শ্রোতা ও বক্তার ভূমিকায় বাঙ্গু : মঞ্জু সরকার

গল্প

শ্রোতা ও বক্তার ভূমিকায় বাঙ্গু

মঞ্জু সরকার

আইওয়ার রাইটিং প্রোগ্রামে একজন লেখক হিসেবে আসার পর, প্রতিদিনই কোনো না কোনো অনুষ্ঠানে শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত থাকতে হয়। বেশিরভাগই সাহিত্যবিষয়ক আলোচনা অথবা লেখকদের রিডিং। এসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বক্তা হিসেবেও নিজেকে তৈরি করছে বাঙ্গু চৌধুরী। কারণ নিজেকেও মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াতে হবে পাঁচটি অনুষ্ঠানে।

শ্রোতা হিসেবে এরমধ্যে বুঝে গেছে সে, স্বীকৃতি ও প্রশংসার ভাষা হিসেবে নগদ হাততালি  আমেরিকাতেও বেশ জনপ্রিয়। মুখের ধন্যবাদের চেয়ে করধ্বনি অনেক বেশি কার্যকর এবং সর্বজনীনও বটে। আমেরিকার বিখ্যাত পিয়ানো বাদক সারার পিয়ানো বাদন অনুষ্ঠানে গিয়ে এ সত্যটা ভীষণভাবে অনুভব করেছে আন্তর্জাতিক লেখকরা। আমেরিকান খটমটে ইংরেজির তুলনায় ভাষা হিসেবে হাততালি শতভাগ সুবোধ্য ও গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে  লেখক বাঙ্গুর কাছেও। কৌতূহল জেগেছে, নিজের অনুষ্ঠানে কয়টা হাততালি পাই দেখব।

আইওয়া বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শুধু সৃজনশীল সাহিত্যের নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং শিল্পকলার প্রতিটি শাখার বিশ^বিখ্যাত লোকজনকে অতিথি করে নিয়ে আসে। বিখ্যাত ব্যক্তিদের ঘিরে সারাবছরই চলতে থাকে কোনো না কোনো অনুষ্ঠান। সারা এসেছিল নিউইয়র্ক থেকে। কবি বোদলেয়ারের মানসজগৎ অবলম্বনে বিশেষ এক কম্পোজশিন শোনাবে সে। আইডবলিউপি তাদের অতিথি লেখকদের জন্য আগেই টিকেট বুক করে রেখেছিল। দশ ডলার টিকেটের মূল্য, তারপরও বিশ^বিদ্যালয়ের নিজস্ব বিশাল থিয়েটার হলে সিট খালি নেই একটিও। মঞ্চের আলো আঁধারি পরিবেশে, পর্দায় ভেসে ওঠা চিত্র ও কবিতার সঙ্গে পিয়ানোর সুরলহরি দুঘণ্টা ধরে স্তব্ধ করে রাখে হলঘর। অনুষ্ঠান শেষ হলে যখন আলো জ¦লে ও মঞ্চে পিয়ানোর পাশে দাঁড়িয়ে শিল্পী অভিভাবদন জানায় শ্রোতাদের, শ্রোতারাও সবাই আসন থেকে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে থাকে। মুখর করতালি অভিভূত শিল্পী মাথা পেতে নেয়, চলে যায় মঞ্চ ছেড়ে। করতালি তবু থামে না। দুঘণ্টা ধরে সম্মেহিত দর্শক-শ্রোতা স্তব্ধ থেকে যা পেয়েছে, তার প্রতিদান যেন দুচারটা তালিতে নিঃশেষ হয় না। তালি বাজতে থাকে, শিল্পী আবার মঞ্চে এসে দর্শকদের মাথা নুয়ে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানায়।

বাঙ্গুর পাশের আসনে বসেছিল আইডবলিউপির পরিচালক ক্রিস্ট, দুই আসন পরে ক্যাথিও ছিল। তাদের সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে তালে তালে তালি বাজাতে গিয়ে নিজদেশে দেখা এক সংগীতানুষ্ঠানে মুগ্ধ শ্রোতার সিটি বাজানোর কথা স্মরণ করেছে। অসভ্যদের কায়দায় সিটি বাজানো বা হুররে ধ্বনি দিতে না পারলেও, আমেরিকানদের সুসভ্য তালি বাজানোর ধ্বনি এবং পিয়ানোর সুরমূর্ছনাকে প্রশংসা করতে পাশের আসনের ক্রিস্টকে বলেছে, ‘রিয়ালি ক্রিস্ট, ইট ইজ গ্রেট, এক্সসেলেন্ট।’ ক্রিস্ট বুঝতে না পেরে বাঙ্গুর দিকে কান নামালে বাঙ্গু সহজভাবে বলেছে, ‘তোমাদের সঙ্গে আমিও বেশ এনজয় করলাম এই অনুষ্ঠান।’ ক্রিস্ট তখন বাঙ্গুর পিঠেও মৃদু তালি দিয়ে থ্যাংকস দিয়েছে।

বাঙ্গু পিয়ানো-অনুষ্ঠানের করতালি স্মরণ করে লেখকদের ঘিরে আয়োজিত প্রতিদিনের সাহিত্যের অনুষ্ঠানগুলিতে গিয়েও। সংগীত, নৃত্য কিংবা নাটক-থিয়েটারের মতো সাহিত্যের অনুষ্ঠানে বিপুল জনসামাগম বিশে^র কোনো দেশেই হয় না। সাহিত্যের শহর হিসেবে ইউনেস্কো স্বীকৃত আইওয়াতেও আন্তর্জাতিক লেখকদের ঘিরে আয়োজিত সাহিত্যসভায় দর্শকশ্রোতার সংখ্যা দুই আড়াইশ’র বেশি নয়।  তার মধ্যে আইডবলিপি’র অতিথি লেখক ও কর্মীরা মিলেই তো ত্রিশচল্লিশজন। এ কারণে অনুষ্ঠানের জন্য ছোট ছোট অডিটরিয়াম নির্ধারিত হয়েছে। ছোট হলে সমবেত সীমিত সংখ্যক দর্শক-শ্রোতারাও কি সবাই মন দিয়ে মঞ্চের মাইক্রোফন আগলে দাঁড়ানো কিংবা বসা লেখকটির বক্তৃতা বা রিডিং মন দিয়ে শোনে? অবশ্যই না। কতজন মনোযোগী শ্রোতা, আর কতজন নয়, বলা মুশকিল। অন্যদের কান-মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া না বুঝলেও, বাঙ্গু শ্রোতার ভূমিকায় থেকেও আসলে নিজের চিন্তাভাবনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে বেশিরভাগ সময়। মন দিয়ে শোনে না, বোঝেও না সবার বিচিত্র উচ্চারণ-ভঙ্গির ইংরেজি, মনে রাখার তাই প্রশ্ন ওঠে না।

প্রোগ্রামের সহলেখক ডেনমার্কের ড্যানিডা ক্লার্কের রিডিং অনুষ্ঠানে গিয়ে শোনার বদলে মেয়েটকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বাঙ্গু। দেখার প্রতিক্রিয়াও জাগে ভিতরে। ড্যানিডা প্রায়ই সাদা প্যান্ট-জামা পরে, কী কারণে? একসঙ্গে হাঁটার সময় একদিন ড্যানিডা স্যান্ডেলের স্ট্রাইপ ঠিক করতে নিচু হয়েছিল, সেদিন প্যান্টের ঘের  কোমরের নিচে  নিতম্বের মধ্যবতী বিভাজন অনেকটাই স্পষ্ট করে তুলেছিল। এমন টাইট ফিটিং প্যান্টের গর্তে কীভাবে পা ঢোকায় সে? এটা নিয়েও অনেক সময় ভাবে বাঙ্গু। তারপর জামার উপরের দুটি বোতাম খোলা থাকে বলে স্তনের অর্ধেকটা প্রকাশমান থাকে। অন্য শ্রোতারা তার গল্প শোনে নাকি স্তনের গঠনশৈলী দেখে? আমেরিকানরা হয়তো অতি পরিচিত জিনিস দেখে না। কিন্তু ড্যানিডার বুকের দিকে তাকিয়ে থেকে বাঙ্গু  ড্যানিডার প্রেমিক মেক্সিকান কবি হোসেকেও তার স্তনে ছোট শিশুর মতো ঝুলে থাকতে দেখে। হোসের এরকম নাছোড় ছেলেমানুষি দেখে ড্যানিডা রাতে হোসের রুমেই থাকে, সেটা সহলেখকদের কাছে লুকাবার চেষ্টা করে না। ড্যানিডার গল্পপাঠ শেষে দর্শকশ্রোতারা অনেকেই যথারীতি করতালি দেয়। কিন্তু এই করতালির ধ্বনি এতটাই নিরাসক্ত আর মৃদু যে, যার উদ্দেশ্যে দেয়া হচ্ছে তার কানেও ঢোকে কিনা সন্দেহ। এ কারণেই সম্ভবত ড্যানিডার রিডিং অনুষ্ঠানে হোসে উঠে দাঁড়িয়ে ওয়াও ওয়াও করে এত জোরে করতালি দেয়, সহলেখকরা তাকে দেখাতেও অনেক তালি মারে। বাঙ্গুও জোরে তালি দিয়ে শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত ক্যাথির তালির সঙ্গেও একাত্মতা প্রকাশ করে।

হাসি ও কান্নার মতো করতালিও সম্ভবত সংক্রামক। হোসের কারণেই ড্যানিডার অনুষ্ঠানে  শেষপর্যন্ত করতালিটা  জোরালো হয়েছে বলে বাঙ্গুর ধারণা। তারপরও নিজের তালি থেকেও বাঙ্গু নিশ্চিত, সাহিত্যের অনুষ্ঠানের এ হাততালি প্রায় সময় দায়সারা সামাজিকতা মাত্র, আর এতটাই মৃদু হয়, নিজের কানেও নিজের তালির আওয়াজ ঢোকে না।

তালির ভাষা সম্পর্কে অভিজ্ঞ হওয়ায় বাঙ্গু সিদ্ধান্ত নেয়, নিজে যেদিন মঞ্চের নায়ক সেজে ইংরেজিতে বক্তৃতা দেবে এবং নিজের গল্প পাঠ করবে, কারও হাততালিরই পরোয়া করবে না। বরং নিজের ভূমিকাটুকু ষোলআনা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবে। কেউ শুনুক আর না শুনুক, নিজের বক্তব্য পুরোটা শেষ করার আগে বিরতি দেবে না এক মিনিটও।

প্রস্তুতিটা শুরু হয়েছে অবশ্যি দেশে থাকতেই। কারণ পেশাদার বক্তা সে নয়। দেশে একবার জনা পঞ্চাশেক দর্শকের সামনে এবং টিভি ক্যামেরাকেও অদৃশ্য শ্রোতা ভেবে আলোচনা করতে গিয়ে নিজের ভাষা ভুলে গিয়েছিল। কেউ দেখেনি, কিন্তু বুক এবং পা কেঁপেছিল তার। এখানে বলতে হবে ইংরেজিতে, সামনে থাকবে অন্তত শ দুয়েক শিক্ষিত আমেরিকান শ্রোতা। বিষয়টাও বেশ কঠিন- ইসলাম অ্যান্ড উই। কঠিন বিষয়টা ভাবতে গিয়ে বলবার মতো অনেক কথা তৈরি হয়েছে ভিতরে, নিজের এবং দেশের সত্য তুলে ধরার মস্ত সুযোগ হিসেবেই দেখছে। ফলে ডায়েরিতে নিজের ভাষায় বক্তব্যটি লিখে, অনেকবার ঘষামাজা করে আনাড়ি হাতে ইংরেজিতে অনুবাদও করেছে। কিন্তু নিজের ইংরেজি নিজের কানেও খুব সমৃদ্ধ ও সুশ্রাব্য মনে হয় না। দক্ষ আমেরিকান কাউকে দেখিয়ে বাঙ্গুর ইংলিশে আমেরিকান ফ্লেভার আনতে পারলে বেশ হয়।

মঞ্চে অবতীর্ণ হওয়ার আগে ইংরেজি পেপারটা দেখিয়ে নেয়ার জন্য আইডবলিউপি’র সম্পাদক শাশার সঙ্গে যোগাযোগ করে বাঙ্গু। শাশা সান্ত¡না দেয়, ‘উদ্বিগ্ন  হয়ো না। একজনকে দায়িত্ব দেয়া আছে, সে-ই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।’ সেদিনই নরমান নামে একজন ইমেইল করে জানায়, পেপারটি যেহেতু ওয়েবপেজেও যাবে, সে ভাষাগত দিকটি দেখে দেবে। তার ইমেইলে পাঠিয়ে দিলেই হবে। লেখাটি নরমানকে পাঠিয়ে দেয়ার দিনই রাতে নরমান আবার ইমেইলে অভিনন্দন জানিয়ে বলে, ইট ইজ গ্রেট। আমেরিকান শ্রোতারা যাতে বুঝতে পারে, তার জন্য কিছু কিছু শব্দ ও বাক্যকাঠামো বদলাতে পারি কি? নরমানকে সানন্দে সম্মতি দেয় বাঙ্গু।

একজন আমেরিকান পাঠকের লিখিত অভিনন্দন ও প্রশংসা পাওয়ার পর, সহ¯্র আমেরিকান দর্শক-শ্রোতাদের কাছে নিজেকে তুলে ধরার জন্য রুমে বসে ইংরেজিতে ভাষণের মহড়া দেয়। নিজের মনে হয়, ঘরে বুঝি ফুল ভলিউমে টিভি চলছে। আয়নার সামনে তাকালে মনে হয়, শত সহস্র দর্শক-শ্রোতার দৃষ্টি তার দিকে একাগ্র। তবে সবার সামনে আছে ক্যাথি। তার সহাস্য করতালি দেখে পিয়ানো বাদন অনুষ্ঠানের করতালি কানে বাজে।

অবশেষে নির্ধারিত দিনে, নির্দিষ্ট সময়ের পাঁচ মিনিট আগেই কোটের পকেটে নরমান সম্পাদিত পেপারটি নিয়ে সিটি পাবলিক লাইব্রেরীর হলে উপস্থিত হয়। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ভরে যায় হল ঘরটি। শ্রোতাদের আসনে আইওয়া’র বুদ্ধিজীবীশ্রেণির লোকজন, যাদের কারও রিডিং-অনুষ্ঠানে দেখা যায় না। পরিচিত মুখের মধ্যে সহলেখকবৃন্দ, আইডবলিউপি’র কমকর্তাদের মাঝে আজ ক্যাথিকেও উপস্থিত দেখে বাঙ্গু এবং তার সঙ্গে চোখাচোখিও হয়। হোটেল রুমে মহড়া দেয়ার সময় দর্শকদের মাঝে ক্যাথিকেও কল্পনা করেছিল। আজ তার সঙ্গে সত্যি চোখাচোখি হলে খুশিতে হাসেও বাঙ্গু। ক্রিস্ট কাটায় কাটায় সকাল দশটায় প্যানেল ডিসকাশন শুরুর ঘোষণা দিলে, দুই সহ-আলোচক সেনেগালের জেনবুগল ও  শ্রীলঙ্কার জগাইসিংহের সঙ্গে মঞ্চে গিয়ে বসে বাংলাদেশি বাঙ্গু চৌধুরী।

প্রথমে জেনবুগল ও জগাইকুমার তাদের লিখিত বক্তব্য পাঠ করে। মঞ্চেও নিজের প্রস্তুতি ও সাহস ধরে রাখতে বাঙ্গু এত ব্যস্ত যে, অন্য দুজনের বক্তব্য ভালো করে শোনেও না। জেনবুগলের উচ্চারণ ভালো করে বোঝাও যায় না। তবু শুনতে শুনতে নিজের বক্তব্যের কথাই ভাবে এবং সামনে বসা শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করে। কারও চোখেই প্রশংসা টলমল করে না, জগাইয়ের পড়া শেষ হতে ক্রিস্ট মাইক্রোফোনে ঘোষণা করে, এবারে বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙ্গো চৌধুরী বিষয়টা নিয়ে কী ভাবেন, শোনা যাক।

হাই এভরিবডি সম্বোধন দিয়ে নিজের পেপারটি সামনে রেখে ভাষণ শুরু করে বাঙ্গু। নিজের ইংরেজি ঝরানো কণ্ঠ নিজের কানেও ভরাট ও গুরুগম্ভীর মনে হয়। তবে ভাষণের প্রতিটি শব্দ নিজের কাছে এত সরস ও পরিষ্কার হয়ে ওঠে, তার কারণ ইংরেজিতে ভাষণ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঙ্গু নিঃশব্দে তা বাংলায় অনুবাদ করে নিজেকেও শোনায়। (আমেরিকান শ্রোতাদের সঙ্গে মিলেমিশে একাত্ম হওয়ার সুবিধায় পাঠকদের জন্য বাঙ্গুর ভাষণের স্বকৃত বাংলা অনুবাদটি নিচে দেয়া হলো)।

সৃজনশীল সাহিত্যের মাঝে ধর্মকে টেনে আনা হয়েছে কেন? ভেবে আমার মাথা গরম। ইসলাম সম্পর্কে আমরা এটুকু নিশ্চয় সবাই জানি, এটা একটি ধর্মের নাম। এই  ধর্ম বিশে^র প্রায় অর্ধেক মানুষের জীবনে গভীরভাবে মিশে আছে। এতটাই গভীর যে, তার ব্যাপ্তি ইহকাল ছেড়ে পরকালেও বিস্তৃত। দুঃখিত, এমন গভীর বিষয়ে আমি ধর্মতাত্ত্বিক, দার্শনিক, ঐতিহাসিক কিংবা বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিতে ইসলামের উপর বক্তৃতা দিতে পারব না। কারণ আমি এসবের কোনোটাই নই।

বিষয়ের দ্বিতীয় অংশে যে ‘আমরা’, এই আমরা কারা? ভাবতে গিয়ে আমি  ভয় পেয়েছিলাম।  প্রেসিডেন্ট বুশকে সন্দেহ হয়েছিল। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর বিন লাদেনসহ ইসলাম ধর্মের জিহাদি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে বুশ। এমনকি এই যুদ্ধকে ক্রুসেড বলা হচ্ছে, ক্ল্যাশ অব টু সিভিলাইজেন আখ্যা দিয়েছে কেউ-বা। ইরাকে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন আফগানিস্তানেও নিরীহ মানুষ হত্যা করে চলেছে। কাজেই প্রেসিডেন্ট বুশসহ যারা ইসলামি সন্ত্রাসী নির্মূলে যুদ্ধ করছে, আমরা বলতে কি তাদের বোঝানো হয়েছে? আমরা মানে বুশ অথবা আমেরিকার জনগণ যাই হোক, আমি এ বিষয়েও একটা কথাও বলতে পারব না। কারণ যুদ্ধবাজ বুশ-প্রশাসন সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান-গম্যি আমার নেই। বিখ্যাত আমেরিকান লেখকদের গল্প-উপন্যাস পড়ে আমেরিকার কিছু মানুষকে অন্তরঙ্গভাবে জানলেও, জীবনে এই প্রথম আমেরিকায় এসে কদিন ধরে দেখছি মাত্র। তারপরও এই বিষয়ে আমি বলতে রাজি হয়েছি, ইসলাম ধর্মের সঙ্গে আমার এবং আমার মায়ের একটি সত্যি গল্প শোনাতে।

আমার বাংলা নাম ও চেহারা দেখে অনেকেই আমাকে মুসলমান মনে করে না। পাসপোর্টে ধর্মীয় পরিচয় ইসলাম লেখা আছে। জন্মের সময় মুসলমান হয়ে জন্মেছিলাম কিনা আল্লাই জানে। তবে বালক বয়সে মুসলমান হওয়ার অভিজ্ঞতাটা বেশ আতঙ্কজনক। ইসলামে পুরুষদের মুসলমানিত্বে দীক্ষিত হওয়ার জন্য খৎনা দেয়ার একটা প্রথা চালু আছে । খৎনা মানে ঘচাং করে পুরুষাঙ্গের বাড়তি চামড়া কেটে দেয়া। শৈশবে আমার  লিঙ্গেও অস্ত্রোপচার হবে ভেবে খুব আতঙ্কে ভুগতাম। কেউ অপারেশনকারী কবরেজ আসছে বললেও ভয়ে লুকাতাম। অবশেষে আমাকে ধরেবেঁধে সেই অপারেশনের শিকার করা হলো, খুব কেঁদেছিলাম সেদিন। অন্তত দশদিন খেলাধূলা বন্ধ ছিল, ভালো করে হাঁটতেও পারিনি। এরপরে বালক বয়সেই ইসলাম অনুসারী মুসলিম হওয়ার অভিজ্ঞতা আরও মর্মান্তিক এবং হাস্যকরও।

খৎনা হওয়ার পর মা আমাকে প্রথম ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দিতে শুরু করেছিল। মায়ের কাছে গল্প শুনে শুনে একদিকে ভূতের অস্তিত্ব এবং অন্যদিকে আল্লার অস্তিত্ব সম্পর্কেও শতভাগ নিশ্চিত হয়েছিলাম। মা বলত, আল্লার আদেশ মতো না চললে মরে যাওয়ার পর কবরে ঢুকলে আল্লার ফেরেশতা এসে অনেক শাস্তি দেবে। কেয়ামতের দিন আবার জেন্দা করে দোজখে দেবে। আর আল্লার আদেশ মতো চললে বেহেশতে যাওয়া যাবে। বেহেশত এমন এক স্থান, যেখানকার নানারকম অমৃতফল ভক্ষণ আর অতিশয় সুন্দরী হুরের সঙ্গে খেলাধূলার কল্পনা করে কৈশোরে পুলকিত হয়েছি। দুনিয়ায় আল্লার নির্দেশ মতো চললে সেই বেহেশত লাভ সম্ভব। কিন্তু আল্লার আদেশনির্দেশ জানব কীভাবে? মা আমাকে আল্লার লেখা মহাগ্রন্থ কোরান দেখিয়ে দিত। আরবি ভাষায় জিব্রিলের মাধ্যমে আল্লাহ যেসব আদেশনির্দেশ পাঠাতেন আমাদের নবিজির কাছে, তা এই মহাগ্রন্থে আছে। কিন্তু আরবি আমার মাতৃভাষা নয়, পড়ার বা বোঝার ক্ষমতা ছিল না। বালক বয়সে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা কিছু শিখতাম। মা তাই আল্লার কিছু আরবি বাণী মন্ত্রের মতো মুখস্থ করিয়ে দিয়েছিল। আল্লাহর এবাদত হিসেবে নামাজরোজার নিয়মও শিখিয়ে দিয়েছিল। মৃত্যুর পর খৎনার চেয়েও ভয়ঙ্কর শাস্তির ভয়ে, বালকবয়সে কিছুকাল আমি নামাজ রোজাও করতাম। সবাই বলত ভালো ছেলে। মা বলত, ভালো মানুষ মানেই ভালো মুসলমান, খাঁটি মুসলমান মানেই ভালো মানুষ।

অবশ্যি বালক বয়সের আল্লাভীতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাটির উপরে পৃথিবীর বৈচিত্র, সৌন্দর্য ও জীবের রহস্য আবিষ্কারে এত ব্যস্ত ছিলাম যে, মৃত্যুপরবর্তী  জীবনের কথা ভাববার সময় পেতাম না। ফলে বয়স বাড়তে থাকলে ভূতের ভয়ের সঙ্গে পরকালের ভয়টাও কমে যাচ্ছিল। কৈশোরেই পাঠ্য বহির্ভূত বইপড়ার নেশা হয়েছিল। পাবলিক লাইব্রেরি থেকে বই এনে রাত জেগে বই পড়তাম। বড়দের গল্প-উপন্যাস ছাড়াও জ্ঞানবিজ্ঞানের নানা বই।

আমার মা রোজ ভোরে নামাজের পর সুরেলা কণ্ঠে আরবি ভাষার কোরান পাঠ করে। গ্রামের বাড়িতে পাখির কাকলি আর মায়ের কণ্ঠে কোরান আবৃত্তি শুনেই ঘুম ভাঙত আমার। একদিন ভোরবেলা স্বপ্নে অসম্ভব সুন্দর এক বেহেশতি হুরের সঙ্গে খেলা করছিলাম। মায়ের কোরান পাঠে স্বপ্ন ভেঙে গেলে বিরক্ত হই, হুরকে আর খুঁজে পাই না।  সেইদিন সকালেই মায়ের সঙ্গে তার ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলাম আমি।

‘ও মা, রোজ যে কোরান পড়ো,  কিন্তু আরবি ভাষার মানেও বোঝ না। এর চেয়ে আমার মতো নিজ ভাষায় বই পড়লেও অনেক জ্ঞান বাড়ত। কোরান পড়ে কী লাভ হয় তোমার?’

মা আশা করেনি এমন বিদ্রোহ। অবাক হয়ে শাসন করে, ‘ছি বাবা, আল্লার কিতাব সম্পর্কে এভাবে কথা বলে না! গুনাহ হবে তোর।’

‘সত্যি কথা বললে আল্লা গুনাহ দেয় না। আমি জানি, তুমি বেহেশতে যাওয়ার লোভে রোজ নামাজ কোরান পড়। না বুঝে এরকম পড়ার কোনো দাম নেই।’

মা ভয় পেয়ে বলে, ‘তুই নিশ্চয় খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস! নাকি শয়তান ভর করেছে তোর উপরে? আমার কাছে আয় তো দেখি।’

মা আমার হাত চেপে ধরে কোরানের আয়াত আওড়েই মাথায় ফুঁ দিয়েছে। কিন্তু আল্লার বাণীযুক্ত ফুঁ কাজ দেয়নি। প্রচলিত ধর্মের প্রতি আস্থা আর বাড়েনি।

মায়ের শেখানো ধর্মবিশ^াসকে মিথ্যে প্রমাণের যুক্তি পেয়েছিলাম বিজ্ঞান ও যুক্তিশাস্ত্রের নানা বইপত্র পড়েও। নবীন যৌবনে ধর্মদ্রোহী হয়ে ওঠার আর একটা গোপন কারণ ছিল। সেই সময়ে আমার এক মেয়ে বন্ধুকে চুমু খেতে চেয়েছিলাম। বান্ধবীটির আপত্তি ও ভয়ের কারণ ছিল, আল্লাহ গুনাহ দেবে। আর আমাদের মধুর প্রেম জানাজানি হলে সমাজ বিচার বসাবে। বিচারে আল্লার বিধান ভাঙার জন্য বদনাম ও শাস্তি দুটাই অনিবার্য।

সমাজে আল্লার বিধান মানা যেসব ধার্মিক মানুষ দেখতাম, তাদের অনেককেই খারাপ মানুষ হিসেবে চিনতে শুরু করেছিলাম। তারা কথায় কথায় কোরান হাদিস আওড়ায়, কিন্তু অপর মানুষ ও সমাজের ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে। এরকম ভয়ঙ্কর ইসলামি সন্ত্রাসীদের চেনার সুযোগ ঘটে  ১৯৭১ সালে মুক্তিযেুদ্ধের সময়, যে মুক্তিযুদ্ধ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি সেই ইসলামি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছি।

আপনারা জানেন, ভারতবর্ষ বৃটিশ কলোনি ছিল। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভেঙে ইসলাম ধর্মাবালম্বীদের জন্য সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তান। ৮০ ভাগই মুসলমান অধিবাসীর কারণে বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নামে একটি প্রদেশ হিসেবে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। পাকিস্তানি শাসকদের শাসন ও শোষণে অতিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের বুঝতে দেরি হয় না, অভিন্ন ধর্ম হলেই ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আলাদা এক দেশের মুসলমান আর এক দেশের মুসলমানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায় না। ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যবোধ থাকার জন্য, ভাষা-সংস্কৃতির মিল ও সামাজিক ন্যায়বিচার থাকাটা জরুরি। মুসলিম দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে অখ- রাখার জন্য ঐ সময়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপরাধ লাখ লাখ মুসলমানদের হত্যা করেছে। স্বাধীনতাকামী বাঙালি-মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ফলে পরাজিত হয়েছে তারা এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বাভাবিকভাবেই স্বাধীন এই রাষ্ট্রের সংবিধানে জাতীয়তা, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র রাষ্ট্রীয় চার স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত হয়।

শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নয়, বিশ্বের ইতিহাসে ধর্ম সন্ত্রাস ও নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠার নজির অসংখ্য। বলা হয়ে থাকে ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু আবির্ভাবের পর থেকে ইসলামের প্রসার ও প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুদ্ধ ও বলপ্রয়োগের যে ভূমিকা, তা থেকে ইসলামের জিহাদি সন্ত্রাসীরা কত প্রেরণা পায় সেটা তারাই বলতে পারবে। আমি বরং নবীন যৌবনে ধর্ম নিয়ে মায়ের সঙ্গে আমার যে যুদ্ধ শুরু হয়, সেই যুদ্ধের বর্তমান পরিণতিতে আসি।

বালক বয়সে মা তার সন্তানের ভিতরে যে ইসলাম ধর্মের বীজ রোপণ করেছিল, প্রয়োজনীয় সার-পানি না পেয়ে তা আর শান্তির বৃক্ষ হয়ে ওঠেনি। এখন আমি বাহ্যিক ও সামাজিক জীবনেও ধর্মাচার পালন থেকে এতটাই মুক্ত যে, ধার্মিকরা কেউ নাস্তিক বা কাফের বলে গাল দিলেও তর্ক করি না। অন্যদিকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও মায়ের অন্ধ ধর্মপ্রীতি আরও বেড়েছে। দেশে মসজিদ ও ধার্মিক মানুষের সংখ্যাও কমেনি, বেড়েছে বরং।  ধর্মকে হাতিয়ার করে ধর্মব্যবসায়ী ও রাজনীতিতে ফায়দা লোটার প্রয়াস রাষ্ট্রকেও আদর্শচ্যুত ও সন্ত্রাসের হাতিয়ার করে তোলে অনেক সময়। এই পরিস্থিতিতেও মা ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটেনি আমার। এর প্রধান কারণ ধর্মকে মানা না মানা একান্ত ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হিসেবে নিয়েছি আমি। ব্যক্তির জীবনে কল্পনা, কঠিন বাস্তব থেকে পালানো ও ফ্যান্টাসির জগতে আশ্রয় গ্রহণের ঘটনা ঘটে। লেখক হিসেবে এটাকেও জীবনের বাস্তবতা ভাবি আমি। তেমনি মা যদি ধর্মীয় ফ্যান্টাসিতে আশ্রয় নিয়ে ভয়মুক্ত হয়, শান্তি ও সান্ত¡না পায়, কল্পনায় পরকালে মুক্তি লাভ করে,  তবে জবরদস্তি করে তার ধর্মীয় আবেগকে আঘাত করতে যাবো কেন?

নিজে ধর্মকর্ম করি না বলেই হয়তো, বৃদ্ধ বয়সেও মা নিয়মিত আল্লার কাছে আমার জন্য দোয়া করে। আমেরিকা আসার আগে মা বলে দিয়েছে, ইসলামে নিষিদ্ধ মদ আর শুয়ার যেন না খাই।

মায়ের সঙ্গে দূরত্ব স্বাভাবিকভাবে নিয়েছি বলে, আমি আমেরিকা আসার পর আদেশ-উপদেশ মানার চেষ্টা করিনি। আমার মায়ের বিশ্বাস মতে, ইসলাম হলো আল্লার কাছে থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ ধর্ম যা অনুসরণ না করে কেউ বেহেশতে যেতে পারবে না। মায়ের ধর্মবিশ্বাস সত্য হলে আমার মতো বিধর্মী তো বটেই, ভিন্ন ধর্মবিশ্বাসী তথা অধিকাংশ আমেরিকানরাও বেহেশতে যাবে কি? আল্লাহ জানেন।

বিশে^র  প্রকৃত বাস্তব হলো, মায়ের ধর্মান্ধতা মানবজাতির জন্য চরম সত্য হয়ে যায়নি। নানা ধর্মমতে বিশ্বাসী মানুষ নিজস্ব পন্থায় পরম সত্য বা ঈশ্বরের আরাধনা করে যাচ্ছে। বিশ্বে নাস্তিকের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়।  আশার কথা যে, আমার মায়ের মতো অন্ধ ধর্মপন্থী ও মৌলবাদীদের বিপরীতে নানা ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে বিশে^ মানুষে মানুষে ভালোবাসা ও সহমর্মিতার সম্পর্ক স্থাপনের অসংখ্য নজির সৃষ্টি হয়েছে চলেছে। আমেরিকায় এসেও আমি এরই মধ্যে এমন নজির দেখে প্রেরণা পেয়েছি। এটা সত্যি যে, আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকা ও নানারকম সমরাস্ত্র ব্যবসায় বিশে^র বহু দেশে সন্ত্রাসীদের মদদ দেয়, নিরীহ মানুষ হত্যার কারণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে অগণিত আমেরিকান ক্ষমতাবান শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে গিয়েও বিশ্বের নির্যাতিত ও অধিকার বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ায়, সহমর্মিতার হাত প্রসারিত করে। আমি আমেরিকান জনগণের ব্যক্তি স্বাধীনতা, ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদাবোধকে শ্রদ্ধা করি। সাহিত্যের সামান্য লেখক হিসেবে বিশ্বাস করি, ধর্ম-সম্প্রদায়-বর্ণের গণ্ডী অতিক্রম করে মানুষকে মানুষের সাথে মেলানোর মানবধর্মই আমাদের মুক্তির পথ দেখাবে। মানুষের মুক্তির পথ হিসেবে কোনো মতবাদই শেষ কথা নয় বলে,  আমরা লেখকরা প্রচলিত নানা ধর্মবিশ^াস ও মতবাদে আস্থা রেখে এবং আস্থা হারিয়েও, মানবধর্মের প্রেরণাতেই মুক্তির পথ খুঁজি মানুষের। সকলকে ধন্যবাদ।

টানা বাইশ মিনিট পরে  পড়া শেষ করেই, শেষপর্যন্ত শেষ করতে পারার গর্বে চোখকান খাড়া রেখে সবার দিকে তাকায় বাঙ্গু। ক্যাথিকেও খোঁজে। ক্যাথি পাশে বসা একজনের সঙ্গে কথা বলছে, হয়তোবা বাঙ্গুর প্রশংসাই করছে।

উঠে দাঁড়িয়ে কেউ অভিভাবদন জানায় না, হাততালির আওয়াজ কানে আসে না। তবে অচেনা দু’চারজনকে মৃদু তালি বাজাতে দেখে সে। আর সামনে বসা বৃটিশ কবি ইরিনা কালভাতির সঙ্গে চোখাচোখি হলে, তার চোখের ভাষাও যেন সরবে শুনতে পায়, ‘দারুণ বলেছ। এত সুন্দর বলো তুমি, ভিতরে তোমার বিদ্যাবুদ্ধি, চেহারা দেখে কিন্তু বুঝতে পাইনি।’ অন্যদের চোখের ও মনের প্রশংসা আবিষ্কারের আগেই ক্রিস্ট অনুষ্ঠানের দ্বিতীযপর্ব, অর্থাৎ প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরু ঘোষণা দেয়।

একজন বয়স্ক আমেরিকান শ্রোতা  প্রশ্ন করার বদলে নিজের দুর্বোধ্য ইংলিশে প্রায় পাঁচ মিনিট বক্তব্য রাখে। নাইন ইলিভেন, বিন লাদেন ইত্যাদি শব্দ শুনে ইসলামি সন্ত্রাস এবং ইসলাম বিশ্বের জন্য কতটা হুমকি হয়ে উঠেছে, সেই বিষয়ে বক্তব্য রাখে। তার বক্তব্য শেষ হলে ক্রিস্ট বাঙ্গুকে বলার অনুরোধ জানালে, বাঙ্গু অচেনা শ্রোতাকে ধন্যবাদ জানায়, ‘আপনার পয়েন্টটি বুঝতে পারলেও প্রশ্নটি ঠিক বুঝতে পারিনি। আমার বক্তব্যের উপরে আর কোনো শ্রোতার যদি বিশেষ প্রশ্ন কিংবা মত থাকে, তা হলে সবটা জেনে আমি একসঙ্গে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করতে পারি।’

এরপর একে একে তিনজন শ্রোতা উঠে দাঁড়ায় এবং সংক্ষেপে নিজ মতামত ও প্রশ্ন রাখে। একজন কালো-আমেরিকান মহিলা বাঙ্গুর দিকে আঙুল উঁচিয়ে  হেসে জানতে চায়, ‘তোমার মা পরকালে স্বর্গ পাওয়ার আশায় হিজাবের বন্দিজীবন সহজভাবে মেনে নিয়েছে। কিন্তু তুমি কি ইসলাম ধর্ম থেকে বেরিয়ে নির্যাতিত মানবজাতিকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখছো? তোমার প্রোফেট কি মার্কস?’ আরেকজনের মন্তব্য, খ্রিষ্টান ধর্ম নিয়ে, ধর্মবিশ্বাস বজায় রেখেও বিশ^মানবতার সেবা করা সম্ভব। আরেকজনের বক্তব্যের সার কথাটি মনে হয়, ইসলামকে মুখে যতই শান্তির ধর্ম উদার মধ্যপন্থা বলো, বিশে^ কোনো মুসলিম দেশেই শান্তি নেই। আভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস ও অশান্তির আগুন জ¦লছে মুসলিম বিশ্বে। এশিয়া আফ্রিকার মুসলিমরা আমেরিকায় এলে ফিরে যেতে চায় না এ কারণে। ঠিক বলিনি?

নিজের আত্মপরিচয় অকপটে প্রকাশের জন্যই তো এমন এক বিষয়ে বলার প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিল বাঙ্গু। কিন্তু এখানেও সিআইএ এফবিআই-এর গোয়েন্দা আছে নাকি? তারপরও বাঙ্গু জবাব দিতে গিয়ে বর্তমান বিশ্বে অশান্তি ও সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য আবার সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকাকেও দায়ী করে। নিজের আমেরিকায় থেকে যাওয়ার স্বপ্নটিও অকপটে স্বীকার করে বলে, তোমরা আমেরিকানরা অনেক সময় রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতীক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধাচরণ করেও বিশে^র নির্যাতিত মানুষ ও মানবতার পক্ষে সোচ্চার হও, আমি সামান্য লেখক হিসেবে নিজের ভাষায় নীরবে নিভৃতে সেই কাজটি করে যেতে চাই আসলে। সবাইকে ধন্যবাদ।

ক্রিস্ট অনুষ্ঠান সমাপ্তির ঘোষণা দিলে আলোচক-শ্রোতারা হল ছেড়ে বেরুতে থাকে। শ্রোতাদের মাঝে ক্যাথির উপস্থিতি বাঙ্গুকে উৎসাহিত করেছে, ক্যাথির কারণেই হয়তো গলা একটুও কাঁপেনি, বক্তব্য রাখার সময় একবার চোখাচোখিও হয়েছে। আশা করেছিল, ক্যাথিও দু’একটা প্রশ্ন করবে, কিংবা তুমুল করতালি বাজাবে। কিন্তু ক্যাথি কেন যে নির্বিকার ছিল। চলে যাওয়ার সময় বাঙ্গুই দ্রুতপায়ে হেঁটে ক্যাথির পাশে দাঁড়ায়, ক্যাথির ধন্যবাদ পেতে নিজেই ধন্যবাদ জানায়, ‘হাই ক্যাথি, আমার বক্তব্য শোনার জন্য ধন্যবাদ।’

ক্যাথি বলে, ‘দুঃখিত ব্যাঙ্গু, ধর্ম বিষয়ে আমার ইন্টারেস্ট নেই। ভালো করে শুনিওনি, তোমার লেকচারের সময় আমি পাশের জ্যাকের সঙ্গে কিছু দরকারি কথা বলছিলাম।’

নিজের অমূল্য ভাষণ না শোনার জন্যও ক্যাথিকে আবার ধন্যবাদ জানিয়ে একা একা হোটেলের দিকে হাঁটতে থাকে বাঙ্গু।

লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares