চলহাটির অশেষকথা : হামীম কামরুল হক

গল্প

চলহাটির অশেষকথা

হামীম কামরুল হক

চলহাটির দুপাশে দুটো বিল। পুবে-পশ্চিমে। পুবের দিকটায়ই লোকজনের বাস। গ্রামের পশ্চিম দিকের বিলটায় একেবারে মানুষজন আসে না। কোনো বিল বা এমন বিশাল হাওরের একটা না একটা দিকে গা ছমছমে ব্যাপার থাকে। সহজে কেউ সেদিকটায় যায় না। ওখানটায় জোকানের ভিটা। এর পরপরই জঙ্গল শুরু। জোকান শেখ খুব সুন্দর বাঁশি বাজায়। ছোটবেলায় বাবা-মা মারা যাওয়ার পর একা একা বড় হয়েছে সে। এবাড়ি ওবাড়ি কামলা খাটা ছাড়া আর শেখার মধ্যে শিখেছে বাঁশি বাজানো। তাও শেখা হতো না। প্রতিবছর চলহাটি গ্রামের ছাতিম তলায় বিরাট মেলা বসে। কত বাহারি জিনিস, কত মানুষ আর হয় পালা। মেলা থেকে নিজে নিজেই একটা বাঁশি কিনে নিয়েছিল জোকান। কারও কাছে শিখতে যায়নি। নিজের মতো করে ফুঁ দিতে দিতে কী করে নিজের মতো করেই শিখে নিয়েছে সে। কাউকে শোনানোর জন্য নয়। কোনো বাহাদুরি কেরামতি দেখানোর জন্যও নয়। একেবারে নিজের ভালো লাগার জন্য সে বাঁশি বাজানো শিখে নিয়েছিল। খুব যে ওস্তাদ বাঁশিওয়ালা হয়েছে তা না। ঘুরেফিরে নিজের মতো করে কয়েকটা সুরই বাজায়। মাঝে মাঝে নিজের মতো করে কী সব সুর তার বাঁশিতে এসে বাজতে শুরু করে জোকান নিজেও জানে না। দুবেলা পেটভরে ভাত খেতে পারলে আর জোকানের কিছু চাই না। খাটতেও পারে যমের খাটুনি। নিজের বলতে একটুখানি ভিটামাটি। সামান্য একটু উঠান। তাও এমন এক জায়গায় সেখানে শেয়াল কুকুরও যায় না, মানুষ তো দূরের কথা। একেবারে জঙ্গলের কাছাকাছি জায়গাটায় নিজের মতো থাকে সে। বেশিরভাগ দিনে তার কাজ শেষ হয়ে যায় দুপুরের পর পর। কোনো কোনো দিন বিকালে গড়ায়। এলাকার প্রায় সবাই জানত জোকানের কোনো বুদ্ধিশুদ্ধি নেই। ছিপছিপে পাতলা শরীর একেবারে ধনুকের ছিলার মতো টানটান। গায়ে অমানুষিক জোর।

কেবল দেশ স্বাধীন হয়েছে। গ্রামে গ্রামে  কিছু লোক বন্দুক হাতে ঘোরে ফেরে। যুদ্ধের সময় এদিকটায় মিলিটারি এক চক্কর দিয়ে গেলেও জোকানের দেখা পায়নি। জোকান তার মুনিবের সঙ্গে তাদের মাল নিয়ে বর্ডার পার হয়েছিল। তখন জোকানের কেবল গোঁফ উঠেছে। পেশি ফুলতে শুরু করেছে। মুনিব একটা ক্ষুর দিয়ে বলেছিল, নিচেরটা যা খুশি কর। কিন্তু বগলের তলাটা কিন্তু পরিষ্কার করবি। নোংরা বগল আমার একদম সহ্য হয় না। জোকানের নিজেরও দাঁড়িগোঁফ চুল রাখা পছন্দ না। একটু বড় হলেই চুলকায়। মুনিব কথাগুলি না বললেও  চলত। জোকান নিজের জন্যই নিজে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে।

মুনিব লোকটার অনেক দোষ ছিল। প্রথমদিকে জোকানকে দিয়ে নিজের কিছু আকাম করাতে চেষ্টা করে দেখে মহাবিপদ, এমন বোকা মানুষ নিয়ে আকাম করতে গেলে মান ইজ্জত আর থাকবে না। বোকা ভোন্দা লোক নিয়ে আর যাই হোক আকাম করার সুযোগ নাই। বোকা লোক নিয়ে মসজিদে যাওয়া যায়, কিন্তু মাগিবাড়ি যেতে হলে চালাক লোক চাই। কারও বারোটা বাজানোর জন্য ভোন্দা লোক দিয়ে কোনো কাজের কাজ হয় না। তারচেয়ে তুই বাবা কামলা খাট। টুকটাক ফায়ফরমায়েশ খাট। তোরে কোনো কিছুর সাক্ষী রাখা যাবে না। এটা জোকানের মুনিব ঠিক করে নিয়েছিল।

জোকান আসলে সব ভারী কাজ করতে পারত। হালকা কাজে তাকে কেউ লাগাতও না। বোকা জোকান যে কটা কথা বুদ্ধিমানের মতো বোলে ফেলেছিল তার একটা হলো : ছোট ছোট হালকা কাজে তেজ খরচ হলে ভারী কাজ ঠিকমতো করণ যায় না। তেজ কথাটা জোকান খুব বলত। কথা যে খুব বলত তা না। লোকজন সম্পর্কে কথা বলতে গেলেই বলত, কার তেজ আছে আর কার তেজ নাই। ওনারে দিয়ে এ কাজ হবে না, তেজ নাই। বা বলত, আমার আজকে আর তেজ নাই।

এই জোকান বাঁশি বাজাতে গিয়ে টের পায় তেজের পাশপাশি আরও দুটো জিনিস দরকার, এর প্রথমটা হলো দম, পরেরটা হলো কায়দা। তাই তেজ, দম আর কায়দা যার নাই কোনো ব্যাপারে সে লোক দিয়ে কিছু করার নাই। বোকা জোকানে এই সব কথা চায়ের দোকানে একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়েছিল।

পড়ালেখা করিস নাই! এসব কথা পাস কোথা থেকে?

আমার দিলে কয়। আমি শুনি। কাম করি।

তখনও জোকান যে বাঁশি বাজানো শিখেছে এটা গ্রামের কেউ জানত না। এসময় রমিজ ও তার প্রেমিকা সোনাভান নিজেদের অভিসারের জায়গা খুঁজছিল। সোনাভানের স্বামী মারা গিয়েছিল। গঞ্জে চালের আড়ত ছিল। রমিজ সোনাভানের ভাইয়ের বন্ধু। বিয়ের আগে থেকেই তাদের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু রমিজের কোনো চালচুলা নেই। কেবল দেখলে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। পাকা গমের মতো গায়ের রঙ। আর গায়েগতরে জোয়ানকির অবিশ্বাস্য ধাক। কখনওই বয়স বোঝা যেত না। স্কুলের বালক অবশ্য মনে হতো না। কিন্তু মনে হতো এর বয়স পঁচিশের ওপরে নয়। গ্রামের বিস্তর মেয়ে, বিবাহিত, অবিবাহিত, বিধবার সঙ্গে বোলে তার পিরিতের সম্পর্ক। কেবল লোকমুখেই রটনা ছিল। কেউ তাকে কোনোদিন ধরতে পারেনি। সে বোলে বাতাসে মিলিয়ে যেতে পারত। কেউ কেউ বোলে রমিজ আসলে মানুষ না, জিনটিন ধাঁচের কিছু। সোনাভানও দেখেছে, সেদিন নিজের বাড়িতে নির্জন দুপুরে আরেকটু হলে ধরা পড়ে যেতে যেতে যায়নি। রমিজ খাটের থেকে গড়ান দিয়ে কোথায় মিলিয়ে গেল সেই ঘোরলাগা বর্ষার অন্ধকার দুপুরে, পরে জিজ্ঞাসা করলে সে বোলে রামুখাঁ বাবার কৃপা।

রামুখাঁ চলহাটির এক রহস্যময় পুরুষ ছিল। নিজের নামে একটা সম্প্রদায় আছে। তাদের মন্ত্র হলো : ‘গরতই ছতর।’ আর ‘গতর বাদে প্রভু নাই/গতরেই প্রভুরে পাই।’ এদের আখড়া আছে চলহাটি গ্রামের আরেক দিকের বিলের ভেতরে দ্বীপের মতো জায়গায়। সেটা নাকি রাজ্যের অনাচার অজাচারের রাজ্য। ওরা ওই জায়গার নাম দিয়েছে: মার্গসিদ্ধি। সেখানে কোথা থেকে এত জোয়ান জোয়ান নারীপুরুষ যে আসে কে জানে। আসলে আসে অবাধ মেলামেশার সুযোগ নিতে। সেখানের ঘের দেওয়া একটা জায়গায় বোলে রাতগভীরে উলঙ্গসাধনাও চলে। রাত আরও একটু গভীর হলে সবাই পরনের সব কিছু খুলে একে অন্যের ভেতরে হারিয়ে যায়। এসময় কজন কজনের সঙ্গে মেশে তার কোনো হুঁশ  ও হিসাব থাকে না। নিজেরদের সমস্ত দিক থেকে স্খলিত করে, নিঃশেষ করে দেওয়ার পর শুরু হয় রামুখাঁ বাবার শূন্যতার সাধনভজন। চলহাটির কোনো লোককে ওইখানে যেতে দেওয়া হয় না, একমাত্র রামুখাঁ বাবার অনুসারী আর ঘোর ফর্সা বিদেশি আর ঘোর কালো মানুষ ছাড়া। রামুখাঁ বাবার অনুসারীরা খতনা করে না। আর শরীরের ভেতরের দিকের কোনো লোম পরিষ্কার করে না। বাইরের চুল দাড়ি রাখা না রাখায় যার যার ইচ্ছা পছন্দ আছে। রমিজ ওই রামুখাঁ বাবার অনুসারী বলেই আসলে কেউ তারে কিছু বলতে পারে না। নানান সময় দেশের বাইরে থাকা লোকজনকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। তারা বোলে ওই রামুখাঁ বাবা ও তার উপাসক সম্প্রদায় সম্পর্কে বইপত্র লিখতে চায়। লোকজনের সঙ্গে থাকে দিনের পর দিন। অনেকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে। সেসব কথা একটা ক্যামেরাওয়ালা ছোটযন্ত্রের ভেতরে নিয়ে নেয়। কেবল উলঙ্গসাধনা ঘোর অন্ধকারে চলে বোলে তারা এর গোঙানি ছাড়া আর কিছুই ধারণ করতে পারেনি। ওই সময়ে কোনোমাত্র আলোর ব্যবহার চলে না। রামুখাঁর কঠোর অনুশাসন আছেÑ ওই সময়ে আলো জ্বালালেই ওই দ্বীপ বোলে ডুবে বিলের তলে চলে যাবে। চলহাটির লোকজন বলে, আল্লাহর গজবের হাত থেকে বাঁচার জন্য বোলে ওইরকম অন্ধকার করে দেওয়া হয় সব। কারণ অন্ধকারে আসলে কী ঘটে কেউ তো জানে না। তো সেই দ্বীপে যেসব বিদেশি লোকজন আসে, তাদের বেশির ভাগই আসে রমিজের সঙ্গে। রমিজ কাজ চালানোর মতো বোলে কয়েকটা ভাষা শিখে ফেলেছে। ওর সঙ্গে যারা যারা এসেছিল সেখানে তাদের কয়েকজন বোলে তাকে শহরে নিয়ে তাদের ভাষা শেখার স্কুলে তাকে পড়িয়েছে নানান সময়ে। ওর সঙ্গেই এসেছিল সোফিয়া কসিম অস্টার। তার শরীরে বোলে জার্মান, তুর্কি আর ইতালীয় রক্ত। দাদাদাদি ছিল জার্মান আর তুর্কি। বাপ তো জার্মান আর মা ইতালীয়। ইউরোপীয়দের ভেতরে একধরনের হালকা শ্যামলা আভার মেয়ে আছে, ভ্যারভেরে ফর্সা নয়, সোফিয়ার গায়ের রঙ সেই রকমের। সোফিয়া এসে দিব্যি দিশি পোশাক পরে। শাড়ি বা সালোয়ার কামিজ পরে ঘুরে বেড়ায়। আর সারাগ্রাম রমিজের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। ওদের দুজনকে দেখলেই বলত, ওই যে রমিজের নতুন মাল। রমিজের নিজের বলতে একটা দোতলা টিনের ঘর ছিল। দোতলায় বিদেশি কেউ এলে থাকত। বিদেশিরা গ্রামে এলে গ্রামের মানুষের জন্য বিচিত্র সব খাবার আর কাপড়চোপড় নিয়ে আসত। এসব বোলে রমিজের শিখিয়ে দেওয়া। সোফিয়াকে দেখে রমিজের এক চাচা বলেছিল, এ তো তাদের তরুণ বয়সের নায়িকা নার্গিসের মতোই দেখতে।

সোফিয়ার মতো এত খেয়ালি মেয়ে আগে রমিজ দেখেনি। যখন-তখন বেরিয়ে পড়ছে। যেখানে খুশি যাচ্ছে। ভয়ডর নেই কোনো। আসলে নিজের খেয়ালেই এমন ডুবে থাকে, অন্য কোনো দিকে তালই থাকে না। নিজেকে সে সুফিবাদী বলে। চাইলেই নিজের ভেতরে হারিয়ে যেতে পারে।

এমন খেয়ালে একদিন নিজের মনে ঘুরতে ঘুরতে সে চলে এসেছিল চলহাটির অন্যদিকে, যেদিকটায় আরেকটা বিল। পশ্চিমের দিকে। যেখানে জোকানের ভিটা। সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে আর সোফিয়ার কোনো খোঁজ নেই। গ্রামসুদ্ধ লোকজন নিয়ে মশাল জ্বালিয়ে তো আর সোফিয়ার খোঁজ করা যায় না। রমিজ তাই একাই বের হয়েছিল পাঁচ ব্যাটারির টর্চ হাতে। পুব দিকের প্রায় সবখানেই ঢুঁ দিয়ে সে বুঝতে পারে এদিকটায় নেই। উত্তর-দক্ষিণে যথাক্রমে গ্রামের বাজার, মসজিদ এবং স্কুল কলেজ আর মন্দির। এরপর রমিজ চলে আসে পশ্চিমের প্রান্তে। এখানে বোলে দিনের বেলায় কীসব ভৌতিক ব্যাপারস্যাপার ঘটে। রাতের বেলায় যাওয়ার কথা শুনলেই তো বুক কেঁপে ওঠে। কেবল মাছ ধরার সময় এ দিকটায়, তাও বিলে সামান্য কিছু অংশে লোকজন আসে। পশ্চিমের েিবালে লোকজন নামে না ভয়ে। এর আগে প্রায় সাত-আটজন লোক নামতে গিয়ে চিরদিনের সলিলসমাধি নিয়েছে। অথচ সবাই সাঁতার জানত। একজন কেবল কেবল বলতে পেরেছিল চিৎকার করে, টাইনা নিয়া গেলরে… বাঁচাও। বিশাল বিশাল মাছ নাকি কী অন্য কোনো জলজ জন্তু আছে কিনা তাও কেউ বলতে পারে না। তবে আশপাশে অনেক ঝোঁপজঙ্গল থাকলেও চলহাটিতে সাপের উপদ্রব প্রায় নেই। কেউ কেউ বোলে সব সাপ বোলে ওই মার্গসিদ্ধিতে চলে গেছে। সেখানে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে সাপের পূজা হয়। মার্গসিদ্ধি নিয়ে নাকি দেশের বাইরে বড় বড় বই লেখা হয়েছে। সেখানে বোলে এই সাপের পূজার কথা আছে। রামু খান কি করে রামুখাঁ বাবা হয়ে গেল সেসব ইতিহাসও বোলে পাওয়া যাবে। কিন্তু গ্রামের মানুষ তত স্পষ্ট করে কিছু জানেই না। কেউ কেউ বোলে ওই লোক আর জায়গা সম্পর্কে যত কম জানবে তত মঙ্গল। অমঙ্গল নিয়ে আগ্রহ আরও অমঙ্গল ডেকে আনে।-এটা এখানকার নানান ওয়াজে নসিহতে মোল্লামৌলবিরা সবসময় বলে। সেজন্য গ্রামের লোক মনে করে, অশুভ অকল্যাণ নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখানো যাবে না। সোফিয়াকে খুঁজতে যাওয়ার পেছনে অবশ্য এসব কোনো চিন্তা ছিল না রমিজের। সে জায়গায় জায়গায় তো আর সোফি সোফি বোলে চিৎকারও করতে পারে না। পশ্চিম দিকে যেতে যেতে তার একটা অনুভব হয়। সে আগেও দেখেছে, যে জায়গা বা মানুষে খোঁজ করছে দেখা হওয়ার জন্য, তার কাছাকাছি চলে আসার সময় শরীরে-মনে কেমন একটা সাড়া পড়ে, অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়, হালকা একটা শিহরনের হলকা বইতে শুরু করে। সেরকম হতে থাকে। তখন তার আরেকটা কথা বহুদিন পর মনে হয়, এখানে তো জোকানের ভিটা। তাহলে? সোফিয়া কি জোকানের ভিটায় পৌঁছে গেছে? ঠিক তখন সে বাঁশির সুর হালকাভাবে শুনতে পায়। ঝিম অন্ধকারের ভেতরে এমন একটা আবেশ ছড়িয়ে পড়েছে, রমিজ টের পায় তারও যেন চলার শক্তি চলে গেছে। শরীরটা চাইছে যেখানে আছে সেখানটায় চুপ করে বসে পড়ে, শরীরের আর সব অঙ্গ ভুলে গিয়ে কেবল কানটা সজাগ রেখে স্থানকাল ভুলে যেতে। কিন্তু ঘোরের ভেতরে থামলে চলে না। এগিয়ে যেতে হয়। রমিজ ধীরে ধীরে এগুতে থাকে। বাঁশির শব্দ আরও স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে থাকে। কিন্তু কোথাও কোনো আলো নেই। সোফিয়াই বলেছিল, কুপিটা নিভিয়ে দিতে। সমস্ত চরাচর নিভিয়ে দিয়ে সোফিয়া জোকানের বাঁশির সুরের গভীর নেশায় তলিয়ে গিয়েছিল। রমিজ জোকানের ভিটার কাছাকাছি হওয়ার পর টের পায়, কেমন একটা বাধা যেন। সে আর চাইলেও এগুতে পারছে না। হাওয়ার ভেতরে দেওয়াল তুলে দেওয়া। টর্চের আলো জ্বালাতে গিয়ে দেখে টর্চের আলোও জ্বলছে না। ভয়ে গা ছম ছম করে ওঠে। মেরুদ- দিয়ে শিরশির করে কী ওঠানামা করতে থাকে। রমিজের একবার মনে হয় ঝেড়ে একট দৌড় দেবে কিনা। কিন্তু দেখে তার পা মাটির সঙ্গে গেঁথে গেছে। তারপর বাঁশি থামে। সে শুনতে পায় কিছু ফিসফাস। কিছু হাসি কিছু কথাবার্তা। খানিক পরে উত্তেজিত কথা, কিছু হালকা বচসা মতো, এর ভেতরে মার্গসিদ্ধি মার্গসিদ্ধি শব্দটা কোনোমতে কানে আসে। সোফির কণ্ঠটা সে চিনতে পারে। তারপর চুমুর শব্দ আর কোনো কিছু চুষে খাওয়ার শব্দ হয়। রমিজের নিশ্বাস-প্রশ্বাস থেমে যায় প্রায়। সারা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। এর কিছুক্ষণ পরেই জীবনে প্রথমবারের মতো সে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। সেই জ্ঞান আর ফিরে আসেনি। অথচ তারপরও সে দীর্ঘদিন বিছানায় শুয়ে থেকে বেঁচে ছিল।

এদিকে ওই দিনের পর থেকে জোকানকে আর এলাকায় দেখা যায়নি। তার মুনিব ভিটায় লোক পাঠিয়ে জানতে পারে, সেখানে মেঝেতে কিছু কাপড় পড়ে আছে, একজোড়া নারীপুরুষের কাপড়। আর অজ্ঞান দেহ নিয়ে রমিজ। লোকজন রমিজের অজ্ঞান দেহ নিয়ে ফিরে আসে। তার শ্বাসপ্রশ্বাস চলছিল। কিন্তু সে আর জেগে উঠতে পারেনি। এরপর কতদিন তেমন করে ছিল তাও লোকে ভুলে গেছে। অন্যদিকে সোফিয়া কোথায় গেছে সে ব্যাপারে তো আর কারও কিছু জানারই ছিল না।

লেখক : কথাশিল্পী

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares