উইল : মাহবুবা হোসেন

গল্প

উইল

মাহবুবা হোসেন

মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে ভ্রু কুঁচকে ড্রয়িং রুমে বসে আছে পুষ্প। হাতে একটা উইল। ঠিক তার পাশে বসে আছে ফয়সাল, মুখে তার বিস্ময়। ফয়সাল বুঝতে পারছে না ঘটনাটা কি ঘটছে। উপস্থিত পরিস্থিতিকে আমলে না নিয়ে উল্টো দিকের সোফায় বসে স্মৃতি রোমন্থন করে চলেছেন অ্যাডভোকেট আবুল ফজল। তিনি বর্তমানকে ঠেলে পিছনে ফিরে গেছেন কয়েক বৎসর।

বুঝলে মা তোমার জ্যাঠা যখন মৃত্যুশয্যায় তখন একদিন আমায় ডাকলেন। সে আমার পুরোনো বন্ধু। তার পাশে তখন কেবল তোমাদের পুরোনো চাকর রহমত। গুলশানে এই এত্ত বড় বাড়ি। রহমতকে দিয়ে একদিন খবর পাঠাল। আমি ব্যস্ত মানুষ। যাই যাচ্ছি করে দেরি হচ্ছিল। এর মধ্যে আরেকদিন ফোন করল রহমত। গেলাম সেদিন সন্ধ্যায়। বাড়িটাকে মনে হল ভুতুরে বাড়ি। কয়েকবার বেল বাজালে রহমত এসে দরজা খুলে দিল। সরাসরি নিয়ে গেল তোমার জ্যাঠার ঘরে। তাকে চেনা যায় না। বিছানার সাথে মিশে আছে। আমাকে চিনতে পেরে মৃদু হাসল। সরে বিছানায় বসতে দিতে চাইল। পারল না। রহমত একটা চেয়ার এগিয়ে দিলে চোখ বরাবর বসলাম। সে ইশারায় কাছে ডাকল। আমি কান সজাগ রেখে মুখের কাছে মুখ নিলাম। সে মৃদু কণ্ঠে থেমে থেমে বলল, ‘আবুল ফজল তুমি তো জান পৃথিবীতে আমার নিজের বলতে কেউ নেই। বিয়ে করিনি সন্তানাদি নেই। সারাজীবন স¤পত্তি বিক্রি করেছি আর ঘুরেছি। মনে করেছি জীবন একটাই, মরার পরের জীবন অনিশ্চিত। ধারণা ছিল এতেই সুখ কিন্তু এখন বুঝতে পারছি শেষেরও শেষ আছে, ভবিষ্যতেরও আছে ভবিষ্যৎ। আমি এখন একজন উত্তরাধিকার খুঁজছি। এই বিশাল বাড়িটার মায়ায় পৃথিবীও ত্যাগ করতে পারছি না। রহমতকে দিয়ে যাওয়া যায় কিন্তু এর মর্যাদা সে রাখতে পারবে না। ওর দুই রুমের সুখের সংসার ছত্রখান হবে। ছেলে তিনটা উচ্ছন্নে যাবে। বৌ হবে উন্নাসিক। অযাচিত প্রাপ্তির মর্যাদা রাখা সহজ নয়। এর অপব্যবহার করার প্রলোভন উপেক্ষা করা সাধারণের ক্ষমতার বাইরে। যে সারাজীবন আমার সেবা করল জেনে বুঝে তার এত বড় সর্বনাশ তো আমি করতে পারি না ফজল। তাই সেই সাহস করি না! এর একটা বিহিত করতে তোমাকে খবর দিয়েছি। তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য দুঃখিত-’ বলে তিনি থামলেন। এতগুলো কথা এক সাথে বলে তিনি হাঁপাতে লাগলেন, কথাগুলো বলে আবুল ফজল নিজেও একটু থামলেন; কিন্তু তৎক্ষণাৎ অতীত থেকে ফিরে আসতে পারলেন না। স্মৃতিময় চোখে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। কি কারণে তিনি এ যুগেও ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করেন কে জানে। কলমের মুখটা খোলা। উনি যখন কথা বলছিলেন নিবের আগাটা ফর্সা সোফাটার গায়ে লেগে একটু একটু দাগ বসে যাচ্ছিল। ফয়সালের খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। এক সময় সে উঠে  গিয়ে ফজল সাহেবের হাত থেকে কলমটা নিয়ে মুখটা লাগিয়ে সেন্টার টেবিলে রেখে দিল। আবুল ফজল বা পুষ্প কেউ তা লক্ষ্য করল না, কারণ তখন তারা কোনো কিছু লক্ষ্য করার মতো মানসিক অবস্থায় নেই। দুজনেই যার যার মতো অতীত হাতড়ে বেড়াচ্ছে।

আবুল ফজল পুনরায় শুরু করলেন।

তারপর তোমার জ্যাঠা বলতে শুরু করলেন,

‘আমার জীবিত উত্তরাধিকার কেউ কেউ আছে কিন্তু আমার বাড়িটা আমি দিতে চাই’…বলে চুপ করে গেলেন। একটু পর অনেকটা আদেশের সুরেই বললেন,

‘না আমি বাড়িটা পুষ্পকেই দিতে চাই। তুমি উইল তৈরি করো।’

আবুল ফজল থামলেন।

কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে পুষ্পর প্রতিক্রিয়া হল প্রত্যাশার বাইরে, যার জন্য ফয়সাল বা আবুল ফজল কেউই প্রস্তুত ছিল না। পুষ্প খুশির বদলে প্রচণ্ড রেগে গেল।

আমি কিছুতেই এটা নিতে পারব না। আপনি দয়া করে ফেরত নিয়ে যান।

বলতে বলতে সে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে উইলের কাগজটা সেন্টার টেবিল বরাবর ছুড়ে দিল। উইলটা টেবিলে না পড়ে পাতাগুলো উল্টে উল্টে মাটিতে পড়ে গেল।

 

২.

পু®েপর আচরণে আবুল ফজল ও ফয়সাল দুজনেই অবাক হয়ে যায়। এমন একটা প্রতিক্রিয়া হবে তারা কেউ কল্পনাই করেনি। অবাক বিস্ময়ে পর¯পর পর¯পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুই বুঝে উঠতে পরে না। পু®প যেন সম্মোহনের একটা ঢেউ তুলে দিয়ে বেরিয়ে গেল। আবুল ফজল বিদ্যুৎস্পৃস্ট হয়ে বসে রইলেন। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। ফয়সাল ঠিক কি করবে, বসে থাকবে না পুষ্পের পিছন পিছন গিয়ে বিষয়টা বুঝে আসবে, বুঝতে পারছে না। সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে সেও কিছুক্ষণ তথৈস্থনৈ হয়ে বসে রইল। সম্বিত ফিরে পেলে উইলটা কুড়িয়ে নিয়ে ফজল সাহেবের হাতে দিয়ে অনিশ্চিত গলায় বলল,

আপনি এখন এটা নিয়ে যান। আমি পুষ্পের সাথে কথা বলে বিষয়টা বুঝে পরে আপনাকে খবর দিব। গলাটা তার উত্তেজনায় একটু একটু কাঁপছে।

আবুল ফজল যান্ত্রিকভাবে উইলটা ব্রিফকেসে ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ফয়সাল দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এল। তিনি কিছু না বলে লিফটের গোড়ায় এসে দাঁড়ালেন। কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। এত বিশাল স¤পত্তি পায়ে ঠেলা? গুলশানের মতো জায়গায় এক বিঘার উপর বাড়ি! তার মানে কি? নয়ছয় করেও একশ কোটি টাকার স¤পত্তি। বিষয়ী মস্তিষ্কে চটপট হিসাব কষে নিলেন ফজল। তার মাথাটা ঘুরে গেল। এমন একটা স¤পত্তি হাতে পেলে যে কেউ আকাশের চাঁদ হাতে পেত, কিন্তু পুষ্প? ঘটনা কি? অবশ্যই ডালমে কুছ কালা হ্যায়? নিশ্চয়। তিনি অনিশ্চিতভাবে মাথা নাড়েন। ভাবেন বড়লোকের ব্যাপারস্যাপার! কত রহস্যই না থাকে এদের জীবনে? লিফটের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে বিষয়টা নিয়ে পূর্বাপর আর একবার নাড়াচাড়া করতে থাকেন তিনি।

বাইরের দরজা লাগিয়ে ফয়সাল নিজের রুমে এসে দেখে পুষ্প বড় জানলাটার গ্রিলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ ছাইয়ের মতো কালো। সে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে থাকে পুষ্পের দিকে। তার বিস্ময় লাগে কি এমন দুঃখ থাকতে পারে পুষ্পর, যা এতদিন এত কাছাকাছি থেকেও জানতে পারেনি? স্বল্পভাষী এই মেয়েটাকে মনে মনে ভয় পায় ফয়সাল তার তল পাওয়া যায় না। একেই কি বলে ব্যক্তিত্ব? কোন কথায় অপরিচিতের মতো এমন করে তাকিয়ে থাকবে যে, আর এগোনোই যাবে না। তার সাথে তাই খুব সাবধানে কথা বলতে হয়।

ওখানে দাঁড়িয়ে ফয়সালের মনে হয় আসলেই কি মানুষ রহস্যে ঘেরা একেকটা নির্জন দ্বীপ, যার রহস্য কোনো দিনই সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয় না? নাকি পুষ্পই অন্যরকম? পুষ্পকে এই মুহূর্তে ফয়সালের স¤পূর্ণ অপরিচিত লাগে। একচিলতে রোদ পর্দার ফাঁক দিয়ে এসে পুষ্পের মুখে লুকোচুরি খেলছে। তাকে বড় রহস্যময় লাগে ফয়সালের।

পরপর কয়েকদিন পু®পর কাছে বিষয়টা জানতে চেয়েছে ফয়সাল কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি। সন্ধ্যা নেমে এসেছে অনেকক্ষণ। অন্ধকার হয়ে গেছে। সূর্যটা যখন সামনের হাইরাইজটার পিছনে টুপ করে ডুবে গেল তার অনেক আগে দুপুর আর বিকালের সন্ধিলগ্ন থেকে নয় তলার এই দক্ষিণের বারান্দায় বসে আছে পু®প। তার মনে অনেক ভাবনা। ফয়সাল অফিস থেকে ফেরেনি এখনও। ভাবছে, ভাবছে। কুল-কিনারা করতে পারছে না কিছুরই। বারান্দার লাইটটা হঠাৎ যখন জ্বলে উঠল হাত দিয়ে চোখ আড়াল করল। পু®প। ফয়সাল সুইচে হাত রেখেই বলল,

এখানে অন্ধকারে একা একা কি করছ?

পু®প কিছু বলল না। তাকাল কেবল ফয়সালের মুখের দিকে। কষ্ট দুর্ভাবনা রাত জাগায় স্নান ঐ দৃষ্টি। মুখটা মলিন। ফয়সালের মনটা মায়ায় ভরে গেল। ও একটা মোড়া টেনে পু®েপর কাছে এসে বসল। আলতো করে নিজের হাত রাখল কোলের উপর পরে থাকা পুষ্পের হাতে। কোমল করে বলল,

কি হয়েছে পুষ্প? বলবে না আমায়? এমন কি কথা, যা আমাকেও বলা যায় না?

পু®প চুপ করে থাকে। ফয়সালের গা থেকে সেই অফিস অফিস গন্ধটা এসে লাগে পুষ্পের নাকে, যেটা ধোয়া সার্ট, দামি নিকোটিন, এসির গন্ধ, দামি সেন্ট থেকে রোজ সন্ধ্যায় অফিস ফেরত ফয়সালের গা থেকে আসে যেটা পুষ্পর খুব খুব পছন্দ। এই সময়টায় ফয়সালকে সবচেয়ে বেশি আপন লাগে পুষ্পের। খুব খুব কাছে পেতে ইচ্ছা করে ফয়সালকে। গন্ধটা নাকে লাগতেই ফয়সালকে এত আপন লাগল পুষ্পের যে সেই গোপন কথাটা প্রায় বলেই ফেলছিল। তখনই ফয়সাল হাতে মৃদু চাপ দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

কি বলবে না।

তৎক্ষণাৎ পুষ্প গুটিয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

ফয়সাল তুমি তো বুঝ কথাটা বলবার নয়। বলার মতো হলে আমি কবেই তোমাকে বলতাম। প্লিজ আর জিজ্ঞেস করো না?

সত্যি যদি পুষ্প নিজের কাছেই ব্যাপারটা অস্বীকার করতে পারত? হা আল্লাহ।

ঠিক আছে তাহলে ঘরে চল।

পুষ্পের হাত ধরে টেনে তুলল ফয়সাল। তারপর পিঠে হাত রেখে নিয়ে চলল ঘরে।

আজও জিজ্ঞেস করেও কোনো জবাব পেল না ফয়সাল। ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে তার। পরিবারের এমন কি লুকোনো থাকতে পারে, যা কাছের মানুষটিকেও বলা যায় না? পুষ্প কেন এমন চুপ করে আছে? একটু কি অভিমান হয় না ফয়সালের? তবু সে যুক্তি দিয়ে বিষয়টা বুঝতে চেষ্টা করে।

ফয়সাল লক্ষ্য করেছে বিয়ের পর পু®প খুব অনীহা নিয়ে গুলশানের বাসায় যেত। তখন বিষয়টা তেমন গুরুত্ব না দিলেও এখন যেন মনে হচ্ছে কারণ একটা ছিলই। কি সেটা? জ্যাঠু সম্পর্কিত কি? পুষ্পের বাবা মারা গিয়েছিল পুষ্পের বিয়ের আগেই। মা যখন খুব অসুস্থ তখনই তো জ্যাঠু পারমানেন্টলি দেশে চলে এলেন। তারপরই কি পুষ্প গুলশান যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিল না? মার মৃত্যু হলে হসপিটালে গিয়ে লাশ দেখে এসেছিল মাত্র; কিন্তু আশ্চর্য জ্যাঠুর সাথে একটা কথাও বলেনি। কাঁদেওনি? তখনও অবাক হয়েছিল ফয়সাল; কিন্তু অতিরিক্ত কৌতূহলকে প্রশ্রয় দেয়া ফয়সালের ধাতে নেই। কারণটা আগে কখনও জানতে চায়নি সে। কিন্তু এখন এই অবস্থায়? এত বিশাল স¤পত্তির মালিক হয়েও তা ফিরিয়ে দেয়া? এটা সাধারণ কোনো মান-অভিমানের কাজ নয় ও নিশ্চিত। সন্দেহটা মনে উঁকি দিতেই ফয়সাল বিচলিত হয়ে উঠে। তবুও সে চুপ করে থাকবে বলেই সিদ্ধান্ত নেয়। সময়। সময়ই সব জানিয়ে দেবে নিশ্চিত।

 

৩.

সময়ের ব্যবধানে ঐ ঘটনাটার উপর চর পরে গিয়েছিল। ভুলে গিয়েছিল পুষ্প সেই কষ্টের কামড়, হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। উইলটা এখন আবার খুঁচিয়ে তুলল চরের বালি যেখান থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরবে পানির বদলে রক্ত। সেই মানুষটা, হ্যা, সেই মানুষটা, জগতে যাকে শ্রেষ্ঠ মানুষ বলে মনে করত পু®প, নিজের জীবনেও কল্পনা করত, এমন একজন আদর্শ  পুরুষ যে আকর্ষণে, দৃঢ়তায়, দায়িত্ববোধে, স্নেহে ও ভালোবাসায় একটা আনন্দঘন জীবন ও সংসারের প্রতিশ্রুতি দিবে। নিশ্চিন্ত ও সুখী জীবনের প্রতিশ্রুতি। অথচ সেই মানুষটাই কেমন করে এক ধাক্কায় কাচের দেয়ালের মতো খানখান করে ভেঙে দিল সেই মোহ, জীবনের পাটাতনটাই পাল্টে দিল পুষ্পের। দাঁড়াবার, বিশ্বাস করবার, আস্থা রাখবার আর জায়গা রইল না। ঐ কচি বয়সে নারী-পুরুষের স¤পর্কেও কি ভীতি ধরিয়ে দিল না? ভয় ধরিয়ে দিল না সেই স¤পর্কে? এমন একজন মানুষ যাকে প্রায় দেবতা করে তুলেছিল পু®প ও তার পরিবার! সেই বিশ্বাসে এতখানি ফাঁকি? জানালার গ্রিলে মাথা রেখে সেই সেদিনের মতোই কষ্ট হল পুষ্পর। মনে হল এই এইমাত্র ঘটনাটা ঘটে গেল। চোখের সামনে যেন ¯পষ্ট দেখতে পেল দৃশ্যটা। পুষ্প ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। শেষের দিকে হেঁচকি উঠে গেল তার।

গুলশানের বিশাল বাড়িটার ছাদও বিশাল। ছাদের বিভিন্ন জায়গায় ক্যায়ারি করা গুছান ফুল ও ফলের গাছ। গাছগুলো যতেœ শুশ্রƒষায় চকচক করছে। গন্ধ সৌন্দর্য আর উন্মুক্ততার কি অপূর্ব বিন্যাস। পুষ্পের খুব ভালো লাগে এই জায়গটা। এখানে এলে তার আত্মা মুক্তি পায়। বয়স কত তখন পুষ্পর? তের কি চৌদ্দ? হুমায়ূন পড়বারই তো বয়স তখন? দুপুর গড়িয়ে গেছে। ছাদের এক কোণে বসে হুমায়ূন আহমেদের আমার আছে জলে বুদ হয়ে আছে পু®প। কখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে গেছে খেয়ালই নেই। সন্ধ্যার স্বল্পআলোতেও হুমায়ূন থেকে উঠে আসতে পারছে না পু®প।

হঠাৎ চোখের সামনে ঘটে গেল সেই ঘটনাটি? দৃশ্যটি মনে পড়ে এই এত বৎসর পরেও ঘৃণায় কুকরে উঠে পু®প। ঐ ঘটনাটি শুধু হুমায়ূন কেন পুষ্পের এতদিনের বিশ্বাস ও পরিচিত জীবন থেকে স¤পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয় তাকে।

এই বিশাল বাড়িটা জ্যাঠুর। তিনি বিয়েশাদি করেননি। ঘুরে বেড়ানোই শখ। সারা বৎসর পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। এক সময় ঘুরতেন ব্যবসার কাজে। এখন ঘুরে বেড়ান নেশায়। স¤পদ গড়েছেন একসময়। পঞ্চাশ বৎসর বয়সে এসে মনে হল কি হবে? তারপর থেকে স¤পদ ভাঙতে লাগলেন। পু®পর বাবারা তিন ভাই দুই বোন। বোনদের ছোট বেলায় বিয়ে হয়ে গেছে। ভাইদের রক্তে যাযাবরের রক্ত আছে। সবার বড় লিয়াকত সতেরো বৎসর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে আর ফেরেনি। তার বাবাও নাকি বৎসরের বেশির ভাগ সময় হিমালয়ে হিমালয়ে ঘুরে বেড়াতেন। তাদের গ্রামের বিশাল সম্পত্তি দেখাশোনা করত পুষ্পের মেজদাদা এবং পুষ্পের দাদি। পুষ্পের বাবা বিয়ে করলেও সংসারে মন ছিল না। তিনি জীবনটা ঘুমিয়ে কাটাবেন বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বড় জ্যাঠা তার গুলশানের বাসা দেখাশুনা করার জন্য পু®পদের পুরো পরিবারকে গ্রাম থেকে তুলে এনেছিলেন। পুরো পরিবার আর কে? ষোল বৎসরের কিশোরী পু®পর মা আর ত্রিশ বৎসরের বাবা। পু®প তখনও হয়নি। গুলশানের বাড়িতেই পুষ্পের জন্ম।

গ্রাম থেকে উঠে আসতে বাবার তেমন আপত্তি ছিল না। গ্রামের টিনের চালার নীচে ঘুমানোর চেয়ে গুলশানের এসি রুমে ঘুমানই তো আরাম। আরেকটা ব্যাপারও ছিল। গ্রামে একটা সমাজ আছে, কিছু সামাজিক কর্তব্য তো আছেই। যে মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিবে জীবন, সে দায়িত্ব কর্তব্য করবে কখন? গুলশানে সেই বালাই নেই। এটাও একটা আরাম। অপদার্থ কথাটা অপদার্থেরও ভালো লাগে না। গ্রামে ঐ কথাটা প্রায়ই তাকে শুনতে হত।

পুষ্পর মা সাধারণ একজন গ্রাম্য বধূ থেকে মালি চাকরবাকর দেবর ননদ নিয়ে বিরাট সংসারের কর্ত্রী হয়ে উঠলেন। কর্তৃত্ব থেকে ব্যক্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্য। সবদিকে ছিল তার কড়া নজর। তার নজরদারিতে পরিবারটা সুশৃংখলভাবে চলত। সময় এবং বুদ্ধিই সবকিছু নিখুঁতভাবে শিখিয়েছিল তাকে। তিনি ভীষণ ব্যক্তিত্বস¤পন্ন মহিলা ছিলেন। ব্যক্তিত্বের কারণে সবাই তাকে ভয় পেত; কিন্তু তিনি সবার সাথে সহজ ভাবে মিশতেন। অবশ্যি একটা সীমা পর্যন্তই। তারপরও কেমন করে কে জানে সবার সাথেই তার হাসিখুশি সহজ স¤পর্ক গড়ে উঠে। এমন কি ঝি-চাকরদের সাথেও। তারা তাকে ভয় পায়; কিন্তু সুখদুঃখ তার কাছেই নিবেদন করে।

পু®পর বাবা সম্পূর্ণ আলাদা। ব্যক্তিত্বের ধার ধারে না। হাসিখুশি মানুষ। যতক্ষণ জেগে থাকে, যাকে পায় তার সাথেই হাসিঠাট্টা করে। বুয়ারাও বাদ যায় না। ঐতো সেদিন আনুর মা যখন চা নিয়ে এল বাবা ঠাট্টা করে বললেন,

তোমার স্বামী নাকি তোমারে ছেড়ে গেছে আনুর মা? ভালোই হয়েছে, একদিকে স্বামী কি জিনিস বুঝিয়ে দিয়ে গেল, অন্যদিকে তোমার নিজের সুখ-সুবিধার জন্য অন্যের মুখাপেক্ষি হয়ে থাকতে হল না।

হা হা হা বুয়া বিব্রত মুখে বলে,

মাথা মুণ্ডু কি যে কন খালু কিছুই বুঝি না।

বুয়ারাও তাকে তেমন গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন মনে করে না।

যখন বাবার চা খেতে ইচ্ছা করে পুষ্পর মাকে ডেকে বলেন,

কই গো পু®েপর মা তোমার বিশ্ব সংসার থেকে একচিমটি সময় বের করা যাবে? এই একটু চা পরিমাণ সময়?

মাও হাসতে হাসতে বলন,

দাঁড়াও দেখি বিশ্বসংসার কি বলে?

বাবা-মায়ের স¤পর্কটা ছিল আপাত সহজ। কিন্তু সেই ঘটনার পর পুষ্পর ধারণা জন্মে তাদের আপাত সহজ স¤পর্কটাও আসলে এক ধরনে প্রতারণা। বাবা ছিলেন উদাসীন। কোনো কিছু সিরিয়াসলি নিতেন না। জীবনটা যেন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার বিষয়। হয়তো মার সাথে স¤পর্কের ক্ষেত্রেও একই রকম দার্শনিক মনোভাব তার ছিল। বাবা যেন স্ত্রীকে অন্যের ডিসপোজালে ছেড়ে দিয়ে ভারমুক্ত ছিলেন। নিজের জীবনে স্ত্রীর তেমন প্রয়োজন নেই। শুধু হাসিঠাট্টা করার জন্য একজন কাউকে লাগে। সেটা স্ত্রী হলে জমে ভালো এই আর কি? মা কি সেই সুযোগটাই নিয়েছিলেন? নাকি তিনি পরিস্থিতির শিকার হয়ে সেই স¤পর্কে জড়িয়ে গিয়েছিলেন?

বাবার সাথে জ্যাঠুর স¤পর্কটা মুগ্ধ পাঠকের মতো; কিন্তু মা অনুগত হলেও কিছুটা কর্তৃত্বপরায়ণ। বাবার থেকে জ্যাঠুর সুখ-সুবিধার দিকে মায়ের নজর ছিল বেশি। ভাশুরের সাথে স¤পর্কটা ঠিক ভাশুর ভাদ্রবউয়ের মতো নয়। কিছুটা শ্রদ্ধার কিছুটা আটপৌরে। বন্ধুত্বটাই যেন বেশি। হয়তো অনেকদিন ধরে সংসারের খুঁটিনাটি বিষয়ে পার¯পরিক সমঝোতার ফল। ঐ ঘটনার আগে মায়ের সাথে জ্যাঠুর স¤পর্কটা একটা আদর্শ স¤পর্ক বলে মনে হত পুষ্পর।

 

৪.

জ্যাঠুর আসার সময় হলে পুরো বাড়িটায় সাজ সাজ রব পড়ে যায়। মা ড্রাইভার আর রহমত চাচাকে নিয়ে বাজার করতে লেগে যান। বাগান আর ছাদের গাছ পাল্টানো হয়। ঘরের আসবাব পাল্টে যায়। বিছানার চাদর পর্দা সব নতুন। বাড়ির মতো পুষ্পদের পোশাকআশাক চালচলনও স্মার্ট হয়ে উঠে। বাড়িতে পরিবর্তন ও নতুনত্বের আনন্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। ঝি-চাকরদের পদচারণা দ্রুততর হয়। বাবা আধো ঘুম আধো জাগরণে জ্যাঠুর আসার দিন গুনতে থাকে। তখন দুইভাই জমিয়ে আড্ডা দেয়। জ্যাঠুই কথা বলে বেশি। বাবা মাথা নাড়তে নাড়তে শোনে। জ্যাঠুর ভা-ারে যে কত গল্প, কতছবি, কত ঘটনা, কত অভিজ্ঞতা। এই সময় পুষ্পও জ্যাঠুর পিছন পিছন  ঘোরে। তার সান্নিধ্য খুব ভালো লাগে। কেমন একটা অপরিচিত জগতের আকর্ষণ। জ্যাঠু তাকে কোলের কাছটিতে জড়িয়ে রাখেন। পুষ্প নিশ্চিত পিতৃত্বের স্বাদ পায়। ওমওম একটা ভালো লাগা, যা পিতা পুত্রীর বন্ধন থেকে সৃষ্টি হয়। কিন্তু শ্রদ্ধা ভালোবাসার উল্টাপীঠেই কি থাকে ঘৃণা? কোনো একটা ঘটনায় ভালো লাগা হঠাৎ ঘৃণায় পরিণত হতে সময় লাগে না? প্রত্যাশা যেখানে বেশি আশাভঙ্গের বেদনাও কি সেখানে অসীম? বিশেষ করে পুষ্পর বয়সি মেয়েদের কাছে যেখানে অভিজ্ঞতার ভা-ার প্রায় শূন্য? পুষ্পরও হয়েছে তাই। ঐ ঘটনার পর জ্যাঠুর সান্নিধ্য পুষ্পর জঘন্য লাগে। নিজেকে লাগে ভীষণ রকমের অপবিত্র, একাকী। বাবার উপরও ভীষণ রাগ হয়। বাবাকে আগে শুধুই অপদার্থ মনে হত; কিন্তু এখন মনে হয় আপসকামীও? পুষ্পের মনে তার প্রতি একটা করুণা মিশ্রিত ঘৃণা জন্মে। তার বিশ্বাস হয় না নিজের ভাইকে এতদিন এত ঘনিষ্ঠভাবে দেখেও চিনতে পারেনি? তবে প্রতিকার নেই কেন? আগে জ্যাঠুর একটা ডাকের জন্য পু®প অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত আর এখন? জ্যাঠু ডাকে,

পুষ্প পুষ্প?

পুষ্প শুনতে পায় কিন্তু উত্তর দেয় না।

কিছুই ভালো লাগে না পুষ্পর। নিজের প্রতি, পরিবারে প্রতি, এই বাড়িটার প্রতি একটা ঘৃণা তাকে কুড়ে কুড়ে খায়। পুষ্প বুঝতে পারে পড়াশুনা করে এই অবস্থা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। পড়তে সে বসতেই পারে না। সেই দৃশ্যটা তার সব মনোযোগ তছনছ করে দিয়ে যায়। কিন্তু তার মুক্তি চাই। চাই। যে কোনোপ্রকারে তার মুক্তি চাই। এই বাড়িতে তার অসহ্য লাগছে। বিয়ে কি এর প্রতিকার হতে পারে? সে শুধু ভাবে, ভাবে। আর অপেক্ষায় থাকে একটা বিয়ের।

ফয়সালের সাথে সামান্য পরিচয় ছিল পুষ্পর। একই কোচিংয়ের সিনিয়ার ভাই। এখন বুয়েটের স্টুডেন্ট পুষ্প বুঝত ফয়সাল তাকে পছন্দ করে; কিন্তু পুষ্প তাকে তেমন পাত্তা দিত না। এটাই কি টানত ফয়সালকে? ওর ব্যক্তিত্ব? ঐ ঘটনার পর পুষ্প নিজ থেকেই ফয়সালের সাথে যোগাযোগ করেছিল। বিয়ের পর নিজ পরিবার থেকে স¤পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিল নিজেকে।

 

৫.

দৃশ্যটা ¯পষ্ট মনে আছে পু®পর। যে দৃশ্যটা দীর্ঘদিন তাড়িয়ে বেরিয়েছে তাকে, এখনও স্বপ্নে তাড়িয়ে বেড়ায়।  ভোলা কি এতই সহজ?

সেই ঘোর সন্ধ্যায় পুষ্পর ঘোর ভাঙল ফিসফিস শব্দে। শব্দটা কোথা থেকে আসছে দেখার জন্য পুষ্প হুমায়ূন আহমেদ থেকে বের হয়ে এল। সামনে এগিয়ে মনে হল পানির টেংকিটার পিছনে অন্ধকার জায়গাটা থেকে শব্দটা আসছে। টেংকিটা আড়ালে রেখে শব্দের উৎসটার দিকে এগিয়ে গেল পু®প। দৃশ্যটা চোখে পরতেই একদম থ হয়ে গেল। জ্যাঠু আর মা সংলগ্ন হয়ে ফিস ফিস করে কথা বলছে। জ্যাঠু পুরো ইউরোপ ঘুরে মাত্র পরশু এসেছে।

কেমন আছ মাধু?

কোথায় আর ভালো থাকি?

কেন? কিসের অভাব রেখেছি তোমার?

অভাবের কথা কে বলছে? বলছি দুশ্চিন্তার কথা।

মা ফুঁপিয়ে কাঁদেন।

কেন তোমার কি দুশ্চিন্তা?

দুশ্চিন্তা নয়? এমন করে তাকে ঠকান?

এতদিন পর মাধু?

দেখ আমাদের বয়স হয়েছে। মরতে তো হবে একদিন? দুশ্চিন্তা হয় না? তার উপর মেয়েটাকে লক্ষ করেছ? দিন দিন কি সুন্দর হয়ে উঠছে? ঠিক যেন তোমার চোখমুখ বসান। ওর বাবা বা আমি কারও সাথে মিলবে কি ও?

পাপ পাপ!! মা মাথা নাড়েন আর কাঁদেন। পুষ্পর এমন শক্ত মা এখন যেন কাদার মতো নরম।

ও আমাদের ভালোবাসার ফসল, তাকে পাপ ভাবছ কেন?

জ্যাঠু মায়ের পিঠে হাত রেখে সান্ত¡না দিতে থাকেন। হঠাৎ মা জড়িয়ে ধরেন জ্যাঠুকে।

পুষ্প আর তাকাতে পারে না। হঠাৎ যেন কেউ ময়লা কিছু লাগিয়ে দিল তার গায়ে। মনে হলো তার রক্তের ভিতর দিয়ে ঘৃণার লাভা ছুটছে। গায়ে কেউ বিছুটি লাগিয়ে দিয়েছে।

ঠিক এই মুহূর্তে দীর্ঘদিন ধরে পুষ্পের সাথে জ্যেঠুর গড়ে উঠা পিতাপুত্রির বন্ধনটা এক ধাক্কায় ছিটকে গিয়ে পুতির ছেঁড়া মালার মতো নাচতে নাচতে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গেল। ঘৃণার একটা ঢেউ ভিতর থেকে ঠেলে উঠে পুষ্পর গলা আটকে দিল। তার কেমন বমি বমি লাগতে লাগল। সে ছিটকে সরে এল সেখান থেকে। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে বড় জানালাটায় মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল পুষ্প, কিছুক্ষণ নিজের সাথে যুদ্ধ করে আবুল ফজলকে একটা চিঠি লিখল।

শ্রদ্ধেয় চাচা ছালাম নিবেন। আপনাকে আমি চাচা বলে সম্বোধন করলাম কারণ আপনি আমার জ্যাঠুর বন্ধু। আমি জানি আপনি আমার ঐ দিনকার আচরণে বিস্মিত হয়েছেন। পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা ব্যাখ্যার অতীত। আমার আচরণের ব্যাখ্যা হয়তো আপনি কোনোদিন পাবেন না। তার প্রয়োজনও আছে বলে আমি মনে করি না। কখনও কখনও প্রলোভন ও আত্মসম্মান মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়, তখন যে কোনো একটাকে বেছে নিতে হয়। আমি শেষেরটাই বেছে নিব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি কিন্তু তার কারণ ব্যাখ্যা করতে আমি অপারগ। আশা করি আপনি আমাকে ভুল বঝবেন না। ঐ স¤পত্তি আপনি কোনো চ্যারিট্যাবল অর্গানাইজেশনে দান করে দিবেন, যেখানে প্রয়োজন আমি সই করে দিব। কোনো একটা বিষয়ে আপনাকে অন্ধকারে রাখার জন্য আমি ক্ষমা চাচ্ছি। এছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না। শ্রদ্ধা জানবেন আপনার ¯েœহের পুষ্প। যদিও জ্যাঠু বা মা কেউ আজ আর বেঁচে নেই। তবুও প্রতিকারহীন পারিবারিক প্রতারণার একটা জবাব দিতে পেরে পুষ্প যেন বেঁচে গেল।

লেখক : গল্পকার

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares