ভুয়া : সুমন্ত আসলাম

গল্প

ভুয়া

সুমন্ত আসলাম

 

চিৎকারটা প্রথম দিলেন আলতাফ হোসেন সেখ, সঙ্গে তার স্ত্রীও। ফজরের নামাজ শেষ করেই স্বামী-স্ত্রী মিলে হাঁটতে বের হন তারা। বয়সজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ডাক্তারের শেষ পরামর্শ- হাঁটতে হবে প্রতিদিন। হাঁটতে বের হয়েছেন তাই এবং রহমতগঞ্জ গ্রামের বড় কবরস্থানের দক্ষিণ পাশের দেয়ালের কাছে এসেই থমকে দাঁড়ান, চিৎকার দিয়ে ওঠেনÑ কবরস্থানের একমাত্র গম্বুজওয়ালা যে কবরখানা আছে, সেই গম্বুজের নিচে লোহার একটা আংটা লাগানো আছে, সেখানে গলায় দড়ি লাগানো একটা মানুষ ঝুলে আছে।

ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগল তাদের। এখনও একটু একটু অন্ধকার। কে ঝুলে আছে ওখানে, বোঝা যাচ্ছে না। তাছাড়া গম্বুজের গর্তের আড়ালে ঢেকে আছে মুখটা এবং ওপাশে ফেরানো সেটা। বুকের নিচের অংশ থেকে পা দেখা যাচ্ছে। সারা গায়ে কাফনের কাপড় জড়ানো, কেবল পায়ের নিচের অংশটুকু আলগা। কয়েকটা মাছি এসে থমকে আছে সেখানে, দু-একটা ওড়াওড়ির করছে পাখা ঝাপটিয়ে।

স্বামীর হাত টেনে ধরলেন মিসেস আলতাফ, ‘চলো, কে না কে আত্মহত্যা করেছে, পুলিশের ঝামেলায় পড়ব আমরা।’

স্ত্রীর হাত থেকে নিজের হাতটা আলতো করে ছাড়িয়ে নিলেন আলতাফ হোসেন সেখ। দেয়ালের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালেন আরও। চেহারাটা দেখা গেল না তবুও। আরও একটু চেষ্টা করলেন, তবুও না।

হাতটা টেনে ধরলেন স্ত্রী আবার। তিনিও ছাড়িয়ে নিলেন আবার। এদিক ওদিক তাকালেন। এই প্রত্যুষে কেউ নেই আশপাশে। সাহায্যা করারও নেই কেউ। শেষপর্যন্ত চার ফুট উঁচু দেয়ালটা টপকিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলেন। পারলেন না, এবং নিজেকে নিয়ে নিজে আরও একবার অনুধাবন করলেনÑ না, বয়সটা সত্যি খুব বেড়ে গেছে।

বুকের ভেতর জেদটা বেড়ে গেল আরও। ঝুলে থাকা মানুষটার চেহারা দেখতেই হবে তাকে। আরও একবার আশপাশে তাকালেন। কিছুটা দূরে নির্মাণাধীন এক বাড়ির কতগুলো ইট পড়ে আছে। দ্রুত তার কয়েকটা আনলেন। উঁচু করলেন এবং ভেতরে ঢুকলেন তাতে পা রেখে।

ধর্মীয় নিষিদ্ধতা ও ভীতির কারণে স্ত্রী ঢুকলেন না ভেতরে, অনুরোধও করলেন না আলতাফ হোসেন সেখ। উৎকণ্ঠা, উদগ্রীবতা আর কৌতূহলের চরম উত্তেজনায় ঈষৎ উঁচু এবং চারদিক ঘেরা করবখানার মেঝেতে গিয়ে দাঁড়ানোর জন্য পা রাখলেন তিন ধাপের প্রথম সিঁড়িতে। ভুল বুঝতে পারলেন সঙ্গে সঙ্গে। পায়ের পামস্যু জোড়া খুলে ফেললেন নিমিষে।

দু’পাশে ঢালু করা দু’ফুট উঁচু কবরটার পাশে দাঁড়িয়েই এই প্রথম সত্যিকারভাবে কেঁপে উঠলেন আলতাফ হোসেন সেখ। বেড়ে গেল বুকের ধুকধুকনিটা। সম্ভবত বেড়ে গেল রক্তের গতিও। চিনচিনে একটা ব্যথাও অনুভূত হলো ঘাড়ের পাশটায়।

সব দ্বিধা, সব আতঙ্ক, সব ভয় ঝেড়ে ফেলে উপরের দিকে তাকালেন তিনি। কাফনের কাপড়টা কেবল পায়ের নিচেই আলগা না, আলগা মাথার দিকটাও এবং সেখান দিয়ে নিচু করে রাখা যে মুখটা দেখা যাচ্ছে, প্রথম দর্শনেই তিনি বিশ্বাস করলেন না তা। কয়েকদিন আগে ছানিকাটা চোখ থেকে চশমাটা খুললেন, পাঞ্জাবির কোণা দিয়ে মুছলেন, চোখ দুটোও নরম আবেশে ডললেন। যথাস্থানে চশমাটা রেখে আবার তাকালেন। এবার আর কোনো ভ্রান্তি রইল না, অন্তিম চিৎকারের মতো চিৎকার করে উঠলেন তিনি। চিৎকারের সংক্রমণ লাশ না দেখেই চিৎকার করে উঠলেন স্ত্রীও। যুগল সেই চিৎকার গিয়ে প্রথম পৌঁছল কবরস্থানের পাশের খালপাড়ের মানুষদের কানে, তারপর রহমতগঞ্জ গ্রামের ১ নম্বর গলি ২ নম্বর গলি ৩ নম্বর ৪ নম্বর গলির মানুষদের কাছে। সেটা ছড়িয়ে গেল তেলকুপি, সয়াধানগড়া, শহিদগঞ্জ, ভাঙাবাড়ি, রতনগঞ্জ গ্রামের মানুষদেরও কানে। কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রায় আধা মাইল দীর্ঘ কবরস্থানটার আশপাশ ভরে গেল। সবার চোখে বিস্ময়, ভয়, অলৌকিক মিথ। এটা কী করে সম্ভব! সবার কাছে সবার জিজ্ঞাসা, কিন্তু কোনো উত্তর নেই কারও কাছে। কবরস্থানের পশ্চিম কোণায় টুকরো একটা জমিতে পুরোনো টিনের বাড়ি করা যে আফসার হুজুর থাকেন, বিপদে-আপদে দোয়া আর পানি পড়ার জন্য যার কাছে গ্রামের অনেক মানুষ যান, সকলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা তার দিকে ফিরলেন সবাই। অতি মাত্রার শোভন চেহারা, সৌম্য ব্যক্তিত্ব আর ঠান্ডা স্বরের আফসার হুজুরও কিছু বললেন না। পেকে যাওয়া দাড়িগুলোতে হাত বুলাতে লাগলেন চিন্তিত অবয়বে, গভীর দুশ্চিন্তায়।

দুক করে কেঁদে উঠলেন কেউ। ধর্ম-সংস্কার-সমাজ সব বাধা ঠেলে ঝুলে থাকা মানুষটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন অশীতিপর এক বৃদ্ধা। তারপর একটু একটু দুলতে থাকা তার পা দুটো হাতের দু আজলায় ভরলেন। গালে ঠেকালেন, গলায় ঠেকালেন, ঠোঁট দুটো ঠেসে দিলেন শক্ত করে। ঝুলে থাকা মানুষটা তার কেউ না, তবুও তিনি কাঁদতে লাগলেন, চিৎকার করতে লাগলেন গগন ফাটিয়ে। তার কান্নার জল ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়ল অনেকের চোখে। কিন্তু তারা কেউই বুঝতে পারলেন নাÑতারা কেন কাঁদছেন! বরং তাদের সমস্ত মস্তিষ্কে আপাত ছড়িয়ে আছেÑ সাতচল্লিশ বছর আগে কবরে রাখা মানুষটা আবার কীভাবে জেগে উঠলেন, নিজের কবরের গম্বুজের আংটায় নিজে নিজেই কীভাবে দড়ি দিলেন নিজের গলায়!

কবরস্থানের টিন চুরি করার দায়ে তিন মাস বারো দিন জেলে ছিলেন তমিজ উদ্দিন তরফদার। মুক্তি পেয়ে কিংবা মুক্তি নিয়ে বাসায় ফিরলেন তিনি তারপর। রহমতগঞ্জ গ্রামের মানুষজন সেদিন থেকে দেখলেনÑ সিনা ফুলিয়ে, দুপা কিঞ্চিৎ ফাঁক করে, চোখ-মুখ শক্ত করে নিজের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে ঘন ঘন হাঁটাহাঁটি করছেন। মানুষজন ভেবেছিলেনÑ আগেও যেহেতু তমিজ উদ্দিন ছোটখাটো চুরি-চামারি করেছে, কোনো কিছু হয় নাই তার, এবার ধরা পড়ে জেলে গিয়েছিল, লজ্জায় অন্তত দিনাদশেক বাড়ি হতে বের হবেন না। কিন্তু তাদের সেই অপরিপক্ক চিন্তা-ভাবনাকে লাথি দিয়ে ঠেলা মেরে গলা উঁচু করে কথা বলতেও শুরু করলেন আরও দিনাদুয়েক পর। কয়দিন পর ধমক-ধামক আর যার তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে এক ধরনের একটা ভয়ের রাজ্যও কায়েম করলেন। জেলে গিয়ে এখন যেমন কোনো রাজনীতিবিদ বড় নেতা হয়ে যায়, আগেও তেমন ছিল। তফিজ উদ্দিনের মাঝেও নেতা নেতা ভাব জেগে উঠল এক ধরনের।

তমিজ উদ্দিন তরফদার জেল থেকে বের হওয়ার দেড় বছর পর কমিশনার নির্বাচন হলো রহমতগঞ্জ গ্রামে। ভোটে দাঁড়ালেন তিনি। এবং নির্বাচিত হয়ে গেলেন অলৌকিকভাবে।

পরদিন আনন্দ মিছিল বের হলো। গ্রামবাসী লক্ষ্য করলেনÑ তমিজ উদ্দিন তরফদারের দুপায়ের মাঝে ফাঁকটা বেড়ে গেছে আরও। আগে হাঁটতেন হাঁসের মতো, কমিশনার হওয়ার পর হাঁটছেন পোয়াতি গাভীর মতো। এবং যে কবরস্থানের টিন চুরির দায়ের জেলে গিয়েছিলেন, ক্ষমতাবলে সেই কবরস্থানের সভাপতি হলেন। তারপর প্রথম যে কাজটা করলেন, সেটা হলোÑ ঝকঝকে পাঁচ বান টিন এনে একটি মাদ্রাসা ঘর বানালেন সামনের ফাঁকা স্থানে, সঙ্গে পাঞ্জেগানা নামাজ ঘর। গ্রামবাসী আরও লক্ষ্য করলেনÑ পাঞ্জেগানা নামাজ ঘরের ইমাম সাহেব যে দীর্ঘ মোনাজাত করেন নামাজ শেষে, তার তিন ভাগের দুভাগে থাকে তমিজ উদ্দিনের গুণকীর্তন। মাস ছয়েক পর গ্রামবাসী ভুলতে বসলেনÑ তমিজ উদ্দিন একজন চোর ছিলেন। বরং হুজুরের মোনাজাত সংলগ্ন গুণকীর্তনে সবার মনে আস্তে আস্তে গেঁথে গেলÑ জ্ঞানী, মানবদরদি, সমাজসেবক, চরিত্রবান, এমনকি আলেম শব্দটাও। আগে যারা মোনাজাতে আমিন আমিন শব্দ বলতে একটু দ্বিধা করতেন, তারা এখন সশব্দে উচ্চারণ করেন শব্দটা। কেউ কেউ আবার বিশ্বাসও করতে শুরু করেনÑ তমিজ উদ্দিন তরফদার সত্যি একজন সৎ, চরিত্রবান এবং আলেম মানুষ। মাথায় মাঝে টুপি পরে বিচারকার্যও শুরু করলেন তিনি এবং ভরা মজলিশে দু একটা আরবিও বলতে লাগলেন দ্বিধাহীনভাবে।

একটা নাইট স্কুল আছে রহমতগঞ্জে। এই স্কুলটার নাম কেন নাইট স্কুল হলো অনেকেই তা ভালো করে বলতে পারে না। তবে ধারণা করা হয়Ñ একসময় এই স্কুলে রাতে লেখাপড়া করানো হতো। সেই স্কুলে একদিন সাত টিন বিস্কুট আর তিন প্যাকেট গুঁড়ো দুধ এলো বিদেশ থেকে। বিস্কুটগুলো চারকোণা এবং দুধগুলো বেশ জমাট বাঁধানো।

স্কুলের ছাত্রর্ াকিছু বিস্কুট পেল, দুধও। কিন্তু সবচেয়ে বেশি পেল তমিজ উদ্দিন তরফদারের কুকুরটা। বিস্কুট খেতে খেতে ওটা একসময় এমন ত্যক্ত-বিরক্ত হলো যে, বিস্কুট দিলে ওটা আর খায় না। বাড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে এসে বাহির বাড়িতে চার ঠ্যাং ছড়িয়ে শুয়ে থাকে। এরই মধ্যে একটন গম বরাদ্দ হয়েছিল খালপাড়ের একটা রাস্তা ঠিক করার জন্য, রাস্তাটা আগের মতোই রইল, কিন্তু গমগুলো উধাও। মনি চৌধুরীর একটা রাইস মিল আছে বড় রাস্তায় মাথায়, কেউ কেউ ওখানে সেই গম ভাঙাতে দেখেছে কয়দিন। কিন্তু কেউ কিছু বলেনি, বলার সাহস পায়নি।

সিরাজগঞ্জ পৌরসভা থেকে প্রত্যেক গ্রামের জন্য একটা করে টিউবওয়েল বরাদ্দ দেওয়া হলো একদিন। রাস্তায় পাশে সেট করতে হবে ওটা। পথচারীরা পানি খাবে সেখান থেকে, প্রয়োজনীয় কাজও সারবে।

কমিশনার হিসেবে তমিজ উদ্দিন তরফদারের হাতে এলো টিউবওয়েলটা। তিনি সেটা সেট করলেন তার বাড়ির টিনের বেড়া সংলগ্ন। তিন সপ্তাহ পর টিউবওয়েল টিউবওয়েলের জায়গায় রইল, কিন্তু তমিজ উদ্দিনের টিনের বেড়াটা সরে এলো পুবদিকে। প্রকাশ্যে রইল না আর ওটা, ওখান থেকে পানি খেতে পারল না আর পথচারীরা। বরং ওই টিউবওয়েলের পানি দিয়ে গোসল করতে লাগলেন তমিজ উদ্দিন আর তার পরিবারের সদস্যরা সংসারের যাবতীয় ক্রিয়া-কর্ম করতে লাগলেন পৈতৃক সম্পত্তি ভেবে।

মহাপ্রভুর আখড়া নামে বড় একটা মন্দির আছে সিরাজগঞ্জে। তার পাশে একহিন্দু ভদ্রলোকের বাড়ি, তার দক্ষিণে বিদ্যাময়ী উচ্চ বিদ্যালয়। সেই বিদ্যালয়ে শিক্ষক হয়ে গেলেন তিনি একদিন। ব্যাপারটা ওই সময়ের সবচেয়ে অলৌকিক ঘটনা। গ্রামে কমিশনার, শহরে শিক্ষক। কিন্তু দুবছর যেতে না যেতেই তমিজ উদ্দিন একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করলেন ওই স্কুলে। কোনো ক্লাস নেন না, অর্থ সংক্রান্ত সব ব্যাপারে তার যত্রতত্র আগ্রহ এবং ডিসি অফিস থেকে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জন্য যে আট হাজার টাকা অনুদান আসল একদিন, তা নিমিষে হাফিস হয়ে গেল পরের সপ্তাহেই। স্কুলের ছাত্ররা মিটিং করল, মিছিল করল, কিছুই হলো না তমিজ উদ্দিনের। বরং স্কুলের পাশে যে পরিত্যক্ত হিন্দু বাড়িটা ছিল, তার নেতৃত্বে তা দখল হলো স্কুলের নামে। তারপর সেখানকার বড় নিমগাছটার মোটা তিনটা ডাল কেটে নিজের বাড়ি নিয়ে এলেন। তা দিয়ে দরজা বানিয়ে নিজের ঘরে চৌকাটে লাগালেন।

খুব দক্ষতার সঙ্গে তমিজ উদ্দিন তরফদার শেষপর্যন্ত স্কুলে যে কাজটা করেছেন, তা বেশ অভিনব। স্কুলের হিসাবের খাতা দেখে দেখে তিনি বের করতেনÑ বেশ মোটা অংকের বেতন বাকি আছে কোনো কোনো ছাত্রের। তারপর সেই ছাত্রের অভিভাবককে ডেকে এনে স্কুল থেকে টিসি দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ওই বেতনটা নিজের হাতে নিতেন। এখানে আরও একটা কাজ করতেন তিনিÑ প্রাপ্য বেতনের চেয়ে কিছু টাকা কম নিতেন। অভিভাবকরা তাতেই গদগদ হয়ে যেতেন, দয়াশীল একজন মানুষ ভাবতেন তাকে। স্কুলের পরবর্তী বোর্ড মিটিংয়ে তমিজ উদ্দিন সবাইকে বুঝাতেনÑ ওই ছাত্রের অভিভাবকের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাকে পূর্ণ বেতন মাফ করে দেওয়া উচিত। এবং ছলেবলে বোর্ডে পাশ করিয়ে নিতেন তিনি তা।

স্কুল থেকে অবসর নেওয়ার পর তমিজ উদ্দিনের আবার খায়েশ হলোÑ আরও একবার কমিশনার হবেন তিনি। প্রথবারের পর দ্বিতীয়বার আবার চেষ্টা করেছিলেন, গো-হারা হেরেছিলেন। এতদিন পর ভাবলেনÑ মানুষজন সব ভুলে গেছে, এবার বিজয়ী হবেন তিনি। গো-হারা হারলেন তিনি এবারও। কিন্তু তিন তিনবারের জনপ্রিয় কমিশনার আব্দুল কুদ্দুস খাঁন আকস্মিক মারা যাওয়ায় গ্রামের অঘোষিত মাতব্বর হয়ে উঠলেন তিনি একসময় এবং আগের মতো গ্রাম্য বিচার-আচারের মধ্যমণি হয়ে উঠলেন।

রমজান মাসের এক সকালে ২নং গলির জামেরুল বেওয়া চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন, ‘তমিজ্যা, আমার কাছ থাইক্যা এক হাজার এক হাজার কইর‌্যা তিন হাজার ট্যাকা নিছে। আমার জমির ভ্যাজাল মিটায়া দিব কইছে। দেয় নাই। আরও এক হাজার চায়। আমার সোয়ামি নাই, আমি এই ট্যাকা কই পাই!’

পুতুলের মতো চুপ করে থাকা গ্রামবাসীর মাঝে ফিসফাস শুরু হয়ে গেলÑ বিচারের নামে অনেকের কাছেই টাকা নিয়েছেন তমিজ উদ্দিন। টাকা ছাড়া বিচার হয় না তার কাছে, টাকা দিলেও হয় না অনেকের।

বুধবারের এক সকালে সারা গ্রামবাসী দেখলেনÑতমিজ উদ্দিন তরফদারের বাড়ির গেটে ছোট একটা সাইনবোর্ড লাগানো। সিরাজগঞ্জ পৌরসভা থেকে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়ির নাম্বারসহ তার নাম লেখা, নামের পরে ব্রাকেটে একটি শব্দ লেখা।

শব্দটা পবিত্র, কিন্তু সারাদিনে গ্রামের প্রায় সব মানুষ সেটা দেখে লজ্জায় নিচু করে ফেললেন মাথা, কেউ কেউ মুচকি হাসি দিলেন, কারও কারও ইচ্ছে হলো খুব নীরবে মরে যেতে।

তার ঠিক চার বছর সতেরো দিন পর তমিজ উদ্দিন তরফদার মারা গেলেন। খালপাড়ের আজিজুলের দোকানে বৈকালিক পুরি খাওয়ার জন্য তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে সেদিকে যাচ্ছিলেন। পেছন থেকে একটা টেম্পো ধাক্কা দেয় তাকে। রাস্তার পাশের বড় একটা গর্তে উপুড় হয়ে পড়ে যান তিনি। তারপর কাতরাতে কাতরাতে মাস তিনেক পর মারা গিয়ে ঠাঁই হয় তার ওই কবরস্থানে, যে কবরস্থানের টিন চুরি করে জেলে গিয়েছিলেন তিনি তেত্রিশ বছর আগে।

কবরস্থানের পাশে বিস্তীর্ণ একটা ক্ষেত আছে, পাশে বড় একটা পাকুড় গাছ। গ্রাম্য শালিশ কিংবা কোনো বিচার কার্য সাধারণত কটন মিল মাঠে হয়ে থাকে, আজ সবাই বসলেন ওই ক্ষেতটাতেই। কোনো সালিশি নয়, কারও কোনো বিচার কার্যও নয়, গুম্বজের নিচে ঝুলে থাকা মানুষটার জন্য। কী করা যায় তাকে? আট-দশ গ্রামের মানুষ এসে জড়ো হয়েছে সেখানে। ক্ষেতের আশপাশে অন্যান্য ক্ষেতগুলোতে যে ফসল বোনা হয়েছিল, তা পায়ের চাপে চ্যাপ্টা হয়ে গেল মাটির সঙ্গে, সলিল সেখের সে নতুন বাড়িটা বানানো হচ্ছে ইট দিয়ে, তার সব ইট ছড়িয়ে পড়ল প্রায় চারপাশে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা লেগে যাওয়া মানুষগুলো ওই ইটে বসে ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগলেন আর আড়চোখে তাকাতে লাগলেন ঝুলে থাকা ওই লাশের দিকে। এখান থেকে পুরো শরীরটা না দেখা গেলেও দুলতে থাকা পা জোড়া দেখা যাচ্ছে; মাছি বেড়েছে সেখানে, বোঝা যাচ্ছে তাও।

গ্রামের পঞ্চায়েত কমিটি যখন তুমুল আলোচনায় ব্যস্ত, কোনো কিছুর সিদ্ধান্ত নিতে হিমিসিম খাচ্ছেন তারা, গ্রামের একমাত্র শারীরিক প্রতিবন্ধী ময়না সেখের যখন ধৈর্যচ্যুতি হয়ে ঝিমানি এসে গিয়েছিল, চোখ পিটপিট করা চোখে অল্প দেখা কানাই মুন্সী যখন আও শব্দ করে বড় একটা নিঃশ্বাস ছাড়লেন, ঠিক তখনই চমকে উঠলেন সবাই। গম্বুজের আংটা থেকে লাশটা নেমে হেঁটে আসছে তাদের দিকে। আতঙ্কে স্থির হয়ে গেলেন সবাই।

শরীরে কাফন জড়ানো মানুষটা যখন সবার সামনে এসে দাঁড়ালেন, দ্বিতীয়বারের মতো অবিশ্বাসে ভুগলেন তারাÑনা, এটা হতে পারে না।

‘না, এটা হতে পারে।’ কাফনে মোড়ানো মানুষটা কথা বলে উঠলেন, ‘কবরস্থানের টিন চুরি করে জেল খাটা একজন মানুষ, স্কুলের মতো পবিত্র প্রতিষ্ঠানের টাকা মেরে যিনি সংসার চালিয়েছেন, বিচারের নামের ঘুষ খেয়েছেন গ্রামের অসহায় সাধারণ মানুষের কাছে, সারাজীবন অসৎ জীবন যাপন করা সেই তিনি একদিন হয়ে গেলেনÑ মুক্তিযোদ্ধা! অথচ যুদ্ধ করা তো দূরের কথা, যুদ্ধ সময়ে নেংটি ইঁদুরের মতো পালিয়ে গেছেন তিনি এলাকা ছেড়ে। সরকারি ভাতা খেয়েছেন, যাবতীয় সুবিধা নিয়েছেন, প্রকৃত অনেক মুক্তিযোদ্ধার হক নষ্ট করেছেন।’ শব্দ করে নিশ্বাস ছাড়লেন কাফন জড়ানো মানুষটা, ‘প্রতারক ওই মানুষটার মৃত্যু হলো, সরকারি গার্ড অব অনার দেওয়া হলো তাকে, তোপধ্বনি উচ্চারিত হলো তার প্রতি, যে করবস্থানের টিন চুরি করেছিলেন, সেই কবরস্থানে কবর দেওয়া হলো এক সময়!’ চিৎকার করে উঠলেন এবার কাফন মোড়ানো মানুষটা, ‘আমি এখন যাই কোথায়?’

স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি শুরু করলেন সবাই। মানুষটা ডুকরে কেঁদে ওঠার মতো বললেন, ‘নয় মাস যুদ্ধ করেছি, তিন দিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে তখন, যুদ্ধ কাকে বলে তিলে তিলে তা অনুধাবন করেছি প্রতিদিন, ছড়ড়া একটা গুলির আঘাতে দেড় দিন রক্ত ঝরেছে শরীর থেকে, উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক আর নির্ঘুম কেটেছে অনেক রাত, জীবন আর মৃত্যুর মাঝামাঝি থাকতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। এরকম একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে আমি কীভাবে শুয়ে থাকি ওই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাটার পাশে, একই কবরস্থানে, একই পরিবেশে!’

পা জাপটে ধরা সেই বৃদ্ধটা উঠে দাঁড়ালেন ইট পাতানো আসন থেকে। এগিয়ে গেলেন মানুষটার দিকে। কাছে গিয়ে নিজের দু’হাতের মাঝে তার দু’হাত এনে কিছু বলার চেষ্টা করলেন, পারলেন না। ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল কেবল, তির তির করে।

কাফনে মোড়ানো মানুষটা কাঁদতে শুরু করলেন এবার, ‘অসহ্য যন্ত্রণায় তাই উঠে এসেছি কবর থেকে; ঘৃণায়, গ্লানিতে নিজের গলায় নিজেই দড়ি লাগিয়েছি। আপনারা গ্রামের সচেতন মানুষগুলো যখন কিছু করলেন না, প্রতিবাদ করলেন না, মুখে কুলুপ এটে বসে রইলেন যার যার অন্দরমহলে, তখন একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এটা ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না।’

ভরা মজলিশে বসা যুদ্ধ ফেরত গাজী হাসান খসরু খান, মসজিদের পেশ ইমাম বিজ্ঞ আমজাদ হুজুর, বর্ষীয়ান সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম কালা, পঞ্চায়েত কমিটির সদস্য সচিব আবদুর রশিদ বাবলা, নতুন নেতৃত্বের সৎ যুবক শামীম খানসহ সবাই দেখলেনÑ গ্রামের সবচেয়ে ত্যাগী ও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, তাদের প্রতিদিনের গর্ব সুলতান মাহমুদ আবার হেঁটে যাচ্ছেন তার কবরের দিকে। কবরটা ফাঁক হলো, বেশ দ্রুত গতিতে তিনি ঢুকে গেলেন সেখানে।

তার পর থেকে রহমতগঞ্জবাসী লক্ষ্য করলেনÑ তাদের একমাত্র খালটার পানি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে, কবরস্থানের বড় বড় কড়ই আর মেহগনি গাছগুলো মারা যাচ্ছে ধীরে ধীরে, কবরের গর্তে বাস করা শিয়ালগুলো চিৎকার করে উঠছে রাত-বিরাতে।

কেবল মানুষগুলো সংসার করতে লাগলেন আগের মতোই।

লেখক : কথাশিল্পী

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares