অদল-বদল : আফসানা বেগম

গল্প

অদল-বদল

আফসানা বেগম

 

সবকিছু ভালোমতো শেষ হয়েছে। তারপরেও, হাঁটু গেড়ে বসে খুঁজতে খুঁজতে রানা দেখে, বসার ঘরের কাচের টেবিলের কোণে সামান্য রক্ত জমাট বেঁধে আছে। ঠিক যেখানে কাচের উপরে ‘টেমর্পাড গ্লাস’ লেখাটার ছাপ মারা। যতই জোরে ধাক্কা লাগুক, কাচটা ভাঙার কথা ছিল না। ভাঙেওনি। তবু রানা টেবিলের কাচটার দিকে চমকে তাকিয়েছিল তখন। ধাক্কার শব্দে মনে হয়েছিল সারা ঘরে এক্ষুনই কাচের টুকরো ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু না, তেমন কিছু হয়নি। আর তারপরে এত ব্যস্ততায় এত দুশ্চিন্তায় হয়ত টেবিলের কোণের নীচের দিকের ওইটুকু রক্ত রানার নজর এড়িয়ে গেছে। উপরে ফ্যান চলছিল বলে রক্তটা দ্রুত শুকিয়ে গেছে হয়ত। নখ দিয়ে খুঁটতেই মেঝের উপরে ঝরঝর করে ঝরে পড়ে। টিস্যু ভিজিয়ে টেবিলের কোণটা মুছে, মেঝে থেকে কালচে লাল গুঁড়োগুলো উঠিয়ে ফেলে দেয় রানা। আর কোথাও কোনো চিহ্ন আছে বলে মনে হয় না। এবারে নরম কাপড়ের টুকরো ভিনেগারে ডুবিয়ে নিয়ে জায়গাটা ভালো করে মুছে দেয়। এমনিতে রক্তের গন্ধ আর কোথাও নেই, তবু, ভিনেগারের কড়া গন্ধটা রানাকে শান্তি দেয়। চারদিকে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে সে নিশ্চিন্তে শরীরটা সোফায় এলিয়ে দেয়। ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে হাতদুটো ভাঁজ করে মাথার নীচে রাখে, হ্যাঁ, এবারে সত্যি ঝামেলাটা শেষ হয়েছে।

প্রায় দুদিন বলতে গেলে সাংঘাতিক দুশ্চিন্তায় কেটেছে। প্রথম দিন ছিল বাসাময় তাজা রক্তের গন্ধ। আর দ্বিতীয় দিনে সেই গন্ধ বদলে কেমন যেন আঁশটে গন্ধ হয়ে গেল। শ্বাস নিতেই মনে হচ্ছিল দিনকয়েক ধরে রান্নাঘরে মাছ বা মুরগি কেটে আঁশ কি নাড়িভুঁড়ি জমিয়ে রাখা হয়েছে। সারাবাড়িতে সেই এক গন্ধ। ওদিকে আবার দরজা-জানালা খুললে পাশের অ্যাপার্টমেন্টের লোকদের নাকে পৌঁছে যাবার ভয়। তাই সেদিন রানা দরজার সামনে পড়ে থাকা খবরের কাগজও বাড়িতে ঢোকায়নি। বাড়ির ভিতরে নিকিতা মাঝেমধ্যে নাক সিঁটকে উঠছিল বটে, তবে কিছু জানতে চায়নি। ভয়াবহ দরকার না পড়লে নিকিতা সাধারণত কথা বলে না। কোনো কিছু জানতেও চায় না। নিকিতার মৌনতায় রানা বরাবর যারপরনাই বিরক্ত হলেও এই বিপদের সময়ে সুবিধা হয়েছে। রানা যদি আজও লাশটা গায়েব করতে না পারত তবে ওই উৎকট গন্ধের কারণে নিকিতাকে কথা বলতে হতোই হতো। নিদেনপক্ষে সে নিজেই জিনিসপত্র উলটেপালটে গন্ধের উৎস খুঁজতে শুরু করত। তাই গন্ধটা গায়েব না করা পর্যন্ত অশান্তি হচ্ছিল। তাছাড়া, বারবার মনে হচ্ছিল কোথাও না কোথাও কোনো না কোনো চিহ্ন থেকে যাচ্ছে যা তার চোখে পড়ছে না। দিনের আলোতেও ঘরের সমস্ত বাতি জ্বালিয়ে সে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে। না পেয়ে অস্বস্তি বাড়ছিলÑ নিশ্চয় কিছু না কিছু তার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। এদিকে রক্তের গন্ধ না থাকলেও মনে মনে বিগত গন্ধের উপস্থিতি কল্পনা করে সে ক্রমাগত ভিনেগার দিয়ে মেঝে থেকে শুরু করে বসার ঘরের প্রত্যেকটা আসবাব বারবার মুছেছে। আসবাবগুলোর ভার্নিশ অনেকটা উঠে এসেছে মোছার কাপড়ের সঙ্গে। বলতে গেলে এক বোতল ভিনেগার শেষ। ঘরে কোনো কারণে একবার অ্যামোনিয়া আনা হয়েছিল। হয়ত কাপড়ের দাগ ওঠানোর জন্য হতে পারে। কখনও ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে পড়ে না। চিনু এরকম টুকটাক বহু জিনিস কিনত আর গুছিয়ে রান্নাঘরের উঁচু তাকগুলোতে রাখত, বাস্তব জীবনে যে জিনিসগুলোর প্রায় কখনও প্রয়োজন পড়ত না। অ্যামোনিয়ার বোতল তাই ভরাই ছিল। ভিনেগারেও মন না ভরায় রানা কাপড়ে কিছুটা অ্যামোনিয়া নিয়ে টেবিলের কোণটা থেকে শুরু করে পুরো ঘরটাই মুছে দিয়েছে। অ্যামোনিয়ার তীব্র গন্ধে নিকিতা খেলার ঘর থেকে ছুটে এসেছে। দরজায় দাঁড়িয়ে রানাকে গন্ধ ছড়িয়ে মুছতে দেখেছে। চোখে গোল গোল করে তাকিয়ে থেকেছে বটে তবে কিছু জানতে চায়নি। তারপর হাতে ঝোলানো সাদা টেডি বেয়ারটা মুখের সামনে ধরে বেয়ারের ছোটো কানদুটোর মাঝখান দিয়ে লুকিয়ে কিছুক্ষণ রানাকে লক্ষ করেছে। একসময় সেভাবেই মুখ ঢেকে ধীরে ধীরে পিছনের দিকে হেঁটে আবার নিজের ঘরে পৌঁছে গেছে। টেডি বেয়ারের পিছনে থাকায় নিকিতার মুখের ভাব পুরোপুরি ধরা যায়নি। কিন্তু বিস্মিত কিংবা হতে পারে ভয়ার্ত ছোটো ছোটো চোখদুটো রানা স্পষ্ট দেখেছে। নিকিতা কিছু সন্দেহ করেনি তো! ভাবতেই রানার অসহায় লেগেছে। মনে মনে ঠিক করেছে, কয়েকদিন তাকে স্কুলে পাঠানো যাবে না। বাড়িতে রেখে তার ভাবসাব বুঝে নিয়ে তারপর পাঠাতে হবে। তবে সে যেমন, কারও সঙ্গে দেখা হলেও চট করে কিছু বলার সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয়নি। মনে মনে চিন্তামুক্ত হতে চাইলেও রানা অ্যামেনিয়ার গন্ধ তাড়াতে অস্থির হয়ে উঠেছে তারপর। ছুটে গিয়ে চিনুর ড্রেসিং টেবিল থেকে ট্যালকম পাউডার এনে সারাঘরে ছিটিয়েছে। কিছুটা পারফিউমও স্প্রে করেছে এখানে ওখানে। কিন্তু মাথার ভিতর থেকে তাজা রক্ত কিংবা আঁশটে গন্ধের স্মৃতিটা কিছুতেই তাড়াতে পারেনি। এদিকে নিকিতাকেও ডেকে জিজ্ঞেস করা যায় না যে সে রক্তের গন্ধ পাচ্ছে কি না। তখন সে সত্যিই গন্ধের ব্যাপারে কৌতূহলী হয়ে উঠতে পারে। সারাক্ষণ তালা লাগিয়ে রাখা মুখটা তখন হড়বড় করে খুলে যেতে পারে। দুম করে তখন নিকিতা কিছু জানতে চাইলে? এমনিতেই এক মিথ্যা ঢাকতে হাজার মিথ্যা বলে যেতে হচ্ছে। ঠিক যেমন রক্তের গন্ধ ঢাকতে ভিনেগার, ভিনেগারেরটা ঢাকতে অ্যামোনিয়া, তারপর অ্যামেনিয়ার গন্ধ তাড়াতে ট্যালকম পাউডার।

অস্বস্তিকর চিন্তাভাবনাকে পাশ কাটাতে রানা সোফার উপরে শরীরটাকে টানটান করে নেয়। আর ঠিক তখনই বাইরে খুব জোরে বিদ্যুৎ চমকানোর শব্দ। ঠিক পরপরই আগের চেয়েও জোরে আরেকবার। নিকিতা আবারও টেডি বেয়ার হাতে ছুটে আসে। শব্দে ভয় পেয়েছে নিশ্চয়। রানা তার দিকে তাকায়। হাত দুটো বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘এদিকে আসো, আম্মু। ভয় পেয়েছ?’ নিকিতা কিছু বলে না। করিডোরের মাথায় এসে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। রানা উঠে বসে। সামান্য হেসে বলে, ‘আসো, বাবার কোলে আসো দেখি, নিকু-’ নিকিতা হাতের টেডি বেয়ার ধরে রাখা হাতটা ধীরে ধীরে উপরে ওঠাতে থাকে। তারপর মুখটা পুরোপুরি ঢেকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। এরই মধ্যে ছোটো করে আরেকবার বিদ্যুৎ চমকালে টেডি বেয়ারের দুই কানের মাঝখান দিয়ে বাবার দিকে চোরা চোখে তাকায়। মেঝের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে রানা উঠে দাঁড়ায়, ‘আসো তো, আম্মুটাÑ চলো, আমরা গল্প শুনতে শুনতে ঘুমাই।’ রানা উঠতেই নিকিতা সামান্য চমকে ওঠে। তারপর রানার মুখের দিকে একবার তাকিয়েই সে ছুটে করিডোর পেরিয়ে যায়। নিকিতার ঘরের দরজা জোরে লাগানোর শব্দ পাওয়া যায় তার পরপর।

রানা অবাক চোখে করিডোরের শেষ মাথায় নিকিতার ঘরের দরজা বন্ধ হতে দেখে। করিডোরের বাতি বন্ধ থাকায় নিকিতার ঘর থেকে তীর্যকভাবে আসা আলোই ছিল সেদিককার একমাত্র আলোর উৎস। দরজা বন্ধ হতেই করিডোরটা অন্ধকারে ছেয়ে যায়। সেখানকার লম্বা ছাইরঙা কার্পেটটা দেখতে কালচে দেখায়। সেদিকটায় সমস্তকিছু তখন ধুসর। রানার মাথার মধ্যে হঠাৎ একটা চক্কর দিয়ে ওঠে। নিকিতা কি ওই ধূসরতার মধ্যে কোথাও হারিয়ে গেল? রানার পা যেন সোফার সামনে জমে যায়। সে এগিয়ে গিয়ে নিকিতার ঘরের দরজা স্পর্শ করতে পারে না। বুকটা কেঁপে ওঠে তার, নিকিতা কি তাকে ভয় পাচ্ছে? কিন্তু কেন? সে তো কিছুই দেখেনি! সে তো তখন ছিল স্কুলে। ঘরের সমস্তকিছু পরিষ্কার করে মুছে নিয়ে তারপর রানা নিকিতাকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিল। এনে ভালোমতো গোসল করিয়েছে, খাইয়েছে, গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়েছে। নিকিতা তো কোনো অস্বাভাবিক আচরণ করেনি! এমনকি সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেও মায়ের কথা কিছু জানতে চায়নি। তখন আচমকাই রানার মনে হয়, সে কি তার মায়ের কথা জানতে চাইতে পারত না? কথা না-হয় কম বলে, কিন্তু সেদিন গেল, তার পরের দিন গেল, তারপর আজ হলো গিয়ে তৃতীয় দিনের রাত। এতক্ষণেও কি তার জানতে চাইতে ইচ্ছে করবে না যে মা কোথায় বা কেন আসছে না? রানার মনটা একদিকে যেমন বিরক্তিতে ভরে যায় আরেকদিকে আশঙ্কায়। কিছু না দেখেও, কিছু জানতে না চেয়েও কি নিকিতা তবে কিছু জেনে ফেলেছে? রানার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কাঁপুনির ঢেউ খেলে যায়। সে ধপ করে সোফায় বসে পড়ে। চিন্তাগুলো কেন যেন মাথার মধ্যে সাজে না, ক্রমশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে এলোমেলো হয়ে যায়। আর রানা বসে পড়তেই কাছেই কোথাও ট্রান্সফরমার বার্স্ট হবার শব্দ শোনা যায়। শব্দটা যেন হয় ঠিক তার সোফার পিছনে। শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই চারদিক অন্ধকার। কেউ গিয়ে জেনারেটরের সুইচ অন করতে মিনিট তিন-চারেক লাগবে। এরই মধ্যে হাতড়ে হাতড়ে নিকিতার ঘরে যাওয়া দরকার। বাচ্চাটা এতক্ষণ ভয় না পেলেও এবারে এই ঘুরঘুটি অন্ধকারে ঝড়-বাতাসের শব্দে নিশ্চয় ভয় পাবে। সোফা থেকে উঠে দাঁড়াতেই তীব্র একটা বিজলির ঝলক ঘরের সবকিছুকে ছুঁয়ে যায়। পাতলা পরদা গলে ঘরটা এক কি আধা মুহূর্তের জন্য হাজার ওয়াটের বাল্বের মতো জ্বলে ওঠে। সেই চোখ ধাঁধানো আলোয় রানা স্পষ্ট দেখে চিনুর রক্তাক্ত কাত হওয়া মাথাটা টেবিলের কোণে। থুঁতনিটা কাচের শেষ মাথায় আটকে আছে। লম্বা চুলগুলো চারদিকে ছড়ানো। তার অসার শরীরটা সোফা আর টেবিলের মাঝামাঝিতে কোনোরকমে জায়গা করে নিয়েছে। হাত-পাগুলো নিয়ন্ত্রণহীন এদিক-সেদিক রওনা দিয়েছে। একটা পা টেবিলের তলে ভাঁজ হয়ে আটকে আছে। একটা হাত সোজা টেবিলের মাঝখানের ক্রিস্টালের ডেকোরেশন পিসটার দিকে ধাবিত। যেন ওটা ছুঁতে ছুঁতে থেমে গেছে। খোলা চোখটাও সেদিকে স্থির। দেখলে মনে হয় ওটা ধরতে চেয়েও ধরতে না পারার আফসোস দুই চোখে চিরকালের জন্য জমিয়ে রেখেছে। বিজলির আলো নিভতেই রানা কেঁপে ওঠে। চিনু এখনও এখানে পড়ে থাকে কী করে! তাকে তো সেই কখন রানা বেশ অনেকটা মাটির নীচে ভালোমতো পুঁতে দিয়ে তারপর… বিজলির আলো আরও একবার জ্বলেই নিবে যায়। একই দৃশ্য, চিনু পড়ে আছে। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রানার শরীরটা বাঁশের মতো সোজা হয়ে থাকে আবার পলকা পাতার মতো থরথর করে কাঁপে। সে অন্ধকারে পা বাড়াবে কী করে, সামনের মেঝেজুড়ে পড়ে আছে চিনু। অন্ধকারে ধাক্কা লেগে উলটে পড়ার সম্ভাবনা। রানা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। মাথার ভিতরে তাজা রক্তের গন্ধটা ফিরে আসে। গন্ধটা ধীরে ধীরে আঁশটে হতে থাকে। সোফার পিছনের দিক দিয়ে লাফিয়ে গেলে কেমন হয়? চিনু থাকুক পড়ে। সোফার পিছনে পা ফেলতেই জেনারেটর চালু হওয়ার বিকট শব্দ শোনা যায়। বাইরে ঝড়ের শব্দটাও বাড়ে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। ঘরের বাতিগুলো জ্বলে উঠলে সোফার পিছনে দাঁড়িয়ে রানা এক ঝটকায় মেঝের দিকে তাকায়। কোথায় চিনু! পরিষ্কার ঝকঝকে সাদা মোজাইকের মধ্যে বাদামি আর কালো ছোটো ছোটো পাথরের আধিক্য কেবল। করিডোরের দিকে যেতে রান্নাঘরের দিকের জানালার দিকে চোখ পড়ে। সামান্য খোলা। সেই খোলা পথে মাতাল বাতাস আর বৃষ্টির ছাঁট আসছে। উথাল-পাতাল বাতাসের সঙ্গে জেনারেটরের ডিজেলের গন্ধও ঢুকে পড়েছে সেখানে। বাতি জ্বালতেই দেখে রান্নাঘরের মেঝের অনেকটায় পানি। সেটা আগে মুছে ঠিকঠাক করবে নাকি নিকিতার ঘরে যাবে- এই ভাবতে ভাবতেই দরজার কলবেল বেজে ওঠে। বেলটা রান্নাঘরের দরজার উপরে। ঠিক তার নীচে দাঁড়িয়ে থাকা রানার মাথার উপরে যেন মিষ্টি টুংটাং শব্দটা ঢোলের উপরে ধুমধাম বাড়ি পড়ার মতো শোনায়। মাথাটা ঝিম ধরে যায় এক সেকেন্ডের জন্য। তারপর যথারীতি আবারো কাঁপুনি ছুঁয়ে যায় শরীর। এত রাতে কে আসবে তার বাসায়? কিন্তু সবকিছুতেই এত আতঙ্ক লাগছে কেন, রানা মনকে বকে দিয়ে ঠিকঠাক হতে চেষ্টা করে। মুখটা যতটা পারা যায় স্বাভাবিক করে সব ফেলে আগে ছোটে দরজার দিকে।

দরজা খুলতেই পাশের অ্যাপার্টমেন্টের ভদ্রমহিলা।

‘ভাই কি একা?’ মোটাসোটা মহিলা বেঁটেখাটো কাঁধ ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করেন।

‘না না, একা হবো কেন?’

‘না, মানে ক’দিন ধরে ভাবিকে দেখছি না কিনা, তাই ভাবলাম…’

‘মানে, মানে হয়েছে কী, চিনু একটু অফিসের কাজে… ট্যুরে আর কী, ট্যুরে গেছে।’

‘ওহ্ তাই বলেন। আমি মনে মনে ভাবছি তিন দিন ধরে অফিসে যেতেও দেখি না, আসতেও। সেদিন জি-বাংলার সিরিয়াল, ওই ওই আছে না, রাশি? ওটা নিয়ে আলাপ হচ্ছিল। ভাবি তখন ট্যুরের কথা তো কিছু বললেন নাÑ’ মহিলাকে চিন্তিত দেখায়। দুনিয়ার সবাই তাকে বলেকয়ে বাসা থেকে বেরোবে, এমনটাই ভেবে রেখেছেন হয়ত। বিরক্তি লুকিয়ে রানা সামান্য হাসে, বলে, ‘ও আচ্ছা, বলতে ভুলে গেছে হয়ত।’ মহিলার মুখ থেকে চিন্তার রেখা সরে না। রানা দরজা ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মহিলার মুখে বিচিত্র প্রশ্ন লেখা। রানার জানতে চাইতে ইচ্ছে করে, আর কিছু বলবেন? কিন্তু প্রশ্নটা মুখের ভিতরে লাগাম দিয়ে আটকে রাখে। কৌতূহলী মহিলা রানার শরীরের আর দরজার চৌকাঠের নানান আকৃতির ফাঁক গলে ঘরের ভিতরে চোখ বুলিয়ে নেন। ভিতরটা ভালোমতো দেখা হয়ে গেলে বলেন, ‘ঠিক আছে, ভাবি এলে পরে আসব তাহলে।’ নিকিতা তখন টেডি বেয়ার হাতে নিঃশব্দে রানার পিছনে এসে দাঁড়ায়। ভদ্রমহিলা নিকিতার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে চলে যান।

রানা হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। মেজাজটা খারাপ হয় বটে। কে অফিস গেল আর কে গেল না তা নিয়ে ওই মোটা মহিলার এত মাথাব্যথা কেন? জি বাংলার সিরিয়াল পর্যন্ত ঠিক আছে কিন্তু চুপি চুপি বিল্ডিং-এর প্রত্যেকের গতিবিধি লক্ষ করার অদ্ভুত অভ্যাসটা অসহ্য। তাছাড়া, এই ঝড়-বাতাসের রাতে, ইলেকট্রিসিটি চলে যাবার পরে তার মনে পড়ল যে পাশের বাসার ভাবির খোঁজ নেয়া দরকার? আজব মানুষ! নিজেকে সামলে নেয় রানা। দরজা লাগিয়ে নিকিতার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আম্মু, তুমি এখনো ঘুমাওনি? দশটা বাজে প্রায়। চলো আমরা ঘুমাই।’

নিকিতাকে ছুঁতে গেলেই সে আগে আগে দৌড় লাগায়। রানা রান্নাঘর ঠিকঠাক করার চিন্তা বাদ দিয়ে তার পিছনে ছোটে। নিকিতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অনেকগুলো টেডি আর পুতুলের মাঝখানে শুয়ে থাকে। অথচ তার মধ্যেই বুকের ভিতরে যেন হাতুড়ির মতো বাড়ি পড়তে থাকে। তারপর সেটা বাড়তে থাকে। আরও বাড়ে।

চিনুর উপরের মাটিতে খুব একচোট ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। মাটি সরে গেছে কি? হতে পারে পানিতে ধুয়ে ধুয়ে গলে গলে… আর তারপর চিনু সেখান থেকে বেরিয়ে সোজা বসার ঘরে এসে…উহ্ কী সব আজব চিন্তা আসছে মাথায়! রানা নিজের উপরে ভারি বিরক্ত হয়। কিন্তু ভিতরে ভিতরে বুকটা ঢিপ ঢিপ করছে সেটা বুঝতে একটুও কষ্ট হয় না। জড়িয়ে ধরে রাখা অবস্থায় নিকিতার নিশ্বাস গভীর হয়ে এসেছে, বোঝা যায়। হাতের উপর থেকে তার মাথাটা রানা আলতো করে বালিশে রাখে। নিকিতার ঘরের দরজা নিঃশব্দে বন্ধ করে করিডোরে এসে দাঁড়ায়। ততক্ষণে ঝড় থেমে গেছে। বৃষ্টিও নেই হয়ত। ইলেকট্রিসিটি ফিরে এসেছে। রানা একে একে বাড়ির সমস্ত বাতিগুলো জ্বালায়। একটাও বাদ থাকে না। তারপর ঝকঝকে আলোর মধ্যে সারা বাড়ি হেঁটে বেড়ায়। বাথরুম থেকে শুরু করে শোবার ঘর, বসার ঘর, রান্নাঘর আর স্টোর, কাপড় শুকানো আর ইস্ত্রি করার ছোটো ঘরটা… কোথাও এতটুকু এদিক-ওদিক হয়নি। রান্নাঘরের মেঝে আর চুলার চারদিকটা মুছে নিয়ে রানা স্বস্তি পায়। হাঁটাহাঁটির মাঝখানে করিডোর পেরোতে বারবার বসার ঘরের মাঝখানে রাখা কাচের টেবিল আর সোফাগুলোর দিকে তাকায়। অস্বাভাবিক কিছু নেই সেখানেও। কাজ শেষ হলে বসার ঘরে ফিরে আসে। সোফায় বসে স্থির তাকিয়ে থাকে কাচের টেবিলের কোণটার দিকে। প্রায় মধ্যরাতে সারা বাড়ি আলোয় ঝলমল করে। চিনুর শুচিবাইয়ের জন্য এমনিতেও বাড়িঘর পরিষ্কার ছিল, আর রানার মোছামুছির চোটে সবখানে ইলেকট্রিক বাতির আলোর আঘাতে আয়না হয়ে উঠেছে। চিনু পছন্দ করত এমনটাই, সবখানে শুকনো, ধুলোবিহীন আর ঘরে হাই পাওয়ারের আলো। রানা অবশ্য অনেকবার বলেছিল, ‘ঘরে কি আসলে দোকান-টোকানের মতো অত উজ্জ্বল আলোর দরকার পড়ে? একটু মাইল্ড হলে চলত না?’ কিন্তু চিনুর কথা হলো, ‘টিমটিমে আলো জ্বেলে রেখে ঘরের ময়লা ঢাকব, নাকি? ঘরে থাকবে ঝকমকে আলো, ময়লা-টয়লা থাকলে সাথে সাথে চোখে পড়বে।’ এ বাড়ি ভাড়া নেবার পরে চিনু অনেকগুলো বাতি বদলেছিল। সাধারণ বাতিগুলো বদলে এনার্জি সেভার লাগিয়েছে। তাতে নাকি সাদা আলো হয় আর সমস্তকিছু সে পরিষ্কার দেখতে পায়। চিনুর কথা ভাবতে ভাবতে রানা মাথার চুলে আঙুল ঢুকিয়ে দেয়। শক্ত করে চুলগুলোকে আঁকড়ে ধরে। হাঁটুর উপরে কনুই ঠেকিয়ে সামনের দিকে তাকায়। টেবিলের কোণে বা অন্য কোথাও চিনু নেই। এটাই সত্য। ভাবতে ভাবতেই কোথাও টুক করে একটা শব্দ হয়। শোবার ঘরের বাথরুমের দিক থেকে আওয়াজটা আসে। রানা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তারপর খামোখাই আতঙ্কে অবশ হয়ে যাওয়া পা দুটোকে টেনে-হিঁচড়ে সেদিকে নিয়ে যায়। শোবার ঘরে সব অবিকল যা থাকে তাই। বাথরুমের দরজার সামনে গিয়ে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ায় সে। তারপর নবে হাত দিয়ে দরজার শরীরে কানটা ঠেকিয়ে রাখে কয়েক মুহূর্ত। ভিতর থেকে কিছুই শোনা যায় না। ধীরে ধীরে দরজাটা খোলে তারপর। সামান্য ক্যাচ ক্যাচ শব্দ হয়। কবজাগুলোর মধ্যে কয়েক ফোঁটা নারকেল তেল ঢালতে হবে। মধ্যরাতে চিনু বাথরুমে গেলে তার আর সে বাথরুমে গেলে চিনুর ঘুম ভেঙে যেত। রাতে বিরক্ত লাগলেও ঘুম ভেঙে আর সেই বিরক্তির কথা মনে থাকত না। তাই তেল ঢালবে ঢালবে করেও ঢালা হয়নি। বাথরুমের মাঝখানে এসে দাঁড়ায় রানা। আয়নার সামনে বেসিনের উপরে তাদের দুটো টুথব্রাশ দাঁড়িয়ে আছে। চিনুর ব্রাশটায় হাত রাখে রানা, ফেলে দেবে নাকি? আর কী হবে এটা রেখে? তারপর আবার কী মনে করে ব্রাশটা ওখানেই রাখে। সবকিছু যেমন আছে তেমনটাই থাকা চাই। প্রথম ঝামেলা শেষ হয়েছে কিন্তু এরপর আসল সমস্যা শুরু হবে। কে জানে পুলিশ আসবে নাকি বাড়িতে! কোথায় কোথায় কী আলামত তাদের চোখে পড়বে কেউ বলতে পারে না। তার চেয়ে চিনুর ব্রাশটা গ্লাসের মধ্যে ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকুক। বাথরুমের হুকে চিনুর রাতের কাপড়টাও ঝুলুক। চিনু থাকলে আর খানিক বাদেই হয়ত পরত। কাছে যেতেই কাপড়টা থেকে চিনুর শরীরের গন্ধ নাকে লাগে। কতদিন থাকবে এই গন্ধটা? হঠাৎ চোখ ফেটে পানি আসে রানার। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বাথরুমের মেঝেতে বসে পড়ে সে। তারপর উপুড় হয়ে মেঝেতে মাথা ঠেকিয়ে বলে, ‘কেন এত জেদ করলে চিনু? এত রাগালে কেন আমাকে? জানো না, মাথা গরম হলে আমার হুঁশ থাকে না?’ মুখে লালা ভরে যাওয়ায় শব্দগুলো পরিষ্কার হয় না। কিন্তু বলে নিয়ে নিজেই আঁতকে ওঠে। চোখ-নাক মুছে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। এসব কী বলছে সে! বাথরুমের পাইপের ভিতর দিয়ে উপর নীচের বাথরুমে কথাগুলো শুনতে পাওয়া বিচিত্র নয়। ঠিক যেমন একটু আগে উপরের বা নীচের তলার কোনো শব্দ শুনে সে ওখানে এসেছিল।

চিনুর বালিশের নীচে কয়েক পাতা পড়া ম্যাগাজিন ভাঁজ করা। তেমনই থাকুক। পাশের বালিশে পাশ ফিরে শুয়ে থাকে রানা। দেয়ালের দিকে চোখটা স্থির রাখে। চিনু এখানে শুয়ে থাকলে দেয়ালটা দেখা যেত না। কিন্তু এখন চিনু নেই। কোথাও নেই। কিন্তু তখন তাহলে বসার ঘরের টেবিলের পাশে তাকে পড়ে থাকতে দেখা গেল কেন? বিভ্রান্ত রানা এপাশ-ওপাশ করতে থাকে। কোনোভাবে ঘুম আসে না। ক্রমাগত মনে হতে থাকে বসার ঘরে চিনু পড়ে আছে। রক্তের গন্ধে ভেসে যাচ্ছে ঘরটা। একসময় আর শুয়ে থাকতে না পেরে কৌতূহলের কাছে হার মানে। ধীরে ধীরে শব্দহীন পা ফেলে করিডোরের মাথায় পৌঁছায়। বাতিগুলো শোয়ার আগে নিবিয়েছিল। সুইচে হাত ঠেকাতেই নিশ্চিন্ত লাগে। ঝকঝকে পরিষ্কার ঘর। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে যেই অফ করার জন্য সুইচে আঙুল চেপেছে, শেষ মুহূর্তের একঝলক আলোয় চিনুকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ওই একইভাবে। অন্ধকার হয়ে যাওয়া ঘরে ঠিক জায়গামতো চিনুর পড়ে থাকার আবছা ছবি দেখা যায়। সিল্যুয়েটের মতো, ধারের রেখাগুলোই কেবল স্পষ্ট। এ কি তার কল্পনা? অন্ধকারের ঘোরে দাঁড়িয়ে কোনো মানসিক দুর্বলতা কি? সুইচের উপরে রানার আঙুলটা কাঁপতে থাকে। আবার জ্বেলে নিশ্চিত হবে কি না সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। অন্ধকারের শরীরের উপরে চিনুর আবছা আকৃতি কিছুতেই মোছে না। দ্বিধা আর ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে একসময় রানার অধৈর্য লাগে। দুই হাত চেপে এক সঙ্গে পাশাপাশি সমস্ত সুইচ অন করে দেয়। টেবিলের পাশের সিল্যুয়েটটা তখন পরিষ্কার হয়, হ্যাঁ, চিনু পড়ে আছে। মাথার গর্তটা থেকে গলগল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে টেবিল বেয়ে মেঝেতে। ফটফটে সাদা মেঝের উপরে অজানা কোনো দেশের ম্যাপের আকৃতির লাল টকটকে ছবি হচ্ছে। যে চুলগুলো রক্তে ভেজেনি, ফ্যানের বাতাসে সেগুলো উড়ে উড়ে চিনুর মাথা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চাচ্ছে।

করিডোরের দেয়াল ধরে দাঁড়ানো রানার চোখের পলক পড়ে না। মাথার ভিতরে উলটপালট লাগে, সে কি নিজে হাতে চিনুর লাশটা স্যুটকেসে ভরেনি? পূর্বাচলের তিনশ ফুট রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে একটা ডোবার পাশে পুঁতে দিয়ে আসেনি? রানা বিভ্রান্ত হয়ে ভাবে, ওখানে ফেলে দিয়ে আসতে চেয়েছিল কিন্তু কোনো কারণে যাওয়া হয়নি, এমন কি? স্মৃতির উপরে জোর দিতে থাকে রানা। চিনু তো যেখানকার সেখানেই পড়ে আছে। উহ্ কী যন্ত্রণা! মাথার ভিতরটা যেন নড়ে উঠছে, ফেটে পড়বে যে কোনো মুহূর্তে। জোর করে চেপে চোখ বুজে মাথা পর্যন্ত হাতটা বুলিয়ে নিতে নিতে রানা ভাবতে থাকে কী করা যায়। কেউ এলে দেখে ফেলতে পারে, আর পুলিশ এলে… তখন ওই মহিলাকে ফট করে ট্যুরের কথাটা বলা ঠিক হয়নি। পরে যদি চিনুর অফিস থেকে জানা যায় যে ট্যুর-ফুর কিছু ছিল না, তখন? রানা আর বেশিদূর ভাবতে পারে না। চিনুর খোঁজে কেউ না কেউ তো কদিনের মধ্যে আসবেই, পাশের বাড়ির ওই মহিলার মতো। তখন কী বলবে সে? এইসমস্ত ভাবনার ঘোরে সে চোখের সামনে থেকে হাত সরায়। কোথায় চিনু? নির্ঝঞ্ঝাট ঘরদোর তার চোখের সামনে ঝকঝক করে। রানা অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে, তার কি মাথা-টাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? বাতি নিভিয়ে আর ওদিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না। আজ রাতে একা একা ঘুমাতেও ইচ্ছে করে না। তাই পা টিপে টিপে নিকিতার কাছে উপস্থিত হয়। তার সরু বিছানায় কোনোরকমে নিকিতার পাশে নিজের জন্য জায়গা করে নেয়।

নিকিতা সেরিয়াল খেতে পছন্দ করে না। এদিকে স্যান্ডুইচ বানানোর জন্য পাউরুটি আনা হয়নি। সকালে নাস্তার টেবিলে তাকে সেরিয়াল দিতে তাই রানার খারাপ লাগে। নিকিতা অবশ্য মুখ বুজে খেয়ে ফেলে। কোলের উপরের টেডি বেয়ারের কানের লোম খুঁটতে খুঁটতে মাথা নীচু করে চামচ মুখে ঢোকাচ্ছে দেখে রীতিমতো মায়া লাগে রানার। আহা রে, খেতে যে খারাপ লাগছে তা-ও বলবে না! নাহ্ আজকে বাইরে যেতেই হবে। নিকিতার স্কুল না হোক, অন্তত তাকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে গিয়ে কিছু খাবার-দাবার কিনে আনতে হবে। ভাবতে ভাবতে কবজি উলটে ঘড়িতে তারিখ দেখে নেয় রানা। নয় তারিখ। ভাসা ভাসা মনে পড়ে গত সপ্তাহে চিনু যেন বেশ কয়েকবার নয় তারিখের কথা বলছিল কিন্তু ঠিক কেন, কী কাজের জন্য কিছু মনে পড়ে না। গত তিন দিনের ঘটনায় রানার মাথায় একরকমের স্মৃতিভ্রষ্টের মতো ব্যাপার ঘটেছে। কিছুই কেন যেন ঠিকঠাকমতো মনে পড়ছে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা মনে পড়লেও পড়ছে সিকি কিংবা আধাআধি। আরেক সমস্যা হয়েছে কোন ঘটনাটা আগের আর কোনটা পরের, এটাও অনেক ভেবেচিন্তে বের করতে হচ্ছে। নাস্তার টেবিলে ছড়ানো ছিটানো বাটি আর চামচের সঙ্গে রানা জানে না কতক্ষণ বসে থাকে। নিকিতা উঠে চলে গেছে কখন তা-ও খেয়াল করে না। ভাবনার ঘোর ভাঙে নিকিতার কথার শব্দে। বোঝা যায় কথা বলছে কিন্তু কী বলছে ধরা যায় না। রানা নিঃশব্দে টেবিল থেকে উঠে করিডোরের শেষ মাথায় এসে হাজির হয়। দরজার ফাঁক গলে দেখা যায় নিকিতা তার টেডি বেয়ারদের কণ্ঠে কথা বলছে। একজন বাবা আরেকজন মা। মা বেয়ার বলছে, ‘আর কত কাজ করব আমি? সারাদিন অফিসে কাজ শেষ করে যখন মনে হয় জাস্ট বসে থাকি তখনই শুরু হয় সংসারের কাজ।’ বাবা বেয়ার বলছে, ‘তা, তুমি কী ভেবেছিলে আমি সব কাজ করে রাখব?’

‘করলে ক্ষতিটা কী?’

‘আশ্চর্য আমি কি নিকিতার সব কাজ করিনি? তারপর সারাদিন চাকরি খোঁজার জন্য আমার কত কী করতে হয়, সেটা জানো?’

নীচু হয়ে থাকা রানার মাথা সামান্য এগোতেই দরজাটা ক্যাচ ক্যাচ করে ওঠে। নিকিতার কথা বন্ধ হয়ে যায়। দুই হাত থেকে মুখোমুখি দুই টেডি বেয়ারও ঝুপ করে পড়ে মেঝেতে। তারপর সে নিষ্পাপ চোখে রানার দিকে তাকিয়ে থাকে। রানাও তার দিকে। বাবা-মায়ের কথাবার্তা ভালোই মুখস্থ করেছে। কিন্তু নিজের মনে এত কথা বলা যায়, অথচ বাবার সঙ্গে একটাও না? রানার অবাক লাগে। আর ঠিক তখনই মনে পড়ে চিনু বলেছিল নয় তারিখ বিকেলে নিকিতাকে সাইকোলজিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হবে। নিকিতা কথা এত কম বলে, বাড়িতে আর স্কুলে এ এক ভয়ানক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিনুর ধারণা ছিল ডাক্তার দেখালে ঠিক হয়ে যাবে। রানা ধীরে ধীরে এসে নিকিতাকে কোলে নিয়ে বসে, ‘খেলছিলে, আম্মু?’ নিকিতা ওপর-নীচ মাথা নাড়ায়। ‘তুমি তো সেরিয়াল লাইক করো না। ক্ষিদে পেয়েছে?’ নিকিতা ডানে-বামে মাথা নাড়ায়। রানা তাকে খেলনাগুলোর মাঝখানে বসিয়ে রেখে উঠে আসে।

শোবার ঘরে ফিরে শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকে। পাঁচ মাস ধরে তার চাকরি নেই। একে তো টাকা-পয়সা চিনুর কাছে নিতে হতো, তার উপরে অফিসে হিসাবের হেরফের করার অপবাদের মানসিক যন্ত্রণা। এইসমস্ত কারণেই মাথাটা ঠিকমতো কাজ করে না। চিনুর বোঝা উচিত ছিল। রানার গলার কাছে কান্নার মতো কষ্ট হয়। পাশ ফিরে চিনুর বালিশে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে সে। একসময় নিজেকে সান্ত¦না দিয়ে উঠে বসে। চোখ-নাক মুছে আলমারির দিকে তাকায়। তার নিজের অ্যাকাউন্টটা ব্যাংক বন্ধ করে রেখেছে, কিন্তু চিনু ঘরে যা টাকা জমিয়ে রেখেছে, হিসেব করে চললে তাতে কয়েক মাস চলবে। এর মধ্যে রানা নিশ্চয় একটা চাকরি জোগাড় করে ফেলবে। তবে আজ আর যাই হোক, নিকিতাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।

ডাক্তার আর তার সহযোগী প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে নিকিতাকে কী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন রানা জানে না। তারপর তাকে যখন ডাকা হয়, সে ভিতরে যেতেই নিকিতা তার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকায়। রানা তার মাথার দুই ঝুঁটির মাঝখানে হাত বুলিয়ে দেয়। আর তখন নিকিতা হঠাৎ করে বলে ওঠে, ‘আচ্ছা, বাবা, তুমি চারদিন ধরে মাকে ঘাড়ে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন?’ রানা চমকে ওঠে ঠিকই তবে ডাক্তারের সামনে নিজেকে সামলে সামান্য হাসার চেষ্টা করে; বলে, ‘মাকে ঘাড়ে নিয়ে মানে?’

‘তোমার ঘাড়ে যে মা বসে থাকে, জানো না?’ এটুকু বলেই নিকিতা চুপ। তারপর রানা কিংবা ডাক্তার মায়ের ঘাড়ে বসা নিয়ে তাকে যত কথাই জিজ্ঞাসা করে, আর কোনো জবাব নেই। কখনো অন্যমনস্ক হয়ে যায়, কখনও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে বাজারটুকু সেরেই সোজা বাড়িতে চলে আসে তারা। নিকিতা ঘরে চলে গেলে রানা করিডোর ধরে পায়চারি করে। মেয়েটার কথাটা তার মাথায় ঘুরতে থাকে। একসময় হুট করে নিকিতার ঘরে ঢুকে জানতে চায়, ‘এই যে এখন, বলো তো, আম্মু, মা কি আমার ঘাড়ে?’ নিকিতা রানার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থমকে থাকে। তারপর উপর-নীচ মাথা নাড়ে। রানা সেখানেই স্থবির হয়ে যায়। বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকে নিকিতার দিকে। সে তো এখনও মিথ্যে বলা শেখেনি! ধীরে ধীরে রানার ডান হাত উঠে যায় ঘাড় অবধি কিন্তু নিজের ঘাড় নিজেই ছুঁতে সাহস পায় না। হাতটা নেমে এসে পাশে ঝুলতে থাকে।

রাতে বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রানা খালি গায়ে নিজের ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। বহুক্ষণ ধরে একভাবে তাকিয়ে থাকে। এই বুঝি দেখা যাবে চিনুকে! তারপর ঘণ্টাখানেক বাথরুমে কাটিয়ে হতাশ হয়ে বেরিয়ে আসে। রাতে খাওয়ার আগে-পরে নিকিতার দৃষ্টিকে অনুসরণ করে। রানা যা আশা করেছিল তাই, নিকিতা রানার মাথা থেকে সামান্য উপরে প্রায়ই হা করে তাকিয়ে থাকে। যা হোক, বসার ঘরে টেবিলের কোণে চিনু নেই, ঘাড়ের উপরেও তার অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে না, এই শান্তি নিয়ে রাতে সে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু কতক্ষণ পরে জানে না, হঠাৎ একরকমের আজব কিংবা দুর্বোধ্য ভাষার ধারাবাহিক কথায় তার ঘুম ভাঙে। সরু করে চোখ খুলে দেখে বিছানার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে চিনু। তার গায়ে বাথরুমে ঝুলিয়ে রাখা রাতের গাউনটা। দুই হাতে লোশন মাখতে মাখতে চিনু সেখানে দাঁড়িয়ে অনবরত কিছু বলে যাচ্ছে। হয় খুব নীচুস্বরে অথবা অজানা কোনো ভাষায়, চিনুর কথার বিন্দু-বিসর্গও তাই রানার মাথায় ঢোকে না। বিছানায় কাঠ হয়ে পড়ে থেকে সে চিনুর দিকে তাকিয়ে থাকে। কথাবার্তা রানাকেই বলা হচ্ছে। তারপর হুট করে রানার দিকে তাকিয়ে সে হাসে, খাঁটি বাংলায় বলে, ‘আমাকে দেখে অবাক হচ্ছ?’ রানা কথা বলতে ভুলে যায়। চিনু যেখানে কিনা এরই মধ্যে বিজাতীয় ভাষা রপ্ত করে ফেলেছে, সেখানে রানার মাতৃভাষা ভুলে যাবার জোগাড়।

‘কী, কথা বলছ না যে? ওই স্যুটকেসের মধ্যে দিনরাত থাকা যায়, বলো? অন্তত রাতে তো আরাম করে ঘুমাতে হবে, নাকি? তাই চলে এলাম। অবশ্য এখনও সেভাবে আসতে পারছি না, দেখতেই তো পাচ্ছ। মানে, সাহায্য দরকার। একা একা ওই স্যুটকেসটা থেকে বেরোনো যাচ্ছে না। তুমি এমনভাবে আমার কোমর আর ঘাড়টা ভেঙেছ যে কারো সাহায্য ছাড়া সোজা করা অসম্ভব।’

রানা বালিশ থেকে মাথাটা সামান্য উঠিয়ে নিজের পা দুটো গুটিয়ে নেয়। চোখের অবস্থান বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে তার দৃষ্টি পড়ে চিনুসহ চিনুর পিছনের আয়নার দিকে। অফিসে যাবার আগে তাড়াহুড়ো করে শাড়ি পরার সুবিধার জন্য চিনু মিস্ত্রি ডেকে দেয়ালে একটা লম্বাটে আয়না লাগিয়ে নিয়েছিল। আয়নাটা উপর থেকে নীচে মেঝেকে স্পর্শ করে। রানার চোয়াল ঝুলে যায় সেই আয়নার দিকে তাকিয়ে। চিনু তার দিকে ফিরে কথা বলছে, হাতে লোশন লাগানো হলে তেলতেলে হাতটা গলায় ঘাড়ে মুছে নিচ্ছে, খোঁপা বাঁধার জন্য একহাতের উপরে আরেক হাত দিয়ে চুল প্যাঁচাচ্ছে, অথচ আয়নায় চিনুকে এই সমস্তকিছু করতে দেখা যাচ্ছে আয়নার দিকে ফিরে। মানে চিনুর মুখ রানার দিকেও আবার আয়নার দিকেও, কোনোদিকে চিনুর পিঠ নেই। একদিকে চিনু রানাকে বলে যাচ্ছে, সামনের আয়নাকেও, ‘কিন্তু কী করব, কবে সাহায্য পাবো সেই আশায় তো আর বসে থাকতে পারি না, তাই আধাআধিভাবেই চলে এলাম আর কী।’

রানার খোলা মুখ আর বন্ধ হয় না। কিংবা তারপর কী হয় সে আর মনে করতে পারে না। সকালে যখন ঘুম ভাঙে প্রথমেই সে আয়নার কাছে ছুটে যায়। ভালোমতো পরীক্ষা করে। ঘরের বাতি নেভানো আর প্রতিটা জিনিস যেখানে থাকার কথা সেখানেই স্থির। কিন্তু রাতের ঘটনাটা যে স্বপ্ন নয় সেটা রানা ভালো করেই জানে। ঘরে মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে তার প্রমাণটাও হাতে লেগে যায়, ড্রেসিং টেবিলের উপরে চিনুর লোশনের বোতলটা খোলা। ঢাকনাটা পাশে রাখা। দেখেই বাথরুমে ছুটে যায় রানা। চিনুর রাতের পোশাক ঝুলছে। যেন জীবন্ত কিছু ঘুমিয়ে আছে, সেরকম আলগোছে সে পোষাকটার গায়ে নাক লাগায়। হ্যাঁ, চিনুর গায়ের গন্ধটা একদম টাটকা। সারারাত চিনু তার পাশের বালিশে এই কাপড়টা পরে ঘুমিয়ে ছিল, ভাবতেই শরীরে বিদ্যুতের মতো প্রবাহ খেলে যায়। তার মনে একটা ভয় ছিল যে নিকিতা যখন তার মাকে বাবার ঘাড়ে দেখতে পায় তখন হয়ত মাথার মধ্যে বীভৎস ফুটো আর রক্তসহ দেখতে পায়! আজ রাতে চিনুকে দেখে সে সন্দেহ কিছুটা কমে। নাহ্, হয়ত স্বাভাবিক চিনুকেই দেখে। কিন্তু চিনু আসে কেন? কী চায়? ভাবনার ঘোরে ভিতরে ভিতরে অসহায় আর নিরুপায় লাগে রানার। তারপর বহু আগের এক রাতের কথা মনে পড়ে। রানা তখন কলেজে পড়ে। কয়েক বন্ধু মিলে রাত করে সিনেমা হলের নাইট শো দেখে ফিরছিল তারা। সিনেমা ভাঙার পরে সামনের সিগারেটের দোকানে সিগারেট ফুঁকে গল্পগুজব করে আরো আধা ঘণ্টা কাটিয়ে নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটছিল। রাত একটা তো হবেই। ছোটো জেলা শহরের সরু অলিগলি দিয়ে এগোচ্ছিল। সরু রাস্তার ধারে ধারে বড়ো কিছু গাছ। একটা গাছের নীচ দিয়ে যাবার সময়ে রানার হঠাৎ মনে হলো ঘাড়ে যেন কিছু বেশ জোরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসে আবার ধাক্কা দিল। চাঁদবিহীন রাতটাতে তেমন আলো ছিল না। তবে অন্ধকারে মনে হচ্ছিল উপরে লম্বাচওড়া কিছু একটা ঝুলছে। পকেট থেকে ম্যাচ বের করে আগুন ধরাতেই বারুদের মতো তাদের চোখের সামনে ধপ করে জ্বলে উঠল দুটো সরু নেইল পলিশ লাগানো পায়ের পাতা। পায়ের পাতার সামান্য উপরে পাড়ওলা শাড়ির বৃত্ত। শাড়ির একরঙা জমিন অনুসরণ করে উপরে উঠে গেল তাদের পাঁচজোড়া চোখ। গাছের ডাল থেকে একটা মেয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলছে। ম্যাচের কাঠি পুড়তে পুড়তে রানার দুটো আঙুল স্পর্শ না করা পর্যন্ত সে পাথর হয়ে গিয়েছিল। তারপর বহুদিন সেই জিব বের হওয়া ঝুলন্ত মেয়েটিকে নিয়ে কারণে অকারণে ভেবেছে সে। রাতের পর রাত সেই মেয়েটিকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখার আশঙ্কায় কুঁকড়ে থেকেছে। কোনো রাত আস্ত মেয়েটির অস্তিত্ব অনুভব করেছে ঘরের ভিতরে। অথচ তারপরেও, কোনোদিন মেয়েটি না এসেছে তার স্বপ্নে, না বাস্তবে। আর এদিকে, এই চিনু, তাকে ধাক্কা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে কি একেবারে ঘাড়ে এসে চেপে বসেছে! দিনের শান্তি, রাতের ঘুম, সব হারাম করে দিয়েছে। কিন্তু চিনু যে বলছিল তার সাহায্য দরকার? এর মানেটা কী? ওভাবে ভাঙা কোমর আর গলা সাহায্য করলেই ঠিক হবে নাকি, বললেই হলো?

নিকিতাকে নাস্তা খাইয়ে সে বসার ঘরে খবরের কাগজ খুলে বসে। পেপারে খুঁটিয়ে দেখে চিনুর লাশ নিয়ে কোনো খবর বেরিয়েছে কিনা। সেরকম কিছু না দেখতে পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়। চোখের সামনে থেকে কাগজ সরাতেই বাইরের দরজার দিকে চোখ যায়। সেদিন সকাল বেলা নিকিতাকে স্কুলে রেখে রানা এসে মোটে সোফায় বসেছিল। রাস্তার জ্যাম ঠেলে আসার পরে এত ক্লান্ত লাগছিল যে উঠে গিয়ে চা বানিয়ে আনতেও ইচ্ছে করছিল না। চিনু তখন অফিস যাবার জন্য তৈরি হয়ে দরজার মুখে ঠিক ওইখানে দাঁড়িয়ে তাকে যা-তা বলছিল। রানা যে চাকরি পাচ্ছে না, এ যেন রানার দোষ। সে যে কোনো অপরাধ না করেও অফিসে অপরাধীর তকমা লাগিয়ে চাকরি খুইয়েছে, এটাও যেন তার দোষ। আরেকটা কথা চিনু খুব খারাপ বলেছিল, বলেছিল তার নাকি চিনুর পয়সায় বসে বসে খাওয়াটাই অভ্যাস হয়ে গেছে। এই কথাটা চিনু কী করে বলল? রানা না থাকলে অন্তত নিকিতার জন্য হলেও তো বাড়িতে একটা লোক রাখতে হতো, এটা কি চিনু জানত না? মেজাজ আর কতক্ষণ ঠিক রাখা যায়, তাই সোফা থেকে উঠে এসে রানা দিয়েছিল তাকে জোরে এক ধাক্কা। তবে রানার মন জানে, চিনুকে মেরে ফেলা মোটেও তার উদ্দেশ্য ছিল না। ওটা কেবলমাত্র তার ক্লান্তি, হতাশা আর রাগের কারণে করেছে। ধাক্কা দিয়ে মনে মনে বলেছে, এত যে কটর কটর করছ, এবারে বোঝো! দরজার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে চিনু সোজা গিয়ে পড়েছিল কাচের টেবিলের পাশে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, পড়েছে যখন, উঠবে আর কী। রানা তাকে ওঠাতেও যায়নি। কিন্তু পরমুহূর্তেই বিস্ফোরিত চোখে দেখেছে যে টেবিলের উপরে চিনুর চোখ স্থির। দরজার উপরের বড়োসড়ো লকটাতে লেগে মাথার খুলিতে একটা গর্ত হয়ে গিয়েছিল তার। টেবিলের কোণে লেগে আরেকটা। টেবিলের কোণ থেকে চিনু আর ওঠেনি। হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে সেখানেই পড়ে ছিল। চিনুর রক্তই কেবল চলমান ছিল তখন, চুয়ে চুয়ে পড়ছিল। রানার বুঝতে অনেক সময় লেগেছিল যে চিনু মরে গেছে। নিশ্চিত হবার জন্য ধীরে ধীরে স্পর্শ করেছিল তাকে। কোনো সাড়া পায়নি। তারপর ঘণ্টাদুয়েক চিনুর খোলা চোখ বরাবর বসে ছিল সে। শেষে নিকিতাকে স্কুল থেকে আনার সময় হয়ে যাবে মনে পড়তেই স্টোর রুম থেকে বড়ো স্যুটকেস বের করে এনে তার মধ্যে ঠেসে ঢুকিয়েছিল চিনুকে। কিন্তু অত সহজে কি আর ঢোকানো যায়, কোমরে আর ঘাড়ে চাপ দিয়ে ভাঙতে হয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিল শরীরটা স্যুটকেসের মাপে দুটো টুকরো করে কেটে ফেলবে। কিন্তু আগেই যে রক্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, তা পরিষ্কার করতেই এক ঘণ্টা, আর চিনুর শরীরটা কেটে ফেললে তো রক্তে বাড়িঘর সয়লাব হয়ে যেত। একটা মানুষের শরীরে এতটা রক্ত থাকে আর তা মেঝেতে ছড়িয়ে পড়লে যে আরও কত বেশি মনে হয়, কোনো ধারণাই আগে ছিল না রানার।

নিকিতা ধীর পায়ে স্কুলের ব্যাগ নিয়ে রানার সামনের সোফায় এনে বসে। রানা একটু অবাক হয়। এমনটা তো করে না সে, না ডাকলে সহজে আসেও না। স্কুলের ব্যাগ দেখিয়ে কি স্কুলের কথা বোঝাতে চাচ্ছে? তিনদিন ধরে স্কুল যাওয়া হয় না, এটাই কি তার কথা? রানা মনে মনে ভাবে, ঠিক আছে, কাল না-হয় স্কুলে রেখে আসবে ওকে। নিকিতা স্কুলে থাকলে রানাও সবকিছু ঠিকমতো ভাবার জন্য অনেকটা সময় পাবে। নিকিতা ব্যাগ থেকে একটা ড্রইং খাতা আর কালার পেনসিলের বাক্স বের করে। প্রথমে সাধারণ পেনসিল দিয়ে একটা পাখি আঁকে। পাখিটার ডানা তার শরীরের চেয়ে অস্বাভাবিক লম্বা। মুখটা প্যাঁচার মতো। তারপর যতœ করে দুই দিকের ছড়ানো ডানায় বিচিত্র রঙ লাগাতে থাকে। একদিকের ডানা রঙ করা যখন প্রায় হয়ে এসেছে তখন কেন যেন রঙ পেনসিল থামিয়ে দেয়। এক মুহূর্ত রানার দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর রানার মাথা থেকে দুই-তিন ফুট উপরে তাকিয়ে সামান্য হাসে। পাখির ছবিওলা পাতাটা উলটে ফেলে। রানা বলে, ‘সে কী, পাখিটা তো খুব সুন্দর হচ্ছিল, ওটা শেষ করো, আম্মুÑ’ নিকিতা যেন রানার কথা শুনতেই পায় না। আপনমনে পরের পাতায় একটা হেলানো চতুর্ভূজ আঁকে। রানা দেখে অবাক হয়, ওরকম চতুর্ভূজ স্কুলে আঁকতে শিখেছিল সে, যাকে বলা হতো সামান্তরিক। নিকিতা পেনসিল থামিয়ে রানার মাথার উপরে তাকিয়ে নেয়। তারপর চতুর্ভূজের তিন কোণ থেকে সমান্তরাল তিনটা তীর্যক লাইন টানে। রানার মাথার দু’তিন ফুট উপরে কিছুক্ষণ স্থির তাকিয়ে থাকে। এবারে আগের লাইনগুলোর সমান্তরালে লাইন টেনে তীর্যক লাইনগুলোকে জুড়ে দেয়। চতুর্ভূজটা একটা থ্রি ডাইমেনশনাল চেহারা পেয়ে যায়। রানা বিস্মিত, নিকিতা এরই মধ্যে জ্যামিতিক ড্রইং করা শিখে গেছে! এবারে রানার মাথার উপরে বেশ খানিকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকতে হয় তাকে। যেন মনে হয়, ওখানে কোথাও থেকে নির্দেশ আসছে আর সে পটাপট তাই শুনে এঁকে যাচ্ছে। এরপর নিকিতা এদিকে শেড ওদিকে হাতল, নীচে চাকা একের পর একটা এঁকে ওটাকে একটা স্যুটকেস বানিয়ে ফেলে। শেষ নির্দেশটা নেয়ার জন্য দুই সেকেন্ড রানার মাথার উপরে শূন্যে চোখ স্থির রাখে। তারপর মাথা নাড়িয়ে বুঝে ফেলার ভান করে। এবারে গাঢ় পেনসিল হাতে নিয়ে স্যুটকেসের হাতলের উপরে চারটা অক্ষরের একটা শব্দ লেখে, চঙখঙ. প্রথমে চড়ষড় লিখেছিল। পরে কী যেন নির্দেশ এলো, সে তাই ভালোমতো শোনার ভান করে রানার মাথার উপরের শূন্য জায়গাটায় তাকাল। শেষে ইরেজার দিয়ে ঘষে ঘষে শেষের তিনটা অক্ষর উঠিয়ে বড়ো হাতের অক্ষরে লিখল। রানা এতক্ষণ সার্কাস দেখার মতো মজা দেখছিল, এবারে তার শরীর হিম হয়ে এলো, হ্যাঁ, এই তো সেই স্যুটকেস যাতে সে ভেঙেচুরে ঠেসে ঢুকিয়েছিল চিনুকে! বিয়ের সময় চিনু নিজের বাড়ি থেকে জিনিসপত্র ওটাতে ভরে এনেছিল বোধহয়। তারপর তিন দিন আগপর্যন্ত আর কখনও কাজে লাগেনি। হাতলের উপরে কোম্পানির নামের লোগোটা রানার হাতের তালুতে একটু উঁচু ঠেকছিল। তাকিয়ে দেখে ততক্ষণে নিকিতা সরু পেনসিলে শেড দিয়ে চারটা অক্ষরকে থ্রি ডাইমেনশনাল করে ফেলেছে। দেখলেই মনে হচ্ছে অক্ষরগুলো খানিক উঁচু হয়ে আছে। পেনসিলের কাজ শেষ হলে সে বেশ কয়েকরকমের নীল পেনসিল থেকে বেছে নেভি ব্লু পেনসিলটা হাতে নেয়। রানা চমকে ওঠে, হ্যাঁ, স্যুটকেসটা নেভি ব্লু রঙেরই ছিল। হতে কি পারে না কখনও স্টোর রুমে গিয়ে নিকিতা স্যুটকেসটা ভালো করে দেখে রেখেছিল? কিন্তু এখন তাই বলে সেটা অবিকল আঁকতেইবা হবে কেন! আচ্ছা, আঁকছে যখন আঁকুক। রানা অন্যমনষ্ক হতে চেষ্টা করে। অথচ আড়চোখে দেখে যে স্যুটকেস রঙ করা শেষ হলে নিকিতা তার মাথার উপরে তাকিয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে একটা কিছু বুঝে নিয়ে সে খাতার পাতাটা উলটে ফেলে। আগের মতোই চতুর্ভুজ দিয়ে আরেকটা ড্রইং শুরু করে। এবারে বেশ শুরু থেকেই রানা স্যুটকেসের আকৃতি ধরতে পারে। তারপর বিস্মিত হয়ে দেখে নিকিতা স্যুটকেসের একটা খোলা ঢাকনা এঁকেছে। আঁততে উঠে বলে, ‘আর আঁকতে হবে না, নিকু, চলো আমরা একটু কার্টুন দেখি।’ নিকিতা যেন রানার কোনো কথা শুনতেই পায় না। তার হাত আরো দ্রুত চলে। রানার কথা শেষ হবার আগেই কয়েকটা মাত্র টানে সে খোলা স্যুটকেসের মধ্যে অদ্ভুতভাবে চেপে ঢোকানো একটা শরীর এঁকে ফেলে। আর আশ্চর্যজনকভাবে রানার চোখের সামনে সেই শরীরটা অ্যানিমেশনের মতো নড়তে চড়তে শুরু করে। যেন কেউ তাকে ওই ছোট্ট জায়গার মধ্যে বেঁধে রেখেছে আর শরীরটা বাঁধন ছিন্ন করে প্রাণপণ চেষ্টা করছে বেরিয়ে যেতে। একেকবার স্যুটকেসের চতুর্ভুজের বাইরে শরীরটা হাত-পা ছোঁড়ে কিন্তু হাজার চেষ্টাতেও বেরিয়ে উঠে পড়ার কোনো কায়দা করতে পারে না। রানার বিস্ফোরিত চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে নিকিতা। রানাও তাকায় তার দিকে। নিকিতাও কি শরীরটার নড়াচড়া দেখতে পাচ্ছে? তার মুখ দেখে তেমন মনে হয় না। বরং মনে হয় সে যেন জানতে চাচ্ছে ছবি আঁকা কেমন হলো। রানা আবারো ছবির দিকে তাকায়, ছবিটা স্থির তখন। মাথাটা মুড়িয়ে বুকের সঙ্গে ঠেকানো। পাগুলো উলটে পিঠের পিছনে পাঠানো। বীভৎস ব্যাপার। এরকম একটা ছবি নিকিতা এঁকেছে! মাত্র সাড়ে তিন বছরের নিকিতা। রানা লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। নিকিতার চোখও উঠে যায় প্রায় ছাদের কাছে। তারপর হাসে। রানা নিশ্চিত সে তার ঘাড়ে বসে থাকা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার হঠাৎ মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। চিৎকার করে বলে, ‘ছাদের দিকে তাকিয়ে আছ কেন, নিকু? কী আছে ওখানে?’ নিকিতা গম্ভীর আর নীচুস্বরে বলে, ‘মা।’ হতাশ রানা কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। মাথাটা নীচু করতেই টেবিলের উপরে খোলা ড্রইং খাতায় চোখ যায়। খোলা স্যুটকেসটার ভিতরে তখন কোনো শরীর নেই। একেবারে খালি। রানা নীচু হয়ে খাতাটা হাতে নেয়। চোখ কচলে স্যুটকেসের স্কেচটার দিকে আরেকবার তাকায়, হ্যাঁ, খোলা স্যুটকেসটা একেবারে ফাঁকা। খাতাটা হাতে ঝুলিয়ে নিকিতাকে আঙুল দিয়ে স্যুটকেসের ভিতরটাকে দেখিয়ে বলে, ‘এখানে মা, মানে, এখানে একটা মানুষ এঁকেছিলে না তুমি?’ নিকিতা উপর-নীচে মাথা নাড়ায়। রানা অধৈর্য হয়ে ওঠে, ‘তাহলে মুছলে কখন? কখন মুছলে, হুম? গেল কোথায় মানুষটা?’ নিকিতা ঠোঁট ওলটায়। খাতা মেঝেতে ছুঁড়ে দিয়ে রানা নিকিতার দুই ঘাড় ধরে জোরে একটা ঝাঁকি দেয়। তারপর কণ্ঠস্বর সপ্তমে চড়িয়ে বলে, ‘বলো, কোথায় গেল মানুষটা? বলো।’ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে গম্ভীর গলায় নিকিতা বলে, ‘চলে গেছে।’

রানা সোজা হয়ে দাঁড়ায়; মনে মনে বলে, চলে গেছে মানে? নিকিতাকে বরাবরের মতো শান্ত দেখায়। মেঝে থেকে খাতাটা উঠিয়ে, টেবিলে ছড়িয়ে থাকা পেনসিল বাক্সে ঢুকিয়ে, সবকিছু ব্যাগে পুরে নিয়ে সে ধীরে ধীরে নিজের ঘরে চলে যায়।

রানা সোফায় শরীরটা ছেড়ে দেয়। এ তো মহাযন্ত্রণা হলো! এর মানে কী? চিনু কি তাহলে স্যুটকেসে নেই? কেউ চিনুর শরীরটা বের করে নিয়েছে? এতক্ষণে কি পুলিশের হাতে পড়ে গেছে? রানার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ছুটে গিয়ে টিভি ছাড়ে সে। ঘণ্টাখানেক ধরে বিভিন্ন চ্যানেলের খবর আর ব্রেকিং নিউজের স্ক্রলিং দেখে। নাহ্ কোথাও ওরকম কোনো লাশ পাওয়ার খবর নেই। কিন্তু রানার সন্দেহ যায় না। ইচ্ছে করে রানা নিকিতার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নিকিতা তার পুতুল আর টেডিদের মাঝখানে আধশোয়া হয়ে ফিসফিস করে কথা বলছে। রানাকে দেখতেই তার কথা বন্ধ হয়ে যায়। সে সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে থাকে, রানার মাথার উপর দিয়ে কোনো শূন্যে তার চোখ যায় না। রানা নিশ্চিত হয়, নিকিতার দৃষ্টির মানে, মা এখন বাবার ঘাড়ে নেই। কিন্তু চিনুর লাশ যদি স্যুটকেস থেকে বেরিয়ে পড়ে তবে রানার পালানো দরকার। কিন্তু এই নিকিতাকে ফেলে রেখে বা সঙ্গে নিয়েই সে পালাবে কী করে? কোথায়ইবা যাবে? এত বড়ো পৃথিবীটা তার কাছে হঠাৎ খুব ছোটো লাগে।

মাথাটা যখন দুশ্চিন্তায় পুরোপুরি ঝিম ধরে গেছে, তখন কলবেল বেজে ওঠে। খুলতেই পাশের বাসার মহিলা। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই রানার হাতের নীচ দিয়ে ঘরের ভিতরে উঁকি দেন তিনি। রানা যথাসম্ভব ভদ্রতা বজায় রেখে বলে, ‘জি বলেনÑ’

‘না মানে, ভাবি কি এখনো ফিরে আসেননি? মানে, ওনার ফোনে কেন যেন কল যাচ্ছে না। তাই ভাবলাম-’

‘জি না। মিটিঙে ব্যস্ত আছে হয়ত, তাই ফোন বন্ধ। ফিরলে আপনার কথা বলব।’

‘মানে হয়েছে কী, জি বাংলার সিরিয়ালটা, ওই যে রাশি সিরিয়ালটায় এ কদিনে তো বেশ অনেককিছু হয়ে গেল, ভাবছিলাম ভাবির সঙ্গে তো এ নিয়ে আর কথাই…’

‘এই কটা দিনে সিরিয়াল আর কতদূর যাবে বলুন?’

‘না মানে, হয়েছে কী, দারোয়ান বলল ভাবি নাকি চার দিন ধরে বাড়ি থেকেই বেরোননি, আর নিকিতাও নাকি স্কুলে যাচ্ছে না, তাই ভাবলাম-’

রানার ইচ্ছে করে মোটাসোটা মহিলার মুখের উপরে দরজাটা ঠাস করে লাগিয়ে দেয়। বসে বসে তাদের প্রত্যেকের পিছনে গোয়েন্দাগিরি করা হচ্ছে? এই সমস্তই বুঝি শেখায় ওই সিরিয়ালগুলো! অনেক ধৈর্য নিয়ে রানা রাগটা কোনোমতে গিলে ফেলে। বড়ো একটা নিশ্বাস নিয়ে বলে, ‘নিকিতার একটু শরীর খারাপ ছিল। এই তো কালই স্কুলে যাবে। আর চিনুও মনে হয় কাল চলে আসবে।’ মহিলা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে কয়েকবার মাথা নাড়িয়ে ‘ও আচ্ছা’ বলে চলে যায়।

সেদিন মধ্যরাতের দিকে রানা বিছানায় কাঠ হয়ে শুয়ে থাকে। আগের রাতে ঘটনাটা স্বপ্ন কিনা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। আজ তাই না ঘুমিয়ে বিষয়টা বোঝার অপেক্ষায় আছে। তারপর ঠিক সময়মতো বাথরুমে চিনুর গুনগুন গান শোনা যায়। বেশ রাতে ভালোমতো হাতমুখ ধুয়ে তারপর বিছানায় আসার অভ্যাস ছিল তার। যথারীতি রাতের পোশাকে বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে চিনু। রানা ঘুমানোর ভান করে সরু চোখ খুলে রাখে। চিনু ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাতে লোশন লাগায়; বলে, ‘বাচ্চাটার স্কুল কিন্তু তিন দিন মিস হয়ে গেল। কাল স্কুলে নিতে হবে।’ রানা বালিশ থেকে সামান্য উঠে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় উঁকি দেয়। কিন্তু বিছানা থেকে ওই আয়নার প্রতিফলন দেখা যায় না। চিনু হঠাৎ বিছানার দিকে এগিয়ে আসে। রানার মুখের প্রায় কাছে এসে নীচু হয়ে বলে, ‘কী, আমাকে দেখতে চাচ্ছ?’ বেশি কাছে আসাতে চিনু আর তার রহস্যময় হাসি, সব স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু তারই মধ্যে কেন যেন চিনুর শরীর ভেদ করে ওদিকে ড্রেসিং টেবিল, আলমারি, সেসবও দেখা যায়। চিনু ধুপ করে বিছানায় শুয়ে পড়েই চোখ বুজে ফেলে। খাটটা নড়ে ওঠে একটু। চিনুর মাথার খুলির ফুটোটা হঠাৎ স্পষ্ট হয়, জমাট কালচে রক্তে ভরাট কূয়ার মতো।

রানা বিছানা না নাড়িয়ে ধীরে ধীরে মেঝেতে পা রাখে। শব্দহীনভাবে দরজা খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরে এসে দাঁড়ায়। ওখানে চিনুর সঙ্গে ঘুমানো তার পক্ষে অসম্ভব। সে নিকিতার ঘরের দরজা খোলে। বিছানার কাছাকাছি আসতেই ডিম লাইটের আবছা আলোয় দেখে দেয়ালের দিকে মুখ করে নিকিতাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে চিনু। নিকিতার ঘাড়ের উপরে চিনুর আলতো হাত নির্দিষ্ট তালে পড়ছে-উঠছে। রানার পায়ের শব্দে মুখটা উলটো দিকে ফিরিয়ে চিনু ঠোঁটের উপরে আঙুল ঠেকায়। রানা থেমে যায়। চিনুর কপাল বেয়ে রক্তের ধারাটা আবছা আলোতেও স্পষ্ট বোঝা যায়।

রানা লাফিয়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। তারপর বাড়ি থেকেও। চিনু সবখানে ঠিকঠাক আছে, শুধু ওই স্যুটকেসে নেই? মাথায় চিন্তার চাপে উন্মাদের মতো রানা রাত একটার দিকে ঠিক সেইখানে উপস্থিত হয় যেখানে স্যুটকেসটা গেড়ে দিয়েছিল। ঝড়বাতাসে সমান হয়ে যাওয়া মাটিটা আবছা আলোয় দেখতে একেবারে সমতল। এমনিতে সবকিছু ঠিকঠাকই লাগে। তারপরেও জায়গা বুঝে নিয়ে দ্রুত হাতে মাটি সরাতে থাকে সে। একসময় মাটিমাখা স্যুটকেসটার ঢাকনা বেরিয়ে আসে। ফোনের সামান্য আলোয় দেখতে অনেকটাই অচেনা লাগে। চেন খুলে স্যুটকেসের ঢাকনাটা সরাতেই কী যেন একটা উলটপালট ঘটে যায়। চারদিকে ঘুরঘুটি অন্ধকারের ভিতরে সেখানে একটা ঘূর্ণি লেগে যায়। রানা খেয়াল করে তার দৃষ্টি বা চিন্তা কিছুই ঠিকমতো কাজ করছে না। নিজের শরীরের উপরে কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই। সেই ঘূর্ণাবর্তের টানে স্যুটকেসের মধ্যে দিয়ে রানা কোনো কৃষ্ণ গহ্বরের দিকে রওনা দেয়। আর একসময় বাতাসের দুর্বোধ্য চলাচল বন্ধ হলে ঠিক সেখানেই অন্ধকারের গোপন কোনো কুঠুরি থেকে উঠে আসে চিনু। শরীরটা খুব করে ঝাঁকিয়ে গলা আর কোমরটা সোজা করে নেয়। তারপর হাত দিয়ে ঝেড়ে ঝেড়ে ধূলা আর শুকিয়ে যাওয়া রক্তের গুঁড়ো মাটিতে ফেলে; হেসে বলে, ‘এটুকু সাহায্যই চেয়েছিলাম। থ্যাংক ইউ!’

সকাল সকাল বাসার কলবেল বাজে। পাশের বাড়ির মহিলা উপস্থিত। দরজা খুলতেই চিনুকে দেখে তার চোখ ছানাবড়া, ‘কখন এলেন, ভাবি?’

‘এই তো, সকালে।’

‘আমি বহুবার খোঁজ নিয়েছিলাম। ওই যে রাশির বাড়িতে যে লোকটা এল, শুধু জুতো আর পা দেখা গেল, মনে আছে?

‘হুম।’

‘আর বলবেন না, ভাবি, দুই এপিসোড ধরে সেই পা-ই দেখা গেল। আর শুধু ঝনঝন শব্দ, তার সঙ্গে এর-ওর মুখের ক্লোজ শট। আমার যে কী অস্থির লাগছিল! শেষে কিনা কাল জানতে পারলাম জুতো পরা লোকটা কে। আপনার সঙ্গে এ নিয়ে কথা না বলতে পেরে বেশি খারাপ লাগছিল, বুঝলেন? তা, ট্যুরে গেছিলেন শুনলাম?’

‘হ্যাঁ, এই ফিরলাম আর কী। কে এসেছিল রাশির বাসায় বলেন তো?’

‘সে ওই যে তার পুরোনো এক প্রেমিক, মানে, আমরা যা ভেবেছিলাম তা হলো না। তা, ভাইকে দেখছি না যে?’ মহিলা বাসার ভিতরে উঁকি দিতে শুরু করলেন। চিনু হেসে বলল, ‘সে তো কাল রাতে নাকি বেরিয়েছে, এখনো ফেরেনি। কোথায় যে গেল!’

কিছুক্ষণ বকবক করে মহিলা চলে গেলে চিনু ল্যাপটপ নিয়ে বসে। অফিসে ফোন করে ইতিমধ্যে না-বলে-কয়ে যাওয়া আর ফোনের জবাব না-দেয়ার জন্য আগডুম বাগডুম বহু কিছু বোঝানো হয়েছে। তারপরেও বেশ কিছু  মেসেজ আর মেইলের উত্তর দিতে হবে। এতক্ষণে কেউ গুম-টুমের রিপোর্ট করে ফেলেছে নাকি কে জানে। ওদিকে রানার হাওয়া হয়ে যাবার সন্দেহ নিয়ে একটা অভিযোগও সাজাতে হবে। দিন দুয়েক পরে থানায় গিয়ে গুম জাতীয় একটা রিপোর্ট লিখিয়ে আসলেই হলো। সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করলে কী প্রশ্নের কী উত্তর হবে, সেটা নিয়েও লম্বা ভাবনা আছে। তবে, আপাতত সবকিছু ভালোমতো শেষ হয়েছে।

পায়ের শব্দ পেয়ে চিনু সামনে তাকায়। করিডোরের মাথায় নিকিতা দাঁড়িয়ে আছে। চিনু হাত বাড়িয়ে বলে, ‘কোলে আসো তো দেখি, আম্মুটা!’ টেডি বেয়ারের লোমশ মাথার পিছনে মুখ লুকিয়ে সে খিলখিল করে হাসে, বলে, ‘এতদিন বাবা তোমাকে ঘাড়ে নিয়ে ঘুরছিল আর এখন তুমি বাবাকে ঘাড়ে নিয়ে বসে আছ, মা…হি হি হি…’

লেখক : গল্পকার

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares