পাগলা মামার দলিল : জুলফিয়া ইসলাম

গল্প

পাগলা মামার দলিল

জুলফিয়া ইসলাম

মিনুর মায়ের মামাতো এক ভাইয়ের নাম জামাল যাকে সবাই পাগলা জামাল নামেই চেনে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এক ছেলে ও এক জামাইকে বিসর্জন দিয়ে মস্তিষ্কে বিভ্রাট বাঁধিয়েছেন। সেই মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে মামার মাথায় গণ্ডগোল। মিনু এরকমই শুনে এসেছে। মামার চেহারায় পাগলাটে কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। বয়স পঁচাশির কাছাকাছি। কিন্তু শরীর বেশ শক্ত সমর্থ। এই বয়সেও খালি চোখে কোরান পাঠ করেন। মাইলের পর মাইল হেঁটে হেঁটে পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে যান।

এক বিকেলে বলা নেই কওয়া নেই পাগলা মামা মিনুদের মগবাজারের বাসায় এসে উপস্থিত। মামাকে দেখে মিনুর বাবা মোটেও খুশি হলেন না। জানা গেল মামা নতুন এসেছেন এ পাড়ায়। তিনি জানতেন যে মিনুরা এই মগবাজারে থাকে। তাই দুদিন ধরে খুঁজে খুঁজে অবশেষে আজ বাসাটা পেয়েছেন। নতুন প্রতিবেশি আর ভগ্নিপতির খোঁজ করতেই মামার আগমন ঘটেছে।

মিনু বৈঠকখানায় ঢুকে দেখল মামা হাসিমুখে বসে আছেন। ঠোঁটের কোণে সারাক্ষণই হাসি লেগে থাকে মামার। মিনুর বাবা এসে জিজ্ঞেস করলেন, বাসা খুঁজে পেলেন কীভাবে?

আরে আমি তো আপনার উল্টো দিকের গলিতেই থাকি।

বাবা উত্তরে মাথা ঝাঁকালেন।

অবসর জীবনযাপন করা ছাড়া মামার আর কোনো কাজ নেই। যার জন্য অবসর সময়টুকুতে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। মিনু পাগলা মামার কাছে এগিয়ে গিয়ে নিজের নাম বলল। মামা উঁচুগলায় হেসে দিলেন।

আরে তোদের পরিচয় কি নতুন করে দিতে হবে নাকি? আমি সবাইকে চিনি। কাউকেই ভুলিনিরে।

চা খাবেন মামা?

মেহমান বাড়িতে এলে চায়ের কথা জিজ্ঞেস করতে হয় না কি?

পাগলা মামা তার ঝোলা থেকে পানের কৌটা বের করলেন। কৌটা খোলা মাত্রই বাহারি জর্দার গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। ঘরময় একটা মাতাল ঘ্রাণ মৌ মৌ করছে। মিনুর বাবা একটু বিরক্তই হলেন। তার চোখের চাহনি সেটা বলে দিচ্ছে। কিন্তু মামার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মিনু মনে মনে ভাবল মামা এখনই বোধহয় তার মুক্তিযোদ্ধা ছেলে ও জামাইয়ের গল্প শুরু করবেন। কিন্তু তিনি সেটা করলেন না। টুকটাক কথার ফাঁকে মিনু পাগলা মামার দিকে হাঁ হয়ে চেয়েছিল। কই মামার মধ্যে তো কোনো অস্বাভাবিকত্ব নেই। তাহলে মামাকে সবাই পাগলা মামা নামে ডাকে কেন? এটা মামার প্রতি অবিচার বলে মনে হলো মিনুর। মিনু চেতনায় সন্তান হারানো পিতার মনের অবস্থা হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করল। যুদ্ধে দুটি সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কত গভীর হতে পারে মিনু সেটা চেষ্টা করেও চেতনায় ধারণ করতে পারল না। এই মানুষ এরকম একটা যন্ত্রণা নিয়ে সারাক্ষণ ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, এটা অস্বাভাবিক। এই অস্বাভাবিকত্ব তাকে পাগলা মামা নামে পরিচিত করেছে। কেউ হয়ত বুঝতেই চায়নি যে এটা মামার হাসি নয় এটা তার যন্ত্রণারই বহিঃপ্রকাশ।

কাজের মেয়ে চা আর বিস্কুট নিয়ে এল। মামা চায়ের প্রতি ঝুঁকে পড়ে বাবাকে বললেন, আপনার জন্য দিল না, আপনি খাবেন না?

বাবা গম্ভীর মুখে না বললেন।

বাবার আজ কোথাও বাইরে যাওয়ার নেই নইলে এতক্ষণে কোনো ছুঁতায় বেরিয়ে পড়তেন। মামা অতি যতেœ চায়ের কাপ তুলে নিলেন। খুব ধীরে-সুস্থে চুক চুক শব্দ তুলে চা খাচ্ছেন। মিনুর মনে হলো শুধুমাত্র চা খেতে যিনি এতটা সময় ব্যয় করছেন তিনি নিশ্চয়ই রাত অবধি থাকার পরিকল্পনা মাথায় নিয়েই এসেছেন। কিন্তু মিনু আশ্চর্য হয়ে গেল যখন মামা চা খাওয়া শেষ করেই যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন।

তোমার চা-টা খুব ভালো হয়েছে মা। তাই রসিয়ে রসিয়ে খেলাম। কিছু মনে কোরো না।

না মামা, আরেকটু বসেন।

মামা বসলেন না। মিনু মামাকে গলির মাথা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। এগিয়ে দিয়ে ফেরার পথেই দোতলার খালাম্মার সঙ্গে দেখা। খালাম্মা কপাল কুঁচকে গম্ভীর মুখে বললেন, জামাল সাহেব তোমার কে হন?

আম্মার মামাতো ভাই।

ভদ্রলোক তো ছিটগ্রস্ত। পঙ্গুমুুক্তিযোদ্ধাদের লিস্ট তৈরি করছেন। দেখবে হাড় জ্বালিয়ে খাবে। কিছুতেই প্রশ্রয় দিও না।

মিনু প্রতিবেশী খালাম্মার কথায় একটা হোঁচট খেল। এটা তো অনেক বড় কাজ। মামা এই কাজে হাত দিলেন কোন সাহসে। যে মানুষ এরকম কাজ করার উদ্যোগ নিতে পারে তাকে তো সহযোগিতা করা উচিত। মানুষগুলো সবাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। নিজের কথাই শুধু ভাবে। সামাজিক দায়বদ্ধতা কারও মধ্যে মিনু দেখতে পায় না। এমন কি তার বাবার মধ্যেও এই গুণাবলির অভাব রয়েছে। নইলে বাবা কেন মামাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। দোতলার খালাম্মার কথায় মিনুর ভীষণ অস্বস্তি হতে লাগল। মিনুর প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা করছিল কিন্তু সে সেটা না করে মাথা নিচু করে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল।

সেদিনের বেশ কিছুদিন পর একদিন হঠাৎ নীলক্ষেত মোড়ে পাগলা মামার সাথে দেখা।

মিনু না? কেমন আছ, মা?

জি ভালো। আপনি কেমন আছেন মামা? আর তো বাসায় এলেন না।

লিস্ট তৈরিতে খুব ব্যস্ত রে মা। অনেক দৌড়ঝাপ করছি। কি জানি কতটুকু করতে পারব।

মিনু ভাবল এই বুঝি জোঁকের মতো ছেঁকে ধরবেন মামা। ও প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, মামা আমার একটা কাজ আছে। আরেকদিন কথা হবে।

মামা বললেন, হ্যাঁ মা যাও। আমারও তাড়া আছে।

মিনুর কাছে তেমন বিরক্তিকর কিছু মনে হয়নি, বেশ সহজ স্বাভাবিক মানুষ। সে এত সহজে ছাড়া পাবে ভাবতেই পারেনি। সবাই যে তাঁকে নিয়ে এত এত কথা বলে অথচ মামা তো তেমন নন।

আরেকবার দেখা হলো মামা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছেন।

মিনু এগিয়ে গিয়ে বলল, মামা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কী করছেন?

মামা ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। মনে হলো চিনতে পারেননি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর হাসিমুখে বললেন, চিনতে পেরেছি। অনেকদিন তোমাদের ওদিকটায় যাওয়া হয় না। এ-পর্যন্ত এক হাজার নামের লিস্ট করতে পেরেছি।

আচ্ছা মামা কষ্ট করে এই যে লিস্ট করছেন। এই লিস্ট তো অনেক আগে হয়ে গেছে। আপনি আবার কেন এই ঝামেলা করছেন।

নারে মা ঝামেলা নয়। যদিও অনেকেই মনে করছে যে আমি অহেতুক এই কষ্টটা করছি। কিন্তু তুই তো জানিস না মা অনেক মুক্তিযোদ্ধা এখনও জীবিত আছেন যাঁরা মুক্তিযোদ্ধাদের খাতায় নিজেদের নাম লেখায়নি। তাঁরা কি বলে জানিস? তাঁরা বলে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি কোনো সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার জন্য নয়। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি দেশের জন্য, দেশের সব মানুষের জন্য, দেশের মঙ্গলের জন্য। আমরা এই-বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি। আমরা এই ধুঁকে ধুঁকে মরার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি। আমরা বাঁচার মতো বাঁচতে চেয়েছি।

মামার একটানা কথা শুনে মিনুর ভয় হলো যে মামা আবার কোনো সাহায্য না চেয়ে বসেন। ও চুপ করে থাকল। পৃথিবীতে কত রকম মানুষই তো আছে। পাগলা মামাও একরকম মানুষ। তিনি একটা কাজ নিয়ে আছেন। অনেক খারাপ মানুষের মধ্যে পাগলা মামা তো কোনো খারাপ কাজ করছেন না। তিনি যদি তৃপ্তি পান কাজ করে তাহলে কারও আপত্তি তো থাকার কথা নয়। সে তো নিজে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মাথা ঘামায় না। এখনও সে সেরকমভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। এটা কি নাগরিক হিসেবে তার অন্যায় হচ্ছে না দোষের হচ্ছে সেটাও ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারছে না। তার বাবা-মা তো সেই চেতনায় তাকে উদ্বুদ্ধ করেননি। এখন মামার কাজে আর শুধু শুধু আগ্রহ দেখিয়ে কী লাভ? তিনি যা করছেন, করুন।

কিন্তু মিনু বেশিদিন আর আগ্রহ না দেখিয়ে থাকতে পারল না। এক সন্ধ্যায় এক হাজার বাইশ জন মুক্তিযোদ্ধার লিস্ট নিয়ে মামা তাদের বাসায় হাজির হলেন। হাসি হাসি মুখে মিনুর বাবাকে বললেন, দলিল পড়েন দুলাভাই। মিনুর বাবা কোনো আগ্রহই দেখালেন না।

মিনু হাত বাড়িয়ে নিয়ে লিস্টটায় চোখ রাখল। দলিলের বিষয়বস্তু হলো কোন লোককে হত্যা করলে তার বিচার হয়। বাংলাদেশের ত্রিশ লাখ মানুষের কী অপরাধ ছিল? স্বাধীন রাষ্ট্র চাওয়াটাই কী তাদের অপরাধ? কিন্তু না মৃত লোকদের জন্য তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। তাঁর আক্ষেপ হচ্ছে জীবিত পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনের নিশ্চয়তা চেয়ে সরকারের নিকট আবেদন।

মিনু মামার দিকে তাকিয়ে আছে। মামা শান্ত স্বরে বললেন, আমার এক ছেলে ও এক জামাই মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছে। শহিদদের জন্য আমার কোনো দুঃখ নেই। আমি গর্ব করি। আমার দুঃখ হলো যাঁরা পঙ্গু হয়ে বেঁচে আছে। যাঁদের প্রতি কারও কোনো দায়দায়িত্ব নেই, তাঁদের জন্য। জানো, এ বিষয়টা অনেকে পাত্তাই দেয় না। অনেকে বলে গ-গোল হলে এমন হয়। গ-গোল কাকে বলে? মুক্তির জন্য যুদ্ধ, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ কী গ-গোল?

মিনু কিছু বলল না। পাগলা মামা বলে চলেছেন, আমার দুইজন আপন লোক মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছে। আর আমার কী কোনো দায়িত্ব নেই? আমি তাঁদের খুঁজে খুঁজে বের করবই। মুক্তিযোদ্ধাদের একটা লিস্ট করবই। এত লোক দেশের জন্য লড়াই করে পঙ্গু হলো আর আমাদের কী কিছুই করণীয় নেই?

মিনু লিস্টটা ভালো করে দেখল। খুব গোছানো কাজকর্ম। মিনু আস্তে করে বলল, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকার অনেক কিছুই করছে। আপনার এতসব করার দরকার নেই মামা।

মামা বললেন, তুমি জানো না মিনু। আসল মুক্তিযোদ্ধা যাঁরা তাঁদের অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত করা হচ্ছে। অথচ যারা নকল মুক্তিযোদ্ধা সেজেছে তারাই সেই সুবিধাটুকু আদায় করে নিচ্ছে সরকারের কাছ থেকে। অনেকেই ভাবে আমার মাথা ঠিক নেই। পত্রিকা অফিসের সম্পাদক দেখা করতে চান না। অথচ এই সম্পাদকের এক ভাই নিজে একজন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা। চালচুলাহীন অবস্থায় সে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। তাঁর কথা মনে হলেই বুকের মধ্যে চিনচিনে ব্যথা হয়।

মিনু অত্যন্ত মনোযোগী হয়ে পাগলা মামার কথা শুনতে থাকে। মামা আস্তে আস্তে বলে চলেছেন, সরকারি দলের লোকরা আমি কী বলতে চাই সেটিই বুঝতে চায় না। তারা মুক্তিযোদ্ধার পিতা হিসাবে অনুদানের জন্য দরখাস্ত করতে বলে।

আপনি কী বললেন?

আমি বললাম, আমার দেশের জন্য যাঁরা শহিদ হয়েছে তাঁদের জীবন কী এতই সস্তা? তাঁদের পিতাকে অনুদান দিলেই সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে? সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?

তোমাকে বোঝাতে আমার কষ্ট না হলেও অন্যরা বুঝতে চায় না। অনেক পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা, তারা নামধাম ঠিকানা দিতেও আপত্তি করেÑ কী হবে ঠিকানা দিয়ে? কিসের জন্য যুদ্ধ? আমরা যুদ্ধে না গেলেও তো দেশ স্বাধীন হতো। দেখ মা কী অভিমানের কথা। সবাই দেশের মুক্তির জন্য প্রাণ দিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বলেই তো দেশটা স্বাধীন হলো।

আমি তাঁদের বোঝাই, বলি, যুদ্ধে যেতে হয় না। যুদ্ধ হয় দেশের জন্য। যাতে দেশের মানুষ স্বাধীন দেশে মুক্ত বাতাসে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে পারে। যুদ্ধ তো নিজেই ঘাড়ে চেপে বসে। শুধু অনুভব করতে হয়। যে অনুভব একদিন বঙ্গবন্ধু করেছিলেন। তাঁরা প্রশ্ন করে, বঙ্গবন্ধু কী এই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন? কে বোঝাবে তাঁদের। আমিও তো জানি বঙ্গবন্ধু এই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেননি। কিন্তু আমরা যারা এখনও বেঁচে আছি তারা কী দেশের মঙ্গলের জন্য চেষ্টা করব না। এসব বুঝতে চায় না রে মা।

সেদিন একটা হতাশা ঝরে পড়েছিল পাগলা মামার কথায়। তারপর অনেকদিন পাগলা মামার সঙ্গে মিনুর দেখা হয়নি। হঠাৎ একদিন রাস্তায় দেখা হলে মিনু জিজ্ঞেস করল, কতদূর এগুলেন মামা?

চালিয়ে যাচ্ছি মেয়ে।

লোকজন ঠিকানা দিচ্ছে তো?

সবাই দেয় না। ভয় পায়।

কীসের ভয়?

কী জানি কিসের ভয়। যারা একসময় প্রাণের মায়া ত্যাগ করে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল, তাদের আবার কিসের ভয়! আমি এখন ঠিক করেছি প্রতি জেলায় জেলায় গিয়ে নাম ঠিকানা জোগাড় করব।

অনেকদিন মিনু জামাল মামার কোনো সাক্ষাৎ পায় না। হয়ত ভারী ভারী ফাইল নিয়ে জেলায় জেলায় ঘুরছেন। সংখ্যা হয়ত বাড়ছে। এক হাজার থেকে দুই হাজারে উন্নীত হয়েছে হয়ত। এক সময় পাঁচ হাজারও ছাড়িয়ে যেতে পারে। একজন মানুষের জন্য পাঁচ হাজার লোকের অবদানের কথা সবাই জানবে, এটাই বা কম কিসের।

শীতের মৌসুমের শুরুতে পাগলা মামা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

মনে হয়েছিল এই শীতে টেকেন কি না সন্দেহ। কিন্তু শীতটায় টিকে গেলেন।

একদিন মিনু তাকে ফাইলপত্র বগলে নিয়ে ঘুরতে দেখল।

কী ব্যাপার মামা? এ কী অবস্থা আপনার?

বাঁচব না মনে হয় বেশিদিন, মা।

না বাঁচলে আপনার প্রজেক্টের কী হবে?

ওইটুকুর জন্যই তো আজও বেঁচে আছি।

কতদূর নাম ঠিকানা যোগাড় করছেন?

প্রায় চার হাজার হয়েছে রে মা।

মগবাজারের ঐ পাড়ায় মিনুরা প্রায় তিন বছর কাটাল। মাঝে মাঝে মিনু পাগলা মামার বাসায় যেত। ঘরে দুটি বিধবা মেয়ে মানুষ। একটা তার মেয়ে আর একটা ছেলের বউ।

দলিল সম্পর্কে মেয়ে দুটির ধারণা বেশ স্পষ্ট। মেয়েটি গম্ভীর হয়ে মিনুকে বলল, বাবার খাতায় যত বেশি নাম উঠবে তত বেশি আমাদের স্বামীদের আত্মা শান্তি পাবে।

তিন বছর এক পাড়ায় থেকে মিনুরা ওই পাড়া ছেড়ে চলে গেল। তবু মিনু মাঝে মধ্যে ঐ বাড়িতে যেত। একবার মিনু গিয়ে দেখল তিনি দলিল সংগ্রহের জন্য বগুড়া গেছেন। মিনুর মনে হলো পাগলা মামা যা করছেন তা ঠিকই করছেন। ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তের ঋণ তো পরিশোধ করা যাবে না। অন্তত বেঁচে থাকা অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায় হতে পারলে নিশ্চয়ই শহিদদের আত্মা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।

মিনু মাঝে মধ্যে চিন্তা করে, পাগলা মামার প্রজেক্টে কিছুটা সাহায্য করতে পারলেও হতো। মিনুর সবসময় ভিতর থেকে ডাক আসে কিছু একটা করার। কিন্তু কিছুই করা হয় না।

গত তিন বছরে জামাল মামার বাড়ির দিকে যাওয়া হয়নি। একদিন মগবাজার যাওয়ার পথে ঐ বাড়ির সামনে দিয়ে মিনু যাচ্ছিল। হঠাৎ কি মনে হতে বাড়ির সামনে দাঁড়াল। কড়া নাড়তেই বিধবা মেয়েটি বেরিয়ে এলো। অবাক চোখে মিনুর দিকে তাকিয়ে থাকল।

তার নির্লিপ্ত দৃষ্টির সামনে হকচকিয়ে গেল মিনু। আস্তে করে বলল, আমি মিনু।

জি।

মামা আছেন?

না বাবা বছরখানেক হলো মারা গেছেন।

মিনু নিথর দাঁড়িয়ে থাকলও। কি বলবে বা কী বলা উচিত কিছুই মাথার ভিতর এলো না।

আসুন। ভিতরে আসুন।

মিনু ভিতরে গিয়ে বসল। এটা ওটা জিজ্ঞেস করল। তারপর উঠে আসার সময় জিজ্ঞেস করল মামা পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের যে দলিলটি করেছিলেন সেটা কোথায়?

আছে। কেন?

না, মামা যে কাজটি শুরু করেছিলেন সেটি শেষ করা উচিত।

মেয়েটি চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর অস্ফুটস্বরে বলল, বাবা বলেছিলেন কেউ না কেউ একদিন কাজটি শেষ করবে।

মিনু কিন্তু সেই দায়িত্ব নেয়নি।

দেশে এখন নানারকম সমস্যা। সন্ত্রাস আর বোমাবাজিতে দেশটি ভরে গেছে। চুপ করে থাকা ছাড়া আর উপায় নেই। এর মাঝে পুরোনো সমস্যা নিয়ে ভাববার সময় কই?

সবাই পাগলা মামা হতে পারে না। মানুষের অনেক সমস্যা থাকে। সবাইকে তার ভবিষ্যৎ সমস্যা নিয়ে ভাবতে হয়। অভিমানী পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করার সময় কই। পাগলা মামার মেয়েটি হয়ত মিনুর জন্য অপেক্ষা করে। বাবার দলিলটি হয়ত ঝেড়ে মুছে রাখে। মানুষের বিশ্বাস আর অপেক্ষার কোনো শেষ নেই।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares