চলুন, মানুষের কারখানায় : মনি হায়দার

উপন্যাস

চলুন, মানুষের কারখানায়

মনি হায়দার

 

আমি আপনার যাত্রার নায়িকা আশালতাকে বিয়ে করতে চাই, মোলায়েম কিন্তু দৃঢ়গলায় বলেন জালালউদ্দিন খোন্দকার। মুখে সিগারেটের কু-লী পাকানো ধোঁয়া। সামনে ছোট্ট টেবিল। টেবিলের দুদিকে দুটো চেয়ার। নিজের আসনে বসে আছেন জালালউদ্দিন। বিপরীত আসনে বৈশাখী যাত্রাদলের আধিকারিক গোবিন্দ দেবনাথ। গোবিন্দ দেবনাথের দশাসই শরীরের তুলনায় চোখ দুটো বেমানান রকম ছোট। মাথাভরা তেল চকচকে চুল। পিছনের দিকে বাবরি। মাঝে মাঝে বাবরি চুলগুলোকে একত্র করে বেঁধে রাখেন উঁচু করে। সেই ছোট চোখ তুলে পিট পিট করে তাকাচ্ছে খোন্দকারের দিকে। বোঝার চেষ্টা করছে, সামনে বসা এই মানুষটা ডেকে এনে সমাদর করে খেতে দিয়ে আসলে কি বলতে চাইছে? এটা কি সত্যিকারের কোনো ফাঁদ? নাকি রসিকতা? কিন্তু খোন্দকারের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে না কিছু। চোখ মুখ নাক একেবারে ভাবলেশহীন।

গোবিন্দ দেবনাথ দাঁত বের করে হাসে, কি যে বলেন আপনি খোন্দকার দাদা?  আপনি এই অঞ্চলের মুরব্বি মানুষ। সবাই আপনারে মান্যগণ্য করে।

মান্যগণ্য করে তো ভালো। আমি আপনাকে অন্যায় কিছু কি বলেছি? বলেছি একটা বিয়ে করতে চাই। বিয়ে করা তো অন্যায় না। বলেন অন্যায়?

ঢোক গেলে গোবিন্দ দেবনাথ। ক্ষমতাধর একজন মানুষের সামনে, তার এলাকায় এসে, তার চেম্বারে বসে  কোন সাহসে বলে, ঘরে স্ত্রী সন্তান থাকার পর আবার বিয়ে করা অন্যায়।

বলেন, জোর  দেয় খোন্দকার জালালউদ্দিন, অন্যায়?

আমতা আমতা করে গোবিন্দ, না বিয়ে করা অন্যায় কেন হবে?

টেবিলের উপর চাপড় মারে, মেয়েটাকে দেখে আমার মন উচাটন হয়েছে। মেয়েও হাতের কাছে হেসে খেলে বেড়াচ্ছে।

আবার হাসে থলথলে শরীরে গোবিন্দ দেবনাথ, এইটা কী করে সম্ভব?

খুব অবহেলার সঙ্গে সিগাটের  ছাই ঝাড়ে খোন্দকার, অসম্ভবটা দেখলেন কোথায়?

আপনি মুসলমান আর আশালতা দেবী হিন্দু। হিন্দু-মুসলমানে বিয়ে কী করে হবে? তার উপর আপনি বিবাহিত। বয়স হয়েছে আপনার। লোকে কি বলবে?

লোকে কি বলবে সেইসবে আমার কিছু আসে যায়? আমি জালালউদ্দিন খোন্দকার কারও খাই? আমি আমারটা খাই, পরি, পরিধান করি। আপনার এসব ভাবনার দরকার নেই। আপনি আমার সঙ্গে আশালতা দেবীর বিয়ের ব্যবস্থা করুন। পরে দেখা  যাবেÑ

অনেক কষ্টে ঝুলে যাওয়া মোটা দুই ঠোঁটের উপর হাসি ঝুলিয়ে রাখে গোবিন্দ দেবনাথ, খোন্দকার সাহেব- আপনার পুত্র কন্যা আছে।  আশালতার চেয়ে বয়সও আপনার বেশি।

গোবিন্দ বাবু আপনি সবই ঠিক বলেছেন। আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি আশালতাকে। আমি জানি আমার বয়স। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আশালতাকে বিয়ে করব। এবং বিয়ের ব্যবস্থা আপনিই করবেন। এটাই আমার সিদ্বান্ত।

কি বাজে কথা বলছেন আপনি? আপনি আশালতাকে বিয়ে করতে চাইলে তো হবে না, আপনাকে আশালতারও বিয়ে করার ইচ্ছে থাকতে হবে, নাকি? আর একটা অবিবাহিত মেয়ে, তাও আবার হিন্দু ঘরের ভদ্র মেয়ে আপনাকে বিয়ে করতে রাজি হবে কেন? একটু তেতে উঠছে গোবিন্দ দেবনাথ। গলার স্বর কর্কশ। জালালউদ্দিন খোন্দকারের প্রস্তাবে গলা শুকিয়ে কাঠ। মনে হচ্ছে এক কলসি পানির তৃষ্ণায় গলা ফেটে যাচ্ছে।

বিপরীতে  মৃদু মৃদু হাসে জালালুদ্দিন, ঠিক আছে, আপনি আশালতাকে ডাকুন।

এখানে?

হ্যাঁ। খুব আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়ে জালালউদ্দিন খোন্দকার। ডান পায়ের উপর বাম পা রেখে নাচাচ্ছে। ভাবখানা দুজনের মধ্যে সরস কোনো বিষয়ে গল্প হচ্ছে। দুজনে অনেক দিনের চেনাজানা বন্ধু। আশপাশের দোকানদারেরা কেউ দেখেও দেখছে না।

আমার এখানে ডাকলে সমস্যা আছে? মেয়েটা আসুক। দেখুক জানুক আমাকে। মেয়েটার সঙ্গে ভালো করে কথা বলি। যাত্রার মঞ্চে দূর থেকে দেখে কি সাধ মেটে?

দেখুন জালালউদ্দিন ভাই, এখানে যাত্রা করতে আসার পর আপনার আনাগোনা দেখে বুঝতে পেরেছিলাম, আপনি এই রকম একটা প্রস্তাব দিতে পারেন।

সিগারেটের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে উল্লাসে হাসে, তাই নাকি?

হ্যাঁ। সেজন্য আমরা আপনার খোঁজখবর নিয়েছি।

ভালো করেছেন দাদা। আমাকে নিজে থেকে আর কিছু বলতে হচ্ছে না। নিশ্চয়ই পাত্র হিসেবে আমার যোগ্যতার প্রমাণ পেয়েছেন।

আপনি এই এলাকার একজন গণ্যমান্য মানুষ, গোবিন্দ দেবনাথ না শোনার ভান করে বলে যাচ্ছে, আপনি ভানডারিয়া উপজেলা থেকে একবার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমাদের আশালতা দেবীর বয়সি আপনার একটি কন্যা রয়েছে।

খোঁজ নিয়েছেন, ভালো করেছেন। আর আমার কন্যা হয়েছে তাই বলে আর একটি বিয়ে করতে পারব না এমন কথা কী কোথাও লেখা আছে? কোরানে গীতায় কিংবা মহাভারতে অথবা ত্রিপিটকে?

গোবিন্দ মহাশয় দেখছে ক্রমশ জটিল জলে ডুবে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনিও ঘাগু মানুষ। অনেক ঘাটের জল খেয়েছেন। সুতরাং সহজে কাবু হবার মানুষ নন। যুদ্ধ জানেন দোবিন্দও। বৈশাখী যাত্রাদলের প্রধান আকর্ষণ আশালতা দেবী। আশালতাকে ছাড়লে বৈশাখী যাত্রাদল চলবে কেমন করে? সহজে ছাড়বে কেন? ব্যবসার আসল চালানই যদি চলে যায়, কিংবা চলে যেতে বাধ্য হয়, বৈশাখী যাত্রাদল চলবে কেমনে? আর যাত্রার প্রধান নায়িকা কী চাট্টিখানি কথা? কত তেল দিয়ে, ঘষে মেজে আজকের আশালতাকে তৈরি করতে হয়েছে, সে খবর কী কেউ রাখে? ঘষে মেজে চকচকে বানানোর পর সব ব্যাটারা এসে হুমড়ি খায় প্রেমের লাল পাগড়ি নিয়ে।

আশালতা আজ থেকে আট বছর আগে যখন এসেছিল দলে, তখন তো ঠিকমতো কথাও বলতে পারত না।  অস্বীকার করার উপায় নেই, হ্যাঁ মেয়েটার শরীর বানিয়েছে ঈশ্বর আপন হাতে। চকচকে শরীর। সোনারঙ। রোদ লাগলেও তেরছা হয়ে কেটে যায়, এমন রঙ ওর। আর চোখদুটো মনে হয় কোটরের উপর ভেসে থাকে। বড়। আয়ত। কাজলকালো পাপড়ি। ওকে বুনোফুলও বলা যায়। সেই বুনোফুলে যখন তখন কেউ এসে যখন হাত বাড়াতে চায়, গোবিন্দ দেবনাথ হাসে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্রোধে ফেটে পরেন। জানেন, বোঝেনও- বুনোফুল যখন  দলে আছে তখন তো দুএকটা দুষ্ট বা রসিক ভ্রমর আসবেই। আসেও। কিন্তু গোবিন্দ বাবু বড় কৌশলে সব ম্যানেজ করতে পারেন। বেশি ঝামেলা দেখলে রাতের অন্ধকারে আশালতাকে সরিয়ে ফেলেন অন্য জায়গায়।

গোবিন্দ দেবনাথের মাথায় এক একবার রক্ত চড়ে যায়। এই মুহূর্তেও মগজের মধ্যে ক্রোধ হানা দিচ্ছে ক্ষুধার্থ বাঘের গতিতে।  কিন্তু রাগলে চলবে না, তাকে মেজাজ ঠান্ডা রাখতে হবে। মেজাজ চড়ে গেলে আম ও ছালা দুটোই হারাবার সম্ভাবনা আছে। সামনে বসা জালালউদ্দিন খোন্দকার লোক একদম ভালো না। ধড়িবাজ। জাহাবাজ। বখাটের চূড়ান্ত।

বছর দশেক আগে ভানডারিয়া উপজেলায় নির্বাচনে জালালউদ্দিন ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। আর দ্বিতীয়বার মাত্র সাত ভোটের জন্য ফেল করেছেন। প্রতিশোধে তিন তিনটি মানুষ খুন হয়েছিল বিজয়ী প্রার্থীর। মামলা হয়েছে, পুলিশ এসেছে, জালালউদ্দিন খোন্দকার গ্রেফতার হয়ে জেলে গেছে। ছয় মাসের মধ্যে বের হয়ে এসেছেন। সাক্ষী ও প্রমাণের অভাবে মামলা থেকে জালালউদ্দিন খোন্দকার বেকসুর খালাস। কিন্তু এলাকার মানুষ জানে, এই খুনের সঙ্গে জালালউদ্দিন খোন্দকার জড়িত, এক-শো এগারো ভাগ জড়িত। সেই লোকরে ঘাটানো কঠিন। তাও নিজের এলাকায় বসে! ভয়ে শিড়দাড়া বেয়ে ঠান্ডা  স্রোত নামে গোবিন্দ দেবনাথের।

কিন্তু গোবিন্দ দেবনাথও কঠিন মানুষ। কৌশল জানেন। বৈশাখী যাত্রাদল কি আজকের দল?  দাদা চরণ নারায়ণের হাতে গড়া দল। দাদা চরণ নারায়ণের কাছ থেকে বৈশাখী যাত্রাদলের দায়িত্ব নিয়েছিল বাবা শিবনারায়ণ দেবনাথ। এক চল্লিশ বছর বাংলাদেশের আনাচেকানাচে বৈশাখী যাত্রাদলের যাত্রা দেখেছে মানুষ। এক চল্লিশ বছর পর যাত্রাদলের দায়িত্ব পান পুত্র গোবিন্দ দেবনাথ। তাও প্রায় একযুগ হতে চলল। বংশের মর্যাদা, মুখের অন্ন সবই বৈশাখী যাত্রাদলের উপর। সমস্যা হচ্ছে,  দল নিয়ে বিদেশে আসতে হয়। বিদেশের মাটিতে  সবাই দুর্বল।  সেই সুযোগটাই সবাই নেয়। কিন্তু গোবিন্দ দেবনাথ ইতিমধ্যে থানায় জানিয়ে রেখেছেন। এলাকার যাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, তাদেরও জানানো হয়েছে।

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সিকান্দার বখত বৈশাখী যাত্রাদলের সঙ্গে চুক্তি করেছে। গত রাতে দুই বোতল মদ দিয়ে পরিস্থিতি জানানো হয়েছে। গ্রিনরুমে বসেই গলায় সরাসরি মদ ঢালতে ঢালতে সিকান্দার বখত তেরছা চোখে তাকায় গোবিন্দ দেবনাথের দিকে, তোমার দোকানে এত তাজা তাজা মাল থাকতে আমারে খালি বোতল দিলা  গোবিন্দ বাবু?

মঞ্চে এখন নাচ চলছে। একসঙ্গে সাতটা মেয়ে নাচছে- বাবু গাছে চড়িয়া দুইটা জলপই পারিয়া দে…। বাজাচ্ছে বাদকদল। দর্শকেরা প্রচুর হাততালি দিচ্ছে। গ্রিনরুমে বসেও চারদিকে চোখকান খোলা রাখতে হয় গোবিন্দ বাবুকে। রাত সাড়ে এগারোটায় শুরু হবে যাত্রাপালা ‘আপনদুলাল’। পাশেই গ্রিনরুমের জন্য তৈরি হচ্ছে আশালতা, সুলেখা বেগম, মোহন দাস, সেলিম চৌধুরী।

সব রকমের ব্যবস্থাই আছে গোবিন্দ বাবুর দরবারে। জানে, একটাকে কাটাতে হলে আর একটাকে ব্যবহার করতে হয়। সেজন্য নাচের তিন নম্বর মেয়ে রোখসানাকে তৈরি করেছে অনেক আগে থেকেই। অকাজে রোকসানাকে সে জন্য একটু বেশিই তোয়াজ করতে হয়। কাজ পেতে হলে তোয়াজতো একটু করতেই হবে, এটাই জগতের নিয়মÑ জানে গোবিন্দ দেবনাথ। সিকান্দার বখতের দিকে তাকিয়ে হাসে গোবিন্দ দেবনাথ, এই এক দোষ আপনের।

কী দোষ আমার? বখত ঢুলুঢুলু চোখে তাকায়।

সবুর করতে পারেন না আপনি।

কী কইবার চাও তুমি? গলায় তরল ঢালে সিকান্দার বখত।

কানের কাছে মুখ নেয় গোবিন্দ, আপনার জন্য একটা মেয়ে আমি ঠিক করে রেখেছি। দারুণ সুন্দরী। একটু সবুর করেন, চলে আসবে।

তাই নাকি! চোখ বড় বড় করে তাকায় চারদিকে, কই? কই  আমার সেই রসের বাইদানি? লইয়া আসো।

আরে আপনাকে কইতেছি না, একটু অপেক্ষা করেন। আসতেছে।

আসতেছে মানে? কোথায় আমার কুটুম পাখি? এখনই ডাকো আমার সামনে। গলায় মাল ঢালছে আর টলছে সিকান্দার বখত। মালে ধরেছে বোঝা যাচ্ছে। সিকান্দার  বখত যত না মাল খায়, টলে যায় অনেক বেশি। আরও মজা দেশি মাল খেতে পছন্দ করে লোকটা। দেশি মালে খরচ কম। গোবিন্দ দেবনাথ খুব খুশি বখতের উপর।

নাচ শেষে মেয়েরা গ্রিনরুমে ঢোকে। গোবিন্দ ইশারায় ডাকে রোখসানাকে। রোখসানা বিশাল নিতম্ব আর স্তন দোলাতে দোলাতে সামনে এসে দাঁড়ায়, কন বাবু।

চোখের ইশারায় সিকান্দার বখত দেখায়, তোর কুটুম্ব তোর লাইগা বইসা আছে। ঘরে লইয়া যা।

ঠোঁট মোচড়ায় রোখসানা, এহনই?

এহন অসুবিধা কি?

এই মাত্র নাইচা আইলাম। শরীর মোচড়ায়, আমারে একটু টাইম দিবেন না?

হাত ধরে গোবিন্দ, মারে আমার লাইগা একটু কষ্ট কর। তোরে যা কইচি সেভাবেই লোকটার কাছ থেকে কথা আদায় করবি। সিকান্দার বখত যদি রাজি না হয়, তাহলে এইবার আর দল নিয়ে এই ভানডারিয়া থেকে যেতে পারমু না। তোর কাছেই আমার প্রাণ ভোমরা। আর তোরে সবার চেয়ে এক হাজার টাকা বেশি দেব আমি। কিন্তু কাউরে কবি না। ঠিক আছে?

এক হাজার টাকা বেশি দেব, শোনার সঙ্গে সঙ্গে রোকসানার মুখে মিছরি হাসির ঢেউ ওঠে। শরীরে লাগে বাতাস। একপলকে এসে দাঁড়ায় সিকান্দার বখতের সামনে, হাটু মুড়ে বসে পড়ে মুখের কাছে, চলেন আমার নাগর।

তুমি?

হ্যাঁ আমি। আমি আপনার লায়লা।

আমার লায়লা তুমি? গলা ধরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।

দাঁড়াতে দাঁড়াতে আধো খিচড়ে কথা বলে সিকান্দার, কোথায় যাব রসের বাইদানি?

কানে কানে জবাব দেয় রোখসানা, পাশের ঘরে।

পাশের ঘরে! চলো, লোল পরা মুখে বহু যুগের ক্ষুধিত হাসি কদাকার ফোটে সিকান্দার বখতের ঠোঁটে। দাঁড়াতে গিয়ে শরীর টলে যায়। প্রায় জড়িয়ে ধরে রোখসানাকে, চলো চলো। জড়িয়ে ধরে রোকসানার সঙ্গে অনেকটা লেংচাতে লেংচাতে ঢোকে পাশের গোপন ঘরে। রোকসানা জড়িয়ে ধরে সিকান্দার বখতকে, সিকান্দার বখতও জড়িয়ে ধরে রোখসানার শরীর। ফিসফিসিয়ে বলে রোকসানার কানে কানে, আমি জ্বইলা যাইতেছি রে রোকসানা, আমারে একটু ঠান্ডা কর।

বিছানায় গড়িয়ে পরে রোকসানা, ঠান্ডা তো করবই আপনারে। আগে আমার কথা শোনো গো নাগর। চোখে মুখে কামনার কাম ফুটিয়ে তোলে পেখম খোলা ময়ূরের মতো।

কী কথা?

তুমি আমার কাছে যা চাও  দেবো। তবে-

রোখসানার বুকে মাথা ঘসে, তবে কি গো?

তুমি জালালউদ্দিন খোন্দকারকে শায়েস্তা করবা।

জালালউদ্দিন খোন্দকার? ও হালায় কী করতেছে? গলায় ঢালে বোতলের শেষ তরলটুকু।

ও আমাদের প্রধান নায়িকা আশালতাকে বিবাহ করতে চায়।

সিকান্দার বখত স্থির, নেশা ছুটে গেছে, পিটপিট করে তাকায় রোখসানার দিকে। রোখসানাও ভালো তবে আশালতার মতো ধারালো নয়। আর যাত্রাদলের মেয়েদের ব্যাপারে সিকান্দার বখতের অভিজ্ঞতা অনেক দিনের। প্রতিবছর ভানডারিয়ায় যাত্রাদল আনে এলাকার একটা গ্রুপ। সেই গ্রুপে থাকে সিকান্দার বখত। থাকার একটাই কারণ, পছন্দেও কোনো নায়িকার সঙ্গে বা নাচনেওয়ালির সঙ্গ কামনা। সেই অভিজ্ঞতার  ধারাবাহিকতায় আশালতা দেবীর প্রতি নিজেরও লোভ আছে। আহা, কী শরীর! আম-কাটা ছুরির মতো ধারালো একখানা শরীর। মঞ্চে যখন বাঁকা আর ধারালো শরীর নিয়ে হাঁটে, সংলাপ বলে, কখনওসখনও নাচে, মনে হয় পুরো প্যান্ডেলটা নাচে ওর সঙ্গে সঙ্গে। সেই আশালতার দিকে হাত বাড়িয়েছে জালালউদ্দিন খোন্দকার!

মঞ্চে চলছে আপনদুলাল যাত্রাপালা।

পরের দুপুরে সিকান্দার বখত হাজির জালালউদ্দিন খোন্দকারের বাড়ি। জালালউদ্দিন খোন্দকার সবে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা খেয়েছে। আজকাল জালাল খোন্দকার অনেক দেরি করে ওঠেন বিছানা থেকে। আর কত? জীবনের অনেক সকাল তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন কাজে। আর কাজ করতে ভালো লাগে না। এখন একটু ভোগের দিকে যাত্রা করতে চান। সেই ভোগের দিকে যাত্রার প্রথম গোলাম বৈশাখী যাত্রাপালার প্রধান নায়িকা আশালতা দেবী।

রাতে স্ত্রী হেলেনা খানমের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছিল। হেলেনাকে বিয়ে করেছিলেন একুশ বছর আগে।  হেলেনাকে পেয়ে জালালউদ্দিন খোন্দকারের মনে হয়েছিল জীবন ধন্য। হেলেন যেমন সুন্দরী তেমনি গুণবতী। লেখাপড়ায় ভালো। মেট্রিকে ফাস্ট ডিভিশনে পাশ করেছিলেন হেলেন। ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝি সময়ে বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে সেকেন্ড ডিভিশন পেয়েছিলেন। আরও পড়তে চেয়েছিল হেলেনা খানম, স্ত্রীকে কাছে পাবার আকুল কামনায় পড়তে দেয়নি জালালউদ্দিন খোন্দকার। বিনয়ী, দায়িত্বশীল একজন স্ত্রী হেলেনা। মেনে নিয়েছে স্বামীর আদেশ। বাড়ির সবাই প্রশংসা করে। এইভাবে কতটা দিন কেটে গেলো, টের পায়নি জালালউদ্দিন খোন্দকার। সংসারে এসেছে একটি মেয়ে দুটি ছেলে। সিমলা পড়ে কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে। ছেলে দুটো ইমু আর গগল। ইমু পড়ে ক্লাস এইটে। গগল পড়ে সিক্সে।

সুখে দিন কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎ কোত্থেকে বৈশাখী যাত্রাপালা এলো, যাত্রাপালার নায়িকা আশালতাকে দেখলেন, সঙ্গে সঙ্গে মাথা আর মগজ একেবারে উল্টে গেলো। উল্টে যাবার কোনো তলও পান না। এখন যেদিকে তাকান কেবল আশালতাকে দেখতে পান। পুকুরে গোসল করতে গেলে পানিতে দেখতে পান আশালতা শান্ত পুকুরে ঢেউ তুলে নাচছে। বাজারে, চালের গদিতে দেখতে পায় বাটখাড়ার সঙ্গে আশালতাকেও মাপছেন। বাড়িতে খেতে বসছে দেখে সামনে দিয়ে চকিতে আশালতা যাত্রার ঢংয়ে শরীরের ঢেউ তুলে চলে যায়। যেতে যেতে রেখে যায় এক টুকরো বাঁকা হাসি। আশালতা ছড়িয়ে গেছে জালালউদ্দিন খোন্দকারের রক্তে, রক্ত পার হয়ে অস্থিতে। এখন এই কুহুক থেকে একমাত্র মুক্তি আশালতাকে…। শুরুতে যতটা সহজ আর স্বাভাবিক মনে হয়েছিল, মাঠে নেমে দেখলো পুরো ঘটনাটা একটা উল্টো খেলা। কিছু ঘনিষ্ঠ মানুষ, চালের দোকানের কর্মচারীই আশালতাকে বিয়ের ব্যাপারে সমর্থন দিচ্ছে।

বাকিরা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছে। মুরব্বিরা প্রচ্ছন্ন ভর্ৎসনা করেছেন। কিন্তু আশালতায় ডুবে যাওয়া নৌকা তীরে না আনা পর্যন্ত মুক্তি নেই জালালউদ্দিন খোন্দকারের। বৈশাখী যাত্রাপালার মালিক গোবিন্দ দেবনাথকে হাতের মুঠোয় আনার আগে সে মুঠোয় এনেছে বৈশাখী যাত্রাপালার নায়ক সেলিম চৌধুরীকে। যখন স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছে আশালতা দেবীকে আমার  চাইই চাই, তখন  যাত্রাপালার কাজের লোক নগেনকে গদিতে ডেকে এক-শো টাকার পাঁচটি নোট ধরিয়ে সব জেনে নিয়েছে। নগেনই জানিয়েছে আশালতার প্রধান আকর্ষণ সেলিম চৌধুরী।

সেলিম চৌধুরী দেখতে খুব স্বাভাবিক মানুষ। গায়ের রঙ হালকা ফর্সা। মাথায় ঘন চুল। চোখদুটো ঢুলু ঢুলু। কথা বললে মনে হয়, হ্যাঁ লোকটার কণ্ঠে একটা কিছু আছে। গাঢ় গলায় বলে কথা। এই সাধারণ ছোটখাট মানুষটি যখন নায়ক সেজে মঞ্চে দাঁড়ায়, হাঁটে, গলা ছেড়ে ডায়ালগ বলে, তখন আর মেলানো যায় না। মানুষ এ রকমই, সময়ের সঙ্গে, পরিস্থিতির সঙ্গে পাল্টে যায়। মেকাপে আসল মানুষ হারিয়ে নতুন আর একজন মানুষ তৈরি হয়ে যায়। সেলিম চৌধুরীকে গোপনে খবর পাঠানো হলো নগেনকে দিয়েই। হেলতে দুলতে সেলিম এসে গদির পেছনের খাস ঘরে বসে পা ছড়িয়ে।

সেলিম চৌধুরী ভেবেছিল, আমি নায়ক মানুষ, লোকে আমাকে খাতির যতœ করে আনন্দ পায়। কাছে পেলে বর্তে যায়। ভালোমন্দ খাওয়াতে চায়। ভানডারিয়ার উপজেলা শহরের মেসার্স সিমলা রাইস ঘরের মালিক, নগেন দাস কানে কানে যার নাম বলেছে জালালউদ্দিন খোন্দাকার, তিনিও আমন্ত্রণ জানিয়েছে খাতির করার জন্য।  একটু বর্তে যাবার জন্য।

কী খাবেন নায়ক সাব? চেয়ারে দুপা ছড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেন খোন্দকার জালালউদ্দিন।

তেমন কিছু না, একটা সিগারেট আর এক কাপ চা।

সে কি? আর কিছু খাবেন না? আপনি নায়ক মানুষ। এসেছেন আমার গদিতে।

নাহ, আর কিছু খাব না।

লোক ডেকে চা আর সিগারেট আনতে আদেশ দেয় জালালউদ্দিন খোন্দকার। লোকটা চলে গেলে সরাসরি তাকায় জালালউদ্দিন, সেলিম সাহেব?

বলেন।

আপনাকে আমি ডেকেছি খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলার জন্য।

একটু অবাক হয় সেলিম চৌধুরী। তাকে ডেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার কী দরকার? আর এমনই কী কথা? সে কয়েক দিনের অতিথি মাত্র  এই ভান্ডারিয়া উপজেলার। সাত আট দিন পর যখন বৈশাখী যাত্রাদল এখান থেকে জেলা শহর পিরোজপুরে চলে যাবে, সেও দলের সঙ্গে যাবে। বলা যায়, সেলিম চৌধুরী একজন ভাসমান মানুষ। একটি যাত্রাদলের সঙ্গে ভেসে বেড়ায় কূলে কূলে। সেলিমদের বংশ পেয়াদা। ঘটনাচক্রে যাত্রায় এসে নায়ক বনে গেছে। নায়ক যখন হয়েছে তখন পেয়াদা বংশকে নামের সঙ্গে নিতে পারে না। নামও ছিল নেছারউদ্দিন পেয়াদা। সেই নাম পরিবর্তন করে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে রেখেছে, সেলিম। সঙ্গে যোগ করে নিয়েছে চৌধুরী। নায়ক সেলিম চৌধুরী। কিন্তু  নিজেতো জানে, সে কি! সেই  নেছারউদ্দিন পেয়াদার সঙ্গে কী গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চায়  ভানডারিয়া উপজেলার ধরিবাজ লোক জালালউদ্দিন খোন্দকার?

আপনি কী ভাবছেন? প্রশ্ন করে জালালউদ্দিন।

কিছু না।  আমি অপেক্ষা করছি, আপনি কি বলবেন-

আমি যতদূর জানি, আপনার যাত্রাদলের নায়িকা আশালতার সঙ্গে আপনার একটা ভাব আছে। আনাপরা দুজন একে অপরকে ভালোবাসেন। চোখ তুলে তাকায় সেলিম চৌধুরী, চোখে চোখ রেখে আবার প্রশ্ন করে জালালউদ্দিন, আছে না আপনাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক?

না মানে, এক সঙ্গে কাজ করি। এ পর্যন্ত এগারোটা বই এক সঙ্গে করেছিতো। আশালতা দেবীর সঙ্গে একটা বোঝাপড়া আছে আর কী।

দেখেন, আমার সঙ্গে সোজাসাপ্টা কথা বলবেন। আপনি আশালতাকে ভালোবাসেন। বলেন, বাসেন না?

হঠাৎ অজানা অচেনা একজন লোককে কী করে গোপন ভালোবাসার জানালা খুলে দেবে? আর কেনই-বা দেবে? কিন্তুু লোকটাকে তো সুবিধার মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, কোথাও একটা মস্তবড় গিঁট আছে। কিন্তু কী গিঁট, কোন ধরনের গিঁট বুঝতে পারছে না সেলিম চৌধুরী।

জালালউদ্দিন খোন্দকার চেয়ার ছেড়ে সামনে দাঁড়ায়, টেবিলে হেলান দিয়ে কড়া চোখে তাকায়, আপনি আশালতাকে ভালোবাসেন না?

বাসি আর না বাসি তাতে আপনার কী?

হাসে জালাল, আপনার প্রশ্নটা সঙ্গত। কিন্তু আপনার এই প্রশ্নে, উত্তরটা পরে দেব। একেবারে পরিষ্কার করে দেব। এখন আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দিন।

হেদায়েত চা আর সিগারেট দিয়ে যায়।

নিন, চা নিন।

সেলিম চৌধুরী চায়ের কাপ হাতে নেয়। কিন্তু চুমুক দেয় না। মাথাটা তালগোল পাকিয়ে গেছে। লোকটা  কেন এইসব প্রশ্ন করছে? কী জানতে চায় সে? লোকটার কথাবার্তায় বুঝে গেছে, সত্যি কথা না বললে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা আছে।

আমার কথার উত্তর কিন্তু এখনও দিলেন না সেলিম সাহেব?  জালাল খোন্দকারের গলায় সামান্য ক্রোধ।

কী প্রশ্ন আপনার?

আপনি আশালতাকে ভালোবাসেন কী না?

বাসি।

গুড। এখন বলুন আশালতা আপনাকে ভালোবাসে?

বাসে।

ভেরি গুড। মনে হচ্ছে জালালউদ্দিন খোন্দকার হাতের তারায় তাস বাটছে, আশালতাকে আপনাদের বৈশাখী যাত্রাপালার মালিক গোবিন্দ দেবনাথও ভালোবাসে?

মাথা নাড়ায় সেলিম চৌধুরী, বুঝে গেছে এই লোক সব জানে। এখানে কোনো কিছু লুকানো যাবে না। এসব গোপন কপাট কে খুললো জালালউদ্দিন খোন্দকারের কাছে? নগেন দাস? হতে পারে। একশো টাকা দিলে নগেন দাশকে দিয়ে খুন করানোও যেতে পারে।

আমি সরাসরি বলতে পারব না। তবে, এই রকম আমিও শুনেছি।

আশালতা আপনাকে কিছু বলেনি?

বলেছে।

কী বলেছে?

গোবিন্দ বাবু ওকে বিরক্ত করছে।

আপনার প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছে করছে না?

মানে?

মানে, মালিক যখন একটা কিছু চায় খুব সহজেই সে সেটা পেয়ে যায়। কারণ মালিকের ক্ষমতা আছে। আছে প্রবল শক্তি। সেই শক্তির কাছে হেরে যাওয়ার আগে আপনার কিন্তু বিজয়ী হওয়ার পথ এবং সুযোগ আছে।

যতই শুনছে ততই অবাক হচ্ছে সেলিম। সামনের এই লোকটা কে? কেমন করে বলছে এসব? মুখ তুলে প্রশ্ন করেÑ আমার বিজয়ী হওয়ার কী পথ আছে?

বিজয়ী হওয়ার অনেক রকম পথ। আমি যে পথের ঠিকানা বলছি, সে ঠিকানায় যেতে হলে আপনাকে ভুলে যেতে হবে আশালতা দেবীকে।

অবাক চোখে তাকায় সেলিম চৌধুরী। অজানা ভয়ে শরীর একটু একটু কাঁপছে, আমি আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।

জালালউদ্দিন খোন্দকার আবার বসে চেয়ারে, পা তুলে দেয় পায়ের উপর, আয়েশ করে টান দেয় দামি সিগারেটে, না বোঝার কিছু আছে নাকি দুনিয়ায়? আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি।

টেবিলের ড্রয়ার টেনে টেবিলের উপর রাখে এক তোড়া টাকা। সব নতুন চকচকে কড়কড়ে টাকা। পাঁচশো টাকার নতুন নোট সব। মেসার্স সিমলা রাইস ঘরের মালিক এত টাকা কেন বের করে টেবিলের উপর রেখেছেন, কী চায় ভদ্রলোক? আশালতাকে ভালোবাসার জন্য আমাকে খুন করবে না-তো? কিংবা টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবে না-তো, আপনি বৈশাখী যাত্রাপালার মালিক গোবিন্দ দেবনাথকে হত্যা করুন। এই লোককে দেখে মনে হয়, সব পারে।

এই টাকাটা আপনার। এখানে আশি হাজার টাকা আছে। আমি যতদূর জানি, আপনি বৈশাখী যাত্রাপালা থেকে বছরে পান ত্রিশ হাজার টাকা। কারণ যাত্রাতো বারোমাস চলে না। আমি আপনাকে আরও বিশ হাজার টাকা দিব। অর্থাৎ আপনি আমার কাছ থেকে নগদে পাচ্ছেন পুরো এক লাখ টাকা। আমি জানি, আপনি এতো টাকা কখনও এক সঙ্গে দেখেননি। কী দেখেছেন?

ঘাড় নাড়ে সেলিম, না। দেখিনি।

সত্যি বলবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ, খুব মোলায়েম গলায় বলেন খোন্দকার। মনে হচ্ছে মের্সাস সিমলা রাইস স্টোরের পেছনের গদিতে সত্য বলবার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন খোন্দকার জালালউদ্দিন।

কিন্তু এই টাকা আমাকে দিচ্ছেন কেন?

এই টাকার বিনিময়ে আপনি আমাকে আশালতা দেবীকে দেবেন।

নিষ্পলক চোখে সেলিম চৌধুরী তাকিয়ে থাকে জালালউদ্দিন খোন্দকারের দিকে। সামনে বসা এই লোকটা কী মানুষ? ভালোবাসা টাকা দিয়ে কিনতে চায়! লোকটা আমাকে কী ভেবেছে? সামান্য এক লাখ টাকার বিনিময়ে আমি আশালতাকে ত্যাগ করবো? লোকটা বদ্ধপাগল।

আপনি যদি টাকাটা না নেন, তাতেও আপনার কোনো লাভ হবে না। কারণ, আশালতাকে নিয়ে ভানডারিয়া ত্যাগ করতে পারবেন না। টাকাটা নিলে আপনার কাছ থেকে একটা নৈতিক সাপোর্টের আশা রাখি আমি। আমি আপনাদের মালিক গোবিন্দ বাবুর সঙ্গে কথা বলেছি। ভদ্রলোক আমাকে চিনতে পারেনি, কিন্তু আমি খুব শীঘ্রই আমাকে চেনাব। মাঝখান থেকে আপনি এক লাখ টাকা হারালেন। আমি মনে করি, টাকাটা নিয়ে আপনি বুদ্ধির পরিচয় দেবেন।

কিন্তু আপনি আশালতাকে নিয়ে কী করবেন?

বিয়ে করব।

আপনি বিয়ে করবেন?

হ্যাঁ আমি বিয়ে করব আশালতাকে।

কিন্তু আমার তো ধারণা আপনার স্ত্রী আছে।

কেবল স্ত্রী না, আমার তিন তিনটি ছেলেমেয়ে আছে। মেয়েটি বড়। এ বছর ইন্টারমিডিয়েডে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে কলেজে। বড় ছেলে পড়ে ক্লাস এইটে, ছোট ছেলে পড়ে সিক্সে।

স্ত্রী-পুত্র-কন্যা থাকার পরও বিয়ে করবেন আপনি?

টেবিলে চাপড় দেয় জালালউদ্দিন খোন্দকার, অবশ্যই। আমি যেদিন প্রথম আশালতাকে দেখি, সেদিন সেই মুহূর্ত থেকে আশালতার প্রেমে পড়েছি। আশালতাকে না পেলে আমার জীবন থাকা না থাকা সমান। বুঝতে পারছেন, আমি জীবনবাজি রেখেছি আশালতার জন্য। কেবল জীবন? জীবনের চেয়েও বড় আমার সম্মান, আমার খ্যাতি সবই বিসর্জন দিতে বসেছি। আগামী নির্বাচনে আমি উপজলো চেয়ারম্যানের পদে নির্বাচন করব ভেবেছিলাম। আশালতা দেবীকে বিয়ে করার পর সেটা আর সম্ভব হবে না। আশালতাকে বিয়ে করব শুনে এলাকার মানুষ আমার নামে যা-তা বলছে। বিয়ে করলে কী হবে, তা তো বলাই যাচ্ছে না। আমার মেয়েটি লজ্জায় কলেজে যেতে পারবে না। আমার বিশ বছরের সংসার যার হাতে বেড়ে উঠেছে সেই স্ত্রী হেলেনা খানম আমাকে অভিশাপ দিচ্ছে, আমাকে লুকিয়ে কাঁদছে, সবকিছুকে আমি আশালতার জন্য বাজি রেখেছি।

থমকে যায় সেলিম চৌধুরী। মনে হচ্ছে ভুল করে এক অজানা টানেলে ঢুকে পড়েছে। দীর্ঘ অন্ধকার এক টানেল। এই টানেলের কোনো শেষ নেই। যা শুনছে, ভুল শুনছে। যা ঘটছে, যা শুনছে এসব আগামী যাত্রাপালার  কোনো দৃশ্য।

চেয়ারে হেলান দিয়ে আবেগে চক্ষু বন্ধ করে জালালউদ্দিন খোন্দকার, বুঝলেন নায়ক সাহেব, জানি আপনি অবাক হয়েছেন। যে-ই শোনে আমার এই বিয়ের ঘটনা, তাজ্জব হয়ে আমার দিকে তাকায়। প্রথমে মনে করে আমি বুঝি ঠাট্টা বা মশকরা করছি। কিন্তু যখন বোঝেÑ না, আমি ঠাট্টা বা মশকরা না, সত্যি বিয়ে করতে যাচ্ছি তখন তাজ্জব বনে যায়। বিস্ফোরিত চোখে তাকায়। হাসতে হাসতে সিগারেটে টান দেন জালালউদ্দিন খোন্দকার, আমি নিজেও কী কম অবাক! আমিও তো আমাকে চিনতে পারছি না। ঘরে অমন সুন্দরী স্ত্রী রেখে কেন আমি আবার বিয়ে করতে যাচ্ছি?  কেন বিয়ে করতে যাচ্ছি, এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু আমি আপনাকে দিতে দিতে পারব না নায়ক সাহেব। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে একমাত্র আশালতা দেবী।

আশালতা দেবী আপনাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে?

তা তো জানি না।

জানেন না? দাঁড়িয়ে যায় সেলিম চৌধুরী।

জানব কেমন করে? আমার সঙ্গে তো আশালতার এখনও দেখা হয়নি, কথাও পরের কথা। আশালতা দেবী হয়তো আমাকে চেনে না। আমি  ওকে দেখেছি আপনাদের মঞ্চে। আপনার সঙ্গে অভিনয় করতে। কী অসাধারণ ধনুকের ঢংয়ে বাঁকা শরীর। চোখের কটাক্ষ! মুখের চাক ভাঙা হাসি… দেখেই আমি মজে গেছি। আমার সারা দুনিয়াজুড়ে এখন কেবল আশালতা আর আশালতা। জানি, লোকে আমাকে নিন্দা করছে। আমার বদনাম করছে, কিন্তু আশালতা ছাড়া আমার মুক্তি নেই। আহা, দাঁড়িয়ে গেলেন কেন? বসুন নায়ক সাহেব।

না, আমি যাই।

আরে আর একটু বসুন না! আপনার সঙ্গে কেবল কথা জমে উঠেছে। বিকেল মাত্র, পালা শুরু হবে মাঝ রাতে। বসুন  না, কানের কাছে মুখ নেয় খোন্দকার, মাল খাবেন?

মাল?

মাল বুঝলে না? তরল? অভ্যাস আছে?

মাথা নাড়ায় এদিক ওদিক, নাহ্। আমার তেমন অভ্যাস নেই।

বলেন কী? যাত্রাপালায় অভিনয় করেন আর মাল খান না? বিদেশি মাল আছেÑ ফোন করলেই দিয়ে যাবে। চাইলে মাংসেরও ব্যবস্থা করতে পারবো। খাবেন?

সেলিম চৌধুরী  চায় দ্রুত পালাতে, মেসার্স সিমলা রাইস স্টোরের পেছনের গোপন গদির চার দেয়াল ভেঙে। এখানে, এই লোকের সামনে বেশিক্ষণ থাকা মানে বিপদ ডেকে আনা। বিপদ তো ঘাড়ের উপর অলরেডি ভর করেছে। এসেছিল চা সিগারেট খেয়ে আড্ডা মারতে, আর এসে ফাঁদের সামনে দাঁড়িয়েছে। রুম থেকে বের হওয়ার সময়ে দেখা হয়েছিল আশালতার সঙ্গে। বেশ সেজেগুজে নগেন দা আর মালতির সঙ্গে বের হচ্ছে।

কোথায় যাচ্ছ?

বলব না, মিষ্টি হাসে আশালতা, তুমি কোথায় যাচ্ছ?

একটু আড্ডা মেরে আসি।

আমি যাচ্ছি পাশেই একটা বাড়িতে। আমাকে গতকাল থেকে নেয়ার চেষ্টা করছে। লোক পাঠিয়েছে। যাইÑ শরীরে ঢেউ তুলে চলে যায় আশালতা। পেছনে পেছনে বের হয়ে আসে সেলিম চৌধুরী। আশালতা কী জানে তাকে নিয়ে কী এক খেলা চলছে! আহা একটি জীবন, একটি দিন মানুষের জীবনে কী অসম্ভব পরিবর্তন নিয়ে আসে? খোন্দকারের ফাঁদের জাল ছিন্ন করে বের হওয়া দরকার। হাই তোলে সেলিম চৌধুরী, আজ রাতের পালার একটু রিহার্সেল বাকি আছে।

তাই! দাঁড়ায় জালালউদ্দিন খোন্দকার, কিন্তু আমার প্রস্তাবটা?

কিসের প্রস্তাব?

আশালতাকে ভুলে যাওয়ার প্রস্তাব, টেবিলের উপর রাখা টাকার বান্ডিলটা নাড়াচাড়া করছে জালালউদ্দিন খোন্দকার।

ভালোবাসলে, ভালোবাসার মানুষকে কী ইচ্ছে করলেই ভুলে যাওয়া যায়?

আপনি তো জটিল প্রশ্ন তুললেন। কিন্তু প্রশ্ন তুলে তো লাভ নেই, কারণ আশালতাকে আমার চাই। আর আপনি বুঝতে পারছেন না কেন, আশালতা এই ভানডারিয়া ছেড়ে যেতে পারবে না। আমার হাতের নাগাল আপনি জানেন না নায়ক সাহেব, আমার হাতের নাগাল থেকে যেতে চাইলে মানুষ নয়, লাশ হয়ে যেতে হবে। এই কাঁচা বয়সে লাশ হওয়ার চেয়ে বেঁচে থাকার সুখ নিলে ভালো হয় না? সরাসরি চোখ রাখে সেলিম চৌধুরীর চোখে।

জালালউদ্দিন খোন্দকার চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ায় সেলিমের পেছনে, আপনি কিংবা আশালতা দেবী যদি লাশ হয় সেটা হবে আমার জন্য দুর্ভাগ্য। আশালতা দেবী এবং আপনি দু’জন প্রতিভাদীপ্ত  অভিনয় শিল্পী। আপনারা বাঁচিয়ে রাখছেন যাত্রাশিল্পকে।  শিল্প কী করে বাঁচবে যদি শিল্পী না বাঁচে? বুঝছেন আমার কথাটা?

সেলিম কোনো কিছুই ভাবতে পারছে না। বোধ অসাড় হয়ে আসছে। হাঁসফাঁস করতে থাকে। মনে হচ্ছে রুমের মধ্যে অক্সিজেন নেই।

ঘাড়ের উপর হাত রাখে জালালউদ্দিন, বুঝলেন নায়ক সাহেব জীবন হচ্ছে জীবনের চেয়েও বড় শিল্পী। সুতরাং জীবনের শিল্প নিয়ে ভাবেন, এই টাকাটা পকেটে রাখেন, জালালউদ্দিন খোন্দকার টাকার বান্ডিলটা পকেটে ঢুকিয়ে দেয়Ñ শোনেন নায়ক সাহেব, টাকার চেয়ে বড় শিল্প দুনিয়ায় নেই। আশালতা দেবীকে আপনি পেলেন না, তাতে কী, আশালতা দেবীকে বাজি রেখে আপনি নগদ একলাখ টাকা আয় করলেন। আমি কথা দিচ্ছি, আপনি যে আমার কাছে আপনার ভালোবাসাকে বন্ধক রাখলেন, আমি কাউকে বলব না। বাড়ি যান, আপনারা তো পেয়াদা বংশ। অভিনয় করতে এসে হয়েছেন চৌধুরী। আপনার আয় রোজগারের উপর আপনার পরিবার-মা বাবার জীবন চলে। আমি কি ঠিক বললাম? চোখের উপর চোখ রাখেন খোন্দকার জালালউদ্দিন। মুখে অদ্ভুত হাসি, জমিজমা রাখেন, হালচাষের ব্যবস্থা করেন, জীবনে সুখ পাইবেন। জমিজমা হবার পর নতুন করে ভালো দেখে একটা মেয়েকে বিয়ে করবেন। ব্যস, জীবন হয়ে উঠবে মধুর..।

হা হয়ে যায় সেলিম চৌধুরীর মুখ, জালালউদ্দিন খোন্দকারের কঠিন চোখের দিকে তাকিয়ে মাথাটা নীচু করে বের হয়ে যায় সেলিম চৌধুরী। পকেটে আশি হাজার টাকার বান্ডিলটা শোনাচ্ছে যাত্রার বিবেকের সেই চিরায়ত গান,… এই পৃথিবী কে কাহার…সুযোগের করো ব্যবহার….

পোনা নদীর পারে ইটের লাল ভাটা। এখন কাজ বন্ধ। সামনে সবুজ মাঠ। ঘাসের উপর বসেছে সেলিম চৌধুরী। সূর্য ডুবে যাবার আয়োজন করছে। পশ্চিম আকাশটা লালে লাল। ডুবতে যাওয়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সেলিম চৌধুরী মাটিতে শুয়ে পরে, চিৎ হয়ে। সরাসরি দেখে লাখ লাখ কিলোমিটার দূরের আকাশ। দূর থেকে বাঁিশর সুর কানে আসছে। সেলিম চৌধুরী উদাস হয়ে আবার উঠে বসে। তাকায় নদীর দিকে। একটা লঞ্চ চলে যাচ্ছে। লঞ্চটায় প্রচুর মানুষ। কোথায় যাচ্ছে এই মানুষগুলো?

পকেটে হাত দিয়ে টাকার বান্ডিলটা আনে। কচকচে টাকা, চকচকে টাকা। আশি হাজার টাকান বা-িল। জীবনে প্রথম একসঙ্গে এতগুলো টাকা হাতে পেলো। তাও ভালোবাসার মানুষটার বিনিময়ে। জালালউদ্দিন খোন্দকার ঠিকই বলেছে, জীবনে একসঙ্গে এত টাকা দেখিনি আমি। দেখব কী করে? আশি হাজার টাকার বান্ডিলটা চিরকালের ভূমিদাস বাবা জসিমউদ্দিন পেয়াদার হাতে তুলে দিলে, কেমন হবে  চেহারা, ভেবে আমোদ অনুভব করছে  বৈশাখী যাত্রাপালার নায়ক সেলিম চৌধুরী। টাকাটা হাতে নিলে চোখ ঠিকরে বের হয়ে আসতে চাইবে বাবা জসিমউদ্দিনের। কত আশা, নিজের একজোড়া গরুর। যে গরু দিয়ে জমিতে চাষ করবে, ফসল ফলাবে। এক জোড়া গরুর টাকা কোনোদিনই বেচারা কৃষক জসিমউদ্দিন পেয়াদা জোটাতে পারলো না। আশালতাকে বিসর্জন বা বন্ধক দিয়ে বাবা জসিমউদ্দিন পেয়াদার একজোড়া বলদের বলদ হবে সে? হাসি পায় সেলিমের, এক নারীর বিনিময়ে একজোড়া বলদ। আচ্ছা, পরের বিশ হাজার টাকা দেবো তো জালালুদ্দিন খোন্দকার? লোকটাকে ভয়ানক নিষ্ঠুর মনে হলেও সৎ মনে হয়েছে। কথা যখন দিয়েছে কথা রাখবে, ভরসা রাখতে চায়। না রাখলেও বা কী করতে পারবে সে? বলতে পারবে কী ভাই, আমার বাকি টাকাটা দিলেন না?

লোকটি যদি প্রশ্ন করে, কিসের টাকা?

কী জবাব দেবে যাত্রার নায়ক সেলিম চৌধুরী? প্রকৃতপক্ষে ওর কাছে কোনো জবাব নেই।

আশালতাকে ভুলতে পারবো আমি? মেয়েটি আমাকে প্রাণ খুলে ভালোবেসেছে। যাত্রাদলে সেলিম চৌধুরীর সঙ্গে আশালতার প্রেমের সম্পর্কটা দানা বাঁধতে শুরু করলে বাঘের চেহারা নিয়ে গোবিন্দ দেবনাথ প্রাচীর তুলে দাঁড়ায়। আশালতাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছে গোবিন্দ, তুমি সেলিমের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করবে না। ওকে আমি দলে রাখবো না।

কেন?

ওর সংলাপ ডেলিভারি হয় না। দর্শক ওকে এখন নিতে চায় না।

তাই নাকি? ভেতরে ভেতরে হাসে আশালতা। কিন্তু ভেতরের হাসিটা বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। না হেসে উপায় থাকে না।

তুমি হাসছো কেন?

আপনি একমুখে কত কথা বলেন, বলতে পারেন, শুনে তাই হাসি পায়।

মানে?

মাইকেল মধুসূদন যাত্রাপালায় নামানোর সময়ে আপনি সেলিমকে কী বলেছিলেন?

কী বলেছিলাম?

মনে নেই আপনার?

না।

আপনি সেলিমের অভিনয় দেখে বলেছিলেন- সেলিম, আজ অমলেন্দু বিশ্বাস বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতেন। বলতেন, আমার অভিনয়ের একজন যোগ্য উত্তরসূরী পেয়েছি। তোমার মধ্যে দিয়ে আমি অমলেন্দু বিশ্বাস বেঁচে থাকব। আর সেই গোবিন্দ বাবু আজ বলছেন সেলিমের সংলাপ হয় না? আশ্চর্য! যাত্রা  করতে এসে কত যাত্রা দেখছি গো!

দেখো আশা, তুমি তো শুধু অভিনয় করো। আর পুরো দলটাকে চালাতে হয় আমাকে। দলে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশজন মানুষ। সবাইকে সামলানো কী সোজা? আর সেলিম চৌধুরী কেন, আমার বৈশাখী যাত্রাদল টিকিয়ে রাখতে অনেককে অনেক কথা বলতে হয়, বলেকয়ে বুদ্ধি করে সবাইকে হাতে রাখতে হয়। সেই কারণে হয়তো আমি সেলিমকে ওইসব বলেছিলাম। তার মানে এই নয়,ও ভালো অভিনয় করে।

সেলিম চলে গেলে সেলিমের জায়গায় কাকে রাখবেন?

একটা ছেলে পেয়েছি। দীপালী যাত্রাদলের।

কী নাম?

ভবতোষ মিশ্র। বেশ লম্বা, স্বাস্থ্যবান। ভবতোষ মঞ্চে দাঁড়ালে মঞ্চ কাঁপে। চড়া গলা। সংলাপের ডেলিভারি ভীষণ ভালো। আমার সঙ্গে কথা চলছে, কিন্তু সেলিম চৌধুরীর চেয়ে টাকা বেশি চাচ্ছে। আমি চেষ্টা করছি বুঝিয়ে শুনিয়ে আমার দলে আনতে। আনতে পারলে সেলিম চৌধুরীকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব।

আপনি কী করে ভাবলেন, একজন এনে দাঁড় করালেই আমি সেই লোকের সঙ্গে অভিনয় করবো? আমারও পছন্দ অপছন্দ থাকতে পারে না?

আশা! হিসহিস করে গোবিন্দ দেবনাথের গলা, তুমি আমাকে এমন কথা বলতে পারলে?

হাসে আশালতা,অন্যায় কিছু বলেছি?

এখন অনেক বড় নায়িকা হয়েছো তুমি, মুখের উপর যা ইচ্ছে তাই বলতে পারছ? পিছনের ইতিহাস এত তাড়াড়াড়ি ভুলে গেলে?

ইতিহাস? কোন ইতিহাসের কথা বলছেন গোবিন্দ বাবু?

আট বছর আগে তুমি কোথায় ছিলে, একবার মনে করে দেখো।

কোথায় ছিলাম আপনিই বলুন।

আমি কেন বলব? তোমার মনে নেই?

হাসে আশালতা, কেন মনে থাকবে না? আমি কোনো কিছুই ভুলি নাই।

সত্যি ভোলো নাই?

না। ভুলি নাই। সেসব কী ভুলে যাওয়া যায়? আমি বাড়ির কাছের অমলের হাত ধরে ঘর ছেড়েছিলাম। ও আমাকে বলেছিল সঙ্গে করে অনেক টাকা নিয়ে এসেছে। কিন্তু অমল আমাকে মিথ্যা বলেছিল। শুরুতেই অমল আমাকে ভালোবাসেনি। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি। অমল আমার সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করেছে। ও চেয়েছিল আমাকে বিক্রি করে ওর স্যালো মেশিন কেনার টাকার জোগাড় করতে। ওর সঙ্গে ঘর ছেড়ে প্রথমে আমরা বাগেরহাটে আসি। একটা হোটেলে থাকি কয়েকদিন। প্রথম হোটেলে বা শহরে থাকছি, আমি স্বপ্নে উড়ছিলাম। রুমে বসে খাওয়া দাওয়া, ফোন করলে লোক এসে চা দিয়ে যায়। আমার কাছে সব কিছু স্বপ্ন মনে হচ্ছিল। আমরা মাঝে মাঝে বেড়াতে যেতাম মার্কেটে। দেখতাম সিনেমা। বেশ চলছিল। হঠাৎ একদিন অমল একজন লোক নিয়ে এলো, পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, বন্ধু আমজাদ। আমজাদের বাড়ি মংলা। আমজাদের  গ্রামে  বেড়াতে যাব আগামীকাল। আমি রাজি হলাম নতুন জায়গা দেখার আশায়। আমার সঙ্গে আমাজাদ ওর বাড়ির অনেক গল্প করল। রাতে আমরা হোটেল একসঙ্গে খেলাম। আমজাদই জোর করে বিল দিলো। খেয়ে চলে গেলো আমজাদ। আমরা হোটেলে এলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে অমল বাইরে গেলো। বললো, এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরবে। আমাকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যাবে। আমি সেজেগুজে অপেক্ষা করতে থাকি অমলের। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো, অমল আসে না। আমি দুশ্চিন্তায় যখন পাগলপ্রায়, সেই সন্ধ্যায় এলো আমজাদ। বললো, ভাবি চলেন আমার সঙ্গে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বন্ধু কই? সেই যে সকালে গেলো আর তো আসছে না।

একটা জরুরি কাজে অমল আগেই মংলা চলে গেছে। আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে বলেছে। এই নিন চিঠি। আমাকে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দেয়। হাতে নিয়ে দেখি, অমলেরই লেখা। অমল লিখেছে, আশালতা, তুমি আমজাদ ভাইয়ের সঙ্গে চলে এসো। আমি একটা বিপদে পড়ে হঠাৎ আগে চলে এসেছি। মংলা এলেই আমাকে পাবে। এখানে আমি ব্যবসা করব। চিঠি পড়ে আমি অবাক হলাম। অমল আমার স্বামী। যদিও আমাদের তখনও বিবাহ হয়নি কিন্তু স্বামী স্ত্রীর মতো জীবন যাপন করছিলাম। কিন্তু এখন আমি কী করব? কার সঙ্গে পরামর্শ করব? আমার চারপাশটা অন্ধকার হয়ে এলো। আমি কাঁদতে শুরু করলাম।

আমজাদ আমাকে বোঝাতে শুরু করল। ইতিমধ্যে আমজাদের আর একজন বন্ধু এলো। সেই বন্ধুর চোখজোড়া লাল। মুখ রুক্ষ। কথা বলে না যেন চড় মারে ঠাস ঠাস। আমাকে বললে, এখন কাঁদছেন কেন? কান্নার অনেক সময় পাবেন। চলেন আমগো লগে।

কথা বলার সময়ে টের পেলাম লোকটার মুখ থেকে মদের গন্ধ আসছে। জীবনে প্রথম মদের গন্ধ পেলাম। আমি বুঝতে পারছি, আমি একটা ফাঁদে আটকা পড়ে গেছি। দেখলাম, মদ খাওয়া লোকটা খুব চোটপাট করছে আমজাদের সঙ্গে, বলছে আমার বের হতে দেরি হলে হোটেল রুমের মধ্যে খুনোখুনি হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে ওদের সঙ্গে বের হয়ে এলাম কাঁদতে কাঁদতে।

বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখলাম আরও কয়েকজন লোক। সবাই আমাকে বারবার দেখছে। বুঝে গেছি আমি চিরকালের জন্য অমলকে হারিয়েছি। ওরা টিকেট কেটে বাসে উঠছে।

আমজাদ এসে আমার পাশে দাঁড়ায়, চলেন ভাবি। বাসে উঠি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, বাসে আমরা কোথায় যাবো?

বাণীশান্তা! বলেই জিহ্বায় কামড় দেয় আমজাদ, না ভাবি। আসলে আমরা যাবো মংলা।

কিন্তু আমার মনে হলো বাণীশান্তা যে-জায়গাই হোক, আমার জন্য সুখের কোনো জায়গা নয়। সুখের হলে আমজাদ জিহ্বায় কামড় দেবে কেন? আর আমজাদের সঙ্গের তিনজন লোকের চেহারা হাবভাব মনে হচ্ছে লোকগুলো ডাকাত। আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি ওদের সঙ্গে যাব না।

আমজাদ তাড়া দেয়, ভাবি ওঠেন বাসে। এখনই বাস ছাড়বে।

আমি তোমাদের সঙ্গে যাবো না, বললাম আমি।

দেখলাম, আমজাদের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। চোখ বড় বড় করে আমাকে দেখছে। কানের কাছে মুখ এনে বলে, ভাবি- আপনি চাইলেও এখানে থাকতে পারবেন না। আমাদের সঙ্গে চলেন নইলে বিপদে পড়বেন।

যাব আমি, তার আগে অমলকে আমার সামনে হাজির করেন।

বিরক্তি প্রকাশ করে আমজাদ, কি যে বলেন! এখন এই বাস স্টপিজে অমলকে পাব কোথায়? অমলতো… লোকটা তোতলাতে থাকে।

অমল কোথায়?

বললাম তো আপনার স্বামী আমার বন্ধু অমল মংলায়। অমল মংলায় আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। গেলেই দেখতে পাবেন। আমজাদের আচরণে উৎকণ্ঠা দেখতে পাই আমি। বুঝতে পারি, কোথাও একটা ঝামেলা আছে। সাহস করে বলি, ওর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে চাই আমি।

বাসে যে দুজন লোক উঠেছিল, তার একজন নেমে আসে। বাস স্ট্যান্ডের চারপাশে লোকজন গিজগিজ করছে। দূরে তিন চারজন পুলিশকে দেখে আমার মনে সাহস বাড়ে। মনে মনে ভেবেছি ওরা বেশি তেড়িবেড়ি করলে দৌড়ে পুলিশের কাছে যাব। আমার ভাবনার মধ্যে হোটেল রুমে আসা সেই তিরিক্ষি লোকটি বাস থেকে নেমে এসে আমার সামনে দাঁড়ায়, তাকায় কড়াচোখে, তুমি আমারে চেন?

না।

আমার নাম মোখলেস। আমি মাইয়া মানুষ কেনাবেচা করি। তোমারে আমি ত্রিশ হজার টাকায় কিনচি অমলের কাছ থেকে। একবারে নগদ ত্রিশ হাজার টাকা। অমল টাকা লইয়া গ্রামে গেছে, শ্যালো মেশিন কিনে জমি চাষাবাদ করবে। এহন তুমি আমার মাল। তেরিবেড়ি না কইরা আমার লগে বাসে ওঠো। নইলে, লোকটার হাতে রিরাট ধারালো চাকু দেখতে পাই।

দেখছ তো? একটা টান দিমু পেটের উপর, নাড়িভুড়ি সব বাইরে চইলা আইবে। বেশি তেরিবেড়ি না কইরা বাসে ওঠো।

আমি যামু না।

লোকটা কুচকুচে কালো দাঁত বের করে হাসলো, কইচিতো তুমি আমারে চেন নাই। আমার নাম মোখলেস। মোখলেস যে মাইয়া একবার কেনে, সেই মাইয়া সারা জীবনের জন্য মোখলেসের হইয়া যায়। আর এই এলাকাটা আমার হাতের মইধ্যে। আমি টাইনা বাসে উঠালে কেউ আসবে না তোমাকে বাঁচাইতে। ঝামেলা না কইরা চলোÑ লোকটা হাঁটতে শুরু করে, ভেবেছে আমিও পিছনে পিছনে আসছি। আমজাদ হাঁটছে লোকটার সামনে সামনে। আমি দেখলাম এই সুযোগ। এক দৌড়ে আমি একটু দূরের পুলিশের কাছে যাই।

বলি, ভাই আমাকে বাঁচান।

কী হয়েছে আপনার? আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে এএসআই জহিরুল হক।

আমাকে কয়েকজন বাসে তুলে নিতে চায়।

কই তারা? জহিরুল হক সঙ্গের পুলিশদের ইঙ্গিত করে, দেখো তো কারা ওনাকে বাসে তুলতে চায়?

আমি পিছনে তাকাই। লোকগুলোকে আর দেখি না। আমি আশপাশে ভালো করে তাকাই। না, নেই। ওরা পালিয়েছে। এএসআই জরিহুল হক পুলিশদল বাসস্ট্যান্ড ঘোরে আমাকে নিয়ে। কোথাও ওরা নেই। আমি এক বিপদ থেকে আপাতত মুক্তি পেলেও আবার নতুন বিপদে পড়লাম। আমি এখন কোথায় যাব? বাড়িতে যাওয়ার আর কোনো পথ নেই। আমার সামনে আমি কোনো পথ খুঁজে পেলাম না।

জহিরুল হক জিজ্ঞেস করলো, আপনি ওদেরকে চেনেন?

না।

চেনেন না?

আমি নিশ্চুপ থাকি। আমার অবস্থা হচ্ছে কড়াই থেকে চুলোয় পড়ার মতো। এখন পুলিশকে সব বলতে হবে, আমার সর্বনাশের সমুদয় ঘটনা ।

আসলে ঘটনা কী?

ইতিমধ্যে আমাকে ঘিরে অনেক লোক জমা হয়েছে মজা দেখার জন্য। নানা কথা বলতে শুরু করেছে। আমার কান গরম হয়ে উঠলো। জহিরুল হক খুব ভালো পুলিশ অফিসার। সবাইকে চলে যেতে বলল। সবাই চলে গেলে আমাকে বলল, এখন আমাকে বলুন কী ঘটনা ঘটেছে। একটা কথা পুলিশ সম্পর্কে অনেক বাজে কথা গল্প ছড়ানো আছে। দয়া করে আমাকে সেরকম না ভেবে একজন বন্ধু ভেবে বলুন, কী ঘটেছে।

আমি সব বললাম। জহিরুল হক আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে বললো, ঠিক আপনার মতো ঘটনা ঘটেছে আমার চাচাতো বোনের জীবনে। যে বোনটাকে আমি খুব ভালোবাসতাম। আপনার সৌভাগ্য বাণীশান্তায়  যাবার আগেই আপনি পুলিশের কাছে এসেছেন। কিন্তু আমার বোন রুনি এখন বাণীশান্তায়।

বাণীশান্তা কী?

জহিরুল হক আমার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। বললো, বেশ্যাপাড়া। মংলা খুলনা বাগেরহাট পিরোজপুরÑ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের বড় বেশ্যাপাড়া।

আমার মনে হলো আমার শরীরে বজ্রপাত হয়েছে। আমার শরীর আমার মন আমার সুন্দর আমার আনন্দ আমার বিরহ আমার প্রেম আমার অনুভব আমার গোপনÑ সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি বাসস্ট্যান্ডে একজন মৃত মানুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকি। শেষ পর্যন্ত অমল আমাকে বেশ্যা বানাতে চেয়েছিল? অথচ এই অমল আমাকে একনজর দেখার জন্য পথে পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত।

জানেন, আমি মাঝে মাঝে রুনিকে দেখতে যাই, আমার সঙ্গে আপন মনে কথা বলে জহিরুল হক।

রুনি কে?

রুনি? যাকে আমি ভালোবাসতাম। যদিও রুনি আমার চেয়ে বয়সে এক বছর বড় কিন্তু আমি ওর প্রেমে পড়েছিলাম। ওকে পাগলের মতো ভালোবাসতাম। কিন্তু আমার ভালোবাসাকে উপহাস করতো। হাসতো। আমার পুলিশের চাকরিকে খুব অপছন্দ ছিল রুনির। বলত আমাকে বিয়ে করতে চাইলে তোকে পুলিশের চাকরি ছেড়ে আসতে হবে। আমি বোঝাতে চাইতাম। বিদেশি পারফিউম পছন্দ করত ও। আমি প্রতি মাসে দামি দামি পারফিউম পাঠাতাম। রুনির বন্ধু, একসঙ্গে কলেজে পড়ত, ইশতিয়াক নাম, সেই ইশতিয়াকের হাত ধরে ঘর ছাড়ে রাতের অন্ধকারে। রুনির বাবা আমার বড় চাচা শামসুদ্দিন খান মারা গেলেন হার্ট অ্যাটাকে। আমরা সহ্য করলাম। সহ্যটা অসহ্য হয়ে উঠলো যখনÑ

থেমে যায় জহিরুল হক। আমি তাকিয়ে থাকি মানুষটার মুখের দিকে। খুব সুন্দর মুখ। বলিষ্ঠ গড়ন। লম্বা তাগড়া চেহারা। এমন বলিষ্ঠ পুরুষকে ভালোবাসল না কেন রুনি? আসলে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া যায় না। ভালোবাসা বা প্রেম এক ছন্নছাড়া অগ্নিকা-। এই ছন্নছাড়া অগ্নিকা- কখন কার খোঁপায় লাগবে, কেমন করে লাগবে, লাগলে কতটুক পুড়বে- কেউ কী আগে বলতে পারে?

আমি বললাম, থামলেন কেন? কেন অসহ্য হয়ে উঠল?

ইশতিয়াক কয়েক মাস রুনিকে ব্যবহার করে বাণীশান্তার দালালদের কাছে এক লাখ টাকায় বিক্রি করে দেয়।

এক লাখ টাকায়?

হ্যাঁ। কারণ রুনি দেখতে ছিল দারুণ সুন্দরী। যে কেউ দেখলে ওর প্রেমে পড়ত। জানেন, যে রুনি পুলিশকে, পুলিশের চাকরিকে ঘৃণা করত, সেই রুনি এখন সেই পুলিশকে খুব ভালোবাসে।

আপনার কথা বুঝতে পারলাম না।

লোকমুখে জানাজানি হলো আমাদের রুনি বাণীশান্তায়। একজন নামি দামি বেশ্যা। আমি বাণীশান্তায় যাই। যেহেতু পুলিশ আমি, আমার একটা ক্ষমতা আছে। সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে বাণীশান্তার প্রতিটি ঘর খুঁজে খুঁজে ওকে বের করি। আহারে, কী ভয়ংকর দৃশ্য, আমাদের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার সবচেয়ে সুন্দরী কন্যা এখন শ্যাওলাপরা পাতিলের মতো পশুর নদীর তীরে একটা ভাড়া খুপরি ঘরে থাকে। সারাদিন কাঁদে। আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিল। প্রথমে না চেনার ভান করে। কিন্তু আমি হাসতে থাকি। আমার হাসি দেখে  ভযংকরভাবে গালিগালাজ করতে লাগলো। আশপাশের লোক আমাকে দেখে অবাক। আমার শরীরে পুলিশের পোশাক, আমি দাঁড়িয়ে আছি রুনির ঘরের সামনে, বেশ্যা হবার পর ওর নাম হয়েছে দিলরুবা। সেই দিলরুবা আমাকে গালি দিচ্ছে আর আমি দাঁড়িয়ে শুনছি। ধীরে ধীরে ওর স্যাঁতস্যাঁতে ছোট্ট খুপরি ঘরে প্রবেশ করে ওকে জড়িয়ে ধরি। ও আমার বুকে একটি পুতুলের মতো ভেঙে পড়ে। আমি এখন প্রতি রোববার ওর কাছে যাই।

আপনি তো আবার- এবার থেমে যাই আমি।

হাসে জহিরুল হক, আমি কী চেষ্টা করিনি? আমি ওর পায়ে ধরে বলেছি, চল রুনি, যা হবার হয়েছে। আবার নতুন করে সংসার শুরু করি আমরা। আমি যদি ভুলেও কোনোদিন এ বিষয়ে প্রশ্ন করি, তোকে ছোট করি, তুই যে শাস্তি দিবি মাথা পেতে নেব।

কী বলেছে?

বলেছে, জহিরুল তোকে এক সময়ে উপহাস করতাম। যা তা বলতাম। তোর পুলিশের চাকরি, পোশাককে অবজ্ঞা করেছি, যা তা বলেছি।  সেই তুই এখন আমার প্রাণ। তোকে এখন আমি আমার জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসি। কিন্তু তোকে বিয়ে করব না।

কেন বিয়ে করবি না?

বিয়ে করলে যে আমাকে বাণীশান্তার এই বেশ্যাপাড়া ছেড়ে যেতে হবে।

সেটাই কী স্বাভাবিক নয়? মানুষ তো সুস্থ ও সুন্দর জীবন চায়।

আমি চাই না সুন্দর ও সুস্থ জীবন। আমি আর মানুষের পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাই না।

আমি ওকে দুহাতে আঁকড়ে ধরি, কেন?

আমি তোর উপর যে অন্যায় করেছি এই বেশ্যাপাড়ায় থেকে তার প্রায়শ্চিত্ত করব। তোর ভালোবাসাকে আমি অপমান করেছি। আমি এখানে থেকে আমার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করব।

নিজের প্রতি প্রতিশোধ নিচ্ছে আর কী! আপন মনে বলে আশালতা।

আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি যখনই যাই, ওর পা ধরে কাঁদি, দুহাত জড়ো করে অনুরোধ করি, আমাকে কেন এমন শাস্তি দিচ্ছিস? আমাকে ভয় দেখায়, তুই যদি বেশি বাড়াবাড়ি করিস আমি পশুর নদীর জলে ডুবে মরব। আমি জানি, রুনি সাঁতার জানে না। পশুর নদীতে নামলেই ও ভেসে যাবে।

বাড়ির সবাই কী রুনির খবর জানে?

জানে। কিন্তু কেউ ভুলেও মনে করে না। মানুষ এক অদ্ভুত প্রাণী। এই যে আপনি, কী যেন নাম আপনার?

আশা, আশালতা।

ভারি সুন্দর নাম। আশালতা। লতায় জড়ানো আশা। তো আপনি কী এখন বাড়িতে ফিরে যেতে পারবেন? বাড়ি গেলেও কী আপনার আত্মীয়Ñ যেমন মা বাবা ভাই বোন আপনাকে গ্রহণ করবে? যদিও বেদনায় তাদের হৃদয়ের তন্ত্রী ছিঁড়ে যাবে কিন্তু নেবে না। গ্রহণ করবে না। সুচিতার দোহাই দেবে, সমাজের দোহাই দেবে, ধর্মের বাধা নিষেধের প্রসঙ্গ তুলবে, বলবে তুমি শুদ্ধ নও। একবারও ভাববে না আপনার জীবনযন্ত্রণাকে।

আমি তো আপনাকে খুঁজতে খুজতে এখানে এসেছিÑ জহিরুল হকের সামনে দাঁড়ায় একজন সৌম্যদর্শন মানুষ। কী করছেন এখানে? অফিসে চলেন।

এখানে কেন এসেছেন? জহিরুল হক পুলিশের মোড়কে ফিরে যায় মুহূর্তে।

আজ আপনি আমার যাত্রাপালা দেখবেন না?

আজকের পালার নাম কী?

গুনাইবিবি।

গুনাইবিবি?

হ্যাঁ।

ঠিক আছে যাব।

যাবার সময়ে ওসি সাহেবকে নিয়ে যাবেন। হাত পাকিয়ে বোতল দেখিয়ে হাসতে হাসতে বলে, আজকে ভালো আয়োজন আছে।

যাব। আশালতার দিকে চোখ রেখে জহিরুল হক কথা বলছে গোবিন্দ দেবনাথের সঙ্গে। কথা বলতে বলতে ডাক দেয় জহিরুল হক, গোবিন্দ বাবু?

বলুন।

দেখুন তো আমার সামনের এই মেয়েটি আপনার বৈশাখী যাত্রাপালায় কোনো কাজ করতে পাওয়ার যোগ্যতা রাখে কী না? আমার তো মনে হয় উনি নায়িকা হওয়ার ক্ষমতা রাখে। আপনার এখন যে নায়িকা, কী যেন নাম তার?

আলেয়া আখতার।

উনি তো আলেয়া আখতারের চেয়েও সুন্দরী। ফিগারও চমৎকার।

গোবিন্দ দেবনাথ ভালো করে তাকায় আশালতার দিকে। সেই তাকানো মানে অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। ঘুরে ঘুরে এদিক ওদিক তাকিয়ে গোবিন্দ দেবনাথ একটু গাম্ভীর্যের সঙ্গে কিছুটা সংশয় কণ্ঠে ধারণ করে জবাব দেয়, মনে হয় ঘষে মেজে একটা কিছু করা যাবে। আগে বলেন মেয়েটি কে?

মেয়েটি আমার মা।

গোবিন্দ দেবনাথ হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে জহিরুল হকের দিকে। চোখে মুখে অবিশ্বাসের তীব্র চাবুক। বুঝতে পারছে গোবিন্দ দেবনাথ, এখানে একটা নাটক আছে। নিজেই নাটক যাত্রাপালার মানুষ, আধিকারিক। খুলনায় চলছে বৈশাখী যাত্রাপালার পনেরো দিনব্যাপী যাত্রা। এসব জায়গায় পুলিশ থানা হাতে রাখা দরকার। আর মেয়েটিকেও একপলকে ভালো লাগে। দোহারা গড়ন। টিকলো নাক। গ্রীবাটাও উঁচু। মনে হয় চলবে। আজকাল তো যাত্রায় কেউ আসতে চায় না। সবাই যায় নাটকে বা সিনেমায়।

তুমি গান গাইতে পারো?

মাথা নাড়ায় আশালতা, পারি অল্প অল্প।

হাসে গোবিন্দ দেবনাথ, ওই অল্প অল্পতেই চলবে। চলো আমার সঙ্গে। তাকায় এএসআই জহিরুল হকের দিকে, ওকে নিয়ে গেলাম। খুলনায় আছি তো কয়েক দিন, বাজিয়ে দেখি।

আমাকে বাঁচালেন গোবিন্দ বাবু।

চলো, গোবিন্দ বাবু সামনে সামনে হাঁটে। পেছনে পেছনে আশালতা। বাসস্ট্যান্ড পার হয়েই একটা রিকশা ডেকে উঠে পরে গোবিন্দ, পাশে বসে আশা। রিকশা ছুটে চলে বৈশাখী যাত্রাপালার প্যান্ডেলের দিকে।

আমার সব মনে আছে গোবিন্দ বাবু।

তাহলে? আজ যে তোমার এত খ্যাতি তার পেছনে কে? এই আমি গোবিন্দ দেবনাথ। এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যেও না। আমি তোমাকে না আনলে তুমি কোথায় থাকতে? পথে পথে শিয়াল কুকুর তোমাকে খাবলে খাবলে খেয়ে রাস্তায় ফেলে রাখত।

আমি জানি, সব জানিÑরুদ্র কণ্ঠে জবাব দেয় আশা।

যদি জানোই, কথা শুনছ না কেন?

গত আট বছর ধরে যা বলছেন শুনছি না? যেভাবে অভিনয় করতে বলেন করছি না?  কিন্তু মনের উপর জোর করছেন কেন? বৈশাখী যাত্রাপালার অভিনয় কি করছি না? আমার অসুস্থ শরীরেও আপনার পালার অভিনয় কি আমি করি না? আমাকে কি আমার মতো চলতে দিয়েছেন কখনও? আমার মনটাকে বুঝতে চেয়েছেন কখনও?  কেবল আধিকারিক হয়ে আমার উপর স্টিম রোলার চালাবেন, সব মেনে নিলে ঠিক আছে না মানলে আমি খারাপ? আমি কি এই আট বছরে বৈশাখী যাত্রাপালায় যা দিয়েছি, বলুন কম দিয়েছি? আমি তো শূন্য একজন মানুষ। আমাকে এত অসহায় ভাবছেন কেন?

 

গোবিন্দ দেবনাথ বসে আছেন মেসার্স সিমলা রাইস ঘরের মালিক খোন্দকার জালালউদ্দিনের সামনে, অনেকটা লেজ কাটা টিকিটিকির চরিত্রে। টেবিলের উপর  দুই কাপ ধূমায়িত চা। পাশে রাখা দামি সিগারেটের প্যাকেট। বিকেল পার হয়ে সন্ধ্যা নামছে চারদিকে। ভানডারিয়া লঞ্চঘাট থেকে ঢাকাগামী লঞ্চের কর্কশ হুইসেল শোনা যাচ্ছে। চারদিকে ইলেকট্রিক লাইট জ্বলে উঠেছে।

নিন, চা নিন গোবিন্দ বাবু।

নিচ্ছি, বলতে বলতে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দেয় আয়েশ করে। আজকে ভানডারিয়ায় বৈশাখী যাত্রাপালার শেষ রজনী। নিজের মতো পরিকল্পনা করে সব রেডি রেখেছেন গোবিন্দ দেবনাথ। ‘জীবন নদীর তীরে’ যাত্রাপালার মাঝামাঝি সময়ে আশালতাকে প্যান্ডেলের পেছন থেকে বের করে আনবে গোবিন্দ দেবনাথ নিজে। প্যান্ডেলের কাছেই পোনা নদীতে প্রস্তুত থাকবে গহর মাঝির নৌকা। গহর মাঝি নৌকায় আশালতাকে পার করে দেবে নদীর ওপারে, ফুলতলায়। ফুলতলা বাসস্ট্যান্ডে প্রস্তুত থাকবে একটা টেম্পু। সেই টেম্পুতে এক টানে  পিরোজপুর জেলাশহরে চলে যাবে আশালতা দেবী। আর পিরোজপুরে শহরে পৌঁছে যেতে পারলে  ভানডারিয়ার খোন্দকার জালালউদ্দিনের নিজের হাত নিজের কামড়ে খাওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। পিরোজপুরে হোটেল ইছামতীতে রুমও রিজার্ভ করা আছে আশালতার নামে। পরের সকালে সবার সামনে দিয়ে,  খোন্দকার জালালকে কাঁচলা দেখিয়ে চলে যাবেনÑ কিছুই করার থাকবে না।

শুধু চা খাচ্ছেন গোবিন্দ বাবু? দাঁড়ান জালালউদ্দিন খোন্দকার, হাতে দিয়াশলাই- নিন, সিগারেট ধরান।

সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের উপর রাখা সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে সামনে প্রজ্বলিত আগুনে সিগারেট ধরিয়ে টান দেন, আপনাদের ভানডারিয়া উপজেলাটা আমার খুব ভালো লেগেছে- ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে কথা বলেন গোবিন্দ দেবনাথ।

হাসে জালালউদ্দিন, ভালো লাগলে থেকে যান। আমি জায়গা দেব আপনাকে। বলুন, কত কাঠার উপর আপনি বাড়ি বানাতে চান?

সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গোবিন্দ দেবনাথ মৃদু হাসেন, শালা বইনচোদ, শুয়োরের বাচ্চা! আমার  যাত্রাপালার নায়িকাকে বিয়ে করতে চাস, আবার আমাকে জায়গা দিয়ে এখানে বেঁধে রাখবি? তোকে বিয়ে করাচ্ছি আশালতাকে। আশালতা তো না, বিয়ে করবি পরগাছার উপর স্বর্ণলতার ঝাড়। হারামির বাচ্চা, তুই আমারে চেনস নাই? তোরে আমার খেল দেখাব শেষ রাতে।

কী জমি নেবেন না? গোবিন্দ দেবনাথকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে আবার প্রশ্ন করে জালালউদ্দিন।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে হাসে গোবিন্দ, ভাইরেÑ আমি যাত্রাপাগল  মানুষ। আমার বাবাও ছিল এই বৈশাখী যাত্রাদলের আধিকারিক। আমার রক্তেও সেই যাত্রার গান, যাত্রার বিবেক, যাত্রার টিনের তরবারির ঝনঝনানি, দ্রিম দ্রিম নাচের ঝংকার আর যাত্রার সঙ্গে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ানোই আমার জীবন। আমি কি এক জায়গায় থাকতে পারি? যখন আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বৃষ্টি বাদল হয় তখন তো আর যাত্রা চলে না। সেই সময়ে আমার বিশ্রাম। থাকি বাড়িতে, নিজের আপন বৌয়ের কাছে, হাসেন গোবিন্দÑ আমি কেমন করে আপনাদের এখানে বাড়ি করে থাকি?

বললেন যে!

সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে উত্তর দেন গোবিন্দ দেবনাথ, আরে দাদা কথায় কথায় মানুষ কত কথাই বলে, সেইসব কথা কী সত্যি হয়?

আবার কথায় কথায় বলা অনেক কথাই সত্যি হয়ে যায়  গোবিন্দ বাবু, বুঝলেন? চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তাকায় খোন্দকার, আজকের রাতই তো আপনাদের শেষ রজনী ভানডারিয়ায়?

হ্যাঁ। ভালোয় ভালোয় এখানের সব রজনীর পালা সুন্দরভাবে উৎরে গেছে। আসলে আপনাদের এই ভানডারিয়ার মানুষ খুব ভালো। সরল। আর সবাই যাত্রা ভালোবাসে। আগামী বছরের জন্য আগাম বায়না করেছে সিকান্দার বখত।

সিকান্দার ভাই আগামী বছরেরও বায়না করেছে?

সিগারেটে টান দিয়ে মাথা ঝাঁকায় গোবিন্দ, হ্যাঁ। বড় ভালো মানুষ এই সিকান্দার দাদা। একেবারে মাটির মানুষ। আবার যাত্রা ভালোবাসে।

এখান থেকে যাবেন কোথায়?

যাব আপনাদের পাশের জেলা, ঝালকাঠি। আপনি যাবেন নাকি?

হাসে আপন মনে জালালউদ্দিন খোন্দকার- ব্যাটা গোবিন্দ দেবনাথ, আমার সঙ্গে মামদোবাজী? আগাম বায়না নিয়েছো পিরোজপুরের নাজিরপুরে, আর আমাকে বলছো কাছেই ঝালকাঠিতে যাবে! তুমি  চলো ডালে ডালে আমি চলি পাতায় পাতায়। টের পাড়ে আজকের রাতটা শেষ হলে!

ঝালকাঠি? অনেকদূর না?

কই আর দূর? ভানডারিয়া থেকে বাসে উঠলে ঘণ্টাখানেকের পথ। যাত্রা দেখে শেষ রাতে ঘুমাতে চাইলে আমার রুমে ঘুমাবেন। সঙ্গে দিমুনে… গোবিন্দ রহস্যমাখা চোখে হাসে।

বলছেন! আড়মোড়া ভাঙে খোন্দকার জালালউদ্দিন।

ওখানে আসেন, যাত্রা দেখবেন। আপনি যা যাত্রার ভক্ত দাদা? আপনাদের মতো লোকদের জন্যই যাত্রা টিকে আছে। আজকালকার ছেলেপেলেরা তো যাত্রা দেখে না। তো পোলাপানরা দেখে ডিসের ন্যাংটো নাচ গান। ঝালকাঠি যাবেন তো দাদা যাত্রা দেখতে?

হাসে জালালউদ্দিন খোন্দকার, শালা গোবিন্দ দেবনাথ, আমি কী তোমার যাত্রা দেখতে যাই? আমি তো যাত্রা দেখি না, দেখি দেবী আশালতাকে। শালার ভোদর, তুমি সেটা জেনেও কেমন আমার সঙ্গে খেলতেছ? মনে করছ আমি কিচ্ছু বুঝি না। আমি সবই বুঝি চান্দু। আমি কেমন করে কতটুকু বুঝি, সেটা বুঝবা পরে, রাতের শেষে। দাদা?

বলেন।

আপনাদের নায়িকা আশালতা দেবীকে কোথায় পেলেন? এত চমৎকার অভিনয় করে, দেখলে অভিনয় করে না, মনে হয় জলের উপর হাঁসের মতো ওড়ে আর ভেসে বেড়ায়।

আর বলবেন না, মেয়েটাকে নিয়ে আমি বড় বিপদে আছি গোবিন্দ দেবনাথের কণ্ঠে নিখাত বিরক্তি।  কি যে করি মেয়েটাকে নিয়ে!

বিপদে আছেন, মানে কী?

মেয়েটা তো ভালো ঘরের মেয়ে না দাদা। আপনারা কেবল বাইরের জৌলুশ দেখেন আর অসুখে ভোগেন। এইসব সস্তা বাজারের মেয়েদের সামলানো কত কঠিন, বুঝবেন না দাদা। আপনারা বুঝবেন না।

বলেন কী দাদা? আমি তো ভেবেছি যাত্রাপালাকে অসীম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসে বলেই নায়ক-নায়িকারা আসে কাজ করতে।

হাসে গোবিন্দ দেবনাথ, এই লাইনে কী আর ভালো মেয়ে আসে? দশ ঘাটের জল খাওয়া আগুনে পোড়া মেয়েরাই আসে। আমরাও আপনাদের মতো দর্শকদের সামনে রঙ মেখে ওদের পাঠাই। ওরা শরীর আর শরীরে মাখানো রঙ দিয়ে দর্শকদের বিভ্রান্ত করে। দিশাহারা করে দেয়। দিশেহারা করে না দিতে পারলে আমাদের পেট কেমনে চলবে? রঙ দেখে আপনারা নাচেন পঙ্গপালের মতো।

আপনার কথা শুনে তো আমার খারাপ লাগছে দাদা, খোন্দকার জালালউদ্দিন আরও গভীরে টোপ ফেলে। দাদা, ওর মাও কি যাত্রা করতো?

আরে না, চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে তাকায় খোন্দকারের দিকে, ওর মা তো ছিল খানকি পাড়ার খানকি।

চমকে ওঠার ভান করে খোন্দকার, বলেন কি দাদা?

যা সত্য তাই বলছি।

আমার কেমন অবিশ্বাস লাগে।

কি অবিশ্বাস লাগে আপনার?

এই যে আপনি বললেন, আশালতার মা বেশ্যা ছিল!

গলায় জোর  দিয়ে বলেন গোবিন্দ দেবনাথ, ছিল তো। আমিই সাক্ষী।

আমার কেমন…

ওই হলো আপনাদের এক দোষ, যা চোখে দেখবেন, মনে করেন এটাই সত্য। আসলে না। আড়ালে অনেক অসত্য অঘটন লুকিয়ে থাকে, বুঝলেন? গোবিন্দ দেবনাথের মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি, ওর মা ছিল মংলাপোর্টের ওই পারে যে বেশ্যাপাড়া, নাম শোনেন নি? বাণীশান্তা, সেই বাণীশান্তার নামকরা মক্ষীরানি। নাম আভারানি। আভার এক রাতের রেট ছিল সেই কালে এক হাজার এক টাকা।

এক হাজার এক টাকা?

হ্যাঁ। এক হাজার এক টাকা।

এত টাকা দিয়ে কেউ কী যেত?

হা হা হা হাসে গোবিন্দ দেবনাথ, দাদা দেখি নাবালক এই লাইনে। শোনেন, বলি আপনাকেÑ যারা একবার বেশ্যাদের বাড়ি যায়, নেশা হয়, তারা মৃত্যুর দিন পর্যন্ত যায়। যেতে বাধ্য হয়। এ এক নেশা, মস্ত নেশা। আপনার নিজের স্ত্রী আপনার সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবহার করবে। কোনো ছলাকলা করবে না। ঘরের স্ত্রীর দাপটের কাছে আপনি হেরে যান। এরা করে না অতি নাটকীয় অভিনয়। কিন্তু এই বেশ্যরা? তারা কেবল শরীর দেয় না আপনাকে, দেয় ছলাকলার ঠমক। জানে, আপনি বারবার গেলে ওরাই লাভবান হবে। বেশ্যার আর একটা নাম বারবনিতা, কেন বারবনিতা? জানেন? তারা একই সঙ্গে বারো রকমের ভনিতা জানে।

এ লাইনে তো দেখছি দাদার অনেক অভিজ্ঞতা?

হাসার চেষ্টা করে গোবিন্দ দেবনাথ, তা আছে। দাদা, আমি এখন যাই। আমার কাছে একজন বায়না করতে আসবে তুষখালি থেকে। টচ করে দাঁড়ায় গোবিন্দ দেবনাথ।

যাবেন?

হ্যাঁ যাই। আজ শেষ রজনীতো, অনেক গোছানোর অনেক কাজ বাকি রয়েছে।

কিন্তু আমিতো আপনার জন্য একটা জিনিস আনতে দিয়েছি। আমার লোক আর কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে। শুনেছি, আপনি খুব পছন্দ করেন।

কী আনতে দিয়েছেন?

হাতের ইশারায় দেখায়, বোতল। বিদেশি জিনিস আনতে দিয়েছি। একেবারে বৃটিশদের তৈরি ভদকা। সঙ্গে শুকুরের মাংসও আছে।

চকচক করে ওঠে গোবিন্দ দেবনাথের চোখ, সত্যি বলছেন?

আপনাকে মিথ্যা বলব কেন? আপনি আসার সঙ্গে সঙ্গে আনতে পাঠিয়েছি আমার লোক হেদায়েতকে। সাইকলে গেছে সাইকলে আসবে। দাঁড়ান, আমি মোবাইল করি, দেখি, কতদূরে আছে? জালালউদ্দিন খোন্দকার সেল বের করে ফোন করেÑ হ্যালো? হেদায়েত তুই কোথায়? আসতেছিস? কয় মিনিট লাগবে? দশ মিনিট? আচ্ছা আয়। সেল বন্ধ করে তাকায় জালালউদ্দিন খোন্দকার, দাদা দশ মিনিট সময় আপনি আমাকে দেবেন না? আপনার জন্য আনিয়েছি। আর আপনি না থাকলে কী জমবে?

ঠিক আছে, ছেড়ে দেয়া চেয়ারে আবার বসেন গোবিন্দ দেবনাথ, আপনি একজন অবাক মানুষ দাদা। দাওয়াত দিয়ে আমাকে মাল খাওয়াতে চাইছেন। আমিও মাল খেতে একটু বেশিই পছন্দ করি। বলছেন, আবার বিদেশি মাল! লোভ সামলানো বেশ কঠিন।

নিন, মাল আসতে আসতে আমরা দু’জনে দুটো সিগারেট টানি- বাড়িয়ে ধরে সিগারেট খোন্দকার জালালউদ্দিন।

গোবিন্দ দেবনাথ সিগারেট নিয়ে ধরায়। সিগারেট ধরায় জালালউদ্দির খোন্দকারও। দুজনের উৎপাদিত ধোঁয়ায় সিমলা রাইস ঘরের পেছনের ছোট্ট ঘরটা ভরে যায়। খুক খুক কাশে গোবিন্দ। কাশতে কাশতে গোবিন্দ ভাবছেন, গত দুদিন আগে একবার এসে যে ভুল করেছিলেন, আজ বৈশাখী যাত্রাদলের শেষের দিনও মেসার্স সিমলা রাইস স্টোরের মালিকের ডাকে এসে কি ঠিক করলাম? লোকটাকে খেল দেখাতে এসেছি, বুঝতেও পারছে না, আশালতা দেবীকে মাঝরাতের পর এই ভানডারিয়ায় আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। যখন পাবে না, তখন কি  করবে এই লোকটা? আমার উপর আক্রমণ করবে নাতো? নাহ, সিগারেটের ধোয়া উগড়ে দিতে দিতে মাথা নাড়েন, না কিছুই করতে পারবে না আমার। আমার পিছনে আছে সিকানদার বখত। সিকানদার বখতের হাত ধরে আছে থানা পুলিশ। ওসিকে প্রতি রাতে একজন নর্তকী পাঠাই। ওসি ওবায়দুর মিয়া কায়দা করে বৌকে বাপের বাড়ি পাঠাইছে। আপন বৌয়ের অবর্তমানে বৈশাখী যাত্রাদলের নর্তকীদের সঙ্গে রাত কাটায়। তো, সবই আমার হাতের মুঠোয়। আমার মুঠো থেকে কেউ ফসকে যেতে পারবে না। আপন মনে মাথা নাড়ান গোবিন্দ দেবনাথ।

গোবিন্দ দেবনাথের  মাথা নাড়ানো দেখে আপন মনে হাসেন খোন্দকার, দাদা?

চোখের সামনে জমায়েত ধোঁয়ার কুণ্ডলি দুহাতে সরিয়ে তাকায়, বলেন।

সেদিন পর তো আর বললেন না?

কী বলব?

ওই যে আশালতা দেবীর মা আভারানি, সেই আভারানির মেয়ে আশালতা কিভাবে আপনার কাছে এলো, বৈশাখী যাত্রার প্রধান নায়িকা হলো?

ও সেই ঘটনা আপনাকে বলি নাই?

বলেছেন, সবটা না। আসল ঘটনা বাকি রয়ে গেছে।

আসল ঘটনা কোনটা?

ওই যে, আভারানির মেয়ে আশালতা দেবী কিভাবে আপনার হাতে…

হো হো হাসেন গোবিন্দ, ও এই ঘটনা শুনবেন?

বললে শুনতাম।

আপনার কাছে মিথ্যা বলব না, আমি এই অঞ্চলে এলে  মাঝে মাঝে আভারানির কাছে যেতাম। মহিলাকে আমার ভালোই লাগতো। ছলাকলা জানতো অনেক। ছেনালদের যা দরকার আর কি! আভারানি ছিল আশালতার চেয়ে দশগুণ বেশি সুন্দরী। শরীর না যেন মিছরির নৌকা। সেই নৌকায় যখন চড়তাম শরীর কেটে রক্তপাত হতো। আর মাগি জানতোও শরীরের কসরৎ। কী যে সুখ পেতাম  আভার কাছে, আপনাকে বলে শেষ করা যাবে না। আভারানির কাছে নিয়মিত যেতে যেতে ওর সঙ্গে আমার একটা ভাব হয়ে গেলো। বলতে পারেন এক ধরনের প্রেম।  এমন হয়েছে বর্ষার সিজনে আমি চলে আসতাম বাণীশান্তায়।

কেবল আভারানির জন্য চলে আসতেন?

খোন্দকারের বিস্ময়ে হাসেন গোবিন্দ, আমার জায়গায় আপনি হলেও আসতেন। আসতে বাধ্য হতেন। আভারানি কেবল নারী বা ছিনাল না, ছিল শরীর-কলায় পারদর্শী এক উর্বশী।

দীর্ঘশ^াস ত্যাগ করেন খোন্দকার জালালউদ্দিন, আগে যদি জানতাম!  তো আশালতা আপনার হাতে আসার ঘটনাটা বলেন।

এক রাতে, আমার আজও মনে আছে। খুব বর্ষা ছিল। পশুর নদীর পারে, কাঁচা মাটির উপর ছোট ছোট ঘর বেশ্যাদের। নদী ভাঙে, বেশ্যারা ছোট ছোট ঘরগুলো লোক দিয়ে সরিয়ে দূরে নেয়। বেশি দূর নিতে পারে না, কারণ চারদিকে গৃহস্থ বাড়ি। তো আভারানি আমাকে বললো, আপনি আমার একটা উপকার করবেন?

উপকার? আভারানির উপকারের কথায় আমি ভড়কে গেলাম।

কেন?

আরে বাপু জাতে ওরা বেশ্যা। টাকার বিনিময়ে আপনাকে শরীর দেয়। তাও আবার ঘণ্টা মেপে। ওদের কী বিশ্বাস করা যায়?

ঠিকই বলেছেন। বেশ্যাদের বিশ^াস করা যায় না কিন্তু রাজাকারদের বিশ^াস করতে হয়।

আপনি আবার বেশ্যাদের মধ্যে রাজনীতি আনছেন কেন?

সরি, আর আনব না। আপনি বলেন।

আমি বললাম কী উপকার?

আভারানি আমার পায়ে পড়লো। কাঁদতে কাঁদতে বললো, আমি অনেক ভেবে দেখেছি, আপনি ছাড়া আমার গতি নেই। আপনিই আমাকে ভরসা দিতে পারেন।

আসল কথা বলো।

আমার একটা মেয়ে আছে।

আমি পড়লাম আকাশ থেকে। জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় তোমার মেয়ে?

আছে এই বেশ্যাপাড়ায়।

তো আমি কী করব?

আপনি ওকে নিয়ে যান।

সর্বনাশ, বেশ্যার মেয়ে নিয়ে আমি কোথায় যাব?

ওকে দেখলে আপনার পছন্দ হবে। ওর নাম আশালতা। আপনি ওকে আপনার যাত্রায় নামান। আমি আর আমার এই মেয়ে এই বেশ্যাপাড়ায় একসঙ্গে বেশ্যাগিরি করবো, একজন আর একজনের নাগর নেবো, ছি ছি কী নষ্টজীবন আমার? আপনি আমাকে উদ্ধার করেন। আমি জানি, আপনি চাইলেই এই নরক থেকে আমার মেয়েকে উদ্ধার করতে পারবেন। আমি তো আমার জীবন শেষ করে দিয়েছি, মা হয়ে মেয়ের সর্বনাশ চোখের সামনে করতে পারবো না। দেখতেও চাই না। আপনি রক্ষা করুন… আমার সামনে কাঁদতে শুরু করলো আভারানি।

আমি একজন বেশ্যার ভেতর অন্য রকম এক বারতা পেলাম। মনে হলো আভারানি কেবল একজন বেশ্যাই নয়, একজন মাও। আমার ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। আমি রাজি হলাম, বললাম, আগে তোমার মেয়েকে দেখি,  দেখার পর আমি আমার সিদ্ধান্ত জানাব।

পরের সপ্তাহে আমি গেলাম আভার কাছে। আভারানি মেয়েকে দেখায়। আশালতাকে দেখে আমার মোটামুটি পছন্দ হয়। যাত্রার লাইনে আছি জন্ম থেকে। দেখে বুঝতে পারি, গড়েপিটে নিলে কাজ চলবে। আমি নিয়ে আসিÑ অনেক কষ্ট করে গড়েপিটে আশালতাকে এইখানে নিয়ে এসেছি। এখন সে হয়েছে বৈশাখী  যাত্রাদলের প্রধান নায়িকা, কিন্তুÑ থেমে যায় গোবিন্দ দেবনাথ।

কিন্তু কী দাদা?

কথায় আছে রক্তের টান, মোছা যায় না। আশালতা বড় হয়েছে বেশ্যাপাড়ায়। নিজের চোখে দেখেছে বেশ্যাদের কীর্তিকলাপ। দেখেছে নিজের মায়ের ব্যবসা। সেটা ছাড়বে কী করে? মায়ের বেশ্যাগিরি সুযোগ পেলে মেয়েও করে। আর তখন দুঃখে বুকটা ফেটে যায় দাদা, কথা বলতে বলতে গোবিন্দ দেবনাথের গলা ভিজে আসে।

বলেন কী দাদা?

সেলিম চৌধুরীর আগে আমার যাত্রায় যে নায়ক ছিল সুকুমার বসু। সেই সুকুমার বসুর সঙ্গে করেছে ফষ্টিনষ্টি আশালতা। যাত্রাদলে একটা নিয়ম আছে, সেটা তো মানতে হবে। নিষেধ করেছি, শোনেনি। এখন বেশ্যা গিরি করছে সেলিম চৌধুরীর সঙ্গে। একবারে শুরুর দিকে করেছে, ডান্স মাস্টার রজত বিহারীর সঙ্গেও রাত কাটিয়েছে। মেয়েটার প্রতি আমার ঘৃণা ধরে গেছে। আমি এখন অন্য নায়িকা খুঁজছি। পেলে আশালতাকে ঘাড় ধরে বের করে দিব আমার বৈশাখী যাত্রাদল থেকে।

দরজায় এসে দাঁড়ায় হেদায়েত, চাচা আইচি।

ভেতরে আয়।

জালালউদ্দিন খোন্দকারের আদেশে ভেতরে ঢোকে হেদায়েত। হাতে একটা বড় ব্যাগ। ব্যাগের ভেতর থেকে তরকারির ডাটা বের হয়ে আছে। হেদায়েত ব্যাগের ভেতর হাত দিয়ে তরকারি সরিয়ে একটা চকচকে বোতল বের করে রাখে টেবিলের উপর। বিদেশি বোতল দেখে গোবিন্দ দেবনাথ হাসেন। হাসতে হাসতে বোতলটাকে আদর করেনÑ অনেকদিন বিদেশি জিনিস খাই না। কোথায় পাবো বলেন, এই মফস্সল পাড়াগাঁয়ে।

জালালউদ্দিন খোন্দকার উঠে আলমারি খুলে সুদৃশ্য দুটি গ্লাস বের করে টেবিলের উপর রাখেন। তাকান হেদায়েতের দিকে, হেদায়েত?

কন চাচা।

আবুলের দোকানের ফ্রিজে রাখা পানির বোতলটা আন। আর মল্লিকের হোটেলে গিয়ে আমার কথা বল, মাংস চাইছি। এক কেজি  ভূনা মাংস নিয়ে আসবি।

জে চাচা। হেদায়েত বের হয়ে যায়।

জালালউদ্দিন খোন্দকারের করিৎকর্মায় মুগ্ধ গোবিন্দ দেবনাথÑ আপনার আয়োজন তো বেশ পাকা।

হ্যাঁ, মাঝে মাঝে আমি এখানে আমার পরিচিত কয়েকজনকে নিয়ে বসি। মফস্সলের পানসে জীবনে একটু আনন্দ আনার চেষ্টা করি আর কী! হাসে জালালউদ্দিন খোন্দকার, আজ আপনি আমার স্পেশাল গেস্ট, তাই আজ আর কাউকে বলিনি। আজ আমরা মৌজ করব আপনি আর আমি।

বিগলিত গোবিন্দ বাবু, আপনি বড় বিবেচক একজন মানুষ। আগে বুঝতে পারিনি।

কি যে বলেন দাদা। আপনারা আমার কাছে নমস্য মানুষ। ডুবে যাওয়া যাত্রার মতো একটা শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেনÑবলতে বলতে বোতলের ছিপি খুলে গ্লাসে গ্লাসে ঢালে জালালউদ্দিন খোন্দকার। ধরায় আবার সিগারেট। ঢোকে হেদায়েত। হাতে ঠান্ডা পানির বোতল আর মাংসের ডিশ। রাখে টেবিলের উপর।

হেদায়েত?

কন।

তুই দরজা বন্ধ করে বাইরে অপেক্ষা কর হেদায়েত। কেউ আসলে বলবি আমি নাই।

জে চাচা।

হেদায়েত বের হয়ে গেলে গ্লাসে ঠান্ডা পানি ঢালে খোন্দকার। দুজনে হাতে নেয় গ্লাস। চিয়ার্স…দুজনের কণ্ঠে বাজে সামান্য সুর। মুখে ঢালে লাল দ্রাক্ষা। একের পর এক। সঙ্গে বেশি পিঁয়াজ মরিচ দিয়ে কষানো শুকরের মাংস।

একগ্লাস টানার পর গোবিন্দ ঢুলতে শুরু করেন, বুঝলেন খোন্দকার দাদা। মানুষের জীবন যাত্রা নাটকের চেয়ে খুব বড় নয়। এই জীবনে কত দেখলাম। সবাই নিজে মহারাজা হতে চায়, কেউ আর্দালি হতে চায় না। আরে বাবা সবাই যদি মহারাজা হবি, রাজ্যে প্রজা হবে কারা? প্রজা না থাকলে মহারাজা রাজাগিরি করবে কেমনে?

আপনি ঠিকই বলেছেন গোবিন্দ দা, সঙ্গে তাল দিচ্ছেন খোন্দকার।

এই যে আশালতা মেয়েটা, ওকে আমি রাস্তা থেকে তুলে আনলাম। বছরের পর বছর ধরে ঘষে মেজে তৈরি করলাম, সেই আশালতা আমাকে ঘৃণা করে?

গলায় পানীয়ের চুমুক নিয়ে কুতকুত চোখে তাকায়, বলেন কি?

হ্যাঁ আশালতা দেবী আমাকে ঘৃণা করে। বলে, হ্যাঁ আপনি আমাকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছেন, ঘষেছেন, তৈরি করেছেন, বিনিময়ে আমি কি এই আট বছরে বৈশাখী যাত্রাদলে কিছ্ইু দিইনি? আমাকে বলে, আপনি একটা স্বার্থপর। আমি নাকি ওকে বিয়ে করতে চাই…।

আপনি যাত্রাদলের মালিক, আপনি বিয়ে করতে চাইলে আশার রাজি হওয়া উচিত।

গ্লাসের পুরোটা পানীয় মুখের গহব্বরে ঢেলে দিয়ে দাঁড়ান গোবিন্দ দেবনাথ। খোন্দকার জালালউদ্দিনের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে বলেন, আসুন দাদা আমার বুকে আসুন। এই একমাত্র আপনিই আমার দুঃখ বুঝলেন। আর কেউ বুঝলো না। জানেন, আমার স্ত্রী ছেলেমেয়ে জানিয়ে দিয়েছে, আমি যদি আশালতাকে বিয়ে করি, আমার সঙ্গে ওরা কোনো সম্পর্ক রাখবে না।

আহা, খুব দুঃখজনক..।

তিন পেগ টানার পর গোবিন্দ দেবনাথ ঢুলু ঢুলু।

দাদা, আমারে তো এত সহজে ধরে না…. আজ যে ধরলো… দাদা…

ধরবে না, বিদেশি মাল… টেস্টই অন্যরকম।

হতে পারে, গোবিন্দ দেবনাথের মুখের পাশ দিয়ে ফেনা নামে।

দাদা? ডাকে জালালউদ্দিন খোন্দকার।

জমে জেমে যেতে যেতে চমকে তাকায় গোবিন্দ বাবু, আমাকে ডাকছেন?

আপনাকে ছাড়া কাকে ডাকব? এই মুহূর্তে আমার এই গদিঘরে আর কে আছেন?

দাদা, আমার নাচতে ইচ্ছে করছে, গোবিন্দ দেবনাথ চেয়ারের উপর শরীর ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একেবারে শূন্যে পৌঁছেছেন।

গোবিন্দ দা? কানের কাছে মুখ এনে ডাকেন খোন্দকার জালাল।

অনেক দূর থেকে বলছেন গোবিন্দ, আমাকে কিছু বলছেন?

হ্যাঁ দাদা।

শরীরে একটা ঝাঁকুনি খেয়ে আড়মোড়া ভাঙার চেষ্টা করতে করতে, বলুন।

আপনার আশালতাকে দিয়ে দিন আমাকে।

একটু সময় নেয় বুঝতে গোবিন্দ দেবনাথ। তাকায় ঘোলাটে চোখেÑ হাতের গ্লাস খালি। মুহূর্তে ভরে দেয় খোন্দকার। এক ঠেলায় পুরোটা গলায় ঢেলে আবার দাঁড়াবার চেষ্টা করেন গোবিন্দ, হাঁটতে চেষ্টা করছেন কিন্তু দু’পা সামনে দিয়ে ঘুরে ধরে চেয়ার। হাঁটতে পারছেন না। টলোমলো করছে পুরো শরীর, আমার আমার… গোৎ গোৎ করে, আমার বোঝা উচিত… ছিল। ক্যান আমাকে…মাল খাওয়াচ্ছেন আপনি!

আমি কি করলাম? একটা কৈফিয়ৎ দেয়ার চেষ্টা করে খোন্দকার। আপনি বিদেশি মানুষ, এসেছেন আমার এলাকায়। আবার আজ আপনার বৈশাখী যাত্রাদলের শেষ রজনী। আমার একটা দায়িত্ব আছে না, অতিথি সৎকারের। আমি সেই চেষ্টাই করেছি দাদা.. ভুল হয়ে থাকলে মার্জনা করবেন।

এখানে আর আর থাকবো বো না। আমি যাই, হাঁটতে শুরু করেন গোবিন্দ দরজার দিকে। টেবিল ছেড়ে সামনে একপা বাড়িয়েই টাল সামলাতে না পেরে ধপাৎ শব্দে মাটিতে আছড়ে পড়েন। চেয়ারে বসে মাটিতে পতিত গোবিন্দ দেবনাথের বিশাল শরীর দেখতে দেখতে হাসেন জালালউদ্দিন খোন্দকার। হাসতে হাসতে আরও একগ্লাস ঢালেন নিজের গলার ভেতরে, লোকটা এত তাড়াতাড়ি টলে যাবে ভাবিনি। মনে হচ্ছিল মাল টেনে টাল হতে অনেক সময় নেবে। কিন্তু বেশি সময় না নেয়ায় খোন্দকারের কাজের গতিও বেড়ে গেছে, অবশ্য একটু আগে, এই যা।

হেদায়েত?

নিঃশব্দে দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে হেদায়েত। মেঝেতে পতিত গোবিন্দ দেবনাথের দিকে তাকায়। গোবিন্দ গো গো শব্দ করছে। মুখ থেকে লালা ঝরছে।

সিগারেট ধরায় জালালউদ্দিন খোন্দকার, হেদায়েত?

জে চাচা?

নগেন দাস এসেছে?

জে, এসেছে চাচা।

গহর মাঝি?

এহনও আসে নাই। তয় আসবে। আপনি চাইলে আমি এহনই একবার যাইতে পারি।

না, একটু সময় দেখে যা।

আইচ্চা।

নগেন দাসকে ডাক।

হেদায়েত বাইরে যায় দরজার। ফিরে আসে এক মিনিট পর। সঙ্গে নগেন দাস। হালকা লিকলিকে গড়ন নগেন দাসের। গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। পরনে পাজামা আর হাওয়াই শার্ট। নাকের নিচে একজোড়া হিটলারী গোঁফ। সামনের তিনটে দাঁত উচু। নগেন দাস সামনে, মাটির উপর পতিত গোবিন্দ দেবনাথকে দেখে চমকে ওঠে এবং  থরথর কাঁপতে থাকে।

হাসেন জালালউদ্দিন খোন্দকার, না, নগেন দাস তোমার মনিবকে হত্যা করা হয়নি। অনেক দিন বিদেশি মাল খায়নিতো, বিদেশি মাল পেয়ে একটু বেশি খেয়েছে আরকি! আরে খেয়ে  মাটিতে সেজদা দিচ্ছে। চিন্তার কিছু নাই, ঘণ্টাখানেক পর উনি উঠে বসবে। তুমি চিন্তা করো না।

ঠোঁট চাটে নগেন দাস, ঘণ্টা খানেক পর উঠে বসবে তো?

উঠে বসবে ঠিকই কিন্তু সকালের আগে এই ঘর থেকে বের হতে পারবে না।

সকালের আগে.. নগেন দাসের মুখ আটকে যায়।

তোমার বোঝা উচিত নগেন দাস। তোমার মনিব যদি ভোরের আগে এই ঘর থেকে বের হয়ে যায়, আমরা আমাদের প্লান বাস্তবায়িত করব কিভাবে? এখন তুমি বুঝতে পেরেছ?

ঘাড় নাড়ে নগেন দাস, জি বুঝেছি।

সুতরাং ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নিজের গ্লাসে আবার ঢালে জালালউদ্দিন খোন্দকার, তাকায় নগেনের দিকেÑ অভ্যাস আছে নাকি?

না বাবু। ও সব আমি ছুঁই না।

হাসে জালালউদ্দিন, গুড। ভেরি গুড। গলায় ঢালে পুরো গ্লাসÑনগেন দাস?

জে বাবু।

তোমাকে কী কী করতে হবে মনে আছে?

জে মনে আছে বাবু।

পুরো প্লানটা আমাকে আর একবার শোনাও।

রাত একটার দিকে আমি আশালতা দেবীকে পোনা নদীতে অপেক্ষায় থাকা গহর মাঝির নৌকায় উঠাইয়া দিব। নৌকায় উঠাইয়া দেওয়ার লগে লগে আপনে আমারে পাঁচ হাজার টাহা  দেবেন।

না, হলো না, মাটিতে পতিত গোবিন্দ দেবনাথকে দেখিয়ে বলেন জালালউদ্দিন খোন্দকার, আশালতা দেবীকে নৌকায় নিয়ে আসার কথা ছিল গোবিন্দ দেবনাথের। কিন্তু ভদ্রলোক তখন যেতে পারবে না। অসুস্থ, যাবে কী করে? হাসে জালালউদ্দিন খোন্দকার, এখন কী করে কী করবে?

হুজুর? গলা চুলকায় নগেন দাস।

বলো।

আমার মনে পড়ছে। আমি গিয়ে আশালতাকে বলব গোবিন্দ বাবুর নৌকায় অপেক্ষা করছে। পরিস্থিতি ভালো না। এখনই আপনাকে আমার সঙ্গে যাইতে কইচে।

শাব্বাস! চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ান জালালউদ্দিন খোন্দকার। পকেট থেকে এক হাজার টাকার চকচকে নোট বের করে বাড়িয়ে ধরে নগেন দাসের দিকে, নাও। তোমাকে এখনই এক হাজার টাকা বকশিশ দিলাম। আর আগের চুক্তি মোতাবেক পাঁচ হাজার টাকাতো আছেই। হেদায়েত?

জে চাচা?

গহর মাঝি আসছে না কেন?

আসার তো কথা, বলতে বলতে দরজা ঠেলে ঢোকে গহর মাঝি। এই তো আইসা পরচে চাচাজান।

চিন্তার কিছু নাই। আইসা পরচি মুই, হাসে গহর মাঝি।

দেরি হলো কেন?

আমি কী ঘড়ির কাঁটা ধইরা চলতে পারি? আমি তো ঘড়ির টাইম চিনি না। অনুমান কইরা আইয়া পড়লাম।

ঠিক আছে। আগের প্লান মনে আছে তো?

ঘাড় কাৎ করে গহর মাঝিÑ জে, আচে। গহর মাঝি কোনো কিছু ভোলে না হুজুর।

নৌকায় আশালতা ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নৌকা ছেড়ে দেবে। নিয়ে আসবে লঞ্চঘাটে। আমি সেখানে অপেক্ষা করবো।

জে ঠিক।

নগেন দাস, তুমি? তুমি কী বলো? আমার প্লানে কোনো ঝামেলা আছে?

জে না। পেলান এক্কেবারে পানির নাহান পরিষ্কার। তয় একটা কতাÑ

কী কথা?

আশালতারে নৌকায় উঠাইয়া দেওয়ার পর আমি কিন্তু নৌকায় থাকুম না। আমি যাত্রা প্যান্ডেলে চইলা যামু। নইলে আমি বিপদে পড়–ম। প্যান্ডেলে না দেখলে আমারে সন্দেহ করবে সবাই।

ঠিক আছে। আশালতাকে নৌকায় তুলে দিয়ে চলে যাবে তুমি। আমার জন্য তুমি বিপদে পড় আমিও চাই না। চিন্তিত জালালউদ্দিন তাকান ঘড়ির দিকে, এখন বাজে সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা। গহর এই লও এক হাজার টাকা। এটা আমার পক্ষ থেকে আগাম বকশিশ। কাজ শেষ হলে চুক্তির পুরো টাকা পাবে। গহর মাঝির সঙ্গে হেদায়েত এখন থেকেই থাকবে। আমি আছি এখানে গোবিন্দ বাবুর দেখাশনা করছি। হেদায়েত?

জে চাচা?

তুই ইকবালকে খবর দিয়ে যা। সারারাত তো আমি এখানে থাকতে পারব না। গোবিন্দ বাবুকে পাহারা দিতে ইকবালকে লাগবে।

জে, ঘাটে যাবার সমায়ে আমি ইকবালকে কইয়া যামু।

আর দেরি করা ঠিক হবে না, এখনই তোরা বের হয়ে যা…

জালালউদ্দিনের মুখের কথা শেষ হতে পারে না, দুজনে বের হয়ে যায়।

চেয়ার টেনে পতিত গোবিন্দ বাবুর মুখোমুখি বসেন খোন্দকার জালালউদ্দিন, হাতে বোতল আর গ্লাস। পান করতে করতে চোখ রাখেন গোবিন্দ দেবনাথের দিকে, আমার সঙ্গে বিটলামি করো ব্যাটা যাত্রার পো যাত্রা। তুমি আমারে গল্প শোনাও আশালতা বেশ্যার ঘরের মাইয়া! বলতে বলতে পতিত গোবিন্দ দেবনাথের মুখের উপর গ্লাস কাৎ করে মদ ঢালতে থাকেন । খা শালা, খা। বেশি করে খা। পেট ভরে খা…। মরার আগে

খেয়ে নে..।

 

আশা!

আশালতা!

আশালতা দাঁড়িয়ে জানালায় চোখ রাখে। পেছনে না তাকিয়েও টের পেয়েছে জালালউদ্দিন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। খুব কাছে। দুটো শরীরের মধ্যে এক ইঞ্চিও দূরত্ব নেই। মানুষটার শরীর থেকে সিগারেটের তীব্র গন্ধ আসছে।

বলুন।

আমার দিকে তাকাও।

সঙ্গে সঙ্গে নয়, একটু সময় নিয়ে আশালতা ফিরে তাকায়। তাকাতে বাধ্য আশালতা। সত্যি ওর চোখ দুটো গভীর জলের দীঘি। স্বচ্ছ। নিটোল। ওর চোখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে নেশা লাগে। আশালতাও এই প্রথম মানুষটিকে দেখে সামনাসামনি। দীর্ঘ শক্ত সমর্থ শরীর। চওড়া কপাল। ব্যাকব্রাশ চুল। কপালের ডান পাশের কয়েকটি চুল সাদা। পাকা চুলে ব্যক্তিত্বের ছাপ আরও প্রকাশ পাচ্ছে। দাঁড়িয়ে দৃঢ় ভঙ্গিতে। মনে হচ্ছে প্রাচীনকালের কোনো স¤্রাট। যে মানুষ পরাজয় জানে না। কেবল পেতে জানে, আর দু’হাতে লুণ্ঠন করতে জানে। সেই লুণ্ঠনে কার কি সর্বনাশ হলো, কার চোখে কত জলের স্রোতে কিছু যায় আসে না।

আমি ভনিতা পছন্দ করি না। যা বলার সরাসরি বলি।

বলুন। আমাকে কি করতে হবে?

আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই আশালতা।

হাসে আশালতা, সত্যি আপনি আমাকে বিয়ে করবেন?

তোমার বিশ^াস হয় না?

আমার বিশ^াস কিংবা অবিশ^াস কি আসে যায় আপনার কাছে?

তুমি আমার স্ত্রী হবে, তোমার মনের খবর নেয়াটা জরুরি আমার কাছে।

আমি আপনাকে বিয়ে করতে না চাইলে আপনি কী করবেন?

আমি জোর করে হলেও তোমকে বিয়ে করব।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় আশালতা, আপনার পক্ষে সেটাই তো স্বাভাবিক। সুতরাং আপনি আমাকে প্রশ্ন করছেন কেন? আমার ইচ্ছে অনিচ্ছার কোনো মূল্য তো আপনার কাছে নেই। আপনার যা ইচ্ছে আপনি করুন।

আশালতা?

জানালা থেকে চোখ সরিয়ে চোখ তুলে তাকায়, বলুন।

আমি জানি আমি তোমার সঙ্গে অন্যায় করেছি। কিন্তু এ ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না। প্রথম যেদিন তোমার অভিনয় দেখি যাত্রাপালায়, আমি সেদিন থেকে যেদিকে তাকাই, কেবল তোমাকেই দেখতে থাকি। আমার জগৎ সংসারটা এলোমেলো হয়ে যায়। অনেক ভেবেছি তোমাকে নিয়ে, কিন্তু কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি আমাকে নিতেই হলো।

আপনি তো আপনার দিকটা ভেবেছেন, আমার দিকটাতো ভাবেননি।

তোমার দিকটা ভেবে তোমাকে হারানোর আমি ঝুঁকি নিতে চাইনি।

চমৎকার। আমি এখন আপনার হাতের মুঠোয়। আপনার যা ইচ্ছে তাই করুন। আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন?

বিয়ে তো করবোই কিন্তু একটা বিষয় জানা দরকার-

কী বিষয় জানতে চান?

তুমি তো হিন্দু ধর্মের মেয়ে।

হ্যাঁ ,তাতে আপনার কী সমস্যা? আপনি তো আমাকে চেয়েছেন, আমাকে হাতের মুঠোয় এনেছেন। এখন হিন্দু-মুসলমানের প্রশ্ন আসছে কেন?

প্রশ্ন আসছে বিয়ের সময় তোমাকে মুসলমান হতে হবে।

কেন?

নইলে তোমাকে বিয়ে করতে পারব না।

কী চমৎকার নাটক আপনি করছেন আমাকে নিয়ে? উপহাসের হাসি আশালতারÑ যখন ছিনিয়ে আনলেন তখন মনে ছিল না?

দেখো আশা, ঘটনা ঘটে যাবার পর অনেক ঝামেলা সামনে এসে দাঁড়ায়। এতোদিন একমাত্র কাজ ছিল তোমাকে আমার কবজায় আনা। আমি জানি, যাত্রার প্যান্ডেলে গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করে আমার মনের গভীর আকাক্সক্ষা তোমাকে বলার সুযোগ ছিল না। প্রথম কেউ আমাকে তোমার কাছে যেতে দিতো না। যেহেতু তুমি বৈশাখী যাত্রাদলের প্রধান নায়িকা। গোবিন্দ বাবু তোমাকে রাখতেন প্রায় কড়া নজরের উপর। সঙ্গে ছিল নায়ক সেলিম চৌধুরী। তুমিই বলো, তোমাকে তুলে আনা ছাড়া আমার সামনে বিকল্প কি ছিল? কিছুই ছিল না। এখন আমার কবজায় আসার পর এই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

যে প্রশ্নই সামনে আসুক আমি আমার ধর্ম নিয়ে থাকতে চাই, দৃঢ়কণ্ঠে জানায় আশালতা।  ধর্ম আমি ত্যাগ করব না। আমার জীবনের সব সুখ সব আশা চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। আমার বেঁচে থাকার জন্য ওই ধর্মটুকই আছে, সেটা আমি কোনোভাবেই হারাতে পারব না।

হিন্দু হয়ে যদি আমার সঙ্গে তুমি থাকতে পারো, একটু সময় নেয় জালালউদ্দিন খোন্দকার- আমারও কোনো সমস্যা নেই।

তিন রাত আগে আশালতাকে ভানডারিয়া উপজেলার একটি দোতলা বাড়িতে এনে রেখেছেন খোন্দকার জালালউদ্দিন। বাড়িটির সাজানো গোছানো। চারপাশে গাছপালা। খোন্দকার জালালউদ্দিনের বন্ধু মেহেরউল্লাহর বাড়ি। বাড়িটি বানানো হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। মেহেরউল্লাহর ইচ্ছে ছিল এখানে বসে আড্ডা জমাবে। কিন্তু হঠাৎ করে মা মারা যাওয়ায় মেহেরউল্লার মনে এক ধরনের পরিবর্তন আসে। আড্ডা আর জমানো হয়নি। সেই বাড়িটি অনেকদিন পর কাজে লাগলো জালালউদ্দিন খোন্দকারের।

আশালতাকে নিজের আয়ত্তে আনার পর জালালউদ্দিন খোন্দকার কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। যেহেতু পাখি নিজের খাঁচায়, তাড়াহুড়ো করতে চায় না। একটি নারীকে শিকড় থেকে উপরে আনা হয়েছে, নারীটিও অন্য ধর্মের, সেই নারীকে একটু স্থিতিশীল হওয়ার সময় দেয়া দরকার। জালালউদ্দিন সবসময়ে এই বাড়িতে আসেন না। আশালতাকে দেখাশুনা করছে হেদায়েত। হেদায়েতের কাছ থেকে আশালতা জেনে গেছে জালালউদ্দিন খোন্দকারের ক্ষমতা, ধন আর ঐশ্বর্যর খবর। বুঝে গেছে এই মানুষের কবল থেকে নিস্তার নেই। গোবিন্দ দেবনাথ  আর জালালউদ্দিনের মধ্যে অনেক ফারাক। গোবিন্দ দেবনাথ ডাঙ্গায় তোলা মাছ খুব ভালো ভাজতে পারে। আর জালালউদ্দিন খোন্দকার ডাঙ্গায় ও জলে সমান শক্তিশালী। কাউকে পরোয়া করে না। জালালউদ্দিন খোন্দকারের হাত থেকে যদি নিস্তারই না থাকবে, তাহলে পাওনা  বুঝেই নতুন জলে সাঁতার কাটবে। নারী যখন, শরীর যখন সমস্যা,  এবং শরীর যখন সম্পদ, তখন শরীরটাকে পুরোপুরি ব্যবহার করা উচিত। একমাত্র নারীর শরীরের নরম মাংস আর একটি গোপন সুরঙ্গের জন্য পুরুষদের এত যুদ্ধ, এত নির্মমতা?

বাড়ির জানালায় দাঁড়িয়ে আশা দেখছে দূরের পথ। মানুষের আসা-যাওয়া। জানালার সামনে দিয়ে একটা পাখি উড়ে যায়। ভাবছে আশা, পাখিটা, ছোট্ট পাখিটাও কত স্বাধীন! নিজের ইচ্ছেমতো উড়তে পারে। নিজের ইচ্ছেমতো যে কোনো গাছের যে কোনো ডালে বসতে পারে। গান গাইতে পারে। কিন্তু আমি একজন মানুষ হয়েও কিছুই পারি না। মেয়ে মানুষের জীবনে দরকার সংসার। অমলের কাছে এসেছিলাম আট ন’বছর আগে সংসারের আশায়। ছোট্ট একটা সংসার। কত কল্পনা, কত ইচ্ছে ছিল একটি নিটোল সংসারের। বিয়ের জন্য বাবা কত ছেলে এনেছিলেন, নানা উছিলায় সব বিয়ে ভেঙে দিয়ে অমলের সঙ্গে অমলের হাত ধরে পালিয়ে এসেছিলাম। আর অমল? একটা শ্যালো মেশিনের কাছে অমল সেই আশা ধুলিসাৎ করে দিয়েছে। বৈশাখী যাত্রাপালার সেলিম চৌধুরীর কাছে অনেক প্রত্যাশা থাকলেও লোকটি ছিল ভয়ানক ভীরু প্রকৃতির। কতবার বলেছি, চলো পালিয়ে যাই। কিন্তু সেলিম চৌধুরীর সাহস ছিল না। কেবল বলতো, আর একটা বছর থাকি, হাতে কিছু টাকা পয়সা আসুক, পালাব।

সেই এক বছর আসার আগেই আমি ছিনতাই হয়ে এলাম জালালউদ্দিন খোন্দকারের কাছে। আমাকে ভেবে কী সেলিম কষ্ট পাচ্ছে? পেলে কী লাভ? সেলিম আমাকে স্বচ্ছন্দময় একটি জীবন দিতে পারত না। হেদায়েতের কাছে যা শুনেছি, জালালউদ্দিন খোন্দকারের সংসারে আমি না খেয়ে থাকবো না। অবশ্যি সংসার যদি হয়! সংসার না হলে মরে যেতেও পারব না। মরা, আত্মহত্যা খুব কঠিন কাজ। সবাই সেটা পারে না। আমিও পারব না। আমাকে আমার যাবতীয় ঘৃণা আর বিবমিষার সঙ্গে এই দগ্ধ শরীর নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে পাশবিক এই দুনিয়ায়।

আমাকে দেখে মুগ্ধতার রেশ কতদিন থাকবে জালালউদ্দিনের? পুরুষ মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়- ক্ষণে ক্ষণে। যাদের ক্ষমতা আছে, আছে টাকা পয়সা, ওদের কাছে নারী খুব মূল্যবান বা সম্মানের- ভাবার কোনো কারণ নেই। এই জীবনে অনেক কিছু শিখেছি, দেখেছি। যাত্রাপালার অভিনয় করার কারণে অনেক অনেক আশ্চর্য মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে,  সেইসব পুরুষদের কামনার চোখ দেখেছি কিন্তু  কেউ জালালউদ্দিনের মতো সাহস করে, গোবিন্দ দেবনাথের সঙ্গে লড়াই করে আমাকে ছিনিয়ে আনতে পারেনি। এইখানে এই মানুষটি অন্যদের থেকে আলাদা, একরোখা। গোবিন্দ দেবনাথ শুয়োরের মতো পাহারা দিয়ে রাখত। বাইরে গেলেও আমার পিছনে  লোক লাগিয়ে রাখত বিষ্ঠার গন্ধ নিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা। নিজেকে মনে হতো পথের একমুঠো ধুলো।

হেদায়েত জানিয়েছেÑ সংসারে সিমলা নামে মেয়ে আছে খোন্দকারের। আছে দুটো পুত্রও। আর বৌটা নাকি এখনও সুন্দরী। দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনের ভেতরে আমি আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে ঢুকে গেছি। ভদ্র মহিলা কী আমাকে ক্ষমা করবে? করবে না জানি। আমি হলে কী করতাম?

কী ভাবছ?

কী আর ভাবব?

এই বাড়িটা আপতত আমার নয়। আমার এক বন্ধুর। সেই বন্ধুর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, বাড়িটি বিক্রি করবে।

কার বাড়ি কে বিক্রি করবে, কে কিনবে, এসব আমাকে শোনাচ্ছেন কেন?

হাসে জামালউদ্দিন, এই বাড়িটা আমি তোমার নামে কিনে দিবো।

আপনার  অনেক দয়া।

তুমি এভাবে বলো না-

কীভাবে বলছি?

তুমি কথা বলছ খুব স্বাভাবিভাবে কিন্তু কথার ভেতরে সূক্ষ্ম অপমানের টান টের পাই।

তাই?

হ্যাঁ। আমি তোমাকে সত্যিকারের সুখী দেখতে চাই।  দুপুর থেকে এই বাড়িতে তোমার কাজ করার জন্য একজন বয়স্ক মহিলা আসবে। রাবেয়ার মা নামে সবাই চেনে। তোমার সব কাজ রাবেয়ার মা করে দেবে। হেদায়েত তো আছেই। তোমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র যা লাগে, একটা তালিকা করে দিও হেদায়েতের কাছে। সব পৌঁছে যাবে সময়মতো।

ঠিক আছে, ঘাড় কাৎ করে  আশালতা।

আমি জানি, আমাকে তোমার খারাপ লাগছে কিন্তু যতটা ভাবছ মানুষটা আমি একেবারে খারাপ নই। আমি সত্যি তোমাকে ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি আশা…

আশালতার ঠোঁটে এক টুকরো হাসির রেখা দেখে জালালউদ্দিন, তুমি হাসছো কেন?

একটি মেয়েকে জোর করে তুলে এনেছেন, আটকে রেখেছেন নিজের ক্ষমতার চৌহদ্দিতে, আবার বলছেন, আপনি মানুষটা ভালো!  আমাকে ভালোওবাসেন। এবং আমাকে সেটা মানতেও হবে?

হ্যাঁ, তোমার সূক্ষ্ম অপমানের পরও বলছি আমি মানুষটা ভালো।

আপনার জন্য ভালো শব্দটার সংজ্ঞাটাই পাল্টাতে হবে দেখছি।

তুমি এসেছো ক’দিন?

মানে?

মানে কতদিন হলো তুমি এসেছ?

আমি তো আসিনি। আমাকে তুলে আনা হয়েছে এবং আপনি আমাকে তুলে এনেছেন। আমি আসলাম কখন?

তুমি যদি এভাবে আমাকে বিড়ম্বিত করো, আমি কষ্ট পাই। খুব কষ্ট পাই।

আবার আবছা হাসি আশালতা দেবীর মুখে, সত্যি কষ্ট পান?

সামনে দাঁড়ানো প্রবল ক্ষমতাশালী মানুষ খোন্দকার জালালউদ্দিন মাথা ঝাঁকান, হ্যাঁ। পাই।

একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে আশালতা, বুঝতে পারলাম। তো আমাকে কি করতে হবে?

কতদিন হলো তুমি আমার কাছে এসেছো?

তিন দিন।

আমি তোমার সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করিনি। আমি তোমাকে বিরক্ত করিনি। আমি তোমার উপর হামলে পরিনি। তোমার অন্তরের বেদনাকে সয়ে যাবার সময় দিচ্ছি। এখনও বলবে, আমি মানুষটা খারাপ?

না,  আপনি খারাপ না। তবে আপনি একটি বক।

বক! অবাক খোন্দকার জালালউদ্দিন। কিসের বক?

বকের মাছ শিকার করা দেখেছেন? বক মাছ শিকারের জন্য দীর্ঘক্ষণ চরে একপা পানিতে ডুবিয়ে অপেক্ষায় থাকে। নাগালে মাছ এলেই গেঁথে ফেলে নিমিষে লম্বা ধারালো ঠোঁটে। আর প্রমত্ত শিকারিরা দুর্বল প্রতিপক্ষ পেলে একটু সময় দিয়ে, খেলিয়ে খেলিয়ে আস্তে ধীরে খেয়ে ফেলেÑ এই যা।

হাসেন জালালউদ্দিন, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি অনেক পড়াশুনা করা একটা মেয়ে। কিন্তু আমি জানি তেমন পড়াশুনা করার সুযোগ তুমি পাওনি। তোমার কথায় আমার রাগ করা উচিত, ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে তোমাকে কেটে ফেললে আমার চরিত্রের সঠিক প্রকাশটা পেত। কিন্তু  জরুরি কাজ আছে, চলে যাচ্ছি। কাল বা পরশু তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে।

দেখা হওয়াটা কি খুব জরুরি?

তোমার দিক থেকে দেখা হওয়াটা জরুরি না হলেও আমার দিকে থেকে খুব জরুরি। পকেট থেকে একটা মোবাইল সেট বের করে বাড়িয়ে ধরে, নাও।

সেটটা নেয় আশা। নতুন একটা সেট। সুন্দর। তাকায় জালালউদ্দিন খোন্দকারের দিকে, এটা দিয়ে আমি কি করব?

সেটে আমার নাম্বার দেয়া আছে। ওটার ভেতরে অনেক গান আছে। আমি পুরোনো দিনের গান খুব পছন্দ করি। পুরোনো দিনের গানের কথা তেমন সুরও… তুমি চাইলে শুনতে পারো। মন খারাপ হলে শুনবে। ভালো লাগলেও শুনবে। মন ভালো থাকবে। আর যদি কখনও প্রযোজন মন করো আমাকে ফোন দিও। আসি!

সামনে দু’পা দিয়ে দ্রুত ফিরে আসে আশার সামনে। আশাকে বিস্মিত করে দু’হাতে আশালতার মুখ তুলে ধরে চোখের সামনেÑ তুমি সত্যি খুব সুন্দর। দুই ভ্রু’র মাঝখানে আলতো একটা চুমু খেয়ে ছেড়ে দেয়। এবং আগের চেয়ে দ্রুত লম্বা পা ফেলে চলে যায়। আশালতা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে জালালউদ্দিনের চলে যাওয়ার দিকে। শত অপমান আর নিষিক্ত তিক্ততার মধ্যেও মনে হলো আশালতার, এই জীবনে সত্যিকারের কেউ তাকে ভালোবাসলো আজ, এবং এই মুহূর্তে। এবং কোনো কারণ ছাড়াই দুচোখ বেয়ে পানি নামতে থাকে।

জীবনে অনেক কেঁদেছে আশালতা দেবী। কিন্তু এই মুহূর্তের কান্নায় শরীর-মন একাকার হয়ে সুখের একটা নির্ঝরের ¯্রােত বয়ে যাচ্ছে…।

 

দুই.

জসিমউদ্দিন পেয়াদা অবাক চোখে আশি হাজার টাকার বাণ্ডিলটার দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখে পলক পড়ে না। মনে হচ্ছে জসিমউদ্দিন পেয়াদার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। রাতে খাওয়ার পর ঘরের মধ্যে খাটে বসেছিল। স্ত্রী আছিয়া বেগম পান  বানিয়ে সামনে ধরে। পানটা হাতে নিয়ে আছিয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে পানটা মুখে দিয়ে দুটো কি তিনটা চিবুনি দিয়েছে, সামনের বারান্দা থেকে ভেতরে, বাবার সামনে এসে দাঁড়ায় সেলিম চৌধুরী, অথবা খবিরউদ্দিন পেয়াদা।

যাত্রাদলে অভিনয় করার কারণে, পিতাপুত্রের সম্পর্ক খুব একটা ভালো না। প্রথম সন্তান ছেলে হওয়ায় খুব খুশি হয়েছিল জসিমউদ্দিন পেয়াদা। দরিদ্র কৃষক। নিজের জমি নেই বললেই চলে, ধানের জমি। পিতার সূত্রে কেবল একটুকরা বাড়ির জমিন পেয়েছে ভাগে। তাও এগারো কাঠা জমির তিন ভাগের এক ভাগ। দুই ভাই আর দুই বোন। এগার কাঠা জমি ভাগ হলে পেয়েছিল, পৌনে তিনকাঠা। সম্পদ বলতে শরীর। উজান গাঁও গ্রামের এমন কোনো বাড়ি বা ঘর নেই, জসিমউদ্দিন কাজ করেনি। যখন যে ডেকেছে, জসিমউদ্দিন পেয়াদা কাজ করেছে। কারও বাড়ি নারকেল গাছ বেয়ে নারকেল পেড়ে দিতে হবে, দিয়েছে। কারও বাড়ির পুকুর কাটতে হবে, কেটেছে। কারও নাড়ার ঘর নতুন নাড়া দিয়ে ছেয়ে দিতে হবে, দিয়েছে। যেদিন কোনো কাজ পাওয়া যেত না, ঝাঁকি জাল নিয়ে নেমে পড়তো খালে। সারাদিন মাছ ধরে, বিকেলে উজানগাঁও বাজারে বিক্রি করে, চাল ডাল কিনে আনত। সেই চাল ডালে সংসার এগিয়ে গেছে।

জীবনে ছায়ার মতো লেগেছিল, আছিয়া বেগম। জীবনে কোনোদিন মুখের উপর কথা বলেনি। জসিমউদ্দিন পেয়াদা যা জোগার করে দিতে পেরেছে, সেই অপর্যাপ্ত চালডাল তেল নুন মরিচ দিয়ে সংসারে জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে গেছে। কম তো হলো না, সংসারের ঘানি টানার বয়স। আঠাশ বছর। বিয়ের প্রথম বছরের মাথায় আছিয়া বেগমের পেটে আসে সন্তান। সেই সন্তান খবিরউদ্দিন। খবিরউদ্দিনের পর মিয়াজউদ্দিন, মিয়াজউদ্দিনের পর মেয়ে খায়রুন নাহার, খায়রুন নাহারের পর আবার ছেলে গিয়াসউদ্দিন, গিয়াসউদ্দিনের পর আরও একটা মেয়ে এবং ছেলে হয়েছিল, কিন্তু বাঁচেনি। প্রথম সন্তানের উপর বাবা মায়ের আলাদা একটা টান থাকে। খবির দেখতেও হয়েছে সুন্দর। ছোট থেকে চটপচে স্বভাবের। স্কুলেও মেধার পরিচয় দিয়েছিল। ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ে উজান গাঁওয়ের পাশের ইউনিয়ন ইকড়ি বাজারে এলো নিখিল যাত্রাপার্টি।

এলাকায় প্রথম যাত্রাপার্টি এসেছে। দিকে দিকে সাড়া পড়ে যায়। নৌকায় নৌকায় মাইকিং হচ্ছে, হ্যাঁ ভাই বলছি নিখিল যাত্রাপর্টির যাত্রাদলের হৈ হৈ রৈ রৈ কাণ্ড। আজ রাতে ইকড়ি বাজারে নিখিল যাত্রাপার্টির আলো জলমল রঙিন মঞ্চে অভিনীত হবে যাত্রাপালাÑ কাসেম সখিনার প্রেম কাহিনি। অভিনয় করবেন নটরাজ বিজয় কুমার সাহা। নায়িকা সুন্দরী লাস্যময়ী মোহময়ী সিতারা আখতার। সিতারা আখতার। সিতারা আখতারের। সঙ্গে থাকবেন আকাশ থেকে নেমে আসা একঝাঁক ডানাকাটা পরি। টিকেটের মূল্য মাত্র ত্রিশ টাকা। মাত্র ত্রিশ টাকা। হ্যাঁ ভাই জীবনে সুযোগ বার বার আসে না। আদি নিখিল যাত্রাদলের মহাপালা আজ রাতে ইকড়ি বাজারের মঞ্চে  ‘কাসেম সখিনার প্রেম কাহিনি’। কাসেম সখিনার প্রেম কাহিনি নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করবেন, স্বপ্নকন্যা সিতারা আখতার।

পাশের বাড়ির ইদ্রিস পড়ে একই স্কুলে, একই ক্লাসে। খবির পিতা-মাতার একান্ত ভালো ছেলে। সকালে ঘুম থেকে উঠে, হাতমুখ ধুয়ে মায়ের দেয়া পান্তাভাত খেয়ে বাপের সঙ্গে কাজে চলে যেত। কাজ থেকে ফিরে পুকুরে বা পাশের খালে গোসল সেরে বইখাতা নিয়ে স্কুলে যায়। যাবার পথে দাঁড়ায় ইদ্রিসদের বাড়ির সামনে। গলার রগ ফুলিয়ে ডাক পারে, ইদ্রিস? ও ইদ্রিস?

লুঙ্গিপরা হাফ শার্ট গায়ে ইদ্রিস পান্তা খেয়ে কুলি করতে করতে বই বগলে নিয়ে উঠনে নেমেই সাড়া দেয়, আইতেছি…। দৌড়ের উপর  দৌড় দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে  উপস্থিত ইদ্রিস, ল।

ল, দুই জনে হাঁটতে শুরু করে আবার।

ল, বলার সঙ্গে সঙ্গে দুজনে দৌড় শুরু করে। মনে হয় দুজনের মধ্যে প্রতিযেগিতা চলছে। চার বাড়ি মানে, পুবের বাড়ি, পশ্চিমের বাড়ি, মাঝের বাড়ি আর মুড়ার বাড়ি, মুড়ার বাড়ি মানে চার বাড়ির শেষের বাড়ি, এই চার বাড়ির সবাই, যারা স্কুৃলে যায়, জেনে গেছে, স্কুলে যাবার সময়ে ইদ্রিস আর খবির একটা দৌড় প্রতিযেগিতায় অংশ নেবেই নেবে। এবং  ইদ্রিসদের বাড়ির সামনে থেকে দৌড়ে উজান গাঁও খালের পাড়ে গিয়ে থামে। খাল পার হতে হবে খেয়ায়। খাল তো দৌড়ে পার হওয়া যায় না। চার বাড়ির ছাত্ররা আসিয়া, কুলসুম, জাবির, কুদ্দুস, মোহন, সমর, আবুল, আলেয়া অপেক্ষায় থাকে খেয়ার পারে এসে, দুজনের দৌড় প্রতিযোগিতা দেখার জন্য। দৌড়ে খালের পারে এসে হাঁপায় খবির আর ইদ্রিস। আর উজান গাঁওয়ের ছাত্ররা দেখেছে, যতদিন স্কুলে যাবার জন্য খেয়াঘাটে এসেছে, খেয়া কখনও এই পাড়ে পায়নি। খেয়াটা সব সময়ে অন্যপাড়ে থাকে। আর খেয়াঘাটের মাঝি সিকান্দার মিয়া ওই পাড়ে বসে নৌকায় ঝিমায়।

কারও হাতে ঘড়ি নেই। কিন্তু পুব আকাশে ক্রমাগত উপরে উঠে যাওয়া সূর্যের অবস্থান দেখে বলতে পারে, এখন সময় কত।

ওই সিকান্দার চাচা? গলা ছেড়ে ডাকে সমর।

ঝিমাতে ঝিমাতে মাথা তোলে সিকান্দার,…আইতেছি। হাই তোলে। মুখ ধোয় উজানগাঁওয়ের খালের পানিতে। কুলি করে সময় নিয়ে। আস্তে ধীরে নৌকার বাঁধন খোলে। খালের তির তিরে পানির ¯্রােত পার হয়ে খেয়া এই পারে এলে, সবাই হুড়মুড় করে নৌকায় ওঠে। সিকান্দার বাচ্চাদের এই হুজ্জোত পছন্দ করে না।

এই মিয়ারা, তোমরা আস্তে ওঠো..।

নৌকা ওই পাড়ে যায়, সিকান্দারের খরবদারিকে থোড়াই পরোয়া করে, হুড়মুড় করে উঠে যায় পাড়ে।  নৌকা টলমল করে। সিকান্দার দাঁতে দাঁত ঘষে, হালার ঘরের হালা…

এইভাবেই চলছিল খবিরের শৈশব। সেই শৈশবের স্কুলের সহপাঠী ইদ্রিসই জানায় এক বিকেলে, খবির যাত্রা দেখবি?

যাত্রা কেমন? গতকাল তো খালের পারে পাড়ে নৌকার লগে লগে ঘুরছি…। হুনছি যাত্রায় মাইয়ারা নাচে হাসে খবির।

তুই হাসলি ক্যান?

যারা নাচে হ্যারা নাহি সব দেখায়?

হাসে ইদ্রিসও, আমিও হুনচি। যাবি?

টিকিটের টাহা নাই তো আমার কাছে। ত্রিশ টাকা টিকিট।

আরে দশ টাহাও টিকিট আচে।

উত্তেজিত খবির, কস কি? দশ টাহার টিকিট?

হ। আমার কাছে বিশ টাকা আছে।

আমার কাছে কোনো টাখা নাই। তয় মায়ের কাছে চামু।

তাইলে চল, যাত্রা দেহি।

কেমনে যামু? রাইতে বাবায় যাইতে দেবে না।

আরে হালার গরু, বাবা মারে কইবি ক্যান?

না কইয়া যামু কেমনে?

তুই তো সামনের বারিন্দায় ঘুমাস?

মাথা নাড়ে খবির, হ।

রাইতে সবাই খাইয়া ঘুমাইয়া পড়লে তুই দরজা খুইলা আইসা পড়বি। না, তোর আসার দরকার নাই। আমি তোদের বাড়ির উঠানে খাড়াইয়া কাউয়া ডাকুম তিনবার। তুই দরজা খুইলা বাইরে আবি। দুইজনে মিইল্লা যামুÑ

আমার ভয় করে।

হালার পো, তুমি মাইয়া মানুষের শরীর দেখবা আবার ভয় পাইবা, এইডা অইবে না। আমি যেডা কইলাম, হেইভাবে রেডি থাকবা। আমি কাউয়া ডাকলেই তুমি দরজা খুইলা বাইরে আইবা।

‘মাইয়া মানুষের শরীর দেখবা’ শোনার পর খবির আর না করতে পারে না। মাথাটা নিচু হয়ে আসে, ঠিক আছে। যামু তোর লগে।

তাইলে এহন বাড়ি যাই, দুপুরের এই সিদ্ধান্তের পর খবির যায় খবিরের বাড়ি। ইদ্রিস যায় নিজের বাড়ি। বাড়ি যেতে যেতে খবিরের মনে পড়ে যায়, গত মাসে বড়খালার বড় মেয়ে, কুলসুম বুবুর শরীরের যে ঘ্রাণ পেয়েছে, এখনও নাকে সেই ঘ্রাণ লেগে আছে। বাতাসে টান দিলে কেমন দিল পাগল করা ঘ্রাণটা এখনও পায় খবির।

কুলসুম বুবুর বিয়ে হয়ে গেছে বছরখানেক আগে। বিয়েতে মা-বাবার সঙ্গে খবিরও গিয়েছিল। দুলাভাই দুবাই থাকে। বিয়ের পর দুলাভাই মাসখানেক থেকে দুবাই চলে যায়। খবিরদের উজানগাঁও থেকে বড়খালার বাড়ি দুই গ্রাম পর, আমতলি। মাঝে দুইবার গিয়েছিল বড়খালার খবর নিতে। মাসতিনেক হলেই মা পাঠায়, যা তো খবির, বড়বু’র একটা খবর লইয়া আয়।

খবিরও যাবার জন্য তৈরি। খালার বাড়ির একটু দূরে আমতলির হাট। সেই হাটে, ইঙ্গুল ময়রা তেলের উপর  জিলাপি আর আমৃত্তি ভাজে। কি যে ভালো লাগে। চার আনা একটা আমৃত্তি। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত  অবাক হয়ে দেখে খবির। মায়ের দেয়া আটআনা থেকে চারআনা দিয়ে একটা আমৃত্তি কিনে খায়। বড় একটা আমৃত্তি খায় খবির অনেক সময় নিয়ে, ধীরে ধীরে। মিষ্টিতে মুখটা ভরে যায়। পুরোটা খেতে পারে না। তখন একগ্লাস পানি খায়। পানি খাওয়ার পর মুখের মিষ্টি একটু কমে। শেষ পর্যন্ত হাতে নিয়ে আমৃত্তি চাখতে চাখতে খালার বাড়ি যায়।

আরও ছোটবেলা থেকে কুলসুম বুবুকে দেখে আসছে খবির। বুবু বড় বেশি হাসে। খলখল হাসি। হাসিতে গোটা বাড়ি  ফেটে পরে। বিয়ের পর কুলসুম বুবু আগের মতো হাসে না। আগের মতো ওর সঙ্গে দুষ্টমিও করে না। খবির বোঝে, বড়দের মধ্যে ঘোরলাগা রহস্য আছে। কিন্তু এখন তো খবির বড়। ওর বড় হওয়াটা কুলসুম বুবু সহ্য করতে পারে না। মাসচারেক আগে খালার বাড়ি গেলে, কুলসুম বুবু রান্না ঘরে রান্নার সময়ে বড় খালার দিকে তাকিয়ে বলে, ও মা? মা?

বড়খালা তরকারি কুটছিল। তাকায়, কি অইচে?

তুমি দেখছ?

কি দেখমু?

আমাদের খবির মানে খবির মিয়াতো বড় অইয়া গেছে।

বড় খালা চোখ বড় বড় করে তাকায়, তোর কথা তো কিছুই বুঝতে পারতেছি না।

বোঝবা কেমনে? তুমি তাকাইয়া দেহো, খবির মিয়ার নাকের নিচে কেমন কালা কালা মোচ উঠছে। তোমার ছোট বুইনের  পোলা বড় অইচে, মোচ উঠছে, বিয়া দেওন লাগবে…সুন্দর দেখে একটা মেয়ে দেখো।

খালা, খালাতো বোন ঝুমুর, কাজের মহিলা হাসে। খবির দৌড়ে পালায়।

সেই খবির  গত মাসে বড়খালার বাড়ি যায়। দুপুরের ভাত খেয়ে চলে আসতে চাইলে খালা বলেন, বাড়ি যাইয়া কি করবি? রাইতটা থাইকা যা। পাশের বাড়িতে বিয়ার দাওয়াৎ আছে।

কার বিয়া?

ওই যে ছালমারে দেখছোনা, ধলা ছালমা, হেই ছালমার বিয়া। গরুর গোস্ত দিয়া ভাত খাইতে পারবি পেট ভইরা।

গরুর গোস্ত! কতদিন গরুর গোস্ত খায় না। থেকে যায় খবির।

বিকেলে খালাতো ভাই আমির, পাশের বাড়ির সোলেমান আর ইয়াছিনের সঙ্গে  হা ডু ডু খেলেছে পুকুর পাড়ের মাঠে। খেলার পর সন্ধ্যার আগে পুকুরে নেমে উথালপাথাল গোসল সেরে বাড়িতে আসে খবির, উদোম গায়ে। খালা গামছা দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিয়ে বলে,  সন্ধ্যা অইয়া গেছে কখন? ছালমাগো বাড়ি যাইতেছি আমরা। তোর কুলসুম বুবুর কাছে যা। বাশত্যাল দিয়া মাথাটা ভালা কইরা আচড়াইয়া দেবে।

বাশত্যাল দিুম ক্যান?

আরে গাধায় কয় কি! বিয়া বাড়ি যাবি, একটু সাইজা গুইজা যাবি না? যা…খালা হাসে, এক্কেরে বোকার হদ্দ অইচে পোলাডা।

খবির কুলসুম বুবুর ঘরে ঢুকলে, কুলসুম বুবু তাকায়, কি?

আমারে একটু বাশত্যাল দিবা?

ঠোঁট মুছড়িয়ে হাসে কুলসুম, তোর মাথায় বাশত্যাল দিমু ক্যান? তোর কি বিয়া?

খালায় কইচে।

আবারও মুখ ভেঙচায় কুলসুম বুবু, খালায় কইচে। আয়, আমার কাছে আয়।

খবির রুমের ভেতরে ঢুকলে হাত ধরে বসায় খাটের উপর। খাটের নীচ থেকে বের করে বাশতেলের বোতল। ছিপি খুলে হাতের তালুতে তেল নিয়ে দুহাতে ঢেলে খবিরের মাথার ঘন কালো চুলের মধ্যে মাখতে থাকে। আরামে চোখ বুঝে আসে খবিরের। জীবনে এইভাবে আদর করে কেউ মাথায় বাশতেল মেখে দেয়নি। তেল মাখতে মাখতে কুলসুম জিজ্ঞেস করে, ক্যামন লাগতেছে?

খুইব ভালো লাগতেছে বুবু।

কি ভালো লাগতেছে? আমারে না বাশত্যাল?

কথা বলে না খবির। কুলসুম বুবুর কাছে বসার পর থেকেই দুই রকম গন্ধ পাচ্ছে ও। একটা বাশতেলের। আর একটা গন্ধ কেমন যেন, ফুলের না জলের বুঝতে পারে না খবির। অদ্ভুত একটা গন্ধ, জীবনে প্রথম পায়।

মাথায় ঝাঁকি দেয় কুলসুম, কথা কস না ক্যান?

কি কথা কমু?

তোর কোনডা ভালো লাগতেছে?

জানি নাÑ

রেগে যায় কুলসুম বুবু, এই আমার দিকে ফের।

খবির শরীর ঘুরিয়ে কুলসুম বুবুর দিকে ফেরে। কুলসুম বুবু গভীর চোখে তাকিয়ে আছে খবিরের দিকে, খবির কয়েক পলক চোখে চোখ রেখে, দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। বুবু দুহাতে হঠাৎ খবিরকে নিজের দিকে টেনে ওর মুখটাকে বুকের উপত্যকায়  স্থাপন করে, আমারে তোর ভালো লাগে না?

এই মুহূর্তে বুঝতে পারে, বাশতেলের বাইরে দ্বিতীয় সুরভিত গন্ধটি কুলসুম বুবুর শরীরের। এত পাগল করা বিমোহিত গন্ধ বুবুর শরীরে? খবির নিজেই বুঝতে পারে না, কখন বুবুর দুই স্তনের মধ্যেখানে নাক ডুবিয়ে  দিয়েছে। আর দুহাতে জড়িয়ে ধরেছে বুবুকে। বুবুও ওকে বুকের মধ্যিখানে রেখে দুহাতে পিষে ধরেছে।

খবির? বুবু ফ্যাসফাসে গলায় ডাকে, খুব আস্তে।

বুবুর ডাকে বুকের গহিন খাদ থেকে মুখ তোলে খবির। সঙ্গে সঙ্গে বুবুর কামনা মাখা ঠোঁট নেমে এসে ওর ঠোঁটদুটো নিজের মুখের মধ্যে নিয়ে চুষতে থাকে বুবু। বুবুর শরীরের কারখানা থেকে আরও তিমির মাখা  সুবাসিত গন্ধ এসে আকুল করে তোলে খবিরকে। মনে হচ্ছে ওর শরীরটা অবশ হয়ে যাচ্ছে। চেনা বুবু অচেনা  অপূর্ব সুন্দরীর রূপ ধরে ওকে গ্রাস করছে, কুলসুম বুবুর শ্বাস ঘন হয়ে আসছে।

ও কুলসুম? কুলসুমু? রান্নাঘর থেকে কেউ ডাকছে।

ঝট করে বুক থেকে খবিরকে সরিয়ে বুকের অসংবৃত ব্লাউজ ব্রা ঠিক করে রুমের বাইরে আসে কুলসুম বুবু। গলা বাড়িয়ে তাকায়, কেউ নেই। আবার রুমে এসে খবিরকে আলতো আদর করে, তুই রাইতে আমার কাছে ঘুমাবি।

তো তোমার তোমার কাছে ঘু-ঘুমবো? ঘোর কাটেনি খবিরের।

হ, তুই রাইতে মার কাছেই তো ঘুমাবি। সবাই ঘুমিয়ে গেলে আমার ঘরে চইলা আসবি। মুখের কাছে মুখ আনে কুলসুম বুবু, আসবি?

ঘাড় কাৎ করে খবির, আসমু।

এহন যা বিয়াবাড়ি।

খবির রুম থেকে বের হতে গেলে, হাত বাড়িয়ে ধরে, ল, তোর লগে আমিও যাই।

লন।

দুজনে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ায়। বুবু দরজা বন্ধ করে ফিরে দাঁড়ায়। বুবুর একেবারে শরীর ঘিরে দাঁড়িয়ে খবির। কি যে ভালো লাগছে বুবুকে…। মনে হচ্ছে মেলা থেকে কিনে আনা এক পয়সার বাঁশি বুবু। চাইলেই বুবুকে বাজানো যায় নিজের সুরে…।

রাতে, বিয়ে বাড়িতে গরুর গোস্ত দিয়ে পেটভরে ভাত খেয়ে খালার বাড়িতে এসে, খালার বিছানায় শুয়ে পড়েছে। যতোই গরুর মাংস দিয়ে ভাত খাক, কুলসুম বুবুর শরীরের মৌমাখা গন্ধটা নাক থেকে যাচ্ছে না। একে একে সবাই ঘুমিয়ে গেছে, জেগে আছে শুধু খবির, আর একটু পরেই উঠবে, যাবে কুলসুম বুবুর রুমে, আবারও নেবে ঘ্রাণ ঘ্রাণ আর ঘ্রাণ…।

খালার ডাকে ঘুম ভেঙে যখন  খবির তাকায়, তখন সকাল। নাকের মধ্যে কেবল ঘুমভাঙা সুবাসিত ঘ্রাণের বোতল ভেঙে যায়…পড়ে থাকে বোতলের চারা। ঘুম থেকে উঠে পুকুর পাড়ে যায় মুখ ধুইতে, ঘাটের উপর কুলসুম বুবু। ওকে দেখে অন্যদিকে তাকায়। নিজেকে কি অসহয় লাগছে! মুখের পানি একটু জোরেই নিক্ষেপ করে কুলসুম বুবু ওর দিকে তীব্র তাকিয়ে চলে যায়। খবির কি করবে? কেন ঘুমিয়ে পড়লো? কেন গেলো না বুবুর রুমে? আবারও ঘ্রাণ নিতে পারতো? চোখ ফেটে পানি আসে… মুখ না ধুয়ে, নাস্তা না খেয়ে খবির পিছনের পুকুরঘাট থেকেই চলে আসে বাড়িতে।

না, কুলসুম বুবুর শরীরের ঘ্রাণ নেয়ার রাতের মতো আর ভুল করে না খবিরউদ্দিন পেয়াদা। বিছানায় শুয়ে থাকে ঠিকই কিন্তু ঘুমায় না। জেগে থাকতে থাকতে যখন ধৈর্যহারা ঠিক তখনই কাউয়া ডাকার শব্দ শুনতে পায় খবির। সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে নেমে খুব সন্তর্পণে দরজা খুলে উঠোনে নামে। উঠোনে দাঁড়িয়ে ইদ্রিস।

দুজনে দুজনের হাত ধারে, আধ খাওয়া চাঁদের মিহি জোছনায় দৌড়ে উঠোন পার হয়ে রাস্তায় আসে। দ্রুত হেঁটে রাস্তা পার হয়ে কোলায় নামে, কোলায় [কোলা : ধান উঠে যাবার পর ধান গাছের মুড়া পড়ে থাকে যে বিরান মাটিতে, আদিগন্ত সেই মাঠই কোলা, বরিশাল অঞ্চলের শব্দ] নামার সঙ্গে সঙ্গে কানে আসে মাইকে বাজানো গান… ও দরিয়ার পানি তোর মতলব জানি…।  গানের সুর কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওরা আর দ্রুত হাঁটে না, দৌড় শুরু করে। বিশাল কোলা দৌড়ে পার হয়ে যখন বড় রাস্তায় ওঠে, তখন অনেক মানুষের দেখা পায়। রাস্তাটা পার হয়ে নামার পরই চোখে পরে আলো বন্যা বইছে…। বড় রাস্তার পর ছোট্ট একটা খাল। খালের উপর হাক্কা। মানুষ গিজগিজ করছে। হাক্কা পার হলে খুব দ্রুত যাওয়া যায় যাত্রা প্যান্ডেলে। যাত্রাকে কেন্দ্র করে এই হাক্কাটা বানিয়েছে যাত্রার আয়োজকেরা। দশ বিশ মিনিট হেঁটে ঘুরে যাওয়ার পথই আসল পথ। কিন্তু উজান গাঁওয়ের উত্তর পশ্চিম দিকের মানুষেরা অতুটুক হেঁটে যেতে চায় না। মনে হচ্ছে একটু দেরি হলেও আদি নিখিল যাত্রাদলের নায়িকা সিতারা আখতারকে আর দেখতে পাবে না। দেখতে পাবে না আকাশ ভেঙে নেমে আসা রূপসী নর্তকীদের ঝুমুর ঝুমুর নাচ! এ সব না দেখতে পেলে জীবন ব্যর্থ। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি পারো, যত দ্রুত পারো, সবার আগে চলো যাত্রা প্যান্ডেলের দিকে। রাত যত বাড়ছে দূরের কাছের গ্রাম থেকে মানুষ আসছে ¯্রােতের বেগে। মাইকের গান যত কানে আসে মানুষের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা বাড়তে থাকে। উত্তেজনায় কেউ আর পনেরো বিশ মিনিট হেঁটে ঘুরে যাত্রা প্যান্ডেলের কাছে যেতে চায় না। মনে হচ্ছে যেতে দেরি হলেই যাত্রার নায়িকা আর নর্তকীদের দেখতে পাবে না। দেখতে না পাবার তীব্র আকুলতায় সবাই লাইন বেঁধে হাক্কার উপর ওঠে। ইদ্রিস আর খবির  হাক্কায় ওঠার জন্য সারিবদ্ধ বয়স্ক মানুষদের সঙ্গে অপেক্ষা করছে।

পিছনের বয়স্ক একজন প্রশ্ন করে, অ্যাই তোমরা কই যাইবা?

ওদের সামনের একজন, যে মুখ চাদরে আড়াল করে রেখেছে, উত্তর দেয়, অগো ছোট দেখলে কি অইবে, ওরাও যাত্রার নায়িকা দেখতে আইচে সন্টু ভাই।

সামনের মানুষেরা ধীরে ধীরে হাক্কা পার হচ্ছে। ছোট একটা মুলি বাঁশ দিয়ে বানানো হয়েছে। উপরে এক দিকে ধরনি। ধরনিও খুব শক্ত করে বানানো হয়নি। কেমন এলোমেলা টলোমলো করে হাক্কাটা। টলোমলো হাক্কার উপর উঠে যায় ইদ্রিস। ইদ্রিসের পিছনে পিছনে খবির।

মান সোনমান আর রইলো না, সন্টুর গলায় রাগ। এইসব পোলাপান যাত্রা দেখবে ক্যান? অগো পানি কি ঘন অইচে?

কথার মাঝখানে ইদ্রিস আর খবির হাক্কা পার হয়ে প্রায় পাড়ে এসেছে।

কলিকালের পোলা ওরা, তৃতীয় আর একজন মন্তব্য করে, কলিকালের পোলাপানের পানি দশ বচ্চর অইলেই ঘন অয়।

কাল গ্যাছে কলিতে, বাল ওঠছে দাঁড়িতে- সন্টু সরল ছড়া বলে, কলিকালের সঙ্গে মিলিয়ে। ইদ্রিস আর খবির হাক্কা পার হয়ে তীরে পা রাখে। সঙ্গে সঙ্গে সুন্টুর ছড়ায় হাক্কার উপরে যারা ছিল, সবাই হা হা হাসিতে ফেটে পরে, প্রত্যেকের শরীর শীতের পোশাক। মাঘ মাস শেষ। ফালগুন মাসের মাঝামাঝি হলেও  গ্রামে শীত আছে। বিশেষ করে রাত যত গভীর হয় শীতের মাত্রা বাড়তে থাকে। যাত্রা দেখতে যারা এসেছে, সবাই শীতের সোয়েটার  জামফার, চাদর জড়িয়ে এসেছে। সন্টুর ছড়ার হাসিতে ছোট্ট টলটলায়মান হাক্কাটা দ্রুত দোলে। এবং  হাক্কাটা বাঁধা বাঁশ ছিঁড়ে পানিতে নেমে যায়। কোমড় সমান পানি, শীতের রাতে হাক্কার উপর আট নয় দশজন মুহূর্তে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে যায়। দুই পারের মানুষ ঘটনায় হাসতে শুরু করে।

ইদ্রিস,  হেঁটে একটু আগে চলে গেছে। পিছন থেকে ডাকে খবির।

কি?

হাক্কা ভাইঙ্গা পড়ছে। অনেক মানুষ ভিজতাছে-

দ্রুত কাছে আসে ইদ্রিস হাক্কার। দেখে এক পলক। ভিজে যাওয়া মানুষগুলো অকাতরে গালি দিচ্ছে। কে কাকে কেন দিচ্ছে, কেউ জানে না। কিন্তু বিশ্রী গালি দিতে দিতে পানি ভেঙে কুলে ওঠার চেষ্টা করছে।

খবিরের হাত ধরে ইদ্রিস, এইহানে খাড়াইয়া খেলা দেখার দরকার নাই। প্যান্ডেলের দিকে ল।

ল, দুজনের প্যান্ডেলের দিকে যায়।

সেই রাতে খবির আর ইদ্রিস আদি নিখিল অপেরায় দেখেছিল ‘কাসেম সখিনা প্রেম’ যাত্রাপালা। সঙ্গে পাওনা ছিল নর্তকীদের আলুথালু ঝুমুর ঝুমুর নাচ। কিন্তু আমাদের ‘চলুন, মানুষের কারখানা’র প্রধান চরিত্র বা নায়ক খবিরউদ্দিন পেয়াদা বা পরবর্তীকালে যাত্রার নায়ক সেলিম চৌধুরী কিন্তু জীবনের প্রথম দেখা যাত্রা পালায় নর্তকীদের ঝুমুর ঝুমুর নাচ, কোমর বা বক্ষ দুলানির দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়নি। খবির অবাক বিস্ময়ে দেখেছে, চরিত্রগুলো। কিভাবে আসে মঞ্চে, প্রস্থান করে মঞ্চ থেকে। কিভাবে সংলাপ প্রক্ষেপণ করে। যাত্রার অভিনয় শিল্পীদের টেনে টেনে কথা বলার ঢং দারুণ লেগেছে। জীবনের প্রথম যাত্রা দেখে শেষ রাতে বাড়ি যাবার পথে, কোলার উচু নিচু পথে হাঁটতে হাঁটতে খবির নিজের মতো করে সংলাপ আউড়ে যায়, আমি তোমাকে ভালোবাসি কাসেম। আমার পিতা বিজয়নগর রাজ্যের রাজা হতে পারেন, তুমি কৃষকের পুত্র হতে পারো তাতে আমার কিছু যায়  আসে না। এখন তুমি আমাকে বলো, এই মুহূর্তে আমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার সাহস রাখো কি না?

খবিরের এই সংলাপ ঘুমের মধ্যেও চলতে থাকে।

যাত্রাপালা চলে সাতদিন। আদি নিখিল যাত্রাদলের চতুর্থ রজনীতে যাত্রা দেখেছিল, খবিরউদ্দিন পেয়াদা। প্রথম যাত্রা দেখার পরে বাকি তিন রজনীও দেখেছিল, একই কায়দায়। টাকা জোগাড় করেছিল বাগানের বাঁশ বিক্রি করে, গোপনে। খবিরকে নেশায় পেয়ে যায়। পর পর তিন রাতে তিনটি যাত্রাপালা দেখে, খবির মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, আমি একদিন যাত্রাপালার নায়ক  হবো।

পরের বছর আবার দি নিউ গোপাল যাত্রাদল এলো উজান গাঁও গ্রামের পাশের গাম, তেলিখালিতে। তেলিখালি খবিরের ছোট খালার বাড়ি। ছোট খালার বাড়িতে থেকে পর পর সাতটা যাত্রা দেখে। কেবল দেখেই না, দিনে যাত্রার আধিকারিক, মোহন্ত চৌধুরীর সঙ্গে কথাও বলে।

আমি আপনার যাত্রাদলে যোগ দিতে চাই, দুপুরে প্যান্ডেলের বেশ দূরে একটা পুকুরে গোসল সেরে হেলেদুলে আসছিল মোহন্ত চৌধুরী। সকাল থেকে অপেক্ষায় থেকেছে, কখন মোহন্তবাবুকে একা পাওয়া যায়!

আমি আপনার যাত্রাদলে কাজ করতে চাই-

মোহন্ত বাবু চিন্তায় বিভোর। নায়িকা চম্পাবতী রায় অসুস্থ। অনেক জ¦র। অথচ রাতে ‘নাগরাজ’ পালার অভিনয়। প্রধান নায়িকা  চম্পাবতী রায়। দ্বিতীয় নায়িকা হেমলতাকে দিয়ে কাজ চালানো যাবে, কিন্তু দর্শকেরা চায় চম্পাতবীকে। হেমলতাকে দিয়ে কাজ চালাতে গেলে, দর্শকেরা ধরে ফেলবে। আর একবার বদনাম হলে, যাত্রাদলের কদর কমে।

কি করা যায়!

ভাবনার মধ্যে খবিরের কথায় চমকে পিছনে তাকান মোহন্ত চৌধুরী, কি বললে?

আমি আপনার যাত্রায় কাজ করতে চাই।

তোমার নাম কি?

খবিরউদ্দিন পেয়াদা।

তুমি কি কর?

লেখাপড়া করি।

কোন ক্লাসে পড়?

এবার  মেট্রিক পরীক্ষা দেবো।

মোহন্ত চৌধুরী এতক্ষণ হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিলেন খবিরের সঙ্গে। ‘আমি মেট্রিক পরীক্ষা দেবো’ শুনে ঘুরে দাঁড়ালেন। তীক্ষè চোখে তাকালেন খবিরের দিকে। জীবনে অভিজ্ঞতা কম হলো না। যেখানেই যখন যাত্রা নিয়ে যান, দুই চার দশজন ছেলে আগ্রহ দেখায়, যাত্রাপালায় যোগ দেয়ার। মঞ্চের আলোআঁধারির মোহজগৎ ওইসব ছেলেদের চোখে রঙ লাগায়। কিন্তু ওরা তো জানে না, এইসব রঙের পিছনের কত অন্ধকার, কত কান্না লুুকিয়ে থাকে বা আছে। তিনি সব সময়ে চান যাত্রাশিল্পে শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা আসুক। এই যাত্রাপালা তো বাঙালি সংস্কৃতির আদি বিস্তারের শাখা। তিনি শঙ্কিত, যাত্রার  মধ্যে আজকাল অনেক অযাত্রা ঢুকেছে।

এখন যারা যাত্রাদলকে নিয়ন্ত্রণ করে, সরকারের কাছ থেকে অনুমতি আদায় করে, ওরা সরকারি দলের চামচা। সরকারি প্রভাব খাটিয়ে যাত্রাদল এলাকায় নেয় যাত্রা ভালোবেসে নয়। দুটি কারণকে সামনে রেখে যাত্রাদল এলাকায় নেয়, এক- যদি নায়িকা বা নর্তকীদের সঙ্গে ইয়ে করা যায়। দ্বিতীয়ত, যাত্রাকে সামনে রেখে জুয়ার আসর বসিয়ে টু পাইস কামিয়ে নেয়া যায়। ঘৃণা ধরে গেছে এই যাত্রা পেশায়। অনেকবার যাত্রা বন্ধ করে দেয়ার ইচ্ছে করেছেন। কিন্তু যাত্রার সময় এলে কোত্থেকে নায়ক-নায়িকা চরিত্ররা, নর্তকীরা, মেকআপ ম্যান, প্যান্ডেলের সবাই হাজির হয়ে যায়, নিজেও না করতে পারেন না। আবার  বেরিয়ে পড়েন। বেরিয়ে পড়তে পড়তে ভাবেন, এইবার শেষ। আর যাত্রা নয়। কিন্ত পরেরবার ঠিকই বের হন। এইভাবে দীর্ঘ বাইশ বছর যাত্রার আধিকারিক তিনি। অভিজ্ঞ চোখ। কত ছেলে এসে মাথা কুটেছে, অনুনয় বিনয় করেছে, নেননি। যাত্রাদল করা, যাত্রাদলে অভিনয় করা সহজ নয়। এইসব ছেলে ছোকরারা বোঝে না।

মোহন্ত চৌধুরী অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখেন খবিরকে। ছেলেটি গড়ন লম্বা। একহারা স্বাস্থ্য। চোখ দুটো বড়। আজ থেকে আট নয় বছর পর, যখন শরীর যৌবনে পূর্ণতা অর্জন করবে, যাত্রার নায়ক হতে পারবে। এখন যাত্রায় ঢুকলে নায়ক-নায়িকাদের আদেশ পালন করতে করতে জীবন শেষ হয়ে যাবে।

তুমি অভিনয় জানো

জানি।

কোথায় শিখেছো?

আপনাদের যাত্রা পালার অভিনয় দেখে শিখেছি।

তাই! হাসেন মোহন্ত চৌধুরী।

অভিনয় করে দেখাবো?

ছেলেটা আগ্রহ দেখে মোহন্ত চৌধুরীও আগ্রহবোধ করেন,  দেখাও।

‘কাসেম সখিনার প্রেমকাহিনি’, ‘নাগরাজ’ যাত্রাপালার বেশ খানিকটা বলে খবির, এবং সেই সঙ্গে শারীরিক কসরৎ দেখায়। ছোট্ট শরীরের হাতপা নাড়ানো এবং অভিব্যক্তি দেখে মোহন্ত চৌধুরী হাসবেন না কাঁদবেন, বুঝতে পারেন না। কিন্তু খবিরের আগ্রহকে তিনি অস্বীকার করতে পারেন না।

ওর মাথায় হাত রেখে বলেন, আমি তোমার আগ্রহ দেখে খুশি হয়েছি। চেষ্টা করলে তুমি যাত্রায় কাজ করতে পারবে। কিন্তু আমরা তো মেট্রিক পাশের নীচে কাউকে নিই না। তুমি তো এ বছর মেট্রিক পরীক্ষা  দেবে?

মাথা নাড়ায় খবির, হ্যাঁ।

তুমি মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করো, তখন দেখা যাবে।

আপনাকে তখন কোথায় পাবো?

তুমি আমার সঙ্গে এসো।

যাত্রা প্যান্ডেলের সামনে গিয়ে বললেন, তুমি একটু অপেক্ষা করো। আমি আসছি।

মোহন্ত চৌধুরী ভেতরে চলে গেলেন। রাতের দেখা আলোঝলমল কোনো কিছুই দেখা যায় না। প্যান্ডেলের পর্দা ফাঁক করে ভেতরে তাকায়। তাকিয়েই অবাক, রাতে যে সব মেয়েদের দেখেছে পরির লাবণ্যে নাচতে, নেচে পুরো প্যান্ডেল, প্যান্ডেলের দর্শকদের মাথায় তুলেছিল, সেই অবাক চরিত্রগুলো কত সাধারণ। বসে বসে খাচ্ছে। হাসছে। একেবারে অবিকল মানুষের মতো। এদেরকে মানুষ মনে হয়নি। মানুষের মধ্যে অন্যরকম কিছু মনে হয়েছিল।

এই নাও, ফিরে তাকাতেই দেখতে পায় মোহন্ত বাবু সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে একটা কার্ড, এই নাও আমার কার্ড। মেট্রিক পাশ করতে পারলে আমার কাছে চলে এসো। কেমন?

আচ্ছা, ঘাড় কাত করে খবির।

এখন যাও।

মোহন্ত বাবু প্যান্ডেলের মধ্যে ঢোকেন। হাতে ধরা কার্ডটির দিকে তাকিয়ে থাকে খবির, লেখা : মোহন্ত চৌধুরী, আধিকারিক, দি নিউ গোপাল অপেরা।  গ্রাম : বাড়ইখালি।  থানা : মোড়েলগনজ। জিলা :  খুলনা।

পরের বছর মেট্রিক পাশ করে, বাড়ির কাউকে না বলে, এক সকালে যাত্রা করে, প্রায় সন্ধ্যার আগে আগে মোড়েলগঞ্জের বাড়ইখালি গ্রামে মোহন্ত চৌধুরীর বাড়ির দুয়ারে উপস্থিত হয় উজান গাঁও গ্রামের জসিমউদ্দিন পেয়াদার বড় পুত্র, খাবিরউদ্দিন পেয়াদা।

সন্ধ্যার আবছা আলোয় বাড়ির সামনে খবিরউদ্দিনকে দেখে যতটা অবাক হয়েছেন মোহন্ত চৌধুরী, খুশি হয়েছেন অনেক বেশি। এক বছরে অনেকটা বড় হয়েছে খবির। দেখেই বুঝেছেন, যাত্রাপালার ভবিষতের একজন নট সামনে দাঁড়িয়ে।

আমি মেট্্িরক পাশ করেছি, মোহন্ত চৌধুরীকে দেখে, কাঁপা কাঁপা গলায় নিজেকে উপস্থাপন করে খবির। হাসতে হাসতে খবিরকে জড়িয়ে ধরেন তিনি, আমি জানি।

শুরু হলো বাংলাদেশের যাত্রাপালার একজন নায়কের আবির্ভাবের চর্চা।

কত ঘাটের জল খেয়ে, সাতটা যাত্রাদলের পর সেলিম চৌধুরী যখন মধ্য গগনে, তখন দেখা হলো, ভানডারিয়া উপজেলার খোন্দকার  জালালউদ্দিনের সঙ্গে। এবং পুরো ভুগোলটাই পাল্টে দিয়েছে লোকটা।

 

তিন.

গোবিন্দ দেবনাথের যখন জ্ঞান ফিরে আসে, তখন সকাল।

বৈশাখী যাত্রাদলের প্যান্ডেলে দুপুর রাত থেকে গোবিন্দকে না দেখে,অনেক খোঁজাখুঁজি করে। যাত্রা শুরু করার আগে তিনি নিজে সব তদারক করেন। পালার চরিত্রানুসারে মেকআপ, পোশাক আশাক ঠিক আছে কি না, তিনি শেষবারের মতো দেখেন। শেষ মুহূর্তেও গোবিন্দ অনেক কিছু পরিবর্তন করেন। যদিও যাত্রা, অভিনয়, কিন্তু যাত্রারা মানুষেরা মনে করে, প্রার্থনারও অধিক কিছু। সন্ধ্যার দিকে আধিকারিককে না দেখে, মনে করেছিল, কোনো নিমন্ত্রনে গেছেন। রাত দশটার মধ্যে ফিরে আসবেন। কিন্তু রাত দশটা হয়ে, এগারটা, এগারটা হয়ে বারোটা যখন, তখন থানায় খবর দেয়া হলে, ওসি বিশাল ভুড়ি দুলিয়ে হাজির, কি ঘটনা? গোবিন্দ সাবকে নাকি পাওয়া যাইতেছে না!

গোবিন্দ দেবনাথের পক্ষে দ্বিতীয় যে ব্যক্তি দি বৈশাখী যাত্রাপালার দায় দায়িত্ব পালন করে, সে মলয়  রায়। দেবনাথের বৌয়ের দিকে আত্মীয়। ওসির সামনে মলয় রায় হাত জোড় করে প্রায় ভেঙে পড়ে, স্যার আমার দাদাবারবুরে উদ্ধার করুন।

পানের পিক ফেলে ওসি কামরুদ্দিন, কোথায় গেছে জানলে না উদ্ধার করব আপনার দাদাবাবুকে। আগে বলেন কোথায় গেছেন তিনি?

কি করে বলব? দাদাবাবু কোথাও গেলে বলে যান না।

আপনাদের মধ্যে গোবিন্দ দেবনাথের  সঙ্গে আর কে ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ করেন?

নগেন দাস, একবাক্যে বলে মলয় রায়।

ডাকুন ওকে।

ওকে ডেকে কি করবেন? ওতো একেবারে কাজের মানুষ। দাদাবাবুর সব কাজ করে দেয়Ñ

হাসে কামরুদ্দিন, আপনি ওসি না আমি?

আপনি ওসি।

তাইলে আমাকে কাজ করতে দেন।  ডাকেন নগেন দাসকে।

রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। ওইদিকে লোকজনে টিকেট কেটে বসে গেছে। আশালতার মনে অজানা ভয় জেগে উঠেছে। না জানি কি হয়। ওকে নিয়ে যে একটা চটিল চক্র জমে উঠেছে ভানডারিয়ায় জেনে গেছে। বেশি অবাক আশা, সেলিম চৌধুরীর পরিবর্তনে। সব সময়ে এড়িয়ে চলে। অথচ এতদিন, পরিচয়ের পর থেকে  চাইলেও, না চাইলেও সেলিম চৌধুরী পাশ থেকে নড়তে চাইতো না। এই পাশে পাশে থাকাটা একদম পছন্দ করতে পারত না আধিকারিক। কতভাবে হুমকি দিয়েছে গোবিন্দ। কিছুতে দমে যায়নি আশালতা। রাতের অন্ধকারে, একটু আড়াল পেলেই জড়িয়ে ধরত সেলিম চৌধুরী। আশালতাও তৃষ্ণার্ত থাকত একটু পৌরুষময় ছোঁয়া বা পিষ্ট হবার …।

নগেন দাস প্যান্ডেলের সামনে তিনটি টিকেট কাউন্টারে ঘুরে ঘুরে দেখে। বেশি টাকা হলে একটা টিনের বাক্সে ভরে নগেনের হাতে দেয়। নগেন দাস টাকাটা এনে অভিনয় মঞ্চের পিছনে বড় একটা চেয়ারে বস গোবিন্দ দেবনাথের হাতে দেয়। গোবিন্দ দ্রুত প্যান্ডেলের নিজের রুমে চলে যান। মাঝারি আকারের সিন্দুকে টাকাটা রেখে চাবি কোমরের সঙ্গে বেঁধে আবার এসে বসেন চেয়ারে। রাত, কাঁটায় বারোটা বাজার সঙ্গে বেজে ওঠে বাদ্য। বারোটা বেজে দশ মিনিটে দৃশ্যের পর সাজানো চরিত্রগুলো মঞ্চে ওঠে। ওঠার সময়ে আধিকারিক গোবিন্দ দেবনাথের পা ছুঁয়ে যায়…।

আজ কার পা ঁছুয়ে  মঞ্চে উঠবে শিল্পীরা? বৈশাখী অপেরার শিল্পীদের মধ্যে গভীর গোপনে  একটা কথা চালু আছে, গোবিন্দ দেবনাথের পর দি বৈশাখী অপেরার মালিক হবার তালে আছে মলয় রায়। মলয় রায় দখলের কোনো সূত্র তৈরি করল নাতো!

টিকেট কাউন্টার থেকে নগেন দাসকে ডেকে ওসি কামরুদ্দিনকে দেখে নগেন দাসের ভেতরে কাঁপন শুরু হয়। ব্যাটারা কি সব জেনে গেছে? আম ছালা সবই যাবে নাকি? পানের পিক ফেলে কামরুদ্দিন জিজ্ঞেস করে,  তুমি নগেন দাস?

জে, কোনোভাবে উচ্চারণ করে।

তুমি কতদিন ধরে আছো গোবিন্দ বাবুর সঙ্গে-

যাত্রার শুরু থেকে।

যাত্রার শুরু থেকে! ওসি কামরুদ্দিন পুনরায় বলে, তো তোমার মালিক গোবিন্দ বাবু কোথায় গেছেন বলতে পারো?

মুখের ডগায় এসে গিয়েছিল, জালাল খোন্দকারের সিমলা রাইস মিলে গেলে পাবেন। দ্রুত কোনোভাবে সামলে নিয়ে বলে, আমি কেমনে বলব হুজুর। আমি তো সন্ধ্যার পর থেকেই টিকেট কাউন্টারে থাকি।

মলয় রায় যোগ করে, জি স্যার। নগেন দাস টিকেট কাউন্টারের দায়িত্ব পালন করে।

বিকেলে কখন দেখেছো?

একটু ভাবে, বিকেল চারটার সময়ে বাবুকে চা খেতে দেখেছি রুমে।

কার রুমে?

ওনার নিজের রুমে।

ঠিক আছে, তুমি যাও।

নগেনের মনে হলো মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে যাচ্ছে। ওসি কামরুদ্দিন আবার পিক ফেলে তাকায় মলয় রায়ের চৌকো মুখের দিকে, আপনি কখন দেখেছেন আজ?

স্যার, আমার পেটটা একটু খারাপ। দুপুরে অল্পকিছু খেয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এত ক্লান্ত যে বিকেলে আর উঠিনি। সন্ধ্যার পরে ওরা যখন আমাকে বলল, দাদাবাবুকে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন আমি উঠে আসি। আমি সবার কাছে খোঁজ নিয়েছি, কেউ বলতে পারল না, দাদাবাবু কখন কার সঙ্গে বের হয়ে গেছে প্যান্ডেল থেকে।

আপনাদের নায়িকা আর নায়ককে ডাকুনতো…

ওসি কামরুদ্দিনের খুব ইচ্ছে ছিল, আশালতা দেবীকে…। বলেছিলও গোবিন্দ দেবনাথকে। গোবিন্দ দেবনাথ বলেছিল, স্যার আপনি বলেছেন, আমার কাছে ছোট্ট একটা দাবি করেছেন, আমার পালন করা উচিত। কিন্তু একটা সমস্যা আছে।

কি সমস্যা? কামরুদ্দিনের গলায় ক্ষোভ। আমি না বললে আপনি এই ভানডারিয়ায় পালা করতে পারবেন না।

বিগলিত হাসে গোবিন্দ. জানব না কেন? আমি কি আজকের মানুষ। আপনাদের মতো বড় বড় মানুষদের মিশে, দেখে শুনে আজ এইখানে। আসল সমস্যাটা শোনেন-

বলেনÑ

আশালতা দেবী আমার বাগদত্তা।

মুখে কথা আটকে যায় ওসি কামরুদ্দিনের, বলেন কি?

হ্যাঁ। বিষয়টা বাইরের কেউ জানে না। আমার দলের সবাই জানে। আমরা তো প্যান্ডেলে স্বামী-স্ত্রীর মতোই থাকি। এই সিজন শেষ হলে আসছে বর্ষায় আমাদের বিয়ে হবে।

ঠিক আছে, আশালতা বাদ, আপনার শ্রেষ্ঠ নর্তকী, কি যেনো নাম- প্রিয়া। ওকে পাঠান।

ঠিক আছে, পাঠাব।

পরের সন্ধ্যায় প্রিয়া গিয়েছিল ওসির বাসায়। ভালো একটা অভিজ্ঞতা দিয়েছে প্রিয়া। এখন সমস্যা হলো, গোবিন্দ দেবনাথ উদ্ধার পালা।

সামনে এসে দাঁড়ায় আশালতা। এখনও প্রসাধন সারেনি। চোখে মুখের রঙ আর জৌলুশ দেখে ওসি কামরুদ্দিনের মনে কামনার ঝড় ওঠে। কিন্তু ঝড় এখন বিশ্রামে পাঠাতে হবে, আপনি আশালতা দেবী?

জি।

আপনাদের আধিকারিক গোবিন্দ বাবুকে আপনি শেষ কখন দেখেছেন?

বিকেলে।

নির্দিষ্ট করে বলুন, ঠিক কটায়?

আমি নিদিষ্ট করে বলতে পারব না। আমি ঘুম থেকে উঠে মুখ ধোয়ার জন্য বাইরে আসার সময়ে দেখি আধিকারিক গোবিন্দ বাবু বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসছিলেন। উনি চলে গেলে আমি বাইরে  চলে যাই।

আশালতা দেবীর কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সেলিম চৌধুরী এসে দাঁড়ায়। ওসি কামরুদ্দিন তাকায়, আপনি তো নায়ক সেলিম চৌধুরী?

জি। আমিই সেলিম চৌধুরী।

আপনি আজ বিকেলে বা সন্ধ্যায় আপনি কখন দেখেছেন গোবিন্দ বাবুকে?

আমি ওনাকে দেখিনি।

মানে?

আমি দুপুরের খাবারের পর থেকে ঘুমিয়ে ছিলাম। উঠেছি এই একটু আগে-

ও।

ওসি কামরুদ্দিন কামনামাখা চোখে তাকায় আশালতার দিকে, আজকে তো আপনাদের শেষ রজনী?

মাথা নাড়ে আশালতা, হ্যাঁ।

মলয় বাবু?

জি বলেন-

আপনি আসুন আমার সঙ্গে। যাবার জন্য পা বাড়িয়ে আবার দাঁড়ায় ওসি কামরুদ্দিন, আপনারা আজকের রাতের কাজ শেষ করুন। কিন্তু  গোবিন্দ বাবুর কোনো খবর না পাওয়া পর্যন্ত কেউ কোথাও যাবেন না। মানে যেতে পারবেন না।

আর্তনাদ করে মলয় রায়, ওসি সাব? আমাদের যে কালকেই এইসব প্যান্ডেল ভেঙে চলে যেতে হবে। জানেন তো যাত্রাদলের অনেক লটবহর। আমরা পিরোজপুরের পার্টির কাছ থেকে বায়না নিয়েছি। দুদিন পর পিরোজপুরে প্রথম যাত্রা…

হাত তোলে কামরুদ্দিন, একজন জ্বলজ্যান্ত মানুষের খবর নেই, যে এই বৈশাখী যাত্রাদলের মালিক, তাকে ছাড়াই যাবেন কি করে? জীবিত বা মৃত- তাকে তো পেতে হবে। নাকি?

জীবিত বা মৃত! আপন মনে বিড় বিড় করে মলয়। দাদাবাবু মারা যাবেন কেন?

হাসেন ওসি, আপনার দাদাবাবু মারা গেছেন আমি কি বলেছি? আমি বলেছি,ওনাকে পাওয়ার বিষয়ে। এখন চলুন আমার সঙ্গে।

কোথায় যাব?

ভয়ের কিছু নেই। আমার অফিসে চলুন। আপনার দাদাবাবু বিষয়ে কিছু কথা আছে আমার। যা সবার সামনে বলা যাবে না।

নগেনকে সঙ্গে নিয়ে যাই?

আরে না। আপনি আধাঘণ্টার মধ্যে চলে আসবেন। চলুন, ওসি কামরুদ্দিন পরম স্নেহে হাত রাখে মলয় রায়ের কাঁধে। আহারে, কত কালের চেনাজানা।

মলয়ের না গিয়ে উপায় থাকে না। দি বৈশাখী যাত্রাদলের শেষ রজনী শেষ হলো এক ধরনের শোকাবহ  শোক নিয়ে। সকালে ঘুম ভাঙলো শোক বিসর্জন দিয়ে, নগেন দাসের চিৎকারেÑ এই তোমরা কোথায়? শিগগির আসো। বাবু ফিইরা আইচে… বাবু ফিইরা আইচে।

গোবিন্দ দেবনাথের সকালে যখন ঘুম ভাঙে, চোখ মেলে তাকায়, নিজেকে দেখতে পায়, ভানডারিয়া উপজেলা শহরের মাঝ বরাবর ভাগ হয়ে পোনা নদীর  পোলের গোড়ায়, মাটিতে পরে আছেন। তিলকমাত্র, উঠে বসেন তিনি। এবং লহমায় গতকালের বিকেল থেকে সন্ধ্যা, রাত এবং এই মর্মান্তিক মুহূর্তের ঘটনা মনে পড়ে যায়। কেউ দেখার আগে উঠে দাঁড়ান। লোকজনের আনাগোনা এখনও শুরু হয়নি। শরীরের জামা কাপড় ঠিক আছে কিন্তু সারা শরীরের জামা কাপড়ে কাদা ময়লার দাগ আছে। তিনি দ্রুত পোনা নদীতে নামেন। হাতমুখ ধুয়ে কুলি করেন কয়েকবার। প্রবল তৃষ্ণায় তিনি আজলা ভরে পানি পান করলেন এবং নিজেকে কিছুটা সুস্থির মনে করলেন। এবং ভাবলেন দ্রুত ফিরে যাওয়া দরকার, দি বৈশাখী অপেরার কাছে। পোনা নদীর তীর থেকে দ্রুত উপরে উঠে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলেন, আশালতা ঠিক আছে তো? হাঁটতে হাঁটতে আরও ভাবছেন, খোন্দকার জালালউদ্দিন কোথায়? আমি নেই প্যান্ডেলে, এই সুযোগে কি সেলিম চৌধুরী আশাকে নিয়ে ভেগেছে? মলয় রায় কি করছে? গতকালের যাত্রাপালা কি হয়েছিল? হয়ে থাকলে টাকা পয়সা কে রেখেছে?  সিকান্দার বখতরা হামলে পড়েছে আমার যাত্রাদলের উপর? ভাবনার মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করে, দি বৈশাখী অপেরার দরজায়।এবং প্রথম দেখে নগেন দাস। নগেন দাসের চিৎকারে অপেরার সব মানুষ এসে ভিড় করেছে সামনে, কিন্তু চোখে মুখে কোনো আনন্দ নেই। সবার মুখে এক ধরনের বিষাদ।

কি হয়েছে মলয়?

আশালতা দেবী নেই।

নেই মানে?

যাত্রা শেষ হওয়ার পর প্যান্ডেলের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন গোবিন্দ দেবনাথ। পাশের একটা চেয়ারে বসলেন। বুঝলেন তুরুপের তাস  হাতছাড়া হয়ে গেছে। কিন্তু কোথায়, কার সঙ্গে? সেলিম চৌধুরী তো সামনে। ওকি কিছু জানে? নাকি খোন্দকারের লোকেরা তুলে নিয়ে গেছে?

আপনি সারারাত কোথায় ছিলেন?

আমি কোথায় ছিলাম আপাতত জানার দরকার নেই। মলয় রায়ের দিকে তাকিয়ে বলেন গোবিন্দ- আমি পরে তোমাদের  বলব। এখন দ্রুত প্যান্ডেল ভাঙ্গো। জামাকাপড় যার যা আছে গুছাও, তৈরি হও- যত শীঘ্র সম্ভব, ত্যাগ করতে হবে ভানডারিয়া।

দাদা? গোবিন্দ বাবুর আদেশে প্রত্যেকের মধ্যে চঞ্চলতা প্রকাশ পায়। সারা রাত ধরে যাত্রাপালা চলার পরে, সকালে, এই সময়ে যাত্রার সবাই ঘুমিয়ে থাকে। সেই ঘুমটা আজকে কারও চোখে নেই। কিন্তু ক্লান্তি আর  নিঃশব্দ আতঙ্ক আছে। আর যাত্রাজীবনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ শিল্পীরা নিজের নিজের ঘরে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মলয়ের ডাকে সবাই ফিরে তাকায়।

কি?

আমরা যে পিরোজপুরে যাবো, নায়িকা তো সঙ্গে নেই।

জানি।

কে নায়কার ভূমিকায় অভিনয় করবে?

নির্মলা সেন করবে।

নির্মলা সেনের মুখে ঘন হাসি। পাশে দাঁড়ানো পাপড়ি রায় আর হেলেনা খানম কটাক্ষে তাকায় নির্মলার দিকে। নির্মলা সেনের মুখে গর্বিত হাসিচ্ছটা দেখে ভ্রুকুচকে চলে যায় পাপড়ি। হেলেনা খানম মুখ ভেংচায়, দেখা যাবে! শরীরে ঝংকারের ছন্দ তুলে চলে যায় হেলেনা খানম। কিন্তু নির্মলা সেনের হাসি থামে না। অনেক দিনের অপেক্ষার পর সুযোগ এসেছে, এবারে সবাইকে দেখাবে, দেখাতে হবে, বৈশাখী অপেরার প্রধান নায়িকা কাকে বলে! আশালতা দেবীর সঙ্গে কোনোভাবেই পেরে উঠছিল না কেউ। তেমন লেখাপড়া জানেন না আশালতা দেবী, অথচ কিভাবে যাত্রার সব অনুষঙ্গ অঙ্গে ধারণ করে মাত করে দিয়েছে।

নির্মলা নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে ভাবছে, কোথায় গেলো দিদি?

 

চার.

জসিমউদ্দিন পেয়াদা টাকার বান্ডিলটা হাতে নিয়ে তাকায়, পুত্র খবিরউদ্দিন পেয়াদার দিকে, বিশাল জিজ্ঞাসা নিয়ে, এত টাকা?

আমি ধীরে ধীরে জমাইছি। আপনি অনেকদিন বলেছেন চাষের জন্য গরু কিনবেন। সেই জন্য জমিয়ে জমিয়ে আপনাকে দিলাম. যাত্রার পাঠের মতো নিজের মধ্যে আগে থেকে সাজানো কথাগুলো বলে যায় খবির।

কত টাকা আছে এই বান্ডিলে?

আশি হাজার টাকা।

আশি হাজার টাকা! স্বাগত উচ্চারণ করে জসিমউদ্দিন পেয়াদা। জীবনে একটা কাজ করছ বাবা, বড় দুঃখ ছিল, সারাজীবন বুঝি পরের জমিতে কাম করেই যেতে হবে। তাকায় স্ত্রী আছিয়া বেগমের দিকে, এক জোড়া চাষের গরু কিনে মেলা টাকা থাকবে। সেই টাকায় নগদ তিন চাইর বিঘা জমি রাইখা নিজেই চাষ দিমু। দেখবা, দুই তিন বছরের মধ্যে আমাগো কপাল ফিরইরা যাইব।

আছিয়া বেগম পান মুখে দিয়ে, আর এক খিলি বাড়িয়ে ধরে স্বামীর দিকে, নেন পান নেন।

দেও, স্ত্রীর হাত থেকে পান নিয়ে মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে অনেক দিনের না-বলা কথা বলে জসিমউদ্দিন পেয়াদা, তোমার পোলার তো  একটা বিয়া দেওয়া লাগে।

আমি যাই, যেতে যেতে আবার বলে যাত্রার সেলিম চৌধুরী, আর জসিমউদ্দিন পেয়াদার পুত্র খবির, দেখি আরও হাজার বিশেক টাকা পরে আরও দিতে পারি।

আরও বিশ হাজার টাকা দিবি?

মাথা নাড়ায়, একটা যাত্রাদলে কাজ করেছিলাম। কিন্তু টাকা দেয় নাই। বলছে, আগামী মাসে দেবে। দিলে তোমাকে দিয়ে দেব।

পরের দিন সেলিম চৌধুরী চলে আসে ভানডারিয়া। দেখা করে মেসার্স সিমলা রাইচ  স্টোরের মালিক খোন্দকার জালালউদ্দিনের কাছে। সেলিম চৌধুরীকে দেখে জালাল খোন্দকার অবাক, আরে আপনি? কেমন আছেন? বসুন।

বসে সেলিম চৌধুরী, আমি কাজে এসেছি।

আমার কাছে? খোন্দকার জালালউদ্দিন দেখছেন, কয়েক মাস আগের সেই সেলিম চৌধুরীর সঙ্গে সামনে বসা এখন এই সেলিম চৌধুরীর অনেক পার্থক্য। গম্ভীর। চেহারায় সেই জৌলুস নেই। কেমন তামাটে  রঙ শরীরের, মুখের।

আপনি বৈশাখী অপেরায়  অভিনয় করেন না?

না।

কি করেন?

বাপের সঙ্গে জমিতে চাষাবাদ করি।

খোন্দকার জালালউদ্দিন ভেতরে ভেতরে চমকে ওঠেন। হ্যাঁ সেই রকমই মনে হয় সেলিম চৌধুরীকে। আশালতা দেবী যেখানে নেই সেখানে অভিনয় করবে কিভাবে? মনের সিঙ্ক না হলে আর যাই হোক শিল্প হয় না,আপনি কি আমার কাছে এসেছেন?

হ্যাঁ।

আমি কি করতে পারি আপনার জন্য সেলিম চৌধুরী?

আমার পাওনা বিশ হাজার টাকা নিতে এসেছি।

পাওনা বিশ হাজার টাকা…বলতে বলতে মনে পড়ে যায় খোন্দকারের। আরে, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।

কিন্তু আমি ভুলিনি।

দেখতেই তো পাচ্ছি, আপনি ভোলেন নি। এবং পাওনা টাকা নিতে এসেছেন। চা খাবেন?

না। টাকাটা দিন চলে যাই।

এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন?

আমি আপনার সামনে বসে থেকেই বা কি করব?

ঠিক আছে, খোন্দকার ড্রয়ার খুলে দশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল বের করে রাখে  টেবিলের উপর,  এখানে দশ হাজার আছে।

পুরো বিশ হাজার টাকাই দিয়ে দিন। আপনার তো টাকার অভাব নেই। খামাখা আমাকে ঘুরিয়ে কি লাভ? চোখে চোখ রেখে বলে সেলিম।

ঘুরাচ্ছি না আপনাকে সেলিম চৌধুরী ওরফে খবিরউদ্দিন পেয়াদা। আপনি যে মনে করে আজকে টাকা নিতে আসবেন আমি তো জানি না। আর গতকাল এক পার্টিকে তিন লাখ টাকা দিতে হয়েছে, তাই আজ ক্যাশ প্রায় শূন্য। কিন্তু আপনি অনেক দিন পর এলেন বলে এইটা দিলাম। আসেন আবার আগামী সপ্তাহে, বাকি দশ হাজারও দিয়ে দেব। আপনি ভাববেন না, আমি আমার দেয়া কথা রাখব না।

জানি, আপনি আর দশজনের মতো ছোটলোক না, টাকার বান্ডিলের দিকে হাত বাড়ায় সেলিম চৌধুরী। কথা যখন দিয়েছেন, তখন টাকাটা দেবেন।

খোন্দকার হতবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন সেলিম চৌধুরীর দিকে। লোকটার সাহস বেড়েছে। অনেকটা একরোখা। টাকার বান্ডিলটার উপর সেলিম চৌধুরীর হাতের উপর হাত রাখেন খোন্দকার, আপনি অনেক বদলে গেছেন সেলিম চৌধুরী।

হ্যাঁ, আমি জানি আমি বদলে গেছি। আমার এই বদলে যাওয়ার পিছনে বড় ভূমিকা আপনার- বান্ডিলটায় টান দেয় ।

একবার দেখা দিয়ে যাবেন না? সেলিম চৌধুরীর হাতের উপর চাপ রেখে বলেন খোন্দকার।

অবাক সেলিম চৌধুরী, কাকে দেখব?

আশালতা দেবীকে।

আশালতা দেবী! ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করে সেলিম চৌধুরী ওরফে খবিরউদ্দিন পেয়াদা। দুজনে তাকিয়ে আছে দুজনের দিকে।

হ্যাঁ, আপনার প্রেমিকা আশালতা দেবী। যাকে আমি কিনে নিয়েছি একলাখ টাকায়-

না, নব্বই হাজারে, টান দিয়ে দশ হাজার টাকার বান্ডিলটা নিজের আয়ত্তে নেয় সেলিম চৌধুরী। আপনি এখনও দশ হাজার টাকা বাকি রেখেছেন।

হাসেন খোন্দকার, খোন্দকার জালালউদ্দিন যখন যাকে যে কথা দেয় সেটা রাখে। যদি মৃত্যুর খবরও দিয়ে থাকি, সেই ব্যক্তির মৃতুর পর আমি জানাজায়ও যাই সেলিম চৌধুরী। তুমি আগামী মঙ্গলবার ভানডারিয়া বাজারের দিন বিকেলে আসবে, এবং বাকি দশ হাজার টাকা নিয়ে যাবে। যাও এখন-

আমি থাকতে আসিনি, সেলিম মেসার্স সিমলা রাইস স্টোর থেকে বের হয়ে হাঁটতে থাকে। পকেটে দশ হাজার টাকার বান্ডিল। পকেটে হাত দিয়ে টাকার স্পর্শ নেয় হাতে, সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে আশালতাকে। থমকে দাঁড়ায় সেলিম, কেমন আছে  আশা? একবার দেখে গেলে… না, সিদ্ধান্ত নিতে পারে না সেলিম চৌধুরী ওরফে খবিরউদ্দিন পেয়াদা। যাবো? আহা কী স্নিগ্ধ মুখ? টানা টানা চোখ আর শরীরের নিঃসীম গন্ধ!  যাই, অন্তত একবার দেখে যাই, পিছনে ফিরে তাকাতেই বিপরীত প্রশ্ন জাগে মনে, না। যা বিক্রি করেছি সেই বিক্রির মালের উপর আমার কোনো অধিকার নেই। টার্ন করে আগের পথে চলে, সেলিম চৌধুরী ওরফে খবিরউদ্দিন পেয়াদা।

পরের মঙ্গলবার বিকেলে এসে বাকি দশ হাজার টাকাও নিয়ে যায় সেলিম চৌধুরী। সেলিম চৌধুরী ওরফে খবিরউদ্দিন পেয়াদা টাকাটা নিয়ে পিতা জসিমউদ্দিন পেয়াদার হাতে দিলে, বড় পেয়াদা পুত্রের  যাত্রাপালায়  অভিনয় করার কারণে এতদিন যে ক্রোধ লালন করে আসছিল, সেই ক্রোধ পরম ¯েœহে রূপান্তরিত হয়। বড় পেয়াদা দুটি গরু কেনে। সাত বিঘা জমি নগদ কিনে নিজের হাতে নিজের মতো চাষাবাদ করে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দুঃখ, নিজের জমি নিজের মতো চাষাবাদ করার আকাক্সক্ষা শেষ জীবনে বাস্তবায়িত হওয়ায়, বড় পেয়াদা এখন উজান গাঁওগ্রামে সামাজিকভাবে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে।

দুপরের খাবার খেয়ে আশা বারান্দায় বসেছিল। মোবাইলে শুনছিল গান…কেউ কোনোদিন আমারে তো কথা দিল না… চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের লেখা এই গানটি খুব প্রিয় আশালতার। শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন গেয়েছেনও দরদ দিয়ে। অনেক পুরোনো দিনের গান। সেলিম চৌধুরীর সঙ্গে খুলনায় গিয়ে বৈকালী সিনেমা হলে সিনেমাটা দেখেছিল। আশা মনে করতে পারে না, ছবিটার কি নাম ছিল? কসাই? কসাই হবে। নাকি সুন্দরী? পরিচালক আমজাদ হোসেন তখন যতœ করে ছবি বানাতেন। কোথায় সেইসব মানুষ, আর কোথায় সেইসব ছবি! বুকের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ^াস বের হয় আশালতার। খুলনায় থাকার সময়ে এক পরিচালক আশার অভিনয় দেখে, নায়িকা হবার প্রস্তাব দিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে আশা রাজি। কিন্তু বাঁধা দেয় সেলিম।

আমি  সিনেমার নায়িকা হলে তোমার সমস্যা কি?

আমি এই পরিচালক লোকটাকে চিনি। ও লোকটার তোমাকে নায়িকা বানানোর ক্ষমতা নেই।

তোমাকে কে বললো?

আমি বলছি। শোনো লোকটার কাজই হলো যাত্রা প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে নায়িকা হওয়ার মতো মেয়েদের কাছে প্রস্তাব দেওয়া। প্রস্তাব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রার নায়িকারা রাজি হয়ে যায়। কারণ, সবার সামনে উদাহরণ নায়িকা অনজু ঘোষ। অনজু ঘোষও যাত্রায় অভিনয় করতেন। সিনেমার প্রতি সবার আকর্ষণ তীব্র। একবার নায়িকা হতে পারলে পিছনে তাকাতে হবে না। সুতরাং যে রাজি হয়, গোপনে  সেই মেয়েটিকে ঢাকায় নিয়ে যায়। মেয়েটি  ঢাকায় তিন থেকে চারমাস পরে ফিরে আসে।

ফিরে আসে?

হ্যাঁ ফিরে আসে শরীরের সবটুকু সুষমা হারিয়ে। সিনেমার নামে মেয়ে শিকার করা ওদের পুরোনো  কৌশল। একটা গ্রুপই আছে…।

আর শুনতে চাই না, আশার আশা নিভে যায়।

দুপুরের রান্নাটাও হয়েছে চমৎকার। রাবেয়ার মা রান্না করেছে। বাইলা মাছের সঙ্গে গোল আলুর ঝোল। মুুরগির মাংস আর আমের আচার। অনেকদিন পরে তৃপ্তির সঙ্গে ঘরের রান্না খেয়েছে। গান শুনতে শুনতে চোখের উপর ঘুমের ভার নেমে আসছে। কেবল চোখ বন্ধ করেছে দরজায় খটখট শব্দ। কে এলো? খোন্দকার?

ঘুম চলে যায়। আড়মোড়া ভেঙে বসে আশালতা। নিশ্চয়ই  খোন্দকার এসেছে গোঁফে ঘি মেখে। আর কত সহ্য করবে?

রাবেয়ার মা যায় দরজা খুলতে। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। ঘরের দরজায়  ছায়া পড়লে তাকায় আশালতা। তাকিয়েই নির্বাক। জীবনের অভিজ্ঞতায় বুঝে গেছে, আবার নতুন একটা টানেলের মুখোমুখি হতে হচ্ছে ওকে। সামনে দাঁড়িয়ে দুজন নারী। না, একজন নারী আর একজন কন্যা। নারীর চেহারায় একটা সৌম্য দর্শন আছে। ফর্সা মুখ। গোলাকার চোখ। মাথায় ঘোমটা। কানে দুল। মাথায় অনেক চুল। মাঝখান দিয়ে সিঁথি। শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। আর মেয়েটি মায়ের কাছ ধার নিয়ে রূপে মাকে হারিয়ে দেয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। আশালতাকে দেখছে দুইজোড়া চোখ। হাজার হাজার চোখের কামনায় কন্টটিত দৃষ্টির সামনে যে আশালতা শরীর এলিয়ে দিয়ে নেচেছে, গেয়েছে দুর্বার, সেই আশালতা মাত্র দুজন নারীর সামনে পাথরের মতো নিশ্চুপ। কি করবে, কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না।

তুমি আশালতা? বয়স্ক মহিলা জিজ্ঞেস করেন।

অনেকক্ষণ সময় পর নিজেকে ফিরে পায় আশা, কথা বলতে পারে না। ঘাড় নাড়ে মাত্র। মুখের ভেতরটা শুষ্ক।

আমাকে চিনেছ?

আশা একবার চোখ তুলে দেখে মা ও মেয়েকে। আবার চোখ নামিয়ে নেয়।

আমি জালালউদ্দিন খোন্দকারের স্ত্রী, হেলেনা খানম। আমার পাশে যাকে দেখছো, আমার মেয়ে সিমলা। সিমলা খোন্দকার। আমাদের একমাত্র মেয়ে। ভানডারিয়া কলেজে ফাস্ট ইয়ারে পড়ে।

আশালতা দাঁড়িয়েই থাকে। ঘামছে। জীবনে রঙ্গেমঞ্চে অভাবনীয় নাটকীয় দৃশ্যের সামনে পড়েছে কত, কখনও এমন বিব্রত এমন লাঞ্ছনাপীড়িত সময়ের মুখোমুখি হতে হয়নি। ভেতরের মানুষটি খুব চাইছে হেলেনা খানমের দিকে এগিয়ে যেতে। পায়ের উপর সম্মান নিবেদেন করে জানাতে, আমি নির্দোষ। আমি আপনার সংসারের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইনি…।

আশালতার ভাবনাকে স্তব্ধ করে এগিয়ে আসে হেলেনা খানম। ধরে হাত, চলো।

কোথায়? শরীরটা শরীরের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। কোথাও কোনো ভূমিকম্প নেই কিন্তু আশালতার শরীর কাঁপছে।

কোথায় আবার? আমার সংসারে যাবে। এই অঞ্চলে খোন্দকার বাড়ির আলাদা সুনাম আর গৌরব আছে। আমার শ^শুর আজ থেকে বিশ বছর আগে সেই গৌরবের দায় আমার কাঁধে দিয়ে গেছেন। ঝগড়া মারামারি যা করা দরকার বাড়িতে গিয়ে করব। ভাড়া বাড়িতে খোন্দাকার বাড়ির বৌ থাকতে পারে না। চলো, হেলেনা তাকায় সিমলার দিকে, সিমলা ওকে ধর…।

সিমলা এগিয়ে আসতে শুরু করে। আশালতা দুহাতে জড়িয়ে ধরে হেলেনা খানমের পা-জোড়া, দিদি আমারে জোর করে এনেছে। আমি কিছুই জানি না। আমাকে আপনি ক্ষমা করুন…

আমি সব জানি আশা! আমি সব জানি! হেলেনা খানমের গলায় এমন অভয় আর আশ্রয়ের সুর ছিল যে, ঝর ঝর  কেঁদে ফেলে আশালতা।

ওকে টেনে তোলো সিমলা। হাসে। চোখে চোখ রাখে, অ্যই আশা তুমি কাঁদছো কেন? শোনো আজ থেকে তুমি আমার ছোট মা। আমি কেনোদিন যাত্রা দেখিনি। বাড়িতে গিয়ে আমাকে যাত্রা দেখাবে। দেখাবে তো?

আশালতা হেলেনা খানমের হাত ছেড়ে দিয়ে দুহাতে জড়িয়ে ধরে সিমলাকে, দেখাব। দেখাব। হাজার বার দেখাব..তুমি যতবার চাইবে ততবার দেখাব। মেয়েটার বুকের ভেতরে মুখটা গুঁজে দিয়ে আরও বলে, আমাকে তাড়িয়ে দিও না তোমাদের সংসার থেকে। যতদিন বাঁচি আমাকে এইভাবে রেখে দিও…।

‘দি বৈশাখী অপেরার’ নায়ক সেলিম চৌধুরী ওরফে খবিরউদ্দিন পেয়াদার কি হলো? সেলিম চৌধুরী কি বিয়ে করেছে? খোন্দকার জালালউদ্দিন কি সংসার জীবনে সুখী? আশালতা কতটা মানিয়ে নিতে পেরেছে সংসারে? আমার মতো সবকিছু জানতে ইচ্ছে করছে না আপনাদের? সেটাই আপনাদের জানাতে চাই।

আশালতা দেবী নিজস্ব গুণে খোন্দকারের সংসারের একজন হয়ে গেছে। হেলেনা খানম সংসারের ভার অনেকটাই ছেড়ে দিয়েছে আশালতার উপর। সিমলা অভিনয় শিখছে আশার কাছ থেকে। শিখছে নাচও।  খোন্দকারও খুশি। হেলেনা খানম যে সংসারের প্রতিদ্বন্দ্বীকে এইভাবে গ্রহণ করবে, চিন্তাও করেননি। আশালতা, হেলেন আর সিমলা মিলে নতুন একটা ঘরানা তৈরি করবে, কখনও ভাবেনি। অনেকটা নির্ভার জীবনযাপন করছেন।

আরও তিন বছর পর সিমলা বিএ পাস করেছে। বিয়ের প্রস্তাব আসছে নানা জায়গা থেকে। বিয়ে একটা প্রায় ঠিক হয়ে গিয়েছিল সিমলার। ছেলে দেখতেও সুন্দর। ব্যাংকে বড় পদে চাকরি করে। ছেলে, জাকির হোসেন সিমলাকে দেখে মুগ্ধ। পারলে ওইদিনই বিয়ে করে। কিন্তু জাকিরের বাবা হেমায়েত হোসেন যখন শুনেছে, সিমলার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী আছে এবং সেই স্ত্রী হিন্দুধর্মের। মুসলমান হয়নি। আরও ঘটনা সেই দ্বিতীয় স্ত্রী ছিল যাত্রার নায়িকা, আর বিয়েটা হয়নি।

আরও কয়েকটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। সবই ভালো মোটামুটি। বিয়ের পাত্ররা সিমলাকে দেখে মুগ্ধ। বিয়ে করার জন্যও প্রস্তুত। কিন্তু কেমন করে কানে যায়, আশালতা দেবীর ঘটনা। সব বিয়ে ভেঙে যায়। শেষ পর্যন্ত দি বৈশাখী অপেরার নায়ক সেলিম চৌধুরী ওরফে খবিরউদ্দিন পেয়াদা, জসিমউদ্দিন পেয়াদার পুত্রের সঙ্গে বিয়ে হয় সিমলার। বিয়ের সকল আয়োজন করেছে আশালতা দেবী। নিজের হাতে সাজিয়েছে সিমলাকে। বাসর ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে এসে বসেছে খোন্দকার জালালউদ্দিনের সামনে। খোন্দকার বিছানায় শুয়ে আছেন। বুকের উপর থেকে নিচের দিকে একটা চাদর দিয়ে ঢাকা। দুটো পায়ের একটি পা নেই। আর একটি পা নাড়াতে পারছেন না। প্রায় পুরো শরীর অসাড়। কেবল মাথাটা নাড়াতে পারেন। দু’বছর আগে একটা মারাত্মক দুর্ঘটনায়, এই পরিণতিতে পৌঁছেছেন।

আর হেলেনা খানম হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বছরখানেক আগে মারা গেছেন। পুরো সংসারের ভার আশালতা দেবীর হাতে।

 

লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares