এইসব কলহাস্য : মাহবুব আজীজ

উপন্যাস

এইসব কলহাস্য

মাহবুব আজীজ

পাঁচতারা হোটেলে কি সবাই নিচুস্বরে কথা বলে!

আমি বসে আছি র‌্যাডিসন হোটেলের লাউঞ্জে- সকাল দশটা বাজে, কোট-টাইপরা লোকজন যতটা পারে নিঃশব্দে দ্রুত হেঁটে যায়, কোনো প্রতিষ্ঠানের এজিএম-টেজিএম হবে হয়তো; নইলে এত লোক এই সকাল সকাল র‌্যাডিসনে একই ধরনের ব্যাগ হাতে হাজির হবার কথা নয়; এইসব মানুষই যখন রাস্তায় চলে বা বাসে- ট্রেনে চড়ে, কথা বলে সর্বশক্তি দিয়ে, পাঁচতারায় ঢুকেই এদের স্বর নিচু হয়ে যায়! বসে আছি কোনার টেবিলে- একা, বসে কফি খাই; রাশেদ মনসুর ইন্টারকমে বলে দিয়েছেন, আমাকে যেন কফি দেয়া হয়; আমি তার ডাকে সকাল ঠিক দশটায় উপস্থিত হই।

সেই জিগাতলা থেকে এয়ারপোর্ট রোডে নিকুঞ্জের আগে সকাল দশটার মধ্যে এই র‌্যাডিসনে পৌঁছা আমার জন্য যন্ত্রণাবিশেষ। বেসরকারি সাহায্য সংস্থা মাইক্রো মিলিয়নসে জুনিয়র রিসার্চার হিসেবে কাজ করি, আপিস ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে- সকাল সাড়ে ন’টার মধ্যে আমাকে আপিসে উপস্থিত হতে হয়; সেটাই রোজ বিরাট ঝক্কি বলে মনে হয়; এর মধ্যে দুলাভাই আর দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে বড় আপা- পারুল দিনকয়েক আগে ফরিদপুর থেকে বাসায় উপস্থিত হয়েছেন। দুলাভাই পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স, নির্বিরোধ শান্ত মানুষ- তার  কোলন ক্যান্সার ফার্স্ট স্টেজ- ল্যাবএইড আর আনোয়ার খান মেডিক্যালে লাগাতার দৌঁড়ঝাপ করতে হচ্ছে; বাবা- সমবায় মন্ত্রণালয়ের সেকশন অফিসার হিসেবে পিআরএলে গেছেন গত বছর; মাত্রই অবসরপ্রাপ্ত, সেইসূত্রে পূর্ণাঙ্গ বেকার- অনেকদিন পর একটা কাজ পেয়ে, বলা যায়, বাবা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। মা আর বড় আপা যতটা সময় পারেন জায়নামাজে বসে কান্নাকাটি করছেন। আমাদের আড়াই ঘরের সরকারি বাসা, গত পঁচিশ বছর আমরা হলদে রঙের এই কলোনি বাসায় আছি, পিআরএলের এই বছরটি আর মাত্র এখানে থাকতে পারবো- এক ঘরে বাবা-মা, আরেক ঘরে আমি, ড্রইংরুমের মতো ছোট পরিসরে কাজল বাসায় এলে থাকেÑ বেশিরভাগ সময় সে জাহাঙ্গীরনগরের আল বেরুনী হলেই থাকে, সরকার-রাজনীতি বিষয়ে এমএ শেষ করে এমফিল করছে, তার ইউনিভার্সিটির শিক্ষক হবার ইচ্ছা। আমরা দু’ভাই-ই জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্র, আমি নৃবিজ্ঞান থেকে বেরিয়েছি অনেকদিন- ভাইবোনদের মধ্যে আমি মেঝো, বড় আপা আমার থেকে ছয় বছরের বড়, কাজল আমার বছর চারেকের ছোট।

‘হ্যালো! আপনি কি মিস্টার সজল? ইফতেখার মাহমুদ সজল?’ দুধসাদা প্যান্ট-শার্ট আর ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক হোটেলের তরুণী কর্মী আমার সোফার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেন। কাপড়ের রঙের মতোই তার মুখের রঙÑ এত সাদা মাখে কেন এরা মুখে? কাফন কাফন লাগে যে!

‘স্যার?’ তরুণী প্রশ্নচোখে আমার দিকে তাকায়।

‘জি।  আমিই… রাশেদ মনসুর স্যারের গেস্ট। স্যুট নম্বর ৫০৭।’

‘থ্যাংক ইউ স্যার। তিনি আপনাকে তার স্যুটে যেতে বলেছেন। লিফটে উঠে ফাইভ প্রেস করবেন প্লিজ। নেমে সোজা হাতের বামে স্যুট নম্বর ফাইভ ও সেভেন।’ বলেই মিষ্টি হাসি দিলেন তরুণী। বাহ্, কাফনের হাসি কিন্তু সুন্দর; এদের সুন্দর হাসি দেয়ার ট্রেনিং দেয় নিশ্চয়ই; পাঁচতারা হোটেলে কাজ করে যে সব মেয়ে, তাদের সকলের হাসি সুন্দর।

লিফটের দিকে এগোই, রাশেদ মনসুর স¤পর্কে গত কয়েকদিন রীতিমতো আমাকে মুখস্থ করতে হয়েছেÑ এনজিও লাইনে তিনি জাঁহাবাজ মানুষ; পেশার শুরু ঢাকাতেইÑ অবশ্য তার ক্যারিয়ারে চমকপ্রদ বাঁক বদল আছে; ঢাকায় ছিল নিজস্ব ক্রিয়েটিভ এজেন্সিÑ ব্যবসা করতেন। নব্বই দশকের শেষ দিকে আমেরিকা চলে যান, বেসরকারি সংস্থায় পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করে দ্রুত খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন, তারপর অজস্র দেশ আর বহু সংস্থায় কাজ করেন, এনজিও সেক্টরে তার সাফল্য এখন বিস্ময় হিসেবে মানা হয়। আমি অবশ্য বিস্মিত হই না- একটা লোক কাজ করেছে, প্রফেশনে ভালো করেছে; এতে বিস্ময়ের কি! তবে আমাদের এমডি মাফরুহা নূর খান সংক্ষেপে মাফরুহা এন খান যেভাবে ‘রাশেদ ভাই’, ‘রাশেদ ভাই’ করেন, তাতে বুঝিÑ বেসরকারি সংস্থার জন্য তিনি আসলেই বিস্ময় জাতীয় কিছু! যে মাফরুহা ম্যাডাম ভ্রু না কুঁচকে কথাই বলতে পারেন না সাধারণত, তিনি রীতিমতো হাসিমুখে আমাকে বোঝাতে শুরু করলেন, ‘বুঝলে… অনেকদিন পর ঢাকা আসছে রাশেদ ভাই। বিশ বছরতো হবেই। কিছুদিন থাকবে! যতটা সম্ভব ছায়ার মতো তার সাথে তুমি থাকবে। … এ গ্রেট ম্যান। আমেরিকায় বসে আমাদের জন্য যা করেছে…!’

‘ইয়েস! ইয়াংম্যান। ওয়েলকাম। তুমি সজল?’ স্যুটের দরজায় দাঁড়ানো রাশেদ মনসুরকে দেখে আমার ভালো লাগেÑ বুদ্ধিদীপ্ত মানুষটি স্মিতহাস্যময়- মাঝারি উচ্চতার, দাঁড়িগোফ নিখুঁত কামানো, প্রায় নির্মেদ, বাইরে বেরুনোর প্যান্ট-শার্র্ট-জুতো পরনে; পাতলা হয়ে এলেও চুল এখনও যথেষ্ট, জেল মাখানো মসৃণ-পরিপাটি- বয়স পঞ্চাশের বেশি নয়; দেখতে তাকে আরও কম মনে হয় আমার কাছে।

‘ইয়াংম্যান। আরেক দফা কফি হোক আমার সাথে…!’ বলতে বলতে ড্রইংরুমের সোফায় বসবার ইঙ্গিত দেন রাশেদ মনসুর, বলতে থাকেন, ‘মাফরুহা ভেবেছে ঢাকা শহর চিনবো না! সাথে গাইড রাখতে হবে। কি আশ্চর্য ব্যাপার… অবশ্য ঢাকার চেঞ্জে অবাক হয়ে যাচ্ছি!’

‘আপনি বের হয়েছিলেন এর মধ্যে? গতকাল তো পৌঁছেছেন?’ রাশেদ মনসুরকে বলি।

‘বেরুবো না মানে? অ্যারাইভাল টাইম কাউকে বলিনি। পরশু সকালে হোটেলে ব্যাগটা রেখেই উবার নিয়ে টিএসসি গেলাম। ডিপার্টমেন্টে গেলাম। টিএসসির তেমন বদল নেই। তবে রাস্তাঘাট লোকজনে আর যানবাহনে একাকার হয়ে গেছে! গতকাল সারাদিন হোটেলে ঘুমিয়েছি। -আন্তরিক ভঙ্গিতে কথা বলতে বলতে নিপুণ হাতে কফি বানান রাশেদ মনসুর আর বলতে থাকেনÑ ‘শোনো, তুমি আমার ২০/২৫ বছরের ছোট হবে। আপনি-টাপনি বলতে পারবো না!’

‘জি অবশ্যই তুমি বলবেন।’ আমি বলি।

‘বয়স কত তোমার? ২৭? ২৮?’ কফির পেয়ালা আমার হাতে তুলে দেন তিনি।

‘আরও বেশিÑ ৩০ হলো গত মার্চে।’

‘গুড। এইতো স্থির হওয়ার বয়স!… তুমি স্পেসিস… মিন। ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড ইমোশনাল…! মাফরুহার ওখানে কদ্দিন?’

‘তিন বছরের বেশি।’

‘শি ইজ নাইস।…আমরা ইউনিভার্সিটির ফ্রেন্ড। একসাথে পড়েছি এইটিজে।’

‘ জি, জানি।’

‘ মাফরুহা দুর্দান্ত ছাত্রী ছিল। ইংরেজিতে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া সহজ কথা নয়। আমি অবশ্য লাড্ডুগুড্ডু ছিলাম। ’… প্রাণখোলা হাসি হাসেন রাশেদ মনসুর; তার হাসি মালিন্যমুক্ত, অনেকদিন এত প্রাণবন্ত হাসি দেখিনি, হাসতে হাসতে বলেন তিনিÑ ‘মাফরুহা ভালো ডিবেট করতো, ইউনিভার্সিটিতে জয়েন না করে এনজিওতে গেল, পরে নিজের অর্গানাইজেশন করলো, সাহস আছে সত্যি!’

আমরা কথা বলতে থাকি মৃদুস্বরে- বেশিরভাগ কথা অবশ্য বলেন রাশেদ মনসুর, তার সাথে তাল মিলিয়ে যাই, তার বাচনভঙ্গি অসাধারণ সুন্দর, মৃদু অথচ স্পষ্ট, মার্জিত বাংলা তার, এত বছর বিদেশে আছেন, কথায় বোঝা যায় না; বলি- ‘আপনার কথা শুনলে মনেই হয় না, এত বছর বিদেশে আছেন।  সুন্দর বাংলা বলেন আপনি।’

‘দেশ যখন ছাড়ি, তখন বয়স ত্রিশ। এরপর আর ভুলবার কি আছে? যারা ভোলেন, তারা আসলে ভান করেন।’-রাশেদ মনসুর বলেন।

‘আপনি এত বছরে একবারও দেশে আসেন নি?’

আমার চোখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন রাশেদ মনসুর, আস্তে আস্তে বলেন, ‘নাহ। আসবার ইচ্ছাও ছিল না।’ বলতে বলতে চোখ সরিয়ে সিগারেট ধরান তিনি- ‘বুঝলে, এটা ডানহিল সিক্স পারসেন্ট নিকোটিন। এর কম নিকোটিনে ডানহিল আর পাওয়া যাচ্ছে না আজকাল। তুমি খাও সিগারেট? নেবে?’

‘আপনার সাথে খাওয়া কি ঠিক হবে?’ সংশয়ভরা স্বর আমার।

‘কেন? ঠিক হবে না কেন?’ রাশেদ মনসুর বলেন।

‘আপনার কাছে অফিসিয়াল অ্যাসাইনমেন্টে এসেছি। এখানে বসের সাথে এভাবে সিগারেট খাওয়ার চল নেই স্যার।’

আবার রাশেদ মনসুরের সেই হা-হা-হা হাসি; বলেনÑ ‘কিসের অফিসিয়াল অ্যাসাইনমেন্ট? আর কিসের স্যার?’ তিনি ডানহিল এগিয়ে দেন আমার হাতে, লাইটার জ্বালিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমাকে রাশেদ ভাই বলবে। আমার সাথে তোমার কোনো অফিসিয়াল ব্যাপার নেই, থাকবে না।’

‘স্যার, আমরা আপনার পাশে থাকতে পারলে আনন্দিত হবো।’-যথাসম্ভব বিনয়ী ভাব রেখে বলি।

‘শুনলাম তুমি জাহাঙ্গীরনগরে পড়াশুনা করেছো? সেলিম আল দীনকে চিনতে?’ একেবারে অন্য প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন রাশেদ মনসুর।

‘স্যরি স্যার। উনার মৃত্যুর পর আমি ভর্তি হই সেখানে।… জাহাঙ্গীরনগরে তার অনেক স্পর্শ, অনেক কিছু…!’

‘জানি। তাকে কাছ থেকে দেখেছি তিরাশি, চুরাশি সালে। নাট্য উৎসবে গিয়েছিলাম। দারুণ মানুষ।…কোন্ সাবজেক্টে পড়েছো যেন তুমি?’

‘নৃবিজ্ঞান। এনথ্রোপলজি…।’

‘ওই সাবজেক্টের এক টিচার রেহনুমা আমাদের বন্ধু ছিল, সাহসী মেয়ে।’ একটু চিন্তা করেন রাশেদ, থেমে আবার বলেন, ‘আচ্ছা বলো তো, এই যে আমাকে দেখছো, আমার সম্পর্কে তোমার ফার্স্ট ইম্প্রেশন কি? আমাকে তোমার ভাবুক বা হুইমজিক্যাল ধরনের মনে হচ্ছে? মনে হচ্ছে, কাজ ছাড়া খামোখা কথা বলতে পছন্দ করি?’

আচমকা এই ধরনের প্রশ্ন রাশেদ মনসুর করবেন, ধারণা করতে পারিনি; বলি- ‘না, না, আপনাকে আমার খুবই গোছানো আর পরিকল্পিত স্বভাবের মানুষ মনে হচ্ছে। বিনা কারণে আপনি কিছুই করেন না, এটা আমি নিশ্চিত!’

‘দূর!’- একটু তাচ্ছিল্যের সাথে হাসেন রাশেদ মনসুর- ‘তাহলে তোমার সাথে এত কথা বলছি কেন? স্ট্রেইট তোমাকে বললেই তো পারি… এই চলো তো নারিন্দা। গাড়ি ডাকো। ড্রাইভারকে বলো, পুরাতন মন্দির সড়কে যেতে!…’

‘এটা যে করছেন না, এরও কারণ আছে নিশ্চয়ই।’ খানিকটা দৃঢ়তার সাথে বলি।

‘বলো দেখি- কী কারণ?’

‘সম্ভবত এত সহজ কোনো কাজে আপনি কারও সাহায্য চাইবেন না। আপনি আরও জটিল- কেন যেন মনে হচ্ছে, আপনার ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপারে খোঁজখবর নেবার কাজ  আমাকে দিয়ে করাবেন…’

‘বাহ… এই বয়সী ছেলেরা এত শার্প হয় নাকি আজকাল!… নিজের বুদ্ধি কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছো… যাক্, মাফরুহা অন্তত বুদ্ধিমান একটা ছেলেকে আমার কাছে পাঠিয়েছে।…’ আরেকটা ডানহিল ধরান রাশেদ মনসুর, আর বলতে থাকেন, ‘আমরা গ্লোবাল ভিলেজে বাস করি, বিশ বছর পর এলেও এই দেশের সবই আমার জানা, হাতের রেখার মতো পরিচিত। মাথা বলে যে একটা গোলাকার বস্তু আছে, অনেকেই সেটাকে শুধু ঘাড়ে বহনের জিনিস মনে করে।…’ নিজের মনে হাসেন রাশেদ মনসুর- ‘তুমি গোলাকার বস্তুটাকে কাজে লাগানোরও চেষ্টা করছো। অবশ্য তোমার অনুমান ঠিক নয়, আমার খোঁজখবরের জন্যও কাউকে দরকার নেই। আমি নিজেই যথেষ্ট। তবে শার্প লোকজন আমার পছন্দ। কথা বলতে সুবিধা।…চলো আমরা এবার রওনা দিই।’

আমাদের এনজিও- মাইক্রো মিলিয়নসের গাড়ি র‌্যাডিসনের গ্যারেজে অপেক্ষা করে রাশেদ মনসুরের জন্য- আমাকে এরই মধ্যে আপিস থেকে এমডি ম্যাডামের পিএস রোখসানা ফোন করে এই তথ্য জানায়, রাশেদ মনসুরকে তথ্যটি জানাই; তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘মাফরুহা একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলছে! আমি বাপু নিজের মতো চলতে ফিরতে পছন্দ করি।’

‘যখন মনে করবেন যে, পারসোনালি ঘুরবেন, তখন এই গাড়ি ছেড়ে দেবেন স্যার। উবার ডেকে নেবেন। এখন এটাই থাক বরং…!’

‘তাও ঠিক। থাক…। তবে তুমি যে আমাকে স্যার স্যার করছো, এটার কি করি?’-রাশেদ মনুসরের চিন্তিত মুখে কথা বলবার ধরন দেখে আমি হাসি, বলি- ‘জি রাশেদ ভাই চলেন। আমাদের অফিসের গাড়িতেই চলেন। পরে দেখা যাবে।’

‘এবার ঠিক আছে। চল তবে…।’ রাশেদ মনসুরের কথার ভঙ্গিতে আশ্চর্য ধরনের আন্তরিকতা আছে।

গাড়িতে উঠতে যাবো, ফোন বেজে ওঠে- স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখি, তৃষা- এখন ফোন না ধরলে আর রক্ষা নেই, গত দু’দিন ধরে কোনো সাড়াশব্দ নাই তার; আমিও ফোন বা মেসেজ দিই নাই, আর তার ফোন যদি এখন না ধরি, তবে এই নিয়ে লঙ্কাকা- বাঁধবে,  রাশেদ মনসুরের দিকে আলতো হাসি দিয়ে গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে ফোন ধরি- ‘বলো?’

‘বলো মানে? দুই দিন খোঁজও তো নিলা না! বেঁচে আছি না মরেছি?’

‘তুমিই আমাকে ফোন দিতে না করছো? বললে যে, তোমার কনসেনট্রেশন নষ্ট হয় আমি ফোন করলে… ‘-যথাসম্ভব শান্তস্বরে আস্তে আস্তে বলি।

‘আমি না করছি! তুমি কি? তুমি কি একটা!’

‘তৃষা শোন… আমি একটা অফিসিয়াল ডিউটিতে আসছি। র‌্যাডিসনে। পরে তোমাকে ফোন দিচ্ছি।’

‘তোমার সাথে জরুরি কথা আছে আমার!’

‘সংক্ষেপে বলো তাইলে!’

‘কিসের সংক্ষেপ! তুমি একটা স্বার্থপর! নিজেরটা ছাড়া আর কিছু বোঝ না!’ -এত সকালে কীভাবে তৃষা এত রাগ করতে পারে, সত্যিই অবাক লাগে আমার।

‘এটাই তোমার জরুরি কথা?’ আমি ক্লান্তস্বরে বলি।

‘তোমার সাথে আবার কি জরুরি কথা বলবো? তোমার কোনো বোধবুদ্ধি আছে!’ তৃষার রাগ বাড়তে থাকে।

তৃষার সাথে জটিলতা আমার দিন দিন বাড়ছেই- হয়তো শেষই করতে হবে তার সাথে আমার সমস্ত যোগাযোগ। ক্লান্ত স্বরে বলিÑ ‘শোন…পরে কথা বলি। অফিসিয়াল অ্যাসাইনমেন্ট। তোমাকে ফোন দিচ্ছি পরে।’ দ্রুত ফোন কেটে গাড়ির সামনের দিকে এসে দেখি রাশেদ মনসুর গাড়িতে ওঠেননি তখনও, আরেকটু এগিয়ে লবি বরাবর খোলা জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে ডানহিল টেনে চলেছেন, আমাকে দেখে হাসলেন, ‘কোনো অসুবিধা? মুখখানা ম্লান মনে হচ্ছে!’

‘ঠিক আছি স্যার। কোনো অসুবিধা নাই।’

‘আবার স্যার?’ রাশেদ মনসুর কপট রাগী রাগী মুখে আলতো হাসছেন।

‘স্যরি রাশেদ ভাই।…আসলে আপনাকে দেখলেই এমন একটা সমীহ আসে যে…’

‘কলোনিয়াল কনসেপশন… বাদ দাও এগুলো। তোমার মুখখানা আচমকা কালো হলো, কোনো অসুবিধা?’

‘না, না’ বলতে বলতে এবার আমি হাসি, ‘আমি তো কালোই রাশেদ ভাই! নতুন করে কি কালো লাগবে..’

‘এই যে আরেকটা কলোনিয়াল কনসেপশন!…’ হাহাহা করে হাসেন রাশেদ মনসুর- ‘চলো, এবার গাড়িতে উঠি। অভিসার সিনেমা হলের দিকে যাই চলো।’

‘ অভিসার সিনেমা হল!’ আমি অবাক হয়ে তাকাই- ‘চলেন যাই।’ ড্রাইভারকে বলি, ‘মতিঝিলের দিকে যান ভাই…।’

 

০২.

তৃষার সাথে আমার জটিলতা আসলেই বাড়ছে।

আমার যা স্বভাব- অন্তত নিজেকে যতটা বুঝতে পারি, তাতে তৃষার সাথে আমিইবা কেন তাল মিলিয়ে কথা বলতে পারি না, নিজেই বুঝি না। সাধারণভাবে আমি বিবাদে যাই না,  চেষ্টা করি নিজের কথা অন্যকে বোঝাতে, না পারলে সরে আসি- তৃষাকে না পারি আমার কথা বোঝাতে; না পারি ওর কাছ থেকে সরে আসতে!

তৃষাকে প্রথম দেখি কমপক্ষে দশ বছর আগে, তখন আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জহির রায়হান ফিল্ম সোসাইটির সদস্য, রাতদিন ফিল্ম নিয়ে দৌড়ঝাপ করলেও ক্যাম্পাসে একধরনের বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করি। অজস্র বন্ধুবান্ধব, দিনভর আড্ডা, ফিল্ম সোসাইটি, বাম রাজনীতি- এতকিছুর পরও আসলে আমি সবকিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন থাকি।

বন্ধুদের একেকজনের আগ্রহ একেক দিকে। পড়াশুনার চাপও থাকে, তবে আমার মতো দ্বিতীয় সারির ছাত্র পরীক্ষার আগে পড়ে নিলেই হয়ে যায়- বন্ধুরা সহযোগিতাপরায়ণ, পাস করতে থাকি।

দ্বিতীয় বর্ষ নৃবিজ্ঞানে পড়ি তখন, আমার যারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তারা সবাই বাম রাজনীতির সাথে জড়িত- আমি ফিল্ম সোসাইটিতে, আমাদের ফিল্ম সোসাইটির বড়  নেতারা- জাঈদ ভাই, তপনদা- এরা প্রত্যেকে বাম ছাত্র সংগঠনের নেতা, আমাকেও দলে চান তারাÑ আমি পাশ কাটিয়ে যাই, ফিল্মই আমার পছন্দ, কোন ছাত্র সংগঠনের সাথে নিজেকে জড়াই না, পিছলে পিছলে যাই।

জাঈদ ভাই, তপনদাদের সাথে প্রচুর আড্ডা দিই আল বেরুনী হলে, আড্ডা দিতে দিতে ক্লান্ত হই- তারা আদর্শপরায়ণতার কথা বলেন,  বোঝানÑ ছাত্রজীবনেই যদি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের হাতছানি থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে সুনির্দিষ্ট একটি আদর্শের পক্ষে দাঁড় করাতে না পারি; তো বুঝতে হবে আমার ভেতরে স্পষ্ট কোনো মতাদর্শ নেই!

‘মতাদর্শ থাকতেই হবে কেন? কেন সুনির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক মতাদর্শে থাকতেই হবে!’ আমি তর্ক জুড়ে দিই।

‘সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতামত না থাকাও একটা রাজনীতি। এটাকে বলে সুবিধাবাদ। এটাই আমাদের মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এই সুবিধাবাদ নামের আরামের জায়গাটা থেকে তোমাকে বের হয়ে আসতে হবে। সমাজের সবচেয়ে বড় অবহেলিত অংশটিকে কেন আমরা ভুলে যাবো? নিজেকে আমরা সেই শ্রেণির সাথে যুক্ত করবো। তাদের পক্ষে যেভাবেই হোক লড়াইয়ে থাকতে হবে আমাদের।’ জাঈদ ভাই আমাকে বোঝাতে থাকেন।

জাঈদ ভাই আর তপনদাদের গুরুগম্ভীর কথা শুনতে থাকি।

সবসময় এসব শুনতে ভালো লাগে না। এই ভালো না লাগবার সময়টিতে হলের চার তলায় সহপাঠী রাব্বির রুমে প্রায়ই যেতে শুরু করি। রাব্বি সরকারি ছাত্র সংগঠনের নেতাগোছের একজন, এই কারণে আল বেরুনী হলে তার বেশ আরাম-আয়েশ। একখানা ছোট্ট কালার টিভি পর্যন্ত রুমে আছে, ফ্রিজও আছে। তার কথাবার্তাও অন্যরকম, তার কাছেই শুনি নানামুখী অভিযানে সে অংশ নেয়।

একদিন বিকেলের দিকে রাব্বির রুমে যাই, সে তখনই খানিক পান করে চোখ লাল করে বসে আছে; আমাকে দেখে বলে- ‘এই যে গুডবয়! আসিছ, ভালো হইছে। খুব লোনলি ফিল করতেছিলাম।’

‘ক্যান? কি হইছে তোর?’ রাব্বির মুখে লোনলি ফিল করবার কথা শোনা বিস্ময়কর বটে!

‘ছ্যাঁকা খাইছি। নীলা আমারে বলছে- আই হেট ইউ!’

নীলা ইংরেজিতে পড়ে, বড় বড় ডাগর চোখ ও ডাকাবুকো তার ভঙ্গি- কথায় তার সঙ্গে আশপাশের কেউ পারে না, আমরা একই বর্ষের; বিভাগ ভিন্ন, জহির রায়হান ফিল্ম সোসাইটিতে সে মাঝে মাঝে আসে, সেই সুবাদে আমি নীলাকে বেশ চিনি।

‘প্রেমের প্রস্তাব কবে দিলি!’

‘দুর… প্রেমের প্রস্তাব। গুল্লি মারি। চল্… আজ এক জায়গায় যাবো। তোরও  কেউ  নাই… অবশ্য  তুই এই লাইনেরই না। আর আমি দুঃখ পাওয়া প্রেমিক। শরৎচন্দ্র হয়া যাবো আজকে!’

বুঝতে পারি, কোথায় যাবার ইঙ্গিত দেয় রাব্বি; আমার কোনো ছুৎমার্গ নাই- বরং কিছু আগ্রহই আছে, সাহস নাই বলা যায়; পতিতাপল্লী শুনলেই কেমন যেন গা ছমছম করে।

‘ইয়ে… পতিতাপল্লীতে যাবো আমরা?’ ভয়ে ভয়ে রাব্বিকে জিজ্ঞেস করি।

অবাক চোখে আমার দিকে তাকায় রাব্বি- ‘এই তোদের লেফট পলিটিক্স! আর সিনেমা আন্দোলন! পতিতা? পতিতা আবার কি? তাইলে পতিত কারা?…ছি! ছি! তোর কাছ থেকে এত জঘন্য আর অশিক্ষিত এপ্রোচ চাই না সজল…’

‘ঠিক এভাবে বলতে চাই নাই। …যৌনকর্মীর কাছে যাবো আমরা?’

‘নাহ। আমরা প্রেম সন্ধান করবো। মন ও শরীরের সঙ্গী খুঁজে নেব!’ হাসতে হাসতে রাব্বি বলে, ‘এত ভয়ের কী হলো, বুঝলাম না!’

রাব্বির সাথে আমি পা মেলাই, সাভার বাজার পেরিয়ে গেণ্ডা- প্রধান সড়ক ছেড়ে বাঁয়ে এক গলির ভেতর আমরা হাঁটতে থাকি, রাব্বি আমাকে জ্ঞান দেয়- ‘পাড়ায় গেলে অনেক ভাল্লাগবে! সাভারে ফরমাল পাড়া নাই। আমি নারায়ণগঞ্জে গেছি। তুই নিশ্চয়ই পাড়ায় যাস নাই কোনোদিন!’

‘না।’

‘নিয়া যাবো একদিন। আজ ইনিংস ওপেন র্ক…।’

গলির মাথায় একতলা বাসার সামনে থামি আমরা, উপরে টিন চারদিকে দেয়াল- বছর দশেক আগের কথা, ওদিককার রাস্তা তখনও আধাপাকা, আধাকাঁচা- রাব্বির সাথে মোবাইলে কথা হয়, ভেতর থেকে দরজা খোলে গৃহকর্মী চেহারার এক মধ্য বয়সি। আমরা কথা না বলে  ভেতরে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসি। কেমন ঘোরের মধ্যে থাকি আমি, কী হতে যাচ্ছে ভেবে ভয় ও রোমাঞ্চ দুই-ই বোধ করি, আমার অনেক বন্ধুর মতো, খুব রোমান্টিকতা না থাকলেও একেবারে নেই বলা যাবে নাÑ মনের খুব ভেতরে নিশ্চয়ই আমিও অপেক্ষা করি, একদিন আমারও বিশেষ কাউকে খুব ভালো লাগবে, সেখান থেকেই যা হওয়ার সব হবে; আমার কোনো তাড়াহুড়ো নাই। প্রেমশূন্য, টাকার বিনিময়ে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা হবে! মৃদুস্বরে রাব্বীকে বলি, ‘ দোস্ত। তুই যা। আমি বসি। আমি যাবো না।’

‘টাকা নাই নাকি! ব্যাপার না। আমার কাছে আছে।’

‘না, টাকা বিষয় না।’

‘চুপ র্ক তো। ন্যাকামি করিস না। টাকা আমি দেব।’

আমাদের কথার মধ্যে মধ্যবয়স্ক এক নারী আসেন, সবুজ-লাল ডোরা কাটা, পান খাওয়া ঠোটে রাব্বীর দিকে হাসি ছুড়ে বলেন, ‘আজকাল এইদিকে আর আসেনই না। নতুন মানুষ সাথে আনছেন। আপনের তো রুবিনা লাগবো। মাসি, এ আমার বন্ধু সজল। ভালো ছেলে।… প্রথম আসছে তো। দীপালিরে একট বিশেষ কেয়ার নিতে বলে দেন…। আস্তে আস্তে ঠিক হয়া যাবে।’

তারে দীপালিরে দেই। বাম দিকের ঘরটাতে যান।’

‘সে কি আর জানি না বাপু! যান… যান… যার যার ঘরে চইলা যান। আধঘণ্টার জন্য ১ হাজার ১ হাজার মোট ২ হাজার টেকা আগে দেন।’

রাব্বি দুই হাজার টাকার দুটো নোট বের করে মাসির হাতে দেয়, আমি যন্ত্রচালিতের মতো দীপালির ঘরে ঢুকি।

ছোট্ট একটা ঘর, ৮ ফুট বাই ১০ ফুট- একপাশের দেয়ালে বড় আয়না, ছোট খাটে বসা সবুজ-লাল শাড়ি পরা দীপালির বয়স কত হতে পারে, অনুমান করতে পারি না। মুখে কয়েক পরতের স্নো-পাউডার, চুল বেণি করা, চোখে কাজল।

বললামÑ ‘তোমার আসল নাম দীপালি?’

‘মাসি এই নাম দিছে। আসল নাম ভুইলা গেছি।’ ওর কথায় ময়মনিসংহ-নেত্রকোনা অঞ্চলের টান।

‘ইয়ে… পানি খাওয়া যাবে একটু?’ আমার গলা শুকিয়ে কাঠ।

দীপালি হাসে। জলের গ্লাস হাতে তুলে দিতে দিতে বলে, ‘আমারে ২০০ টেকা দিবেন?’

‘টাকা দিয়েই তো ভেতরে এলাম।’

‘ওইটাতো মাসির। আমার নিকি! আমারে দিলে ঠকবেন না…। বলতে থাকে দীপালি, ‘ খাসির মাংস দিয়া ভাত খাইতাম নিজের মতো।’

মানিব্যাগ থেকে ১০০ টাকার দুটো নোট বের করে ওর হাতে দিই আর এক দমে পুরো গ্লাস পানি খেয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দীপালির দুই হাত ধরি। আমার ঠিক সামনে দাঁড় করাই।

‘তুমি খুব সুন্দর।’ দীপালিকে বলি।

‘বেবাকতেই কামের সময় কয়। খাড়ায়া হইতো না। বিছনাত আসেন। আর কনডোম পইরা লন।’ বলতে বলতে শাড়ি খুলতে শুরু করে দীপালি।

তাকে থামাই। ‘এভাবে না। আসো একটু চুমু খাই।’ বলে তার ঠোঁটের দিকে আমার ঠোঁট এগিয়ে নিই।

বিদ্যুৎগতিতে নিজের দুই ঠোঁটের উপর দুই হাত চেপে ধরে দীপালি; রুদ্ধস্বরে বলে, ‘চুমা খাওন যাইতো না! এইটা বাদে আর সব…।’

এর মানে কি?

বোকা চোখে তাকাই, দীপালি শরীরের পোশাক একে এক খুলতে খুলতে বলে, ‘আপনে ডেরেস খুলেন…।  রাইত আটটার পরে সাভার বাজারে ভাতের হোটেল বন্ধ হয়া যায়।’

আমার সারা শরীর বরফের মতো ঠান্ডা মনে হতে থাকে, পেটের ভেতর থেকে উঠে উঠে আসে সপ্তাহখানেক আগে খাওয়া ভাতের রস- এত টক, আমি ওয়াক করে বমির ভঙ্গি করতেই দীপালি বলে, ‘মরণ। এরম করেন ক্যান মরদ পোলা। শাহরুখ খানের লাহান লাগে দেখতে। আসেন, তাড়াতাড়ি…’

আর পারি না, পাশের বাথরুমে গিয়ে মুখে আঙুল দিয়ে বমি করি, দীপালি অবাক হয়ে তাকায়, বমি করে মুখ ধুয়ে এসে মানিব্যাগ থেকে ৫০০ টাকার একটা নোট বের করে দীপালিকে দিই- ‘ ভাল্লাগতেছে না। যাই!’

ছো মেরে নোটটা হাতে তুলে নেয় দীপালি। ‘করবেন না?…আইচ্ছা! শরীল ভালা লাগতেছে না আপনের বুঝছি! …যান তাইলে…আমি তাত্তাড়ি হোটেলে যাই। হোটেল বন্ধ হয়া যাবে।’

দ্রুত হাতে পোশাক পরতে শুরু করে দীপালি- চোখ জ্বালা করে ওঠে, কেমন গা গুলাতে থাকে… ধুত্তরি! আমি একটা পুওর মিডলক্লাসের ইমোশন…!

রাব্বিকে না বলেই সেদিন একা হলে ফিরে আসি, বহুদিন আর রাব্বির সামনাসামনি হই না। এমনকি এরপর আমি অনেকদিন মেয়েদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারি নাই; প্রেম-ট্রেম তো অনেক দূরের কথা। আমার অপরাধবোধ হয়Ñ কিসের? আমি জানি না।

০৩.

মনে আছে, ওই অপরাধবোধের সময়টাতেই তৃষাকে দেখি প্রথম।

দৃক গ্যালারিতে ফিল§ এপ্রেসিয়েশন কোর্সে আমরা সহপাঠী ছিলাম। শ্রাবণী হায়দার তৃষা- লম্বা, একহারা গড়নের তরুণী, বড় বড় চোখ, কাঁধ পর্যন্ত এলোমেলো চুল. ভারী চশমা, গম্ভীর মুখ- অল্প হাসে, তবে তার অল্প সেই হাসি বড় সুন্দর, কথা বলে গুছিয়ে; জানলাম, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্রী, ফিল্ম- ডকুমেন্টারি, সিনেমা সবই তার কাছে শখের চেয়ে আরও বেশি কিছু। কিছু মানুষ থাকে মুখখানা সবসময় সিরিয়াস, তৃষার মুখ সে রকম- কাজ পাগল কাজ পাগল একটা ভাব আছে তার- আমার এ ধরনের মানুষ কম পছন্দ। আমার পছন্দ একটু আনমনা ধরনের, কোনো বিষয়েই বেশি সিরিয়াস নয়, এমন মানুষ- তাই দৃকে তৃষার সাথে ব›ধুত্ব হয় না আমারÑ চিনতাম পর¯পর, মুখচেনার কিছু বেশি, সামনাসামনি দেখা হলে হাসি ও কুশলাদি বিনিময় হয়, এই পর্যন্তই।

কয়েকটি এনজিও-তে রিসার্চার হিসেবে কাজ করে মাইক্রো মিলিয়নে থিতু হই। একদিন আপিসে কাজ করছি, জানতে পারি, সাম্প্রতিক শ্রেণি সংগ্রাম নিয়ে সাত তরুণ-তরুণীর চলচ্চিত্র প্রদর্শনী চলছে শিল্পকলায়, জাঈদ ভাই আমাকে ফোন দেন- তিনিই জাহাঙ্গীরনগরে জহির রায়হান ফিল্ম সোসাইটিতে আমাদের নেতা ছিলেন; ফোনে তার ভারী গলা- ‘এইভাবে মুখ বুজে চাকরি করবা শুধু! ফিল্ম মাথায় উঠলো!’

‘চাকরিও আর করতে পারলাম কই ভাই .. রিসার্চের নামে সারাদিন যে কি করি, নিজেই বুঝি না।’ Ñআমি বলি।

‘তাইলে আসো আজ বিকালে। সাম্প্রতিক শ্রেণি সংগ্রাম নিয়া চলচ্চিত্র উৎসব। ১০/১৫ মিনিট করে ৭টা সিনেমা হবে। দারুণ ব্যাপার।’

‘আপনি এখনও শ্রেণি সংগ্রাম নিয়া আছেন? এখন শ্রেণি কই? এখন তো একটাই শ্রেণি- যে যার মতো আছি! তার আবার সংগ্রাম?’

‘অবশ্যই শ্রেণি আছে। হয়তো কাঠামো আর প্রকাশভঙ্গিতে কিছু পরিবর্তন আসছে। তবে সবই আছে।…আসো, আসলেই বুঝবা।’

সেদিন বিকেলে যাই শিল্পকলায়- অনেকদিন পর জাঈদ ভাইর ডাক আমাকে পুরনো দিনে নিয়ে যায়, ফিল্ম সোসাইটির অনেকের সাথে দেখা হয়; আর দেখা হয় তৃষার সাথে- তার ছবি ‘থাপ্পড়’ দেখে আমি মুগ্ধ- এত গভীরভাবে অপমানবোধ আর গ্লানিকে অল্পসময়ে সিনেমায় উপস্থাপন করে, দারুণ ব্যাপার। ছবি প্রদর্শনী শেষে হলুদ শাড়িতে ঝলমল তৃষা মঞ্চে অতিথিদের ধন্যবাদ জানায়, তারপর নিচে নেমে  সামনের সারিতে আমাকে দেখে চিনতে পেরে, পরিচিত হাসি হাসে, পরের ছবি শুরু হবে একটু পরই- তৃষা আমার পাশে বসে- মুগ্ধ চোখে বলি- ‘এত সুন্দর ভাবনা আর ছবি অনেকদিন দেখি নাই সত্যি!’

মুখ টিপে আশ্চর্য এক নীরবভঙ্গিতে হাসে তৃষা, পরে অনেকবার দেখেছি, নিজের ঢংয়ে আচমকা সেই চাপা হাসি- যখন সে খানিকটা বিব্রত, তবে মনে মনে খুশি, একটু মাথা নিচুও করে ফেলে!

আমরা ফোন নম্বর বিনিময় করি, ফেসবুকে বন্ধু হই।

তৃষার সিনেমাটি সত্যিই আমার ভালো লাগে- ‘থাপ্পড়’- কয়েকটি শ্রেণি-পেশার মানুষকে সে নিয়ে আসে সিনেমার পর্দায়, যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রান্তিক এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর থাপ্পড়ের আওতার মধ্যে! ওর দেখবার চোখ তীক্ষ্ণ, ব্যাখ্যা করবারও নিজস্ব ঢঙ আছে; সেই রাতেই মেসেঞ্জারে এসব কথা লিখে পাঠাই। রাত ১২টার মতো বাজে তখন, মেসেঞ্জারে সাথে সাথে তৃষার উত্তর :

‘ থ্যাংকু। একটু বেশি হয়ে হচ্ছে কিন্তু!’

‘মোটেই বেশি বেশি হচ্ছে না! আরও বেশি বলা উচিত! আমিতো পারি না এভাবে ভাবতে…!’ –  মেসেঞ্জারে লিখে পাঠাই।

‘বুঝছি। আর বলতে হবে না!…কী করছিলেন এখন?’ তৃষা জিজ্ঞেস করে।

‘কিচ্ছু না। এই টুকটাক ফেসবুক। আচ্ছা, দৃকে থাকতে আমরা কথা বলি নাই তেমন, না? … এত খারাপ লাগছিল আজকে!’

‘কেন? কেন? খারাপ লাগবে কেন?’

‘আপনার মতো ঝকঝকে আর মেধাবী মানুষের সাথে বিশেষ মনোযোগের সাথে কথা বললাম না। এটা কিছু হলো?’

‘…ঝকঝকে মেধাবী! তখনতো তাকাতেনই না ভালো করে। জাহাঙ্গীরনগর থেকে আসতেন, নিশ্চয়ই প্রেম করতেন চুটিয়ে! কোনোদিকে তাকানোর আর স্কোপ ছিল না!… আপনার সেই প্রেম কী হলো! বিয়ে করছেন?’ তৃষা জিজ্ঞেস করে।

‘একেবারে জ্যোতিষী হয়ে গেলেন! কোথায় আর প্রেম করতে পারলাম। ফিল্ম সোসাইটি করতাম, তত্ত্ব কথা শিখতে গিয়া কিছুই হয় নাই।’

আর তারপর আমাদের কথা চলতে থাকে অনর্গল, তুই-তুমি-আপনি সব গুলিয়ে একাকার করি আমরা, দিনে-রাতে যখন ইচ্ছা ফোনে কথা বলি আমরা-

‘কি করো!’ -তৃষা বলে।

‘এই তো তোমার কথা ভাবি!’-আমি বলি।

‘এইযে চারপাশ দুর্গন্ধে ভরে দিলা! জানো তো… মিথ্যারও গন্ধ আছে!’

‘কেন মিথ্যা হবে! আমি বুঝি তোমার কথা ভাবতে পারি না!’

‘তা কী ভাবতে ছিলেন শুনি!’

‘ভাবছিলাম আবার কবে দেখা হবে!’

‘গত বৃহস্পতিবার দেখা হলো! আজকে শনিবার… এখনই কিসের দেখা?’ তৃষার কণ্ঠে বিস্ময়!

‘কেন? দেখা হলে কি? আমরা রুটিন করছি নাকি যে, অমুক দিন আর তমুক দিন দেখা করবো, বাকি দিন দেখা করবো না!’

‘তুমি কই?’

‘আমি অফিসে। আর কই? কোথাও তো নিলে না!’

‘আসতে পারবা!’

‘কেন পারবো না? বলো, কোথায় আসতে হবে!’

‘ফ্লোরেনটিনাতে আসো। গুলশান আড়ঙের আগে, কফি শপ।’

‘আসতেছি।’ বলে আমি কফি শপে তখনই ছুটি।

 

আর সময় পেলেই আমি উপস্থিত হই তৃষার আপিসে।

‘তোমার উপর রেগে যাচ্ছি, কারণ তুমি একটা মস্ত গাধা।’ তৃষা রাগী গলায় বলে।

‘আমি আবার কি গাধামী করলাম?’

‘সারাক্ষণ তো তাই করছো। কতবার বলছি- অফিসে আসবা না! নাহ্, আমাকে না দেখে তিনি থাকতে পারছেন না! সোজা চলে এসেছেন!’

‘কি মুশকিল! আমি বাঘ না ভাল্লুক- একটা অফিসে একজনের কাছে একজন যেতে পারে না!’

‘আমি এরকম হুটহাট করে বেরুতে পারি না। আমার অস্বস্থি হয়!’

‘আচ্ছা, আর আসবো না।’ আমি বলি।

আবার রেগে ওঠে তৃষা- ‘আসতে না করলাম নাকি! আশ্চর্য!…অফিসে আসবা না। পাশের কোনো রেস্টুরেন্টে বসে ফোন দিবা। আমি আসবো।’

আমি হাসি, ‘ জি আচ্ছা। ম্যাডাম।’

আমরা কথা বলি, অবিরাম কথা বলি, ঝরঝর করে হাসি, তৃষা তার নিজের গল্প একটু একটু করে বলতে শুরু করে; তার বিয়ে হয় বছর দশেক আগে, যখন আমরা দৃকের ছাত্র- তখনই, সাব্বির- তৃষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, প্রেমের পর বিয়ে, বছর দুয়েক পর পুত্রসন্তান- ‘আয়মান আসে আমার কোলজুড়ে… আয়মান বড় হতে শুরু করলো আর আমাদের খটমট লাগতে শুরু হলো! জঘন্য!’

 

০৪.

‘কি ব্যাপার! সজল? এত চুপচাপ?’ রাশেদ মনসুরের প্রশ্নে তার দিকে তাকাই, গাড়িতে উঠবার পর কয়েকটি প্রসঙ্গে আমরা কথা বলিÑ আমার বাড়িতে কে কে আছে; রাশেদ মনসুরের আত্মীয়-স্বজন বলতে তেমন কেউ নেই- এ’ধরনের পারস্পরিক পরিচিতিমূলক কথা, আসে দেশ-রাজনীতি প্রসঙ্গ; আমাদের গাড়ি বনানী ফ্লাইওভারে উঠে প্রায় আধঘণ্টা নিশ্চল দাঁড়ায়, জ্যামে কথা বলতেও ইচ্ছা হয় না, চুপ থাকি দু’জনেই।

‘ ভয়াবহ জ্যাম!’ রাশেদ মনসুর আপন মনে বলেন।

‘এটা রেগুলার ঘটনা!’ আমি বলি

‘সেই সময় এতো মানুষ ছিল না… আর গাড়ি! কি কাণ্ড!’ নিজেকেই যেন বলেন রাশেদ মনসুর, তার চোখেমুখে একধরনের আনন্দময় হাসি দেখতে পাইÑ এতদিন পর প্রাণে ভরপুর নিজের দেশ দেখছেন; দেখছেন অবিশ্রান্ত কোলাহল, যানবাহনের ধোঁয়াÑ সম্ভবত ভালো লাগে তার। তার পাশে চুপ করে বসে সামনের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। ভাইব্রেট করা ফোন জিন্সের পকেটে নড়েচড়ে ওঠে, বড় আপা ফোন করেছেন, ‘সজল, আজকে সন্ধ্যায় আবার ল্যাবএইডে তোর দুলাভাইকে যেতে হবে। তুই সাথে থাকিস।’

‘ক’টায়?’

‘ঠিক সাতটায় টাইম দিছে। একেক ডাক্তার একেক কথা বলছে। আনোয়ার মেডিক্যালের ডাক্তার বলছে, এখনই কেমো শুরু করতে হবে! আর ল্যাবএইডের ডাক্তার বলছে আগে অপারেশন, তারপর কেমো। তোর দুলাভাইয়ের মাথার ঠিক নাই, আব্বা কিছু বোঝে না, তোকে যেতেই হবেরে…!’  ‘আচ্ছা’ বলে ফোন রাখি।

পারুল আপা আমাদের বড় বোনÑ আমার আর কাজলের শৈশবের অনেকটা জুড়ে আমাদের একমাত্র বড় বোন; ছোটবেলায় বায়নাটায়না সব পারুল আপার কাছেই ছিল। মনে আছে, এক বিছানায় আমরা তিন ভাইবোন ঘুমাতাম, অন্তত ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত তো অবশ্যই, সে সময় খুব ফুটবলের পোকা ছিলাম। রাত-দিন ফুটবল আর ফুটবল; আমাদের পারিবারিক অবস্থা অত শোচনীয় না হলেও বাবা কেন যেন কোনো ধরনের খেলনা বা ফুটবল- কতই বা টাকা আর লাগতো এসব কিনতেÑ কিনে দিতে চাইতেন না। আপা তখন উচ্চমাধ্যমিকে পড়েন, নিজের পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত- আমি পড়ি ক্লাস ফাইভে, কাকে আর বলি ফুটবল কিনে দিতে! কলোনির মাঠে ফুটবল খেলতে যেতাম, নিজের একটা ফুটবল যদি থাকতো- প্রায়ই ভাবতাম, একদিন ভাবলাম আপাকে একটা চিঠি লিখি, আমাকে ফুটবল কিনে দাও! সরাসরিই বলতে পারি, তবে লিখলে এটার আলাদা গুরুত্ব থাকে আর আপা আমার হাতের লেখা আর বানানোর ব্যাপারে দিনরাত তাগাদা দেন- আমি লিখলাম তাকে, যতটা সম্ভব নিঁখুত বানান আর সুন্দর হাতের লেখায়, একটা ফুটবল আমার চাই-ই চাই। আপার পড়ার টেবিলে বইয়ের ভাঁজে রেখে দিই সেই চিঠি, সন্ধ্যায় পড়তে বসে চিঠি পড়ে আপা কথা বলেন না; পরদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে কালো সাদা ডোরাকাটা সুন্দর একটা ফুটবল নিয়ে আসেন। কত বছর আগের কথা সেটা? ২০? এখনও আমি সাদা-কালো ডোরাকাটা ফুটবলটা চোখের সামনে দেখতে পাই।

‘স্যার, অভিসার সিনেমা হলে আসছি। পার্ক করুম?’ ড্রাইভার জিজ্ঞেস করে।

‘আমরা কি আরও ভেতরে যাবো রাশেদ ভাই? ঠিকানাটা জানেন?’

‘হুম। ২ বাই ৩ হাটখোলা। অভিসারের সামনে দিয়ে বামে যেতে হতো; এখন কিছুই চিনতে পারছি না। হলটা অবশ্য একই রকম আছে… বাঁয়ে এগোও ড্রাইভার…’ রাশেদ মনসুর ড্রাইভারকে বাঁ-দিকে এগোতে বলেন আর ডানে-বামে বাড়ির নম্বর দেখতে দেখতে বলেন- ‘ওই যে সামনের কানাগলি, ওটা বরাবর যাও। চিনতে পেরেছি।’

কানাগলির শেষ বাড়িটার সামনে এসে আমরা গাড়ি থেকে নামি; রঙওঠা পুরনো তিনতলা, রাশেদ মনসুর  ‘বাসায় আছে তো লোকজন নাকি!’ বলে নিচতলার গেটের পাশে কলিংবেল চাপেন, কিশোর বয়সি গৃহকর্মী এসে গেট খোলেÑ‘কারে চান?’

‘জামিল সাহেবের বাসা? মিসেস জামিল আছেন? বলো যে, রাশেদ আসছে..।’

আমরা অপেক্ষা করি, রাশেদ মনসুর বলেন, ‘আমার স্যারের বাসা। ইউনিভার্সিটি লাইফে তারা আমার অভিভাবক ছিলেন।’ এরপর যে দৃশ্যের সূচনা হয়, তা অনেকটা নাটকীয়Ñ আশি ছুঁই ছুঁই এক বৃদ্ধা এসে হাত ধরেন রাশেদ মনসুরের, ‘বাবা, জানতাম তুমি আসবা! আমাদের এত বড় বিপদ!’ এবং ভেতরে নিয়ে ড্রইংরুমে বসান; অবিরল কথা শুরু হয় মিসেস জামিলেরÑ অনেক চেষ্টা করেও এতদিন কোনো যোগাযোগ করতে পারেননি তারা। ‘কিন্তু বিপদের সময় আল্লাহ ঠিক তোমারে মিলায় দিল আমাদের সাথে…!’ বৃদ্ধা বলেন আর কাঁদেন; রাশেদ মনসুর বলেন, ‘আমাদের সময় ঘরোয়া বিখ্যাত খিচুড়ির দোকান ছিল। মধুমিতার পাশে… আজ আবার খেতে ইচ্ছা করছে। সজল, তুমি গাড়ি নিয়ে চট করে খিচুড়ি নিয়ে আসো।’ বলে মিসেস জামিলকে জিজ্ঞেস করেন রাশেদ, ‘স্যার কই? বাসায় নাই?’

‘না। সে তো মিতার ওখানেই। কয়দিন হলো! আমাদের কি আর খাওয়া ঘুম আছে বাবা!’ বুঝতে পারি, বৃদ্ধার সাথে নিজস্ব আলাপ আছে রাশেদ ভাইর, আমি ঘরোয়ার খিচুড়ি আনতে বের হই।

কিছু একটা হয়েছে এই বাড়িতে আর সে সম্পর্কে জানেনও রাশেদ মনসুর, বুঝতে পারি; এর মধ্যে আমাকে নিয়ে এখানে আসবার কারণও আছে- সময়মতো আমাকে জানাবেন রাশেদ ভাই, জটিল কোনো ব্যাপার কি! ভদ্রমহিলা এভাবে কাঁদছেন কেন?  আচ্ছা, দেখা যাবে সেটা। জামিল স্যারের বাসা থেকে বেরিয়ে তৃষাকে ফোন দিই,- ‘ কে যে স্বার্থপর নিজে একবার চিন্তা করে দ্যাখো!’

‘অবশ্যই তুমি স্বার্থপর। আমাকে অহেতুক কষ্ট দেয়ায় তোমার আনন্দ।’

‘তোমার সাথে সামনাসামনি আমার কথা বলতে হবে।’

‘…কথা হলেই তো আবার ওই একই প্যাঁচাল শুরু করবা! ডিমান্ড! আর ডিমান্ড! আমি কোনো ডিমান্ডের মধ্যে নাই!’

‘এইগুলা কী বলো তুমি! আমার কোন ডিমান্ড নাই! যা স্বাভাবিক, সেটা বরং তুমিই মানতে চাইছো না!’

‘আমি মানতে পারবো না। আমার প্রেমের দরকার নাই।’ তৃষা বলে।

‘এইভাবে মুখ মুছে ফেলতে পারো তুমি!’

‘পারি। মুখই মুছে ফেলবো। তোমার মতো স্বার্থপরের সাথে এছাড়া আর কি করতে পারি!’

‘আমাকে একদিন সময় দাও তুমি!’

‘অবশ্যই সময় দেব। ইল্লজিক্যাল কথা বলে আমার কনসেনট্রেশন নষ্ট করতে পারবা না।’

‘সব কথা লজিক্যাল বলবো।’ -বলে তৃষার ফোন কেটে বড় আপাকে ফোন দিই, আমাদের বোন একটাই- তারপরও ছোট থেকেই আমি আর কাজল যে কেন আপা বা আপু না ডেকে তাকে বড় আপা ডাকি,জানি না-

‘বড় আপা, চিন্তা করো না। সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় ল্যাবএইডে উপস্থিত থাকবো।…দুলাভাই কী করছে? কাজল আসছে আজ?’

‘কাজল দুপুরে বাসায় আসছে।’

‘কাজলকে দুলাভাইয়ের সাথে ল্যাবএইডে পাঠিও। আমি থাকবো সেখানে। চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

বড় আপার সাথে ফোনে কথা বলবার সময়ই দেখি ফোনে ইনকামিং কল- রাশেদ মনসুর!… অনেকক্ষণ ধরে ফোনে কথা বলছি! খিচুড়ির উদ্দেশ্যে রওনাই তো হইনি; ভাবলাম- যে হারে বুড়ো মহিলা কাঁদতে শুরু করলেন, তার স্বাভাবিক হয়ে আসল কথা শুরু করতেই তো অনেকটা সময় লেগে যাবে; এই ফাঁকে জরুরি কথাগুলো…

‘হ্যাঁ, সজল- তুমি কোন্ পর্যন্ত?’

‘রাশেদ ভাই, মাত্র স্টার্ট করেছি। যেতে আসতে দশ দশ বিশ মিনিট লাগবে হাইয়েস্ট।’

‘বাদ দাও তাহলে। চলে আসো। আজ থাক…আমরা বাইরে খেয়ে নেব।’

‘সরি। রাশেদ ভাই। মাইন্ড করলেন? আমি দুটো জরুরি ফোন…’ আমি বলবার চেষ্টা করি…

‘দূর। মাইন্ড করবো কেন? খালার সাথে কথা হয়ে গেছে। তুমি আসো, দেরি করো না! কাজ আছে।’

আমি বাসার ভেতর ঢুকি আবার, মিসেস জামিলের সাথে রাশেদ ভাই আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন- ‘খালা, এর নাম সজল। ও আমার হয়ে আপনার সাথে সব যোগাযোগ রাখবে। ভালো ছেলে। আমরা একসাথে কাজ করি।’

হাত তুলে সালামের ভঙ্গি করে বলি, ‘জি, স্লামালিকুম।’

‘ওয়ালাইকুম সালাম, বাবা। আমাদের মস্ত বিপদ। আমরা বুড়ো মানুষ। একটু পাশে থাকতে হবে বাবা!’

‘নিশ্চয়ই। আমরা সাধ্যমতো সব করবো।’

গাড়িতে বসবার পর কয়েক মিনিট, বলা যায়- স্তব্ধ থাকেন রাশেদ মনসুর, সকাল থেকে দেখছি তাকে- এক মুহর্তের জন্য মনে হয়নি তার মুখে চিন্তার ছাপ পড়ে, এই প্রথম থমথমে মুখে তিনি চিন্তামগ্ন; তবে কয়েক মিনিট মাত্র- ইত্তেফাক বিল্ডিংয়ের উল্টোদিকের রাস্তা দিয়ে মতিঝিল বরাবর চলে আমাদের গাড়ি। রাশেদ মনসুর বলেন- ‘সেই ইত্তেফাক। এখানে একটা বাসস্টপ ছিল। শাহবাগ থেকে এখানে এসে নামতাম।’

‘ইত্তেফাক পত্রিকা কিন্তু আর এখানে নাই ভাই।’ উৎসাহের সাথে বলি।

‘জানি। দুই ভাইয়ের বিবাদে ইত্তেফাক এখন কারওয়ানবাজারে। এই বিল্ডিং বড়ভাই পেয়েছেন, ছোট ভাই পত্রিকা।’

‘দেশের খুঁটিনাটি সব খবর আপনি জানেন!’ আমার কণ্ঠে বিস্ময়!

‘তোমার র‌্যাডিসন থেকে মতিঝিল আসতে যতক্ষণ লাগলো…এটা বুঝি এক দেশ বলে মনে হয় তোমার!’ হাসেন রাশেদ মনসুরÑ ‘চাইলেই সব জানা যায়। তোমার দরকার আছে কিনা, সেটা হলো দেখবার বিষয়!’

‘আমরা কি ঘরোয়া তে থামবো? ওখানে খুব ভিড় হবে এখন!’ আমি বলি রাশেদ মনসুরকে।

‘নাহ্ …শাহবাগের দিকে যাও। সিলভানা নামের একটা রেস্টুরেন্ট ছিল আমাদের সময়, পাশাপাশি দুটো রেস্টুরেন্ট, সিলভানা আর মৌরি। সিলভানায় খেতে চাই।’

মতিঝিল থেকে প্রেসক্লাব, মৎস্য ভবন, শিশুপার্ক হয়ে আমাদের গাড়ি এগোতে থাকে, রাশেদ মনসুর কথা বলছেন না, তোর চোখে সেরকম আগ্রহের ঝিলিকও দেখি না, গাড়ি এগিয়ে চলে, রাশেদ ভাইর পাশে বসে ফেসবুক স্ক্রল করি;  মেসেঞ্জারে ঢুকে দেখি তৃষার মেসেজ-

‘খিচুড়ি খাইছো! কেমন?’

লিখলামÑ ‘ঘরোয়াতে যাওয়া হয় নাই। খিচুড়ি প্রজেক্ট বাতিল হইছে। এখন সিলভানায় যাচ্ছি।’

হাসির ইমো পাঠায় তৃষা- ‘সত্যি করে বলো তুমি আসলে কার সাথে আছো?… রোমান্টিক ব্যাপার মনে হচ্ছে!’

‘হুম। খুবই রোমান্টিক। প্রায় তিনটা বাজতে চললো। না খেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেছি!’

‘আহারে!’ এবার একটা কান্নার ইমো পাঠায় তৃষা।

পিজি হাসপাতালের নিচে সিলভানা রেস্তোরাঁর সামনে গাড়ি থামে। রাশেদ ভাইয়ের পিছুপিছু সিলভানায় ঢুকে দোতলায় চলে যাই, ভদ্রলোকের স্মৃতিশক্তি চমকে ওঠার মতো; কাউকে জিজ্ঞেস না করে তরতর করে দোতলায় পৌঁছে যান ও কোনার একটা টেবিলে বসে বলেন, ‘এই টেবিলটাতেই আমরা বসতাম।’ মৃদু হাসেন তিনি- ‘টেবিল বদলে গেলেও আর সব একই আছে। ’

‘আপনি নিজে আমার চেয়ে সবই ভালো চেনেন। আমি আর কি গাইড হবো আপনার?’

‘তোমাকে গাইড হিসেবে সাথে নিয়ে ঘুরছি না। কিছু কাজ করে দিতে হবে আমার। আমি আড়ালে থাকবো, তুমি সামনে থাকবে!’

রহস্যজনক ঘটনা মনে হচ্ছে! কি জানি- আমার চেহারা দেখে হাসেন রাশেদ মনসুরÑ ‘ভয় পেয়ে গেলে নাকি হে!’

‘জি না। ভয় পাবো কেন?’ আমিও হাসি, আসলেই ভয়ের কি আছে!

ধীর কণ্ঠে বলতে শুরু করেন রাশেদ মনসুর- ‘শোন, বহু বছর আগে হঠাৎ করে নিজের দেশ ছেড়ে চলে যাবার পেছনে আমার একটি কারণ আছে!’ এরই মধ্যে তিনি পাবদা মাছ, কাচকি মাছভর্তা, আলুভর্তা আর ডাল অর্ডার দিয়েছেন দু’জনের জন্য।

বলছেন রাশেদ মনসুর- ‘খুবই ব্যক্তিগত। আর ইমোশনাল।… আজ পর্যন্ত কারও সাথে এটা নিয়ে কথা বলবার প্রয়োজন হয়নি।’ বিব্রতভঙ্গিতে তিনি বলেন, ‘কারও সাথে এগুলো নিয়ে কথা বলতে হবে, আমার ধারণায় ছিল না।…।’

‘ঠিক আছে রাশেদ ভাই। যে কোনো বিষয়ে আপনি আমাকে বলতে পারেন। কোনো সমস্যা নাই।’ আশ্বস্ত করি রাশেদ মনসুরকে, দ্রুতই তিনি বিব্রতভাব ঝেরে বলেন, ‘মাফরুহা আমার অনেক পুরনো বন্ধু। সে কিছুটা জানে আমার অতীত। কিছুটা হয়তো ধারণা করে। তবে পুরোটা জানে না, কখনও বলিনি, বলবার প্রয়োজন বোধ করিনি। …তাকে যখন বলি, একটা শার্প ছেলে দাও, যে আমার হয়ে ডিল করতে পারবে!… সে তোমাকে পাঠিয়েছেÑ নিশ্চয়ই বুঝেই পাঠিয়েছে।’ বলতে বলতে সোজা আমার চোখের দিকে তাকান রাশেদ মনসুরÑ ‘আমার যখন তোমার মতন বয়স, ২৯/৩০Ñ আমারও চোখগুলো তোমার মতো এমন স্বচ্ছ ছিল, এমনই ঝকঝকে ছিল। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। করতে চাই।’

‘নিশ্চিন্তে করতে পারেন।’

‘থ্যাংক ইউ। এখন খাই চলো। পাবদা মাছ, আলু ভর্তা …দুনিয়ার সেরা খাবার!’ সুস্বাদের ঘ্রাণ নেন তিনি চোখ বন্ধ করে, বলেনÑ ‘বলছিলে তোমার দুলাভাইয়ের ক্যান্সার। আজ সন্ধ্যায় তাকে নিয়ে যাবে ডাক্তারের কাছে।’

‘ জি। একেক ডাক্তার একেক কথা বলে ঘাবড়িয়ে দিচ্ছে। আমার থাকা দরকার।’

‘অবশ্যই থাকবে। পরিবার পৃথিবীর আর সবকিছুর আগে…। আনফরচুনেটলি… জীবনে আমার কখনও পরিবার হলো না!’ ম্লান হাসেন রাশেদ মনসুরÑ ‘কিন্তু আমি বুঝি, পরিবার বিষয়টা কি! তুমি অবশ্যই যাবে। তোমার সাথে সুবিধামতো সময়ে আমি বসবো; তুমি নিজের মতো কাজ করো…। আমি ডাকলেই কেবল তুমি আসবে। গাইড হয়ে গাছ হয়ে বসে থাকবার কোনো দরকার নেই!’ নিজের প্রাণখোলা অনবদ্য হাসিটি অনেকক্ষণ পর হাসেন রাশেদ মনসুর।

 

০৫.

আমাদের আড়াই ঘরের বাসাটির দুই শব্দে পরিচিতি দিতে হলে, বলা যায়Ñ সামন্যে সন্তুষ্ট!

ছোটবেলা থেকে বাবাকে দেখেছি ঘড়ির কাঁটা ধরে আটটার মধ্যে বাসা থেকে আপিসের উদ্দেশে বেরিয়ে যেতে, ৯টা-৫টা আপিস করে তিনি মতিঝিল থেকে জিগাতলার বাসায় ফিরেছেন সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে। এরপর আয়েশ করে পত্রিকা পড়া আর টিভি দেখা তার দায়িত্বের অংশ বলেই তিনি মনে করেছেন সারাজীবন, বিটিভির সংবাদও যে কোনো ভদ্রলোক এত আস্থা ও মনোযোগের সঙ্গে দেখতে পারেন, বাবাকে না দেখলে আমি বিশ্বাস করতাম না। সমবায় অধিদপ্তরে কাজ করেছেন, সরকারি কলোনির এই বাসাতেই বিশ বছর কাটিয়ে দিলেন; তার সহকর্মীরা অনেকে যখন চাকরির পাশাপশি সমবায়ের  দোকান লিজ নেয়া বা অন্য আরও নানা পার্টটাইম ব্যবসা করবার চেষ্টা করেছেন, তিনি হাসিমুখে বিটিভির সংবাদ দেখে তৃপ্তির সাথে সপরিবারে রাতের আহার সেরেছেন। আর সেই আহার, যেমনই হোক- আনন্দ ও তৃপ্তি নিয়ে শেষ করে ‘অতি চমৎকার রান্না হয়েছে হাসনা’ বলতে বলতে আবার টিভির সামনে চলে যেতেন তিনি। হাসনা আমার মায়ের ডাকনাম, হাসনাহেনাÑ আদর করে সংক্ষেপ করে এখনও বাবা মায়ের ডাকনামটি ধরে ডাকেন, ভালো লাগে। কথায় কথায়, ‘হাসনা এইদিকে আসোতো’…! ‘হাসনা আমার পাঞ্জাবিটা’! মা’রও চাহিদা খুব কমÑ হাসিখুশি মানুষ তিনি; দাদা-দাদি, নানা-নানি বেঁচে থাকবার সময় আমরা বছরে দুই ঈদ পালাক্রমে যথাক্রমে ময়মনসিংহ আর দিনাজপুর যেতাম; তখন মাকে দেখতাম বাজার করবার ব্যাপারে বেশ সিরিয়াস, গত ১০ বছরে দাদার বাড়ি বা নানার বাড়ির পাট আমাদের চুকে গেছে, এখন ঈদেও কোথাও যাই না আমরা। এই যে কলোনির বাসাটি ছেড়ে দিতে হবে, বছরখানেক পরÑ তারপর কোথায় যাবো আমরা, এই নিয়েও বাবা-মা কাউকেই তেমন চিন্তিত দেখি না। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করলামÑ ‘কোথায় থাকবো আমরা, কিছু ভাবছো নাকি!’

‘ক্যান, তুই আছোস। কাজল আছে। তোরা বাসা ভাড়া করবি। আমরা থাকবো। ভাবাভাবির কি আছে?’ মা সোজা জানিয়ে দিলেন। একদিন দেখি আমাকে শুনিয়ে মা বলছেন বাবাকে, ‘পেনশনের টাকা দিয়া ফ্ল্যাট বুকিং দাও। গ্রামের জমি-টমি বেচো কিছু! তোমার ছেলেরা ভয় পায়, কলোনির বাসা চলে গেলে আমরা থাকবো কোথায়?’ বাবার নিস্পৃহ মুখ দেখে বুঝতে পারি, তিনি আদৌ এই নিয়ে চিন্তিত নন।

বাবা হাসান মাহমুদ সমবায় দপ্তরের সেকশন অফিসার হিসেবে পিআরএলে গেছেন মাত্র, এখনও চুলে- পোশাকে ছিমছাম, বাড়তি চাহিদা না থাকলেও পরিপাটি থাকেন সবসময়,  সুচিবায়ুর ঝোঁক আছে তার। বিশেষ করে টাকা-পয়সা ব্যবহারে তাকে সবসময় শুচিবায়ুগ্রস্ত মনে হয়। বাড়ি ফিরবার পর পকেটে যে পরিমাণ টাকাই থাকুক না কেন, দশ টাকা হোক আর এক হাজার টাকা- সেগুলোর প্রতিটি নোট তিনি পানি দিয়ে ধুয়ে ড্রইংরুমের সেন্টার টেবিলে বিছিয়ে দেন; তারপর নিজে কাপড়চোপড় ছেড়ে টিভি দেখতে বসে যান। টেবিলের উপর রাখা টাকার উপর সামান্য ওজন রাখেন আগে থেকে পরিষ্কার করে রাখা ছোট পাথর চাপা দিয়ে- এসব পাথরও তিনি সময় করে কুড়িয়ে এনে নিজ হাতে ঘটা করে  পরিষ্কার করেন।  ছোটবেলায় বাবার এইসব কাণ্ডে আমরা অভিভূত হয়ে যেতাম; কিন্তু মা দেখতাম রাগে গজগজ করছেন- ‘পাগল আর কাকে বলে!’ বছরের পর বছর যেতে যেতে বুঝি, পাগলামিও একসময় অভ্যাস হয়ে যায়। পিআরএলে যাওয়ার পর বাবা বাসা থেকে বের হন না, তাই আজকাল সন্ধ্যার সময় টাকা ধুয়ে ফ্যানের নিচে শুকানোর চলও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

আজ অনেকদিন পর বাবা ল্যাবএইড থেকে ফিরে নিজের মানিব্যাগে রাখা দুইটি ৫০০ টাকা আর কয়েকটি ১০০ টাকার নোট, কয়েকটি ২০ টাকা/১০ টাকার নোট সব ধুয়ে ড্রইংরুমের সেন্টার টেবিলে শুকোতে দিয়েছেন!

বাবা যখন আপন মনে টাকা ধোয়া ও শুকানোর কাজে মগ্ন- তার এই কাজ বিপুল আগ্রহের সাথে বড় বড় চোখ করে দ্যাখে বড় আপার ছেলে সূর্য আর মেয়ে রশ্মি- ১০ ও ৮ বছরের শিশু দুটির কাছে এটি এক নতুন অভিজ্ঞতা বটে। দেখি- সূর্য আর রবি নানাভাইয়ের সাথে মহাউৎসাহে টাকা ধোয়া ও শুকানো পর্বে অংশ নিচ্ছে।

আমার ঘরে মানে বড় আপা আসবার আগ পর্যন্ত যে ঘরে আমি থাকি, ঘুমোই- সেই ঘরে মা, বড় আপা গবেষণায় ব্যস্ত হয়েছেন। দুলাভাইকে একের পর এক প্রশ্নবাণে রীতিমতো ক্লান্ত করে তুলছেন তারা; আমি যতই বলি- আমিও সাথে ছিলাম, বাবাও মহাউৎসাহে দুলাভাইয়ের সাথে গিয়েছেন, আমরা সব বলছি! কে শোনে কার কথা, কাজলের যাবার কথা ছিল দুলাভাইকে নিয়ে, বাবা গিয়েছে বলে সে যায়নি, চলে গেছে জাহাঙ্গীরনগরে, ফোন করে খবর নিয়েছে কয়েকবার।

‘বুঝলি সজল, তোর দুলাভাইকে ইন্ডিয়া নিতে হবে! এখানকার ডাক্তার ওকে মেরে ফেলার বন্দোবস্ত করেতেছে!’ মা রায় ঘোষণার মতো আমাকে বললেন।

‘কথা বলছি তো ডাক্তারের সাথে। এখনও ফার্স্ট স্টেজ। অপারেশন করা যাবে এখানে। ইন্ডিয়া আমাদের চাইতে উন্নত নাকি! কি যে বলেন আম্মা!’ -দুলাভাই মাকে বড় আপাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, ‘ইন্ডিয়া যাওয়াও তো সোজা ব্যাপার না। কে যাবে আমার সাথে? ভিসা-পাসপোর্ট হেনতেন কত ব্যাপার। কি দরকার?’

‘কি দরকার! কি দরকার! সারাজীবন এই কথা বলেই তো ক্যান্সার বাধায় বসছো!’ বড় আপার রাগ বাড়তে থাকে।

‘কি মুশকিল! আমি কি ইচ্ছা করে ক্যান্সার বাধাইছি নাকি? কেউ কি শখ করে অসুস্থ হয়?’ দুলাভাইয়ের কাতর কণ্ঠ।

‘কথাবার্তা তো শোন না… ইন্ডিয়া কি আমেরিকা? এত ডরাও কেন! সজল যাবে, আমি যাবো। ফার্স্ট  কেমো দিয়া চলে আসবো, বাকিটা এখানে দেব…। সূর্যের ক্লাসমেটের মামা ইন্ডিয়া থেকে  কেমো দিয়ে সুস্থ আছে। এখানকার ডাক্তার বলছিল তিন মাস বাঁচবে। আড়াই বছর হলো, সেই লোক দিব্যি সুস্থ!’

‘একেকটা কেস একেক রকম পারুল। একটু খোঁজখবর করি। সজল আছে। ওর উপর একটু ভরসা রাখো তোমরা!’

‘না, বাবাÑ আমারও মতো ইন্ডিয়া। এখানকার ডাক্তাররা একেকজন একেক কথা বলতেছে। জীবন-মরণের ব্যাপার। কোনো রিস্ক নেয়া যাবে না। সূর্যরশ্মি এখনও এত ছোট!’-মা এবার কাঁদতে শুরু করেন।

বুঝতে পারি, ইমোশনাল এই পর্বে কথা বলা ঠিক হবে না;  বড় আপা আর মাকে ইমোশন কমিয়ে আনার সুযোগ দেবার জন্য ওই ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রইংরুমে বাবার কাছে এসে বসি, বাবা ততক্ষণে টাকা শুকিয়ে মানিব্যাগে ভরে রেখেছেন, সূর্য আর রশ্মি নিজ নিজ ট্যাবে ব্যস্ত, কোনোদিকে তাকানোর সময় তাদের নেই, বাবাকে বললাম, ‘আপনার কিরকম চাচাতো এক ভাই আছেন না পিজির বড় ডাক্তার। তাকে বলে পিজিতে একবার দুলাভাইকে দেখানোর ব্যবস্থা করেন।’

বাবা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পান, আমার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকানÑ ‘আজমের কথা এত দেরিতে মনে পড়লো? আশ্চর্য! চোখের আড়াল মানে আসলেই মনের আড়াল! আরে ওতো বিরাট প্রফেসর। ফোন করলে দেখবি ছুটে আসবে।…আমার টেলিফোন ডিরেক্টরিটা কোথায়? দাঁড়া এক্ষুনি ফোন দিচ্ছি!’

‘উনি ব্যস্ত প্রফেসর। রোগী দেখছেন চেম্বারে নিশ্চয়ই। সকালের দিকে ফোন করেন।’

বাবা কথা শোনেন না, তখনই ফোন করে ডাক্তার আজমের সাথে যোগাযোগ করেন ও হাসিমুখে নিজের নাম বলেন ও তারচেয়েও  দ্রুত তার মুখ পাংশুবর্ণ ধারণ করে, তিনি ফোন রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘ইয়ে… অনেকদিন পর ফোন করলামতো, তাই বুঝি চিনতে পারে নাই।’ আমি কথা বলি না, বাবা আবার বলেন, ‘এই সময় আসলে আমার ফোন করাই ঠিক হয় নাই। তুই ঠিক বলেছিলি… চেম্বারে থাকলে ডাক্তাররা নিজের বউ-বাচ্চাকেই চিনতে পারে না! দাঁড়া, সকালে ফোন করবো।’ বলতে বলতে মা-বড় আপা ও দুলাভাইয়ের সামনে গেলেন ও হাসিমুখে বলতে থাকেনÑ ‘বিপদের সময় কারও মাথা ঠিক থাকে না। সমানে ল্যাবএইড আর আনোয়ারে দৌড়াচ্ছি, ও হাসনা- তোমার আজমের কথা মনে আছে। আরে… আমার চাচাতো ভাই, পিজির বিরাট প্রফেসর। তাকে ফোন দিছি। আজকে ফোনে কথা বলতে পারে নাই। কাল কথা বলে সন্ধ্যায় মুর্তজাকে নিয়ে যাবো।’

মায়ের মুখে আশার ঝিলিক জেগে উঠেও নিভে যায়- ‘সে কলোন ক্যান্সারের ডাক্তার নাকি! এই চিকিৎসা সে কেমনে করবে!’

‘যে করতে পারবে, তার কাছে সে পাঠাবে! উল্টাপাল্টা চিকিৎসা হবে না। আসলে বুঝলা… আমাদের দেশ এখন মধ্যম আয়ের, কয়েক বছরের মধ্যে আমরা উন্নত বিশ্বের দেশ হচ্ছি। এর মধ্যে চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়ায় আমরা কেন যাবো!’

ইন্ডিয়ায় যেয়ে দুলাভাইয়ের চিকিৎসার বিরুদ্ধে বাবা নানাকথা বলতে শুরু করলেন। এটা যে তার স্বদেশপ্রীতি, এটা ভাববার কোনো কারণ নেই, তিনি আসলে ভীতু প্রকৃতির মানুষ! অচেনা শহরে কে যাবে দুলাভাইয়ের সাথে, থাকবে কোথায় ইত্যাদি নিশ্চিতভাবে তাকে চিন্তিত করে তোলে- আবার, এটাও ঠিক দুলাভাই যদি শক্ত সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি ইন্ডিয়া যাবেন চিকিৎসা করতেÑ বাবাও সুড়সুড় করে তাতে সায় দিলে এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে শুরু করবেন!

মাঝে মাঝে নিজেই চিন্তা করি, বাবা এমন করেন কেন? এমনকি রাজনৈতিক বিষয়েও তার নির্দিষ্ট কোনো পছন্দ বা মতামত নেই- সেই ছোটবেলা থেকে দেখে ও শুনে আসছি, যখন যে দল থাকে বাবা সেই দলের সমর্থক বনে যান আর বিটিভির খবরকে বেদবাক্য মনে করে তৃপ্তি সহকারে তা শুনতে থাকেন! আমার এখন মনে হয়, বাবা আসলে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চান না, এক ধরনের বানানো তৃপ্তির মধ্যে বাস করে সুখে আছেন বলে ধারণা করেন!

আমার উচ্চমাধ্যমিকে পড়বার সময়ের ঘটনা। সে সময় যা হয় আর কি; অনেক বড় হয়ে গেছি- মনে হয়, বাবা-মা তেমন কিছুই বোঝেন না বলে; আরও মনে হতে থাকে, আমার পক্ষে সবই সম্ভব- আর, নিজেকে খুবই প্রতিভাবান হিসেবে শনাক্ত করি, প্রতিভাবানেরা একাডেমিক পড়াশুনায় মনোযোগী হয় না, আমিও বিনাদ্বিধায় পড়াশুনায় অমনোযোগী হয়ে উঠি। সিটি কলেজ থেকে বাসায় চিঠি আসে বাবার কাছে, ছেলেকে তার আর রাখতে চান না। ক্লাস করে না, কলেজের নিয়মনীতির তোয়াক্কাও করে না।

অন্য বাবা হলে কী করতেন! রেগেটেগে অন্তত কৈফিয়ত তলব করতেন, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ছোটাছুটি করতেন, বাকাঝকাও নিশ্চিত কপালে যুক্ত হতো- আমার বেলায় হলো উল্টো, নিজের সুখী ও নিশ্চিন্ত পরিসর যেন পাল্টে না যায়, এরকম একটা মুখ করে বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সজল, তোর কি ভালো লাগে? পড়ালেখা আপাতত বন্ধ করে অন্যকিছু করবি?’

বাবার শা›তস্বরে ঘাবড়ে যাই, পড়ালেখা না করে কি করবো? এই প্রশ্নের জবাব কি দেব, বুঝতে না পেরে মাথা নিচু করে রাখি।

‘ইয়ে… সবাইকেই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে, কোন মানে আছে! পড়তেই হবে, কোন মানে নাই।  দোকান দিবি নাকি একটা? আমাদের সমবায়ে কম পয়সায় দোকান দেয়া যায়?’

বাবার কথা শুনে আমার আক্কেলগুড়ুম হয়, খুবই বুঝতে পারি, আমি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা না দিলে আদৌ তার কোনো সমস্যা নাই, তিনি আমাকে দোকানে বসিয়ে দেবেন; ভীত কণ্ঠে বলি- ‘না…না…কি বলেন! ইউনিভার্সিটিতে পড়বো না? এমএ পাস না করলে হবে?’

‘তাইলে কি করবি এখন? এরা তো তোরে রাখবে না।’

‘আমার আরও কয়েকজন বন্ধুরও এ রকম হইছে। তারা টিসি নিয়া তেঁজগাও কলেজে ভর্তি হবে, আমিও তাই করবো।’

‘তাই নাকি! তাইলে তো ভালোই, তেঁজগাও কলেজ নামকরা কলেজ। ওইটাই ভালো হবে।’ কথা শেষ করে বাবা আনন্দচিত্তে পত্রিকা পড়তে শুরু করলেন এবং আস্তে করে বললেন, ‘ব্যাপারটা তোর মা আর পারুলকে জানাস না। না বুঝে খামোখা হই চই করবে…।’

কোথায় আমি তাকে বলবো, মা যেন আমার এই ফাঁকিবাজির কথা না জানে, বড় আপা যেন না জানে; উল্টো বাবাই আমাকে সাবধান করে দিলেন!

বাবা একবার হারিয়ে যান।

তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। আর্থিক টানাটানি ঘোচাতে আচমকা বাবা ঠিক করলেন তিনি খণ্ডকালীন ব্যবসা করবেন, বাংলাবাজারে গাইড বই ছাপানোর কাজ শুরু করলেন আরও দুই সহকর্মী মিলে। সিন্ধান্ত নিলেন, খরচ কমানোর জন্য একেকজন একেক বিভাগীয় শহরে নিজেরাই গাইড বই নিয়ে শহরের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরিগুলোতে পৌঁছে দেবেন। বাবার ভাগে পড়লো খুলনা। তিনি গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে গাইড বইয়ের বোঁচকাসমেত চট্টগ্রামের বাসে উঠে পড়লে! পরবর্তী দুই দিনে তার আর কোনো খোঁজখবর নেই, তখনকার দিনে মোবাইল ফোন ছিল না, মা পাগলের মতো হয়ে গেলেন, তার সহকর্মীরা হতভম্ব; পরদিনই একজন খুলনায় রওনা হলেন ও দেখলেন সেখানকার লাইব্রেরতে হাসান মাহমুদ নামের কোন গাইড ব্যবসায়ী পৌঁছেন নাই!

আমাদের বাসায় তখন মর্সিয়া ক্রন্দন। মা আর বড় আপা কেঁদে অন্ধ হবার অবস্থা। আমি আর কাজলÑ দুই ভাই, মা-বোনের সাথে খানিক কেঁদে কেটে নিজেদের ফুটবল খেলায় মেতে উঠি। পারুল আপার কেন দেয়া সেই ডোরাকাটা বল। রাস্তায় খেলছিলাম, কি হলো আচমকা একটা রিকশাকে সাইড করতে গিয়ে ফুটবল আর পাই না; তখন জিগাতলা পোস্ট আপিসের সামনের রাস্তা এখনকার মতোই অপরিসর, খানাখন্দে ভরপুর, ফুটবল পাই নাতো পাই না। খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হলাম দুই ভাই, ফুটবল পাই নাÑ এদিকে বাসার অবস্থা করুণ, মা-বোন পাগলপ্রায়, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছেÑ আমরা দুই ভাই ফুটবল ছাড়াই যার পর নাই মন খারাপ করে বাসায় ফিরি।

সেদিন বাসায় রান্না হয় না, পাশের বাসার খালাম্মা ভাত-তরকারি নিয়ে এসে মা আর পারুল আপার সাথে আহাজারিতে যোগ দেনÑ অ্যাকসিডেন্ট যে হারে বাড়তেছে বইন! হাসপাতালগুলায় খোঁজ নিছেন? থানা-পুলিশ?

মা ফ্যাল ফ্যাল করে খালাম্মার দিকে তাকান।

পারুল আপা আমাকে আর সজলকে হ্যাঁচকা টানে সেখান থেকে সরিয়ে পাশের ঘরে নিয়ে হাতমুখ ধুয়ে আসতে বলেন। আমরা হাত-মুখ ধুয়ে আসি।

পারুল আপা বলেন, ‘তোরা ছোট মানুষ। আল্লা তোদের চাওয়া শুনবে! পশ্চিম দিকে ফিরে মোনাজাত করা দুইজনে বল, হে খোদা আমার বাবাকে ফিরিয়ে দাও। কিছুক্ষণ এভাবে বলতে থাক। মোনাজাত শেষ করে তারপর খেতে আয়।’

আমরা দুই ভাই মোনাজাত শুরু করি। হে খোদা আমার বাবাকে ফেরত দাও। হে খোদা আমার বাবাকে ফেরত দাও… বিড়বিড় করতে থাকি দুই জনে- কিছুক্ষণ পর দেখি কাজল আমার দিকে অবাক চোখে  তাকিয়ে আছে; খেয়াল করি, আমি কোন্ ফাঁকে বাবার কথা ভুলে আল্লার দরবারে আমার ফুটবল ফেরত চাওয়ার ফরিয়াদ করতে শুরু করেছিÑ ‘হে আল্লা, আমার ফুটবল ফেরত না পেলে আমি বাঁচবো না। ফেরত দাও আল্লা!’

০৬.

তৃষাকে কীভাবে গুছিয়ে আমার যুক্তিগুলো বলবো, তাই ভাবতে থাকি। হাসিও পায়- আজ তৃষার সাথে কি বলবো, তাই নিয়ে আমার ভাবতে হয়, অথচÑ অনর্গল, অর্থহীন কথা বলতে বলতে আমরা দিনের পর দিন আর রাতের পর রাত পার করেছি।

তৃষা আমাকে সাব্বিরের গল্প করে, তার সঙ্গে কুৎসিত ঝগড়ার কথা বলে, আয়মানের অসহায়ত্বের কথা বলে।

‘মাঝে মাঝে সাব্বির এমনভাবে কথা বলে যে, আয়মানের এই অসুস্থতার জন্য আমি দায়ী!  অসভ্য আর অশিক্ষিতের মতো চেঁচায়…!’

শুনি, তৃষার অভিজ্ঞতা- উচ্চশিক্ষিত সাব্বিরের গোয়ারের মতো আচরণ! কষ্টটা কি শুধু একা তৃষার!

আয়মানকে প্রথম দেখি আড়ংয়ে, সে সন্ধ্যায় গুলশান আড়ংয়ে আমাকে যেতে বলে তৃষা; আমি যাই, দেখিÑ ভেতরের গ্রাসরুট রেস্টুরেন্টে আমার অপেক্ষায় আছে তৃষা, সঙ্গে দেবশিশুর মতো মিষ্টি একটা শিশু- আয়মান, ৮ বছরের ছেলেটাÑ আমাকে দেখে মাথা নাড়লো, তারপর মা’র চুল হাতে ধরে নাকের কাছে নিয়ে শুকতে লাগলো!

ওর ভাষাহীন চোখ আর কথা বলবার ব্যর্থ চেষ্টায় ‘আ আ..’ শব্দে স্তম্ভিত হয়ে যাইÑ তৃষার শিশু অটিস্টিক, মাকে ঘিরেই তার পুরো জগৎ; বুঝতে পারি।

‘দুটো মেয়েকে ট্রেনিং দিয়ে বাসায় রেখেছি। আয়মান বড় হয়ে যাচ্ছে। এখন আর হোমমেইডদের মানতে চায় না। আমাকে চাই তার অথবা তার বাবাকে।’

আয়মানের সাথে ভাব করবার চেষ্টা করি, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর চিকেন ফ্রাই কিনে আনি; সে খুশি হয়ে খেতে শুরু করে; তবে আমার দিকে তাকায় না; তৃষা বলে, ‘সময় লাগবে। সবাইকে সে শত্রু ভাবে। ভাব হতে ওর অনেক সময় লাগে!’

‘চাকরিটাও করতে ভালো লাগছে না!’ আয়মানকে খাওয়াতে খাওয়াতে তৃষা আমাকে বলে।

‘কেন? চাকরির আবার কি হলো?’

‘ক্রিয়েটিভ কিছু কাজ করতে চাই। ফিল্ম মেকিংকে তো আর প্রফেশন করতে পারলাম না। এনজিওতে এলাম… ফিল্ম অরিয়েন্টেড কাজ করবো…। মাঝে মাঝে নিজের কিছু শর্টফিল্ম। কিন্তু যা করতে হচ্ছে… ক্রিয়েটিভিটির সি-ও নাই এতে! কেরানির হদ্দ হচ্ছি!’

‘এর মধ্যেই গুছিয়ে নাও। টাকা-পয়সা জমিয়ে টুপ করে নিজের ফিল্ম করে ফেলবে!’

‘আর পারবো? ওই থাপ্পড়-ই শেষ মনে হচ্ছে!’

‘কেন শেষ হবে? এত সুন্দর ফিল্ম করলে… সাহস রাখো। …তোমার ভেতরটা এত সুন্দর যে তুমি পারবেই। আমি জানি।’ কীভাবে যেন আপনমনে কথাগুলো বলি, তৃষা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, হাতে মৃদু চাপ দিয়ে বলে, ‘তুমি আমাকে কোনোদিন ছেড়ে যাবে নাতো!’

মনের একেবারে ভেতর থেকে ভাবিÑ তৃষার মতো  একটা মানুষের জন্য আমি যে কোনো কিছু করতে পারি!

আমরা সারা শহর ঘুরতে শুরু করি। এই তো তিন মাসও হয়নি, তখন বিকেল- ধানমন্ডির ২৭-এ আমার আপিসে আসে তৃষা, আমি তাকে বলি, ‘আজ রিকশায় ঘুরি চলো…!’

রিকশায় ওঠা নিয়ে তৃষার অনেক আপত্তি! রিকশায় উঠতে হবে কেন? আমার গাড়িতো সঙ্গে আছে!

‘রিকশা আর গাড়ি এক হলো!  আমরা রিকশায় যাবো!’

‘উফফ’- বিরক্তিতে ভ্রু-কুঁচকায় তৃষা; ড্রাইভারকে ফোনে আবাহনী মাঠের সামনে আসার নির্দেশ দিয়ে বলে, ‘তোমার এইসব ছেলেমানুষী একদম ভালো লাগে না!’

‘মোটেই ছেলেমানুষী না। আজকে কতদিন পর তোমার সাথে দেখা হলো।’

‘হুম…বসে বসে দিন গুনি আরকি!’

‘আমিতো দিনই গুনি।’

‘খুব ভালো করো।… একটা কাজে আসছি, বিনা কারণে আসি নাই।’

‘বলে ফেলো।’

‘রিকশায় বসে এই কথা বলা যাবে না!’

‘এই জন্যই ধাবায় যাচ্ছি। কাজের কথা ধাবায় বসে বলবো…।’ ডানে বসা তৃষার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকাইÑ কী সুন্দর সাদা শাড়ি পরে আছে, বাতাসে চুল ওড়ে, আঁচল ওড়ে!

‘হা করে তাকায় থেকো না। পরিচিত লোকজনে রাস্তাঘাট ভরা।’

‘কি শাড়ি পড়ছো এটা? এত সুন্দর!

হাসে তৃষা, হাসলে কি যে সুন্দর লাগে ওকেÑ ‘আজকাল শাড়িও চিনতে হবে আপনাকে! এটা হলো খোলের শাড়ি! সাদা খোল!’- তৃষা বলে।

‘খোল ব্যাপারটা কী? ঢোলের ছোট ভাই খোল!’

তৃষা আমার নাক বরাবর জোরে এক ঘুষি মারে, বেশ জোর ওর হাতে, সত্যি ব্যথা লাগে, নাক চেপে বসে থাকি মুখ নিচু করে; তৃষা হাসতে থাকে, হাসতে হাসতে রীতিমতো চোখে পানি টানি এনে একাকার…

‘আমি কিন্তু সত্যি খুব ব্যথা পাইছি…’

‘তা আদর করবার জন্য ঘুষি দিছি নাকি!’

‘খোল ব্যাপারটা জানি না। তাই জিজ্ঞেস করলাম! আর…উফফ..!

‘মশাই, খোল হলো জমিন। ধরো, বললামÑ সাদা খোলের লাল পাড় শাড়ি। মানে সাদা জমিন, পাড়টা লাল। তাঁতের শাড়ির জমিনকেই সাধারণত খোল বলে।’

‘খুব ভালো!’ রাগ রাগ গলায় বলি। তৃষা আমার ডান কানটা মলে দেয়। ‘উফফ্, এতো ডাইনিরে…! কান নাই করে দিলা…!’- কাতরস্বরে বলি।

ফুরফুরে বাতাস বয়ে যায়, টাটকা বাতাস, পৃথিবীর মানুষ কত সুখে আছে! আমরা ‘ধাবা’ নামের রেস্তরাঁয় বসি, আবাহনী মাঠের কাছাকাছি।

‘যখন তখন আমাকে মেসেজ দিও নাতো মেসেঞ্জারে। বিশেষ করে রাতের বেলা…!’

‘কেন? সাব্বির চলে আসছে নাকি বাসায়? তুমি না বললা… সে আলাদা বাসা নিছে বনানীতে।’

‘বোনের বাড়িতে গেছিল রাগ করে। ঝগড়া করলেই মিরপুরে ভাইয়ের বাড়ি বা বনানীতে বোনের বাড়ি চলে যায়। হঠাৎ কাল রাতে ফিরে আসছে। হাসিমুখে। যেন কিছুই হয় নাই। আর তখন তোমার টুং টুং  মেসেজ!

‘স্যরি। জানতাম নাতো!’

‘এখন তো জানলে! ’

‘তোমাদের ঝগড়া মিটে গেছে তাইলে!’

‘দেখি। ক’দিন তিনি স্বাভাবিক থাকেন! আবার ভাংচুর শুরু করেন কখন!’

‘ভাংচুর? ব্যাপারটা কি?’

‘আয়মানকে সবকিছু করিয়ে দিতে হয়। সে তার বাথরুমের কথাও বলতে পারে না। এগুলো বাবা-মা’র পক্ষে মেনে নেয়া আসলেই কঠিন! সাব্বির মাঝে মাঝে মাথা গরম করে ফেলে! আমার ওপর দোষ চাপিয়ে জিনিসপত্র ভাংচুর করে… আমাকেও মারধর করে!’

‘তোমাকে মারধর করে? বল কি! … তুমি মানো কেনো?’

‘মানি নাতো! উল্টা আমিও মারি। বুঝতেই পারো, রণক্ষেত্র আর কাকে বলে!’ কষ্টের একটা হাসি ফোটে তৃষার মুখেÑ ‘এটা কোন জীবন! … আমিতো হাসতেই ভুলে গেছিলাম প্রায়! নিজের ফিল্ম আর চাকরি নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলাম। আয়মানের জন্য দুটো কাজের লোক ঠিক করেছি… এর মধ্যে তোমার সাথে দেখা হলো আমার…!’

‘আমাদের দেখা অনেক আগেই হইছে। দশ বছর আগে। তখন তোমার বিয়েও হয় নাই!’-আমি বলি।

‘ওটাকে কি আর দেখা হওয়া বলে?’ চোখে একধরনের হাসি ফুটিয়ে তৃষা বলে, ‘তোমার বয়সতো কম হলো ন…বিয়ে করো না কেন?’

‘৩০ বছর বয়স বেশি নাকি! কি জানি!…  পছন্দ করতে পারলাম না কাউরে!’

‘কাউকে পছন্দ হলো না? তোমার কোনো প্রেম নাই এখনও? এটাও বিশ্বাস করতে হবে আমাকে।’

‘আগে ছিল না। এখন আছে। আর তুমি সেটা জানো।’ আমি আস্তে আস্তে বলি।

তৃষা মাথা নিচু করে থাকে।

‘তুমি জানো না?’ আমি বলি।

‘না’। তৃষা বলে।

‘তুমি অবশ্যই জানো…!’

‘কেন নিজের মুখে বললে কি গুনাহ হবে!’ তৃষার গলায় রাগ।

‘বলবো।’ আমি বলি।

‘কবে?’ তৃষা বলে।

‘আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে।’

‘যাবো।’ তৃষা আস্তে আস্তে বলে,‘ তুমি যেখানে বলবে, আমি যাবো সেখানে…।’

 

০৭.

রাশেদ মনসুরের সাথে বসে আছি ধানমন্ডি সাতমসজিদ রোডে আকাশছোঁয়া এক রেস্তোরাঁয়। রাশেদ ভাই এসেছিলেন মাইক্রো মিলিয়নসের আপিসে, মাফরুহা ম্যাডামের সাথে দেখা করলেন; সেখানেই লাঞ্চ করবার কথা- রাশেদ ভাই ম্যাডামকে বললেন, ‘সজলকে নিয়ে আমি একটু বাইরে বসবো। আশা করি, তুমি কিছু মনে করবে না! তোমার সাথে আমি এক সন্ধ্যায় ফুল কোর্স ডিনার করবো।’

‘একটা শর্ত আছে।’ মাফরুহা ম্যাডাম বললেন।

‘বলো।’

‘সেদিন আমিই ট্রিট দেব তোমাকে, এখানে এসে তুমি খাওয়াবা সেটি হচ্ছে না।’

‘এগ্রিড।’ বলে রাশেদ মনসুর আমাকে নিয়ে ২৭ নম্বরের কাছেই সাতমসজিদ রোডের এই বিশাল বিল্ডিংয়ের রুফটপে নিয়ে আসেন। ‘ব্লু মুন’ নামের রেস্তোরাঁ- রাশেদ ভাই হাসিমুখে  বললেন, ‘দিনের বেলায় এরা চাঁদ দেখার ব্যবস্থা করেছে। গুড!’ নানাপদ অর্ডার করেন তিনি। রাশেদ ভাই খাদ্যরসিক বটে!

তিনি খেতে খেতে কথা শুরু করেনÑ ‘কয়েকটি কাজ করতে হবে। আমার হাতে সময় কম।’  মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকি- ‘সজল। মিতা আমার একসময়ের ওয়াইফ। আমেরিকায় যাবার আগে আমাদের ডিভোর্স হয়।… সেদিন যার বাসায় তোমাকে নিয়ে যাই, জামিল স্যার আর তার ওয়াইফ… তাদের মেয়ে।…’

‘আচ্ছা।’

‘তো মিতা বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে। ও পরে যাকে বিয়ে করে তার নাম হামিদুজ্জামান। সরকারের সচিব পর্যায়ে কাজ করে মাত্র রিটায়ারমেন্টে গেছে।’ রশিদ মনুসরের মুখে হামিদুজ্জামানের নাম শুনে চমকে উঠি, গেল ক’দিন পত্রিকায় নামটি পড়েছি বলে মনে হয়, আমার উৎসুক চোখ দেখে জিজ্ঞাসাটি বোঝেন রাশেদ ভাই, বলেন, ‘ঠিকই ধরেছো। এই হামিদুজ্জামান খুনের ঘটনায় অ্যারেস্ট হয়েছে। কেলেঙ্কারি…। সে নাকি নিকেতনে এক মহিলাকে বাড়ি ভাড়া করে দিয়েছিল, সেখানে হাজব্যান্ডসহ মহিলা থাকতো। এক সন্ধ্যায় সেই হাজব্যান্ড নিহত হয়। তখন হামিদুজ্জামান নিকেতনের সেই বাড়িতে ছিল! সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে।…’

এ’ধরনের বিবরণের সামনে কথা খুঁজে পাওয়া কঠিন- চুপ করেই থাকি, প্রাক্তন স্ত্রীর বর্তমান স্বামী খুনের দায়ে পুলিশের হাতে! সেই খুনের পেছনে আছে আবার কেলেঙ্কারি! খুনির স্ত্রীর প্রথম স্বামী আমার সামনে বসা! …বাংলা সিনেমা এর সামনে চূড়ান্তভাবে ফেল!

‘মিতাও সরকারি চাকরিতে আছে।…দুই ছেলেমেয়ে। মেয়েটা বড়, নিউইয়র্কে পড়াশুনা করে; ঘটনা প্রকাশ হবার পর বুঝতেই পারো ওদেশে একা এইটুকু মেয়ের কি অবস্থা! মিতা আমাকে ফোন করেÑ আমি মিতার মেয়ে অর্পাকে সাথে করে ঢাকায় এসেছি।’

স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থাকি, এ তো নাটকীয় ঘটনা- জীবন আসলে কখনও কখনও বানানো নাটককেও হার মানায়।

‘আমাকে কী করতে হবে?’ স্পষ্টস্বরে রাশেদ মনসুরকে জিজ্ঞেস করি।

‘আমি মিতাকে হেল্প করতে চাই। তার পরিবারে বুড়ো বাবা-মা ছাড়া কেউ নাই। হামিদ সাহেবের এই পরিস্থিতি, তার দিকের লোকজনও তেমন একটা আছে বলে মনে হয় না।…’

‘কী করতে চাইছেন আপনি?’

‘যেটাকে বলে… লাইনঘাট বের করে হামিদ সাহেবকে ছাড়িয়ে আনা। আমি চিনি ভদ্রলোককে, আমাদের বেশ সিনিয়রÑ আমি ওভার শিওর, সে খুন করবার মতো লোক না। হয়তো অ্যাফেয়ারে জড়িয়ে গেছিল, এটা হতেই পারে; কিন্তু খুন সে করে নাই।’

‘পুলিশ ভেরিফিকেশন হচ্ছে… বের হয়ে আসবে।’

‘অত ওয়েট করা যাবে না। আমি এত বছর পর এখানে আসছি… তারপরও আমার বন্ধুবান্ধবদের অনেকেই বেশ উচু পর্যায়ে আছে। অলরেডি যোগাযোগ করেছি। ভালো রেসপন্স পাচ্ছি।…’

‘বাহ। তাইলে তো ভালো।’

‘সমস্যা হচ্ছে… আমরা সবাই একসময়ের ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র। একে অপরকে ভালো করেই চিনি। মিতার জন্য আমি প্রকাশ্যে দৌড়াতে পারি না। আরেকটা ব্যাপারও আছে!’

‘কী ব্যাপার!’ আমি জিজ্ঞেস করি।

‘এদেশেই শুধু না, আমেরিকাতেও যখন কাজ করতে গেছি, ক্যাশ ছাড়া অনেক সময় কাজ হয় না। সাপোর্ট মানি… কিছু জায়গায় আমি তোমার হাতে ক্যাশ পাঠাতে চাই। তারা আমার কাছ থেকে টাকা নেবেও নাÑ এত ঘনিষ্ঠতা ছিল… কী করে টাকা নেয়! আবার টাকা ছাড়া জটিল কাজ হবে না!’

…বুঝলাম, আমাকে এক ধরনের দালালি করতে হবে; আমাকে নিঃশব্দ দেখে রাশেদ মনসুর খনিকক্ষণ  ভেবে আবার বলেন, ‘তুমি ভাবতে পারো, কথা নাই বার্তা নাই আমি টাকার জোরে এক খুনির পক্ষে তোমাকে দালালি করতে নামাচ্ছি!’

‘না, না, আমি তা ভাবছি না।’

‘তোমার ভাবাই উচিত! মাফরুহা তোমাকে গাইড হিসেবে পাঠিয়েছে আমার কাছে, সেখানে আমি তোমাকে আমার পারসোনাল একটা কাজে…’

‘আপনি এভাবে কেন ভাবছেন রাশেদ ভাই! আমি ঠিক আছি। অবশ্যই করবো  আপনার কাজ।’

‘কেন আমার এই কাজ তুমি করবে?’

‘কারণ, আপনাকে দেখে, আপনার সাথে মিশে আমার মনে হয়েছে আপনি কোনো অন্যায় করতে পারেন না।…যার সাথে আপনার ডিভোর্সড হয়ে গেছে, তার স্বামীর এই ধরনের কাজে আর কিছু না হোক, সে তো একটা মেয়েকে রীতিমতো বাসা ভাড়া করে পালছিল… সেরকম একটা লোকের জন্য ফাইট করবেন… আপনার হৃদয়টা আমি বুঝবো না!’ বলতে বলতে খানিকটা ইমোশনাল হয়ে যাই, আসলেই বাঙালি একটা বাজে ইমোশনাল জাতি! দূর, খালি চোখে পানি আসে।

‘ইটস অলরাইট…। কাজটা অবশ্যই তুমি করবে। বিনা শর্তে, ভালোবাসায়। আচ্ছা?’

‘আচ্ছা।’ আমি জলটলমল চোখে রাশেদ মনসুরের দিকে তাকিয়ে বলি, রাশেদ ভাই, ‘আপনার মতো মানুষের সাথেও ডিভোর্স হওয়া সম্ভব? কেন আপনাদের ছাড়াছাড়ি হলো?’

সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকান রাশেদ মনসুর, তাকিয়েই থাকেন, আমি থতমত খেয়ে যাই; বেশি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেললাম! ‘স্যরি, রাশেদ ভাই। প্রশ্নটা আমার করা ঠিক হয় নাই। টু পারসোনাল। স্যরি।’

রাশেদ মনসুর পনেরো তলা রুফ টপে বসে ধানমণ্ডি লেকের দিকে তাকিয়ে থাকেন আর বিড়বিড় করে বলেন, ‘বুঝলে তখন এই রোডে এতো বড় বড় দালান ছিল না। তারপরও দু’চারটি ছিল। জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডের পরপরই উচু দালানে ছিল স্প্রিং অনিয়ন নামের রেস্টুরেন্ট। মিতাকে নিয়ে কত বিকেল সেখানে বসে থেকেছি। স্প্রিং রোল খেতে খুব পছন্দ করতাম আর স্প্রাইট। ছেলেমানুষির চূড়ান্ত। দুইটা টিউশনি করতাম- বাবাতো ছিলেন না আমার, ভাইবোনরাও আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়, কে কার খবর রাখে, চাইলে যে দিত না- তা না; আমারই কেমন লাগতো যেন, আমি ধুমিয়ে ছাত্র পড়াতাম। আর মিতার সাথে চুটিয়ে প্রেম করতাম! হাহাহা!…’ প্রাণখুলে হাসেন রাশেদ মনসুর।

‘একটু একটু করে টাকা জমিয়ে বিয়ে করি। কষ্ট করে জমানো টাকা। আজও মনে আছে, চার বছর প্রেম করি আর এই সময় আমি ৪২ হাজার টাকা জমিয়ে ফেলি বিয়ে করার জন্য। নাইনটি ফোরে কম টাকা না কিন্তু!’…

বলতেই থাকেন রাশেদ মনসুর- ‘৯৪তে বিয়ে করি। আর ৯৮ এ ডিভোর্স হয় আমাদের, ওই বছরই আমেরিকা চলে যাই। …আমার একসাথে পড়তাম। ও ভালো ছাত্রী ছিল।’ কথা বলতে বলতে উঠে রেস্তোরাঁ লাগোয়া বারান্দায় যান রাশেদ মনুসর, আমিও তার পিছু পিছু- বেশ বারান্দাটা- সুপরিসর, উন্মুক্ত- এত উঁচুতে খোলা বারান্দা, মনে হয়- পাহাড়ের উপর ভেসে আছি! রাশেদ ভাই সিগারেট ধরিয়ে আমাকেও একটা সিগারেট জ্বালিয়ে দেন, বলেন- ‘তুমি আমার ভাই। কোনো প্রশ্ন না করে কয়েকটা প্লেসে প্যাকেট পৌঁছে দেবে। যাকে যাকে বলবো, ঠিক তার হাতে। তারপর আমাকে ফোনে ধরিয়ে দেবে!’

‘অবশ্যই।’

‘প্রত্যেককে বলবে, তুমি রাশেদ মনসুরের ছোট ভাই। বহুদিন পর বড় ভাই দেশে আসছেন, আপনার জন্য এই ছোট গিফট প্যাকেটটা পাঠিয়েছেন। ব্যস…আর কিছু না।’

‘ঠিক আছে রাশেদ ভাই। বুঝতে পারছি।’

‘আমি লিস্ট কম্পোজ করে, অ্যাড্রেস ও ফোন নাম্বারসহ সব ডাটাবেজ করে রেখেছি। মোট ২০ জন। সময় মাত্র ২ দিন। তুমি একটা গাড়ি ২ দিনের জন্য ফুলটাইম ভাড়া করবে… তোমার যাতায়াত খরচসহ সব কিছু ফাইল করা আছে। গাড়িতেই আছে। নিচে মেনে বুঝিয়ে দিচ্ছি!’

পনেরো তলা বারান্দা থেকে আমরা নিচে নামি, রাশেদ ভাই আমাকে গাড়িতে উঠিয়ে বলেন, ‘চলো …একটু স্প্রিং অনিয়ন রেস্টুরেন্টটা দেখে আসি। এইতো সামনেই হবে!… দুই মিনিট রাস্তা।’

বলতে থাকেন রাশেদ মনসুর, ‘শঙ্কর থেকে জিগাতলা বাস স্ট্যান্ডের দিকে গেলে…একটু আগে কড়াই গোশত রেস্তোরাঁর আগের বিল্ডিংটাই… দোতলায় কসমো লাউঞ্জ ছিল, উপরে ১২-১৩ তলায় ছিল ওই রেস্তোরাটা…’ ড্রাইভারকে বলেন, ‘সোজা গিয়ে রাইফেলস স্কয়ার দিয়ে ঘুরে ইউটার্ন নিতে হবে মনে হয়। রাস্তার আইলে কাটা নাই।…’

গাড়ি এসে থামে কড়াই গোশতের সামনে। নাহ, তার পাশের বিল্ডিংয়ে ওই রেস্তোরাঁটি নাই। বিমর্ষ চোখে তাকিয়ে বলেন রাশেদ মনসুরÑ ‘প্রিয় একটা বসবার জায়গা বা একসময়ে থাকবার জায়গা আর নাই দেখলে কেমন খাঁ খাঁ করে সব… আচ্ছা ভালো কথা! এদিকেই তো তোমাদের বাসা সজল! চলো, তোমার বাসায় যাবো। কে যেন খুব অসুন্থ তোমার? দুলাভাই, চলো তাকে দেখে আসি একটু।’

ঘন বিকাল এখন; বাসায় সবাই কি ঘুমে? কি যে করি! বাসার যে এলোমেলো অবস্থা, অবশ্য এখান থেকে গাড়ির দূরত্বও নয়, হাঁটাপথেই যাওয়া সম্ভব; রাশেদ ভাইকে বলি- ‘গাড়ি থাকুক এখানে। এখান থেকে হাঁটা দূরত্বে ৫ মিনিটও না। জিগাতলা রোড দিয়ে ঢুকলেই হাতের বায়ের সরকারি কলোনি!’

‘আরে চিনিতো সেই কলোনি। আমাদের এক ক্লাসমেটের বাসা ছিল এখানে- শীলু। সে এখন দিনাজপুর কলেজের প্রফেসর। খানিকটা যোগাযোগ এখনও আছে।’ কথা বলতে বলতে আমরা হাঁটতে শুরু করি, আমার ভালো লাগে; সত্যিই রাশেদ মনসুর দারুণ স্নিগ্ধ এক মানুষ।

 

০৮.

নীতি-নৈতিকতার স্বাভাবিক যে ধারণা, বেশিরভাগ সময়ই আমি নিজেকে তার সাথে মেলাতে পারি না। এটা আমার স্বভাবের অন্তর্গত নাকি? তাও বুঝি না- সেই জাহাঙ্গীরনগর থেকে বারবার ভাবি, আমি এ রকম কেন? সবকিছুর সাথে থেকেও আবার কোনোকিছুর সাথে যেন নেই। রাব্বির সাথে সাভারের গেন্ডায় দীপালির ঘটনার পর বড় ধরনের বিবমিষায় পড়ি, আবার একটা সময় সেটি ফিকে হয়ে আসে; রাব্বির সাথে মাঝেমধ্যেই আমার দেখা হয়Ñ ইএনডিপিতে মস্ত কাজ করছে, হাহা করে হাসে, পাস করেই  নীলাকে বিয়ে করে রাব্বি।…দাপটের সাথে  তারা এখন সংসার করছে! বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নীলার সাথে প্রেম করা নিয়ে রাব্বির কত কা-!

কয়েক মাস হলো মাইক্রো মিলিয়নসের একটা কাজে কনসালট্যান্ট হিসেবে রাব্বি আমাদের সাথে পার্টটাইম কাজ করেÑ এখন তার কেতাদুরস্ত অবস্থা দেখে বুঝবার উপায়ই নেই- কতটা বিশৃঙ্খল জীবন সে ইউনিভার্সিটিতে যাপন করেছে!

রাব্বি আর আমি ইউনিভার্সিটি ফ্রেন্ড- এটা জেনে মাফরুহা ম্যাডাম আমাকে দায়িত্ব দিলেন রাব্বিকে কোঅর্ডিনেট করবার জন্য।

ব্যস, আমাদের বন্ধুত্বের সেকেন্ড ইনিংস শুরু হয়।

ধানমণ্ডি ২৭-এ মাইক্রোমিলিয়নসের আপিসে সন্ধ্যার আগেই কাজ শেষ করে রাব্বি, তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করি- কাজ শেষে নিজের নীল নিশানে উঠবার আগে একদিন বলে- ‘চল্, একটু গলা ভিজিয়ে নিই।’

‘টায়ার্ড লাগছেরে। বাসায় যাবো।’

‘তোর বাসায় আছেটা কে? অডবল কোথাকার! চল, ঢাকা ক্লাবে পার্টি আছে। তোতে আমাতে কথা কই!’

‘বাসায় যা হারামজাদা। নীলাকে বাচ্চাদের সময় দে!’

‘উরে… আসছে দাদাজান! আমি সব সামলিয়েই যা করার তাই করি। তোর মতো পুতু পুতু করে জীবন কাটাই না!… চল্!’

রাব্বি ঢাকা ক্লাবের সদস্য। সদস্যরা অতিথিকে সাথে নিয়ে নিচ তলায় পানাহার করতে পারে…

‘ইশ্রে… এই বেকুবরে নিয়া কি করি!’ রাব্বি খেদের সাথে বলে।

‘আবার কী করলাম?’

‘হারামজাদা পড়ে আছিস গোল গলার টিশার্ট! স্যান্ডেলের পেছনে ফিতা আছে?’

মৃদু কণ্ঠে বলি, ‘বাদ দে। দোস্ত। যে জায়গায় পোশাকের এতো বায়নাক্কা থাকে, সেটাতে আমি যাই না!’

রাব্বি সাথে সাথে তেড়ে ওঠে- ‘এই জন্যই তো একবিন্দু উন্নতি হয় নাই তোমার? ঢাকা ক্লাবে যাবা না, লোকজন চিনবা না… জাতে উঠবা কেমনে?’

‘আমার জাতে ওঠার দরকার নাই। ঠিক আছি।’

‘বুদ্ধি আছে। …চল্, ব্যবস্থা করছি। আসছি যখন, না খেয়ে যাওয়ার লোক নাকি আমি?’

রাব্বির প্রবল উৎসাহের পাশে আমার আপত্তি ধোপে টেকে না। সে ঢাকা ক্লাবের বার গেটে গিয়ে বলে, একটা সাড়ে ষোলো শার্ট দেন! কি কালার নিবি রে!’

মানে কি? এরা এখানে শার্টও রেখে দেয় নাকি? কেমন অপমানবোধ হতে থাকে, গরু গরু লাগে নিজেকে!

‘নে, শার্টটা পরে ফেল। ইনও করতে হবে, বুঝলি!’ রাব্বি বলে আর আমাকে ইঙ্গিত করে দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে শার্টটা পরে নেয়ার জন্য। নিজেকে জোকার মনে হলেও কিছু করবার নাই, মনে করে আমি দরজার পাশে যাই- টিশার্টের উপরে চকলেট রঙের শার্ট পরি ও প্যান্টের ভেতরে গুজি, রাব্বি তীক্ষè দৃষ্টিতে দেখে বলেÑ ‘এইবার ঠিকাছে। সাবাস্ দোস্ত…।’

আমরা নিচতলার বারের কোনার টেবিলে বসি। রাব্বী ব্ল্যাক লেভেল হুইস্কি অর্ডার করে। আমাকে নিস্তেজ দেখে সে আবার আনন্দিত স্বরে বলে, ‘তুই আমার দেখা একটা মিস্টেরিয়াস ক্যারেকটার। এভাবে একটা জীবন কাটায় বুঝি কেউ?’

এবার আমাকে হাসতেই হয়- ‘আমার কথা বাদ দে। তুইতো ফাটাফাটি জীবন কাটাচ্ছিস! সে কথা বল্, শুনি…’

‘হুম। তা কাটাচ্ছি, বলতেই হয়। ফ্যামিলি লাইফে আমি হ্যাপি। খুবই হ্যাপি। নীলা একটা মহামানবী। আমাকে একশ’ ভাগ ভালোবাসে। বাচ্চারাও দারুণ। সবদিকে সাইন করছে!’

‘তুই? তুই একশো ভাগ ভালোবাসিস নীলাকে?’

চুপ করে ভাবে রাব্বি, একটু পর বলতে শুরু করে, ‘আমার ব্যাপারটা একটু গোলমেলে। অবশ্যই নীলাকে ভালোবাসি। তবে দিনের পর দিন একজনের সাথে থাকা একটু বোরিং!’ বলতে বলতে মাতাল গলায় হাসে সে, কয় পেগ খেলো? তিন পেগ? এতেই এ রকম হাসি কেন?

‘বোরড্ হলে কি করিস? এখনও গেণ্ডায় যাস নাকি!’ আমি বলি।

আচমকা এই কথার সূত্র বুঝতে পারে না রাব্বি- একটু পরই তার মনে পড়ে যায়- ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ- গেণ্ডা! সাভার বাজারের কাছের গেণ্ডা! তুই এখনও সেসবেই পড়ে আছিস! শালা মধ্যযুগীয়! …পৃথিবী কোথায় চলে গেছে… তুই ব্যাটা গান্ধীবাদ নিয়ে আছিস!’

‘আমি কোনো বাদ নিয়েই নাই। আমার আসলে কোনকিছুতে জড়ানোর মতো সাহসই নাই।’

‘এইটা হান্ড্রেড পারসেন্ট ঠিক কথা বলেছিস। তুই হচ্ছিস আমার দেখা সবচেয়ে ভীতু একটা মানুষ। শোন…’ ফিসফিস করে বলে রাব্বিÑ ‘মাইক্রোমিলিয়নসের এই কাজে একটা ব্যাংকক ট্রিপ আছে। তোকে সাথে নিয়ে যাবো… সেই গে-ার পরে এবার ব্যাংকক! সেবার তো পালিয়েছিলি… এবার দেখি তুমি কি করো চান্দু!’

মানুষ গড়ে ওঠার সময় যে জীবনযাপন করে, পরিণত বয়সের চিন্তা ও আচরণ তার উপর অনেকটাই নির্ভর করে- এটা বইয়ের ভাষা হলেও বাস্তবে আমার মনে হয়, ইউনিভার্সিটি লাইফে কে কী প্র্যাকটিস করছে, সেটা তার পেশাদারী জীবন- অর্থাৎ মূল কাজের জীবনে প্রভাব রাখে। রাব্বিকে দেখে আমার আরেকবার এই কথা মনে হয়, সে আগের মতোই সব বিষয়ের উপরিতল ছুঁয়ে গেলেই সন্তুষ্ট- গভীরে গিয়ে কিছু দেখবার মতো মন নাই তার!

‘কিরে! কি ভাবিস! আমাকে খারাপ মনে হচ্ছে খুব?’ রাব্বি জিজ্ঞেস করে।

‘তা-না।… তুই যে নার্সিসিস্ট ছিলি… এখনই তাই আছিস, ভাবছিলাম। দেশ-দুনিয়ার কোনোকিছু নিয়ে ভাববার নাই তোর?’

‘কি হবে ভেবে? আমি কে? আমি যদি এখন আমার রেস ছেড়ে আর পাঁচজনের কথা ভাবি, আমার চলবে? আমার খাওয়া-পরা জুটবে!’

‘এত খেয়ে কী করবি? বেশি খেলেই বরং অসুখ হয়!’ হালকা গলায় হাসি, আমিও সম্ভবত মাতাল হই; কত পেগ খেয়েছি। ছয়? ছয় আমার জন্য অনেক।

‘জ্ঞান দিস না। তোরা সারাজীবন বাম বাম করে কি আঁটি বাঁধলি! ফ্যা ফ্যা করে সব রাস্তায় ঘোরোস… আর এর ওর কাঁধে চেপে নদী পার হোস… ওয়াক থু!’ রাব্বি রাগ ঝাড়ে।

‘পজিটিভ থিংকিস প্রসেস থাকবে না… সমাজে। আমরা টিকে থাকবো কী করে?’

‘ওই নিয়েই থাকো শালা পাতি বাম!… তোমারে এইবার আমার সাথে ব্যাংকক যেতেই হবে মাইরি!…’ আর যাই করুক ছাত্রজীবনে রাব্বি কোলকাতার বই বেশ পড়েছে, মনে পড়লো।

আমার মনে হয়, কি আসে যায়! যাই, ব্যাংকক ঘুরে আসি রাব্বির সাথে। মাইক্রো মিলিয়নসে রাব্বির প্রজেক্ট ছিল- এইচআইভি রোধে সামাজিক সচেতনতা কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে। রাব্বি আপিসকে প্রস্তাব দেয়- ব্যাংককের মতো এইচআইভি ঝুঁকিবহুল শহরে এ নিয়ে সচেতনতামূলক কাজ হচ্ছে, দেখে আসি।

রাব্বি আর আমি যাই ব্যাংকক সেই দেখে আসবার কাজে।

বলতে গেলে, আমি বিদেশ যাই-ই নি, এক কোলকাতা আর শান্তিনিকেতন ছাড়া! রাব্বি বলে, ‘দুর, দুর… কোলকাতা আর ব্যাংকক… এইগুলা বিদেশ নাকি! তোকে নিয়ে যাবো একবার ফ্র্যাংকফুর্ট। শালার, মেয়েরা.. .সেখানে…!’  তার মুখ চকচক করে।

ব্যাংককে পৌঁছাই বিকেল নাগাদ, সুকুমভিতে অ্যাম্বাসাডর হোটেলে উঠি আমরা; রাব্বি ব্যাগ রেখে বলে ‘ইউনিভার্সিটিতে পড়তেছি, লাগে দোস্ত!…চল একটু সরেজমিন দেখে আসি।’

ব্যাংকক মানেই মোটামুটি এখানে ওখানে বিস্তর পাব-বার, দেখলাম- রাব্বির সব মুখস্থ। ‘চল্, দুর্ধর্ষ এক পাব থেকে ঘুরে আসি।’

‘মাত্র এলাম। শহরটা ঘুরে দেখি। রাতের দিকে না হয়…’

‘দুর দুর। অফিসিয়াল কাজে আসছি! এইচআইভি সচেতনতা বাড়ানোর জন্য কি করা দরকার! তো রেডলাইট এরিয়ায় না গেলে হবে!… চল… ওখান থেকে বেরিয়ে সারারাত ঘুরবো। আর কালও তো শহর দেখবো আমরা।’

রাব্বির সাথে সেই পাবে যাই।

আট বছর আগে গেণ্ডায় যে রকম একটা বাসায় যাই, সে রকম বাসা এটি নয় নিশ্চয়ই- অনেক বিলাসবহুলও নয়, ছিমছাম- বাংলো ধরনের;  ড্রইংরুম বা বসবার ঘরে বসি- এক মধ্যবয়সি নারী এসে বলে- একশো ডলার পার আওয়ার।…এখানেও টাকাটা আগেই দিতে হবে। রাব্বি একশো একশো- দুইশো ডলার মধ্যবয়সি নারীর হাতে দেয়; আর তারপর আমার আর রাব্বির সামনে ৫/৬টি নারী এসে হাসিমুখে দাঁড়ায়- যেন র‌্যাম্পে দাঁড়ায় তরুণীরা- কোমর বাঁকিয়ে ভ্রুভঙ্গি করে, প্রত্যেকে কেবল অন্তর্বাস পরনে, আর মুখে-চোখে কড়া সাজ; প্রত্যেকের ঠোঁট টকটকে লাল লিপস্টিক।

আমার মাথা ঝিমঝিম করে; রাব্বি নিজের জন্য একজন আর আমার জন্য একজনকে পছন্দ করতে শুরু করে- বিবমিষাময়  সেই দৃশ্যÑ রাব্বি একজনকে চোখ টিপে নাম জিজ্ঞেস করে-

‘শার্লিন।’ তরুণীর নাম শার্লিন।

রাব্বি আমার দিকে তাকিয়ে বাংলায় বলে, ‘পুরুষের মতো আচরণ কর শালা!… কি ফিগার দেখছিস!… সোজা ওর সাথে ওর ঘরে যা বেকুব!’

শার্লিনের সাথে তার ঘরে যাই।

গে-ার ঘরটার সাথে মেলাবার চেষ্টা করি। অতটুকুই সম্ভবত- না, একটুখানি বড় হবে, তবে খাটটা ওরকমই ছোট- তবে একপাশের দেয়ালজুড়ে বড় একটা আয়না- মাছের চোখের মতো নিষ্প্রণ ভাষাহীন চোখে শার্লিন খাটে শুয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলে, ‘এসো। দাঁড়াইয়া আছো কেন?’

‘তোমার সাথে খানিক কথা বলিতে চাই।’ আমিও ইংরেজিতে বলি।

রিনঝিন শব্দে হাসে তরুণী, ‘কথা আবার কি? যদি আমার জন্য বিশেষ কিছু করিতেই চাহোÑ তবে ১০টি মুদ্রা দাও। ১০ ডলার। বহু দিবস রজনী নিজের পছন্দমতো আহার জোটে না!’

শার্লিনের আধো ইংরেজি বুঝতে কষ্ট হয় না- আমূল কেঁপে উঠি, দীপালিও এ রকম বলেছিল; বলি- ‘আমরা অগ্রিম পরিশোধ করিলাম। তারপর তোমার কক্ষে আমি আসিলাম।’

‘সমগ্রটাই মাসিমা লইয়া লইবেন। আমার ভাগে সপ্তাহে কয়েক ডলার জোটে। এই যে থাকতে দেয়, খাইতে দেয়, আর সকলই তাহাদিগের! খাওয়াটাও নামমাত্র…!’

‘তোমার দেশ কোথায়? তুমি থাইল্যান্ডেরই?’

‘নাহে। আমি ইন্দোনেশিয়া হইতে এইখানে আসিয়াছি। এইখানে গ্রাহক প্রচুর জানিয়াছিলাম; ইহা সত্য- তবে ব্যবসা অনেকেই করিতেছে। বেশিদিন বাজারমূল্য বজায় রাখিতে পারি না আমরা!’

খাটের একপাশে বসে কথা বলি, শার্লিন বালিশে ঘাড় এলিয়ে কথা বলতে থাকে; অন্তর্বাস পরনে- নানা ভঙ্গিতে আকর্ষণীয় হবার প্রাণান্ত চেষ্টারতÑ কিছুই চোখে পড়ে না আমার-  বলি, ‘মানিব্যাগে বিস্তর মুদ্রা নাই। এই নাও পনেরো ডলার। তুমি খুশি?’

খুশিতে লাফ দিয়ে ওঠে শার্লিন, ওই বেচারাও আজ খুশি হইবে। বেচারার সাপ্তাহিক সিট ভাড়ার সমগ্রটা ইহাতে হইয়া যাইবে। আরও ৫ ডলার দাও প্রেমিক!  খানিক খাইবো!’

শার্লিন কার সিট ভাড়া দেবে? তারপর খাবে?… আরও ৫ ডলার শার্লিনের হাতে তুলে দিই।

‘তুমি একখানা লক্ষ্মীমন্ত সাধু! আসো, এইবার আমাতে প্রবেশ করো… দ্রুত।’ শার্লিন আমার হাত ধরে টান দেয়।

‘আমি তোমার মুখ চুম্বন করিতে চাহি।’ বলতে বলতে শার্লিনের দুই গালে দুই হাত রাখি।

বিদ্যুৎচমকের মতো নিজের দুই হাতে দুই ঠোঁট ঢেকে শার্লিন বলে, ‘ঠোটে চুম্বন নহে। অসুবিধা হয়।… ইহা ভিন্ন যা চাইবে তাহাই পাইবে তুমি!’

শার্লিনের কথা শেষ হবার আগে সমস্ত শরীর কুঁকড়ে যায় আমার, মনে হয় আদিগন্ত তুষার হিমে আমুণ্ডু ডুবে যাই; সেই এক কথা- ভিন্ন দেশে আরেক ভাষায়, একই ভঙ্গিমায়-আমার পেটের ভেতর থেকে পুরনো ভাতের তিতে রস বের হয়ে মুখ ভরে ওঠে, বমি করবার জন্য পাশের বাথরুমে দৌড়ে যাই।

‘কি হলো হে পথিক? তোমার কি শরীর খারাপ করিয়াছে?’ শার্লিনকে উদগ্রীব মনে হয়, তার চোখে চাঞ্চল্যÑ দেয়ালের ঘড়ির দিকে তাকায় বারবার, কেউ কি অপেক্ষা করছে তার জন্য?

‘ভালো বোধ করিতেছি না। আমি চলিয়া যাইবো।’

বিন্দুমাত্র দেরি না করে শার্লিন বলে, ‘তাহাই করো। শরীর মন্দ থাকিলে এইরূপ কর্মে ব্রত না হওয়াই উত্তম।’ -ভাঙ্গা ইংরেজি বলতে বলতে সে দ্রুতহাতে অন্তর্বাসের উপরে বাইরে যাওয়ার উপযোগী স্কার্ট-টপস পড়ে নিতে শুরু করে, আমি বাইরে এসে বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে বুকভরে শ্বাস নিই। আরেকটু হলে দম বন্ধ হয়ে মরেই যেতাম!

কে ওটা? শার্লিন না? দু-মিনিটের মধ্যে সে বেরিয়ে আসে এক যুবকের বুকে মাথা গুজে ঠোঁটে ঠোঁটে চুমু খাচ্ছে। এক ফাঁকে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখলো, চিনতে পারার কোনো চিহ্নও নাই- কলকল করে সে বলতে থাকে তার প্রেমিককেÑ তোমার সিট ভাড়াও জোগাড় করিয়াছি। সঙ্গে আজ রাতের আহারাদি!

বুকের ভেতরটা আমার মোচড় দিয়ে ওঠে। আমার তৃষার মুখটা মনে পড়ে। তার পরও আমি কেন এখানে?

আমার নৈতিক শক্তি বলতে কিছুই কি নাই!

 

০৯.

তৃষার সাথে টানা কয়েক মাসের নিবিড় কথা আর ঘোরাফেরায় আমার ভেতরে একটা পরিবর্তন নিজেই টের পাই। বুঝতে পারিÑ আমার নৈতিক শক্তি নাই কথাটা ঠিক নয়, এখন আমি একটা অন্য একটা মানুষে পরিণত হচ্ছি। হয়তো তৃষার মতো এরকম একজনের জন্য অপেক্ষা ছিল আমার- ভেতরের লুকানো সত্তাকে বের করে আনবার জন্যে! এই সত্তাটা একটা মানুষের জন্য যে কোনো কিছু করতে পারে! এই যে কোনো কিছু করতে পারার ইচ্ছাটাই প্রেম।

তৃষা বলেÑ ‘আমরা সোলমেট। বুঝছো!’

আমি বলিÑ ‘বুঝছি।’

এরপর একদিন সকালে আমরা সাভার পাড় হয়ে যাইÑ জাহাঙ্গীরনগরের কাছাকাছি হরিণাপুর পল্লী নামের সুন্দর এক জায়গায় আমার এক বন্ধু রোমেল দোতলা বাড়ি বানিয়েছে। ঢাকায় চাকরি করে সে, ওটা তার রিসোর্টের মতো; তৃষাকে নিয়ে বেলা ১১টার মধ্যে সেখানে পৌঁছে যাই। চোখ ভরে যায় এমন সুন্দর জায়গা- অবশ্য ঘোরাঘুরিতে আমার মন নাই, কেয়ারটেকারকে বলা ছিল, আমরা দোতলার একটা ঘরে যাই।

কাঠের দোতলা। সুন্দর বারান্দার পাশে গোছানো ঘর। বড় বড় জানালা।

আমি তৃষাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরি। আর ছাড়বো না।

তৃষা বলে, ‘এখন বলো সেই কথা!’

আমি বলি, ‘তুমিতো জানো!’

‘বলো, তুমি বলো আমাকে!’ তৃষা বলে।

‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ আমি বলি।

‘আবার বলো।’ তৃষা বলে।

‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ আমি বলি।

‘আবার বলো।’ তৃষা আমার বুকের সাথে মিশে যেতে যেতে বলে, ‘এই কথাটা আমি কতদিন শুনি না!’

‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ বলতে বলতে তৃষার সারামুখে আমি চুমু খেতে শুরু করি… মুখের প্রতিটি বিন্দুতে… সত্যিই আমার জীবনে এই ঘটনা ঘটছে; এটি সত্য তো!

আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি না তো!

‘অ্যাই কি হলো! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমাচ্ছো নাকি!’ বলতে বলতে তৃষা বুভুক্ষের মতো আমার ঠোঁটে-গালে চোখে চুমু খেতে থাকে। আমিও পরম যতেœ চুমুগুলো ফেরত দিই।

শারীরিক স্পর্শের ভাষার চেয়ে শক্তিশালী ভাষা আর নেই- তৃষাকে ছুঁয়ে বুঝতে পারি আমি। আমার মনে হতে থাকে আমি মরে যাবো, সুখে আমি মরে যাবো।

আমরা দু’জনে দু’জনের ভেতরে অমৃতের সন্ধান পাইÑ পাগলের মতো পরপর দু’মাসে চারবার ছুটে যাই আমরা সাভারের সেই নিভৃত ঘরখানায়। চোখের পলকে উড়ে যেতে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

আর তারপরই আচমকা একদিন রাতে ফোন করে কাঁদতে শুরু করে তৃষা।

আপিস থেকে আড্ডা দিয়ে শাহবাগ হয়ে বাসায় ফিরছি তখন। রাত ৯টার মতো বাজে। আমি রিকশায়।

তৃষা ফোন করে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে- ‘তুমি আমাকে আর খবরদার সাভার যেতে বলবা না। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি!’

‘মানে কি? কি হলো তোমার?’ তৃষার কান্নার তুফান অবস্থা দেখে সিটি কলেজের মোড়ে রিকশা থেকে  নেমে যাই, জিগাতলার দিকে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি- ‘ব্যাপারটা কি?’

‘আমি পারছি না। ছেলের দিকে আমি তাকাতে পারছি না!’

‘আমরাতো প্রেম করছি নাকি!… প্রেমের মধ্যে শরীর থাকবে না। এখানে ছেলেকে আনছো কেন?’ আমি তৃষাকে বুঝিয়ে বলবার চেষ্টা করি।

‘তুমি বোঝার চেষ্টা করো… নিজের স্বার্থটাই শুধু দেখো না! প্লিজ।’-তৃষা আমাকে বোঝানোর স্বরে বলে।

‘নিজের স্বার্থ কই দেখলাম! আমি একতরফা প্রেম করছি নাকি তোমার সাথে? প্রেমের মধ্যে শরীর আসবে, এখানে স্বার্থের কি দেখলা!’ আমি যুক্তি দিই।

‘তুমি আমার কথা বোঝার চেষ্টাই করছো না। শুধু নিজেরটা দেখছো।’

‘অবশ্যই বোঝার চেষ্টা করছি।…পৃথিবীতে যার যার জায়গা বলে একটা ব্যাপার আছে। তোমার ছেলে, তোমার স্বামী বা আমি… সবাই যে যার জায়গায়। কারও সাথে কারও অবস্থান সাংঘর্ষিক নয়!’

‘তুমি একটা লম্পট। পুরা লম্পট।’

‘আরে! কি মুশকিল লাম্পট্যের কি করলাম! আমি তো আমার যুক্তি দিচ্ছি।’

‘এটা কোনো যুক্তি হলো! দু’জনকে একসাথে ভালোবাসতে পারি না আমি।’

‘সাব্বিরকেও ভালোবাসছো নাকি আজকাল!’

‘মুখ সামলে কথা বলো। সাব্বিরকে ভালো না বাসলে আমি ওর সাথে থাকতাম না!’

‘তাইলে রাতদিন মারপিটের কথা বলো কেন!’

‘কিসের মারপিট! ও আমাকে বুক দিয়ে আগলে রাখে। সাব্বির না থাকলে আমি কোথায় ভেসে যেতাম…!’

এরপর আর কি কথা চলে। মন খারাপ করে বলি, ‘আচ্ছা।’

‘কি আচ্ছা?’

‘সাভার যেতে আর বলবো না।’

‘এইতো গুড বয়।’

রাতে ইউটিউবে ফিল্ম দেখি, এটা ওটা বই নাড়াচাড়া করি, শরীরের ভেতরে যেন কোনো শক্তিই পাই না- তৃষাকে আমি আর আমার বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরতে পারবো না- ভাবতেই…

আসলে প্রেম ব্যাপারটি তবে কি?

শরীর! তৃষার শরীরের জন্যে আমার আকর্ষণ!…

কেন? আর কারও জন্য এমন ঝড় বয়ে যায় না কেন আমার শরীরে! তাহলে কী দাঁড়ালো… আমার সাথে তৃষার সম্পর্কটা কী? প্রেমই যদি হয়, তবে তাতে শরীর কেন আসবে না?

‘কী করো’- টুং করে মেসেঞ্জারে তৃষার নক।

‘ভাবছিলাম।’ আমি মেসেঞ্জারে লিখে পাঠাই।

‘কী ভাবো?’

‘ভাবছিলাম তুমি কী করো?’ মেসেঞ্জারে আমি লিখি…

‘বাবুকে নিয়ে পাশের ঘরে সাব্বির ঘুমাচ্ছে। আমি ইউটিউবে ফিল্ম দেখি।’

‘আমি আরও ভাবছিলাম, তুমি খুবই অযৌক্তিক কথা বলছো!’

‘কোন্টা  অযৌক্তিক!’

‘এই যে সাভার যাবো না আমরা… আমি তোমাকে ভালোবাসি।’

‘সাভার শুধু না… তুমি আমাকে ভালোবাসার কথাই বলতে পারবা না। আমার কনসেনট্রেশন নষ্ট হয়!’

‘এইসব তুমি কী বলো!’

‘ঠিকই বলি।’

‘তাইলে আমি তোমার সাথে কী কথা বলবো?’

‘দুনিয়াতে প্রেম ছাড়া কোনো কথা নাই। আমি প্রেম চাই না। ব্যস, এই নিয়ে কোনো কথা বলবা না।’

‘শোন… আমার একটা কথা শোনো। আমাদের যে সম্পর্ক, তাতে স্বাভাবিকভাবেই শরীর প্রসঙ্গ আসে, আসবে। মাঝামাঝি বলে কিছু নাই।’

‘মাঝামাঝি থাকবার দরকার কি? আমাকে বিয়ে করো!’

আমার সারা শরীর ঝনঝন শব্দে বাজতে থাকে। অবশ্যই আমি তৃষাকে বিয়ে করবো, ওর সন্তানকে নিজের সন্তান মনে করতে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধাও নেই- আমি তৃষাকে বলি, ‘এরচেয়ে ভালো প্রস্তাব আর হতে পারে না। চলো… আমরা বিয়ে করি।’

‘আচ্ছা, কাল সন্ধ্যায় ধাবায় আসো। বিয়েতো জীবনে করো নাই। মেসেঞ্জারে বিয়ে করা যায় না; অনেককিছু এর সাথে জড়িয়ে থাকে… এখন বুঝবা না; কাল ধাবায় আসো। কথা বলবো…।’

 

১০.

ধাবায় মুখোমুখি আমি আর তৃষা। একদিনেই তৃষার চোখে কালি পড়ে গেছে।

‘আজকে অফিস যাই নাই।’

‘সেতো চেহারা দেখেই বুঝতে পারছি।’

‘সারাদিন অনেক চিন্তা করলাম।’

চুপ করে শুনতে থাকি; তৃষা বলে চলে- ‘আমি আসলে সাব্বিরকে ভালোবাসি। ওর কোনো দোষ নাই। অটিস্টিক বেবি যার হয় নাই, সেই বাবা বা মা ছাড়া কেউ এই কষ্ট বুঝবে না। …ওর মানসিক অবস্থা আমি বুঝি।…ওকে ছেড়ে আমি আসতে পারবো না।’

তৃষার মুখে দিকে তাকিয়ে নিজেকে আমার নিঃস্ব মনে হয়Ñ এই একটি মানুষ পৃথিবীতে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়, মানুষটি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে!

আমি বলিÑ ‘তুমি…তুমি…আমাকে ছেড়ে চলে যাবে!’

আমার হাত ধরে তৃষা- ‘কেন ছেড়ে চলে যাবো। আমিতো আছি। তোমার সাথেই আছি।’

‘আমি তোমাকে বুঝতে পারি না!’

‘বুঝতে চেষ্টা করো। তাইলেই বুঝবা।’

‘…ঠিকাছে, কোনো সমস্যা নেই, থাকো তুমি তোমার সংসারে। বিয়ে করতে হবে না। আমরা যেভাবে আছি সেভাবে থাকি, কাল বিকেলে সাভার যাই।’

আকাশের ঘন কালো মেঘ জড়ো হয় তৃষার মুখে, ‘তুমি আমার কথাই বুঝতে পারছো না। আমি এর মধ্যে আর নেই। থাকবো না।’

বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যতটা, রাগ হয় তারও বেশি; আমি বলি, ‘বেশ। তাইলে আমাদের ব্রেক আপ।’

তৃষা বলে, ‘ব্রেক আপ আবার কি? চুমু না খেলে মরে যাবা নাকি তুমি?…বিয়ে করে নাও না একটা পছন্দ করে।’

‘তোমারে পছন্দ আমার।’ আমি বলি।

‘আমি বুকড… অলরেডি।’ হাসে তৃষা।

‘তাইলে আর কি… ব্রেক আপ… ব্রেক আপ।’ আমি প্রায় চিৎকার করি।

‘চাষার মতো চেঁচিও না। এখানে অনেক লোক আছে।’

‘চলে যাবো… চলে যাবো… আর এক মুহূর্ত থাকবো না।’ আমি উঠে দাঁড়াই।

তৃষাও দাঁড়ায়, বলে- ‘চলো। আমাকেও বাসায় যেতে হবে। দেরি করে ফিরলে আমার ছেলে মন খারাপ করে!’

ধাবা থেকে বেরিয়ে হনহন করে হাটতে শুরু করি র‌্যাংগস প্লাজার দিকে, পেছনে আস্তে আস্তে হার্টে তৃষা মন খারাপ করে- সে আজ গাড়ি নিয়ে আসেনি, ঠিক করেছিল রিকশায় আমি তাকে পৌঁছে দেব অনেকখানি… হঠাৎ মনটা কোমল হয়ে আসে, আমি দৌড়ে তৃষার দিকে ফিরি- ‘চলো, রিকশায় একসাথে যাই।’

‘কোনো দরকার নেই। তুমি যাও।’ তৃষার মেঘস্বর।

‘চলোতো… এমন করো না।’ তৃষাকে বলি।

‘আমি কিছুই করি নাই। তুমিও করছো। এখন যাও।’ বলে রিকশায় উঠে সামনের দিকে এগোয় তৃষা।

মন খারাপ করে ধাবা রেস্তরাঁয় আবার এসে বসি। কফি অর্ডার করি। কফি খাই।

‘কি করো?’ তৃষার ফোন ।

‘কি আর করবো? ধাবায় বসে কফি খাচ্ছি।’

‘বাসায় যাবা না?’

‘যাবো। পরে।’

‘মন খারাপ করছো?’

‘নাহ।’

‘মন খারাপ করো না। সোনাাপাখি।’

…কি বলবো একে আমি? চোখে পানি আসে! দূর, বাংলা উপন্যাসের নায়ক হয়ে যাচ্ছি- খরখরে গলায় তৃষাকে বলি, ‘কেন মন খারাপ করবো না?’

‘কেন মন খারাপ করবা?’

‘তুমি সেটা জানো।’

‘ছোঁয়াছুঁয়ি ছাড়া তোমার চলে না? তুমি এত স্বার্থপর কেন?

‘আরে… তুমিতো যুক্তিই বুঝতে চাইছো না। আমাদের সম্পর্কটাতো প্রেমের নাকি?’ আমি বলি।

‘তো?’

‘প্রেমের সম্পর্কে শরীর আসবেই। এটা সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা। একে কীভাবে অস্বীকার করবো।’

‘তোমাকে অস্বীকার করতে বলছে কে?’

‘তুমি বলছো।’

‘আমি বলছি… আমি পারবো না। তুমি আরেকটা প্রেম করো না কেন?’ তৃষা বলে।

‘প্রেম কি বাজারে কিনতে পাওয়া যায়?’

‘অ। দুনিয়াতে আমি একজনই আছি! আর কারও সাথে তুমি প্রেম করতে পারো না! আমাকে যদি না চিনতে? যদি দেখা না হতো আমাদের?’

‘কি থেকে কি হতো; এই চিন্তা করে কোনোদিন কিছু হয়? হবে! …আমার সাথে তোমার প্রেম… এইটাই সবচেয়ে বড় সত্য। তোমার জন্য আমার যে অনুভূতি, পৃথিবীতে আর কারও জন্য সেই অনুভূতি হয় না, নাই।’

‘আমার এই অনুভূতির কোনো দরকার নাই।’

‘এখন তুমি অস্বীকার করছো? আমি কি একা একা সব করলাম?’

‘আমি কিছুই অস্বীকার করি নাই। কখনও বলিও নাই, তুমি একা একা সব করছো।…আমি আর এর মধ্যে নাই… ব্যস… এইটা তোমাকে মানতে হবে…।’

‘মানলামতো। আবার ফোন করছো কেন?’ রাগী গলায় বলি।

‘একশোবার ফোন করবো। তোমার কি?’

‘কি মুশকিল! বলছো তোমার প্রেম নাই… আবার গুটুর গুটুর ফোন!’

‘অবশ্যই গুটুর গুটুর ফোন করবো। আমার ইচ্ছা।’ তৃষা জেদি গলায় বলে।

 

১১.

দু’দিনের জন্য একটা প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া বাবদ কেউ কাউকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেয়!

বুঝলাম, রাশেদ মনসুর আমাকে টাকাটা আসলে কোন এক অজুহাতে দিতে চাইছেন- আমি তার কাজে নিজেকে যুক্ত করছি বলে! আরও বুঝতে পারি, এই নিয়ে তিনি কোনো বাড়তি কথাও পছন্দ করবেন না; আমি বলিও না- র‌্যাডিসন হোটেলে তার স্যুট থেকে ২০খানা গিফট বক্স ও আমার যাতায়াত বাবদ ক্যাশ পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে আমি সকাল সকাল কাজ শুরু করি।

রাশেদ মনসুরের কাজকর্ম অত্যন্ত গোছানো; যেখানে যেখানে যাবো- আগে থেকে মেসেজে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন; তার ছোটভাইকে পাঠাচ্ছেন সামান্য উপহারসহ; তিনি নিজে আসতে পারছেন না- কারণ, তার হাতে সময় একেবারেই নাই।

সবগুলো অ্যাপয়েন্টমেন্ট শেষ করে আমি বুঝতে পারি, রাশেদ মনসুর এরই মধ্যে হামিদ সাহেবের জামিনের ব্যবস্থা চূড়ান্ত করেছেন; এই চূড়ান্তকরণের সঙ্গে আমার দু’দিনের লাগাতার গিফটবক্স প্রদানের সম্পর্ক আছে কিনাÑ আমি অবশ্য জানি না; তবে রাশেদ মনসুর কেন এই প্রাণপণ লড়াই করছেন তার প্রাক্তন স্ত্রীর স্বামীর জন্যেÑ এটা জানার প্রবল এক আগ্রহ আমার মধ্যে তৈরি হয়!

হামিদ সাহেবের জামিন হয়েছে, চার্জশিট থেকেও তার নাম বাদ যাবে- এটিও জানা গেছে, র‌্যাডিসনের পুলসাইডে বসে সন্ধ্যায় বিয়ার খেতে খেতে হালকা গলায় রাশেদ মনুসর আমাকে বলেন, ‘তুমি এত বুদ্ধিমত্তার সাথে এতগুলো মানুষকে ঠিকমতো ডিল করেছো… আমি তোমার জন্য একটা কিছু করতে চাই সজল…।’

‘রাশেদ ভাই আপনি অনেক করেছেন…’

‘কি করলাম?… সেদিন তোমার বাসায় গিয়ে আমি মুগ্ধ। এত চমৎকার মিডল ক্লাস একটা ফ্যামিলি… বহু বছর পর আমি দেখলাম। অবশ্য সুযোগই আমার নাই!’

‘একটা প্রশ্ন করতে চাই আপনাকে!’

‘বুঝতে পারছি, তুমি জানতে চাইবে- এক্স ওয়াইফের হাজব্যান্ডের জন্য আমি এতকিছু করলাম কেন!

‘জি। অবশ্য আপনার আর মিতা ম্যাডামের ডিভোর্স কেন হয়েছিল, জানতে পারলেই এর উত্তর পেয়ে যাবো। সেটা যদি বলেন আমাকে…।’

আমার চোখের দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন রাশেম মনুসর, ‘তোমার দুলাভাইয়ের চিকিৎসার ব্যবস্থাটা আমি সিঙ্গাপুর মাউন্ট এলিজাবেথে করছি। সেদিন তোমাার বাসা থেকে কাগজপত্র নিয়ে এসেছিলাম। তোমার বোন আর দুলাভাইকে পাঠিয়ে দাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।’

‘এটা কি বলছেন আপনি রাশেদ ভাই?’

‘পৃথিবীতে ফ্রি লাঞ্চ বলে কিছু নেই। সামনে মিতা আরও বড় কিছু ঝামেলায় পড়বে।…মার্ডার কেস সহজে হামিদকে ছাড়বে না। তুমি মিতার হয়ে এই কেস পুরোটা লড়ে দেবে। বিনিময়ে আমি তোমার দুলাভাইয়ের চিকিৎসার পুরোটা বহন করছি।’

‘রাশেদ ভাই!’ বিস্ময়ের সাথে তাকিয়ে থাকি তার দিকে।

‘শোন… এক সময় আমার কিছুই ছিল না। স্ট্র্যাগল লাইফ ছিল বলতে পারো। কিন্তু মিতা পাশে ছিল। আমার মনে হতো, বেঁচে থাকবার জন্য কেবল মিতা পাশে থাকলেই হয়!’…র‌্যাডিসনের পুলসাইড সন্ধ্যার পর সুনসান নীরব হয়ে থাকে- শান্ত কোমল জ্যোৎ¯œা আজ র‌্যাডিসনের খোলা পুলসাইডেÑ রাশেদ মনসুর বলতে থাকেন- ‘আমার সামর্থ্যরে প্রতি মিতার আস্থা ছিল না…’

‘মানে?’

‘সে বিসিএস দিয়ে ফরেন সার্ভিস পেল… আমি বিসিএস দিলামই না। নিজের মতো একটা আইডিয়া জেনারেটিং এসেন্সি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিলাম।…যা হয় এখানে- জানো তো..পুঁজি ছাড়া, শুধু বুদ্ধি দিয়ে ব্যবসা? আমি পেরে উঠছিলাম না।’

আমি শুনতে থাকি।

‘এর মধ্যে… আমাদের পাঁচ বছরের প্রেম আর তিন বছরের সংসারের মাথায় মিতার মা হবার সম্ভাবনা হলো। মিতা প্রেগন্যান্ট হলো। আমি খুশিতে পাগল হয়ে গেলাম… আমার দুনিয়াতে উত্তরাধিকার আসবে। আমার চিন্তা… কিন্তু মিতা তাকে পৃথিবীতে আনতে রাজি হলো না..’

‘মানে?’

‘মানে প্লেইন অ্যান্ড সিম্পল। ক্যারিয়ারের কথা তুলে জানালো, এখন তার আরও সামনে যাবার সময়, এই অবস্থায় বাচ্চা নিতে সে পারবে না…’

নিশ্চুপ শুনতে থাকি। খোলা আকাশে জ্যোৎস্নার নহর বইয়ে দিয়েছে চাঁদ।

‘আমার অবশ্য ধারণা, মিতা ভেবেছিল, আমি বেশি স্বপ্নবাদী… রিয়েল লাইফের ফাইটে আমি হয়তো তার মতো ক্যারিয়ারিস্টের সাথে তাল মেলাতে পারবো না। তাই শুরুতেই… কি জানি!…আমি মিতার সিদ্ধা›ত মানতে পারিনি; বলেছি তাকেÑ এই ঘটনা ঘটালে আমি তার সাথে থাকবো না।…’

‘তারপর?’ আমি বিস্ময়ের ঘোরে বলি।

‘তারপর আর কি- সে স্পষ্ট করে বলে- থেকো না। আমিও থাকিনি। চলে গেছি।’

আচ্ছা, আকাশের চাঁদকে মানুষের কথা শুনতে পারে! মনে হয় যেন, চাঁদ নিচে নেমে এসেছেÑ রাশেদ মনসুরের কথায় হতভম্ব হয়ে…

 

১২.

জীবনজুড়ে বিস্ময়ের পর বিস্ময়। নাটকীয়তার পর নাটকীয়তা। এতসব মাথায় ঢোকে না আমার, ঝিম মেরে বসে থাকি বাসার এক চিলতে বারান্দায়। তৃষা মেসেঞ্জারে নক করে-

‘আমার কষ্ট হচ্ছে খুব। তুমি আমাকে সারাদিন একবারও নক করো নাই।’

‘আমাদের একটা ডিসিশনে আসতেই হবে।’

‘আমি তোমাকে একটা চিঠি লিখছি…’

‘কই সেই চিঠি… এখুনি দাও।’

‘মনে মনে লিখছি…। কাগজে তো লিখি নাই।’

‘উফফ… তুমি না! আশ্চর্য বাজে একটা লোক।’

‘হুম। খুব বাজে। স্বার্থপর।…আমার যে খুব কষ্ট হচ্ছে এই বাজে লোকটার জন্য!’

‘আমারও খুব কষ্ট হচ্ছে দুনিয়ার সবচেয়ে রাগী আর দজ্জাল এই মেয়েটার জন্য!’

‘তাইলে কি করা যায়?’

‘আসলেই তো কি করা যায়?’

‘এই স্বার্থপর লোক… আমাকে একটু আদর করে দাওতো… খুব কষ্ট হচ্ছে!’

…আমার শরীরটা ঝিমঝিম করে, ফিরে আসছে, ফিরে আসছে… আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ, সবচেয়ে বড় বেদনা; নিয়তি যাকে কোনোদিনই পুরোটা আমার হয়ে আসতে দেবে না… তবু যতটুকু সে আসে…

‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ আমি লিখে মেসেঞ্জারে পাঠাই।

তৃষা মেসেঞ্জারে লিখে পাঠায়- ‘আবার বলো।’

‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ -আমি লিখি… সে রাতে গভীর তৃপ্তি নিয়ে ঘুমোতে যাই।

আমার দুঃস্বপ্নের রাত কেটে গেছে। তৃষা আমাকে ভালোবাসে। বুকের ভেতরটা পরিপূর্ণ হয়ে থাকে, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।

আমাদের দাদী বাড়ি ময়মনসিংহ শহরের কেওয়াটখালীতে। ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ঘেঁষে। ছোট্ট সুন্দর দোতলা বাড়ি, মিনিট দশেক হাঁটলেই নদীর তীর, দাদা-দাদি যখন বেঁচে ছিলেন, আমরা সবক’টি কোরবানির ঈদে সেখানে যেতাম।

মনে মনে ঠিক করি, এবারের কোরবানি ঈদে অনেকদিন পর আবার কেওয়াটখালী যাবো। তৃষাকে বলবো, কোনোভাবে বাসা ম্যানেজ করে অন্তত একটা দিনের জন্য ময়মনসিংহে আসতে! তৃষা নিশ্চয়ই আসবে।

আমি দিন দুই আগেই পৌঁছে যাবো ময়মনসিংহ। এবার গিয়ে উঠবো ছাদে এক চিলতে চিলেকোঠায়। ছাদ থেকে দূরের অবারিত ধানের ক্ষেত দেখা যায়; তৃষা যখন ছাদের ঘরে আসবে, বলবো- ‘দ্যাখো যতদূর চোখ যায় ধানের নদী…!’

‘কবিত্ব বাদ দাও। আমি টায়ার্ড। জিরিয়ে নিই একটু!’ -তৃষা স্বভাবসুলভ বিরক্তির ঢঙে বলবে।

আমি তৃষাকে জিরোতে দেব না, জোর করে তখন তখনই তাকেসহ হাঁটতে শুরু করবো। ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে দিগন্তছোঁয়া রাস্তাÑ

তৃষা বলবে, ‘এই কাদাপানির মধ্যে বুঝি আমি হাঁটতে পারি!’

‘আমার হাত ধরো!’

তৃষা আমার হাত ধরবে। আমি তাকে বলবো, ‘চোখ বন্ধ করে খানিক হাঁটো। তারপর চোখ খোলো। দেখবে সবুজ রঙের ফুল চোখে ভাসতে থাকবে!’

তৃষা তাই করবে। আমি তৃষার হাত ধরে ধরে হাঁটতে থাকবো।

‘নদীর কাছে যাবো। তোমাদের সেই নদী! এত গল্প করেছো যার…।’ তৃষা বলবে।

আমরা ব্রহ্মপুত্রের দিকে হাঁটতে থাকবো, হালকা বাতাসে আমাদের দু’জনেরই চুল উড়বে।

‘ক’দিন চুল কাটো না! আর কি বিচ্ছিরি দাড়িগোঁফের জঙ্গল!’ তৃষা আমাকে বলবে।

‘কেমন রবীন্দ্রনাধ রবীন্দ্রনাথ ভাব এসে যাচ্ছে না! …ভবাছি চুল দাড়ি বড় করে ফেলবো!’

‘হুম। তারপর একটা ঝোলা কাঁধে ভিক্ষায় নেমে যাও! মানাবে বেশ!’ তৃষা বলবে।

‘কেন? কেন? আমাকে আর্টিস্টের মতো দেখায় না বুঝি! আমি বলবো।

‘আর্টিস্ট না ছাই! একাট ভ্যাগাবন্ডের মতো দেখায়। চুলগুলা কাটবা তো। আর দাড়িফাড়ি… একদম ভালো লাগে না আমার!’

‘চুমু খাওয়ার সময় ঠিকই তো দাড়িতে মুখ ঘষো!’- আমি বলবো।

‘আহারে! কি কথার ছিরি! মানুষ যে এত অসভ্য হতে পারে, তোমাকে না দেখলে আমার বিশ্বাস হতো না…!’

‘আমাকে না দেখলে তোমার আর কি কি বিশ্বাস হতো না…’ -আমি বলবো।

‘বিশ্বাস হতো না যে, কেউ কাউকে এতটা সুন্দরভাবে ভালোবাসতে পারে। এত যতœ করে ভালোবাসতে পারে!…এই তুই এত যতœ করে ভালোবাসা কার কাছে শিখলিরে…’ তৃষা বলবে।

‘তোর কাছে শিখেছি।’ আমি বলবো।

‘মানে? আমি আবার কখন ভালোবাসলাম?’

‘তুমিইতো আমাকে শিখালে কীভাবে যত্ন করে ভালোবাসতে হয়। সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসতে হয়। বুকের মধ্যে কীভাবে এত শক্ত করে জাপটে ধরে রাখতে হয়! …আমি বুঝি এগুলো কিছু জানতাম!’

‘হুম। আপনি তো শিশু… অবোধ! …আপনি কিভাবে জানবেন এগুলো!’

‘আমাকে জানাও তুমি… আমাকে জানাও…।’

হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে যায়।

ক’টা বাজে। রাত সাড়ে তিনটা। স্বপ্নও এত স্পষ্ট হয়। সেই খোলের শাড়িটা পরেছিল তৃষা, আর তার শরীরের গন্ধ। আমি স্পষ্ট পেলাম। কি সুন্দর গন্ধ, তৃষার শরীরে আমি হাস্নাহেনার মাথা ঝিম গন্ধ পাই। সেই গ›ধটাই স্বপ্নের ভেতর পেলাম।

…আহ্, বুকের ভেতর সামান্যতম দুঃখও আর নেই যেন… তৃষা আছে, তৃষা আমাকে ভালোবাসে।

 

১৩.

পরদিন বিকালের আগেই তৃষার জরুরি তলব- যত কাজই থাকুক, আজ সন্ধ্যায় তোমাকে ‘ধাবা’য় আসতে হবে!

প্রজাপতির মতো উড়তে উড়তে আমি যাই সেখানে। তৃষা আসে সময়মতো; আমাদের প্রিয় ধাবা রেস্তরাঁয়। আবাহনী মাঠের কাছাকাছি।

‘শোন… চেষ্টা করেও আমি পারলাম না।’ তৃষা বলে।

‘কি সমস্যা? সাব্বিরের সাথে ঝগড়া?’

‘নাহ। তোমার সাথে রাতের মেসেঞ্জারে কথা বলবার পর দেখি আমি আর মাথা তুলতে পারি না। আমাকে আমার মতো থাকতে দিতে হবে!’

‘এর মানে কি?’

‘এর মানে হচ্ছেÑ চুমু খাওয়া চলবে না। সাভার যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না… এতবার ফোন করা যাবে না। আমাকে আমার মতো থাকতে দিতে হবে! আমার কনসেনট্রেশন তুমি ব্রেক করো না।’

আর কত হতভম্ব হবো! মুখ কালো করে তার  দিকে তাকিয়ে থাকি। তৃষা বলে, ‘আমি অনেক ভাবলাম, আমার ঘুম হয় না। আমার ছেলের মুখের দিকে আমি তাকাতে পারি না। তুমি আমাকে হেল্প করো প্লিজ!’

‘তুমি এত রক্ষণশীল…! তাইলে আমরা বিয়েই করি… চলো…।’

‘অতো সোজা না সবকিছু!’ তৃষার চোখে জল টলমল করে- ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে সে চোখ মুছতে মুছতে বলে ‘আয়মান কথা বলতে পারে না। দেখেছো তুমি ওকে, ৮ বছর বয়স হয়ে গেল- একটা ছোট্ট শিশুর মতো আমাকে আয়মান জড়িয়ে রাখে, চুলের ঘ্রাণ নেয়। রাতে ঘুমাতে গেলেও সে চুল নাকের কাছে নিয়ে রাখে। আরেকজনের চুলের ঘ্রাণ সে নেয়। ওর বাবা। আমরা ঝগড়া করলে সে কিছুই বোঝে না, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। এইটা এমন একটা কষ্ট, তোমাকে বোঝাতে পারবো না।…’

‘বলেছি তো তোমাকে… যে যার জায়গায় থাকে, থাকবে- কোনোটাই সাংঘর্ষিক না। কেন তুমি সবাইকে একসাথে প্যাঁচাচ্ছো!’

‘অবশ্যই সাংঘর্ষিক। চিন্তা করে দেখলাম… আমাকে শক্ত হতেই হবে! ইমোশনাল হওয়ার বয়স আমার নাই। পরিস্থিতিও নাই।’

মুখের ভেতরটা জলশূন্য মনে হয়। ‘আমি আসলে কি তাইলে!’ তৃষাকে জিজ্ঞেস করি।

‘তুমি একটা মায়া। ভুলে গিয়েছিলাম, আমি একটা  ফ্রেমের মধ্যে থাকি! আছি। সেই ফ্রেমে আয়মান ছাড়া আর কিছু নাই। আর আয়মানের জন্য ওর বাবাকে দরকার। আমি কেন তাকে বাবা ছাড়া করবো?’

অস্পষ্ট স্বরে তৃষা বলে, ‘আয়মানের দিকে তাকিয়ে নিজেকে স্থির করেছি। কারও শূন্যস্থান কেউ পূরণ করতে পারে না। আমি সেটা চাইও না।’

‘আমি কি তাইলে? আমি কি তোমার?’ ক্রুদ্ধস্বরে বলি।

‘বললাম তো মায়া।’ এবার তৃষার স্পষ্টস্বর।

‘শুধু মায়া? মায়ার কারণে এতকিছু হলো!’

‘…ভুলে গিয়েছিলাম, আমাকে একটা ফ্রেমের মধ্যে থাকতে হয়! কেউ বলে দেয় নি; এটা নিজেই বেছে নেয়া… এই ফ্রেম ভাঙা যায় না, ভাঙতেও চাই না…’

‘আমি কিছুই না? কিছু না তোমার?’

‘অনেক কিছু!… তুমি আমার ভুলে যাওয়া ভালোবাসা আর প্রেম… আবার আমার সামনে নিয়ে এসেছো! ভুলেই গেছিলাম, ভালোবাসা-প্রেম এইসব আবার কি! সাব্বিরের সাথে বছরের পর বছর পাশাপাশি থাকতে থাকতে আয়মানকে নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যেÑ আমার মনে ছিল না, ভেতরের মানুষটার বয়স বাড়ে না। আমি এখনও প্রেমে আকুল হতে পারি! …আমার সব অভ্যাসের অংশ হয়েছিল। তোমার ছোট ছোট কথা, সারাক্ষণ ঘিরে ঘিরে রাখা আমাকে আমার নিজের জায়গাটিতে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে!’

‘তোমার নিজের জায়গা কোনটা?’

‘ওইযে বললাম ফ্রেম… আমার ফ্রেমের ভেতর। আয়মান আর সাব্বির। …সাব্বির ফোন করছে। সে ল্যাবএইডে আসছে চেকআপে। ওকে তুলতে হবে আমার। যাই।’

…তৃষা চলে যায়। আমি ধাবা রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে আবাহনী মাঠের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি- এখনও মাঠটা কত সুন্দর! এত রাতেও এখানে ফুটবল খেলে ছেলেরা! শৈশবে ফুটবল নিয়ে কি মত্তই না থাকতাম! আমাকে সাদাকালো ডোরাকাটা ফুটবল কিনে দিয়েছিলেন পারুল আপা। আমার বোনটা, কত ছোট ছোট বিষয়ে আনন্দ যে খুঁজে নিতে জানে- তার বরের চিকিৎসা হচ্ছে সিঙ্গাপুর মাউন্ট এলিজাবেথে, আপা খুশিতে পাগল হয়ে গেছে!

হাঁটতে হাঁটতে আবাহনী মাঠের পাশে এসে দাঁড়াই। নানা বয়সী শিশু-কিশোর-যুবক মনের আনন্দে ফুটবল খেলছে। আর হাসছে, কেউ কেউ পড়ে যায়- চিৎকার করে, কেউবা মাঠের পাশে জোর চক্কর দেয়- তারা স্বাস্থ্য সচেতন! বাহ্, বেশ কয়েকটি তরুণ-তরুণী জুটিও বসে থাকে গ্যালরিঘেঁষে। চাঁদের আলোয় ভেসে যায় তারা।

এইসব কলহাস্যের ভেতরে নিজেকে কেন এত দূরের মনে হয়?- ভাবতে ভাবতে আকাশে গোল থালার মতো আলোর ফিনকি ওঠা চাঁদের দিকে তাকাই- হাজার হাজার বছর ধরে চাঁদের চেহারা একই রকম। তাই না!

লেখক : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares