পারদ : জাহিদ হায়দার

গল্প

পারদ

জাহিদ হায়দার

কী বৃষ্টি! থামার নাম নেই। গাছপালা, ঘরবাড়ি, ঢাকা শহর, চলমান ও থেমে থাকা গাড়ি এবং অনেক মানুষ নিরুপায় হয়ে ভিজছে। অনেকে ভিজছে না। কেউ মাথা গুঁজেছে কোনো দোকানের ভেতর, কেউ কোনো অফিসের সিঁড়ির গোড়ায়। কোনো কোনো রাস্তায় হবে জলজট। উল্টে পড়বে রিকশা আর যাত্রী। আগামীকাল কাগজে করুণ ছবি দেখা যাবে। হয়তো তার পাশে মেয়রের একটি  ঘোষণাও  থাকবে : ‘আগামী বছর শহরে জলাবদ্ধতা থাকবে না।’ নাগরিকরা জানে, আগামী বছর আবার হবে। চলছে এভাবেই। শিলার মাথা ব্যথা কমছে না।

বৃষ্টির শব্দ ভাঙছে একলা থাকার নীরবতা। হালকা নীল কাচের উপর গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা দেখতে  শিলার ভালো লাগছে। তার মনে হয় এবং ইচ্ছা করে : কাচের উপর ধীরে গড়িয়ে পড়া শাদা পুঁতির মতো  ফোঁটা ফোঁটা পানির উপর অসুস্থ তর্জনী রাখে। গড়িয়ে পড়া  ফোঁটাকে অনুসরণ করে আঙুল। শিলা হেসে দেয়। আঙুল ভিজছে না অথচ ছুঁয়ে আছে বৃষ্টি। ফোঁটাগুলিকে পারদের বল মনে হয়। কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা হবে।

তিন দিন হলো জ্বর। সঙ্গে খুশখুশে কাশি। ডাক্তার বলেছে, তিনচার দিন পর রক্তের টেস্ট করলে ঠিকমতো  রেজাল্ট আসবে, চিকনগুনিয়া নাকি ডেঙ্গু।

শিলা জানে, অসুখ হলে যারা দেখতে আসে বা ফোনে খোঁজখবর নেয় তারা ডাক্তার না হয়েও চিকিৎসার পরামর্শ দেয়। যেন সবাই ডাক্তার। বাঙালিরা কাজে অকাজে যে বেশি কথা বলে, না জেনে কথা বলে, তার প্রমাণ পাওয়া যায়, কারও অসুখ হলে। অসুস্থ মানুষকে দেখতে আসলে কেউ কেউ সত্য সহানুভূতি দেখায়, কারও কারও সহানুভূতির মাত্রা বিরক্তিকর লাগে, বোঝা যায় একটা অভিনয় চলছে, কোনো সহজতা নেই। মনে হয়, আরিফও অভিনয় করত আমার সঙ্গে। কিছুদিন ওর সঙ্গ ভালো লেগেছিল। ওর চিন্তা ও চলাফেরায় টাকা, টাকা আর কখন কাকে টপকে যাবে এই চিন্তা। ভোগবাদী চিন্তাচেতনা ও সুবিধাবাদিতার পারফেক্ট প্রডাক্ট। প্রথম পরিচয়ের দু’দিন যেতে না যেতেই সেক্স করতে চাইলো। বলে কি না, ‘এটাকে একটা ফান হিসাবে নাও, তাহলে গিল্টি ফিলিং থাকবে না, তুমি তো মডার্ন মেয়ে।’ আধুনিক হওয়ার সঙ্গে, পরিচয়ের দু’দিনের মধ্যে সেক্স করবার সম্পর্ক কী, শিলা জানে না, বোঝে না।

দোতলার কোণার ঘর। খাটের উপর, জানলার পাশে, রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে শিলা। ঘরের আয়নায় দেখা যাচ্ছে ওর পেছনের একপাশ। মনে হচ্ছে, একটা ধূসর রঙা বানর ঘাড় ফিরিয়ে আছে। ধূসর চাদরে অর্ধেক শরীর জড়ানো।

চারদিকে এক ঝিমানো পরিবেশ। কোথাও থেকে স্মৃতির অবসাদ চোখের সামনে পর্দা দোলায়। মা এসেছিল। কী  খেতে চাই জানতে চাইলো। বলেছি, ‘মুখে স্বাদ নেই। তবে ঝাল কিছু দিতে পারো।’ মা জানে, আমি এক ভেতরমুখি মানুষ, যাকে বলে চাপা স্বভাবের। মাকে একদিন বলেছিলাম, ‘মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অনেকটা পারদের মতো, থার্মোমিটারের ভেতরে বা কোনো পাত্রে থাকলে সুন্দর, ভেঙে  গেলে পারদের টুকরোগুলো হাত দিয়ে ধরা যায় না।’ আমার কথা শোনার পর মা বুঝেছিল, আমার একটা প্রেম ছিল, ভেঙে গেছে।

সত্যি ছিল। চিন্তা আর শরীরের কোষে কোষে প্রেমের ঝড় বইতো। রাতগুলি ছিল ঘুমহীন। প্রায় সারারাত দুজন কথা বলতাম। কীসব অর্থহীন কথা। অর্থহীনতার মধ্যে বেঁচে থাকা। স্বপ্ন দেখা। কিন্তু কনটিনিউ করেনি। হয়তো আমিই কনটিনিউ করতে পারিনি। প্রেমের ভার বহন করা কষ্টকর, মনে হয়েছিল। কথাটা আশরাফকে বলিনি। আরিফের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগের ঘটনা ছিল ওই প্রেম।

 

১.

নদীতীর। শৈশবের নদী ইছামতি। নৌকা ভেসে যাচ্ছে। পালগুলি ডুবে মরা মানুষের ফুলে ওঠা পেটের মতো। বাতাস বইছিল। চুলে ঢেকে যাচ্ছিল মুখ। আমার বয়স তখন তের বা চৌদ্দ হবে। মিনেস্ট্রেশন হয়ে গেছে। পুরুষের চোখের সবরকম ভাষার অর্থ বুঝতে শুরু করেছি।

বিকালবেলা পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সঙ্গে ছিল বন্ধু সোনালি। হঠাৎ ঝড় উঠল। বালিতে চারদিক শাদা হয়ে গেল মুহূর্তে। আমরা দুজন একটি শ্যাওড়া গাছের নিচে দাঁড়ালাম। পাড়ার দুটি ছেলে, সোহেল আর জামাল দৌড়ে এসে আমাদের পাশে দাঁড়ালো। বয়সে আমাদের থেকে ওরা বড়। চারজনই চারজনকে চিনি। মুখোমুখি পড়লে কথা বলি। অন্ধকার হয়ে আসছিল। বৃষ্টি শুরু হলো। হঠাৎ সোহেল আমাকে, জামাল সোনালিকে জড়িয়ে ধরে। চুমু খায়। আমি সোহেলের হাতে কামড় মারি, সোনালি জামালের অ-কোষে লাত্থি মারে। জামাল আর্তনাদ করে বসে পড়ে। সোহেল আমাকে ছেড়ে দেয়। বৃষ্টির মধ্যে ওরা দৌড়ে পালায়। সত্যি বলতে কি, আমার যতবার ওই চুমুর ব্যাপারটা মনে হয়েছে, আমার শরীরের মধ্যে একটা সুন্দর ঢেউ বয়ে গেছে। মনে হয়েছে, জৈবিকতা একরকমের পারদ, উষ্ণতা খোঁজে, ঠান্ডায় জমে থাকে।

নদীর পাশে ছিল আমাদের বাঁশের বেড়ার পাঠশালা, এখনও আছে, বাঁশের বেড়া নেই, ইটের দেয়াল হয়েছে। নদীটা সরে গেছে। আমিও তো বড় হয়েছি। শৈশব থেকে সরে এসেছি। না আসিনি মনে হচ্ছে। দূরে ফেলে আসা শৈশব কৈশোর আর জীবনের পরের অংশ নিয়ে কথা বলছি। নিজের সঙ্গেই।

একদিন আমরা ক’জন, তখনও বাংলা স্যার ক্লাসে আসেননি, জানলার পাশে দাঁড়িয়ে নদীতে পালতোলা নৌকার যাওয়া আর ওপারের কয়েক ঘরের ছোট ছোট বসতি দেখছিলাম। চরে থাকা মানুষরা নিজেদের গ্রাম গড়ে তোলেনি। মাঝে মাঝে দমকা বাতাসে বালি উড়ছে। রোদের ভেতর ঝকঝক করছে রূপালি করোগেট টিনের চাল। হঠাৎ আমরা দেখি চরের মধ্যে ফায়ারব্রিগেডের দুটি লাল গাড়ি। উড়ন্ত বালির মধ্যে চারকোণা চলমান লাল দুটি বস্তু আমার ভালো লাগে। মনে হয়েছে, লাল দুটি বস্তু চলতেই থাকুক, যে-বাড়িতে আগুন লেগেছে সেখানে না গেলে কী আর হবে। আমরা ক’জন বলছিলাম, নদীর ওই পাড়ে ফায়ারব্রিগেডের গাড়ি কীভাবে গেল। সোনালি বললো, “অনুকুল ঠাকুরের আশ্রমের পাশে ইছামতী শুকনা, ‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে,’ ওখান দিয়েই গাড়ি গেছে।” অনেক দূরে একটি বা দু’তিনটি বাড়ি পুড়ছে আর আমরা কবিতা শুনে হাসলাম। আমাদের মধ্যে পারদ গরম হয়েছিল। নিষ্ঠুরতা করি, তখন বুঝিনি।

পরদিন জেনেছিলাম আমাদের সহপাঠী-রহিম, কাদের আর শরিফদের বাড়িতে আগুন লাগে। ওরা চর থেকে আসত।

শিলা জানলার বাইরে হাত দিল। চেষ্টা করছে বৃষ্টি ধরতে। কার্নিশ থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে। হাত নাগাল পায় না। বৃষ্টি ছেড়ে যাচ্ছে। তাকালো আকাশের দিকে। কোথাও নীল নেই। মেঘে ঢাকা। ‘সোনালি হঠাৎ মরে গেল কেন?’ প্রশ্নটা নিজেকে করবার পর শিলার মনে পড়ে, সোনালিরা গ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসবার আগের দিন লাল-নীল আর হলুদের ঢেউ খেলানো সুন্দর চারটি চীনা মার্বেল আমাকে দিয়েছিল। অনেকদিন ছিল আমার কাছে। যাবার সময় সোনালি বলেছিল, ঢাকা থেকে যখন আসবে, আরও মার্বেল আনবে। ওরা ঢাকায় চলে যাবার চার মাস পর খবর আসে সোনালি তিন দিনের জ্বরে এক সন্ধ্যায় মরে যায়। আমি হিসাব করে দেখেছি, তিন দিন আগে, ঠিক সন্ধ্যার সময় মার হাত থেকে থারমোমিটার পড়ে গিয়েছিল। বাড়িতে কারও জ্বর ছিল না। আমাদের পাশের বাড়ির আবু চাচার ছেলে অনুর জ্বর হয়েছিল। ওর বোন শেফালি আপা থারমোমিটার নিতে আসে। মার হাত থেকে থারমোটিার পড়ে যাবার পর মেঝের উপর পারদ ভেঙে ছোট ছোট বল হয়ে যায়, আমি বলেছিলাম, ‘শিশিরবিন্দু।’ পারদের টুকরোগুলিকে যতবার ধরতে যাই, পারছিলাম না, আরও টুকরো হয়ে যাচ্ছিল।

 

২.

তখন রূপকথা পড়ার বয়স। কথাটা ভেবে এখন হাসি পায় শিলার। রূপকথা সব বয়সেই পড়া যায়। সব মানুষের মধ্যেই রূপকথা আছে। যার মধ্যে রূপকথা নেই সে স্বপ্ন দেখতে পারে না। ‘সত্যি রাজপুত্র, রাজকন্যা কোথায় থাকে?’ আমার প্রশ্নের উত্তর বাবা দিতে পারেনি। রাজপুত্র আর রাজকন্যার রূপের অনেকরকম বর্ণনা বাবা দিয়েছিল, আমার মনে একটাও ধরেনি। লালকমল, নীলকমল আর কঙ্কাবতীরা হয়তো একদিন ছিল, যখন ছিল তখনও কেউ তাদের দ্যাখেনি। তাদের গল্পগুলি আমরা বারবার শুনে যাব। এই জ্বরের মধ্যে রূপকথা পড়তে ইচ্ছে করছে। বাবার বইয়ের আলমারিতে কোনো রূপকথা নেই। চারদিন আগে বাবার টেবিলে রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধসংগ্রহ দেখলাম। বইটার মধ্যে ছিল বুকমার্ক। খুলে দেখি ‘সভ্যতার সংকট।’ বাবা এই প্রবন্ধটি কতবার যে পড়েছে, তার হিসাব নেই এবং আমার ধারণা যতবার বাবা পড়ে ততবার বাবা এক সংকটে পড়ে যায়। বাবার চিন্তাচেতনার মধ্যে একরকমের পারদ নিঃশব্দে ওঠে-নামে। তা বেঁচে থাকার নাকি মৃত্যুবোধের, আমি বুঝতে পারি না।

আবার বৃষ্টি শুরু হলো। শিলা খাট থেকে নেমে ঘরে আলো জ্বাললো। বাল্বের বিপরীতের দেয়াল প্রতিদিনই দ্যাখে কিন্তু আগে কখনও শিলার মনে হয়নি, ওই দেয়াল একটা দাঁড়ানো মরুভূমি। অন্য দেয়ালের পাশে, মেঝের উপর একটা ছোট গাছ ছিল। শিলা গাছটাকে শাদা দেয়ালের, মানে মরুভূমির মতো মনে হওয়া দেয়ালটার গায়ের সঙ্গে লাগিয়ে দিল। এই কাজ ভালো লাগে তার। মনে হলো, একটা সেলফি তুলে দু’তিনজন বন্ধুকে পাঠানো যেতে পারে। তোলেনি। নিজেকে প্রশ্ন করে, ‘একটা ইচ্ছে মনের মধ্যে জেগে উঠেই মরে যাচ্ছে কেন?’ কিছুক্ষণ উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে।

১.            আমি হতাশার একজন জাতক হয়ে উঠছি,

২.            আমার বেঁচে থাকবার সময়পরিধির মধ্যে এমন এক নেতিবাচক কাজকর্ম চলছে যা আমাকে স্বপ্ন দেখায় না,

৩.           যৌনতাবোধ কী কমে যাচ্ছে? প্রেমবোধ কমে যাচ্ছে? শরীর তো শরীর চায়। যদিও এই ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত আমার সেক্স করবার কোনো অভিজ্ঞতা হয়নি। আমার কোনো কোনো বান্ধবীর হয়েছে। এবং তারা অভিজ্ঞতার গল্পও করেছে।  যৌবনকে ক্ষুধার্ত রাখা কি ঠিক?

৪.            মাঝে মাঝে হত্যা করবার বোধ জাগে কেন? মানুষ সবসময়ই শিকারি। মন মতো শিকার আজও করতে পারিনি বলে, মনে হয় মনের অবচেতনে হতাশা আছে।

৩.

নিজের কপালে হাত দিল। জ্বর বেড়ে যাচ্ছে।

কিছুদনি আগে সেলিম নামের একজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। বাসায়ও এসেছিল। শহরের কোথাও  আর্ট-একজিবিশন হলে সেলিম যাবেই। জাদুঘরের এক আর্ট-একজিবিশনে পরিচয় হয়। আকাশ আর পাতাল এক করে কথা বলে। মনে হয়, সবসময় রঙের জগতে ভাসছে।  কেউ তাকে ধরতে পারবে না। সে ধরাও দেবে না। আর তার ওই স্বভাব বা প্রবণতা খুব আকর্ষণ করে, ভেতর থেকে টান মারে। পরিচয়ের তিন দিনের মাথায় আমাকে বললো, ‘মানুষের দায়িত্ব আমি কোনোদিন নেব না, মানে বিয়ে কখনও করব না। নারীর সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায়, প্রয়োজনে সেক্স করা যায়, তার থেকে বেশি কিছু না, মানুষ সবসময়ই একাকী।’ আমার মনে হয়েছিল, ওইসব কথাবার্তা একটা বিশেষ কায়দা, মেয়েদের মুগ্ধ করবার কায়দা। ক’দিন যাবার পর মনে হয়, সেলিমের আচার আচরণ, কথাবার্তা, কাপড় পরার মধ্যে কোনো দায়বদ্ধতা নেই। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই এক চির সন্ন্যাসী।

শিলা সেলিমকে ফোন করে। আসতে বলে। ও জানায়, রাত আটার আগে সময় পেলে আসবে। শিলা জানতে চেয়েছিল, সেলিম কোথায়। আর্ট কলেজে ছিল তখন। তরুণ শিল্পীদের আঁকা ছবি দেখছিল।

সেলিম আসেনি। ফোনও করেনি।

বৃষ্টি পড়ছে আগের মতোই। অনেকগুলি ছেঁড়া ছেঁড়া গল্পের মধ্যে নিজেকে রাখতে আর ভালো লাগছে না। আরিফের কথা মনে পড়লো। ‘হ্যামলেট’ দেখার পর ও বলেছিল : ‘শেক্সপিয়ার হ্যামলেটিয় কমপ্লেক্স তৈরি করেছেন।’ ইডিপাস ও ইলেকট্রা কমপ্লেক্সের কথা জানতাম। আরিফকে ‘হ্যামলেটিয় কমপ্লেক্স’ কী জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল : টু বি অর নট টু বি দ্যাট ইজ দ্য কোশ্চেন।’ বলেই কী হাসি।

জ্বর মাপতে হবে। ডাক্তার বলে গেছেন, দু’ঘণ্টা পরপর জ্বর কত হয় দেখে লিখে রাখতে হবে। অর্ধেক পানি ভরা গ্লাসে ছিল থার্মোমিটার। শিলা গ্লাস থেকে থার্মোমিটার নিল। ঝাঁকি দিতে যেয়ে টেবিলের কোণায় লেগে থার্মোমিটার ভেঙে যায়। পারদ ছিটকে পড়ে হালকা গোলাপি টাইলসের মেঝের উপর। বেশ বড় মুক্তার মতো  তিনচারটে রূপালি বল মেঝের উপর পড়ে দৌড়ে এদিক-ওদিক ছিটকে গেল।

শিলা বিছানা থেকে নামে। খুব সতর্কভাবে, যেন এক গোপন কাজ, কেউ দেখে ফেললে অপরাধ হবে, ডান হাতের তর্জনী দিয়ে পারদের একটি বল একটু দূরে পড়ে থাকা আর একটি পারদের বলের কাছে নিয়ে আসতে চাইলো। আঙুল লাগতেই পারদ আরও দু’তিনটি ছোট ছোট বল হয়ে ছুটে গেল হাতের লাগালের বাইরে।  মেঝের উপর পড়ে থাকা সবগুলি পারদ একসঙ্গে করবার চেষ্টা করে। হচ্ছে না।

শিলার মনে পড়ে, শৈশব, বাবার মুখ, চরের মধ্যে আগুন লাগা বাড়ি, ‘সভ্যতার সংকট’, সোনালির হারিয়ে যাওয়া, আরিফের হ্যামলেটিয় কমপ্লেক্স, সেলিমের না আসা, মার চিন্তিত মুখ এই সবকিছু রুপালি পারদের ছোট ছোট বল।

পারদগুলির দিকে তাকিয়ে শিলা নিজেকেই বলে : ‘ব্রোকেন ড্রিমস।’

লেখক : কথাশিল্পী

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares