নাড়ার আগুন ও নক্ষত্রবীথি : শহীদ ইকবাল

গল্প

নাড়ার আগুন ও নক্ষত্রবীথি

শহীদ ইকবাল

একটি অনিশ্চিত যাত্রা শুরু হয় হা-ঘরে বিলাই নওশার। তুরুক তুরুক তালে সে ঝুঁকে ঝুঁকে চলে। সামনে চরকমলির হাট। সে হাটে আজ দেখা হওয়ার কথা খুব দূর থেকে আসা মোল্লাসাবের। মোল্লাসাবের টমটম সেবার নষ্ট হলে আর তিনি এ হাট পর্যন্ত আসেননি। গোটা হাটজুড়ে তখন মানুষের ডাক থেমে গিয়েছিল। খুব দূরে কচি আগায় কাঁচা-সবুজ চিক্কন সুতার মতো পাকুড়ের পাতার বুলবুলি দোলা তখন থ হয়া আটকাইয়া কয় : ‘ক্যারে-বা এটে মড়ক পড়চেনি! আর ঝরি হবানায়, আমন আর গাড়া হবি না’- সে সুর মড়ার ভেতরে ভেতরে না-কওয়া আওয়াজ। কত পুরাতন এ পাকুড় গাছ! তার ভেতরে অনেককালের মানবপ্রজন্মের বয়ে চলা সাড়াশি প্রাচুর্যময় অভিশাপ প্রবহমান। এখনও তার পত্রদোলায় সে হাসিকান্নার কুচকানো স্বর বইয়া চলে। সেবার ঐরাবত পীঠশূন্য গতরদোলা দিয়া হুট কইরে চরকমলির শ্যাষ মাথাত এসে থামি যায়। এ হাটের মানুষ খুব মেলামেশাপ্রবণ, এখানে জীবনের বহু ঘটনার ফয়সালা হয়, মিটমাট হয়। এ মিটমাট মিলমিশ কখনও কখনও অনন্তে মিশায়। হার্দ্য সম্পর্ক আর তাদের ভাঙে না কখনও। সাক্ষাতের স্থান ঠিক হয় জুম্মাঘরের চালের বাতার তলোত বসি। সে মতে হাটবারে মাছহাটির পাশে পাকড়ের তলায় শিপার ওপর বইসে তামান মীমাংসা হয়। ফাঁকে ফাঁকে গফুর-আনসার বিড়ির ম্যাটাধোঁয়ার ভেতরে খুকখুক কাশি আর সাঁঞ্জের কুপি আলোর চোরামুখের স্বপ্নধরা চোখের আলকাটানো উক্তিতে গমোক হয়া উঠি কয়- ‘জমির কানির গোরস্তানের কতা তোর মোনোত নাই! ছাড়ি দে, তোর নিজের গনাগুষ্ঠির কতা…’ তখন ওপার থেকে হাঁক পাড়ে ‘অই না-মানার কিছু নাই’। এসব সারাৎসার আর বিশ্রম্ভালাপ নিয়া যখন গরম রুষ্ট প্রকৃতি ঢেউ তুইলা শীষদোলা বাতাসের সারিতে সব মানুষের ধ্বনিবোল কানে কানে গায়ের গরমে ঘন হয়া চিলপাখা তড়পাইয়া তোলে- তখন চরকমলির হাটের তামান মানুষের জাতধর্মবর্ণ এক হয়া সমস্যার নিষ্পত্তি নিয়া জীবনযাপন করে। বিলাই নওশা ও তার অন্য সহযোগীকুল হাটের প্রান্তে বা অন্য কোনো মনিষ্যিহীন আবছায়া আবডালে পরিশ্রমের বাইরে ফাও সময়ে কিছু ভাবে, তাতে তার চোখে ঘোর আসে, কাল রাতে কালাচাঁদ তাকে যে প্রস্তাব দিয়াছিল তা কতটা গ্রহণযোগ্য! এক নুলা পোলাঅলার সংসারে ভূমিহীন বিলাই (নওশা) আর তার অদ্বিতীয় কালোকিষ্টি বৌ বড়ো বেচইন এখন। বৌটা যেমন বাচাল তেমনি সরম-হায়াহীন। নুলা সন্তানটা জন্ম দিয়া তার বাড়তি আনন্দটুকুও নষ্ট করে দিয়াছে। কত্তকাল এ পাপভার বইবে কে জানে! এর আগে কোষ্টার ক্ষেতের সন্তানটা নিয়া কতকিছুই তো হলো- এই হাটোতেই তো তার মীমাংসা হচিল, ডগডগা সে মাগি এখনও বিলাই-মস্তিষ্কে খুন হয়া আস্ত ক্রিয়াশীল। হ, সে তারে লাব করার কথা কইছিল, আম্রিকা কোষ্টার খ্যাত তখন সিনা বরাবর দণ্ডায়মান। বিলাই পাশের খালে মাছ ধরার জন্য বড়শি লাগানোয় খুব ব্যস্ত। হুস্ করি দাঁতনাত কামড় দিয়া সে কয়, মদ্দের ব্যাটা মাছ ধরোস, পুরুষ বোজোস না! হাট্, মোর সাথে। তারপর অনেককাল বিলাই শরমে কাকো মুখ দেখায় নাই। কিন্তু খুব ডাক পাড়ে- সেই সিনার ছতোর-ভূমি। লম্বাচুলের গড়নে ভীরুচোখা মুখটা ভাসে, অনন্তকাল ভাইসা চলে। বিলাই তার কাছেই নওশা উপাধি পায়। পরে ছাওয়াল খসানোর দায়ে তামাম জানাজানি হয়, তখন নওশা পরিচয়ও জানাজানি। পরে অধিকাংশ দিন জানখাটা জেবনের অংশ মনিবের দাওয়ায় সেই বিচার বসিলে এক হাঁকে সব বাতিল কইরে দেন তানি। কেউ মুখ তুলে কিচ্ছু কইবার পারে নাই। মোল্লাসাব সব সামলিয়া কন, ‘মাগির দায় হামার, সব ভাগ ব্যাটারা’। তারপর চিরটা কালের দয়ায় ঝুইলে পড়েন তিনি। এত বড় মানুষ! অথচ কী এক দয়ায় এক নওশাসাজনের জন্যে দিল পোড়ে তার। কেন? কোনো কারণ সে খুঁজে পায় না। এক নিঃস্ব, গরিব বাউরার জন্য মোল্লাসাব কেন এত উতালা? যার আবির্ভাবে তেলের আলোত পোড়া ঘূর্ণিপোকার সূর্যে, তাতে জমিন থাকে নতজানু, সমস্ত পৃথ্বীশক্তি অবলুপ্তÑ তিনিই কলঙ্ক নিরোধে নতুন জীবন দেন। এ তো জীবনভাগ্যও বলতে হবে! কই সে হতচ্ছাড়া- এই কলঙ্কের ধরাতেই কি সেই রমণী এত অপার হয়া উঠ্ছে? সত্যিই কি সে নওশা? ম-লসাবও নামটা ছাড়েন নাই।

নুলো সন্তানটার পর মাগির প্যাট খালি। বিলাই কালাচাঁদের প্রস্তাবটায় কেমন স্বস্তির হাওয়া পায়। বুকভরা শ্বাস বোধ করে। কাল অমাবস্যার দ্বিপ্রহরে গোরস্তানের ওপর দুটা আমলির ডাল কাটি নিয়া বেশকম মতোন মোল্লাসাবের কাছারির বারান্দাত নিয়া আসা লাগবি। এতে ফকিরালির কাজটা বেশ ভালো চলে। মোল্লাসাব এরপর আর বেশিদিন বাঁচিবেন না, ক্রমাগত শুকিয়ে ঘটবে অকালমৃত্যু। নিদানের চোখাচোখি বাণে আরেক অমাবস্যার আগেই তিনি হারিয়া যাইবেন। কালাচাঁদের এইটা তৃতীয় মিশন। কিন্তু যে মোল্লাসাব বিলাইয়ের পরানের এত কাছাকাছি, বিশ্বস্তÑ তার পক্ষে তো এটা অন্যায়। দ্বিধান্বিত যতটা, তার চেয়ে সে সংকোচে পড়ে- একদিকে তার দয়াধর্ম অন্যদিকে অচঞ্চল আত্মার দাহ। কালাচাঁদ প্রলুব্ধতার তার দিয়া বাঁধতে চায়, কড়কড়া লোভে বিলাই সেই মাগির স্মৃতির ছায়ায় দোলে, হাওয়ার আঁচল ওড়া পাড়ে দুলকি চালে ক্ষীণতোয়া পাল ওড়ায়; জাপটায়, উসুম নেয়, ইলিশকাঁটা খোঁজে, ওমে সুখগরমে ঢুইকে পড়ে মাইয়ার কোলে, অতঃপর হিক পাড়েÑ গন্ধে গন্ধে বুকের স্বাদ নেয় বিলাই; মুখ লুকায়, চুকচুক চাহনিদোলায় ওড়ে, খালপাড়ে কে যেন চিক্কুর পাড়ে, মাইয়া মেয়ের মনে মাতৃমোহ ডাইকে লয়, মা ডাকে, দৌড়ায় আগে আর পেছনে মায়ের পান্টি, বিলাই কুত্তা… তোর জনম দ্যাখমু। পরে আবার কান্দোন, মোর বিলাই বাবা, কবে মইরে গেছি, তু কই বাবা…হুপহুপ হুপহুপ, ক্যাডা বা, পাক্ড়ের ওপারোত। চ্যাতন আসে, ভরা বাতাসে তখন ট্যাকার পুঁটকি মাইরে কয়, কালাচাঁদ ভাগ্ চুদিরব্যাটা। আর থাকুম না তোর লগে। আজ আর হাটের কাম নয়। গমগমা মানুষ বাতিল করে সে ভিনো হয়া হাঁটে, আলাদা হয়। ফুরফুরা বাতাসে আটাষ্যড়ির দলা মাড়ায়া, মরে যাওয়া নিশিন্দা নদীর চ্যাগার পুল পার হয়া, দুধধোয়া জ্যোৎস্নার স্নানে ডুবিয়া, কলার তলার ছায়া মাড়িয়া এগিয়া চলে। জ্যোৎস্নার আলোয় কালা মাইয়া কুত্তাটা ওলান দুলি সুপ্পুত্থ করি সাইড কাটে, ল্যাজ নাড়ে, প্রভুভক্তি দেখায়, আস্তে দৌড়ায়, ফের থামে, পেছনে তাকায়। এ ভক্তি কে দেখায়! বিলাই মোল্লাসাবকে? না নিদানকালে মোল্লাসাব বিলাইকে? হ, শেষ পারানির কড়ি, হায়রে কড়ির প্রাণ কত্ত বড়ো দর!

বিলাই এরপর তার ধাঁচের অপেক্ষমাণ জনতা থেকে দূরের দিকে এগিয়ে গেলে মোল্লাসাবকে চিমনির আগুনে চিনতে চেষ্টা করে। মোল্লাসাব কীভাবে সংবর্ধিত হয়- এর ঐরাবতযুক্ত পুরাণভূমিকাইবা কী? হিন্দু-মিথে ঐরাবত তো আকর্ষণীয় নাগবিশেষ। প্রণয়ের সাথে তার প্রবল সংযুক্তি আছে। তাছাড়া সমাজধর্মের মূল্যেও কর্তৃত্বের প্রকাণ্ডতা আর মূর্খতা নিয়াও কত কল্পনা-অনুরাগ। এর শক্তি বা বিশালতা অনেক কিছুর মাপকাঠি। বিলাই এসব কম বোঝে। কিন্তু তার জন্য মিলিয়ে ফেলাটা সহজই মনে হয়। তার জন্ম বা তারও আগে মোল্লাসাব কি তার পূর্বপুরুষ বা তারও আগের এ পরিবারের কেউ এমন ঐরাবত-সহরত নিয়া হাটওয়ালা এ গ্রামের মানুষের উদ্দেশে কতকিছুই তো করিয়াছেন অতঃপর করিয়া চলিয়াছেনÑ তাহারা এ অভাবী-উদ্বাস্তু মানুষের লগ্ন হইয়া ফিরিয়া যাওয়া বা যাওয়া-আসা বা আসাআসিতে তাহার ভাগ্য নির্ধারিত হয়। জোয়ার-ভাঁটা উত্থান-পতনের মতো এ তল্লাটে আনন্দ আসে, তাহা চলিয়াও যায়, অপেক্ষা গুনিয়া চায়া থাকিয়া চাহনি-সৃষ্টির আদায়-বিদায় নিয়া ভূমির জল ওঠে আবার নাবিয়া যায়; সে রস টানিয়া উর্বর-অনুর্বর অনুকূল-প্রতিকূল জানার আগেই হয়তো উপেক্ষিত হাটগ্রামের অপেক্ষার সুতো বাহিয়া মোল্লাপ্রজন্মের মানুষকুল ত্রাতা হইয়া ওঠেন। এভাবে কত্তোকাল যে কালগর্ভে মৃত্যুহীন হয়- তার খবর কে রাখে? এরূপে গড়ে ওঠা ধারণা কালে কালে গোড়াপত্তন করে, গড়ে ওঠে। শুধু হাটগাঁয়ের উদ্বাস্তু বিলাই নওশা কেন ধারা অনুধারা বা গ্রাম-গ্রামান্তর পার হইয়া তা আকাশ কাঁপায় ছড়ায় ছিটিয়া দেয়, বলিহারিরূপে পেরিয়া চলে, শেষ হয় না সে সুনাম-সন্ধিৎসা। কিন্তু কী হলো অদ্য! চরকমলির হাটে তিনি কেন আসিলেন না, না আসিলে তো আজকের আশা গতদিনের প্রত্যাশা কোথায় মুখ থুবড়িয়া পড়িবে কে জানে! এ কি পরীক্ষার মুখোমুখি সকলে? সে কি বাণীদূত! আশায় উহার কি অবকাশ মিলিবে? মোল্লাসাব কি হাটগাঁয়ের প্রতীক্ষা বা সকল উপযোগীর অধিকৃত রায়ের প্রতিপাদ্য। আশীর্বাদপুষ্ট বিলাই সবকিছুর ভেতরে আনন্দ পায়। সে আনন্দে মনভেলা ভাসাইয়া দেয়। কিন্তু তার আগমনদিন কবে! কালাচাঁদ সত্য হলে তার নিদানকাল সমুপস্থিত। বিলাই রুহানি শক্তির ধন্দে পড়ে। এ ঐরাবত তার আমৃত্যু অজুহাতের কাঁধমুখ। কর্তব্য আর কৃতজ্ঞতা মনুষ্যকুলের অভিজ্ঞান। সরল কথায় তার কালসাধনা পরিপূর্ণ। মাগির মুখ নয়, তার অনুকম্পা ওই চিদ্আনন্দের কেলি। সেখানে আপন-পর তার চাইতে বৃষ্টি-জোৎস্নার বিচ্ছুরিত সুখাশীর্বাদ কম কী! বিলাই প্রশ্নসঙ্কুল আবর্তগুলা মাথায় নিয়া অমাবস্যার আকুল আঁধারের প্রতীক্ষায় ন্যায়কুলে ব্রত। সিদ্ধান্তটুকু কালাচাঁদের কর্মের বাইরেÑ তার রুহানি আলোর অভীপ্সিত গন্তব্যে। আসুক সে তার কাছে। অধিকতর কাছে। সে যাইবে অমাবস্যার আঁধারে, জ্বিন-আমলির নিমিত্ত নিষ্পত্র বাণ, কোথায় তাহার শক্তি আর কী-ই বা তার রূপ, যেখানে মোল্লাসাব লক্ষ্যে আছেন! আসুন না তবে!

কিন্তু বিলাই কালাচাঁদের ক্রমাগত প্রতি-উৎসাহে বিচলিত হয়ে পড়ে। নুলা সন্তানের প্রতি নিরুৎসাহ বাড়ে। মনের দুয়ারগুলো হু হু বাতাসে কম্পমান হয়ে দীপ্র দেউলিয়া ঘোষণা করে। বৌ-সন্তানের নিষ্প্রভতায় যে সংসার কোলাহলহীন, গতিশূন্য সেখানে কালাচাঁদ বইয়ে দিতে পারে গভীর দখিনা চান্দুনী সুবাস। হাওয়াভরা একপশলা দুর্দম ভোগবৃষ্টি। এসবের মুখ সে কোনোকালে দেখেনি। কিন্তু দেখতে চায়। কত্তকাল তাহার সেইসব প্রিয়জনরা মরিয়া হজিয়া গিয়াছে। কতদিন দেখে নাই সেইসব হাওয়া দুলানো ঝড়বৃষ্টিরাত আর মসীমাখা দুন্দুভিতে চোরামুরগি জবাই করা চাঁদরাতের বসন। মানভাঙা সে বসনে উঠিয়া আসিয়াছে সিঁদুররেখার বিজুলি আলোর ঝলক। কী দেখিয়াছিল তাতে। সেই মুরগিরক্তের শানিত ছুরির তরলতলে ভাসিয়া ওঠে দুলদুল খুরের মাটিশুকানো মিহি কটা রক্তের ছোপছাপ কণ্ঠস্বর। সেখানে হুলফোটানো বোল্লার ক্রিয়াশীল ক্রোধে কোষসেলের করুণ কণ্ঠস্বর আলাদা বিন্যস্ত পাইলে কোথা হইতে দৌড়িয়া মমদেল মুচি আসিয়া কয় : ‘ডাক আসিছে, চরকমলির টমটমে- আসছেন তিনি, নুকা বাবু নুকা, আস্ত থুবানায়’। তখন তামান নেতা খামোস। হাওয়ার মুখ তাড়িয়ে খালাস। আরও বড়ো সেই দাপুটের কম্পন। ভয়ে ফেরে নাই কেউ। যেন জনমের চিকিৎসা। হায়! সেই মানুষ কিনা, হঠাৎ তার এত প্রিয় হলো। কী বাঁচনের জন্য বড়স্বরে বিরাট হয়া ওঠেন, জানে না কেউ। ম্যাজিক অর্কেস্টা যেন সব, একি তার চেরাগ! এত্তসব অস্থির প্রদাহ তাকে তাড়া করে। আলোবৃষ্টি মাখা বাউলিয়া বাতাস খালি কান্দনে ভাসে, আর কয় ‘ক্যা তোর এত শোক মা! জনমের পরে পথের বাঁকের কণ্ঠ কি বুঝিস না?’ এসব মানুষমাখা বিস্তর অভিবাদন স্বর ভূতলের ত্রিকাল বার্তায় বহিয়া চলে আর জন্ম-মৃত্যুর প্রশ্বাস ছন্দোদোলায় ভাসমান থাকিলে বিলাই অবচেতনে বসন্ত-প্রলাপ বকে। খুব শানশওকত চোখে        মোল্লাসাবের অবয়ব হাতড়ায়। আবেগের প্রকোপে চোখের আলোর চকচক ছায়ায় হুল হুল করিই পানি ঝরে পড়ে। সিনা উঁচু করে নিমতলার দিকে তাকান। কী এ সৃষ্টিলীলা! কেমন এক রমণলীলায় দর্পিত হয়ে ওঠে তার চোখ। ভিজে ওঠে গোটা শরীর। নম্র্রনীতির নাও ভাসিয়া চলে। ভোর আর শিশির কায়াছায়ায় মিলায়। মুথা ঘাস পায়ে মাড়িয়া নেওর ভাপ মাথায় নিয়া সূর্যসেবকের নীতিতে বিলাই ভাবতে থাকে, নুলাটার জেবন কীভাবে চলবে, আল্লা ওর হায়াত দিছে কদিন- কেটা জানায়! কিন্তু এ নুলাই তো তার সব। দৃঢ় এক মমতার মরীচিকা আটকানো। চুম্বনের মমতাজালে শে’র ওঠে। হাওয়াবৃষ্টির সক্রিয়দাহে কঙ্কনা-নৃত্যে ভোগসঙ্গম প্রখর হইয়া উঠলে কাউয়ার ডিমে ফের মানুষজন্ম ফেরে। তখন ধ’রের ভেতর আটাষ্যড়ির পাড়মাখা গন্ধ সৃষ্টি করিয়া গড়ে ওঠে অমোঘ আমোদের এন্তেজাম। ঝরঝর বীর্যবৃষ্টিই তার কারণ। সেখানে নুলাটা কীভাবে ছিল, কীসের পানিকৃষ্টে তার ভাসমান রূপ- কে জানে। বিলাই স্বজন্মের ঘোরে পড়লে নুলা নিয়া নিদানকালের তড়পানিতে শেষজানাজার টুপিদৃশ্য ছায়াপাত করে। সে নুলাটার জন্য কান্দিয়া ওঠে। ওর সব দায় তখন নিজের কান্ধে নিয়া কয় : ‘তুই মোর সোহাগের পিদিম’। বিলাই তো নিরানন্দ নয়! নিষ্ক্রান্ত হয়া ঝরাপাতার ঝরনায় হাঁটিয়া চলে। এক গূঢ় আভাসে আবার উঠিয়া আসেন চরকমলির মোল্লাসাব, তড়পাইয়া দেখেন, এ গ্রামের সহীহ মানুষ তিনি, তার ওপর কি অন্যায় চলে? কালাচাঁদ অন্য পথ চিনিয়া নিক। নিজের নুলা ছেলেটার মমতার মতো তাকে বাঁধিয়া ফেলে মোল্লাসাব। এক প্রকার মর্যাদার সমর্থন তাকে পাইয়া বসে। এক ইশারায় মোল্লাসাব বলছিলেন, কিরে তোর কি নুলার ’পর আর কেউ নাই, সেটার খবর কী! ওই উঁচা ভিটার ওপর দিয়া তখন কেমন মজার হাওয়া আসিয়া কলিজা সুশীতল করিয়া দেয়। পিরপিরানি মজায় উচ্চাসীন হয়া সক্কলকে জানাইয়া কয়, দেখ- এক ফেরেশতার নাগাল লইছে, ওর কী পাওয়ার বাহে! এমন সমর্থনে জোছনাপশর আলোয় সে লাব করা মাইয়া মাগির ছবিতে আঙুল চালায়। ভাইসা ওঠে সেই আম্রিকা কোষ্টার রোদছায়ায় দুলুনির উল্কিমার্কা মিঠা আলো। ঘন মাখামাখিতে তখন জ্যৈষ্ঠের কড়া তাপের কুটকুট কামড়ানি। হঠাৎ কইরাই এক নিশায় ঘোর আসে। জন্মের আখরে ডাক ওঠে। হায় সেই আনন্দ সময়টুকু শুধু সেই চেনে! চেনার ভেতরেই সে একপাপ নিয়া এই কালা জল পাহাড় সমুদ্র ছাইয়া বীর্যভ্রƒণ মর্ত্যে বইসা রাখে। তখনই সমাজ-শ্বাস ফণার ধুয়ায় বাড়ি মারে। মনে মনে কয় আহা কী এমন কাম করছি, কামের কড়ানাড়ার কীর্ত্তনের বোলে ‘বধূয়া নিদ নাহি আঁখিপাতে’র ছায়া, কোষ্টার মৃত্তিকাভূমে মইয়ারে চিৎপঙ্গরে ফেলে। সেই লগ্নে একলয়ে সোঁতাবাতাস বইয়া চল্তে চল্তে বিলাইয়ের মাথায় ঘোরানি তোলে- তখন দুর্বল লাগে, অধঃপতিত হয়া গন্ধ তৈরি করে। সেইদিনের পর সে কত্তকাল আর ফেরে নাই। চেনে নাই কাউরে। কী সুন্দর দিনের চিরল বাতাস আঁকাবাঁকা ধুলারাস্তার যবশর্সার ক্ষেতে কতকিছু বহিয়া গিয়াছে। মোল্লাসাবের পূর্বপুরুষের গোরে থমকানো বাতাস আর ডাক পাড়ে নাই। কানমোচড়ানি স্যাররা কেউ নাই এ পাড়ায়। সবকিছুর তরে বিলাইয়ের এই নুলা ছেলেটাই নিরবধি বড় হচ্ছে। বৌ আর বৌ নাই, সে সোয়ামি বিলাইয়ের সহবাসের ধার ধারে না। সত্যিই এ গ্রামও মইরে গেছে। আ¤্রকিার ক্ষেতে কার যেন বাড়ি উঠ্ছে। পাল্টিয়া গিয়াছে বইয়া চলা তাবৎ করুণ বাতাস। মোল্লাসাব শুধু চরকমলির হাট কেন, যে দূর হইতে তার চরকমলির হাট আসার কথা, তা সরে নাই। দূরত্ব তার অশেষ। পাল্টানো গ্রামে আর আসেন নাই তিনি, তার আর প্রয়োজনও নাই। তার অপেক্ষায় বিলাই এখন ন্যুব্জ। লাভ করা মাগির ছায়া তাকে পালিয়া নিয়া বেড়ায়। সে কি বুড়িয়া গিয়াছে! ভরা রোদে সে কি এখন অনুপস্থিত? নাকি ফিরোজা হাওয়ায় কোষ্টাচুল আর অপুষ্ট স্তন দুগ্ধহীন মিলমিশে ভরিয়া এখন বাতিল, বিহিন। কালাচাঁদ কোনোকিছুর শোধ না নিয়াই হঠাৎ চরোপপড়া আগুনে কোন্ বড়পুলের ওপরে মরিয়া গিয়াছে। তারপরও মোল্লাসাব আসেন নাই। বিলাই নওশা সেই দৈব পুরুষটির জন্য এখনও পগারের ধ’রে বইসে বৃষ্টিভেজা আটাষ্যড়ির গন্ধ টানিয়া শ্বাস লন। কুচকুচা কালো মরাচামড়ার শরীরে কুঁজা হয়া বিড়বিড় কইরা কন, ‘মজার মায়া মজার হাওয়ায়/ কীসের কান্না কী-বা মায়ায়/ ফিইরা আইবানা মিয়া, ফিইরা আইবানা তুমি… হু হু হো হু হুম… হু হু… হুম’।

লেখক : গল্পকার, অধ্যাপক

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares