ডেথনোট : ধ্রুব এষ

গল্প

ডেথনোট

ধ্রুব এষ

যায়, চলে যায় বসন্তের দিন।

কেউ আর দেখে না, কখন হলুদ হয়ে যেতে থাকে পাতারা?

কেউ আর দেখে না, হলুদ পাতার দল উড়ছে?

কেউ আর দেখে না, হলুদ পাতারা উড়ে কোন হলুদ দূরপুরে যায়?

অথচ সব গল্পই হলুদ পাতার।

অথচ কয়টা হলুদ পাতার গল্প কে লিখে?

হলুদ পাতা হলুদ সাবমেরিন হয়ে যায়। আমরা থাকি একটা হলুদ রঙের সাবমেরিনে।

We all live in a yellow submarine
Yellow submarine, yellow submarine
We all live in a yellow submarine
Yellow submarine, yellow submarine
−Beatles

হলুদ রঙের পাতা কী করে হলুদ রঙের সাবমেরিন হয়ে যায়?

ইয়েলো ডুবোজাহাজ!

গল্প। স্টোরি।

দিনে কয়টা গল্প লেখা যায়?

আট-নয় পৃষ্ঠার হলে একটা।

স্ট্রেস কম পড়ে না তাতেও। অবসাদ। বড় গল্প ধরলে অবস্থা আরও ভয়ংকর। আগে এত স্ট্রেস পড়ত না এবং স্ট্রেস কাটাতে বসতেও হতো না। বয়স হয়ে গেছে। এখন বসতেই হয় সন্ধ্যায়। লেখা হোক কিংবা না হোক। নিয়মিত দুই পেগ। কখনও কখনও তিন পেগ হয়ে যায়। সমস্যা নেই, ইকো বলেছে, কখনও কখনও আট পেগ হলেও কিছু না। ব্ল্যাক-আউট না হলেই হলো। কিংবা ব্ল্যাক-আউট হলেও বা কী?

ব্ল্যাক-আউট।

কত বছর আগে হয়েছিল একবার?

আঠার-উনিশ… বিশ বছর আগে। বিষ্ণুদের ছাদে। ইকো, মুজাহিদ, এনামুল, বিষ্ণু, রিয়াজ, রাব্বি, জিসান এবং আরও কেউ কেউ ছিল। এছাড়া আর কিছু মনে নেই। বিষ্ণু, বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী। এনামুল বলত, চ করব রতি। রাব্বি বলত, চক্কর বক্কর। খুন করা হয়েছে চক্কর বক্করকে। দুই বছর আগে। লিজ নেয়া তাদের শত্রুসম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত বাড়িটা বেদখল হয়ে গেছে এর মধ্যে। এলাকার ওয়ার্ড কমিশনার জড়িত। তপতী বৌদি একা কী করবেন? তেরো বছর তেরো দিনের দাম্পত্য, ছেলেপুলে তাদের হয়নি।

তেরো বছর তেরো দিন মনে আছে কারণ বিষ্ণুর লাশ শনাক্ত করে কান্নাহীন তপতী বৌদি এক আশ্চর্য বিষাদ গলায় নিয়ে বলেছিলেন, তেরো বছর তেরো দিনের সংসার। সন্তান-সন্ততি হয়নি। তাতেও তো আমাদের কোনো অপূর্ণতা ছিল না ভাই!

অপূর্ণতা কী? পূর্ণতা কী? তপতী বৌদি কেমন আছেন এখন? বাপের বাড়িতে গিয়ে উঠেছেন। পুরান ঢাকাতেই। রাজার দেউড়ি এলাকায়। চাকরি নিয়েছেন, বলেছিল কে। রাব্বির সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে? সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে রাব্বি। তপতী বৌদির বয়স কত হবে এখন? আটত্রিশ-উনচল্লিশ। মহিলা কি আর বিয়ে করবেন না? কষ্টকর একটা জীবন কাটাবেন? নাকি তার কষ্টকর মনে হচ্ছে না? কার কাছে যে কোনটা কষ্টকর মনে হয়।

মুজাহিদ আর রিয়াজ শেষ হয়ে গেছে। মুজাহিদ তিন কার্ড, রিয়াজ ইয়াবায়। মুজাহিদ স্টুডেন্ট লাইফ থেকেই জুয়ারি। তার পরিণতি জানত বন্ধুরা। বাপের সম্পত্তি ধ্বংস করেছে, বউ ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছে, ছেলেটাও ড্রাগ এডিক্টেড। স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়া যায়। কিন্তু রিয়াজ! কী করে সম্ভব? এই বয়সে কী করে কেউ আসক্ত হতে পারে ইয়াবায়? চার বছর আগে ধরেছিল। মরে যাচ্ছে এখন। যে কোনোদিন নিউজ হতে পারে, রিয়াজুর রশিদ এক্সপায়ার্ড।

এনামুল চা বাগানের ম্যানেজার। বিয়ে করেছে, বাবা হয়েছে, যথেষ্ট বিষয়-সম্পত্তি করেছে। আবার প্রেম করছে, আবার বিয়েও করবে। দূর-সম্পর্কের শালির সঙ্গে রিলেশন। আর কিছু জানে না বন্ধুরা। আইসোলেটেড হয়ে গেছে এনামুল। নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কাউকে ফোন করে না এবং কেউ ফোন করলেও ধরে না। এনামুলের বউ নিশাত ভাবি ডেট করেন তার কাজিনের সঙ্গে। ক্লাবে দেখা হয়েছিল। ভদ্রলোক দর্শনের অধ্যাপক। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ে পড়ান। বিপতœীক এবং ষাটোর্ধ্ব। গবেষণার কাজ নিয়ে দেশে এসেছেন। কয়েক মাস থাকবেন এবং গবেষণা করবেন। বর্তমানে নিশাত ভাবিকে নিয়ে গবেষণা করছেন। প্রাচীন শাস্ত্র প্রয়োগ করে দেখছেন। কিয়োর্কেগার্দের দর্শন নিয়ে অনেক ইন্টারেস্টিং কথা বলেছিলেন সেদিন।

ভালো আছে, অনেক ভালো আছে দুজন। রাব্বি এবং ইকো। রাব্বি প্রেসের ম্যানেজার। বাংলাবাজার এলাকার ‘নূর প্রিন্টার্স’, তেইশ বছর ধরে দেখাশোনা করছে। পার্মানেন্ট বোর্ডার বিউটি বোর্ডিংয়ের। ছেলেমেয়ে আর শাশুড়িকে নিয়ে তার বউ থাকে নড়াইলে। দ্যাশের বাড়ি। ষোল বছর আগে বিয়ে করেছে। বউকে ঢাকায় আনেনি একবারও। বন্ধুরা শুধু তার বউয়ের নামটা জানে এবং বিয়ের আগে ওঠানো একটা থ্রি-আর ফটোগ্রাফ দেখেছে। স্কুলড্রেস পরে ওঠানো ছবি। মফস্সলের স্নিগ্ধ একটা মেয়ে। রাব্বির ফুফু ভাইপোকে ছবিটা পোস্ট করে পাঠিয়েছিলেন। এই মেয়েটির সহিত তোমার বিবাহ দিতে মনস্থির করিয়াছি, বাপধন। তোমার পছন্দ হইবামাত্র জানাইবা।

পুলকিত রাব্বি কন্যার ছবিটা কয়েকদিন পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছিল। যাকে পেরেছে, দেখিয়েছে। মফস্সলের স্নিগ্ধ সেই মেয়েটার নাম ঝুমা। বিগত ষোল বছরে ঝুমা তিন সন্তানের জননী হয়েছে। দুই পুত্র, এক কন্যা। রাব্বি আরেকটা মেয়ে নিতে চায়, ব্যালেন্সের জন্য। ছেলে দুই, মেয়ে দুই। ঝুমা রাজি হচ্ছে না এখনও।

আর ইকো। বয়সের দিক থেকে বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র। আরও অনেক কিছুতেও সিনিয়র। সেসব কথা যত কম বলা যায়। সে তার নামের মতোই অদ্ভুত। ছেলের নাম ইকো রেখেছিলেন তার স্যোশালাইট রূপবতী মা। ছেলে হয়েছে বুদ্ধিজীবী। যা হয়, চূড়ান্ত ভ-। দেশের সংকটে চিন্তান্বিত হয় এবং কলাম লিখে পত্র-পত্রিকায়। টকশো, সেমিনার নিয়ে মহাব্যস্ত থাকে। চরিত্র? মোটামুটি সভ্য বাংলায় বলা যায় লম্পট। স্কুল লাইফেই বিয়ে করে ফেলেছিল। এক ছেলে, এক মেয়ে। তারা বড় হয়ে গেছে। ছেলেটা ফিল্ম মেকার, মেয়েটা পিয়ানিস্ট হয়েছে। মেয়ের দিক থেকে চার বছর আগেই নানা হয়ে গেছে ইকো। ছেলেরও বিয়ে দিয়ে দেবে এর মধ্যে। তাতে কী? স্বভাবচরিত্র কিছু পাল্টায়নি। ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট বাপের সূত্রে বিস্তর টাকাঅলা হয়ে জন্মেছে। প্রায় বিভিন্ন রিসোর্টে যায়। এ নিয়ে কোনো রাখ-ঢাকও নেই, ‘যাই, কী করব? আমার দরকার পড়ে। আমি যাই। কী করব?’

কিন্তু রিসোর্টে? টাকা খরচ করে?

‘অসুবিধা কী? কত টাকা যায় আর? গার্লফ্রেন্ড মেনটেইন করব? আমার অত সময় নেই, ভাই। আফটার অল আমার বউকে আমি এখনও ভালোবাসি।’

ঠিক। টিনএজে প্রেমে পড়েছিল, বিয়ে করেছে। আনা ভাবিকে এখনও ভালোবাসে ইকো। তার কিছু মেলানো যাবে না আসলে। আজব চরিত্র। নিয়মিত রেড এবং হোয়াইট ওয়াইন খায়। মাঝে মধ্যে সংবিদা মঞ্জরী। গাঁজার এক নাম যে সংবিদা মঞ্জরী, এটা সে-ই বলেছিল একদিন। আরেক নাম জয়া। মদের আরেক নাম ধান্যেশ্বরী। ধেনো, চোলাইয়ের। আবার ‘মাল’ শব্দটা ইংলিশ। এম ইউ এল এল (গটখখ)। অর্থ, মসলা সহযোগে প্রস্তুত উত্তেজক পানীয়। বিষ্ণুদের ছাদে এরকম অনেক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞানের কথা হতো। ইকো জ্ঞানী এবং রঙিন। দুপুরে ফোন করেছিল এই জ্ঞানী ও রঙদার ব্যক্তি, ‘অ্যাই টালটু, তুই কি বাসায় থাকবি অদ্য সন্ধ্যায়?’

এই বয়সে টালটু বলা যায় কাউকে? নাকি ডাকা যায়? কিন্তু এ হলো ইকো। তার পক্ষে সব সম্ভব।

‘থাকব। কেন?’

‘বাসায় থাকবি কেন? তোর বাসায় কি কেউ আসবে?’

‘না। কেউ আসার কথা না এখনও।’

‘তোর কোনও ফাইল?’

‘না।’

‘গুড।’

‘গুড কেন? কি হয়েছে?’

‘কিছু হয়নি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়… ইয়ে মানিক ফকির অ্যারাইভড। আজ স্পেশাল বাঁশি বাজাবে। তোর বাসায়।’

‘ঠিক আছে, আয়।’

‘মানিক ফকির বাঁশি নিয়ে আসবে, আমি ওয়াইন।’

‘কী?’

‘ওয়াইন, ওয়াইন। আমি দুই বোতল ওয়াইন নিয়ে আসব। তুই একটা রেড খাবি? তাহলে দুইটা রেড আনব। ওয়াইন টোস্ট করে ফকির বাঁশি বানাবে।’

ওয়াইন টোস্ট করে বাঁশি ফকির বানাবে? বানাক। বাউল ফকিররা বাঁশি বলে গাঁজার কল্কিকে। কিন্তু মানিক ফকির বাউল-ফকির না। খড়খড়ে গলা, গানও গায় না। ঠিক কী করে ইকোও জানে না। মিস্টিরিয়াস একটা ক্যারেকটার। থাকে ঝিনাইদহের ওদিকে কোথায়ও। কোনোদিন তার নিজের গল্প সে বলেনি। তবে লোকটা ইকোর মতো জ্ঞানী। দুই জ্ঞানী ব্যক্তির মেলা হয়েছে। আর একজন হলে গান হয়ে যেত, তিন জ্ঞানীর হলো মেলা ঢাকায় এসে…। কখন আসবে তারা? ইকো আর মানিক ফকির? সন্ধ্যায়? সন্ধ্যা কত ঘটিকায়? সন্ধ্যা হবে কখন? কতক্ষণ আর?

এখন বাজে পাঁচটা বেয়াল্লিশ। আজ সন্ধ্যা হবে ছয়টা আঠারো মিনিটে। পত্রিকায় লিখেছে। তারপর আসবে দুই জ্ঞানী।

বাঁশি আর ওয়াইন।

ইকোর ওয়াইনপ্রীতি সর্বজনবিদিত। গিফট পায় অনেক। ঘরভর্তি থাকে ওয়াইনের বোতলে। একশ পঁচিশ বছরের পুরনো এক বোতল ওয়াইন পেয়েছে কিছুদিন আগে। আয়োজন করে খাবে। উপলক্ষ্য খুঁজছে, উপলক্ষ্য আজই বানিয়ে নিতে পারে। আরও অনেক কিছুর মতো উপলক্ষ্য বের করার ক্ষেত্রেও সে একজন এক্সপার্ট হেডমাস্টার। বন্ধুদের নিয়ে শেষ সেলিব্রেট করেছে টিংকারের জ্বর সেরে গেছে বলে। টিংকার চিকুয়াহুয়া জাতের একটা কুকুর। ইকোর নাতনি শামায়লার পোষ্য।

ইকো বুড়ো হবে না কখনও।

সেলফোন বাজছে।

ঊপযড়

ঈধষষরহম…

আবার ইকো। কী হয়েছে?

‘বল।’

‘প্রোগ্রাম ক্যানসেল।’

‘অ।’

‘কেন ক্যানসেল জিজ্ঞেস করবি না?’

‘কেন?’

ইকো হাসল, ‘খিক! খিক! খিক! অসুখ। আত্মার গভীরতর অসুখ।’

‘বুঝেছি। মানিক ফকির আছে তোর সঙ্গে?’

‘ছিল, এইমাত্র বাইরে গেল। আমার ধারণা কনডম কিনতে গেছে শালা। খিক! খিক! খিক! আজ একটা দারুণ এক্সপেরিমেন্ট হবে। ফকিরকে নিয়ে যাচ্ছি রিসোর্টে। ব্যাটার ভণ্ডামি দেখি কতদূর।’

‘রিসোর্টে অ্যালাউ করবে ফকিরকে?’

‘আমার সঙ্গে যাচ্ছে না ও? নুমা যদি দেখে লাইক দেয় তবে একটা বিরাট এক্সাইটমেন্ট হবে। খিক! খিক! খিক!’

‘মানে কী? নুমা যদি দেখে লাইক দেয় মানে? কাকে লাইক দেবে? মানিক ফকিরকে? নুমা শোবে মানিক ফকিরের সঙ্গে?’

‘খিক! খিক! খিক! শোবে না, আই থিংক নুমা উড়বে। মানিক ফকির দ্বিতীয় আসমানে উড়িয়ে নিয়ে যাবে নুমাকে। চিন্তা করে দেখ একবার ব্যাপারটা। ফকিরের পারসপেকটিভ থেকে চিন্তা করে দেখ। নুমার পারসপেকটিভ থেকে চিন্তা করে দেখ। দুই শ্রেণি-চরিত্রের দুটো শরীর। মিলেমিশে এক হয়ে যাবে যখন! খিক! খিক! খিক! কী ঘটবে নুমা প্রমিজড ডিটেইল আমাকে বলবে।’

‘ডিটেইল বলবে মানে? কী ডিটেইল বলবে?’

‘এই ধর ফকির কিরকম ফোর প্লে করল…।’

‘তুই এসব শুনবি?’

‘শুনব না? কেন?’

‘তুই পারভার্ট!’

‘আমি পারভ্? আরে ব্যাটা এটা যদি নুমার আর্জ হয়?’

‘নুমার আর্জ!’

‘দেখ, আমি অনেকবার তোকে বলেছি, তুই ভুল সময়ে জন্মেছিস। তোর জন্মানো উচিত ছিল আঠারশ একান্ন কি বায়ান্ন খ্রিস্টাব্দে। বিরাট একটা ঐতিহাসিক ভুল হয়ে গেছে। আ.ব.ম দেওয়ানজিকে কখনও দেখেছিস? সাক্ষাৎ অবতার। সে কাল একটা ডেফ এন ডাম্ব মেয়ের সঙ্গে শুয়েছে জানিস? শোন ব্যাটা, নুমা নিজেই চায় এটা।’

‘নুমা চায়!’

‘নুমার সঙ্গে কথা বলবি তুই। নাম্বার দেব?’

‘না।’

‘আচ্ছা তুই…।’

‘কী? বল?’

‘তোর বয়স এখন কত?’

‘তোর কত?’

‘আমার কত তুই জানিস।’

‘তোর তিন বছর পরে আমার জন্ম। ঠিক তিন বছর।’

‘তবে?

‘তবে কী?’

‘কী আবার? তুই কি আর বিয়ে করবি না?’

‘না।’

‘পবিত্র গাভী! কেন?’

‘এই কি তোর সিরিয়াস কথা?’

‘তোর কী মনে হয়?’

‘কী মনে হবে? আমাকে এই সিরিয়াস কথাটা তুই আরও এক কোটি একবার বলেছিস।’

‘বলেছি। এক কোটি একবার বলেছি। এখন আবার বললাম। এক কোটি দুইবার হলো। এখন বল, তুই কেন আর বিয়ে করবি না? মমর সাথে তোর ব্রেকআপ হয়ে গেছে বলে?’

‘তুই কি মাতাল?’

‘না। এখন তুই কি বলবি আমি জানি। তারপরও বল।’

‘আমি অনেকবার তোকে বলেছি।’

‘আমি শুনেছি। হাস্যকর। আমার দাদি একটা কথা বলতেন। মেয়েলোকের হানা/ প্রথমে দেয় ফুলজল/ পরে দেয় টানা। তোর কি এখনও ধারণা মম তোকে ভালোবাসত? ভালোবাসলে কেউ এভাবে চলে যায়?’

‘ভালোবেসেও চলে যাওয়া যায়।’

‘ওল্ড কমন ডায়লগ, ডিয়ার। খিক! খিক! খিক! আচ্ছা, একটা সত্যি কথা বল তো? তোর কি ফিজিক্যাল ডিজায়ার নেই?’

‘হা! হা! হা!’

‘হাসবি না। তুই একবার আবেদ করিমকে মিট কর।’

‘সাইকিয়াট্রিস্ট?’

‘তোর কি মনে হয় না তোর কাউন্সেলিং দরকার?’

‘না।’

‘তাহলে তুই জাহান্নামে যা। গো টু হেল।’

বলে লাইন কেটে দিল ইকো। আজ তাহলে আর আসছে না সে। আসতে পারবে না। ভালো হয়েছে। গল্পটা তবে লিখে ফেলা যায়। সাত-আট পৃষ্ঠার একটা গল্প। ‘দৈনিক কালাকাল’ থেকে চেয়েছে। লিখে বসা যাবে নিশ্চিন্ত হয়ে। ক্যামিনো আছে ঘরে। মেহিকান টাকিলা। আর একটা অ্যাবসল্যুট ভোদকাও আছে। লেখা শেষ করে যেটা মনে হয়। সাত-আট পৃষ্ঠার একটা গল্প মানে গড়ে আড়াই-তিন হাজার শব্দ। পৃষ্ঠায় দেড় থেকে দুই হাজার ক্যারেক্টার। তেমন একটা পৃষ্ঠা একটানা লিখলে আঠার-বিশ মিনিট লাগে। আট পৃষ্ঠার জন্য তাহলে আট ইনটু বিশ, একশ ষাট মিনিট। মোটকথা চাইলে টানা তিন ঘণ্টায় লিখে ফেলা যায় একটা গল্প। টানা অবশ্য লেখা যায় না কখনও। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং অফ থাকলেও না। আজ যাবে? এখন যাবে?

এখন বাজে ছয়টা দুই। সূর্য আর ষোল মিনিট পর ডুববে। ঠিক ষোল মিনিট পর ডুববে? নিশ্চিত তারা? পত্রিকাঅলারা? দেখতে হবে। না, থাক। এখন লিখে ফেলতে হবে গল্পটা।

দক্ষিণে জানালা এই ঘরটার। রোদ পড়েছে জানালার শার্সিতে। কমলা রঙের রোদ। আজ কত তারিখ চৈত্রের? উনিশ না একুশ? প্রহর শেষের রাঙা আলোয় কেমন মায়াময় হয়ে আছে পৃথিবী।

‘প্রহর শেষের রাঙা আলোয়… এই কবিতাটার নাম কী বলেন তো?’

‘সেদিন চৈত্রমাস?’

‘কী?’

‘কবিতাটার নাম, সেদিন চৈত্রমাস?’

‘বুঝেছি। কোন বইয়ের কবিতা বলতে পারবেন?’

‘কোন বইয়ের? মানসী?’

‘মানসী! হি! হি! হি! মনে হলো আর বলে দিলেন, হ্যাঁ? এর চেয়ে সঞ্চয়িতার কথা বলতেন। বুদ্ধিমানের মতো হতো উত্তরটা। বোকা! এটা কোনো কবিতার বইতেই নেই। রবীন্দ্রনাথ এটা লিখেছিলেন ‘মালঞ্চ’ উপন্যাসে। এই চার লাইনই লিখেছিলেন। মনে থাকবে?’

‘মনে থাকবে, শ্রীমতী দূরদ্বীপবাসিনী।’

‘কিহ্হ!’

কার সঙ্গে এসব কথা বলেছিল কে? চৈত্রের এমন আর একটা বিকেলে? হয়ত গতকাল, হয়ত অনেক বছর আগের একদিন। চৈত্রের বিকেল। বসন্তের দিন। যায়, চলে যায় বসন্তের দিন। আর হলুদ পাতারা ওড়ে। আর হলুদ দূরপুরে যায়। আর হলুদ সাবমেরিন হয়।

যে বলেছিল, শ্রীমতী দূরদ্বীপবাসিনী, মম না সে, আর একজন।

মম।

কেমন আছে এখন মম? তার এখনকার জামাই তাকে ভালোবাসে অনেক? তিন বছর প্রেম করে তিন বছর সংসার, মাত্র ছয় বছরে ফুরিয়ে যায় সব? ভালোবাসা? কিছু অবশিষ্ট থাকে না মায়ারও?

অনেক অনেক মায়া জমা থাকে শুধু শ্রীমতী দূরদ্বীপবাসিনীর চোখের মণিতে?

আর কিছু?

না।

এত অবসাদ!

রাক্ষুসে অবসাদ।

যায়, চলে যায় হলুদ বসন্তের দিন।

কী হবে আর গল্প বানিয়ে!

হলুদপাতা কিংবা গল্প হয়ে যাওয়াটা বরং একটা ব্যাপার হতে পারে।

মানুষ থাকে না, গল্প থেকে যায়…।

আর কিছু?

লিখল না সে।

লেখা হলো না।

লেখক : কথাশিল্পী, প্রচ্ছদ শিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares