সুলালের কথা : হরিশংকর জলদাস

গল্প

সুলালের কথা

হরিশংকর জলদাস

 

আ র কেউ বুঝতে না পারলেও শিবুর চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারটি সুধাংশু বুঝতে পেরেছিল।

সে রাতে পাশাপাশি শুয়েছিল শিবু আর সুলেখা। অনেক রাত। দুজনেই চিৎ হয়ে শুয়েছিল। ঘর অন্ধকার। শুধু দূরের দেয়ালে নীল রঙের একটা ডিমলাইট জ্বলছে। ডিমলাইটের আলোতে ঘরের অন্ধকারটা একটু পাতলা হয়েছে। টাঙানো মশারি ভেদ করে ওই আলো ভেতরে পৌঁছাচ্ছে না। অস্পষ্ট দুটো শরীর পাশাপাশি শুয়ে আছে। সুলেখার অবয়ব আন্দাজ করতে শিবুর তেমন অসুবিধা হচ্ছে না। সরু ধারালো নাক, পাতলা ঠোঁট, চিকন ভ্রƒ, মিষ্টি থুতনিÑ এসব নিয়ে ঈষৎ লম্বাটে মুখম-লটি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে শিবু। তার চোখ দুটো অন্ধকার-সওয়া হয়ে গেছে এর মধ্যে। তাছাড়া দীর্ঘদিনের দেখার অভিজ্ঞতা সুলেখার চেহারাটাকে বুঝে নিতে সহায়তা করছে শিবুকে।

সুলেখা কি ঘুমিয়ে গেছেÑ ভাবছে শিবশঙ্কর। ঘুমিয়ে পড়াটা স্বাভাবিক। যা ধকল যায় সারাটা দিন! ঘরকন্নার কাজ কি কম! মায়েরও বয়স হয়ে গেছে। আগের মতো মা সংসারের কাজ করতে পারে না। সুলেখা হাত লাগায়। শিবু আশা করেছিলÑ সত্যব্রতের বউ এলে সুলেখার কাজ কমবে। কিন্তু আদতে তা হয়নি। মা বা স্ত্রী তাকে খুলেমেলে না বললেও শিবুর এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না, সংসারের কাজে সত্যের বউ হাত লাগতে রাজি নয়। সব বউই তো ঘরকন্নার কাজে নিজেকে জড়িয়ে নেয়। সত্যের বউ রানিবালা নয় কেন? সত্যের প্রশ্রয় আছে কি? সত্যের আচরণে খামতি দেখেছে শিবু। আগের মতো নরমশরম ব্যবহার করে না সত্যব্রত। কী রকম যেন উদ্ধত, কিছুটা  হিংস্রও যেন। সীতানাথ আর সত্যব্রতের মধ্যে এক ধরনের আঁতাত দেখতে পাচ্ছে ইদানীং। সীতানাথ আগে থেকেই উচ্ছৃঙ্খল। সত্যব্রতের আশকারায় সে যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। চেয়ে দেখল- সুলেখার হাত দুটো বুকের ওপর গুটানো। মৃদু লয়ে বুক ওঠানামা করছে। সুলেখার বুকের ওপর ডান হাতটা রাখতে গিয়ে বিরত থাকল শিবু। চিৎ হয়ে শুয়ে রইল সে।

কাল থেকে সে আর স্কুলে যাবে না। হয়তো কর্তৃপক্ষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করবে, চাকরি ছাড়ার কারণ জানতে চাইবে। কী জানাবে সে ওদের? সভাপতির নোংরা আচরণের কথা বলবে সে ওদের? সভাপতি হয়ে যে হায়দার সাহেব এরকম অনুদার সাম্প্রদায়িক, সেই লোকের কমিটিও আর কতটুকু মানবিক হবে? তারাও যে ভেতরে ভেতরে সাম্প্রদায়িক নয়, তার প্রমাণ কোথায়? যতই সাধাসাধি করুক, আর নয় সাজনমেঘ হাইস্কুলে।

মিনিট, ঘণ্টা করে করে রাত সকালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই ঘুম আসছে না শিবুর চোখে। কাল সকালে সে যখন স্কুলে যাবার প্রস্তুতি নেবে না, সুলেখাকে তাড়া দেবে না নাস্তা দেওয়ার জন্য, সবাই যে সচকিত হয়ে উঠবে। একদিনের জন্য ছুটি নিয়েছে বলে হয়তো কালকের দিনটা পার করা যাবে। কিন্তু পর পর কয়েকদিন যখন সে স্কুলে যাবে না, তখন তো সবাই সন্দিগ্ধ হয়ে উঠবে। বড় হইচই পড়ে যাবে তখন বাড়িতে।

কী করা দরকার শিবশঙ্করের! চাকরি ছাড়ার কথা সবাইকে বলে দেবে? না লুকিয়ে রাখবে কথাটা? কিন্তু কতদিন লুকিয়ে রাখা যাবে চাকরি ছাড়ার কথাটা? ভেবে কূল পায় না শিবু।

অনেকক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে থাকে শিবু। হঠাৎ সে বলে ওঠে, ‘তুমি ঘুমাচ্ছো সুলেখা?’

সুলেখার ঘুম বড্ড পাতলা। শিবুর  কথায় তার ঘুম ভেঙে গেল। ভড়কানো গলায় বলল, ‘কী! তুমি ঘুমাওনি এখনও!’

‘না।’ মৃদুকণ্ঠে বলল শিবু।

‘তোমাকে একটা কথা বলতে চাই সুলেখা।’ আবার বলল শিবশঙ্কর।

‘কী কথা! এত রাতে! দুঃস্বপ্ন দেখেছো! খারাপ কিছু!’ একনাগাড়ে বলে গেল সুলেখা।

‘ভয় পেয়ো না। শান্ত হও।’ হালকাস্বরে বলল শিবু।

‘কী ব্যাপার বলো তো!’ সুলেখার কণ্ঠস্বরে অস্থিরতা।

‘কাল থেকে আমি আর স্কুলে যাবো না।’

মানে! স্কুলে যবো না মানে!’ ধড়মড় করে উঠে বসল বিছানায়।

‘চাকরিটা আমি ছেড়ে দিয়েছি।’

নির্বাক হয়ে গেল সুলেখা। বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে? মনোমালিন্য?’

‘অপমান করেছে ওরা! ওরা মানে স্কুলের সভাপতি হায়দার সাহেব।’

‘তোমার কথার সবটুকু বুঝে উঠতে পারছি না আমি। একটু খোলসা করে বলো।’

ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসল সুলেখা।  শিবশঙ্কর উঠে খাটে ঠেস দিয়ে বসল। তারপর আদ্যোপান্ত সবকিছু খুলে বলল সুলেখাকে।

সবশেষে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি বলো এখন সুলেখা, আমার কি আর ওই স্কুলে যাওয়া উচিত?’

মুহূর্তকাল দেরি না করে সুলেখা বলল, ‘না। কিছুতেই না।’

বড় একটা স্বস্তির শ্বাস বেরিয়ে এল শিবুর গলা চিরে। বলল, ‘তুমি আমায় বাঁচালে সুলেখা। বিকাল থেকে বড় কষ্ট পাচ্ছিলাম। পরিবারের কথা ভেবে ভেবে বড় অস্বস্তি লাগছিল আমার। আমার আয়টা বন্ধ হয়ে গেলে বাবা-মা বড় বেকায়দায় পড়ে যাবে।’

‘বেকায়দায় পড়বেন কেন? তুমি টিউশনি করবে। গোটাচারেক টিউশনি করলে হেডমাস্টারের বেতনের চেয়ে অনেক বেশি আয় হবে তোমার।’

‘হেডমাস্টারি ছেড়ে টিউশনি! বাড়ি বাড়ি! ভিক্ষুকের মতো!’

স্বামীর কথা শুনে কাছে এগিয়ে এল সুলেখা। শিবুর খোলা বুকে ডান হাতটা রেখে বলল, ‘দেখো, ভেঙে পড়ো না। ধরে নাও এটা তোমার একটা পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় তুমি হারবে না, রাতের পর সকাল আসে। আমি নিশ্চিত, এসব তুমি একদিন কাটিয়ে উঠবে।’

শিবশঙ্কর আর কোনো কথা বলল না। সুলেখাকে বুকের কাছে টেনে নিল।

ওরাতেই ঠিক হলোÑ চাকরি ছাড়ার ব্যাপারটি পরিবারের কাউকে বলবে না ওরা। বাড়ি বাড়ি টিউশনি শুরু করবে শিবু। বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকবে।

 

না বললেও শিবুর চাকরি ছাড়ার ব্যাপারটি সুধাংশু বুঝে গেল একদিন।

প্রথম দিকের দু’তিনদিন পরিবারের মধ্যে কোনো কৌতূহল তৈরি হয়নি। ভেবেছে- হয়তো স্কুলে লম্বা কোনো ছুটি হয়েছে। নানা পালা-পার্বণ, জাতীয় দিবস- এসবের তো ছুটিছাটা আছেই। সুধাংশুর হঠাৎ সন্দেহ হলো- শিবুর স্কুলে না যাওয়ার অন্য কোনো কারণ নেই তো? সেদিন কাটগড় বাজারে মাছ বেচতে যাওয়ার সময় দেখল- দল বেঁধে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, পতেঙ্গা হাইস্কুলে। কৌতূহল চাগিয়ে উঠল সুধাংশুর মধ্যে। মাথাতোলা এক পড়ুয়াকে জিজ্ঞেস করল- তোমাগো ইস্কুল খোলা বাজান? বন্ধ চইলছে নি তোমাগো ইস্কুলে? ছেলেটি ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ল। মুখে বলল, কই কুনু বন্ধ চলে না ত। ইস্কুল ত পুরাদমে খোলা। আর কিছু জিজ্ঞাস করেনি সুধাংশু। ভেতরটা হঠাৎ ক্ষেপে  উঠেছিল শুধু। তাহলে শিবু স্কুলে যাচ্ছে না কেন? কোনো কিছু কি হয়েছে?

দু’দিন চুপচাপ থেকেছিল সুধাংশু। তৃতীয় দিন বিকেলের দিকে বলেছিল, ‘এই বেলা কি তোমার কুনু কাজ আছে বাপ?’

শিবু চকিতে বাপের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে মাথা নামিয়েছিল। মৃদু গলায় বলেছিল, ‘না বাবা, কোনো কাজ নেই আমার।’

‘তাইলে বাবা চল আমরা একটু সমুদ্রপাড় থেইকে বেড়াইয়া আসি।’

শিবশঙ্কর বুঝতে পারে বাপ সুধাংশ তাকে কিছু বলতে চায়। অবশ্যই তা গুরুত্বপূর্ণ। সে এ-ও বুঝতে পারে- বাপ যা বলতে চায়, তা জনসমক্ষে বলতে চায় না। কী হতে পারে? কোন ব্যাপারে কথা বলতে চায় বাবা? শিবু কিছু একটা আন্দাজ করে। তবে তা মনের মধ্যে চেপে রাখে। বাপকে বাড়তি কিছু আর জিজ্ঞেস করে না।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে গেছে। ভাটা বোধহয়। কূলের জল অনেকদূরে সরে গেছে। সমুদ্র নিস্তরঙ্গ। শুধু মৃদু একটা ধ্বনি  শিবু আর সুধাংশুর কানে এসে বাজছে।

‘আমি বুইঝতে পারিছি বাবা ইস্কুলে কিছু একটা হইয়েছে।’ ভূমিকা না করে বলল সুধাংশু। বাপ-ছেলে সমুদ্র কূলের বেড়িবাঁধে পাশাপাশি বসেছে।

শিবশঙ্কর চমকে উঠল না। হাঁ করে বাবার দিকে একটু তাকাল শুধু। সে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। তাই বাবার প্রশ্নে কোনো রাখঢাকে গেল না। আগাগোড়া সবকথা বাপের কাছে খুলে বলল শিবু । ভেবেছিলÑ তার দরিদ্র বাপটি চাকরি ছাড়ার ব্যাপারটি জানতে পেরে হাহাকার করে উঠবে। হা-হুতাশে গোটা সমুদ্রপাড়কে তোলপাড় করে ছাড়বে। বলবেÑ এখন আমাদের কী হবে বাপ! তোমার চারশ টাকা বেতনও তো কম নয় আমাদের পরিবারের জন্য! একটা বড় ধরনের চাহিদা তো মিটত  তোমার বেতন দিয়ে! বঙ্গ-সাগরেও এখন মাছের কমতি। গত বছরখানেক ধরে সমুদ্রে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। সংসারের টানাটানিটা বেড়ে গেছে বড়। এই সময় তুমি চাকরিটা ছাড়লে যে বড় ধাক্কা খাব রে বাপ! হায়দার সাহেব বলেছেন বলেছেন। ওতে তুমি কিছু মনে করো না। অন্নদাতারা এমনই হন। একটু বদমেজাজি, একটু সুযোগ সন্ধানী। সভাপতির ভাগ্নেটাকে প্রমোশন দিয়ে দিলে তোমার এমন কী ক্ষতি! তুমি যাও বাবা, স্কুলে ফিরে যাও। সভাপতি হায়দার সাহেবের সঙ্গে দেখা করো। একটু চোখ গরম করলে চুপ থেকো। আপনাতেই ঠান্ডা হয়ে যাবেন তিনি। তোমার যে চাকরিটা করা ভীষণ দরকার বাপ। পরিবারের অস্তিত্বের জন্য যে দরকার।

কিন্তু কী আশ্চর্য! সুধাংশু এর কিছুই বলল না। স্থির চোখে পুত্রের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল শুধু। তারপর হঠাৎ পুত্রের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শিবশঙ্করকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে  হু হু করে উঠল।

অনেকক্ষণ পরে বুকের বাঁধন আলগা করে বলল, ‘আমি অশিক্ষিত একজন জেলে বাপ। সারাজীবন কারও কাছে কুনু সন্মান পাই নাই। অকারণে অপমান পাইছি মানুষের কাছে থেইকে। প্রতিবাদ কইরতে পারি নাই। তুমি, বাপ সেই অপমানের প্রতিশোধ লইছ। আমি যা কইরতে পারি নাই, তুমি তা কইরে দেখাইছ রে বাপ। তারপর কণ্ঠে প্রচুর আনন্দ ঢেলে সুধাংশ বলেছে, ‘চুলায় যাক তোমার হেডমাস্টারি। অই  চাকরির দরকার  নাই। কইরতে হইবে না তোমার অই হেডমাস্টারি।’

বিরাট একটা জগদ্দল পাথর যেন শিবশঙ্করের বুকের ওপর থেকে নেমে গেল। বাবার কথা শুনে তার দুচোখ ফেটে জল আসতে চাইল। অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরণ করল শিবু।

বাপে ছেলে পাশাপাশি সেই নির্জন কোলাহলহীন সমুদ্রপাড়ে অনেকক্ষণ বসে থাকল।

একসময় সুধাংশু বলল, ‘তুমি ভাইবো না শিবু। নাড়ি দিছেন যিনি, অন্ন জোগাইবেন তিনি।’ বলে  জোড়হাত কপালে ঠেকাল সুধাংশু। অদৃশ্যমান, অস্তিত্বহীন ঈশ্বরের উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে বড়ই তৃপ্তি পেল সুধাংশু। বাপের কথা শুনে নিজের ভেতরে খুব জোর অনুভব করল শিবশঙ্কর।

বলল, ‘বাবা, টিউশনি করব আমি। আমার এমএ পাসটা কি বৃথা যাবে! নিশ্চয় না। দেখো, একদিন না একদিন আমি দাঁড়াবই।’

‘একখান কথা বাপ। তোমার ভাইদের মইধ্যে দুইজন খুব বেয়াড়া। সইত্য আর সীতানাথের কথা কইতেছি আমি। যদি, কুনুদিন গায়েলাগা কথা কয় ওরা সইয্য কইরো। বড় ভাই তুমি। ওদের কথাগুলাকে উড়াইয়া দিও।’

সেই সন্ধ্যায় গভীর একটা তৃপ্তি নিয়ে বাড়িতে ফিরেছিল বাপে আর বেটায়।

 

এখন তিন তিনটা টিউশনি করে শিবশঙ্কর। বাড়ি বাড়ি। তিন মাইল ঠেঙিয়ে সল্টগোলার ট্রাকমালিক সোবাহান সাহেবের নাইনে পড়–য়া মেয়েকে পড়াতে হয়। রেহানা ভালো ছাত্রী। শান্ত মনোযোগী। অন্যটা রিফাইনারির এক অফিসারের ছেলে। পরেরটা পরেশবাবুর বাউ-ুলে ছেলে নন্টু। নন্টু মানে নটেবর। বাদরামির জন্য নটেবর মানুষের কাছে নন্টু হয়ে গেছে। তাকে সামাল দিতে বড় বেগ পেতে হয় শিবশঙ্করকে। অথচ পরেশবাবুই মাসমাইনেটা মাসের প্রথম তরিখে দিয়ে দেন। সোবাহান সাহেব টিউশন ফি দিতে বড় ধানাইপানাই করেন। আজ নয় কাল করে করে শুধু শুধু ভাড়াতে থাকেন। দেন যখন, খুচরো খুচরো দেন।

কী আশ্চর্য! স্কুল থেকে কোনো খবরই নিলেন না তাঁরা। কেন চাকরি ছাড়লÑ এর কোনো ব্যাখ্যাই চাইল না স্কুল কর্তৃপক্ষ। হয়তো হায়দার সাহেব স্কুল কমিটিকে ভুল বুঝিয়েছেন অথবা আবোলতাবোল বলে তাঁদের কানভারী করেছেন তিনি।

এক বিকেলে নটেবরকে পড়াতে গিয়ে সুলালের সঙ্গে দেখা শিবুর। সুলাল তার ক্লাসমেট ছিল। এইট পর্যন্ত। তারপর দেশ ছেড়েছিল সুলালরা।

পরেশবাবুর বাড়িটা হিন্দু পাড়ার মাঝখানে। পরেশবাবুর স্বর্ণের দোকান। বাড়িটাও তা-ই ওদের থেকে আলাদা। ইটের একতালা বাড়ি। বড়সড় উঠান। ধানের গোলা। পাশের পুকুর মাছে ভর্তি। পরেশবাবুর স্ত্রী বড় আদর করেন  শিবুকে। থালাভর্তি জলখাবার দেন। বাবা-মা-পরিবার-পরিজনের কথা জিজ্ঞেস করেন। ছেলে যে বেজায় বেতমিজ জানেন পরেশ গিন্নি। বলেন, ‘বাবা আমার বেয়াড়া ছাওয়ালটারে একটু মানুষ কইরে দিতে পারো কিনা দেখ। সে যেন তোমার মতো হয়।’

শিবশঙ্কর হাসিমুখ করে পরেশগিন্নির দিকে তাকায়। মনে মনে বলেÑ তার মতো বিদ্বান অথচ বেকার ছেলে নিয়ে কী করবেন মাসিমা?

সুলাল প্রথমে শিবুকে চিনতে পারেনি, শিবশঙ্করও। সুলালদের বাড়ির পাশ দিয়ে মাটির পথটি বেয়ে পরেশবাবুদের বাড়িতে যেতে হয়। পরস্পরকে ছাড়িয়ে দু’কদম এগিয়েও গেছে দুজনে। দুজন একসঙ্গে ফিরেও তাকিয়েছিল। চোখে গভীর ছায়া ফেলে শিবু ফিরে এসেছিল সুলালের নিকটে।

সুলাল বলে উঠেছিল, ‘আরে শিবু না?’

‘সুলাল!’ বিস্মিত কণ্ঠস্বর শিবুর।

‘বডিটা তো বেশ বাগিয়েছিস রে বেটা।’ বিচিত্র একটা ভঙ্গি করে বলল সুলাল।

শিবু আমতা আমতা করে কী যেন বলতে চাইল। সুলালের চোখমুখের নাড়াচাড়া আর কথার ধরন দেখে থমকে গেল। সুলাল এমন একটা বেমক্কা প্রশ্ন করছে, যার উত্তর কী দেবে বুঝে উঠতে পারছিল না শিবু।

‘কী ব্যাপার তোর রেডিও অফ যে! কোনো সাউন্ড বের হচ্ছে না কেন?’

শিবু ভাবছে- সুলাল এ কী ভাষায় কথা বলছে? সব কথার মানে মাথায় ঢুকছে না যে তার!

এক পর্যায়ে শিবু বলল, ‘কী করব ভাই, এমনিতেই শরীরটা ওরকম হয়েছে।’

‘ছোটবেলায় হেভি লালটু ছিলি। এখনো তো দেখি ছক্কা হাঁকানোর শরীর। তা আছিস ক্যামন?

‘ভালো।’

‘শুধুই ভালো। তা তোর মালটা কেমন?’

‘মালটা মানে!’

‘তুই এখনও দেখি ল্যাবাগোবা রয়ে গেছিস। তোর বউয়ের কথা জিজ্ঞেস করছি।’

‘ল্যাবাগোবা মানে কী!’ সুলালের শেষ প্রশ্নটা মাথায় ঢুকল না শিবুর।

‘কীরে শিবু তোর সার্কিটটা তো এক্কেবারে বসে গেছে। মেকানিকের কাছে নিয়ে যেতে হবে মনে হয় তোকে।’

 

উত্তর পতেঙ্গার হিন্দুপাড়ায় সুলালদের বাড়ি ছিল। গাছগাছালিতে ভরা। সামনে উঠান ছিল বড়, পুকুরও ছিল। এখনও সব আছে, নেই শুধু সুলালরা। সুলালরা মানে সুলাল আর তার মা-বাপ। বড়ভাই আছেÑ দুলাল। দুলাল মজুমদার সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়াত। সেদিনের সেই অপমান-অপদস্থতার পর সবাই দেশ ছেড়েছিল। যায়নি শুধু দুলাল। তার কাছে চাকরিটা জরুরি ছিল। দুলালকে বাড়িতে রেখে রঘুনাথবাবু স্ত্রী আর ছোটছেলে সুলালকে নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন।

চৌষট্টি সালের দিকে মাৎস্যন্যায় চলেছিল পূর্ব পাকিস্তানে। আইয়ুবি শাসনের সাম্প্রাদায়িক ধাক্কা উত্তর পতেঙ্গার মতো প্রত্যন্ত গ্রামেও এসে লাগছে তখন। দিনকয়েক আগে নান্টু খলিফাকে হাটশেষে বাড়ি ফিরবার সময় কাউয়ার পুকুর পাড়ের ঘন ঘাসের মধ্যে নিয়ে গিয়ে কোপানো হলো। রাতের আঁধারে কে এই নিরীহ লোকটিকে হত্যা করল, তদন্তহীন থেকে গেল তা। গোটা হিন্দুপাড়াজুড়ে আতঙ্ক। সুলালদের বাড়ির পাশের জমিনঘেঁষে পুরানো দিনের একটা সেগুন গাছ ছিল। রঘুনাথবাবুর পরদাদার আমলের গাছ। সেদিন সকালে ওই গাছের গোড়ায় কোপ পড়ল। হারুন কসাই ওই গাছটি কেটে নিয়ে যাবে। দড়িকাছি আর জন তিনেক কাঠুরিয়া নিয়ে এসেছে সে। দাবি করছেÑ ওই সেগুন গাছটি তারই।

অবাক হয়ে রঘুবাবু বলেন, ‘হারুন, এই গাছ তোমার হল কীভাবে? পুরুষানুক্রমে এই গাছ আমাদের। আমাদের জমিতেই তো এই গাছটি।’

হারুন কসাই চোখ গরম করে বলে, ‘তোমাদের আবার গাছ কী, জমি কী? এসব তো আমাদের জমি। মুসলমানের জমি। পাকিস্তানে হিন্দুদের আবার জমি কী!’

‘কী যে কওনা হারুণ ভাই, মগের মুল্লুক পেয়েছো নাকি? যা ইচ্ছা তা-ই করবে! আজ গাছ কেটে নিয়ে যাবে। কাল পুকুরে জাল ছিটাবে! পরদিন ঘরে ঢুকবে।’

‘তাই তো করবো মালাউনের বাইচ্চা। জানে বেঁচে থাকতে চাইলে রা করিস না।’

সুলাল বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে। এইটে পড়লে কী হবে, গাঁট্টাগোট্টা শরীর তার। হারুন কসাইয়ের দিকে এগিয়েছিল সে। হারুন কোপ তুলেছিল। রঘুবাবু সুলালকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে না দিলে কোপটা সুলালের মাথাতেই পড়ত। দু’ফাঁক হয়ে যেত মাথাটা। দুলাল তখন স্কুলে। সুলালের মা হাহাকারে বুক ফাটিয়েছিল।

যাবার সময় হারুন বলেছিল, জানে বেঁচে থাকতে চাইলে ইন্ডিয়ায় চলে যা। নইলে নান্টু খলিফার মতো অবস্থা হবে।’

রঘুনাথ সেই সকালে চেয়ারম্যান-মেম্বারের বাড়িতে অনেক দৌড়ঝাঁপ দিয়েছিল, কিন্তু কিছুর কিছু হয়নি। হারুন কসাই সেগুন গাছটি কেটি নিয়ে গিয়েছিল পরদিন।

অপমানে আর ভয়ে দেশ ছেড়েছিল রঘুনাথবাবু, সপরিবারে। দুলাল মজুমদার যায়নি ওপারে। ও-ই বাড়িটা পাহারা দিয়ে রেখেছিল। অনেক ঝড়ঝাপটা গেছে দুলালের ওপর দিয়ে। দুলাল মাটি কামড়ে বাড়িটাতে থেকে গিয়েছে।

বহু বছর পরে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার আরও বহু বছর পরে, সুলাল এসেছে নিজ জন্মভূমিতে। মা আর বাবা মারা গেছে অনেককাল। বারাসাতে একটা ঘর তুলেছিল রঘুনাথবাবু। ওখানেই সুলালের থিতু হওয়া। বউবাচ্চা  করা।

বারাসাতে গিয়েই পাড়ার মাস্তানদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল সুলাল। মারপিট, দোকান দখল, চাঁদাবাজিÑ এসব সদলেবলে করে বেড়াত সে।

মদখাওয়াটা তার ধাতে সয়ে গিয়েছিল। কড়া বাংলাতেই সে আনন্দ পেত বেশি। আস্তে আস্তে সে সুলাল থেকে লালু হয়ে গিয়েছিল। লোকেরা আবডালে তাকে লালু মাস্তান ডাকা শুরু করেছিল। বাপের ছনের ঘরের জায়গায় দালান তুলেছিল, একতলা। এসব করতে করতেও তার বারবার পূর্ব পাকিস্তানের বাড়িটির কথা মনে পড়ত। সেগুন গাছটির কথা মনে পড়ত। বারবার চোখের ওপর ভেসে উঠত হারুন কসাইয়ের কোপ মারার দৃশ্যটি। প্রথম প্রথম উঃ বলে মুখ ঢাকত সুলাল। সেই সুলাল এসেছে পিতৃভূমিতে। বয়স হয়েছে তার। কিন্তু সেদিনের ক্রোধটা মরেনি।

 

সুলালের কথা বলার ধরন দেখে শিবশঙ্কর একটু যে ভড়কে যায়নি, এমন নয়। সুলালের কথার অধিকাংশের মানে সে ধরতে পারছে না। আবার সুলালকে এড়িয়ে যেতেও ইচ্ছে করছে না। স্কুলজীবনে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল সুলাল।

শিবু বলল, ‘দেখ সুলাল, তোর কথার মানেগুলো ঠিকঠাক মতন আমি বুঝে উঠতে পারছি না। যাকগে, কেমন আছিস বল।’

সুলালের চোখ দুটো একটু চিক চিক করে উঠল যেন। হঠাৎ সুলাল ডানে ঘাড়টা ঘুরাল। একটু দূরে দুটো সেগুন গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এই গাছ দুটো হারুনের কেটে নিয়ে যাওয়া সেগুন গাছটির গোড়া থেকেই উঠেছে। ওদের পাতাগুলো বাতাসে নড়ছে।

চোখ ফিরিয়ে নিল সুলাল। কী রকম একটা শ্বাস  ফেলল। বলল, ‘ভালো আছি। তোদের চেয়েও ফাইন আছি।’

‘তা এতদিন পরে এলি যে!’

সুলালের চোখ দুটো কীরকম করে হঠাৎ জ্বলে উঠল। ডান হাতটা দিয়ে কপালে ঝাঁপিয়ে-পড়া চুলগুলো এক ঝটকায় পেছনে সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘হারুইন্যার পোঁদে ফুঁ দিতে এসেছি। তৈয়ার হতে সময় লেগেছে বলে আসতে দেরি হয়েছে।’

সুলালের কথা এবারও কিছু বুঝল না শিবু। বোকাসোকা চাউনি নিয়ে সুলালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকল।

‘কীরে বোকাচোদা, এই সকালে মাল টেনেছিস নাকি? কথা বলছিস না যে রে?’

শিবু বুঝতে চেষ্টা করলÑ এই সুলাল আর আগের সুলালে মধ্যে বিস্তর ফারাক। স্কুলজীবনের সুলাল তেমন বেশি কথা বলত না। মাঝে-মধ্যে মোক্ষম দু’একটি এমন কথা বলত, সহপাঠীরা না হেসে পারত না। কথা বলত শিশির, শিশির চৌধুরী। ছোটখাটো শিশির গোলগাল ছিল। গাঁময় ছুটে বেড়াত, তার পেছনে থাকত তিনচারজন সাগরেদ। আম-জাম-কাঁঠাল পেরে খেয়ে ছুটির দিনের দুপুরটা কাবার করে দিত শিশিররা। সুলালের মধ্যে সেরকম দস্যিপনা ছিল না। অনেকটা নিরীহ শান্ত প্রকৃতির ছিল সুলাল।

একবারের কথা মনে পড়ে শিবশঙ্করের। সেই বিকালে শিশিররা শিবুদের বাড়িতে গিয়েছিল। কেন জানি সুলালও ছিল সেই দলে সেদিন। শিশির হঠাৎ বলেছিল, ‘আমার খুব তেষ্টা পেয়েছে রে শিবু। জল দে।’

শিশিরের সঙ্গে অন্যরাও সেবেলা শিবুর বাড়িতে জল খেলেও সুলাল জল খায়নি। এড়িয়ে গিয়েছিল। শিশিরের জোরাজুরিতে বলেছিল, ‘বাবা মানা করেছে জেলেদের বাড়িতে কিছু না খাওয়ার জন্য।’

শিশির শুধিয়েছিল, ‘খেলে কি হবে রে?’

নিচুগলায় সুলাল বলেছিল, ‘জাত যাবে নাকি।’

‘তোর জাতে পেচ্ছাব করিরে সুলাল।’ সেই শিশির হঠাৎ মারা গেল একদিন। গলার দড়ি দিয়েছিল সে। দোতলা মাটির ঘর ছিল তাদের। নিচের তলায় অন্যরা থাকলেও দোতলায় থাকত ওরা। ওরা মানে মা আর তারা দুইভাই। বাপ যশোরে চাকরি করতেন। মাঝে-মধ্যে আসতেন। শিশিরকে পড়াতে আসত সন্তোষ নামের এক যুবক। সন্ধ্যা বেলাতেই পড়াতে আসত। বড়ভাই মিহির এসএসসি পরীক্ষা শেষে মামাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। যথারীতি সেই সন্ধ্যায় পড়াতে এসেছিল সন্তোষ। সেই সন্ধ্যায় শিশির কী দেখেছিল কে জানে, গভীর রাতে গলায় দড়ি দিয়েছিল। গোয়ালে তাদের বেশ কয়েকটা দুধেল গাই ছিল। দুর্মুখরা বলে সন্তোষের সঙ্গে শিশিরের মায়ের ইয়ে ছিল। তা-ই বুঝি চোখে পড়েছিল শিশিরের। আজ এই পড়ন্ত বিকেলে মেটেপথের ওপর দাঁড়িয়ে এসব কথা মনে পড়ছিল শিবুর। একদার সহজ সোজা সুলালের মুখ হতে এরকম খাচ্চর কথা শুনে শিবুর বিস্ময়ের অন্ত থাকে না।

আচমকা সুলালের কণ্ঠ শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল শিবশঙ্কর, ‘তুই ভাবছিস, আমি এরকম করে এই ভাষায় কথা বলে যাচ্ছি কেন? সময় আমাকে পালটে দিয়েছে রে শিবু। একদার শান্ত সুলাল বারাসাতে গিয়ে মাস্তানদলে মিশে গেলাম। মা-বাবা অনেক চেষ্টা করেও ফেরাতে পারল না। নানা খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়লাম আমি। খিস্তিখেউড়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়লাম। মা-বাবার কথা শুনি না, রাতবিরাতে বাড়ি ফিরি। হাল ছেড়ে দিয়েছিল বাবা। শেষের দিকে খুব বিরক্ত হয়ে উঠেছিল আমার উপর। আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল। মাকে বলত, একে জন্মের সময় মুখে নুন দিয়ে মেরে ফেলোনি কেন? অনেক কষ্ট নিয়ে বাবা আমার মরে গেল। মা-ও বাঁচল না বেশিদিন। তবে বিয়েটা করিয়ে গিয়েছিল মা।’  একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুলাল। মাটির দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবল গম্ভীরভাবে। তারপর কর্তিত সেগুন গাছটির গোড়ার দিকে তাকাল একবার।

তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘এসেছি আমি হারুইন্যার কল্লা নিতে। একদিন যে হারুন কসাই আমাদের সেগুন গাছটি জোর করে কেটে নিয়ে গিয়েছিল, যে হারুন আমাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল, তাকে সসেমিরা দেখবার জন্য এসেছি। তৈয়ার হয়েই এসেছি আমি। তুই শুধু ভাই তার বাড়িটা দেখিয়ে দিবি আমায়।’ খিস্তি এড়িয়ে ধীরে ধীরে বলে গেল সুলাল।

শিবুর হঠাৎ মনে পড়ল হারুনের কথা। হারুনের রাহাজানির কথা গোটা গাঁয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়ে। হারুন শুধু রঘুনাথ বাবুর গাছ কেটে ক্ষান্ত হয়নি, জেলেপাড়ায়, নাপিতপাড়ায় সে অত্যাচার চালিয়েছিল। এর গরুটা নিয়ে আসা, ওর পুকুরের মাছ ছেঁকে তোলাÑ এসব তার নিত্যদিনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সেই হারুনের পরিণতি হয়েছিল করুণ, বীভৎস।

সুলালের কথা শেষ হবার পর বেশ কিছুক্ষণ ধরে সুলালের দিকে তাকিয়ে থাকল শিবশঙ্কর। তারপর বলল, ‘তুই যার ওপর প্রতিশোধ নিতে এসেছিস, তাকে তো খুঁজে পাবি না।’

‘কেন? কেন খুঁজে পাবো না! কালো ছোপধরা দাঁতগুলো বের করে হঠাৎ খেঁকিয়ে উঠল সুলাল। ‘হারুন ঠেঁসে গেছে।’ সুলালের ভাষায় কথা বলে মৃদু একটু হাসল শিবু।

শিবুর হাসিকে উড়িয়ে দিয়ে ক্ষুব্ধ গলায় সুলাল  বলল, ‘ঠেঁসে গেছে মানে! কে তার লোডশোডিং ঘটাল!’

শিবু আস্তে আস্তে বলল, ‘কুকুর বেড়ালের মতো রাস্তায় চিড়ে-চেপ্টা হয়ে মরেছে হারুন।’

‘মানে! কী ভাবে!’ বিশ্বাস করতে চাইছে না সুলাল। বড় একটা মাংসের দোকান খুলেছিল হারুন কসাই। উত্তর পতেঙ্গায় মাংসের চাহিদা এত বেড়ে গেল যে, দেশীয় গরু দিয়ে সামাল দিতে পারছিল না হারুন। চোরাইপথে কসবা দিয়ে গরু আনা শুরু করেছিল। গরু বুঝে নেওয়ার জন্য নিজে যেত সে। একবার গরু বুঝে নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রামের হাইওয়ে পার হচ্ছিল। অসতর্ক ছিল। পেছন থেকে বিরাট এক লড়ি ডলে দিয়েছিল তাকে। ব্যাঙের মতো থেতলা হয়ে গিয়েছিল। বারো ঘণ্টা এভাবেই পড়েছিল রাস্তার মাঝখানে। পরে পুলিশ ডেডবডি নিয়ে গিয়েছিল। জানাজানি হতে তিন দিন লেগে গিয়েছিল। বাড়িতে আনার পর সবাই দেখেছিল- হারুনের মৃতদেহের জায়গায় এলেবেলে মাংসের স্তূপ।’

সবশুনে থম মেরে গিয়েছিল সুলাল। মরা কণ্ঠে বলেছিল, ‘যাক ভাই, মা-বাবার শ্মশানে দাঁড়িয়ে বলতি পারব আমাদের দেশ ছাড়িয়েছিল যে সে এখন পৃথিবী ছেড়েছে।’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে সুলাল আবার বলেছিল, ‘তা তুই এখন কী করচিস? পড়াশোনা কতদূর…।’

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে শিবু বলেছিল, বাড়ি বাড়ি টিউশনি করছি। বিএ অনার্স এমএ করেছি। হারুনরা এখনও বেঁচে আছে বলে হাইস্কুলের চাকরিটা গেছে আমার।’

‘তোর কথা বুঝতে পারছি না।’

‘তোরা দেশ ছেড়ে ভালো করছিস, না আমরা থেকে গিয়ে ভালো করেছি, বুঝতে পারি না এখন।

‘খুলে বল না সব তোর কথা আমার ঘিলু নিচ্ছে না রে শিবু।’

সুলালের কথা শুনতে পায়নি এমন করে শিবু বলল, ‘তুই মালের কথা জিজ্ঞেস করছিলি না? মালটা ভালো। কাল বিকালে আয় আমার বাড়িতে। তার হাতে জলখাবার খাবি। যদি আগের মতো থাকিস, জল তো আর খাবি না। খাবারটা খেয়ে আসবি।’ বলতে বলতে সুলালকে জড়িয়ে ধরল শিবু।

লজ্জায় সুলালের মাথাটা শিবশঙ্করের কাঁধে নুইয়ে পড়ল।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares