পাপ-পুণ্যের দুনিয়া : হরিপদ দত্ত

গল্প

পাপ-পুণ্যের দুনিয়া

হরিপদ দত্ত

সে জেগেছিল। ঘুম এ-চোখ থেকে ও-চোখে ঘুরে বেড়াচ্ছিল শরীরে সুড়সুড়ি দিয়ে হাঁটার মতো, কালো পিঁপড়ের। অস্থির হাঁটা বলেই ঘুমও স্থির হয় না। ওর মনে সন্দেহ। নতুবা আতঙ্ক। উল্টোদিকে মুখ করে পাশে শুয়ে থাকা মানুষটা ওকে ঘুমের মধ্যে গলা টিপে খুন করবে না তো? তার চোখে চোখে রাখলেই ওর মনে হয় স্বামী পদবীর পুরুষটার চোখে একজন ঘাতক বসে আছে। তাই সে আতঙ্কিত। রক্তে শীতল স্রোত বয়ে চলে।

একটা জনরব বা কোলাহল শুনেছে সে। ঘরে, গ্রামে, শহরে, যানবাহনে। কেবল সে নয়, ওর মা শুনেছে, মায়ের মাও শুনেছে। কেন সেই জনরব? মা, এখন সে তা স্মরণ করতে চায় না। তবু করতে হয়। না করে পারে না। ‘পুরুষেরা কর্তৃত্বপরায়ণ’। গায়েবি দুনিয়া থেকে ওরা তা লাভ করেছে। যদি তা সত্য হয় তবে আনত হবে ওর মাথা। শির সোজা করতে বাসনা জাগে মনে। কিন্তু পারে না। মাথার লম্বা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে চোখ-মুখ ঢেকে দেয়। দুনিয়াটা অন্ধকারে ছেয়ে যায়। মেয়ে মানুষের মাথায় চুল এত লম্বা কেন? এত কালো কেন? অবাধ্য হয়ে আচমকাই চোখ ঢেকে দেয়। গার্মেন্টেস-এ কাজ করতে গিয়ে অনেকে সময়ই লম্বাচুল। চোখে নেমে এলে কাজের সমস্যা হয়। সুপারভাইজারেরে গাল খেতে হয়। বাজে গাল। বুঝি সুযোগ খুঁজে বেড়ায় বদ ব্যাটাগুলো। তাছাড়া অটো মেশিনে খুব সাবধানে সেলাই করতে হয়। উনিশ-বিশ হলেই পুরো কাপড়টাই বাতিল। বিদেশি পার্টির অর্ডার বলে কথা! কাপড় বাতিল হলে মায়নাও বাতিল।

আর ওই যে পাশে শুয়ে আছে মানুষটা, সে অন্য দুনিয়ার মানুষ। মেয়ে মানুষটার দুনিয়া সত্যি সে চেনে না। চেনে না তাদের চার বছর বয়সের মেয়েটার দুনিয়াও। মা শহরে, রোড অ্যক্সিডেন্টে পায়ের হাড় ভাঙা অকেজো বাপও চেনে না তাকে। মা ঘরে নেই বলে বিরক্ত করে, ধৈর্য হারায় লোকটা। রাগ চাপকে নিজেকে থামাতে অক্ষম। গায়ে হাত তোলে। পুরুষ মানুষ, ঘরে বউ নেই, নিজের জন্য আর মেয়ের জন্য রাঁধতে হয়, যত্ন-আত্তি করতে হয় মেয়েকে। বিষয়টা ওর মামার বাড়ির লোকেরাও জানে। তাই মাঝেমধ্যেই নানি এসে নিজের কাছে নিয়ে যায়, পাশের গাঁয়ে।

আজ সন্ধ্যায় শহর থেকে বাড়ি ফিরে মা যখন দেখে মেয়ে ওর বাপের বাড়ি, বড় গোসা হয়। স্বামী কোনো মেয়েকে আনতে গেল না এই নিয়ে মনকষাকষি। এক কথা থেকে অন্যকথা। বৌ’র কেন এত সাজগোজ? শাড়ির বদলে কেন পরে সেলোয়ার কমিজ? স্বামী বুঝেও বুঝতে চায় না, কাজের ক্ষেত্রে শাড়ি নিষিদ্ধ। কাজ করতে সমস্যা। কখন মেশিনে জড়িয়ে যায়। তাছাড়া শাড়ি পরলে কাপড় চুরির ভয়। শাড়ির ভাঁজে কাপড় লুকানো যায়। দু’একজন ধরা পড়ায় কাজের সময় শাড়ি পরতে সুপারভাইজারের মানা। মাঝে-মধ্যে মালিকও ঢুকে পড়ে ফ্যাকটোরিতে। শাড়ি দেখলেই ধমকাধমকি। এ ভাবে শাড়ি পরার অভ্যাসটাই বদলে গেছে। কেবল শাড়ি কেন, জীবনের অনেক অভ্যাসই বদলে গেছে ওর। গ্রাম্যজীবন, দরিদ্র গৃহস্থের বৌ, ঘর-সংসার, সন্তান-স্বামী সেবা, দিনভর কাজ, রাতভর ঘুম। নগর যাত্রা, পোশাক তৈরি কারখানার কাজ, রাতে ডিউটি পড়লে সারাদিন ঘুম। সব পাল্টে গেছে।

বছরে দুটো ঈদ আর তির-চার মাসে দু’তিন দিনের জন্য ছুটিতে গ্রামে ফেরা। দূর জেলা বলে সাপ্তাহিক ছুটিতে আসা হয় না। গ্রামে ফিরতেই ছুটির সময় কাবাড়। ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে বাড়ি ফিরতে দেখতে পেয়ে আধাপঙ্গু মানুষটা সুখ আর শান্তির উত্তেজনায় বৌ’রনাম ধরে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘আনজু, ওই আনজুমান, বাড়ি ফিরলি? হায়রে মাইয়া মানুষ, স্বামী না মাইয়ার টানে শহর ছাইড়া আসলি?’

পথক্লান্তি থাকলেও আনজুমান ব্যাগটা দাওয়ায় ফেলে লম্বা দম টেনে হাসে, ‘মাইয়ার বাপে ভালানি? মাইয়াটা বুঝি ঘুমে?’

‘আমি পোড়া কপাইল্যা বশির, নুরির বাপ, আনজুর ভাতার, না না, ভাতার না, ভাত কি তোরে আমি দিই, তুই আমারে খাইতে দেস, খোদার কি যে কেরামত, পুরুষ খায় মাগির কামাই, কথাটা শ্লেষ হলেও বশির হাসে। মনে মনে ভাবে বৌটা ঘরে ফিরবে বলেই হাট থেকে মাছ এনেছে এবং আধাসের দুধও। রোজগারের টাকা তো বৌ’রই। পথদুর্ঘটনার আগে বশির যখন কামাই-রোজগার করত ঘরের বৌ আনজুমান মনের চাপে থাকত, কি দিয়ে খেতে দেবে পুরুষটারে? আনজুমান আর বশিরের চিরচেনা সেই দুনিয়াটা বদলে গেছে। এই বদলে যাওয়া দুনিয়ায় কেউ যেন ঠিকঠাক খাপ খায় না। অথচ দুর্ঘটনার পর মহামুসিবত থেকে বাঁচার জন্যই গাঁয়ের গার্মেন্টস কর্মী ফিরোজের তালাক পাওয়ার মেয়ের হাতে তুলে দেয় বৌ’কে বশির। আনজুমান রজি ছিল না। তবু অনাহারে  মরার ভয়ে চলে যায় সে শহরে। যেদিন মেয়েকে স্বামীর জিম্বায় রেখে প্রথমে শহরে পা দেয় সে, সেদিন ছিল মহাশোকের দিন। তালাকের কলঙ্ক শরীরে মেখে চিরদিনের জন্য যেন স্বামীর বাড়ি ছেড়ে দরিদ্র বাপের ঘরে ফেরা। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত দীর্ঘপথ আনজুমানের চোখের জল বুঝি থামতেই চায় না।

আজ সে সব পুরাতন দুনিয়ার কিস্সা। আনজুমানের জীবনে যেদিন অকল্পনীয় ঘটনা ঘটে যায় এবং যা ঘটে যায় তা কোনোদিন খোয়াবেও ভাবতে পারেনি। সহকর্মী ইসহাকের ইচ্ছার কাছে অন্তত মাসসাতেক পাথর কঠিন হয়ে থাকলেও সেদিন গলে পানি হয়ে যায়। এ যেন  এক  টিমটিমে আলো জ্বলছে। এই মানুষটা, এই পুরুষটা, যে কিনা আধা মানুষ আর আধা পুরুষ, সে-ই গত তিনমাস আগে ছুটিতে বাড়ি এলে অকথ্য গালিগালাজ করে ওকে আচমকা বিছানার ওপর গলাটিপে ধরেছিল খুন করবে বলে, ‘তুই নষ্ট মাইয়া মানুষ, তোরে খুন করে আমি দোজখে যাইতে চাই।’

আনজুমান বুঝতে পারে শহরের কথাটা গ্রামে রটিয়েছে কে। প্রাণপণ চেষ্টা করে স্বামীকে বুঝাতে। মিথ্যার এক বিশাল পাহাড় তুলে ধরে বশিরের সামনে। এক সময় বশির শান্ত হয়। আনজুমান বুঝতে পারে না মিথ্যেটা তার সত্যে পরিণত হলো কিনা বশিরের কাছে। বশির কি ওকে বিশ্বাস করছে? দ্বিধায় ছুটে বেড়ায় আনজুমানের মন। সত্যি বলতে কি সে একটু ভয়ও পায়। এমন নির্মম রূপ কোনোদিন সে দেখেনি বশিরের ভেতর। হিং¯্রতা। প্রতিহিংসা।

কিন্তু এত হিংসা কেন? কে পাঠালো তাকে পাপ-পুণ্যের ঢাকা শহরে? নিশ্চয় তার স্বামী বশির। সাধ্য কি তাই? নাকি অদৃশ্য আছে অন্য কেউ? কে সে? ক্ষুধা-দারিদ্র কি? নাকি একটা স্বপ্নের গোলকধাঁধা? ঢাকা শহরে চকমকে, চিকমিকে, কাগজের মুদ্রা খিলখিল হাসে। যে যায়, সে-ই পায়। তাই তো পায়ে হাঁটলে, ট্রেন-বাসে-চাপলে। কিন্তু এমন তো কথা ছিল না বশিরের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা? অন্য একটা পুরুষের সঙ্গে ঘর করা? পুরুষটা বশিরের মতো পঙ্গু নয়, উপার্জনে অক্ষম নয়। ওর, দু’চোখে আনজুমান দেখেছিল সবুজ ফসলের ক্ষেত। আর এসব যদি মিথ্যে হয় তার? সেকি তবে লোভী? সুখের লোভের লালা কি  জিহবায়  স্রোত বয়ে দিয়েছে? ফসল শূন্য মাঠ পেছনে ফেলে সবুজ ফসলের মাঠের গোলকধাঁধায় পা ফেলেছে? যদি ভুল করে থাকে তাতে সে কান্নায় ভাসবে। আর কারো কাছে না হোক, খোদার কাছে সে ক্ষমাপ্রার্থী।

বিছানা ছেড়ে উঠে বসে আনজুমান। লোডসেডিং। অন্ধকার। খোলা জানালা দিয়ে বাইরের জোনাক রাতের ছায়া আলো গড়িয়ে পড়ে বিছানায়। বশির কি ঘুমে? খোঁড়া পুরুষটা তো নপুংসক নয়। ক’টা মাসেও ওর শরীরে   আগুনের তাপ বাড়েনি কি? নিশ্চয়ই আজ আনজুমান তার কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেবে। কিন্তু সে তো ঘুমে। নাকি জেগেই আছে? রাগ-ক্রোধ জমাট বেঁধে আছে বুকে? নাকি সে আনজুমানকে খুন করার অপেক্ষায় আছে? গোপন কোনো অস্ত্র নেই তো ধারে কাছে?

তা হলে আনজুমান এখন অপেক্ষায় থাকুক বশিরের হাতে খুন হবার জন্য বুকটা কেঁপে ওঠে ওর। বিনিদ্র থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। ঘুমোলে ওকে অতি সহজেই খুন করে দেবে বশির। জেগে থাকলে আধা পঙ্গু এই মানুষটি ওকে খুন করতে পারবে না। তবু সারা শরীরে ঠান্ডা একটা ¯্রােত বয়ে যায়। আতঙ্কের ভেতরও ওর মনে হয় বশির চাইলেও এই হত্যাকা-টি ঘটাতে পারবে না। কেননা বৌকে খুন করলে ক্ষুধা তাকে দানবের মতো গ্রাস করবে। বৌ’র প্রতি প্রতিহিংসা পরাজিত হবে ওর দয়ার কাছে। সে জানে উপার্জনহীন একটা মানুষের কাছে বৌ’র করুণা কত মূল্যবান। এ যেন পিরের দরগার প্রদীপ।

শহরে আনজুমানের সঙ্গে একটি পর-পুরুষের সম্পর্কের কথা যদি সে স্বীকার করে তবে কি গ্রামসালিশে বসিয়ে বিচার করতে পারবে বশির? পারবে কি ওকে তালাক দিতে? পারবে না, দুনিয়াটা বড় নির্মম। গোনাহগারের কাছেও মাথা নোয়াতে হয়। নোয়াতে বাধ্য বশির। আনজুমান কিছুটা হলেও ঢাকা শহরটা চিনেছে। দেখছে নেশাখোর স্বামীর কর্মহীন জীবন। স্ত্রী গোনাহের পথে নেমে কুড়িয়ে আনছে টাকা। স্ত্রীর বিনিময়ে নেশা আর আহারের নিশ্চয়তা। নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা পুরুষটার সামনেই  স্ত্রীর ওপর পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে অচেনা পুরুষ। নেশায় আচ্ছন্ন চোখ সবই দেখে স্বামী। কিন্তু তার আত্মা-তো জন্মান্ধ! কেবল দেখে পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর ঘটনা। অথচ নির্বিকার। হিংসা, ক্রোধ আর হিং¯্রতা ছায়ার মতো পড়ে থাকে শীতল হয়ে। এ সব দেখে দেখে আনজুমানও বুঝেছিল, এই দুনিয়াটার রীতি আলাদা, চিরদিনের চেনাজগৎ একবারে ভিন্ন। সেই দুনিয়া দেখেই কৌতূহল হয়েছিল ওর। আঁধার কেটে পা ফেলেছিল ধীরে।

তারপর রাত আরও গভীর হয়। দু’চোখে ঘুম নামে। ঘুমিয়ে পড়ে আনজুমান। খোয়াবে দেখে, মেয়েটা ফিরে এসেছে। মেয়ের হাত ধরে সে ছুটছে। গ্রাম পেছনে ফেলে ছুটছে শহরের উদ্দেশ্যে। খোঁড়া বশির  পিছু নিলেও এক সময় বিপুল শস্যপ্রান্তর আর আকাশছোঁয়া বাঁশবনের আড়ালে পথ হারিয়ে ফেলে সে। কোনোদিন আর আনজুমানকে ধরতে পারবে না বশির। অনতিদূরে পাপ-পুণ্যের দুনিয়া ঢাকা শহরের আলো দুলে ওঠে। কী আলো! ইস্ কী চকমকা আলো! এতো তীব্র আলো যে, শরীরের ভেতর রক্তের রঙও দেখা যায়। সেই লাল রক্তের আলোর দিকেই ছুটছে আনজুমান।

ভোর হলে আনজুমানের ঘুম ভাঙে। কিন্তু স্বপ্নের ভেতর রক্ত রঙ ভেজা যে শহর তার ঘোর কাটে না। কয়েকটা মুহূর্ত কাটলে সে দেখতে পায় বিছানা শূন্য। বশির নেই। হয়তো ঘুম ভেঙেছে, বাইরে গেছে। কিন্তু দরজাটা হা করে খোলা কেন? বিছানা ছেড়ে উঠোনে পা রাখে সে। এদিক ওদিক তাকায়। হঠাৎ দেখতে পায় রাস্তার পাশে আমতলায় দাঁড়িয়ে আছে বশির। বুঝতে পারে বৌ’র প্রতি রাগ তার কমেনি। তাই এগিয়ে যায়, আনজুমান দেখতে পায় ওরই ওড়না গলায় পেঁচিয়ে আমের ডালে ঝুলে আছে বশির। আচমকা দুনিয়া কাঁপিয়ে তার গলায় আর্তনাদ বিস্ফোরিত হয়, ‘এই কি করলা, আজই আমি স্বীকার করতাম তোমার বৌ’র শরীর পরপুরুষ চিনে ফেলেছে, সত্যটা না জাইনাই চলে গ্যালা?’

লেখক : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares