ইরা : অরুণ কুমার বিশ্বাস

উপন্যাস

ইরা

অরুণ কুমার বিশ্বাস

 

প্রাণপণ গাড়ি হাঁকাচ্ছে আবদুল। জ্যামের রাস্তায় সময় মেপে গন্তব্যে পৌঁছানো এখন রীতিমতো অসম্ভব। বিশেষ করে অফিস ছুটির সময়, আর যদি হয় বৃহস্পতিবার তাহলে তো কথাই নেই।

এয়ারপোর্ট রোড ধরে দুরন্ত গতিতে গাড়ি ছুটছে। পেছনের সিটে অধীর উত্তেজনায় ছটফট করে ইরা। সময়মতো তাকে এয়ারপোর্ট পৌঁছতে হবে। হবেই। নাহ, সে দেশের বাইরে কোথাও যাচ্ছে না। তার গন্তব্য আপাতত দেশেই- চট্টগ্রাম।

কী হলো আবদুল, পিচ্চিবাবুদের মতো হেলেদুলে গাড়ি টানছো কেন? আর জোরে যাওয়া যায় না! বারবার তাড়া দেয় ইরা। ক্রমশ ওর অস্থিরতার মাত্রা আবদুলের পায়ের তলায় অ্যাকসিলেটরে চাপের মতো বাড়তে থাকে। ইশারায় আবদুল তার ম্যাডামের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, গাড়ির গতিবেগ এখন ঘণ্টায় একশ দশ। এরচেয়ে জোরে টানলে পুলিশ-কেইস হতে পারে। দুর্ঘটনার কথা না হয় তোলাই থাক।

ইরা তা জানে, কিন্তু তার প্রয়োজনটা একটু বেশিই জরুরি বিধায় মন মানতে চাইছে না। পারলে সে যেন অ্যালবাট্রস পাখির মতো বিশাল পাখায় ভর করে নিমিষে পৌঁছে যায় কুর্মিটোলার ডোমেস্টিক এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে, যেখানে অন্তত দুজন খুনি তার জন্য অপেক্ষা করছে।

ইয়েস, খুনি, মানে কনট্র্যাক্ট কিলার। বা বলা যায় ওর বন্ধু। ইরা কোনো আনন্দভ্রমণে চট্টগ্রাম যাচ্ছে না। দীর্ঘ প্রায় একবছর ধরে এই সুযোগটার জন্য সে অপেক্ষা করেছে। বলা যায়, গোল্ডেন অপরচুনিটি। একটা বদলা নেবার অপেক্ষা। এই মুহূর্তে এটা ইরার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বাস্তব।

অদৃশ্য ইশারায় আবদুল গাড়ির গতি শ্লথ করে। তারপর একটু একটু করে চাপিয়ে দেয় রাস্তার পাশে। ইরা খেয়াল করে, উল্টোদিকে র‌্যাডিসন ব্লু হোটেল। মানে এখনও অনেকটা পথ তাকে যেতে হবে।

কী হল আবদুল, গাড়ি থামালে যে! এনি প্রবলেম! রাগতস্বরে ইরা বলল। আবদুল ওর অফিসের ড্রাইভার, নিজের নয়। তবে সে খুব বিশ^স্ত। সদ্যোজাত বাছুর যেমন তার মা গাভিটিকে বিশ^াস করে।

সার্জেন্ট ম্যাডাম, সিগনাল দিয়েছে। হলুদ পুলিশ। তো তো করে আবদুল বলল। ইরা লক্ষ্য করেছে খুব বেশি ঘাবড়ে গেলে আবদুল তোতলায়। সে এও জানে, গাড়ি চালকদের কাছে হলুদ পুলিশের গুরুত্ব অন্যরকম। ওরা রাস্তায় রাজার ভূমিকায়। সিগনাল দেয়ামাত্র গাড়ি থামাতে হবে। নইলে কেস অবশ্যম্ভাবী।

যাহ্ গেরো! মুখ ছিটকে বেরিয়ে এলো ইরার। পুলিশ সিগনাল দেবার আর সময় পেল না।

চরম বিরক্ত ইরা। পুলিশ না জানি এখন কিসের চার্জ আনবে!

ক্যাঙারুর মতো ছুটতে ছুটতে ছুটে এলো সার্জেন্ট। গাড়ির গতিবেগ অনেক বেশি ছিল তাই চট করে ব্রেক কষতে পারেনি। আবদুল। তাই পুলিশকে একটু বেশি পথ ছুটে তবে ওকে ধরতে হল। এবার নিশ্চয়ই তার ঝাল মেটাবে।

ভেরি ন্যাচারাল। তুমি তাকে দৌড় করিয়েছ, আর সে তোমাকে ছোটাবে না, তাই কি হয়!

ড্রাইভার হিসেবে আদৌ চৌকস নয়, বরং সে একটু ভোলাভালা টাইপের। ট্রাফিক সার্জেন্টের দাবড়ানি খেয়ে সে কেমন মিইয়ে যায়। ওদিকে গাড়ির ভেতরে বসে ঘামছে ইরা। যদিও হাই পাওয়ারে এসি অন করা আছে। সার্জেন্ট গাড়ির কাগজ চেক করে। আবদুলের ছোটখাটো একটা পরীক্ষা নিয়ে নেয়। ইরা ভাবল গাড়ি থেকে একবার নেমে দেখবে। পরে অবশ্যি মত বদল করে। সবখানে সব ওষুধ কাজ করে না। ইরা বোঝে, দুনিয়ায় সবাই এক রকম নয়। কেউ কেউ স্রেফ নিজের ক্ষমতা জাহির করার জন্য মানুষের কষ্টের কারণ হয়।

ইরা গাড়ির ভেতর থেকে গলা চড়ায়, আবদুল হলো?

এবার হিন্দি ফিল্মের স্টাইলে মাথা ঝুঁকিয়ে সার্জেন্ট বলল, গাড়ির কাগজে গড়বড় আছে। সময় লাগবে। লোকটার রকমসকম ভাল লাগেনি ইরার। মনে হল, সে একটু বেশিই রুক্ষ। সত্যি বলতে, মানুষের কণ্ঠে তার ব্যক্তিচরিত্র অনেকখানি ফুটে ওঠে। ইরা তাই ব্যাকগিয়ার মেরে কৌশল পাল্টে নেয়। গলা খাঁকরে চেহারায় ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তারপর বলল, একটু তাড়া ছিল। জরুরি কাজে এয়ারপোর্ট যাচ্ছি। যদি একটু তাড়াতাড়ি করেন…!

এয়ারপোর্ট যাচ্ছেন তো যান না। কে আটকে রেখেছে! কিন্তু আমাকে আমার কাজ করতেই হবে। গাড়ির কাগজ রেখে দিচ্ছি। পরে জায়গামতো যোগাযোগ করে মামলা তুলে নেবেন।

এই যোগাযোগটা যে কত কঠিন ইরা তা জানে। কিন্তু সার্জেন্ট সাহেব জানেন না যে এটা টিভি চ্যানেলের গাড়ি। উল্টোপাল্টা মামলা দিলে তিনি নিজেই ফাঁসবেন। ইরা আবদুলকে চোখের ইশারা করে। মানে কথা বাড়িও না, তুমি বরং চলে এসো। আমাকে এক্ষুনি এয়ারেপার্ট পৌঁছতে হবে। ব্যাপারটা জরুরি।

সার্জেন্ট অবশ্যি কী ভাবলো কে জানে! বাস্তবে খুব একটা ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাইয়ে না গিয়ে কাগজ ফিরিয়ে দিল। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো ড্রাইভার আবদুল। গাড়ির কাগজ তার কাছে নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয়। হোক না সে স্রেফ হুকুমের চাকর। গাড়িও তার নিজের নয়। এতকাল মনিবের নুন খেয়ে এসেছে। গাড়ির প্রতি এটুকু দরদ না থাকলে চলবে কেন!

ছাড়া পেয়ে দুরন্ত গতিতে গাড়ি ছোটায় আবদুল। স্পিডোমিটারের কাঁটা আবারও একশ কুড়ি ছাড়িয়েছে। নিকুঞ্জ পেরিয়ে ছোটখাটো জ্যামের দেখা মেলে। সিগনাল নয়, জ্যামই।

আবার জ্যাম! বিরক্ত ইরা ঘেমে নেয়ে ওঠে। বারবার কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখে। আর মাত্র দশ মিনিট। আরও বেশি দেরি করে ফেললে হয়তো ফ্লাইট মিস করবে। বোর্ডিং কার্ড পাবে না, ফ্লাইটের দরজাও বন্ধ হয়ে যাবে। মানে ফুল প্রুফ প্ল্যান পুরোটাই ভ-ুল! মানে হয়!

আবদুল ওর ম্যাডামের তাড়াটা বোঝে, পেছনে কারণ কী তা অবশ্যি ওর জানা নেই। কী এমন বিশেষ প্রয়োজনে ঢাকা বিমানবন্দরে ছুটছে ইরা তা কেবল সে নিজে ছাড়া আরও দুজন জানে। তারাও এয়ারপোর্টে ইরার জন্য অপেক্ষমাণ।

পিঁপড়ের মতো শ্লথ গতিতে গাড়ি এগোয়, আবদুল কিছুতেই স্পিড নিতে পারে না। ক্রমশ ইরার ধৈর্যের বাঁধ চুঁইয়ে পানি গড়ায়। এভাবে আটকে গেলে তার প্ল্যান সাকসেসফুল হবে না। কিছুতেই না। অথচ পুরো কাজটার পেছনে সে মেলা সময়, শ্রম ও টাকা ইনভেস্ট করেছে। টাকার কথা না হয় বাদ দিলাম, এই প্ল্যান পাস করলে ইরার জীবনের এক জঘন্যতম অধ্যায়ের অবসান হবে। দীর্ঘদিন পুষে রাখা কষ্টের উপশম না হলেও কিছুটা হলেও সান্ত¡না অন্তত মিলবে।

আবারও তাড়া দেয় ইরা, কী হল আবদুল, নেমে হাঁটব নাকি!

আবদুল বোঝে এটা ম্যাডামের স্রেফ কথার কথা। হেঁটে কেউ কোনোদিন এয়ারপোর্ট পৌঁছেছে এমন নজির বিশ্বের কোথাও নেই। আদতে তা সম্ভবও নয়। অবশ্যি পুরো শহরে যদি হঠাৎ মহামারি লেগে যায় তো সে আলাদা কথা।

 

খ.

আবদুল গাড়ি নিয়ে বেমক্কা আটকে যায় নিকুঞ্জের সামনে রাস্তায়। এয়ারপোর্ট থেকে ইরার বান্ধবী লাইসা সেলফোনে জানায়, ফ্লাইট খানিক লেট। অন্তত আধঘণ্টা। টেনশন করার দরকার নেই। ধীরেসুস্থে এসো। উই আর ওয়েটিং ফর ইউ।

ইজ হি দেয়ার ? লাইসার কাছে জানতে চায় ইরা।

ইয়েস, হি টার্নড আপ। কিচ্ছু ভেব না, আমরা তার উপর নজর রাখছি। ওপাশ থেকে লাইসা বলল।

ভাবিত হয় ইরা। কী বলল লাইসা?

লাইসা বলল ‘আমরা’! তার মানে ‘ফাস্ট শুটার’ এসে গেছে। মনে মনে আশ্বস্ত হয় ইরা। যদিও এই কেসে গোলাগুলির কোনো কাহিনি নেই, তবে ক্লাইম্যাক্স আছে। কাজ হবে নিঃশব্দে। কোনো রকম হৈ চৈ করা চলবে না। গভীর নদী বয়ে চলার শব্দ কম।

ইরা এবার উল্টো বলল, আবদুল, আস্তে যাও। ফ্লাইট লেট। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কারও বাম্পারে মেরো না। জানো তো, সময়ের চেয়ে জীবনের দাম বেশি!

যানজটের সুযোগ ইরা কিছুক্ষণের জন্য ভাবনার অতলে হারিয়ে যায়। কতদিন হল! তা প্রায় এক বছর। ইরার তখন একটা চাকরি ভীষণ দরকার। সদ্য মাস্টার্স শেষ করেছে। নিম্নমধ্যবিত্তের টানাপড়েনের সংসার। রিটায়ার্ড বাবা পেনশনের প্রায় সব টাকা খরচ করে তাকে বিদুষী বানিয়েছেন। ভাবছেন, এবার তার মেয়ের একটা চাকরি হবে। মেয়েই তখন শক্তহাতে সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু বাবা জানেন না যে শুধু বিদূষী হলেই চাকরি পাওয়া যায় না। চা-এর সাথে টা-ও চাই। এই শহরে কত ছেলেমেয়ে মাথাভর্তি বুদ্ধির ঢিবি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে! কেউ তাদের পুঁছেও দেখছে না। চাকরি চাইলে বলে, অভিজ্ঞতা চাই। হার্ডকোর এক্সপেরিয়েন্স। অনভিজ্ঞ মানুষ আর দুবলা বাছুরের মাঝে তফাৎ কোথায়!

আরে বাবা, কাজ না দিলে কাজের অভিজ্ঞতা আসবে কোত্থেকে! মঙ্গল গ্রহ থেকে! ইরা অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু হয়নি। লিখিত পরীক্ষা টপকে বেশ কিছু ইন্টারভিউও দিয়েছে। তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি, তবে সাক্ষাৎকারকালে কামলোলুপ টেকো বুড়োরা তার ভাইট্যাল স্ট্যাটাস দেখে খানিক মজা লুটেছে। জিভ চেটে মনে মনে হয়তো বলেছে, খাসা দেখতে মাইরি!

নাহ্, দেখতে মন্দ নয় আমাদের ইরাবতী। চৌকো চেহারায় কাজল-কালো চোখে মায়াবী দেখতে ইরা। দেহে কোনো বাড়তি মেদের ছোঁয়া নেই। উজ্জ্বল গায়ের রঙ, প্রায় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি (হিলছাড়া) উচ্চতায় ইরা যেন খাপখোলা তলোয়ার! শুধু শরীর দেখিয়ে যদি কাজ পাওয়া যেত, তাহলে এদ্দিন বেকার থাকত না ইরা। আসলে কিসে যে কী হয় ছাই, তা-ই এখনও বুঝে উঠতে পারল না সে।

এরই এক ফাঁকে প্রেম এসে গেল ইরার জীবনে। কাননে কুসুম ফুটলে সৌরভ ছুটলে অলি তো আসবেই। এসেছেও বারকয়েক। তবে ইরা বরাবরই বেশ সতর্ক। বসন্তের শুরুতে কুহু রবে কোকিল ডাকলেই সাড়া দিতে হবে এমন তো নয়!

একটু রয়েসয়ে বাবা! বন্ধুরা বিনাপয়সায় পরামর্শ দিল তাকে। মসৃণ পথ। সাবধানে পা ফেললে ভাল। নইলে হড়কাতে সময় নেবে না। আর একবার হড়কালে রাগেদুঃখে মাথার চুল ছিঁড়ে মাথা ফর্সা হবে, কিন্তু যা একবার গেছে তা কিন্তু ফিরে পাবে না।

ইরা ভেবে দেখলে, মুফতে উপদেশ এলেও নেহাত মন্দ নয়। একটাই তো জীবন। বুঝেশুনে খরচ করাই সমীচীন। নইলে পস্তাতে হবে।

কিন্তু ভবিতব্য সারায় কে! ইরার জীবনে প্রেম এল অনেকটা বিনা নোটিশে বজ্রাঘাতের মতো।   ছেলেটা তার একদম অচেনা নয়। টিএসসি-তে মাঝে মাঝে দেখা হতো। মৃদু চোখাচোখি বা হাসি বিনিময়, তখনও কথা হয়নি অবশ্যি। পরে বিতর্ক করতে গিয়ে জানাশোনা।

ইরা এমনিতে বেশ ডানপিটে, ভয়ডর খুব একটা পায় না। কঠিন সিদ্ধান্ত ভেবেচিন্তে ঠান্ডামাথায় নিতেই বেশি পছন্দ করে। তবে আসলে কি জানেন তো, ভুল যখন হয়, তখন গভীর চিন্তাশীল ব্যক্তিকেও চিত্তচাঞ্চল্যে পেয়ে বসে। ইরার ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। আশিকের সাথে ওর ঘনিষ্ঠতা হয়েছে কোনোরকম গৌড়চন্দ্রিকা ছাড়াই।

হঠাৎ একদিন বিতর্কের মহড়া শেষে আশিক বলল, ইরা, তুমি আমাকে ভালবাস? বিয়ে করবে?

ইরা তো অবাক। এই ছেলে বলে কী! কিসে তার মনে হলো ইরা তাকে পছন্দ করে! ভালবাসা তো অনেক দূর কা বাত!

ইরা কিছু না বলে হাসল। ভুল আসলে তার তখনই হয়েছে। বেসিক্যালি যারা ত্যাঁদোড় প্রকৃতির ছেলে, তারা খুব সহজেই হাসির নানারকম ‘মানে’ করে বসে থাকে। এই যেমন আশিক! ইরার ঠোঁটে হাসি তাকে শেরপা তেনজিং-এর মতো দুঃসাহসী করে তোলে। ও ধরে নেয়, এভারেস্টের চূড়া তার হাতের মুঠোয়। কারণ ইরা রেগেমেগে তেড়ে না এসে মায়াবী হাসি উপহার দিল।

ব্যস, কাহিনি শুরু হো গিয়া। ইরা না চাইলেও আটকাতে পারেনি আশিককে। ইরা চশমার ফাঁক গলে ভারিক্কি চালে বলল, দেখো আশিক তোমাকে হার্ট করা আমার ইচ্ছে নয়। কিন্তু আমি এখনও কিছু ভাবছি না। আই নিড অ্যা জব। ব্যাডলি।

ভাবছ না মানে! সেদিন তাহলে হাসলে যে ? আর চাকরি, ও তুমি পেয়ে যাবে।

কী করব তাহলে! তোমার কথা শুনে কাঁদব! অমনি ফিক করে হেসে ফেলে ইরাবতী।

একদম হাসবে না ইরা। তুমি জানো না, তোমাকে নিয়ে কত রঙ-বেরঙের স্বপ্ন সাজিয়েছি আমি। সহসাই আবেগ তাড়িত হয়ে পড়ে আশিক। গোল গোল চশমায় চোখঢাকা আপাতবুদ্ধিমান ছেলেটা।

ইরা মিটিমিটি হাসে। ছেলেরা বুঝি এমনই হয়! কত সহজে ওরা কাউকে ভালবেসে ফেলে! বাসা যায়! তাও আবার চট করে মুখে আনে। নির্লজ্জ কোথাকার!

ইরা ভাবছে বটে, তবে আশিকের সাহস তাকে আশান্বিত করে। মেনিমুখো পুরুষ ওর একদম পছন্দ নয়। কাউকে ভালবাসলে তাকে সেটা জানানোর বা বোঝানোর দায়িত্বও তারই। অবশ্যি দুদিক থেকে ব্যাপারটা হয়ে এলে মুখ ফুটে না বললেও চলে।

 

গ.

ইরা মুখে যতই না না করুক, প্রেমটা শেষমেষ ওদের হল। এক্ষেত্রে অবশ্যি সুকৃতি বা দুষ্কৃতি যা-ই বলুন, ওটা আশিকের প্রাপ্য। ইরাকে বাগে আনতে সে কম ঝুলোঝুলি তো করে নি!

ইরা শেষে আশিকের অফুরান চাপাচাপিতে নিমরাজি থেকে রাজি হয়। বা বলা যায়, ইরার মনে দয়ার ভাব জাগে। মানে বলতে চাইছি, আশিকের প্রতি ইরার আবেগ স্বতঃস্ফূর্ত নয়। অনেকটা আশিকের অনুরোধে ঢেঁকির বদলে য়ারোপ্লেন গেলার মতো।

এবার খুশি তো? টিএসসির ভিতরে পর্তুগিজ উপাসনালয়ের এক কোণে দাঁড়িয়ে আশিকের ঠোঁটে প্রথমবারের মতো ঠোঁট ছুঁইয়ে জানতে চেয়েছিল ইরা। খুব যে ভাল লেগেছে এমন নয়। বরং জিভে কেমন তিতকুটে স্বাদ পেল। আশিক তখন সিগারেট খেত। পরে ইরাই ছাড়িয়েছে। শ্লেষাত্মক সুরে বলেছে, বেকারের এসব বাবুগিরি মানায় না। নিজের গাড়িতে চেপে বেনসনের ধোঁয়া ওগড়াতে হয়, দশটাকা ভাড়ার রিকশায় নয়।

কথাটা ভীষণ আঁতে লেগেছে আশিকের। একটা সস্তা ধরনের খিস্তি দিয়ে তক্ষুনি সিগারেট ছাড়লো আশিক। ইরা বুঝে গেল, এই ছেলে আর যাই হোক, হিমালয় ডিঙাতে পারবে না। কারণ ভাল ছেলেরা কখনও সস্তা খিস্তিখেউর করে না। তাদের ব্যক্তিত্বে এক রকম দ্যুতি থাকে, আশিকের যা নেই।

তবে প্রথম চুমুর অভিজ্ঞতা আশিকের মনে উচ্ছ্বাস জুগিয়েছে। তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছে ছেলেটা। ইরা ভাবলো, ব্যাটা এ কাজে পটু বেশ। না জানি আরও কত মেয়ের ঠোঁটের কৌমার্য হরণ করেছে! ওর ঠোঁটে তিল আছে। একটা নয়, গোটা তিনেক।

হস্টেলের বান্ধবীরা এ নিয়ে ইরাকে কম খেপিয়েছে! প্রায়ই ওরা ফিচেল হেসে বলতো, কি রে, ডাইনিং এ যাবি ইরা! নাকি ভরপেট ইয়ে খেয়ে এসেছিস! তোর বয়ফ্রেন্ডের ঠোঁটে তো শুনেছি শতেক তিল।

ইরা খোশমেজাজে ওদের সবাইকে ঝাড়–পেটা করেছে। বিনিময়ে সবাইকে নিয়ে জন্মদিনে মাটন-কাবাব খাইয়েছে। সত্যি, ক্যাম্পাসের সেই দিনগুলো কতই না রঙিন ছিল! ভাবলে এখনও গায়ে শিহরন খেলে যায়।

আশিক দেখতে মোটেও অসুন্দর নয়। স্বাস্থ্যবান, দুচোখে বুদ্ধির দীপ্তিও ছিল। কিন্তু ইরা ক্রমশ বুঝতে পারে, ও চোখে দ্যুতি নেই, বড্ড নি®প্রভ। তবে কি ও ঘাটবদল করবে! আই মিন, নতুন কোনো দ্বীপে নোঙর ফেলবার পাঁয়তারা! বা নোঙর কোথাও ফেলতেই হবে এমন তো কথা নেই! থাক না কিছুদিন ছেঁড়া পালে মাতাল হাওয়ায় ভেসে ভেসে!

কিন্তু মেঘে মেঘে বেলা তখন অনেকটা গড়িয়ে গিয়েছে। চাইলেই কি সম্পর্কের বুকে যতিচিহ্ন এঁকে দেয়া যায়। আশিকইবা তা মানবে কেন! কিন্তু ভুল মানুষের সাথে ঘুরে ঘুরে ইরা তখন ক্লান্ত। একের পর এক চাকরির ইন্টারভিউ দিচ্ছে। কিন্তু কোনো কাজ মিলছে না। চাকরির বদলে ওরা ইরাকে দেখে জিভে সসস্ বিজাতীয় শব্দ তোলে! খট্টাস জানোয়ার!

ইরা সবচেয়ে বেকায়দায় পড়ে যখন বাবা তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকেন। তিনি বুঝতে পারেন, খুব সহজে মেয়ে তার চাকরি পাবে না। মেয়েকে নিয়ে তার যে স্বপ্ন ছিল, তা বুঝি দিবাস্বপ্নের মতো অধরাই থেকে যাবে। তিনি তাই ঠিক করলেন, চোখ বোজার আগে মেয়েকে কোথাও পাত্রস্থ করবেন।

ইরার আজকের এই পরিস্থিতির জন্য আশিকেরও কি কোনো দায় নেই! ইরাকে ও কখনও বুঝতেই চায়নি। বা বোঝার মুরোদ ছিল না। প্রেমিক হিসেবে সে যতটা বিশ্বস্ত, পুরুষ হিসেবে ঠিক ততটাই অপদার্থ। ওর চাকরি নেই, পাবার চেষ্টাও করেনি ঠিকমতো। বরং ইরার টিউশনির টাকায় মেসভাড়া দিয়েছে। দিনের পর দিন ওর পেছনে আঠার মতো লেগেছিল, ইরা যদি সদয় হয়ে তাকে দুটো ড্রেস কিনে দেয়! ছি! এমন কাপুরুষ আশিককে সে কি করে ভালবাসবে!

লজ্জার মাথা খেয়ে শেষে একদিন বলে বসল ইরা, এভাবে ঠিক যাচ্ছে না আশিক। চলো, এবার ছুটি!

ছুটি মানে! তুমি কী বলতো চাও? গোঁয়াড়ের মতো খেপে ওঠে আশিক।

ছুটি মানে ছুটি! বেকার অবস্থায় তুমি তো আমাকে বিয়ে করতে পারবে না। মিছে কেন তবে পথ আগলে থাকা। চলো এবার যে যার পথ চিনে নেই। নিরুত্তাপ গলায় ইরা বলল।

ডু ইউ মিন ইট ইরা? অদ্ভুত চোখে তাকায় আশিক।

কেন নয়! আর কতকাল আমি তোমায় পুষবো বলো তো! পরিবারের প্রতিও আমার কিছু কর্তব্য আছে, নয় কি! এবার আমাকে ছুটি দাও আশিক।

ইরার কণ্ঠ বলে দেয়, সে মোটেও ফান করছে না। শুরুতে খানিক ঘাবড়ে যায় বেকার যুবক আশিক। কিন্তু ইরা তখনও জানত না, আশিক কেবল একজন ব্যর্থ যুবকই নয়, মানুষ হিসেবেও সে খুব ইতর প্রকৃতির। বলা যায়, জীবনে এই প্রথম ইরা কারও কাছে প্রতারিত হয়।

আশিক এতকাল তাকে ব্যবহার করে এসেছে। ওর কুরুচির পরিচয় পেয়ে আঁতকে ওঠে ইরা।

ও জান্তব গলায় বলল, চাইলেও তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না সোনা। ইউ আর মাই কেপ্ট।

তার মানে? ভড়কে যায় ইরা।

বুঝলে না! আমি তোমাকে খুশি করেছি, বিনিময়ে তুমি আমার মেসভাড়া দিচ্ছো, খাওয়াচ্ছো। এর নাম বার্টার সিস্টেম। আদিকাল থেকে চলে এসেছে। চলতেই থাকবে।

নাহ, আমি এর শেষ দেখতে চাই।

পারবে না। তারচেয়ে বরং এটা দেখো। শেয়ালের গলায় আশিক বলল। তারপর ওর চোখের সামনে চালু করল এক টুকরো ভিডিও ক্লিপ। আশিকের সাথে ইরার বিশেষ মুহূর্ত।

ছি! ভয়ে ইরা চোখ বন্ধ করে। কিন্তু অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে! লজ্জায় ঘেন্নায় ওর মরে যেতে ইচ্ছে করে! এই ছেলেকে সে বিশ্বাস করে ভালোবেসেছিল! এও কি সম্ভব!

 

ঘ.

আশিকের সাথে ওর যোগাযোগ আপাতত বন্ধ। ইরা ভাবল এই সমস্যার আদৌ কোনো সমাধান নেই। আশিক তাকে ছাড়বে না। ওর গ্রামের বাড়ির খবর নিয়ে জানলো আশিকের বাবা সামান্য চৌকিদার। তার নামে ছিঁচকে চুরির অভিযোগ আছে। তার মানে আশিক জন্মগতভাবে ছোটলোক। ও কখনও শোধরাবে না।

সুইসাইড! ইয়েস, খুব সহজেই নিজেকে নিঃশেষ করা যায়। তাহলে আর কোনো আপদ থাকে না। কিন্তু বাবা যে খুব কষ্ট পাবেন! ইরাকে নিয়ে তার এত স্বপ্নসাধ সব মিথ্যে হয়ে যাবে!

এই লজ্জার কথা কাকেইবা সে বলবে! এসব কথা কহতব্য নয়!

অবশেষ তীর খুঁজে পায় ইরা। প্রাক্তন রুমমেট লাইসা সাহায্যে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এল। সব শুনে বলল, অন্যের অপরাধে নীরবে বিদায় নেয়াটা কোনো কাজের কথা নয়। তাকে শাস্তি পেতে হবে। জীবনটা এ সস্তা নয় রে ইরা। খোলামকুচির মতো যেখানে সেখানে ছড়িয়ে দিবি!

কী করব বল? আমার কী দোষ? ঘোলাটে চোখ মেলে তাকায় ইরাবতী।

দোষ তুই একটা করেছিস, আবার করিসওনি। মানুষ চিনতে ভুল করেছিস ইরা। বা বলা যায় ভুল মানুষকে আপন মনে করে জায়গা দিয়েছিলি! কিচ্ছু ভাবিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি তোর পাশে আছি।

সত্যি বলছিস! লাইসার কথায় খানিক ভরসা পায় ইরা। চরম অপরাধ করেছে আশিক। এর যোগ্য শাস্তি ওর পাওনা। পেতেই হবে। ইরা নিজে থেকে তো ওর কাছে যায়নি! আশিকই বরং ইনিয়েবিনিয়ে এমনকি দূরে কোথাও হারিয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে বাগিয়ে নিয়েছে ইরাকে।

মানুষ তো! ইরা তাই ফেরাতে পারেনি ছেলেটাকে। এখন বুঝতে পারছে, এটা ওর এক রকম শখ কিংবা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। পেশাদার ফ্রডের মতো আচরণ করছে আশিক। দুঃখে দুর্বিপাকে পাশে নেই, অথচ টাকার দরকার পড়লেই ইরাকে তার মনে পড়ে!

অপরচুনিস্ট একটা! ঘৃণায় মুখ বিকৃত করে ইরা। লাইসা ঠিকই বলে, এত সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে নেই। পরে পস্তাতে হয়। মানুষের স্বভাবটাই এমন, বসতে পেলে শুতে চায়।

কিছুদিন খুব খারাপ কেটেছে ইরার। জোর করে হলেও আশিকের খুব কাছে এসে গিয়েছিল ইরা। আগুন আর ঘি পাশাপাশি থাকলে যেমন হয় আর কি! দুজনের আবেগ অনুভূতিগুলো কেমন করে যে শরীর-মনের ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে গেল, টের পায়নি ইরা। হঠাৎ এক সময় বুঝতে পারে আশিকের উপর সে নির্ভর করতে শুরু করেছে। ছোটখাটো নানাবিষয় আশিকের সাথে শেয়ার করতে মন চায়। ভাল-মন্দ দুটোই যেন এখন আর তার একার নয়। খুব কাছের কেউ ভেবে নিভৃত গোপন কথাটিও ইরার আর আপন থাকে না, নিমিষে দুজনের যৌথ সম্পত্তি হয়ে যায়।

কী হল, অমন মুখ গোমড়া করে আছিস যে! মন খারাপ? নীলক্ষেতে যেতে যেতে ইরাকে শুধায় লাইসা।

না রে, কিছু না। চুপ মেরে যায় ইরা। তারপর নিজে থেকেই আবার বলে, আচ্ছা লাইসা তুই বল তো, আশিক আমাকে সত্যি ভালবেসেছিল? নাকি পুরোটাই ওর ভ-ামি!

লাইসা কী বলবে! ছেলেটাকে সে ভাল করে জানেই না। উল্টো সে বলে, তোর কী মনে হয়, বছরের পর বছর ও তোর সাথে অভিনয় করে গেছে! জাস্ট অ্যাক্টিং!

কী জানি, হবে হয়তো! তাহলে বলতে হয় আশিক খুব ভাল অভিনেতা। নিখুঁত ভালবাসার ভান করে গেছে। কিচ্ছু বুঝতে দেয়নি।

মে বি। নেতা আর অভিনেতার মাঝে মিলটা এখানেই। এদের দুজনের কেউই মনের কথা পাবলিককে ঠিকঠাক বুঝতে দেয় না। পাছে মুখোশের আড়ালে আসল চেহারা ধরা পড়ে যায়! মিথ্যে গপ্পো আর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে বেঁধে ফেলে অপরের মন।

ইরা চেপে গেলেও লাইসা ক্ষমা করে না। সে বলে, ছেলেটা শুধু ফ্রড নয়, ও তোকে অ্যাবিউজ করেছে ইরা। কতটা নীচ হলে সে ওসব ভিডিও রেকর্ড করে রাখতে পারে তুই ভাবতে পারিস। কী করে ও এটা করতে পারলো! আই জাস্ট কান্ট থিঙ্ক ইরা। এর মানে কী জানিস?

কী? ইরার নিজেকে বেকুবের মতো মনে হয়। মানুষের উপর বিশ্বাস তো উঠেই গেছে। এমন কি নিজের উপরে বিশ্বাসটুকু আর অটুট নেই। আশিক এভাবে তাকে ভাঙতে পারলো!

লাইসা ইরার মনের কথা বোঝে। বন্ধুকে কষ্ট দিতে ওর মন সায় দেয় না। ওর যত রাগ আশিকের উপর। ব্যাটা একটা মিচকে শয়তান। এক নম্বর ঘুঘু। সবার সামনে সে বিনয়ের অবতার। যেন ইরা ছাড়া কিচ্ছুটি বোঝে না। লাইসা ইরার যত ক্ষোভ উসকে দিতে বলল, এর একটাই মানে হয় ইরা। আশিক শুরু থেকেই তোকে টার্গেট করেছিল। ভোলাভালা পেয়ে ও তোকে ট্রাপে ফেলবে।

ট্র্যাপ! মানে ফাঁদ? এসব কী বলছিস তুই? ইরা যেন আকাশ থেকে পড়লো। মেয়েটা আসলেই বড্ড সরল।

ওর দুচোখে বিস্ময় দেখে লাইসা আরো খেপে যায়। হিসহিসিয়ে বলে, এখনও তোর শিক্ষা হয়নি ইরা! আশিককে তুই চিনতে পারিসনি! গেল ক’বছরে ও তোর থেকে কত টাকা নিয়েছে হিসাব কর। আমরা কেউ ঘাসে মুখ দিয়ে চলি না। তুই না বললেও জানি, মাসের ঠিক দুতিন তারিখ আশিক তোর হলের গেটে এসে হানা দিত। মাসোহারা চাই, মেসের ভাড়া দিতে হবে। মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হয়েছে। টাকা চাই, নতুন বই কিনতে হবে। কী, ঠিক বলছি না? ইরার চোখে চোখ রাখে লাইসা। ও চোখে মুক্তোদানার মতো ঝুলে থাকে টলটলে অশ্রু।

ইরাকে কষ্ট দিতে আর সাহস হয় না লাইসার। ইরার কাঁধে সে আলতো হাত রাখে। প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে, একদম ভাঙবি না। জীবনের এখনও অনেকটাই বাকি। হাভানা বিচের সেই বৃদ্ধ জেলে সান্তিয়াগোর কথা মনে নেই! দীর্ঘ তিনরাত সে আঠার ফুট লম্বা হিংস্র মারলিন মাছের সাথে লড়াই করে শেষে জয়ী হয়। চলার পথে দু’একটা হাঙর-কুমির এসে যেতেই পারে। তাই বলে হার মানতে হবে! কভি নেহি।

ইরা লাইসার কাঁধে নিজেকে লুকোয়। তখনও সে জানে না তার আগামী আরও বন্ধুর। অনেক বেশি বিপদসংকুল। আরও অনেক কিছু তার জানার বাকি। তবে মনে মনে একটা ডিসিশান নিয়ে ফেলে ইরা, আশিককে সে ছাড়বে না। শাস্তিটা ওর জন্য ফরজ হয়ে গেছে।

 

ঙ.

গাড়ি এগোয় এয়ারপোর্টের পথে। দ্রুত গতির ট্রেনের মতো ফ্ল্যাশব্যাকে চিন্তার ঘুণপোকা কামড়ে চলে ইরার মগজ।

ইউনিভার্সিটির পাট চুকিয়ে বন্ধুরা যে-যার মতো ছিটকে যায় চেনা বলয় থেকে। আর কারও সাথে খুব একটা যোগাযোগ হয়ে ওঠে না। তবে ফাঁদে আটকে থাকে কেউ কেউ। ইরার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই। ওর ধারণা, যাদের জীবনে অফুরান সুখ বা করার তেমন কিছু নেই, তাদের সময় কাটানোর জন্য ফেসবুক একটা ভাল বিনোদন-বন্ধু হতে পারে। জীবনে ফেসবুকের প্রয়োজন এরচেয়ে বেশি কিছু নয়। বিশেষ করে ইরার মতো মেয়েদের জন্য, যে কিনা নিজের মতো লুকিয়ে থাকতে চায়।

গর্তজীবী! শব্দটা ইরারই সৃষ্টি।

বেড়ে বলেছিস। সায় দেয় লাইসা। ও কিন্তু ইরাকে ছাড়েনি। সেই কবে কোনো এক বন্ধুদিবসে আগস্টের প্রথম রোববার কথা দিয়েছিল, বন্ধু পাশে আছি, থাকব।

ওদের দুজনের মাঝে একটা ব্যাপারে ভীষণ মিল। ইরা ও লাইসা যথেষ্টই পুরুষবিদ্বেষী। তবে কি লাইসার জীবনেও কোনো প্রতারক এসেছিল! ইরা জাস্ট অনুমান করে, তবে নিজে থেকে কখনও জানতে চায়নি। এসব বিষয়ে অকারণ খোঁচাখুঁচি ভব্যতার মধ্যে পড়ে না।

ইরা ও লাইসা একসাথে থাকে। ছোট্ট দুরুমের বাসা নিয়ে। চাকরি এখনও কারও হয়নি, তবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। লাইসার দম আছে। ও একের পর এক ডিগ্রি নিচ্ছে। ডিপ্লোমা বাগাচ্ছে। ভাল চাকরি পেতে গেলে নিজেকে তৈরি করতে হয়। শর্টকাট রাস্তা ওর পছন্দ নয়। সে পথে হাঁটবে না লাইসা।

ফেসবুকে লাইসা সরব নয়। তবে মাঝে মাঝে দেখে বেকুব কিসিমের কিছু ছেলেমেয়ে টয়লেটে যাবার আগে ও পরে স্ট্যাটাস দেয়- ‘ভারমুক্ত হলাম’। কিংবা প্রেয়সীর হাতে সপাটে চড় খেয়ে লেখে, ‘বড্ড লেগেছে গো! মেয়েদের হাতে এত জোর জানা ছিল না।’ এদের খেয়েবসে কোনো কাজ নেই! নাকি সব গৌরি সেনের নাতি!

ইরা এসব শুনে হাসে। মৃদু ফেকাসে হাসি। ওর বাবার কথা মনে পড়ে। বাবার শরীরটা মোটেও ভাল যাচ্ছে না। বাবা তাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছে! কতো কী ভেবেছে! অথচ কিচ্ছু করতে পারলো না ইরা!

লাইসা ভরসা দেয়, বেটার ডেজ উইল কাম সুন, ইরা। আমরা চাকরির আশায় একের পর এক দরজায় কড়া নাড়ছি, কিন্তু সঠিক দরজাটা হয়তো এখনও খুঁজে পাইনি। তবে পাবো। খুব শিগগিরই।

লাইসার পজিটিভ মানসিকতা ইরাকে আবিষ্ট করে। সত্যি, মেয়েটা লড়তে জানে। জীবন মানেই তো যুদ্ধ। কেতাবি শোনালেও এটাই সত্যি।

বাবার পরামর্শে ইরা এখন বিসিএস নিয়ে ভাবছে। সিভিল সার্ভিস। খুব সম্মানের চাকরি। যেমন ভারতে আইসিএস। বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। কেউ কেউ অবশ্য সরকারি চাকরির খুব নিন্দেমন্দ করে। ইরা খোঁজ নিয়ে জেনেছে, এই নিন্দুকের তালিকায় যারা, তারা অন্তত চার পাঁচবার বিসিএস ট্রাই করেছে। ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে নি, তাই এখন বলছে সরকারি চাকরি খারাপ।

কেউ কেউ অবশ্য প্রিলিমিনারিতেই টেকেনি। তারা আরও খাপ্পা। সরকারের গোলাম হওয়ার চেয়ে নাকি সেলুন খোলা ভাল। কোনো মানে হয়! ব্যর্থতা মেনে নিয়ে নাক-কান মূলে নিজের কাজে মন দাও না কেন! ধরে নাও সবাই সব কিছু পারে না। করতেও নেই। ব্যস!

লাইসা করপোরেট কুইন হতে চায়। তবে সেও বিসিএসএ’র ফ্যান। বিয়ে যদি করতে হয় তো কোনো সরকারি কর্তাকেই করবে। স্ট্যাটাস আছে। ঠিকঠাক কাজ করলে প্রোমোশনও মেলে। অঞ্চল ও স্বজনপ্রীতি, তেলবাজি কিছু থাকলেও যোগ্য লোকের ভাত এখনও মরেনি। দেশটা চালাতে হবে তো! শুধু তেলে তো দেশ চলে না। গ্রে ম্যাটার চাই, মগজ।

হঠাৎ সেদিন রেগেমেগে বাসায় ফেরে লাইসা। যে কিনা প্রায়ই বলে, কখনও রাগবি না ইরা। রেগে গেলে তো হেরে গেলে।

পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে ইরা। ও তখন প্রিলি নিয়ে ব্যস্ত। বাবার একটা স্বপ্ন অন্তত তাকে পূরণ করতে হবে। ক্যাজুয়ালি বলল, কী হয়েছে রে লাইসা? এনিথিং রঙ? রাস্তায় হঠাৎ জুতোর ফিতে ছিঁড়ে গেছে, নাকি কেউ পা মাড়িয়ে দিয়েছে!

লাইসা চুপ। ইরা চোখ তুলে দেখে, ও কাঁদছে। রীতিমতো শব্দ করে। তার মানে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটেছে। নইলে লাইসার মতো শক্ত ধাতের মেয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদবে কেন!

বল না বোন, কী হয়েছে? আমাকে বল।

ধাতস্থ হতে কিছুটা সময় নেয় লাইসা। ওয়াশরুমে যায় (ভাগ্যিস ও ফেসবুকে অ্যাক্টিভ নয়। তা হলে হয়তো এক্ষুনি স্ট্যাটাস দিয়ে ফেলতোÑ আম ইন টয়লেট, উইদ থ্রিজি ইন্টারনেট), চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে আসে।

এবার বল কী হয়েছে। ইরা ফ্রিজ খুলে ওর জন্য ডাবল কিউব মিক্সড ফ্লেভার আইসক্রিম নিয়ে আসে। ইরা মেয়েটা তাকে বোঝে। দুয়ের মাঝে নিশ্চয়ই কোনো অদৃশ্য বাঁধন রয়েছে।

লাইসা যা বলল তা শুনে রাগে সারা গা চিড়বিড় করে ইরার। স্বগতোক্তির মতো বলে, ওরা মানুষ, নাকি আমাজন জঙ্গলের জানোয়ার!

ঘটনাটা অনেকটা এ রকম-

একবুক আশা নিয়ে লাইসা আজ একটা সাক্ষাৎকার পর্বে হাজির হয়েছিল। কোম্পানিটি নতুন। দেশিয় কোম্পানি। কনজুমারস প্রডাক্ট, লোকাল কনজাম্পশনের পাশাপাশি তারা এক্সপোর্ট করতে চায়। মিডলইস্ট ওদের সম্ভাব্য মার্কেট। লাইসার পদের নাম মার্কেটিং এগজিকিউটিভ, ওভারসিজ পোস্ট। বিদেশিদের সাথে তাকে ইন্টারফেস তৈরি করতে হবে। ভাল ইংরেজি জানা লেডি অফিসার চাই।

ভাল কথা, লাইসা বোর্ডের সামনে যেতেই শুরু হল আপত্তিকর উঁকিঝুঁকি। যেন চাকরিপ্রার্থী নয়, ওরা সেই মান্ধাতার স্টাইলে বিয়ের কনে খুঁজছে।

শুরুতেই প্রশ্ন, আপনে অ্যানাউল শেলেরি কত চান? কত দিতে অইবো?

লাইসা ভাবলো এর সম্ভবত জিভে প্রবলেম তাই স্যালারি বলতে পারছে না। এমন অনেকেরই হয়। অঞ্চলভেদে বা জন্মগত কারণে। কিন্তু ‘অ্যানাউল’ জিনিসটা কী! খায় নাকি চুলে দেয়!

লাইসার মনটা ভীষণ খারাপ হল। ও এবার বেরোতে পারলে বাঁচে। ভিক্ষার কাজ নেই, কুত্তা ঠেকাও।

এরা তার বার্ষিক বেতন জানতে চায়। ব্রিটিশ স্টাইল, গুড। লাইসা চার পাঁচ লাখ কিছু একটা বলল।

পরের প্রশ্ন আরও কৌতূহলোদ্দীপক বা বলা যায় রুচির বিচারে নিম্নগামী। বলে কিনা, আপনি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন। সে কি ঘোড়া নাকি, ঘণ্টার পর ঘণ্টার দাঁড়িয়ে থাকবে! বেআক্কেল কোথাকার! লাইসা তখনও ধৈর্য হারায়নি। কারণ চাকরিটা ওর দরকার। সে উদ্ভট প্রশ্নের উত্তরে অর্থবোধক কিছু একটা বলল।

এর পরের প্রশ্ন শুনে যে কারও মাথায় গ্রহ-নক্ষত্ররাজিসহ আকাশ ভেঙে পড়বে। খচ্চর লোকটা বলে কি না, আপনার কোমরের মাপ কত! একেবারে খাঁটি বাংলায় স্পষ্ট উচ্চারণ। লাইসা ভাবলো, সে ভুল শুনছে না তো! এ কেমন আজগুবি কথা!

এর পরে হয়তো ওর আপার পার্টের বিবরণ জানতে চাইতো। সেই সুযোগ অবশ্য লাইসা দেয়নি। ডানহাতের চেটোয় সবটুকু শক্তি জড়ো করে কষে মারলো এক থাপ্পড়। বিরাশি শিক্কা যাকে বলে। ব্যাটা রিফ্লেক্স অ্যাকশনে ভাল। নইলে খবর ছিল। সে ডাক মেরে মাথা নুইয়ে দিল। চড়টা ব্যাটে-বলে হয়নি। একটুর জন্য ফসকে গেল। নইলে বাসায় গিয়ে আজ বউয়ের কাছে মুখ দেখাতে পারত কিনা সন্দেহ।

কিন্তু কী আশ্চর্য, এই ঘটনার পর লাইসার দুচোখ ফেটে কান্না এলো। যা তার স্বভাবের সাথে একদম যায় না। অন্যায় করলো একজন, আর তার শাস্তি পাচ্ছে কিনা লাইসা! এ কেমন ধারা কথা! কিন্তু আদতে তাই হল। লাইসা নিজেকে সামল দিতে না পেরে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলল।

অথচ বাইরে থেকে অফিসের চাকচিক্য দেখে মোটেও বোঝার উপায় নেই, ভেতরে কতগুলো হুমদোমতো রুচিহীন ভোঁদর বসে আছে, ইন্টারভিউর নামে ইভটিজিং যাদের অন্যতম পেশা।

এই আমাদের সভ্য শহর ঢাকা। রাস্তায় নেমে আনমনে ভাবে লাইসা, এই শহরে কি না থাকলেই নয়! ওর ধারণা, অন্তত লাখ পঞ্চাশেক লোক এখানে এমনি পড়ে আছে। তাদের কিচ্ছু করার নেই। ভাসমান শ্যাওলার মতো শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে বেড়ায়। কাজ ওরা করে না। স্রেফ অকাজে মজে থাকে। অবশ্যি কিছু চালিয়াতও আছে শহরে, রঙিন মুখোশে ঢাকা তাদের আসল চেহারা। দিনের আলোয় এদের চেনা কঠিন। লাইসা ও ইরা কিছু কিছু চিনতে শিখেছে। এদের সংখ্যা এত বেশি যে চটজলতি চিনে ওঠা কঠিন।

 

চ.

কাহিনি শুনে ইরা হাসবে কি কাঁদবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।

এমন ঘটনা ওর সাথে ঘটলে কী করতো তা-ই হয়তো ভাবছে। এসব গাধার বাচ্চাদের কে পয়দা করেছে বলতে পারিস ? শেষে লাইসা নিজেই বলল।

গাধার বাচ্চা না, বল্ বরাহনন্দন। ইরা মুচকি হেসে বলল।

ওদের বাংলাজ্ঞান ভাল। হালের ডিজুস উচ্চারণে ওরা অভ্যস্ত নয়। বরাহনন্দন! যা বলেছিস! মনে মনে খুশি হয় লাইসা। ওর কষ্ট ইরা না বুঝলে আর কে বুঝবে! লাইসা ঠিক করলো, বাচ্চাদের স্কুলে পড়াবে। এসব চাকরিফাকরি ওর পোষাবে না। কিন্তু তা-ই বা দিচ্ছে কে! বা টিচিং-এর কাজ পেলেও তাতে যা বেতন তা দিয়ে বাসার ভাড়া উঠবে না। খাবে কী!

লাখ টাকার প্রশ্ন। মধ্যবিত্তের এই এক প্রবলেম। এদের দুচোখে বেশুমার স্বপ্ন থাকে, জীবদ্দশায় যার একটাও পূরণ হয় না। কেউ কেউ বলে, মানুষ নাকি তার স্বপ্নের সমান বড়। আরে ভায়া, বাতাসে স্বপ্নের ফানুস উড়িয়ে কি পেট ভরে! করে খেতে হয়!

বারবার টিচিং শব্দটা বলতে গিয়ে আলজিভে আঘাত লাগে। ফলে এক চমৎকার শব্দ তৈরি হয় ইরার ঠোঁটে। টিচিং-এর বদলে চিটিং। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেবে! ভরসা পায় না। শিক্ষকদের সেই সম্মান আর এখন নেই। তারা বলে কিনা, স্রেফ সালাম আর সম্মান ধুয়ে খেলে জীবন চলে! টাকা চাই, অঢেল টাকা। তাই এখন অনেকেই গুরুগিরি ছেড়ে ব্যবসায় নেমেছে। নিয়মিত ক্লাস কামাই করে বাসায় ওয়াজ মাহফেল বসাচ্ছে। এক সিটিং এ শখানেক ছাত্র পড়ায়, ছাত্র কিছু শিখুক বা নাই শিখুক, মাস শেষে মায়েদের কাছ থেকে কড়কড়ে নোট গুনে নেয়। একে আপনি চিটিং বলবেন না তো কী বলবেন, ধর্মসভা!

এভাবে আরও কিছু দিন যায়। ইরা বিসিএস এর স্বপ্নে বিভোর। সাথে দুটো প্রাইভেট পড়ানো। বাসায় গিয়ে ছাত্র ঠোঙানোর এই কাজটা বেশ জোটে এই শহরে। লাইসা এখনও হাল ছাড়েনি, তবে মাঝে মাঝে ভাবে, চাকরির চেষ্টায় ইস্তফা দিয়ে বিজনেস জাতীয় কিছু ভাবলে হয়!

সে কি! তুই ব্যবসা করবি লাইসা। অ্যা বিজনেস লেডি! ইজ ইট ট্রু! ইরা দুচোখ উল্টে এমন ভাব করলো যেন ওটা ব্যবসা নয়, পাবলিকের পাছায় অপরিষ্কার বাঁশ দেয়া।

অনেকটা তাই। আজ পেপারে দেখিসনি, ওষুধ কোম্পানির মালিকের কুড়ি বছরের জেল। অপরাধ কী- বিষাক্ত উপাদানে তৈরি প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে ৭৬ শিশুর মৃত্যু। ভাবা যায়!

আসলে ওরা মানুষ না, জানোয়ার। মুনাফার লোভে ওরা বাচ্চাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। ওদের ধরে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেয়া উচিত।

লাইসা বন্ধুর সাথে একমত হয়। আইন সবার জন্য নয়, আইন মানুষের জন্য। যারা কসাই বা জানোয়ার, তাদের জঙ্গলের নিয়মে বিচার হওয়া উচিত। নো এফআইআর, নো চার্জশিট, সোজা ফায়ারিং স্কোয়াড বা প্রকাশ্যে ফাঁসি।

রাত জেগে খুনসুটি করে ওরা। কত কথা বলে, সো কল্ড সভ্য সমাজের পোস্টমর্টেম করে ছাড়ে। ইরা জানতে চায়, তা কিসের ব্যবসা ফাঁদবি শুনি?

ব্যবসা ফাঁদব মানে! এটা কি গল্পের প্লট যে ফাঁদা যায়! ফাজলামো হচ্ছে, তাই না! লাইসা চোখ পাকায়।

ইরা অবশ্য মনে করে এই ওভারপপুলেটেড শহরে তিনখানা ব্যবসা ফাঁদলেই জমে যাবে। এই যেমন ধর বাচ্চাদের স্কুল, ফাস্টফুডের দোকান আর খেয়ে খেয়ে হয়রান রোগীদের জন্য হাসপাতাল বা ক্লিনিক।

তা যা বলেছিস। আমার এক মামা আছে জানিস তো। এক নম্বর হাড়কেপ্পন। দুটো টাকা আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে না। তিনি পেশায় ডক্টর।

কিসের ডাক্তার, পাইলস নাকি নাড়িভুঁড়ির? মজা করে বলল ইরা।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। যদি বলি মামা কেমন আছেন, করোলা ভাজার মতো তেতো মুখ করে বলবে, কেমন আর থাকি বল। এবারে শীতটাও এমন পড়েছে যে মানুষের রোগ-বালাই কিছু হয় না। রোগী না থাকলে ডাক্তারের আর থাকল কী! স্রেফ হরিমটর মুখে নিয়ে বসে থাকা। এভাবে বাঁচা যায় বল।

তোর মামা কি আসলেই ছাপোষা? মানে খুবই গরিব! একদম হাতযশ নেই! নাকি স্লোগান গেয়ে টুকলি মেরে স্রেফ পলিটিক্যাল কোটায় পাস করেছে? ইরার ঠোঁটে হাসি।

আরে না না, ডাক্তার মন্দ নয়। তবে কসাই, বুঝলি। পাঁচ মিনিট রোগী দেখে সাতশ টাকা ভিজিট নেয়। কোনোরকম বাছ-বিচার নেই। রোগীর দিকে ভুলেও তাকায় না, পাছে বেহাল দশা দেখে মন দুর্বল হয়ে যায়। ভিজিটে টান পড়ে।

হা হা! নিজের মামাকে নিয়ে এসব বলতে তোর খারাপ লাগে না? ইরা যুগপৎ বিস্মিত ও লজ্জিত। লাইসা আরও বলল মামার সম্পত্তি কিছু কম নেই। এই শহরে গোটাতিনেক বাড়ি, দুখানা ব্র্যান্ডনিউ গাড়ি হাঁকায়। একটাই ছেলে তার, একটু ‘বি’ টাইপ।

বি টাইপ মানে? লাইসার কথা শুনে অবাক হয় ইরা। মেয়েটা এমন মজা করে কথা বলে!

মানে বোকা টাইপ। বলতে পারিস অটিস্টিক। অবশ্য এ নিয়ে মামির কোনো ভাবনা নেই। তিনি ঘুরে ঘুরে শপিং করেন আর ফাস্টফুড খান। খেয়ে খেয়ে চেহারাটা যা বানিয়েছেন না! দেখতে পুরো ঢাকের বায়া। নানরুটির মতো গোলাকার মুখে ইয়া মোটা বেঢপ শরীর! জাস্ট অ্যা লাম্প অফ ফ্লেশ। লাইসা দুহাত প্রসারিত করে মামির সাইজ দেখায়। হেব্বি মজা পায় ইরা।

পরক্ষণে কেমন দার্শনিক হয়ে ওঠে ইরা। ওর ভীষণ বাবার কথা মনে পড়ে। একেলা গাঁয়ে পড়ে আছেন। ভালমন্দ কিছু খেতে পান কিনা কে জানে! সংসারে এমন হয়। যার অনেক আছে তার খাবার লোক নেই। আর যার কিচ্ছু নেই, তার শুধু খাইখাই স্বভাব।

লাইসার মুড আজ ভীষণ খারাপ। কেন, কী হয়েছে ? বিসিএস গাইড মুখস্থ করতে করতে জানতে চায় ইরা। আজ ওদের স্টারে কাবাব খেতে যাবার কথা। ওখানে খাবারটা সস্তা, মানেও মন্দ নয়। মালিক বলে, সে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নাকি খাসি জবাই করে। নো বিফ, নো ভেড়া বা গণ্ডার! শুনে ভাল লাগলো। সস্তায় বেচে বলে ছাত্র-ছাত্রীরা তার পছন্দের কাস্টমার।

আসলে ব্যবসায় নামলেই হয় না, ব্যবসা বুঝতে হয়। বেশি বিক্রি, কম লাভ। এটাই নীতি হওয়া উচিত। অটোমোবাইল কোম্পানি ফোর্ডের মালিক হেনরি ফোর্ড একটা দামি কথা বলেছেন। যে ব্যবসায়ী শুধু মুনাফার কথা ভাবে, কাস্টমারের হক নয়, ওটা সবচেয়ে খারাপ ধরনের ব্যবসা। এ ব্যবসা দীর্ঘদিন টেকে না। মানুষের হক মেরে আর কতদিন! ধম্মো বলে একটা কথা আছে না!

তা লাইসার মন খারাপ কেন! ইরা উৎসুক চোখে তাকায়। ওর ধারণা, আজও বেআক্কেলে কিছু ঘটেছে। লাইসার কর্মকা- তাকে বিপুল আনন্দ দেয়। এমন সাদামনের মেয়ে ও আর দেখেনি।

আর বলিস না ইরা, পুরো শহরটা যেন লঙ্গরখানার চেহারা নিয়েছে। পাতালপুরির দৈত্য এসে সভ্যভব্যতা যেন সব ঝেটিয়ে বিদায় করেছে।

আরে হয়েছে কী বলবি তো! ইরা উসখুস করে। তোর কারণে আজ স্টারের কাবাব মিস হল।

শোন তবে। রোজ যে বাসায় ছাত্র পড়াতে যাই, ওই যে ফাস্টফুড বয়, ফুটবলের মতো দেখতে। আজও গেলাম। কলবেল চাপলাম। একবার নয়, কয়েকবার। ভেতর থেকে কারও কোনো সাড়া নেই। অবশেষে বিরক্ত হয়ে বেল টিপেই ধরে আছি। অমনি ভেতর থেকে হেড়ে গলায় একজন বলল, মাফ করো।

ভাব একবার, বলে কি না মাফ করো। আমি ভিক্ষুক! অথচ ওরা জানে এই সময় আমি পড়াতে যাই। এত খারাপ লাগলো তোকে বলে বোঝতে পারব না।

যুক্তির বিচারে হয়তো এটা সামান্য ভুল। কিন্তু আমি ঠিক করেছি ওখানে আর যাব না। এমন অপমান মেনে নেবার মতো মনের জোর আমার নেই রে ইরা।

মানে তুই হেরে গেলি লাইসা! এটা নিশ্চয়ই আশিকের অপমানের তুলনায় মোটেও বেশি নয়। ইরা তাকে বোঝাতে চেষ্টা করে।

ড্রপ ইট ইরা। সিদ্ধান্তটা এবার আমাকেই নিতে দে। তারপর একটু থেমে বিরস মুখে বলল, খিদে পেয়েছে, কিছু খাব।

ইরা আর কিছু বলে না। ও বুঝতে পারে, লাইসার মন সত্যি খারাপ। ও কিচেনে ঢুকে ঝটপট কিছু নুডলস রেঁধে আনে। পেট ঠান্ডা হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

 

ছ.

অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে, তাই না! ড্রাইভার আবদুল তখনও জ্যামের রাস্তায় পথ করে নিতে ব্যস্ত। চারদিকে প্যাঁ পোঁ হর্নের শব্দে কান পাতা দায়। উসখুস করে ইরা। বান্ধবী লাইসা ও তার ভাড়াটে সহযোগী এয়ারপোর্টে অপেক্ষমাণ। ওরা দুজন লোকের উপর সতর্ক দৃষ্টি বোলায়। একজন আশিক, ইরার প্রাক্তন প্রতারক প্রেমিক। আর অন্যজন…?

ইরা আবারও স্মৃতির সাগরে ডুব দেয়। ফিরে যায় একবছর আগেকার সেই ছোট্ট দু’রুমের বাসায়, যেখানে কিনা ইরা আর লাইসার বৃত্তবন্দি জীবন নীরবে গুমরে মরে। প্রাইভেট টিউশন ছেড়ে লাইসা তখন কাঠ বেকার। ও কিছু একটা করতে চায়। ব্যবসার ভূত তখনও ওর মাথা থেকে নামেনি। কিন্তু ব্যবসা করতে পুঁজি চাই, অনেক টাকা। লাইসাকে টাকা দেবে কে!

ইরার জীবনে সহসাই বাঁকবদল হয়। বাড়ি থেকে ফোন আসে, বাবা অসুস্থ। তাকে গাঁয়ে যেতে হবে। ওর মন কু গাইতে থাকে। বাবা অসুস্থ! নাকি খারাপ কিছু …! ভাবতে পারে না ইরা। তাকে নিয়ে বাবার এত স্বপ্ন! সব মিথ্যে হয়ে যাবে! কিছুই দেখে যেতে পারবেন না তিনি!

চোখ ফেটে কান্না পায় ইরার। তক্ষুনি হোল্ডঅল গুছিয়ে ট্রেনে চাপে ইরা। লাইসা সাথে যেতে চেয়েছিল। ইরা বলল, আগে আমি যাই। তেমন কিছু ঘটলে তোকে ফোন করব। তখন চলে আসিস।

ভাগ্যের কী পরিহাস, লাইসাকে সত্যি সত্যি ইরাদের বাড়িতে যেতে হয়েছিল। কারণ ইরা গাঁয়ে পৌঁছতে পৌঁছতে ওর বাবা আর নেই! ম্যাসিভ স্ট্রোক সামাল দিতে না পেরে তিরি পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। আপসোস! শেষবেলায় মেয়েটাকে একবার দেখতেও পেলেন না!

ইরা হামলে কাঁদলো সারারাত! বাবা, তুমি বড় অসময়ে আমাকে একা ফেলে চলে গেলে। যাবার আগে একটু বলেও গেলে না!

এই বেবুঝ কান্নার কোনো সান্ত¡না নেই। যার যায় কেবল সেই বোঝে এই প্রস্থানে কত কষ্ট। বাবাকে হারিয়ে ইরা এখন এতিম, উন্মূল শ্যাওলার মতো বিপুলা পৃথিবীর একোণ ওকোণ অযথাই ভেসে চলা!

কিছু কিছু মানুষ থাকে, একটু অন্যরকম। সাধারণ্যে ওদের খুঁজে পাওয়া কঠিন। জীবনের স্বাভাবিক হিসাব-নিকাশে তাদের আগ্রহ কম। এই যেমন লাইসা। ইরার জন্য ও করেনি এমন কিছু নেই। অথচ এক অর্থে ওরা কেউ কারও নয়। রক্তের বন্ধন দূরে থাক, ঢাকা আসার আগে ওরা কেউ কাউকে চিনতই না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আবাসিক হলের কক্ষসঙ্গী, সেখানেই সম্পর্কের সূচনা ও নিবিড় বন্ধুতা।

বাবা যখন মারা যান, ইরা তখন বলতে গেলে নিঃস্ব। না, শুধু টাকার কথা নয়। তার আপন বলেও কেউ রইল না। লাইসা এসে পাশে দাঁড়াল, যেমনটা সে পরিচয়ের পর থেকেই ছিল। ইরার খুব কাছে, ছায়ার মতো।

দিশেহারা ইরা ঠিক বুঝতে পারে না, এবার তার কী করা উচিত! গাঁয়েই থাকবে, নাকি ফিরে যাবে ইট-কাঠ-পাথরের নিষ্করুণ শহর ঢাকায়!

লাইসা ওর মন বোঝে। সদ্য বাবাকে হারিয়ে ইরার মন এখন ভীষণ নরম, স্পর্শকাতর। সামান্য ফুলের খোঁচাও ওর সইবে না। লাইসা বলল, দুটো দিন রেস্ট নাও। তারপর ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো, কী করবে!

এই প্রথম লাইসা ওকে ‘তুমি’ করে বলল। এই আবাহন সহ্য করার ক্ষমতা ইরার নেই। ও আবার কাঁদতে লেগে যায়। লাইসা যেন শুধুই ওর বন্ধু নয়, বড় বোন কিংবা মায়ের মতো গভীর মমতায় তাকে আঁকড়ে ধরে আছে। ইরা বুঝতে পারে, লাইসাকে ছেড়ে থাকা ওর পক্ষে কেবল কঠিন কাজ নয়, রীতিমতো দুঃসাধ্য।

অবশেষে ওরা ফিরে এল। রায়ের বাজারের সেই ছোট্ট দু’রুমের বাসায়। কিন্তু ওরা বেকার। দুজনেই।

কী মনে করে আশিককে ফোন করলো ইরা। আত্মসম্মানের আগে আত্মরক্ষা করা প্রয়োজন। এই শহরে ওদের এমন কেউ নেই যে কিছু টাকা ধার দেবে। অন্তত কয়েক মাসের জন্য।

আশিক ফোন ধরেনি। ইরা অবশ্য এ রকমটাই ভেবেছিল। দুধের মাছি দুধ ফুরোলে কি আর থাকে! কিন্তু তাকে চমকে দিয়ে মাঝরাতে ফোন ব্যাক করলো আশিক। ওদের কথোপকথন অনেকটা এরকম-

হঠাৎ খোঁজ করলে যে ! আশিকের কণ্ঠে ব্যঙ্গ বা এরকম কিছু।

ইরা এসব গায়ে মাখলো না। বরং স্বরে কাঠিন্য ধরে রেখে বলল, না, একটু দরকার ছিল।

ও তাই বলো। আমাকেও তাহলে কারও দরকার পড়ে! বাহ্ ভালো। আশিক এবার অনেকটাই শ্লেষাত্মক।

আমার বাবা মারা গেছেন। আমি ভীষণ অর্থকষ্টে আছি। ছোট্ট করে ইরা বলল। অনেকটা যেন জ্ঞাতব্য বিষয় পেন্ডিং পড়ে আছে, তাই জানালো। ওর কণ্ঠে আকুতি কিংবা অনুরোধ কোনটাই নেই।

ওহ সরি! তোমার বাবার বয়স হয়েছিল, তাই না?

ইরা গাম্ভীর্য ভাঙলো না। বলল, তা হয়েছিল। তবে খুব বেশি নয়। আরও কিছুদিন হয়তো বেঁচে যেতেন। দীর্ঘশ্বাস চাপে ইরা। হয়তো ভাবছে, এ কাকে কী শোনাচ্ছে সে!

আঙ্কেলের ঠিক কী হয়েছিল, আই মিন কিভাবে মারা গেলেন? আশিককে খানিক সহমর্মী মনে হয়। নাকি এটাও স্রেফ অভিনয়!

হার্ট অ্যাটাক। একটু থেমে ইরা আবার বলল, ব্যর্থতা আমারই। বা বলতে পারো পুরো জাতির। শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ থেকে ডিগ্রি নিয়ে যদি দু’মুঠো খাবার জোগাড় করার মতো চাকরি না জোটে, তাহলে কাকে দোষ দেবে আশিক! জাতিপুঞ্জের মহাসচিব বানকি মুনকে নয় নিশ্চয়ই!

আশিক এবার শব্দ করে হাই তোলে। মানে ওর শোনার ইচ্ছে নেই। ও ক্লান্ত।

তাও মরিয়া হয়ে ইরা বলল, কিছু টাকা দেবে আশিক? ভীষণ দরকার। কাল ভাড়া দিতে না পারলে বাড়িঅলা অপমান করে তাড়াবে।

অমনি হো হো করে হেসে ওঠে আশিক। যেন এমন মজার কথা আর হয় না।

হাসছো যে! নিজেকে সামলে নেয় ইরা। জানোয়ারটাকে সে চেনে। মানুষের অনুভূতি নিয়ে খেলতে ওর একটুও বিবেকে বাঁধে না।

না মানে, তুমি আমার কাছে টাকা চাইছ! কেমন টেলিপ্যাথি বল তো! আমি ভাবলাম, কাল যাব তোমার কাছে। আমারও মেসভাড়া বাকি পড়েছে কয়েক মাস।

ইরা কিছু বলে না। আশিকের সাথে অহেতুক আলাপ প্রলম্বিত করার কোনো ইচ্ছেই ওর নেই। লাইসা ইশারায় ফোন রাখতে বলে। লোকাটাকে সেও বিলক্ষণ চেনে।

কিন্তু ইরা শেষ দেখতে চায়। জানোয়ারটা কত নীচে নামতে পারে জানা দরকার। ইরা বলল, সত্যি দরকার। দেবে কিছু টাকা?

দেবো না মানে! আলবাত দেবো। কবে লাগবে? কাল? চলে এসো আমার ডেরায়।

মেসে কেন! ক্যাম্পাসে এসো। তোমার বন্ধুদের আমার পছন্দ নয়। সবক’টা অপোগ- বদমাশ।

কিন্তু ওদের যে তোমাকে ভীষণ পছন্দ! এসো না সোনা!

তার মানে? রেগে যায় ইরা। এমন অসভ্যতামি ওর সহ্য হয় না।

বুঝলে না! টাকাটা যে ওরাই তোমাকে দেবে মাই সুইট ডার্লিং! মেসে না এলে চলবে কেন! দু’পেগ খেয়ে জাস্ট একটু বেসামাল হবে। আর কিচ্ছু না। শেয়ালটা খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসে। জঘন্য জান্তব হাসি।

ফোন কেটে দেয় ইরা। বুক উজার করে কাঁদে। লাইসা তাকে বোঝায়, কুকুর সুযোগ পেলে কামড়ায়। তুই কেন মিছে ছুঁচোটার কাছে হেল্প চাইতে গেলি!

ইরা স্বীকার করে, ভুলটা হয়েছে ওরই। জানোয়ার কখনও মানুষ হয় না। কক্ষনো না।

 

জ.

সারারাত একটুও ঘুমায়নি ইরা। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। লাইসার সান্ত¡না বা সমবেদনা কোনোটাই খুব একটা কাজে আসেনি। প্রিয়জন সান্নিধ্যে তার কান্নার বেগ বরং বেড়েছে।

মানুষ কত বিরুদ্ধাচারী! এই আশিকই একদিন বলেছিল, ইরার জন্য সে সব করতে পারে। পৌষের শীতে পানাপুকুরে গলাঅব্দি ডুবিয়ে রাখতে পারে পুরোটা রাত। শুধু কথার কথা নয়, শুরুর দিকে এমন খেপামি করতো ছেলেটা! বান্ধবীদের কাছে মাথা হেট হয়ে যেত ইরার। ওরা বলতো, ছেলেটা সত্যি তোকে অনেক ভালোবাসে রে ইরা। ওকে তুই না করিস না। কাছে ডাক। দিনের পর দিন শুধু তোর জন্য হলের গেটে ও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। এমন ভাল লাগা খুব বেশি আসে না জীবনে।

ফুঁ! এই তাহলে ভালবাসার রঙবদল। মাথার ভিতর ঝিমঝিম করতে থাকে ইরার। প্রচ- ব্যথায় ছিঁড়ে পড়তে চায়। এত সহজে ও আশিকের ফাঁদে পা দিল! দিতে পারলো! নিজেকে সস্তা করে দিয়ে কী পেল সে জীবনে! কিচ্ছু না, স্রেফ অপমানের গ্লানি আর অনিঃশেষ দুর্দশা।

কেন এমন হল, বলতে পারিস লাইসা ? আমার কী দোষ ছিল?

লাইসা নির্ঘুম জাগে। ইরার কষ্ট হয় ওর কথা ভেবে। বেচারি লাইসা কেন তার জন্য কষ্ট পাবে! এমনও তো রিলেশন হয়! নিজের কথা না ভেবে শুধুই পরার্থপরতা। ইরা অবাক হয়, দুজন মানুষের মাঝে কত তফাৎ! আশিক তাকে ঠকিয়েছে শুধু নয়, তার মেসের বন্ধুদের কাছে তুলে দিতে চায় ইরাকে। বিনিময়ে বখরা খাবে। ছি! কী জঘন্য!

লাইসা ইরার কথার পিঠে কিছু বলে না। কী বলার আছে তার? কী জানি, হয়তো ওরা কেউ কাউকে চিনতেই পারে নি। বা এমনও হতে পারে, মেয়েদের ঠকানোই আশিকের পেশা।

ইরা বলল, না রে লাইসা, ও আসলে একটা বিকৃত মানসিকতার মানুষ। পারর্ভাট। নইলে যাকে সে কিছুটা হলেও ভালবেসেছে বলে সে দাবি করত, তাকে কখনও মেসবাসি শ্বাপদের হাতে তুলে দিতে পারে! ও একটা লম্পট শুধু নয়, নষ্ট চরিত্রের মানুষ। আই হেট হিম লাইসা, আই’ল কিল হিম! ঘোঁত ঘোঁত করে বলল ইরা।

ইরার এই প্রত্যয় লাইসার ভাল লাগে। মেয়েটা এখনও মরে যায়নি। ভিতরে আগুনটা হয়তো চাপা পড়েছিল। এবার জেগে উঠবে। সত্যি বলতে, নো অফেন্স শুড গো আনপানিশ্ড। এটা লাইসার কথা নয়, ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট উপন্যাসে রাশান লেখক ফিয়োদর দস্তয়েভস্কি বলেছেন। আসলেও তাই। প্রকৃতির নিয়মে অপরাধ করে কেউ মাফ পায় না। কোনো না কোনোভাবে তাকে মূল্য দিতে হয়। কোনটা হয়তো সমাজের চোখে পড়ে, কোনটা পড়ে না। অপরাধী ঠিক সাজা পেয়ে যায়।

রাতভর অনেক নাটক হল। কেঁদে কেঁদে ইরার মাথা ভার। ঘরে চাল বাড়ন্ত। নুডল্স ফুডল্সও নেই যে নাশতা করবে। লাইসার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। মোড়ের মাথায় যে মুদিখানা দোকান, সেখানে গেলে হয়। আধবুড়ো ভদ্রলোক ওদের বেশ সমীহ করেন। বুঝিয়ে বললে হয়তো তিনি বুঝবেন। কিছুদিনের জন্য চাল-ডাল-নুনটুকু অন্তত তিনি বাকিতে দেবেন।

ইরাকে কিছু না বলে লাইসা বেরুল। ইরার আত্মসম্মানবোধ বেশি। শুনলে হয়তো যেতেই দেবে না। কিন্তু ও জানে না, যুদ্ধক্ষেত্রে কখনও কখনও গোলাবারুদের চেয়ে চকোলেট বেশি দরকারি হয়ে ওঠে। পেটে খেলেই না তবে সৈন্য-সামন্তরা যুদ্ধজয়ে উৎসাহ পাবে।

লাইসার অনুমান ভুল প্রমাণিত হয়নি। দোকানি মোজাফফর ওদের বাপের বয়সি না হলেও পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। ইরা বা লাইসাকে তিনি এর আগেও দেখেছেন। একই মহল্লায় থাকে ওরা, মুখচেনা হতে প্রবলেম কি!

মোজাফ্ফর সব শুনে নিজে থেকে বললেন, নিন না কী লাগবে! টাকার কথা আপাতত ভাবতে হবে না। চাকরি পেলে সময়সুযোগ মতো দেবেন।

লাইসা ঘাড় নাড়লো। মানে টাকা পেলেই সব মিটিয়ে দেবে। তবে বিবেকের সায় বোধহয় ঠিক মেলে নি। লাইসা মোজাফ্ফরের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারে না। কোথায় যেন একটু বাঁধো বাঁধো ঠেকে। একেই কি বলে  আত্মসম্মান!

মোজাফ্ফর মুদি দোকানদার হতে পারেন, কিন্তু তার অনুভূতির সাগরে বালু জমেনি। লাইসার অপ্রতিভতা তার নজর এড়ায় না। তিনি বললেন, কিচ্ছু ভাববেন না, সময়মতো শাদি করলে আপনার মতো একটা মেয়ে থাকত আমার। ধরে নিন, সেই অধিকারে কথাটা বললাম। তাছাড়া ব্যবসা কি শুধু মুনাফার জন্য, মানুষের জন্য নয়!

লোকটাকে খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে লাইসার। কিন্তু ওদের অতীত অভিজ্ঞতা সেই ভরসা দেয় না। কেবলই মনে হয়, নতুন কোনো ঝামেলায় জড়াচ্ছে না তো! লাইসা ঠিক করে, খুব জলদি টাকা জোগাড় করে মোজাফ্ফরের ঋণ সে মিটিয়ে দেবে। মনে অস্বস্তি নিয়ে পেট ভরানো যায় না। তাতে পুষ্টি ও মনোবল দুটোই হারাতে হয়।

লাইসা ওর কথা রাখতে পেরেছে। বোঝা গেল বিধাতা ওদের প্রতি ততটা বিমুখ নন। একটা ফরেন ফান্ডেড প্রতিষ্ঠানের ‘ইংলিশ ইন অ্যাকশন’ প্রোগ্রামে কো-অর্ডিরেটরের কাজ পেল লাইসা। স্যালারি মন্দ নয়, মাস গেলে তিরিশ হাজার পাবে। লাইসা দুবার না ভেবে লেগে পড়লো। ঢাকাতেই অফিস, তবে মাঝেসাঝে ডিভিশন শহরে যেতে হতে পারে। কারণ মূল প্রোগ্রামটা দেশব্যাপী, রাজধানীকেন্দ্রিক নয়।

লাইসার চাকরি হয়েছে শুনে ভীষণ খুশি ইরা। খাওয়ার চিন্তাটা আপাতত করতে হবে না। ওর যা বেতন, তাতে দুজনের বেশ চলে যাবে। কিন্তু আবার বিমর্ষ হয়ে পড়ে ইরা। বন্ধুর টাকায় বসে বসে খাওয়া কতটা সংগত ঠিক বুঝতে পারে না। এখানেও সেই আত্মসম্মানের প্রশ্ন!

কী হল, মুড অফ করে বসে আছিস যে! সেলিব্রেট করবি না? খোশমেজাজে বলল লাইসা।

ইরা চুপ। যেন তার কিছু বলার নেই। লাইসার অর্জনে তার খুশিই হওয়া উচিত, কিন্তু সে পারছে কই! পরে অস্ফুটস্বরে বলল, আমি তোর ঘাড়ে চেপে আছি, তাই না রে!

মারব এক থাপ্পড়। ঘাড়ে চেপে আছিস মানে! মনে নেই ইরা, আঙ্কেল মারা যাবার পর তুই কী বলেছিলি! আমি তোর বন্ধু শুধু নই, বড় বোন। বোন হয়ে ছোটকে দেখব না! এতটা ছোটলোক আমাকে ভাবতে পারলি! মনঃক্ষুণ্ন হয় লাইসা। অভিমানী চোখে শূন্যতা ভর করে। ইরা খুব খেয়াল করলে দেখত সেখানে দু’চারটে মুক্তোদানা আলগোছে জমা হয়েছে। তার মানে ইরার কথায় খুব কষ্ট পেয়েছে লাইসা।

আসলে পৃথিবীর সবাই সমান নয়। একটু ইতর-বিশেষ আছে বলেই না আমরা টিকে আছি। নিষ্ঠুর নগর-সভ্যতা আমাদের বড্ড স্বার্থপর করে দিয়েছে। আমি এবং আমার বাইরে বোধহয় আর কিছু ভাবতে পারছি না। অথচ এ জীবন মানুষের নয়, শেয়াল, শকুন কিংবা কূপমণ্ডুকের। যারা কেবল নিজের উদরপূর্তি নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

ইরার জন্য দুঃসংবাদ-বিসিএস এগ্জাম আপাতত হচ্ছে না। পুরো সিস্টেম আপডেট করবে তাই কিছু দিন পিছিয়ে গেছে। তবে বয়স নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। প্রার্থীরা বাড়তি সময় পাবেন।

যাহ্ গেরো! হতাশা ব্যক্ত করে ইরা। কথায় বলে না, অভাগী যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়! আমার অবস্থাও হয়েছে তেমনি। আমি একটা অপয়া, বুঝলি লাইসা। আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। আই’ম জাস্ট ফিনিশড।

কী বললি! অপয়া? হোয়াট ডাজ ইট মিন? লাইসা যেন ঠিক ধরতে পারে না।

তোকে এর মানে বুঝতে হবে না! আমি একটা বোকা। কমপ্লিট ফুল। ইডিয়েট। মনের ঝাল মিটিয়ে নিজেকে একচোট বকে নেয় ইরা। একের পর এক সাফল্য মানুষকে জীবন উদ্দীপ্ত করে, ঠিক তেমন ব্যর্থতার ধারাপাত আমাদের হতাশার সাগরে ডুবিয়ে দেয়। ইরার কেবলই মনে হয়, সবকিছুর পেছনে ওই শয়তানটা দায়ী। আশিক। ইরার জীবনটাকে ও তছনছ করে দিয়েছে। ও এখন কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। সবাইকে ওর শত্রু মনে হয়। এমন কি লাইসাকেও।

লাইসা চাকরি পেল, ও পেল না। লাইসার কথা সবাই শোনে। মোড়ের দোকানদার মোজাফ্ফর চাচাও। কিন্তু ইরা কিছু করতে গেলেই গ-গোল। কিচ্ছু হয় না। সে অপয়া নয়তো কী! একটা যাচ্ছেতাই! কলাগাছ!

এবার তাহলে তুই কী করবি ইরা ? বল আমাকে। দুজনে মিলে চেষ্টা করলে কিছু একটা নিশ্চয়ই হবে।

আমি এখন ঘুমাব। তুই যা তো লাইসা। আমাকে বিরক্ত করিস না। রূঢ় গলায় ইরা বলল। অন্যসময় হলে লাইসা কষ্ট পেত, কিন্তু এখন পেল না। ইরার মনের অবস্থা ও বোঝে। একজন ভঙ্গুর মানুষের সাথে কমপিট করা চলে না। এটা অন্যায়। ইরার এখন সময় দরকার। একটু ভাল সময়। আশিকের প্রতারণা, আঙ্কেলের হঠাৎ চলে যাওয়া, বিসিএস পেছানো, সব মিলিয়ে নাস্তানাবুদ অবস্থা। লাইসা ইরাকে সময় দেয়, নিজেই চালিয়ে নেয় দুজনের সংসার। প্রিয়জনের মতো স্বজনের সিক্ত ভালবাসায় ক্রমশ ভরিয়ে তোলে ইরাকে। ইরা সেরে ওঠে, কিংবা প্রস্তুতি নেয় নতুন একটি সংগ্রামের। যেখানে ওর জন্য অপেক্ষা করছে আবার কোনো দুঃসময়।

 

ঝ.

ডাকেই খবরটা এল। জিইপি ডাকযোগে, কুরিয়ারে নয়।

ইরা চাকরি পেয়েছে। সত্যি সত্যি পেয়েছে! ইরা বারবার পড়ে, বেশ বড় চাকরি। মাসমাইনে শুরুতেই পঁয়ত্রিশ হাজার। ছমাস পরে কনফার্ম হলে আরো পাঁচ বাড়বে। আর ওর যোগ্যতায় কোম্পানি খুশি হলে এক লাফে রাউন্ড ফিগার পঞ্চাশ। সাথে পার্কস অ্যান্ড আদার ফ্যাসিলিটিজ তো আছেই। ভাবা যায়!

চাকরির খবরে ইরা যতটা না খুশি হয়েছে, তারচেয়ে বেশি খুশি লাইসা। ইরাকে জড়িয়ে ধরে সে কেঁদেই ফেলে। এই কান্না বিশ্বাসের, ভালবাসার, সহানুভূতির। যাক, এতদিনে স্রষ্টা ওর দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন!

বল কী খাবি, তোর চাকরি সেলিব্রেট করব। লাইসা বলল। ওর খুশি যেন উপচে পড়ছে।

উঁহু, চাকরি পেলাম আমি। তুই কেন খাওয়াবি? আজ আমি তোকে ট্রিট দিচ্ছি।

তাই! টাকা কোথায়?

কেন, তুই না আমার ওয়ার্ল্ড ব্যাংক! আপাতত ধার দে, পরে বেতন পেয়ে শুধরে দেব। ইরা চোখ পাকালো। দুজন খুব হ্যাপি মুডে এখন। জীবনে যেন উচ্ছ্বাস উপচে পড়ে। মেয়েরাও যে একে অপরের বন্ধু হয়, এদের না দেখলে বোঝার উপায় নেই। জাস্ট হার্ট টু হার্ট। ওয়ান ক্যান ডাই ফর আনাদার!

খুব কিছু নয়, বুমারসে ডিনার। খাবার মন্দ নয়, তবে একটু ঘিঞ্জি। আরও স্পেশাস হলে ভাল হতো। তাছাড়া ছোটখাটো বার্থডে পার্টি লেগেই আছে। ওরা কোণের দিকে জায়গা নিয়ে বসলো। কালই ইরার জয়েনিং। তার আগে কোম্পানির এমডি বিশিষ্ট শিল্পপতি কামরান আহমেদের সাথে সৌজন্যসাক্ষাৎ।

চোখের তারায় হেঁয়ালি মেখে নিয়ে লাইসা বলল, চাকরি পেয়ে একটা জিনিস কিন্তু তুই হারালি ইরা?

কী জিনিস?

খুব দুর্লভ। সহজে মেলে না। মিটিমিটি হাসে লাইসা। মেয়েটা পারেও বটে। ইরাকে নিয়ে ওর খোঁচা-খুনসুটি আর গেল না।

ইরা উসখুস করে। আহ, বল না। মিছে কেন সাসপেন্সে রাখছিস!

এত সহজে কি বলা যায়। যা হারাচ্ছিস তা কৌমার্যের মতোই ইনোসেন্ট। একবার গেলে আর ফিরে আসে না।

লাইসার কথা শুনে ইরা সত্যি ভয় পায়। চাকরি করলে কী এমন হারাতে হয় যা দুর্লভ বা একবার হারালে আর ফেরত আসে না! প্রনচিলি খাওয়া থামিয়ে হতাশায় ডোবে ইরা। ওর ভাবান্তর দেখে মজা পায় লাইসা। ইরা মেয়েটা সত্যি বোকা! নইলে বন্ধুর কথা শুনে কেউ এমন আনমনা হয়! বোকার হদ্দ একটা, রিয়েল গবেট।

কী হল, খাচ্ছিস না যে! এত সময় নিলে প্রন তো লাফিয়ে পুকুরে নেমে যাবে। নে, খেয়ে নে। স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে লাইসা।

ইরা চুপ। ওর প্লেটে খাবার একদম নড়ে না। তারপর নিচু গলায় বলল, চাকরিটা আমি করব না লাইসা। ওসব আমায় মানায় না রে! আমি যেখানে যাই, সেখানেই একটা অনর্থ ঘটে। এবারেও ঘটবে।

লাইসা হো হো করে হাসে। বুমারসের বাকি সব ওকে তাকিয়ে দেখে। এমন গারলের মতো কে হাসছে! বেশ মজা পায়। লাইসা চটুল সুরে বলল, এবারেও ঘটবে মানে! তুই জ্যোতিষ নাকি! যত্তোসব নেগেটিভ মেন্টালিটি।

তাহলে বল, চাকরিটা পেলে আমি কী হারাব? বেণিদোলানো স্কুলগার্লের মতো অভিমানী গলায় ইরা বলল।

কেন, বেকারত্ব! চাকরির সন্ধানে জুতোর শুকতলা ক্ষয়, শহরজুড়ে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানো! চাকরিতে জয়েন করলে কি আর তুই বেকার থাকবি বল! আর একবার চাকরিতে ঢুকলে তোর অভিজ্ঞতা হবে। তখন আর কেউ এক্সপেরিয়েন্স এক্সপেরিয়েন্স বলে পাড়া মাথায় করে চেঁচাবে না। অভিজ্ঞতার কথা বলা মাত্র এক টুকরো কাগজ ছুড়ে দিবি নাহের ডগায়। নারীনেত্রীর মতো হাত-পা নেড়ে লাইসা বলতে লাগল। ওর কা-কীর্তি দেখে বুমারসের পেটুকেরা খাওয়া ভুলে এক কাতারে জড়ো হয়। যেমন এখানে বাঁদরনাচ চলছে। বেচারি ইরা লজ্জায় মিইয়ে যায়। সামান্য ব্যাপার নিয়ে লাইসা যে এমন লঙ্কাকা- জুড়ে দেবে কে জানত!

পরদিন সকাল দশটা বাজার আগেই ধানমন্ডি বারো নম্বরে অফিসের ঠিকানায় ইরা হাজির। বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ি একটা। সামনে একচিলতে বাগান। বাড়িঅলার রুচির প্রশংসা করতে হয়। ইরা খোঁজ নিল, বাড়িঅলা কানাডাপ্রবাসী। মেলা টাকায় কোম্পানি তার করপোরেট অফিসের জন্য বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে।

রিসেপশনের মেয়েটি ওর পরিচয় পেয়ে সম্ভ্রমের সাথে উঠে দাঁড়ালো। তারপর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারের সূত্র ধরে ইরার জন্য জয়েনিং লেটার তৈরি করল।

তারপর ছোকরাপানা একজন এসে ইরাকে উপরে নিয়ে যায়। এটা তার রুম। প্রায় তিনশ’ স্কয়ারফুটের সাজানো পরিপাটি কক্ষ। পাশেই পিএ বসে। তার মানে ওর নিজস্ব পিএ আছে! অবাক হয় ইরা। এতটা সে আশা করেনি। একটা ছোটখাটো কাজ, মাস গেলে বেতন। স্টার্টার হিসেবে এরচেয়ে বেশি কিছু কি আশা করা যায়!

অফিসে একটু গুছিয়ে বসতে না বসতেই কফি নিয়ে এল।

কী নাম আপনার?

রিয়া। আমি আপনার সাথে কাজ করব। স্যার বলে দিয়েছেন।

কে স্যার?

আমাদের কোম্পানির এমডি কামরান আহমেদ। উনিই তো আপনাকে পছন্দ করেছেন। রিয়া বেশ গর্বের সাথে বলল।

পছন্দ করেছেন! একটু থতায় ইরা। রিয়া তারপর মিষ্টি হেসে বলল, স্যার খুব ভাল। এখানে কাজ করতে আপনার কোনো অসুবিধা হবে না ম্যাম। মেধাবী মেয়েদের স্যার পছন্দ করেন।

কফিতে চুমুক দিয়ে ইরা কী যেন ভাবলো। রিয়া মেয়েটা বেশ মিষ্টি। নিজেকে সাজাতে জানে। রুজ-পাউডারের ইঞ্চিখানেক চুনকাম নয়, চোখের পাতায় মাসকারার ঢিবিও বানায়নি। রিয়ার চেহারায় রুচির ছাপ স্পষ্ট। দেখেই কেমন মায়াবী মনে হয়!

স্যার কখন আসবেন? জানতে চায় ইরা। এ প্রশ্নটা অবশ্যি না করলেও হত। ন’টা পাঁচটা অফিস। প্রথম দিনই তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। কোম্পানির এমডি, অফিস সময়ে অফিসে থাকবেন, এটাই বরং স্বাভাবিক।

দুচোখের তারায় হাসি ছড়িয়ে রিয়া বলল, স্যার আসার কোনো ঠিক নেই। ওঁর অফিস, প্রয়োজন মতো আসেন। তবে বাইরে বিশেষ কোনো কাজ না পড়লে নটার আগেই অফিসে এসে যান।

আজ আসেননি, না?

আজ দেরি হবে। তবে আসবেন। আপনাকে থাকতেও বলেছেন। বিশেষ কিছু ইন্স্ট্রাকশন দেবেন।

ইরা আর কথা বাড়ায় না। রিয়া তার ব্যক্তিগত সহকারী। বাটন প্রেস করলেই ছুটে আসবে। তাকে সামনে বসিয়ে কথা বলার কী আছে!

বেশ কিছু দিন আগে ইরা এই ইন্টারভিউটা দিয়েছিল। ভাবতে পারেনি, ওর চাকরিটা হবে। এমন ইন্টারভিউ কত দিয়েছে! শর্টলিস্টেড হবার পরেও ডাক পায়নি। কারণ ওর পেছনে কারও স্পেশাল তদবির ছিল না।

সকাল বেলাটা অফিস কমপাউন্ড দেখে কেটে গেল। অনেকগুলো রুম, অ্যাডমিন, হিউম্যান রিসোর্স, অ্যাকাউন্টস, মার্কেটিং নিয়ে ফুল সেটআপ। আর ওদিকটা ? নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করে ইরা। বেশ বড় একটা স্পেস নিয়ে এমডি কারমান আহমেদের কামরা। সাথে রেস্টরুমও আছে ভিতরের দিকে। রিয়া জানালো ওটা নাকি সাউন্ডপ্রুফ। ভারি পর্দাঅলা নানারকম বিদেশি পেন্টিং আর বাহারি টবে সজ্জিত। রিয়া একবার মাত্র দেখেছিল ঘরটা। কামরান সাহেব সেদিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তাই।

কী অসুখ স্যারের?

হার্টে প্রবলেম। স্যার মাঝে মাঝে সিঙ্গাপুর যান চেকআপ করাতে।

রয়েল রোগ। বয়স চল্লিশ পেরোলেই খাবারে কাটছাঁট। চর্বি ও মিষ্টিতে বারণ। আসলে মানুষের জীবনটাই এমন। যখন দুরন্ত টগবগে তারুণ্যে অবাধ সাঁতার, তখন চাইলেও কিছু করার নেই। কারণ পকেট ফাঁকা। আর যখন সক্ষমতা এল, তখন হাসপাতালের সাথে পাকাপাকি সম্পর্ক। উপভোগের উপায় নেই। তাতে শরীর বাগড়া দেয়।

এই অফিসে লাঞ্চ সার্ভ করা হয়। সবাই মিলে একসাথে বসে খাওয়া। এতে নাকি অফিসে কাজের মান বাড়ে, টিম¯িপ্রট তৈরি হয়। ইরার মন্দ লাগেনি। প্রথম দিনেই লাঞ্চটেবিলে সবার সাথে টুকাটাক আলাপ হল। ইরার কাজ যেহেতু ফরেনারদের নিয়ে, কলিগরা তাকে একটু সমীহের চোখে দেখছে। তাছাড়া সে নাকি স্যারের স্পেশাল চয়েস। নিয়োগ বোর্ডের অন্যান্য সদস্যরা ইরাকে তালিকায় রাখেনি। কিন্তু স্যারের আগ্রহে বাধা দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয় ভেবে চুপ ছিল।

বেলা তখন চারটারও কিছু বেশি। রিয়া হঠাৎ জানান দিল, স্যার এসেছে। কিছুক্ষণ পরে হয়তো তিনি ইরাকে ডাকবেন। রিয়ার কথায় ইরার অ্যাড্রেনালিন সচল হল। এই প্রথম কোনো প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতির সাথে তার মুখোমুখি কথা হবে। ভাবতেই গা শিউরে ওঠে ইরার। না জানি প্রথম সাক্ষাতে কী সব বলেন কামরান আহমেদ!

 

ঞ.

ঘড়িতে পাঁচটা বেজে কুড়ি মিনিট। অফিসের প্রায় সবাই ডেস্ক ছেড়ে চলে গেছে। দারোয়ান বা মালি গোছের কেউ হয়তো টবে লাগানো গাছের পরিচর্যা করছে। পিএ রিয়া ইরার কাছে ছুটি চেয়ে নিল। ওর মাকে নিয়ে নাকি ডাক্তার দেখাতে যাবে। অনেক কসরত করে তবে সিরিয়াল পেয়েছে।

যাচ্ছলে! ইরা ভেবেছিল রিয়াকে থাকতে বলবে। একা একটা অফিসে এই প্রথম, কলিগরা সব চলে গেছে। কেমন যেন ভয় ভয় লাগে ইরার। এত বড় নামি কোম্পানি, রাস্তায় বড় বড় হোর্ডিং-এ তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন শোভা পায়। ভয় কি!

নিজেকে নির্ভার করে ওয়াশ রুমে ঢোকে ইরা। নীলাভা তাঁতের শাড়িটা ঠিক করে হালকা প্রসাধন সেরে নেয়। প্রথম দর্শনেই স্যারের যেন মনে না হয় মেয়েটা একটা রুচিহীন গেঁয়ো ভূত। ইরা তৈরি হয়ে বসে আছে স্যারের ডাকের অপেক্ষায়। বেলা গড়াচ্ছে। তখন প্রায় সন্ধ্যা। উসখুস করে ইরা। একবার ভাবে লাইসাকে ফোন করবে। পরে অবশ্য সামলে নেয়। লাইসা তাকে আনস্মার্ট ভাববে। পরে এ নিয়ে হাসাহাসি করবে। কী দরকার বাবা, এমডি তো বাঘ-ভালুক নয় যে খেয়ে ফেলবে!

হঠাৎ ইন্টারকম বাজে। তার মানে স্যার ডাকছে।

ইরা ছুটে বেরিয়ে গেল তার রুম থেকে। স্যারের দারোয়ান তাকে পথ দেখিয়ে দেয়।

আসব স্যার?

প্লিজ আসুন। গম্ভীর স্বরে কামরান বললেন।

রুমে ঢুকে ইরা তাজ্জব বনে যায়। ও ভাবতে পারে না, এত যত্ন নিয়ে একটা অফিস কি করে সাজানো সম্ভব! অফিস তো নয়, যেন লালগালিচা সংবর্ধনা।

ওখানে আরাম করে বসুন। সোফা দেখিয়ে দেন বিজনেস টাইকুন কামরান আহমেদ। রিয়া ঠিক বলেছে, স্যারের রুমটাকে যতটা না অফিস, তারচেয়ে বেশি বিশ্রামঘর বলে মনে হয়।

ইরা সঙ্কোচবোধ করে। বা খুব একটা সহজ হতে পারে না। প্রথম চাকরি বলেই কি! নাকি ভাবছে এত বড়মাপের একজন মানুষের সামনে পা ছড়িয়ে বসাটা সহবতের মধ্যে পড়ে না।

শুরুতে মামুলি গোছের কিছু কথাবার্তা হলো। ইরার ফ্যামিলিতে কে কে আছে, এখানে জয়েন করার আগে অন্য কোথাও কাজ করেছে কি না। যেন ওর আপন কেউ, শুনে সহানুভূতি জানান কামরান আহমেদ। এই অব্দি সব ঠিক ছিল। নাথিং রঙ, নো অ্যানোম্যালিজ।

আশ্চর্য ব্যাপার, কামরান সাহেব অফিস ড্রেসে নন, তার পরনে ট্র্যাকসুট এবং স্নিকারস। ব্যায়াম করবেন বা হাঁটতে যাবেন। ইরা কিছু মনে করেনি। প্রায় বাপের বয়সি একজন মানুষ, কী পরে আছেন কি নেই, এটা নিতান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার। নগ্ন তো নন।

ইরার হঠাৎ শোকেসের দিকে চোখ গেল। ওক কাঠের নকশিঅলা গ্লাস শোকেস। বেশ কিছু মেমেনটো বা সম্মানসূচক শিল্ড জমা পড়েছে সেখানে। কিন্তু পাশে ও-দুটো কী!

গবলেট মনে হয়! বিদেশি জিনিস দেখেই বোঝা যায়। গবলেটে পানাহার চলে, ইরা জানে। তার মানে কামরান আহমেদ মদ্যপানে অভ্যস্ত। এটা অবশ্যি নতুন কিছু নয়। ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন নিয়মিত পানাহার করেন, ক্লাবে গিয়ে ফুর্তিফার্তায় মেলা টাকা ওড়ান। দুহাতে কামান, ওড়াবেন না! ইনপুট-আউটপুট ঠিক রাখতে হবে তো। নইলে স্রেফ কোষ্ঠকাঠিন্য! অর্শ-পাইল্স পেয়ে বসবে যে!

ওমা, ও কী! ইরা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করে, গবলেট দুটো টেনে নামালেন কামরান আহমেদ। সাথে চ্যাপ্টামতো বোতল। বোতলের ভেতরে কী বস্তু আছে ইরা অনুমান করতে পারে। স্যার খাচ্ছেন খান। কিন্তু দুটো গবলেট কেন ? ইরা তো এসব খায়নি কোনোদিন!

কী হলো ইরা, আরাম করে বসো। চাইলে ডিভানে শরীরটা ছড়িয়ে দিতে পারো। আই ডোন্ট মাইন্ড।

এতে ইরার অস্বস্তি আরও বাড়ে। স্যার তাকে ডিভান অফার করলো কেন! এটা একটা অফিস, জমিদারের রঙমহল নয়!

আহা, উসখুস করছো কেন! বাসায় ফেরার জন্য ভেব না, আমি নিজে তোমাকে গাড়িতে করে পৌঁছে দেব।

তার কোনো দরকার নেই স্যার, আমি একাই যেতে পারব। স্বরে কাঠিন্য এনে ইরা বলল। এখানে ওর মোটেও ভাল লাগছে না। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। সেলফোন তুলে নিয়ে লাইসাকে ফোন করতে যেতেই কামরান সাহেব তাকে রূঢ়ভাবে শাসালেন। বললেন, উঁহু, নো ফোনকল নাউ। জরুরি আলাপের জন্য তোমাকে আমি ডেকেছি। বলতে পারো ডেবিউ প্রেজেন্টেশন। ইউ হ্যাভ টু পাস ইট আউট।

ফোন রেখে দেয় ইরা। আর ভুলটাও সে ওখানেই করল। ও বুঝেও বুঝতে পারেনি, নাউ অর নেভার!

কামরান দুটো গ্লাসে মদ ঢেলে ইরাকে অফার করলেন। নাও ইরা, হ্যাভ অ্যা সিপ।

ইরা মাথা নাড়ে। আমি ওসব খাই না স্যার। কক্ষনো খাইনি।

অনেক কিছুই তুমি আগে করোনি। তাই বলে করবে না তা তো নয়! জীবনে সবকিছুই মানুষ প্রথমে শুরু করে, পরে অভ্যস্ত হয়। তুমিও হবে। নাও নাও, গিভ মি অ্যা কোম্পানি!

কামরানের কণ্ঠে বস্সুলভ কাঠিন্য। ইরা উপেক্ষা করে। মৃদু অথচ প্রতিবাদী সুরে বলল, স্যার, কী যেন বলবেন! আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।

দেরি! হা হা হা! ইউ আর নেভার লেট হোয়েন ইউ ড্রিংক ইউদ ইওর বস্, বেবি! নাইট ইজ নেভার ওল্ড!

বেবি! কথার এ কী ছিরি! আঁতকে ওঠে ইরা। তার মানে লোকটার নেশা চড়ে গেছে। এবার পালাতে হবে। নইলে বিপদ।

ইরা বলল, আপনি বরং বিশ্রাম নিন স্যার, আমি আসি। কাল অফিস আওয়ারে কথা হবে। অনুমোদনের অপেক্ষা না করে উঠে পড়ে ইরা। কিন্তু চাইলেই কি ওঠা যায়। ইরা ডিভান পেরিয়ে দরজার দিকে যেতে যেতে তাকে ধরে ফেলে কামরান। তারপর অনেকটা জোর করে তাকে এক ঢোক মদ খাইয়ে দেয়।

ইরা টলতে থাকে। ওর গা গুলায়। মদের সাথে কী মেশানো ছিল কে জানে! নিমিষে ইরা ঢলে পড়ে ডিভানের উপর। তারপর আর কিছু মনে নেই।

লাইসা বারবার ফোন দেয়। দিতেই থাকে। এপাশ থেকে রিসিভ করে না কেউ। কামরান ওটা সাইলেন্ট মুডে রেখে দিয়েছে। অফ করেনি, পাছে কিছু আঁচ করতে পেরে তার অফিসে এসে হানা দেয়! লোকটা বড্ড ঘোরেল!

পরদিন সকালে কামরানের বিশ্রামকক্ষে তন্দ্রার ঘোর ভাঙে ইরার। এক অদ্ভুত ভয়ঙ্কর আবহে নিজেকে সে আবিষ্কার করে। তার শরীরে শ্বাপদের নখরাঘাত, নগ্নতার গান। অদূরে বাহারি ল্যাম্পশেডের গায়ে আলগোছে ব্রাটা দোল খায়, ডিভানের উপর পায়ের কাছে ছড়িয়ে থাকে শাড়ি, ব্লাউজ ও পেটিকোট। কক্ষের আনাচেকানাচে খুঁজলে হয়তো পাওয়া যাবে ইরার চুলের ক্লিপ, দুএকটা চুড়ি, কাচের নয়তো রাজস্থানি কলাকারের হাতে গড়া ব্রেসলেট।

ঘেন্নায় মুখ বিকৃত করে ইরা। সর্বস্ব খুইয়ে এছাড়া আর কিছু করার থাকে না তার। এই দ্বিতীয়বার এবং সম্ভবত শেষবারের মতো অপমানটুকু গায়ে জড়িয়ে নেয় বিধ্বস্ত ইরা। তারপর আস্তে ধীরে এক লম্পটের ওয়াশরুমে ঢোকে। নিজেকে খানিক ভদ্রস্থ করে, কামার্ত হায়েনার গুহা থেকে বেরিয়ে গিয়ে যা হোক করা যাবে।

ইরার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম নেয়। আশ্চর্যের বিষয়, ওটা কোনো দুঃখ বা কষ্টের অনুভূতি ছিল না। ইরা মোটামুটি নিশ্চিত হয় যে ওর মতো বোকা দুনিয়াতে আর নেই। আর সম্ভবত আসবেও না।

কে এই কামরান! কী তার পরিচয়! এসব না জেনেশুনে কি করে সে অফিস আওয়ারের পরে স্বেচ্ছায় শ্বাপদের গর্তে ঢুকে গেল! বা আরেকটু কৌশলী কি সে হতে পারত না! কামরানের কথায় আপাত সম্মতি দিয়ে ওয়াশরুমে যেতে পারত। তারপর সেখান থেকে সে লাইসা বা পুলিশ লাইনে ফোন করতে পারত।

কিন্তু এসব কিছুই করা হয়নি। ইরা আসলে ভাবতেই পারেনি, ওর বাপের বয়সি একজন মানুষ সহসাই এমন আগ্রাসী হয়ে উঠবে! মানুষ আসলে অনেক কিছুই ভাবতে পারে না, অথচ তা ঘটে এবং ঘটতেই থাকে।

কামরানের কক্ষ থেকে বেরোনোর আগে দুলাইনের একটা চিরকুট চোখে পড়ে। লোকটা কত ধুরন্ধর! চিরকুট হাতেলেখা নয়, কমপিউটার কম্পোজড। ও লিখেছে, ‘সরি ফর এভরিথিং। চাকরিটা চাইলে তুমি করতে পারো। ডোন্ট গো ফর পুলিশ। ভুল করবে। রিসেপশনে তোমার জন্য একটা খাম রাখা আছে। ধরে নাও কমপেনসেশন প্যাকেজ। ওটা নিয়ে নিও। অ্যান্ড লেট্স বি ফ্রেন্ডস!’

এবার দুচোখ ফেটে কান্না পায় ইরার। লোকটা তাকে কী মনে করেছে, প্রফেশনাল স্লাট? হাউ ডেয়ার হি ডাজ! মেয়ে দেখলেই কি ওর তাই মনে হয়! ড্যাম ডিবচ!

অফিস থেকে বেরিয়ে যাবার সময় সত্যি সত্যি রিসেপশনের মেয়েটা তাকে একটা খাম এগিয়ে দেয়। বেশ কিছু পাঁচশ টাকার নোট। নোটের তাড়া বের করে বাতাসে ছুড়ে দেয় ইরা। বলে, তোমার বসকে বলে দিও টাকা দিয়ে সব হয় না। এবং তার প্রাপ্য শাস্তিটা সে পাবেই।

 

ট.

সারারাত কোথায় ছিল জানতে চাইলে লাইসার হাতে কমপিউটার টাইপ্ড চিঠিটা তুলে দেয় ইরা। ওর চোখে টলায়মান অশ্রু। বাকিটুকু লাইসা বুঝে নেয়। নৈঃশব্দ্য হিরন্ময়। কোনো কোনো সময় নীরবতাই অনেক কিছু বলে দেয়। অযথা স্বরযন্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না।

এবারেও ঠকে গেলি ইরা! মন খারাপ করিস না, বোন আমার। জীবনে চড়াই-উৎরাই থাকেই। লাইসা বলল। আর কি বলার আছে! কোনো সান্ত¡নার বাণী কি ওর দুঃখ মুছতে পারবে! পারবে না।

সারাদিন কিচ্ছু খায়নি ইরা। রুচি হয়নি। বা খেলেও নির্ঘাত বমি হয়ে যেত। লাইসা ওর জন্য ফেভারিট ডিশ বানালো। কিন্তু তা মুখেও তোলেনি ইরা। লাইসা ইরাকে চেনে। মেয়েটা বড্ড অভিমানী। ওর যা মনের অবস্থা, তাতে সে যা কিছু করে ফেলতে পারে। লাইসা ওকে পাশে পাশে রাখে। কিন্তু ওর মনের ঘরে তো আর ঢুকতে পারে না। ‘এটিক ইন হার মাইন্ড’। ওটা নিতান্তই ইরার নিজস্ব ঘর।

রাতভর ভেবে ইরা তিনটা সম্ভাবনা বা করণীয় বিষয় ঠিক করল। টুকে ফেলল কাগজে। প্রথম যা মাথায় এল তা হল জীবন থেকে স্বেচ্ছায় ছুটি নেয়া। তা না পারলে চিরকাল নিজের কাছে পালিয়ে বেড়াতে হবে। ইরা আত্মহননের পথ বেছে নেবে। এ জীবনের কার্যত কোনো মানে নেই। মানুষ একজীবনে যে সব বিষয়ে গৌরববোধ করে তার কোনোটাই অবশিষ্ট নেই ইরার কাছে। সে আসলেই শেষ হয়ে গেছে। মাথা গোঁজা বা মাথা উঁচু করা, কোনোটাই তার পক্ষে সম্ভব নয়।

সুইসাইড করাই এখন ইরার জন্য শিল্পসম্মত কাজ। এখানে আপাতত স্থির থাকে ইরা।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা বারকয়েক মাথাচাড়া দিয়েছে। চাইলেও পুরোপুরি নাকচ করতে পারেনি ইরা। সর্বনাশের বদলা নেয়া। খুনের বদলা খুন। কামরান যা করেছে তার একটাই শাস্তি হতে পারে- মৃত্যুদণ্ড। এর বাইরে কিছু ভাবছে না ইরা। কখন কিভাবে করবে সেটা সময় বলে দেবে। বা পরিস্থিতি বুঝে কাজ করতে হবে।

আর তিন নম্বর করণীয় হতে পারে আইনের আশ্রয় নেয়া। ব্যাপারটা পুলিশকে জানাবে। প্রমাণ হিসেবে কামরানের অফিসের দারোয়ানের সাক্ষ্য ও চিরকুট উপস্থাপন করা যেতে পারে। কিন্তু তাতে কী কাজ হবে! শোনা যায়, আইন এখন টাকাঅলার পকেট রক্ষা এবং গরিবের উপর রোডরোলার চালানোর জন্য উপযুক্ত। তাই যদি হয় সেক্ষেত্রে আইনের উপর ভরসা করা কোনো কাজের কথা নয়। বরং নেহাতই বোকামি। আর যাই হোক, ইরা আর কোনো বোকামি করবে না। মরে গেলেও না। বিশ্বাসের ব্যাপারটাইও আপাতত মূলতুবি রইল। বস্তুত ‘আস্থা বা বিশ্বাস’ কোনো বিশ্বাস করার মতো অনুভূতি নয়। স্বার্থে আঘাত রাখলেই মানুষ ওটা নির্দ্বিধায় পায়ে মাড়িয়ে যায়। তাতেই বোধকরি আখেরে বিস্তর লাভ হয়।

সারসংক্ষেপ তাহলে কী দাঁড়ালো- স্বেচ্ছায় মুক্তি, সমুচিত শাস্তি বা আইনের আশ্রয় নেয়া। ইরা রাত জেগে কাগজের উল্টোপিঠে আঁকিবুঁকি করে। হঠাৎ কী মনে হতে শব্দ করে হেসে ওঠে। শাস্তি কামরান একা কেন, আশিকেরও প্রাপ্য। কামরান ওর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ধর্ষকের ভূমিকা নিয়েছে। আর আশিক বিশ্বাসভঙ্গ ছাড়াও ভালবাসাকে অপমান করেছে। তাকেও শাস্তি পেতে হবে। কঠিনতর শাস্তি।

হাসির শব্দে লাইসার তন্দ্রা টুটে যায়। জেগে উঠে দেখে ইরা হাসছে। এই ভয়টাই ও করেছিল। মেয়েটা শেষমেষ না পাগল হয়ে যায়! লাইসা বলল, ইরা, তুই ঘুমোসনি!

ইরা চুপ। কাগজের গায়ে ইরার লেখাগুলো পড়ে লাইসা। তারপর গম্ভীর স্বরে বলে, আমি তোর দু’নম্বর সিদ্ধান্তের সাথে একমত ইরা। যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে চলে যাওয়ার কোনো মানেই হয় না। থানা-পুলিশ করেও লাভ নেই। অপরাধীর শাস্তি হবে না, বরং তোর কষ্টের কথা জেনে রসালো কেচ্ছা বানাবে! তাতে পত্রিকার কাটতি বাড়বে, চ্যানেলের টিআরপি মাথায় চড়ে বসবে। এদেশের মিডিয়া মোগলদের তো তুই চিনিস!

ইরা কিছু বলে না। ওর নিস্পৃহ ভুতুড়ে চাহনি লাইসার বুকে ভয় ধরিয়ে দেয়। বুকের বাঁ-পাশটা দুর্বোধ্য কষ্টে খামচে ধরে! ইরা তার বোন। বোনটাকে কোনোভাবে হারাতে চায় না লাইসা।

এভাবে আরও কিছুদিন কাটে। লাইসা পারতপক্ষে ইরাকে চোখের আড়াল করে না। তাকে বুঝতে দেয় যে ইরা চলে গেলে লাইসাও থাকবে না। বোনের দেখানো পথ বেছে নেবে। আত্মহনন।

সময় তো এক রকম যায় না। এই ঘটনার মাস ছয়েক বাদে ইরার আবারও চাকরি হয়। একটা নিউজ চ্যানেলে। ইরার মোটেও মত ছিল না। লাইসা চেষ্টাচরিত্র করে কাজটা জুটিয়ে দিয়েছে। অবশেষে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট ইরা বসার মতো একটা ডেস্ক পেল।

কিন্তু ইরা ভাল নেই। লাইসা খেয়াল করে, মাঝেমাঝেই ও কেমন উন্মনা হয়ে যায়। কিছুতেই সে একা থাকতে পারে না। একা রুমে তো নয়ই।

লাইসা ওর এক বন্ধুকে ব্যাপারটা বলল, তবে ছদ্মনামে। বন্ধু জানালো, এটা একটা মানসিক সমস্যা। একাকিত্বে ভয়, বিশেষত একলা রুমে। এর নাম ক্লস্ট্রোফোবিয়া। লাইসা বলেকয়ে ইরার হলরুমে কাজের ব্যবস্থা করলো। মানে যেখানে কখনও ইরা একা থাকবে না। সবার সাথে হৈ-হুল্লোড় করে সময় কেটে যাবে।

আপাতত এটুকুই। চাকরিটা ইরাকে স্যুট করলো। ও এখন আগের চেয়ে অনেকটাই সহজ ও স্বাভাবিক। তবে প্রতিশোধের ব্যাপারটা সে ভোলে নি। ভুলবেও না।

 

ঠ.

নামেন আপা, এয়ারপোর্ট আইসা পড়ছি। আবদুলের কণ্ঠ শুনে স্মৃতির খোয়াড়ি ভেঙে বাস্তবে ফেরে ইরা। ওয়েদার খারাপ, টারম্যাকে ভিজিবিলিটি কম, এই অজুহাতে ফ্লাই বেঙ্গল এয়ারলাইনসের চাঁটগা ফ্লাইট আরেক দফা পিছিয়ে যায়। সাড়ে ছটার ফ্লাইট আটটায় ছাড়বে।

এতে কিছুটা চিন্তিত হয় লাইসা। ড্যাশ এইট বিমান শেষতক উড়বে তো! লাইসা ও তার কলিগ রুমি আগেই এয়ারপোর্টে মজুত ছিল। ইরা ঝটপট চেক-ইন সেরে কাউন্টার থেকে বোর্ডিং কার্ড বুঝে নেয়। তারপর চোখের ইশারায় ওদের সাথে কনট্যাক্ট করে ইরা।

আর ওর শিকার দুজন- বিশিষ্ট শিল্পপতি কামরান আহমেদ ও প্রতারক প্রেমিক আশিক মোস্তাফা। এদের একজন মরবে, অন্যজন ফাঁসবে। এভাবেই ঘুঁটি সাজিয়েছে লাইসা, ইরা ও রুমি।

ইরার সাথে ওর হ্যান্ড লাগেজে বাড়তি পোশাক ছিল। সময়মতো সাধারণ যাত্রী থেকে সে বিমানের কেবিন ক্রু বা বিমানবালা হয়ে উঠবে। নইলে পুরো ছকটা খেলিয়ে ওঠা যাবে না।

আশিককে প্রলুব্ধ করেছে রুমি। শরীরী খেলায় যারা পারঙ্গম, তাদের নাকে বঁড়শি দেয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয়। রুমি আশিককে কব্জা করেছে। এক রকম প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের হোটেল পেনিনসুলায়। রুমি আপাতত আশিকের সাথে। লাইসা একলা একখানে বসে আছে। আর ইরা ডোমেস্টিক বোর্ডিং লাউঞ্জলাগোয়া ওয়াশরুমে গেছে নিজের বেশবদল করতে। ওদের তিনজনের কথা হয় চোখে চোখে ও সেলফোনে খুদে মেসেজের মাধ্যমে।

ফুল প্রুফ প্ল্যান। কিন্তু কামরানের কোনো দেখা নেই। ও  এখনও এল না কেন! তবে কি পুরো প্ল্যান ভেস্তে যাবে! অথচ রুমির কাছে পাকা খবর আছে, এই ফ্ল্যাইটেই চাঁটগা যাচ্ছে কামরান। একটা বিজনেস কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করতে।

লাইসার ফোনে বিপ বিপ সাউন্ড। মানে মেসেজ এসেছে। ইরা লিখেছে, আই’ম রেডি। কে ইজ দেয়ার?

কে মানে ওদের অন্যতম শিকার শিল্পপতি কামরান আহমেদ।

নট ইয়েট। তবে সময় আছে।

লাইসার ধারণা, ভিজিবিলিটি কোনো কারণ নয়, কামরানের জন্যই ফ্লাইট ডিলে হচ্ছে। রুমি জানালো ফ্লাই বেঙ্গলের অন্যতম অংশীদার কামরান আহমেদ। তাকে ছাড়া বিমান উড়বে কি করে!

আশিকের কাছে অপমানিত হবার পর ইরা যখন চাকরি পাবার জন্য মরিয়া, লাইসার বুদ্ধিতে ইরা তখন কেবিন ক্রুশিপের উপর একটা ট্রেনিং করেছিল। সেই শিক্ষাটা এখন কাজে লাগবে।

সংক্ষেপে ওদের প্ল্যানটা এই- ফ্লাই বেঙ্গলের চাঁটগা ফ্লাইটের একজন লেডি কেবিন ক্রুকে ওরা কৌশলে সরিয়ে দেবে। নাহ্ কোনো মারধর নয়, অপহরণও করবে না। তবে তার বুদ্ধি হরণ করবে ওরা। দায়িত্বটা রুমির। কোনোভাবে তাকে এই ফ্লাইটে ডিউটি থেকে বিরত রাখবে। সেই ফাঁকে কেবিন ক্রু হিসেবে কাজ করবে ইরা। ছোটখাটো ফ্লাইটে এমন বদল প্রায়ই হয়, তাই ক্যাপ্টেন বা কোপাইলট কোনো রকম সন্দেহ করবে বলে মনে হয় না। করলে করুক, ইরা এখন বেপরোয়া। যেমন করে হোক ছুঁচোদের শাস্তি দিতে হবে।

ইয়েস, ফ্লাইট অ্যানাউন্স হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে উড়বে। লাইসার অনুমান সত্যি প্রমাণিত হল। ফ্লাইট আসলে কামরানের জন্যই অপেক্ষা করছিল। লাইসা টেক্সট করে জানালো যে কামরান এসে গেছে। ওই তো, দুধসাদা স্যুট, রয়েল ব্লু প্যান্ট আর সুদৃশ্য বো-টাই।

কাফনের কাপড় হিসেবে বেশ মানিয়েছে, কী বল! ইরা ফিরতি টেক্সট পাঠায়। ওর রক্তে এখন খুনের নেশা। এত দিনে একটা মোক্ষম সুযোগ পেয়েছে। কোনভাবেই ফেইল করবে না। নো, নেভার।

বোর্ডিং শুরু হবার ঠিক আগমুহূর্তে রুমির সেল থেকে (সিমটা নিশ্চয়ই অরিজিনাল নয়) কেবিন ক্রু রূপকথার ফোনে একটা কল আসে।

হ্যালো, কে বলছেন? কোত্থেকে? পেশাদার ভঙ্গিতে ফোন রিসিভ করে রূপকথা।

আমি সিটি হাসপাতাল থেকে বলছি। আপনাকে এক্ষুণি একবার আসতে হবে। কেজো গলায় রুমি বলল তার থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে দঁড়িয়ে।

কেন বলুন তো? কী হয়েছে?

আপনার মা অসুস্থ। রাস্তায় পড়ে গিয়ে এখানে ভর্তি হয়েছেন। এক্ষুনি আসুন। এটুকু বলে অমনি লাইন কেটে দেয় রুমি। মিছে নাটক বাড়িয়ে কী লাভ!

ব্যস, এতেই কাজ হল। কেবিন ক্রুর পোশাকে ইরা গিয়ে তার পাশে দাঁড়ায়। নিজের পরিচয় দিয়ে বলে, ডোন্ট ওয়রি রূপকথা। আমি আজই এখানে জয়েন করেছি। তুমি চলে যাও। আমি ঠিক চালিয়ে নেব।

লোকাল ফ্লাইটে মাঝেমাঝে এমন হয়। শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে একাধিক কেবিন ক্রু জমা হয়ে যায়। এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না, কারণ তাদের মজুরি খুব বেশি নয়।

রূপকথা উর্ধ্বশ্বাসে তার মায়ের কাছে ছুটলো। আর বিমানবালা সেজে ইরা উঠে গেল চাটগাঁর ফ্লাইটে।

বোর্ডিং অ্যারেঞ্জমেন্ট এমন যেন কামরানের সিটের ঠিক পেছনে আশিক বসতে পারে। তার পাশে পাতানো বান্ধবী রুমি। উল্টো দিকে থাকছে ঘটনার মূল নায়িকা লাইসা।

বিমান টেকঅফের পরে ব্যাটা কামরান চোরা চোখে বারকয়েক ইরাকে দেখেছে। একটু সুন্দরী কাউকে দেখলেই এদের নোলায় পানি গড়ায়। ইরা ভাবলো, তাকে চিনে ফেলবে না তো! অবশ্য চেনার কথা নয়। এরা তো আসলে সৌন্দর্য দেখে না, সৌন্দর্য গেলে। তাই অনেকটা নিঃশঙ্ক হয়েই কাজে নামে কেবিন ক্রুর পোশাকে ইরা।

একে একে সবাইকে খাবার দিতে থাকে। যাত্রী একুনে তিয়াত্তর। কামরানের আসন সামনে এ-ওয়ান। ইচ্ছে করেই তাকে সবার আগে খাবার ও পানীয় বুঝিয়ে দেয় ইরা। সাথে মিষ্টি হেসে মাথা নোয়ায়। সম্মানী ব্যক্তি, সম্মান করবে না! সাদায় তাকে বেশ মানিয়েছে! পারফেক্ট কাফনের সাজ।

জুসের গ্লাসে একটু একটু করে চুমুক দেয় কামরান। নিজের টাকায় কেনা বিমানে আরামসে ভ্রমণ করছে, ব্যাপারই আলাদা।

ইরা দ্রুত সবাইকে খাবার তুলে দিয়ে কামরানের দিকে অপাঙ্গে তাকায়। ব্যাটা কতক্ষণে ঢলে পড়ে সেটা দেখার খুব ইচ্ছে ওর। ওদিকে রুমি আশিককে নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। খোঁচা খুনসুটিতে মাতোয়ারা তারা। যেন মাত্র বিয়ে হয়েছে। হানিমুন ট্যুর করছে এখন।

নাও না আশিক। এটুকু তুমি খাও। রুমি আবেগে গদগদ গলায় বলল।

আশিক বলে, তুমি নাও ডার্লিং। এটুকু তোমার জন্য।

ইরা দেখে আর ভাবে, অতি বড় চালিয়াতও ধরাশায়ী হয় আশিক। এবার বুঝবে তুমি প্রতারণার শাস্তি কত নির্মম। তুমি কিছু জানবে না বুঝবে না, তবু ফেঁসে যাবে। মৃত্যুদণ্ড না হোক, যাবজ্জীবন কারাভোগ তোমাকে করতেই হবে!

মাত্র তিরিশ মিনেটের এয়ারট্রাভেল। কিছুক্ষণের মধ্যে বিমান ল্যান্ড করবে। ইরা তীক্ষè নজর বোলায়। ওই তো, ঢুলতে শুরু করেছে মিস্টার কামরান আহমেদ। তার মানে ওষুধে কাজ করছে। জুস পুরোটুকু খায় নি। হাই ভলিউম মরফিন মেশানো আছে। যেটুকু গিলেছে তাতেই ওর ‘দ্য অ্যান্ড’ হবার কথা। মরফিনের অ্যামপুল এতক্ষণে জায়গামতো চালান হবার কথা। ভ- প্রেমিক আশিক মুস্তাফার পকেটে।

চোখে চোখে লাইসার সাথে আরেকদফা কথা হয় ইরার। রুমিও আড়চোখে তাকায়। জানান দেয়, ইয়েস, অ্যাম্পুল ইজ দেয়ার। কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারবে না।

খুশি হয় ইরা। লাইসা আর রুমির হেল্প না পেলে এ কাজ কিছুতেই সম্ভব ছিল না। এক ঢিলে তুই পাখি মারা।

বেচারা কামরান মারা যাবার আগে বারদুই খিঁচুনির কবলে পড়ে। অমনি ছুটে আসে পাশেপাশের যাত্রীরা। বিমান ততক্ষণে নেমে গেছে চাটগাঁয়। যাত্রীদের ভেতর একজন ডাক্তারও ছিলেন। তিনি নাড়ি টিপে বললেন, হি ইজ নো মোর। মানে কামরান মারা গেছেন।

বিমান ল্যান্ড করার পর ইরাকে অবশ্য কেউ আর খুঁজে পেলো না। ওর মুখমণ্ডলে ভারি প্রসাধন ছিল। অনেকটা মুখোশের মতো। প্রসাধনের মাধ্যমেও যে কারো চেহারার জিওগ্রাফি আমূল বদলানো যায় এই বিদ্যেটা ইরার জানা ছিল। অর্থাৎ সিসিটিভিতে ইরার চেহারা ধরা পড়লেও আসল ইরাকে লোকেট করা কঠিন। তাছাড়া এর প্রয়োজনটাই বা কি!

ক্যাপ্টেন রাডারবার্তার মাধ্যমে কন্ট্রোল টাওয়ারে খবর পাঠালেন, কামরান ইজ ডেড। কাম আপ উইদ দ্য পুলিশ। ফ্লাই বেঙ্গল এয়ারলাইন্সের ড্যাশ এইট বিমানটি সিল করা হল। ইট্স অ্যা ক্লিয়ার কেস অফ মার্ডার। তাই চেক না করে কোনো যাত্রী রিলিজ করা যাবে না।

চিটাগাং মেডিকেল কলেজ থেকে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এলেন। বিশিষ্ট শিল্পপতি কামরান আহমেদের খুনের ঘটনা তখন টক অফ দ্য সিটি। র‌্যাব-পুলিশ যৌথভাবে যাত্রীদের জেরা-তল্লাশি করছে। খুব একটা খুঁজতে হয়নি অবশ্যি। ফরেনসিক এক্সপার্ট বললেন, কামরান সাহেবের জুসের গ্লাসে বিষাক্ত মরফিন মেশানো হয়েছে। নামি কোম্পানির টেট্রাপ্যাকড জুস, তাই আগে থেকে মেশানো সম্ভব ছিল না। যাত্রীদের কেউ একাজ করেছে।

ব্যস, পুলিশ অমনি খানাতল্লাশি শুরু করে দিল। লাগেজ ব্যাগেজ যার যা ছিল সব উল্টেপাল্টে দেখলো। অবশেষে কামরানের ঠিক পেছনের সিটে বসা আশিকের জামার পকেটে পাওয়া গেল হাই ভলিউম মরফিনের অ্যাম্পুল।

এরপর খুব বেশি জেরার দরকার হয় নি। র‌্যাব ও পুলিশ এই মর্মে একমত হয় যে, আশিক মোস্তাফাই কামরানের খুনি। সাক্ষী হিসেবে রুমি এগিয়ে যায়। সে নিশ্চিত করে, আশিককে রুমি একবার সামনের দিকে ঝুঁকে কামরান সাহেবের গ্লাসে কিছু ঢালতে দেখেছে। রুমি কিছু মনে করেনি। ভেবেছে কামরান তার পূর্বপরিচিত। স্রেফ মজার করার জন্যই হয়তো অমনটি করেছে।

কামরান স্পটেই ফিনিশ। তাকে খুনের দায়ে আশিক অ্যারেস্ট হয়। সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্সই কেবল নয়, রুমি তার আই-উইটনেস। কেস এখানেই খতম। আশিক নির্ঘাত ঝুলবে এবার।

পরের ফ্লাইটে এক হয় ওরা তিনজন- লাইসা, রুমি ও ইরা। জীবনে তাও একটা কাজ করতে পারল ইরা। লাইসা ও রুমির প্রতি তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। অনেক অনেকদিন বাদে আজ ইরা একটু স্বস্তি মতো ঘুমোবে।

লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares