মানুষ-অমানুষ : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

গল্প

মানুষ-অমানুষ

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

মেয়ের হাত ধরে ঢাকার বাসে উঠে হাশিম শেখের মনে পড়ল, চশমাটা বাড়িতে ফেলে এসেছেন। চশমা ছাড়া তিনি খুব যে অচল, তা নয়, এমনিতে চলা ফেরায় কোনো সমস্যা হয় না, কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নামতে পা হড়কে যায়, মানুষ চিনতে ভুল হয়, আর সবচেয়ে বেশি যা কষ্টের, সকালের কাগজটা অথবা দুপুরে বিছানায় শুয়ে বই পড়াটা যে আর হয় না। অথচ তিনি যাচ্ছেন পুরো একটা মাসের জন্য। মেয়ে ইমা চাকরি পেয়েছে একটা এনজিওতে, এই কিছুদিন হলো, এখন একটা বাসা নিতে গিয়ে দেখেছে, তার একার পক্ষে বাসা ভাড়া করাটা অসম্ভব। বাড়িওলারা কোনো একা মেয়েকে বাসা ভাড়া দেবেন না। খুঁজে পেতে এক সহকর্মী তামান্নাকে জোগাড় করে ইমা আবার গেল দুই তিন বাড়িওলার কাছে। সেখানেও শুনতে হলো ‘না’। দুই অবিবাহিত মেয়ের কাছে বাসা ভাড়া দেয়া আর পাড়ার মাস্তান আর টপ টেররদের হাতে বাড়ির চাবিটা তুলে দেয়া একই কথা, বললেন এক বাড়িওলা। আরেকজন জানালেন, তার অন্যান্য ভাড়াটিয়ারা আপত্তি তুলবে। ইমা-তামান্না যে ভদ্র পরিবারের মেয়ে, ভালো চাকরি করে এবং মাসের এক তারিখ ভাড়ার টাকাটা যে তার হাতে তারা তুলে দেবে, এ ব্যাপারে তার কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু ভাড়াটিয়াদের বিরাগভাজন তিনি হতে চান না। ইত্যাদি।

ইমা তাই একদিনের সফরে গ্রামে গিয়ে তার বাবাকে ঢাকা এনে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি খোঁজার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার পরিকল্পনাটা এরকম : বাড়িটা হাশিম শেখই ভাড়া নেবেন, তামান্না হবে তাঁর ভাতিজি। বাবার ওপর তার ভরসা আছে। এক মাসেই তিনি বাড়িওলার এবং প্রয়োজন হলে ভাড়াটিয়াদের মন জয় করতে পারবেন। এরপর মা এসে একমাস থাকবেন। তাঁর কাজ হবে বাড়িওয়ালি এবং ভাড়াটিয়া পরিবারগুলোর মাতা-ভগ্নিদের মন জয় করা। তিনি চলে গেলে বাড়িতে শুধু ইমা-তামান্না থাকলেও কেউ এ নিয়ে মাথা ঘামাবে না। ইমার এই পরিকল্পনার পেছনে প্রেরণা যুগিয়েছেন নসু চাচা, যিনি স্ত্রী আর চার ছেলেমেয়ে নিয়ে মধ্য বাড্ডার এক দুই কামরার ফ্ল্যাটে কোনোমতে জীবন কাটাচ্ছেন, একটা মেলামাইন কারখানায় মাঝারি মানের একটা চাকরি করে। তাঁর ওখানেই উঠেছে ইমা, এবং এতে গোটা পরিবারে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা দেখে সে মরমে মরে আছে। ঢাকায় থাকার মতো আর কোনো ঠিকানা তার থাকলে মধ্য বাড্ডার এই ফ্ল্যাটে সে নিশ্চয় পা রাখত না, কিন্তু আত্মীয় যথেষ্ট থাকলেও ঠিকানা তার মাত্র একটাই। সেই নসু চাচা, যাকে নিয়ে হাশিম শেখের অনেক উচ্চাশা ছিল। নিজে তিনি এডওয়ার্ড কলেজে বিএ টা শেষ করেছেন, কিন্তু নসুকে পাঠিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে যাওয়াটা তাঁর কাল হলো কি না কে জানে, কারণ নসু অনেক চেষ্টা করে এম কম পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন, হিসাব বিজ্ঞানে, কিন্তু পরীক্ষাটা আর দেয়া হয়নি তাঁর। ক্যাম্পাসে মারামারি করে, দু’জনকে মারাত্মক জখম করে তিন মাস জেল খেটে তিনি মতিহার ছেড়েছিলেন। চিরদিনের মতো।

নাসিম শেখ ওরফে নসু বখে গিয়েছিলেন। ছাত্র রাজনীতির আফিম খেতে শুরু করেছিলেন। ক্যাডারদের দলে নাম লিখিয়েছিলেন।

হাশিম শেখ আদরের ছোট ভাইটিকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বিয়ে শাদী দিয়ে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু মানুষ একবার বখে গেলে পথে আর আসতে চায় না। নসু শেখও চাননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি যে পথে এলেন, একটা চাকরি নিলেন, একে একে চার সন্তানের জনক হলেন, তা সম্ভব হলো দু’টি কারণে− এক, ঢাকায় এসে তিনি দেখলেন,  যে দলের ক্যাডার হয়ে তিনি হাঙ্গামা করতেন, তার নেতারা কেউ আর তাকে চিনলেন না। অনেকবার তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন নসু শেখ, কিন্তু একটা চাকরির যে অনুরোধ করবেন অথবা কিছু একটা করে খাওয়ার উপায় নিয়ে কথা বলবেন, তা তো দূরের কথা, তিনি যে নসু শেখ, দলের নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক, সেই পরিচয়টাও তিনি ঠিকমতো দিতে পারলেন না। ফলে রাজনীতি নিয়ে তার যেটুকু মোহ ছিল, সব ভেঙে গেল। তিনি বুঝলেন, রাজনীতির মাঠটা বড়ই পিচ্ছিল। এখানে খেলতে পারে শুধু পাকা খেলোয়াড়রা। এতদিন তিনি যা করেছেন, তা হলো, মাঠের বাইরে থেকে বলটল কুড়িয়ে এনেছেন, খেলোয়াড়দের পানির বোতল আর গামছা জুগিয়েছেন। কিন্তু মাঠে পা রাখার সামর্থ্যটা আদায় করতে পারেন নি। আর দুই, তার স্ত্রী ময়মুনা। স্বামীকে পথে ফেরানোর জন্য যা যা করার তিনি তাই করেছেন। এ সবের একটা তালিকা করলে কলেবরে তা এই গল্পটাকে ছাড়িয়ে যাবে, সেজন্য সে রাস্তায় না গিয়ে শুধু উল্লেখটুকুই করা হলো।

ইমা যেদিন মধ্য বাড্ডায় এসে হাজির হলো, নসু শেখ বিব্রত হয়েছিলেন, মেয়েটিকে কোথায় বসতে দেবেন− শুতে দেয়াতো দূরের কথা− তা ভেবে, কিন্তু ময়মুনা ইমার একটা হাত ধরে ঘরে ঢুকিয়েছিলেন, একটা ভরসা জাগানো হাসি দিয়ে তাকে সহজ হতে সাহায্য করেছিলেন। ময়মুনার প্রতি ইমা তাই খুবই কৃতজ্ঞ।

নসু শেখের কাছে আমরা আবার ফিরে যাব, ময়মুনার কাছেও। আপাতত ইমা যে ধরে নিয়েছে তার বাবা বাড়িওলা-ভাড়াটিয়া সকলের মন জয় করে ফেলবেন, এবং তার মাও, সে কথায় একটু যাওয়া যাক। ইমা ছোটবেলা থেকে দেখেছে, গ্রামের প্রতিটি মানুষ তার বাবাকে আদর্শ মানে। তার স্কুলের হেডমাস্টার রতন ভৌমিক বলতেন, হাশিম শেখের মতো ভদ্র, বিনয়ী এবং সদালাপী মানুষ এই গ্রামে আর দ্বিতীয়টি নেই। তার এক মামা পুলিশের দারোগা। তিনি ইমাকে বলতেন, দুলাভাই মানুষকে বশ করার মন্ত্র জানেন। হাশিম শেখের বশবর্তী হয়ে আছেন ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আলফাজ উদ্দিন থেকে নিয়ে তিন মাইল দূরের পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের কর্তা-কর্মচারীরা। হাশিম শেখ যদি কারও কাছে কিছু চান, সে লোকের জন্য তা হয়ে দাঁড়ায় এক অবশ্যি পালনীয় আদেশ। ইমার মা, যিনি বিয়ের আগে মুখরা অপবাদটি মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন− এবং বিষয়টি দুই মামাই অকপটে স্বীকার করেছেন− হাশিম শেখের অর্ধাঙ্গিনী হয়ে যাবার পর পুরোই যেন পাল্টে গেলেন। ইমার মনে হত, মা যেন পণ করে কতটা ভালো হওয়া যায়, কথায় কতটা মধু মাখানো যায়, তার একটা প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন তাঁর স্বামীর সঙ্গে।

ইমা স্থির নিশ্চিত, সবচাইতে কঠিন হৃদয় বাড়িওলাকেও বশ করতে পারবেন তার বাবা। সেই মন্ত্র তাঁর জানা। এবং বাবার পর মা এসে যদি বশীকরণ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন, সেই বাড়িওলা আর তার ভাড়াটিয়াদের তখন ইমাকে মাথায় তুলে রাখা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না।

নসু শেখের দুই কামরার ফ্ল্যাটটা তার কাছে একটা কারাগারের মতো মনে হয়। বাড়ির মানুষগুলো ফেরেশতার মতো, তার যতœ-আত্তিতে একটুখানি গাফলতি নেই। কিন্তু সারাক্ষণ তার দিকে নজর দিতে গিয়ে যেন তারা অদৃশ্য কিছু গরাদ তুলে দিয়েছে তার চারপাশে। অফিস থেকে ফিরতে একদিন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে সেদিন উদ্বেগের পারদটা চাঁদ ছুঁয়েছিল। ফলে ইমার মনে হয়, সে যেন সবাইকে একটা পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে− পরীক্ষাটা তার মন জয় করার, তাকে সন্তুষ্ট রাখার। নসু চাচা চোখে পানি নিয়ে একদিন বলেছিলেন, ভাইজান তো বাবার মতোই, বাবার কাজগুলিই করেছেন। তাঁর আশাভঙ্গ করেছি, এই দুঃখে তাঁর সামনে যেতেই ইচ্ছে করে না। অর্থাৎ, ইমা ভাবে, অগ্রজের প্রতি কৃতজ্ঞতাটা এখন ইমাকে দিয়েই দেখাতে চাইছেন তিনি।

ভালোবাসাও যে কষ্টের একটা কারণ হতে পারে, ইমা বিষয়টা এই প্রথম টের পেল। সে নসু চাচাকে বলল, একটা বাসা খুঁজতে হবে। তবে অফিসের কাছাকাছি। অর্থাৎ মগবাজার অথবা মালিবাগে। অথবা সিদ্ধেশ্বরীতে।

নসু শেখ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, ওই দিকে তাঁর থাকা হলে দুটি মেয়েকে যে করেই হোক তিনি ভিখারুন্নেসায় ভর্তি করাতেন। মেয়ে দুটি নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন মধ্য-বাড্ডার হলি চাইল্ড প্রি ক্যাডেট একাডেমিতে ফলবে না। ছেলে দুটি বড়, তারা যাচ্ছে উমেদ আলি হাইস্কুলে, বাড্ডা বাজারের ঠিক মাঝখানে, ফলপট্টির গাঘেঁষে, ভাঙাচোরা এক ছোট্ট দুই তালা দালানে। এই স্কুলে পড়ে কেউ কোনোদিন যে মধ্য বাড্ডার ভুগোল ছেড়ে কোথাও বেরুতে পারবে, সেরকম বিশ্বাস রাখাটা কঠিন। দ্বিতীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেছেন, অথচ ওই দিকে কত ভালো ভালো স্কুল।

ওই দিকে মানে মগবাজার-মালিবাগের দিকে।

ইমার পরিকল্পনা শুনে তামান্না শুধু ছোট্ট করে বলেছিল, ঢাকায় আমার কেউ নেই ইমা। তুমিই সম্বল। এক খালাত বোনের ভরসায় এসেছিল তামান্না, তিনি পনেরো দিন সময় বেঁধে দিয়েছেন।

তামান্নাকে নিয়ে আরেকদিন লেখা যাবে। আজ তামান্না ইমার সঙ্গে ছায়া হয়েই থাকুক।

 

২.

ঢাকায় নামতে নামতে হাশিম শেখের মনে হয়েছে, চশমাটা ফেলে এসে তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছেন। এখন, এই এত দিন, তিনি কীভাবে কাটাবেন, সেই চিন্তায় সারা পথ তিনি কাতর ছিলেন। ঢাকায় বাস থেকে নেমে প্রথমেই তিনি একটা হোঁচট খেয়েছেন, ইমা শক্ত করে তাঁর হাত না ধরে রাখলে হয়তো একটা বড়সড় বিপত্তি ঘটতে পারত। তার গায়ের ওপর দিয়ে মানুষ চলে গেছে, ধাক্কা দিয়েছে, বাজে ব্যবহার করেছে তাঁর সঙ্গে, একটা মোটামতো ড্রাইভার তাঁকে ধমক দিয়েছে, তাঁর গায়ে থুথু পড়েছে। অনেক দূরের জিনিষ দেখতে তাঁর কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা কাছের বস্তু দেখা নিয়ে। এক সময় ইমা ভেবে ভুল করে একটি মেয়ের হাত ধরতে গিয়েছিলেন তিনি। তিনি জানতেন, এরকম ব্যাপার ঘটবে, প্রচুর ঘটবে, কারণ ঢাকায় যে এক ভয়ানক কদর্য জায়গা, সে বিষয়ে তিনি স্থির নিশ্চিত। এজন্য ঢাকা আসতে তিনি মন থেকে সায় পাননি। মনটা বিগড়ে ছিল। হয়তো সে কারণে চশমাটা গুছিয়ে নিতে তিনি ভুলে গেছেন। আর ইমা যে সে ব্যাপারটা খেয়াল করবে, মেয়েটা বাড়িতে থাকলই বা কতক্ষণ। পা রাখার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়া। ঢাকার পথে।

তাঁর মনটায় এমন বিরক্তি জমল, যে তাঁর ইচ্ছা হলো ফেরত বাসে গ্রামে ফিরে যাবেন। নেহাৎ ইমার অনুরোধ। মেয়েটা যদি তাঁকে বলে, বাবা, সূর্যের দিকে তাকিয়ে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকো, তিনি তাই করবেন। ঢাকায় এসে বাসা খুঁজে সেই বাসায় এক মাস থাকা তো সে তুলনায় কিছুই না।

তবে ঢাকায় আসতে তাঁর একদম যে ইচ্ছা ছিল না, তার পেছনে ছিল আরেকটি কারণ। সে আমাদের নসু শেখ। ছোট ভাইটিকে তাঁর অপদার্থতা আর বখে যাওয়ার জন্য কোনোদিন ক্ষমা করেননি। তাঁকে তিনি বিয়ে-শাদি দিয়ে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ভেবেছেন, যে ছেলে স্বপ্নের মানে জানে না, সুযোগ হাতে পেয়েও পা দিয়ে মাড়ায়, তাকে তিনি নিজের হাতেই ছেড়ে দেবেন। হাশিম শেখের পয়সা ছিল নসুকে সাহায্য করার, বিশেষ করে যখন একটা ছোটখাটো চাকরি নিয়ে সে জীবনের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকল। কিন্তু নিজ থেকে তিনি সাহায্যের ব্যাপারটি তোলেননি। নসুও কোনোদিন অগ্রজ থেকে টাকাপয়সা চাননি। বিষয়টা আপনাদের অবাক করতে পারে, কিন্তু আমরা এর কারণ জানি বলে অবাক হইনি। কারণ সেই ময়মুনা। সে বলেছে স্বামীকে, কারও কাছে হাত পাতলে আমাকে পাবে না। ময়মুনা জানত, তার স্বামীকে নিয়ে হাশিম শেখের উচ্চাশার গল্পটা জানত। সেটি যে বিফলে গেল নসু শেখের কারণে, সে ব্যাপারেও তার সন্দেহ ছিল না। সেজন্য সে চায়নি, হাশিম শেখের কাছে টাকা চেয়ে নসু তাঁর আশা ভঙ্গের বেদনাটা আরেকবার জাগাক।

হাশিম শেখরা ছিলেন চার ভাই, দুই বোন, তিনিই সবার বড়। দুই বোনের বিয়ে হয়েছে সচ্ছল পরিবারে, একটি ভাই নিউমোনিয়ায় মরেছে। একটি ভাই দীর্ঘদিন থেকে আছে মধ্যপ্রাচ্যে। ফলে বাড়ির জমিজমা, ফসলি ক্ষেত, পেয়ারা বাগান− সবই আছে হাশিম শেখের মলিকানায়। ইমাকে সেজন্য চাকরি নিতে মানা করেছিলেন হাশিম শেখ। গ্রামে ফিরে তার দাদার নামে দেয়া স্কুলটার হাল ধরুক সে, এরকমই ছিল তাঁর আশা। টাকাপয়সার তো অভাব নেই মা, তিনি বলেছিলেন মেয়েকে।

টাকাপয়সা চাই না বাবা, আমি চাকরিটা চাই, চাকরিটা আমাকে আমি হতে সাহায্য করবে, ইমা ঠান্ডা গলায় বলেছিল।

চাকরিটাও অবশ্য মন্দ না। হাজার চল্লিশেক বেতন। লেগে থাকলে বছর বছর বেতনের অংক বাড়বে, এমন বলেছিলেন চাকরিদাতা। নসু শেখ জিজ্ঞেস করেননি, কিন্তু করলেও ইমা যে কত বেতন পায়, তা তাকে সে বলতে পারত না। তিনি কি এর অর্ধেকও পান?

হাশিম শেখ ঢাকা আসতে চাননি, কারণ ছোট ভাইটার মুখোমুখি তিনি দাঁড়াতে চাননি। সে যখন হাঙ্গামা করে জেলে গেল, হাশিম শেখ জখম হওয়া দুটি ছেলেকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তারই মায়ের পেটের ভাই কি করে দু’জন মানুষকে চাপাতি দিয়ে কোপালো, বিশেষ করে একজনের বয়স যেখানে সবে মাত্র ১৮, তা তিনি ভাবতে পারেননি। ভাইটিকে তার মনে হয়েছিল দানব। সেই দানব, এবং দানবটা ছিল ভয়ানক মিথ্যুক ও, যেহেতু সে বলেছে কেউ একজন নাকি ওদের কুপিয়ে চাপাতিটা তার হাতে তুলে দিয়েছে। তিনি রেগে বলেছেন, একটা পাপের দায় আরেকটা পাপ দিয়ে মোছার চেষ্টা করো না। তুমি কি তিন মাসের শিশু? সেই দানব কি এতদিনে মানব হয়েছে? ময়মুনা বলছে বটে, হ্যাঁ, কিন্তু তাঁর সন্দেহ আছে। সেজন্য ইমাকে বলেছিলেন, তিনি হোটেলে উঠবেন।

কিন্তু চাচা যে সাদি-হাদিকে চাচির বোনের বাসায় পাঠিয়ে তোমার থাকার জায়গা করে রেখেছেন? বিপন্ন গলায় বলেছিল ইমা।

সাদি-হাদি যদি জানতে চান, নসু শেখের দুই ছেলে, যারা উমেদ আলি হাইস্কুলে পড়ে, অথবা পড়ার চেষ্টা করে। বাজারের হৈ চৈ বাঁচিয়ে সারা সকাল টিউশনি করে ক্লান্ত শিক্ষকরা কতক্ষণ পড়াতে পারেন, অথবা সাদি-হাদির মতো স্বাস্থ্যহীন, রুগ্ন ছেলেরা পড়তে পারে, বলুন?

নিতান্ত অনিচ্ছা নিয়ে মধ্য-বাড্ডার দিকে রওনা হতে হলো হাশিম শেখকে। ইমা কথা দিল, কালই তাঁকে নিয়ে চোখের ডাক্তার দেখাবে, চশমার ব্যবস্থা করবে। হাশিম শেখ বললেন, কালই তিনি বাসার খোঁজে বেরুতে চান। সবচেয়ে ভালো হয় কাল বাসা ভাড়া করে পরশু উঠে যেতে পারলে। ইমা অবশ্যি তার সে আশায় একটু ছাই ফেলে দিল। বলল, বাসা ভাড়া হয় মাসের ১ তারিখ থেকে। ১ তারিখের এখনও ৬ দিন বাকি।

 

৩.

নসু শেখ এসে পা ধরে সালাম করলেন হাশিম শেখকে, ময়মুনাও। একটা চেয়ারে বসে অনুজের সঙ্গে তিনি টুকটাক কথা বললেন। ময়মুনাকে রুমালে বাঁধা সোনার একটা টিকলি দিলেন, যেটি বিয়ের পর নসুর সঙ্গে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়ার সময় দিতে ভুলে গিয়েছিলেন এবং এতদিন যে এটি সিন্দুকের পেছনের দিকে পড়ে ছিল, তাও ভুলে গিয়েছিলেন, এবং ইমা বাড়ি গিয়ে ময়মুনার প্রশংসা না করলে হয়তো এটির কথা তাঁর মনেও পড়ত না।

এতদিন মানে চৌদ্দ বছর। অবাক!

ময়মুনা টিকলিটা পেয়ে মরমে মরে গেল। যেন এটি তার হাতে তুলে না দিলেই সে জগৎসুখী হত। ময়মুনার মাথায় এ চিন্তাটি একবারও আসেনি, যদিও আমাদের এসেছে, এবং আমাদের ধারণা আপনাদের মনেও এসেছে, যে, এই বাজারে এটি বিক্রি করলে লাখ দেড়েক টাকা তার হাতে আসবে।

টুকটাক কথা একসময় শেষ হয় এবং নসু শেখ এবং হাশিম শেখ খেয়াল করেন তাদের মাঝখানে নীরবতা একটা চাদরের মতো ঝুলে আছে। চাদরের দুদিকে দু’জন, ফলে তাদের কথা বন্ধ হয়ে যায়। হাশিম শেখ ভাবেন, চৌদ্দটি বছর ভাইটিকে তিনি কেন এত দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। নসু যে বাড়ি যাননি, তা নয়, দু’বার ময়মুনাকে নিয়েও গিয়েছেন, বড় দুই ছেলেকে নিয়েও, কিন্তু হাশিম শেখ রয়ে গেছেন অনেক দূরে। বাড়িটা তাঁর এমনি যে, উঠানের শেষ মাথার টুঙ্গি ঘরে তিনি বসে থাকলে সারাদিন আর কারও সঙ্গে দেখা না হলেও চলে। আর উঠানের যেদিকে তাঁর ঘর, তার উল্টোদিকের ঘরগুলিতেই আত্মীয়স্বজনরা এলে ওঠেন, যেমন নসু উঠেছেন, ফলে নসুর সঙ্গে দু’একবার মুখোমুখি হওয়া ছাড়া তাঁর সঙ্গ বাঁচিয়ে চলতেও তাঁর কোনো সমস্যা হয়নি।

নসুর সঙ্গ বাঁচিয়ে কেন চলবেন হাশিম শেখ, জিজ্ঞেস করলেন? কারণ ওই ১৮ বছরের ছেলেটি, তিন বছর জখমের সঙ্গে লড়াই করে যে একদিন পরপারে চলে গিয়েছিল, হাশিম শেখকে অনুতাপের আগুনে ফেলে দিয়ে, যে আগুনে তিনি দীর্ঘদিন পুড়েছেন। তিনি নসু শেখের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা রাক্ষসকে দেখেছেন, যে রাক্ষস একটি কোমল ও মায়াবতী মেয়ে এবং মাসুম দুই শিশুকে নিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়ালেও কোনোক্রমেই তাকে তিনি মানুষের কাতারে ফেলতে পারেননি।

আজ নসুর গলা শুনে হাশিম শেখের একটুখানি বিস্ময় লেগেছে। গলাটা কোমল, যে রকম কোমল ছিল তাঁদের বাবার গলা, বিশেষ করে দরজায় হাত পেতে কেউ দাঁড়ালে তার সঙ্গে কথা বলার সময়, অথবা অসুস্থ স্ত্রীকে রাতে নিজ হাতে ভাত খাইয়ে দিতে দিতে দু’এক কথা বলার সময়। হাশিম শেখ দেখতে চাইলেন, এ কি সেই রাক্ষস, যে একটা স্বপ্নকে চাপাতি দিয়ে কেটেছে, এবং কাটতে গিয়ে আরেকটি স্বপ্নের গলা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে। কিন্তু তাঁর চোখে চশমা নেই। তিনি ইমাকে ডাকলেন।

ইমা এল, রিনা-দিনাকে নিয়ে ময়মুনা এল। হাশিম শেখ সাদি-হাদিকে না দেখতে পেয়ে শুকনো গলায় দুঃখ প্রকাশ করলেন। রিনা-দিনাকে হাত বাড়িয়ে আদর করতে চাইলেন, এবং তারা যথারীতি গুটিয়ে গেল। তিনি বাসা খোঁজার প্রসঙ্গ তুললেন। ইমাকে কাছে পেয়ে নসু শেখের অস্বস্তি কিছুটা কমল। তিনি তিনটি ঠিকানার কথা জানালেন, এবং পরদিন সেখানে তাদের নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা বললেন। চশমা ছাড়া হাশিম শেখ, কাছের কিছুই প্রায় পরিষ্কার লাগছিল না, এতে তাঁর ক্রোধও হচ্ছিল। তিনি সেই ক্রোধ থেকে চুপ থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। ফলে কথা বলছিল ইমা এবং নসু শেখ। কথা বলতে বলতে নসু শেখের মনের মধ্যে চার সন্তান নিয়ে হাহাকারটা ঈষৎ চাড়া দিয়ে উঠল। তিনি ইমাকে বলতে শুরু করলেন, মালিবাগ-মগবাজারে যদি তিনি থাকতেন, এতদিনে ছেলেমেয়েগুলি ভালো স্কুলে যেত। ইমাকেও তাহলে বাসা ভাড়া নেয়ার কথা ভাবতে হত না।

হাশিম শেখের কাছে নসুর দীর্ঘশ্বাস মেশানো কথাগুলো কদর্য মনে হলো। এখন কেন অশ্রুপাত? চাপাতি হাতে স্বপ্নের গোড়া কেটে এখন কেন দীর্ঘশ্বাস ফেলা? তিনি আচমকা বললেন, তামান্না মেয়েটাতো তাহলে তোমাদের সঙ্গে থাকতে পারত না। অথচ ওর প্রয়োজনটা এখন ইমা থেকেও বেশি।

নসু শেখ অগ্রজের বিরক্তি না বুঝতে পেরে বললেন, কেন, সেও তো থাকতে পারত আমাদের সঙ্গে, ইমার ঘরে।

ইমাকে একটা আলাদা ঘরই দেখি তুমি দিয়ে দিচ্ছ, নসু, শ্লেষের সুরে বললেন হাশিম শেখ।

নসু শেখ এবারও এই শ্লেষের বিষয়টি না বুঝে কিছু একটা বলতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু ময়মুনা ঠিকই বুঝেছিল। সে নসুকে থামিয়ে বলল, ভাইজান, আপনাকে এক কাপ চা দিব?

 

৪.

পরপর দুই দিন নসুর দেয়া তিন ঠিকানায় শুধু নয়, খবরের কাগজ থেকে জোগাড় করা আরও চার ঠিকানায় গিয়েও খালি হাতে ফিরতে হলো ইমা আর হাশিম শেখকে। সাত বাড়িওলার এক বাড়িওলাও বুড়ো হাশিম শেখকে বাসা ভাড়া দিতে রাজি হলেন না। দু’জন অবশ্যি ভাড়া হয়ে গেছে জানিয়ে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। হাশিম সাহেব তাঁর বশীকরণ মন্ত্র প্রয়োগ করবেন কি, দু’চার কথার বেশি কিছু বলতেই পারলেন না। এক বাড়িওলার ‘কি করেন?’ প্রশ্নের উত্তরে যখন তিনি জানালেন তিনি গ্রামে থাকেন, জমিজমা দেখেন বাড়িওলা তখন ইমার দিকে চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকালেন, এবং ইমা যখন জানাল, ভাড়াটা সে-ই দেবে, যেহেতু সে চাকরি করে, তিনি তামান্নার দিকে তাকিয়ে নোংরা ইঙ্গিতে চোখ ঘুরিয়ে বললেন, বুঝেছি, কোন ধরনের চাকরি, এবং দরজা বন্ধ করে দিলেন। ইমা ভয়ানক হতাশ হলো, কষ্ট পেল, ক্রুদ্ধ হলো। তার থেকে বেশি হলো তামান্না। হাশিম শেখ নিজেকে চরম অপমানিত বোধ করলেন। তাঁর চোখে চশমা নেই। তিনি কোনো বাড়িওলার মুখ পরিষ্কার দেখতে পেলেন না। তাঁর শুধু মনে হলো, লোকগুলো রাক্ষস। এদের শায়েস্তা করাটা জরুরি। তাঁর হাতে লাঠি থাকলে তিনি নিশ্চয় দু’ঘা বসিয়ে দিতেন। দ্বিতীয় দিন মধ্য-বাড্ডায় ফিরে তিনি ক্লান্ত শরীরে হতাশ মনে চেয়ারে বসে চুপচাপ মর্মজ্বালায় পুড়তে থাকলেন। অফিস থেকে ফিরে তাঁর এই অবস্থা দেখে নসু শেখ বললেন, পরদিন তিনিই যাবেন। এবং সঙ্গে ময়মুনা যাবে। দিনা অথবা রিনা, প্রয়োজন হলে তারাও যাবে। এবং ইমা তো বটেই।

চা খেতে খেতে নসু শেখ ইমাকে বললেন, চিন্তা করো না, মালিবাগ-মগবাজার তো আর গুলশান-বারিধারা না যে বাসা বাড়ি হঠাৎ আক্রা হয়ে যাবে।

ইমারও তাই ধারণা। কিন্তু তার মনে হতাশা জমেছে। সে হাশিম শেখকে বলল, চল বাবা, তোমার চশমার ব্যবস্থা করি।

হাশিম শেখ বললেন, প্রয়োজন নেই। তোমাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাব। তোমার এখানে চাকরি করার কোনো কারণ দেখি না।

ভয় পেয়ে ইমার গলাটা খুব শুকনো শোনালো। কেন বাবা? তোমাকে তো বলেছি চাকরিটা আমার কেন প্রয়োজন, সে বলল।

হাশিম শেখ উত্তর দেয়ার আগেই নসু বললেন, না ভাইজান। ইমার চাকরিটা ভালো। এটি হাতছাড়া করা ঠিক না। তারপর একটুখানি থেমে বললেন, চলেন, আপনার চশমার ব্যবস্থা করি।

ইমা এবং স্ত্রী ছাড়া কারও কথা হাশিম শেখ শেষ কবে শুনেছেন, তা তিনি মনে করতে পারলেন না। কিন্তু নসুর কথায় তিনি উঠলেন। তাঁর মনে এরকম একটি ধারণা হলো, এই রাক্ষসদের শহরে নসুর মতো রাক্ষসই পারবে কোনো রাক্ষস বাড়িওলাকে ধমকটমক দিয়ে একটা বাড়িভাড়া নিতে। এই রাক্ষসপুরে কিছুদিন দেখেশুনে থাকতে হলে চশমাটা তাঁর প্রয়োজন হবে।

তাছাড়া, চশমা ছাড়া নসুর সামনে বসে থাকতেও তাঁর অস্বস্তি লাগে। রাক্ষসটা তাঁকে নিশ্চয় খুঁটিয়ে দেখে, মনে মনে নানা কিছু ভাবে।

 

৫.

ইমা ময়মুনাকে নিয়ে নসু শেখ ফিরলেন সন্ধ্যার দিকে। দিনা-রিনাও সঙ্গে গিয়েছিল।

নসু জানালেন তিন বেড রুমের একটা সুন্দর ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়া গেছে। ছয়তলা বাড়ির চার তলায়। কিছুদিন ইমার সঙ্গে ময়মুনাকে থাকতে হবে। নসু বাড়িওলাকে বলেছেন, তাঁর চাকরিটা ট্যুরের চাকরি, মাসের বেশ কটা দিন ঢাকার বাইরে তাঁকে থাকতে হবে। ইত্যাদি।

ইমা হাসি মুখে বলেছে হাশিম শেখকে, তোমাকে আর ঢাকা থাকতে হবে না, বাবা, তোমাকে বাড়ি রেখে আসব। হাশিম শেখের ভেতরটা খচখচ করতে থাকল। ময়মুনা কেন থাকবে ইমার সঙ্গে? তিনি নন কেন? নসু কি তাহলে এই ফ্ল্যাট ছেড়ে মগবাজারে ইমার ফ্ল্যাটে ওঠার পায়তারা করছে? প্রথমে ময়মুনাকে পাঠাবে, তারপর সবগুলো কাচ্চাবাচ্চাকে? তারপর নিজে যাবে?

এত বড় ফ্ল্যাটের কী দরকার ছিল? হাশিম শেখ গলায় বিরক্তি নিয়ে বললেন।

ইমাই পছন্দ করল, নসু জানালেন। একটা দুই রুমের ফ্ল্যাটে প্রথমে গিয়েছিলাম। ফ্ল্যাটটা ওর পছন্দ হয়নি, আর বাড়িওলাকে পছন্দ হয়নি আমার।

কেন?

বাড়িওলা বাড়ির বুড়ো মালিকের ছেলে। চরিত্রহীন।

হাশিম শেখের রাগ হলো। এক চরিত্রহীন আরেকজনকে বলছে চরিত্রহীন। এক রাক্ষস খারাপ বলছে আরেক রাক্ষসকে।

ভাড়া কত? তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

পঁচিশ হাজার। ইমা বলল।

পঁচিশ? এ তো গলাকাটা ভাড়া।

ইমা হাসল। চিন্তা করো না বাবা, আমি তেরো দেব, তামান্না দিবে বারো।

ও, হাশিম শেখ বললেন, এবং চুপ মেরে গেলেন।

এরকম একটা ফ্ল্যাট এই পাঁচ বছর আগেও পনেরো হাজার ছিল, ইমা, নসু শেখ বললেন।

তা তুমি একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিলেই তো পারতে, নসু, এই দুই রুমের খাঁচায় বউ আর চার ছেলেমেয়েকে আটকে না রেখে। নসুর কাছে অগ্রজের এই শ্লেষ মাখানো প্রশ্নটি অত্যন্ত হৃদয়হীন মনে হলো। কিন্তু তিনি চুপ করে থাকলেন।

হাশিম শেখ একটা টিস্যু দিয়ে চোখ দুটি মুছলেন। নসুর মুখটা তিনি অস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। তিনি একটু চমকে উঠলেন। এত কালো কেন?

হাশিম শেখ একটুখানি ভাবলেন। কালো কি এজন্য যে নসু একটা রাক্ষস? এতদিন দূরে দূরে ছিল। এখন ইমার হাত ধরে তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছে। এবং টের পেয়েছে ইমাকে তার অধিকারে নিতে পারলে বাড়ির ওপর তার অধিকারটাও সে আদায় করে নেবে? তার মুখটা কী কালো এজন্য যে তার ভেতরের অনেক বদ মতলব এখন তার চোখে মুখে ফুটতে শুরু করেছে? তিনি বিরক্ত হলেন। বাড়ি থেকে, জমিজমা থেকে তার যা পাওয়া, তা তো সে চাইলেই তাকে তিনি দেবেন। সোজা পথে না এসে ঘুরপথে আসা কেন?

হাশিম শেখের মনটা পড়া নসু শেখের সাধ্যের বাইরে। তিনি অগ্রজের চোখে যা দেখলেন, তাতে মনে হলো তিনি খুব বিরক্ত। মেজাজটা তাঁর যেন বিগড়ে আছে। এর কোনো ব্যাখ্যা না পেয়ে উঠে চলে গেলেন। ইমা নিচুস্বরে বলল হাশিম শেখকে, তোমার সমস্যাটা কী বাবা? চাচা না হলে তো ফ্ল্যাটটা ভাড়া পেতাম না। তুমি যে পাবে না, সে তো দেখলেই। এখন চাচি বেচারি একমাস থাকবেন আমার সঙ্গে, এতে দুজনেরই কত কষ্ট করতে হবে,  বলো তা?

হাশিম শেখ কিছুক্ষণ মেঝের দিকে তাকিয়ে বললেন, নসু তোমাকে তিন বেডরুমের ফ্ল্যাট জোগাড় করে দিয়েছে এ কারণে যে ও এখন পরিবার নিয়ে তোমার ঘাড়েই চাপবে।

ছিঃ বাবা, ইমা বলল। তার গলা আহত শোনালো, যেন সে বিশ্বাস করতে পারছে না তার বাবা এরকম একটা কথা বলতে পারেন।

 

৬.

পরদিন হাশিম শেখের চশমা নিয়ে মধ্য বাড্ডায় ফিরে ইমা দেখল ঘরজুড়ে যেন খুব ঠান্ডা বাতাস বইছে। হাশিম শেখ চেয়ারে বসে আছেন। তাঁর সামনে আরেকটি চেয়ারে বসে নসু শেখ, নসু শেখের পাশে দাঁড়ানো ময়মুনা। হাশিম শেখের সামনে ছোট একটি টেবিলে এককাপ চা রাখা, কিন্তু চা টা তিনি খাননি। সেটি জুড়িয়ে ঠান্ডা হয়ে গেছে। হাশিম শেখ টুকটাক দু’এক কথা বলছেন, নসু শেখ হ্যাঁ না করছেন, মাথা দুলাচ্ছেন। কিন্তু প্রত্যেকের চোখ শীতল, যেন অত্যন্ত নিরানন্দ একটা নাটকের মহড়া চলছে, মহড়াটা শেষ হলেই তাঁরা বাঁচেন।

ইমা সামনে দাঁড়াতে হাশিম শেখ বললেন, তিনি রাতের বাসে ফিরতে চান। সুরাবর্দী নামের এক কন্ট্রাক্টর পল্লী বিদ্যুতের কাজ করছে তাঁর গ্রামে, সে যোগাযোগ করেছিল। ওর সঙ্গেই যাবেন। ইমা একটু অবাক হলো, আবার হলোও না। সে বুঝেছে, হাশিম শেখ ঢাকা এবং মধ্য-বাড্ডাকে একেবারেই পছন্দ করছেন না। ঘৃণাই করছেন বরং। তাঁর চোখে ঢাকা এক কদর্য শহর, মধ্য-বাড্ডার এই ফ্ল্যাটটি একটি বস্তিঘর, আর নসু এক রাক্ষস। এর বাইরে এমন কিছুই তিনি দেখছেন না, যা তাঁকে একটুখানি, ঝিলিমিলি হলেও, আলোর সন্ধান দেবে। ইমা জানে, হাশিম শেখ যা বলেন, তা করেন। মগবাজারের ওই ফ্ল্যাটটার ভাড়া তিনিই প্রতিমাসে পাঠাবেন, সকালে এরকম একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার পর কিছুতেই তাঁর মত পাল্টাতে পারেনি ইমা, এমন কি তামান্না যে বারো হাজার টাকা দেবে, সেই টাকাটাও তিনি নিতে রাজি হননি। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার দীর্ঘশ্বাসের ওপর দিয়েই নসু শেখ বললেন, ভাইজানকে আমিই বাড়িতে রেখে আসতাম, কিন্তু। …

কিন্তু তোমার চাকরি … তাই না? হাশিম শেখ শ্লেষের সঙ্গে বললেন।

জি ভাইজান, নসু শেখ বললেন।

এরকম একটা ছোটখাটো চাকরি না করলেই কি হয় না? হাশিম শেখের গলায় এবার রাগ, এবং রাগের পারদ চড়ার সঙ্গে সঙ্গে গলাও তাঁর চড়তে থাকল। একটা ভালো চাকরি নিতে পারো না? নিলে তো এই বস্তি ঘরে থাকতে হতো না তোমাকে। এই বস্তিঘরে থেকে বাচ্চাগুলোর কী হবে? তাদের ভবিষ্যৎ বলে কিছু থাকবে? এখানে থেকে তারা কি মানুষ হবে? কোনোদিন? নাকি তোমার মতো অমানুষ, তোমার মতো রাক্ষস হবে তারাও?

নসু শেখের হাতপা যেন মাটিতে ঢুকে যেতে লাগল। তিনি শুনলেন, ইমাও শুনল। বাবার দীর্ঘদিন ধরে পুষে রাখা রাগ, হতাশা আর আশাভঙ্গের কষ্ট যেন একটা তুফানের তীব্রতা নিয়ে আছড়ে পড়ছে ঘরের ভেতর। ইমা যে কিছু বলবে, কী বলবে? সে ভেবে পেল না, এরকম তুফানের সামনে কোনো ছাতা নিয়ে সে দাঁড়ায়। সে দেখল, নসু শেখ মুখ নিচু করে তুফানের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছেন। তার খুব কষ্ট হলো।

কিন্তু তুফানের সামনে দাঁড়াল ময়মুনা। আশ্চর্য শান্ত এবং কোমল, অথচ নিশ্চল গলায় সে বলল, না ভাইজান, আমার ছেলেমেয়ে অমানুষ হবে না। মানুষের মতো মানুষ যদি হতে না-ও পারে, কিন্তু অমানুষ হবে না।

হাশিম শেখ অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন। কিন্তু ময়মুনার মুখ তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন না।

তারা অমানুষ হবে না, কারণ তাদের বাবা অমানুষ নন। তিনি যে বেতন পান, তা দিয়ে মগবাজারের ওই ফ্ল্যাটটারও ভাড়া দিতে পারেন। কিন্তু তিনি বেতনের অর্ধেকটা পাঠিয়ে দেন ভগতপুরে।

ভগতপুরে?

জি ভাইজান। আরিফ নামের যে ছেলেটি চাপাতির কোপে মারা পড়েছিল, তার বাবা মার কাছে। তারা অবশ্যি তা জানে না।

জানে না?

না ভাইজান, তাছাড়া, চাপাতির কোপটা তিনি দেননি, যদিও আরিফকে তিনি একটা ঘুষি মেরে মাটিতে ফেলেছিলেন। কোপটা যিনি দিয়েছিলেন, তাকে পুলিশ তো ধরেই নি, বরং গাড়িতে করে থানা থেকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছিল। সেই লোক এখন বড় নেতা। তার ছবি টেলিভিশনে আপনিও দেখেন।

আমিও দেখি?

জি ভাইজান। আরেকটা কথা, এই মেলামাইন কারখানায় তিনি যে চাকরি করেন, সেটাও তিনি করেন অন্য একটি কারণে। এই কারখানাটা চালায় একটা ট্রাস্ট, যারা এর লাভের টাকা অনেকগুলি এতিমখানায় দেয়, তাতে সেগুলোর দেখভাল হয়।

দেখভাল হয়?

জি ভাইজান। এই কথাগুলো কাউকে যেন আমি না বলি, সেজন্য তিনি আমাকে দিয়ে কিরা কাটিয়েছিলেন। আজ তার সে কিরা আমি অমান্য করলাম। আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন কেন আমি অমান্য করলাম?

হাশিম শেখ চোখ বুঁজে আছেন। তার বোঁজা চোখ দেখে ইমার হঠাৎ মনে পড়ল চশমার কথা। সে ব্যাগ থেকে চশমা বের করে তাঁর হাতে দিল। বাবা, তোমার চশমা, সে আস্তে করে বলল।

হাশিম শেখ চশমাটা হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন। তিনি বুঝলেন, এ চশমা পরলে তিনি যা দেখবেন, তা দেখার জন্য তাঁর কোনো প্রস্তুতি নেই।

আপাতত তিনি বসে থাকবেন, একটা অমানুষের মতো একটা রাক্ষসের মতো, যতক্ষণ না সুরাবর্দী কন্ট্রাক্টর এসে তাঁকে নিয়ে যায়।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares