ইটভাটার আগুন : আলী ইদ্রিস

 

গল্প

ইটভাটার আগুন

আলী ইদ্রিস

ধীর্ঘ বিশ বছর যাবৎ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী, একবারও দেশে আসিনি। দেশে আসার সিদ্ধান্ত নিলেই ডজনখানেক বাধা পথ আগলে ধরে। ছেলেমেয়ের শিক্ষাঙ্গন থেকে একই সময়ে ছুটি পাওয়া যায় না, আবার ওরা  যখন ছুটি পায় সে  সময়ে আমি অফিস থেকে ছুটি পাই না। স্ত্রীর বার্গার শপ বন্ধ রাখলে দিনে বিশ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়। আরও কিছু বিষয় আছে, যা সমন্বয় করে সপরিবারে দেশে আসা হয়ে ওঠে না। অগত্যা স্থির করলাম একাই দেশ থেকে ঘুরে আসব। নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন, লন্ডন থেকে বাংলাদেশ বিমানে সোজা সিলেট অবতরণ করে টেক্সিতে হবিগঞ্জে পৌছঁলাম। সিলেট এয়ারপোর্টে আমাকে রিসিভ করতে এলেন তমিজ ভাই। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে লন্ডনিদের শহর  সিলেটে  বিস্তর পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। কিন্তু  হবিগঞ্জে  লক্ষণীয় উন্নতি দেখলাম না। তমিজ  ভাই বললেন উন্নতি কিছু হয়েছে জেলাশহর হওয়ার পর। জেলখানা ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস শহর থেকে শহরতলিতে চলে গিয়েছে, দু’একটি বেসরকারি স্কুল, কলেজ গড়ে উঠেছে। শহরটিকে  সাপের  মতো পেঁচিয়ে রাখা হবিগঞ্জের দুঃখ খোয়াই নদীর দু’পাড়ে উঁচু বেড়িবাঁধ ও নদীতে দুটি চওড়া ব্রিজ নির্মিত হয়েছে। রেল লাইনকে পিচ ঢালা বাইপাস সড়কে রূপান্তরিত করা হয়েছে। পৌরসভার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। শুনে ভালো লাগল।

বিকেলে তমিজ ভাইকে নিয়ে গ্রামের রাস্তায় বের হলাম। সেই কর্দমাক্ত, পিচ্ছিল মাটির রাস্তা আর নেই, পৌরসভার বদৌলতে সব রাস্তা এখন কংক্রিটে পাকা করা। পাশে নালা। সবচেয়ে ভালো লাগল গ্রামের গোরস্থানটি দেখে। একেবারে আমূল পরিবর্তন। গোরস্তানটি ছিল বাড়িঘরের ভিটার চেয়ে নিচু, খানাখন্দ আর গর্তে ভরা। বৃষ্টি হলে পানি জমতো আর খোয়াইর বাঁধ ভাঙা জোয়ারে কোমর সমান পানি হতো। ডুবে যাওযা গোরস্থান পার হওয়ার সময় গর্তওয়ালা কবরে পড়ে কতবার ভয় পেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। এখন সেই গোরস্থানকে মাটি ভরাট করে  অনেক উচুঁ করা হয়েছে, চতুর্সীমানায় সারি সারি মেহগনি গাছ। গোরস্থানের বুক চিড়ে তিনটি পাকা রাস্তা চলে গিয়েছে। সংলগ্ন গ্রামের মসজিদটি দেখে আরও অবাক হয়ে গেলাম। মসজিদটি ঘিরে শৈশবের মধুর-স্মৃতি মনে পড়ল। মসজিদটি ছিল বাঁশ আর ঢেউ টিন দিয়ে তৈরি। একদিন গ্রামের সবাই স্থির করল এটা ভেঙে ইট আর চুন-সুড়কি দিয়ে পাকা মসজিদ তৈরি করবে। তখন বাজারে ইট কিনতে পাওয়া যেত না। দু’একটি  ইটের  ভাটা ছিল সেই সিলেট শহরে। তাতে কি, গ্রামের সবাই ইট তৈরির জন্য নিজেদের জমি দিতে চাইল। শেষে কমরুদ্দিন চাচার জমি নেয়া হলো। দিনরাত দারুণ উৎসাহে সবাই কাজ করতে লাগল। আমরা ছেলেপেলেরা আনন্দে হৈচৈ করতে লাগলাম। ইট শুকালে ভাটা তৈরি হলো। গোরস্তানের গাছ কেটে ভাটার জ্বালানি সরবরাহ করা হলো। একদিন পুরো গ্রামের মানুষ একত্রিত হয়ে ভাটায় আগুন দিল। ইট দিয়ে সুন্দর একটি মসজিদ তৈরি হলো। সেই মসজিদ ভেঙে কয়েক বছর পূর্বে তিনতলার ফাউন্ডেশনসহ অনেক বড়  আয়তনের আধুনিক  স্থাপত্যের মসজিদ বানানো হয়েছে। কমরু চাচার  জমিতে পোড়া ইট পরিত্যক্ত হয়ে মাটিতে মিশে গেল। আর মহৎপ্রাণ জমিদারের মতো লোকটি ভাগ্যের চক্রে শুধু নিঃস্ব হননি, একমাত্র ছেলে মরে গেল, বৌ হারালেন, শেষে নিজের প্রাণটাও দিলেন। এ পর্যন্ত বলেই তমিজ ভাই বললেন, চল্, সন্ধ্যে হয়ে আসছে। বাসায় গিয়ে চা টা খাওয়া যাক। অগত্যা বাসায় ফিরতে  হলো।

চাপর্ব শেষ করে তমিজ ভাইয়ের সাথে বারান্দায় গিয়ে বসলাম। কমরুদ্দিন চাচার অসমাপ্ত কাহিনি শোনার ঔৎসুক্য দমাতে পারলাম না। তমিজ ভাই শুরু করলেন, শোন শাওন, কমরুদ্দিন চাচা এ গ্রামের সবচেয়ে বড় জোতদার ছিলেন। খোয়াই নদীর চর বল, দক্ষিণ বন্দ বল, সবখানেই চাচার জমি ছিল। বিশেষ করে দক্ষিণ বন্দে চাচার যে তিরিশ বিঘা জমি ছিল ঐগুলো থাকলে এর বর্তমান বাজারমূল্য নব্বই কোটি  টাকা দাঁড়াতো। আমাদের নিজেদের জমিও পঁিচশ বিঘার কম ছিল না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি ভাবে খোয়া গেল এসব জমি। তমিজ ভাই বললেন, আমাদের দেশের সরকার জনগণের মঙ্গল চায় না, গরিব মানুষের একমাত্র আয়ের উৎস ফসলি জমি অধিগ্রহণ করতে দ্বিধা করে না। আমরা তখন বুঝতে পারিনি, কিন্তু এখন ভাবলে স্তম্ভিত হয়ে যাই, কি করে  সরকার স্রেফ বেসরকারি  ঠিকাদারের স্বার্থে ইটভাটা তৈরির জন্য কমরু চাচা ও আমাদের জমিসহ প্রায় দশ একর জমি অধিগ্রহণ করল। ঐ সব জমিতে বছরে তিনটি ফসল ফলতো। তাতে এ গ্রামের মানুষ আরও গরিব হলো, দেশে কৃষিযোগ্য জমির পরিমাণ কমলো কিন্তু মুনাফা হলো ঠিকাদারের।’ আমি প্রশ্ন করলাম, ‘আপনারা বাধা দিলেন না কেন? বেসরকারি ঠিকাদারকে ইট ভাটা তৈরির জন্য গরীব মানুষের জমি অধিগ্রহল করা অনৈতিক। সরকারি কাজের জন্য হলেও ইটের জোগান দেয়ার দায়িত্ব ঠিকাদারের।’ তমিজ ভাই বলেলন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করি কি করে। হ্যাঁ, আমরা উকিল, মোক্তার নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারতাম। কিন্তু কেউ আমাদেরকে পরামর্শ দেয়নি। তুমি তখন  নবম শ্রেণির ছাত্র।’ আমার মনে পড়ল ঐ ইটভাটায় গিয়ে দেখতাম ইট তৈরির জন্য একদিকে মাটি কেটে বিরাট বিরাট পুকুর বানানো হয়েছে, অন্যদিকে  পোড়া ইট স্তূপ করে  রাখা হয়েছে।

তমিজ ভাই বলতে লাগলেন, কমরু চাচা মসজিদ গড়ার উদ্দেশ্যে নিজের জমি দান করে ইট তৈরির রাস্তা দেখিয়েছিলেন, আর সরকার তার জমি অধিগ্রহণ করে ইটভাটা বানাল এবং ঐ ইট দিয়ে সরকারি স্থাপনা  তৈরির জন্য  শায়েস্তানগর গ্রামের কৃষি জমি একের পর এক অধিগ্রহণ করল। কমরু চাচা ভালো কাজ করতে গিয়ে নিজেই বলি হলেন। ইটভাটার জমি অধিগ্রহণ করার দুবছর পর দেখা গেল সরকারি সার্ভেয়ার দক্ষিণ বন্দের  অবশিষ্ট জমি সার্ভে করছে। সার্ভেয়ারকে জিজ্ঞেস করে  জানতে পারলাম, ঐ জমি টি অ্যান্ড টি  সিগনাল টাওয়ার  স্থাপনের জন্য অধিগ্রহণ করা হবে। প্রায় একশ’ একর তিন ফসলি জমি  গ্রামবাসীদের প্রাণ। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত  গ্রামবাসী এ সব জমিতে চাষ-বাসের কাজে ব্যস্ত থাকত। কমরু চাচার নিজেরই জমি ছিল দশ একর। সেটাও সরকারের পেটে চলে গেল। কিন্তু  নামমাত্র দাম যা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করার  কথা সরকার তা করল না। সরকার কয়েকটি কিস্তির  মাধ্যমে  জমির দাম  পরিশোধের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল। প্রথম কিস্তির টাকা পেতে কমরু চাচাকে  দশদিন মহকুমা প্রশাসকের অফিসে যেতে হয়েছিল। দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পরিশোধের নোটিশ যখন এল, তখন  প্রথম কিস্তির প্রাপ্ত দামের অর্ধেক বাজার সদাইয়ে খরচ হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয় কিস্তির  টাকা আদায় করতে কমরু চাচাকে ছ’মাসে মহকুমা প্রশাসকের অফিসে অন্তত বিশবার যেতে হয়েছিল। তারপরও মহকুমা  প্রশাসকের  অফিস মূল্য পরিশোধ করেনি।

দুর্ভাগ্য নাকি একাকী আসে না, সদলবলে হাজির হয়। সরকারের নির্দয় আচরণের পাশাপাশি খোয়াই নদীও    কমরু চাচার সাথে বিরূপ আচরণ শুরু করল। কমরু চাচার জমিতে কয়েক বছর যাবৎ খোয়াই নদী পলি উপহার দিয়ে বিরাট এক চরের সৃষ্টি করেছিল। গ্রামবাসী সে চরকে বলত ‘কমরুর চর’। কিন্তু হঠাৎ প্রাকৃতিক কারণে  খরস্রোতা খোয়াই খেপা যুবতীর মতো বাঁক পরিবর্তন করে কমরু চাচার জমির দিকে এগোতে লাগল। ক্ষীণাঙ্গী  খোয়াই রাত-দিন  চব্বিশ ঘণ্টা ধপাস ধপাস শব্দে পাড় ভেঙে চরের জমি উদরস্থ করল। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ‘কমরুর চর’ খোয়াই’র গর্ভে বিলীন হলো। বিরাট চরের বালু উদরস্থ করেও ক্ষীপ্ত  নদীর ক্ষুধা মিটল না। এরপর খোয়াই’র নজর পড়ল কমরু চাচার ভিটাসহ আরও কয়েকটি ভিটার ওপর। নদীর তীর থেকে কমরু চাচার  ভিটা অন্তত পাঁচশ’ ফুট দূরত্বে অবস্থিত ছিল। কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই ভিটাও নদীগর্ভে তলিয়ে গেল। কমরু চাচা ঘরের একটি টিনও বাঁচাতে পারেন নি। এককালে শত বিঘা জমির মালিক কমরু চাচা তখন বাস্তু-ভিটাহীন নিঃস্ব ভিখারি।

একটি  মানুষ একাকী কত ধকল সহ্য করতে পারে! এখন বাঁচার একমাত্র সম্বল মহকুমা প্রশাসকের অফিস থেকে  অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণের অর্থ, কিন্তু দশবার সাক্ষাৎকার  দিয়েও একটি টাকাও পাওয়া যায়নি। কমরু চাচা  ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে মহকুমা প্রশাসকের অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। এদিকে সংসারে নিত্য টানাপড়েন, নূন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা, অথচ একদিন কমরু চাচার বাড়িতে গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু ছিল, মেহমানদের আপ্যায়ন করা হতো পোলাও, কোরমা, বড় বড় মাছের টুকরা দিয়ে। গ্রামের অভাবী কেউ টাকা-পয়সা বা ধানচাল ধার চাইলে কোনোদিন বিমুখ হতো না। কমরু চাচার অভাব অনটন দেখে তার  উপকারভোগীরা যারা তার কাছ থেকে ধারকর্জ নিত তারা এগিয়ে এল। তারা যথাসম্ভব নিজেদের দেনা পরিশোধ করল। তারা আরও পরামর্শ দিল, ‘চাচা, মহকুমা প্রশাসকের অফিসে চাচিকে পাঠিয়ে দেন। মেয়ে মানুষের  কান্না-কাটি দেখলে  ওদের  মন গলতে পারে।’

সবার পরামর্শে  কমরু চাচা  স্ত্রীকে  মহকুমা  প্রশাসকের  অফিসে  পাঠালেন । মহকুমা  প্রশাসক  অফিসে  প্রধান সহকারী  সেলিম  মহিলা দাবিদার এসেছে শুনে চমকে গেল। আজ পর্যন্ত অধিগ্রহণের  জন্য ক্ষতিপূরণ চাইতে এ অফিসে কোনো মহিলার আগমন ঘটেনি। তাই সেলিম কিছুটা ভয়ও পেল। কিন্তু  মহিলার দিকে তাকিয়ে সে আর চোখ ফেরাতে পারল না। যেন সে ঘুমের ঘোরে দিবাস্বপ্ন দেখছে। এ তো  তার হারিয়ে যাওয়া রেশমা, মানে কমরু চাচি ! অবিকল রেশমার অবয়ব, কাজল কালো চোখ, চৌকশ নাক, লাল গোলাপের পাপড়ির মতো পান খাওয়া  ঠোঁট, মেঘের মতো ঘন কালোচুল। নিজের গ্রাম ছেড়ে, পরিবার ছেড়ে  ব্যাচেলার সেলিম জীবনের কুড়িটি বছর এ অফিসে কাটিয়ে দিয়েছে, আর এক বছর পরেই চাকরি থেকে অবসরে যাবে। যৌবনে রেশমার সঙ্গে প্রথম প্রেম, দীর্ঘদিনের রোমাঞ্চকর পত্রালাপ, মাঝে মাঝে সবার অগোচরে লুকিয়ে কলেজ প্রাঙ্গণে কয়েক মুহূর্তের  সাক্ষাৎ, কিন্তু হঠাৎ করেই রেশমার বিয়ে, অতঃপর গভীর ক্ষোভে সেলিমের হবিগঞ্জ থেকে স্বেচ্ছায় বদলি হয়ে অনুন্নত ভাটি অঞ্চল আজমিরিগঞ্জে আত্মগোপন। সেই অপ্রত্যাশিত বিচ্ছেদের ব্যথা বুকে পুষে সেলিম  অনেক বছর কাটিয়ে দিয়েছে। সহকর্মী, বন্ধুরা  ঘটনা জানতে চেয়েছে, সেলিম কাউকে কিছু বলেনি। দীর্ঘ দশ বছর সে কোন মহিলার  দিকে  ভালভাবে  তাকায় নি । অভিমান, ক্ষোভ, ক্রোধ  সবই মনে কাজ করছিল। বিয়ের আগে রেশমা একটি চিঠিতে লিখেছিল ‘সেলিম, আমার যদি বিয়ে হয়ে যায়, অর্থাৎ  বাবা যদি জোর করে বিয়ে দেয়,  তুমি  কি  কলঙ্কের ভয় না করে  আমাকে নিয়ে পালাতে পারবে?’ সেলিম আশ্বাস দিয়েছিল পারবে। কিন্তু বাস্তবে  সে পারে নি। ভীতু সেলিম রেশমার বিয়ের খবর সময় মতো পেয়েও তাকে নিয়ে পালাতে সাহস করেনি।

স্বেচ্ছা নির্বাসনে পানি বেষ্টিত হাওর অঞ্চলে দশ বছর  কাটানোর পর কর্মঠ কর্মকর্তা  হিসাবে সেলিমকে  কর্তৃপক্ষ  আবার হবিগঞ্জ সদরে  নিয়ে  এল। হবিগঞ্জে ফিরেও  সেলিম অভিমানে  রেশমার কোনো খোঁজখবর নেয়নি, তার ধারণা ছিল তার রেশমা বেশ সুখেই ঘর করছে, কি অধিকারে সে এখন তার খবর নেবে। সে তো একটা কাপুরুষ! কিন্তু আজ অকস্মাৎ কি ঘটল। রেশমা কোথা থেকে উদয় হলো?  রেশমা তো  আগের মতোই আছে। হয়তো তার সংসারে সুখের বন্যা বইছে। তবে সে আসলেই রেশমা কি না কে জানে। অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে শেষে সেলিম মুখ খুলল, ‘আপনার  কোন এলাকা, কাগজপত্র নিয়ে এসেছেন?’ মহিলা উত্তর দিলেন, ‘জি, এই যে কাগজ,পাঁচ বছর যাবৎ আমার স্বামী এ অফিসে ঘুরছে’ বলেই সেলিমের দিকে ক্ষতিপূরণের দাবিগুলো এগিয়ে দিলেন। সেলিমের দিকে তাকিয়ে রেশমা চাচিও দৃষ্টি ফেরাতে পারলেন না, মনে হলো এ মুখ তো চেনা ! কিন্তু সাহস হলো না জিজ্ঞেস করার। সেলিমেরও কাজ করার মন মরে গেল। সে কাগজগুলো পড়তে পারল না, ফিরে পাওয়া রেশমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। রেশমা চাচি দৃষ্টি নামিয়ে নিলেন। এবার সেলিম এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, আপনি কি রেশমা? রেশমা চাচি চোখ তুলে তাকালে দেখা গেল তার চোখ দুটো ভেজা। সেলিম বুঝল সে তার রেশমাকে চিনতে পারেনি, কিন্তু রেশমা তাকে ঠিকই চিনেছে। সেলিম বলল, ‘আমি দুঃখিত রেশমা, তোমাকে চিনতে পারিনি বলে।’ রেশমা আঁচলে চোখ মুছে উত্তর দিল, ‘তুমি কোনোদিনও আমাকে চিনতে পারনি, চেনার চেষ্টা করনি, আমি চললাম।’ সেলিম  তার রেশমাকে থামাতে পারল না।

অনেক্ষণ সময় নিয়ে ক্ষতিপূরণের দাবিনামাগুলো সেলিম নথির সংগে মিলিয়ে দেখল যে বিষয়টি পুরানো কিন্তু জটিল নয়, তার পূর্ববর্তী সহকর্মী অযথাই কিংবা হীনউদ্দেশ্যে অর্থ পরিশোধ আটকিয়ে রেখেছিল। কমরু চাচাকে সহজ সরল মানুষ পেয়েই ঐ অফিসার কুমতলব আটছিল।  টাকার পরিমাণও কম নয়। তখনকার দিনে এক লাখ বিশ হাজার টাকা যার বর্তমান মূল্যমান এক কোটি টাকার অধিক। সেলিম  প্রয়োজনীয় সমস্ত কাগজপত্র তৈরি করে পরিশোধের ব্যবস্থা করে রাখল।

পরদিন অধীর আগ্রহে সেলিম তার রেশমার আসার অপেক্ষা করছিল। অবশেষে রেশমা চাচি এলেন, কিন্তু দাবিদারদের প্রচ- ভিড়। পাবলিক অফিস, ডজনখানেক পুরুষের ভিড়ে চাচিই একমাত্র মহিলা। মহিলা বলে  জনৈক দাবিদার রেশমাকে ভেতরে নিয়ে বসানোর জন্য সেলিমকে অনুরোধ করল। সেলিম যেন হাতে চাঁদ পেল। ভিড় কমলে সেলিম রেশমাকে ডেকে বলল, ‘তুমি তো এক লাখ বিশ হাজার টাকা পাবে, এত টাকা দিয়ে কি করবে?’ টাকার অংক শুনে চাচির সংজ্ঞা হারানোর জোগাড়। অথচ সংসারে  টাকার অভাবে স্বামী স্ত্রী কি কষ্টই না করেছেন। অভাবের জ্বালায় জোয়ান ছেলেকে ঠিকাদারের  ইটভাটায় কাজ করতে দিয়েছেন। যাদের  বাপ দাদার জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তাদের অনেকেই সেই ইটভাটায় শ্রম বিক্রি করেছে। সেই ছেলে একদিন কাজ থেকে ফিরে সেই যে সংজ্ঞাহীন হলো, আর সংজ্ঞা ফিরে এল না। রোগ শোক ও দুশ্চিন্তায় কমরু  চাচা শয্যাশায়ী হলেন। রেশমা চাচিও  মানসিকভাবে  দুর্বল হয়ে পড়েন।

রেশমা চাচি সেলিমের প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেলেও দু’জনের মনের মধ্যে একটা অব্যক্ত জিজ্ঞাসা গুমরে মরতে লাগল। সেলিম রেশমাকে চায়, কিন্তু কোন্ মুখে সে তাকে সংসার ত্যাগ করতে বলবে। সে কি তার জন্যই বার বছর অপেক্ষা করে বিয়ে করেনি, না অন্য কোনো কারণ  ছিল, অথবা খামাখাই বিয়ে না করে  বার বছর কাটিয়ে দিয়েছে। বিভ্রান্ত, উদাসীন সেলিম নিজেও এ প্রশ্নের উত্তর জানে না। রেশমা চাচিরও মনে হয় হঠাৎ সেলিমকে পেয়ে হারানো প্রেম খুঁজে পেয়েছেন। তবে কি  বার বছরের সংসার লোক দেখানো অথবা প্রহসন ছিল, তাও নয়। লৌকিকতার খাতিরে সবই করেছেন, জৈবিক পন্থায় ছেলে জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু কোথায় যেন একটা শূন্যতা, খালি খালি লাগা অনুভূতি  হাহাকারের  মতো বিরাজ করছিল, যা কাউকে জানাতে পারতেন না। হঠাৎ করেই বাবা তার লেখাপড়া বন্ধ করে সম্পদশালী, বয়স্ক স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। বাবার প্রতি পুঞ্জীভূত অভিমানের বিস্ফোরণটা এখন ঘটল। বুড়ো স্বামীর হাতে টাকা এসেছে, স্বামীর খাওয়া পরার অভাব হবে না, অর্থলোভী স্বজন, এমনকি  স্ত্রীরও অভাব হবে না। ক্ষোভে, অভিমানে রেশমা চাচি ক্ষতিপূরণের টাকা থেকে এক পয়সাও নিলেন না। তিনি তার হারানো প্রেমিককে নিয়ে আর একবার ঘর বাঁধতে চাইলেন। জীবনের অনাস্বাদিত স্বাদ মধুর না অম্ল তা পরীক্ষা করতে চাইলেন। এর পর থেকে রেশমা চাচিকে কারণে-অকারণে প্রায়ই সেলিমের অফিসে  দেখা যেত। এক রাতে দু’জনই এলাকা থেকে উধাও হয়ে গেল।

এ পর্যন্ত বলে তমিজ ভাই বিরতি দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর কমরু চাচার কি হলো?’ তমিজ ভাই বলেলন, ‘কি আর হবে, বুড়ো বয়সে শুধু অর্থের জোরে বাঁচা যায় না। মধুর লোভে অনেক মধুকর চাচাকে ঘিরে রইল। যেই মধু ফুরাল, সবাই চম্পট দিল। কয়েক বছরের মধ্যেই অর্থাভাবে, অযত্নে, একাকিত্বের যন্ত্রণায়  কমরু চাচা একদিন মারা গেলেন। রেশমা চাচি আর ফিরে আসেন নি। নিজের  জমিতে সরকারের তৈরি ইটভাটার আগুনে পুরো একটি সংসার পুড়ে ছারখার হয়ে গেল।

লেখক : গল্পকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares