আলি হায়দারের নির্বাচন-পর্ব : মাসুদা ভাট্টি

 

উপন্যাস

আলি হায়দারের নির্বাচন-পর্ব

মাসুদা ভাট্টি

জৈষ্ঠের শেষ দিকে কোনো বিকেলে বৃষ্টি নামলে রাতে গরমটা আরও তীব্র হয়, মাটি-বাতাস-গাছগাছালি সবকিছু থেকেই এক ভীষণ ভাঁপ বেরুতে শুরু করে, শ্বাস নিতেই কষ্ট হয়। এই শ্বাসকষ্ট রাতের আঁধারকে আরও অন্ধকার করে তোলে। কিন্তু নির্বাচনে যারা দাঁড়ায় তাদের কাছে এই রাত, অন্ধকার, ভ্যাঁপসা গরম, কাঁদা-কাচর কিছুই আর কষ্টের থাকে না। সামনে তাদের যে মূলো ঝোলে সেটা তাদেরকে দিয়ে আরও আরও সব কষ্ট করিয়ে নেয়। আলি হায়দার নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন কিন্তু এখানেও জাতীয় পর্যায়ের রেষারেষি আর উত্তেজনা। আমরা আলি হায়দারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে চাইছি।

ভাদ্রের এই অন্ধকার রাতে গ্রামের যে পথে দিনের বেলাতেও মানুষ হাঁটতে চায় না, সে পথে তিনজন সঙ্গী নিয়ে কেন আসন্ন নির্বাচনে তরুণ চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আলি হায়দার চলেছেন তার কারণ একটু পরেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি বিশাল গৃহস্থবাড়ির উঠোন পেরিয়ে পাকা মেঝে আর টিনের চালের ঘরটির চারদিকে ঘোরানো বারান্দায় ওঠার আগে গলাটা নামিয়ে আলি হায়দার বলেন, ‘কাকা আছেননি? আমি আলি হায়দার।’

ভেতর থেকে খুট করে দরোজাটা খুলে যায়, বোঝা যায় যে ভেতরে আগন্তুকদের জন্য অপেক্ষা চলছিল। এখানকার গ্রামে এখনও বিদ্যুৎ আসেনি। রাস্তার কথা তো বলাই হলো, এখনও পায়ে চলার পথ। বিল এলাকা বলে রাস্তাঘাট থাকে না, প্রতি বর্ষা শেষে রাস্তাগুলো কেবলই নীচু হতে থাকে কিংবা ভেঙেচুরে যায়। ঘরের ভেতর হারিকেন জ্বলছে। মৃদু আলোয় দ্যাখা যায় সেখানে আরও কয়েকজন লোক বসা। গ্রামে তাদেরকে সকলেই চেনে-জানে। তারা মূলত গ্রামের বিচার-আচার করেন, বয়স হয়েছে কারও, কাউকে বা বয়স না হলেও বয়স্ক দেখায়। জমি-জমানির্ভর জীবন কারও, কেউবা তার কিশোর থেকে বালেগ হওয়া ছেলেকে মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুর পাঠিয়ে সে পয়সা দিয়ে একের পর এক জমি কিনছেন বা পাকা ঘর তুলছেন। মোটকথা, ঘরের ভেতরকার মানুষগুলো এলাকায় নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন এবং তাদের কাছে ভোট আছে।

এই ভোট থাকার বিষয়টা কিন্তু অদ্ভুত। এদেশের বিশাল জনগোষ্ঠী সকলেই সকলের আত্মীয়-স্বজন, সকলেই সকলকে চেনে। এক প্রান্তের মানুষ নিমিষেই আরেক প্রান্তের মানুষকে তার আত্মীয় বানিয়ে ফেলতে পারে এবং ফেলেও। প্রমাণ করা যায় যে, অমুকের খালাতো ভাইয়ের শ্বশুরের তালতো ভাই। এটা প্রমাণিত হওয়ার পর পরই মামা, চাচা, খালু বা ফুপা সম্বোধন করে একেবারে আত্মীয়তার দাবি নিয়ে আচার-আয়োজন চলে। বিষয়টি যদি একটি ইউনিয়নের মতো ক্ষুদ্রতায় এনে ফেলা যায় তাহলে গোটা ইউনিয়ন জুড়েই প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে নানামাত্রায় সম্পর্কিত। ভোট এলে এইসব সম্পর্কগুলো নতুন যোগ্যতায় প্রয়োজনীয় আর ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে যে গোষ্ঠী যত বড় নির্বাচনী প্রার্থীর কাছে তিনি বা সেই গোষ্ঠীটি ততই গুরুত্বপূর্ণ। বোঝাই যাচ্ছে যে, এই হারিকেনের আলোয় যে সকল প্রাকৃত মুখ দেখা যাচ্ছে তারা প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের আগে তাদের এক চেহারা আর আজকে তাদের চেহারা বা মেজাজ আরেক।

এমনিতে তাদের কারও সঙ্গে আলি হায়দারের পথে-ঘাটে দেখা হলে তারা আলি হায়দারকে ডেকে বসাবেন, নিজেদের সমস্যার কথা বলবেন। কারণ আলি হায়দারের করা রাজনৈতিক দলটি এখন ক্ষমতায়। যদিও যিনি এলাকার এমপি তিনি আলি হায়দারের করা দলের নন। বিষয়টি বেশ জটিল। ক্রমশ আমরা এই জটিলতায় প্রবেশ করব। এদের সমস্যাগুলো সবসময় কমবেশি একই রকম। সরকার বদলাক কি দেশে ক্যু-ফ্যু কিছু হোক, তাদের সমস্যার রকমফের খুউব কমই হয়।

যেমন এই বাড়িটি যার, তার নাম সালাম শেখ। এই এলাকায় শেখ আর মাতুব্বরদের দাপট অনেক। এই দুই গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতার প্রমাণ নিয়ে প্রায়শই নানাবিধ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, কখনও কখনও সেটা খুন-খারাপির পর্যায়েও চলে যায়। এর বাইরে যেসব ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আছে তারা পক্ষ বদলিয়ে কখনও শেখদের, কখনও বা মাতুব্বরদের পক্ষে যায়। যখন যেমন সুবিধে। মাতুব্বররা এক সময় এই এলাকায় বিশিষ্ট ছিল কারণ তাদের গোষ্ঠী থেকেই আইয়ুব খানের আমলে একজন প্রেসিডেন্ট হয়েছিল। সে ছিল এক আমল, ক্ষমতাকে তখন এত হেলাফেলা কেউ করতে পারত না। যতদিন সে প্রেসিডেন্ট সাহেব অর্থাৎ হাশেম মাতুব্বর বেঁচে ছিলেন ততদিন তিনি আইয়ুবের আমল আর তার ক্ষমতার দম্ভই করে গিয়েছেন। এমনকি স্বাধীন দেশেও মাতুব্বরদের ক্ষমতা অটুট ছিল। কারণ এই গোষ্ঠীতে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যাও বেশি ছিল, বেশি ছিল লেখাপড়া জানা লোকজন। আর জমিজমা? সে-তো বেশিরভাগই এই গোষ্ঠীর হাতে ছিল। কিন্তু সময় কারও সমান নাহি যায়, এই সত্যকে প্রমাণ করে মাতুব্বর গোষ্ঠী ক্রমশ শক্তিহীন হয়। জমি-জমা বিক্রি করে নিজেদের আধিপত্য হারাতে থাকে। কিন্তু তাই বলে এখনও তারা একেবারেই ফেলনা সেকথা বলা যাবে না। আলি হায়দারও এই গোষ্ঠীর ছেলে। আলি হায়দারের অনুরোধেই তাদের বৈরী শেখ গোষ্ঠীর মাথা সালাম শেখ তার সঙ্গে আজ বসতে রাজি হয়েছেন। আলি হায়দার জানেন, এই বসাটার একটা মূল্য তাকে দিতে হবে। আজকে ঠিক হবে, সেই মূল্যটা আসলে কী।

: আস্সালামু আলাইকুম কাকা। আছেন কেমন?

: আর বাবা থাহা-থাহি। আছি একরহম। বিষ-ব্যথায় অচল ওইয়া গেছি। খাবার পারি না, দানা-পানি মুহি দিলিই ওক আসে।

এদেশের বেশিরভাগ মানুষকে কেমন আছেন প্রশ্ন করা হলে তিনি কখনওই সরাসরি বলতে পারেন না যে, ভালো আছি। প্রথমেই শারীরিক অসুস্থতার ফিরিস্তি দিয়ে তারপর আরও আরও বৃত্তান্ত দিয়ে এই প্রশ্নটিকে একেবারেই মুখ্য করে তুলবেন। আলি হায়দার তাই বলেই ফেলেন, ‘ডাক্তার-টাক্তার দেহান না ক্যান? আমি কি নিলু ডাক্তাররে কবোনি আফনার জন্যি? পেসার-টেসার বাড়লোনি আবার?’

আর নিলু ডাক্তারের কথা কইও না বাজান। ও একটা চশমখোর। গেলিই কয়ডা বড়ি ধরাইয়া দেয় আর দাম চায় হাজার টাহা। আরে মালাউনের বাচ্চা, তুই ঔষেদ দিবি এত দাম রাখপি ক্যান? আমারে কয়, ঔষেদের দাম না দিলি রোগ বালো ওবি ন্যানে। মিজাজটাই খারাপ ওইয়া যায় বুজলা?

আপনি একটা ভালো ডাক্তার দেহানদি কাকা। পরীক্ষা-টরিক্ষা কইরা তারপর ওষুধ খান। আইজকাইল কেউ পরীক্ষা না করাইয়া কি ওষুধ খায়? কন?

হ বাজান, যাবার চাই কিন্তুক কেমনে যাই কও? ছাওয়ালে টাহা পাডাইয়া কয় ডাক্তার দেহানোর জন্যি কিন্তুক এই বাড়িঘর ফালাইয়া যাই ক্যামনে?

দীর্ঘক্ষণ ধরে এরকম আলোচনা চলে। তাতে যোগ দেন বাকি যারা উপস্থিত রয়েছেন তারাও। কিন্তু সালাম শেখের গলাই বেশি শোনা যায়, কারণ এখানে তিনিই বয়স্ক। রাত গভীর হতে থাকে। গ্রাম্য রাতের বৈশিষ্ট্যই হলো, একটু গভীরের দিকে গেলেই পাখিগুলোও কেমন নীরব হয়ে যায়। উঠোনের পাশে লাগানো বরই গাছ থেকে নাকফুলের মতো ফুলটা পড়লেও তার শব্দ টের পাওয়া যায়। ঘরের ভেতরকার আলোচনা যতোই নিঃশব্দে করার চেষ্টা হোক না কেন, কথাগুলো বেশ জোরেই শোনা যায়। ঠিক এরকমই একটি মুহূর্তে আলি হায়দারের সর্বক্ষণের সঙ্গী একরামই কথাটা তুলে দেয়।

নির্বাচন তো কাছাইয়া গ্যালো। আপনারা তো কিছু কন না, কি করবেন না করবেন?

সালাম শেখ তখনও একরামের এই বাক্যটি শুনতে পেয়েছেন বলে ঠিক বোঝা গেল না। তিনি অন্য কোনো প্রসঙ্গে কথা বলেই যাচ্ছিলেন। আলি হায়দার নিজেই তখন কথাটা পাড়েন, ‘কাকা আপনাগো সমর্থন না পাইলে তো এই বিপদ পার হইতে পারব না, কিছু একটা কন কাকা। আমি কথা দিলাম কাকা, এইবার এই এলাকার জন্য কিছু না কিছু করবার পারব। দল ক্ষমতায়, দলের প্রতীক পাইছি, দল এলাকার কাজে সাহায্য করবে না সেটা তো হইতেই পারে না। এত বছর ধইরা আমাগো এলাকায় কিছু হইল না, না রাস্তা-ঘাট, না বিদ্যুৎ, আমি জান-প্রাণ দিয়া চেষ্টা কইরা যাব কাকা। আপনারা সমর্থন দিলেই হবে খালি, বাকিটা প্রশাসন কইরা দিবে।’

সালাম শেখ আলি হায়দারের কথা কিছুটা শুনেছেন কিংবা কিছুটা বুঝেছেন বা বুঝতে চাননি, এরকমও হতে পারে। তিনি একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ করেন, আলোটা একটু তীব্র হলে তার চেহারা দেখা যেত, এবং সেটা দেখা গেলে বোঝা যেত যে, তিনি আসলে এসবের ধার খুউব একটা ধারেন না। রাস্তা হলেই-বা কি, না হলেইবা কি? বিদ্যুৎ থাকলেও যা না থাকলেও তাই। তার জীবন তো পার হয়ে গেছে প্রায়, এসবের প্রয়োজন তো খুউব একটা পড়েনি। এখন এগুলো হলেও তার যে বিশাল কোনো লাভ হবে তাতো নয়। তিনি বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেন, ‘ঠিকই কইছ বাবা, আমাগো তো কেউ কিছু দিল-টিল না। বাচ্চুও আইছিল, সেও তুমার মতো কইলো তার নিগা কাম করবার জন্যি। হেও তো আমাগো পর না। দেহি কী করা যায় না যায়, গুষ্ঠির মুরুব্বিগোর সাথে কতা না কইয়া কিছু কবার পারি আমি? কও?’

আলি হায়দারের মুখটা এই অন্ধকারেও যে আরও অন্ধকার হয়ে যায় সেটা তার গলার আওয়াজ পরিবর্তনেই বোঝা যায়। নির্বাচনে ওর প্রতিপক্ষ বাচ্চু শিকদার যে ওর আগেই এখানে এসে কথা বলে গিয়েছে সেটা ও বুঝতে পারেনি। আসলে বাচ্চুর তো নির্বাচনেই দাঁড়ানোর কথা ছিল না। ওদের প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীর ছেলে হলেও এক সময় বাচ্চু আলি হায়দারের বন্ধুই ছিল। একই সঙ্গে প্রাইমারি ইস্কুলে লেখাপড়া করেছে দু’জনে। কলেজ আলাদা হলেও বন্ধুত্ব কমেনি। কিন্তু বাচ্চুর ছাত্র রাজনীতির অভিজ্ঞতা নেই, নেই কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ও। কিন্তু যে সময়ে আলি হায়দারের বাবা জমি বিক্রি করে ছেলের রাজনীতির খরচ জুগিয়েছেন ঠিক সেই সময়ে বাচ্চুর দারোগা-বাবা একের পর এক জমি কিনেছেন আর সম্পদ বাড়িয়েছেন। ফলে এখন বাচ্চুর আয় বছরে কয়েক লাখ টাকা আর আলি হায়দারের বলার মতো কোনো উপার্জন নেই। বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি আছে কয়েক বিঘা অবশিষ্ট, সেখান থেকে বছরকার খাবারটা চলে আসে। উপজেলা শহরে বাবার করে যাওয়া একটা বাড়ি আছে তিনতলা, নিজেরা এক তলায় থেকে বাকিটা ভাড়া দিয়েই দিন চলে তার। কিন্তু তারপরও বাচ্চুর নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা ছিল না। কিন্তু রাজনীতির ধারাতো বদলে গেছে, একই এলাকায় কয়েকজন শক্ত সমর্থক না রাখলে তো এমপি বা নেতাদের চলে না। কখনও কোনো রাজনৈতিক দল না করেও বাচ্চু এখন সরকারি দলের কর্মী হয়ে এমপি সাহেবের কাছের মানুষ। নির্বাচনের বেশ আগে থেকেই তার প্রার্থী হওয়ার কথা এলাকায় জানান দিয়েছে বাচ্চু এবং ক্রমশ আলি হায়দারের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব দূরত্বে বদলেছে।

এইতো কিছুদিন আগেই যখন নির্বাচন হবে হবে বলে চারদিকে জোর আলোচনা চলছে তখন এমপি সাহেবের উদ্যোগেই এলাকায় উঠোন বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল খোঁজ নিয়ে জানা কাকে চেয়ারম্যান প্রার্থী করা যায়। ইউনিয়ন হিসেবে আলি হায়দারদের ইউনিয়ন বিশাল এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। আটটি গ্রাম, অন্য যে কোনো গ্রামের চেয়ে যেগুলো বিশাল। ভোটার সংখ্যাও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই বেশি। উপজেলাসংলগ্ন এলাকাটি পশ্চিম দিকের এই শেষ সীমানা, যেখানে আলি হায়দারদের গ্রাম, সেখানকার তুলনায় শুধু উন্নত তাই-ই নয়, সেখান থেকেই বারবার চেয়ারম্যান হওয়ায় এই এলাকাটি একেবারেই অনুন্নত। এলাকাটি প্রকৃতির কাছ থেকেই দুই ভাগে ভাগ হয়ে আছে, মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে মরা মরা গোছের একটি নদী। কিন্তু নদীতো নদীই, মারা গেলেও বাঁক থেকে যায়, বিলের কাছাকাছি হওয়ায় প্রায় সারা বছরই পানি থাকে, আর বর্ষায় তো চেহারা বেশ ভালোই বদলে ফেলে। ফলে উপজেলা থেকে এই শেষের দিকে মানে আলি হায়দারদের গ্রাম পর্যন্ত আসতে বর্ষায় নৌকো আর শুকনোর দিকে হাঁটা ছাড়া কোনো গতি নেই। এত উন্নয়নের যুগেও এই এলাকার কোনো পরিবর্তন আসেনি। একটি রাস্তা হবো হবো করছে, বিদ্যুৎ আসি আসি করছে, এমপি সাহেব অনেক কষ্টে এই এলাকায় মিটিং করতে এসে বারবার সেকথা বলেনও কিন্তু এখনও সেটা হচ্ছে না। বছরখানেক আগে বিশ্বরোড থেকে একটি শাখা রাস্তার গ্রামের প্রান্ত পর্যন্ত আনার জন্য আলি হায়দার তার গাঁটের পয়সা খরচ করে আর আপন খালাত বোন দলীয় এক নেত্রীকে ধরে, বহু চেষ্টা-তদবির করে স্থানীয় হাট পর্যন্ত আনতে পেরেছে, এখনও সে রাস্তা কাঁচা, তাতে একটা ইঁট বসানোর চেষ্টাও কেউ করেনি এখনও পর্যন্ত। আলি হায়দার ভেবেছেন এই রাস্তাই তার নির্বাচনী তুরুপের তাস এবং সঙ্গে বিদ্যুৎ। তার চিন্তায় বাচ্চুর পক্ষে এসব সম্ভব নয়, কারণ বাচ্চুর সঙ্গে ওপরের কারও যোগাযোগ তো নেই-ই তাছাড়া এই রাস্তা করার সময় তিনি যে দৌড়ঝাঁপ করেছেন, সেটাতো সকলেই দেখেছে।

কিন্তু যখন নির্বাচন ঘনাচ্ছিল তখন দেখা গেলো বাচ্চুর প্রতিও মানুষের টান কম নেই। যে এমপি’র নির্বাচনে নিজের পকেটের পয়সা খরচ করতেও আলি হায়দার পিছপা হননি সেই এমপিই এখন বাচ্চুর পক্ষে কথা বলেন। যদিও সরাসরি আলি হায়দারকে না করতে পারেন না; কিন্তু আড়মোড়া ভেঙে বলেন, নির্বাচন করতে টাকা-পয়সা লাগে, এলাকায় জোর দেখানোর মতো ক্ষমতা লাগে, সেসব কি আলি হায়দারের আছে? এর মাঝে আবার আলি হায়দার কিছুদিন এলাকাতেও ছিলেন না। তাকে এলাকা থেকে সরে যেতে হয়েছিল।

এবার নাহয় নির্বাচন হচ্ছে দলীয় প্রতীকে কিন্তু এর আগেরবার নির্বাচন কিন্তু হয়েছিল যার যার তার তার অবস্থান-নির্ভর। রাজনীতির প্রতি তার ঝোঁক ছিল, একটি বড় রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে আলি হায়দার ধরেই নিয়েছিলেন যে, তিনি আসলে একজন যোগ্য প্রার্থী। সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিজের রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকার কারণে তিনি দৌড়ঝাঁপ করে এলাকার জন্য কিছু না কিছু আনতে পেরেছেন সরকারের কাছ থেকে। এমনিতেই এই বিল-জলা-খালের এলাকায় কোনোদিন কোনো কাজ হয়েছে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। এলাকার যে সকল বৃদ্ধরা একে একে গত হতে বসেছেন তারা গল্প করেন যে, কোনো এক সময় এখানে পাট কাটা কাঁচি দিয়ে খাল কাটার ঘটনাও ঘটেছে এবং একবার নাকি একটি লঞ্চমতো এসে এখানে নদীর সঙ্গে খালগুলোর যোগাযোগ ঘটিয়ে দেওয়ার কাজটি করেছিল। কিন্তু এখনও উপজেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ বলতে সেই হাঁটা পথ না-হয় বর্ষাকালে নৌকো। এরকম এলাকায় একজন এমপি প্রার্থী জন্মাবেন সে সুযোগও নেই। কিছু কিছু ছেলেপেলে সময়ের সঙ্গে শহরে গিয়ে থিতু হয়েছে বটে কিন্তু কারও পক্ষেই এখনও পর্যন্ত এই এলাকা থেকে সরকারি চাকরিতে বড় কোনো পদেও আসীন হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। রাজনীতিতে বড় কিছু হওয়া তো দূরের কথা। এরকম একটি এলাকায় আলি হায়দার তার অসুস্থ বাবা-মাকে নিয়ে ফিরে এসেছিলেন জেলাশহরে তাদের বসবাসের পাট তুলে দিয়ে। এমনকি ছোটোখাটো সরকারি চাকুরে বাবার শেষ বয়সের জমানো টাকা দিয়ে এক টুকরো জমি কিনেছিলেন জেলা শহরের প্রান্তে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের খুউব কাছেই, সেই জমিটুকুও বিক্রি করে দিয়ে চলে আসেন তারা এই গ্রামে। উদ্দেশ্য, একদিন নির্বাচন করবেন।

তবে উদ্দেশ্য শুধুমাত্র নির্বাচন করা তা নয়, এও সত্য যে, এই এলাকার জন্য আলি হায়দার কাজ করেছেন, তিনি চেয়েছেন এখানকার একটু হলেও উন্নতি হোক, রাস্তাঘাট হোক, বিদ্যুৎ আসুক, স্কুল হোক কিন্তু চাইলেই সব পাওয়া যাবে এমন কথা এদেশে হবার নয়। আলি হায়দার তবু হাল ছাড়েননি, তিনি নিজেকে একটু হলেও তার দলীয় এমপি’র কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পেরেছেন। বিশেষ করে বিগত নির্বাচনে খেয়ে না-খেয়ে তিনি কাজ করেছেন এমপি’র জন্য। হয়তো ভেবেছেন যে, এমপি সাহেব তাকে নির্বাচনী  বৈতরণী পার করিয়ে দেবেন। কিন্তু নির্বাচনের মাঠে নেমে আলি হায়দার বুঝতে পারছেন, যতটা সহজ তার মনে হয়েছিল, বিষয়টা তত সহজ নয়। এতোদিন তার চারপাশে যারা ছিল সকলের কাছেই এখন তিনি প্রার্থী। রাতারাতি সম্পর্কের সমীকরণ যেন বদলে গেছে।

এই যে কিছুদিন আগেও গ্রামের যে-কোনো বিচারে-আচারে আলি হায়দারকে ডেকে তার একটা মীমাংসার জন্য কতো কাকুতি-মিনতি তাদের। আলি হায়দারও খুউব মনোযোগ দিয়ে মানুষের কথা শুনেছেন, যার জন্য যখন যতটুকু প্রয়োজন করার চেষ্টা করেছেন। এমনকি সে জন্য তাকে  প্রতিপক্ষের হাতে নাজেহালও হতে হয়েছে। কিন্তু আলি হায়দার একটি বিষয় মাথায় রেখেছেন যে, ভোটের সময় হয়তো তারা তার পাশে থাকবেন। যদিও তিনি একথাটি বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন যে, যে পক্ষের হয়ে তিনি কোনো বিবাদ মিটিয়েছেন তার পাল্টা পক্ষ আসলে তার পাশ থেকে সরে গিয়েছে কিংবা শত্রু হয়েছে। আলি হায়দারের সঙ্গে এমপি’র সম্পর্ক ভালো, থানার সঙ্গেও ওঠবস আছে তার, সে কারণেই তার সালিশি মেনে নিয়েছে কেউ কেউ কিন্তু সেটা একেবারেই যে মাথার ভেতর জমা করে রেখেছিল সকল পক্ষই, এখন নির্বাচনের আগে আলি হায়দার সেটা টের পাচ্ছেন। কিন্তু এখন আর কী নেমেই যখন গেছেন, তখন তো আর ভেজা কাপড় নিয়ে উঠে আসার কোনো উপায় নেই, তাই না?

 

নির্বাচনের আগের গল্প

শুরু থেকেই শুরু করা যাক। আলি হায়দার বয়সে তরুণ, ছাত্রত্ব থেকে বেরিয়েছেন বছরপাঁচেক আগে। বেশ বয়সেই তিনি ছাত্রত্ব ছেড়েছেন। কারণ জেলাশহরের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে নাম করেছিলেন। কিন্তু এর বেশি আর তিনি এগুতে পারেননি। সে যোগ্যতা তার ছিল না, এমনটা বলা যাবে না কিন্তু ছাত্রনেতার পর্যায় পেরিয়ে যুবনেতার ধাপে পৌঁছুতে হলে কেন্দ্রীয় নেতার আশীর্বাদ লাগে, এমনকি ছাত্র থাকাকালীন এমন কিছু কাজ করে দেখাতে হয় যাতে মনে হতে পারে যে, যুবনেতা হিসেবেও তিনি দলের জন্য বিরাট কিছু করতে পারবেন। আলি হায়দার সেটি দেখাতে পারেননি। তাছাড়া তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন না, ছিলেন একেবারেই শেষের দিকের সম্পাদক পর্যায়ে, ফলে তিনি পেছনের সারি থেকে উঠে দাঁড়াতেই পারছিলেন না। চেষ্টা করেছেন খুউব, কিন্তু বিফলেই গেছে সেসব। যদিও এই বিফল হওয়ার পর্যায়ে আলি হায়দার একে একে বহু কিছু হারিয়েছেন।

লেখাপড়া হওয়ার কথা তার ছিল না। মেধা তার মধ্যমানের চেয়েও খারাপ। কিন্তু তার ভেতর জানা-বোঝার আগ্রহ ছিল, সেগুলোকে জাগিয়ে রাখার মতো পরিবেশ তার ছিল না। নিজের পরিবার নিম্ন মধ্যবিত্ত। বেশি বয়সের সন্তান বলে পেনশন পাওয়া বাবার খরচ করার মতো সম্পদ ছিল কেবল সেটুকুই যেটুকু তিনি চাকরি থেকে অবসরান্তে পেয়েছিলেন। ছাত্রসংসদ নির্বাচনে সেখান থেকে বেশ খানিকটাই খরচ করা হয়ে গিয়েছিল। তারপর জীবন-যাপন এবং একমাত্র ছেলের খরচ জোগাতে বৃদ্ধ হায়দার সাহেব তার বাবার রেখে যাওয়া ফসলি জমি বিক্রি করেছেন একের পর এক। জমিগুলোর প্রতি তার মমত্ব ছিল অসীম। কিন্তু ছেলেকে প্রতিষ্ঠার জন্য সেগুলো একে একে হাতছাড়া হতে দেখে তিনি আসলে জীবনের প্রতি আশা-আকাক্সক্ষা সবই হারাতে বসেছিলেন। ঠিক সে সময়ই তার শরীরে বাসা বাঁধছিল ভয়ঙ্কর এক ব্যাধি। এই রোগই তাকে নিয়ে গিয়েছিল মৃত্যুর কাছে। সে অবশ্য অনেক পরের গল্প। আমরা সে গল্পে ক্রমশ প্রবেশ করব। আমরা এখন নির্বাচনের আগের দিনগুলিতে আছি। কিন্তু তারও আগে এই নির্বাচনে আলি হায়দারকে সরকারি দল কী করে যোগ্য মনে করল সে বিষয়টি আমাদের জানা থাকা দরকার।

আলি হায়দার নির্বাচন করবেন বলে গ্রামে ফিরেছিলেন। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন যে, শহুরে জীবনে তিনি বেমানান। তার সে শখও ছিল না কোনোদিন। বরং এই গ্রামে ফিরে আসাটা তার বরাবরের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু তার একেবারে তলায় রূপকথার সেই ভোমরার মতো যে কৌটোটি তিনি লালন করতেন, সেটি আর কিছুই নয়, নির্বাচন করা। তাও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া। এলাকায় ফিরেই তিনি নেমে গিয়েছিলেন সমাজ সেবায় কিংবা বলা ভালো মানুষের সেবায়। এই কারও মেয়ের বিয়ে নিয়ে গ-গোল হলো, সেখানে গিয়ে সে গ-গোল মেটানো কিংবা জমিসংক্রান্ত ভাইয়ে-ভাইয়ে বিরোধও তিনি মেটাতেন। বাড়িতে তিন বেলা ভাত খাওয়া হয়নি তার বহুকাল। অসুস্থ বাবা-মাকে এলাকার সকলেই এক সময় সম্মান করতো, কারণ এই এলাকা থেকে সরকারি চাকুরে তো তেমন একটা দেখা যেত না সেকালে, তাই যতো ছোট চাকরিই করেন না কেন, আলি হায়দারের বাবা হায়দার সাহেবকে এলাকার সকলেই সম্মান করতেন। তাছাড়া জেলাশহরে বেড়াতে গেলে হায়দার সাহেবের বাসায় একবেলা কেউ খায়নি এরকম লোক এই এলাকায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। দরকার হলে এই বাসায় থেকে দিনের পর দিন চিকিৎসা বা আদালতে মামলা চালানোর ঘটনাও আমরা শুনেছি। কিন্তু এখন এই বৃদ্ধ বয়সে জেলাশহরের বসবাস গুটিয়ে এলাকায় এসে থাকার যে ঝক্কি তারা হয়তো সেটা নিতেন না কারণ এখানে ডাক্তার নেই, বদ্যি নেই, নেই কোনো নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, যে সুযোগ-সুবিধায় তারা মোটামুটি একটি জীবন পার করে দিয়েছেন। কিন্তু একমাত্র ছেলে তাদেরকে টেনে এনেছেন এখানে। এই পা-ববর্জিত বিল-জল-খালময় এলাকায়। এখানে তারা মৃত্যুর অপেক্ষা করে যাচ্ছেন অনবরত। যদিও শহরে থাকলে তাদের জীবন কী করে চলতো সে বিষয়ে তাদের ধারণা নেই, কারণ তাদের একমাত্র ছেলেকে দিয়ে তো কোনোদিন একটি পয়সাও উপার্জন হয়নি। নেওয়া ছাড়া, দেওয়ার বেলায় আলি হায়দারকে কখনও পাওয়া যায়নি।

এই গভীর দুঃখ নিয়ে হায়দার সাহেব যেদিন এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যান সেদিন হায়দার সাহেবের স্ত্রী রাবেয়াও মনে মনে ভাবেন যে, এরপর থেকে তার জীবনকে এ পৃথিবীতে যত সংক্ষিপ্ত করা যায় ততই লাভ। তবুও কিছু কিছু জমি তখনও অবশিষ্ট ছিল, বছরকার খাবারটা চলে যায়, সংসার ছোট হওয়ায় কিছু কিছু বিক্রি করে বাকি খরচটাও চলে আর তার বাকিটা দেখেন তার বোনের মেয়ে ইলোরা। যাকে তিনি এক সময় পেলেছেন, বোনটা চলে গিয়েছিল ইলোরাকে জন্ম দিয়েই। জন্মের পরেই মেয়েটাকে কারও কাছে গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিল ওদের পরিবার থেকে। হায়দার সাহেবের অনুমতি নিয়েই রাবেয়া মেয়েটিকে নিয়ে এসেছিলেন তার কাছে। তখনও তার কোনো সন্তান হয়নি। তিনি ইলোরাকে সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে তার জন্য আসা পুরস্কার হিসেবেই দেখেছেন। কী ভরাট হয়ে উঠেছিল তার জীবন সেটা তিনি কাউকে কখনওই বোঝাতে পারবেন না। হায়দার সাহেবও কখনওই ইলোরাকে পরের মেয়ে বলে ভাবেননি, বরং ইলোরার জন্য সবচেয়ে ভালো ইস্কুলের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে যতভাবে সম্ভব তার লেখাপড়ার সুযোগ করে দেওয়ায় কোনো ধরনের কার্পণ্য করেননি। ফলে জেলাশহরের সেরা সরকারি ইস্কুল থেকে ইলোরা জাতীয় পর্যায়ে মেধা তালিকায় শেষের দিকে নাম লিখিয়ে হায়দার সাহেবের পরিবারের নাম উজ্জ্বল করেছিলেন। কলেজের ফলাফলেও পত্রিকার পাতায় ইলোরার ছবি উঠেছিল। শুধু মেডিকেলে সুযোগ না পেয়ে ইলোরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেখানেই তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন রাজনীতিতে এবং এখন তিনিই সরকারি দলের একজন বিশিষ্ট নেত্রী ইলোরা হায়দার। খুব সংক্ষেপে এই গল্প বলা হলেও ইলোরা হায়দারের এই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার গল্প এতটা সরল নয়। এই না-সরল গল্পও আমরা জানব, কারণ আলি হায়দারের নির্বাচনের গল্পের সঙ্গে ইলোরা হায়দারের গল্পের সংযোগ রয়েছে অনেক। কিন্তু এখন শেষ করা যাক আলি হায়দারের নির্বাচনী গল্পটা। শুধু এখানে আমরা এটুকু জেনে রাখি যে, ইলোরা হায়দার সাহেবের নামটি গ্রহণ করার ফলে যেমন তার জন্মদাতা পিতাকে অস্বীকার করেছেন তেমনই যে হায়দার সাহেবের পরিবারে তিনি একেবারে আপন বোন হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন, তা কিন্তু নয়। বরং কারণে ও অকারণে একথা তাকে শুনতেই হয় যে, হায়দার সাহেবের পরিবার যদি তাকে না দেখতো তাহলে তিনি হয়ত এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতেই পারতেন না। ফলে ইলোরা হায়াদরকে এই বেঁচে থাকার মূল্য দিতেই হবে যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন ততোদিন। ইলোরার তাতে আপত্তি নেই, তিনি হাসিমুখেই এই সত্য মেনে নিয়েছেন এবং ঢাকা থেকে নিজের সংসারটা বাঁচিয়ে তিনি বাকি সবটুকুই তার খালা তথা জীবনদায়ী মা’র জন্য করে যাচ্ছেন। আর তার রাজনৈতিক ক্ষমতার সবটুকুই তিনি প্রয়োগ করে থাকেন তার ভাই আলি হায়দারের জন্য। আলি হায়দারও তার বোন ইলোরা হায়দারের এই ক্ষমতাটুকুর জোরেই যে নির্বাচন করতে নেমেছেন সেটাও সকলেই জানেন। এমনকি নির্বাচনী খরচও যে ইলোরা হায়দার জোগাবেন, সেকথাও এলাকার সকলে বলাবলি করেন। সকলের ধারণা ইলোরা হায়দার অগাধ বিত্তশালী এবং আলি হায়দারের নির্বাচনে অর্থের কোনো অভাব হবে না। যদিও সেকথা পুরোপুরি অসত্য এবং সত্যিই অসত্য।

আলি হায়দার এলাকায় এতদিন ধরে যে দাপট ও শক্তি নিয়ে কাজ করেছেন তার পেছনে ইলোরা হায়দারের প্রচ্ছন্ন ও প্রকট, দুই ধরনের অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু নির্বাচনে ভোট প্রাপ্তির বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমীকরণ। এমনকি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়টিও তাই। আমরা একথা জানি যে, যখন স্থানীয় নির্বাচন দলীয়ভাবে হতো না তখন একবার আলি হায়দার চেষ্টা করেছিলেন প্রার্থী হওয়ার। হয়েওছিলেন। সেই নির্বাচনে ইলোরা হায়দার কমপক্ষে ত্রিশ-চল্লিশ লাখ টাকা খরচ করেছিলেন। কিন্তু সেই নির্বাচনে আলি হায়দার প্রায় হাজার খানেক ভোটের ব্যবধানে হেরে গিয়েছিলেন। সব নির্বাচনেই ভোটে জেতা ও হারার গল্পটি একরকম। তাই আমরা সেই পরাজিত নির্বাচনের গল্প এখানে আর করতে চাই না। আমরা পরবর্তী নির্বাচন, যে নির্বাচনে আলি হায়দার সরকার দলীয় নমিনেশন পেয়েছিলেন সেটি সম্পর্কে জানতে চাই বিস্তারিত। সে কারণে আমরা শুধু এটুকু জানিয়ে রাখতে চাই যে, সেই পরাজিত হওয়া নির্বাচনে ইলোরা হায়দারের ত্রিশ-চল্লিশ লাখ টাকা খরচ হওয়ার পরেও নির্বাচন শেষ হওয়ার মাস খানেক পর থেকেই একের পর এক ব্যক্তি এসে রাবেয়া’র কাছে পাওনা টাকা দাবি করতে লাগল। কেউ এক লাখ, কেউ পঞ্চাশ হাজার, কেউ বা তার চেয়েও বেশি।  সবচেয়ে ভয়ঙ্কর গল্প জানা গেলো যে, নির্বাচন করতে গিয়ে হায়দার সাহেবের অবশিষ্ট যে জমজিমা ছিল তার দলিলপত্রও আলি হায়দার বিভিন্ন জনের কাছে বন্ধক রেখে টাকা এনেছেন। রাবেয়া এই ভয়ঙ্কর চাপ নিতে পারেননি বেশিদিন। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর মাত্র বছরখানেক কিংবা তার চেয়ে একটু বেশি সময় তিনি বেঁচেছিলেন। কিন্তু সেই বেঁচে থাকাটাও খুব সুখের ছিল না। তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেটা কতটা অসুস্থতাজনিত কারণে আর কতটা তার একমাত্র ছেলে আলি হায়দারের দেওয়া কষ্টের কারণে সেটা আমরা জানতে পারি না। কারণ রাবেয়া বরাবরের চাপা একজন মানুষ, নিজের সুখ-দুঃখের কথা তিনি কাউকেই কখনও বলেননি। কিন্তু এই রাবেয়াই একদিন ইলোরা হায়দারকে কাছে ডেকে বসিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই ইলু’। ইলোরা জানতেন, তার মামণি তাকে কী বলতে চান, তাই গলাটা স্বাভাবিক রেখেই বলেছিলেন, ‘বলো মামণি’।

ঢাকার যে হাসপাতালে ইলোরা তার মামণিকে এনে ভর্তি করেছিলেন সেই হাসপাতালটি খুব বিখ্যাত ছিল না কিন্তু এর বেশি তিনি আর পারছিলেন না। কারণ, আলি হায়দারের নির্বাচন করে আর নিজের জীবনের বাকি সব আবিল মিটিয়ে তার পক্ষে এর চেয়ে ভালো কোনো হাসপাতালে মামণিকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু দিন দিন মামণিকে ওই গ্রামে ফেলে রেখে মরতে দেওয়ার কথাও তিনি ভাবতে পারছিলেন না। আলি হায়দারকে যখনই তিনি বলতে চেয়েছেন যে, রাবেয়াকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা করানো দরকার, তখনই আলি হায়দার উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন যে, ঠিক হয়ে যাবে, এমন কোনো অসুখ না এটা। আর বয়স হয়ে গেছে রাবেয়ার, ঢাকায় এনে চিকিৎসা দিলেই বা এমন কী হবে? ইলোরা এক প্রকার জোর করেই রাবেয়াকে ঢাকায় এনেছিলেন। মাসের পর মাস চিকিৎসা চলছে এই হাসপাতালে কিন্তু তার অবস্থার খুউব একটা হের-ফের হয়নি। বরং এই হাসপাতালটার সকলের সঙ্গে ইলোরার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে প্রতিদিন দু’বার করে আসা-যাওয়ায় আর বেশিরভাগ রাতে রাবেয়ার সঙ্গে থাকার ফলে। আলি হায়দার ঢাকাতেই আসতে চায় না, কারণ ততদিনে নতুন আরেকটি নির্বাচনের জন্য তার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা চলছিল এবং ততদিনে একথাও জানা গিয়েছিল যে, এবার নির্বাচন হবে দলীয় ভিত্তিতে, দলীয় মনোনয়নে। আর দল ক্ষমতায় থাকায় আলি হায়দার এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, তিনিই এবার নির্বাচিত হয়ে চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছেন কারণ ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে নির্বাচনে হারানোর মতো কোনো ঘটনা এদেশে ঘটতে পারে সেটা কেউই বিশ্বাস করে না, আলি হায়দারও করেন না। ফলে তিনি এলাকায় আরও বেশি করে সময় দিতে শুরু করেন। ততদিনে অবশ্যি ইলোরাই উপজেলা শহরে এক টুকরো জায়গা কিনে একটা ছোট্ট দোতলা বিল্ডিং করে দিয়েছেন রাবেয়ার জন্য। আর সেই বিল্ডিং দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন রাবেয়া, কারণ তিনি জানতেন যে, এই বিল্ডিং আসলে শেষ পর্যন্ত আলি হায়দারের জন্যই থাকবে, এখানে কোনোদিনই ইলোরা বসবাস করতে যাবেন না। তিনি সেকথা ভেবে এই অসুস্থ শরীরেও সবচেয়ে বড় শান্তি পেয়েছিলেন।

কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে, বড় বড় শ্বাস টানতে টানতে, ইলোরার হাত ধরে রাবেয়া যেদিন বললেন, ‘ইলু তুমি আমাকে কথা দাও, আমার মৃত্যুর পরও আলি হায়দারকে ফেলবা না’ তখন কিন্তু ইলোরা নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। ঠিক সেই মুহূর্তে ইলোরার মনে হয়েছিল, যদি সত্যিই তিনি রাবেয়ার জন্ম দেওয়া মেয়ে হতেন তাহলেও কি রাবেয়া পারতেন এরকমভাবে বলে যেতে? কেবলমাত্র নিজের ছেলের কথা বলতে? একবারও কি ইলোরার কথা ভাবতেন না রাবেয়া যদি সত্যি সত্যিই তার মা হতেন তিনি? ইলোরার ভেতরকার প্রশ্নটি হয়তো অসুস্থ রাবেয়াও বুঝতে পেরেছিলেন, তাই বলেছিলেন, ‘শোনো তোমার হয়তো মনে হচ্ছে যে, আমি তোমার সত্যিকারের মা হইলে কি এরকম ছেলের টান টানতে পারতাম? পারতাম। কারণ কি জানো মা? কারণ হইলো, দুর্বল সন্তানের প্রতি মা’দের সবচেয়ে বড় পক্ষপাতিত্ব থাকে, আমারও আলি হায়দারের জন্য ভয় লাগে সব সময়। ও কোনোদিন কিছু কইরা খাইতে পারবে বইলা আমার মনে হয় না। পারলে এতদিনেও পার তো। তুমি ওরে বাড়ি কইরা দিছো, আমার মনে হইছে গ্রামের সবকিছু তো উইড়া-পুইড়া গেছে, এখন শুনতেছি কার কার কাছে বলে বন্ধক রাখছে। সেসব ছাড়াও বা না-ছাড়াও, কিন্তু বাড়িটা যে হইছে, ছেলে-সন্তান নিয়া এইখানে তো মাথা গুজার ঠাঁইটা হইল। আমার এখন মইরাও শান্তি মা। তোমার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না’।

চোখের জল ইলোরার পক্ষেও ধরে রাখা অসম্ভব ছিল। এই ভদ্রমহিলা না থাকলে তার জীবনটা কী হতো, কেমন হতো সেটা বহুদিন ভেবেছে, এখন আর তিনি সেটা ভাবেন না। কিন্তু এই ভদ্রমহিলা চলে গেলে ইলোরার জীবনে আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না, আপনজনের তালিকায় সেটা ভেবে ইলোরার ভেতর থেকে হু হু করে কান্না আসে। তিনি কান্না চেপে রাখতে অভ্যস্ত কিন্তু কখনও কখনও সে শক্তি তার থাকে না। তাই রাবেয়াকে জড়িয়ে ধরে তিনি ভেঙে পড়েন কান্নায়। বহু পরিচিত কেবিনের ভেতর হলুদ আলো জ্বলে। একজন অসুস্থ নারী হাঁপর টানার মতো শ্বাস টেনে টেনে কথা বলেন আর একজন ত্রিশোর্ধ্ব নারী সেই শ্বাসকষ্টের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে থাকেন। দৃশ্যটা নির্মম এবং সত্য। এবং এই সত্যের ভেতর এই প্রতিশ্রুতি আদায় হয়ে যায় যে, ইলোরা হায়দার কখনওই আলি হায়দারকে ফেলবেন না। তিনি যতদিন জীবিত থাকবেন আলি হায়দারের জন্য যতটা সম্ভব তিনি করে যাবেন। হয়তো এরকম প্রতিশ্রুতি আদায়ের শান্তি নিয়েই এই ঘটনার মাত্র সপ্তাহখানেকের মাথায় রাবেয়ার মৃত্যু হয়। ইলোরার জন্য সে মৃত্যু ছিল পৃথিবী থেকে সবশেষ আপনজন চলে যাওয়ার আর আলি হায়দার যেটি বুঝতেও পারেননি, তাহলো, এই মৃত্যু-পরবর্তী তার জীবন সম্পূর্ণভাবে একার ও স্বজনহীনতার। আলি হায়দারের বুদ্ধি-জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন না তুলে একথা বলাই যায় যে, তিনি এই সত্য বুঝতে পারেননি। কিন্তু রাজনৈতিক বুদ্ধি দিয়ে তিনি এটুকু বুঝতে পেরেছিলেন যে, তার মায়ের মৃত্যু-পরবর্তী মিলাদটা যদি একটু বড় করে করা যায় তাহলে একই সঙ্গে মানুষকে একথা জানান দেওয়া যাবে যে, তিনি আগামী নির্বাচনে একজন শক্ত প্রার্থী এবং একবার যদি ইলোরা হায়দারকে দিয়ে একথা ঘোষণা দেওয়ানো যায় যে, কেন্দ্র থেকে তিনি আলি হায়দারকে মনোনয়ন এনে দেওয়ার কাজটি করবেন, তাহলে এলাকায় তার প্রভাব পড়বেই এবং মানুষ সেটি জোর দিয়েই বিশ্বাস করবে।

বাড়িভর্তি সদ্য রাবেয়ার গত হওয়া শোক পুব থেকে পশ্চিমে, উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে যায়। ঘোর বর্ষাকাল। চারদিকে আগের মতো থৈ থৈ পানি হয় না আজকাল। তবুও নৌকো ছাড়া চলা দায়। গোরস্থানে নিয়ে যাওয়ার পর রাবেয়াকে শেষ দেখা দেখতে আসা মানুষ একে একে ফাঁকা হয়, বাড়িটা কেমন ভারী আর থম ধরে থাকে। সন্ধ্যে নাগাদ কবর দেওয়া লোকজন ফিরে এলে তাদের জন্য খারারের ব্যবস্থা করেন ইলোরা। দেখতে পান উঠোনের এক কোণায় চেয়ার পেতে বসে আছেন আলি হায়দার। মুখটা নীচু করা, যেন স্তব্ধ পাথর। ইলোরা গিয়ে আলি হায়দারের পিঠে হাত রাখেন। ঠিক তখনই আলি হায়দার ডুকরে কেঁদে ওঠেন। বোঝা যায় এতক্ষণ শোকটা সামলানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু আর পারলেন না। ইলোরার হাত সেটা উস্কে দিলো এবং ভালোই হলো হয়তো। সে রাতেই দু’ভাই বোনে মিলে ঠিক করেছিলেন যে, একটু বড় করেই মায়ের মিলাদ করবেন। তিনটে গরু জবাই করার কথা ঠিক করলেন এলাকার মুরুব্বিরাই। আর কাকে কাকে দাওয়াত দেওয়া হবে সেটাও ঠিক হলো। ইলোরা প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন যে, এরকম একটা কিছু করতে হবে। হায়দার সাহেবের মৃত্যুর পরও এটা করতে হয়েছিল। তাই তিনি নিষেধ করেননি। আর নিষেধ করার মতো পরিস্থিতিও ছিল না।

পাঁচ দিনের দিন যে  বিশাল আয়োজনটি আলি হায়দারদের বাড়িতে হলো তা ছিল দেখার মতন। বাড়ির বাইরে বড় উঠোনে গর্ত খুঁড়ে রান্না চলছে। আগের দিন ঢেঁকিতে মশলা কোটা হয়েছে। বাবুর্চি এসেছেন দূরের কোনো এক গ্রাম থেকে। তিনি আগে থেকেই লিস্টি ধরিয়ে দিয়েছেন তার কী চাই। সে অনুযায়ী বাজার করা হয়েছে। বাজার বলতে তো সেই উপজেলা শহর। সেখান থেকেই নৌকো বোঝাই করে আনা হয়েছে জিনিসপত্র। আর তিনটে গরু, চারটে ছাগল কেনা হয়েছে সাত মাইল দূরের বিখ্যাত গরু-ছাগলের হাট থেকে। পানি ঝাঁপিয়ে তাদেরকে নিয়ে আসা হয়েছে। আগের রাতেই সেগুলো জবাই করে মাংস তৈরি করতে করতে ভোর হয়ে গিয়েছিল। রান্না চড়াতে চড়াতে বেলা অনেকটাই উঠে গেল। কিন্তু এরই মধ্যে এই দাওয়াতে কে আসবে আর কে আসবে না তা নিয়ে শুরু হলো নতুন গ-গোল। গ্রামের দাওয়াতে এরকমটাই হয়ে থাকে কিন্তু এবার যেন বিষয়টি একেবারে অন্য মাত্রা নিল। সবাই বলাবলি করতে শুরু করল যে, নির্বাচনের কারণেই এরকমটা হচ্ছে, নাহলে এরকম হতো না। ইলোরা ঠিক বুঝতে পারেন না কী করবেন। তিনি এলাকার সবাইকে চেনেন। জেলাশহর থেকে ছুটিছাঁটায় তারা আর কোথাও না গেলেও এই গ্রামে এসে মাসের পর মাস কাটিয়েছেন। এখানে সকলেই তার জন্মবৃত্তান্ত জানলেও একথাও মানেন যে, ইলোরা আসলে এই গ্রামেরই মেয়ে। তার কথার মূল্য একটু হলেও আছে। রাবেয়ার জানাজায় যারা উপস্থিত হয়েছিলেন তাদেরকে সে মুহূর্তেই বলে দেওয়া হয়েছিল যে, পাঁচ দিনের দিন যে মিলাদ হবে সেটায় উপস্থিত থাকার জন্য। কিন্তু তার পরদিন থেকেই যখন লিস্টি ধরে দাওয়াত দেওয়ার কাজটি শুরু হয়েছিল তখন থেকেই বিপত্তি শুরু হয়েছিল। রাবেয়ার জানাজায় উপস্থিত হলেও গ্রামের একটি পক্ষ সরাসরি দাওয়াত নিতে অস্বীকার করল।

প্রথমে এই অস্বীকারের বিষয়টি এসে জানালেন আলি হায়দারদের মুরুব্বি আলেমজান। গ্রামের সবাই তাকে মুরুব্বি মানে। আর সে কারণেই তিনি গিয়েছিলেন হাকিমদ্দি শিকদারদের বাড়িতে। গ্রামের দু’টি মুখ্য গোষ্ঠী একটি মাতুব্বর গোষ্ঠী আরেকটি শিকদার গোষ্ঠী। আলেমজান মাতুব্বর গোষ্ঠীর সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি আর হাকিমদ্দি শিকদার গোষ্ঠীর মুরুব্বি। গলা খাকারি দিতে দিতে যখন আলেমজান গিয়ে হাকিমদ্দি শিকদারের বারান্দায় ওঠেন তখন বৃদ্ধ হাকিমদ্দি বসে ঝিমুচ্ছিলেন। ‘অ্যাদো আছো কেমুন?’ একটু জোরেই আলেমজান জানতে চেয়েছিলেন, কারণ তিনি জানেন যে, হাকিমদ্দি শিকদার কানে কম শোনেন। সেই বহুদিন আগে থেকেই তার কানে কম শোনার কথা এই এলাকার লোকজন জানেন। আর আলেমজান তো আরও ভালো করেই জানেন, কারণ তারা দু’জনেই বলতে গেলে একসঙ্গে বুড়ো হয়েছেন। কাইজ্জ্যা-ফ্যাঁসাদ ছাড়া দু’জন বয়স্ক মানুষের সম্পর্ক যেটুকু থাকার ততটুকু আছে কিন্তু এই দুই বৃদ্ধের জীবন সম্পর্কে জানা থাকলে আমরা বুঝতে পারব যে, দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্বটা ক্ষমতার, মান-সম্মানের এবং অর্থের। দীর্ঘ সময় ধরে আলেমজানের গোষ্ঠী এলাকার মাতবরি-সর্দারি করে আসছে, তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তিও বেশি কিন্তু বছর দশেক হলো শিকদার গোষ্ঠীতেও চাকরিজীবী বেড়েছে, বিদেশে গিয়ে অর্থ উপার্জনকারীর সংখ্যাও বেড়েছে। তাই ঢের জমির মালিক হওয়া সম্ভব হয়েছে এই গোষ্ঠীর। এখন তারা আর আগের মতো মাতুব্বর গোষ্ঠীকে মূল্য দেন না। না দেওয়ার কারণও আছে। মাতুব্বর গোষ্ঠীতে এক সময় অর্থ-বৃত্ত আর চাকরিজীবীর সংখ্যা বেশি থাকলেও ক্রমশ তা কেবল কমেছে তাই-ই নয়, বরং আলি হায়দারের মতো বাপের সম্পত্তি একের পর এক বিক্রি করে দেওয়ার সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু ক্ষমতার দাপট আগের মতোই দেখানোর ক্ষেত্রে মাতুব্বরদের কেউ পিছপা হননি। এরকমটা মানবে কেন অন্যেরা? তারাও ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে, শ্রম দিয়ে এবং ইদানীং রাজনীতির জোরেও। গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে যেভাবে রাজনীতি ঢুকেছে তাতে এখানেও দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর মধ্যেই দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। মাতুব্বর গোষ্ঠী এখন সরকারি দল কিন্তু শিকদার গোষ্ঠী এর আগের সরকারের আমলে যথেষ্ট প্রতিপত্তি আর ক্ষমতার জোর দেখিয়েছে। এই দুই বৃদ্ধ এখন দুই পক্ষের মুরুব্বি হলেও তাদেরকে নাড়ান-চাড়ান কিন্তু এই দুই পক্ষের অপেক্ষাকৃত তরুণরাই। হাকিমদ্দি শিকদার জানতেন যে, আলেমজান দাওয়াত নিয়ে আসবেন। তিনিও প্রস্তুত ছিলেন, কেশে গলা থেকে বহু পুরোনো শ্লেষ্যা পরিষ্কার করে বলেন, ‘আর থাহা না থাহা, আল্লায় যেমুন রাখছে। তুমি আছ কেমুন?’

হে কথা পরে কবানে। অ্যাহন হোনো, বেশিক্ষণ বসফার জো নাই। পরশু শনিব্যার দুফেরে আমাগো বাড়ি খাবা তোমার গুষ্ঠীরে নিয়া। রাবু ভাবীর জন্য মিলাদ, বুজলা?

হ বুজলাম রে বাফু। তয় আসফার তো পারবনানে বাই। জানাজায় গেছিলাম আমরা। রাবু বাবীরে তো আমরা হ¹ুলি সুন্মান হরি। তয় ভাই তোমাগো বাড়ি খাবার যাবার পারবান নানে। সেই পথ তুমরা তো আর রাহো নাই। কী রাখছো?

আলেমজান জানতেন যে, এরকমই একটা কিছু শুনতে হবে হাকিমদ্দি শিকদারের কাছ থেকে। তিনিও প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন। বললেন, ‘কী কও মিয়া, তিনকাল গিয়া এককাল ঠ্যাকছে। অ্যাহনও এই শত্তুরগিরি রাখফার চাওনি? আর মরা মাইষির সঙ্গে কিসির শত্তুরত্যে? আবার কোনো জায়গায় দুই বাই এক সাথে খাবার পারবানে বইলাতো মনে অয় না। কিডা কহন মইরা যাই তার ঠিক আছেনি?’

তার ঠিক নাই অবশ্যি। কিন্তুক আমাগো যাওয়া অবে নানে আলেম। তুমি যাও, এই ন্যাও পানডা মুহি দ্যাও বলেই সামনে দেওয়া পানের খিলি বৃদ্ধ আলেমজানের হাতে তুলে দেন আরেক বৃদ্ধ হাকিমদ্দি শিকদার। কিন্তু ঘরের ভেতর যে, হাকিমদ্দি শিকাদেরর বড় ছেলে ছমেদ শিকদারও ছিলেন সেটা জানা ছিল না আলেমজানের। ভেতর থেকে বেরুতে বেরুতে ছমেদ বলেন, ‘কাকা আপনাগো কোনো আয়-আয়োজনে আমরা নাই। আমাগো ডাকফেন না আল্লার ওয়াস্তে। আমরা আপনাকে সাতেও নাই পাঁচেও নাই। আল্লায় আমাগো দিন দেছে, অ্যাহন আমরা এল্লাহই চলবার পারব’।

আলেমজান এখবর জেনেই এসেছেন যে, আগের রাতে এই বারান্দাতে বসেই ওদের বৈঠক হয়েছে, রাবেয়ার মিলাদে এই গোষ্ঠীর কেউ যাবে না। দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাস পুরোনো হলেও এই বাড়ির ছেলেদের সঙ্গে, এই ছমেদ শিকদারের সঙ্গেও কিন্তু রাবেয়া বা হায়দার সাহেবের সম্পর্ক খুউব ভালো ছিল। হাকিমদ্দি শিকদার তো রাবু ভাবির জন্য জান-প্রাণ দিতে পারতেন সেই যৌবনে। যখন এই গ্রামের মধ্যে রাবেয়া বউ হয়ে এসেছিলেন সকল যুবকের কাছেই তিনি বিস্ময়ের ছিলেন তার সৌন্দর্য আর শিক্ষা-দীক্ষার জন্য, এমনকি তার পারিবারিক ঐতিহ্যের খবর জেনে এই এলাকার সকলেই রাবেয়াকে সম্মান করতেন। তখন আজকের বৃদ্ধ হাকিমদ্দি বা আলেমজান সকলেই রাবু ভাবি বলতে অজ্ঞান ছিলেন। আজকে তার মৃত্যু-পরবর্তী মিলাদে উপস্থিত হতে কেন তারা অস্বীকৃতি জানাচ্ছে তা জানার জন্য আমাদের বেশিদূর যেতে হয় না। আমরা জানতে পারি যে, মাত্র কিছুদিন আগেই শিকদার গোষ্ঠীর এক মেয়ে যার বিয়ে হয়েছিল তিন চার গ্রাম পরের একটি গ্রামে, তাকে মারধর করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। মেয়েটি অত্যাচারিত হয়ে বাবার বাড়ি চলে আসে। থানায় মামলা দায়ের করতে যায় শিকদার গোষ্ঠীর মেয়েটির ভাইবেরাদর। কিন্তু থানায় মামলা নিতে চায় না কারণ আগে থেকেই থানাকে পয়সা দিয়ে ঠিক করে রেখেছিল মেয়েটির শ্বশুর বাড়ির লোকজন। আলি হায়দারের কাছে মেয়েটির ভাই গিয়ে অনুরোধ করেছিল যাতে থানাকে বলে মামলা নেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু আলি হায়দার খুউব একটা গা করেননি বিষয়টা নিয়ে। ফলে এখনও মেয়েটি শ্বশুর বাড়িতে যেতে পারেনি আর ঘটনারও কোনো সুরাহা হয়নি। বারবার বিচার বসানোর কথা বলেও কোনো ব্যবস্থা করা যায়নি। ফলে পুরো ঘটনাটির জন্যই শিকদার গোষ্ঠী আলি হায়দারকে দায়ী করে। খানিকটা দায়ীতো অবশ্যই আলি হায়দার। কারণ মেয়েটির যে বাড়িতে বিয়ে হয়েছে সেই বাড়িতে আলি হায়দারের যাওয়া-আসা আছে। ভোটের হিসেবে আলি হায়দারের কাছে তারা শিকদার গোষ্ঠীর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেই হয়তো তিনি আর বিষয়টি নিয়ে কিছু করতে আগ্রহী হননি। এই ব্যাপারটিও এলাকায় কথায় কথায় আলোচিত হয়। কিন্তু আলি হায়দার আপাতত মেয়েটির স্বামীর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। সেটা হয়তো এ কারণে যে, যদি ওই গোষ্ঠীর ভোট পাওয়া যায় তাহলে শিকদার গোষ্ঠীর ভোট ছাড়াই তিনি নির্বাচনে জিতে যাবেন। ভোটের হিসেবে শিকদার গোষ্ঠীর ভোটসংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু আলি হায়দার একথা ভুলে গেছেন যে, শিকদার গোষ্ঠীর ছেলে বাচ্চু শিকদারও নির্বাচনকে সামনে রেখেই কাজ করে যাচ্ছে এলাকায়। এখন যখন নির্বাচন ক্রমশ ঘনিয়ে এসেছে দু’পক্ষের দূরত্বটা শুধু এখন স্পষ্ট নয়, বিশেষ ভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এখন আলি হায়দারের মায়ের মৃত্যুতেও শিকদার গোষ্ঠী দাওয়াত নেবে না সেটা স্বাভাবিক হলেও বিষয়টা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু হয়ে উঠেছিল। আলেমজান ফিরে এসে শেষ পর্যন্ত ইলোরাকে বলেছিলেন, ‘মাগো আমি তো পারলাম না, তুমি অ্যাকবার যাইয়া দ্যাখফানি?’

আলি হায়দারও আলেমজানের কথায় তাল দিয়ে বলেন, ‘আপা আপনি গেলে ওরা না করতে পারবে না। আপনি একবার যান। গিয়া বাচ্চুর সঙ্গে কথা কন। বাচ্চুই নষ্টের গোড়া। আপনার সঙ্গে তো ওর খাতির আছে।’ একথা সত্য। বাচ্চুকে ইলোরা সত্যিই ভালোবাসে, পছন্দ করে। ছোট ভাইয়ের বন্ধু হিসেবে সব সময় বাচ্চুকে বড় মাছটা, মাংসের বড় টুকরোটা দিয়েছে ঈদে-চাঁদে ওদের বাসায় বেড়াতে গেলে। বেড়াতে গেলে কি? জেলা শহরের কলেজে যখন বাচ্চু লেখাপড়া করতেন তখন ইলোরাদের বাসায় প্রায় দিনই যাতায়াত ছিল তার। ঘরে যা ছিল তাই দিয়েই হয়তো খাওয়ানো যেত কিন্তু ইলোরা বাচ্চুর জন্য একটা ডিম ভেজে দিয়ে হলেও খাওয়াটাকে বিশেষ করে তুলতেন। বাচ্চুরও ইলোরা আপার জন্য টান আছে। গ্রামে যে রাজনীতিই চলুক না কেন বাচ্চু ইলোরার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন সব সময়। অনেক সময়ই বাচ্চু ইলোরার কাছে আলি হায়দারের বিরুদ্ধে নালিশ করেন। কিন্তু বাচ্চু এটাও জানেন যে, আলি হায়দার ইলোরার কথা শুনবার মতো মানুষ নন। এ নিয়ে ফোনে হাসাহাসি হয় দু’জনের। আজকে রাবেয়ার মৃত্যু পরবর্তী মিলাদে বাচ্চুদের না-আসাটা ইলোরার কাছে সত্যিই বিস্ময়কর এবং তার চেয়েও বিস্ময়ের এটা জানা যে, এই না-আসার পেছনে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিটি আসলে বাচ্চু শিকদার। ইলোরার ভেতর একটু ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এটা জেনে কিন্তু তারপরও মুরুব্বিরা ওকে ঠেলে পাঠান গ্রামের কয়েকটি বাড়িতে দাওয়াত দেওয়ার জন্য। এমনিতে এত অল্প সময়ে যেখানে যেখানে যাওয়া সম্ভব নয় সেখানে সেখানে ইলোরা লোক পাঠিয়েছেন। আর এখন তো মোবাইল হয়ে যাওয়ায় সবাইকে মোবাইলেই দাওয়া দেওয়া যায়। গ্রামে কারও না কারও মোবাইল নম্বর জানা থাকলেই হলো, তাকে ফোন করে কাক্সিক্ষত মানুষটিকে ধরা যায়। রোদ পড়লে ইলোরা বেরিয়ে পড়েন গ্রামের বাড়ি বাড়ি দাওয়াত দেওয়ার জন্য। সন্ধ্যে নাগাদ বাচ্চুদের বাড়িতে ঢোকেন ইলোরা, ‘চাচিআম্মা কই? চাচিআম্মা?’

শিকদার বাড়ির যে মহিলার সঙ্গে ইলোরার মামণিরও সম্পর্ক খুউব ভালো ছিল তার খোঁজই করেন ইলোরা। চুলোর পাড় থেকে আঁচলে ঘাম মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসেন বাচ্চুর মা। মোটামতো ভদ্রমহিলা, বয়স হয়েছে অনেক কিন্তু এখনও শক্তপোক্ত। বাচ্চুর বউ গ্রামে থাকে না, থাকে জেলা শহরে। তাই রান্নাবান্না, সংসার তাকেই দেখতে হয়। তিনি কাউকে দিয়ে একটি চৌকি আনিয়ে দিলেন ইলোরার জন্য, ‘বসো মা’। এমনিতে আর কুশল জিজ্ঞেস করলেন না, রাবেয়ার মৃত্যুর পরে ইলোরাদের বাড়িতে গিয়েই সে কাজটি করেছিলেন তিনি। ইলোরাও কথা না বাড়িয়ে বললেন, ‘মিলাদের দাওয়াত দিতে আসছি চাচি আম্মা। মামণিতো আপনাকে খুউব পছন্দ করতেন, আপনারা না গেলে মামণির আত্মা খুউব কষ্ট পাবেন।’ বাচ্চুর মা একথা শুনে আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন, ফিস ফিস করে বললেন, ‘আমাগো কি আর উফেয় আছে মা পুরুষ মাইনষির কথার বাইরি যাবার? উফেয় নাই। তারা ঠিক করছেন যাবেন না। আমাগো কাছে কেউ জিগেয়ও নাই, কেউ আমাগো কিছু কয়ও নাই। তারা গেলি আমরা যাব, তারা না গেলি আমরা যাব না তুমি তো জানোই মা এইসব। যাও গিয়া তোমার কাকারে গিয়া কও, আমারে কইয়া কী লাভ কওদি?’

একথা ইলোরা জানেন না তা নয়, কিন্তু তিনি জেনে নিলেন বিষয়টা ভদ্রমহিলার কাছ থেকে। তারপর জানতে চাইলেন, ‘কাকা কই?’

ওই যে গোয়াইল ঘরে, গাইডারে খ্যাড় দিবার লাগছে।

তাইলে আর না বসি চাচি আম্মা। কাকার সঙ্গে কথা বলেই চলে যাই আজ। বাড়িতে অনেক কাজ, বোঝেনই তো।

ইলোরা উঠে গোয়ালঘরের দিকে যান। খালি গায়ে লুঙ্গি পরা ছমেদ শিকদার খড়ের গাদা থেকে খড় টেনে টেনে একটা বড় মাটির তাগারিতে ভেজাচ্ছেন। বোঝাই যাচ্ছে গরুটা তার খুউব যতেœর। একটি স্বাস্থ্যবান বাছুর ছুটোছুটি করছে চারপাশে। মা গাইটা একটু পর পর ¯েœহের আতিশয্যে বড় বড় দম ছেড়ে বাছুরকে জানান দিচ্ছে তার অবস্থান। বেশিদিন হয়নি গাইটি বিইয়েছে, সেটাও বোঝা গেলো। ইলোরা যে এ বাড়িতে এসেছেন সে খবর ছমেদ শিকদারের অজানা নয় কিন্তু তিনি এমন একটা ভাব করছেন যেন ইলোরাকে দেখতেই পাননি। অথচ এই লোকই ঢাকায় যখন হৃদরোগের চিকিৎসা করতে গিয়েছিলেন তখন ইলোরার বাসায় থেকে চিকিৎসা করিয়েছেন। যতদূর সম্ভব ভালো ডাক্তারের কাছে নিজে নিয়ে গিয়ে ইলোরা তাকে দেখিয়েছেন, কোনো ফি নেননি ডাক্তার ইলোরাকে চেনেন-জানেন বলে। ইলোরা যা বোঝার বুঝে যান নিমিষে। তিনি তাও ছমেদ শিকদারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘চাচা কী খবর? শরীর কেমন এখন?’- আর শরীর। বাইচ্যা আছি মা। আমি গেছিলাম তোমাগো বাড়ি তোমার মারে দ্যাখফার জন্যি। তুমি কোনো কামে আছিলা, দ্যাহা অয় নাই। জানাজায়ও গেছিলাম। তোমার মা’র আতে কম খাইছি? বালো মানুষ আছিলো তুমার মা-বাপ।

ইলোরা সুযোগটা নেন। বলেন, ‘চাচা এই ভালো মানুষটার মিলাদে আসবেন না কেন তবে?’

বালো মানুষির সঙ্গে মিলাদে যাওয়ার কোনো সম্পক্ক নাই মা। তুমারে সুন্মান করি, তুমি আইছো কিন্তুক মা আমরা যাবার পারব না। গুষ্ঠির হগ্গুলির সেদ্ধান্ত, আমাগো যাবার কইও না। মাফ চাই তোমাগো কাছে।

মাফ চাইবেন কেন চাচা? কিন্তু মৃতের সঙ্গে কিসের রেষারেষি আমি সেটাই তো বুঝতে পারি না চাচা।

না রিষারিষি কিসির? আমাগো যাবার যো নাই।

কথাটা বেশ জোরের সঙ্গে বলেন ছমেদ শিকদার। তারপর গলাটাকে একটু হাল্কা করে বলেন, “হুনো তোমার বড় কাকার সাথে একটু দ্যাহা কইরা যাইও। বেশিদিন বাঁচপেন নানে। বয়স হইছে, রাজরোগে ধরছে। ওষুদ কিনতি কিনতিতো ফতুর ওইয়া গেলাম। কাশতি কাশতি অ্যাহন কাপড় নষ্ট কইরা ফেলায়। যাও তারে এট্টু দেইহা যাও।

সে তো যাবই চাচা। এই বাড়িতে এসেছি আর বড় চাচার সঙ্গে দ্যাখা করিনি এরকম হয়েছে কখনও। কিন্তু আপনারা কেন আসবেন না সেটা যদি বলতেন তাইলে বুঝতে পারতাম সমস্যাটা কোথায়।

কারণ কিছু নাই মা, তোমার বাই’র কাছে গিয়া জিগাইও সে কি আমাগো যাওয়ার কোনো উফায় রাখছেনি? আমাগো থুইয়া আমাগো শত্তুরগো সাথে গিয়া ওঠবস করে সে। আমরা কি বানের পানিতে ভাইসা আইছিনি?

কিন্তু ছেলের ওপর রাগ থাকলে সেটা আপনি তার সঙ্গে বুঝবেন, মামণির মিলাদে আসতে চাচ্ছেন না কেন?

শোনো গ্রামদ্যাশের চল তুমি বুঝবা না, শহরে বড় হইছো, শহরে থাহো। তুমি এইডা বুঝবা না। যাও বাড়ি যাও। কাম কাইজ আছে অনেক, অত বড় একটা অনুষ্ঠান করবা। আমরা যাবার পারব না।

কথাটা বেশ কঠোর শোনায়। ইলোরার কানে খট্ করে লাগে কথাটা এবং তিনি বুঝতে পারেন, এরপর আর কোনো কথা চলে না। তিনি অপমানটা হজম করে নিয়ে উঠে পড়েন। এবং বৃদ্ধ হাকিমদ্দি শিকদার যে বারান্দায় সারাদিন শুয়েবসে থাকেন সেখানে যান। একটা গন্ধ চারদিকে, বোঝাই যায় এ গন্ধ মৃত্যুর, বেশিদিন আর হয়তো নেই হাকিমদ্দি শিকদারের। ‘বড় চাচা কেমন আছেন?’

একই কথায় উত্তর দেন হাকিমদ্দি শিকদারও। গ্রামের সকলেই কেমন আছেন-এর উত্তরে কখনওই সরাসরি বলেন না কেমন আছেন। পাল্টা প্রশ্ন করেন এবং তারপর সে প্রশ্নটা নিয়ে ফেনাতে শুরু করেন। ইলোরার হাতে সময় নেই। তাছাড়া একটু আগে পাওয়া অপমানকর বাক্যটাও মন থেকে সরাতে পারছেন না। তিনি সরাসরিই হাকিমদ্দি শিকদারকে বলেন, ‘বড় চাচা আসছিলাম আপনাদের দাওয়াত দিতে। ছমেদ চাচা তো বলে দিলেন যাবেন না। আপনারও কি একই মত?’

বুড়া হইলে কি আর কাউর কোনো মত অ-মত থাহে মা? মাইয়া মাইনষেরও অধম হইয়া যাইতে হয় বয়স হইলে। আমার হইছে সেই দশা। এই বারিন্দায় সারাদিন শুইয়া বইসা থাহি, মরণের জন্যি। কবে আসফি কিডা যানে। আমার আর কোনো মত নাই, অ-মতও নাই।

তাহলে আর কি বড় চাচা? আমি যাই। দুয়া কইরেন আমাগো জন্যে।

দুয়া তো করিই মা। আইসো তুমি আবার আসলি। তয় আমারে আর দ্যাখফার পারবানানে।

ইলোরা বারান্দা থেকে উঠোনে নামতে যাবেন, তখন ফিস ফিস করে হাকিমদ্দি শিকদার বলেন, ‘মা হুনো, এক মালসা তরকারি পাঠাইয়া দিও। মেজবানির গোস্ত খাবার মন চাইছে। কেউ জানি দ্যাহে না মা। একটু রাইত ওইলি পাঠাবা।’

ইলোরা বলেন, ‘ঠিক আছে বড় চাচা, আমি কাউরে না জানিয়ে আপনার জন্য মাংস পাঠিয়ে দেবো। আপনি খেয়ে মামণির জন্য দুয়া কইরেন।’

তয় দুয়া হরবো না? তুমার মা’রে আমি স্বপনে দেখছি মা, বেশিদিন আমারও নাই।

ইলোরা ছমেদ শিকদারের করা অপমান মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন সেদিন। সিদ্ধান্ত নেন, গোপনে হলেও পুরো পরিবারের জন্য তিনি রান্না করা মাংস পাঠাবেন। মিলাদের দিন দুপুরবেলা বাড়িভর্তি মানুষ। কোথা থেকে এত মানুষ এসেছে কে জানে? সবাইকে ইলোরা চেনেনও না। কিন্তু প্রায় সবাই এসেই ওর সঙ্গে কথা বলছেন। আলি হায়দারকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। থানা থেকে লোকজন আসার কথা খেতে। আসার কথা এমপি সাহেবেরও। তাদেরকেই আনানোর ব্যবস্থা করছে হয়তো। এদিকের সবকিছু একা একা ইলোরাকে দেখতে হচ্ছে। কেউ এসে বলছে নুন লাগবে, কেউ এসে বলছে আলু কম পড়বে। বস্তায় বস্তায় চাল বের করে দিচ্ছেন ইলোরা। সেগুলো ধুতে নিয়ে গিয়ে কে কয় কেজি করে সেখান থেকে সরিয়ে রাখছেন সে খবরও পাচ্ছেন তিনি। মশলা, পেঁয়াজ এরই মধ্যে হাতানো হয়ে গেছে। ডালের ব্যাগটা ফুটো করা, সেখান থেকে ডাল পড়ে মেঝেতে ছড়িয়েছে। একজন এসে বললো, ‘আমি পরিষ্কার কইরা দিই দ্যাওদিনি?’

ইলোরা রাজি হলেন না। তিনি জানেন, এই পরিষ্কার করার ইচ্ছাটা কোত্থেকে এসেছে। বললেন, ‘এখন আর পরিষ্কার করে কী হবে? এখনই তো রান্না করার জন্য নিয়ে যাবে। মেঝেতে পড়ে থাকাগুলো তো আর রান্না করা যাবে না।’

Ñআমি নিয়া যাবানে মা, আমারে দিয়া দিও। খেচুড়ি রাইন্ধা দিলি পুলাপানগুলা খাবেনে।

ইলোরা কোনো কথা বলেন না। জিনিসপত্র নেয়া হয়ে গেলে এই মহিলাকে একটু বাড়িয়েই দেবেন, সেটা ভাবলেন। যে মেয়েরা মশলা বেটেছে, পেঁয়াজ-রসুন-আদা ছিলেছে, রান্নার পানি আনছে তাদের মধ্যে কথায় কথায় ঝগড়া লাগছে। তার বিচারও ইলোরাকেই করতে হচ্ছে। এই মুহূর্তে মামণিকে খুব মনে পড়ছে ওর। ভদ্রমহিলা কী করে যে সবদিক সামাল দিতেন, ইলোরা ভেবে পান না। হায়দার সাহেবের মৃত্যুর পর যে মিলাদ হয়েছিল তাতেও এভাবেই সবাইকে ডাকা হয়েছিল। অসুস্থ শরীর নিয়ে রাবেয়া সবদিক সামাল দিয়েছিলেন, ইলোরাকে এভাবে একার ওপর দায়িত্ব নিতে হয়নি। আজকে ইলোরা আবারও বুঝতে পারছেন যে, নারীরা পেছন থেকে শক্ত হাতে সংসার না সামলালে সৃষ্টি উচ্ছন্নে যেত, অন্ততঃপক্ষে বাংলাদেশে তো বটেই।

দুপুর গড়াতে গড়াতেই বাড়ি ভরে গেলো লোকে-মানুষে। শিশুদের চেঁচামেঁচিতে কে কাকে কী বলছে কিছুই বোঝার উপায় নেই। ডেকোরেটরকে ডাকা হয়েছে প্লেট-গ্লাশের জন্য। ত্রিপল বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে কলাপাতা কেটে, ধানের নাড়া বিছিয়ে তার ওপর বসিয়ে দিলেই চলতো। কিন্তু এই গ্রামেও ডেকোরেটর আছে, মেলামাইনের প্লেট-গ্লাশ আছে, আর নাড়া কোথায় পাওয়া যাবে এতো মানুষের বসার জন্য? বাড়ির ভেতরকার উঠোনে বিশিষ্ট মানুষদের জন্য বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাবেয়ার তুলে রাখা চীনা মাটির প্লেট আর দারুণ সব কাচের গ্লাস বের করা হয়েছে, সেগুলোর দায়িত্ব একজনকে দিয়ে দিতে হয়েছে ইলোরার। নাহলে একটাও ঘরে তোলা যাবে না। তাও এর আগের বার বেশ কয়েকটা খোয়া গিয়েছে। এমনকি ঘরের ভেতর রাখা রাবেয়ার বিভিন্ন মাপের অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল থেকে বেশ ক’টি সেদিনের পর থেকে আর পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে ইলোরার দুঃখ নেই কিন্তু কষ্ট আছে, কারণ মামণির হাতের জিনিসপত্র বলে কথা। ও ভেবেছিল যে, মামণির ব্যবহার করা জিনিসগুলি সব নিয়ে যাবেন ঢাকায় নিজের বাসায়। কিন্তু সাহস হচ্ছে না সেকথা বলতে, কারণ হয়তো আলি হায়দার সেগুলো নিতে দেবেন না। তবে একথা ইলোরা ভেবেছেন যে, অন্তত এখান থেকে জিনিসপত্রগুলি সরিয়ে উপজেলা শহরের নতুন বাড়িতে নিয়ে যাবেন। সেখানে আলি হায়দারের স্ত্রী সেগুলো দেখেশুনে অন্তত রাখতে পারবেন। মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার স্মৃতিও ধূসর হয়ে যাবে, এটা মানা যায় না, আর মামণির ক্ষেত্রে যে এমনটি হবে সেটা ভাবতেও ওর গলা বুজে আসে কান্নায়।

চিৎকার চেঁচামেঁচিতে বোঝা যাচ্ছে যে খাবার দেওয়া শুরু হয়েছে। ইলোরা বাবুর্চিকে বলে একটি বড় পাতিল মাংস সরিয়ে রেখেছেন ঘরের পেছন দিককার একটি অন্ধকারমতো জায়গায়। কে জানে হয়তো খাবারে টান পড়লো, তখন যাতে বিপদে পড়তে না হয়। এরকমতো প্রায়ই হয়। অনুষ্ঠানে খাবারে টান ফেলা এদেশের অঘোষিত রীতি। যেন গৃহস্থকে বিপদে না ফেলতে পারলে আর আনন্দ কিসে? আগে তো প্রায়ই শোনা যেত যে পাত্রপক্ষ পাত্রীর পরিবারকে নাকানি-চুবানি খাওয়ানোর জন্য লোক ভাড়া করে নিয়ে গেছে খাওয়াতে যাতে খাবারে টান ফেলে পরিবারটিকে সকলের সামনে হেনস্থা করা যায়। দিন বদলেছে কিন্তু এখনও ইলোরার মনে হয়, এও এক ধরনের শত্রুতা যে, আজকে যদি খাবারে টান ফেলে দিয়ে সকলের সামনে অপদস্থ করা যায় ওদের? ইলোরা আগের রাতেই যারা খাবার বেড়ে খাওয়াবে তাদেরকে বসিয়ে পই পই করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, কী ভাবে খাবার পরিবেশন করবে সে সম্পর্কে। আর বাড়তি সতর্কতা হিসেবে বড় এক পাতিল মাংস সরিয়ে রেখেছেন। আর যারা খাবার বেড়ে খাওয়াবে তাদেরকে আগে থেকেই খাইয়ে দিয়েছেন।

প্রথম দলটি খেয়ে উঠে যাওয়ার পর দ্বিতীয় দলটি বসে গেল। আর বাড়ির ভেতর মহিলাদের খাওয়ানোর জন্য বসিয়ে দিতে বললেন ইলোরা। ঠিক তখনই থানার ওসি দলবল নিয়ে এলেন। বিশিষ্ট কেউ এলেই ইলোরাকে গিয়ে সামনে দাঁড়াতে হয়। হেসে কথা বলতে হয়। প্রত্যেকেই ইলোরাকে কোনো না কোনো কাজ করে দিতে বলেন। কেন ইলোরা এখনও সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমপি হতে পারছেন না সে বিষয়ে জানতে চান। কিন্তু ইলোরা এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় বহু চেষ্টায় আবিষ্কার করে নিয়েছেন। থানার ওসি সালাম দিয়ে বললেন, ‘ম্যাডাম বহুদিন তো আপনাদের এলাকায় থাকা হইল। এইবার এট্টু রাজধানীতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।’ ইলোরা মিষ্টি মাখানো হাসিটা ছড়িয়ে বললেন, ‘নিশ্চয়ই বলব আমি, আপনার তো বদলিরও সময় হয়েছে, তাই না?’

জি ম্যাডাম। সময় তো আগেই হইছে। বদলিও করছিল কুষ্টিয়ায়, কিন্তু যেতে চাই না, এইবার গেলে ঢাকায় যেতে চাই। আপনি বললেই হবে ম্যাডাম। কিছু লাগলে আমি দিব ম্যাডাম।

না না সেটা আমি বলতে পারব না। আপনাকে আমি পরিচয় করিয়ে দিব একজনের সঙ্গে আপনি নিজেই কথা বলে নেবেন দয়া করে। আমি আপনাকে ফোন নাম্বারটা দিয়ে দেবÑ ইলোরা বিষয়টা এড়ানোর চেষ্টা করেন।

ঠিক আছে ম্যাডাম আমি আপনারে ফোন দিব। আমার কাছে আপনার নাম্বার আছে। আর চিন্তা কইরেন না ম্যাডাম আলি ভাইরে আমি দেইখা রাখব, তার কোনো অসুবিধা হবে না।

এবার ইলোরা বুঝতে পারেন, তার কাছ থেকে সুবিধা চাওয়ার বিপরীতে আলি হায়দারকে ওসি সাহেব সুবিধে দেবেন। ইলোরার বিষয়টা আগেই বোঝা উচিত ছিল, তিনিও বোঝেনও কিন্তু এখন এই অনুষ্ঠানে, এত মানুষের সামনে যখন থানার ওসি বিষয়টি স্পষ্ট করে উত্থাপন করেন তখন ইলোরার মনটা খারাপ হয়ে যায়। একটা বিষণœতা নিয়ে তিনি সেখান থেকে সরে যান। যাওয়ার আগে বলে যান, যাদেরকে ঠিক রাখা হয়েছে বিশিষ্টদের খাবার পরিবেশনের জন্য তাদেরকে, ঠিকমতো যাতে আপ্যায়ন করা হয় সে ব্যাপারে। এই বিশিষ্টজনদেরকে ‘ভিআইপি’ বলে সম্বোধন করছে সবাই এখানে। ইলোরার হাসিও পায়। কিন্তু দুঃখ লাগে এটা ভেবে যে, যে মানুষটা মারা গেছে তার কথা এই বাড়িতে, এই আয়োজনে একবারও কেউ উচ্চারণ করছে না, সবাই যেন খেতে এসেছে, বিয়ে বাড়িতে যেমন মানুষ তেমন, পার্থক্য শুধু এটাই যে, বিয়ে বাড়িতে পুলাও-রোস্ট বা বিরিয়ানি খাওয়া হয় আর এই বাড়িতে এখন সাদা ভাত, ঝাল গরুর মাংস আর গরুর মাথা-জিহ্বা-কলিজা-গুর্দা-তিল্লি দিয়ে একটা পাতলা ডাল করা হয়েছে। শেষ পাতে রয়েছে চাষনী খীর। একথা ভেবে চোখে জল এলো ইলোরার কিন্তু সব সময় চোখের জল ফেলা যায় না। নারীকে তার জীবনে বহুবার বহুক্ষেত্রে এরকম জল গোপন করতে হয় চোখেরই ভেতরে।

ডালের কথা মনে আসায় মনে পড়ল কাল রাতে তিনটি গরু, চারটি খাসি জবাই করার পরের ঘটনা মনে পড়ে। একের পর একজন এসে ইলোরাকে বলতে শুরু করলেন, ‘আমারে উজুরিডা দিও মা। কতোদিন উজুরি খাই না।’ কেউ এসে বলেছে, ‘পাওগুলা আমারে দিও মা। শক্ত গোস্ত খাবার পারি না। পাও চাইরখাইন জ্বালাইয়া নিয়া খাবার পারলি ওইত।’ ইলোরা কাকে কী দেবেন ঠিক বুঝতে পারেন না। সবাই চাইছেন সবকিছু। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সমান ভাগে ভাগ করে দেবেন পা আর ভুঁড়ি সবাইকে। তাতে যে যতটুকু ভাগে পাবেন সেটাই সই, এর বেশি কিছু করতে গেলে দোষ বাড়বে বৈ কমবে না। শেষ রাতে সেই ভুঁড়ি আর গরু-ছাগলের নলা ভাগ হলো, তা নিয়েও কত গ-গোল।

ইলোরার মনটা বিষিয়ে গেলো আবার। এই আয়োজন, এই এত মানুষজন, কেউই তার মামণিকে মনে রাখবে না, এটা ভাবতেও কষ্ট হলো তার। তিনি ভেতর বাড়ির দিকে এগুলেন তখন একজন এসে বললেন, ‘আফা আপনারে একবার বাইরে যাইতে হবে। যারা খাবার বসছে তাগো সামনে দিয়া একবার ঘুইরা আসবেন। ভাই বলছে, আপনি গিয়া একবার সবাইরে কবেন যে, নির্বাচন আসতেছে, সবাই জানি ভাইর দিক খেয়াল রাখে।’

ইলোরার ভেতরটা একেবারেই শক্ত হয়ে গেল একথা শুনে। কী করে তিনি যাবেন একদল মানুষ যারা গোগ্রাসে খাচ্ছে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে এমন একটি দিনে ভোট চাইতে? ইলোরার ইচ্ছে হলো তিনি দৌড়ে এখান থেকে বেরিয়ে যাবেন। কিন্তু কোন দিকে, কোথায় যাবেন? তিনি কোনো রাস্তা দেখতে পেলেন না। চারদিকে অসংখ্য মানুষ। চিৎকার করছে, কেউ খাচ্ছে, কেউ বাড়িতে থাকা কোনো স্বজনের জন্য একটু খাবার নিয়ে যেতে চাইছেন এবং তা নিয়ে বাবুর্চির সঙ্গে কথা কাটাকাটি চলছে। আকাশটা ভারী হয়ে আছে মেঘে, কিন্তু এরকম মেঘে বৃষ্টি হয় না। ইলোরা সেই ভারী মেঘ মাথায় করে পরনের শাড়িটা টেনে-টুনে ঠিক করে, আঁচলটা পিঠ থেকে সামনে টেনে এনে বাড়ির বাইরের দিকে যেখানে সবাই খেতে বসেছে সেদিকে গেলেন। তখন ওর ভেতরটা যদি কেউ দেখতে পেত তাহলে ধারণা করা যেত যে, আকাশের থম ধরা মেঘ নয়, সেখানে রক্তবৃষ্টি হচ্ছে। বারবার ওর চোখের সামনে তখন ভেসে উঠছে রাবেয়া আর হায়দার সাহেবের মুখ। একটা অসহ্য গুমোট সেদিন বিকেল পর্যন্ত ওই বাড়িতে ছিল। এমপি সাহেব এসে পৌঁছেছিলেন মাগরিবের নামাজের আগে। সেখানেও ইলোরাকে গিয়ে দাঁড়িয়ে হাসি হাসি মুখ করে কথা বলতে হয়েছিল সবার সঙ্গে। তারপর টেবিলে বসিয়ে এমপি আর এমপি’র সঙ্গে আসা উপজেলা কর্মকর্তাসহ বাকিদের বেড়েও খাওয়াতে হয়েছিল। ইলোরার এতে কষ্ট নেই, কিন্তু কষ্টটা ছিল অন্যখানে, এই খাওয়ানোর সত্যিকারের উদ্দেশ্য ইলোরা ধরতে পেরেছিলেন বলে এবং সেখানে ওর মামণির মিলাদ যে কোনো বিষয় নয়, সেটা ওকে ছিঁড়েখুড়ে ফেলছিল। সে রাতেই ইলোরা ওই বাড়ি থেকে চলে এসেছিলেন। বাড়ি থেকে বেরুনোর আগে ওই ডেগভর্তি মাংস থেকে বাড়ি বাড়ি মাটির মালসা ভরে পাঠিয়েছিলেন। এমনকি শিকদার বাড়িতেও পাঠিয়েছিলেন মাংস। সে রাতে শিকদার বাড়ি থেকে মাংস ফেরত আসেনি। পরবর্তীসময়ে এটাও নির্বাচনে একটি ইস্যু হয়েছিল। সে আরও পরের ঘটনা। তার আগে আরও কিছু ঘটনা আছে আমাদের জানার মতো।

নির্বাচনের আগের নির্বাচন।

নির্বাচনী ক্যাচাল বলে কথা। বছরখানেক আগে থেকেই শুরু হয় সে ক্যাচাল। জাতীয় নির্বাচনে দেখি আমরা একই দল থেকে একাধিক প্রার্থী নির্বাচনের আগে মাঠে নেমে যান। তাদেরকে তুলে মাত্র একজন প্রার্থীকে টিকিয়ে রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোকে হিমশিম খেতে হয়। প্রায়শই সেটা পারে না কেউ, সরকারে থাকা দলগুলোকেই এই ঝামেলায় পড়তে হয় সবচেয়ে বেশি। সুযোগ-সুবিধা পেয়ে প্রতিটি এলাকায় নেতাকর্মীরা সরকারের সময় শেষে একেকজন এমন ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে যে, প্রত্যেকেই মনে করে তারই নির্বাচনে দাঁড়ানো উচিত। কিন্তু এবার যখন স্থানীয় পর্যায়েও দলীয় মনোনয়নের আইন হলো তখন বিষয়টা যেন একেবারেই লাগামছাড়া হয়ে গেলো। জাতীয় রাজনীতির ভয়ঙ্কর কোন্দল এক দৌড়ে চলে গেলো দেশের প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি বাড়িতে। পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে কম লেখালেখি হলো না। কিন্তু পত্রপত্রিকায় এই মনোনয়ন নিয়ে খুন-খারাবির খবরও যেমন নিয়মিত তেমনই এ বিষয়ে কারওরই গা না করার বিষয়টিও এরই মধ্যে গা-সওয়া হয়ে গেছে। আলি হায়দারদের ইউনিয়নে নির্বাচন হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের একেবারে শেষের দিকে। সে কারণে এখানে প্রার্থী নির্বাচনেও দলগুলো গরিমসি করেছে অনেকদিন। বিশেষ করে সরকারি দল।

স্থানীয় এমপিদের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায় থেকে চেয়ারম্যান-মেম্বার প্রার্থীদের নাম আহ্বান করা হলেও কাদের কাছে এই নাম চাওয়া হয়েছে তা নিয়ে আলি হায়দারের সংশয় ছিল। তবুও দলের ইউনিয়ন-নেতাদের কাছে নিজের নামটি দেওয়ার জন্য প্রথম থেকেই আলি হায়দার তাদেরকে হাতে রেখেছিলেন। তাদের বিপদে-আপদে পাশে থাকাতো আছেই, পরবে-উৎসবে এটা সেটা উপহার পাঠাতেও কার্পণ্য করেননি তিনি। এজন্য নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন লাভের আগেই তার ধারের অংক অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। এখন সেটা বেড়েই চলেছে। এবার নির্বাচনে ইলোরা তাকে বলেই দিয়েছেন যে-কোনও ধরনের সহযোগিতা তিনি করতে পারবেন না। তারপরও আলি হায়দার বিশ্বাস করেন যে, শেষ পর্যন্ত ইলোরা তাকে সাহায্য করবেই। না করে যাবে কোথায়? কে আছে আর তার এই পৃথিবীতে? আলি হায়দার ছাড়া? এই কথাটি সুযোগ পেলেই আলি হায়দার শুনিয়ে দেন ইলোরাকে। তাতে কাজও হয়। আর ইলোরাকে আলি হায়দারের মা যদি না নিয়ে আসতেন তাহলে ইলোরার কী হতো? একথা তো ইলোরাকে বুঝতে হবে সারা জীবন ধরেই। আলি হায়দার তাই নিশ্চিন্ত আছেন যে, ইলোরা কোনো না কোনো ব্যবস্থা ঠিক করবেন।

কিন্তু তার আগে দলীয় মনোনয়নই যদি ব্যবস্থা না করা যায় তাহলে তো সব দিক দিয়েই কাহিল হয়ে যাবেন তিনি। সে কারণে এমপি সাহেব ছাড়াও দলের সঙ্গে সম্পর্কিত সকলের সঙ্গেই খাতির জমা রেখেছেন আলি হায়দার। সে জন্য রাত-দিন, আপন-পর নেই তার কাছে, তিনি তার প্রতিটি মুহূর্তই দল আর রাজনীতিকে দিয়ে আসছেন গত কয়েক বছর। কিন্তু তার এক সময়কার বন্ধু এবং এখনকার প্রতিদ¦ন্দ্বী বাচ্চু শিকদার গোপনে গোপনে এমপি সাহেবকে হাত করে ফেলেছেন। কী ভাবে করেছেন সেটা আলি হায়দারের কাছে সত্যিই বিস্ময়ের। তিনি ভেবেছিলেন যে, এমপি সাহেব কোনোভাবেই অন্য কাউকে সমর্থন দেবেন না, কিন্তু এখনতো দেখা যাচ্ছে যে, বাচ্চু শিকদারের হয়ে তিনি কথা বলতে শুরু করেছেন। এমপি সাহেবের যুক্তি হলো, একবার নির্বাচন করে যে হেরেছে তাকে মনোনয়ন দিলে আবারও হারার সম্ভাবনা। কিন্তু প্রকাশ্যে একথা বললেও মানুষের জানতে এখন আর বাকি নেই যে, আসলে বাচ্চু শিকদারকে তিনি হাতে রাখতে চান আগামি নির্বাচনের জন্য। এরই মধ্যে বাচ্চু শিকদারকে তিনি অনেকগুলো কন্ট্রাক্ট দিয়েছেন রাস্তা করার জন্য, পুকুরের ইজারা দিয়েছেন। বিভিন্ন চাকরি প্রার্থীকে বাচ্চু শিকদারই তার কাছে নিয়ে গিয়ে চাকরির জন্য ‘কিছু’ পাইয়ে দিয়েছে। এই বাচ্চু শিকদারই যে ভবিষ্যতে এলাকার নেতা হবে সেকথা এমপি সাহেব ঠিকই বুঝেছেন। কিন্তু কেন্দ্রের সঙ্গে আলি হায়দারের বোনের ভালো সম্পর্ক থাকায় সরাসরি একথা এমপি সাহেব আলি হায়দারকে বলতে পারেন না। তবে আলি হায়দার যাতে কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন না পান সেজন্য তিনি সবকিছুই করেছেন। দলের তৃণমূলকে গোপনে নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছেন যাতে আলি হায়দারের নাম পাঠানো না হয়। কিন্তু আলি হায়দার সেটি বুঝতে পেরে ওয়ার্ড-নেতাদের কয়েকজনকে পাঁচ হাজার করে টাকা নগদ দিয়ে নিজের নামটি প্রথম নাম হিসেবে এমপি’র কাছে পাঠানো লিস্টে রেখেছেন। এমপি সাহেব সেটা দেখে খেপে গিয়েছেন ঠিকই কিন্তু তাতে তারও উপকার হয়েছে। তিনি আলি হায়দার আর বাচ্চু শিকদার, দু’পক্ষকে নিয়েই খেলার সুযোগ নিয়েছেন। সে খেলার মূল ফলাফল এলাকায় আলি হায়দার আর বাচ্চু শিকদারের গোষ্ঠীর মধ্যে খুনোখুনি অবস্থা গত এক বছর ধরেই।

এই খুনোখুনির বিস্তারিত আমাদের জানা দরকার, নাহলে পুরো বিষয়টা আমাদের পরিষ্কার হবে না। এমপি সাহেব ক্ষমতা পেয়েই এলাকার স্কুলগুলোতে বিদ্যোৎসাহী বলে একটা অবৈতনিক পদ আছে, সেখানে নিয়োগ দিতে শুরু করেছিলেন। এই পদের মাহাত্ম্য কি সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে, এরাই মূলত এসব স্কুলে নিয়োগবাণিজ্য করে থাকেন, এমনকি স্কুলের ফলাফল বদলে দেওয়ার ক্ষমতাও রাখেন এসব বিদ্যোৎসাহীগণ। মজার ব্যাপার হলো কোনো এক বিচিত্র কারণে এলাকার বিদ্যোৎসাহী হিসেবে এমপি সাহেব আলি হায়দারকে ভাবলেও কাবিখা বা অর্থ যোগ আছে এমন কোনো প্রকল্পের কাজ দিয়েছেন বাচ্চু শিকদারকে। আলি হায়দার গ্রামের স্কুলগুলোতে সর্দারি করলেও তার আয় নেই বললেই চলে, বোন চালায় তাকে, এখবর সর্বত্রই জানে সকলে। আর বাচ্চু শিকদার কথা নেই বার্তা নেই দলে দলে মানুষকে চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়াতে পারে, সঙ্গে কখনও ডালপুরি বা টোস্ট বিস্কুট। মানুষ এখন অর্থ দিয়ে ওজন মাপে, ক্ষমতার মাত্রা দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। নির্বাচনের আগে উঠোন বৈঠকগুলিতে তাই জোরেশোরেই বাচ্চু শিকদারের নামোচ্চারিত হয়। কিন্তু একথাও সবাই বলাবলি করে যে, আলি হায়দারও কম খাটেনি এলাকার জন্য। তার বোনকে দিয়েই হোক আর নিজে দৌড়েই হোক এলাকার জন্য রাস্তা বরাদ্দ এনেছে, বিদ্যুৎ লাগো লাগো করছে। কিন্তু একথাও কি সত্য নয় যে, আলি হায়দারের মতো কিছু না-করা মানুষকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করলে তাদের ভাগ্যে কিছুই জুটবে না? আলি হায়দার এবং বাচ্চু শিকদারের পক্ষে-বিপক্ষে এরকম আলোচনা চলতেই থাকে এলাকায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলি হায়দার কী করে দলীয় মনোনয়নটি লাভ করেন সেটিও খুউব উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা।

আলি হায়দারের বোন ইলোরা হায়দারকে আমরা চিনি। বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো একটি উপ-কমিটিতে তিনি আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েই এই দলটির ছাত্র রাজনীতিতে তিনি জড়িয়েছিলেন। তারপর বহু পথ পেরিয়েছেন, বিদেশ থেকে লেখাপড়া করে এসে তিনি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন। ফলে তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে গতবার সম্মেলনের পরে একটি ভালোই পদ পেয়েছেন। প্রায়ই তিনি দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাতায়াত করেন। দেশের সর্বত্রই মানুষ তাকে চেনে। কিন্তু তার পক্ষে কোনো রাজনৈতিক দলের মেঠো রাজনীতি করাটা ঠিক হয়ে ওঠেনি, তাছাড়া তার কোনো এলাকা নেই যেখান থেকে নির্বাচন করতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ইলোরা হায়দার কোনোদিনই এতোটা উচ্চাশা নিয়ে রাজনীতি করেননি। তিনি শিক্ষকতা করেন কিন্তু আজকাল শুধুমাত্র শিক্ষকতা করে জীবন ধারণ যে সম্ভব নয় সেকথাও সকলে মানেন। যে কারণে তিনি রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করেন, সেটা ভালোবেসে, টিকে থাকার জন্য এবং আরও বহুবিধ কারণেই। নিজের ব্যক্তিগত জীবন তার খুব একটা সুখকর নয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, রাজনীতি, বিভিন্ন সভা-সেমিনার করেই তার জীবন কাটাতে অসুবিধে হয় না। আর সেই যে, রাবেয়াকে কথা দিয়েছিলেন কোনোদিন আলি হায়দারকে তিনি ফেলবেন না, দেখে রাখবেন, সে দায় তো তার আছেই।

আলি হায়দারকে অনেকেই মনে করে থাকেন কম বুদ্ধির, মাথাগরম একজন মানুষ হিসেবে। কিন্তু মাঝে মাঝে আলি হায়দার প্রমাণ করে দেন যে, তিনি আসলে তা নন। নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে যখন এলোমেলো কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল চারদিকে তখন একদিন ইলোরা যখন একদিন বেড়াতে গিয়েছেন উপজেলা শহরের ওই বাসায় তখনই এক সন্ধ্যায় গ্রামের মুরুব্বিদের বাসায় হাজির করিয়ে তাদের দিয়েই কথাটা পাড়িয়েছিলেন আলি হায়দার। কথা তেমন কিছু নয়, এলাকাবাসী চায় যে, আলি হায়দার এইবার নির্বাচন করুক। যেহেতু দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন আর দল যখন ক্ষমতায় তখন এবার আর তার নির্বাচিত হওয়াটা কেউ ঠেকাতে পারবে না। বিগত নির্বাচনে আলি হায়দারের পরাজয়টা হওয়ারই কথা ছিল কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী যে পরিমাণ অর্থ খরচ করেছে, আলি হায়দারতো সেটা পারেনি। কিন্তু ইলোরাতো জানেন যে, কথা সত্য নয়। তার নিজেরই খরচ হয়েছে চল্লিশ লাখের ওপরে টাকা। তারপর তো সেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে আঘাতটা আলি হায়দার রাবেয়াকে দিয়েছেন সেটা ভাবলে এখনও ইলোরার চোখ ফেটে পানি আসে।

গোপনে একাধিক মানুষের কাছ থেকে ধার করেছেন আলি হায়দার লাখ পাঁচেক আর গ্রামের বসতবাড়িটিসহ বিঘা ছয়েক জমির দলিল দিয়ে এনেছেন কুড়ি লাখের মতো। প্রায় কোটি খানেক টাকা খরচ করার পরও কেউ যদি বলেন যে, টাকার জন্য নির্বাচনে জিততে পারেননি আলি হায়দার তখন তার মুখের ওপর বলতে ইচ্ছে করে ইলোরার, যা জানেন না তা নিয়ে কথা বলতে আসবেন নাতো। কিন্তু মানুষের মুখের ওপর কথা বলাটা ওর শেখা হয়নি আজও। কিন্তু মনের ভেতর হিসাব কষতে থাকেন ইলোরা, নির্বাচনের সময় দেওয়া চল্লিশ লাখ এবং তারপর রাবেয়াকে সান্ত¡না দিতে গিয়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আলি হায়দারের নেওয়া ধারদেনাও শোধ করেছেন তিনি। কিন্তু যেদিন জানা গেলো যে, বাড়িসহ জমিজমা বন্ধক দিয়ে টাকা এনে নির্বাচন করেছেন আলি হায়দার এবং সেই টাকা শোধ দিতে না পারায় সবকিছু তারই চাচাতো ভাইকে দলিল করে দিয়েছেন আলি হায়দার তখন আর মাথা ঠিক রাখতে পারেননি ইলোরা। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই পরিবারের সঙ্গে আর কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখবেন না। কিন্তু মৃত্যুশয্যায় শুয়ে মামণি তার হাত ধরে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন যে, তিনি কোথাও যেতে পারবেন না। এভাবে বেঁধে রেখে কেন চলে গেলেন মামণি, সে প্রশ্ন রাতের পর রাত ইলোরাকে কাঁদায় কিন্তু তিনি যাবেনই-বা কোথায়? এই পরিবারকে অস্বীকার করলে তার থাকেইবা কি আর অবশিষ্ট জীবনে? নিজেকে তার অভিশপ্ত লাগে এ কারণেই।

এরকম একজন মানুষের জন্য ইলোরার কাছ থেকে রাবেয়া প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন যে কিনা নির্বাচনের পরে ধারদেনার ভার সইতে না পেরে এলাকা থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল যতদিন পর্যন্ত না ইলোরা এসে একে একে সকলের দেনা শোধ দিয়েছেন। আর এরকমই কোনো এক দুর্বলতম দিনে ইলোরা ঠিক করেছিলেন রাবেয়া আর হায়দার সাহেবের অতি কষ্টে রক্ষা করা জমিজমাটুকু ফিরিয়ে আনবেন। তিনি সেজন্য তার রাজনৈতিক ক্ষমতাও প্রয়োগ করেছেন। ওসিকে দিয়ে থানায় ডেকে এনে যে মূল্য নিয়ে জমি দলিল করে দিয়েছিলেন আলি হায়দার তার চেয়েও বেশি মূল্য দিয়ে সেই জমি আর গ্রামের বাড়িটি ফিরিয়ে এনেছিলেন ইলোরা। ফিরিয়ে এনে মনে হয়েছিল, তিনি যদি মারাও যান তাহলে এসব দিয়েই আলি হায়দারের চলে যাবে হয়তো। কারণ, আলি হায়দারের পরিবারকে দেখার ক্ষমতাওতো তার নেই। একটা ছেলের বাবা হয়েও তাকে একগাছি সুতো কিনে দেওয়ার মতো আয়ও আলি হায়দারের নেই এখন পর্যন্ত।

কিন্তু এবারও যখন আলি হায়দার নির্বাচন করার জন্য বাকি সবকিছু, সব সম্পর্ককে অস্বীকার করে মাঠে গিয়ে পড়ে রইলেন তখন ইলোরা একবার ভেবেছিলেন যে, আর নয়, আর কেন এই সম্পর্ককে তিনি পালবেন? কীসের জন্য? কোন ভরসায়? কিন্তু ততোদিনে আলি হায়দারের সংসারে নতুন মানুষটি এসেছে সে ইলোরাকে নতুন করে ভাবাতে শুরু করেছে। মনে হয়েছে কোনো ভাবে যদি এর বাবাকে টিকিয়ে রাখা না যায় তাহলে একেওতো একদিন ইলোরারই বইতে হবে। কিন্তু সে পর্যন্ত যদি ইলোরার কাউকে বইবার মতো ক্ষমতা না থাকে? ইলোরা জানতেন যে, এই যে গ্রামের মুরুব্বিদের নিয়ে এসে তাকে বলানো হলো, এ তার ভাই আলি হায়দারেরই বুদ্ধি। কারণ, এই মানুষগুলো নিজ থেকে এসে কোনোদিনই তাকে বলবেন না যে, ইলোরা যেন আলি হায়দারকে মনোনয়ন এনে দেন দলের কাছ থেকে। কিন্তু ইলোরা নিজেও দ্বন্দ্বে পড়ে যান এটা ভেবে যে, এমপি সাহেবকে মুখ ফুটে বললে যদি তিনি ওর কথা না রাখেন? তখন? এটা তো এক ধরনের অপমানও? এতো ছোট ব্যাপারে এমপি সাহেবের কাছে অপমানিত হতে হবে? ভাবতে ভাবতে তিনি উঠে যান মুরুব্বিদের সামনে থেকে। সারারাত ঘুমাতে পারেন না। ঢাকায় এসেও অনেক সময় নিয়ে ভেবেছেন তিনি। আর ঠিক সে সময়ই আলি হায়দারের স্ত্রী ফোন করে তার কাছে কান্নাকাটি করেন, যাতে তিনি চেষ্টা করে দল থেকে আলি হায়দারকে মনোনয়ন এনে দেন। ইলোরা এবারও বুঝতে পারেন যে, এই ফোনটিও মেয়েটি ইচ্ছে করে করেনি, বাধ্য হয়েই করেছে। এমনিতে মেয়েটি কোনোদিন তার কাছে কিছু চায়নি। কিছু চাওয়ার মতো তার অবস্থান নয়, এই সত্য সে জানে, তাই সে চায় না। ইলোরা মেয়েটির এই অসহায় অবস্থাটি বুঝতে পেরে তার চাওয়ার আগেই তাকে সবকিছু দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু নির্বাচনের মনোনয়নের জন্য যখন আলি হায়দার স্ত্রীকে দিয়ে ফোন করালেন তখন ইলোরা বুঝতে পারলেন যে, তার আসলে কোনোই উপায় নেই এই মনোনয়ন সংগ্রহ করা ছাড়া, যেভাবেই হোক তাকে কাজটি করতেই হবে। তিনি শেষাবধি সেই লোকটির কাছে গিয়েই দাঁড়ালেন যাকে তিনি মনেপ্রাণে ঘৃণা করেন। কিন্তু তার ক্ষমতা আছে, দলের ভেতর তার প্রতিপত্তি আছে। এই মানুষটি বিনিময় ছাড়া কিছুই করেন না। সবাই সে কথা জানে। ইলোরা নিঃসন্দেহে এই বিনিময়-ঝুঁকি নিয়েছিলেন। কিন্তু কেন নিয়েছিলেন সেটা  বুঝতে হলে আমাদের ইলোরা আর আলি হায়দারের মধ্যেকার কথোপকথনটিও জানতে হবে বিস্তারিত।

ইলোরা তখনও মনে মনে ভাবছিলেন কাকে ধরবেন মনোনয়নের জন্য? এমপি সাহেবকে নাকি অন্য কাউকে। ঠিক এমনই একদিন সন্ধ্যের পরে, যে সময়টিতে ইলোরা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন পার্কটিতে হাঁটাহাঁটি করেন, তারপর একটা পানির বোতল হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরেন, কখনও-বা ক্যাম্পাসের চটপটির দোকানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুচ্্কা খান। নিজের সঙ্গে নিজের এই উদ্যাপন তাকে আনন্দ দেয় খুউব। কখনও কখনও দু’একটা ছেলেমেয়ে এসে তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলে। কিন্তু এই সময়টা তিনি একা থাকতেই পছন্দ করেন। বাসায় ফিরেও তিনি টেলিভিশন না খুলে বারান্দায় আরাম-চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিয়ে থাকেন। ঠিক সেই সময় হিসেব কষেই ফোনটা এসেছিল আলি হায়দারের। এমনিতে কিন্তু কোনোদিন আলি হায়দার নিজে ফোন করেন না ইলোরাকে। আবার ইলোরাও কোনো প্রয়োজনে যদি ফোন করেন তাহলে হয় আলি হায়দারের ফোন বন্ধ পাবেন, না হয় তার ফোন আলি হায়দার ধরেন না। কিন্তু ইলোরা যদি আলি হায়দারের ফোন না ধরেন তাহলে ঘণ্টাখানেক পর্যন্ত এই ফোনটি আসতেই থাকবে, এটা জানেন বলেই একটি রিঙ বাজার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ফোনটি তোলেন, কথা বলেন আলি হায়দারের সঙ্গে।

স্লামালেকুম আপা।

ওয়ালাইকুম সালাম। কেমন আছিস?

এইতো আছি।

পিচ্চি কেমন আছে?

আছে ভালোই, খাবার চায় না মোটেওÑ আলি হায়দারের সঙ্গে ইলোরার অমিলের সবচেয়ে বড় জায়গাটি হচ্ছে ওরা দু’জনে সম্পূর্ণ দু’ভাবে কথা বলেন। যদিও শিশুকালে একসঙ্গে ওরা বড় হয়েছেন রাবেয়া আর হায়দার সাহেবের কাছে, যারা খুউব সুন্দর করে কথা বলতেন, কখনওই তাদের কথাবার্তা থেকে আঞ্চলিকতা বোঝা যেত না, সেখান থেকে ইলোরাও পেয়েছেন অভ্যেসটি। তিনিও প্রমিত বাংলায় কথা বলেন। কিন্তু আলি হায়দারকে বহু চেষ্টা করেও রাবেয়া পারেননি প্রমিত বাংলায় কথা বলাতে। সেই আঞ্চলিক উচ্চারণেই কথা বলেন আলি হায়দার।

ডাক্তার দেখিয়েছিস?

ডাক্তার দেখাবো কিন্তু সময় পাবার লাগছি না মোটেও- এরপর আর কোনো রকম ভণিতা না করে সরাসরি ইলোরাকে জিজ্ঞেস করেন আলি হায়দার, ‘আমার মনোনয়নের কী করলেন?’

আমার কিছু করার কথা নাকি আলি?

এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলের ওপাশে ফোঁপানোর শব্দ পাওয়া যায়। কথায় কথায় আলি হায়দার কেঁদে ফেলতে পারেন, এরকমটি অনেকবার হয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। ইলোরা যদিও এখনও আলি হায়দারের কান্না শুনলে কেমন যেন হয়ে যান। এই সেই শিশু আলি, যাকে তিনি কোলে নিতে পারতেন না, তারপরও হাঁচর-পাচর করে কোলে নিতেন। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধান দু’জনের বয়সে। কিন্তু শিশুকাল থেকেই অলিখিতভাবে ইলোরার ওপর আলি হায়দারের দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছিলেন রাবেয়া। তিনি কি জানতেন যে, একদিন এই ছেলের দায়-দায়িত্ব সবই বহন করতে হবে ইলোরাকে? আর সে জন্যই তিনি ইলোরাকে প্রস্তুত করছিলেন শিশুকাল থেকেই? নাকি এ কারণেই ইলোরাকে তিনি নিয়ে এসেছিলেন? কিন্তু পরক্ষণেই ইলোরা এ প্রশ্ন বাতিল করে দেন এটা ভেবে যে, তখনওতো রাবেয়ার কোনো সন্তান ছিল না। তিনিতো নিশ্চয়ই জানতেন না যে, একদিন আলি হায়দারের মতো একটি সন্তান হবে রাবেয়ার এবং সে এরকম একটা অকাজের ঢেঁকি হবে? মনে মনে ইলোরা নিজেকে গাল দিয়েছিলেন নিজের মায়ের চেয়েও বেশি খালা সম্পর্কে এরকম কথা ভাবছেন বলে।

জড়ানো গলায় আলি হায়দার বলেন, ‘এইবার শ্যাষ আপা, আর কোনোদিন বলবো না। যদি বলি তাইলে আমি মানুষের বাচ্চা না’- শিশুকাল থেকেই আলি হায়দার শতেক বিষয় নিয়ে ইলোরার কাছে এরকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইলোরা পাত্তা দিলেন না। কিন্তু কিছু বললেনও না।

আপা, আপনি একবার শুধু এমপি সাহেবকে ফোন করলেই হবে। আপনার কথা ফেলবার পারবেন নানে। এইবারই সুযোগ আপা, একবার নমিনেশন পাইলে আর ঠেকাতে পারবেন না কেউ আমারে। বাচ্চু নমিনেশন নেওয়ার জন্য উইঠা পইড়া লাগছে। কিন্তু আপনি চাইলে আপনাকে না করার সাধ্য নাই তার।

বাচ্চু শিকদার যে নমিনেশন চাইছে সে খবর ইলোরার জানা। বাচ্চু নিজেও ফোন করেছিল ইলোরাকে। ফোন করে দেখা করতে চেয়েছিল কিন্তু ইলোরা ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে কাটিয়েছেন। কিন্তু জানতে চেয়েছিলেন কেন ফোন করেছে বাচ্চু। বাচ্চু কোনো ধরনের ভণিতা না করেই বলেছিল, ‘আফা নির্বাচনে দাঁড়াবার চাই এবার। গতবার তো আলি হায়দার দাঁড়াইছিল, এইবার আমারে সুযোগ দেন।’

ইলোরা সুন্দর করে হেসে বলেছিলেন, ‘আমি সুযোগ দেওয়ার কে রে? তোরা কি পাগল না আর কিছু? আর তুই জানিস না যে, আলিকে আমি কিছু বললে ও তার উল্টোটা করে? আমি যদি বলি দাঁড়াস না ও ঠিক দাঁড়াবে। শোন কিছু মনে করিস না, আমি তোকেও বলি, কেন নির্বাচনে দাঁড়াতে চাস তুই? তোকে তো আমি আলি হায়দারের মতোই ভালোবাসি, তোর কোনো ক্ষতি হোক সেটা আমি চাইবো না কোনোদিন বাচ্চু। তুই বাদ দে ভাই, এই পাগলামি বাদ দে। শোন আমাদের এলাকার ভোট কম, যে এলাকায় ভোটার বেশি সেই এলাকা থেকেই চেয়ারম্যান হবে। মাঝখান থেকে তোদের টাকা-পয়সা আর শ্রমটা নষ্ট হবে, আর কতোটা সময় নষ্ট হবে এর পেছনে বল তো?’ ওপাশ থেকে একটু বিরক্তি নিয়েই হয়তো, অন্তত ইলোরার সেটাই মনে হয়েছিল, ‘সাহায্য করবেন না সেইটা কন আফা। আপনার ভাইরে দাঁড় করাবেন সেটা সোজা কইলেই অয়। আমারে ঘুরাইয়া-প্যাঁচাইয়া কথা শুনান ক্যান?’ ইলোরার মেজাজ খারাপ হয়ে যায় বাচ্চুর এই ঔদ্ধত্য দেখে। তিনি বলেন, ‘সেটাই যদি বুঝিস তাহলে তুই-ই বা ফোন করছিস কেন? তোর কি মনে হয় আমি আমার ভাইকে রেখে তোর জন্য মনোনয়ন চাইব?’ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বাচ্চু শিকদার বলেছিল, ‘তাও যদি আপনার আপুন ভাই ওইত। ভাই ফুটান, কিছু দিবার না পারলি বাই আর বাই থাকপেন নানে। আমার জন্যি আপনার কিছু করতে অবে না। আপনারে মুরুব্বি মানি আমি আপনারে জানাইয়া থুইলাম, পরে কবেননে যে, আপনারে জানাইলাম না।’ এরপরে কি আর বাচ্চুর সঙ্গে কথা চলে? আলি হায়দারের জন্য বাচ্চুর কাছ থেকেও ইলোরাকে কথা শুনতে হয়। এরকম কথা বহুদিন বহু মানুষের কাছ থেকেই তিনি শুনেছেন কিন্তু এই বয়সে এসেও যখন এসব কথার তীর দিয়ে লোকে ওকে বিদ্ধ করতে চায় তখন ইচ্ছে করে সব ছেড়ে দিয়ে একদিক কোথাও চলে যেতে। কিন্তু যাবেনটা কোথায়? বিদেশেও তো তার ভালো লাগেনি, জীবনটা এরকম সময়েই বিস্বাদ মনে হয় ইলোরার কাছে।

এখন আবার আলি হায়দারও যখন ফোনের ও প্রান্তে বাচ্চু শিকদারের নামোচ্চারণ করেছেন তখন আবার সেই ফোনালাপের স্মৃতি ইলোরার ভেতরটাকে বিষিয়ে দিয়েছে। তিনি বেশ বিষ মেশানো স্বরেই বললেন, ‘আমারে এবার তোরা মুক্তি দে না? আর কতো বল? তোদের জন্য নিজেরে আর কতো নীচে নামাব আমি?’

ফোনের ওপাশে তখন আলি হায়দারের রুক্ষ কণ্ঠ আরও রুক্ষ হয়ে ওঠে, ‘কী করছেন আপনি আমার জন্য? আমার জন্য আমার বাপ-মা যা থুইয়া গেছে তাই দিয়াই তো আমার চলে, আমার জন্য আপনার কিছু করার ক্ষমতা থাকলিতো করবেন?’ এসব বাক্যের পরে নতুন করে কিছু বলার থাকে না ইলোরার কখনওই। তিনি চুপ করে থাকেন, ভাবেন ফোনটা রেখে দেবেন। কিন্তু তিনিতো জানেন, ফোন আবার আসবে, এবং এসব কথা শুনতেই হবে তাকে। এক সময় বিরক্ত হয়েই তিনি বলবেন যে, ঠিক আছে আমি চেষ্টা করব তোর মনোনয়নের ব্যবস্থা করার জন্য। দেখি কতোদূর কী হয়। সে পর্যন্ত আলাপচারিতাকে যেতে দিলে ইলোরাকে যে যন্ত্রণাময় কথাগুলো শুনতে হতো তা শোনার চেয়ে না শোনা ঢের উত্তম। তিনি আলি হায়দারকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোর পায়ে ধরি ভাই, তুই আমাকে আর কথা শুনাইস না। আমি আমার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। এমপি সাহেবকে বলে দিবো কিংবা আরও যদি কাউকে বলতে হয় তাকেও বলে দিবো। তবু তুই তোর ওই ভাঙা রেকর্ড থামা, একই রেকর্ড আর কতোবার বাজাবি তুই?’ ইলোরা ফোন রেখে দেন। হাঁপাতে থাকেন। বয়স হয়েছে তারও, নিজেকে তিনি আর ধরে রাখতে পারেন না। হু হু করে কেঁদে ফেলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া এই বাড়িগুলি বেশ সুন্দর, চারদিকে গাছপালা, তার ভেতর নতুন নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি উঠেছে, এর আগের পুরোনো বাড়িগুলিতো একেকটি প্যালেসের মতো। বাইরে সন্ধ্যা নেমে গেছে, অন্ধকারে জোনাকি ফোটে না এ শহরে, চোখভর্তি পানি নিয়ে ইলোরা সে সন্ধ্যায় জোনাকি দেখেছিলেন; হতে পারে চোখের ভেতরের জলে বারান্দায় ঝোলানো বৈদ্যুতিক বাতিটি থেকে ঠিকরে আসা আলো তার চোখের ভেতর অসংখ্য জোনাকি ছেড়ে দিয়েছিল।

পরদিন ভোরে উঠেই তিনি সেই রহস্যময় বৃদ্ধের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, আপনার কাছে একটা জিনিস চাই, দিতে হবে, না করতে পারবেন না। বৃদ্ধের চোখ চক চক করে উঠেছিল, বলেছিলেন, তুমি যা চাও তাই-ই পাবে, না জেনে না শুনেই বলছি, কিন্তু আমি যা চাই তার কী হবে?

ইলোরা হেসে হেসে ও যা চায় সেটা জানিয়েছিলেন বৃদ্ধকে কিন্তু বৃদ্ধর চাওয়া বিষয়ে ইলোরা আমাদের কিছু জানাতে চাননি কোনোদিন, আমরাও ইলোরা হায়দারকে এ বিষয়ে বিরক্ত করতে চাইনি কোনোদিন। আলি হায়দারকে কেন্দ্রে ডেকে এনে চেয়ারম্যান নির্বাচনে মনোনয়নের কাগজটি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কাগজ হাতে পেয়ে আলি হায়দার ফোন করেছিলেন ইলোরাকে। ধন্যবাদ দিয়েছিলেন সত্যিই অন্তর থেকে কিন্তু ইলোরার অন্তরে সে ধন্যবাদ গ্রহণ করার মতো জায়গা অবশিষ্ট ছিল না আর। পরবর্তী বেশ কিছুদিন ইলোরার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্ল্যাটে গ্রামের লোকজনের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছিল আর তারা আসার সময় সঙ্গে করে আলি হায়দারের নির্বাচনী প্রচারণার বিভিন্ন ছবি নিয়ে আসতেন কেন সেটা ইলোরা কোনোদিন ঠিক বোঝেননি। হয়তো আলি হায়দারই সেটা ইলোরাকে দেখানোর জন্য পাঠাতেন, এটা বোঝাতে যে, তার জনপ্রিয়তা কতোখানি। কিন্তু ইলোরা প্রতিটি ছবিতেই দেখতেন একদল শিশু-কিশোর, যারা এখনও ভোটার হয়নি তাদেরকে নিয়ে আলি হায়দারের মিছিল যাচ্ছে। পেছনে কিছু বয়স্ক মানুষ যে নেই তা নয়, সকলকেই ইলোরা চেনেন। ইলোরা খবরও পেতেন বিভিন্ন জনের কাছে নির্বাচনী প্রচারণার, কিন্তু সেগুলো খুব একটা সুখকর ছিল না। পাশের থানা থেকে ইলোরার পরিচিত লোকজন ফোন করেও ইলোরাকে খবর দিত নির্বাচন বিষয়ে, শোনার ইচ্ছে না থাকলেও এসব তাকে শুনতে হতো। সবচেয়ে বিরক্তিকর ছিল পার্টি অফিসে গেলেই ইলোরাকে সবাই ছেঁকে ধরতো ভাইয়ের নির্বাচন উপলক্ষে কিছু খাওয়ানোর জন্য। বিষয়টা কষ্টদায়ক ছিল খুউব ইলোরার জন্য, সবাই এমন ভাব করতো ওর সঙ্গে যেন ও নিজেই সংসদ নির্বাচন করছে। অথচ ওর ভাই একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে মাত্র। যে নির্বাচন এখনও অনেকদিন বাকি, তার ফলাফলও কী হয় কে জানে?

নির্বাচনের দিন : গণতন্ত্র যেদিন মুক্তি পায়

বাচ্চু শিকদারকে কোনওভাবেই ঠেকিয়ে রাখা যায়নি, নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হয়েইছেন। একই এলাকা থেকে দু’জন প্রার্থী, কে কার ভোট কাটবে এই বিতর্ক নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর দিন থেকেই জারি ছিল। এমনিতেই জ্যৈষ্ঠের গরম, মাত্রই ভাদ্র শেষ হয়েছে। প্রতিদিন বৃষ্টি নামার কথা থাকলেও প্রায় দিনই বিকেলে আকাশ মেঘ নিয়ে দম ধরে থাকে, তাতে গরম আরও তীব্র হয়, কিন্তু পথে পা দিলেই প্যাঁচপ্যাঁচে কাঁদা। খালগুলো আধা ভর্তি, চাইলেই কেউ এপার-ওপার করতে পারে না। এখনও এই খালগুলোতে সাঁকো বাঁধা হয়নি। কে বাঁধবে? যে চেয়ারম্যানের ওপর এই দায়িত্ব পড়ে তিনি নিজেওতো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি ভোট চাইতে গেলে সরাসরি মানুষ এসব প্রশ্ন করে কিন্তু গভীর রাতে একদল যুবক তার হয়ে প্রচারণায় যায় বাড়ি বাড়ি। তাদের সঙ্গে থাকে বড় বড় ব্যাগ, জাদুকরের থলে থেকে যেমন খরগোশ, গোলাপ কিংবা কবুতর বের হয় তেমনই তাদের থলেগুলো থেকে বিড়ি বা সিগারেটের প্যাকেট, কেজিখানেক চাউল বা আটা, আর নগদ শ’পাঁচেক টাকা বের হয়, বাড়ি প্রতি কখনও এসব বাড়ে বা কমে, যে বাড়িতে যতো বেশি ভোট সে হারে যুবকদের ঝোলা থেকে বের হওয়া জিনিসের পরিমাণ বেশি হয়। রাতের এই প্রাপ্তির গল্প দিনের বেলায় কেউ কাউকে বলে না, কিন্তু একথা দিকে দিকে রটে যায়। স্থানীয় নির্বাচনী অভিযোগ কেন্দ্রে এসব অভিযোগ নিয়ে গেলে কেউ তা আমলে নেয় না, কারণ প্রমাণ কই? কেউ তো সেটা প্রমাণ করতে পারবে না কোথাও। কে নিজে থেকে গিয়ে বলবে যে, রাতের বেলা তার বাড়িতে এমন কেউ প্যাকেট ভর্তি করে জিনিসপত্র দিয়ে গেছে? আর নগদ যা পাওয়া যায় তার হিসেব ভুলতে হয় সবার আগে, একথা মুখে আনাও পাপ।

যদিও তফসিল ঘোষণা, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ আর দাখিলের মধ্যবর্তী সময়ে অনেক খেলা চলে। এমপি সাহেব এ-সময় এলাকা থেকে দূরেই থাকেন। নিজেকে এসবের মধ্যে জড়াতে চান না তিনি। এমনিতেই স্থানীয় নির্বাচনে এমপি হিসেবে তিনি আসতে পারবেন না, সংবিধানে এরকম নির্দেশনাই আছে। তিনি এদিক দিয়ে বাঁচোয়া অনুভব করেন। কিন্তু তার সর্বক্ষণের সঙ্গী কিংবা দলের উপজেলা পর্যায়ের নেতৃত্ব মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার দিন আলি হায়দারের পাশে ছিলেন। প্রচারণা শুরুর দিন কয়েক পরে একটি হোন্ডা দিয়ে এমপি সাহেব একটি ছেলেকে পাঠিয়ে ছোট্ট একটি খামও ধরিয়ে দেন আলি হায়দারকে। আলি হায়দার খুলে দেখেন তার ভেতর দেড় লাখ টাকা। এমনিতে ধারকর্জ করে এতোদিন ধরে আলি হায়দার চালিয়ে যাচ্ছিলেন কিন্তু মনোয়নপত্র কেনা, জমা দেওয়া ও যাচাই-বাছাইয়ের সময়ও সরকারি কর্মকর্তারা তার কাছে বকশিশ চেয়েছিলেন তিনি দিতে পারেননি বেশি কিছু। কোত্থেকে দেবেন? এর আগের নির্বাচনে তাকে ধার দিয়ে মানুষ তার পিছে পিছে বছরখানেক দৌড়ে বেড়িয়েছে। এবার আবার ধার দিয়ে কেউ আর মারা পড়তে চায় না। ইলোরা যদি সেবারও টাকাটা না দিতেন, আলি হায়দার যদি আবার এলাকায় ফিরে না আসতেন তাহলে কি আর সে টাকা পাওয়া যেত? যেত না। লোকে সেকথা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন আলি হায়দারকে। টাকার চিন্তায় আলি হায়দারের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। কী করবেন কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। ইলোরার কাছে মনোনয়নের পাওয়ার জন্য যেভাবে কাকুতি-মিনতি করতে হয়েছে তারপর কি আর নির্বাচনে কোনো পয়সা দেবেন ইলোরা? নিজেরওতো চক্ষুলজ্জা বলে কিছু আছে আলি হায়দারের। ভেবেছিলেন দল থেকে তাকে সাহায্য করা হবে, তিনি শুনেওছেন যে, দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেটা স্থানীয় এমপি’র মাধ্যমেই আসে। কিন্তু এমপি সাহেব তো মাত্র দেড় লাখ টাকা দিয়ে বলে দিয়েছেন, দল থেকে এর বেশি দেওয়া যাবে না আর। আলি হায়দারের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে, কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।

গ্রামের স্থানীয় বাজারগুলোতে নির্বাচনী অফিস খোলা হয়েছে, প্রত্যেক প্রার্থীই খুলেছেন। এলাকার দলীয় সমর্থকদের ধরেটরে আলি হায়দারও খুলিয়েছেন কিন্তু তার নির্বাচনী অফিসে যেন কোনো প্রাণ নেই, প্রণোদনা নেই। বিকেল বিকেল চা-বিস্কুটটা পর্যন্ত তিনি খাওয়াতে পারছেন না। প্রচারের জন্য মাইক ভাড়া করতে হবে, সেই পয়সাও তার নেই। নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে তার। কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয়, কোনো কিছু না ভেবেই তিনি এই পর্যন্ত চলে এসেছেন। দল থেকে টাকা পাবেন, তাই দিয়ে নির্বাচন করবেন আর সরকারি দল হিসেবে বাকিটুকু করবে প্রশাসনÑ এই হিসেব-নিকেশ নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে পড়েছেন নির্বাচনে। এখন এই মাঝ সমুদ্দুরে দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছে বিরাট ভুল হয়ে গেছে। এই ভুল শোধরানোরও কোনো উপায় তারা জানা নেই। এর-ওর-তার কাছে তিনি হাত পেতেই চলেছেন, কেউই তাকে এক কানাকড়িও দিতে চাইছে না। কিন্তু দেবে দেবে না করেও দু’একজনের কাছ থেকে ঠিক কিছু বের করে এনেছেন তিনি। বলেছেন, এবার নির্বাচনে তিনি জিতবেনই, প্রশাসনই তাকে জিতিয়ে আনবে। সারা দেশেতো এরকমটাই হয়েছে। কেউ কেউ আলি হায়দারের একথা বিশ্বাস করেছেন, তারাই যথাসাধ্য দিয়েছেন তাকে। কিন্তু তা সামান্যই, তা দিয়ে এই দক্ষযজ্ঞ চালানো যাবে না, একথা আলি হায়দার স্পষ্ট বুঝতে পারছেন। এদিকে সময় যতোই এগিয়ে আসছে ততোই বুঝতে পারছেন যে, প্রশাসনও তার পক্ষে আসলে কিছু করছে না। তিনি এর মধ্যে যে ঢাকায় গিয়ে এমপি সাহেবের সঙ্গে কথা বলবেন তারও সুযোগ নেই। কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে তিনি আবারও সব লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে ইলোরাকেই ফোন করলেন, ‘আপা আমারে বাঁচান আপা, আমি মারা যাচ্ছি।’

কী হয়েছে তোর?

নির্বাচন করতে নামাটা বিরাট ভুল হয়েছে আপা। দল থেকে আমাকে কেন যেন কোনো সাহায্যই করা হচ্ছে না। পাশের ইউনিয়নে কিন্তু প্রার্থীকে অনেকগুলো করে টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাকে যা দেওয়া হয়েছে তা দিয়ে আমি একদিনও চালাতে পারব না। আপনি কি আবার একটু কথা বলবেন এমপি সাহেবের সঙ্গে?

নারে ভাই, আমি সেটা পারব না। উনাকে আর কিছু বলতে চাই না। তাছাড়া উনি চান নাই তুই নমিনেশন পাস, উনি তোকে নমিনেশন দিতেই চান নাই। বাচ্চু শিকদারকে দিতে চেয়েছিলেন। আমি আরেকজনকে ধরে তোর জন্য সেটা করতে পেরেছি কিন্তু এখন আবার টাকা-পয়সার কথা বলতে পারব না কাউকে। আমাকে তুই ওটা করতে বলিস না ভাই।

আপা তাইলে তো আমি শ্যাষ। এবারও আর জিততে পারব নানে। কী করব আপা?

আমিও তো বুঝতে পারছি না কী করবি। কিন্তু তুই এসব কথা আগে ভাবিস নাই?

ভাবব না কেন? বললাম না, ভাবছিলাম দল থিকা ফান্ড দিবে নির্বাচনের জন্য? কিন্তু এখন তো সেদিক থেকে কোনও আশা আর নাই। এমপি সাহেব আমার ফোনটাও ধরে না। কী করব আপা?

আলি হায়দারের অসহায় কণ্ঠস্বর ফোনের ওপাশে। এবারে কান্না নেই সত্য কিন্তু উৎকণ্ঠাটা টের পান ইলোরা। বুঝতে পারেন, বেচারা সত্যিই বিপদে পড়েছেন খুউব। কিন্তু তিনিইবা কী করতে পারেন? এর আগেরবার নির্বাচনে তিনি বিদেশ থেকে যে টাকা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন দেশে এসে সেটা ব্যাংকে জমা করে রেখেছিলেন ভবিষ্যতের জন্য। সেখান থেকেই তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন ভাইয়ের নির্বাচনী খরচ জোগানোর জন্য। কিন্তু তাতে ফল হয়নি খুউব একটা। পরে আবার নির্বাচনের সময় নেওয়া ধারদেনা শোধ করা আর বাড়িসহ জমিজমা ফিরিয়ে আনায়ও কম টাকা ব্যয় হয়নি। এই মুহূর্তে তার হাতে খুব বেশি কিছু নেই যে তিনি সেটা ভাইকে নির্বাচনের জন্য দিয়ে দেবেন। সত্যি কথা বলতে কি আলি হায়দারের জন্য তার মায়াও হয়, এই একটা লক্ষ্য নিয়েই ছেলেটা এতোদিন অপেক্ষা করে আছে। কোনো কিছুতেই মন লাগাতে পারেনি। এমনকি শহরের বাড়িটা পর্যন্ত বিক্রি করে গ্রামে চলে এসেছে, এই নির্বাচন নির্বাচন করে। কতোদিন এই শহরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ঢোকার জন্য পাস পাইয়ে দেওয়ার জন্য ইলোরাকে ফোন করে জ্বালিয়েছেন। কারণ ওই একটাই, এলাকায় একটা রাস্তা করার জন্য ছেলেটা কী খাটুনিইটা করেছে। কতো মানুষের কাছে যে গিয়েছে তার ঠিক নেই, এলাকার সব মানুষের সই নিয়েছে আবেদনপত্রে তারপর সেটি জমা করেছে। একের পর এক পত্রপত্রিকায় চিঠি লিখে আগে এই রাস্তার দাবি প্রতিষ্ঠা করেছে। আজকে আলি হায়দারের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। এতোটা বছর তার আর কোনো কাজ ছিল না। এলাকার মানুষের জন্যই তিনি কাজ করেছেন। নিজের জীবনের সবচেয়ে ভালো সময়টাই আলি হায়দার মানুষের জন্য দিয়েছেন, কতোটুকু কী করতে পেরেছেন সেটা মুখ্য নয় কিন্তু মানুষের পাশে থাকার এই ইচ্ছেটার কোনো মূল্য নেই?

কতোদিন মুখ আলো করে ইলোরার কাছে এলাকায় বিভিন্ন কাজের ফিরিস্তি নিয়ে এসেছেন আলি হায়দার, ইলোরা কখনও শুনেছেন, কখনও এড়িয়ে গিয়েছেন। রাজনীতিতে নিজের অবস্থানকে ঠিক রাখার জন্য একেক সময় আলি হায়দার একেক দাবি করেছেন ইলোরার কাছে। কখনও তিনি সেটা মিটিয়েছেন, কখনও মেটাতে পারেননি। কিন্তু আলি হায়দার হাল ছাড়েননি। এখন বাবা-মা সব হারিয়েছেন। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি কিছু ভাবেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। একটি ছেলে হয়েছে তার কিন্তু ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়েও তার কোনো ভাবনা নেই। এসব ব্যাপারে তিনি যেন সম্পূর্ণ উদাসীন। তার ভাবনার কথা তার মুুখ থেকে বের করার ক্ষমতা স্বয়ং ঈশ্বরেরও আছে কিনা সেটা কারও জানা নেই। তিনি কী করবেন বা কী করতে চান সে বিষয়ে তিনি নিজেই ঠিক জানেন কিনা সেটাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না। কিন্তু আলি হায়দার একথা জানেন যে, তিনি যে-কোনো ঝুঁকি নিয়ে নির্বাচন করতে চান। এবার তাকে নির্বাচনে জিততেই হবে। নাহলে তিনি কী করবেন সেটা নিজেও স্পষ্ট করে জানেন না। তিনি এও জানেন যে, এবার চেয়ারম্যান হলে তিনি এমন কিছু করবেন যাতে বার বার লোকে তাকে চেয়ারম্যান বানায়। তাছাড়া এখন তো প্রতিটি ইউনিয়নের উন্নয়ন বাজেটও প্রায় পঁচিশ কোটি টাকা, তার মানুষের কাছে হাত পাতার দিনও ফুরাবে এবার। কিন্তু এসব কথা কখনোই কাউকে মুখ ফুটে বলেননি আলি হায়দার। কিছুটা ইলোরা বোঝেন হয়তো কিন্তু বুঝেই-বা তিনি কী করবেন? তার ক্ষমতা কতটুকু? তাছাড়া ক্ষমতা দিয়েও কি সব কিছু করা যায়? এই নির্বাচনে তিনি ক্ষমতা প্রয়োগে কতটুকু কী করতে পারবেন? তিনি অস্থির হয়ে ভাবেন কিন্তু কূল-কিনারা পান না।

আলি হায়দার প্রতিদিনই তাকে ফোন করেন বিকেল বিকেল, ‘আপা কী করব আমি?’ বুঝতে পারেন অসহায় আলি হায়দার আর কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ইলোরাকেই ফোন করেন। তিনি কোনো পরামর্শ দিতে পারেন না। বিভিন্ন ব্যবসায়ী নেতার কাছে ফোন করেন ইলোরা। তাকে যারা চেনেন তারা তে আলি হায়দারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা জানতেনই, যারা জানতেন না তাদের সঙ্গেও কথা বলেন ইলোরা, নানাজনে নানাপরামর্শ দেন কিন্তু কাজের কাজ করেন দু’জন মাত্র। একজন এমপি ইলোরাকে বলেন, ‘আপনার ভাইয়ের নির্বাচনে মাসখানেক ধরে খাওয়ানোর জন্য আমি একটন চাল পাঠাতে চাই। আপনি ঠিকানা দেন আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ ইলোরা জানেন যে, এই সময়ে এই চালটা খুউব কাজে আসবে। অন্তত প্রচারণায় যারা নামবেন তাদেরকে খাইয়ে দেওয়া যাবে বা রাত-বিরাতে ক্যাম্পেইন করে ফিরে আসার পর ক্ষুধার্থ ছেলেদের খাওয়ানোর ব্যবস্থাতো হবে। ইলোরা নিজেই বললেন, ‘সঙ্গে মণ খানেক আলু আর ডালও দিয়ে দেবেন তাহলে মশলা-টশলা ওরা কিনে নিতে পারবে।’ হাসতে হাসতেই ইলোরা কথাটা বলেছিলেন কিন্তু ভদ্রলোক যে সত্যিই সত্যিই একটন চাল আর তিন বস্তা আলু, এক বস্তা ডাল পাঠিয়ে দেবেন সেটা বুঝতে পারেননি। কিন্তু দু-একদিন পরেই আলি হায়দার ফোন দিলেন, ‘আপা কি এক ট্রাক চাউল, কয়েক বস্তা আলু আর ডাল পাঠাইছেন?’

আমি পাঠাইনি। আরেকজনের পাঠানোর কথা ছিল। পাঠিয়েছেন তাহলে? তোর নির্বাচনী প্রচারে কাজে আসবে, হিসেব করে খরচ করিস। দেখিস আবার চুরি-টুরি যেন না হয়। যার কাছে দায়িত্ব দিবি তাকে বলে দিবি প্রতিদিন সকালে দশ কেজি করে চাল, আর কেজি তিনেক আলু আর কেজি খানেক ডাল বের করে দিতে, বাকিগুলো বারান্দার ছোট্ট রুমটায় ঢুকিয়ে রেখে তালাবন্ধ করে রাখতে। আর শোন, আমি হাটখোলার আলিমদ্দির দোকানে বলে দিয়েছি, সেখান থেকে বাকিতে মশলাপাতি, চা-বিড়ি নিস যা লাগে। একটু বুঝেশুনে খরচ করিস। আলিমুদ্দি সব লিখে রাখবে। দেখিস আবার না খেয়েও যেন লিখে না রাখে। প্রতিবার কিছু কেনার পর যে কিনছে তাকে দিয়ে সই করাবি- বলেই ইলোরার মনে হলো, সবাইতো আর সই করতে জানে না গ্রামে। ওপাশে আলি হায়দার নীরবে শুনে যান। কিছুক্ষণ থেমে থেকে বলেন, ‘আপা হাতে একটা পয়সা নাই, কী করব? প্রতিদিন ক্যাশওতো কিছু লাগে। কিছু ব্যবস্থা করা যায় না?’ ওর গলায় গভীর অসহায়ত্ব। বুঝতে পারেন যে, তাকে চাপ দেওয়ার মতো মুখ আর নেই আলি হায়দারের। এরকম সময়েই ভাইয়ের প্রতি মায়া আরও প্রবল হয় ইলোরার। বলেন, ‘দেখি কী করা যায়।’

ফোনের এ প্রান্তে আলি হায়দার ঠিক বুঝতে পারেন যে, ইলোরা যখন বলেছেন ‘দেখি কী করা যায়’ তখন কিছু একটা করবেনই। এই বোনটা না থাকলে তিনি যে ভেসে যেতেন সে সত্য তার অজানা নয়। কিন্তু একথাও তো সত্য যে, যার কেউ নেই তার আল্লাহ আছে, আলি হায়দার এ সত্যও মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন। আল্লাহই যে ইলোরাকে তার জন্য ঠিক করে রেখেছেন এটাই বারবার মনে হয় আলি হায়দারের। তার চোখমুখ উজ্জ¦ল হয়ে ওঠে। তিনি সাহস করে বলেন, ‘আপনি আসবেন না? আপনি আসলে আমার প্রচারে জোয়ার আসবে আপা, আপনি না আসা পর্যন্ত জোয়ার উঠানো যাচ্ছে না।’

ইলোরার হাসি পায় এই জোয়ারের কথা শুনে। রাজনীতির একটি ভাষা আছে, আছে নিজস্ব রীতি-

রেওয়াজ। যুগের পুর যুগ ধরে নির্বাচনী প্রচারে এই ভাষা, এই রেওয়াজ-রীতি ব্যবহৃত হয়ে আসছে এদেশে। এখনও এসবের বদল আসেনি খুউব একটা। মাঝে মাঝে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিংবা কোনো প্রচলিত টিভি সিরিয়াল বা নাটকের ডায়লগের সঙ্গে মিল রেখে নির্বাচনের স্লোগান ঠিক করা হয়। ইদানীং প্রচারণাতেও নানা কৌশল থাকে। কেউ কেউ নিজ খরচে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য বিজ্ঞাপন চিত্র বানিয়ে স্থানীয় কেবল টিভি দিয়ে এলাকায় প্রচার করে থাকেন। কিন্তু এই এলাকার বেশিরভাগ জায়গাতেই তো বিদ্যুৎ নেই। তাই আলি হায়দার সে কাজটি করেননি। কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বী সদ্য পদত্যাগকারী চেয়ারম্যান ঠিকই তার জন্য প্রচার-বিজ্ঞাপন বানিয়েছেন, স্থানীয় কেবল টিভি সেটা দেখাচ্ছেও। আলি হায়দারেরও ইচ্ছা একটি ভাষণ রেকর্ড করে সেটি কেবল টিভিতে দেখাবেন কিন্তু সেজন্য প্রায় হাজার কুড়ি টাকা দরকার। তার হাতে নেই দুশো টাকাও।

ইলোরা অনেক কষ্টে হাসি বন্ধ করে বলেন, ‘আমি আসবো দু-একদিনের মধ্যেই। কিন্তু ভাই তোর কাছে হাত জোড় করে বলি, আমারে কোনো জায়গায় ভোট চাইবার জন্য নিয়ে যাসনে। এর আগেরবার গেছিলাম কিন্তু তাতে তো কোনো কাজ হয় নাই, হয়েছে? বল? তাহলে আবার কেন নিবি?’

আপা এবারতো পরিস্থিতি ভিন্ন। এবারতো দলীয় টিকিট পাইছি আমি আপা। আমারে কেউ ঠেকাইতে পারবে না। আপনি আসলেই বুঝবেনÑ ইলোরা আর কথা বাড়াতে চান না। কথা বাড়ালেই নানা প্রশ্ন করতে হবে আলি হায়দারকে। যদি দলীয় টিকিটের পক্ষেই জোয়ার উঠে থাকে তাহলে তাকে এত টাকা খরচ করতে হচ্ছে কেন? আর ক্ষমতা ব্যবহার করেই যদি সরকারি দল ওকে জিতিয়ে আনতে পারে, তাহলেই-বা ওকে এভাবে ক্যাম্পেইন করতে হচ্ছে কেন? ইলোরা জানেন এই সময়ে আলি হায়দারকে এসব প্রশ্ন করলেই ওর আসল চেহারা বেরিয়ে আসবে। সকল অসহায়ত্ব ফুঁড়ে বেরুবে ওর নিকৃষ্ট রূপ, যা দিয়ে ইলোরাকে ও আঘাত করতে ছাড়বে না কোনো ভাবেই। ইলোরা তাই আর কথা না বাড়িয়ে বলেন, ‘আমি দেখি কিছু ব্যবস্থা করতে পারি কিনা, আমার কাছে তেমন কিছু নেই। তবু কাল-পরশু কিছু ব্যবস্থা করতে পারলে আমি চলে আসবো, তুই সাবধানে থাকিস, রাত-বিরাতে সাবধানে চলাফেরা করিস।’

এমনিতে ইলোরা এলাকা থেকে যেসব খবরাদি পাচ্ছিলেন তা মোটেও ভালো নয়। কবির নামের একটি ছেলেকে তিনি দায়িত্ব দিয়েছেন সার্বক্ষণিকভাবে আলি হায়দারের সঙ্গে থাকতে। এ জন্য তিনি কবিরকে বেতনও দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিদিন রাত দশটার পরে একটা মিস কল দেয় কবির। ইলোরা সঙ্গে সঙ্গে ফিরতি ফোন করেন কবিরকে। ‘কী রে কী অবস্থা? সব ঠিক আছে?’

না আফা ঠিক নাই। মনে অয়, এইবারও আমরা হারবো। এমপি সাহেবতো আমাগো কোনো কামেই আইলো না। মাইনষি কয়, সে বাচ্চুরে টাহা দিছে ইলেকশন করার জন্য।

মানুষেতো অনেক কিছুই বলে, সব কথা বিশ্বাস করতে হয় না- ইলোরা বিষয়টিকে হাল্কা করতে চান। কিন্তু কবির সিরিয়াস হয়ে বলে, ‘আফা আপনি বিশ্বাস করবেন না, বাচ্চু শিকদার যে কি বাড় বাড়ছে, তার সাহস দেখলে আপনি অবাক হবেন। সে আপনারে নিয়াও নানান কতা কয়। মাইনষেরে নিয়া হাসাহাসি করে। আমাকে শুনাইয়া শুনাইয়া উস্কানি দেয়। আমরাও তো মানুষ আফা, মারামারি লাইগা যাবার পারে যে কোনো সুমায় আফা।’

খবরদার কবির, তোরা কোনো মারামারির মধ্যে যাবি না। নির্বাচনে হারিস বা জিতিস কিছু যায় আসে না, কিন্তু মারামারি লাগলে কিন্তু ক্ষতি হবে তোদেরই।

কী কন আফা অগো যে লোকজোন তাগো তো আমি একলাই ফেলাইয়া দিবার পারি। খালি আলি ভাই আমারে থামাইয়া দেয়।

কবিরের এই কথায় ইলোরা কিছুটা স্বস্তি পান। আলি হায়দার যে মারামারি করার মানুষ নন সেটা আবারও জানতে পেরে ইলোরা আশ্বস্ত হন। কিন্তু তিনি কবিরকে বলেন, ‘শোন রাত-বিরেতে আলিকে নিয়ে বেশি বের হওয়ার দরকার নেই। বা বের হলেও সাবধানে দলবল নিয়ে বের হবি বুঝলি?’

আফা সব জায়গায় তো আর লোকজন নিয়া যাওয়া যায় না। গোপনে যাইতি অয়। সেইসব জায়গায় গিয়া দেখি সেইখানেও সবাই আমাগো আগে গিয়া কাম সাইরা আইছে।

মানে কী?

মানে হইলো সব জায়গায় চেয়ারম্যানের লোকেরা টাহা ছড়াইছে। আমাগো আগেই তারা গিয়া বইসা আছে যেইখানে যাই সেইখানে।

চেয়ারম্যান এতদিন টাকা বানিয়েছে আর এখন সেটা আবার নির্বাচনে ব্যয় করছে। তাছাড়া উনিতো শুনেছি ব্যবসায়ী মানুষ, তার দুই ভাই বিদেশে থাকে, তিনি টাকা ছড়াবেন না তো ছড়াবে কে? সেসব নিয়ে ভাবিস না।

না আফা ভাবতাম না, লোকে তো কয় এমপি সাহেবরেও চেয়ারম্যান টাকা খাওয়াইছে। কইছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনে এমপি সাহেবের নির্বাচন সে তুইলা দিবে। তাই এমপি সাহেব এ্যাহন তার জন্য কাজ করার নির্দেশ দিছে প্রশাসনরে। নইলে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করার পরও মোবাইল দিয়া সরাসরি টাকা বিলানোর ছবি তুইলা দেওয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা নিলো না ক্যান তার বিরুদ্ধে?

ইলোরা এ প্রশ্নের উত্তর জানেন না। কিন্তু বুঝতে পারেন যে, সত্যিই কোনো না কোনো ঘটনা ঘটছে সেখানে। তিনি কবিরের কাছ থেকে কিছু ঘটনা শোনেন আর বাকিটা নিজের রাজনৈতিক বুদ্ধি-বিবেচনা খাটিয়ে বুঝে নেন ঘটনার এদিক-ওদিক। তিনি কবিরকে বলেন, ‘আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের কী অবস্থা? তারা ভোটটা দিবে তো?’

তাগো কতা আর কইয়েন না আফা। তারা হগ্গুলিই খালি কয়, কিছু দিয়ার নাম নাই, খালি চাবার আসো ক্যা? এর আগের নির্বাচনেও তুমাগো ভোট দিছি, নির্বাচনে হারছো তো কী হইছে? একবার আসছিলা আমাগো কাছে? গ্রামের মাইনষিও একই কতা কয়। কয়, নির্বাচনে হাইরা যে বিটা পলাইয়া যায় তার ভোটার রাইখা তারে ভোট দিলি আবারও একই ঘটনা ঘটবে। এইবারতো আমাগো কেউ ছাইড়া কথা কবি নানে। আমাগো নামে যদি মামলা দেয়, আমরা কী হরবানে?

প্রশ্নটি সঙ্গত এবং অত্যন্ত যৌক্তিক। নির্বাচন শেষ করেই আলি হায়দার গতবার এলাকা ছাড়া হয়েছিলেন, বছর চারেক পরে এলাকায় ফিরেই আবার প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। মানুষতো তাকে অনেকদিন এলাকায় দেখেনি। এর আগে তবু এলাকায় থেকে মানুষের বিপদে-আপদে কাঁধ দিতে পেরেছেন আলি হায়দার কিন্তু নির্বাচনে হেরে সেই যে পাওনাদারদের ভয়ে এলাকাছাড়া হয়েছিলেন ফিরে এসেছেন তো এই সেদিন। মানুষ খারাপ কিছু বলেনি।

ইলোরা কবিরকে কী বলবেন ভেবে পান না। তারপরও বলেন, “খাবার-দাবারের কী অবস্থা? চাল-আলু-ডাল আছে? মশলাপাতি কিনেটিনে দিস কিছু? চাঙ্গে পিঁয়াজ ছিল, সেখান থেকে মণখানেক নামায়ে দিস, দেখিস আবার নির্বাচনের উছিলায় সব পিঁয়াজ যেন আবার হাওয়া হয়ে না যায়।”

না আফা আমি নামায়ে দিছি মণ খানেক। চাইল এহনও যেট্টুক আছে তা দিয়া নির্বাচন উঠাইয়া দিয়া যাবেনে। আলি ভাইর বউতো একবারও আসে না, আসলি তাও সেই-ই এসব দেখফার পারতো।

ছোট বাচ্চা রেখে ও কী করে যাবে কবির?- ইলোরা বুঝতে পারেন এ নিয়ে নিশ্চয়ই সবাই আলোচনা করে, নাহলে কবির হঠাৎ এই প্রশ্ন করার কথা নয়। ইলোরা নিজেই জানেন ওই গ-গ্রামে যেখানে এখনও বিদ্যুৎ নাই, পুরোনো ঘরটা সারাদিন কেমন অন্ধকার হয়ে থাকে, রাত হলেতো কথাই নেই, একটি ভুতুড়ে বাড়ির মতো দেখায় সেখানে মাস ছয়েক বয়সের একটি শিশুকে নিয়ে সারাজীবন শহরে বাস করা আলি হায়দারের স্ত্র্রীর পক্ষে একদিনও বসবাস করা সম্ভব নয়। কিন্তু গ্রামের মানুষ এসব বুঝবে কেন? তারা দেখে যে, আলি হায়দারের বউ একবারও গ্রামে আসে না। তাদের এক বেলা রান্না করে খাওয়ায় না। কথায় কথায় এসব প্রশ্ন সকলের মুখে মুখে ফেরে। কিন্তু এর আগেও দেখেছেন ইলোরা, আলি হায়দারের স্ত্রী হিসেবে মেয়েটা সকল দায়িত্ব পালন করলেও স্বামীর এই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পাগলামিটা ঠিক মেয়েটা নিতে পারে না। এর আগের বারও সে তেমন একটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনের কাজে হাত লাগায়নি। কারও কাছে গিয়ে ভোট চাওয়ার মতো মেয়ে সে নয়। সারাদিনে সে কথাই বলে একটা কি দু’টো। আর এবারতো তার একটা অজুহাত আছে। কোলের ছেলে রেখে সে কী করে যাবে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে?

কিন্তু ইলোরার একথাও অজানা নয় যে, আলি হায়দার ওর শাশুড়িকে চাপ দিয়ে গেলবার নির্বাচনে বেশ কিছু অর্থ আদায় করেছিল। এ কথা শোনার পর ইলোরা মরমে মরে গিয়েছিলেন। নির্বাচন মানুষকে এতটাই খারাপ করে ফেলে যে, স্ত্রীর বিধবা মা’কে চাপ দিয়েও অর্থ নেওয়ার মতো নীচু কাজ প্রার্থীকে দিয়ে করিয়ে নেয়? নাকি একজন মানুষ আসলে জন্মগতভাবেই এতটা খারাপ না হলে নির্বাচনের অজুহাত দেখিয়েও এরকম খারাপ কাজ করতে পারে না। ইলোরা ঠিক মেলাতে পারেন না বিষয়টা। নির্বাচনের পরে ইলোরা সেই অর্থ ফেরত দিতে চাইলেও ভদ্রমহিলা নেননি ইলোরার কাছ থেকে। এবার নির্বাচনে কী করছে তা আলি হায়দারই জানে, ইলোরা কবিরের কাছে জানতে চান ‘কবির একটা সত্যি কথা বলতো ভাই, আলি কি ওর শাশুড়ির কাছ থেকে এবারও টাকা-পয়সা নিচ্ছে কিনা চাপটাপ দিয়ে?’

কী কন আফা, জামাই নির্বাচন করবার লাগছে আর শাশুড়িতি টাহা দিবি না ক্যান?

টাকা তার কাছে থাকতে হবে তো নাকি? উনি কি টাকার গাছ লাগিয়েছেন নাকি? তাছাড়া, জামাইকেতো উনি আর নির্বাচন করতে বলেননি, তাহলে জামাইর নির্বাচনের জন্য উনি কেন টাকা দেবেন? উনার কি মেয়ে একটাই নাকি? আর মেয়েদের জামাইরাও যদি এরকম টাকার জন্য চাপ দেওয়া শুরু করে? ভদ্রমহিলা তখন কী করবেন?

না আফা এইবার কোনো টাহা পয়সা এ্যাহনও তাগো কাছে চাওয়া অয় নাই। তই আলি ভাইর ছোটো শালার মোটরসাইকেলটা আমরা ব্যবহার করবার লাগছি। তেল খরচ মাঝে মাঝে সে দেয়। তয় বেশিরভাগ আমরাই তেল ভরি।

ইলোরা বুঝতে পারে এই অসচ্ছল পরিবারটির জন্য এও কম নয়। ছেলেটা ছোটখাটো একটা চাকরি করে। তারপক্ষে প্রতিদিন যদি দশ লিটার তেলও ভরতে হয় সেটাও একটা বিশাল খরচ। কিন্তু আলি হায়দার নিশ্চয়ই মোটরসাইকেলে তেল ভরা না থাকলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওর স্ত্রীকেই আজেবাজে কথা শোনান। এমনিতেই নির্বাচন নিয়ে মাথার ঠিক নাই, তার ওপর যদি শ্বশুর বাড়ির লোকেদের কোনো দোষ-ত্রুটি পাওয়া যায়, আলি হায়দার যে নিশ্চুপ থাকার মানুষ নয় সেটা ইলোরা জানেন। মনে মনে প্রার্থনা করেন যাতে মেয়েটির ওপর আলি হায়দার অত্যাচার না করেন, করলেও যে ইলোরা কিছু করতে পারবেন সেরকম নয়, কিন্তু দূর থেকে এই শুভ কামনা করা ছাড়া আর তো কোনো কিছু করারও নেই তার।

অনেক ভেবেচিন্তে কবিরকে বলেন, ‘শোন আমি তোরে কিছু টাকা পাঠাচ্ছি বিকাশ করে, তুই টাকাটা আলির হাতে দিবি, দিয়ে বলবি মাওই আম্মা দিছেন নির্বাচনে খরচ করবার জন্য। কোনোদিনও যেন এই খবর কেউ না জানে। তাহলে কিন্তু তোর খবর আছে।’

কী কন আফা? আমি কারে কবার যাবো? আপনিও যে কি কন না কন?

আর মাত্র সপ্তাহ খানেক বাকি। এক সন্ধ্যেয় এক মাথা বৃষ্টি নিয়ে ইলোরার গাড়িটি গিয়ে উপজেলা শহরে ওদের বাড়ির সামনে থামল। গাড়ি রাখার কোনো জায়গা নেই সেখানে। পাশের আরেকটি বাড়িতে ইলোরা গাড়িটি রাখার ব্যবস্থা করেছেন। এখানে এলে গাড়িটি সেখানেই থাকে। নিজের গাড়ি নিয়ে ওই ভাঙাচোরা কাঁদাময় রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সাহস ইলোরা করেন না। তাই একটি স্থানীয় গাড়িকে আসতে বলেন পরদিন সকাল বেলা যাতে সেটায় করে যতদূর পর্যন্ত যাওয়া যায় ওদের গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য সেটুকু যেতে পারেন। রাতভর বৃষ্টি হচ্ছে, নিশ্চয়ই সকালে আরও কাঁদা হবে পথে। কিন্তু কী আর করা? ভেবেছেন গাড়িটা সপ্তাহখানেকের জন্যই ভাড়া নেবেন। নির্বাচন  না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন তিনি সকালে যাবেন এই গাড়িটি করে  রাতে আবার ফিরে আসবেন। গ্রামের ওই ঘরে তার পক্ষে ঘুমানো সম্ভব নয়। আজকাল ঘুমের ব্যাঘাত হলে তার শারীরিক কষ্ট হয় খুউব। সে কারণেই তিনি প্রতিদিন গ্রামের বাড়ি আর উপজেলা শহরের বাসা, এই দুই জায়গায় যাতায়াত করতে চান। তাছাড়া বাসায় ফিরে এলে প্রতিদিন ওই পিচ্চি মানুষটার সঙ্গেও থাকা হবে কিছুক্ষণ। শুধু কি তাই? আসলে গ্রামের বাড়িতে ইলোরা নিরাপদও বোধ করেন না। এলাকায় পা দেওয়ার পর থেকেই তিনি শুধু খারাপ খবর পাচ্ছেন বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে। তার কিছুই করার নেই, তবু মানুষ এসে এসে তাকে খারাপ খবর শুনিয়ে যাচ্ছে।

একেক গ্রামে একেকজন মাতুব্বর ঘোষণা দিয়ে তার হাতে এতগুলো ভোট আছে বলে ঘোষণা দিয়ে বসে আছেন। সেই ভোটগুলো কিনতে হলে তাকে কত টাকা কি দিতে হবে সেসবও তিনি লোক মারফত  প্রার্থীদের জানিয়ে দিচ্ছেন। বাকি প্রার্থীদের খবর তিনি বলতে পারবেন না, কিন্তু আলি হায়দারের কাছে যে খবর আছে তাতে মোট চার থেকে পাঁচ গ্রামের এরকম মাতুব্বরকে কিনে ফেলতে পারলে এ যাত্রায় তিনি ঠিক চেয়ারম্যান হয়ে বেরিয়ে আসবেন বলে তিনি মনে করেন। রাতে বাসায় খেতে বসে সে কথা পাড়েন ইলোরার কাছে। বলেন, ‘আফা এদের কয়েকজন আছে আপনার মুখ থিকা কথা শুনলেই কাইত হইয়া যাবেনে। বাকিগুলারে কিছু কিছু এ্যাহন দিবেন আর বাকিটা ভোটের পরে দিবেন বইলা কড়াল করবেন।’

ইলোরা চমকে ওঠেন আলি হায়দারের কথা শুনে। এসব লোকের সঙ্গে গিয়েও তাকে ডিল করতে হবে? কেন? তিনি এসব প্রশ্নের উত্তর জানেন না। তাছাড়া তিনি তো বস্তা ভরে টাকা আনতে পারেননি। তার সে সামর্থ্যও নেই। এক ব্যবসায়ী নেতা নির্বাচনের খবর চেয়ে ইলোরাকে ডেকে পঁচিশ লাখ টাকার একটি প্যাকেট ধরিয়ে দিয়েছেন। ইলোরার নিজের কাছে ছিল আরও দশ লাখের মতো। সব মিলিয়ে ইলোরা বত্রিশ লাখ নিয়ে এসেছেন, বাকি টাকা বাসায় রেখে এসেছেন। একেবারে শূন্য করেতো নিয়ে আসা যায় না। কোনো বিপদ-আপদ হলে? কিন্তু এখানে আসার পর থেকে যেসব কথা শুনছেন তাতে একটা পয়সা কাউকে দিলেও সেই পয়সাটা পানিতে ফেলা হবে। যদিও একথা আলি হায়দারকে কেউ এখন আর বোঝাতে পারবে না। তার হিসাব সহজ। যদি এই স্বগোষিত মাতুব্বরদের কেনা যায়, রাতের বেলায় বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে গিয়ে যদি পরিবার প্রতি শ’পাঁচেক টাকা করেও দেওয়া যায় তাহলে ভোটের বাক্স উপচে না পড়লেও যতটুকু পাওয়া যাবে, তার সঙ্গে যদি প্রশাসনকে আগে থেকেই কিনে ফেলা যায় তাহলে তার বিজয় কেউ আর ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। কিন্তু একথা তাকে কেউ বলার মতো সাহস বা বুদ্ধি কোনোটাই রাখে না যে, তার বিজয়কে ঠেকিয়ে রাখতে না পারার ক্ষেত্রে অনেকগুলো যদি বা কিন্তু আছে। একটি দু’টি হলে না হয় কথা ছিল কিন্তু বহু সংখ্যক যদি, কিন্তু নিয়ে কী করে তিনি এই নির্বাচন পার করবেন সে ব্যাপারে তখনও পর্যন্ত তার কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। তিনি যেন ইলোরার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। যে মুহূর্তে ইলোরা এসেছেন সে মুহূর্ত থেকেই তিনি একের পর এক নির্দেশ দিয়ে চলেছেন ইলোরাকে।

এরই মধ্যে ইলোরা একবার গিয়ে ইউএনও’র সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। সেখানেই পরিচয় হয়েছে র‌্যাবের স্থানীয় কর্মকর্তার সঙ্গে। পুলিশের ওসি নিজেই এসেছিলেন দেখা করতে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, পৌরসভার দলীয় মেয়রও এসেছিলেন কথা বলতে। ইলোরা জানতে চেয়েছিলেন, দল থেকে কেন প্রার্থীকে তেমন সাহায্য করা হলো না। উত্তরে একেকজন একেক রকম কথা বলেন। ইলোরা বুঝতে পারেন যে, এদের কারওরই মূল সত্য জানা নেই। তাদের কাছে প্রশ্ন করে তাই কোনো সত্য জানা যাবে না।

নির্বাচনের ঠিক চারদিন আগে যে ঘটনা ঘটল সে জন্য ইলোরা মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। রাত তখন প্রায় তিনটে। তিনি ফিরছিলেন গ্রাম থেকে। সবাইকে খাওয়াতে খাওয়াতে, কথাবার্তা বলতে বলতে গভীর রাত হয়ে গেল। তারপর এলেন এলাকার কয়েকজন মুরব্বি, সঙ্গে কয়েকজন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। তাদেরকে ইলোরা ছোটোবেলা থেকেই চেনেন। রাবেয়া আর হায়দার সাহেবের সঙ্গে তাদের সকলেরই হৃদ্যতা ছিল। ওদের কারও একজনের বাড়িতে এক সময় নিয়মিত কবির গান হতো, হায়দার সাহেব সেখানকার নিয়মিত অতিথি ছিলেন। সেকথাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ওরা বারবার বললেন। তারপর বললেন, এবার পূজো তারা ধুমধাম করে করতে চান। এই তো এখন জ্যৈষ্ঠ মাস, আর মাত্র মাস চারেক পরেই পূজো। পূজোর জন্য ইলোরা যেন তাদের কিছু দিয়ে যান সে কথাটি তারা কোনো রকম রাখঢাক ছাড়াই বললেন। বিনিময়ে তারা আলি হায়দারকে ভোট দেবেন, একথাও তাদের কেউ জিজ্ঞেস করার আগেই বললেন। প্রতিশ্রুতি ইলোরা চাননি। তিনি হয়তো এমনিতেই পুজোর জন্য কিছু না কিছু দিতেন সাধ্যমতো। কিন্তু একটা সেটা দায়িত্বের মতো হয়ে গেল। এই সংখ্যালঘু পরিবারেরই কয়েকটি ছেলে রাত-দিন আলি হায়দারের সঙ্গে লেপ্টে থেকে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে, কেউ আবার বিনি পয়সায় বিভিন্ন হাট বা স্কুলে স্ব-উদ্যোগেই আলি হায়দারের নির্বাচনী প্রচারণার সাব-অফিস খুলে কাজ করছেন। এদেরকে কিছু একটা দিতে পারলে ইলোরার নিজেরই ভালো লাগত। কিন্তু যে মুহূর্তে ভোটের কথা উঠল এবং ওকে মূলত ভোট কেনার জন্যই টাকাটা তাদের হাতে তুলে দিতে হবে বলে মনে হলো, ঠিক সেই মুহূর্তে ইলোরার মাথাটা বিগড়ে গেলো। কবিরকে ডেকে তার হাতে টাকাটা তুলে দিলে বললেন, ‘ওদেরকে আসছে পূজায় এটা খরচ করতে বল। আমি অন্য সময় না হয় উনাদের সঙ্গে কথা বলবো। আজকে বেশ রাত হয়ে গেছে। বাসায় যেতে হবে।’

কবির ইলোরাকে বুঝতে পারে। সেই জোর জার করে উপস্থিত মানুষদের সরিয়ে দেয়। তারপর সেই গভীর রাতে পাহাড়ের মতো এসে সামনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘চলেন আফা রওনা দেই। যাইতি যাইতি বিয়ান ওইয়া যাবেনে।’

এখানকার মানুষের এই আদি-অকৃত্রিম ভাষায় কথা বলাটা ইলোরার বেশ লাগে কিন্তু ইলোরা নিজে এভাবে কথা বলতে পারে না। কিন্তু ওর বুঝতে একটুও কষ্ট হয় না এই অঞ্চলের ভাষা। এই রাতের বেলা কাদার ভেতর দিয়ে পথচলা খুবই মুস্কিলের। সাপখোপের ভয়তো আছেই। টর্চের আলোয় দেখে দেখে পা ফেলছেন ইলোরা। গাড়ি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সে পর্যন্ত পৌঁছুতে এখনও আধ ঘণ্টাখানেকের হাঁটা পথ। গ্রামের মধ্যে দিয়ে রাস্তা। এই পথেই বাচ্চু শিকদারের মামাবাড়িও। সেই বাড়ির সামনে আসতেই ইলোরা একসঙ্গে অনেকগুলো মোটরসাইকেলের আওয়াজ শুনতে পেলেন। বুঝলেন এই গভীর রাতেও হয়তো কেউ নির্বাচনী প্রচারে এসেছে। হতে পারে চেয়ারম্যানের সেই যুবকরা, যারা গভীর রাতে ঝোলায় করে টাকা, চাল, মোবাইল ফোন ইত্যাদি নিয়ে বাড়ি বাড়ি বিলি করে দেয়। ইলোরা হাঁটার গতি কমালেন না। কবির আছে সঙ্গে। আরও দু’তিনটি ছেলে। সবাই ইলোরার চেয়ে বয়সে ছোট। হঠাৎই মোটরসাইকেলের আওয়াজ খুব কাছে চলে এলো। ইলোরা মনে মনে বেশ একটু ভয়ই পেলেন। এতগুলো মোটর সাইকেল, এখন যদি ওদেরকে ঘিরে ফেলে তাহলে? কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ইলোরার এ কথাও মনে হলো যে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ও ভয় পাবে না।  ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। এই এলাকারই মেয়ে ও। এখানে ওকে কেউ কিছু বলে পার পাবে না। কিন্তু তারপরও ভেতরটা ধুকপুক করতে লাগলো, বাইরে তার কোনো প্রকাশ দেখালেন না তিনি। তার সঙ্গে ছেলেপেলেদের তিনি কোনো রকম ভয় দেখাতে চান না। কবির ফিস ফিস করে বললো, ‘আফা বাচ্চু শিকদার আসফার লাগছে। আপনার সাথে মনে অয় কতা কবি।’

ইলোরা বললেন, ‘আমার সঙ্গে এখন কী কথা? কথার তো আর কোনো জায়গা নেই। নির্বাচনের তো আছে মাত্র আর পাঁচ দিন।’

ঠিক সে সময়ই একটা মোটরসাইকেল একেবারেই ইলোরার পাশে এসে গেল। সেটা চালাচ্ছে একজন আর তার পেছনে বাচ্চু বসে আছে। মোটরসাইকেল ইলোরার পথ আঁটকেই দাঁড়ালো প্রায়, সে কারণেই ইলোরাকে দাঁড়িয়ে পড়তে হলো। এক হাতে টর্চ, আরেক হাতে মোবাইল এবং শাড়ির কুচি ধরে আছেন। ঘেমে নেয়ে গেছেন প্রায়। গরম বিজ বিজ করছে চারপাশে। ‘কেমুন আছেন আফা? আমিতো ভাবছিলাম আপনি আসফেন নানে। পারলেন না, ভাইর ইলেকশনে আসতেই হইলো আপনারে’- বাচ্চুর গলার স্বর রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দেয়, সেটা আরেক ধরনের সাহসও দেয় ইলোরাকে। আশপাশের বাড়ির মানুষ ততক্ষণে হয়তো কেউ জেগে গিয়েছে, তারা বাচ্চুর কথা শুনতে পাচ্ছে জেনে ইলোরা নিজেও গলা চড়িয়েই কথা বলেন, স্বাভাবিকের চেয়ে, ‘হ্যাঁ, আসতেই হলো। তোরা পাগলামি করবি আর  বোনদের সে জন্য মূল্য দিতে হবে। আর পারি না ভাইরে তোদের জ্বালায়।’

আমিতো কইছিলামই আফা, আলিরে বইসা যাবার কন। আমারে দলীয় মনোনয়নটা দ্যান। আপনি দ্যাখতেন যদি চেয়ারমান আমি অবার না পারতাম এই জীবনে আর আপনার সামনে দিয়া হাঁটতাম না।

আচ্ছা না হয় তুই মনোনয়ন পাসনি, কিন্তু একই জায়গা থেকে দুইজন দাঁড়াতে গেলি কেন? আলি নাহয় পাগল বুজলাম, তুই কেন সুস্থ মানুষ হয়ে বাপের টাকা নষ্ট করতে গেলি? টাকা থাকলেই সেটা নির্বাচনে দাঁড়িয়ে নষ্ট করতে হবে?

সে আপনি বুঝবেন না আফা। এলাকার রাজনীতি নষ্ট ওইয়া গ্যাছে। তাছাড়া আপনাগো গুষ্টির সাথে আমাগো কবরে গিয়াও মারামারি করতে হবে। এইবার আপনার ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরতিযোগিতা অয়, পরেরবার আপনার ভাইরবিটার সাথে হবে তার পরে আমার ছাওয়াল আর আলি হায়দারের ছাওয়াল করবে। পরতিযোগিতা অবেই আফা।

কিন্তু তাতে লাভটা কার হবে? এবারওতো মনে হয় বর্তমান চেয়ারম্যানই জিতে যাবে, তোদের দুই বন্ধুর দ্বন্দ্বের কারণেই জিতবে এবার সে। নাহলে সরকারি দলের মনোনয়ন পেয়েও চেয়ারম্যান হতে না পারার দায় আর কারওরই না, তোদের নিজেদের, এই এলাকাবাসীর। কেউই কি তোদেরকে মিলিয়ে দিতে পারলো না?

আপনিইতো পারলেন না। আপনারেইতো কইছিলাম।

ভাইরে তোদের দু’জনের কেউই আমার আপন ভাই না, তাই আমার কথা তোরা কেউই শুনবি না, সেটাই স্বাভাবিক। আলি হায়দারকেও নিষেধ করেছিলাম শোনেনি, তুইও শুনিসনি- ইলোরা শেষবার যখন বাচ্চুর সঙ্গে ওর কথা হয়েছিল তখন বাচ্চু ওকে যে অপমানটা করেছিল তার খানিকটা ফিরিয়ে দিয়ে একটু তৃপ্ত হন। ঠিক তখনই গলা নামিয়ে বাচ্চু বলেন, ‘শোনেন আফা এ্যাহনও সুমায় আছে, আমি বইসা গেলি আলি বাইর হইয়া যাবেনে। কিন্তু আমারওতো এই কয়দিন খরচ-বরচ কম অয় নাই এ্যাহেবারে। আপনি সেইডা আমারে দিয়া দ্যান, আমি বইসা যাই।’

এতক্ষণে ইলোরা বোঝেন এই গভীর রাতে মোটরসাইকেল থামিয়ে কেন বাচ্চু তার সঙ্গে কথা বলল। ইলোরার হঠাৎ মনে হয়, এই পথে এই সময়ে ইলোরা আসবেন সেটা বাচ্চু কী করে জানল? নিশ্চয়ই তাকে কেউ জানিয়েছে ইলোরার কথা। ইলোরা আবারও নিজেকে সতর্ক করে দেয়। তারপর থেমে থেমে বলে, ‘তুই বললি আমি শুনলাম। আমি তোকে জানাবো কাল বা পরশু। বুঝলি? এখন বাড়ি যা, অনেক রাত হয়েছে, ঘুমা গিয়া।’

বেশি দেরি কইরেন না আফা কইলাম। শেষে কিন্তু কোনো কূলই আপনি রাখফার পারবেন নানে। আমি একলা জিতবো নানে, এইটা ঠিক কিন্তু আমি বইসা গেলি আলি হায়দারের জিতার চান্স বাড়ে।

মাত্রতো বললি, আমাকে এবার একটু  ভাবতে সময় দে? তাছাড়া কত কি দিতে হবে সেটা জানতে হবে তো?

কত আর লাখ দশেক দেবেন,  আমারতো এমনিও আপনার উপর হক আছে ছোডো ভাই হিসেবে।

তাতো আছেই, কোনোদিন সেই হক আমি অস্বীকার করেছি নাকি? যখনই পেরেছি আমি করেছি। কেন কাকার চিকিৎসার সময় আমি আমার সাধ্যমতো করিনি? Ñসুযোগ পেয়ে ইলোরাও শুনিয়ে দেন।

বাচ্চু একথার কোনো উত্তর না দিয়ে বলে, চলেন আপনারে আউগেইয়া দিয়া আসি।

না আমাকে এগিয়ে দিতে হবে না। আমি যেতে পারব। কবির আছে সঙ্গে, আর খাল পার হলেই গাড়ি দাঁড়াইয়া আছে। চলে যেতে পারব। তুই বাড়ি যা।

বলেই ইলোরা দাঁড় করানো মোটরসাইকেলটাকে পাশ কাটিয়ে হাঁটার উদ্যোগ নেন। আর তখনই কোত্থেকে যেন আরেকটি মানুষ বেরিয়ে আসে, এতোক্ষণ অন্ধকারের কোথায় দাঁড়িয়ে ছিল লোকটা সেটা ইলোরা ঠিক ঠাহর করতে পারেননি। বাচ্চুর বড় বোনের বর। লোকটা শুরু থেকেই ইলোরাকে নানারকম খোচামারা কথা বলেন। তাকানোর ভঙ্গিও খুউব খারাপ। এই মধ্যরাতে রাস্তা আঁটকে সেই লোকটাই বলে, ‘চলো শালী আমিই তোমারে দিয়া আসি, নাকি আমার সাথে যাবা আমাগো বাড়ি। তোমার বুইন তোমারে নিয়া যাবার কইছে। বাচ্চু তুমি যাও বাড়ি আমি শালীরে বাড়ি পৌঁছাইয়া দেই।’

ইলোরার শরীর জ্বালা করে ওঠে লোকটাকে দেখে। তার উপর আবার লোকটা যেচে তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চাইছে। এতগুলো বয়সে ছোট ছেলের সামনে তাকে ইঙ্গিত করে কথা বলছে, শুনতেও খুউব খারাপ লাগছে ইলোরার। গলায় ঝাঁঝ মিশিয়ে ইলোরা বলেন, ‘থাক এত রাতে আর আপনাকে চড়নদার হতে হবে না। আমি একাই যেতে পারব’Ñ ইলোরা তাকেও পাশ কাটিয়ে পা বাড়ানো মাত্রই লোকটা অন্ধকার থেকে একটি হাত বের করে ইলোরার একটি হাত ধরে ফেলে, ‘আরে রাগ হও কেন তুমি? এত রাইতে এ্যাকলা এ্যাকলা যাবা, ভাবলাম তোমারে সাথে কইরা দিয়া আসি। কুথায় আমারে ধন্যবাদ দিবা, তা না উল্টা চ্যাত দ্যাহাও। এ্যাতো চ্যাত দ্যাহানো কি ভালো কও?’

ইলোরা ঘেমে যাচ্ছিলেন প্রবলভাবে। তাই হাত সামান্য ঝাড়া দিতেই লোকটার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিতে পেরেছেন। তারপর কোনোদিক না তাকিয়েই বলেছেন, ‘এই কবির চল যাই। আর বাচ্চু তোরে বলি, তুই যদি আমার সম্মান রাখতে না পারিস, তোর বোনের সম্মানও তুই রাখতে পারবি না। খোঁজ নিয়া দেখিস, তোর বোন কেমন আছে।’ এটাও ইলোরা একটা খোঁচাই দিলেন ওদেরকে। এই লোকটা আরেকটা বিয়ে করেছে বলে এলাকায় কানাঘুষা আছে। ইলোরা যতটা দ্রুত পা চালিয়ে চলতে শুরু করেন। বাচ্চু মোটর সাইকেল স্টার্ট দেয় আর ওর বোনের বর লোকটা যেমন অন্ধকার থেকে হঠাৎ এসেছিল তেমনই হঠাৎ অন্ধকারেই মিলিয়ে যায়। কিন্তু পুরো বিষয়টা নিয়ে গোটা পথ ইলোরা ভাবতে থাকেন। কী ভাবে ওদের এই সাহস হলো ইলোরাকে পর্যন্ত অপমান করার? কবির হয়তো ইলোরার ভেতরকার এই টানাপড়েন লক্ষ্য করে থাকবে, গাড়িতে উঠেই কবির বলে, ‘আফা আপনি যদি কন তাইলি এক কোপ দিয়া উয়্যার ঘাড় আর মাথা ছেন্ন কইরা দিবার পারি।’

ইলোরা গম্ভীর গলায় বলেন, ‘তোর কিছুই করতে হবে না কবির। তোরা কে কি পারিস না পারিস আমার জানা আছে। আমার যা করার আমি নিজেই করব। কাল বিকেলে হাটখোলায় একটা সভা ডাকার ব্যবস্থা কর তোরা। বাকিটা আমারে করতে দে।’

পথে আসতে আসতে ইলোরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, চার গ্রামের চার মাতুব্বরকে কাল রাতে ডেকে এনে তাদের সঙ্গে দরদাম করবেন ভোটের। ক’টা ভোট তারা দিতে পারবেন আর কত টাকা সে জন্য চান সেটা জেনে নিয়ে তিনি নিজে ওদের সঙ্গে লেনদেন করবেন। যে টাকা তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন তার মধ্যেই কাজ সারার চেষ্টা করবেন না হলে ঢাকায় কাউকে বলে পাঠাবেন আরও কিছু পাঠানোর জন্য। আশাকরি সেটা আর দরকার হবে না। ইলোরা বুঝতে পেরেছেন যে, এবারও আলি হায়দার নির্বাচনে জিততে পারবেন না। কিন্তু ভোটের আগে ময়দান ছেড়ে দিয়ে বলা যাবে না, আলি হায়দারকে দিয়ে সে কাজ করানোও যাবে না।  তবে ইলোরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, কিছু টাকা খরচ হলেও তিনি কিছু কিছু মানুষের মুখোশটা খুলে দেবেন। সেটা তিনি কী ভাবে করবেন সেটা নিয়ে আরও ভাবতে হবে, রাতভর তিনি সেটাই ভাবলেন কেবল। আর মাঝখানে গিয়ে আরও একবার ভালো করে স্নান করলেন। লোকটার শক্ত হাত ইলোরার ফর্সা হাতের ওপর কেটে বসে আছে, সেখানে পাঁচটি আঙুলের দাগ জ্বলজ্বল করছে। বালতি বালতি পানি ঢেলেও ইলোরা সে দাগ মুছতে পারবেন না কিন্তু বালতি থেকে মগ ভরে শরীরে পানি ঢাললে, এক অদ্ভুত ভালো লাগা শরীরময় ছড়িয়ে পড়ে এবং সেটা দ্রুত মনে চলে যায়। প্রায় ভোর হওয়া পর্যন্ত ইলোরা পানিই ঢাললেন শরীরে।

ভোরে উঠে হাতমুখ ধুয়ে আবারও তৈরি হলেন ইলোরা গ্রামে যাওয়ার জন্য। গাড়ি চলে এসেছিল। গ্রামের বাড়ি গিয়ে মেয়েদের দল ভাগ করে তাদের গ্রামে গ্রামে পাঠানো থেকে শুরু করে বিকেল পর্যন্ত সব কাজ একে একে সারলেন। তারপর সঙ্গে করে আনা একটি ধূসর ইঁট রঙা শাড়ি পরলেন, ঘরের অন্ধকার হাতড়ে রাবেয়ার স্টিলের আলমারির পারা ওঠা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টিপ পরলেন, তারপর নিজের ব্যাগ থেকে দামি পারফিউমের শিশি বের করে অর্ধেক বোতল পারফিউম নিজের ঘাড়ের ওপর উপুড় করে দিলেন ইলোরা। তারপর বেরুলেন স্থানীয় হাটখোলায় তার জন্য ডাকা জনসমাবেশে। আলি হায়দারকে সঙ্গে নিয়েই গেলেন মিছিল করতে করতে। বেশি দূরতো নয়, গ্রামের কোণেই, একটা ছোট্ট খাল পার হলেই। কাদার ওপর দুধের সরের এত সাদা সাদা ফেনা। কিন্তু সেই কাদায় ইলোরাকে নামতে হয়নি। ও একটা ভ্যানে চড়ে বসেছিল, ছেলেপেলেরা ভ্যানটি টেনে নিয়ে গেছে হাটখোলা পর্যন্ত। সেখানে লোকে লোকারণ্য। সবাই যে এই এলাকার ভোটার তা নয়। ইলোরার কথা শুনেও কেউ এসে থাকবে এখানে। মঞ্চ-টঞ্চ কিছু নেই। একটু উঁচুমতো জায়গায় কয়েকটি চেয়ার পাতা, সামনে টেবিল রাখা। একটি মাইক আছে, আছে একটি মাইক্রোফোন। স্থানীয় এক ছাত্রনেতা সভা পরিচালনা করছেন। একের পর এক নাম ঘোষিত হচ্ছে, সবাই আলি হায়দারকে ভোট দেওয়ার কথা বলে নেমে যাচ্ছেন। কেউ একটু সময় নিয়েই ইতিহাস বলছেন, বারবার কথা আসছে রাবেয়া আর হায়দার সাহেবের। তারা কতো ভালো মানুষ ছিলেন সেটা প্রত্যেক বক্তাই বলছেন। এটাই ইলোরার খুউব ভালো লাগছে। গরমে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ওর কিন্তু কী করবে ও, সন্ধ্যের আগে তো এই অনুষ্ঠান শেষ হবে না। আলি হায়দারকে বক্তৃতা দিতে বলা হলো। আলি হায়দার স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাদের মতো জ্বালাময়ী গলায় বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন। সে বক্তৃতার কোনো পরম্পরা নেই। নেই কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য। তিনি এই রাস্তাঘাট করেছেন, বিদ্যুৎ বরাদ্দ হয়ে গেছে, এখন এই এলাকার মানুষের কাছে তার দাবি যাতে সরকার ক্ষমতায় থাকতে থাকতে তিনি আরও কিছু কাজ করতে পারেন। পুরো বক্তব্য থেকে কেউ চাইলে এসব কথা বের করতে পারেন কিন্তু সেগুলো বের করার শক্তি যে উপস্থিত অনেকেরই নেই, সেকথা বোঝাই যায়।

কিন্তু ইলোরাকে যখন বক্তৃতা দেওয়ার জন্য ডাকা হলো সভা একেবারে চুপ। ইলোরা আশ্চর্য হলেন মানুষের এই একাগ্রতা দেখে। তিনি ঠিক করেই এসেছিলেন অল্প কথায় অনেকগুলো কথা বলবেন। প্রথমেই বললেন, যে তিনি এখানে ভোট চাইতে আসেননি। তিনি এলাকার মেয়ে না হয়েও এলাকার মান-সম্মান রক্ষা করতে এসেছেন। আলি হায়দারকে তিনি যে বার বার প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন এবং বারই বারই যে আলি হায়দার এই গ্রামে চলে এসেছেন সেটা বলে উপস্থিত মানুষের কাছে তিনি বলেছেন যে, এই মানুষটার হারানোর আর কিছুই নেই, সবই তিনি হারিয়ে ফেলেছেন নির্বাচনের পিছনে। এবার যদি হেরে যান তাহলে তাকে পথে বসতে হবে চিরতরে। কিন্তু সেতো ব্যক্তিগত ক্ষতি, আলি হায়দারের। ইলোরা চাইলেই একটু কষ্ট করে হলেও সে ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারবেন আলি হায়দারের। কিন্তু আলি হায়দার হারলে এলাকার কী ক্ষতি হবে? যে রাস্তাটা আসার কথা ছিল সেটা আসবে না। যে বিদ্যুৎ আসার কথা ছিল সেটা আসবে না। এখনও একবারও বর্তমান চেয়ারম্যান এই এলাকায় আসেননি, তিনি নির্বাচিত হয়েও এদিকে আসেন না কারণ তার এই এলাকার মানুষের ভোটের প্রয়োজন নেই, তিনি পুব দিকের মানুষ, পূব এলাকা থেকেই তিনি ভোট উঠিয়ে নেন এবং সেখানকার মানুষের জন্যই তিনি কাজ করেন। এই পশ্চিম এলাকা তাই অবহেলিত, বরাবর ছিল, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। তারপর ইলোরা বললেন, এই এলাকার মানুষের ভেতরার অনৈক্যের কথা। কেন একজন প্রার্থী থাকার পরও আরেকজনকে দাঁড় করানো হলো একই এলাকা থেকে এবং সে জন্য ওই প্রার্থী কার কাছ থেকে কত কি পেয়েছে সেটা খোঁজ নিয়ে দেখার কথা বলেই ইলোরা তার হাতে থাকা বোমাটি ফাটালেন, বললেন, ‘সেই প্রার্থী কাল রাতে আমার কাছেও এসেছিলেন, বলেছেন টাকা দিলে তিনি সরে দাঁড়াবেন। এলাকার উন্নয়ন-টুন্নয়ন তার কাছে কিছু নয়, এই অবহেলিত মানুষ তার কাছে কোনো মাইনে রাখে না, সে টাকা চেনে, শুধু টাকা। কার কার কাছ থেকে এই নির্বাচনের জন্য সে টাকা এনেছে আপনারা খোঁজ করে দেখুন। কিন্তু আমি পরিষ্কার ভাষায় বলে দিতে চাই, আমি তাকে এক পয়সাও দেবো না। তাতে আলি হায়দার নির্বাচনে জিতুক বা হারুক আমার কিছুই এসে যায় না। কিন্তু এই অসৎ মানুষকে তার অসততায় আমি উৎসাহ দিতে পারি না, দিবো না। আপনাদের একথা আমি আজ জানাতে চাই যে, আমার মায়ের মিলাদের দিনও তারা রাজনীতি করতে ছাড়েনি। তাদের গোষ্ঠীর কাউকেই আমার মায়ের মিলাদে আসতে দেয়নি তারা। কিন্তু গভীর রাতে আমি নিজে হাতে মালসা ভরে গোস্তের তরকারি আর ভাত পাঠিয়েছি তাদের বাড়িতে, তারা কিন্তু সেগুলি ঠিক খেয়েছে, সেটা ফিরিয়ে দেয়নি। তাহলে গোষ্ঠীর বাকি মানুষ কী দোষ করেছিল? তাদেরকে কেন খেতে দেওয়া হলো না একবেলা ভালোমন্দ? যে মানুষগুলা শুধুমাত্র তাদের নিজেদের পেট নিয়ে ভাবে তারা মানুষের কথা ভাববে কী করে? যারা নিজেদের গোষ্ঠীর মানুষকেই অভুক্ত রেখে নিজেরা গোস্ত খায় তারাতো সুযোগ পেলে জনগণের পেটের ভাত, পরনের কাপড়, থাকার বাড়িঘর সব কেড়ে নিতে পারে’- ইলোরার গলার স্বর চড়া হতে থাকে। প্রতিটি বাক্যের শেষে মানুষের করতালি শোনা যায়। একেবারে শেষ বাক্যে ইলোরা বলেন, ‘আপনারা চেয়ারম্যান আলি হায়াদরাকে বানাবেন বটে, কিন্তু পেছন থেকে কাজ করবে অন্য কেউ। তার যা কিছু আছে তাই-ই দিয়া সে আপনাদের সেবা করবে, চেয়ারম্যান হয়ে আলি হায়দারকে আপনাদের জন্য বরাদ্দ করা গম বিক্রি করতে হবে না, সেই গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি আজ।’

সন্ধ্যে হয়ে যায়। কিন্তু গ্রামে তো অত মসজিদ নেই, থাকলেও তাতে মাইক নেই। মাইক থাকলেও বিদ্যুৎ নেই। তাই বোঝা যায় না সন্ধ্যেটা খুউব ভালো করে। এখানে-ওখানে অন্ধকার জমাট বাঁধা। আবার এক হাঁটু কাদা ঠেলে বাড়ি ফেরা সকলের। কী কঠিন এক জীবন এখানে। প্রত্যেক মানুষের পায়ে ঘা, মাটির ভেতর বসবাসকারী ঘুঘরা পোকার কামড়ের দাগ প্রত্যেকের পায়ে। রাত হলে তুঁতে গুলিয়ে গরম করে প্রত্যেকে পায়ে মাখে, নাহলে ঘুমাতে পারে না। ব্যথায় কাতরায়। আবার সকাল হলে সেই মাটিতে নামতে হয়। এখন ট্রাক্টরে চাষ হয় ঠিকই, এখন আর আগের মতো হাল বাইতে হয় না কৃষককে জোড়া বলদ দিয়ে কিন্তু তাতে কি? জীবনের কী বদল হয়েছে? ইলোরা এখনও এই গ্রামের নারীদের দেখে আর অবাক হয়। তাদের জীবনে বদলের মধ্যে শুধু এই গ্রাম থেকে কয়েকটি মেয়ে পেটের তাগিদে ঢাকার আশুলিয়ায় গিয়ে গার্মেন্টস কারখানায় কাজ নিয়েছে। তারাই মাঝে মাঝে ঈদের চাঁদে বাড়ি আসে ঢাকার গন্ধ নিয়ে। নতুন ধরনের পোশাক আশাক তাদের পরনে। চোখে স্বপ্ন, নতুন জেলার মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের গল্প তাদের মুখে। কিন্তু ছুটি শেষে ফিরে যাবার সময় আসে তারা যেতে চায় না, একদিন দেরি করে, দু’দিন দেরি করে, শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে যেদিন ওদের রওনা দিতে হয় সেদিন নাকের জল চোখের জল এক হয়ে যায়। নির্বাচন উপলক্ষে সেই মেয়েরাও এসেছে ঢাকা থেকে।

বিভিন্ন জায়গায় যারা চাকরি-বাকরি করে তারাও এসেছে ভোট দিতে। কিন্তু ভোটের হিসেব অন্য জায়গায়। রাতভর শুয়ে শুয়ে ইলোরা এসবই ভাবছিলেন। ভোটের আগের দিন রাতে নানা জায়গা থেকে নানান রকম খবর আসতে থাকে। উপজেলা নির্বাহীকে নাকি এত টাকা দেওয়া হয়েছে যে তার মুখে বর্তমান চেয়ারম্যান ছাড়া আর কোনো কথা নেই। আলি হায়দার লোক মারফত তার জন্য একটা প্যাকেট পাঠিয়েছিলেন কিন্তু তিনি সাফ বলে দিয়েছেন যে, তার কোনো কিছু লাগবে না। যতটুকু করার তিনি এমনিই করবেন। ইলোরা ম্যাডামের ভাই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে, তার জন্য কি কিছু করার দরকার আছে? এমনিতেই সে জিতে আসবে। থানার ওসি সাহেব নতুন এসেছেন, তিনি এলাকা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন বোঝেন বলে মনে হয় না। তার ভাবটা আলগা গা-ছাড়া। বাসায় এসে একদিন খেয়ে গেছেন, বলে গেছেন যে কোনো কাজেই তিনি থাকবেন। কিন্তু কিসের কী কাজ? ওসি সাহেবকে ফোন করলে ফোন ধরেন না, কিন্তু ফিরতি ফোন করেন রাতে। বলেন যে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের দুই দিন আগে গ্রামভিত্তিক মাতব্বরদের ডেকে এনে আলি হায়দার তাদের হাতে একেকটি প্যাকেট তুলে দিয়েছেন। গোপনে আলি হায়দারের স্ত্রী মোবাইল ফোনে সেসবের ভিডিও তুলে রেখেছে। সবদিকই মোটামুটি সামাল দেওয়া হয়েছে এখন অপেক্ষা ভোটের দিনের আর ফলাফলের। কিন্তু ইলোরা কেন যেন ফলাফল আঁচ করাতি পারেন এবং সেটা পেরে নিজের ভেতর নিজেই ভেঙে পড়েন। ইলোরাকে ফোন করেছিলেন র‌্যাবের সেই অফিসার ভদ্রলোক, নির্বাহী অফিসারের অফিসে যার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। বললেন, ‘ম্যাডাম একটা কথা বলতে চাই, যদি কিছু মনে না করেন।’

ইলোরা বললেন, ‘নিশ্চয়ই, বলুন’।

আমাদের কাছে মাঠ পর্যায়ে চালানো জরিপ আসছে। আপনার ভাই তিন নাম্বারে আছে জরিপে। বর্তমান চেয়ারম্যান জিতে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। আর দ্বিতীয় হবে সাবেক চেয়ারম্যান। আপনার ভাই তৃতীয় আর বাচ্চু শিকদার চতুর্থ। আমরা এই ফলাফল বদলাইতে পারব না। আমাদেরকে ফোন করেছিল উপর থেকে। কিছু করা যায় কিনা জানতে চেয়েছিল। কিন্তু কী ভাবে করব ম্যাডাম? সেকেন্ড টেকেন্ড হইলে না হয় কিছু করা যাইতো।

না না কী আর করবেন আপনারা?- ইলোরা অফিসার ভদ্রলোককে সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি ভাঙতে থাকেন। তিনি নিজেও জানতেন একথা, কিন্তু কোথাও হয়তো এ বিশ্বাসও তার ছিল যে, সরকারি দলের মার্কা থাকায় এবার হয়তো ফলাফল ভিন্ন হতেও পারে। কিন্তু এই অফিসারের কথাই বা ফেলে দেন কী করে? ইলোরা কারও সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেন না, তিনি জানেন এসব কথা কাউকে তিনি বিশ্বাস করাতে পারবেন না। ভোটের আগের রাতে ইলোরা নিজেও ঘুমুতে পারেন না, ছেলেকে ঘুম পারিয়ে আলি হায়দারের স্ত্রীও সারারাত জেগে থাকে আর আলি হায়দার বাড়ি ফেরেন ভোর রাতে। তাকে দেখতে হয় এক্ষুনি পড়ে যাবে। সারা শরীর কাদায় মাখানো। পাঞ্জাজাবীটা ময়লা, চুলগুলো উস্কখুস্কÑ একটা ভাঙাচোরা মানুষের মতোন দেখায় আলি হায়দারকে। মায়া হয় ওর জন্য ইলোরার আর হয় অক্ষম এক রাগ। এর মধ্যে না গেলেও ও নির্বিঘ্নে ওর জীবন পার করতে পারত। কিন্তু ওকে এই ভয়ঙ্কর খেলায় নামতেই হয়েছে। কিছু বললেই দশ কথা শোনাবে, আর আজকে, ভোটের আগের রাতে কিছু বলার মতো শক্তিও নেই ইলোরার। একটু আগেই যে কথা শুনেছেন তিনি তারপর আর নতুন করে কিছুই ভাবতে পারছেন না ইলোরা। বিছানায় কোনো মতে শরীরটা এলিয়ে রাখেন ভোরের অপেক্ষায়। হাল্কা আলো ঘরের ভেতর, পাশে একটি শিশু ঘুমিয়ে আছে, ঘুমের ভেতরই হাসছে সে অবিরত। ও জানেও না ওর চারপাশে বড় মানুষেরা কী সব কা- করে চলেছে। থাক যতদিন না জেনে থাকতে পারে, ততোদিনই এই হাসি থাকবে, জানলে এই হাসি আর থাকবে না। ইলোরা তাকিয়ে থাকেন ঘুমন্ত শিশুটির মুখের দিকে। ওরও চোখ একটু বুজে আসে।

 

সব শেষ এবং নতুন শুরুর আগে

তিনি এলাকার ভোটারও নন। তাই ভোটের দিন সকাল বেলা ইলোরা গ্রামের বাড়ি গিয়ে সারা গ্রাম হেঁটে নারীদের দলে দলে ভোট কেন্দ্রে পাঠানোর চেষ্টা করেন। কেউ যায় কেউ যায় না। কেউ হাসে, কেউ বলে, ‘সবাইরে দিলা মা আমরা কি দোষ করছি? আমাগো তো দিলা না কিছু?’

কি দিয়েছি চাচি?

হুনছি তুমি বস্তা ভইরা টাহা আনছো আর হগ্গুলিরে দিছো। আমাগো ভোট নাই? আমাগো দিবা না?

ইলোরা জানে এরকম গল্প চাউর হয়ে গেছে। ওর কিছুই করার নেই এসব গল্প নিয়ে। সঙ্গে থাকা হাত ব্যাগে এক গাদা একশ’ টাকার নোট ছিল, সেখান থেকে দুটি একশ’ টাকার নোট বের করে মহিলার হাতে দিয়ে ইলোরা বলেন, ‘চাচি বিশ্বাস করেন এই প্রথম এই নির্বাচনে আমি নিজের হাতে কাউকে কিছু দিলাম। আমি ভোট কেনা-বেচায় বিশ্বাস করি না। সেটা আমার নীতির সঙ্গে যায় না’- একথা বলেই ওর মনে হলো আসলেতো নীতির সঙ্গে অনেক আপসই ইলোরা করেছেন এবং প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছেন। এই নির্বাচনে তার থাকারই কথা নয়। তিনি কোনোভাবেই এর একটি পক্ষ হতে পারেন না। কিন্তু তিনি বাধ্য হয়েছেন। কিছুটা ভাইয়ের জন্য তার স্নেহে, কিছুটা রাবেয়াকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, কিছুটা পরিস্থিতির কারণে। কিন্তু নির্বাচনে তার জড়িয়ে পড়াটা দূর থেকে, সামান্যই অংশগ্রহণ এতে তার স্বতঃস্ফূর্ত, সবটাই কেমন যান্ত্রিক আর দায়িত্ব পালন করে যাওয়া। একথা সত্য যে, নির্র্বাচনের পরে এবারও আলি হায়দার ওর স্ত্রীকে নির্বাচনে কোনো কাজ না করার জন্য গালিগালাজ এমনকি মারধরও করতে পারেন, ওকে দিয়ে কিছুই বিশ্বাস নেই। এটা ভেবেও ইলোরা কিছু কাজ করেছেন যেটা ওই মেয়েটার করার কথা ছিল। বাচ্চাটাকে নিয়ে মেয়েটার পক্ষে এসব করা সম্ভবপর ছিল না। কিন্তু যারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাদেরকে এক ধরনের পাগলামিতে পেয়ে বসে, তারা কোনো দিক বিবেচনা করে না, কেবল নিজের দিকটাই দেখে, নিজের কথাই ভাবে এই নিজের দিক দেখা, নিজের কথা ভাবাটা নির্বাচনের পরও বজায় থাকে, এমনকি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও নিজেকেই কেবল সে দেখেশুনে রাখে, ভোটাররা তখন গৌণ হয়ে যায়। আর হারলেতো তাকে বাধ্য হয়েই নিজের কথা ভাবতে হয়, আশপাশে তখন আর কেউ থাকে না তার। কখনও তাকে দেশছাড়া হতে হয়, নয়তো তাকে রাস্তায় চলতে হয় মাথা নিচু করে। ইলোরা ভাবেন, এরপর আলি হায়দার কী করবেন? তার সামনে তো আর কোনো পথই খোলা থাকছে না। নাকি থাকছে?

ইলোরা ভোটের দিনদুপুর বেলা থেকেই এই ভাবনা ভাবতে থাকেন। তিনি চলে এসেছিলেন গ্রাম থেকে। উপজেলা শহরের বাসার দোতলায় তিনি বসে আছেন। একের পর এক খবর আসছে তার কাছে। কোথাও থেকে খবর আসছে জাল ভোটের, কোথাও থেকে ভোট গ্রহণ বন্ধ হওয়ার আর বেলা দু’টোর দিকে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর খবরটি আসে ইলোরার কাছে। ইউনিয়নের একেবারে মাঝখানে একটি সেন্টার আছে। বলা হয় এই সেন্টারে যে বেশি ভোট পাবে সেই-ই নির্বাচনে বিজয়ী হয়। তাই সকলের নজর থাকে সেই সেন্টারের দিকে। সেখানে খুউব গ-গোল হয় প্রতিবারই। এবারও ভোটকেন্দ্র দখল করার জন্য সকল পক্ষ মরিয়া। কিন্তু ওপর থেকে নির্দেশ আছে সেটা কাউকে করতে দেয়া যাবে না। এমনিতেই সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে সরকারকে আর নির্বাচন কমিশনকে মানুষ ধুয়ে দিচ্ছে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতে গিয়ে দেশময় খুনোখুনি ছড়িয়ে পড়েছে বলে বিদেশি গণমাধ্যমেও খবর বেরিয়েছে। সরকার তাই শেষ দিকে এসে কোনো নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় না। সেই কেন্দ্রেই যখন দলবল নিয়ে আলি হায়দার প্রবেশ করতে যান তখন অপর পক্ষ থেকে একদল যুবক তাদের ওপর চড়াও হয়। আলি হায়দারের সঙ্গে থাকা তিনটি ছেলেকে কুপিয়ে যখম করা হয়েছে, আলি হায়দারের মাথা ফেটে গেছে বলে খবর আসে। তাকে কেন্দ্রের পাশেই কোনো একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ইলোরা কী করবেন ঠিক বুঝতে পারেন না। ওসিকে ফোন করেন। জানতে চান ঘটনা। ওসি হাসতে হাসতে বলেন, ‘আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাডাম, নির্বাচনে এরমই হয়। নির্বাচন করতি গেলি দু’একটা কোপ-কাপ খাতিই অয়।’ এরপর এই লোকের সঙ্গে আর কোনো কথা চলে না। ইলোরা একে তাকে ফোন করে খবর নেওয়ার চেষ্টা করেন কিন্তু একেকজন তাকে একেকরকম খবর দেন। এসব খবর নিয়েই তিনি অপেক্ষা করেন বাসায়, এর বেশি কীইবা করার আছে তার।

ভোট গ্রহণ শেষ হয়। ভোট গণনার জন্য ব্যালট বাক্সগুলো সেই দুর্গম এলাকা থেকে এখান পর্যন্ত নিয়ে আসাটা তো একটা পরীক্ষার মতো। নিশ্চয়ই সরকারের লোকজনের সে অভিজ্ঞতা আছে। ওদের বাসার সামনে দিয়ে উপজেলা অফিসে যাওয়ার রাস্তা, সেখান দিয়ে বর্তমান চেয়ারম্যানের সমর্থকরা মিছিল নিয়ে যায়। বোঝাই যায় ওরা বিজয়ের ইঙ্গিত পেয়েছে। সন্ধ্যের মুখে ঝরে পড়া পাখির চেহারা নিয়ে বাড়ি ফেরেন আলি হায়দার। জামাকাপড় না ছেড়েই বিছানায় শুয়ে পড়েন। কপালের কাছটা কেটে হা হয়ে আছে, ব্যান্ডেজটাও করা হয়নি। ঘাড়ের কাছটা ফুলে নীল হয়ে আছে। কোনো কিছু দিয়ে হয়তো ওখানে আঘাত করা হয়েছে। কবির গেছে হাসপাতালে, ওর বড় ভাই কোপ খেয়েছে। পাঁচটি ছেলের সেখানে চিকিৎসা চলছে, একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। একজন ডাক্তার এখানেও দরকার। কিন্তু কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না একজন ডাক্তার ডেকে আনার মতো। বাড়িটা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে আছে, অথচ এই দুপুরে এখানে গম গম করছিল কতো মানুষ এসে। নির্বাচনের ফলাফল কেন্দ্রেই জেনে যায় মানুষ, রাত আটটা ন’টা পর্যন্ত আর কাউকে অপেক্ষা করতে হয় না। কিংবা ফলাফল নিয়ে তাদের আগ্রহ আসলে কমই। যে জেতে সে নিজেই জেতে, মানুষ হয়তো এই সত্যটা জানে, তাই জয়-পরাজয় নিয়ে তাদের তেমন কোনো উচ্ছ্বাস বা হাহাকার থাকে না।

আলি হায়দারের স্ত্রীই শেষ পর্যন্ত একজন ডাক্তারকে ডেকে আনেন। তিনি এসে কপালের কাটা জায়গায় সেলাই দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেন। ব্যথানাশক ট্যাবলেটের সঙ্গে আরও কিছু ওষুধ দেন। একটা কিছু খাওয়ানোর পর সেগুলো খাইয়ে দিতে বলেন। আলি হায়দার নিজে না খেলে তাকে কেউ কোনোদিন কিছু খাওয়াতে পারেন না, সে সাধ্য কারওরই নেই। রাবেয়ারও ছিল না। সামনে কিছু খাবার আর পানি রেখে দেয় আলি হায়দারের স্ত্রী। খাবারটা সরিয়ে রেখে ওষুধগুলো খেয়ে নেন আলি হায়দার। তারপর চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকেন। ঘুমিয়েও পড়েন বুঝি।

ঘরের ভেতর ইলোরা হায়দার আর আলি হায়দারের স্ত্রী, যার নামোল্লেখও আমরা এ পর্যন্ত করিনি কারণ তার প্রয়োজন হয়নি। তিনি এখানে খুব সামান্য ভূমিকার একজন মানুষ। আমরা যদি গভীরভাবে জানতে চাইতাম তার পরিচয়, হয়তো জানতে পারতাম কিন্তু তাতে ঘটনাপ্রবাহে কোনো কিছু যোগ বা বিয়োগ হতো না। এই পরিবারের নতুন অতিথিটি তার মতো করেই ঘুমাচ্ছে। একটু পরেই তার ওঠার কথা, উঠেই দুধ খেতে চাইবে সে। আলি হায়দারের স্ত্রী সেজন্য অপেক্ষায় আছে। আর ইলোরা বসে বসে ভাবছেন আর একটি নির্বাচন চলে গেলো। তিনি খুউব কাছ থেকে দেখলেন গণতন্ত্রের প্রক্রিয়া। তিনি কি একে গণতন্ত্র বলতে পারেন? বলা যায়? তার শিক্ষা, তার দীর্ঘ বিদেশবাস সবকিছুই তাকে একজন ভিন্ন মানুষ হিসেবে তৈরি করেছে। কিন্তু সে তো ব্যক্তি হিসেবে ইলোরা হায়দার, যদি সমগ্রের মধ্যে নিজেকে ফেলে ইলোরা ভাবেন তাহলে তিনি এই প্রক্রিয়ার কোথাও কি নিজেকে ফেলতে পারেন? বাইরে অন্ধকার, গাঢ় অন্ধকার। বিদ্যুৎ চমকালে অন্ধকার ফুঁড়ে আলো ছিটকে বের হয়ে আসে, পৃথিবীকে দেখা যায়, কিন্তু সে তো মুহূর্তের জন্য মাত্র। পৃথিবীকে এত অল্প সময় দেখে কিছু বোঝা যায় না। তবে আজ রাতে বৃষ্টি হতেও পারে, ইলোরার মনে হয়।

ঠিক তখনই ইলোরার মোবাইলটা বেজে ওঠে। ওপাশে ওসির গলা, ‘ম্যাডাম থানা থেকে ওসি বলছি। আপনার ভাইকে বলেন বাসায় না থাকতে। অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে বলেন। আমাদের কাছে এই মাত্র কেস ফাইল করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। তাকে গ্রেফতার করতেই হবে আমাদের। বাসায় থাকতে না করেন তারে, কিছুক্ষণ পরই আমরা আসবো আপনাদের বাসায়।’ ইলোরা বুঝতে পারেন না, তিনি কি ওসির প্রতি কৃতজ্ঞ হবেন নাকি ওসিকে বলবেন, আপনার কাজ আপনি করুন, এটা বলে আমাকে সাবধান করছেন কেন? কিন্তু ইলোরা এই শেষোক্ত বাক্যটি বলতে পারলেন না। ফোনটি রেখে আলি হায়দারের স্ত্রীকে বললেন কাপড়চোপড় গোছাতে। তারপর নিজের ড্রাইভারকে ফোন করে গাড়ি আনতে বললেন পাশের বাড়ি থেকে। তারপর মাত্র মিনিট খানেকের মাথায় আলি হায়দার, তার স্ত্রী ও শিশুসন্তানকে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন ইলোরা। বেরুনোর আগে বাড়িটি ভালো করে তালাবদ্ধ করে আলি হায়দারের শালার হাতে চাবিটি দিয়ে তাকে এসে পরিবার নিয়ে একটি কামরায় থাকতে বললেন। সেই মুহূর্তে এর বেশি কিছু আর করার ছিল না, করার মতো সময়ও ছিল না।

ঘুমের ওষুধেই হয়তো আলি হায়দার গাড়িতে উঠেই আবার ঘুমিয়ে পড়েছেন। শিশুটিও খেয়েদেয়ে ঘুম। ঘুম নেই শুধু গাড়ির ভেতর যাত্রীবেশী দুই নারীর। চালকও ঘুমায়নি, সে ঘুমিয়ে গেলে গাড়ি চালাবে কে? চালককে দেখেই ইলোরার মনে হলো, কাউকে না কাউকে কোথাও না কোথায় আসলে জেগে থাকতে হয়, নাহলে গাড়ি চালাবে কে? আলি হায়দারের নির্বাচন পর্বের এখানেই শেষ হতে পারতো কিন্তু এর অভিঘাত আলি হায়দার ও তার পরিবারের জীবনে আরও দীর্ঘ। আমরা সে গল্পও জানবো, গণতন্ত্রের গল্প আমাদের জানা থাকা দরকার।

 

লেখক : কথাশিল্পী

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares