অবিশ্বাসের জন্মবিন্দু শেষে : রুমা মোদক

গল্প

অবিশ্বাসের জন্মবিন্দু শেষে

রুমা মোদক

আমার অতি নিরীহ আর তার অতি উগ্র- দুটি অস্তিত্বের একত্র অবস্থান পরস্পরের জন্যই বিব্রতকর ঠেকছিল। সে আঁচ করছিল হয়তো অকারণেই তাকে বহন করে চলেছি আমি। তার এই আঁচ করার পেছনে ছিল আমার চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রতি অবিশ্বাস। আর আমি আঁচ করছিলাম যে-কোনো মুহূর্তে যে কেউ আঁচ করে ফেলতে পারে আমি কিছু বহন করছি। সংগোপনে, যতটা সংগোপনে রাখলে বাইরে থেকে কারও কিচ্ছু বোঝার সুযোগ নেই, আমি সেভাবেই রেখেছি তাকে। কিন্তু আমার চেহারায় ভেসে থাকা অস্বস্তিকে গোপন করতে পারছি না বুঝতে পারছিলাম। কিংবা হয়তো কেউ কিছু আঁচই করছিল না, আমিই বুঝতে ভুল করছিলাম। কিন্তু আমার অন্তর্জাত অস্বস্তি কিছুতেই আমাকে স্বস্তি দিচ্ছিল না।

কিন্তু চূড়ান্ত স্বস্তি পাওয়ার জন্য আমার এই ক্ষণিক অস্বস্তিটাকে সঙ্গে নিতে হয়েছে। নিপাট নিরীহ গোছের চুন খেয়ে মুখ পোড়া মেয়ে আমি, যেদিন হুট করে বিবাহিত ধনাঢ্য লোকটির প্রেমে পড়ে গেলাম, সেদিন থেকেই জানি, ধরাধামে কেউ বিশ্বাস করবে না, কেউ করবে না যে আমি তার অর্থ-বিত্ত-সম্পদের লোভে পড়িনি। কেউ বিশ্বাস করবে না যে আমি আমার প্রবঞ্চিত জীবন নিয়ে তার প্রবঞ্চিত জীবনের প্রেমে পড়েছিলাম।

আমার মূল অস্বস্তির কারণ এটিও বটে। আমাকে কেউ কখনও বিশ্বাস করে না। আমি জানি না আমার আচরণে কিংবা ব্যক্ত ভাবে এমন কী আছে যে আমাকে সবাই অবিশ্বাস করে। সে অবিশ্বাসের মূল্য চুকাতে চুকাতে আমি আজ এসে জীবনের এই খাড়া ঢালে এসে দাঁড়িয়েছি। যেখান থেকে আর পিছনে ফিরবার সুযোগ নেই।

আমি জানি আমি খুব সাধারণ মেয়ে, সুন্দরী তো নই-ই। গুণবতীও নই। যেখানে একজন ধনাঢ্য-বিবাহিতকে আটকানোর জন্য অনেক সুন্দরী-গুণবতী বৈচিত্র্যময় জাল বিস্তার করে রাখতে পারে সেখানে আমার কোনো যোগ্যতাই নেই তাকে জালে আটকানোর। বিশ্বাস করুন তাকে জালে আটকানোর কোনো দুরভিসন্ধিও আমার মাঝে ছিল না। আমি এক প্রবঞ্চিত নারী। ক্যান্সারাক্রান্ত মাকে নিয়ে চেন্নাই দু’মাস অবস্থান করার সুযোগ নিয়ে যে নারীর প্রেমিক বিয়ে করে ফেলে, আর তার বিয়ে করার কারণ হিসাবে আমাকেই দায়ী করে। দায়ী করে মানে অবিশ্বাস করে, টাকা-পয়সা দিয়ে, সাথে গিয়ে যে মামাতো ভাই আমাদের আজন্ম ঋণী করে, আমার প্রেমিক তার উদ্দেশ্যকে যতটা সন্দেহ করে তারচেয়ে বেশি অবিশ্বাস করে আমাকে। অসুস্থ মাকে নিয়ে নিরুপায় আমার অসহায় অবস্থা কোনোভাবেই তার বিশ্বাসের কারণ হয়ে উঠতে পারে না।

বিনা অপরাধে অবিশ্বাসের দুর্বিষহ বোঝা কাঁধে নিয়ে আমি যখন আবার ধনাঢ্য বিবাহিত লোকটির বঞ্চনাময় জীবনের গল্প শুনে তার প্রেমে পড়ে গেলাম এবং চারদিকে সব সুন্দরী ও গুণবতীদের জালপাতানোর সম্ভাবনাকে ছিঁড়েফুঁড়ে তিনিও আমার প্রেমে পড়লেন, আমরা দুজনই দুজনকে বিশ্বাস করলাম। কিন্তু কেন যেন কেউ আমাকে বিশ্বাস করে না এবং আমি আবার অবিশ্বাসের ফাঁদে পড়লাম।

এই যেমন আজ, বেলেশ্বরী নদীঘেঁষা কামারপট্টিতে। বেলেশ্বরী নদীর পাড়ে, যে পাড় ঘিরে একদা গড়ে ওঠা বাজার ক্রমে জনবসতিতে ঘন সম্প্রসারিত হয়ে হয়ে গ্রাম আরও ঘন হতে হতে ক্রমে শহর হয়ে উঠেছে। আর সেই শহরটির ত্রস্ত ছুটে চলা যেখানে এসে একটুখানি হাঁফ ছেড়ে জিরিয়ে নিয়েছে সেখানে। শহরের গা উপচানো কিন্ডারগার্টেন, ডায়াগনোসিস সেন্টার, কোচিং সেন্টার ইত্যাদি আবর্জনাগুলো এখানে এসে ছুটি পেয়ে যায়। নেহাৎ অকেজো প্রয়োজন ছাড়া এ দিকটা মাড়ায় না কোনো কেজো মানুষ।

বেলেশ্বরী নদীটাও মায়ের আঁচলের মতো পুরো শহর ঘিরে এখানে এসে সীমানা শেষ করে দিয়ে চলে গেছে অন্য শহরের উদ্দেশ্যে। এখান থেকেই অন্য শহরমুখী গোটা তিনেক স্থায়ী-অস্থায়ী সেতু শুরু হয়েছে উন্নয়নের সাক্ষ্য দিয়ে। তার কোলঘেঁষে দোকানগুলো হাঁপড় হাঁপড় ধ্বনি নিরন্তর বাজাতে থাকে গির্জার ঘণ্টাধ্বনির মতো। লোহা পোড়ানো আগুনের হল্কা নশ্বর জীবনের মতোই উড়ে উড়ে ছাই হয়ে নদীতে মিশে যায়, নিশ্চিহ্ন হয়। কামার পট্টির নিস্তরঙ্গ, সংগ্রামক্লান্ত, উদ্দীপনাহীন গ্রামগুলো থেকে বের হয়ে অনিল কর্মকার, সুনীল কর্মকার, ভৈরব কর্মকার প্রমুখেরা প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল বেলা ধূপধুনো জ্বেলে ছাপড়া দোকানগুলো খোলে। থরে থরে সাজানো দা-খুন্তি-বটি-কড়াইগুলো ঝেড়েঝুড়ে প্রথমে একচোট হুঁকো টানে। পরে, একে-অন্যকে ‘কিতারে তর পোলায় আর ফোন করছে নানি কিংবা কিতা বে ভুবনের মাইয়ার জামাই আর হাছাঅই মাইয়াডারে নিত নানি’ ইত্যাকার সংকটময় ঘটনাগুলোর আলোচনা-পুনরালোচনাপূর্বক কাতারপ্রবাসী পুত্র কিংবা স্বামী পরিত্যক্ত কন্যার খোঁজখবর বিনিময়ে নিত্যদিন শুরু করে। সারাদিনে যে দু-চারজন খুচরা কাস্টমার এসে এ দোকান সে দোকান যাচাই করে পছন্দমতো দা-টা-খুন্তি টা কিনে নিয়ে যায়, তাদের জন্য খুব একটা অপেক্ষা থাকে না তাদের। চেনা অভাবের ভাঁজ পড়া, বাধ্য হয়ে বয়ে চলা জীবনের নির্বিকার যাপনে মানুষ কী আর নিত্য সংসারের জন্য দা-খুন্তি কেনে! এতো আর নিত্য প্রয়োজনের চাল-ডাল-নুনের মুদি মাল নয়। তাদের রোজগারের মূল ধান্ধাটা জেলাসদর কিংবা বিভাগীয় সদর থেকে আসা পাইকারি ক্রেতাদের কেন্দ্র করে। সেখানে আগুনে হাত পুড়ে, জ্বলন্ত হল্কার সামনে খালি গায়ে ঘাম ঝরিয়ে দা-খুন্তি-ছুরি-চাপাতি জাতীয় আসবার কিংবা অস্ত্র বানানোর কারিগর নেই, কিন্তু প্রয়োজন আছে। এবং প্রয়োজনটা একটু বেশিই আছে। আসল চাহিদা সেখানেই।

সেই কামারপট্টিতে আমাকে নিতান্ত সাধারণ হলেও মোটামুটি সুবেশি এবং সর্বোপরি নারী দেখে সবাই নড়েচড়ে বসে। পাকা রাস্তা-ঘাট, দোকান-পাট ইত্যাদি অলংকারে নতুন গড়ে ওঠা শহরটিতে এখনও নারীদের কাপড়ের দোকান কিংবা মাছ বাজারে যাবার প্রচলন হয়ে উঠেনি। এই কামারপট্টি তো বহুদূর। আমাকে ঘিরে তাদের কৌতূহলী জিজ্ঞাসু দৃষ্টি তারা যতই লুকানোর ভান করুক, সবই ব্যর্থ হচ্ছিল। তারপর এ দোকান সে দোকান ঘিরে আমি যখন দা-বটি-ছুরি-খুন্তি নেড়েচেড়ে দেখছিলাম তাদের সবার দৃষ্টিতে ছিল অবিশ্বাস। যেন আমার মতো নারীর কোনো গার্হস্থ্য প্রয়োজন থাকতে নেই, থাকলেও নারী হয়ে এসব কিনতে এ-পর্যন্ত আসার রহস্য কী! তাদের যাবতীয় কৌতূহল- অবিশ্বাসকে অসাড় প্রমাণ করে আমি যখন একটা জিনিস কিনেই ফেললাম, তাদের চোখ থেকে তখনও অবিশ্বাসের ছায়া সরেনি। এক অবিশ্বাস পরিবর্তিত হয়ে রূপ নিয়েছিল অন্য অবিশ্বাসে।

ধনাঢ্য বিবাহিত লোকটি কিন্তু প্রথমে আমাকে বিশ্বাস করেছিল। যতটুকু বিশ্বাস করলে জীবনের প্রবঞ্চনার কথা বিনিময় করা যায়। আমাদের দুজন প্রবঞ্চিত মানুষের প্রবঞ্চনার ইতিবৃত্ত এক মোহনায় পতিত হয়ে ভেসে চলছিল উত্তাল জীবন সমুদ্রমুখী। তার সঙ্গে আমার পার্থক্য ছিল একটাই, প্রবঞ্চিত ঘটনাটি তার উপর চেপে বসেছিল বিক্রম-বেতালের ভূতের মতো আর আমার প্রবঞ্চনার ঘটনাটি আমার আত্মবিশ্বাস আর জীবনপ্রবাহ ছ্যাড়া-ভ্যাঁড়া করে আমাকে ত্যাগ করে গিয়েছিল।

লোকটির সাথে আমার পরিচয়ের সূত্রপাত ফেসবুকে। আমি মধ্যবিত্ত কিংবা তার চেয়েও নিচে নিম্ন মধ্যবিত্ত সাধারণ মেয়ে। বিত্ত-বৈভবে ঝলসানো লোকটি আমার ফেসবুক আইডিতে রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে ম্যাসেঞ্জারে লিখেছিল- ঠিক এরকম সাধারণ-অসাধারণ একটা নারীর স্বপ্ন দেখতাম আমি।

তার বলার অভিনবত্বে আমি স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠি যেমন পুরুষকুলের স্বাভাবিক উত্যক্তের ভাষায় উঠি না। প্রোফাইলে আনম্যারিড ইনফর্মেশন দেখে বয়সে বড় কিংবা ছোট সমানে শ্লীল কিংবা অশ্লীল ভাষায় প্রস্তাব দিয়ে যায়। ভাষার ভিন্নতা বটে, ভাব অভিন্ন। লক্ষ্য এক। প্রোফাইল ঘেঁটে আমার মতো সাধারণ অবিবাহিতা মেয়েকে সবার হয়তো একটু সস্তাই মনে হয়। উত্যক্তের পরিমাণ দিনে দিনে বাড়াবাড়ি রকমের বাড়তে থাকে। গা বাঁচিয়ে চলার জন্য যে ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাগাদা দেয় প্রাকৃতিকভাবে, আমার চলার পথের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে তা খুব যত্ন করে তুলে রাখা। ফলে সেই পঁচিশ বছরে প্রাপ্ত প্রবঞ্চনা আমাকে পঁয়ত্রিশ বছরে পৌছে দেয় পুনঃপ্রবঞ্চনাহীন নির্বিরোধী জীবনে। কিন্তু জীবন নির্বিরোধী হলে হবে কী? নিঃসঙ্গতা এক প্রাচীন সঙ্গী নিয়ত বিরোধে জড়ায় আমাকে, যাপন দুঃসহ করে, সময় দুর্বিষহ করে। এই দুঃসহ দুর্বিষহতাকে ক্ষাণিক ফাঁকি দিতেই ছাত্র-ছাত্রীদের দুরভিসন্ধিতে টাকা জমিয়ে মোবাইলখানা কেনা আর ফেসবুক একাউন্ট খোলা। বেশ ভালোই নিঃসঙ্গতাগ্রাসী এক ভার্চুয়াল জগতের সন্ধান মেলে। সময় কেটে যায়, কোথা দিয়ে কিভাবে, হিসাবে গড়মিল হয়ে যায় আমার। প্রতারক জীবনের মতো ভুলভাল হিসেবের ভার্চুয়াল সময়টা উপভোগ করি আমি।

গা ঘিনঘিনে অশ্লীল প্রস্তাবকারীদের ব্লক দিয়ে শ্লীল প্রস্তাবকারীদের সাথে কিছুটা আগানোর চেষ্টা করি। হ্যাঁ চেষ্টা করি। অস্বীকার করি না নিঃসঙ্গতা একটা সঙ্গ চায়, আশ্রয় খোঁজে। অধিক, অসম্ভব কিছু প্রত্যাশা নয়, একটু বাক-বিনিময়ের সঙ্গী। অবাক আবিষ্কার করি, কেউ নিঃসঙ্গতার সহমর্মিতা বিনিময়ের সঙ্গী হয় না। সবাই ইনিয়ে-বিনিয়ে লাভ খোঁজে আর বিনিময়ে আমার নিঃসঙ্গতার ঘুমপাড়ানি গান শুনে খুব দ্রুত অধৈর্য হয়ে পালিয়ে বাঁচে।

 

২.

বেলাল ঢুকলেই আড্ডার পরিবেশটা নিমিষে বদলে যায়। হঠাৎ মেঘে ছেয়ে থাকা আকাশে সূর্য উঁকি দেয়ার মতো রোদ ছলকায়। শেয়ার বাজারে ইনভেস্ট করে টাকা লস খাওয়া শফিক, বিদেশে যাবার জন্য দালালের কাছে টাকা দিয়ে নিঃস্ব হওয়া লতিফ, রাজনৈতিক দলে পদের দৌড়ে হেরে যাওয়া তারেক সবাই মুহূর্তে উৎফুল্ল হয়ে উঠে সব হতাশা ফুঁ মেরে। আর্থিক সামর্থ্য আর দিলদরিয়া স্বভাব দুয়ের রাজযোটকে সর্বদা আড্ডার মধ্যমণি বেলাল। প্রতিদিন হতাশার সমাধানহীন পচাডোবায় হাবুডুবু খেতে খেতে জগার স্টলে তারা অপেক্ষায় থাকে বেলালের। কিন্তু ছেলেটা বড় খেয়ালি। এই লতিফ, তারেক, শফিকদের হা-পিত্যেশ করে বসে থাকার কোনো গুরুত্বই তার কাছে নেই। এখানে উদয় হওয়া না-হওয়া সম্পূর্ণ তার ইচ্ছাধীন।

অবশ্য এ ব্যাপারে তাদের কিছু করারও নেই, বেচারারও কোনো উপায় নেই। বড় ভাই হেলাল তাকে ছাড়া অচল। কন্ট্রাকটারি ব্যবসার সাইট পরিদর্শন থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক্সি এন ইঞ্জিনিয়ারের টেবিল চাপড়ে বিলে সাইন করানো কোনো কাজই তাকে ছাড়া হয় না। কয়দিক দেখবে ব্যবসায়ী হেলাল। চারদিকে ছড়ানো ছিটানো ডজনখানেক ব্যবসা তার, সবগুলোই রমরমা, একা হাতে সামলানো মুশকিল। বেলালকে ছাড়া গতি নাই তার। শুধু কী ব্যবসা সামলানো, রাজনৈতিক চাঁদাবাজির ঠেলা সামলানো, রাত-বিরাতে ক্যাশ টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরা, যখন-তখন পরিদর্শনের হুমকি সামলে দেয়া শূন্য থেকে কোটিপতি হওয়া কী কম ঝক্কি! হেলালকে রাখতেই হয় সাথে।

বেলাল তাই আড্ডায় নিত্যদিন আসার সুযোগ করে উঠতে পারে না। কিন্তু যেদিন আসে কোনো কিছুর অভাব হয় না। পর্যাপ্ত তরল, সদ্যস্থাপিত চাইনিজ রেস্তোরাঁর ফ্রাই করা চিকেন। উদার হস্তে খরচে কোনো কার্পণ্য নেই তার।

আজ বেলালের চোখের দিকে তাকিয়ে উৎফুল্লতা গোপনের চেষ্টা করে সবাই। বেলালের সুচতুর দৃষ্টিতে আজ রুষ্টতা। কিছু একটা ঘটেছে সবাই টের পায়, কিন্তু স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কিছু করা ও জিজ্ঞেস করার দুঃসাহস নেই। বদমেজাজটা সামলে রাখতে জানে না বেলাল। যখন-তখন, যেখানে-সেখানে যে কাউকে দেখিয়ে জল ঘোলা করে ফেলে। দুর্মুখেরা বলে এসবই তার পকেটের গরম। তাই সবাই সমঝে চলে, সাবধানে কথা বলে যেন রুষ্ট না হয় সে, হতাশ জীবনের এই আনন্দের অপেক্ষায় কোনো বিঘœ না ঘটে।

পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে শফিকের হাতে টাকার গোছা দিতে দিতে মুখ খুলে বেলাল- রোশনির বাড়ি কোনো পাড়ায় রে? বাপের নাম কী? টাকার গোছা হাতে পেয়ে শফিক যেমন বুঝে ফেলে করণীয় কী, ঠিক তেমনই রোশনির নাম উচ্চারণ করা মাত্রই সবাই বুঝে ফেলে বেলালের রুষ্ট দৃষ্টির অন্তর্নিহিত কারণ।

এ এক প্রকাশ্য গোপন বিষয়। বেলালের অপ্রতিরোধ্য নারীপ্রীতি। মনে ধরার বালাই নেই, চোখে ধরলেই হলো। রোশনি শহরের উঠতি সংগীতশিল্পী। চোখে ধরেছে তার। বিষয়টি বুঝে ফেলার সাথে সাথে মামলা চুকে যেত রোশনিকে বাগে আনার ফাঁদ ফেললেই। কিন্তু বেলাল না জানলেও বাকিরা জানে রোশনি শহরের উঠতি ছাত্রনেতা হাকিম ভাইয়ের প্রায় সর্বজনস্বীকৃত প্রেমিকা। তাকে বাগে আনার চেষ্টা করা কঠিন নয় কেবল, অসম্ভবও। সবাই প্রমাদ গোনে।

বেলাল অধৈর্য হয়, কথা কছনা ক্যান কেউ? ফেসবুকে সার্চ দে, নাম-ঠিকানা বাইর কর। নিজের ফেসবুক একাউন্ট থাকলেও চালানোর ফুসরত বা ধৈর্য কোনোটাই নেই বেলালের। তাই অন্যদের আদেশ। শফিক উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে বের হয়ে গেলে, বেলালের দৃষ্টি আরও রুষ্ট হবার আগে লতিফ ভয়ে ভয়ে জানিয়ে দেয় বিষয়টা, রোশনি ত সভাপতি হাকিম ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড।

কী! দৃষ্টির রুষ্টতা কমানোর উদ্যোগ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়ে দ্বিগুণ তেজে জ্বালিয়ে তোলে বেলালকে। জগার স্টলে গ্লাস-কাপ হাতের ঝটকায় ভেঙেচুরে উল্কার বেগে বেরিয়ে যায় সে। শফিক এক হাতে খবরের কাগজে মুড়ানো বোতল আর অন্যহাতে চিকেন ফ্রাই নিয়ে ঢুকলে আপাতত আজকের রাতটা উদ্যাপনের নিশ্চয়তা পায় বটে কিন্তু আসন্ন অনিশ্চিত বিপদাশঙ্কা সবার দুশ্চিন্তা উঁচকে দেয়।

 

৩.

আর এই ধনাঢ্য বিবাহিত লোকটি কিনা আমাকে অসাধারণ সঙ্গী বিবেচনা করে নিজেই বাক-বিনিময়ের সূত্রপাত ঘটালো। তার ম্যাসেঞ্জার বার্তায় মৃদু ভূমিকম্পের মতো কাঁপলাম বলেই তার প্রোফাইলটাও ভালো করে ঘাঁটলাম, বিবাহিত জেনেও নিজেকেও নিবৃত্ত করতে পারলাম না। পাল্টা প্রত্যুত্তর রেখে কাঁপন থামাতে চাইলাম, অসাধারণ কিছুই নই… খুব সাধারণ। সেই শুরু…। সে আগায়… আমিও…। আমার সময় কাটানোর খুব স্বাভাবিক প্রবণতা অস্বাভাবিক মোহগ্রস্ততার দিকে যায়। আমি টের পাই আমি তার মাঝে পতিত হতে থাকি, সমর্পিত হতে থাকি…। দুজনের মাঝে স্থাপিত হয় বিশ্বাস আর নির্ভরশীলতা।

যে বিশ্বাস আর নির্ভরশীলতায় তার পৈতৃক ভিটায় নবনির্মিত সুসজ্জিত কক্ষে শীতাতপ যন্ত্রের কোমল ঠান্ডায় সে আমাকে জানায়, কী করে তার স্ত্রী স্বীকৃত নারীটি প্রবঞ্চিত করেছে তাকে। পছন্দ করত, বিয়েই হতো। হয়তো বছর কয় পরে, পায়ের নিচের মাটিটা আরেকটু পোক্ত হলে। আর সে কিনা আঠারো সপ্তাহের গর্ভ নিয়ে হাজির হলো একেবারে তার মায়ের কাছে! লোকলজ্জা, সামাজিক সম্মান, মানসিক অস্থিরতা ইত্যাদি বহুবিধ কাঁটা গোলাপ বাগানের ঝাড়ে আটকে দিয়েছিল তাকে। বের হয়ে আসতে চাইলেও তা পারতো না সে। যে অবৈধতাকে চাপে পড়ে বৈধতা দেয়া, তার জন্য আর নেশাও থাকে না, মায়াও থাকে না। পৈতৃক ভিটাতে স্থান দেয়ার সম্মানটুকুও দেয়নি লোকটি। কেবল দায়ের দায়িত্ব তার প্রতি…। সে আরও বলেছিল, কী করে জীবনের এই ফাঁকগুলো মানুষ যেন জেনে যায় আর ধূর্ত নারীরা ফাঁদ পাতায়। সে বলেছিল। সব বিশ্বাস করে বলেছিল।

তার এই বিশ্বাসের শেষবিন্দু আর অবিশ্বাসের সূচনাবিন্দুর কথা মনে পড়াতেই আমার আবার তার কথা মনে পড়ে। তাকে বহন করছি আমি, বিশেষ উদ্দেশ্যেই করছি। আলগোছে হাত দিয়ে অস্তিত্ব নিশ্চিত হই। হাত সরিয়ে আনার সময় খুব বিরক্ত হয়ে বলে সে, তুমি পারবে না। কখনওই কিচ্ছু করতে পারবে না। শুধু শুধু আমাকে বহন করে বিপদ বাড়াচ্ছো। অবিশ্বাস এবার ঘিরে ধরে নিজেকেই, আসলেই কী পারব না আমি? আত্মবিশ্বাসহীন দুর্বলতার কাছে পরাজিত হবো? নিজেকে নিজেই দৃঢ় করি। পারতেই হবে, পারতেই হবে আমাকে। এবার দেখি তার চোখেও অবিশ্বাস। আমি বলি ধেয়ে আসা পানির ¯্রােতে বিপন্ন পিঁপড়া যেমন শক্তিশালী মানুষের পা কামড়ে বাঁচতে চায় আমি তেমন বাঁচব, বিপন্নতার চূড়ান্ত মুহূর্তে পা বেয়ে উঠে, কামড়ে ধরে। তার চোখে ফিরতি অবিশ্বাস দেখার অপেক্ষা করি না আমি।

স্কুলের প্রবেশ গেটে দারোয়ান সালাম ঠোকে, আফা আজকে অত লেইট, বড় আফা অনেক আগে আইছে। সকাল সকাল কামারপট্টি গিয়ে দেরি হয়ে যাবার বৃত্তান্ত তাকে বলে লাভ নেই। কিন্তু দারোয়ানের চোখে কী অবিশ্বাস দেখি আমি? বড় আপা কতই তো এমন আগে আগে স্কুলে আসে, কোনোদিন তো কিছু বলে না সে।

কমনরুমে কাঁধের ব্যাগ হাতলে ঝুলিয়ে নির্দিষ্ট চেয়ারে বসতে না বসতেই এম.এল.এস.এস জানাতে আসে, বড় আফা আফনেরে ডাক অইন। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আমি উঠতে যাব, সহকর্মী অরুণাদি বলে ওঠেন, আরে বাবা ব্যাগে কী এমন মহামূল্যবান সম্পদ, রেখে যাও। আপা গার্লস গাইডের ট্রেনিং-এর চিঠি দেবেন তোমাকে। এভাবে বলল কেন অরুণাদি? অরুণাদির চোখেও কী অবিশ্বাস দেখি আমি? ক্লাসগুলো খুব অমনোযোগিতায় সারতে থাকি আজ। বোর্ডে ণত্ব বিধানের নিয়ম বুঝাতে বুঝাতে আবার তার বিরক্ত কণ্ঠ শুনতে পাই, এই যে একঘরভর্তি নিষ্পাপ মুখগুলোকে আমি ব্যাকরণের মতো খটখটে বিষয়েও মন্ত্রমুগ্ধের মতো আটকে রাখি, সে আমি কেন বৃথাই তাকে বহন করছি! কেন নিজের বিপদ ডেকে আনছি! আমি যা চাইছ তা পারব না, সে ধাত নয় আমার।

আরে মহামুশকিল তো! তোর কী? তোর এত মাথাব্যাথা কেন, আমি পারব কী পারব না আমি দেখব। স্বভাববিরুদ্ধ একটু রুক্ষ হয়ে যাই কী? ছাত্রীরা কী শুনে ফেললো কিছু? ক্ষণিকের আত্মবিস্মৃতি সংহত করে সামনে বসা সারি সারি পবিত্র মুখগুলোর দিকে তাকাই। নিপাট নিরীহ আমার মতো সাধারণ শিক্ষকের হঠাৎ এই বদলে যাওয়া রুক্ষমূর্তির দিকে অবিশ্বাসের চোখেই তাকিয়ে আছে তারা।

 

৪.

ঘরে ঢুকেই ডাইনিং টেবিলে ভাত খাওয়ারত বেলালের গালে গায়ের জোরে থাপ্পড় লাগায় হেলাল ভাই। ভাতের প্লেট সমেত চেয়ার উল্টে ছিটকে পড়ে বেলাল। ইলিশ মাছের ঝোলমাখা ভাত ছড়িয়ে পড়ে আনাচেকানাচে ঘরময়, গুচ্ছ-গুচ্ছ, একটা-দুটো নানান রকম ভাবে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় বেলাল ঘটনার আকস্মিকতায়। বুঝে উঠতে পারে না কী ঘটেছে!

হেলাল ভাইয়ের তার মতো বদমেজাজ নয়। ঠান্ডা মাথার সুপরিকল্পিত সুবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। তার হলোটা কী বুঝতে পারে না বেলাল। হেলাল ভাইয়ের মুখে শিলাবৃষ্টির মতো তুবড়ি ছোটে গালির। বেলাল এক থাপ্পড়ের টাল সামলাতে না সামলাতেই হেলাল ভাই আরেক থাপ্পড় দিয়ে শুইয়ে দেয় তাকে। পাশের ঘর থেকে মা আর গৃহকর্মীরা এসে হামলে পড়ে বাঁচায় বেলালকে। হেলাল ভাইয়ের এ রূপ সম্পূর্ণই অপরিচিত সবার কাছে, বেলালের কাছে তো বটেই। গজগজ করতে করতে ক্রুদ্ধ হেলাল ভাই ঢুকে যায় নিজ কক্ষে।

টাল সামলে নানা জায়গায় ফোন লাগায় বেলাল। শফিক, লতিফ, তারেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের আগে। কেউ ফোন ধরে না। মনে মনে বিড়বিড় করার মতো ধৈর্য তার কোনোকালে ছিল না। তারস্বরেই গালি পাড়ে সে, শালারা সময়ে ফোন ধরে না। পা-চাডার দল, ভাগের সময় সব হাজির। কেউ ফোন না ধরাতে মোটর বাইকটায় চড়ে বসে সে বের হবে বলে। ঠিক তখন ফোন ব্যাক করে একজন, কে? শফিক, লতিফ, তারেক? যে-ই হোক, দেখার সময় নাই। ফোনটা পিক করে বেলাল।

ঐ প্রান্তে যা শুনে স্তব্ধ হয়ে বাইক থেকে নেমে পড়ে সে। জেলার কোনো হোটেলে কোনো মেয়ের সাথে রাত কাটানোর ভিডিও তার অনলাইনে ভাইরাল। হাতে হাতে সেই ভিডিও ক্লিপ। বেলাল ঠিক ডিজিটাল ছেলে নয়। এসব ফেসবুক-টেসবুক খুব সুবিধা করতে পারে না, নইলে সেও জানতে পারত অনেক আগেই। এই ডিজিটাল না হওয়ার কারণজাত হতাশায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে সে। কী করা উচিত এই মুহূর্তে বুঝে উঠতে পারে না। ও প্রান্ত থেকেই পরামর্শ আসে, তাড়াতাড়ি আয় কিতা করণ যায় ঠিক করি।

জগার স্টলের সামনের দিকে চেয়ারে চা-ডালপুরি নিয়ে আজ আর বসা হয় না। সরাসরি পিছনে চলে যায় সবাই। কাজটা যে নেতা হাকিমের করা এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ সবাই। কিন্তু পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে একমত হতে পারে না। রোশনির রিকশা আটকে হুমকি দিয়েছিল বেলাল, শুনে ফোনে পাল্টা হুমকি দিয়েছিল নেতা হাকিম। পাল্টা হুমকিতে তখন না ঘাবড়ালেও বেলাল স্পষ্টই বুঝতে পারে এই ফাঁসিয়ে দেয়ার কাজটা হাকিমেরই প্রতিশোধ।

শালি রোশনিরে ধরা না, ছোঁয়া না কিচ্ছু না। তার এত বড় মাশুল! নিজের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির কথা না হয় বাদই থাকলো, নেতা হাকিমের সাথে হেলাল ভাইয়ের নানা ব্যবসার অংশীদারিত্ব। ক্ষতিটা যতটা না বেলালের হবে, তার চেয়ে বেশি হবে হেলাল ভাইয়ের। সরকারি দলের নেতা হাকিম সব হাতিয়ে কব্জা করতে সময় নেবে না। পথে বসে যাবে হেলাল ভাই। মাথা ভনভন ঘোরে বেলালের। ভাইয়ের অর্থে তার শক্তি! একটা নারীর প্রতি সামান্য লোভ সব হিসাব এমন জট পাকিয়ে দেবে কে জানত! কী করবে বুঝে উঠতে পারে না বেলাল। বাকিরাও কোনো কার্যকর পথ দেখিয়ে সমাধান দিতে পারে না।

হঠাৎ কী হয় জগার স্টল থেকে বের হয়ে দ্রুত মোটর সাইকেলে স্টার্ট দিয়ে হাওয়া হয়ে যায় বেলাল। কেউ কিছু বুঝে উঠে পিছন ডাকার সুযোগটুকু পায় না। তবে বেলালের বদরাগী, ক্রুদ্ধ উঠে যাওয়ার ভঙ্গি যে আশঙ্কা রেখে যায় তাতে বাকিরা ঘাবড়ে যায়। এমন হিং¯্র রোষ তার দেখেছে আগেও। সামান্য কারণেও রেগে অঘটন ঘটায় বেলাল। সঙ্গে থাকা কেউ না কেউ তাকে সামাল দেয়। কিন্তু এখন একা মোটরবাইক নিয়ে কোথায় গেল সে! যেখানেই যাকÑ ভীষণ বড় রকমের অঘটন ঘটানোর লক্ষণ নিশ্চিত করেই গেছে সে।

 

৫.

প্রাত্যহিক যে জীবন অর্থবিত্তের নিশ্চয়তায় নিয়ত আনন্দময় হওয়ার কথা ছিল লোকটির, সেই দাম্পত্য ছিল দুর্বিষহ তার। প্রবঞ্চনা দিয়ে যে সম্পর্ক শুরু, প্রতিনিয়ত প্রতারণা করাই হয়ে দাঁড়ায় তার ভবিতব্য। কেবলই অর্থ হাতানোর কৌশল বুঝেও না বুঝার ভান করে থাকা যে দাম্পত্য, তাকে বিবাহিত জীবন বলে না। জীবন সে পেয়েছিল আমার কাছে। হিসাব-নিকাশহীন কেবলই প্রাপ্তির জীবন। বলা বাহুল্য, আমিও পেয়েছিলাম। স্কুলের চাকরিতে আমাদের মা-মেয়ের জীবন ভালোই চলে যেত। টানাপড়েন আমাকে শিখিয়েছিল জীবনের চাহিদাগুলোর রাশ টেনে ধরতে। ফলে ধনাঢ্য বিবাহিত লোকটি তার অর্থ-বিত্তের প্রতি মোহহীন আমাকে আবিষ্কার করতে সময় লাগেনি। বৈধ স্ত্রী না হয়েও তার পৈতৃক ভিটায় তার একান্ত কক্ষে অবাধ যাতায়াতের অধিকার ছিল একমাত্র আমার। আমার নিঃসঙ্গতার অনিবার্য সঙ্গী হয়ে উঠেছিল সে। যখন-যেখানে অবস্থান করুক, আমি ফোন দেয়ামাত্র সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করে পাল্টা হ্যালো বলার মতো সম্মান দিয়েছিল সে। নিঃসঙ্গতার বোধ আমার কেমন ঝড়ে ওড়া তুলোর মতো ভাসতে ভাসতে দূর দিগন্তে মিলিয়ে গিয়েছিল, আমি তার সন্ধান পেতাম না। করতামও না।

সেদিন তার একান্ত কক্ষে অপেক্ষায় ছিলাম আমি। এ আমার নিত্যকর্ম। সে ফেরে কাজকর্ম সেরে। তার ব্যস্ততা বুঝি আমি। অপেক্ষা করি, ধৈর্য ধরি। দেখা না হওয়ার অস্থিরতা আমার দিন মাটি করে দেয়, নিজের অস্থিরতাকে সমীহ করেই বসে থাকি আমি। হঠাৎ কী হয় তার সহোদর ভাইটি, বয়সে যে আমারও ছোট, ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দেয় প্রথমে। তার প্রাথমিক আচরণ আমার সন্দেহের ঊর্ধ্বেই থাকে। সে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রটির রিমোট হাতে নিলে দরজা বন্ধ করার একটি গ্রহণযোগ্য কারণ দাঁড়ায়। আমি মোটেও উদ্বিগ্ন হই না ততক্ষণ, যতক্ষণ না সে আমার হাতের মোবাইলটি কেড়ে নেয়।

কিন্তু তখন আর সাবধান হয়ে পালাবার পথ থাকে না আমার। আমারই পরিধেয় শাড়ি হ্যাঁচকা টানে খুলে মুখে চেপে ধরে আমার। অসুরের নির্দয় শক্তিতে আমার ব্লাউজ টেনে ছিঁড়ে, টেনে ছিঁড়ে ছয়ত্রিশ ইঞ্চি অন্তর্বাস, ছুঁড়ে ফেলে। আমার প্রতিরোধের সর্বশক্তিকে দ্বিগুণ শক্তিতে দলিত করে আমাতে উপগত হয় সে। তার চোখেও অবিশ্বাস দেখি আমি দমবন্ধ অন্ধকারে। শালী… মাগি… ভালোবাসা ভালোবাসা.., ভাইজানের লগে ভালোবাসার ঢং! কিচ্ছু বুঝি না না? আমি কচি খোকা!

অবিশ্বাস কী আমার পিছু ছাড়বে না? ধনাঢ্য বিবাহিত লোকটিকে যখন ঘটনাটা বলেছিলাম আমি, ঠুনকো কাচের গ্লাসের মতো খানখান হয়ে ভেঙে পড়েছিল তার বিশ্বাসের সৌধ। এতদিন, এতগুলো মুহূর্ত ধরে তৈরি করা বিশ্বাস নিমিষে ধুলোয় মিশিয়ে তীব্র অবিশ্বাসে আমাকে ত্যাগ করতে সময় নিলো না সে। তারপর তাকে কত ফোন-ম্যাসেঞ্জারে কত বার্তা! সমস্ত কিছু ব্লক করে দিয়ে অবিশ্বাসকে আরও পোক্তই করল সে। আমি জানতেও পারলাম না, কী ভাবল সে! তার অর্থ-বিত্তের লোভে গল্প সাজিয়েছি? নাকি তার সাম্রাজ্যে একচ্ছত্র অধিপত্নী হবার লোভে ভাইকে দূরে সরাতে চেয়েছি! কী ভাবল সে?

আমি জানি না আমার আচরণে কিংবা ব্যক্তভাবে এমন কী আছে যে সবাই আমাকে অবিশ্বাস করে? যে অবিশ্বাসের সকল যন্ত্রণা সংহত করে সাহসী প্রস্তুতি নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছি, দাঁড়িয়েছি ধনাঢ্য বিবাহিত লোকটির পৈতৃক ভিটার সদর ফটকে।

ভিতর থেকে তীব্র আতর লোবানের গন্ধ করুণ মিহি তেলাওয়াতের সুরের সাথে মিশে নাকে মুখে কানে তরঙ্গায়িত হয় আমার। আমি উঁকি দিয়ে দেখি প্রশস্ত উঠানে কাফনে মোড়া মৃতদেহ। সকল প্রস্তুতি অপ্রস্তুত হয়ে আমাকে ফটকের আড়ালে আত্মগোপনের তাড়া দেয়। সাদা টুপি পরা জনাকয়েক লোক ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে আর বের হতে হতে যে কথাগুলো বলে, সেগুলো ছুঁড়ে আসে আমার কানের দিকেÑ আল্লার বিচার আল্লায় করছে। বেশি বাড় বাড়ছিল বেলাল।

নিজেকে কেমন নির্ভার অবসন্ন লাগে আমার। ব্যাগের ভিতর হাত দিয়ে বের করে আনি খবরের কাগজে মোড়া ছুরিটা। কামারপট্টি থেকে কেনা অস্ত্রটি নিয়ে বড় সন্ত্রস্ত দিন কাটাতে কাটাতে যে কাজটির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমি, তার আর দরকার নেই। আমি পারতাম না, ছুরিটির এই বদ্ধমূল অবিশ্বাস আর আমি পারতাম নিজের এই দৃঢ়তা, দুয়ের দ্বন্দ্ব স্বীকার করেই তাকে মুক্তি দিই আমি, ছুঁড়ে ফেলি দূরে… যতদূর যায়…।

লেখক : গল্পকার

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares