শহরের বুকের কথা : স্বদেশ রায়

গল্প

শহরের বুকের কথা

স্বদেশ রায়

ওর ডাকনাম নীপা, পুরো নাম ছিল তাসমিমা খান নীপা, তিন বছর হলো নামটার একটু পরিবর্তন হয়েছে। এখন ওর নাম তাসমিমা কবীর নীপা। সাইফুলের সঙ্গে বিয়ে হবার পরে নামের শেষে সাইফুলের নামের শেষাংশ জুড়ে নিজের নামটির আকৃতি বাড়িয়েছে, তাসমিমা কবীর নীপা। তিন বছরে শুধু যে নামের আকার বেড়েছে তা নয়, শরীরের আকারও বেড়েছে। কিছুদিন আগেও জগন্নাথ কলেজের সোসিওলোজি ডিপার্টামেন্টে ও ছিল সিরাজের আলেয়া। শরীরে কোথাও তার কোনো মেদের নাম মাত্র ছিল না। সাইফুলের বন্ধু সোহাগ বলত, দোস্ত তোর নীপাকে ঈশ্বর নিজ হাতে তৈরি করেছে। এমন বডি সোহাগ তার জীবনে একবারই দেখেছে তা কোনো মানুষের নয়, ওর মামার বাড়িতে রাজবাড়ির এক বৃদ্ধ ভাস্কর একাই একটা দুর্গা প্রতিমা গড়েছিলেন তাঁর দাদু মহাশয়ের অনুরোধে। সেই প্রতিমার বদলে নীপাকে দাঁড় করিয়ে দিলে মনে হবে যেন রঙ করার আগের সেই মাটির রঙের প্রতিমাটি। কাঁচা মাটির মতো গায়ের রঙ নীপার, যে রঙ কেবল উইনি ম্যান্ডেলাকে মনে করিয়ে দেয়।

সাইফুল কখনও কখনও সোহাগের দু’হাত ধরে বলত দেখ, আসমা, বীথি, লাইজু এরা সব থাকতে আমি কালো রঙের একজনকে বেছে নিয়েছি, তোরা আর ওর দিকে হাত বাড়াসনে। সোহাগ বলতো, কাকারে, সেরাটা পেয়েছো তো তাই এত ভাবভঙ্গি, আর আমরা দেখ, সাধিয়া মরিছি, ইহারে, উহারে, তাহারে। সাইফুল তখন সোহাগকে বলত কেন তোর মিডফোর্ডের ডাক্তারনির খবরকি? শালা রঙটা দুধে আলতা আবার গলার স্বরটাও। নে কাকা তুই একা আর থিয়েটার করিস না, ডাক্তার সাহেবানাকেও নামিয়ে ফেল। আলু বাজারের মুক্তা দেখিস ঠিক শ্যাম বাজারের ডায়মন্ড হয়ে যাবে।

পুরোনো ঢাকার গলি পথ বেয়ে এমনি সব আলাপে অনেকদিন কেটে গেছে সোহাগ ও সাইফুলের। ক্যাফে কর্নারে বসে বিকেলে কাটলেট খেতে খেতে অনেক সময় নীপা বলে উঠত, এই একঘেয়েমি কাটলেট আর ভালো লাগে নাÑ সোহাগ বা মুক্তা বলত তাহলে চলো বোস কেবিনের চপ আর চা খাই। নীপা মাথা ঝাঁকিয়ে বলত না বাবা, ফরাশগঞ্জে আমি যাব না। অথচ সাইফুল দুপুরের রোদে ফরাশগঞ্জ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কোনো এক স্বপ্নের মধ্যে ডুবে যেত। দুপাশের বিল্ডিংগুলো তাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যেত। বাস্তবে সাইফুলের কাছে যে ফরাশগঞ্জ সেটা কোনদিন নীপার কাছে হবে না। লক্ষ্মীবাজার থেকে ওরা দল ধরে বেরিয়ে ঈশ্বর দাশ লেন, প্যারিদাশ রোড পার হয়েই ঢুকে যেতো ফরাশগঞ্জে- তারপরে ফরাশগঞ্জের ঘাট থেকে বুড়িগঙ্গায় নেমে সোজা শ্যামবাজার লালকুঠি, লালকুঠি থেকে ডাঙায় উঠে ভোঁ দৌঁড়টা তো সে এই ক্যাফে কর্নারের সামনে দিয়েই দিত। কোনো কোনোদিন চলে গেছে শাঁখারি বাজারে, সোহাগদের তিনপুরুষের ভাড়াটে বাসায়। তারপরে ওদের সঙ্গে ওয়াইজ ঘাটে। তখনকার বুড়িগঙ্গার পানিটাই ছিল আলাদা। সোহাগদের বাড়িতে সেদিন দুপুরে নিরামিষ খেয়ে বাসায় ফিরত সাইফুল। তাই তার ফরাশগঞ্জ আর নীপার ফরাশগঞ্জ এক হবার কোনো জো নেই।

এই সোহাগ ও সাইফুল দু’বন্ধু জীবনে সব থেকে যে অদ্ভুত কাজটি করে তাহলো তারা ইন্টার পাশ করার পরে কেউ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়নি। বরং ওরা ভর্তি হয় জগাবাবুর পাঠশালায়। সাইফুলের বাড়ি থেকে কোনো আপত্তিই ওঠেনি, কারণ আর যাই হোক, চাকরির জন্যে, পেটের ভাতের জন্যে সাইফুলের পড়াশুনার কোনো দরকার নেই, পড়াশুনার দরকার শুধু কয়েক পুরুষের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্যে। আর তার নিজের শখ বা ইচেছ পূরণের জন্যে। সোহাগও কেন যেন শাখারিরাজার, বাংলাবাজার, লক্ষ্মীবাজার এই এলাকার গন্ধ ছাড়তে পারেনি। দুজনেই তাই ভর্তি হলো জগন্নাথ কলেজে।

আজ সংসার জীবনে ঢুকে সাইফুল মনে করে সে জীবনে সব থেকে বড় ভুল করত যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিত, কারণ মেধায় তাকে বাদ দেবার কোনো সুযোগ ছিল না, কিন্তু ভর্তি হলে কত বড় ক্ষতিটা তার জীবনে হতোÑ সে তো আর যাই হোক নীপাকে পেত না। নীপার থেকে এ পৃথিবীতে তার জন্যে আর বড় পাওয়া কী আছে! নীপা অবশ্যি পুরোনো ঢাকার নয়, ওর বাবা সদরঘাট পোস্ট অফিসের মাস্টার জেনারেল হিসেবে ওই বছরই বদলি হয়ে এসেছিল। ওই ওদের প্রথম ঢাকায় আসা। নীপা তো পুরানো ঢাকার বাসায় প্রথম সপ্তাহেই হাফিয়ে উঠেছিল, গলির পরে গলি, সব গলিই এক রকম দেখায়। বাব্বা! এ ভাবে গলি ঘুরে বাসা চিনবে কীভাবে সে? ওকে প্রথম প্রাণ দেয় ওয়াইজ ঘাটের বুলবুল লতিতকলা একাডেমী, অবশ্যি এ নাম বললে কোনো রিকশাওয়ালা চিনবে না, বলতে হবে বাফা। যে রিকশাওয়ালা হোক এক টানে নিয়ে যাবে বাফায়। ওই বাফা, আর জগন্নাথ কলেজ এই ছিল সোসিওলোজির ছাত্রী নীপার প্রথম বিচরণ ক্ষেত্র।

ওদিকে পাশ করার পরেই সোহাগটা হঠ্যাৎ করেই এক অকাজ করে ফেলে, কী যেন মনে করে বিসিএস পরীক্ষা দেয়। ঠিক কী যেন মনে করে নয়, সাইফুলকে বলে দোস্ত জীবনের ওপিঠটা একটু দেখতে চাই। ছোটবেলা থেকে তো বাবার ব্যবসা দেখছি। কয়েক পুরুষ কেবল ব্যবসাই দেখেছে। এখন দেখতে চাই চাকরিটা কেমন?  সাইফুল বলে চাকরিতে প্রথমেই তো তোকে ঢাকা ছেড়ে একটা মফস্সল শহরে যেতে হবে। ও বলে দেখি না ঢাকার বাইরের পৃথিবীটা কেমন? সাইফুল বলে আমার মালিবাগে গেলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়, মনে হয় এক্ষুনি দৌড়ে উর্দুরোড়ে না হয় আর্মানিটোলায় যাই। সোহাগ বলে, ক্যানরে? সাইফুল একটু গম্ভীর হয়ে উত্তর দেয়, আমাদের এই পুরোনো ঢাকার বাইরে যেখানে যাই না কেন, ওই শহর কথা বলে না রে? সোহাগ সে সময় সাইফুলকে বলত, তুই যে বলিস, পুরোনো দিল্লি, পুরোনো হায়দ্রাবাদ, ক্যালকাটার শ্যামবাজার, বড় বাজার, পার্কস্ট্রিট, নিউ মার্কেটের আশপাশে গেলে তোর মনে হয় ওই শহর কথা বলে। সাইফুল বলত, আমার মনে হয় কথা বলে, অনেক অনেক কথা বলে। তবে ওদের কথা তো আমি বুঝি না। কলকাতা কথা বলে কলকাতার মানুষের সঙ্গে, হায়দ্রাবাদের কথা কলকাতার শিবেন্দ্র দত্ত গিয়ে শুনতে পায় না। তেমনি টাঙ্গাইলের শিবনাথ গোস্বামী পুরানো দিল্লির ভাষা শুনতে পায় না। হায়দ্রাবাদের কথা শুনতে হলে কৃষ্ণ ট্যাঙ্গুভ্যালি বা বদরে নিজাম হতে হবে, দিল্লির কথা দশ পুরুষের সিধনাথ সিং বুঝবেনÑ না হয় মোন্তাজ হায়দার বুঝবেনÑ আমি সাইফুল ইসলাম বুঝব না।

সাইফুলের কথা কখনও কখনও সত্য মনে হতো সোহাগের। মনে মনে সে নিজের আত্মীয়স্বজনের ছবি দেখত। যারা এখান থেকে কোলকাতায় গেছে, তারা এখনও এখানেই বাস করে, ওরা কেউ কোলকাতাকে বোঝে না। শাঁখারি বাজার যেমন সারা শরীর দিয়ে সোহাগকে টানে ওদের কারও কলকাতা ওভাবে টানে না। তবে সাইফুলকে সব সময়ই কল্পনাবিলাসী, আর নিজের জীবন নিয়ে খেলা করা এক মানুষ মনে হয় সোহাগের। ওর দাদা রহিম কবিরকে এলাকায় সবাই মানে, যতদিন বেঁচেছিলেন শাদা লুঙ্গি পরে বিকেলে এসে লক্ষ্মী বাজারের সিটি কর্পোরেশন মার্কেট চত্বরে বসতেনÑ বসেই শুরু করতেন, হক সাহেব, সোহরাওয়ার্দ্দী সাহেব, শেখ সাহেবের গল্প। একই গল্প জীবনে বারবার করে যাচ্ছেন। বলে যাচ্ছেন মহরমের কিছু মিছিলের কথা, জম্মাষ্টমীর মিছিলের কথা। শবেবরাতের রাতের কথা। বলছেন দাঙ্গার কথা। কীভাবে বীরত্বের সঙ্গে দাঙ্গা ঠেকিয়ে ছিলেন এই এলাকায়  সে সব কথা। গল্প বলার ভঙ্গিমাটা বড় ভালো। তার গল্প তাই আশপাশে সবাই মূলত শুনত না, গিলত। যতদিন বেঁচেছিলেন ধোলাইখালের পাড়ে বসা ঈদের মেলায় তাকে প্রতিদিন যেতে হবে। সাইফুলও কী অদ্ভুত, গ্রাজুয়েশান হয়ে গেছে তারপরেও দাদা’র সঙ্গে ওই মেলায় যেত। ওর মতে ওই মেলায় নাকি একটা গন্ধ আছে। যেমন ওদের মহল্লার গন্ধটি আলাদা। ওদের লক্ষ্মীবাজারের গন্ধটাই আলাদা।

সাইফুলের বিয়েটা যেমন তিন বছর হয়েছে, নীপার শরীরের আকৃতিটা যেমন একটু বেড়েছে, সোহাগের চাকরির বয়স তিন বছর হয়েছে। সোহাগের শরীরেও তিন বছরে সরকারের অ্যাডমিন ক্যাডারের পাওয়ারের একটু রঙ লেগেছে। তবে সোহাগ ও নীপার চোখে সাইফুল ঠিক আগের মতোই আছে। সোহাগের ডাক্তারনীও বিসিএস দিয়েছে। সে আছে সিলেটে। সোহাগকে তাই কুড়িগ্রাম, সিলেট ও শাঁখারি বাজার একটি রেখায় আঁকতে হয়। সাইফুলের ভাষায় এটা একটি ত্রিভুজ। সাইফুল বলে ত্রিভুজের তিনটি কোণ কিন্তু রেখা একটি আর সে রেখা  সোহাগ। এবার সোহাগ বাড়ি এসে দেখে নীপার শরীরের আকৃতি বাড়ছে। মুক্তা ও সোহাগ তো নীপাকে দেখেই রেগে মেগে আগুন সাইফুলের ওপর। বলে আগে খবর দিবি না, নীপার এখানে এলাম এভাবে? সাইফুলের মা বলে, রাগ করো না মুক্তা- তোমরা কাল ওকে তোমাদের বাড়িতে নিয়ে যেও। তার পরে তোমাদের সব স্বাদ পূরণ করো। মায়েদের এই এক বড় গুণ কেমন করে যেন সব আগুনে পানি ঢেলে দিয়ে ঠান্ডা করে দিতে পারে মায়েরা।

পরের দিন সোহাগদের চারশত বছরের পুরোনো ইটের দেয়ালের অদ্ভুত সেই গন্ধের সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত যত আনন্দ গুলো ওদের সঙ্গে এসে ভর করে। নীপার সব ভালো লাগে তারপরেও এমন দিনের বেলায় এত অল্প আলোর ঘরে, যেখানে সূর্যের সঙ্গে ঘরগুলোর বড় বেশি আড়ি- সেখানে নীপার কেমন যেন একটু দম বন্ধ হয়ে আসে। ওর মনের ভেতর পড়ে থাকে ফাঁকা বিলের একটা দিগন্ত রেখা, আর সকাল-বিকেলে নদীর ওপর সূর্য উদয়-ও-ডোবা। ও অনেক চেষ্টা করেছে, অনেক কান পেতেছে- না সাইফুল এই শহরটির যে কথা শুনতে পায় সেটা সে শুনতে পায়নি আজও। মুক্তার জম্ম আলু বাজারে। ওর কাছে এ শহরের ভাষাগুলো তাই টগবগ করে ফোঁটে। সিলেটে গেলে ওর গা ছম ছম করে, ওর মনে হয় ও যেন একটা সিঁড়ি থেকে ফাঁকা কোনো জায়গায় পড়ে যাচ্ছে। ওর যেন মনে হয়, রাস্তাগুলোতে মানুষের পায়ের ছাপ পড়ে পড়ে যেন পথ চলার কোনো রাস্তা হয়নি। এ কেবল রাস্তা তৈরি করে রাখা হয়েছে। এই সব রাস্তার পাশে পাশে সকাল ও বিকেলের কোনো গন্ধ নেই, কোনো খাবারের খুশবু নেই, কোনো হাঁকডাক নেই- আর যে রাস্তায় ফেরিওয়ালার হাঁক নেই সে আর যাই হোক রাস্তা হতে পারে না। রাস্তাগুলোকে তার পুরানো ঢাকার রাস্তার মতো জীবন্ত মনে হয় না। কেবল ইট আর পিচের একটি ভাস্কর্য মনে হয়। তবে মুক্তা বুঝতে পারে, নীপার দম বন্ধ হয়ে আসছে। নিজের ভেতর নতুন একজন, ওদিকে নিশ্বাস নিতে কষ্টÑ সবই সে চেপে রেখেছে কেবল সাইফুলকে ভালোবেসে, আর সাইফুলের আম্মার বুক খুলে দেওয়া আদরের কারণে। শুধু সাইফুলের আম্মা নয়, ওই মহল্লার সব খালাম্মা, মাসি, কাকি, চাচি সবাই যেন কেমন বুক দিয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করে। না, এমন আদর সে কোথাও দেখেনি। কত নরম করে গায়ে হাত রেখে তারপরে ছোট্ট মেয়েটির মতো আদর করে নীপাকে। আজ সোহাগের মাও তাকে বুকের ভেতর নিয়ে একই ভাবে আদর করেছে। নীপা মনে মনে ভাবে, সাইফুলের কথা মতো মানুষের এ বুকের ভাষা না হয় সে বুঝলো, কিন্তু সাইফুল যে এই শহরটির ভাষার কথা বলে সে শহরটির ভাষা কোথায় তার তো কোনো হিসেব পেলো না নীপা, ছয় বছর জগন্নাথে আর তিন বছর সাইফুলের সঙ্গে নয় বছরে তার যে একটা ভালোবাসার ছোঁয়া লাগেনি তা নয়। তা বলে এখনও সে রোকনপুরের গলির ভেতর ঢুকলে পথ হারিয়ে ফেলে আর সাইফুলকে বললে সে বলে, জানো, রোকনপুর যতই লক্ষ্মী বাজারের ঘাড়ের ওপরে তারপরেও রোকনপুরের ভাষা লক্ষ্মীবাজার থেকে একদম আলাদা।

সাইফুলের আব্বা কী কোনো অগোচরে বুঝতে পেরেছিল নীপার মনের ভাষা?  সাইফুলের বিয়ের পর থেকেই তিনি গুলশানের তার অনেকগুলো জমির ভেতর একটা জমি একদিন সাইফুলের মা আর নীপাকে দেখাতে নিয়ে যান। দু পাশে বাড়ি উঠছে। ওদের বিশাল জায়গা খালি পড়ে আছে। ওই জায়াগায় গিয়ে ওদের দুজনের সামনে একটা ডিজাইন খুঁলে ধরেন মিজান কবির, ডুপলেক্স বাড়ির ডিজাইন, শিল্পীর তুলিতে আঁকা ফুলবাগানটার দিকে প্রথম চোখ পড়ে নীপা’র- মনে হয় ওর জন্ম হয়েছিল যে টাঙ্গাইলের সরকারি বাড়িতে, যেখানে তার ছোট বেলা কেটেছে সেখানে যেমন একটা ফুলের বাগান ছিল তেমনই বাগান। ওর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মিজান কবিরও সিদ্ধান্ত নেন, কাল থেকে এ বাড়ির কাজে হাত দেবেন। সাইফুলের আম্মা বলেন, এখানে বাড়ি করে কী করবে তুমি? মিজান কবির বলেন, বাড়ি না করলে জমিটা রাখতে পারা না। জমির দাম বেড়েই চলেছে। নীপার কাছে এই বাড়ি তৈরির বিষয়টি কোনো গুরুত্ব পায়নি। তাই সে হাজার কথা বললেও সাইফুলকে বলার প্রয়োজন মনে করেনি যে একটি নতুন বাড়ির কাজ শুরু হয়েছে। সাইফুল বাড়ির কাজ শুরুর কথা প্রথম শোনে তার আম্মার কাছে। তার দিনতিনেক পরে একদিন আবার সঙ্গে তার কথা বলার সুযোগ হয়, শুনেছিল বাড়ি তৈরি হচ্ছে, নইলে জমিটা থাকবে না হয়তো শেষ অবধি। আব্বার ব্যবসায়িক বুদ্ধির ওপর তার আস্থা আছে, আবার নিজের ওপরও আস্থা আছে আব্বার শতভাগের একভাগ ব্যবসায়িক বুদ্ধিও সে তার পড়াশুনা দিয়েও অর্জন করতে পারেনি। আর পারেনি বলে কোনো দুঃখও নেই সাইফুলের। সাইফুল কেমন যেন তার শহর, তার চারপাশের মানুষগুলো আর নীপাকে নিয়ে অনেক ভালো আছে। দু-শো বা তি-নশো বছরের পুরোনো চুন সুরকির বাড়ির তিনতলার ছাঁদে পায়রাগুলো বাকবাকুম, বাকবাকুম করে ডাকতে থাকে আর তার পাশের চিলেকোঠায় বসে জন ডান, কিটস, ইয়েটস, ব্লাক পড়তে পড়তে অন্য একটা জগতে চলে যায় সাইফুল। এর ফাঁকে কখনও এককাপ চা নিয়ে নীপা তার পাশে এসে বসলে তার জীবনটা যেন রঙিন হয়ে ওঠে। অনেক সময় নীপার মুখের দিকে তাকিয়ে সে পরাশরের পুরোনো বইয়ের দোকানের সেই নীপাকে খোঁজে। অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়তে এসেছে নীপা। সাইফুল তখন থার্ড ইয়ারে। হঠাৎ একদিন পরাশরের পুরোনো বইয়ের দোকানে দেখে নীপা শামসুর রাহমানের পাঁচটি কাব্য হাতে নিয়ে আট টাকা দাম বলছে, পরাশর দশ টাকাতে শক্ত হয়ে বসে আছে। হঠাৎ সাইফুলের চোখে চোখ পড়তেই পরাশর আট টাকাতে রাজি হয়ে যায়। নীপা একটু পিছন ফিরতেই সাইফুল দুটো এক টাকার ধাতব মুদ্রা পরাশরকে দেয়। মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ায় নীপা, পরাশরের চোখে চোখ রেখে বলে, আপনি বই দশটাকার কমে দিবেন নাÑ তা বিক্রি না করলে পারতেন। আমাকে বই দিয়ে ওনার কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন কেন? নিন, আপনার বই ফেরত নিন। বলেই বইগুলো ফেলে দেয়। পরাশর থমকে যায়, থতমত হয়ে কী যেন বলতে যায়, তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সাইফুল বলে, তুমি ভুল বুঝেছ, পরাশর আমার কাছে আরও টাকা পাবে। এখন দুই টাকা ভাঙতি আছে তাই দিয়ে গেলাম। নীপা অনেকটা ক্রোধ চেপে বলে, আপনার কাছে বুঝি সব সময়ই দুটাকা ভাঙতি থাকে! বলে গট গট করে চলে যায়। পরাশর বই আর টাকা নিয়ে তার পিছে পিছে ছোটে। বলে, আপনি ভুল বুঝে আপনার বই রেখে যাচ্ছেন, এ সময়ে তার পেছন থেকে সাইফুল বলে, পরাশর তো তোমার কোনো ক্ষতি করেনি তা ও বেচারাকে আট টাকা ঋণী করাবে কেন? ওর পাপ কে নেবে, তুমি না আমি? কী উত্তর দেবে বুঝে পায় না নীপা, ওর হাসি পায়, অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখলেও তা সাইফুলের চোখ এড়ায় না। তখন সাইফুল আস্তে করে পরাশরের হাত থেকে বইগুলো নিয়ে নীপার হাতে তুলে দেয়। নীপাও দেখতে পায় সাইফুলের অনেক বড় গভীর দুটো চোখ।

সাইফুলের চোখ এখনও আগের মতোই গভীর আছে। কেবল তারুণ্যের বদলে সেখানে ভরা যৌবনের হাওয়া লেগে নতুন পাতার সেই কচি রঙটি হারিয়ে গাঢ় সবুজ হয়েছে। তবে দুবছর বয়সে এখন সারা বাড়ি গট গট করে বেড়ায় সাইফুলের ছেলে। নীপা ওর বাংলা নাম রেখেছে, তন্ময়। না, এ বাড়িতে তা নিয়ে কারও কোনো আাপত্তি নেই। কাউকে বলে দেয়া লাগে না তন্ময় কবির নামের এই শিশুটি সাইফুল কবিরের ছেলে, চোখ দুটোই বলে দেয়, কার ব্যাটা। তন্ময়ের জন্মের পরে নীপার শরীরের আয়তনটি আরও একটু বেড়ে গেছে। সাইফুল ওকে বার বার সচেতন করছে, তবে তাতে কোনো লাভ নেই, সাইফুলের মায়ের আদরই যথেষ্ট নীপার শরীরের আয়তন বাড়তে। তার আদরের ভেতর কোথায় যেন মেয়ে চলে যাবার একটা আদর কাজ করতে থাকে। আর এ খবরটি সাইফুলের আগে নীপাই প্রথম পায়। তার শাশুড়ি আম্মাই তাকে প্রথম জানায় গুলশানের বাড়ির কাজ শেষ। ফার্নিচারও উঠে গেছে। এখন এই ঈদের পরে তাকে আর সাইফুলকে তার বাবা ওই বাড়িতে পাঠাবে। নীপা তার ইচ্ছেমতো এই বাড়ি থেকে যাকে যাকে পছন্দ করে সেই কাজের লোকগুলো ওই বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে। তাছাড়া ও বাড়িতে নতুন মালি ও দারোয়ান নিয়োগ দেয়া হয়েছে যা এ বাড়িতে তিনশ বছরে কখনও ছিল না। কারণ, এ বাড়ি মহল্লার বাড়ি, এ মহল্লায় সকলে দরজা খুলে ঘুমায়, দরজা খুলে রেখে একজন এ বাড়ি থেকে ও বাড়িতে যায়। নতুন ঢাকায় তো আর সেটা চলবে না, সেখানে মহল্লা নয়, সেখানে রোড আর লেনেই পরিচয় শেষ। রোডের বাসিন্দারা কেউ কাউকে চেনে না। সাইফুলের ভাষায়, শহরের আয়তন বাড়ছে, নতুন নতুন এলাকা এখন ঢাকা নাম ধারণ করছে। যারা আসছে তারাও এ দেশের মানুষ- মফস্সল শহর থেকে না গ্রাম থেকে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত হচ্ছে, বিদেশে যাচ্ছে কেউ কেউ, তারপরে ফিরে এসে আধুনিক সুযোগ সুবিধা নিয়ে  বেড়ে যাওয়া ঢাকাতেই বাস করছে। চাকরি করছে না হয় যাদের চাকরি শেষ হয়েছেÑ তারা বাসিন্দা হচ্ছে। নতুন নতুন ব্যবসায়ী হচ্ছে। তবে বেড়ে যাওয়া ঢাকা কি আসলে ঢাকা হচ্ছে? ওখানে কী রাস্তাগুলো কথা বলে, ওখানে কি এখনও ইটের সঙ্গে কোনো গন্ধ যোগ হয়েছে? ওখানে যে আধুনিক বাড়িগুলো হচ্ছে, তার ভেতর আসলে কারা বাস করে? তারা কি যার যার গ্রামের বা মফস্সল শহরের না এই ঢাকার? ওখানে কি ঘরে ঘরে ঢাকার খাবার ঢুকেছে? কত শত বছরে, মোগল, পুর্তুগাল, ইংরেজ মিলে তৈরি হয়েছে ঢাকার খাবারÑ তারপরে নারিন্দাতে শুধু বটি কাবাব, সুতলি কাবাব সেই লালবাগে। এখন ঢাকার যে আয়তন বাড়ছে তাতে একদিন কি সুতলি কাবাব কারখানায় হবে?

সাইফুল আবার ভাবে, সেকি বড় বেশি সেকেলে? সেকি পুরোনোকে আকড়ে ধরে বসে আছে। হয়তো তাই হবে। আজ তার আম্মা, নীপা, তার দুই বোন ও সে নিজে এসেছিল গুলশানের বাড়ি দেখতে। ফার্নিচারগুলো সব বদলে গেছে। সব এক ধাচের। নীপার খুব ভালো লাগে। ওর মুখ দেখে মনে হয় এমনটিই ও চেয়েছিল? সাইফুল মেলাতে পারে না। তার কাছে এগুলো কোনো বাড়ির ফার্নিচার মনে হয় না। মনে হয় সে একটা শো রুমে বসে আছে। একটা বাড়ির ফার্নিচারে তো একটা ইতিহাসের ধারাবাহিকতা থাকবে। দাদার আব্বার পরে আসবেন দাদা তারপরে বাবা এমনি করেই একটি ¯্রােত রেখা তার ভেতর থাকবে। না আর ভাবতে পারে না সে, জন ডানের ডিগ কবিতার কয়েকটি লাইন আওড়াতে থাকে। মনে মনে দেখতে থাকে কেমন করে বাবা খনন করে। তার মনে হয় এই মাটি খননটা চলে যাচ্ছে, এক পুরুষ আরেক পুরুষের মাটি খনন দেখছে না। তারপরেও নীপার খুশি মুখ দেখে নিজের চিন্তাগুলোকে মনের আরও গভীরে ঠেলে দেয় সাইফুল যাতে নীপা বুঝতে না পারে। বাড়িতে ফিরে আজ অনেক রাত অবধি চিলেকোঠায় ইজি চেয়ারে ঠেস দিয়ে একের পর এক কবিতা পড়ে সাইফুল। গ্রামাফোনটিতে বেশ আস্তে করে একটা খেয়াল বাজতে থাকে, সেটা শেষ হতে একটা ধুন তুলে দেয়। রেকর্ডটি ঘুরতে থাকে, ছোট্ট চিলেকোঠাটি যেন কী একটা অনাবিল আনন্দের স্বাদে ভরে ওঠে, সাইফুল বই থেকে মুখ তুলে ছাদের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিল এ সময়ে পিছন থেকে নীপা এসে তার দুই কাঁধে হাত রাখে। পিছনে দু হাত বাড়িয়ে দিয়ে নীপাকে নিজের পিঠের সঙ্গে আগলে নেয় সাইফুল। হঠাৎ তার কাঁধে গরম পানির ফোঁটা পড়ে। সাইফুল বুঝতে পারে নীপা কাঁদছে। এবার নীপাকে দুহাতে টেনে বুকের ভেতর নিয়ে আসে সাইফুল। অনেকক্ষণ মাথায় হাত বুলিয়ে তারপরে বলে, মাকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে? নীপা আরও ফুঁপিয়ে কাঁদে। সাইফুল তার মাথায় হাত বুলাতে থাকে। বলে, ইচ্ছে হলেই মার কাছে চলে আসবে। তোমাকে যে সব সময় ওখানে থাকতে হবে তা তো নয়। তারপরে বাবার গুলশানের অফিস হয়ে গেলে তখন তো তোমাকে অফিসে বসতে হবে। দেখো সময় কেটে যাবে? এবার নীপা সাইফুলের মুখটা টেনে নেয়। তার ঠোঁটে নয়, ছোট্ট শিশুর যেমন কপালে চুমু খায় অমনি চুমু খেয়ে কান্না জড়ানো গলায় বলে, তোমাকে তো আমার জন্যে পুরানো ঢাকা ছাড়তে হচ্ছে? সাইফুল হেসে বলে পাগলি, এই বুঝেছ নাকি? মিজান কবির তোমার জন্যেও বাড়ি করেনি, আমার জন্যেও নয়। তিনি বাড়ি ও অফিস করেছেন তার নতুন প্রজন্মের ব্যবসার জন্যে। আর সে প্রজন্মের দায় আমাদের ঘাড়েই পড়েছে। নীপা দুহাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে বলে, তোমার কষ্ট হবে না এই মহল্লা, এই পুরনো ঢাকা ছেড়ে যেতে। সাইফুল বলে, দেখ পুরোনো ঢাকা তোমরা এখন বলো। কিন্তু আসলে এটাই ঢাকা। ঢাকা তো জায়গার নাম নয়, ঢাকা একটি কনসেপ্ট। এ কনসেপ্ট আজ না হোক কাল মারা যাবে। সে আমি এখানে বসে থাকলেও মারা যাবে। তাই একজন সাইফুল ইসলামের কষ্ট এখানে হিসেবের কিছু নয়। তবে আমি, আমার ছেলে বাস করব কনসেপ্টহীন একটা সময়ে। হয়তো কোনো একদিন, হয়তো আবার চারশ বছর ধরে নতুন কোনো কনসেপ্ট হবেÑ তাই দুঃখ কি? আর কষ্ট! কত কারণেই না এ পৃথিবীতে মানুষ কষ্ট পায়। সেখানে চিলেকোঠার পায়রাদের সঙ্গে থাকা এক সাইফুল যদি একটু কষ্ট পায় তাতে বিশ্বনিয়ন্তার হিসেবের খাতায় একটি ডটও পড়বে না।

লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares