বৃক্ষবালক : মাজহারুল ইসলাম

গল্প

বৃক্ষবালক

মাজহারুল ইসলাম

ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল সাদিক আলির। গতকাল রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় মোবাইল ফোনের রিংগার অফ করতে ভুলে গিয়েছিলেন। বালিশের পাশ থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলেন স্ক্রিনে মামুনের নাম। কলটা রিসিভ করলেন না। ফোনের স্ক্রিনে সময় দেখলেন-পাঁচটা আটত্রিশ। খুব বিরক্ত হয়ে তিনি ফোনটা রেখে দিলেন। আবার বেজে উঠল ফোনের রিংটোন। তখন হঠাৎ তার মনে হলো, এত ভোরে খুব জরুরি না হলে মামুনের ফোন করার কথা না। তাই বিরক্ত হলেও শুয়ে থেকেই ফোনটা ধরলেন সাদিক আলি।

কী হয়েছে মামুন? এত সকালে ফোন করেছ কেন?

অপর প্রান্ত থেকে জবাব এল, আমি মামুন না।

মামুনের ফোন থেকে ফোন করেছেন কেন? কে আপনি?

আপনি কি মামুনরে চিনেন?

হুঁ চিনি। মানে নার্সারির মামুন তো?

নার্সারির মামুন কি না কইতে পারি না। তবে নাম মামুন।

কী হয়েছে বলেন।

রাইতে ঝড়ের সময় একটা বড় গাছের ডাইল মামুনের উপর পড়ছে। মাথা ফাইটা গেছে। নাকমুখ দিয়া অনেক রক্ত পড়ছে।

সাদিক আলি মুহূর্তের মধ্যে শোয়া থেকে উঠে বসলেন। তার চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করলেন, মামুন এখন কোথায়?

আমি অরে হাসপাতালে নিয়া গেছিলাম। ভর্তি কইরা রাখছে। ওর মোবাইল থাইকা অনেকরে ফোন দিছি। কেউ ধরে না। আপনি ধরছেন।

মামুন এখন কেমন আছে?

ভালা না।

আপনি কে?

আমি রিকশা চালাই। ঝড়ের পর ধানমন্ডি লেকের পাড় দিয়া যাইতেছিলাম। রাস্তায় কিছুদূর পর পর গাছের ডাইলÑ এমনকি আস্ত গাছ পইড়া আছে। হঠাৎ কানে আইলো ‘আমি মইরা যাইতাছি। আমারে বাঁচান। আমারে বাঁচান।’ বিদ্যুৎ বাতি নাই। চাইরদিকে ঘুটঘুইট্যা আন্ধাইর। এরমধ্যে দেহি আট নম্বর ব্রিজের কোণায় বড় একটা গাছের ডাইল পইড়া আছে। আওয়াজটা মনে হইলো অইখান থেইকা আইতাছে। সামনে যাইতেই দেহি পনরো-ষোলো বছরের একটা পোলা গাছের ডাইলের নিচে আটকা পইড়া আছে। আমার চিৎকারে আরও দুই একজন আগাইয়া আইল। তাগোরে লইয়া পোলাডারে গাছের ডাইলের নিচ থেইকা বাইর কইরা আইনা ঢাকা মেডিক্যালে নিয়া যাই। ডাক্তার সাব অরে নাম জিগাইলে কইলো অর নাম মামুন।

মামুনের জ্ঞান আছে? মানে ও কথা বলতে পারছে?

হাসপাতাল নেওয়া পর্যন্ত কথা কইছে। হেরপর কথা কইব ক্যামনে? ব্যথায় তো কাতরাইতেছিল।

কথোপকথনের এপর্যায়ে লাইনটা কেটে গেল। ঢাকা মেডিকেলের কত নম্বর ওয়ার্ডে আছে, টাকা লাগবে কিনা, রক্ত লাগবে কি না, ওর বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে কি না-এসব কোনোকিছুই জানা হলো না। সাদিক আলি ফোন করলেন মামুনের নম্বরে। এখন ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কী অদ্ভুত লোকটা! এ অবস্থায় ফোন বন্ধ করে রাখল? নাকি ফোনের চার্জ শেষ? মনে হয় সেটাই হয়েছে।

মনটা অসম্ভব খারাপ হয়ে গেল সাদেক আলির। নিজেই উঠে গিয়ে চা বানালেন এবং চায়ের কাপ নিয়ে টেরেসে গিয়ে বসলেন। দেখলেন রাতের ঝড়ে দুই-তিনটা গাছ টবসহ উল্টে আছে। একটা বড় গাছ গোড়া থেকে উপড়ে গেছে। তবে বৃষ্টির পানিতে গাছগুলো আরও সবুজ ও সতেজ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন নার্সারিতে ঘুরে আর আগারগাঁওয়ের বৃক্ষমেলা থেকে গাছগুলো কিনেছিলেন তার স্ত্রী শাহানা বেগম। প্রতিটা গাছে তার হাতের স্পর্শ আছে। আঠারো মাস আগে ক্যানসারে মারা গেছে শাহানা। গাছগুলোকে নিজের সন্তানের মতো যত্ন করত সে। চেন্নাইতে অ্যাপোলো স্পেশালাইজড ক্যানসার হাসপাতালে মৃত্যুর আগে একদিন সাদিক আলিকে কাছে ডেকে বলেছিল, আমাদের তো কোনো সন্তান নাই। গাছগুলো আমার সন্তানের মতো। তুমি ওদের একটু যত্ন করো। মাঝেমধ্যে খোঁজখবর নিয়ো। ওদের সঙ্গে কথা বোলো। আমি প্রায়ই ওদের সঙ্গে কথা বলতাম। কার কী লাগবে জিজ্ঞেস করতাম। জানো, ওরা আমাকে সব বলত।

সাদিক আলি তখন মাথা নিচু করে স্ত্রীর বিছানার পাশে বসেছিলেন। কোনো কথার জবাব দিচ্ছিলেন না। তাঁর ধারণা হয়েছিল অসুস্থতার কারণে শাহানা প্রলাপ বকছে। গাছ আবার কথা বলে কীভাবে! কিন্তু এই একই কথা মামুনও বলত। একদিন সাদিক আলি দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন মামুন গাছের সঙ্গে কথা বলছে। জিজ্ঞেস করছে, কিরে তোর খবর কী? বড় হইবি ন! বাইট্টা হইয়া আর কতদিন থাকবি? আরেকটাকে জিজ্ঞেস করছে, রাগ করছস নি! অ্যাই, তোরে খাওয়া কম দিই রে? এর লাইগ্যা তুই রাগ কইরা ফুল দেস না? আইচ্ছা ঠিক আছে, কাইল থেইকা তোরে ঠিকমতো খাওয়ামু।

বিস্মিত সাদিক আলি এগিয়ে গিয়ে মামুনকে বলেছিলেন, এসব কী হচ্ছে মামুন! গাছের সঙ্গে কথা বলছ?

একটু বোধহয় লজ্জা পেয়েছিল মামুন। সাদিক আলির হঠাৎ প্রশ্নে থমকে গিয়েছিল। ধাতস্থ হয়ে জবাব দিল, স্যার, গাছের সাথে কথা বলি। ওগো খোঁজখবর নিতে হয় না? কার কী লাগব জানতে হয় তো!

সাদিক আলি আর কোনো কথা না বলে ঘরের ভেতর চলে গিয়েছিলেন। শাহানার কথা মনে পড়েছিল তার। শাহানা তো তাহলে প্রলাপ বকেনি। একই কথা তো সেও বলত। শাহানার কথা মনে হলে সাদিকের আর কোনোকিছু ভালো লাগে না। লাইট নিভিয়ে অন্ধকার ঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকেন। আর প্রার্থনা করেন, ক্যানসারে যেন কারও কোনো আপনজনের মৃত্যু না ঘটে। শেষ তিন মাস শাহানার কষ্টগুলো তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার। প্রথম চার মাস চিকিৎসা চলেছিল সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে। ক্যানসার ধরা পড়েছিল চতুর্থ পর্যায়ে। দুটি কেমোর পর শাহানা আর কেমো নিতে পারেনি। ওরাল কেমো নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল দেশে। এরপর এক মাস স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার পর চেন্নাই নিয়ে গিয়েছিলেন সাদিক আলি। শাহানার ফুপাত ভাই বলেছিল তার একবন্ধু চেন্নাই অ্যাপোলোতে চিকিৎসা করে ভালো আছে। শাহানা তাই চেন্নাই যেতে চেয়েছিল। বাঁচার জন্য কী ব্যাকুলতা ছিল বেচারির। আহারে!

সাদিক জানতেন পৃথিবীর কোনো হাসপাতালেই শাহানার চিকিৎসা করে লাভ হবে না। শুধু অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে। তারপরও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. এস কে সিনহাকে শাহানার ইচ্ছার কথা সাদিক বলেছিলেন। সব শুনে ডা. সিনহা বলেছিলেন, আপনার স্ত্রী যখন চাচ্ছেন নিয়ে যান। তাছাড়া মিরাকল বলেও একটা শব্দ মেডিক্যাল সাইন্সে আছে। কাজেই মানসিক সান্ত¡নার জন্য হলেও নিয়ে যেতে পারেন।

সাদিক আলি তিন দিনের মধ্যে সব ব্যবস্থা করে শাহানাকে নিয়ে রওনা হয়েছিলেন চেন্নাই। কোনো লাভ হয়নি। ২৯দিন পর কফিনবন্দি হয়ে ফিরে এসেছিল শাহানা।

শাহানা চলে যাওয়ার পর সাদিক নিজ হাতে টেরেসে তার রেখে যাওয়া ৭৩টি গাছের যতœ নিতে থাকেন। এসব গাছের মধ্যে আছে পাতাবাহার, মানিপ্ল্যান্ট, বনসাই, ছোট পাম গাছ, গোলাপ, বেলি, কামিনী, রঙ্গন, রজনীগন্ধা, দোলনচাঁপা ইত্যাদি। বেশির ভাগই নানাধরনের ফুলগাছ ও পাতাবাহার। কিছু ফলগাছও আছে। ফলগাছগুলো লাগানো হয়েছে বড় সাইজের কাটা ড্রামে। বড় কিছু সিমেন্টের টবও বানানো হয়েছে ফলগাছের জন্য। এগুলো সবই কলমের গাছ। সারা বছরই নানা রকমের ফল আর ফুলে ভরে থাকে গাছগুলো। আতাফল, জামরুল, মিষ্টি জলপাই, থাই পেয়ারা, দুজাতের কামরাঙা, তিন ধরনের আম, ডালিম, আনার, আমড়া, করমচা কত রকমের গাছ যে লাগিয়েছে শাহানা। বাতাবিলেবুর গাছ আছে দুটি। বাজারের কেনা লেবু নয়, ওর পছন্দ ছিল নিজের গাছের লেবু। খেতে বসে কতদিন যে ছুটে গেছে গাছের কাছে- একটা লেবু ছিঁড়ে এনে রসটা মাখিয়ে নিয়েছে পাতে। একটা মিষ্টি সৌরভ তখন ছড়িয়ে পড়ত খাবার টেবিলজুড়ে।

ফুলের মধ্যে দোলনচাঁপা শাহানার খুব পছন্দের ছিল। একবার দোলনচাঁপা গাছে ফুল ফুটলে শাহানার আনন্দের সীমা ছিল না। সেদিন সাদিক আলি বাইরে থেকে বাসায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তাকে জোর করে শাহানা নিয়ে গিয়েছিল টেরেসে। বলেছিল, দেখো কী সুন্দর ফুল ফুটেছে! দোলনচাঁপার সুবাস পাচ্ছ তুমি? আমার কয়েকটা ছবি তুলে দাওনা ফুলের সঙ্গে। শোনো কাল আরও দুইটা দোলনচাঁপার গাছ কিনে আনব।

সাদিক তার মোবাইল দিয়ে কয়েকটা ছবি তুলেছিলেন। শাহানা নানাভাবে ফুলের সঙ্গে পোজ দিয়েছিল। সাদিক সেদিন মুগ্ধ হয়ে শাহানার ছেলেমানুষি দেখেছিলেন। ছবিগুলো তার মোবাইলে এখনও আছে। খুব মন খারাপ হলে একা একা সেগুলো দেখেন তিনি।

মনে পড়ে, পরদিন সকালেই শাহানা আরও দুইটা না, চারটা দোলনচাঁপা কিনে আনল। নিজ হাতে গাছগুলো টবে লাগিয়েছিল। শাহানার মৃত্যুর কিছুদিন পর সবগুলো দোলনচাঁপায় একসঙ্গে ফুল ফুটল। সাদিক দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন আর চোখের জল মুছেছিলেন। মনে মনে তখন ভেবেছিলেন, শাহানা দেখলে কতই না খুশি হতো!

অনেকদিন পর টেরেসে বসে চা খেতে খেতে পুরোনো কথাগুলো মনে পড়ছিল সাদিকের। শাহানা এবং তিনি প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে বসে একসঙ্গে চা খেতেন।

মনে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে প্রায় প্রতিদিন এতগুলো গাছের যত্ন নিতে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই হাঁপিয়ে উঠেছিলেন সাদিক। রহিমার মার বয়স হয়েছে। সেও ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। গাছে পানি দিতে বললে টব ভর্তি করে পানি ঢেলে দেয়। আবার পানি বেশি দেওয়ার কথা বললে পরদিন এতই কম পানি দেয় যে টবের শুকনা মাটিও ভালোভাবে ভিজে না। গাছগুলো যেন পানিশূন্যতায় নেতিয়ে পড়ে। শাহানা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে একদিন বলেছিল, অতিরিক্ত পানি দেবে না। বেশি পানি দিলে গাছ মরে যাবে। মাঝে মাঝে নার্সারি থেকে সার এনে দেবে। সার হচ্ছে গাছের খাবার। ঠিকমতো খাবার না দিলে ওদের অবস্থাও একদিন আমার মতো হবে। সাদিক মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল, তুমি কি না খেয়ে অসুস্থ হয়েছ?

শাহানা তখন অসহায়ভাবে তার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। সাদিক বুঝতে পেরেছিলেন এভাবে কথাটা না বললেও পারতেন তিনি।

শাহানা বলেছিল, আমি না খেয়ে অসুস্থ হব কেন? আমি শুধু আমার অসুস্থতার সঙ্গে গাছের অসুস্থতার তুলনা করেছি। আমি তো মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। অসুস্থ মানুষের কথায় কিছু মনে কোরো না প্লিজ।

সাদিক আর কোনো কথা বলেন নি সেদিন। আজকাল এসব তাঁর প্রায়ই মনে পড়ে।

কিছুদিন পর সাদিক লক্ষ করেছিলেন বেশ কয়েকটি গাছের পাতা হলুদ হয়ে আসছে। কোনো কোনো গাছ নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। অনেকদিন হলো কোনো গাছেই ফুল ফুটছে না। পাতাবাহারের পাতা শুকিয়ে যাচ্ছে। সাদিক তখন চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ শাহানাকে তিনি কথা দিয়েছিলেন গাছগুলো যত্ন করে রাখবেন।

একদিন ধানমন্ডির নয় নম্বর রোডে পুলিশ ফাঁড়ির উল্টোদিকে একটা নার্সারিতে গিয়েছিলেন সাদিক আলি। কেননা শাহানা প্রায়ই এখান থেকে গাছ কিনত। পরিচয় দিতেই চিনেছিল নার্সারির মালিক ইদ্রিস আলি। শাহানার মৃত্যুর খবর শুনে খুব আফসোসও করেছিল সে। বলেছিল, আপা খুব ভালো মানুষ ছিল। গাছগাছালি খুব পছন্দ করত।

সাদিক আলি জানতে চেয়েছিলেন, কীভাবে গাছের যত্ন নিলে ভালো হয়? ইদ্রিস বলেছিল, স্যার আপনে পারবেন কীভাবে? যার যার কাম তারে দিয়া করাইতে হয়। এরপর মামুনকে ডেকে পরিচয় করে দিয়ে বলেছিল, সপ্তাহে দুই দিন ও আপনার বাড়িতে যাইয়া গাছের যত্ন করে আসব। মাসে অরে দুই হাজার টাকা দিবেন।

সাদিক আলি মুহূর্তের মধ্যে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন এবং ওইদিনই মামুনকে তার কলাবাগানের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। গাড়িতে উঠেই মামুন বলেছিল, আমি আফারে চিনি। আমারে খুব আদর করত। বলত, মামুন টবে মাটি কম দেবে না কিন্তু। বাসায় পৌঁছার পর মামুন ঘুরে ঘুরে গাছগুলো দেখে বলেছিল, অনেকদিন খাবার-খাদ্য ঠিকমতো পায় না। স্যার, চিন্তা কইরেন না, আমি সব ঠিক কইরা ফালামু।

মামুনের কথার মধ্যে কিছু একটা ছিল। প্রথম দিনই তাই সাদিক আলির ভালো লেগে গিয়েছিল ছেলেটাকে। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে ওর সঙ্গে একটা আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাঁর। ব্যক্তিগত নানা কথাও মামুন বলত সাদিককে। জানিয়েছিল বাবার হাত ধরে সাত বছর বয়সে সে ঢাকা এসেছিল। তার বাবা ওই নার্সারিতেই কাজ করত। হেড মালি ছিল। মামুন তার বাবাকে কাজে সহযোগিতা করত। গাছে পানি দিত। পুরোনো টব ঘষে মেজে পরিষ্কার করত। মাটির সঙ্গে সার মিশাত। বাবা তাকে গাছের কলম করাও শিখিয়েছিল।

একদিন গভীর রাতে মামুনের বাবার বুকে ব্যথা শুরু হয়। মামুনের বয়স তখন এগারো। মামুন কী করবে বুঝতে পারে না। পাশের বস্তিতে নার্সারির মালিক ইদ্রিস মিয়া থাকে। মামুন আর তার বাবা থাকে নার্সারির মধ্যেই ছোট্ট একটা টিনের ছাপড়ায়। মামুন দৌড়ে গিয়ে ইদ্রিস আলিকে ঘুম থেকে ডেকে নিয়ে আসে। তারপর দুজন মিলে ভ্যানের মধ্যে বাবাকে শুইয়ে হাসপাতালে রওনা হয়। এই ভ্যান তার বাবা চালাত। কেউ একসঙ্গে অনেক গাছ কিনলে ভ্যানে করে তার বাড়ি পৌঁছে দিত। আবার কখনও ভ্যানভর্তি করে মাটি আর শুকনো গোবর নিয়ে আসত নার্সারিতে। সেদিন সেই ভ্যান চালিয়েছিল ইদ্রিস আলি। মামুনের কোলে মাথা রেখেছিল তার বাবা। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়। মারা যাওয়ার আগে ইদ্রিসকে বলে যায় তার ছেলেকে যেন সে দেখে রাখে। তারপর থেকে মামুন ইদ্রিস আলির কাছেই আছে। ইদ্রিসও তাকে নিজের সন্তানের মতো দেখে। কথাগুলো বলতে গিয়ে একপর্যায়ে মামুন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। সাদিক আলি তাকে সান্ত¡না দিয়েছিলেন। কান্নারত অবস্থায় মামুন বলেছিল, স্যার আমার বাপে কইত গাছেরও জীবন আছে। তাই ঠিকমতো তাদের খাওন দিতে হইব। আদর যতœ করতে হইব। গাছ না বাঁচলে আমরাও বাঁচুম না। গাছের জীবনের সাথে নাকি আমাগো জীবনের সম্পর্ক আছে। আমি অবশ্যি এতসব বুঝি না। বাপে কইত আমি হুনতাম। সাদিক আলি লক্ষ করেছিলেন, কোন গাছে কখন সার দিতে হবে, কখন কীটনাশক স্প্রে করতে হবে- সব মামুনের মুখস্থ থাকত।

অল্প কিছুদিনের মধ্যে শাহানার মতো গাছগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল মামুনের। প্রতিসপ্তাহে মঙ্গল ও শুক্রবার আসত সে গাছের পরিচর্যা করতে। ওর হাতের আন্তরিক ছোঁয়ায় সবগুলো গাছ আবার তরতাজা হয়ে উঠেছিল। মামুন বলে দিতে পারত কোন গাছে কখন কলি আসবে, কখন ফুল ফুটবে। সাদিক আলির বন্ধুরা এ বাড়িতে এলে টেরেসে বসে আড্ডা দিতে পছন্দ করত। কেউ কেউ মামুনকে পঞ্চাশ-একশ’ টাকা টিপসও দিত। মামুন প্রথম প্রথম লজ্জায় টাকা নিতে চাইত না।

একদিন মামুন গাছের পরিচর্যা করছিল। একটু দূরে বসে চা পান করছিলেন সাদিক আলি। বিকেলে টেরেসে বসে এককাপ চা খাওয়া তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। মামুনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন সাদিক আলি, তোমার মার কথা মনে পড়ে না? মাকে দেখতে ইচ্ছা করে না?

মামুন বলেছিল, আমার বাপের ছিল দুই বিয়া। আমার বয়স যখন পাঁচ কি ছয় তখন আরেকটা বিয়া করে বাপে। এই নিয়া সব সময় ঝগড়া বিবাদ লাইগা থাকত। বছর যাইতে না যাইতেই মা আমারে বাপের কাছে রাইখা আরেক ব্যাডারে বিয়া করে। আমি খুব কান্নাকাটি করায় একদিন বাপ আমারে নিয়া গেছিল মার কাছে। দূর থেকে দেখায়া বলেছিল ওই বাড়িতে তর মায় থাকে। যা দেখা কইরা আয়। হেই বাড়িতে যাওনের পর…।

আমারে দেইখা মা জড়ায়া ধইরা বহুত কানছিল আর কইতাছিল, ‘বাপ আমার, তোর জন্য কইলজাটা ফাইটা যায়। তুই আইছস বাপ! তুই আইছস! আমি তোরে রাইখা চইলা আইছি। সোনা আমার, মানিক আমার!’ এরমধ্যে মার সঙ্গে যার বিয়া হইছে হেই ব্যাডা আইসা মার চুল টাইনা ধইরা এমন মাইর মারল যে মা আমার মাটিতে পইড়া গড়াগড়ি খাইতে শুরু করল। তাও মারন থামে না। আমি ভয়ে এক কোণায় দাঁড়ায়া ছিলাম। দ্যাখছিলাম মারে ব্যাডা গালিগালাজ করতাছে আর কইতাছেÑ ‘তোরে না বিয়ার আগে কইছিলাম পোলারে কোনোদিন এই বাড়িতে আনবি না?’ এরপর সামনে আইসা আমার দুইগালে সমানে থাপ্পড় মারতে থাকে হেই ব্যাডা। মা চিৎকার কইরা কয়, ‘বাজান তুই চইলা যা। তুই চইলা যা বাজান। অয় একটা পশু। অয় মানুষ না। তোরে মাইরা ফেলব।’ এরপর হেই ব্যাডা আবার গেছে মারে মারতে। সেই ফাঁকে আমি দৌড়ায়া পালাইয়া আইছি।

সাদিক আলি দেখেছিল, মামুনের দুই চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। তিনি বলেছিলেন, আজ আর কাজ করতে হবে না মামুন। তুমি চলে যাও।

মামুন নিজেকে সামলে নিয়ে তখন বলেছিল, কী কন স্যার! এহনো তো ম্যালা কাজ বাকি। একথা বলে সে গাছের পরিচর্যায় আবার মগ্ন হয়ে পড়েছিল।

চা খেতে খেতে এসব নানা কথা সাদিক আলির আজ মনে পড়ছে। মামুনের জন্য তার চিন্তা হচ্ছে। হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেন, সকাল সাড়ে ছয়টা বাজে। মামুনের খোঁজ নিতে এখন যে হাসপাতালে যাবেন তার কোনো উপায় নাই। আজ তার বিশ্ববিদ্যালয়ে কনভোকেশন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আসবেন। তাকে সকাল আটটার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছাতেই হবে। তিনি আহসান উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক।

কাজেই তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়তে হলো সাদিক আলিকে। রাস্তায় গাড়িতে বসে দুবার মামুনের মোবাইলে ফোন করলেন। ফোন বন্ধ। দুবারই মোবাইলে রেকর্ড করা নারীকণ্ঠ বলে উঠল, ‘এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়’।

সাদিক আলি বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছলেন পৌনে আটটায়। চারদিকে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। র‌্যাব, পুলিশ ও এসএসএফ গিজগিজ করছে। রাষ্ট্রপতির আসার কথা সকাল দশটায়, এলেন আধা ঘণ্টা পর। লিখিত বক্তব্যের বাইরে মাঝে মাঝেই তিনি কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় রসিকতা করছেন। তখন হলভর্তি সবাই হেসে উঠছে এবং হাততালি দিচ্ছে। তাঁর রসবোধ খুব ভালো। সাদিক আলী এইসব কোনো কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছেন না। তার বারবার মামুনের কথা মনে হচ্ছে। অথচ ছেলেটির কোনো খোঁজও নিতে পারছেন না। কেননা মোবাইল ফোন ব্যবহার করা এমন পরিস্থিতিতে নিষিদ্ধ। তাই আনমনা, তিনি রাষ্ট্রপতির কথা শুনে সবার দেখাদেখি হাততালি দিলেও সেই তালির কোনো শব্দ হচ্ছে না।

মামুনের জন্য সাদিক আলির দুশ্চিন্তা হচ্ছে। তিনি অপেক্ষা করছেন কখন মহামান্যের বক্তব্য শেষ হবে আর তিনি ছুটে যাবেন হাসপাতালে। কিন্তু সবকিছু শেষ হতে হতে দুপুর প্রায় একটা বেজে গেল।

আকাশে ঘন কালো মেঘ জমে চারদিক অন্ধকার হয়ে আছে। ভরদুপুরেও যেন ঘোর অমানিশা। সাদিক দ্রুত গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বললেন ঢাকা মেডিকেলে যেতে। এর মধ্যে শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। রাস্তায় প্রচ- ট্রাফিক জ্যাম। বৃষ্টির কারণে জ্যাম আরও বেড়ে গেছে। কাওরান বাজার সিগনালে গাড়ি দাঁড়ানো। সাদিক আলি মামুনের মোবাইল নম্বরে ফোন করলেন। এবার রিং বাজছে। অপরপ্রান্ত থেকে ফোন ধরে বলল, হ্যালো।

মনে হলো মামুনেরই কণ্ঠস্বর। সাদিক আলি বললেন, কেমন আছ মামুন?

ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জবাব এল, আমি মামুন না। স্যার, আমি ইদ্রিস আলি। মামুনের লাশ নিয়া অর গ্রামের বাড়ি যাইতাছি। সকাল দশটায় পোলাডা মারা গ্যাছে।

সাদিক আলি মোবাইল ফোন কানে ধরে আছেন। তাঁর গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। ইদ্রিস আলি ‘হ্যালো’ ‘হ্যালো’ বলেই যাচ্ছে। সাদিক আলির চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

লেখক : গল্পকার, প্রকাশক

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares