সকাল বেলার পাখি : মোহীত উল আলম

গল্প

সকাল বেলার পাখি

মোহীত উল আলম

ঘ রের লোক বুঝতে পারে কখন তাঁর মন অস্থির হয়।

কি সমস্যা, ঘুমাচ্ছো না যে? মিতু জিজ্ঞেস করেন।

জানলা দিয়ে বাইরে আকাশের একটু ফালি দেখা যাচ্ছে। সাবান ফেনা ছড়ানো রং আকাশের। বৃষ্টির মেঘ জমছে। এ দুপুরে তাঁর মোটা শরীরে নাক ডাকিয়ে প্রচ- ঘুম হবার কথা। কিন্তু কই!

তুমি কিভাবে বুঝতে পারো যে, আমি অস্থির হয়ে আছি? দিদার মিতুকে জিজ্ঞেস করেন।

উত্তরের অপেক্ষা না করে তিনি বিছানা ছাড়েন। তাঁর আজকে বিকালে ক্লাস। মিতু শুয়ে শুয়ে দেখেন ঘরের মধ্যে একটা বিরাট ম্যান-মাউন্টেন ঢুলতে ঢুলতে টয়লেটে যাচ্ছে। মিতুর চোখে পানি চলে আসে। এটি তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে।

দিদার টয়লেট সেরে আলনা থেকে শার্ট প্যান্ট টেনে পরতে থাকেন। তার আগে কোমরের ওপর একটা শুকনো তোয়ালে পেঁচিয়ে নেন। মনে মনে বলেন, না আবার সব শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।

সকাল বেলার পাখিটা অদ্ভুত সুন্দর ছিল, তাই না? প্যান্টের বোতাম মারতে মারতে মিতুকে বলেন।

মিতু হাই তুলে ডান হাতটা মুখের ওপরে নিয়ে বললেন, তোমাকে ভয় পেয়েছে পাখিটা। তুমি ওভাবে কাছে না গেলে পাখিটা উড়ে যেত না।

দিদার চিন্তান্বিত কণ্ঠে বললেন, ওটা কি বললে। আমাকে আলাদা ভয় পাবে কেন? পাখি ছোট বড় সবাইকে একই ভয় পায়। আবার যোগ করলেন, কি সুন্দর পাখিটা, তাই না। একেবারে হলুদ রং। কালো এক জোড়া ঠোঁট। ঠ্যাংগুলোও কালো। খাবার ঘরের জানলার কার্নিশে বোগেনভিলার ছায়ায় চুপচাপ বসেছিল, আমি বা তুমি প্রথমে দেখিইনি। কী যে নাম কি জানি।

ময়না-জাতীয় হবে মনে হয়। আশপাশের বাসা থেকে কবুতর তো সবমসয় আসে, কিন্তু এরকম পাখি এ প্রথম দেখলাম । মোবাইলটা নিয়ে তুমি কাছে যেতেই ফট করে উড়ে গেল।

মিতু হাইটাই শেষ করে নিজেও বিছানায় উঠে বসেন। স্বামীকে উদ্দেশ করে বলেন, তুমি বেরুচ্ছো? আকাশে ভারি মেঘ করেছে কিন্তু। জোর বৃষ্টি নামবে। মোবাইল নেবে না?

না, তুমি রাখো। পকেটে মোবাইল রাখলে বের করতে পারি না, খুব কষ্ট, হাতই ঢোকে না। আমি দরকার হলে ইসরাইল সাহেবের মোবাইলটা ইউজ করব।

প্রত্যেকদিন ওনার মোবাইল ব্যবহার করো তুমি, ভদ্রলোক কিছু মনে করেন না?

আরে না, যা পয়সা ওনার। দিলটাও বড়।

দিদার তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মিতুকে কোনো একটা প্রবোধ দিয়ে ঘর থেকে বের হন। লিফটটা তাঁর ওজন নিতে খানিকটা কেঁপে উঠল।

বড় রাস্তায় এসে একটি রিকশা দাঁড় করান। ইদানীং তাঁকে টেম্পু বা ম্যাক্সি নিতে চায় না। ডাক্তারের আদেশ, যতটুকু পারেন যেন হাঁটেন। কিন্তু হাঁটতে গেলেই তাঁর বুক ধড়ফড় করে। রিকশার প্রবল ঝাঁকুনিও তাঁর সহ্য হয় না। প্র¯্রাব এসে যায়।

এবারের প্রিন্সিপালটা পড়েছে একটা অমানুষ। একেবারে আনকম্প্রোমাইজিং। মুখের ওপর কেমন করে বলে যে আপনাকে ছাত্রছাত্রীরা চায় না। আপনি আগে চিকিৎসা করান।

তিনি ক্ষোভ মেশানো গলায় বলেছিলেন, কিন্তু আমার পড়ানোতে তো কোনো ক্রটি নেই। প্রিন্সিপাল ভিলেনের মতো দাঁত বের করে হেসে বলেছিলেন, সেটি সব নয়, আপনাকে পড়াতে দিয়ে বরঞ্চ কলেজের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে।

ইমেজ! কথা বলতে যেয়ে দিদারের গলা সরে না। জ্বালা আর অভিমান। বললেন, একজন শিক্ষক মোটা কি পাতলা তার সঙ্গে কলেজের ইমেজের কী সম্পর্ক! আপনার অনেক শিক্ষক ঠিকমতো পড়ায় না, পরীক্ষা নেয় না, এ অজুহাত সে অজুহাতে অনেকসময় ক্লাসও ফাঁকি দেয়। তাদের জন্য কি ইমেজ নষ্ট হচ্ছে না!

প্রিন্সিপাল গলার স্বর খাদে নামিয়ে ফেললেন। যেন কেউ শুনতে পেলে অসুবিধা হবে। বললেন, ঐ সব তো আছে, এগুলিও আছে। এটা তো প্রাইভেট কলেজ। ঠিকমতো শিক্ষক দিতে না পারলে ছাত্রছাত্রী টানব কেমন করে!

কলেজে ছাত্রছাত্রী আসছে নাÑ দিদার প্রিন্সিপালকে মুখোমুখি অস্বীকার করলেও নিজের মনে মনে এ দায়ভার বহন করে ইদানীং চলাফেরা করছিলেন। প্রিন্সিপাল সাহেবের একটি বাতিক আছে। তিনি নীতিকথা খুব পছন্দ করেন। বিভিন্ন মনীষীর বিভিন্ন বাণী তিনি কম্প্যুটার প্রিন্ট করে দেয়ালের বিভিন্ন জায়গায় লাগিয়েছেন। একটা বাণী  হলো এরকম যে কলম্বাস যদি তার উপদেশকদের কথা শুনতেন তা হলে তার জাহাজগুলো সম্ভবত এখনও বন্দরে পড়ে থাকত।

তাঁর প্র¯্রাব কন্ট্রোলে থাকছে না, এটা অবশ্যি একটা বড় সমস্যা । কিন্তু ডাক্তারদের ঐ একটা কথা, ভারী ওজনের জন্য প্রোস্টেটের সমস্যা হচ্ছে, তাই প্র¯্রাব নিয়ন্ত্রণে নাই। হাঁটাহাঁটি ছাড়া উপায় নেই। যেন হাঁটতে তিনি চান না। কিন্তু হাঁটতে যে তিনি পারেন না। বুক ধড়ফড় করে, মনে হয় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাবেন।

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে তিনি আবিষ্কার করেন যে রিকশাটা ঠিক কলেজ ভবনের নীচে এসে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের কলেজটা ইংলিশ মিডিয়াম প্রাইভেট কলেজ। চট্টগ্রামের কয়েকজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মিলে খুলেছে। তিনতলার বিশাল ভবন। নীচের তলার একটা অংশে পার্কিং, আর বাকি অংশে মার্কেট। ওপরের দু’ফ্লোরে বিশাল স্পেস নিয়ে কলেজ।

রিকশাওয়ালাকে তিনি দু’টো বিশ টাকার নোট দিলেন। রিকশাওয়ালা টাকাটা হাতে নিয়ে ঠায় দঁড়িয়ে রইলো।   চোখের চাহনি এমন যেন সে এরকম অবাক কা- আর দেখেনি। তিনি এবার একটা দশ টাকার নোট  বাড়িয়ে দিলেন।

রিকশাওয়ালা বললো, কি দ্যান স্যার এগুলো! এত বড় একটা পাহাড় টানলাম, পঞ্চাশ টাকাতো শুধু ভাড়াই হবে। তখন তিনি দশ টাকাটা ফেরত নিয়ে আরেকটা বিশ টাকার নোট যোগ করে গাড়িবারান্দায় দাঁড়ালেন। একবার বৃষ্টিমুখর মেঘের দিকে তাকিয়ে তাঁর ভীষণ একটা চিন্তা এলো। এমন বৃষ্টি হোক, নুহের প্লাবনের মতো, সবার সঙ্গে যেন তিনিও ভেসে যান।

দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে তিনি রেলিঙে ভর দিলেন। ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে শ্বাস টানছিলেন। সিঁড়ির মুখে উপরে নীচে বারান্দায় ছাত্রছাত্রীদের জটলা। সবাই সালাম দিচ্ছিল তাঁকে। কেউ কেউ সালাম দিয়েই মুচকি হেসে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল।

তিনি কোন কিছ ুতোয়াক্কা না করে একটা বিরাট ভালুকের মতো হেলে দুলে হাঁটতে হাঁটতে শিক্ষকদের রুমে ঢুকলেন। শিক্ষকদের রুম এসি দেওয়া। কর্তৃপক্ষের প্ল্যান হলো পুরো বিল্ডিং এসি করা । আপাতত প্রিন্সিপালের রুম, শিক্ষকদের রুম ও কয়েকটা ক্লাসরুম এসি করা হয়েছে।

রুমের মধ্যে দু’তিনজন শিক্ষক পাশিপাশি বসে গল্প করছিলেন। একজন তাঁকে দেখে ‘এ যে বিগ গালিভার’ বলে আহ্বান জানালেন। যিনি ডাকলেন, তাঁর নাম মফজল হক । পরিসংখ্যান পড়ান। কম্প্যুটার সাইয়েন্সে এক তরুণী অবিবাহিতা শিক্ষয়ত্রী যোগদান করেছেন। মফজল হক তাঁর কুমারীত্ব ঘুচাবার জন্য তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে চান। কিন্তু নানান বৈষয়িক হিসাব করে বারবার পিছিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর যুক্তি, জীবন একটা, মানুষ একবারই বিয়ে করে।

মফজল হকের পাশে না বসে দিদার ইংরেজির শিক্ষক ইসরাইল হোসেনের পাশে বসলেন। কোচিং পড়িয়ে তিনি সহকর্মীদের মাঝে সম্ভ্রম জাগানো ধনী লোক। ইসরাইল সাথে সাথে দিদারের দিকে তাঁর নিজের মোবাইলটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আজকে কত মিনিট?

দিদার হেসে দিলেন, অন্যরাও হাসলেন। দিদার তাঁর ডান হাতের কলাসদৃশ বিশাল তর্জনী তুলে কণ্ঠে বিনয় মাখিয়ে বললেন, এক মিনিট।

দিদার লাইন পেতে পেতে মফজল হক ইসরাইল হোসেনকে বললেন, আপনি গালিভার ভাইয়ের কাছ থেকে কল চার্জ নেবেন। তা হলে আপনাকে আর ডিস্টার্ব করবেন না।

মেয়ের ফোন বাজছিল। মেয়ে হয়তো আশপাশে কোথাও আছে ব্যস্ত। তাঁর প্রথম ঘরের মেয়ে। আঙ্গিনা নাম। বিয়ে হয়েছে ঢাকায়। বিরাট এক শ^শুর বাড়ির মধ্যে পড়েছে-কাজে ব্যস্ত থাকে মেয়ে, সবসময় টেলিফোন ধরতে পারে না। ফোনটা ইসরাইল সাহেবকে ফেরত দিয়ে মফজল হককে হাসতে হাসতে খসখসে গলায় বললেন, খালি হিসেবের কথা। আপনারটাতে একদিন করতে চাইলাম, বললেন চার্জ  শেষ। এ হিসেবের জন্য বিয়েও করতে পারছেন না।

মফজল হক একটু বেদনামাখা হাসিতে বললেন, আপনি দু’টো বিয়ে করেছেন তো সে জন্য আমি একটাও পারি নি করতে। ন্যাচারাল ব্যালান্স।

দিদারের রাগ হলো না। তাঁকে সবাই খোঁচায়। তিনিও সুযোগ পেলে ছাড়েন না।

আবার টেলিফোনটা নিলেন। এবার মেয়ে ওদিক থেকে টেলিফোন ধরেছে।

কি করছ মা, জামাই কোথায়? ঢাকায় কি খুব বৃষ্টি হচ্ছে?

মেয়েও কি কি বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু এক মিনিটের সামান্য বাকি থাকতেই তিনি ফোন রেখে দিলেন। তাঁর মনের  মধ্যে তোলপাড় করছিল মেয়ের কথা, মেয়ের বিয়ের পর তাঁর প্রথমা স্ত্রী মারা যাবার কথা, এবং আত্মীয়-স্বজন মিলে তাঁকে আবার জোর করে বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর কথা। তখন কি সুন্দর রোগা লিকলিকে ফিগার ছিল তাঁর!  মোবাইল ফেরত দিতে দিতে তিনি ইসরাইল হোসেনকে বললেন, আপনার ছাত্রছাত্রীরা আপনার খুব সুনাম করে। বলে, স্যারের কথা আমরা হা করে গিলি। ক্লাস শেষ করলে মনে হয়, কেন শেষ হলো!

এটাও তিনি বললেন আসলে মফজলের ওপর রাগ ঝাড়তে। প্রতিহিংসার একটা শিরা চিড়বিড় করে সারা পৃথিবী থেকে সরে এসে মফজল হকের ওপর নিবিষ্ট হলো।

মফজল টোপটা গিললেন। তাতানো গলায় বললেন, লিটেরেচার মানেই রস। রসের জন্যই লিটেরেচারের শিক্ষকদের জনপ্রিয়তা বেশি। যেমন, গালিভার ভাই আপনার বিষয় দর্শনশাস্ত্রকে আপনি কোনোভাবেই রসোত্তীর্ণ করতে পারবেন না।

ইসরাইল আর দিদার একসাথে মফজল হককে বাগড়া দিলেন। কেন, তা কেন হবে?

ইসরাইলই কথা চালিয়ে গেলেন: পড়ানো হচ্ছে একটা আর্ট- ছাত্রছাত্রীদের মনোযোগ ধরে রাখার একটি কৌশল। যে শিক্ষক যে বিষয় পড়ান সে বিষয় ছাত্রদের কাছে মনোগ্রাহী করে তোলার একটি কৌশল নিশ্চয় আছে, সেটিই শিক্ষককে রপ্ত করতে হয়। শিক্ষকের এ কৌশল জানা থাকলে পরিসংখ্যানের মতো খটমটে বিষয়ও যেমন রসের হয়ে ওঠে, তেমনি এ কৌশল জানা না থাকলে কবিতার মতো রসের ক্লাসও বিরক্তিকর হয়ে ওঠে।

মফজল সম্মিলিত আক্রমণের মুখে বুঝতে পারছিলেন যে তর্কে তিনি হেরে যাচ্ছেন। বললেন, ছাত্ররা রস চায় না, তারা চায় শিক্ষকের আন্তরিকতা। দিদারের প্রস্রাব আসছিল। আন্ডারওয়্যারের ওপর একটা তোয়ালে জড়িয়ে নিয়েছিলেন প্যান্টের ভিতর। কাজেই তিনি নিরাপদ। তাই তর্ক ছাড়লেন না। বললেন, রস ব্যাপারটা খুব ইর্ম্পোট্যান্ট। স্কুলে আমাদেরকে বিজ্ঞানের এক শিক্ষক পড়াতেন। তিনি চুম্বকের ধর্ম বোঝাতেন এ ভাবে : চুম্বক বিপরীত মেরুতে আকর্ষণ এবং সমমেরুতে বিকর্ষণ করে, যেমন ছেলে আর মেয়ের মধ্যে আকর্ষণ, এবং ছেলে আর ছেলে বা মেয়ে আর মেয়ের মধ্যে বিকর্ষণ হয়।

মফজল হক এতক্ষণে বিজয়ের একটি নিশ্চিত ঝান্ডা দেখতে পেলেন। সোৎসাহে বললেন, উঁহু, হলো না, বিগ গালিভার ভাই, যৌনবিজ্ঞানে সমকামিতার জায়গা আছে, কাজেই আপনার চুম্বকতত্ত্ব এখানে খাটবে না।

দিদারের প্রস্রাবের বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি ক্লান্তি বোধ করছেন। এসি রুমের ঠান্ডার শীতল পরশের মধ্যেও তিনি ঘামছিলেন। এসময় দরজা আস্তে করে ঠেলে ঢুকলেন কম্প্যুটার সাইয়েন্সের জ্যোৎস্না বখত। নিতান্তই তরুণী। সালোয়ার কামিজ পরা। চুল একবারে ভেজা আর ছড়ানো, পিঠের ওপর দিয়ে  কোমর পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে।

জ্যোৎস্না বখত সবাইকে সমীহের সঙ্গে সালাম দিলেন। দিদারের পাশে নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় বসে টেবিলে দু’হাত রেখে তার মধ্যে মাথা গুঁজে দিলেন।

মফজল হক অনাবশ্যক একটা কাশি দিলেন। অনুশোচনার সুরে জিজ্ঞেস করলেন, কি জ্যোৎ¯œা ম্যাডাম, মাইগ্রেনের ব্যথা উঠেছে?

জ্যোৎস্না মাথা না তুলেই বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিলেন, জি স্যার।

মেয়েরা এ সমাজে ঠিক বয়সে বিয়ে না করলে মাথাব্যথা হয় কি না এরকম একটা চিন্তা দিদারের মাথায় চাড়া দিয়ে ওঠার সময় দরজা পুশ হলো। টুপি মাথায় দেওয়া পিয়ন তাহের দিদারের কাছে এসে বলল, প্রিন্সিপাল স্যার আপনাকে সালাম দিয়েছেন।

রুম থেকে বের হয়ে করিডরের বাঁ দিকে প্রথম দরজাটা ঢুকেছে জেনারেল টয়লেটে। তার মধ্যে একটাতে ঢুকে তিনি আরাম করে প্র¯্রাব করলেন। ভেজা তোয়ালেটা খুলে আবার ঘুরিয়ে কোমরে পেঁচালেন। প্যান্টের পকেট থেকে ডিওডের‌্যান্ট বের করে সারা গায়ে স্প্রে করলেন। এ কাজগুলো করার সময় জ্যোৎ¯œা বখত তাঁর মাথা থেকে গেল না। নিজের কাছে নিজে যুক্তি দিলেন, তাঁর মতো বেহদ্দ একটা মোটা লোক যদি দু’ দু’বার বিয়ে করতে পারে, তাহলে বুঝতে হবে এ সমাজে মেয়ে সস্তা। তা না হলে মফজল হকের মতো একটা কমবখত লোক কী করে  জ্যোৎ¯œা বখতের মতো সুশ্রী শিক্ষিত চাকরিজীবী একটি মেয়েকে বিয়ে করতে দোনোমনো করেন!

কিন্তু এর মধ্যে তাঁর প্রচ- ক্ষিদে পাওয়া শুরু হলো। প্রিন্সিপাল অমানুষটা তাঁকে রুমে ডেকে বকাঝকা করা ছাড়া কোনো কাজ করেন না। তাঁর শরীরটা হচ্ছে তাঁর প্রিয় বিষয়। কথা যদি বল্লম হতো তা হলে দিদার এতদিনে একটি বল্লমবাহী জন্তুতে পরিণত হতেন। কিন্তু নীচের একটি দোকান থেকে ভাজা পেঁয়াজু আনাই ছিল। তিনি গোটা চারেক পেঁয়াজু এক সঙ্গে তাঁর বিরাট থাবার মধ্যে নিয়ে মুখে চালান করে দিলেন। প্রিন্সিপাল সাহেব তাঁর দিকে কিছুক্ষণ চকচকে চোখে চেয়ে কোণার একটা ডেস্ক থেকে সাদা একটা কম্প্যুটারে ছাপা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন, পরিচালনা পর্ষদের একটি সিদ্ধান্ত মোতাবেক এ চিঠি আমি ইস্যু করেছি। পর্ষদ আপনাকে চার মাসের সবেতন ছুটি দিয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসা করে, অর্থাৎ পাতলা খান হয়ে যেতে হবে। ভালোই হলো সিদ্ধান্তটা, আপনি একটু সময়ও পেলেন, বেতনটাও আটকালো না। এবং মনে করবেন না যে আমি আপনার জন্য ওকালতি করিনি!

আপনি তো করবেনই স্যার, আপনি আসার পর থেকে তো স্যার আপনিই আমার দেখাশোনা করছেন।

দিদারের ফোড়নটা অবশ্য প্রিন্সিপাল সাহেব উপেক্ষা করলেন। কিন্তু এক ধরনের নির্বিকার মুখভঙ্গি করে বললেন, মাইন্ড ইউ, এটা গুডবাই লেটারও হতে পারে, যদি আপনি না বদলান।

সেটা হলে আমি মামলা করব। হাসতে হাসতে দিদার আরও দু’টো পেঁয়াজু গলাধঃকরণ করলেন। আবার যোগ করলেন, বলব যে আমার শারীরিক কাঠামোকে টার্গেট করে আমার চাকরি খাওয়া হয়েছে।

প্লেইট থেকে শেষ পেঁয়াজুটাও মুখে পুরে দিদার হাসতে হাসতে যখন প্রিন্সিপালের রুম থেকে বের হলেন, তখন  বাইরে অঝোর বৃষ্টি শুরু হয়েছে। প্রিন্সিপালের চিঠি পাবার অর্থ এখন তাঁর আর ক্লাশ নিতে হবে না।

তিনি চিঠিটা শার্টের ওপরের পকেটে ঢুকিয়ে, সহকর্মীদের সঙ্গে আর দেখা না করে, নীচে নেমে গাড়িবারান্দায় দাঁড়ালেন। দু’টো রিকশা গাড়িবারান্দার ছাদের নীচে কোণ ঠেসে দাঁড়িয়ে আছে।  তিনি রিকশা নেবেন, কিন্তু তাঁর আবার প্র¯্রাব গলছে। এর মধ্যে একটা রিকশা ভিজতে ভিজতে গাড়িবারান্দায় ঢুকে একটি ছাত্রীকে নামালো। দিদার বুঝলেন, ইসরাইল সাহেবের প্রাইভেট ব্যাচের ছাত্রী। তিনি এত প্রভাবশালী যে বিকেলে ক্লাস শেষ হয়ে গেলে কলেজের ভিতরেই একটা রুমে প্রাইভেট পড়ান। কর্তৃপক্ষ জেনেও না জানার ভান করে। কারণ ইসরাইলের জনপ্রিয়তার কারণে কলেজও বেশ স্টুডেন্টস পায়।

রিকশাটার কাছে গিয়ে তিনি শুলকবহর যেতে কত নেবে জিজ্ঞেস করলেন।

রিকশাওয়ালা দ্বিগুণের বেশি ভাড়া চাইলেও তিনি রাজি হলেন। তিনি বসলে রিকশার হুডতো আর ওঠানো যায় না, তাই তিনি মাথার ওপরে ছাতা ধরে বসলেন। তাঁর শুধু মাথাটা বাঁচলো, কিন্তু ছাতার বাইরে তাঁর কাঁধ পিঠ মুহূর্তেই ভিজে একসা হয়ে গেল।

শুলকবহরের গলিতে ঢুকতেই বিপুল পানির মধ্যে পড়ল তাঁর রিকশা। আষাঢ় মাসের কেবল শুরু। বছরের প্রথম ভারী বর্ষণও বলা যায়। নালা-খন্দক সবগুলোর মুখ বোজা। পানি জমতে সময় নিলো না। এক বৃষ্টিতেই সব সয়লাব। পুরো শুলকবহর থৈ থৈ করছে পানিতে। তাঁর রিকশাওয়ালা মধ্যবয়সের। মুখে সামান্য দয়ামাখানো দাড়ি। শান্ত মেজাজের। পেডেলে চাপার বদলে তিনি নেমে খুব সাবধানতার সঙ্গে রিকশাটা রাস্তার মাঝখানে রেখে টানছিলেন। পাশের একটা মসজিদ সংলগ্ন পুকুর থেকে পানা ভেসে এসেছে। রাস্তাটা ঘুরতেই দেখা গেল একটা কেজো লোক নিজ বাসার গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তার পাশে জাল ফেলছে। বৃষ্টিতে ভিজছে সেদিকে তার তোয়াক্কা নেই। উপরে দোতলার গ্রিলঘেরা বারান্দা থেকে তাঁর স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা সে দৃশ্য উপভোগ করছে। রিকশাটা টানতে টানতে আরেকটা রাস্তা ঘুরতেই রিকশাওয়ালার কোমর সমান পানি দাঁড়িয়ে গেল। আর রিকশার পাদানিতে তাঁর নিজের পায়ের গোড়ালি ডুবিয়ে পানির স্তর উঠে গেল। রিকশা আর এগোলেই বিপদ হতে পারে। এলাকার লোকজন এরমধ্যেও কোমরপানিতে প্রায় সাঁতরে সাঁতরে যাতায়াত করছে। ওপর থেকে বৃষ্টির কোনো ক্ষান্তি নেই।

রিকশাওয়ালা তাঁর দিকে অসহায় ভঙ্গিতে তাকালে, তিনি বললেন, আর কি করবেন এখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন। রিকশা উল্টে গেলে সমস্যা হবে।

তিনি ছাতাটা বন্ধ করে কোলের ওপর রাখলেন। ভিজে তো গেছেনই, আর মাথা বাঁচিয়ে লাভ কি। একটুক্ষণ চিন্তা করে প্রস্রাবও ছেড়ে দিলেন। ছেড়ে দিলেন মানে, না ছেড়েও উপায় নেই। আর, কোনো কিছুতো শুকনোও নেই। পানিতে প্রচুর ঢেউয়ের সঞ্চার। তিনি জোঁক আর সাপের ভয়ে মনের মধ্যে সিঁটিয়ে রইলেন।

বছরের প্রথম ভারী বর্ষণ। শহরের এরকম জনবহুল এলাকার মধ্যে এত পানি! তিনি অবাক হয়ে ভাবতে থাকলেন। সকাল বেলায় দেখা পাখিটার কথা তাঁর মনে এলো। তিনি মোবাইল নিয়ে ফটো তোলার জন্য এগিয়ে গেছিলেন। সুন্দর ফুরফুরে পাখায় পাখিটা ঝপাট করে উড়ে কাছের আরেকটা গাছে গিয়ে বসেছিল। পাখিটার হলুদ পালক, কালো লম্বা ঠোঁট, ঘন ঘন মাথা দোলানো, চঞ্চল চাহনি সব কেমন যেন এক অর্নিবচনীয় সুখ এনে দিলো তাঁর মনে। তিনি এ জলমগ্ন রাস্তার মধ্যে খোলা হুড রিকশার সিটে বসে ঠায় ভিজতে লাগলেন।

লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares