দুর্বোধ্য বুকের ঘ্রাণ : ইমতিয়ার শামীম

গল্প

দুর্বোধ্য বুকের ঘ্রাণ

ইমতিয়ার শামীম

গলির মোড়ে যে মিস্ত্রি ট্রানজিস্টর সারত, আমরা যাকে মিস্ত্রি কাকা বলে ডাকতাম, যার নাম কখনও আমাদের জানা হয়নি, মাসচারেক পর ফিরে এসে আমরা তার আর দেখা পাইনি। তখন ভারি বৃষ্টির দিন ছিল। মাঝেমধ্যে একফালি রোদ উঠলে ভারি ভালো লাগত। ইচ্ছে হতো আমরা সবাই রোদের দিকে পিঠ দিয়ে বসে গল্প করি আর মিস্ত্রি কাকার ট্রানজিস্টর শুনি। কিন্তু আমরা আর মিস্ত্রি কাকার দেখা পাইনি।

আমরা মানে আমি আর সোহেল ভাই; আমি আর লাবণী; আমি আর মা; আমি আর পূর্বা। খুব নিশ্চিত করেই বলতে পারি, আমরা আর তার দেখা পাইনি। পূর্বার তো মিস্ত্রি কাকার সঙ্গে পরিচয়ই ছিল না, আবারও দেখা হওয়ার তাই প্রশ্নই আসে না; কিন্তু আমি আর বাবাও হয়তো তাকে আর দেখিনি। অবশ্যি বাবার কথাটা নিশ্চিত করে বলতে পারব না। কারণ মাসচারেক পর গ্রাম থেকে ফিরে এসে বাবা আর আমি একবারও একসঙ্গে মোড়ের দিকে যাইনি। বাবা হয়তো গেছেন। হয়তো মিস্ত্রি কাকার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, কিংবা আর দেখা হয়নি; যদিও এ ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের মধ্যে কখনও কথা হয়নি। তবে আমরা মানে আমি আর সোহেল ভাই, আমি আর লাবণী, আমি আর মা, আমি আর পূর্বাÑ আমরা প্রত্যেকেই গলির মোড়ের মিস্ত্রিটাকে নিয়ে অনেক-অনেকবার নিজেদের মধ্যে কথা বলেছি, এখনও বলি, হয়তো ভবিষ্যতেও বলবÑ মাসচারেক পরে ফিরে এসে আমরা মিস্ত্রিটাকে আর কখনও দেখিনি।

খরখরে দুপুরে একটা কাক ডেকে উঠলে আমার এখন এই কথা মনে হয়, গলির মোড়ের মিস্ত্রি কাকা খুবই ভালো মানুষ। আমরা গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার কাজ দেখতাম। মিস্ত্রি কাকা আমাদের আইসক্রিম খাওয়াতো, বোনবোনি খাওয়াতো, কখনওবা চানাচুর খাওয়াতো। কয়েকবার সিঙ্গারাও কিনে এনে খাইয়েছে আমাদের। অজস্র ট্রানজিস্টর ছড়িয়েছিটিয়ে আছে তার দোকানজুড়ে। আছে মাইক, মাউথপিচ, ব্যাটারির বাক্স। এসবের বেশির ভাগই ভাঙাচোরা, কোনোটার আবার নাড়িভুঁড়ির মতো সব তার আর নাটবল্টু বেরিয়ে আছে। সারার জন্যে খোলার পর আর বোধহয় তা মিস্ত্রি কাকা আর সারতে পারেনি। অথবা সেগুলো একেবারেই অচল। ট্রানজিস্টরের ওই দোকান ছাড়া অন্য কোথাও মিস্ত্রি কাকাকে দেখলে তাকে আমরা আর চিনতে পারতাম না। বিরাট এক অপরিচিত প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো খানিকক্ষণ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো তাকে।

একদিন দুইদিন নয়- অনেকদিনই এরকম হয়েছে; স্কুলে যাওয়ার জন্যে আমি আর লাবণী বাসা থেকে বেরিয়ে হঠাৎ একটা দইনাচার ডাক শুনে থমকে দাঁড়িয়েছি, রাস্তার ধারের কড়ই গাছের মধ্যে আঁতিপাঁতি করে দইনাচার বাসা খুঁজছি। আর একজন আরেকজনের কাছ থেকে জেনে নিতে চাইছি, দইনাচার ডিম খাওয়া যায় কি না, সে ডিম কত বড় হয়, সে ডিম কি ভেজে খেতে হয় নাকি সিদ্ধ করে! কিংবা দইনাচার ডিম খেলে কি কোনো পাপ হতে পারে? মুনশি চাচা তো সেদিন বলল, সবচেয়ে ছোট কলেমাটাও যদি সোয়া একলাখ বার পড়া যায়, খোদা তা হলে মনের ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন; তাহলে আমরা কি এক লাখ পঁচিশ হাজার বার কলেমা তৈয়ব পড়লে দইনাচা হতে পারব? দইনাচা হওয়ার পর আবারও একলাখ পঁচিশ হাজার বার কলেমা তৈয়ব পড়ে মার কাছে ফিরে আসতে পারব তো? দইনাচা হলে বাংলা কিংবা আরবি বলা যায় তো?

আমরা এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ তখনই কে যেন পেছন থেকে বলল, কী করো তোমরা? গলাটা আমাদের চেনাচেনা মনে হলো, কিন্তু পেছন ফিরে তাকে দেখেও চিনতে পারলাম না। লোকটা তখন বলল, চলো, কারখানায় চলো- আইসক্রিম কিনে দেব, খেতে খেতে স্কুলের যাবা। তখন আমরা বুঝলাম, এ তো মিস্ত্রি কাকা! সে ছাড়া কে আর আমাদের আইসক্রিম কিনে দিতে চাইবে! আরেকবার এক বিকেল বেলায় ফুটবল খেলা দেখতে গেছি খাঁ সাহেবের মাঠে। ধানবান্ধি আর রহমতগঞ্জের সে কী ফাটাফাটি খেলা! আমি ধানবান্ধির সাপোর্টার আর সোহেল ভাই রহমতগঞ্জের সাপোর্টার। তবে সোহেল ভাই তো রহমতগঞ্জের ভুয়া সাপোর্টার- ওইটাকে সে কেন সাপোর্ট করে, সেটা আমি একটু-একটু বুঝি, রহমতগঞ্জের জাফরুল্লাহ কাকার মেয়ে আলেয়াকে মনে হয় সোহেল ভাই বেশ পছন্দ করে, স্কুল থেকে ফেরার সময় যতক্ষণ না রাস্তা আলাদা হয়, ততক্ষণ পেছন-পেছন যায়, আমি সঙ্গে থাকি বলে তারপর আর যেতে পারে না। আবার লাবণীর কাছে দেখি আলেয়ার গল্প শোনে। আমি আলেয়াকে নাম ধরে ডাকি, সোহেল ভাই সেটা পছন্দ করে না। বলে, তোর চেয়ে বয়সে বড় না? কী অদ্ভুত কথা! লাবণী তো আমার চেয়ে দেড় বছরের বড়ো, সোহেল ভাইও তো অনেক বড়ো- ওদের কি আমি আপনি করে বলি? আর আলেয়া তো লাবণীরই সঙ্গে পড়ে, ওকে আমি আপনি বলতে যাব কোন দুঃখে? ওকে যে আমি তুমি-তুমি করে বলি, তাই তো অনেক! বেশি চাপাচাপি করলে ব্যাপার গড়বড় হয়ে যাবে, লাবণীর সঙ্গে আলেয়া যে আমাদের বাসায় আসা-যাওয়া করে, তাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে; সোহেল ভাই তাই ব্যাপারটা চেপে গেছে। কিন্তু রহমতগঞ্জের সাপোর্টারই রয়েই গেছে। তা থাকুক, ওই নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নাই। কথা হলো খাঁ সাহেবের মাঠ এত বড় যে, ফুটবল খেলার মজাই আলাদা। ধানবান্ধির ফরোয়ার্ডে খেলে হায়দার ভাই, সে যে কী সুন্দর খেলে! আর বল একবার পেলে হলো, সেটা তার আর পা ছাড়া হয় না। সেদিনও তাই হলো, হায়দার ভাই ডিফেন্সের রোকন ভাইয়ের চালান দেয়া বল নিয়ে রহমতগঞ্জের সব খেলোয়ারকে ডজ দিয়ে বল নিয়ে গোলপোস্টের মধ্যে দিয়ে বের হয়ে গেল। এরকম হলো,- কেননা তার দুই দিন আগে কালিয়া হরিপুর বনাম রায়গঞ্জের খেলার সময় মারামারি লেগে জালটাল সব ছিঁড়ে গিয়েছিল। গোলপোস্টে তাই সেদিন কোনো জাল ছিল না। হায়দার ভাই গোলকিপারকে হামা বানিয়ে বল নিয়ে একেবারে ফর্সা গোলপোস্ট দিয়ে বেরিয়ে এলে আমরা ধানবান্ধির সাপোর্টাররা এতক্ষণ বন্ধ করে রাখা শ্বাসটুকু ছেড়ে কী যে চিক্কুর দিলাম, তা বুঝতে পারল কেবল রহমতগঞ্জের সাপোর্টাররা। তার পর তো সোহেল ভাই মুখটা চুন করে বসে থাকল, আর আমার লাফালাফি আরও বেড়ে গেল; ঠিক তখনই দেখি, এক লোক বাদামের একটা প্যাকেট নিয়ে আমাদের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলছে, বাদাম খাও- বাদাম খাও-। অচেনা একটা লোক বাদাম দিচ্ছে, তা খাওয়া ঠিক হবে কি না ভাবতে ভাবতে আমার লাফালাফি তখন বন্ধ হয়ে গেছে। এরই মধ্যে লোকটা আবার বলে উঠল, এত মানুষের ভিড়, তোমরা তো হারায়ে যাবা। খেলার পর আমার পিছে থাকবে, আমি এখান থেকে দোকানে যাব, তোমাদের বাড়িতে পৌঁছে দেব। আমি আর সোহেল ভাই তখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম- আরে, এতো আমাদের মিস্ত্রি কাকা! তা হলে সে-ও খেলা দেখতে আসে!

ওই মাসচারেক মিস্ত্রি কাকার কথা আমরা যে ভুলে গিয়েছিলাম, তা কিন্তু নয়। গ্রামে থাকার সময়েও আমাদের মিস্ত্রি কাকার কথা প্রতিদিন মনে হতো। ঠিক দুপুর হলেই মনে পড়ত। দুপুর হলে চুপচাপ বাসার কাউকে কিছু না বলে আমি আর লাবণী ঘর থেকে বেরিয়ে মিস্ত্রি কাকার কারখানার সামনে দাঁড়াতাম। মিস্ত্রি কাকাকে কিছু বলতে হতো না- তিনি আস্তে করে সবচেয়ে ভালো ট্রানজিস্টরটার নব ঘুরাতেন। সঙ্গে সঙ্গে কী দুর্দান্ত সব গান বাজতে শুরু করত। আমাদের বাবার কোনো ট্রানজিস্টর ছিল না। আমাদের বাসার পাশেই মোক্তার আবদুল হালিমের বাসা। মোক্তারপাড়া রেখে মানুষটা কেন যে আমাদের এই পাড়ায় এসে বাসা নিয়েছে, কারওরই তা জানা ছিল না। অন্তত আমার, সোহেল ভাই আর লাবণীর না। পূর্বাও জানত না। তাছাড়া পূর্বার তো এইসব জানারও কথা নয়। পূর্বা তো আমাদের সঙ্গে আছে মাত্র মাসচারেক হলো।

সত্যি বলতে কি,- মাসচারেক আগের কথা মনে হলে এখন ট্রানজিস্টরের কথাই প্রথম মনে পড়ে। সোহেল ভাই তো মিস্ত্রি কাকার ওই ট্রানজিস্টর সারানোর দোকানে বসে থেকেই ক্রিকেট খেলা শিখে ফেলল। তবে বুঝে আর করবে কি? বাড়িতে কি রেডিও আছে নাকি, যে কানের কাছে সেটা লাগিয়ে বসে বসে খেলা শুনবে? তাছাড়া এই পাড়ায় কি আর কেউ ক্রিকেট খেলে? সোহেল ভাই তাই গাছের ডাল কেটে ব্যাট বানিয়ে আমাকে তার খেলার সাঙাৎ করে মাঝেমধ্যে রাস্তার মধ্যে ক্রিকেট খেলার চেষ্টা চালায়। আর তা দেখে ভ্যানওয়ালারা ভ্যান থামিয়ে খোঁজখবর করে, এইটা কোন খেলা। তবে আমরা যে সব সময় ট্রানজিস্টর শোনার জন্যেই কেবল মিস্ত্রি কাকার দোকানে ঘুরঘুর করতাম, সেরকম না। যদিও অনেকদিনই আমার আর লাবণীর মনে হয়েছে, মিস্ত্রি কাকা আমাদের এত ভালোবাসে- তা হলে তার ভালো ট্রানজিস্টরগুলো না হোক, অতগুলো যে নষ্ট ট্রানজিস্টর পড়ে আছে, সেগুলোর ওপর ধুলো জমছে, সেগুলোর মধ্যে থেকে আমাদের তো একটা ঠিক করে দিলেও পারে! এরকম অদ্ভুত সব কথাবার্তা আমি আর লাবণী অনেক সময়ই মনে করি, পিঠোপিঠি ভাইবোন বলে একজন আরেকজনের কাছে বলেও ফেলি। এমনকি সোহেল ভাইও আমাদের কাছে অনেক সময় এইসব বলে ফেলে। যেমন, কয়েক মাস আগে সে একদিন ফস করে লাবণীকে বলে ফেলেছিল, আলেয়া আমাদের বোন হলে ভালোই হতো, না কি বলিস রে?

লাবণীটা এমন বোকা! উল্টো প্রশ্ন করেছিল, কেন, ভালো হতো কেন?

বাহ্, তোরা দুইজন একসঙ্গে স্কুলে আসাযাওয়া করতি। নিউমার্কেটে যেতি, নদীর পাড়ে যেতি।- গম্ভীর কণ্ঠে বললেও সোহেল ভাইয়ের গলা কাঁপছিল তিরতিরিয়ে; আমি দিব্যি বুঝতে পারছিলাম।

লাবণীটা এমন হাবার হাবা, ফস করে বলে ফেলেছিল, সে তো আমরা এখনও পারি। কিন্তু বোন হলে আলেয়াকে তুই কি আর কখনও বিয়ে করতে পারবি?

সোহেল ভাই ক্লাস টেনে পড়ে, লাবণী পড়ে ক্লাস এইটে আর আমি ক্লাস সিক্সে। কিন্তু কার সঙ্গে কার বিয়ে হতে পারে, এইটা আমরা ভালোই বুঝিÑ অবসরে যাওয়া হাবিব ব্যাংকের ম্যানেজারটা যে বছরখানেক আগে তার বাড়ির কাজের মেয়েকে বিয়ে করেছে, তা নিয়ে আমরা হাসাহাসিও করি। কেন করি, তা অবশ্যি ভালো করে বলতে পারব না। আসলে বড়োরা সবাই হাসাহাসি করে, তা থেকে আমরাও কেমনে যেন বুঝি, এইটা নিয়ে হাসাহাসি করলে ভালোই লাগে। একদিন আমরা জানতে পারি, সোহেল ভাইদের ক্লাসের উঁচু লম্বা ত্যাদর টাইপের কাদির ভাই একদিন নাকি রিটায়ার্ড ম্যানেজারটাকে সামনে পেয়ে মশকরা করেছিল, স্যার, আপনি নাকি কাজের মেয়েকে বিয়ে করেছেন? তখন লোকটা নাকি রেগেমেগে কাদির ভাইকে একটা চড় মেরে বলেছিল, তমিজ করে কথা বলো বদমাশ। সে আমার বধূ হয়।

তো সোহেল ভাইয়ের যখন পড়তে পড়তে আর ভালো লাগে না, তখন সে ঘরের দক্ষিণদিকের জানালা না হয় আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে গলা মোটা করে বলে ওঠে, তমিজ করে কথা বলো বদমাশ। সে আমার বধূ হয়।

শুনে আমি আর লাবণী বিছানার ওপর হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ি। আবার আমলাপাড়ার রিমা আপা বিয়ের আগের দিন আত্মহত্যা করেছিল, এমন ঘটনা মনে পড়ায় আমাদের হাসি আটকে আসে। বিয়ে ব্যাপারটাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। যদিও কেন মনে হয়, তাও ঠিক ভালো করে বলতে পারি না। তবে সবার সঙ্গে সবার যে বিয়ে হয় না, হওয়া সম্ভব না,- তেমন হলে লোকে যেমন হাসাহাসি করতে পারে, তেমনি অমন না হওয়ার দুঃখে কেউ আবার মরেও যেতে পারে- এ রকম একটা অনুভূতি আমাদের কাছে বিষয়টাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তাছাড়া বাবা-মার সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলতে গেলে তাদের চোখমুখ কেমন লম্বাটে আম হয়ে যায়, ঠোঁটগুলো কেমন আমসত্ত্ব হয়ে যায়, ফলে আমাদের খুব বেশি-বেশি করে মনে হয়, বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই লাবণী এমন একটা কথা বলে ফেললে আমি ঠোঁটমুখ চেপে বিষয়টাকে যত গুরুত্বপূর্ণই প্রমাণ করার চেষ্টা করি না কেন, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমার ৩২টা দাঁতই বেরিয়ে পড়ে। আর সোহেল ভাইও মনে হয় এরকম একটা মুহূর্তের জন্যেই অপেক্ষা করছিল, সাৎ করে লম্বা হাতটা বাড়িয়ে আমার ঘাড় ধরে এমনভাবে শিরা-উপশিরাগুলো চেপে ধরে যে, মনে হয় মরে যাব।

এরকম একটা ঘটনার দিন পনেরো বাদে খাঁ সাহেবের মাঠে ফুটবল খেলা ছিল চৌবাড়ি আর জয়নগরের। সকাল থেকেই আমি আর সোহেল ভাই সুযোগ খুঁজছি, কী করে বাসা থেকে সটকে পড়া যায়। ক্লাস তেমন হয় না বলে বাবা আর আমাদের তখন স্কুলে যেতে দেয় না। আমরা মাঝেমধ্যে রাস্তায় জয় বাংলার মিছিল দেখি- কিন্তু মা আবার মিছিলে আমাদের যেতে দেয় না। লাবণী উলের সোয়েটার বোনা শিখছে; সোহেল ভাই বুদ্ধি করে পাড়ার পাতকুয়া থেকে ঠান্ডা পানি এনে দেওয়ার নামে এদিক ওদিক আধা ঘণ্টা কাটিয়ে আসে। কিন্তু আমি কী করি! বারান্দায় বসে বসে দেখি কেমন একটু রোদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে দেয়াল বেয়ে। আমার তখন মনে হয় মিস্ত্রি কাকার দোকান থেকে একটু ঘুরে আসি।

পাড়ার ওই দোকানটা ছাড়া অন্য কোথাও গিয়ে আমরা বসতে পারতাম না। তাছাড়া অন্য কোনো দোকানদার আমাদের অত গুরুত্বপূর্ণ মনেই করত না। বাবা-চাচারা আড্ডা দেন ওই চায়ের দোকানটায়- বেশ খোলামেলা জায়গা সেটা, এখনও কেউ ঘরবাড়ি তোলেনি, তোলার সুযোগও নেই। মাঝেমধ্যে বাবাকে খাওয়ার টেবিলে মার কাছে বলতে শুনি, আমার চা খাওয়া বন্ধ করবে, তা এতই সোজা? বেদখল না হওয়া পর্যন্ত ওই এনিমি প্রপার্টি ওরকমই থাকবে আর আনসারের চায়ের দোকানটাও থাকবে। এই হিন্দুদের জায়গাজমির জন্যেই দেখবে এ পাড়ায় রায়ট বেধে যাবে একদিন।

রায়ট যে কী তা বুঝতে পারি না। হিন্দুদের সঙ্গে রায়টের কী সম্পর্ক, সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই দেখি, মা আকলিমার মাকে নিয়ে জাংলা থেকে লাউ পাড়বার জন্যে বাড়ির পেছন দিকে যাচ্ছে। দুপুর দুইটা পেরিয়ে গেছে, এখনও রান্না শেষ করতে পারেনি মা। আমি আর সোহেল ভাই তবুও সুরুৎ করে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ি। দুপুরের খাবারদাবার? সেজন্যে অপেক্ষা করলে আমাদের খেলা দেখা চাঙ্গে উঠবে। তাছাড়া চলবে। এখন যদি মিস্ত্রি কাকার দোকানের কাছে যাই, দুইভাই দুইটা সিঙ্গারা নিশ্চয়ই পাব। তারপর খাঁ সাহেবের মাঠে যেতে যেতে কয়েকটা আতা গাছ পড়বে, কাজী পেয়ারার গাছ পড়বে; এত কিছু হাতের কাছে পাওয়ার পরও যদি কারও খিদে পায়, ডাল-ভাতের লোভ হয়, মাছের জন্যে পরান কাঁদে আর সেসবের জন্যে খেলা দেখতে না গিয়ে বাড়ির মধ্যে বসে থাকে, তা হলে তার মতো অভাগা এই দুনিয়ায় আর কে আছে!

আমরা বাসা থেকে বেরুতে বেরুতেই একটা ফেরিওয়ালা সাৎ করে সামনে দিয়ে চলে যায়, আকাশ থেকে হঠাৎ করেই এক বালতি কালো মেঘ ঢলে পড়ে, আবার চকচকে ঝকঝকে পিতলের থালার মতো একটা সূর্য তার বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। কোত্থেকে একটা বিরাট মিছিল তীব্র বেগে এগিয়ে আসতে থাকে মূল রাস্তা বাদ দিয়ে এই গলি রাস্তার ভেতর। এমন বড় মিছিল আমরা দু’ভাই দেখেছিলাম নৌকা মার্কা ভোটে জেতার পর আর খুবই দুঃখ পেয়েছিলাম বাবা-মা আমাদের সেই মিছিলে যেতে দেয়নি বলে। না-হয় আমরা ছোটই, কিন্তু আমাদের গলা কি আর একেবারেই খারাপ? দৌড়াতেও তো আমরা কম পারি না। আর গাছে উঠে পোস্টার লাগাতে, পোস্টারের জন্যে দড়ি টাঙাতে আমরাও তো কম যাই না। তারপরও আমাদের সঙ্গে এই দুর্ব্যবহারের মানে পাই না। কী যে দুঃখ লাগে। বস্তিপাড়ার ইউসুফ আর মুনীর পরের দিন আমাদের দেয়া ঝালমুড়ি খেতে খেতে উত্তেজিত কণ্ঠে মিছিলের সঙ্গে এ-পাড়া ও-পাড়া ঘুরে বেড়ানোর গল্প শোনায়। শুনতে শুনতে মনে হয়, এমন শিক্ষিত মা-বাবা না থাকাই ভালো ছিল। ইউসুফ আর মুনীরদের মতো বাপ-মা থাকলে আমরা কত স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতাম! তখন অবশ্যি লেখাপড়াও করা হতো না, সুন্দর সুন্দর ছড়া-কবিতা-গল্পও আর পড়া হতো না। কিন্তু তাতে কি? তখন তো আমরাই কত গল্প করতাম। আর লেখাপড়া করলেও তো চাল-ডাল কিনেই খেতে হয়। বাজারেও যাওয়া লাগে। তা হলে কী দরকার এত কষ্ট করে লেখাপড়া করার? আমি আর সোহেল ভাই এখনও সেদিনের কথা মনে করে এইসব আক্ষেপ করতে থাকি। তবে এখন আক্ষেপ করব কি- এত বড় একটা মিছিলে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ সামনে পেয়েও সেটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকি।

তারপর মিছিলটা চলে যাওয়ার পর মিস্ত্রি কাকার দোকানের কাছে গিয়ে দেখি, সেখানেও আজ ভারী ভিড় জমে আছে। লোকজনের কেউ বলছে, ঘুরাওÑ ঘুরাও- দেখ, খবর কোনে হচ্ছে?

খবর এখন কোনোখানে নাই ভাই। বলছি তো- এখন বেলা বাজে পৌনে তিনটা, এই সময় আপনি এই খবর পাবেন কোথায়?

আকাশবাণী? আকাশবাণীতে একটু ঘুরায়ে দেখ দেখি।

নাই তো রে ভাই। আমি রেডিও-ট্রানজিস্টর নিয়ে পড়ে থাকি। আমি জানি না?

তা হলে কিছুই আর জানার উপায় নাই?

জানলেনই তোÑ বললাম না, পার্লামেন্ট ইয়াহিয়া থামায়া দিছে। পার্লামেন্ট বসবে না। আমাদের মুখের মধ্যে বুড়া আঙুল ধরায়ে দিছে।

ড্রেনের ধারে কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকি আমরা, মিস্ত্রি কাকার দোকানের সামনে পর্যন্ত আর পৌঁছাতে পারি না। সোহেল ভাই পাশের দোকানের জানালার কার্নিশে একটা পা ঠেকিয়ে রড ধরে কাকার মুখ দেখার চেষ্টা করে। তখন কে যেন ধমক মেরে তাকে নামতে বলে। একটা চওড়া হাসি দিয়ে সোহেল ভাই নেমে পড়ে সেখান থেকে। আজ আর আমাদের কপালে সিঙ্গারা খাওয়া নেই। আমি আমার পাতলুনটায় হাত মুছতে মুছতে পকেটে ঢুকিয়ে দিই। একটা পাঁচ পয়সা থাকলেও মন্দ হতো না, দুজনে নিশ্চিন্তে দুইটা বরফ কিনে খেতে পারতাম। তা যাক গে, আগেভাগে গিয়ে আমরা খাঁ সাহেবের মাঠের পশ্চিম কোণের কড়ি গাছটায় চড়ে বসব- আরামে খেলা দেখা যাবে তা হলে। তখনই কে যেন চরম দুঃসংবাদ শোনায়, তা হলে খাঁ সাহেবের মাঠে আজকে নৌকার মিটিং হবে?

তাই তো শুনলাম। মিছিলে তো ওই স্লোগানই দিল। ক্যান, শুনলেন না?

তা তো শুনলাম। তার মানে কি খেলা হবে না? চৌবাড়ি আর জয়নগরের খেলা ছিল না?

আরে ভাই, আপনি আছেন খেলা নিয়া! ঘরে ডাকাত পড়েছে, আর আপনি আছেন খেলা নিয়া!

কিভাবে কোথাকার কোন ঘরে ডাকাত পড়েছে, আমাদের পক্ষে তা জানা মুশকিল। তবে আমাদের মাথায় যে বারি পড়েছে, সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। চৌবাড়ি-জয়নগরের খেলা তা হলে সত্যিই হবে না! মিছিলটা তো আমাদের সামনে দিয়েই গেল, আর স্লোগানও শুনলাম বেশ স্পষ্ট। একচিলতে পথ আমাদের এই পাড়াতে আসা-যাওয়া করার। এই তো সেদিন পাশের ফাঁকা বাসাটা এক ব্যবসায়ী ভাড়া নিলো না রাস্তাটা একচিলতে বলে। বাসা নাকি ভারি পছন্দ হয়েছিল, কিন্তু তাদের আবার একটা গাড়ি আছে! সেই গাড়ি যদি এখানে নিয়ে এসে না রাখা যায়, তা হলে বাসা ভাড়া নিয়ে কী লাভ তাদের। শুনে মনে হয়েছিল, রাস্তাটা একটু বড় হলে ভালোই হতো। স্কুলে গিয়ে বলতে পারতাম, আমাদের পাশের বাসায় একজন গাড়িওয়ালা আছে। কিন্তু তার পরই মনে হয়েছিল, রাস্তাটা বড় না হয়ে ভালোই হয়েছে। রাস্তাটা দিয়ে বড় জোর একটা রিকশা কিংবা ঠেলাগাড়ি কোনোমতে যেতে পারে, উল্টো দিক থেকে আরেকটা ঢুকে পড়লে ভারি ঝামেলা হয়। রিকশা কিংবা ঠেলাগাড়ি কোনোটাই তাই সহজে এই রাস্তায় ঢোকে না। তাতে আমাদের ভালোই হয়েছে। মা আর তার পাড়াতো আপা-ভাবি- খালা-চাচিরা বিকেলে এই রাস্তা দিয়ে পা খেলাতে পারে। মিস্ত্রি কাকার দোকানের কাছে গিয়ে তাদের পায়ের গতি একটু শ্লথ হয়ে পড়ে। হয়তো তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গান শোনেনÑ তীরহারা ঢেউ আর নীড়হারা ঝড়…। আবার আমরা পাড়াতো ভায়েরাও কখনও-সখনও রাস্তায় নেমে পড়ি ডাংগুলি খেলতে। এমন একটা রাস্তা দিয়ে মিছিলটা যখন যাচ্ছিল, স্লোগান শুনব কি, চিপা রাস্তার দুই পাশের দেয়াল আর বাড়িঘরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসা স্লোগানের প্রতিধ্বনি শুনতেই ভালো লাগছিল আমাদের।

সেই মিছিল আর স্লোগান এমন এক ভয়ঙ্কর সংবাদ দিয়ে গেল, আর আমরা টেরও পেলাম না! আমি আর সোহেল ভাই একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাই। মিস্ত্রি কাকাকেও দেখার চেষ্টা করি। আশা করি, এখনই সব লোকজন সরে যাবে এখান থেকে। আমরা মিস্ত্রি কাকার বদ্ধ কারখানার ভেতরে গিয়ে বসব। দু’একটা ট্রানজিস্টর নাড়াচাড়া করব। জানতে চাইব, লাল রঙের এই ট্রানজিস্টরটা ঠিক করা যায় না? মিস্ত্রি কাকা তখন ওয়েল্ডিং মেশিনে কাজ করবেন বলে আমাদের কারখানার মধ্যে থেকে বের করে দেবেন সিঙ্গারার দোকানের দিকে। কিন্তু লোকজনের আজ সরে যাওয়ার নামগন্ধ নাই। পাড়ার লোকজন আজ মিস্ত্রি কাকার ট্রানজিস্টর শুনতে হামলে পড়েছে। তা হামলে না পড়ে উপায় আছে? এই পাড়ায় ট্রানজিস্টর একেবারে হাতেগোনা। একটা ট্রানজিস্টর আছে রউফ ভাইদের বাসাতে। সকালে সেই ট্রানজিস্টর বাজতে শুনলেই আমরা বুঝতে পারি, রউফ ভাই এখন অফিসে চলে গেছে, ভাবি বিছানায় আধশোয়া হয়ে ট্রানজিস্টর বাজাচ্ছে। আরেকটা ট্রানজিস্টর আছে অনেক গাছগাছালিওয়ালা সেই লোকটার বাড়িতে, যার কথা আমরা বোধহয় কেউই জানি না। আর জানার আগ্রহও হয় না। বাড়ির আশপাশে কাউকে দেখলেই লোকটা তেড়ে আসে। সোহেল ভাই তার নাম দিয়েছে খেউ খেউ দাদা। খেউ খেউ দাদার সেই ট্রানজিস্টর শুধু আমরা কেন, মনে হয় এই পাড়ার কারওরই শোনার ভাগ্য হয় নাই। সেটার অস্তিত্বের কথা আমরা জানতে পেরেছি তার ছেলের বউয়ের কাছ থেকে- গ্রামের খাঁটি সরিষার তেল পাওয়ার জন্যে সে আমাদের মায়ের সঙ্গে বেশ যোগাযোগ রাখে। তা হলে বাকি থাকে এই মিস্ত্রি চাচার ট্রানজিস্টর- এবং এটাই এখন সম্বল এই পাড়ার সবার। সিঙ্গারার দোকানেও সেদিন আর কোনো ভিড় দেখি না। বাবার বন্ধুদেরও দেখি ভিড় জমিয়েছে ট্রানজিস্টরের কারখানাতে। যেন একটা ট্রানজিস্টরই সব কিছু জানিয়ে দেবে।

তবে কথা হলো এই- এদিন থেকেই মনে হয় সব কিছু পাল্টে গেল; স্কুলে যাওয়া আমাদের লাটে উঠল। ট্রানজিস্টরের কারখানায় ভিড় থাকে বলে আমি আর সোহেল ভাই এখন পাড়া থেকে বেরিয়ে আনোয়ারা স মিলে গিয়ে কাঠের গুড়ির ওপর বসে থাকি। চারদিকে কাঠের গুঁড়ো, কাঠের কাঁচা ঘ্রাণ আর সার বেধে রাখা মৃত গাছের ওপর এসে পড়া সব জীবিত গাছের ছায়ার নিচে বসে বসে আমরা হাতের তালুর ওপর লাটিম ঘুরাই। কয়েকদিন হলো এই প্রতিযোগিতা চলছে আমাদের দুই ভায়ের ভেতর- কে কতক্ষণ হাতের তালুতে লাটিম ঘুরিয়ে রাখতে পারে। একটু একটু করে মনে হতে থাকে, একটা ঘড়ি আসলেই খুব- খুব প্রয়োজন। সোহেল ভাইয়ের হাত আমার থেকেও খানিকটা চওড়া, বেশির ভাগ সময়েই আমি তাই হেরে যেতে থাকি। কিন্তু কী এক অন্ধ স্পর্ধায় আমি বার বার তার সঙ্গে লড়ি আর রাস্তা দিয়ে মানুষজনের আসা যাওয়া দেখি, মিছিল দেখি। কোনো কোনো দিন অবাক হয়ে যাই, শুধু আমি নই- সোহেল ভাইও; আমাকে সে খোঁচা দিতে দিতে বলে, দ্যাখ, দ্যাখÑ আপারাও মিছিল করছে!

আপারা মানে আমাদের মাস্টার আপারা- শহরের কলেজের আপারা! আমরা উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠি আর গাছের গুঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে পড়ি। আপারা মিছিল করতে করতে চলে গেলে আমি হঠাৎ সোহেল ভাইকে প্রশ্ন করি, স্বাধীনতা কী রে?

স্বাধীনতা মানে স্বাধীন হয়ে যাওয়া- আমতা আমতা করে বলে সোহেল ভাই।

সেটাই তো বুঝতে চাইছি- স্বাধীন হওয়া কী?

এই যে পাকিস্তানিরা আছে না? ওদের খেদিয়ে দেওয়া?

আমরা যে অ্যাসেম্বলিতে গাই ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’,- সেইটা হঠাৎ আমার মনে পড়ে যায়। ভাইকে আমি বলি, আমরা পাকিস্তানি না?

না- না- আমরা তো বাঙালি। আমরা তো ওদের কাছ থেকে স্বাধীন হবো। ওদের তাড়িয়ে দেব। দেখছিস না, বাবাও আর অফিসে যায় না?

সোহেল ভাই লিডার-লিডার বেশ ভাব নিতে থাকে। আর আমারও ইচ্ছা করে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ওকে একটু ক্ষেপিয়ে তুলতে, কেন, তাড়াবো কেন? ওরা আর আমরা এক দেশের না?

একই দেশের ছিলাম- এখন আর নাই। কেন, সেদিন শুনলি না রেডিওতে শেখ মুজিব ভাষণ দিল- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম?

শুনেছি তো! সেই জন্যেই তো জানতে চাইছি- স্বাধীনতা কী?

শোন, স্বাধীনতা হলো- ধর, এখন আমরা ঠিক মতো চাকরি-বাকরি পাই না। পাকিস্তানিরাই সব নিয়ে নেয়। তখন আমরা চাকরি-বাকরি পাব। তারপর, ধর, একুশে ফেব্রুয়ারি, আমরা যে ফুল দিতে যাই- তখন পাকিস্তানিরা বলে পূজা দিতে যাচ্ছি, আসলে তো পূজা না, ভালোবাসা দিতে যাই, শ্রদ্ধা করতে যাই; কিন্তু সেটা ওরা কিছুতেই বোঝে না। তার পর ধর পহেলা বৈশাখের নববর্ষ- ওরা বলে, এটা নাকি হিন্দুদের নববর্ষ! দেশ স্বাধীন হলে এইটা থাকবে না, সবাই তখন শহিদ মিনারে যাবে, সবাই পহেলা বৈশাখ করবে…

কেন যেন আমার তা বিশ্বাস হয় না, আমি কপালে ভাঁজ ফেলে বলি, আমার কিন্তু তা মনে হয় না রে। কেন, খলিল চাচাকে দেখিস না? শহিদ মিনারের ওপর কেমন ক্ষ্যাপা? একুশে ফেব্রুয়ারির কথা শুনলে কেমন ক্ষেপে যায়?

ও তো আসলে মুসলিম লীগের- ভোটের আগে নৌকার জোয়ার দেখে ডিগবাজি দিয়েছে।

তা যত ডিগবাজিই দিক, এরা তো এখন নৌকার লোক। পাকিস্তানিদের তাড়ানোর পর এরাও তো থাকবে। এরা কি এসব মেনে নেবে?

সোহেল ভায়ের মুখে হঠাৎ কথা জোগায় না। তার পরই তড়বড়িয়ে বলতে থাকে, তা কেন হবে? পাকিস্তানিদের তাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এদেরও তাড়ানো হবে!

তা কী করে সম্ভব? এরা তো নৌকার লোক- আমিও গোঁ ধরে বলি। তার পরই কী ভেবে হঠাৎ বলে ফেলি, স্বাধীন হলে তুই আলেয়া আপাকে বিয়ে করতে পারবি নাকি?

সোহেল ভাই ভয়ানক ক্ষেপে উঠছিল, আবার তার চোখেমুখে একটু লালচে ভালো লাগার ছাপও জমেছিল, আবার আলেয়াকে আমি আপা বলছি বলে সে হয়তো খুব খুশিও হয়েছিল। কিন্তু তার পরও কেন যেন হঠাৎ অসম্ভব শান্ত হয়ে পড়ে সে, কেমন কম্পনহীন গলায় বলে ওঠে, কী যে বলিস না তুই! এই বিয়েশাদি, ঘরসংসার, খাওয়াদাওয়া, চাকরিবাকরি- এসবের চেয়ে স্বাধীনতা অনেক- অনেক বড় ব্যাপার রে। স্বাধীনতা এমন জিনিস- যার জন্যে মানুষ জীবন দিতে পারে।

আমি আবারও ত্যাদড়ের মতো বলি, কই- আমি, তুমি… আমরা কেউই তো জীবন দিচ্ছি না?

সোহেল ভাই আমার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলে, যেদিন স্বাধীনতা কী বুঝতে পারবি, সেদিন দেখবি, এই জীবনটা দিয়ে দেয়ার জন্যে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিস, জীবনটা যাচ্ছে না বলে নিজেকে ক্লিশে মনে হচ্ছে।

আমি সোহেল ভাইয়ের সেই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারি না, আবার হাতে ধরা লাটিমটা নিয়ে মেতে উঠতেও ইচ্ছে করে না। তাই জিজ্ঞেস করাও হয়ে ওঠে না, এই ‘ক্লিশে’ মানে কি, আর ওটা ও শিখল কোত্থেকে? কবিতার মধ্যে নাকি এরকম অদ্ভুত আর নতুন নতুন শব্দ পাওয়া যায়। সোহেল ভাই তা হলে কি কবিতা লিখতে শুরু করেছে? স-মিলের পেছনের ডোবায় গাছে বসা কোনো পাখি হয়তো একটা কিছু ফেলে আর আওয়াজ হয় টুব্বুস করে। আমি আমার মাথার মধ্যে তেমনই অর্থহীন টুব্বুস টুব্বুস আওয়াজ শুনতে থাকি। মিছিল আর স্লোগান ছোট এই শহরটার নির্জনতা গিলে খাচ্ছে। প্রতিটি মানুষই মনে হয় একেকটি মিছিল, একেকটি স্লোগান হয়ে উঠছে। রেলস্টেশন আর শহরের বিহারিগুলোকে মনে হচ্ছে হিংস্র ভয়ঙ্কর। আমরা আর বিহারী কলোনির দিকে যাই না। খুব ভয় করে যেতে। শেষ যেদিন গিয়েছিলাম, সেদিন দেখেছিলাম রাস্তার ধারে বসে বসে এক বিহারি একের পর এক রামদা আর ছুরি ধার দিচ্ছে। বাবাকে দেখি প্রতিদিন এর-ওর সঙ্গে এইসব তর্কাতর্কি করতে, এর পরও পাকিস্তানের সঙ্গে কি একসঙ্গে থাকা সম্ভব? ওরা ছয়দফা মেনে নিলেও কি থাকা সম্ভব?

মার কান্নাকাটির শব্দ শুনে একদিন সাতসকালে আমার ঘুম ভেঙে যায়। ধড়মড়িয়ে উঠে বসে দেখি, সোহেল ভাইও বিছানায় নেই। খোলা দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে, লাবণীও মাকে জড়িয়ে ধরে ফোস্ ফোস্ করে চোখ মুছছে। এরকম এক করুণ পরিস্থিতিতে আমার লুঙ্গিটা কি না উরুর কাছে কুচিমুচি খেয়ে আছে! আমি তাড়াতাড়ি লুঙ্গি ঠিক করে মাঝের ঘরে যাই। আর আমাকে দেখে মায়ের কান্নার বেগ আরও বেড়ে যায়, ‘আমার কাছে বলতো, বুবু, মাসুদকে ঠিক আমার মতো দেখা যায়’- বলে মা আরও জোরে জোরে কাঁদতে থাকে। আমি বুঝতে পারি, মামাকে নিয়ে কথা হচ্ছে, মামা আর আমার চেহারায় নাকি ভীষণ রকম মিল। কিন্তু তা নিয়ে কান্নাকাটির কী আছে! বাবাকে খুব অসহায় লাগে, দুই হাত ঝাঁকিয়ে বাবা শুধু বলে, আহ্, তুমি ধরে নিচ্ছো কেন, ও মরেই গেছে?

কারফিউ দিয়ে সারারাত ধরে মেরেছে, আর তুমি আমাকে সান্ত¡না দিচ্ছো?

মার কণ্ঠ ভারী তীক্ষ্ণ শোনায়। সোহেল ভাইকে কোনোখানে খুঁজে পাই না। কী ঘটছে তাও বুঝতে পারি না। আশপাশের বাড়িঘরগুলোও কেমন নিস্তব্ধ। বাসা থেকে বেরিয়ে আমি গলির মোড়ের দিকে হাঁটতে থাকি। মিস্ত্রি কাকার কারখানা এখনও খোলে নাই। তারপরও লোকজন সেখানে ভিড় জমাচ্ছে ট্রানজিস্টর শুনবে বলে।

আরও অনেক পরে সোহেল ভাইকে দেখি- প্রায় দৌড়ে দৌড়ে আসছে সে। আমাকে বিছানায় রেখেই সে নাকি খোঁজখবর জানতে সাতসকালে চলে গিয়েছিল কলেজ হোস্টেলে। ছাত্ররা থানা থেকে সব অস্ত্র নিয়ে এসেছে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। মা যে অমন হাউমাউ করে কাঁদছে, তার কারণও আছে। ঢাকায় পাকিস্তানি আর্মিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ঢুকে খুঁজে খুঁজে বের করে ছাত্রদের মারছে। তবে এখানে সব কিছু এখনও শান্তই আছে। ছাত্রদের একটি দল বিহারি কলোনির সামনে পাহারা বসিয়েছে। বিহারিরা কলোনির মধ্যে থেকে মাঝেমধ্যে তাদের লক্ষ্য করে পটকা বোমা ছুড়ে মারছে। গুলিও নাকি ছুড়েছিল একবার। তবে এখন দুই পক্ষই অপেক্ষা করছে, প্রতিপক্ষের গোলাগুলি শেষ হবে কখন।

মিস্ত্রি কাকার ট্রানজিস্টরে সেদিন কোনো সেন্টার খুঁজে পাওয়া যায় না। আকাশবাণী সামান্য একটু খবরÑ আমাদের জানা খবরের সঙ্গে তার কোনো পার্থক্য নাই। মিস্ত্রি কাকার কারখানা তাই ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়। আর আমরা দুইভাই অনেকদিন পর সেখানকার বেঞ্চটাতে আরাম করে বসি। লাল অকেজো ট্রানজিস্টরটার দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আজ কেন যেন বলেই ফেলি, ওইটা সারতে পারেন না? ওইটা সেরে আমাদের দিয়ে দ্যান। এত লোকজন আসে আপনার দোকানে এখন! আমরা তো ধারেকাছেই আসতে পারি না।

মিস্ত্রি কাকা হেসে ফেলেন। এই সবুজ পাঞ্জাবিটায় তাকে কতদিন হলো দেখছি আমরা! লোকটার কি তা হলে অন্য কোনো জামাকাপড় নেই? মেরামতের কাজ তো খুব বেশি পায় না। কয়টা ট্রানজিস্টরই বা আছে এ শহরটাতে! নতুন ট্রানজিস্টরের একটা দোকান আছে অবশ্যি, কিন্তু ওই দোকানে তো নাটবল্টু, স্প্রিং, তারকাটা থেকে শুরু করে হাজার রকম খুচরা যন্ত্রপাতিও বিক্রি হয়। মিস্ত্রি কাকা নিজেই তো মাঝেমধ্যে হাসতে হাসতে বলে, মেয়ের বিয়ে ঠিক না হলে কেউ নাকি রেডিও কেনে না। তা লাবণীর কবে বিয়ে হবে, বাবা কি সেই জন্যে ট্রানজিস্টর না কিনে বসে থাকবে? তাছাড়া কেমন চাকরিই বা করে বাবা, একটা ট্রানজিস্টর কিনতে পারে না! আমি হঠাৎ বেঞ্চি থেকে নেমে মিস্ত্রি কাকার নোংরা মাটির মেঝেতে শুয়ে পড়ি দুই হাত দিয়ে দুই কান চেপে। তার পর অনুভব করার চেষ্টা করি, ১২ ব্যান্ডের না হোক তিন ব্যান্ডের একটি রেডিও এক ফ্রিকোয়েন্সি থেকে আরেক ফ্রিকোয়েন্সিতে যাওয়ার মাঝখানের অগোছালো আওয়াজ আর একেকটি নতুন ভাষা। কিন্তু মিস্ত্রি কাকা তা বোধহয় ঠিক টের পায় না, শশব্যস্ত হয়ে সে আমাকে মাটির ওপর থেকে টেনে তোলে আর বলে, আরে, কী করো ভাতিজা। দেব তো, তোমাকে লাল ট্রানজিস্টরটা ঠিক করে দেব তো!

তারপর বেশিদিন হয় না- মাসখানেক পরেই শহর ছেড়ে চলে যাই আমরা। তার দুইদিন আগে শহরে পাকিস্তানি আর্মি আসে। মুহুর্মুহু গোলাগুলি হতে থাকে। কোথায় যেন বোমাও পড়ে। রাস্তায় রাস্তায় বিকট ভয়ঙ্কর উল্লাস নিয়ে ঘুরতে থাকে বিহারির দল। এত চিৎকার এ শহরে এর আগে আর কখনও শুনি নাই। সোহেল ভাই, লাবণী কিংবা মা-বাবাÑ কে না জানে, আমাদের বাড়ির পেছনে পৌরসভার পুকুরের ধারে ভাট আর মর্টার গাছের ভিড়ে ন্যাংটো মাটির ওপর দিনরাত শুয়ে থেকে পাখিদের সঙ্গে কথা বলতে আমার কী যে ভালো লাগে! তাই বলে দুই রাত দুই দিন ওয়াপদার পুকুরের ধারঘেঁষা জঙ্গলে পালিয়ে থাকতে হবে, তা আমি জীবনেও ভাবি নাই। কোনো গাছে আমি তখন কোনো পাখি খুঁজে পাই নাই, কোনো পাতায় কোনো সবুজে ডোবা নীরবতা পাই নাই। তবে হ্যাঁ, বহুদিন পরে ওই দুই রাতে আমরা তিন ভাইবোন আবারও বাবার বুকের ঘ্রাণ ফিরে পাই; কেননা যতবারই গোলাগুলি হয় ততবারই বাবা ত্রস্তে আমাদের তিন ভাইবোনকে তার বুকের মধ্যে টেনে নেন। পূর্বাকে আগলে রাখে মা। পূর্বা আমার ক্লাসেই পড়ে, শুধু এটুকুই জানি। ও তো আর আলেয়ার মতো লাবণীর সঙ্গে পড়ে না যে ওর মা-বাবা কে, তারা কী করে, কোন পাড়ায় থাকে তা আগে থেকেই আমার জানা থাকবে! আর্মিরা যে রাতে এলো, সে রাতেই কোত্থেকে চিৎকার করতে করতে এসে আমাদের বাসায় ঢুকে পড়ে সে; পাড়ার কোনোখানে আলো নেই, অন্ধকারে তাকে আমরা আগলে রাখি বটে, কিন্তু তাকে চিনতে পারি না। পরে তাকে আমি চিনতে পারি বটে, কিন্তু তার সম্পর্কে কিছুই বলতে পারি না।

হতে পারে, ওই দুই রাতের পর গলির মোড়ে গেলে হয়তো মিস্ত্রি কাকাকে আমরা দেখতে পেতাম, কিংবা আর দেখতে পেতাম না। অনুমান করে কোনো কিছু বলা তো ঠিক হবে না; সত্যি হলো, মাস চারেক পরে ফিরে এসে আমরা দেখতে পেয়েছি, দোকানটা তছনছ হয়ে গেছে, মিস্ত্রি কাকা বলে কারও অস্তিত্ব সেখানে ছিল বলে মনে হয় না। ব্যাপারটি জানতে আমাদের হয়তো আরও অনেক দেরি হতো- কেননা মা-বাবার তো ইচ্ছাই ছিল না গ্রাম থেকে আবার শহরে আসার। তবে পাকিস্তানিরা বারবার ঘোষণা করছিল, যারা কাজে যোগ দেবে না, তাদের শাস্তি দেয়া হবে। বার বার এই ঘোষণা শুনে মা-বাবা খুব দ্বিধায় পড়ে যায়। গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় পর পর কয়েকবার চিঠি এলে তারা চিন্তা করতে থাকে, এ গ্রাম ছেড়েও পালাতে হবে। তখনই একরাতে গাঁয়ের কালাম ভাইকে দেখি ভারত যাওয়ার আগে বাবাকে খুব করে বলছে, আপনি গিয়ে কাজে যোগ দেন চাচা। যুদ্ধ থেকে ফেরার পর টাউনে গেলে আমাদের শেল্টার লাগবে না? আপনি আমাদের শেল্টার দেবেন, ইনফরমেশন দেবেন। শেল্টার কি, ইনফরমেশন কিÑ এইসব আমার ঠিক জানা হয়নি। সোহেল ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে আমাকে এসবের কিছুই বোঝায়নি। কী ভয়ঙ্কর ভাইটা আমার- তলে তলে সে যে কালাম ভাইদের সঙ্গে খাতির করে ফেলেছিল, সেটা কে জানত! আমরা শহরে ফেরার পর মাসখানেক পর এক সকালে দেখলাম, সোহেল ভাইকেও কোথাও আর পাওয়া যাচ্ছে না। যে চিরকূটটা সে রেখে গিয়েছিল, মাকে দেখলাম চুলার আগুনে সেটাকে পুড়িয়ে ফেলতে আর আবারও জিনিসপত্র গোছগাছ করতে। আমি তখন আবারও ঘরের বাইরে গিয়ে গলির মোড়ের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম। দেখেছিলাম কয়েকজন বিহারি মিলে মিস্ত্রি কাকার জায়গায় নতুন একটা দোকান তোলার কাজ শুরু করেছে।

তবে এটা কিন্তু মোটেও ঠিক নয় যে, সিঙ্গারা, আইসক্রিম, ললিপপ কিংবা  দুপুর-বিকেলে বেজে ওঠা সিনেমার গান অথবা লাল ট্রানজিস্টরটার জন্যেই মিস্ত্রি কাকাকে আমার বারবার মনে হয়। মিস্ত্রি কাকার চেহারা আমি এই কয়েক মাসেই একদম ভুলে গেছি। তা ছাড়া এটা তো ঠিক, তারও আগে মাসচারেক তাকে দেখি নাই আমি। মাসচারেক পর ফিরে এসে দেখেছিলাম, তার কারখানাটা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। বিষয়টা আর সময়টা আমার স্পষ্ট মনে আছে, কেননা সেদিন থেকে বাবাকেও আমরা আর কোনোখানে দেখিনি। সেদিন কাজে যোগ দিতে যাওয়ার পর বাবা আর ফিরে আসেনি। হতে পারে, লাল ট্রানজিস্টরটা মিস্ত্রি কাকা ঠিক করে ফেলেছিল, বিধ্বস্ত কারখানাটায় খোঁজাখুজি করলে সেটা পাওয়াও যেত। কিন্তু ওই ট্রানজিস্টরটার অভাবও কিন্তু আমি অনুভব করি না। আমি জানি, ট্রানজিস্টরে এখন কী খবর হয়; আমার তা জানাই আছে- শোনার কোনো দরকার নেই। আমি শুধু ভারি আশ্চর্য হয়ে ভাবি, আশ্চর্য, আলেয়া আপার সঙ্গে সোহেল ভাইয়ের ব্যাপারটা তো আমি খুব সহজেই বুঝতে পেরেছিলাম, ক্লাস সেভেনের ছেলে হয়েও বুঝতে পেরেছিলাম; কিন্তু সোহেল ভাই যে স্বাধীনতার অর্থ বুঝে গেছে, সে যে বাবা আর মামার মতোই জীবন দিতে পারে, এই ব্যাপারটা একটুও বুঝতে পারি নাই কেন! আহ্, একবার যদি বুঝতাম, সোহেল ভাইয়ের বুকের মধ্যে মুখটাকে খানিকক্ষণের জন্যে ডুবিয়ে রাখতাম আমি, ঠিক তেমন করে- যেমন করে বাবার বুকের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছিলাম পুকুরপাড়ের সেই কালরাতে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares