নতমুখে কোলাহল : প্রশান্ত মৃধা

উপন্যাস

নতমুখে কোলাহল

প্রশান্ত মৃধা

 

সাইকেল চালাতে একটু কষ্ট হচ্ছে রণজয়ের, তবু সে খুশি! যাক, এতদিনে রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে। দেপাড়া থেকে ভাসার হাটখোলা পর্যন্ত রাস্তা আগে ইটলাছা ছিল। সে রাস্তা ভাসা থেকে খানিক দক্ষিণ-পশ্চিমে। রণজয় ইস্কুল থেকে বেরিয়ে সাইকেলে উত্তর-পুবে ভাসার হাটখোলায় এসেছে। কচুয়ার দিকে দক্ষিণমুখী এ পথ রাস্তাখালের গোড়া পর্যন্ত, তারপর পুবে ঘুরে কাউন্সিল পর্যন্ত। মাঝখানে ছোটো রাজবাড়ির সামনে রাস্তার পাশে জমিদারদের বিষ্ণু ও শিবমন্দির, তারপর বামে ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিস। মন্দির ও কাউন্সিলের পাশের রাস্তা সমান্তরালে শপথকাঠির খাল। কাউন্সিলের সামনের পোল পার হয়ে মঘিয়া হাইস্কুলের পর থেকে এঁকেবেঁকে দক্ষিণে উপজেলা সদরের বেইলি ব্রিজ পর্যন্ত গেছে এই রাস্তা। পুরোটাই কিছুদিন আগেও কাঁচা ছিল। খাল সমান্তরাল রাস্তাটা আরও সরু হয়ে সম্মানকাঠি হয়ে বলেশ্বরের কূল ধরে আন্ধারমানিক গেছে। বড়োপুকুরিয়া থেকে কচুয়া যেতে এ পথে যাতায়াতের দরকারও পড়ত না। তাদের মল্লিকবাড়ির পাশ থেকে একটু পশ্চিমমুখে গিয়ে তারপর দক্ষিণে কাউন্সিলের গায়ে মিশেছে যে রাস্তা- সে পথে যাতায়াত করত। এদিকে ভাসার হাটে আসার সময়ে বড়োপুকুরিয়ার খাল সমান্তরাল রাস্তা ধরে বটগাছতলায় এসে তারপরে উত্তরে পোনে এক মাইল। এখন এই রাস্তায় ইট বসানো হলে বর্ষার সময়ে কচুয়ায় যাওয়ার জন্যে গ্রামের সবার এটাই হবে সবচেয়ে সহজ পথ। তখন মল্লিকবাড়ির পাশের হরিসভা মন্দিরের দিকের রাস্তায় ধীরে ধীরে কম পা পড়বে।

হোক, তবু এই রাস্তার কাজ তো শুরু হয়েছে। এতদিনে এটা হোক আর ওটা হোক একটা রাস্তায় বর্ষাকালে হাঁটু না তলিয়ে যাওয়ার উপায় ছিল না। রণজয় শিক্ষক মানুষ। বিএ-বিএড পাশ। তার পক্ষে অমন বর্ষা কাদায় প্যান্ট গুটিয়ে স্কুলে যাওয়া যে কী কষ্টের, তা যারা প্যান্ট না পরে তাদের সে কোনওভাবে বোঝাতে পারবে না। যারা লুঙ্গি পরে তারা চাইলে সেটা গুটিয়ে নিতে পারে। কাছাও দিতে পারে হাঁটুরও উপর পর্যন্ত কাদার তলানো পথে। অথচ প্যান্ট একবার গোটালে ইস্তিরি চলে যায়। কয়লার আগুনে টেবিলের উপর কাঁথা রেখে ইস্তিরি করতে কী কষ্ট! তাছাড়া প্যান্ট পরার পরে তা যদি ওভাবে গুটিয়েই বাড়ি থেকে বেরুতে হবে তাহলে পরার দরকার-ই-বা কী? কিন্তু রণজয় তো নিরুপায়। কতদিনের অভ্যাস। চাকরিতে একদিনও সে পাজামা পরেও যায়নি। একটু গাঢ় রঙের প্যান্ট আর সাদা অথবা হালকা কোনও রঙে শার্টই সে পরেছে বরাবর। কাদায় সাইকেল নিয়েও বেরোবার উপায় নেই, সাইকেল ছাড়া এই প্রায় মাইল তিনেক পথ যেতে সোয়া ঘণ্টা সময় যায়। এখন বর্ষাকালে কোনওভাবে বটগাছের গোড়া পর্যন্ত সাইকেলটা আনতে পারলেই হলো। তারপর আর কষ্ট নেই!

ভাসা থেকে বটগাছতলার কালভার্ট পর্যন্ত মাটি খুঁড়ে ইট লাছার উপযোগী করার জন্যে রাস্তা এবড়োখেবড়োÑ কষ্ট করে সাইকেল চালিয়ে বাড়ির দিকে আসতে আসতে রণজয় বেশ খুশি। সাধারণত তাকে বিকেলের দিকে বেশ ক্লান্ত লাগে। চুলে ও ঘাড়ে ঘাম জমে আর এতটা পথ সাইকেল চালানোয় সে হাঁপায়ও। কিন্তু এখন এত কষ্টের পর বটগাছতলা থেকে প্রায় ঢাল হয়ে নামা গ্রামের রাস্তায় ঢুকে সে সাইকেল থামায়। এখন রাস্তা তার পিছনে। দুই দিকের মাঠে কেউ নেই। আজ বৃহস্পতিবার। রণজয় একটু আগে স্কুল থেকে বেরিয়েছে। প্রতি বৃহস্পতিবারই সে আগে বেরোতে কষ্ট করে। অ্যাসিসটেন্ট হেডমাস্টার হিসেবে আগে সে সুযোগ পেলেও হেডমাস্টার হওয়ার পর নানান কাজে দেরি হয়। স্কুলের কাছাকাছি থাকলে হয়তো আগে বের হওয়া সম্ভব হতো, কিন্তু এত দূরে থাকে, সব খোঁজ নিয়ে, হেডক্লার্ক ও নাইটগার্ডকে বুঝিয়ে বেরুতে তার দেরি হওয়া স্বাভাবিক। বেলা বিকালের দিকে পড়েছে সবে। কিন্তু এতটা হেলে যায়নি যে এখনই মাঠের তরমুজ-বাঙ্গি গাছের গোড়ায় জল দিতে কেউ আসবে।

পিছনে বটগাছতলার রাস্তা রেখে গ্রামের দিকে মুখ ফিরিয়ে সাইকেলের উপরে বসে রণজয় দুপাশে তাকিয়ে ভাবে, গ্রামে ঢোকার এই রাস্তাটায়ও একসময়ে ইটবিছানো হবে। রণজয়ের বামে খাল। এই খালটা তার পিছনের রাস্তার কালভার্টের নীচ দিয়ে একদিকে নাটাইখালি হয়ে ভাসার হাটখোলার পাশ থেকে বলেশ্বরে পড়েছে, অন্যদিকে গেছে তালেশ্বর হয়ে বাগেরহাটে। এ খালে ছোটো পানসি বেয়ে নাটাইখালি ইস্কুলে পড়তে গেছে দলবেঁধে। এক নৌকায় দুই-তিনজন। তখন ইস্কুলের সামনে বড়ো খালে কত নৌকা বাঁধা থাকত। সবগুলো প্রায় একই রকম দেখতে, তাও তারা দেখে চিনতে পারত। সে যখন উপরের ক্লাসে, তখন তার সঙ্গে যেত শ্রীধর-গুণধর ও কৃপাসিন্ধুÑ সব কটাই নীচের ক্লাসে, তবে হাই স্কুলে। অন্য নৌকায় সুনীল স্বপন লালমোহন। বাকি সব নাম সে মনে করতে চায় না। তবে সুনীল কখনও কখনও পরিতোষের নৌকায় যেত অথবা এই বটগাছ তলার গোড়ায় এসে খাঁবাড়ির সরোজের নৌকায় উঠত। সরোজের সঙ্গে সুনীল আর শ্রীধরের সব সময়েই খাতির। আজও বহাল। শুধু সরোজ এখন যাত্রাদলে কোথায় নড়াইল কি মেহেরপুর কি যশোর খুলনা কোথায় না কোথায় প্রম্পট মাস্টারি করে।

রণজয় সাইকেল থেকে নামে। সাইকেলটা স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে ডানে খালের উলটো পাশে দক্ষিণমুখী হয়ে তাকায়। রাজবাড়ি পর্যন্ত চোখ যায় না। মাঝখানে মাহাতাব চেয়ারম্যানের বাড়ি, মুসলমানপাড়ার শুরু। মাহাতাব কাকা এখন আর বাড়ি থেকেই বের হতে পারে না। খালের দিকে ঘুরে সামনের মাঠের পর খাঁবাড়ির সীমানায় তাকায়। এখান থেকে সরোজদের বাড়ির স্মৃতিমঠ চারটে দেখা যাচ্ছে। খাঁবাড়ির পাশ থেকে যে রাস্তাটা ভাসার দিকে গেছে, সেখানেও কাজ শুরু হবে নাকি?

 

দুই

আশালতার বাপের বাড়ির একটা জমি নিয়ে অনেকদিন ধরে কেস চলেছে। তার ভাইয়েরা ধৈর্য ধরে কোর্টকাছারি করেছে। আশালতার মামাতো ভাইয়েরা যখন মামলা ঠোকে তখন কোর্ট উপজেলায় থাকায় চালানো সহজ ছিল। তারপর আবার জেলা সদরে গেলে, সেখানে যাওয়া আসা এসব ঝাক্কি পুইয়েছে। এই ব্যাপারে কৃপাসিন্ধুর মামাতোভাই অর্থাৎ আশালতার বড়োভাইপো রতন বেশ ঝানু। দীর্ঘদিন ধরে শহরে থাকে, কিছুদিন হয় এক উকিলের মহুরিও হয়েছে। সে-ই সব ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে মামলা চালিয়ে গেছে। সম্প্রতি আশালতার ভাইয়েরা কোর্টের নির্দেশে সে জমি বুঝে পেয়েছে।

মায়ের পৈতৃক জমি হলে আশালতার ছেলে হিসেবে কৃপাসিন্ধুর তা নিয়ে কোনও কথা বলতে পারত না। কিন্তু এখানে বিষয়টা একটু জটিল আর অনেকদিন আগের। আশাতলার বড়ো মামা বিয়েথা করেনি। মথুয়াপন্থী হয়ে গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতেই বহুদিন কাটিয়ে তারপর বাড়ি ফিরলে তার ভাগের সম্পত্তির নিয়ে ভাইপোদের সঙ্গে বিবাদ হয়। তার মনে হয়, ওই সম্পত্তির জন্যে ভাইপোরা তাকে মেরেও ফেলতে পারে। শোনা যায়, তেমন ঘটনাও নাকি ঘটেছিল। সেই ডঙ্কা পিটিয়ে উন্মাত্তাল গান গাওয়া আর হরিধ্বনি দেওয়া লোকটাকে তারা নাকি বিষ খাইয়েছিল। কিন্তু তার দীর্ঘদিন ধরে নেশা করার অভ্যাস। সে আফিম খেত, ভাঙ খেত, গাঁজা খেত। এমনকি কারণবারি অর্থাৎ মদেও তার আপত্তি ছিল না। শুধুমাত্র নারীতেই তার কোনও আসক্তি ছিল না।

মথুয়াদের দলের সঙ্গে হরিচাঁদ গুরুচাঁদের নামে সে যখন গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দির পথে রওনা দিত তখন অনেকেই নাকি তার অরক্ত চোখের দিকে তাকাতে ভয়ও পেয়েছে। পথে পরিচিত কোনও বাড়িতে সে আশ্রয় নিত দলসহ। সে দলে নারী-পুরুষ সবাই থাকত। দলনেতা হিসেবে সে নারী-পুরুষ সবার সঙ্গে সমান আচরণ করত। শুধু নেশা করার সময়ে তার সামনে কোনও নারী থাকতে পারত না। তাহলে তার কোনও গোপন কথা মনে পড়ত। কাঁদত তখন। আশালতা এসব তার মায়ের আছে শুনেছে।

একবার বাড়িতে অর্থাৎ সাইনবোর্ডের কাছে বাঁধালে এসে একহাঁড়ি তালের রস খেয়ে আশালতার সেই মামা টানা তিনদিন ঘুমায়। ঘুম থেকে উঠে তার মনে হয়, এই তাড়িতে বিষ মেশানো হয়েছিল। সে তখনই নিজেদের বাড়ি ছেড়ে চলে আসে আশালতার মায়ের কাছে। এরপর কিছুদিন এই ছোটোবোনের কাছেই থাকে আর তাকে তার ভাগের সম্পত্তি দিয়ে ভারতে চলে যায়।

আশালতা তখন ছোটো। পাকিস্তান হয়েছে বেশিদিন হয়নি। বছর দশেক বড়োজোর। আশালতার মনে আছে, বছর বছর সেই মামা আসত। আশালতার বাবা প্রতি ওই বছরের জমি লাগানোর টাকা মামা এলেই তার হাতে তুলে দিত। তখন মামার গায়ে গেরুয়া বস্ত্র। সে দক্ষিণেশ্বর তারাপীঠ এসব সব নানান জায়গায় থাকে। মাথায় জট হয়েছে। কালীর সাধক। বর্ডারে তাকে কখনও আটকায় না। তবে দেশে যে কয়েকদিন থাকত, নিজের দরকারের টাকা সে আশালতার মায়ের কাছ থেকে নিত। কিন্তু তার জমি লাগানো টাকায় হাত দিত না। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আশালতা স্মৃতি থেকে উদ্ধার করতে পারত তার সেই অদ্ভুত চরিত্রের মামাকে।

বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে আসার পরে সেই বড়োমামার কথা অনেকদিন বলেছে আশালতা। লোকটা তখনও বেঁচে। এমনকি দেশ স্বাধীন হবার কিছুদিন পরে ইন্ডিয়া থেকে তাদের পরিচিতরা কেউ এসে বলেছে, লোকটা এখনও বেঁচে আছে। তবে গায়ে আগের মতো জোর নেই। কিন্তু নেশা করা এখনও কমেনি।

তবে তার দিয়ে যাওয়া সেই সম্পত্তি নিয়ে, সে বেঁচে থাকতে কোনও সমস্যা হয়নি। যেই সে মারা গেছে, তারপর পরই আশালতার ছোটোমামা আদালতে মামলা ঠোকে। কীভাবে যেন একটা জাল দলিল বের করে। তাতে নাকি দানপত্রের ব্যাপারে চূড়ান্ত কিছু বলা ছিল না। এত সব আশালতা ভালো জানতও না। যা জানত তার বড়দার ছেলে রতন। সে একক উদ্যোগে মামলা চালিয়ে যায়।

এদিকে আশালতার মা মরার আগে বলে গেছে, এই সম্পত্তি তার বড়দার ইচ্ছে অনুযায়ী সে তার সব কয় ছেলেমেয়েকে সমান ভাগে ভাগ করে দেবে। যদিও জমি হাতে আসার আগে আশালতার মা গত হয়েছে। এমনকি তারও দুবছর বাদে আশালতাও নেই। কিন্তু আছে তার বড়োছেলে কৃপাসিন্ধু। মামারা এমনিতেই যাই থাক, বোনের অসুখের সময়ে কোনও খোঁজখবর নিক না নাই নিকÑ তারা তাদের মায়ের কথা রক্ষা করবে। যদিও কৃপাসিন্ধুর মনে হয়, এই সবই রতনদার জন্যে। রতন তার চেয়ে বয়েসে সাত-আট বছরের বড়ো। কৃপাসিন্ধুকে সব সময়েই সে পছন্দ করে। কৃপাসিন্ধু যখন ফুটবল খেলত, তখন জ্ঞাতিগুষ্টির আত্মীয়স্বজন কেউ তাকে একবারের জন্যেও প্রশ্রয় দেয়নি, শুধু ওই রতন তাকে উৎসাহ দিয়ে গেছে। এমনকি কৃপাসিন্ধু যখন পায়ে ব্যথা পেয়ে রতনদের গোপালপুরের বাড়িতে, তখনও সে-ই তাকে বাগেরহাটে নিয়ে গেছে ডাক্তার দেখাতে।

তাও তো বছর সাতেক হতে চলল। এখন ওই জমি নিয়ে কথা উঠেছে এই জন্যে যে, রতনরা আর একসঙ্গে সে জমি রাখবে না। বাধালের পুরো জমিই বিক্রি করে দেব। এর কারণ, রতনরা ভাইয়ে ভাইয়ে পৃথক হয়েছে। অর্থাৎ কৃপাসিন্ধুর সব মামাতো ভাইয়েরা স্থির করেছে জমি বেঁচে দেবে। সঙ্গে তাদের পিসির দিককার ওয়ারিশ কৃপাসিন্ধু! তবে কৃপাসিন্ধুর কাছে তাদের কোনও দাবি নেই। শুধু মামলা চালানোর খরচের কিছু দিতে হবে। কৃপাসিন্ধু তাতে রাজিও হয়েছে।

বিষয়টা যদি এই হয়, তাহলে এ বিষয়ে আর কারও কোনও সমস্যা থাকে না। আজ রণজয়ের এই ঘটনা শোনার জন্যে মেজাজ খিঁচোনো লাগে না। কিন্তু ঘটনার পিছনের ঘটনা আরও অনেক দূরে এগিয়েছে, আশালতার বাপের বাড়ির সম্পত্তি নিয়ে এখন কেষ্টর সঙ্গে কৃপাসিন্ধুর শুরু হয়েছে নতুন বিরোধ। কেষ্টর কথা শোনার আগেই রণজয়ের মনে হয়েছে, জমির চেয়ে খারাপ জিনিস আর দ্বিতীয়টি নেই। মহাভারতের অত বড়ো  কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধটাই হয়ে গেল জমি নিয়ে। কখনও ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সুচাগ্র মেদিনী’ আওড়াতে আওড়াতে রণজয়ের মনে হয়, এই যে এমপি ইলেকশন- এও তো এক এক এলাকার জমির পাঁচসালা সাফ কাবালা দখল নিয়ে সংসদীয় যুদ্ধ। আগে ছিল ভালো। প্রেসিডেন্ট একলাই সর্বেসর্বা। এখন এই এমপিরা এক একজন ছোটোখাটো রাজা! জমিদারদের চেয়ে অনেক বড়ো। এক এক আসনের জমির দখল নিয়ে দুদলের কত পদের কায়দা। মারামারি। কত মানুষ মারা যায়।

রণজয় ডিগ্রি ক্লাসে ভারতবর্ষের ইতিহাস পড়েছে। তখনও দেশ স্বাধীন হয়নি। কিন্তু এই বাংলাদেশ পাওয়ার জন্যে এতগুলো মানুষ খানসেনাদের হাতে এভাবে মারা গেল! রণজয় নিজের হিসাব মিলায়। শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে সব কথা বলাও যায় না। কলেজে প্রফেসর স্যাররা তাদের সবকিছু সব সময় বলতও না। তবে কেউ কেউ বলতেন। মোয়াজ্জেম স্যার তো যুদ্ধেই শহিদ হলেন। কীভাবে মারা গেলে সে গল্পও জানে রণজয়। এই যে দেপাড়ায় তার ইস্কুল তারপরই তো বারইখালি, স্যার ওই গ্রামের মানুষ, ওই গ্রামেই যুদ্ধের সময় তারে কারা যেন মেরে দিয়ে যায়, ক্যাম্প থেকে রাতের বেলা বাড়ি এসেছিলেন।

এখন সম্পত্তি নিয়ে কথা বলতে তার সামনে বসা জ্ঞাতিদাদা কেষ্ট। তাকে সে কী বলবে? যা শোনার শুনেছে। চারদিকে গণতন্ত্রের যে হাওয়া সেই হাওয়ায় কৃপাসিন্ধুও তো একটু উন্নতি করতে চাইতে পারে। ওদিকে কেষ্ট মল্লিক একটু সেকেলে মানুষ, সে ছেলের নৌকায় বাদাম নাও তুলতে পারে। কিন্তু রণজয় তো জানে এই ঘটনার পিছনে পার্বতী আর তার বুদ্ধি নিয়েই এখন নতুন বিরোধ। ফলে রণজয় এখন চাইলেও কোনও পক্ষেই যেতে পারে না। সেটা তার পক্ষে সম্ভবও নয়। কেননা কৃপাসিন্ধুর মায়ের জমি। সে জমি নিয়ে কান্তিময় বেঁচে থাকলে কথা বলতে পারত, কেষ্ট তাদের বাপ হিসেবে যে-কথা বলবে, তাতে রণজয়ের পক্ষে সায় দেয়া সত্যি মানায় না।

উপজেলা সদরের বাজার ছাড়িয়ে রাস্তাটা একটু পুব দক্ষিণে যেয়ে, গোপালপুরের দিকে বেইলি ব্রিজে ওঠার পর থেকে টানা পশ্চিমে সোজা সাইনবোর্ডে বাগেরহাট পিরোজপুরের রাস্তার সঙ্গে মিশেছে। এই বেইলি ব্রিজের পরপরই সুনীলের বাড়ি ডানদিকে মাঠ রেখে। কিন্তু একটু এগিয়ে রাস্তার বাঁপাশে সিনেমা হল বানানে সাইনবোর্ডের একজন। তেমন বড়ো নয়, নীচে আড়াই ইঞ্চির গাঁথুনির দেওয়াল উপরে টিন। সুনীল সেকথা গ্রামে এসে বলেছে। সুনীল কথাটা দুই ভাবেই বলেছে। একদিকে, ওখানে একটা সিনেমা হল হলে ধীরে ধীরে শহর হবে ওই পর্যন্ত। আজও এই গ্রামে কারেন্ট আসেনি, উপজেলায় কতদিন ধরে বিজলি বাতি জ্বলে। যদিও সুনীলদের ওই পোলের ওপারে কারেন্ট একটু পরে গেছে। তাও তো বছর পাঁচেক। কিন্তু বড়োপুকুরিয়ায় আজও বিজলিবাতি জ্বলে না। ম্যারাডোনার বিশ্বকাপের পর আরও এক বিশ্বকাপ গেছে, সামনে আর একটা আসছে। সবই তারা দেখেছে ওই দীনেশ মলঙ্গির বাড়িতে ব্যাটারিতে। সামিয়ানারা নীচে হ্যাজাক জ্বালিয়ে খেলা দেখানো হয়েছে। সেই ম্যারাডোনার বিশ্বকাপের সময় কান্তিময় আত্মহত্যা করল। এসব কথা গ্রামময় আজও প্রচলিত।

কিন্তু সুনীল যে বলেছে সিনেমা হল হবে, সঙ্গে এও তো বলেছে বাড়ির সামনে সিনেমা হল, সেই জায়গায় মার্কেট হতে আর কয়দিন। আরও বলেছে, ও জায়গায় একটা সিনেমা হল হলে, ছেলেমেয়ে আর মানুষ হবে না। সুনীলের ছেলেটা বছর দশেকের, মেয়েটা চার বছরের। সে-কথাও তো সত্যি। সুনীল ওখানে থাকে, ওর সেই সংকট আছে। ওই সমস্যায় সুনীল একা নয়। ওই এলাকার আরও অনেকেই পড়বে। কিন্তু সুনীলের কথা শুনে পার্বতী কৃপাসিন্ধুকে বলেছে, ভালোই হল, তাইলে বাঁধালের ওই জমি বিক্রি করার পরে ওই সিনেমা হল যেখানে হবে সেখানে কিছু জমি কিনবে নাকি?

বুদ্ধিটা খারাপ না! সুনীলই বলেছিল। বাঁধালে ওই জমির দাম ভালোই। বাঁধালে বড়ো বাজার অনেকদিন ধরে। পাইকারি ওই বাজার এখন বড়ো রাস্তার পাশে। কৃপাসিন্ধুর মায়ের সেই মামার জমিটা যদিও একটু ভিতরে, কিন্তু তার পাশ দিয়েও তো কচুয়া আসার আর একটা রাস্তা ঢুকেছে। সে-রাস্তাও যে কোনওদিন পিচ ঢালাই হবে। ফলে ওখানে ভাগের ভাগ যা কৃপাসিন্ধু পাবে তা দিয়ে এই জায়গায় সুনীলের বাড়ির সামনে হোক কিংবা রাস্তার উলটো পাশেই হোক কিছু জমি কিনতে পারবে।

রণজয়ের কাছে কেষ্ট মল্লিক বলেছে, সুনীল আজকাল নির্ঘাৎ জমির দালালি শুরু করিছে।

রণজয় তাতে অবাক হয়। তা হতে পারে না। আবার হতে পারে। সুনীলকে কোনও কিছুতেই রণজয়ের বিশ্বাস নেই। ও সারাটা জীবন কাটিয়ে দিল বারোঘাটের জল খেয়ে চোদ্দ পদের মানুষ চড়িয়ে। ওর পক্ষে সবই সম্ভব। তবু রণজয় অবাক, যেখানে সিনেমার হল হচ্ছে, সেখানে সুনীলের মতন মানুষ জমি নিয়ে কীভাবে কথা বলে! সেখানকার জমি কেনা বা বেচার ব্যাপারে কত বড়ো মানুষজন আছে, সেখানে সুনীল কে?

যদিও এ বিষয়েও কেষ্ট নতুন খবর পেয়েছে। সুনীলের বাড়ির পাশেই ওর এক জ্ঞাতি শালা ইন্ডিয়ায় চলে যেতে পারে, সে রাস্তার পাশে জমি বেচবে। অর্থাৎ, সিনেমা হলটার সামনের রাস্তার ঠিক উলটো পাশে। কৃপাসিন্ধু যদি চায়, ওইখানকার কিছু জমি কিনতে পারে।

রণজয় ভাবে, এ নিয়ে শ্রীধরের সঙ্গে কথা বলবে। যদিও শ্রীধরকে তার কোনও কোনও বিষয়ে অবিশ্বাস। সে জ্ঞাতি ভাই হলেও তার কেন যেন মনে হয়, শ্রীধর সবকিছুতেই সুনীলের পক্ষে। আর এখন তো নিশ্চয় আরও বেড়েছে। বাশার শিকদারের পার্টি ক্ষমতায়। তার সঙ্গে সুনীলের এত কালের দোস্তি, সেই জোরে সুনীল এখন কত কিছু ভাবতে পারে, তার সঙ্গ শ্রীধর ছাড়ে কীভাবে? তারপরও রণজয়ের মনে হয়, সে শ্রীধরকে জিজ্ঞাসা করলে ভিতরের খবর আরও ভালোভাবে জানতে পারবে।

কিন্তু এখন তো কেষ্টকে ভালোমন্দ একটা কিছু তার বলা দরকার! তার আগে জানা দরকার, কেষ্ট তাকে কী বলতে এসেছে। যদিও রনজয় তো জানে, অন্তত কিছুদিন ধরে এনিয়ে কথা চালাচালি শুনেছে। রসিক খুড়োর সঙ্গেও কেষ্ট এ নিয়ে কথা বলেছে। তখন অবশ্য রণজয় বিষয়টা গুরুত্ব দেয়নি।

কেষ্ট বলে, ‘আমি যতই কই ওইয়ে দিয়ে আমাগে কাজ নেই, ওই জায়গায় জমি কিনে মার্কেট বানানোর মতন কত লোক আছে।’

‘কী? কৃপাসিন্ধু ওই জায়গায় মার্কেট বানাতি চায়?’

এবার কেষ্ট একটু দোনামনায় পড়ে। না, সেকথা কখনও তাকে কৃপা বলেনি। এমনকি কেষ্টর মনে হয়, কৃপার ওই সমস্ত বিষয়ে অত বোধও নেই। কিন্তু এখন তো নিজের মনে হওয়া কথাটা কেষ্ট বলেই বসেছে। সেদিকে কথাটা নিয়ে যেতে পারলে কেষ্টর মনে হয় রণজয়কে ওই ব্যাপারে বোঝানো সহজ হবে। কিন্তু তা নিয়ে সে কী বলতে পারে, চট করে অমন একটা বানানো কথা সে বলেই-বা কী করে? সে রণজয়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। রণজয়ও বুঝতে পারে কেষ্ট একটু বাড়িয়েই বলেছে। সে জানতে চায়, ‘কথা কও না কী জন্যি, ও কেষ্টদা?’

‘আসলে, এহোন সিনেমা হলই তো এহোনো উঠিনি। ওঠপে ওঠপে, তারপর চলুক। তয় একসময় ও জায়গায় মার্কেটও তো হবে!’

‘সে কবে হবে সেই সোমায় দেহা যাবে। সদরের বাজার থুইয়ে প্রায় এক কিলোমিটার বাদে। ওই জায়গায় কহোন কী হবে, তা এহোনি কওয়া যায়?’

‘তা’লি, সে জায়গায় এহোন জমি কেনার কী থাকতি পারে?’

‘জমি কিনলি দাম বাড়বে তাই ভাইবে কৃপা চিন্তা করতে পারে!

‘আসলে সব ওই বউর বুদ্ধি।’

এত তলানিতে রেখে এতটা ধীরে আর যুক্তির সঙ্গে এত কথা হওয়ার বিষয় আর এটা নেই। কথা এর চেয়ে ছড়িয়েছে। কেষ্ট মল্লিকের সংসারের খবর পার্বতী আসার পর থেকে বাড়ির মানুষ তো ভালো প্রতিবেশী পাড়ার মানুষ আর গ্রামে জানাজানি হতে কখনও বেশি সময় লাগেনি। এখন আরও বেশি খোলাসা। প্রায় সব কথাই কী দ্রুত একঘর থেকে অন্য ঘরে চলে যায়। শ্বশুর কেষ্টর সঙ্গে কোনও কথায় না মিললেই একটু বাদে তা কৃপাসিন্ধুর সঙ্গে ঝগড়ায় পরিণত হয় অথবা পার্বতী গজরায়। গজরাতে গজরাতে সেকথা বলে শ্রীধরের বউ ছবিকে; কখনও সাক্ষী মানে গুণধরের বউ বিন্দুকে অথবা রণজয়ের বউ গীতার কাছেও ভেসে আসে সেকথার তরঙ্গ। তবে কখনও রণজয়ের মায়ের কাছেও কথা আসে, আসে সামনের দোকানের রসিকের কাছে কিংবা খুদির কাছে। কথার গুরুত্ব যতই হোক সম্পর্কে রণজয়ের মা, রসিক আর খুদির কৃপাসিন্ধু  ও পার্বতী নাতি-নাতবউ হয় বলে কখনও কখনও প্রশ্রয়ও পায়।

ওদিকে কেষ্টর তো সংকট উভয় পক্ষেই। সাবিত্রী তার দ্বিতীয় পক্ষের বউ। পার্বতী তার বড়ো ছেলের বউ হয়ে আসারও প্রায় বছর দুই পরে তাকে এনেছে। সেও নানান ঘটনার ভিতর দিয়ে। তখন কেষ্ট মল্লিক প্রায় এক মরা মানুষ। অনেকে মনে করে, ওই বিয়েটাই আজ পর্যন্ত তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যদিও সেই কাজ যে কোনও ঘটনার সমাধান ছিল না। অন্যদিকে, আর এক ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল তা তো এতদিন বাদে পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

ওই সম্পত্তি আশালতার বাপের বাড়ির দিকের। আশালতা মারা যাওয়ার পরে কৃপাসিন্ধু সেই সম্পত্তি পেয়েছে, ততদিনে সাবিত্রীকে বিয়ে করছে কেষ্ট। ফলে একদিন দিয়ে কেষ্টর তো এ নিয়ে কোনও কথা বলাই সাজে না। কিন্তু কেষ্টর মনে হয়, সে সবাইকে তাই বোঝাতেও চায়, কৃপাসিন্ধু চলে বউয়ের কথায়। এত দামের সম্পত্তি যদি এইভাবে নয়-ছয় করে সে নষ্ট করে!

এর পিছনেও অন্য কারণ আছে। পার্বতী ওই সদরের মেয়ে। গোপালপুর গ্রামের প্রান্তে রাঢ়ীপাড়ায় তার বাপের বাড়ি। বাধালের জমি বিক্রির টাকায় সদরে সিনেমা হলের সামনে বা পাশ কোনও জমি কিনতে পারে, তাহলে তা দেখভালের দায়িত্ব পাবে তার ভাইয়েরা।

না, বিষয়টা ঠিক অমন নয়। জমি আকাশে দিকে মুখ করে চিৎ হয়ে পড়ে থাকে। তা নিয়ে কথা খাটেও না। কিন্তু যদি কখনও মার্কেট করা যায়। উপজেলা সদরে দোকান ধীরে ধীরে বাড়বে। বলা তো যায় না, পনের কুড়ি বছরের ভিতরে ওই জায়গা কী হবে? কিছু না-হোক, স-মিল অন্তত দেওয়া যাবে। যদি স-মিল বানাতে হলে, যদি কেউ জমি ভাড়া নিয়ে বানায়ও তার জন্যে খালের পাশে জমি হলেই ভালো হয়, ওই সিনেমা হল খাল থেকে অনেকখানিক দূরেই হবে।

এ সবই প্রায় বাতাসে ভাসা কথা। আবার বাতাসে ভাসাই-বা কেন? কেষ্ট মল্লিক দুই চারজনকে তা বলেছে। আজ নয় তাকে বলতে এসেছে, এ নিয়ে ছেলে আর ছেলের বউর সঙ্গে কথা হয়েছে। বুদ্ধি পরামর্শ করার চেয়ে রণজয়কে আপাতত বিষয়টা জানিয়ে রাখল। ধীরে ধীরে একথা অরও দুই চারজনকেও বলবে। জগৎ ম-লকে তো ইতিমধ্যে জানানোর কথা। জগৎদাকে কোনও কিছু না জানিয়ে রাখলে কেষ্টদার পেটের ভাত ভালো মতো হজম হয় কি না সন্দেহ। রণজয় ভাবে, আপাতত কেষ্টদাকে বিদায় করা লাগে। এসব কথা শুনতে শুনতে কানও প্রায় পচে গেছে। কত আর পারা যায়। ক্লান্ত শরীরের আর ভালোও লাগছে না তার। চোখ দুটো লেগে আসছে। এবার কেষ্টদাকে যেতে বলা লাগে। কিন্তু কেষ্ট তো তাকে জানিয়েই এসেছে। এই কথাগুলো তার বলাও দরকার। যদিও যা বোঝার এতক্ষণে তার বোঝা হয়ে গেছে। তাই রণজয় কথা ঘোরানোর জন্যে বলে, ‘আজকাল আর হরিসভায় যাওয়াটাও না?’

‘ও ঠাউর? তুমি কও কী? রাধামাধব তয় আমারে রাখপে?’

‘দেহিব না, সেই জন্যে কইলাম।’

‘হেডমাস্টার হইচো পর আর সোমায় পাও? বাড়ি আসো প্রায় সেই সন্ধ্যার সোমায়।’

‘ভাগবৎ পড়ো?’

‘সেয়ার আর কত সমায় পাই কোথায়?’

হুঁ। তা সত্যি। সাবিত্রীকে বিয়ে করার পর থেকে কেষ্টর আর সময় কোথায়? পরপর দুটো মেয়ে। এখন আবার পোয়াতি। ওদিকে কৃপার ঘরেও একটা ছেলে। সে তো সাবিত্রীকে বিয়ে করে আনার মাস ছয়েক পরে পরে জান্মাল। তাদের গুষ্টির প্রথম নাতি। তারপর সাবিত্রীর মেয়ে হল। কেষ্ট মল্লিকের এক কোলে নাতি অন্য কোলে মেয়ে। তখন থেকে এ নিয়েই তার দিন কাটে। পরমবৈষ্ণব কেষ্ট মল্লিক ধীরে ধীরে ঘোরতর সংসারী। আগে যদি তাকে সংসারে সন্ন্যাসী বলা যেত, এখন তা কোনওভাবেই বলার সুযোগ নেই।

কিন্তু এই নাতি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে নিজের দুটো মেয়ে। তারপরও তার বউ আবার পোয়াতি। কেষ্টর টক্করটা যে তার নিজের ছেলের সঙ্গে। কৃপাসিন্ধু তার একমাত্র ছেলে, সেই সন্তান তাকে পরপারে পার করবে, ভিতর ভিতরে সেকথা হয়তো কোনওভাবেই সে মেনে নিতে পারে না। গীতার সঙ্গে রণজয়ের এনিয়ে একদিন কথা হয়েছে। তাও প্রায় সেরে সামলে। নিজেদের মেয়ে দুটো বড়ো হয়েছে। শিপ্রা তো বিয়ের বয়েস হয়েছে। কিন্তু যা রোগা থাকে মেয়েটা। পড়তে পাঠাতে কষ্ট হয়। পড়াশোনায় মেয়েটা খারাপ না হলেও শরীরের সঙ্গেই পারল না। তবু বাপ মা হিসেবে তাদের দায়িত্ব আছে। অন্তত জামাইকে দেয়াথোয়া লাগলেও। পরে রচনা আর ছেলে রাতুল। ওই প্রায় পিঠাপিঠি মেয়েদের সামনে তো আর কেষ্ট আর সাবিত্রীর একের পর এক সন্তান উৎপাদন নিয়ে কথা তোলা যায় না। তবু সে জানতে চাওয়ার জন্যেই বলেছিল, ‘ও গীতা, সাবি মনে হয় আবার পোয়াতি!’

‘হুঁ। ছওয়াল চাই ছওয়াল।’

‘তাই তো দেহি। পর পর দুই মাইয়ে ঠিকমতো হাঁটতিও পারল না এর মদ্যি।’

‘সাবিত্রি শরীর ওইয়ে। গায়ে কিছু নেই। এক পা খোঁড়া। পরপর দুইজন হইয়ে এহেবার আমছুড় হইয়ে গেইচে, তারপর আবারওÑ’

‘কও না কিছু তোমরা বউরা?’

‘কী কব?’

‘কৃপাসিন্ধুরে দিয়ে কেষ্টদার ছ’লের সাধ মিটিনি? আরও লাগবেÑ’

‘মা তো কয় এবারও মাইয়ে হবে সাবিদির!’

রণজয় তার বউদের দিকে বিস্ময়ের সঙ্গে চেয়ে থাকে। তার মায়ের অভিজ্ঞ চোখ। গীতার ক্ষেত্রেও যা বলেছিল, তাই হয়েছে। রণজয়ের মনে হয়, কেষ্টদা এই পরের বিয়েটা না করলেও পারত। তবু করবে কী? কৃপাসন্ধিু আর পার্বতীর সঙ্গে তার সম্পর্ক যেখানে গিয়ে পৌঁছেছিল!

এ সব সে ভাবতেই পারে। কেষ্ট মল্লিককে নিয়ে জ্ঞাতিভাইদের সঙ্গে মজাও করতে পারে। কিন্তু এখনকার সমস্যার তো তাতে কোনও সমাধান হবে না। তবু সে কেষ্টকে বলে, ‘এ সব ভাবভাবি বাদি দিয়ে আবার ভাগবৎ পাঠ ধরো কেষ্টদা, ভালো থাকপাÑ’

কেষ্ট দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। রাধামাধব তাকে কি সেই সুযোগ দেবে? সে তো তাই চায়। কিন্তু চারদিক থেকে সংসার তাকে জড়িয়ে ধরছে। আজ যদি আশালতা বেঁচে থাকত তাহলে তার জীবনটার এই দশা হয়। যদি থাকত কান্তিময়। অমন সরল গোপালের মতো দেখতে ছেলে তার! সে সোনার ময়না পাখি কার উপর যে অভিমান করে কোথায় উড়াল দেল!

‘ও জমি কৃপার মামাবাড়ির দিকের। আশাবউদির এক মামার। ও নিয়ে তোমার অত কথা কীসের। ওয়া ও খাবে না মাথায় দেবে সেয়া ও ভাববে, তোমারে অততা ভাবদি হবে না।’

‘হয়। তারপরও বউর কথায় জাহোইর (লাফানো) দেয়া ছ’ল!’

‘হইচে। এহোন ছ’লের বাপ। সুমন তো তোমারও নাতি। এদিক তোমার মাইয়েরা দেকাত দেকাত বড়ো হইয়ে যাবে। মিলেমিশে থাহো। আর আগে সেরাম ছেলা, পারলি শ্রীকৃষ্ণের নাম নেও।’

 

তিন

হরিসভা মন্দিরের সামনের অঙিনায় হাঁটুমুড়ে বসে হঠাৎ পুব-দক্ষিণ কোণায় কেষ্টর চোখ পড়ে। চোখ পড়লেই অনেকক্ষণ সেদিকে একটানা তাকিয়ে থাকে সে। তাকিয়ে থাকে কি, ওদিকে তাকালে চোখ সরিয়ে আর ডানে রাস্তার দিকেও আনা হয় না তার। অজান্তে চোখ ভিজে যায়! ওইখানে বসে এনড্রিন খেয়েছিল তার কান্তিময়। আহারে! যদিও ওখানে বসেই খেয়েছে, না খেয়ে ওই জায়গায় গিয়ে বসেছে তা কোনওদিনও কেউ জানতে পারবে না। ওই জায়গায় পড়ে ছিল সে, প্রাণপাখি অন্তর ছেড়ে গেছে, দেহটা পড়ে আছে, আত্মা লীন পঞ্চভূতে। যে সর্বভূতে বিরাজমান ভগবান তাকে এ ধরায় পাঠিয়েছিল, সেই তাকে নিয়ে গেছে। কিন্তু তা-ই বা কী করে হয়, আত্মহত্যায় নাকি মহাপাপ, নরকে গমন নিশ্চিত। অতটুকু অবুঝমান মানুষ যদি কোন খেয়ালে অমন কাজ করেও থাকে, তারও মহাপাপ! কী জানি, সর্বশক্তিমানে লীলাখেলা বোঝা যায়! পরান দেন যিনি, সেই পরানও নেন তিনি।

এসব কেষ্ট ভাবে। ভাগবৎপাঠক কেষ্ট এসব ভাবতে চায় একটানা তাকিয়ে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আজও সে মন্দিরে আসে। সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বালে। রাধামাধবের বিগ্রহের সামনে চোখ বুজে বসে থাকে।

বিকালে তার কমই আসা হয়। সন্ধ্যায় এলে আধো অন্ধকারে ওই কোণার দিকে তাকায় না। কিছুই দেখাও যায় না একটু অন্ধকার হওয়ার পরে। সন্ধ্যাবাতি দিয়ে সে টর্চের আলো পথে ফেলে ফেলে ধীরপায়ে বাড়ির দিকে যায়। কিন্তু বিকালে এই আঙিনায় বসলে ওইদিকে অবধারিতভাবেই তো চোখ চলে যায়। তখন চাইলেই সে চোখ অন্যদিকে ফিরাতে পারে না। তাকিয়েই থাকে। ভালো জিনিস দেখলেও মানুষ চেয়ে থাকে, দুখে-কষ্টের জিনিসের দিকেও মানুষ চেয়ে থাকে। ভগবান তোমার লীলা কে বোঝে? লীলা কেউ না-বুঝলেও এখনকার কেষ্টকে ভাগবান অন্তত বোঝে। সে চাইলেই কি এখন হালদারদের বাগানের কোণার দিকে চেয়ে থাকতে পারে। সে সুযোগে তাকে তার সঙ্গীসাথীরা দেবে কেন? তারা কি আর জানে কেন অমন জলভরা চোখে তাকিয়ে আছে বাবা অথবা ঠাকুরদা!- এই ভেবে অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকার উপায় আছে?

কেষ্টর সঙ্গে বছর ছয়েকের নাতি সুমন আর সাড়ে চার বছরের মেয়ে চম্পা। তার কোলে কোলে দু-বছরের মেয়ে পারুল। চম্পা আর সুমন এই খোলা চত্বরে দৌড়াচ্ছে। পারুল তার কোল থেকে নেমে গুটিগুটি পায়ে দিদি আর ভাইপোর কাছে যাচ্ছে আবার বাপের কাছে ফিরে আসছে। এতে অবশ্যি কেষ্টর তাকিয়ে থাকার ব্যাঘাত হয় না। ওরা তো সামনেই। ওদের দিকে খেয়াল রাখার ফাঁকেই একটানা পুব দক্ষিণ কোণায় তাকিয়ে থাকা যায়। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন এই চত্বরের মাঝমাঠ থেকে তার কাছে দৌড়ে এসে সুমন তার গা মাথা নাড়িয়ে বলে, ‘ও ভাই, তুমিও খেলে না আমাগে সাথে?’

কেষ্ট হাঁটুখুড়ে বসেছিল মন্দিরের বেদির ঠিক নীচে। গত বর্ষায় মন্দিরের ডোয়ার অনেকখানি ক্ষয়ে গেছে এপাশে। এ জায়গায় মন্দির থাকবে, না তাদের বাড়ির সামনের দিকে যাবে- এই সিদ্ধান্ত হওয়ার পরে ঠিক করা হবে। তবে সে সিদ্ধান্ত আপাতত না হলেও, সামনের দুর্গাপূজার আগে একবার তো লেপাপোছা করা হবে। ওই ক্ষয়ে যাওয়া ডোয়ার সঙ্গে নাতির ধাক্কায় কেষ্ট লেপটে যায়। তার শরীর সব সময়েই পাতলা। গত বছর দুই যে আরও শুকিয়েছে, তাও সে বুঝতে পারে। তবে গায়ে বল কমেনি। এতটুক এতটুক ছোটো বাচ্চা মেয়ে তার, এখনই যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে এগুলোকে মানুষ করবে কে? ভগবান তাকে পরীক্ষা করতে ছাড়ে না। কোন ক্ষণে যে সে আবার এই কাজ করল? হুঁ, কেষ্ট জানে। সে নিরুপায়। না-করলে এই ধরাধামে যে কয়টা দিন সে বেঁচে আছে তাও থাকত কি না সন্দেহ। কবে আশালতার কাছে ওপার ঘরামিবাড়ির খালপাড়ে, তাদের ছোটো ভিটাখানার পাশে পঞ্চভূতে সে লীন হয়ে যেত। আর নাহয় হালদারদের বাগানে গলায় দড়ি দিয়ে কান্তিময়ের মতো নিজেকে সরিয়ে নিত। আবার আত্মহত্যা! আত্মহত্যা মহাপাপ। মহাপ্রভূ শ্রীচৈতন্য মানুষকে ওই পথ থেকে সব সময় দূরে থাকতে বলেছেন। জীবে দয়া নামে রুচি বৈষ্ণব সেবন, ইহা হইতে ধর্ম আর নাহি সনাতন! সনাতন ধর্মের বৈষ্ণবব্রত তো তার জানা আছে। নিজে কতজনকে সে শিক্ষা দিয়েছে, আর মনের অজ্ঞাতে কোন পাপ তার লুকিয়ে আছে যে সে আত্মহত্যার কথাই ভাবেনি শুধু, একই সঙ্গে গ্রামবাসী তাকে তাদের দক্ষিণের বাগানে ছোটোছেলে কান্তিময়ের পাশে রেখে আসবে, সেকথাও ভেবে নিয়েছে। হায় রাধামাধব, হে পরমেশ্বর, কুরুক্ষেত্রের মহারণভূমে তুমি মানুষকে জীবনের জয়গান শুনিয়েছে, অর্জুন যখন পরমবান্ধবদের দিকে অস্ত্র তুলে নিতে অপারগ, তাঁকে বলেছে এই জীবন নশ্বর, সবই আগে ঘটে আছে আর আমি কী তোমার পথে না গিয়ে নিজেই নিজের জীবন পথ ঠিক করে নিয়েছি। না, তা কোনওভাবে নয়, এই যে নাতি আমার সাথে এইমাত্র খেলতে ডেকেছে।

এমন বিড়বিড়ানি আজকাল আর করা হয় না কেষ্টর। সুমন থাকতে তো সম্ভবই নয়। জানতে চায়, ‘ও ভাই, একলা একলা কী কও?’ তার বাবা কৃপাসিন্ধুর কাছে শুনেছে, ভাই ভাগবতের শ্লোক বলে। কিন্তু সে তো জানে ছড়া, তার দুই-একটা ঠাকুর্দাকে শুনিয়েও দিতে পারে। কিন্তু সেই ছড়া জেনেও তো সে অমন বিড়বিড় করে না। নাতির কাছে এই প্রশ্নে হার হয় কেষ্টর।

এই হার আনন্দের। এই হারের জন্যেই বেঁচে থাকা। নাতি তাকে খেলতে ডাকছে। আজ যদি আশালতা থাকত? আশা নেই বলেই তো তার কোলে পারুল। ভাইপো সুমনের সঙ্গে খেলছে চম্পা। কিন্তু ভগবান তাকে সেই পরীক্ষাই তো করে যাচ্ছে। এই যে পর পর দুটো মেয়ে, তার এই বয়েস, সাবিত্রীর আবার বাচ্চা হবে। পরমেশ্বর এবার আমারে একটা ছেলে দিও! মেয়ে দুটো বড়ো না করে কেষ্ট তো চোখও বুঝতে পারবে না। মেয়ের বাপ হওয়া কত বড়ো ঝামেলার, তা যার মাথার উপরে থাকে সেই জানে। আশালতা চলে যাওয়ার পর কনক ছিল। ভারতে কেষ্টর ভায়রা ভাইয়ের কাছে বড়ো হয়েছে। কেষ্ট তো ভেবেছিল, আশালতার চিকিৎসার জন্যে একবার বারাসাতে যাবে। সেই যাওয়ার সুযোগটুকু না দিয়ে আশালতা এক দুপুরে চোখ বুজল। তারপর সেও আনল সাবিত্রীকে। কিন্তু বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে তো গলার কাঁটা। কেষ্ট জানে, এ দেশে না-হোক, নিজের কাছে না-হোক অমন বয়স্থা মেয়ে রেখে সে বিয়ে করেছিল, তাতে তার যত লজ্জাই করুক, একথা তো সব সময়ই তার মাথায় ছিল, মেয়েটিকে বিয়ে দিতে হবে। যদি কনক ছেলে হত? তাহলে অত চিন্তা ছিল না। কিন্তু কনক ছেলে হলে কী তাও সে ভাবতে পারে না, কান্তিময় আত্মহত্যা করায়! কনক যদি ছেলে হত, তাহলে তো আর ওই দেশে পাঠানোর প্রশ্নই উঠত না। আর এই গ্রামে থেকে সেও যদি কান্তিময়ের মতন একটা কিছু ঘটিয়ে ফেলত?

তা কী করে হয়। কনক তার মেয়ে, তাদের মেয়ে। কত লক্ষ্মী! কলেজ পাস করল। তার শালি-ভায়রাভাইয়ের পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করল। কী করবে? বাপমার কাছে বড়ো হয়নি। মাসি-মেশমশাই বাপ-মা তার। অকালে মা মরল। ছোটোভাইটা ওই ঘটনা ঘটাল। অমন অসহায় মেয়ের পক্ষে আর কী করা সম্ভব। যাক, জামাই বাবাজীবন ছোটোখাটো একটা চাকরি করে। খেয়ে-পরে বেঁচে আছে মেয়েটা! বাঁচুক।

আগের পক্ষের একমাত্র মেয়ের কথা ভেবে কেষ্ট একটুক্ষণ কান্তিময়ের চিন্তা থেকে দূরে ছিল। সেকথা মনে না-পড়লে এই দুই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আবার হয়তো আনমনা হত, বিড়বিড় করত, সুমন তাকে জিজ্ঞাসা করত সে বিড়বিড়িয়ে কী বলে? এখন পারুলকে কোলে নিয়ে সে নাতি সুমন আর মেয়ে চম্পার সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে, সে ভাবনা দানা বাঁধল না।

কেষ্ট হঠাৎ তাকিয়ে দেখে, জগৎ মণ্ডল। মনে হয়, ম-লবাড়ির এই দিকের পগারের চার পার হয়ে রাস্তায় এসেছে। আজকাল কোলে একটু কুঁজো হয়ে হাঁটে জগৎ। এটা অবশ্য ওই গুষ্টির ধরন। জগতের ছেলে অমল কি অক্ষয়ও একটু একটু কোলে কুঁজো। অচিন্ত্য অবশ্য সদাঁড়া সোজা, এটা ওদের মামাবাড়ির ধরন। ওদের বোন অনিতাও মায়ের লগতের। অনিতার নামটা মনে আসতেই তার আবার কান্তিময়কে মনে পড়ে। কেষ্টর কেন যেন মনে হয়, পার্বতী যাই করুক, ওদের সম্পর্কের কথা সবার কাছে চাউর করে ভালো সাজুক, আসলে সে নিজেই ছেলেটার মৃত্যুর জন্যে দায়ী। একদিন রাতে সে যদি ওর মশারির ভিতর ঢুকে ওভাবে অনুরোধ না করত! যদি না বলত, বাবা, ওরা আমাদের প্রতিবেশী এই সম্পর্কে তুই জড়াস না। চাইলেও পাশের বাড়ির মেয়ে আনতে পারব না। কী হত সেদিন ছেলেকে ওই কথাগুলো না তার বললে? অতটুকু ছেলে। আনে তো আশেপাশে কত বাড়িতে প্রতিবেশী বাড়ির মেয়ে। আছে এই গ্রামে কত ঘরে।

জগৎ ম-ল কেষ্টকে ডেকেছে। নাতি সুমন তাকে একটা ছোট্ট ধাক্কা দিয়ে একটু দূরে সরে, ‘ছোঁও আমারে, ও ভাই?’ ফলে জগতের নীচুগলার ডাকটা সে শুনতে পায়নি। এবার জগৎ গলা খাঁকারি দিয়ে আর একটু জোর বাড়িয়ে ডাকে, ‘ও কেষ্ট, ভালোই তো জমাইচো নাতির সাতে!’

কেষ্ট শুনেছে। ওখানে দাঁড়িয়েই হাসে। সবুজ আর চম্পাকে বলে বাড়ির দিকে যেতে। চম্পাকে বলে, ‘যা কাকার সাথে,’ সবুজকে, ‘ও ভাই, পিসির হাত ধইরে নিয়ে যাও।’ তারপর রাস্তার দিকে এগোতে এগোতে আরও জানায়, ‘ও ভাই, ঠাকুমারে কইয়ো তোমাগে চাপকলের জলে গা ধোয়াইয়ে দিতি। দেহো না ঘামিচো!’

‘কী, ও জগৎদা?’ কেষ্ট হাসে।

জগতের মনে হয়, কেষ্টর মুখে সেই হাসি। মানুষটা কতজনরে কত কথা বলে হাসাত, প্রায় তেমন হাসি হাসছে এখন। এই হাসি ক্ষণে ক্ষণে কোথায় যায়। নিজেই যেন নিজের জালে জড়ায়। নাকি পার্বতীর জন্যে এই হাসি উবে যায়। জগতের ভিতরে অপরাধবোধ কাজ করে কখনও। সাবিত্রীকে বিয়ে করার ব্যাপারে সে-ই উদ্যোগ নিয়েছে। কেউই প্রায় জানত না। কেউ কেউ আঁচ করতে পেরেছিল। তার বড়ো ছেলে অমল জানত। জানত হালদারবাড়ি সুনীল, সুনীলের জেঠাতোভাই অবিনাশ, কেষ্টর জ্ঞাতিভাই রণজয় আর শ্রীধর। কিন্তু যে-ই জানুক, যাকেই জানাক, মূল দায়িত্ব তো জগৎই পালন করেছিল। তারপর এই কয়েক বছরে কান্তির একটা ছেলে আর কেষ্টর দুটো মেয়ে হল, জগতের কেন যেন মনে হয়, সেদিন অসহায় কেষ্টকে আবার বিয়ে না দেওয়াই ভালো ছিল। এই-যে নাতি নিয়ে খেলল, নাতির সঙ্গে খেলেÑ এই ভালো। বেশি বয়েসে আরও দুটো মেয়ে জন্মিয়ে  কাল যদি কেষ্ট চোখ বোঝা তাহলে হবে কী? আজকাল অনেক কিছুরই সে খোঁজখবর রাখে না। বাড়ির সামনে বসেই দিন কাটায়। প্রয়োজন পড়লে কাউন্সিলের কাছে যায়। গোড়াখালে দীনেশ ডাকলে যায়, সম্পর্কে আত্মীয় এক সময়ের, দীনেশের বাপ খবর পাঠায়, জগৎ যায়। তবু এইটুকু ঘরে বাইরে হয়ে সে তো আশপাশের খবর পায়। প্রয়োজনে অমল জানায়, শরিকি ঘরের খবর জানে। আর রাস্তার পাশের প্রতিবেশী কেষ্টর বাড়ির খবরাখবর সে পাবে না? কেষ্টর বউ সাবিত্রী যে পোহাতি তাও জগৎ ম-লের জানা। তাতে তার মনে হয়, একটি ছেলের আশায় এই চেষ্টা!

জগৎ দাঁড়িয়ে এসব ভেবেছে কেষ্টর নাতি আর মেয়েদের দেখতে দেখতে। এখন কেষ্ট ‘কী, ও জগৎদা?’ বলে তাকে ডাকার কারণ জানতে চাইল। জগৎ কেষ্টর কোলের পারুলের গালে টোকা দেয়। এই মেয়ে দেখতে অনেকটা কেষ্ট আগের পক্ষের বড়ো মেয়ে কনকের মতন। যদিও অল্প বয়েসে বাচ্চাদের নানান রকম দেখতে লাগে, ধীরে ধীরে তারা গড়ন পায়। তার নাতি অমলের ছেলে লিটন ছোটোবেলায় দেখতে একেবারে অচিন্ত্যর মতন ছিল, একটু বড়ো হয়ে ইস্কুলে যেতে যেতে একেবারেই যেন অমল, একটু কোলে কুঁজো। অমল পাঠশালায় যাওয়ার সময় অমনই দেখতে লাগত।

জগৎ বলে, ‘না, কী আর, দেখি নাতি আর মাইয়েগো নিয়ে আছো আনন্দে!’

‘এই আরকি। মহাপ্রভুর কৃপায় দাদা, সামনের দিন কয়ডা ভালো গেলি হয়।’

‘আচ্ছা, ও কেষ্ট? এই জায়গায় মণ্ডপ সরানো নিয়ে কোনও আলাপ হইচে?’

‘না। দীনেশ তো অনিমেষ দা আসলি বইসে সবাই যা হয় এট্টা সিদ্ধান্ত নেবে।’

‘অনিমেশ আসপে কবে?’

‘তা জানি নে।’

‘বড়ো অফিসার। আইজ ঢাকা কাইল খুলনো পরশু চিটাগাং কইরে বেড়ায়।’

‘এবার পুজোর আগে আসপে।’

‘তা’লি পুজো এবার এই খোলায়ই হবে।’

‘কেন, হঠাৎ?’

‘না, তুই এই মন্দির চত্বরে থাহো, এইয়ে দেইহে রাহো, সেই জন্যি তোরে জিগোলাম। এমনিতে যে কেউর ধারে জিগোতি পারি।’

তা পারে। অমল কিংবা অক্ষয় তাকে সব খবরাখবর দিতে পারে। নিজেও হেঁটে ঘুরে নিতে পারে। কিন্তু জগৎ হঠাৎ মন্দির সরানো নিয়ে কথা তোলায় কেষ্ট একটু চিন্তায়ই পড়ে। তাদের উঠানের সামনে, একটু সরে পশ্চিমের রাস্তার কোল ঘেঁষে মন্দিরের জায়গা ভাবা হয়েছে। তাহলে সবার জন্যেই সদর হয়। ভাসা থেকে টানা রাস্তাখাল হয়ে কচুয়ায় যাওয়ায় রাস্তাটা বড়ো হলে, তারা পায়ে পায়ে যে পথ ধরে খাল সমান্তরাল রাস্তায় পড়বেÑ এই রাস্তাটা দিনকে দিন পিছনে পড়ে যাচ্ছে। এখন কাউন্সিলেও এইদিকের পথ দিয়ে তেমন কেউ যায় না। সবাই ওই সামনের রাস্তাটা ধরে সোজা বটগাছতলায় পৌঁছে বড়ো রাস্তায় ওঠে। এই জন্যে সবার প্রস্তাব মন্দিরটা ওই জায়গায় সরিয়ে নিলে ভালো হয়। এখনকার মন্দির ঠিক তাদের বাড়ি পিছনেই, মাপমতো সেই পরিমাণ জমি এই জায়গা থেকে তাকে দেওয়া হবে। মল্লিকদের শরিকদের আর যাদের জমি নতুন মন্দিরের জায়গায় পড়বে, তারাও পিছনের এই জায়গায় সমান ভাগ পাবে।

এসব অনেকদিন আগে ওঠা কথা। গ্রামবাসীর প্রস্তাব। অবিনাশ রণজয় দীনেশ আর এদিকে অমল পরিতোষ মিলে প্রায় সিদ্ধান্তেই পৌঁছেছিল। অবিনাশ যখন রাজি তখন সুনীল এ নিয়ে কিছু বলত না। তাদের শরিকি জায়গা হলেও শ্রীধর কিংবা গুণধরেরও কিছু বলার নেই। মন্দির সামনের রাস্তায় এলে তাদের উঠোনটা একটু ছোটো হয় ঠিকই, কিন্তু বাড়ির এই দিকটা সদর হয়। আজ না হোক কাল কখনও না কখনও সরকারি সাহায্য আসবে। তখন সেখানে টিনের চালার দালানও হবে। কিন্তু কেন যে বিষয়টা উলটে গেল? কেউ বলে রণজয়ই ব্যাগরা বাধিয়েছে। তাদের বাড়ির এই অংশ তখন সদর হয় রণজয় তা চায় না। কেউ বলে, গোড়খালের দীনেশ হতে দেয়নি। কারণ এখানে মন্দির না হয়ে যদি তাদের পাড়ার দিকে হয়, তাহলে আরও ভালো। ভাসার হাটে যাওয়ার আগে আর একটা রাস্তা নেমেছে খাঁবাড়ির পাশ দিয়ে, সেই রাস্তা এসে মিলেছে গোড়াখালে পৌঁছানোর আগে ক্যাম্পের মাঠের সঙ্গে। ওই জায়গায় খাস জমি না হোক, মন্দির তোলার মতন জমি কেউ না কেউ দেবে, তাকে গ্রামবাসী দর ধরে দাম দেবে অথবা হিসেব করে নাইয়াপাড়ার দিকে খাসজমি দেবে। কিন্তু সে সব তো ঘুঁটি উলটে যাওয়ার গল্প। কিন্তু এখন তো সবই সচল, মন্দির এখানে থাকলে সমস্যা কী? নাকি সেই ঐতিহাসিক সাড়ে আট আনি সাড়ে সাত আনির হিসাব এখনও জারি আছে?

কেষ্ট মল্লিক আর জগৎ মণ্ডল হাঁটতে হাঁটতে খালপাড়ের রাস্তার উপরে দাঁড়ায়। সন্ধ্যা হতে আর বেশি বাকি নেই। তবে এখনও এক কাপ চা অন্তত খাওয়া যায়। জগৎ ঘাড় ঘুরিয়ে ডাইনে তাকিয়ে দেখে তার বড়ো অমলের বউ দোকান খুলেছে। অমল সেখানেই নেই। একবার ভাবে, কেষ্টকে চা খাওয়ার সময় কথা বলে। যদিও তারা কেউই আজকালের ছোকরাদের মতন চা খেতে শেখেনি। তবু কথা বলতে বলতে খেত। কিন্তু অমল এই দোকান দেওয়ার পরে জগৎ একবারও দোকানের সামনে বসেনি। আজও বসত না। চা খেতে চাইলে অনিতা তার বউদির কাছে থেকে নিয়ে গেছে। অথবা অচিন্ত্যকে বলেছে, সে দিয়ে এসেছে।

জগৎ সেদিকে তাকিয়ে দোকানে যাবে কি না ভাবে। সেকথা কেষ্টকে বলার আগেই দেখে কেষ্ট রসিকের দোকানের দিকে হাঁটছে। জগৎও সঙ্গে হাঁটে। তাহলে তাদের আর চা খাওয়া হচ্ছে না। জগতের মনে হয়, সে কেষ্টকে একটা কথা বলবে বলে ঠিক করেছিল, কিন্তু সেই কথাটা কোনওভাবেই তার মনে আসছে না। নিশ্চিয়ই কথাটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। রসিকের দোকানের সামনে জগৎ বসবে কি না ভাবে। কেষ্ট বেশিক্ষণ বসবে না। তাকে হরিখোলায় যেতে হবে। সন্ধ্যা হতে আর বেশি বাকি নেই।

অথচ, রসিকের দোকানের সামনে তাদের বসতে হল।

সেখানে সাবিত্রী পারুলকে কোলে নিয়ে বাড়ির দিকে গেলে, জগৎ মণ্ডল ভালোভাবে সাবিত্রীকে লক্ষ্য করে। হ্যাঁ, সাবিত্রী আবারও পোয়াতি। মেয়েটা ছেলের কাঙাল। যেন ছেলে না-হলে পার্বতীকে কোনওভাবেই বাগে আনা যাবে না। যতক্ষণ কেষ্টর এই পক্ষে একটি ছেলে হচ্ছে ততক্ষণ কৃপাই সর্বেসর্বা। হায়রে নারী! জগৎ ভাবে, নিজেরা মেয়ে হয়েও সারাদিন ছেলে ছেলে।

খুদি একসঙ্গে কেষ্ট আর জগৎকে পেয়ে রসিকের নামে একগাদা অভিযোগ দায়ে করতে শুরুর করেছে। জগৎ খুদির কথা শোনে আর হাসে। অমন জোয়ান মানুষ তাদের এই রসিক খুড়া। তারা তার চেয়ে বয়েসে ছোটো, তাও রসিককে তাদের চেয়ে জোয়ান দেখায়। এই লোকটা কারও সাথে নেই, পাছে নেই। এভাবে জীবন কাটিয়ে দিল। একটি মেয়ে ছিল, তাকে বিয়ে দিয়েছে। সেই জামাই মেয়েকে নিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে গেছে। এখনও রসিক মেয়েকে টাকা পাঠায় পারলে। তা নিয়ে খুদির কোনও অভিযোগ নেই। যত অভিযোগ লোকটার সকল বিষয়ে উদাসীনতায়। যদি জানত, এই লোককে নদীর ওপারে এক মহিলা তার বাড়িতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল দুই বিঘা জমি দিয়ে। রসিক যায়নি। তাকে নিয়েই থাকল, তবু খুদি লোকটাকে বুঝল না। যদিও আগে তাদের প্রেম যত গাঢ় ছিল, আজকাল সে তুলনায় একটু পাতলা মনে হয়। মনে হয়, খুদি মাসি তার উপরে বিরক্ত। নাকি মন্দিরের জমি নিয়ে কথা উঠেছে, মন্দির এখানে আসবে এনিয়ে খুদি রসিককে কথা শুনিয়েছে। হতে পারে।

যদিও সে প্রসঙ্গ এখন উঠছে না। খুদির তো জানা আছে, এই দোকানের পাশের জমিতে যদি মন্দির আসে, সেখানে রসিকের একটা ভূমিকা থাকবে। এখন যেখানে মন্দিরের পোতা, সে জমি রসিকের। এখানে তার দোকানের পাশের জমির সঙ্গে যদি জমি বদল হয় তাহলে কেষ্ট কিংবা শ্রীধর গুণধরদের সঙ্গে অনেকখানিক জমির ভাগ করতে হবে। খুদির কী তাতে আপত্তি? রসিকের দোকান বা ঘর তো কেউ সরাবে না, মন্দিরের ওই জমির সঙ্গে এ জায়গার জমির অদল বদল। একলা মানুষ রসিক তার গ্রামবাসী আর গুষ্টির লোকজনের জন্যে এইটুকু করতে রাজি। ভিতরে ভিতরে তাই নিয়ে খুদির আপত্তি?

যদিও খুদি বলছে অন্য কথা। কেষ্টকে উদ্দেশ্য করে সে বলে, ‘বাবাজি, আপনার খুড়া মশাইরে এট্টু বুজাইয়েন!’

‘কী হইচে, ও মাসি, তোমাগে আবার হল কী?’

‘সে এই বয়সে একলা একলা ইন্ডিয়ায় যাবে, মাইয়েডারে দেকতি।’

‘খুড়ার আবার বয়েস। এহোন কী তাগড়া জুয়োন। তুমি ক’লি খুড়োরে কাইলকেই আর একবার বিয়ে দিতি পারিÑ’

‘হইচে। কাজের কতা কন।’

জগৎ বলে, ‘এডাও কাজের কথা।’

‘না, ও মামারা, এহোন এই সোমায় একলা একলা ইন্ডিয়ায় যাবে কী জন্যি, তার চেয়ে মাইয়েডারে আসতি লিহে দিক।’

‘একলা যাবে কেন,’ কেষ্ট বলে, ‘সাতে তোমারে নিয়ে যাবে।’

খুদি হাসে। পাশে বসা পরিতোষ। বয়সে বেশ ছোটো, কিন্তু সম্পর্কে রসিক তার দাদু। এই দুইজন কাকা। সে বলে, ‘বৈরাগী আর বৈষ্টোমি। একটা একতারা নিয়ে বাজাতি বাজাতি চইলে গেলি হল।’

তখন কেষ্ট বলে, এমন কথা সে শুনেছে। বেনাপোল থেকে বৈষ্ণবরা মথুয়ারা সন্ন্যাসীরা সাধুরা ইন্ডিয়ায় গেছে এভাবে। একেবারে নাকি চেকপোস্ট থেকে। কেউ কিছু বলেনি।

আপাতত বিষয়টা হাসির হলেও জগৎ ম-ল খুদির হঠাৎ রসিককে নিয়ে উষ্মা প্রকাশের কারণ বুঝে পায় না। সে ভাবে, এ নিয়ে রণজয়ের সঙ্গে আলাপ করবে। আর কেষ্ট তো শুনলই, সে যদি কিছু ধরতে পারে।

 

চার

পার্বতী জানত, সুনীল আজ আসবে! দুদিন আগে শ্রীধরের কাছে খবর পাঠিয়েছিল সুনীলকে আসার জন্যে। সুনীল এই দুদিন আসেনি। এমনিতে যে আগে কখনও এমন খবর পাঠিয়েছে, তাও নয়। সুনীল যখন ইচ্ছে বাড়ি আসে। তবে ধান কেনার সিজন থাকলে কম আসে। তাছাড়া বাড়িতে কোনও খবর দেওয়ার থাকলে তা ছোটোভাই সঞ্জয়কে দিয়ে দেয়। সঞ্জয় যদিও আজকাল কমই আসে। কচুয়া থেকে পিরোজপুর পর্যন্ত সাইকেলে যায় অথবা যায় বাসে, সেখানে কলেজ করে সঞ্জয়ের আবার সুনীলের বাড়ি ফিরতে ফিরতে কোনওদিন বিকেল, কোনওদিন সন্ধ্যা। সঞ্জয় সুনীলের কাছে থাকতে শুরু করার পর সুনীলের বাড়ি আসা একটু কমেছে। শ্রীধর প্রতিদিন যায়। পোলের গোড়ায় বাঁদিকে রেস্টুরেন্টের পরে তার সাইনবোর্ড লেখার দোকান। গ্রামের কারও কি হালদারবাড়ির কারও কোনও প্রয়োজনে সুনীলকে কিছু জানাতে হলে শ্রীধর তো আছে। তাছাড়া হালদারবাড়িতে পুরুষ লোকের অভাব নেই বাড়িতে, ছেলেরা মঘিয়া ইস্কুলে পড়ে। কয়েক বছর হল ওটা নিম্নমাধ্যমিক থেকে হাইস্কুলের অনুমোদন পেয়েছে। তার আগেও নাইন-টেন পড়ানো হত, তখন ছাত্ররা সদরের কচুয়া ইস্কুলের কিংবা এদিকের নাটাইখালি ইস্কুলের হয়ে পরীক্ষা দিত। মঘিয়া স্কুলের পরে তো আর অল্প একটু পথ, মাঝখানে মৈত্র ডাক্তারদের সেই চেরিটেবল ডিসপেনচারি, আজকাল যা স্বাস্থ্য কেন্দ্র, তারপর হেঁটে গেলে মিনিট দশেক কচুয়ার ব্রিজ।

ব্রিজের এপারের গোড়ায় এখন সুনীলের দাঁড়ানোর সঙ্গে তার বাড়ি যাওয়ার সম্পর্ক আছে। হয়তো সেই জন্যেই পার্বতীর মনে হয়েছে, সে জানত, সুনীল আসবে। শ্রীধর পরশু সুনীলকে বলেছিল, ‘তুই বাড়ি যাবি নিকি, দুই একদিনে?’ এমনভাবেই কথা বলা শ্রীধরের ধরন। শ্রীধরের ছোটোভাই গুণধরের ধরন ঠিক উলটো। সে বলত, ‘সুনীল বাড়ি যাবি, চল?’ সুনীল যাবে কি না? সুনীলের যাওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা তার জানার দরকার নেই। এখনে সদরে তার নতুন বাড়িতে বউ ছেলে মেয়েকে যে বাড়ি যে যাবে সেকথা জানিয়েছে কি না, তা একবারও গুণধর জানতে চাইবে না। এখানে তার কাজ শেষ, সুনীলকে পেয়েছে তো তাকে নিয়ে উত্তরমুখে হাঁটো গ্রামের বাড়ির দিকে। রাস্তাখালের গোড়া পর্যন্ত পাকা। যদিও তারা এখনও সেপথ হয়ে ভাসার দিকের রাস্তায় যাওয়া-আসার শুরু করেনি। তারা রাস্তা খালের গোড়ার দিকে কাউন্সিলের সামনের রাস্তা বামে ঘুরে যাওয়ার আগে, পাশ থেকে সোজা গেছে যে রাস্তা সেটা ধরে বাড়ি যায়। কাউন্সিলের পাশে একটু পর রাস্তা কাঁচা। মাহাতাব চেয়ারম্যান বাড়ির সামনে হয়ে হরিসভা মন্দিরের পাশ থেকে তাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় এসে পড়ে। তবে কাউন্সিলের পরের রাস্তাখালের গোড়া থেকে ভাসা পর্যন্ত সুরকি বিছানো রাস্তাটা গত বর্ষার পরে প্রায় দফারফা! শুকনায় যদিও যাওয়া যাবে, আগামী বর্ষায় কী হবে! কর্নেলসাহেবের এই এলাকায় ভোট প্রায় নেই, তাই মনে হয় রাস্তাটা তেমন ভালোভাবে বানায়নি ইঞ্জিনিয়ার কন্ট্রাকটাররা। তাছাড়া সদর থেকে কেউ আসলে ওই কাউন্সিল পর্যন্ত আসে। বড়োজোর তার পরে আর একটু এগিয়ে দেখতে যায় ছোটো রাজবাড়ির প্রাচীন মন্দির দুটো, রাস্তার পাশ থেকে একটু ভিতরে সে বাড়ির একটি দালান, কেউ থাকলে আজ আর তেমন কিছু নেই। এই রাস্তায় আর হাত পঞ্চাশেক এগোলে রাস্তাখাল, যুদ্ধদিনের বধ্যভূমি, সেখান থেকে সোজা তালেশ্বরের দিকে গেছে চিকন রাস্তা, ডানে বড়ো রাস্তা গেছে ভাসার দিকে উত্তরমুখী। এই রাস্তা এক সময়ে চিতলমারি মোল্লাহাটের দিকে আরও বড়ো হবে, তখন বাস চলবে। সেই ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে হয়তো রাস্তায় একটু খোয়ার প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল, পাশেও একটু চওড়া করা হয়েছিল, যদিও উঁচু তেমন করা হয়নি। ফলে গত বর্ষায় রাস্তার অনেক জায়গা ভেসেছে, খোয়ার প্রলেপ দাঁত বের করে দিয়েছে!

সুনীল এ পথে বাড়ি যায়নি অনেকদিন। খোয়ার ঢালাই দেওয়ার পরে একবার গিয়েছিল ভ্যানে। শ্রীধরও ক্লান্ত হয়ে কোনওদিন বিকালে ভ্যানে গেছে। ফলে ওই রাস্তার খবরাখবর সুনীল যা জানে, তা শ্রীধর আর  অন্যের কাছে থেকে শুনে। ওই রাস্তার যে জায়গায় নাটাইখালি থেকে সরু রাস্তা এসে মিশেছে, সেখানের অবস্থা খুব খারাপ। তার মুখে বলে, মসজিদঅলা বাড়ির সামনে। ওই বাড়ির সীমানায় একটা প্রাইমারি স্কুল, পাশের পুরো রাস্তায় কাদায় তলানো। তাদের গ্রামের ছেলেমেয়েরা এ ইস্কুলে আসে না। তারা যায় গোড়াখালের দিকে ক্যাম্পের স্কুলে।

শ্রীধর বাড়িঘরের যাওয়ার কথা জানতে চাইলে সুনীল একথার ভিতরে কোনও ইঙ্গিত না খুঁজে সরাসরি অন্য প্রসঙ্গে যায়। বাড়ি সে যাবে, দুই-একদিনের ভিতরেই। আজ শ্রীধর না বললেও যেত। সঞ্জয় বাড়ি গেছে দিন চারে। চারদিন ধরে গ্রামের বাড়িতে থাকার মানুষ সঞ্জয় না, কিন্তু কেন এতদিন আছে, আজকাল  যে বাড়ি গেলে আর আসতে চায় না, সে কারণ সুনীল অনুমান করতে পারে। ভেবেছিল, বাড়ি গেলে স্বপনের কাছে জিজ্ঞাসা করবে। করেনি।

সুনীল শ্রীধরের কাছে জানতে চায়, ‘দুই একদিনে আজগরের সাথে দেহা হইচে তোমার?’

‘না, কেন?’

‘রাস্তার কন্ট্রাক্টের সাথে থাকল, কাজ করল যেনতেন, নিজেগে গ্রামের কাজ, ওরে পা’লি জিগোতাম।’

‘ও নাকি এহোন বিএনপি?’

‘ও একলা নাকি আমাগো পরিতোষও নাকি সাথে আছে। ভাসার হাটখোলায় কীসমস্ত কমিটি হইচে, সেইতে ওই দুইজন আছে।’

শ্রীধর সুনীলের মতো স্পষ্ট এসব বোঝে না। তাছাড়া রাজনীতির লোকজনের সঙ্গে তার ওঠাবসাও নেই। রাজনৈতিক দলের ব্যানার লিখতে হলে সে লেখে। কেউ কেউ পয়সাপাতিও সব সময় ঠিকঠাক দেয় না।

সুনীল আর জানায়, ‘তা’লি তো বাশারের ধারে শুনতি হয় কেসটা কী?’

‘শুনবি আর কী? হাবির ছোটো ছওয়ালডা এট্টু জোয়ারের নৌকায় বাতাস দেয়া টাইপ। আর পরিতোষের তো চেনোই।’

শ্রীধরের মনে পড়ে, যখন সাইদুলের সঙ্গে তার ভাইপো কৃপাসিন্ধুর খুব খাতির, তখন কোনও কাজে তাদের এইদিকে আসলে খালি ভালোমন্দ জিজ্ঞাসা করত আজগর। যেই এরশাদ গেল তারপর আর সাইদুলের কথা জানতে চায় না। আজকাল সে শুনতে পায়, সাইদুল বাঁধালের ওদিকে বেশ নেতা হয়েছে। এখন আর কৃপাসিন্ধু বা পার্বতীর কাছে আসে না। আগেও দেখতে বেশ সুন্দর ছিল, এখন চেহারায় আরও চেকনাই হয়েছে। সেদিন তার দোকানের সামনে থেকে মোটোর সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময়ে শ্রীধর দেখেছে। যদিও সাইদুলকে নিয়ে কোনও কথা উঠলে সুনীল বলে, ‘এখনও পার্বতীর সাথে ওর সম্পর্ক আছে।’ হেসে চোখের পাতা কাঁপিয়ে সুনীল জানায়, ‘আমার ওই শ্যালিকা আর তোমার ভাইপো বউর সাথে ওরম একজন শাঁসালো জিনিসের সম্পর্ক থাকপে না? তুমি জানো ও শ্রীধরদা, সাইদুলের ধোন কত বড়ো?’

এ কথার অর্থ জানে শ্রীধর। যদিও এভাবে বলতে তার লজ্জাই করবে। কিন্তু ওই বিশেষ অঙ্গটা বড়ো মানে কত ক্ষমতাবান। এখনকার সাময়ে তৌহিদ এমপি হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার ওস্তাদ জহিরুল তো এই উপজেলায় কর্নেলসাহেবের ডানহাত। সেই সুবাদে সাইদুল এরশাদ যাওয়ার পরে বছরখানেক একটু অসুবিধায় থাকলেও এখন চারদিক ম্যানেজ করে নিয়েছে। আগামীদিনে সে যদি রাঢ়ীপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়, কি এই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও হয় কখনও, তাতে কারও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে জহিরুলের বুদ্ধিতে একবার হিরু সৈয়দের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে আর খালিসাখালির মালোপাড়ায় কী সব ট্যাক্স চেয়েছে জেলেদের কাছে। খলিসাখালির খবরাখবর শ্রীধরের সুনীলের চেয়ে ভালো জানে। সেখানে তার শ্বশুরবাড়ি। সুনীলের জেঠাতোভাই অবিনাশের শ্বশুরবাড়িও ওই গ্রামে, সেখানকার বেয়াইরাও সদরে খুব আসে। তারাও সুনীলকে বলেছে, বিয়েই, সাইদুল ভাই আপনার পরিচিত, তার এট্টু কইয়েন আমাগে মালোপাড়ায় যেন ট্যাক্স খাতি না যায়। জাইলে গো এহোন আর সেদিন নেই। তালেশ্বরের এইদিক খাল শুকাইয়ে গেইচে, কচুয়ার খালে তো আগের মতন জল ঢোকে না।

সুনীল তার বেয়াই অর্থাৎ অনির্বাণের মামার সঙ্গে একটু মজাও করেছিল, ‘ওই খাল তো জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আইসে কাটাইল, এহোন আবার তার দল ক্ষমতায় তাইচে, সেই জায়গায় মাছ ধরবে তোমাগে গেরামের মালোরা আর সাইদুল এতদিন বাদে এট্টু ট্যাকসো চা’লি দোষ?’

শ্রীধর সুনীলের চেয়ে বয়েসে বড়ো, পুরনো দিনের কথা তার মনে না থাকার কারণ নেই, আর সম্পর্কের সুতো এখন হয়তো টেনেও বের করতে পারে। কথায় কথায় সে সুনীলকে বলেছিল, ওই খাল কাটার সময়ে পার্বতীর বাপ জগন্নাথ শিয়ারি গান বেঁধে ঘুঙুর পায়ে নেচেছিল। কৃপান্ধিুর বিয়ে নিয়ে শ্রীধরকে সেকথা মনে করিয়ে দিয়েছে তার জ্ঞাতি বড়দা কেষ্ট, অমন মানুষের মেয়ে আনা যায় না, যার কাজ গান বাঁধা আর যার বউ যাত্রা দলে নাচত। যদিও তা নিয়ে কেষ্টকে বুঝিয়েছিল শ্রীধর, শিল্পীর কোনও জাত হয় না। শ্রীধর নিজেও তো শিল্পীমানুষ।

শ্রীধরের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে এসব কথা হলেও, শ্রীধর কিন্তু সুনীলের বাড়ি যাওয়ার কথা তখনও জানতে চায়নি। শ্রীধর বিড়ি ছুড়ে ফেলে সুনীলকে চা খেতে যাওয়ার কথা বলেছে। এই ব্যাপারে সুনীল কৃপণ। নিজমুখে এ কথা বলবে ন। যদি পয়সা খসে। আর এখন এই অঘ্রান মাসে সুনীলের হাতে কাজ প্রায় নেই, এ সময়ে ও পকেটে হাত দেবেই না।

চা খাওয়ার পরে সুনীলের কাছে শ্রীধর জানতে চায়, আজ সে বাড়ির দিকে যাবে নাকি? সুনীল কিছু হা-না কিছুই বলে না। শুধু জানায়, এই কয়দিন ধরে যেতেই চায়। যাওয়া হয়নি। রোজই সে বউকে বলে বের হয়। আজ গ্রামের বাড়ি যেতে পারে, ফিরতে রাত হবে অথবা ফিরবে না। শ্রীধর তো দুদিন আগে একই কথা বলেছিল, সুনীল সেদিনও কিছু বলেনি। শুধু এর সঙ্গে যখন যুক্ত করেছে, কৃপার বউ তোরে কইতে কইচে, বাড়ি গেলে যেন তার সাতে এট্টু দেহা করিস!

এই দুদিনে সুনীল যায়নি, শ্রীধর জানে। সন্ধ্যা রাতে দোকান অটকে শ্রীধর উত্তর মুখে রওনা হওয়ার আগে পরশু সুনীলকে দেখেনি, কিন্তু কথাটা বলার সময়েই মনে হয়েছিল সে যাবে না। কিন্তু গতকাল তো শ্রীধর বাড়ি যাওয়ার সময়ে সুনীলকে সৈয়দদের মিলের সামনে কামাল মিয়ার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছে। তখন সুনীলকে ডাকা যায় না। শ্রীধর ডাকেওনি। পরে বাড়ি পৌঁছে যাওয়ার পরে রসিকের ঝাপ ফেলা দোকানের সামনে বসে থাকার সময়ে সঞ্জয়কে দেখে জানতে চেয়েছে, সুনীল এসেছে কি না? না, সুনীল আসেনি। আজকাল সন্ধ্যার পরে বা আরও পরে সঞ্জয় কেন তাদের বাড়ির সামনে এই দোকানের এখানে আসে তা শ্রীধর অনুমান করতে পারে। দিনে অন্য সময় তো সে থাকে সদরে। তখন সঞ্জয়কে তার দেখার সুযোগ কোথায়? সঞ্জয়ও সেখানে সুনীলের কাছে থেকে পিরোজপুরে পড়ে। এতদিন বাড়িতে কী? একথা জানতে চাওয়ার চেয়ে শ্রীধর বলেছে, সঞ্জয় সুনীল কাইল কচ্ছিল, তুই দিন চাইরে আইচো, কলেজ নেই, কচুয়া যাও না কেন?

সঞ্জয় বলেছে, মাইজদা (স্বপনের) গোয়াল বাঁধার জন্যে থেকে গেছে। শুনে নিজেকে হেসেছে শ্রীধর। সবাই তাকে ভাবে উদাসীন, কিন্তু তারও একদিন বয়েস কম ছিল।

আজও যে সুনীল বাড়ির দিকে যাবে, তা তার কথায় মনে হল না শ্রীধরের। সুনীল যেন তার কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার জন্যে বলল, ‘কী কবে আমাগো পার্বতী? আমার তো ভাইপো বউ না আবার শালিওÑ’

‘সেয়া আমারে তো কই নেই। তয় মনে হয় তোর এই বাড়ির সামনের ওই জমি নিয়ে কিছু কয় নাকি?’

‘বাধজি এক ভোগে। কোন ক্ষণে যে কৃপারে কথায় কথায় কইলাম ওই জমির কথা।’

‘বোঝ। ওই সিনেমা হলের কতদূর?’

‘ও দেহি থুইয়ে কই গেইচে মিস্তিরিরা, উপরের চাল তো খোলা ওই প্রায় তিনমাস। বর্ষায় ঢাকা ছেল এহোন উদলা। কেন গেছে সপ্তাহে আমার বাড়ি ঢোকার সময়ে দেহো নিই?’

‘না।’

এই কথা। শ্রীধর দোকানের সামনে লোক দেখে এগোয়। সুনীল কিছু বলে না। শ্রীধর শুধু বলে, ‘বাড়ির দিক হাঁটলে লইয়ে যাস।’

সুনীল কিছু বলেনি আর। কিন্তু কী মনে করে পোল পার হয়। কী মনে করেও একদম না, যদি আন্ধারমানিকের দিকের কোনও ধানের ব্যাপারিকে পায়, তাহলে আগেই ওখানকার কয়েক বাড়ির ধান কেনার ব্যাপারে কথা বলত, নিজেও কিছু বুদ্ধি পরামর্শ নিত। ওটা তার মামাবাড়ির গ্রাম যেমন আর তার দিদিরও ওখানে বিয়ে হয়েছে। তবে ছোটো ও বড়ো আন্ধারমানিকের মানুষজন লঞ্চ চলে যাবার পরে আর তেমন থাকে না। একমাত্র যাদের কাজ থাকে তাদেরই দেখতে পাওয়া যায়। শপথকাঠি সম্মানকাঠি হয়ে ওদিকে যাবার পথ আংশিক পাকা, অনেকেই সাইকেলও নিয়ে আসে। তবে বলেশ্বর যেভাবে শুকাচ্ছে। কতদিন লঞ্চ ওই নদী দিয়ে শ্রীরামকাঠি পর্যন্ত যেতে পারে তা কে জানে।

কাউকে না পেয়ে সে আবার ব্রিজে ওঠে। দুই পাশে তাকায়। পায়ের নীচে কংক্রিটের ব্রিজ। আগে কাঠের পোল ছিল। তারও আগে বাঁশের সাঁকো। তখন অবশ্য এখানে স্থায়ীভাবে থাকার জন্যে আসেনি সে। এদিকে তেমন আসত না। সেই নাটাইখালি ইস্কুল আর কোনও প্রয়োজন পড়লে রাস্তাখালের গোড়া থেকে হেঁটে তালেশ্বর, একটা টাবুড়ে নৌকা ধরে বাগেরহাট। দিদির ভাসুরের বাসা। এরপরে খুড়োতোভাই জীবন গেল বিএ পড়তে। সুনীল তখন লেখাপড়া ছেড়ে সবে ধানের কারবারে নামছে। তখনও তার সিনেমা দেখার রোগ ষোলো আমার উপরে আঠারো আনা আছে। গোড়াখালের মলঙ্গিবাড়ির দীনেশের ছোটোভাই অরুণেশ থাকত খুলনা, থাকত কমলেশও। সেখানেও চলে যেত। তারও আগে, অনিমেষের তখন খুলনায় পোস্টিং সেখানে তপেশ আর চক্রেশের সঙ্গে যেত, তাও ওই সিনেমার দেখার জন্যে। এমনকি খাঁবাড়ির সরোজ আর সে পায়ে হেঁটে বারোটার শোয়ের আগে বাগেরহাট লাইট হলে পৌঁছেছে, তিনটা ছবি শেষ হলে মাঝিঘাটে মতিলালের হোটেলে খেয়ে নৌকায় উঠে তালেশ্বর হয়ে বাড়ি। মতির হোটেলে ভাত খাওয়ার সময় কিংবা নৌকায় উঠে আধোতন্দ্রায় ট্রেনের হুইসেল শুনে সুনীলের মনে হত, এই ট্রেনে উঠে খুলনায় যেতে পারলে হত, সেখানে অনেকগুলো হল। রাজ্জাক সোহেল রানা আলমগীর ফারুক উজ্জ্বল কবরী শাবানা ববিতা সুচরিতা এভাবে আনোয়ার হোসেন, এটিএম শামসুজ্জামান কতজনের নাম মনে পড়ত।

তাকে নীচু গলায় ডেকে তুলত সরোজ, নৌকায় বসেই চোখে ঘুমে জড়িয়ে ফেলেছিল সুনীল। সরোজ ডেকে, আজকে দেখা মানুষের মন ছবিতে ববিতার চেহারা নিয়ে কথা বলেছে। তার অবশ্যি ববিতার চেয়ে কবরীকেই বেশি ভালো লাগে। আর রাজ্জাক। রাজ্জাকের কী অভিনয়! নৌকায় বয়স্ক লোকজন আছে। তাদের সামনে খুব উঁচু গলায় সিনেমার কথা বলা যায় না। পরিচিত কেউ জ্যেঠামশাইকে বলেও দিতে পারে, বলতে পারে সরোজের বাপকেও। তার বড়দা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আর সে কি না ইস্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখে। মেট্রিক পরীক্ষা দিলই না কিন্তু বোগলে এক ব্যান্ড রেডিয়ো নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সারাদিন সিনেমার গান শোনে, অনুরোধের আসর রেডিও বাংলাদেশ খুলনা অথবা আকাশবাণী কলকাতা। সরোজের কী স্মৃতিশক্তি! আজকের সিনেমার সংলাপ সে প্রায় মুখস্থ রেখেছে। সেকথা নীচু গলায় বলেছেও সুনীলকে। এমনকি এও বলেছে, সরোজদের বাড়ির পরে ভাসার কোণায় ছিটাবাড়ির গিয়ে সুনীল যেন সংলাপগুলো জয়ন্তীকে বলতে পারে এমন ইঙ্গিতও দিয়েছে।

নৌকার ঢুলুনিতে সরোজ সুনীলের প্রায় কানের কাছে মুখ এনে বলল, ‘যদি বলে, হে ঐশ্বর্যবান গ্রহণ করেছো যত ঋণী তত করেছে আমায়Ñ ধর ববিতার মতো জয়ন্তী বলছে’, বলে নীচু গলায়, ‘তাহলে তুই রাজ্জাকের মতো বলবি, আমি যে তোমার মাঝে হারিয়ে গেছি, পারু; থুড়ি জয়ী!’

দুজনে হেসেছে। সেই সরোজ কোথায় গেল? অন্তত কুড়িখানেক যাত্রার বই যার মুখস্থ। বাপ-ভাই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সুনীল তখন কিছুদিনের জন্যে মঠবাড়িয়া বাকেরগঞ্জ বরগুণা আমতলি ওই লাইনে পাইকারদের সঙ্গে। বরিশালের পশ্চিম অংশ তাই তার আজও ভালোই চেনা!

এদিকে ইন্দ্রেরহাট, নাজিরপুর, স্বরূপকাঠি- সেইখানে প্রায় প্রতি ইঞ্চিতে পয়সা কী বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী। স্বরূপকাঠি পর্যন্ত আসতেই রূপালি পরদা, নৌকার ঢুলুনিতে তন্দ্রায় অন্য জগৎ হারিয়ে যেতে যেতে সুনীল চমক ভাঙে, সরোজ তবু মাথা থেকে যায় না আবার যায়ও। সে ভাবে, যদি কখন ফিরে আসে তাহলে সরোজের কাছে জানতে চাবে নিশা কেন কাঁদে পালার ডায়লগ। নিশ্চয়ই মনে আছে ওর। কেন জানে, এখন কোথায় যাত্রাদলে প্রম্প্ট করে।

কিন্তু স্বরূপকাঠিতে পৌঁছে সে তো প্রায় বাস্তবেই এসেছে। সরোজ সরতে সরতেও সরছে না। তবু তাকে হাটিয়ে সে ভাবে, এখন তো বাড়ির দিকে চলেছে। নাকি সে, লালমোহন আর বিমল কিংবা বটগাছের গোড়ার বাড়ির নৌকা বাড়ির হাবির ভাই জলিল। পুবদিক থেকে তাদের ফিরে আসা। স্বরূপকাঠিতে অনেক বড়ো বড়ো মহাজন। তখন তাদের আজকের মতই ফুরসতের দিন, সিজন আসছে। আর যাওয়া হল না। ধানের দিন আসে দিন যায়, কিন্তু স্বরূপকাঠি আর যাওয়া হল না। জলিল ঢুকে পড়ে। সরোজের জায়গায় জলিল। সিনেমা থেকে বাস্তবে। জলিলও কোথায় চলে গেছে। শুনেছে ঢাকায় থাকে। বাড়ি তেমন আসে না। জলিলকে ভাবতে ভাবতে তার ভাইপো আজগর। আজগরকে পেলে হয়! রাস্তার কথাটা তুলবে। নাকি সে এবার বাড়ি গেলে রাস্তাখালের গোড়া ধরে বটগাছতলার পথে যাবে? যদি আজগরকে পায়।

এই ভেবে, সুনীল ব্রিজের রেলিং থেকে ওপারে ঢালে তাকিয়েছে। কৃপাসিন্ধু দাঁড়ানো। সুনীলের চোখের একদম ভিতরে যেন চমক খেলে যায়। সে কৃপাসিন্ধুর দিকে এগোয়। আবার দাঁড়ায়। উঠে আসুক কৃপা। কৃপাসিন্ধু সুনীলকে দেখে হাসে। কৃপাসিন্ধুর ভিতরে এক ধরনের সারল্য আছে। স্বভাবে একটু মিইয়ে থাকা ধরনের। যখন ফুটবল খেলত তখনও, এই যে খেলতে চান্স পেয়েছে এতেই সে খুশি। সুনীলসহ গ্রামের সবাই জানে, সে কত বড়ো বড়ো স্ট্রাইকার ঠেকাত। অথচ গায়ে তেমন কিছু নেই, হ্যাংলা দেখতে! পায়ে ব্যথা পেয়ে খেলা ছাড়ার প্রায় বছর দশেক পরেও গায়ে গতরে তেমন বাড়েনি। ও আর বাড়েও না। শরীর স্বাস্থ্য এমনই থাকবে। সুনীলর ওর তুলনায় ভারি, এখনও বাঁধন অটটু, কোথাও একটু থলথল ভাব নেই। সুনীল তো নিজের সম্পর্কে বলেই, সে ধানের কারবারি, কামলা-কিষান না পেলে খালের কাদায় নেমে এখনও তাকে দুইমণ ওজনের বস্তা নামাতে হয় নৌকা থেকে। সেই মানুষের শরীরে থলথলা ভাব থাকলে হয়?

কৃপাসিন্ধু কাছে আসতেই সুনীল বলে, ‘কী ভাইপো, কৃপাসিন্ধু করুণাসিন্ধু, কোথায় চলিলে বাছাধন, গন্তব্য কোথায়?’

কৃপাসিন্ধু হাসে, ‘তোমার ডায়লগ সুনীলকাÑ’

‘ডায়লগ না, ডায়লগ না, তোরে দেকলিই মন ভালো। এই জগতের সাউয়োর কোনও চিন্তা নেই তোর। আছো, চলতেচো, পার্বতী কয় না কিছু?’

যদিও সুনীল জানে, কৃপার মাথার চুল যে পাৎলা হয়েছে তা তো পার্বতীর কথায় আর ওর বাপের যে টাক পইড়ে গেছে, তাও পুতের বউর কথার ঝালে।

পার্বতী কী কয় তা সুনীল ভালোই জানে, তাই সেদিকে না গিয়ে তাকে পার্বতী যা বলেছে, তাই বলার জন্যে কৃপাসিন্ধু মুখ খোলে, ‘তোমারে এট্টা কথা কতি কইচে পার্বতী-’

‘কী, ওই আমার এই বাড়ির সামনের জমি কেনার কথা?’

কৃপাসিন্ধু মাথা নাড়ায়। কিন্তু সুনীল সেটা খেয়াল করে কি করে না, তার আগেই বলে, ‘তুই এহোন যাও কই?’

‘গোপালপুর। রতনদা খবর দিয়ে পাঠাইচে, পরিতোষদা গেইল বাগেরহাট তার ধারে। কাইল বাঁধালের ওই জমির ব্যাপারে কথা কবে।’

‘ওহ। আমি যদি বাড়ির দিক যাই তয় তোগো কবানে কী হল? ও লোক তো রাজি, কিন্তু অপেক্ষা করে সিনেমা হল চালু হয় নিকি!’

‘সিনেমা হল চালু হ’লি কী?’

‘এ বাড়ার বেবোধ, সিনেমা হল চালু হ’লিই তো ওই জায়গার দাম বাড়বে। তুই আচ্ছা বোকাচোদা। সারাডা জীবন শহরে শহরে খেলাইলি ফুটবল আর এই হিসেব বুঝিস না?’

‘হ।’ মিনমিনে গলায় কৃপাসিন্ধু সায় দেয়। তাতে সুনীলের হাসি পায়। কীভাবে যে পার্বতীর সঙ্গে সংসার করে, ভেবেই আবার উলটো ভাবে, এইরাম বলেই কৃপাসিন্ধু পার্বতীর সঙ্গে সংসার করতে পারছে।

সুনীল বলে, ‘তয় আউগো।’

‘তুমি যাবা গ্রামের দিক?’

‘দেহি।’

‘গেলি পার্বতীরে এট্টু বিষয়টা বুজোইয়ে কইয়ো।’

সুনীল কৃপাসিন্ধুর সদরের দিকে নেমে যাওয়া দেখে। তারপর আর সে দাঁড়ায় না। বড়ো পুকুরিয়ার বাড়ি দিকে হাঁটে। শ্রীধরকেও কিছু বলার দরকার মনে করে না। হাতের ঘড়িতে দেখে পোনে পাঁচটা, দিন এখনও আছে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক!

 

পাঁচ

গ্রামে ঢুকে সুনীল নিজেদের বাড়ির দিকে যায়নি। কিছুক্ষণ বসেছে রসিকের দোকানে। সেখানে পরিতোষ আছে নাকি দেখেছে, ওকে তবে আজগরের কথা জিজ্ঞাসা করত। সঙ্গে জানতে চাইতে, সেও নাকি আজকাল আজগরের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। কিন্তু তাতো হবার কথা নয়। পরিতোষ সেই কবে ডিগ্রি ফেলের ক্ষমতায় গ্রামের এদিকে ওদিকে টুকটাক প্রাইভেট পড়ায়। তাও সব সময় নয়, এসএসসি পরীক্ষার আগে আগে। শীতকালজুড়ে তার যা কিছু ওই কাজের সুযোগ থাকে। তখন ওর উদয়াস্ত পরিশ্রম যায়। একদিকে খেতের কাজ অন্যদিক ছাত্রছাত্রী পড়ানো। নাইন-টেনের ইংরেজি গ্রামার একেবারে মন্দ জানে না পরিতোষ। অন্তত রণজয় তো তাই বলে, এমনকি অবিনাশের ছেলে অংশুমানকেও বলতে শুনেছে, পরিতোষভাই বোঝায় খারাপ না! খালি এট্টু কথা বেশি কয়। গ্রাম সম্পর্কে পরিতোষ তাদের খুড়া, সেদিক থেকে অংশুর দাদু। যদিও অবিনাশ নিজেই ভালো ছাত্র ছিল, ছোটোবেলায় সুনীল স্বপন আর তার নিজের ভাই লালমোহন কিংবা জীবনকেও পড়িয়েছে। আন্ধারমানিক হাইস্কুলে মাস্টারিই দীর্ঘদিনের। কিন্তু আসা যাওয়ায় এতটা সময় যায়, তাছাড়া অবিনাশ মানুষও একটু চাপচাপ, নিজের ভিতরে থাকে, অংশুমান অনির্বাণ আর মেয়ে লাবণ্যর পড়াশোনার ব্যাপারে উদাসীন। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা নিয়ে উদাসীন সুনীলও। গ্রামের প্রায় সবাই তাই। কিন্তু সুনীলের উদাসীনতা নিয়ে বিভার আর সঞ্জয়ের আপত্তির শেষ নেই। উপজেলা সদরে ইস্কুল-কলেজে যাওয়ার সুযোগ এখন, সে সেখানে থাকে, এ গ্রামের ছেলেমেয়েদের মতন জল-কাদা ভেঙে যেতে হয় না; মেয়েদের তো কষ্ট আরও বেশি। প্রাইমারির পরে দুটো গ্রামের কয়েকটা পাড়া ডিঙিয়ে যেতে হয়, পথে বখাটের উৎপাত। কোন অনিষ্ট কখন হয়, সেই ভয় আছে। এখন তেমন কিছু না ঘটলেও সারাদেশে এমন ঘটনার তো অভাব নেই। রেডিয়োতে সে সংবাদ না পেলেও সদরে খবরের কাগজে এমন সংবাদ সে বা শ্রীধর দেখে, রণজয় ইস্কুলে যায়, যায় অবিনাশ। তার ভিতরে জীবিকার জন্যে হলেও পরিতোষ যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছেলেমেয়েদের পড়ায়, আগখালের মাতাবাড়ির মধুসূদনের মেয়েটা যে কলেজে পড়ছে, তা পরিতোষেরই জন্যে। মধুর ছেলেটাও পড়ালেখায় ভালো! ওদের জ্ঞাতি ললিতের মেয়েটাও এইটে বৃত্তি পেয়েছে। যদিও খালের ওপারের অর্পণা সুযোগ থাকার পরও পড়ল না। পরিতোষ ওর জন্যে চেষ্টার ত্রুটি করেনি। এখন শোনে অপর্ণার বাপ মানব ঘরামি মেয়ের বিয়ে দেবে। অপর্ণা দেখতে শুনতে ভালোই, লেখাপড়াটা করতে পারত।। জ্ঞাতি ভাইঝির জন্যে পাত্রের খোঁজ করতে ধীরাজ একথা বললে সুনীলের পরিতোষের খবর পুরোটা জানা হয় না। কারণ ধীরাজের কাছে পরিতোষের খবর জানা যাবে ঠিকই, কিন্তু বলতে তার একটু বাধো বাধো হওয়ার কথা। হয়তো ধীরাজ ভাবতে পারে সুনীল তাকে খোঁচাচ্ছে। প্রণবেশ হাজরা মারা যাবার পরে তার মায়ের সঙ্গে পরিতোষের সম্পর্ক নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কিছু না বললেও আড়ালে অনেকে বলে। আবার পুলক আর পরিতোষ প্রতিবেশী। পুলকের সঙ্গে ধীরাজের বোনের বিয়ে হয়েছে। খালের এপাড়-ওপাড়। তা নিয়ে এ সময়ে জল কম ঘোলা হয়নি।

সুনীল খুদির কাছে পরিতোষের কথা জিজ্ঞাসা করেছে। খুদি দেখেনি। তবে সন্ধ্যার পরে তো প্রায়ই আসে। এখন ললিতের মেয়েকে পড়াতে যেয়ে থাকতে পারে। সুনীল ভাবে, পরিতোষের সবই ভালো, শুধু ওই একটা দোষ যদি একটু বাদ দিতে পারত। কিন্তু সুনীল একথা বলতে পারবে না, সম্পর্কের খুড়া পরিতোষকে। তাহলে তাকে উড়িয়ে দেবে। এক বয়েসে দুজনে লাইট হলের পিছনে বেপাড়াও গেছে একইসঙ্গে। এখন সুনীল তাকে সাধু হতে বলে কোন সাহসে!

‘তালি, ও মাসি যাই এট্টু পার্বতীর সাথে দেহা কইরে আসি।’ বলে রাস্তা ধরে একটু হেঁটে বাঁয়ের উঠোনে ঢোকে। অনেক খানিক এগিয়ে ডানে কেষ্টর ঘরের সামনে গিয়ে, ‘ও কেষ্টদা’ ডেকে গলা নামিয়ে, ‘ও ছোটো বউদিমণি’ বলে সাবিত্রীকে ডাকে। কেষ্ট যে বাড়ি নেই, তা সুনীল জানে। আসার সময়ে হারিখোলার সামনে চত্বরে তাকে দেখেছে নাতি ও মেয়েদেরকে নিয়ে। সন্ধ্যার আগে আগে আসবে। এই ডাকটা যে স্রেফ সাবিত্রীকে দুটো কথা বলার জন্যে তা সাবিত্রী বোঝে। ঘরের দরজায় দাঁড়ানো সে। পেটটা বেশ উঁচু। সুনীল দেখে বলে, ‘আর কত। ছওয়াল তোমার হওয়ানোই লাগবে।’

সাবিত্রী হাসে। ছোটো শরীরে হাসিটা একটু মলিন, কিন্তু সব মিলে চোখের ভিতরে জেদ। সেই জেদ কেষ্টর আগের পক্ষের একমাত্র ছেলের বউ পার্বতীর সঙ্গে। একথা সে বলে না। কেউই বলে না, কিন্তু মানুষ তার কোনও কোনও অক্ষম জেদের কাছে এতটাই কাহিল যে সেই ভার আপসেই বহন করে চলে। তারপর এক সময়ে সে জানেও না সেই জেদের ভার এমনি এমনি সে পালন করে চলেছে।

সাবিত্রী তাই। সাবিত্রী বাপ-ভাইয়ের ইচ্ছা আর শরীরের অক্ষমতার জন্যেই তো মালা দিয়েছে নিজের দ্বিগুণ বয়েসি কেষ্টর গলায়। সেটা যে পুরোপুরি তার সায় ছিল তা কারও মনে হয় না। তবে সাবিত্রীর তরফ থেকেও তো শর্ত ছিল। সতীন ছেলেই তার চেয়ে বয়েসে বড়ো, তার বউ সন্তানসম্ভবা। সেই ঘরে এসে সাবিত্রীর অপাঙ্ক্তেয় হওয়ার সম্ভাবনা ষোলো আনার উপরে আরও দুই আনা। তবু তাকে আসতে হয়েছে। সে এসেছে। সেখানে টিকতে হলে তার অবলম্বন হিসেবে দুই বিঘা সম্পত্তি দানপত্রে লিখে দিয়েছে কেষ্ট মল্লিক। তার তাতে যে পুতের বউ পার্বতী ও ছেলে কৃপাসিন্ধুর সঙ্গে তাদের দুজনেরই দূরত্ব বাড়বে সেকথাও সাবিত্রীর জানা ছিল। এমনকি এসেছেও জেনেছে।

কিন্তু নিজের দখলদারিত্বের জন্যে তার তো পুত্র সন্তান চাই। নইলে যেদিন কেষ্ট মল্লিক চোখ বুজবে, দানপত্রের ওই দুই বিঘা সম্পত্তি ছাড়া আর কোনও জমির ভাগ তো তার মেয়েরা পাবে না। ওই দুই বিঘাও তো তাকে লিখে দিয়ে যেতে হবে তার মেয়েদের। কিন্তু ছেলে থাকলে সেও কৃপাসিন্ধুর সমান অংশ ভাগী হত। আজ সাবিত্রীর দুটো মেয়ে। ফলে কেষ্ট মল্লিকের প্রকৃত উত্তরাধিকার কৃপাসিন্ধু। সেখানে সাবিত্রীর তো কিছু নেই। হয়তো দুই মেয়ের পরে একটি ছেলের আশায় সাবিত্রী তার প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সাবিত্রী তো সে-কথা কোনওভাবেই মুখে স্বীকার করবে না। সে কেন কেউই তা করে না। ফলে সুনীলের কথায় সাবিত্রীর হাসিটুকুই এখন একমাত্র সম্মতি।

সুনীলও হাসে, ‘কী কথা কও না যে?’

সাবিত্রী বলে, ‘আইজ একেবার বাবু সাইজে?’

বাবু সাজা! এখন শুকনার সময়। হাতে কাজ নেই। সুনীল প্যান্ট পরেছে। এখন তো খালের পাড়ে নামার কোনও দরকার পড়বে না। গায়ের জামাটাও ইস্তিরি করা। মাথাভর্তি চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। এতটা পথ হেঁটে আসায় একটু আউলায়নি। তবে মুখে ঘাম জমেছে, পিঠেও। জামার নীচের গেঞ্জি পুরোপুরি না ভিজলেও কিছুটা যে তাও সে টের পেয়েছে। পায়ে চামড়ার চটি।

তাতে সুনীলকে বেশ বাবু-বাবু লাগছে নাকি!

সাবিত্রীর কথাটা উড়িয়ে না দিয়েও সে বলে, ‘তোমার চোখে এহোনো রং, তুমি কততা দেকপানে!’

সাবিত্রী এতেও হাসে। তারপর বলে, ‘এদিক যাও?’

‘এই পার্বতীর সাথে এট্টু দেহা কইরে আসি। পোলের উপর কৃপার সাতে দেখা, ও ক’ল পার্বতী কী জানি কবে।’

শুনে সাবিত্রীর মুখখানা একটু অন্ধকার হাসিটা নেভে, আবার সঙ্গে সঙ্গে সেটা উধাও করে দিয়ে বলে, ‘যাও, বউ আছে। পারলি পরে একবার আইসো, কতা আছে।’

সুনীল সাবিত্রীর একথাকে গুরুত্বহীন করে তোলার জন্যেই যেন বলে, ‘এহোন কও। কথা হলি বাড়ির দিক যাব তারপর কহোন না কহোন চইলে যাই।’

‘না, রাইতে। তোমার দাদা হরিসভাদের ফিরলি পর। কেন আইজ রাত্রে তুমি বাড়ি থাকবা না?’

‘এহোনো ক’তি পারে না।’

সুনীল সাবিত্রীর ঘরের ডোয়ায় একটা পা রেখেছিল এমন ভাব করে, যা বলবে সে এখনি শুনবে। সে ভেবেছে, নিশ্চয়ই পার্বতী সম্পর্কে অভিযোগ। এ তো কত শোনে। অন্যের তুলনায় সুনীল একটু বেশিই শোনে। পার্বতীর বাপের বাড়ির গ্রামে এখন সে থাকে। সে গ্রামের প্রায় প্রান্তে তার শ্বশুরবাড়ি, পার্বতীর বাপের বাড়ির সেখান থেকে ডাকের মাথায়। সুনীল নিজের গ্রামে আসলে মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েই আসে, পার্বতীর নামে কিছু কথা শুনে যেতে হবে। কিন্তু সেই শোনাও তো অর্থহীন, সে গিয়ে কাকে কী বলবে। পার্বতীর ভাইদের? তাদের বলে কী হবে? জগন্নাথ শিয়ারি নেই। পার্বতীর মাও মেয়ের ব্যাপারে খোঁজ-খবর কমই নেয়। সাধারণত মোড়েলগঞ্জে ছোটোমেয়ের কাছে গিয়ে থাকে সে। সেই মেয়ে-জামাই দুজনেই চাকরি করে। পার্বতীর মা তাদের কাছে থাকলে দুইপক্ষেরই সুবিধা। ফলে সাবিত্রীর এই অভিযোগ অনুযোগ সুনীলের জন্যে এক কান দিয়ে শোনা, অন্য কান দিয়ে বের করে দেওয়া।

সাবিত্রী সুনীলের গুরুত্ব না-দেওয়াটাও বুঝতে পারে। তবু সে বলে, ‘থাকলি আইসেনে, কথা আছে।’

‘আচ্ছা দেহি-’

উঠানের উলটো পাশে একটু কোনাকুনি কৃপাসিন্ধুর ঘর। আগে সেটা ছিল কেষ্টর ঘর। সেখানেই বউ নিয়ে উঠেছিল কৃপাসিন্ধু। আশালতা মৃত্যু, কান্তিময়ের আত্মহত্যা আর কেষ্টর আবার বিয়ের পরে উঠোনে খানিকটা ঢুকে নতুন ঘর বেঁধেছে কেষ্ট। ঘর দুটো ঠিক মুখোমুখি নয়। কেষ্টর নতুন ঘর দক্ষিণমুখী। মাঝে উঠোন। তারপর কৃপাসিন্ধুরর ঘরও দক্ষিণমুখী। একটু এগিয়ে বাঁয়ের হাতায়। ফলে সকালে দরজা খুললেই দুই ঘরের মানুষের প্রথমে প্রভাতের পুণ্য আলোয় মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ নেই। শ্বাশুড়ি পুত্রবধূ কেউই দরজা খুলে পরস্পরকে দেখে বলতে পারবে না, ‘সকালে উঠেই না-মানুষের মুখ দেখে দিনটা খারাপ যাবে।’

সুনীল ডানে শ্রীধরের ঘরের দিকে তাকায়। উঠোনে বা বারান্দায় সানি নেই। সম্ভবত ক্যাম্পের মাঠে খেলতে গেছে রাতুলের সঙ্গে। ছবিকেও দেখে না সুনীল। সে সোজা কৃপাসিন্ধুর ঘরের দিকে এগোয়। সে দিকের ঘরের আবডালে যাওয়ার আগে দেখে সাবিত্রী তখনও বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।

সুনীল কৃপাসিন্ধুর ঘরের বারান্দায় গলা একটু উঁচু করে ডাকে, ‘ও পারু, আছো নাকি?’ ডেকেই সুনীল চমকায়, কাকে ডাকছে। এমন ডাকের কথা সিনেমা দেখে এসে নৌকায় বসে বলেছিল সরোজ!

পার্বতী ঘরেই ছিল। আধশোয়া। ডাক শুনে ওঠে সে যে শোয়া সুনীল তা দেখেনি। সুনীলের গলা শুনেই পার্বতী বুঝেছে কে এসেছে। সে মাথার পিছনে হাত দিয়ে চুল ঠিক করে। গত প্রায় মাস তিনেকে সুনীল তাকে দেখেনি। সিজনে সুনীল বাড়িতে কমই আসে। পার্বতীর চুল বাঁধার ভঙ্গিতে তার পুরো শরীরটাই সুনীলের কাছে স্পষ্ট হয়। পার্বতী একটু মোটা হয়েছে। তাতে কালো রং আরও একটু কালো, কিন্তু উজ্জ্বল। নাকি শেষ বিকালের আলোয় হঠাৎ ঘরে ঢুকে পার্বতীকে তার এমন লাগছে।

পার্বতী বলে, ‘তুমি আসপা, সেয়া আমি জানতাম-’

সুনীল কোনওমাত্র জড়তা ছাড়া পার্বতীর কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে, ‘কী কইরে জানতি?’

‘সেয়া কওয়া যাবে না।’ পার্বতীর চোখে রহস্য!

‘ওরে শালি, এ জায়গায় তুই ভাইপো বউ, অত ঢঙ করিস না-’

‘হইচে। বালের ভাইপো তোমার-’

‘তোর সব গেছে। এহোন মুখও-’

পার্বতী চেয়ার টেনে সুনীলকে বসতে দেয়। দরজায় এসে সামনের ছোট্টো মরা পগারের পরে রণজয়দের ঘরের দিকে দেখে। সুনীলের এই কথা শুনে সে চকিতে চোখ বড়ো করে তাকায়। মুখটা একটু কোঁচকায়ও। সঙ্গে বলে, ‘সব গেছে মানে। কী দেইহে কও?’

‘সব গেছে না তয় কী? বাড়া আইজ সাইদুরের সাথে যাও, কাইল নিয়ে যায় দুলাল। কোথায় কোথায় যাও কচুয়ার রাজনীতি করা ছ’লপলের সাথে!’

পার্বতী কথার ইঙ্গিটা বুঝতে পারে। কিছু বলবে কি না ভাবে। কিন্তু তার আগেই সুনীল তার কথার পক্ষে মতামতও পেশ করতে থাকে, ‘বাপের বাড়ি যাইয়ে তোর পাখনা গজায়? তারপর তুই কোথায় কোথায় যাও, কাগো ধারে যাও, সব খবর আসে।’

সুনীল একথা বানিয়ে বলেনি। সে পার্বতীর রাঢ়ীপাড়া যাওয়ার পরে যে ভূমিকা তার অনেক কিছুই তো বাশার শিকদারের কাছেও শোনে। কচুয়া বাঁধাল সাইনবোর্ডের কার কার সঙ্গে খায়খাতির ওঠাবসা তখন তার তাও জানে। বাশার নিজেও তো একজন। সুনীলের মতো শুধুই ধানের কারবারি বাশার নয়। নিজের রাইস মিল, স-মিলÑ দুটোই আছে। পাওয়ার পার্টিও লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ। এখন নয় রাজনীতিতে একটু কোণঠাসা। বাগেরহাটের সঙ্গে তাদের এখনকার গ্রুপিঙে ঠিক এঁটে উঠছে না। তাছাড়া বাশার রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে মেয়েমানুষের বিষয়টা জড়ায়ও না। কিন্তু সুনীল তার বহুদিনের বন্ধু। নাটাইখালি স্কুলে মামাবাড়িতে থেকে পড়ত বাশার, তখন থেকেই দুজনের জানাশোনা। বাশার তাকে পার্বতী সম্পর্কে যা বলে, তাতে বাড়তি একটু আধটু থাকতে পারে কিন্তু মিথ্যা নেই। যাক, এখন তো সে পার্বতীকে জেরা করতে আসেনি। ওইকথা বলে নিজের সুযোগ তৈরি করা। আচ্ছা বেশি বলা হল না তো, অত কথা বলার দরকারই-বা কী পার্বতী যদি তাতে বেজার হয়। একথা তোলাই ঠিক হয়নি।

পার্বতী জানতে চায়, ‘কী করি কচুয়ায়, শোনো কী?’ পার্বতীর গলাও কেন যেন নেমে যায়। সেও সুনীলকে চেনে, বারোঘাট তো ভালো চব্বিশ ঘাটের জল সুনীল এই জীবনে খেয়েছে। এখন এই সমস্ত জানতে চাইলে কোনটা বলতে কোনটা বলবে তার ঠিক আছে। তারপর গ্রামময় রাষ্ট্র করে কি না- সেকথাও পার্বতী ভাবে।

সুনীল হাসে। চেয়ারে বসে হাত নেড়ে বলে, ‘আগে ক’- কী কইরে বুঝলি আইজকে আমি আসপো?’

পার্বতীর চোখ হাসে। মুখে ছল। ওই হাসিতে চোখের তারা কাঁপে। প্রায় বছর দশেক আগে গোপালপুরে কৃপাসিন্ধুর পাশে বসা পার্বতীর চোখের পাতার এই নাচন সে প্রথম দেখেছিল, তারপর আরও কতবার! শেষও গত বর্ষায়। সেদিন নিজেদের বাড়ি থেকে কচুয়ায় ফিরে যাবার সময় এবাড়ির সামনের রাস্তায় পার্বতীর সঙ্গে দেখা। হাঁটতে হাঁটতে হরিসভা মন্দিরের কোল পর্যন্ত গিয়েছিল। না, তারপরে প্রায় মন্দির-চত্বরের শেষ সীমানায় রাস্তার কোণা পর্যন্ত। কেষ্ট তখনও মন্দিরে আসেনি। সুনীল খুব উদাস গলায় যেন হাওয়ায় কথাটা ভাসিয়ে দিল, এমন ভঙ্গিতে বলেছে, ‘যাই, আইজ তোরে দেখতি আইলাম, দেখা হইচে।’

পার্বতীর চোখে দুটো হেসে উঠেছিল মুহূর্তে। এই জন্যে কি বাপের বাড়ির দিককার কুকুরটাকেও আপন মনে হয়? তাও তো নয়, বাপের বাড়ি সে মন চাইলেই যায়। সে ব্যাপারে তোয়াক্কা করে না। সাইদুল আসে শ্রীধরের সঙ্গে, কখনও আসে সুনীলকে নিয়েও। তার মোটর বাইকের পিছনেও বাপের বাড়ি যায়। এমনকি সুনীল কচুয়া বাজারে বসেও দেখেছে, দেখেছে পোলের গোড়ায় চায়ের দোকানে সাইদুল বা দুলালের সঙ্গে পার্বতী। সুনীল জিজ্ঞাসা করলে বলেছে, ‘বাড়ি যাই!’ সুনীল হয়তো বুঝেছে অথবা বোঝেনি; তাই আবার জানতে চেয়েছে কোন বাড়ি! পার্বতীর গলায় তখন কপট উষ্মা, ‘বাপের বাড়ি।’ তখন সে সুনীলের শ্যালিকা, গলায় সেই গদগদানি। যদিও চিন-পরিচয়ে সাইদুলরা কৃপাসিন্ধুর কারণে তাকে কাকাই ডাকে, কিন্তু ও-সময় সে সম্পর্কের সুতো আলগা হলে সাইদুলও রসিকতায় যোগ দেয়। পার্বতীর রসিকতার মাত্রা সুনীল বুঝতে চেষ্টা করে। বড়োপুকুরিয়ায় যে পার্বতীকে দেখে এখন সে তুলনায় প্রায় বিপরীত। এমনকি সাজসজ্জায় উগ্রতা না থাকলে এখন পরিপাটি। গলার স্বরে আর কথার সুরে আলাদা টান, প্রায় শুদ্ধ কথাই বলছে। তখনই একা পেয়ে নীচু গলায় বলেছিল, ‘সাবধানে করিসÑ’ তাতে পার্বতীর চোখে কটাক্ষ। সুনীলও তো ছেড়ে কথা কওয়ার লোক নয়, তাকে কপট কটাক্ষ ঘায়েলও করা যায় না। সে বলেছিল, ‘পয়সা কড়ি দে?’ এতে পার্বতীর মুখ গোমড়া। যদিও সে একথা জানতে ভোলে না, কাউন্সিল থেকে ভাসা পর্যন্ত রাস্তাটার ব্যাপারে সে লেগেই আছে। তার মানে শ্বশুরবাড়ির গ্রামের উন্নয়নের ব্যাপারে তার চিন্তার শেষ নেই। তবে পার্বতীর সেই লেগে থাকার চেষ্টা কোথায় ভেসে গেছে। এরশাদই নেই। জেলের ভাত খায়। আর তৌহিদসহ বাকিরাই-বা কোথায়? তবে সাইদুলের মতন লোকদের তো দল পালটাতে সময় লাগে না। সে অবশ্যি আরও পরে। যদিও তখন পার্বতীর সুনীলকে পাত্তা দেওয়ারও অত দরকার ছিল না। তারপরও যে দিয়েছে তাও তো সুনীলের বাড়ির সামনের ওই জমিটার উলটো পাশে সিনেমা হল বানানোর কথা ওঠায়। সেও অনেকদিন।

তবে সুনীলের ওই দেখতে আসার কথায় পার্বতী বলেছিল, ‘আমিও যাবানে কচুয়ায় তোমারে দেকতি। তোমার ভাইপোর ক’ল তোমার বাড়ির সামনে যে জমি, যদি বাঁধালের জমি বেচার পয়সায় হয়, কেনার একটা ইচ্ছে আছে। তহোন যাইয়ে জমিও দেখলাম, তোমারেও দেকলাম।’

‘হইচে। জমি নিজেরা নিজেরা দেইখে আসিস। আমার বাড়ি ধারদেও যাবি না। বিভা জানলি।’

পার্বতী খলখল হেসে উঠেছিল। বিভাকে সে চেনে। একটু গম্ভীর আর পার্বতীকে কখনও তেমন পছন্দ করে না। তবে তার খুড়োতো দিদির সঙ্গে খুব ভালো খাতির ছিল। এখনও সেই দিদি বাপের বাড়ি আসলে বিভাদির সঙ্গে দেখা করে। এসবও শোনা কথা, কে জানে এখনও তারা সই আছে কি না। মায়াদির সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না, ভাবে পার্বতী।

সেই খলখল হাসির মুখখানা এই মুহূর্তে সামনে। সুনীল চেয়ারেই বসা। ভাবে পার্বতী কাছে না এলে হাত ধরতে হাত বাড়াবে কি না। তবু কথাটা যেন চাপা না পড়ে যায়, তাই সে আবারও জানতে চায়, ‘ক’লি না, কী কইরে বুঝলিÑ’

‘বুঝছি বুজজি!’

‘!!!’ সুনীল চেয়ে থাকে!

‘ওই ধারের (ঘরের) কাকারে (শ্রীধর) কইচি দুইদিন আগে, আসো নাই। আইজ তোমার ভাইপোরে ক’লাম তোমারে কওয়ার জন্যি। সে যেই কইচে, আর-’

‘আর?’

‘আর শুনিচো আইজ সে বাড়ি আসপে না, অমনি আইচো-’

ধরা পড়ে গেছে সুনীল। তা সে উলটো ঠেলা দেয়। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বলে, ‘হইচে, খুব বোজজো গেলাম।’

পার্বতী সুনীলের হাত ধরে টানে। বসাতে চেষ্টা করে। গায়ের ও কাছে আসে, ‘রাগ করো কী জন্যি? বোঝলাম, এই দুইদিন সোমায় পাওনি, আইজকে পাইচো, সেই জন্যি আইচো!’

সুনীল বলে, ‘কী কবি ক’-’

‘রাগ করলা।’ এটা পার্বতীর বাহানা। গলায় আহ্লাদ। এখনই হয়তো পেঁচিয়ে ধরবে। ওই যে রণজয়দায়ের ঘরের দিকে একবার তাকালে, এ ঘরের পিছনের বারান্দার কাছে গিয়ে দেখে এগিয়ে এল। ও অমন পারে। সেই সন্ধ্যায়, চারদিকে তাকিয়ে ওই হরিসভার কোনায়ইও তার শরীরের কাছ ঘেঁষে এসে বলেছিল, আসো না কেন? সেদিন ছবিখুড়ির সাথে কথা কইয়ে চইলে গেলা, ভাবজি আসপা। ঘরে সুমন আর ওর বাপ কেউ ছেল না!’ আজ এখন তারা কেউ নেই। সুনীল জানে তার উদ্দেশ্য। কিন্তু এই সময়ে! প্রায় সন্ধ্যার আগে আগে, সে যে এখানে এসেছে তা তো সাবিত্রী দেখেছে। এখনই হয়তো নাতি আর মেয়েদের নিয়ে বাড়ি ফিরবে কেষ্ট। কেষ্ট ফিরলে সুমন আসবে। কোনও কারণে ছবিও আসতে পারে।

পার্বতী ওদিক থেকে এগিয়ে এসেই চেয়ারে বসা সুনীলকে জড়িয়ে ধরে। পার্বতীর বুক সুনীলের মুখের কাছে। ওই অবস্থায় সে বলে, ‘আসো না কেন, সুপুরুষ দাদাবাবু?’

সুনীল ওই বুকে মুখ চেপে রাখার অনুমোদন দেয়। অথবা নিজেই মুখ সরায় না। কিন্তু পার্বতীর ‘আসো না কেন?’ বলার কারণটা সে বুঝতেও পারছে না। এলে কী হবে? এইসব? এ তো হতেই পারে। সুনীল বাম হাত তুলে পার্বতীর ডান স্তনে চাপ দিতে দিতে তাকে একটু সরায়, ‘আসলি কি করবি? বলা মাত্র পার্বতী চাপ বাড়ায়। আবার চেপে ধরে। সুনীলের ঘাড়ের কাছের চুলের হাত বোলায়। সে হাত উপরে তোলে। মাথার চুল মুঠ করে ধরে সুনীলকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে। ফাঁকে একবার ডান হাতে আঁচলও সরায়।

সুনীল এতে একটু হিমশিম খায়। পার্বতী আচ্ছা খেলোয়াড়, কিন্তু এই প্রায় কালসন্ধ্যায় মা-কালীর রণরঙ্গিণী রূপ ধরবে নাকি। তাও পারে। সুনীল একটু সরিয়ে দিয়ে বলে, ‘কেউ আসপে-’

‘হয়। আমার যেন চোখ নেই। উঠোনের এট্টু তো দেখা যায়। সুমন আসলি ডাকত।’

‘আসলি কী করবি?’

‘সেয়া পরে ক’বানে-

‘তয় এহোন?’

‘এহোন কও, তোমার ওই লোকরে কবা তো জমিডা দিতি। নয় আমি কিন্তু সাইদুল ভাইরে কইয়ে থ্রেট দেয়াবÑ’

ওরে বাবা! সে অবশ্যি পারে পার্বতী।

‘ক’বানে- এহোন যাই। এই তোর কতা?’

‘হুঁ। রাত্তিরে আসপা?’

স্বাভাবিক আহ্বান। সুনীল হেসে মাথা নাড়ে। সামনের বারান্দায় নামতেই পার্বতী ডাকে, ‘সঞ্জয়ের বিষয়ডা কিছু শোনচো?’

সুনীল কিছু তো শুনেছে। কিছু অনুমানও করেছে। তবু ডানে বামে মাথা নাড়ে। যেন জানে না কিছুই।

পার্বতী বলে, ‘রচনার সাথে লাইন। সেইয়ে নিয়ে রণজয়কাকা মাইয়েডারে মারিচে কী মাইর!’

‘কবে?’

‘কাইলকে। গীতাদি আমারে কয়, তুমি আসলি এতি সঞ্জয়রে যেন তুমি কচুয়া নিয়ে যাও।’

সুনীল বাড়ির পথ ধরে। যাওয়ার সময়ে রণজয়ের সামনে না-পড়লেই হয়। আগে সে স্বপন অথবা স্বপনের বউর কাছে সব শুনবে। অথবা অবিনাশের স্ত্রী, সুনীলদের বড়োবউদির কাছে। তারপর সঞ্জয়ের সঙ্গে কথা। পার্বতী এসব নিয়ে ফাউ কথা বলার মানুষ না।

 

ছয়

বছর আষ্টেক আগে কান্তিময় আর অনিতার ঘটনাটা আজ সবার স্মৃতি থেকে লেপেপুছে গেছে। সেই ঘটনা জানাজানি হওয়াতেই কান্তিময় আত্মহত্যা করেছিল কিনা তাও আজ আর কেউ মনে করতে চায় না। কিন্তু কান্তিময়ের সমবয়েসিরা তো ভোলেনি, তাদের ভোলার কথাও নয়। পুত্রশোক আজও সামলাতে পারেনি কেষ্ট মল্লিক। এখনও হরিসভার কাছে পেলে তার কান্তির মৃত শরীর যে জায়গায় পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে তার দৃষ্টি যাবেই। আর কান্তিময়ের সঙ্গে অনিতার সম্পর্ক থাকুক কি না-থাকুক, তা নিয়ে কথা ওঠারই সেই ঘটনা ঘটেছিল, একথা তার সমবয়েসিদের মনে আছে। এমনকি অনিতার ছোটদা অচিন্ত্য তখনই জানত, সঞ্জয় রচনাকে পছন্দ করে। আবার সঞ্জয় জানত, কান্তিময় অনিতাকে পছন্দ করে।

এখন, এতদিন বাদে সঞ্জয় আর রচনার ঘটনানাটা সামনে এসেছে। সেই সময়ে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে সঞ্জয় কচুয়া কলেজে পড়তে গেছে। সুনীলের বাড়িতেই থেকেছে। তাতে পছন্দ থেকে সে সম্পর্কে ডালপালা ওই সময়ে মেলেনি। সঞ্জয় কয়েক বছর হয় পিরোজপুর কলেজে ডিগ্রি পড়ে, অনিতাও দুই এক ক্লাসে ফেল করে এখন এসএসসি পরীক্ষা দেবে। সম্পর্কটা এখন আগের তুলনায় গাঢ়। তাও এতদূরে জল গড়াত না। যদি ডিগ্রিতে এত সেসনজট না থাকত, সঞ্জয় ড্রপও দিয়েছে এক বছর, আর সম্প্রতি টেস্ট পরীক্ষার পরে ফাইনালের তারিখ ঘোষণায় অনেক দিন ধরে সঞ্জয়ের বাড়িতে থাকার সুযোগ না হত। তবে এতেই তো পরিবারে ক্যাচাল হওয়ার কথা নয়। ভাইপোদের হাতে একখানা চিঠি দেওয়া কি মল্লিকদের বাগানের শুরু সেখানে দেখা করা, দিনের ভিতরে কয়েকবার রচনা হালদার বাড়িতে যায়, কোনওদিন সে বাড়ির বড়ো পুকুরে স্নান করে বাগানের পথে ফেরেÑ এই নিয়ে এত কথা হওয়ার তো কিছু নেই।

বিষয়টা কত কিছুদিন ধরে বেশ উলটে গেছে। সেটা সঞ্জয়ের কারণেই। কিন্তু সঞ্জয়কে তো কিছু বলতে পারে না রণজয় মল্লিক। বললে সঞ্জয়ও হয়তো দুকথা শুনিয়ে দেবে। গুষ্টিতে ভাই-ভাইপো মিলে তাদের সংখ্যা অনেক। মল্লিকরা খালের এপার ওপার এমনকি আগাখালে কি হাজরাবাড়ির পাশে মিলে অনেক ঘর হলেও লোকসংখ্যায় তারা এত নয়, হালদারা এক বাড়িতেই জ্ঞাতি-শরিক অনেক। তাদের ভাই-ভাইপোও বেশি। অর্থাৎ, হালদারদের প্রতিঘরেই পুরুষের সংখ্যা বেশি। গলায় তাদের তেজও বেশি। কোনও একসময়ে সে বাড়ির একজন ডিস্ট্রিক বোর্ডের মেম্বার ছিল, কেউ ছিল মাতব্বর, ফলে সেই অতীত তেজের খানিক তাদের ভিতরে আজও আছে। অন্তত উপরে উপরে। এমনকি সুনীলকে দেখলেও তা মনে হয়। শুধু অবিনাশই যা একটু চুপচাপ প্রকৃতির। ওবাড়ির অসিত কিংবা জীবনের কথায় ধার আছে, স্বপনের কথায় ঝাল, সঞ্জয়ের কথায় আছে যুক্তি। এমনকি তাদের জ্ঞাতি খুড়তোভাই নব- দেবুও কথায় কম যায় না।

তবু রণজয় মল্লিক কিছু বলতেও যদি রচনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। তা তার হাতে নেই। রণজয় ইস্কুলের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরুলেই রচনা হালদারবাড়িতে যায় সঞ্জয়ের আপন ও জ্ঞাতি ছোটোবোন কিংবা ভাইঝিদির সঙ্গে গল্প করতে আসে। সঞ্জয় এলেও তাই করে। ইস্কুলে পড়াকালীন রচনা ইস্কুলে যেত তাও তো ওদেরই সঙ্গে। পরপর দুইবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েও সে পাস করেনি। এবারও দেবে। এই তিন বছরে হালদারবাড়িতে তার যাওয়া আশা প্রায় অবারিত। যদিও সঞ্জয় সব সময় থাকত না। কিন্তু সে বাড়িতে এলে রচনার যাওয়া আসা একই থাকে। গীতা এ নিয়ে কতদিন মেয়েকে গালমন্দও করেছে। বড়দি শিপ্রার বিয়ে হওয়ার পরে রচনাকে দেখারও কেউ নেই। বিছানাপড়তা শাশুড়িকেই নিয়েই গীতা পারে না। আবার মেয়েকে বকাঝকা করলে শাশুড়ি গাল ফোলায়। গীতার কেন জানি মনে হয়, রণজয়ের মা সঞ্জয়কে পছন্দ করে। যদিও গ্রামের দিক থেকে এই সম্পর্কের ভিতরে গোলমাল আছে। অবিনাশ-সুনীলরা রচনার বাবাকে ডাকে দাদা। অর্থাৎ, ডাকের দিক থেকে সঞ্জয় রচনার কাকা! অনেকদিন আগে, সেই হিন্দুস্থান-পাকিস্তান হওয়ার বছরে অবিনাশের বাপের বড়ো আন্ধারমানিক নিবাসী মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে রণজয়ের মাসির বিয়ে হয়েছিল। সেই সূত্রে রণজয় কাকা ডাকে অবিনাশের বাপ-খুড়োকে। তাছাড়া, প্রতিবেশী বাড়িতে এমনিতেই দীর্ঘদিন পাশাপাশি বসবাসের ফলে অদৃশ্য বন্ধনও তৈরি হয়। একেবারে সামাজিক সংকট না থাকলে তাদের ভিতরে আত্মীয়তার সম্পর্ক হয়, কিন্তু সঞ্জয় ও রচনার ক্ষেত্রে এই পারস্পরিক স্তরের ওলোট পালট কোনও সংকট নয়। সংকট যা আছে তা উপরে উপরে দৃশ্যমান না-হলেও ভিতরে ভিতরে আছেইÑ সেটি আপাতত গ্রামের মন্দির সরানো নিয়ে। এক্ষেত্রে সুনীল ও অবিনাশের অবস্থান রণজয়ের উলটো। ওদিকে রণজয়ের জ্ঞাতি শ্রীধর সুনীলদের দিকে। এমনিক অমল ম-লরাও। আবার পরিতোষ রণজয়ের দিকে, রণজয়ের ভাগ্নে হরষিত রণজয়ের দিকে কিন্তুতার কাকা যতীন্দ্রনাথ সুনীলদের পক্ষে, কিন্তু তার ছোটো ছেলে মন্টু রণজয়দের দিকে। ওদিকে কৃপাসিন্ধু আর কেষ্টরও এ নিয়ে আপাতত মতান্তর আছে। মতান্তর আছে যার জমি সেই রসিকের সঙ্গে তার শালি খুদিরও।

ফলে, এখন রণজয়ের পক্ষে রচনাকে হালদারবাড়ি যেতে মানা করার সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কেরও যোগসূত্র আছে। সে চাইলেও সুনীলকে ডেকে বলতে পারে না, সঞ্জয়কে নিয়ে যেতে। সুনীলের সঙ্গে দেখা হওয়ারও সুযোগ নেই। স্বপনকে বললে, স্বপন যদি তাকে বেশি দুকথা শোনায়? যদি বলে, নিজের মাইয়ে ঘরে আটকাইয়ে থোন, বুন-ভাইঝি আমাগোও আছে। তারা তো দিন নেই দুপুর নেই মানষির বাড়ি যায় না!

এ ব্যাপারে রণজয় নিরুপায়। গীতাও তাই। তবু ইস্কুল থেকে বাড়ি এসে রণজয় প্রতিদিন প্রথমেই রচনাকে খোঁজে। রচনাও সে সময়ে বাড়িতেই থাকে। তবে গীতা বলেছে, রাতের বেলা আগে কয়েকদিন রচনা উঠে তাদের দক্ষিণের বাগানের দিকে গেছে। সেদিকে টয়লেট। তার পর আর একটু দক্ষিণেই সঞ্জয়দের জ্ঞাতি দেবু-নবদের ঘরের পিছন। সেখানে মেঘনিশ কিংবা গাব গাছতলায় সঞ্জয় এসে দাঁড়াতেই পারে। দেবু-নব দেখলেও কিছু বলবে না। তাদের ছোটোমা তখন অল্পবয়েসি ছেলেদের নিয়ে ঘুমিয়ে। বোনটার সম্প্রতি বিয়ে হয়েছে। দেবুর জন্যে পাত্রী দেখছে সুনীল-স্বপনরা। হঠাৎ বাবা মারা যাওয়ায় ওরা বেশ সংকটে পড়েছে। জ্ঞাতি হিসেবে ওই বাড়ির সবার সে দিকে খেয়াল আছে। তবু ভিতরে ভিতরে সংকট তো থাকেই, আপাতত তা এমন নয় যে দেবুর ঘরের পিছনে মাঝরাতে সঞ্জয় এলে তার কেউ সেকথা কাল রণজয়কে বলে দেবে। তবে মন্দির সরানো নিয়ে দেবু এখনও কোন পক্ষে অবস্থান নেয়নি। আপাতত সে বাড়ির দাদাদের পক্ষে। তবে গোড়াখালের দীনেশ মলঙ্গি তাকে লোন জোগাড় করে দেওয়ার কথা বলেছে অথবা অল্প সুদে টাকা দেবে, যদি তাই হয় তখন দেবু দীনেশের দিকেই বাতাস দেবে। যদিও দীনেশ এখনও এই ব্যাপারে খোলাখুলি কিছু বলেনি।

রচনার রাতে উঠে হালদার বাড়ির বাগানে যাওয়ায় রণজয় চিন্তিত। উঠোনের দিকে, গরমের সময়ে খোলা জায়গায় অনেকেই ঘুমায়। খালে নৌকায় ধান থাকলে নৌকাও ঘুমায় কেউ কেউ, কিন্তু এই বাগানের পথে তো কোনও উঠান নেই। মল্লিকবাড়ির এই অংশে সামনে ছোটো উঠান, বায়ের হাতায় রাস্তা, রাস্তার সামনেই কাঠের সাঁকো। এই সাঁকো সামনে কংক্রিটের অথবা কংক্রিটের কাঠামোয় উপরে কাঠের হবে। এ বাড়ির উঠান মূলত কেষ্টর বাড়ির অংশে। সেটাও এই রাস্তা লাগোয়া। সেখানে ওপারে ঘরামিবাড়ির সঙ্গে সাঁকো। ওদিকে হলে রচনা বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে কেউ না কেউ দেখত। শ্রীধর অথবা গুণধর উঠানে অথবা বারান্দায় থাকে। গুণধরের বেড়িয়োয় গান বাজে। কেষ্ট মল্লিক নতুন ঘরের সামনে খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে থাকে। সে গুনগুনিয়ে রাধাবিচ্ছেদি কোনও গান গায়। সেদিক থেকে রচনার বাড়ির বাইরে যাওয়া কোনওভাবেই সম্ভব হত না।

কিন্তু এদিকে রণজয়ের বড়ো ঘরখানায় ভিতরের দিকে তিনখানা কামরা। পশ্চিমের কোণায়খানে সে আর গীতা থাকে। মাঝের ঘরে রাতুল। পুব কোনারটায় রচনা। আগে শিপ্রাও থাকত, তার বিয়ের পরে রচনা একা। এ ঘরের সামনেই বারান্দায় চেয়ার টেবিলে ইস্কুল থেকে এসে রণজয় বসে। যদিও রচনার কামরার দরজা খেলে না। সে রাতুলের দিকে দরজা অথবা পিছনের দরজাই বেশি ব্যবহার করে। পিছনের বারান্দালাগোয়া দরজা দিয়েই বেরোয়। ওখান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় যায়। রাস্তায় দক্ষিণ বরাবর হেঁটে হালদারবাড়ির সীমানা শুরু হলে, বাড়িতে ঢোকার রাস্তা না গিয়ে দেবুদের ঘরের দিকে যায় পাতলা বাগান ধরে। হয়তো ওই পথে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায় সঞ্জয়। তখন কখনও তাকে ডাকলে সে বাগানের পথে চলে আসে যেন টয়লেটে এসেছিল। যদিও তার হাতে লম্ফ হারিকেন কিংবা টর্চ কিছু থাকে না।

পরশু ঘটনাটা এই তুলনায় একটু গুরুতর। রাতে খাওয়ার পরে সঞ্জয় দেবুকে এসে বলে, ‘তুই আইজকে নবর ধারে যাইয়ে শোÑ’

এর বেশি দেবুকে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজনও পড়ে না। তবে দেবু তখনই যায় না, শুধু নবকে বলে আসে, ‘তোর খাটে আমি শোব।’ তারপর অপেক্ষা করে। রচনা এলে সে যাবে। সঞ্জয় বললে সে রচনাদের সীমানায় ঢুকে পাহারা দেবে। কিন্তু তার আর প্রয়োজন পড়ে না। সঞ্জয়ই রচনাকে নিয়ে দেবুর ঘরে আসে। পরে দেবুর হিসাবে একটা হয়েছে ভুল। অন্তত দেবুর সেদিন বাগানে পাহারায় থাকা দরকার ছিল। বৃষ্টি-বাদলা নেই। তবে বাগানে এখন চিনা-জোঁকের উৎপাত কিছু আছে। ওদিকে সঞ্জয় যে সেই রচনাকে নিয়ে দেবুর ঘরে ঢুকেছে তো ঢুকেছে আর বেরুনোর নাম নেই। মাঝরাত পার হয়। মল্লিকবাড়িতে গুণধরের রেডিয়ো ততক্ষণে বন্ধ। হালদারবাড়িতে সামনের বার এসএসসি পরীক্ষার্থী অংশুমানও ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্য সময় হলে ধানের কারবারি স্বপন কি লালমোহন নৌকায় থাকত। কখনও বাড়ির উঠোনে পড়ত তাদের টর্চের আলো। যদিও দেবুর ঘরের পিছন দিকে সে আলোর নিশানা পৌঁছত না। আর দক্ষিণের কোনায় রাস্তার পাশে যে চাপকল সেটি চেপে জল খেতে এই বাড়ির মেয়ে বিজলি। যে অনেকদিন আগে অজ্ঞাত দুঃখে আত্মহত্যা করেছিল হালদারবাড়ির পরের ম-লবাড়ির বাগানের কাছে। তারপর থেকে সামনের ওই চাপকলে কোনওদিন রাতে সে জল খেতে আসে। বাড়ির লোকজন কখনও শোনে। সামনের বারান্দায় ঘুমানো সুনীলের বাবা বীরেন তখন সেকথা বলে, ‘ওই যে বিজলি জল খায়।’ যদিও নৌকায় থাকলে স্বপন কিংবা লালমোহন টর্চের আলো ফেলে দেখেছে কেউ নেই, কিন্তু কলের মুখে জলের ধারা!

তৃষ্ণার্ত বিজলির জল খাওয়ার ঘটনাও সেদিনের মতো ঘটেছে। সে মেয়ের আত্মহত্যার পরে দেশে ছেড়ে চলে গেছে দেবুর জেঠা। দেবুর এখন আর তাকে ভালো মনে নেই। বিজলিকেও নয়। তবে সেই জল খাওয়ার সঙ্গে রাত হওয়ার সম্পর্ক আছে বলেই দেবুও বুঝতে পারে রাত অনেক হয়েছে। এখন রচনাকে যেতে বলা লাগে। দেবু উঠে তার কামরার সামনে গিয়ে সঞ্জয়কে ডাকে। সঞ্জয় দেবুর চেয়ে বয়সে সামান্য বড়ো। কিন্তু তাদের দুজনের ভিতরে ডাকাডাকি দাদা-ভাইর কোনও বিষয় নেই। দেবু ডাকলেই সঞ্জয় ভিতর থেকে বলে, ‘যাবেনে, তুই যাইয়ে ঘুমা।’

দেবু তাও সরে না। তার মনে হয়, এখন রণজয়দা জানলে দীনেশদাকে কম সুদে তাকে টাকা দেওয়ার কথা বলবে না। দেবু আবার ডাকে। কিন্তু ততক্ষণে রণজয় বাগানের ওমাথা থেকে ডাকছে। এদিকে দেবুও সঞ্জয়কে ডাকে। সঞ্জয় তাকে চুপ করে ঘুমিয়ে থাকতে বলে। এর একটু পরে রণজয়ের ডাক আর শোনা যায় না। তার মানে রণজয় বুঝে গেছে রচনা ঘরে নেই। এত রাতে মেয়ের এবাড়ির অন্য কোনও ঘরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। রণজয়ের ডাকে সামনের বারান্দা থেকে তার বিছানাপড়তা মাও গলা তুলে ডাকছে। তার মনে হয়, এইবার তার নাতনিকে পেলে রণজয় আর আস্ত রাখবে না।

এদিকে রণজয় তাদের বাড়ির বাগানের সীমানায় এসে আবার কয়েকটি ডাক দিয়ে চলে যায়। কিন্তু সারারাত সে আর ঘুমায় না। বারান্দায়ই বসে তাকে। তারপর ভোর রাতে, আলো ফোটার আগে সে আসে বাগানের সীমানায়। তখনই রচনা বেরোয়। সে বাপকে দেখেছে। রণজয় ল্যাট্রিনের আড়ালে দাঁড়িয়েছিল। সঞ্জয়েরও তা খেয়াল করার কথা নয়। সে রচনাকে বের করে দিয়ে দেবুদের ঘর থেকে নিজেদের ঘরে চলে গেছে। দেবু তখন নিজেদের কামরায় আসতেই ব্যাপারটা বুঝতে পারে। সে টের পায় আধো অন্ধকারে রণজয় হিরহির করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে রচনাকে। তারপর প্রথমে উঠোনেই এক চোট, পরে ঘরে নিয়ে দরজার আটকে আর এক চোট মারে। মল্লিকবাড়ির সবার ঘুম ভেঙে যায়। উলটো দিক থেকে আসে কেষ্ট-কৃপা ও পার্বতী; শ্রীধর-ছবি, গুণধর-বিন্দু, এমনকি মন্দিরের গায়ের ঘর থেকে রাঘব আর রথীন। এদিকে খালের ওপার ঘরামিবাড়ির লোকজনও খালপাড়ে। ম-লবাড়ি থেকে অবশ্য টের পাওয়ার কথা নয়। যেমন হালদারবাড়ি থেকেও টের পাওয়া যাবে না। তবে দেবু টের পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সঞ্জয়কে ডেকে আনে, ‘তোরে আগেই কইলাম। এহোন সামলা। মাইয়েডারে মারতিচেÑ’ সঞ্জয়ের চোখ কপালে। দেবু বলে চলে, ‘সেই মাঝরাইতে কইলাম দিয়ে আয়, শুনলি না, কয়বার করা লাগে?’

এখন সঞ্জয়ের করার কিছু নেই। সে আর দেবু ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। রণজয় রচনাকে ঘরে নিয়ে দরজা আটকে মারায় তারা কিছু টের পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু রণজয়ের মায়ের চিৎকার, ‘ও বউ, মাইয়েডারে মাইরে ফেলাল! এ কেষ্ট, এ শ্রীধর, ধরো না-কেন, দরজা ভাঙ!

ভোরেই ঘটনা জানাজানি হয়। আগেও সবাই কমবেশি জানত। সঞ্জয়কে বাড়ি আসতে দেখলেই বুঝতে পারত। সঞ্জয়ের সমবয়েসিরা কোনও সুযোগ করে দিত তাদের কথা বলার। আজকাল যদিও তা লাগত না। তবে অচিন্ত্য একদিন দেবুকে বলেছিল, ‘সঞ্জয় যা শুরু করছে, রণজয়কার কানে গেলি!’

কারণ দেবুর কাছে অচিন্ত্য শুনেছে, প্রায়ই দিন তাদের বাগানে দেখা করে ওরা।

এই ভোরেই একটু আলো ফুটলেই স্বপন তার বউকে কথা শোনায়। তাদের ছোটোবোন সোমাও তাতে সায় দেয়। অর্থাৎ স্বপনের বউয়ের প্রশ্রয় আছে। সে জন্যেই সঞ্জয় বাড়িতে আসলে এত ঘন ঘন রচনার পা-পড়ে এবাড়িতে। দিনে আসে অংশুমানের কাছে, লাবণ্যর কাছে, আসলে তো আসে সঞ্জয় আছে বলে। বীরেন্দ্রনাথ কিছুই বলে না। চুপচাপ শোনে। সে ঠিক করেছে সুনীল আসলে সব বলবে। সঞ্জয়ের মা চুপ করে থাকে। তবে সে স্বপনের বউয়ের পক্ষে দাঁড়ায়। বউকে এত কিছু বলে কী লাভ? সঞ্জয় বুঝমান বিএ পড়া ছেলে, সে কি বউদির কথা শোনে।

সুনীল এর কিছু জানত না। বাড়িতে ঢোকার আগে তাকে যা বলার বলেছিল পার্বতী। এই জন্যে সে চেয়েছে পথ যেন রণজয়ের সঙ্গে তার দেখা না-হয়। হয়ওনি। তার ভাই সঞ্জয় কী কতটা ঘটাতে পারে। আজকাল পিরোজপুর আর কচুয়ায় কাদের সঙ্গে মেশে, তার জানা আছে। কিন্তু সেসব তো বাইরে। নিজগ্রামে প্রতিবেশী বাড়িতে বাড়িতে এমন ঘটনা? এতে সম্পর্কের অবনতি হয়। গ্রামের সামাজিকতাও উলটে পালটে যায়। তাও সুনীলের জানা আছে। অন্তত বছর পনের আগে, সরোজদের খাঁবাড়ির পরে ভাসার ঠিক আগে মাতাবাড়ির জয়ন্তীর জন্যে তার সম্পর্ক নিয়ে কী হয়েছিল। সুনীলের জেঠামশাই সেসব শুনে তাকে কীভাবে মেরেছিল এই উঠানে ফেলে, তা সুনীল এখনও মনে করতে পারে। ওই যে বাড়ির উঠোনে ঢোকার মুখে যে ছোট্ট কাছারি ঘর, ওইখানের পাটাতন থেকে একটা সুপারির চলা নিয়ে তাকে আচ্ছাসে পিটিয়েছিল। পিটানের চোটে সুনীলের লুঙ্গি খুলে যাবার জোগাড়। বাবাকে ঠেকাতে এসেছিল ধলু (অসিত), তার পিঠেও কয়েক ঘা পড়েছিল! তখন কয়েকদিন সরোজের সঙ্গে দেখা করতেও যায়নি। সরোজই আসত। সে প্রেম থামেনি। এমনকি জয়ন্তীর বড়দি বাসন্তীর বিয়ে হয়েছে মল্লিকবাড়ির ওপারে ঘরামি বাড়িতে, আজ আসার পথেও দূরে উঠানে বাসন্তীকে দেখেছে, তাকে দেখলেও জয়ন্তীর কথা মনে পড়েছে সুনীলের। এখনও ঘরামিবাড়িতে গেলে বাসন্তীকে একটু রহস্য করেই সুনীল বলে, ‘ও খুড়ি, দেলা না তোমার বুইনরে।’ বাসন্তীর চোখ হাসে। গলায় কপট রাগ, ‘আমি দেয়ার কেডা, তোমরাই আনলা না। আমাগো বাড়ির মাইয়ে তোমরা আনো কী কইরে?’ সুনীল কিছু বলে না। ভিতরে ভিতরে গজারায়ও না। কথাটা বলার জন্যে বলা বলেই ওখানেই উড়িয়ে দেয়। জেঠামশাইর চোখ মনে পড়ে। সেখানে লুকানো আছে অতীতের কোনও ঘটনা। গ্রামে এমন অতীত সব সময়ই লুকানো। প্রকৃতির ভিতরে সে স্মৃতি লুকিয়ে থাকে। তবু সুনীল জানে, এই বাসন্তীই চায়নি জয়ন্তীরও একই গ্রামে বিয়ে হোক! তবু বাসন্তীর ভিতরে সুনীল খোঁজে জয়ন্তীর স্মৃতি। সেই শোধ কীভাবে নিয়েছিল সে! সেই খেদ! তাও সুনীলের এক প্রাপ্তি। ভিতরের আগুন!

অন্তত বছর পনেরো আগে, তালেশ্বর পার হওয়ার সময় দেখে রথখোলার কোণায় বাসন্তীর স্বামী নিতাইর নৌকা। ধানের ওজন বেশি হওয়ায় জল ঢুকেছে। বটগাছতলার হবির বড়োছেলে আকবর সুনীলের নৌকার গুন টানছে। তার পাশ থেকে যাওয়ার সময়ে নিতাই চেঁচিয়ে বলেছিল, সুনীল হাজি সাবের মিলে যাইয়ে আমার নাম খাতায় উঠাস। জোয়ারের জল যেভাবে ঢুকাতাচে, আমি মনে হয় ভাটির আগে আর বাগেরহাট যা’তি পারব না। সুনীল নিতাই নাম খাতায় উঠেছিল প্রায় সন্ধ্যায়। ততক্ষণে তার ধান বেচা শেষ। নিতাই এই পৌঁছল। এখনও তার ধান মাপাতে রাত্রির এক প্রহর পার হয়ে যাবে। সুনীল বলেছে, সে আসতে আসতে দক্ষিণ থেকে অনেক নৌকা এসেছে, ম্যানেজার তখন নাম তুলতে চায়নি। ফলে নিতাইকে রাত্রে মতির হোটেলে থাকতে হয়। ভাটির টান কমতেই সুনীল নৌকা খুলে বাড়ি আসে। সুনীল জানে, সে যখন বাড়ি পৌঁছল, এখনও মাপা হয়নি নিতাই খুড়োর ধান। তবে নিতাই আজ দর পাবে ভালো। এই খুশিতে সে মন খারাপ পুষিয়ে নিতে পারবে। সুনীলকে বলেছে আজ যে সে আসবে না, সংবাদটা বাসন্তীকে দিতে।

মামা রাতের আগে আগে সুনীল সেকথা বলতে ঘরামি বাড়ি যায়। চৈত্র মাসে মাসের গরমে তখনও চরাচর ততটা নির্জন হয়নি। দূরে টু-পাখি ডাকলে সেই শব্দে একটা প্যাঁচা কোথাও পাখা ঝাপটায়। সুনীল মল্লিকবাড়ির সামনের ঘরামি বাড়ির সাঁকে পার হয়। ডান কোণায় নিতাইয়ের ঘরের দিকে যেতে যেতে ডাকে, ‘ও বাসন্তী!’ যেন জয়ন্তীকেই ডাকল সে। না, তা কী করে হয়। সুনীল জানায়, ‘খুড়া আইজকে আসপে না। তালেশ্বরে যাইয়ে নৌকায় জল ঢুকিচে!’ বাসন্তীও বুঝেছে, এতক্ষণ আসেনি যখন আসবে না আজ। অতগুলো ধান নিয়ে গেছে, বিক্রির পরে সঙ্গে অত টাকা! মানুষটার জন্যে সে উৎকণ্ঠাই ছিল! সুনীল বলায় বাসন্তী নিশ্চিত। তাকে বসতে বলে। হারিকেন নিভিয়ে বারান্দায় কোলের ছেলেকে নিয়ে ঘুমিয়েছে। তখন হঠাৎ সুনীল গলা নামিয়ে, ‘খুড়ি দেলা না তোমার বুনরে! সেই জন্যি এই মাঝবাত্তিরেও দেকতি আসি।’ বাসন্তী আড়মোড়া ভেঙে বলে, ‘সেয়া বুজজি। নয় বাগেরহাট দিয়ে ফিরে বাড়ির ঘাটে নাও বান্ধার আগে এই খালপাড়দে গলা উঁচু কইরে কইরে যাইতা।’ সুনীল কী বলবে? ঘরামিবাড়ির দুই দিকেই কাল। সে ভাসার পথে আসুক কি চারখালির পথে গোড়াখাল হয়ে আসুক, বলে যেতে পারত। তখন বলবে না বলেই এত রাতে এসেছে। তখন বললে আসার উছিলাটাই থাকত না। সুনীল বলে, ‘বোঝাজো? তোমার বুইনরে দেহি না কতকাল। সেই জন্যে তোমারে দেহি।’ বাসন্তীর কী হয়ে! সে বলে, ‘দেহো এই রাত্তিরে কী জ্বালাইয়ে দেকপা?’ অন্ধকারে নীচু গলায় বাসন্তীর কথা ও হাসির অর্থ সুনীল বুঝতে পারে। একথায় প্রশ্রয়। সুনীল বাসন্তীর কথার সায় দিতে মুহূর্তে তার মশারির ভিতরে ঢুকে পড়ে।

কিন্তু তাতে কি আগুন নিভেছে? অপ্রাপ্তির খেদ কি তাতে যায়? নিতাই খুড়ো বিছানাপড়তা, তার ভাইঝি অপর্ণার সঙ্গে রসিকের দোকানের সামনে দেখা হলে জানতে চেয়েছিল। জেঠামশাইয়ের সেই জেদ! তাতে কার কী কী হয়েছে? জয়ন্তী উত্তরদেশে (চিতলমারি) কোন বাড়ির বউ। কতবার সেদিকে গেছে সে, সেই বাড়ির পাশ দিয়ে এসেছে, তবু ঢোকেনি।

আজ সঞ্জয়কে সে যদি লাঠিপেঠা করে, তাতে কী হবে? কিংবা রচনাকে বোঝালেই-বা কী? সুনীলের সুজন সখি সিনেমার কথা মনে পড়ে। সিনেমার মতো জীবন নয়, কিন্তু সিনেমার মতো কত ঘটনা প্রতিদিনই এই জীবনে ঘটে যায়!

ফলে কাছারিঘর রেখে বাড়ির ছোট্ট নারায়ণ মন্দিরের পাশে দাঁড়িয়ে সুনীল যখন সোমাকে ডাকে, তখনও কিন্তু সে জানে না সঞ্জয়কে কী বলবে। তাই ভাবে মায়ের সঙ্গে কথা বলার আগে সে স্বপনের বউ দীপার সঙ্গে কথা বলবে। দীপা কিছুটা হলেও নিরপেক্ষ। যদিও এখন নিরপেক্ষ অনিরপেক্ষয় কিছু যায় আসে না। রসিকের দোকানের সামনে গেলে তাকে রণজয়ের সামনে মাথা নীচু করেই কথা বলতে হবে। তার ভাইয়ের জন্যেই মেয়েটা মার খেয়েছে। সঞ্জয় বয়েসে বড়ো। একদিকে গ্রামে খোঁচানোর লোকেরও অভাব নেই। তারা সুনীলকে এককথা বলবে তো রণজয়কে অন্যকথা। মল্লিকরা গুষ্টিতে লোকও বেশি। আবার ওই খোঁচানো পার্টি সমাজকে দুইভাগ করতেও ওস্তাদ। বাড়িতেই আছে এক দেবু- সেই যে কখন কোনদিক ভগবানেরও বোঝার সাধ্যি নেই। তবু সে দীপার সঙ্গেই আগে কথা বলবে। তাছাড়া সঞ্জয় এখন বাড়িতে নেই। ঘরামিবাড়ির পিছনের অথবা ক্যাম্পের মাঠে খেলতে গেছে। এটা ভালো, গ্রামে এসে ফুটবল খেলতে যায়, তাস পিটায় নাÑ এ ব্যাপারে সুনীল সঞ্জয়কে সমর্থনই করে। কচুয়া থাকলে কার না কার মটোর সাইকেলের পিছনে কোথায় কোথায় দাবড়ে বেড়াত তার ঠিক আছে?

কিন্তু সুনীল দীপার সঙ্গে কথা বলেও আপাত কোনও সমাধান পায় না। নিজের জীবন দিয়েই বুঝেছে। কান্তিময়ের ঘটনা ফিকে হলেও সামনে আছে। আছে এ বাড়িতে বিজলির ঘটনা। আবার উলটোও তো আছে। পুলক আর রিক্তা, কিংবা সে পর্যন্ত ভাববার আগে বীরেন্দ্রনাথ সুনীলকে বলে, ‘তুই ওরে কাইল সকালেই কচুয়া নিয়ে যা।’

তাই। কিন্তু তাতে কোনও সমাধান হবে না, সে জানে। সঞ্জয়ের জন্যে অপেক্ষা করে। স্বপন এসে বলে, অমলের দোকানের সামনে দেখেছিল। ডাকেনি। সুনীল জানে, ওখানে বিস্কুট খেয়ে পেট ভরবে না। খিদে লাগলেই আসবে।

সঞ্জয় আসে বেশ রাত করে। সবার খাওয়া শেষ দীপা তার ভাত ঢাকা দিয়ে বসে আছে।

এদিকে সুনীলের আর দোকানের কাছে আড্ডা দিতে যাওয়া হয় না। উঠোনে সঞ্জয়কে দেখেই সে বলে, ‘কাইল ভোরেই তুই আমার সাথে কচুয়া যাবি।’

এজন্যে সুনীলের পার্বতীর কাছে যেতে রাত আরও গভীর হয়।

 

সাত

হরিসভা মন্দির সরানোর নিয়ে কবেকার সাড়ে আট আনি সাড়ে সাত আনি জমিদারি ভাগ বাঁটোয়ারা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে!

সেই কোন্ কালে প্রতাপাদিত্যের বংশধরদের একজন গন্ধর্বনারায়ণ রায় মঘিয়ায় বসতবাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। লোনা-জলা-বাঁদাÑ সুন্দরবন সন্নিকটবর্তী এই অঞ্চলে তাদের জমিদারি এক সময়ে শরিকি বিবাদে দুই ভাগে ভাগ হয়েছিল। লোকমুখে ছেটো তরফ আর বড়ো তরফ। বড়ো তরফ বড়ো : সাড়ে আট আনা; ছোটো তরফ ছোটো, সাড়ে সাত আনার মালিক। এলাকার জনজীবনে সে-ভাগের প্রভাব পড়ে। হিন্দুস্থান-পাকিস্তানের আগে ফকিরহাটের মৌচাভাগে যে কৃষক সম্মেলন হয়, সেখানে এই গ্রাম থেকে যারা যারা যোগ দিয়েছিল, তারা জমিদারের চক্ষুমূল হয়েছিল। আবার বাগেরহাটের দশানি কিংবা রায়কাঠি কিংবা এই কচুয়ার সাংদিয়ার জমিদারবাড়ির কেউ কেউ সেই সম্মেলনের সঙ্গে যুক্তও ছিল। জমিদারি ব্যবস্থার বিলোপে তাদের ‘কমিউনিস্ট’-করা উত্তরাধিকারীরা ভূমিকা নিয়েছিল।

কিন্তু এই এলাকায় সে ব্যবস্থা বিলোপেরও বহুদিন পরেও তরফের হিসাব জারি আছে। শিশির রায়চৌধুরীই মোটামুটি পরিচিত জমিদার বংশের শেষ প্রতিনিধি। পাকিস্তান পর্বেও সে ছিল। তার ঠাকুরদার আমলে জমিদারি দুই ভাগে ভাগ হয়েছিল কিংবা তারও আগে। লোকমুখে আজ তা বড়ো রাজবাড়ি আর ছোটো রাজবাড়ি। ছোটো রাজবাড়ি একটু পশ্চিম দক্ষিণে, আজকে কাউন্সিলের আগে; বড়ো রাজবাড়ি পুব-উত্তরে। মাঝখানে খাল ও ফসলি জমি। বড়োপুকুরিয়া থেকে দক্ষিণ দিকে এগোলে বড়ো রাজবাড়ি, খালের ওপারে, সেই অংশ বড়ো তরফ; আর এদিকে মাহতাবউদ্দিন চেয়ারম্যানের বাড়ির দিক থেকে কাউন্সিলে গেছে যে পথ কিংবা ভাসা থেকে আসা বড়ো রাস্তা- যেটা রাস্তাখালের গোড়া থেকে পুবে ঘুরে আবার দক্ষিণে কচুয়ায় গেছেÑ সেখানে ছোটো রাজবাড়ি। এই হিসাবে বটগাছতলা থেকে নেমে ডানের হাতায় হবি তরফদারদের বাড়ি, পরে যথাক্রমে প্রণবেশ হাজরার বাড়ি, জগৎ ম-ল, কেষ্ট ও রণজয় মল্লিকের বাড়ি, তারপর বীরেন্দ্রনাথ হালদারের বাড়ি আবার ঘরামি ও ম-লবাড়িÑ এ সবই ছোটো তরফের; লোকমুখে সাড়ে সাত আনির। আবার খালের ওপারে ইসমাইল দফাদায়ের বাড়ি, তারপর মল্লিকদের তিনঘর, ঘরামি বাড়ি হয়ে এইখালের একটি অংশ গোড়াখালে গেছে, উলটো পাশে মাতাবাড়ি ও মাঝিবাড়ি, মাঝিবাড়ির পরে ও আগে মল্লিকদের দুই শরিক- তারা সাড়ে আট আনি। তারপর ওই পুবমুখী খাল ধরে গোড়াখালে যেতে ডানের হাতায় মলঙ্গিবাড়ি, এ পাশে আর প্রায় সবটাই তারা। উলটো দিকে অর্থাৎ ঘরামি বাড়ির পিছনে মাতাবাড়ি, খাঁবাড়ি, ম-ল আর হাজারাদের জ্ঞাতি গুষ্টি। একদিকে ক্যাম্পের মাঠ থেকে মলঙ্গি বাড়ি সমান্তরাল আঙ্গারমানিক পর্যন্ত। এদিকে ঘরামিদের পিছন থেকে আর একটি রাস্তা খাঁ-বাড়ির পরে উঠে ভাসার হাটখোলার কাছাকাছি। এই জমির এই বিন্যাসে তারাও বড়ো তরফের। এদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমে এদিকে ধোপাখালি ও দিকে গজালিয়া পর্যন্ত ছোটো তরফের।

মন্দির সরানো নিয়ে ছোটো তরফের বড়ো তরফের সামাজিকতার, যা গ্রামের ভাষায় ‘সামাজিতা’, কোনও কারণ ঘটত না। কিন্তু সুনীল অথবা শ্রীধর জানিয়েছে, সরকার মন্দির উন্নয়নের জন্যে টাকা দিতে পারে। ওদিকে দীনেশের কাছে অনিমেষও বলেছে, সে একটা ব্যবস্থা করবে। অনিমেশের মতো অফিসার চাইলে তার অথবা অন্য যে কোনও মন্ত্রণালয় থেকে সাহায্য দিতে পারে। এই আসনের এমপি কর্নেলসাহেবকে সে বললেও একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। যদিও গ্রামবাসীর কাছে এ সবই বড়ো বড়ো মানুষের ব্যাপার। এমনকি রণজয় কিংবা অবিনাশ যখন তাই বলে, তারা সম্মতি না-দিয়ে পারে না। তবু এইটুকু তো তারা বোঝে, মল্লিক আর ম-লবাড়ির মাঝখান দিয়ে প্রথমে পশ্চিমে তারপর মন্দিরের পরই দক্ষিণমুখে যাওয়া এই রাস্তার পাশে তাদের হরিসভা মন্দির বড়ো বেমানান। হয়তো বেমানান হত না, যদি কাউন্সিল থেকে এই রাস্তাটা সদর হত, যদি এদিকে কোন হাট বা গঞ্জ মতন থাকত। কিন্তু কাউন্সিলর থেকে তালেশ্বরের দিকে রাস্তাখালের গোড়া থেকে সোজা উত্তরে ভাসার দিকের রাস্তাটা ধীরে ধীরে বড়ো রাস্তা হবে, উঁচু হবে, সেখানকার আশেপাশের জমির দাম বাড়বে। কচুয়া থেকে রওনা দিয়ে ওই রাস্তার পাশেই কাউন্সিল অফিস, হাইস্কুল, জমিদারদের জোড়া মন্দির ভাসা পর্যন্ত যেতে দুটো প্রাইমারি স্কুল, কাউন্সিলের পরে একটা মাদ্রাসাÑ সবমিলে সেটা সদর হলে ভালো। সে ক্ষেত্রে এই মন্দিরটা একটু ভিতরের দিকে। তার চেয়ে ওই বটগাছতলা থেকে সোজা অর্থাৎ উত্তর-দক্ষিণের এই রাস্তায় মল্লিকবাড়ি সামনের ফাঁকা জায়গায় মন্দিরটা এলে অনেকখানি সদর হয়। এই দুই তিন গ্রামের খাল পাড়ের এপাড়া ওপাড়া মিলে একটাই মন্দির, তখন সেখানে যদি সরকারি সাহায্য পাওয়া যায়, তাহলে বড়ো দালানও তোলা যাবে। যদিও গোড়াখালে মলিঙ্গিরা ক্যাম্পের মাঠের পাশে ঘরামিবাড়ি কোণায় একবছর বারোয়ারি দুর্গাপূজা করেছিল। ও পূজা সরকারি সাহায্যে কি নিজেদের উদ্যোগে হতেই পারে। কিন্তু স্থায়ী হরিসভা মন্দির তো দরকার। এ গ্রামে বৈষ্ণবভাবাপন্ন মানুষই বেশি। কথায় কথায় মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য আর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম নেওয়া লোকের অভাব নেই। যদিও পুবের গ্রাম বড়ো ও ছোটো আন্ধারমানিক কিংবা চরসোনাকুড় ও কুচিবগা হিন্দুপ্রধান হলেও সেখানে হরিসভা মন্দির কম, থাকলেও তা ব্যক্তি উদ্যোগে, সেখানকার নমঃশূদ্ররা ধনী। বলেশ্বরের চরে জমি অনেক। এই ইউনিয়নের গোটা পুব দিক অন্তত দুই আড়াই শতাব্দী ধরে বলেশ্বরের চরেই গড়ে উঠেছে। আবার কচুয়ার ঠিক উত্তর পাড়Ñ শপথকাঠি-সম্মানকাঠি অন্তত পঞ্চাশ বছর ধরে বলেশ্বরের ভাঙনের শিকার, সে জায়গার উলটে দিকের মলঙ্গির চর দিনকে দিন বাড়ছে। সেখানে বলেশ্বর হারে শুকিয়ে যাচ্ছে তাতে বড়ো আন্ধারমানিক কোণায় বৈরাগীর হাট পর্যন্ত নদী আর নদী থাকবে না, খালে পরিণত হবে!

মল্লিকবাড়ির পিছনের হরিসভা মন্দির নিয়ে কথা উঠলে গোটা ইউনিয়নের অবস্থাই সেখানে কথায় কথায় ওঠে। যদিও এই এলাকার মানুষ নিজেদের একদা জমিদারি ব্যবস্থার ভাগ অনুযায়ী নিজেদের যে আলাদা আলাদা তরফে ভাগ করে। তাই নিয়ে ঝগড়া করে। নিজেদের যে পৃথক সমাজে নয়, তখন তাদের মনেও থাকে না। বর্ণহিন্দু জমিদাররা তাদের নিম্নবর্ণের এই রায়তদের নিজেদের প্রয়োজনেই ভাগ করেছিলেন, জমিজমার খাজনা আদায়ে তাদের সুবিধা হত। প্রতিটি পৃথকীকরণেই শাসনে সুবিধা। যদি অমল জোর গলায় বলে ঠোঁট উলটায়, ‘একদিন যাগো বাড়ির সামনে দিয়ে আমাগে মতন রোমাসোমারা জুতো পায় দিয়ে হাঁটতি পারতাম না, ছাতি মাথায় দিয়ে যা’তি পারতাম না- তাগো ভাগ নিয়ে এহোনো নিজেগো মদ্যি বিবাদ করি!’Ñ সে কথায় এখন কান দেওয়ার লোক কম। কারণ এখানেও তো সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। অমলরা কেষ্ট-রণজয় মল্লিকদের জমি চাষ করে। আবার গোড়াখালের মলঙ্গিরা প্রচুর ভূসম্পত্তির মালিক। তাদের তিন শরিকি বাড়িতে অন্তত জনা তিরিশের পরবাসী আসে ধান কাটতে। সে গুষ্টির বড়োভাই অনিমেশ সরকারি অফিসার। তাদের প্রায় আধা কিলোমিটার বাড়ি সামনের রাস্তায় একখানা করে ইট বিছানো। সামনে থেকে হেঁটে গেলে বোঝা যায় এই মলঙ্গিদের সীমানা শুরু হল। সে রাস্তার দুপাশে পুরোটাই পাতাবাহার গাছ। মাঝখান দিয়ে ইটলাছা দুটো পথ দুই বাড়িতে ঢুকে গেছে। বাড়ি সীমানা শেষ, তখন বড়ো পগার। সাঁকো পেরিয়ে আঙ্গারমানিকের রাস্তায় পড়ো, যদিও ডানে বামে প্রায় সব জমিই তাদের।

এদিকে ওই গ্রামের মাঝিরাও প্রচুর সম্পত্তির মালিক। দক্ষিণে এগোলে হালদার বাড়ির সামনের খালে ওপারে চারখানা শরিকি বাড়ি বাদিলে পিছনের সেই মলঙ্গিদের জমির সঙ্গে মিশেষে হরষিতের জমি। এদিকে মল্লিকদের খালের উলটো পাশে এক-দুই ঘর বাদ দিলে ঘরামিদের কেউ কিছু জমিজমার মালিক, কেউ চাকরি করে।

মাস শেষে সংসার খরচের টাকা পকেটে আসলেই জমির ওপর নির্ভরতা কমে। আবার অন্যের তুলনায় সামাজিক অবস্থানও বাড়ে। আজ কেউ মহাজন না হতে পারে, জমি-জিরাত ও বাড়িতে কাজের থাকলে থাকলে তাদের সামাজিক অবস্থান বাড়ে। উঁচু গলায় কথা বলা যায়। চাইলে কাউকে হেয়ও করার সুযোগ ঘটে।

ফলে রসিক মল্লিক যতই হরিসভার জন্যে জমি দিতে চাক আর তাতে রাঘব-রথীনার সম্মত হোক কিংবা শরিক হিসেবে কেষ্ট কি শ্রীধর-গুণধরের কোনও আপত্তি না-থাকুক গ্রামের অন্যদের তাতে আপত্তি জানাতে, একে ওর তাকে এর কথা লাগাতে তো তাদের কোনও আপত্তি নেই। তাতে এমন একটা কাজ যদি পিছায় পিছাক। পরিতোষ উলটো ঠেলা দেয়ায় ওস্তাদ। ওদিকে রণজয়ের ঘরের প্রায় পিছনের পোতায়ই মন্দির আসবে, তাকেও অনেককিছু বিবেচনা করতে হবে। কেননা রণজয় তো জানে রসিক খুড়ো আজকে আছে কালকে নেই। একটি মেয়ে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। সে চোখ বুঝলে ওই দোকান আর এর পিছনের ঘর থাকবে না। খুদি চলে যাবে ছেলেদের কাছে। ওদিকে কেষ্ট মল্লিকের হিসাব ভিন্ন। যদিও তার এক ঘরে দুই শরিক। দুই পক্ষ। একপক্ষে কৃপাসিন্ধু আর পার্বতী, অন্যদিকে বউ সাবিত্রী আর মেয়ে তিনটি যথাক্রমে চম্পা পারুল আর জুঁই। সাবিত্রী একের পর এক মেয়ে জন্ম দিয়েই যাচ্ছে। কেষ্ট তাকে বাদ দেওয়ার কথা বললে বলে, তার ছেলে লাগবে। সেই কারণটাও কেষ্টর জানা আছে।

ফলে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে এই : এখন রসিক মল্লিকের কোনও আপত্তি নেই। আগে রাঘব আর রথীনের ঘরের ঠিক পিছন পাশে যেখানে একটা ছোটো পগার রেখে হরিসভার সীমানা শুরু, সে জায়গায় আট কাঠা মতন জমি রসিকের, সেখানেই মন্দিরের ঘর দুটো ও সামনে খেলার জায়গা, সামনের বাকি জায়গা মল্লিকদের এজমালি, এর দক্ষিণের জমি হালদারদের, তাও শরিকি। এখন মন্দির খালপাড়ে রাস্তার কাছে এলে, সামনে রাঘব-রথিনদের যে জায়গায় সেই বাবদ রসিকের ওই জায়গা তারা নেবে। উঠোনে ঢুকতে বাঁ-দিকে কেষ্টর জায়গা আছে কিছু, রসিকের দোকানের পরে রণজয়ের ঘরের দিকে রণজয় আর শ্রীধরদেরও আছে কিছু জায়গা। গ্রামের সবাই প্রয়োজনে চাঁদা দেবেন ওই জায়গার দাম বাবদ।

কিন্তু রণজয় আপাতত মন্দির সরানোর পক্ষে নয়। সে শ্রীধর আর গুণধরকে কারণটা বলেছে। এদিকে কেষ্ট রাজি হলেও রাজি নয় পার্বতী ও কৃপাসিন্ধু। আর তলে তলে নিমরাজি সাবিত্রী। সে কারণ একেবারেই ভিন্ন।

সেই পহেলা বৈশাখ সন্ধ্যায় সারাদিন নগরকীর্তনের পরে কেষ্ট মল্লিক একটা হারিকেন জ্বালিয়ে গ্রামের উত্তর মুখে ওই বটগাছতলার দিকে হেঁটেছিল, সঙ্গে ছিল জগৎ মণ্ডল। সেদিন দুজনকে যদি কেউ প্রশ্ন করেও থাকে, কোথায় যায়? তারা তা বলেনি। একনিষ্ঠ ভাগবৎপাঠক কেষ্ট পাঞ্জাবি ও বারো হাত ধুতি পরে বেশ বাবু সেজে জগতের সঙ্গে যাচ্ছে, অনেকেই মনে করেছিল নিশ্চয়ই ভাসার কোনও বাড়িতে ভাবগৎ পাঠ! আজ সেই গল্প অনেকেরই জানা। পরদিন সকালে অথবা সকাল নয় তখন ভোর- তারা ফিরেছিল সাবিত্রীকে নিয়ে। সাবিত্রী কেষ্টর নতুন বউ! তখন কেষ্টর বড়ো ছেলের বউ পার্বতী তিন মাসের পোয়াতি। তখন সাবিত্রীকে দেখে অমল বলেছিল, এ তো পাণ্ডাপাড়ার সাবিত্রী। ভাসার পরের গ্রাম ছিটবাড়ি, তারপর পাণ্ডাপাড়া থেকে সাবিত্রীকে আনতে সেই যে দুজন গিয়েছিল, সে বাড়িতে বিয়েও হয়েছে, সাবিত্রীর নতুন বউয়ের সাজ, প্রত্যেকের চোখে রাত্রি জাগরণের নমুনা। কেষ্টর হাতে নেভা হেরিকেন আর জগৎ ম-লের হাতে একটা নতুন ছাতি। কাল সন্ধ্যায় বেরুবার সময়ে জগৎ মণ্ডলের হাতে কোনও ছাতি ছিল না, এই ছাতিটা কেষ্টকে শ্বশুরবাড়ি থেকে দিয়েছে। আর তো কিছুই নেই। যদি কিছু থেকেও থাকে তা পরে আসবে। অথবা আসেনি কিংবা কেষ্ট মল্লিক আনেনি। তার শুধু সাবিত্রীকেই প্রয়োজন। তার বাঁচার ইচ্ছেহীন জীবন এখন সাবিত্রীর হাতে। সে শুধু সাবিত্রীকে চায়। তাহলে অমন জীবন আরও কিছুদিন হয়তো কাটিয়ে দিতে পারবে।

কিন্তু সাবিত্রীর বাপ ভাইয়ের খুড়া জেঠারা তো কিছু শর্ত দিয়েছে। নয়তো একে দোজবর, তার উপর অত বড়ো ছেলেÑ অমন লোককে ছেলের বয়সের ছোটো একটি মেয়ে দেয় কেউ? একটা তো সবার জানা, সাবিত্রী বাঁ পায়ে একটু খাটো। সে পা খুড়িয়ে হাঁটে। সেই জন্যেই নাহয় তাকে যেনতেন ভাবে বাপ-ভাই পাত্রস্থ করেছে। কিন্তু সেটি তো একমাত্র কারণ হতে পারে না। সেই সংবাদ অবশ্যি তখনই কাউকে বলেনি কেষ্ট।  যে মধ্যস্থতা করেছে সেই জগৎও কাউকে বলেনি। এমনকি তার বড়ো ছেলে অমলকেও নয়।

তবে ওদিকে তখন ঘনঘন যাতায়াত ছিল পরিতোষের। তাছাড়া মানুষের ভিতরের খবরাখবর সে ভালোই রাখতে পারে। সে-ই প্রথম গ্রামে জানায়। রসিকের দোকানের সামনে খালপাড়ে দাঁড়িয়ে পরিতোষ অমলকে বলে, ‘এ অমলকা, জগৎভাই তোরে কিছু কইনি?’ না অমলকে কিছুই বলেনি জগৎ ম-ল। তাছাড়া এ প্রশ্নে বোঝা তো যায়নি কী বিষয়ে। তখন রসিকের দোকান থেকে উঠোনের দিকে যাচ্ছিল সাবিত্রী। পরিতোষ তাকে দেখায়, ‘এই যে লেঙ্গিরে কী শর্তে বিয়ে করিছে কেষ্টকা?’ অমল তখনও পরিতোষের মুখের দিকে তাকায়। তার তো জানার কারণ নেই। সে তো পরিতোষের মতো গ্রামে গ্রামে ঠেলা খেয়ে বেড়ায় না। তার হাতে কাজ থাকে ও আছে। মাঠের মানুষ। কিছু জমিজমা চাষ করে বাপ-ভাই নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে কি না সেই চিন্তায় অস্থির। মায়ের অসুস্থতায় দেনা-দায়িক হয়েছে। জমি বান্দা দিয়েছে, বিক্রি করেছে। এখন অসহায়। ছোটো ভাইবোন দুটো পড়ে। অক্ষয় তার সঙ্গে জোগাল দেয় সব কাজে। বোনটা বড়ো হচ্ছে, বিয়ে দিতে হবে। তার মতো মানুষের এত কিছুতে এত রহস্য আর খোঁজ নেয়ার সময় নেই। অমলের ভাষায় সে কোনও কিছুতেই জইড় (জড়তা/প্যাঁচ) পছন্দ করে না। সবকিছুতেই সমাধানে আসা দরকার। মানুষ যেন চারটে খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারে। যা দিনকাল পড়েছে, এই দেশে কতদিন থাকতে পারবে! সেই ভাবনাও তাকে ভাবতে হয়।

কিন্তু পরিতোষের রহস্য করা তাতে কমে না। অমল ভাবে, কর রহস্য, ভাই তোরা এক গুষ্টির মানুষ! তোগে গুষ্টির খবর তোর ডালপালাছাল ছড়িয়ে নিয়ে বেড়া!

পরিতোষ বলে, ‘দুই বিঘা জমি লিখে দিতে হইচে লেঙ্গিরে।’

এবার অমল দম ছাড়ে। চোখ বেড়ো করে। বাপের মতো সেও একটু ঘাড়ে কুঁজো। এই সংবাদ শুনে সে ঘাড়টাও একটু খাড়া হয়ে গেল।

পরিতোষ আরও জানায়, কোন্ কোন্ দাগে সেই জমি। এই বাড়ির উপরে চার কাঠা। দক্ষিণে ষোল কাঠা। কোন্ কোন্ দাগে তাও বলে দেয়। অমল সে জমি পরিতোষের চেয়ে ভালো চেনে। কোনটায় কেমন ধান হয় জানে। ফলে সাবিত্রীর বাপ খুড়োরা মেয়েটাকে একেবারে জলে ফেলেনি তাও সে বুঝতে পারে। নাকি এই ব্যাপারে তাদের বুদ্ধি দিয়েছে তার বাপ জগৎ। চট্ করে সেকথাও তার মনে আসে। কিন্তু তা তো পরিতোষকে বলা যায় না। পরিতোষকে অবশ্যি আর কিছুই বলার দরকার পড়ে না, কিছুক্ষণ বাদে এই দোকানের সামনে আসা সবাই একে একে জেনে যাবে। এমনকি ‘ও বউদি-’ বলে ডাক দিয়ে এই সংবাদ সে পার্বতীকে দিতেও বাদ রাখবে না।

রাখেনি। সেই সন্ধ্যার পর পর মল্লিক বাড়ি উঠানে সাবিত্রীর গলা শোনা গেছে। সাবিত্রীরও। কেষ্ট মল্লিক হরিসভা থেকে ফিরে হারিকেন হাতে ঠাঁয় দাঁড়িয়েছিল। শীর্ণদেহী মানুষ তখন যেন আরও শীর্ণ। পাশে দাঁড়ানো সবল ও দীর্ঘদেহী তার কাকা রসিকের প্রায় কোলে ঢুকে যাচ্ছিল। যতবার কৃপাসিন্ধু পোয়াতি পার্বতীকে টেনে ঘরে নিতে চায়, ততবার সে হাত সরিয়ে দেয়। শ্রীধরের বউ ছবিও টেনে নিতে পারে না। গুণধর বাড়িতে ছিল না, থাকলে উভয় পক্ষকেই কথা শোনাত। রথীন একবার এসে দাঁড়িয়ে ঘরে চলে গেছে, নাকি তার মা ডেকেছে। তার বোনটা ছবি-শ্রীধরের ছেলে সানিকে নিয়ে, সেও নিজেদের ঘরে যায়।

সাবিত্রীর পক্ষে সবাই। তারা ভেবেছে, এই জায়গা সম্পত্তি এতো সবই কেষ্টর ওয়ারিশরাই ভোগ করবে। তবে অনেকে দুজনার আলাদা আলাদা সংকট বুঝতে পারে। এও বুঝতে পারে, সাবিত্রী অসহায়। আর পুতের বউ হিসেবে পার্বতী এর শোধ তুলবে।

এখন যেন সেই সুযোগের কিছুটা। যদি মন্দির এখানে আসে তাহলে জায়গাটার গুরুত্ব বাড়বে। তাহলে মন্দিরের সম্পত্তিতে কেষ্ট কেন তার সামনের জায়গা দেবে? একথা পার্বতী তোলেনি, তোলার সুযোগ তার নেই। তবে সাবিত্রী ঠিকই তুলেছে। ফলে কেষ্ট মল্লিক এখন কোনও পক্ষেই নয়। পার্বতী ভাবে যদি গ্রামের সবাই মিলে ওই সবটুকু জায়গা নিয়ে নেয়, তাহলে আরও ভালো হয়! সাবিত্রীর ক্ষমতার বিলোপে পার্বতীর শান্তি।

যাক, আপাতত তা ঘটল না। গোড়াখাল আগাখাল আর খালের ওপাড়ের সঙ্গে একবারে এপাড়ের উত্তরধার দক্ষিণধারের কোনওকিছুর এক আলোচনায় শালিসে বৈঠকে সমঝোতা হয়েছে এমন খবর খুব নেই। নেই বলে সেই সাড়ে আটআনি সাড়ে সাতআনির হিসাব সামনে আসে। তাতে সহজেই দুই পক্ষ হয়। তাতে গ্রামীণ সামাজিকতা কিছুদিনের জন্য টোল খায়। এমনকি তাতে কেউ কেউ বাপ-মার শ্রাদ্ধ নিজের সমাজ নিয়ে করে, কেউ মেয়ের বিয়ে দেয় শুধু জ্ঞাতিগুষ্টি নিয়ে, ছেলের বিয়ের বরযাত্রী যায় নিজের সমাজকে জানিয়ে। তাতে আবাল্য বন্ধুর বন্ধুত্ব আপাতত স্থগিত থাকে। অথবা সে ব্যবস্থা একই থাকে, সমাজের এই বিধান সবাই মেনেও নেয়।

তবে সবচেয়ে সংকট সৃষ্টি হয়, সাড়ে আট আনি সাড়ে সাত আনির ভিতরে এক পাড়ার সঙ্গে অন্য পাড়ার বিরোধ আর সামাজিকতার হিসাব ঢুকে পড়লে। এই যেমন, হরিসভা স্থানান্তরে গোড়াখালের আপাতত বিরোধের সঙ্গে সবাই যেমন জানতই, কিন্তু এখন এই ঘটনায় হালদাররা আর মণ্ডলরা গেল একদিকে। তাদের সঙ্গে মাঝিরা। ওদিকে মল্লিকদের সঙ্গে হাজরারা। আবার ঘরামিরা কোনও পক্ষেই নেই। গোড়াখালের মলঙ্গিরা হালদারদের আত্মীয় হলেও এক্ষেত্রে তারা গোড়াখালের।

ফলে, সমস্যায় পড়েছে রসিক মল্লিক। মানুষটা নির্বিরোধ, নাম রসিক, কিন্তু কথাবার্তায় অতটা রসিক সে নয়, তার তুলনায় তার ভাইপো কেষ্ট রসিকতা জানত ভালো, এখনও জানে। তার স্ত্রী সাবিত্রী একের পর এক মেয়ে জন্ম দেওয়ায় নাতি স্থানীয়দের কাছে তার রসিকতার মাত্রা বেড়েছে। তারা যেন সেই বছর দশেক আগের কেষ্টকে আবার পেয়েছে। সে তারই মতন এক লোকের গল্প বলে। ক্যাম্পের রাস্তার এপাড় ধরে সে গোড়াখাল থেকে আসছিল। তখন অংশুমান, অনির্বাণ রাতুল মিন্টু সব খেলতে যায়। কেউ সম্পর্কে তার নাতি, কেউ ভাইপোস্থানীয়। যাক তাতে এমন মজার গল্প বলায় কেষ্টর বাধে না। এক লোকের বউয়ের পর-পর শুধু ছেলে হয়। ঠিক তার উলটো। প্রথমজনের নাম রাখে পীতাম্বর, পরের জন নীলাম্বর, তার পর রেখেছে দিগম্বর। বউ তার আবার পোয়াতি। এরপর আবারও যদি ছেলে হয় তাহলে নাম পাবে কোথায়? এই চিন্তায় লোকটা অস্থির। তখন তার এক বন্ধু বলে, ‘দোস্ত, চিন্তা নেই। তোমার ছেলে যতই হোক নাম নিয়ে চিন্তা নেই। নাম আমি দিতে পারব!’ লোকটি জানতে চায়, ‘কীভাবে?’ তখন তার সেই বন্ধু জানায়, ‘কেন, এরপর যে হবে তার নাম রাখবে সেপ্টেম্বর, তারপর অক্টোবর, তারপর নভেম্বর, আর ডিসেম্বর। অন্তত আর চারজন পর্যন্ত নাম নিয়ে কোনও চিন্তে নেই!’

শুধু ভাগবৎ পাঠকই নয় কেষ্ট। রস আছে। এ গল্প শুনে ছেলেরা হাসে। তাকেও চিন্তা করতে মানা করে। বলে, তার জ্ঞাতি খুড়ার নাম রসিক না হয়ে তার নাম রসিক হওয়া উচিত ছিল। তবে কেষ্টও তা তাদের রস দিয়ে সমাধান করে। খুড়া আগে জন্মেছে তাই নামটা আর তার পাওয়া হয়নি। তবে ভগবান পার্থসখা শ্রীকৃষ্ণের নামে তার নাম। সেও কি কম রসিক ছিল? অর্জুনের সঙ্গে কত পদের রঙ্গ রসিকতা সে করেছে। করেছে অষ্টসখির সঙ্গেও, নামগুলো সে এক নিশ্বাসে বলে। তখন ওই ছেলেদের কেউ যদি তাকে সেই রসিকার কোনটা করতে বলে, তাহলে আগের দিন হলে সে নৌকাবিলাসের একটু কিংবা গোপীদের বস্ত্র চুরির কোনটা বলত, কিন্তু এখন আর সে কেষ্ট মল্লিক নেই। সে তাদের খেলতে যেতে বলে। আর নিজেও বাড়ির দিকে এগোয়। চম্পার মা পারুল আর জুঁইকে সামলাতে পারছে না।

এই কেষ্ট মল্লিকের কাকা রসিক যত গম্ভীর হোক, লোকটির জীবনে দুঃখের তো সীমা নেই। আবার সদাআনন্দে থাকার বিষয়ও যেন সে জানে। একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়ে, জামাইকে জমি জমা কিছু দিয়েছে। শালিকা খুদিকে নিয়ে থাকে। খুব যে ভালো আছে তাও না। সে-ই সেধে তার ওই জায়গাটুকু হরিসভা মন্দিরকে দিতে চেয়েছে তাতে গ্রামের লোকজন তাকে দাম ধরে কিছু দেয় তো দেবে। সে হিসাবও হয়নি। কিন্তু তার আগেই এই ক্যাচাল ও সামাজিকতা, এই বিয়ে এটা ওটা! মন্দিরটা কাঠের কাঠামোয় দাঁড়িয়ে আছে। নাড়ার চাল, পাশেরটা গোলপাতার। কবে যে এগুলো ঠিক হবে? কবে এই রাস্তার পাশে আসবে? সরকারি অনুদানে পাকা দেয়াল হবে? রসিক তা দেখে যেতে পারবে তো?

তা সে পারুক কি নাই পারুক, এই ঘটনার সমাধান তো একটা হওয়া দরকার। সামনে শ্রাবণ ভাদ্দর। তারপরই বড়ো পূজার দিন, তার আগে মন্দির এখানে আসবে না? রসিকের মনে হয়, এই জীবনে সে তা দেখে যেতে পারবে না। সেকথা খুদিকে বললে, খুব নীচু গলায় খুদি তাকে বলে, ‘তোমার কাজ তুমি করিচো, ভগবান তো দেহিচে। এহোন হবে এট্টাকিছু!’

‘কী জানি। দীনেশ যে প্যাচ কষিছে!

‘প্যাচ আমাগে পরিতোষও কম জানে না।’

‘তাও।’

সাড়ে আট আনি সাড়ে সাত আনির কোনও সমাধান আসলে কারও জানা নেই।

 

আট

সাড়ে আট সাড়ে সাত আনির সামাজিকতার জেরে মন্দির নিয়ে বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত হয়। গ্রামে সম্মিলিত বসার জায়গা তেমন নেই। বড়ো কাছারিঘর আছে মলঙ্গি বাড়িতে। দীনেশের প্রস্তাব অনুযায়ী সেখানেই বসার সিদ্ধান্ত হয় এক শুক্রবার। অন্যদিন হলে যারা চাকরি করে তাদের পক্ষে থাকা অসম্ভব। আবার জলকাদার দিন, কখন ঝেঁপে বৃষ্টি আসে তার ঠিক নেই। শুক্রবার বাদে অন্যদিন সন্ধ্যার পরে যাতায়াতের অসুবিধা ভেবে সকালেই বসা ভালো। তাছাড়া মাঠে জল উঠেছে, সন্ধ্যার পর পর টর্চ হাঁড়িকল (হাড়ি-আলো) নিয়ে মাঠে মাছ কোপাতে যায় অনেকে। সন্ধ্যায় বৈঠক দিলে তারা বেজার হবে। অংশুমান স্বপন দেবু, এদিক অনিন্ত্য অক্ষয় ধীরাজ কি পরিতোষসহ অল্পবয়সি অনেকেই ও-কাজ রেখে আসবে না।

মলঙ্গিবাড়ির কাছারি ঘরে হবে বৈঠক, কিন্তু সেখানে আলোচনায় দীনেশের গলায় চড়বে বেশি। এ নিয়ে রণজয়ের সঙ্গে পরিতোষের কথা হয়েছে। আবার হরষিতের সঙ্গে স্বপনেরও। এপাড়ায় মন্দির নিয়ে তাদের ভিতরে মতের ফারাক যতই থাক, গোড়াখালে গেলে দীনেশ তাদের একটু বেশি বলবে, তা নিয়ে কথা বাড়বে, তাও তো তাদের জানা আছে। তবু এখানেই যাবে তারা। হুকোয় কেউ দুটো টান দিতে দিতে কথা শুনবে। বড়ো ভালো তামাক কেনে দীনেশ। এখন পয়সার গরম দেখাতে নিশ্চয়ই সেরা তামাকে ছিলুম (হুকো) সাজিয়ে রাখতে বলবে তার বাড়ির কিষানদের। কেউ বলে, তামাক যেমনই কিনুক, তামাক মাখার মরচে গুড়টা ভালো কেনে ওই বাড়ির কিষান। দীনেশের বাবা এখনও ভালো তামাকের সমজদার। গ্রামে অন্যবাড়ির ছিলুমে মুখ দিলে, তার বাড়ির তামাকের মতো এই তামাকে রাগ নেই- একথা জানিয়ে দিতে ভোলে না। তারা আলোচনা করে, ছোটো চোখে পিট পিট করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কথার প্যাঁচ ধরবে বুড়াকর্তা। সেই প্যাঁচে প্যাঁচ খেলানোর জন্যে তারা সিদ্ধান্ত নেয়, জগৎ মণ্ডল আর বীরেন্দ্রনাথ হালদারকে তাদের সঙ্গে যেতে বলবে, যদি হরষিতের যতীন্দ্রনাথ মাঝিও যায় তো ভালো। সুনীলকে আসার জন্যে শ্রীধরের কাছে খবর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বীরেন গেলে সুনীল কথা বলবে কম। বিষয়টা তাও নয়, তারা ভিতরে ভিতরে নিজের সামাজিক হিসাব ঠিক করে যাওয়া স্থির করে। রসিক যেন তার কথা সাফ সাফ জানায়। সেকথাও রসিককে বুঝিয়ে বলে। যদিও খুদির হিসাবে রসিকের মতো মানুষ কোন কথায় কোন কথা কয় তার হিসাব আছে? আবার পার্বতী তাকে যা-ই বোঝাক, কৃপাসিন্ধু ভাবে সুনীলকে পেলে সব কথা একটু জেনে নিতে পারত। পার্বতীর কেন যেন মনে হয় পরিতোষ আর সুনীল তার পকেটের লোক!

মলঙ্গিবাড়ির দিকে যেতে যেতে রণজয় অমলকে বলে, ‘ভাইপো, যাইয়ে লাভ কী? কথা তো যা কওয়ার ওই দীনেশই কবে।’

অমল তো সব সময়েই সমাধানে আসার পক্ষে। তার মনে হয়, দীনেশ যত কথাই বলুক, তবু যদি পুরো বিষয়ে একটা সমাধানে আসা যায় আজকের বৈঠকে তাহলে ভালো। সঙ্গে সে এও ভেবে রেখেছে, আপাতত যদি মন্দির ওই জায়গায় থাকে, তাহলে সেও তার দোকানটা মন্দিরের চত্বরের সামনের রাস্তায় নেবে। পাশাপাশি তার আর রসিকের দোকান, সে দোকানে মালপত্তর তেমন থাকে না, রসিক দোকানটা করে একটা কিছু করা লাগে তাই, এখন অমলও প্রায় সেভাবেই করে, কিন্তু শুভার সঙ্গে তার কথা হয়েছে, একটু ভালো করে যদি করা যায়। তবে তাতে রসিকের ক্ষতি হতে পারে। তাই দোকানটা আপাতত সে মন্দিরের কোলে নিয়ে যাবে। কিন্তু সেকথা মল্লিকবাড়ির কারও সামনে এখনও তোলেনি, এমনকি জগতের সঙ্গে এনিয়েও কোনও আলাপ করেনি সে। রণজয়ের কথা শুনে সে বলে, ‘দীনেশের গলা এমনেই এট্টু বেশি, তার উপর মহাজন মানুষ, তয় তোমারে মাইন্য করে।’

রণজয়ের চোখ হাসে। সে চোখে চতুরতাও কখনও খেলে। একটু বড়ো আর গোল চোখে হাসির সঙ্গে কথা মিলে ওই চতুরতার কখনও আগেও ধরা পড়ে। এখন অবশ্যি দীনেশের তাকে মান্য করার কথায় রণজয়ের বলা কথার ধরন বদলায় না, ‘সে তো অন্য বিষয়, কিন্তু আমাদের এইদিকের ঘটনায় সব সময় গোড়াখাইলেরা বাম হাত ঢুকায় সেয়া কি ওরা বোঝে না? ঠিকই বোঝে, বোঝে বইলেই বেশি কথা কয়।’

‘তয় আইজকাল-’ হরষিত রণজয়কে বলে, ‘আরও বড়ো দুই বুদ্ধিমান গজাইকে, মামা। সে দুইজন দীনেশ মামা আর কমলেশ মামার চাইয়ে বেশি বোঝে।’

‘কেডা কেডা?’ স্বপন জানতে চায়। সম্প্রতি রচনাকে নিয়ে সঞ্জয়ের ঘটনায় হালদারদের সঙ্গে ভিতরে ভিতরে মল্লিকদের একটু দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আবার অত বড়ো করে না-ভাবলে তা মূলত স্বপনের সঙ্গে রণজয়ের। সুনীল বাড়িতে থাকে না, তার সঙ্গে রণজয়ের মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা কম, কিন্তু স্বপনের সঙ্গে দেখা হয়। স্বপন এখন একথায় ঢুকলেও রণজয়ের সঙ্গে আলাপে জড়াতে চাইল না। সে প্রশ্নটা হরষিতকেই করেছে! কিন্তু হরষিত উত্তর দেওয়ার আগেই অমল তার মিনমিনে গলায় বলে, ‘ওই দীনেশের ভাই অরুণেশ। ঢাকা ফেরত। সেই জন্যি কথায় ভাব বেশি।’

‘আরও একজন আছে, সেও চট্টগ্রাম-ফেরত।’ হরষিত বলে

রণজয় বলে, ‘বুজজি।

‘তুইও ঢাকা ফেরত, হরো।’ বলে অমল জানতে চায়, ‘কিডা, কার কতা ক’লি?’

‘বোজে নাই? ওই খাঁ-বাড়ির-’

‘শিবেন?’ স্বপন বলে।

‘হুঁÑ’ হরিষত জানায়।

‘না-না। সেয়ার চাইয়ে আর একজন, খাঁবাড়ির কূলের ঘরামিবাড়ির কল্যাণ?’

‘ওরে থামাইতে লাগত পুলকরে।’

‘পুলক আসপে না?’ অমলের কাছে জানতে চায় স্বপন।

অমল বলে, ‘আসপে মনে কয়। হাজরামশাইর শরীরডা খারাপ। সেরেই আসতে কইচেলাম। সে আসপে না মনে হয়, তয় পুলক আসতে পারে। বাপে গেলে সে জায়গায় তো পুলক কখনও যায় না।’

এই রীতি আগে খুব শক্তভাবে মানা হত, আজকাল সেই সহবতের কায়দা ধীরে ধীরে বদলে গেছে, বদলে যাচ্ছে। প্রতি বাড়ি থেকে এমন আলোচনায় যেত সে বাড়ির কর্তা। এই যে রণজয় যাচ্ছে, আর হয়তো কেষ্ট যেত। হালদারবাড়ি থেকে বীরেন্দ্রনাথ, তাহলে আর সুনীল স্বপন কিংবা অবিনাশ যেত না, এখন তো অংশুমানও যাচ্ছে। যদি মাঝিবাড়ি থেকে হরষিতের কাকা যতীন মাঝি যেত তাহলে হরষিত যেত না। বিষয়টা এমন। এখন তো সামাজিক কিংবা পারিবারিক স্তর কাঠামোয়ও বদলে আসছে। বয়েসিরা তাই হয়তো বলে, আগেই দিন ভালো ছিল, এখন কোনও কিছুতেই হিত অহিত জ্ঞান নেই। বলে, তেলের দাম আর ঘিয়ের দাম এক। বলে, ছাগলে চাটে বাঘের গাল। এমনকি এখনও বলে, সবাই নেতা! যাক, তবু স্তর কাঠামোর অন্য তফাৎ আছে। নাপিতবাড়ি থেকে তারা তো কাউকে ডাকে না। ধোপাদের দূরে রাখে। রাখে হিন্দু তেলিদের। মুসলমান মৎস্যজীবীদের নিকারি বলে, নাইয়াও বলে, কিন্তু মালোপাড়া অর্থাৎ হিন্দু মৎস্যজীবীদের সঙ্গেও তাদের দূরত্ব থাকে। কেউ কথায় প্যাঁচ খেললে বলে, এ তো দেখি কায়তি বুদ্ধি। অর্থ্যাৎ, কায়স্থর বুদ্ধি! সেই জমিদারবাড়ি পাশে তারা কয়েক ঘর থাকলেও এই গ্রামের প্রয়োজনে বুদ্ধি-পরামর্শ দিতে ডাকা হয় না। যেমন ব্রাহ্মণদের উপস্থিতি শুধু পূজা আর শ্রাদ্ধে। তাদেরও পিছনে বলে, আলোচালের বাওন। সে কথাটার ভিতরেও কোনও শ্রদ্ধা নেই। থাকে না। এমনকি যখন সকল ব্রাহ্মণকে এক পাল্লায় মাপা হয়, তখন হয়তো বিদ্যাসাগরকেও সেখানে তোলে, কিন্তু পর মুহূর্তে তা মনে করিয়ে দিলে জিব না-কাটলেও বুুঝতে পারে, তাকে একই কাতারে ফেলা ঠিক হয়নি। আর প্রতিবেশী মুসলমানদের সম্পর্কে ধারণা আরও অদ্ভুত। এই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান রমেন তাদের সম্প্রদায়ের হলেও, তার সঙ্গে মুসলমান কোনও নেতার সম্পর্ক ভালো হলে, নিজেদের ভিতরে বলবে, রমেন আজকাল মেয়াগো বুদ্ধিতে চলে! আবার প্রতিবেশী কোনও মুসলমানের সঙ্গে খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, কারও প্রতি অবিশ্বাস। কখনও গোটা সম্প্রদায়ের প্রতি তীব্র রাগ, কখনও সাদ্দাম হোসেন বাপের ব্যাটা! আবার রাজনৈতিক মেরুকরণও কাজ করে। কর্নেলসাহেব বিএনপির, সদর উপজেলায় বাড়ি, এই আসনের এমপি হলেও তার সঙ্গে তাদের দূরত্ব আছে। যেন তাকে কোনও দাবি জানানো আর না-জানানো সমান কথা, কিন্তু সৈয়দ হিরু তাদের উপজেলার, স্বাধীনতার পর এমপি ছিলেন, তাকে এখনও সব অভাব-অভিযোগ তারা তাকেই জানায়। তবে এর চেয়ে বেশি আতংক বিরাজ করে অন্য কারণে, নিকারিপাড়া কিংবা কাউন্সিলের পাশের পাড়া থেকে রাতের বেলা ধান কেটে নিয়ে যায়। এমনকি ডাকাতিই হয়েছে। একসময় বলেশ্বরের ওপার থেকে ডাকাত আসত বর্ষার কালে। ভাসার হাটখোলার ওই পাশেই বলেশ্বর উত্তর থেকে এসে নেমেছে, সেখানে পশ্চিমের বাগেরহাট থেকে ভৈরবের একটা স্রোত এসে পড়েছে, তার আগে একটা ঘুরে গেছে রথখোলা তালেশ্বর থেকে কচুয়ার দিকে, ভাসার উলটো পাশের গ্রাম থেকে এদিকে কি আর পুবে কুচিবগা চর সোনাকুরে আন্ধারমানিকে ডাকাতি হয়েছে। সেই ডাকাতরা আসলে সম্মিলিতভাবে হিন্দু-মুসলমান মিলে প্রতিরোধও করা হয়েছে। আবার বছর দশকের আগে কাউন্সিলের পাশের মুসলমানরাই ডাকাতি করেছে। মামলা হয়েছে। ফলে তা নিয়ে আতঙ্কও আছে। তাতে মুসলমান পাড়ায়ও বিভক্তি আছে।

কিন্তু গ্রামীণ সেই কাঠামোয় তো নানান কারণে বদল ঘটে। ইউনিয়নব্যাপী সম্পর্কের বদল হয়। গ্রামের যার বাগেরহাটে যোগাযোগ ভালো, আত্মীয়স্বজন আছে- সে অনেক ব্যাপারেই একটু কম তোয়াক্কা করে। যেমন হরষিত কিংবা সুনীল কিংবা সুনীলদের আত্মীয় গোড়াখালে দীনেশরা। আবার তাদের আত্মীয়রা আছে পুব দিকের গ্রামগুলোয়। সেখানকার মানুষ এদিকের তুলনায় অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন। জোতদার বলো মহাজন বলো আর নির্বাচিত চেয়ারম্যান সব সেদিকের। এক সময়ে জমিদারের বড়ো ভরসা ছিল ওই চরের মানুষরা। ফলে বৈবাহিক সম্পর্ক, সামাজিক সম্পর্ক আর শহরের সঙ্গে সম্পর্কে অনেক কিছুর হেরফের ঘটে।

যেমন মলঙ্গিবাড়ি যেতে যেতে প্রথম দলের কথা এক রকম। আবার একটু পিছনে যাচ্ছে পরিতোষ সুনীল শ্রীধর ধীরাজ কিংবা রাঘবÑ তাদের কথাবার্তার ধরন ভিন্ন। তাদের সঙ্গে রসিক আছে, আছে প্রায় কোনও কিছুতেই কথা না-বলা অবিনাশ। সে শুনেছে আজ কমলেশ আসবে সেই ফকিরহাট থেকে। অনেকদিন দেখা হয় না পিসতুতো ভাইয়ের সঙ্গে। সে যাচ্ছে দেখা করতে। কমলেশ তাদের একমাত্র পিসির ছেলে, দীনেশ তার কাকাতো ভাই, বয়সে বড়ো। অবিনাশের সমবয়েসি।

যেতে যেতে সুনীল বলে, ‘এই ব্যাপারটার একটা ফয়সালা না-হলি কচুয়ার দুই চারজন বড়ো হিন্দু ব্যবসায়ীরে সাহায্য করত কই কীভাবে?’

আবার শ্রীধর বলে, ‘সুনীল টিএনও সাহেবরে তো বলার জন্যে বাশার শিকদারকে বলতে পারো। বাশার সরকারি দল করে টিএনও তার কথা শোনবে।’

কথা ধীরে ধীরে কোন দিকে যাবে তা পরিতোষ বুঝতে পারছে। এটার সঙ্গে গোড়াখালের বিরোধ যেমন আছে একই সঙ্গে সদরে কার কত ক্ষমতা তাও একই সঙ্গে দেখানো হয়। যদি এসই ক্ষমতায়ই কিছু হলেটা বলিয়ান দীনেশ। তাদের বাড়ি গেলেই বোঝা যাবে। তবে এখন সঙ্গে কৃপাসিন্ধু আছে কি না তাই দেখে পরিতোষ। রসিক সামনে।  সে গলা নামিয়ে বলে, ‘সুনীলকা, এসব বাদ দেও, আগে ফয়সাল হোক, তারপর ভাবা যাবে।’

শ্রীধর যে ব্যাপারটা বুঝতেই পারেনি। সে জানতে চায়, কেন আগে এ বিষয়ে ফয়সালা হোক না হোক আলোচনা হলি সমস্যা কী? সেকথা তো ওই জায়গায় তোলাও যায়।’

পরিতোষ বিড়িতে একটা কষে টানা দিলে বলে, ‘তোলা যায়, চাঙ্গেও তোলা যায়, তবে কেউ আবার ওইকথা শুনলি দেখা গেল কবেনে সাইদুলরে কবে সে-’

সবাই হাসে। একথার অর্থ ধীরাজও ধরতে পারে। সে একটু চাপচাপ। আর অর্থনৈতিকভাবে এখন পিছিয়ে পড়া। মা অসুস্থ। ওদিকে তালইমশাই প্রণবেশের শরীর খারাপ। বোনাই পুলক আসেনি এখনও, সে এলে অবশ্য ধীরাজের একটু বল ভরসা থাকত। কিন্তু এই কথাটা তো পার্বতীকে উদ্দেশ্য করে বলা। তাতে সুনীল আর পরিতোষ পরস্পরের চোখের দিকেও তাকায়। একটু হাসেও সে চোখ। সুনীল পরিতোষের তাকানোর কারণটা বুঝতে পারে। সেদিন সঞ্জয়কে বকাঝকা করে রসিকের দোকান পর্যন্ত আসতে আসতে বেশ রাত হয়। পরিতোষ দোকানের সামনে থেকে বাড়ির দিকে ফিরছিল। অথবা সেও জানত কৃপাসিন্ধু বাড়ি নেই। হয়তো এক-আধবার ভেবেছে যানে কি না পার্বতীর কাছে। হতে পারে সন্ধ্যা রাতে পার্বতীর সঙ্গে দেখা করতে এসে দোকানের সামনে দেখা, হতে পারে সে শ্রীধরের ঘরে এসেছিল সেখান থেকে বেরুবার সময় পার্বতীর সঙ্গে দেখা। এসব কল্পনা করে লাভ নেই। পার্বতীর সঙ্গে কথা হয়েছিল, বলেছিলও কৃপা নেই সে আসবে কি না? অথবা, রংঢঙ করতে করতে ইনিয়ে বিনিয়ে কথা তুলেছে। পার্বতী তাকে রাতে আসতে মানা করেছে। হয়তো পরিতোষ ততক্ষণে জানে সুনীল এসেছে, তাকে খুঁজেছে। প্রয়োজন থাকলে কাল সকালে তাদের বাড়িতে এসে দেখা করবে। কিন্তু সুনীল এসেছে, হয়তো তাই পার্বতী তাকে নিষেধ করেছে ভেবে সে দেখতে চায় সুনীল কখন আসে। তাই সুনীলের জন্যেই অপেক্ষা করেছে। সুনীল এই পর্যন্ত এসেছে। পরিতোষ যা বোঝার বুঝেছে। একথা তারা কেউই কাউকে বলবে না। সুরির সাক্ষী মাতাল। তবে সুনীলকে এইটুকু খোঁচা দিতে ভোলে না, ‘ও বা, (অর্থাৎ কাকা, ভাইপোকে এভাবে ডাকা যায়) যাও কই? বউমার ধারে না শালির ধারে?’ সুনীলও ভেবাচেকা খাওয়ার লোক নয়!  সে সময় নেয়। পরিতোষ যা বলার বলে যাক। যেমন সেয়ানা তেমন ত্যাদোড় লোক পরিতোষ। সুনীল নয় চোদ্দ ঘাটের জল খেয়ে মানুষ চেনে, পরিতোষের তো তা করতে হয়নি। একেবারে চোখের দিকে তাকিয়ে মানুষের পেটের গভীর পর্যন্ত সব সময় দেখে নিতে পারে। পেটের কাছে কুঁজো আর কুচকুচে কালো রঙের শরীরটায় চোখ দুটোই সবচেয়ে জ্বলজ্বলে। সে দুটো সব সময়ই কথা কয়। তাকিয়ে ভিতর পর্যন্ত দেখতে পারে। যদিও এই অন্ধকার সে সুযোগ নেই। আকাশ প্রায় অন্ধকার। কৃষ্ণপক্ষের আকাশে তারগুলোর আলোয় তো চোখের ভাষা পড়া যায় না। তবে টর্চের আলো মাটিতে ফেললে তার যেটুকু ঠিকরে ওঠে তাতেই পরিতোষ সুনীলকে পড়ে নিতে চাইল।

‘যাই কই সেয়ার তুই বোঝে না?’

‘যা, যা তাড়াতাড়ি। শ্রীরাধিকা কহোন দিয়ে অপেক্ষা করতেছে, এতক্ষণে মনে হয় ঘুমিয়ে গেছে। প্রাণগোবিন্দ এখনও এল নাÑ’

‘এ আমি যদি প্রাণগোবিন্দ হই, তয় তুই কী?’

‘আমি কাটাবাড়া-’

‘কেন যাও না? বউদি কইয়ে যাইয়ে গলা ধইরে ঝোলো না?’

‘আর কইস না। যা-’

সুনীল পরিতোষের সঙ্গে একথা বলতে বলতে পশ্চিম দিকের রাস্তাটায় একটু ঢুকেছিল। সেখান থেকে খাল সমান্তরাল রাস্তায় এসে পরিতোষ উত্তরে বাড়ির দিকে হাঁটে আর সুনীল সাবিত্রীর ঘরের দরজা তাকাতে তাকাতে শ্রীধরের ঘরের দিকে গিয়েছিল যেন শ্রীধরের কাছে এসেছে। জানে শ্রীধরের দরজা বন্ধ। সামনের বারান্দায় সে ঘরে কেউ ঘুমায় না। পরের ঘরে গুণধরের বারান্দায়ও কেউ নেই, পিছনের বারান্দায় ওদের মা থাকে। শ্রীধরের ঘর সোজা উঠোন ডিঙিয়ে দক্ষিণে পার্বতীর ঘরে গিয়েছে সুনীল।

চোখে সেকথা থাকলেও এখন তো আর সে কথা তুলবে না পরিতোষ। অথচ ধীরাজ যে হেসেছে? সেটা উলটে দিতে তার ভগ্নিপতির প্রতিবেশী পরিতোষ বলে, ‘হাসো কী জন্যি, ভাইডি? হাসিস না হাসি না, শুইনে যাÑ’ তারপর, আবার সামনে পিছনে তাকিয়ে বলে, ‘তোর বোনাই আসল না?’

‘যাই নাই ও বাড়ি।’ ধীরাজ বলে।

কিন্তু মলঙ্গিবাড়িতে পৌঁছে দেখে, কাছারিতে প্রণবেশ হাজরা, জগৎ ম-ল আর বীরেন হালদারÑ এই দিককার তিনজন বয়স্কই উপস্থিত, দেবেন মাঝি একটু পরে আসবে বলেছে। তাহলে ভালোই হল, এই বয়েসি মানুষগুলোর কারণে দীনেশ যদি এট্টু কম কথা কয়। তারা গুরুত্ব বুঝে রসিককেও ওই তিনজনের পাশে চেয়ারে বসতে বলে। রণজয় আর অবিনাশও চেয়ারে বসে। একখানা চেয়ার ফাঁকা রাখে যদি দীনেশের বাবা দেবেন মলঙ্গি আসে তাহলে সে বসবে। বাকিরা চারদিকে কয়েক খানা বেঞ্চি ও এক পাশের একটা খাটে বসে।

দীনেশ কাছারিঘরের সামনে ঘটি রেখেছে। অতিথি নারায়ণ। এটা রীতি। কেউ যদি পা ধোয়। কয়দিন বৃষ্টি না হওয়ায় রাস্তায় কাদা তেমন ছিল না। যার পাও ধোয়ার সামনের খাল অথবা বাড়ির ভিতরের পুকুর থেকে ধুয়ে এসেছে। কেউ আত্মীয়বাড়ি হিসেবে বাড়ির মহিলাদের সঙ্গে দেখা করে এসেছে। সুনীল কমলেশের সঙ্গে কথা সেরেছে। পুর্বের মলঙ্গিদের নতুন বাড়ির থাকে, সেখান থেকে এবাড়িতে আসা বউদের সঙ্গে সুনীল দেখা করেছে। পিসতুতোভাই ও ভাইয়ের বউ তার। কমলেশকে অবিনাশ বলেছে, পরে কথা আছে। আলোচনা শুরু হয়। গোড়াখাল থেকে দীনেশ দীর্ঘ ভূমিকা দেয়। ওদিক থেকে বলে পরিতোষ। তার কথায় মন্দির আগের জায়গা থেকে সরুক কি না-ই সরুক, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় মন্দির ওই পাড়ায় থাকবে কি না। এই খোঁচাটা পরিতোষ ইচ্ছে করেই দিয়েছে। কারণ আগাখাল গোড়াখাল জোটবন্ধভাবে মাঝখানে ক্যাম্পের মাঠের এক কোনায় দুই বছর দূর্গা পূজা দিয়েছে। এটা হতেই পারে। পুবের বড়ো ও ছোটো আন্ধারমানিকের গেরস্থরা সম্পন্ন। তাদের বারোয়ারি পূজার সংখ্যা বেশি। অনেক বাড়িতে নিজেদের মন্দিরে কালীপূজাও হয়, আবার বারোয়ারি খোলায় পূজাও হয়। কিন্তু সেখানকার হাইস্কুলের কাছে তাদের যে পূজা সেটা তারা সবাই মিলেই দেয়। সে ক্ষেত্রে তাদের কোনও বিরোধ নেই।

এতে ঝগড়া লাগার উপক্রম। এই গোড়াখালের যারা তারা পূজা দিয়েছে, কিন্তু ওইখানে হরিসভা মন্দির হলে তাদের কোনও আপত্তি নেই। সেজন্যে রসিক মল্লিককে সবাই ধন্যবাদও জানায়। দেবেন মাঝি তার আভিজাত্য আর গরিমাকে একটু পাশে সরিয়ে রসিকের বদান্যতার কথাটা জানাতে ভোলে না। অনেকেই বলে বিষয়টা মনে হয় তার ভাইপো অনিমেশ শিখিয়ে দিয়েছে। অফিসার মানুষ, সৌজন্যবোধ তার টনটনে।

এদিকে প্রণবেশ হাজরা কিংবা বীরেন হালদার তাদের অভিজ্ঞতায় বুঝে নিতে চায়, রসিককের বিষয়টা বড়ো করে ওই জায়গায় কি রাস্তার পাশে হরিসভার বিষয়টা ভেস্তে দিতে চায় কিনা গোড়াখালের লোকজন। এদিকেও খালের ওপর ঘরামিরা আছে, আছে ভাসার কাছের খাঁবাড়ির লোকজন। সরোজের বাবা আসেনি, কিন্তু ওর ছোটোভাই সর্বজিৎ এসেছে। সে গুটি চালাতে ওস্তাদ। চিতলমারি কৃষি অফিসে কাজ করে। গ্রামে বিশেষ আসে না। আজ এসেছে। তার বাপ না দীনেশ তাকে চিঠি লিখে আনিয়েছে তা তো বোঝার উপায় নেই।

তবে আলোচনা এগোলে দেখা গেল ধীরে ধীরে এদিকের সবাই একমত, মন্দির ওই পাড়াতেই থাকবে। নিজেদের ভিতরের ব্যাপারটা ফয়সালার হলে ওখান থেকে সামনের রাস্তায় আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে। এ সময় কমলেশ জানায়, অনিমেষের আজকের আলোচনায় থাকার ইচ্ছে ছিল। সেইমতো খুলনায় কাজও ফেলেছিল, কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় এসে আটাক পড়েছে সে। সারাদেশে অবরোধ। আজ হয়তো ঢাকায় পৌঁছেছে।

এতক্ষণে একথা বলল কমলেশ! বীরেন হালদার তার ভাগ্নেকে চেনে। একটু আত্মভোলা টাইপ। অত বড়ো অফিসার অমলেশ, এই মন্দিরটা হলে কতভাবে হয়তো সাহায্য করতে পারত। আর সেকথা কী না এখন বলল। তাকে জানানোসহ বাকি কাহিনি সবই বলে কমলেশ। জানায় সে ফকিরহাট থাকতেই তাকে বিস্তারিত জানিয়েছিল। সে বলেছে, তারা যা সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই তার সিদ্ধান্ত তবে, গ্রামের গুরুজনরা যেন সব ব্যাপারে থাকে।

দীনেশ মলঙ্গি বিষয়টা জানত না। যদি সুযোগ থাকত, তাহলে সে যেন এই গোড়াখালে একটা স্থায়ী হরিসভা বানানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নিত তাদের ক্ষমতাবান বড়দা অনিমেষকে বলে। কিন্তু সে গুটি তো উলটো দিল তারই জেঠাতভাই।

ফলে সিদ্ধান্ত হল, আবার হল না।

দীনেশ ভাবে, এখনও সুযোগ আছে যদি এদিকের বিষয়ে ঢুকে সেখানে দুই পক্ষ করা যায়। তাহলে মন্দির আগের জায়গাতেই থাকবে। স্থায়ী মন্দিরের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে গোড়াখালের ব্যাপারে আগোনো যাবে। এ ব্যাপারে পার্বতী তার তুরুপের তাস!

দীনেশের এই হিসাবও যে সেই সাড়ে আট আনি সাড়ে সাত আনির ঘোরে সুনীল বা পরিতোষ রণজয় বা হরষিত কেউ-ই তা বোঝে না!

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares