উৎসন্ন সময় : আনোয়ারা সৈয়দ হক

 

উপন্যাস

উৎসন্ন সময়

আনোয়ারা সৈয়দ হক

 

আজ সকাল থেকেই আবার কানে গায়েবি আওয়াজ শুনছে নসু। ঘরের ভেতরে দরজা লাগিয়ে বসে আছে সে। আপন মনে বিড়বিড় করছে। জানালার পর্দা টানা, আর তা এমনভাবে যেন বাইরে থেকে কেউ টের না পায় যে ঘরের ভেতরে কী হচ্ছে।

এরকম বন্ধ দরজার দিকে তাকালে বশিরা খাতুনের বুকের ভেতরে হাতুড়ির ঘাই পড়ে। দম বন্ধ হয়ে আসে। ভয়ে হাতপা সব কুঁকড়ে যায়। দিন কি রাত, তার হিসেব থাকে না। আজও  তিনি বন্ধ দরজায় অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করে হাল ছেড়ে দিয়ে এখন রান্নাঘরে বসে ‘হায় আমার নসুর আবার কি হলো’ বলে বিলাপ করতে লাগলেন।

দুঃখের বিষয় এরকম বিলাপ নসুকে নিয়ে তাকে মাঝে মাঝেই করতে হয়।

বশিরা খাতুনের বয়স পঁয়তাল্লিশ। কানের দু’পাশে চুলে পাক ধরেছে, যদিও তার বয়সি অনেকের চুলে পাক এখনও ধরেনি। সংসার একেকজনকে একেকভাবে প্রতারণা করে। বশিরা খাতুনের আজকাল মনে হয় বুঝি তিনি এই সংসারে শুধু ধোঁকাই খেয়ে চলেছেন। স্বামীর কাছ থেকে ধোঁকা, ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে ধোঁকা, সংসারের কাছ থেকে ধোঁকা। এমন কি বাপের বাড়ি থেকে যেটুকু সম্পত্তি পেলে তার জীবন অনেক সহজ হয়ে আসত, তাও ভাইদের মিষ্টিমুখের কারসাজিতে এতদিন পর্যন্ত কিছুই হয়নি।

কিন্তু এতসব অভিযোগ তিনি কার কাছে করবেন। আর এর প্রতিকারই-বা কি?

বশিরার মাঝে মাঝে এখন মনে পড়ে তার বাপের বাড়ির এক দূর-সম্পর্কের চাচার এরকম মাথা খারাপ ছিল। জীবনে বিয়ে-থাওয়া করেননি। তবে নসুর মতো তিনি ছিলেন না। তার বাতিক ছিল শহরের মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়ানো। কোনো কোনো সময় তিনি শহরের বাইরেও চলে যেতেন। নীরব মানুষ ছিলেন। বেশি কথাবার্তা বলতেন না। লেখাপড়াও বেশিদূর ছিল না। জীবনের প্রতি চাহিদাও তার বেশি ছিল না। একদিন হঠাৎ করে সেই চাচা বাড়ি থেকে যেন উধাও হয়ে গেলেন। তারপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। তার ভাইয়েরা কিছুদিন খোঁজার চেষ্টা করে তারপর হাল ছেড়ে দিলেন।

বশিরা এখনও জানেন না তার সেই চাচা এতদিনও বেঁচে আছেন কী না। তবে তার জন্যে এখন আর কারও মনে আফসোস নেই। আর আফসোস হয়েই-বা লাভ কি। চাচার তো কোনো পিছুটান ছিল না।

এদিকে সাতসকালে মায়ের এরকম বিলাপ করা দেখে ভীষণ রাগ হচ্ছে রোকসানার। আবার যেন সবকিছু ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। এতদিন বেশ চলছিল। নসু ভাইয়া বেশ ভালো ছিল। নসুর মাথা খারাপ হয়েছে আজ বেশ কিছুদিন ধরে। পির, ফকির, পানিপড়া, মাদুলি ক্রমাগত চলেছে। মাত্র গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে একজন কামেল পির এসে তিনদিন ছিলেন। তার সাথে ছিল আরও দু’জন সাগরেদ বা শিষ্য। তারাও এককালে কামেল হবে সাধনার জোরে। এখন শুধু হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঢোলা পাঞ্জাবি পরে, চোখে সুরমা দিয়ে, মাথায় গোল টুপি লাগিয়ে হুজুরের সাথে সাথে ঘুরছে, পরে একদিন তারাই হয়ে উঠবে শক্তিশালী বুজুর্গ। একেকজন কামেল ব্যক্তি। তখন তাদের নুরানি চেহারার জৌলুস দেখে ভক্তিভরে সালাম দেবে মানুষ। এর পেছনে কত যে সাধনা আছে তার আর কোনো খোঁজ পড়বে না।

কামেল পির দু’সপ্তাহ আগে তার শিষ্যসহ তিনদিন ছিলেন। তিনি এসেছিলেন ভারত থেকে। আসলে এসেছিলেন তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব এজতেমায় যোগ দিতে। প্রতিবছরই তিনি আসেন। আর যখন আসেন তখন তার মুরিদদের সাথে একবার করে দেখা করে যান। তাদের  বালা-মুসিবত দূর করার চেষ্টা করেন। যে ক’দিন তারা ছিলেন, সে ক’দিন জোর খাওয়াদাওয়া হয়েছিল। তিনদিনে ছ’খানা মুরগি, ছয় কিলো গরুর গোসত, অজস্র তরিতরকারি, জর্দা, ফিরনি সব খতম করা হলো, রোকসানা তাকিয়ে তাকিয়ে ব্যাজার মুখে সব দেখল। সে ছেলেবেলা থেকে অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে চিন্তাভাবনা করে। মাকে কতবার বলেছে নসু ভাইয়াকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে; কিন্তু একথায় তার মা বা বাবা কেউ কান দেয়নি। বাবাটার ওপরে এজন্যে রাগ হয় রোকসানার। একজন সরকারি কর্মচারী হয়েও কীভাবে ভদ্রলোক আধিভৌতিক, অবাস্তব ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী হয়, অবাস্তবতার শিকড়বাকড় নিজের মনের চারপাশে জড়িয়ে নিয়ে বসে থাকে এটা কিছুতে বুঝতে পারে না রোকসানা। বরং সে  তখন তাকিয়ে দেখেছিল কীভাবে তার বাবা-মা কামেল পীরের আচার-আচরণে মোহাবিষ্টের মতো ঘুরতে লাগল তার পিছু পিছু। সেই তিনদিন দোয়াদরুদ একভাবে পড়া হলো। দোয়া এত জোরে জোরে পড়া হলো যে পির সাহেবের দু’ঠোঁটের কোণে ফেনা জমে উঠল। লোবানের গন্ধে ভারি হয়ে উঠল বাড়ি। সেই মুহূর্তে রোকসানার মনে হয়েছিল তাদের বাড়ির ভেতরে শুধু তারা ক’জন মানুষ মাত্র নয়, আরও অনেকে আছে। এই কামেল পির এবং তার সাগরেদরা ছাড়া আরও অনেকে। তারা যেন এ বাড়িরই অধিবাসী। কিন্তু রোকসানা তাদের চোখে দেখতে পাচ্ছে না। এরকম অনুভূতি কেন হলো তা বলতে পারবে না রোকসানা। দোয়াদরুদ পড়তে পড়তে সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে ‘বন্ধ’ করা হলো বাড়ি। খারাপ জিনের বিধ্বংসী আচার-আচরণের হাত থেকে বাড়ি রক্ষা করার এটা একটা তরিকা। আরও অনেক তরিকা আছে। সেগুলো সেই মুহূর্তে প্রয়োজন হলো না। কারণ তার আগেই বাড়ি বন্ধ করতে গিয়ে পির মাহবুবউল্লাহ জিলানি সাহেব বাড়ির দক্ষিণ পশ্চিম কোণের মাটি খুঁড়ে বের করলেন তিনটে তাবিজ। তাবিজ তিনটে পুরোনো। লালচে তামার মতো তাদের রঙ। জায়গায় জায়গায় ক্ষয়ে গেছে। একটা তাবিজ চ্যাপ্টা বাতাসার মতো। দুটো তাবিজ লম্বা।

তাবিজ তিনটে বাড়ির কর্তা মকবুল হোসেনের চোখের সামনে দুলিয়ে দেখালেন পির মাহবুবউল্লাহ। দেখে তো মকবুল হোসেনের চক্ষুস্থির। মকবুল হোসেন এতদিন কেবল গল্পই শুনতেন। মানুষ মানুষের ক্ষতি করার জন্যে নাকি তাবিজ চালাচালি করে। আর আজ তারই বাড়ির আঙিনা খুঁড়ে তাবিজ বেরোচ্ছে! কা- আর কাকে বলে। দিনকাল কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে। তাবিজ তিনখানা হাতে নিয়ে তিনি বাড়ির ভেতরে ঢুকে সকলকে দেখালেন। তাবিজ দেখে তো রোকসানা হতভম্ব। বশিরা খাতুন কেঁদে উঠলেন। বললেন, হায় আল্লা, আমরা তো কারও কোনোদিন কোনো ক্ষতি করিনি। তাহলে এটা কী হলো , ও নসুর বাবা?

শুধু রোকসানা কেন, হেলাল আর বুলিও দেখল তাবিজগুলো। দেখে তাদের মুখ গম্ভীর হলো। চোখে দেখা দিল ভয়।

মকবুল হোসেন আর বশিরা খাতুন এবার হামলে পড়লেন পিরসাহেবের পায়ের কাছে। ওদের অবস্থা দেখে করুণা করে নিজের জাফরানরঙা দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে ধ্যানে বসে গেলেন পির বাবা। শিষ্য দু’জন একভাবে বাতাস করতে লাগল, কারণ পিরবাবা ফ্যানের বাতাস খান না। এরপর ধ্যান ভাঙলে নসুকে নিয়ে ঘরের ভেতরে একাকী বসলেন তিনি। বসার আগে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে দিলেন। ঘরের ফুটোফাটা সবই ন্যাকড়া দিয়ে বন্ধ করা হলো, কারণ ঘর নিñিদ্র না হওয়া পর্যন্ত খারাপ জিনদের তলব করা যাবে না। নসু কিছুতেই পিরবাবার সাথে একঘরে বসবে না। কিন্তু জোর করে তার মুখে চড় চাপট মেরে বসানো হলো। চোখে একটা উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি নিয়ে নসু পিরবাবার সাথে দক্ষিণের ঘরটাতে গিয়ে বসল। সেই ঘরেই পিরবাবাকে থাকতে দেয়া হয়েছিল। বাড়ির মধ্যে এই ঘরটাই সবচেয়ে ভালো। এরপর বন্ধ দরজার বাইরে থেকে মাঝে মাঝে নসুর চিৎকার শোনা যেতে লাগল, না, না, না!

মকবুল হেসেন আর বশিরা খাতুন পায়চারি করতে লাগলেন বাইরে। দরদর করে ঘাম বেরোতে লাগল দু’জনের শরীর দিয়ে। বাবা মায়ের এরকম অবস্থা দেখে রোকসানার হাত-পা যেন একেবারে ঠান্ডা হয়ে এল। বুলি দৌড়ে পালিয়ে গেল। হেলাল বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় গিয়ে পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকল। সবকিছু দেখে তার ভীষণ খারাপ লাগতে লাগল। তার বাড়িটা একেবারে আর দশটা বাড়ির মতো না। ভাবল হেলাল। আর ঠিক সেই সময় পানের দোকানের মেহেদি তার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলে উঠল, আপনারে আইজ খুব আপসেট দেখত্যাছি ভাইয়া। সিগারেট চলব নাকি?

কথা শেষ করে একাট ফাইভ ফিফটি ফাইভ তার নাকের ডগায় তুলে ধরল মেহেদি। কিন্তু মাথা নেড়ে না বলল হেলাল।

এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে নসুর সঙ্গে একা বসে থেকে কীসব করলেন কামেল পির। এরপর নসু ঘর ছেড়ে বেরোল যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। মা-বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসল যেমন অচেনা মানুষের দিকে তাকিয়ে মানুষ হাসে। তারা হাসি দেখে প্রাণ শুকিয়ে গেল মা-বাবার। রোকসানাকে তো চোখেই দেখল না নসু। গটগট করে হেঁটে বসার ঘরে চলে গেল, তারপর সেদিনকার খবরের কাগজটা টান মেরে টিপয় থেকে তুলে নিয়ে গম্ভীরভাবে পড়তে লাগল।

রোকসানা আশ্চর্য হয়ে গেল তার বড়ভাই মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন হোসেন ওরফে নসুকে দেখে। এ যেন অন্য কোনো নসু।

এরপর আরও দু’দিন ছিলেন কামেল পির। প্রতিদিন একবার করে বসেছিলেন নসুকে নিয়ে। বাকি সময়টা কোরাণ তেলাওয়াত, বিভিন্ন কামেল পির এবং দরবেশদের অলৌকিক সব গল্প, এসবের ফাঁকে ফাঁকে নামাজ, খাওয়াদাওয়া, ঘুম, বিকালে বাগানে বেড়ানো ইত্যাদি করে দিন কাটল তার।

তার ভারতে ফিরে যাবার দিন কামেল পীরের হাতে একটা কাগজের খাম হাতে তুলে দিলেন মকবুল হোসেন। বড় বিনীতভাবে হাতে তুলে দিলেন। যেন এমন অকিঞ্চিৎকর কিছু এরকম একজন মানুষের হাতে তুলে দিতে তার সংকোচ হচ্ছে। তার সঙ্গে আসা শিষ্যদের জন্যে দিলেন নতুন পাজামা পাঞ্জাবি, গামছা, টুপি ইত্যাদি।

পির সাহেব চলে যাবার পরেও নসু যেন একেবারে মাটির মানুষ। জিনিস ভাঙাভাঙি নেই, চেঁচানো নেই, বিড়বিড়ানি নেই, আপন মনে হাসাহাসি নেই। একেবারে যেন সব চুপচাপ। এবার মন করে খাতাপত্রবই হাতে নিয়ে বসলেই হলো। সেই তিনবছর আগে এইচএসসি পড়তে পড়তে, খুব মন দিয়ে পড়তে পড়তে  হঠাৎ করে একদিন নসু হো হো করে হেসে উঠেছিল এবং তারপর তিন মাসের জন্যে একেবারে চুপ। বাড়ির কারও সাথে কথা বলে না, কলেজে যায় না, গোসল করে না, আগে গোসলে ঢুকে নসু কত গান গাইত সিনেমার, সেসব একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। এমনকি মনে না করিয়ে দিলে নসু ভোরে উঠে দাঁতও মাজত না। যেন একটা ছবির অ্যালবাম থেকে কে যেন একটা একটা করে ছবি খুলে ফেলে দিতে লাগল বাইরে। আর তারা  বাতাসে উড়ে উড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। খালি হয়ে গেল অ্যালবাম। শুধু যেন শূন্য পাতার ওপরে লেগে থাকল কিছু আঁঠা, সেই  স্মৃতি মনে করে যে এখানে একদিন নসু বলে একটি প্রাণবন্ত ছেলের ছবি লাগানো ছিল। অনেকগুলো ছবি।

তিন মাস পর থেকে থেকে শুরু হলো  নসুর আপন মনে বিড়বিড় করে কথা বলা। ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে ভেতরে চুপচাপ বসে থাকা। কখনওবা জানালার পর্দা গোপনে সরিয়ে দৃষ্টি তীক্ষè করে বাইরের দিকে উঁকি মেরে দেখা। কারও চোখে চোখ পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে সাঁৎ করে সরে যাওয়া। সবই যেন একটা গোয়েন্দগিরির মতো।  তবু এটাও সহ্য করা যায়। কিন্তু মাঝে মাঝে নসু এমন সব গালাগালি আর ভাঙচুর শুরু করে যে তখন চুপ করে থাকা বড় কঠিন হয়ে পড়ে। অদৃশ্য কোনো শত্রুকে সে শাসায় হাতে লাঠি উঁচিয়ে। মুখ খিস্তি করে। সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে রোকসানার, তার ভাই নসু যখন মুখ খিস্তি করে। এতরকমের মুখ খিস্তি সে শিখল কীভাবে? রোকসানাকে একদিন সে বলে বসল, অ্যাই খানকি মাগি, আমার ঘরের ভেতরে উঁকি মেরে দেখিস কি?

নসুর অভিযোগ সত্যি ছিল, কারণ মায়ের পরামর্শে রোকসানা নসুর ঘরের ভেতরে উঁকি মেরে দেখেছিল সে কী করছে সকাল থেকে ঘরে বসে। কারণ কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। তার ওপর সেদিন সকাল থেকে সে কিছুই খায়নি। বশিরা খাতুনের দোষ এই যে তার ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো না খেলে খুব অস্থির হয়ে যান। তাই মায়ের অনুরোধেই রোকসানা জানালার ফাঁক দিয়ে তার ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়েছিল। যা দেখেছিল তাতে অবাক হবার মতো কিছু ছিল না। দেখেছিল ঘরের মেঝেয় নসু চুপ করে বসে ছাদের সিলিঙের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু সিলিঙের দিকে তাকিয়ে থাকলেও নসুর চকিত চোখ মেলে দেখে ফেলেছিল রোকসানার উঁকি দেয়া। ব্যস, তারপর আর যায় কোথায়। ঘরের দরজা খুলে তেড়ে এসেছিল সে রোকসানার দিকে। তাকে মারবে। আর সেইসময় মুখ খিস্তি। রোকসানা ভাইয়ের ব্যবহারে রাগ করার চেয়ে অবাক হয়েছিল খুব বেশি। যে ভাইটিকে সে মনে করত পৃথিবীর খারাপ কোনো শব্দ  জানে না, পৃথিবীর খারাপ কোনো মানুষের সাথে জীবনে মেশে না, সেই ভাইয়ের মুখ দিয়ে বেরোনো গালি শুনে তার মনে হয়েছিল তাহলে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ মুখ খিস্তি করতে পারে। পৃথিবীর সব সুশীল মানুষই মুখ খিস্তি করার যত রকমের বিশেষণ আছে, তা তাদের মুখস্থ হয়ে মাথার ভেতরে জমা হয়ে থাকে! জন্মের পরপরই জমা হয়ে থাকে। শুধু বাইরের কঠিন শাসন সেই খারাপ শব্দগুলো লুকিয়ে রাখে মনের গহিন কোনো কোণে। যে-কোন মুহূর্তে মনের আগল ঢিলে হয়ে গেলেই তারা বেরিয়ে পড়ে!

সেই থেকে সমাজের সব ভালো মানুষদের প্রতি রোকসানার এক ধরনের কৌতূহলী দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হয়েছে। যাকে সমাজ ভালো বলে সে কি সত্যি সত্যি ভালো? সে কি আগাপাছতলা ভালো? নাকি সেও ব্যক্তিগত জীবনে অনেক আবর্জনা ছিঁটিয়ে চলে তার চারপাশে?

রোকসানা বুঝতে পারে মানুষের প্রতি এই ধরনের মনোভাব খুব খারাপ, এসব সুস্থমনের চিন্তা ভাবনা নয়, কিন্তু একবার যা ভেবে ফেলেছে, তাকে সে অস্বীকার করবে কী ভাবে?

তো জিনের আছর হবার পর থেকে একভাবে নসুর ধর্মীয় চিকিৎসা চলছে। কারণ এই দুনিয়াতে আল্লা যেমন মানুষ তৈরি করেছেন তার পাশাপাশি জিনও তৈরি করেছেন মানুষের জীবনে অশান্তি ডেকে আনার জন্যে। জিনেরা মানুষদের প্রতি ক্ষিপ্ত, কারণ আল্লা মানুষের আগে তাদের আগুন থেকে সৃষ্টি করার পরেও  নিজের সৃষ্টিতে সন্তুষ্ট না হয়ে মানুষ তৈরি করেছেন। সেই মানুষ হলো মাটি দিয়ে তৈরি। কোথায় মাটি আর কোথায় আগুন। জিন মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব মানবে কেন? তাই নসুর মতো ভালো একটা ছেলেকে নষ্ট করতে পারলে তো জিনের লাভ! একথা বিশ্বাস করেই নসুর বাবা-মা ক্রমাগত সেই জিনের আছর থেকে নসুকে বাঁচাবার জন্যে বিভিন্ন পির ফকিরের কাছে দৌড়োদৌড়ি শুরু করেছেন।

কিন্তু  এবারে দু’সপ্তাহও গত হতে পারল না, নসু আবার ঘরের দরজা বন্ধ করে বসেছে।

রোকসানার কাছে সমস্ত ব্যাপারটা যেন মনে হয় সেই গ্রিক মিথোলজির সিসিফাসের পাথর তোলার মতো।  পাহাড়ের মাথায় সারাদিন পরিশ্রম করে পাথর তোলে আবার পরদিন সে পাথর গড়িয়ে পড়ে যায়। আবার তোলে আবার গড়িয়ে পড়ে যায়। সারা জীবন এভাবেই চলছে। তবু থামতে পারে না। কারণ দেবতার নির্দেশ অমান্য করা যাবে না। করলেই মহাবিপদ।

রোকসানার বুকের ভেতরে এখন অদ্ভুত এক কষ্ট হতে লাগল। কষ্টটা তার বড়ভাই নাসিরউল্লা নসুর জন্যে।

 

২.

মিথুনকে দেখেও রোকসানা না দেখার ভান করল প্রথমে। এই কোচিং সেন্টারে মিথুন অংক কষায়। নিজে পড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং। বুয়েটের থার্ড ইয়ারের ছাত্র। মিথুন আজ ক্লাস নিতে শুরু করেছিল। রোকসানা তার ক্লাসের সামনে দিয়ে অচেনার মতো ঘুরে গেল একবার। এই ক্লাসটা সে করবে না আজ। মিথুনকে বোঝানো দরকার যে তাকে না হলেও রোকসানার চলবে। সে ঠিকই  বিশ^বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করবে। এবং ভালো মাকর্স নিয়ে।

ঘুরতে গিয়ে করিডরে দেখা হলো  নিমির সাথে। নিমির গালের দু’পাশে দুটো লজেন্স। গাল ফুলে টেনিসবলের মতো হয়েছে। রোকসানাকে দেখে নিমি হাসতে গেল যেই ওমনি টুপ করে একটা লজেন্স গাল থেকে বেরিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। পা দিয়ে দ্রুত সেটা সরিয়ে ফেলে নিমি বলল, কীরে, মিথুন স্যারের ক্লাস করবিনে আজ? রোকসানা বলল, না ঃ।

কেন?

ভাল্ লাগছে না।

মন খারাপ?

হ্যাঁ।

কীসের জন্যে?

নসু ভাইয়ার জন্যে। তার অবস্থা খুব খারাপ।

কথাটা মিথ্যে বলল রোকসানা। আদতে নসুর কথাটা তুলতেই চায়নি সে। এটুকু সে বোঝে মানুষ শারীরিক অসুস্থতার প্রতি যতখানি সহানভূতি দেখায়, মানসিক অসুস্থতা ততটাই হাসিঠাট্টার বিষয়। এটাকে বিশেষ আমল দিতে চায় না কেউ। কিন্তু এই অসুখ যাদের বাড়িতে হয়, হায় আল্লা, যাদের বাড়িতে এই অসুখের লক্ষণ দেখা যায়, তাদের বাড়ির দিনরাত একেবারে যেন এক হয়ে যায়। দুঃখের নদী ছল ছল করে বয়ে যায় সংসার দিয়ে। বাইরের মানুষ তার কোনো খোঁজ পায় না। দিবারত্রি সে বাড়িতে অশ্রুপাত ঘটে,  নীরব অশ্রুপাত। কে তার সন্ধান রাখে?

মুখ ফসকে নিমিকে কথাটা বলে যেন বিপাকে পড়ে গেল সে। নিমির মোটাসোটা শরীরের গোলগাল মুখটা বিস্মিত হয়ে উঠল। সেইসাথে কৌতূহলীও। একটু থেমে কী যেন ভেবে নিমি জিজ্ঞেস করল, নসুর অবস্থা খারাপ? কেন রে, কী হয়েছে?

কিছু চিন্তা না করেই এবার রোকসানা বলে উঠল, পেট খারাপ।

পেট খারাপ?

হ্যাঁ।

লবণপানি খাওয়াচ্ছিস নে?

খুব!

তারপরও খারাপ?

হ্যাঁ। নিমির সাথে এভাবে নসুকে নিয়ে কথা বলতে বাজে লাগছে রোকসানার। কিন্তু এখন আর উপায় নেই। মিথ্যে ডায়ালগ একবার শুরু হলে তার আর শেষ নেই!

তাহলে নসু ভাইয়াকে কলেরা স্যালাইন দে। ভালো হয়ে উঠবে। আমার বোনের হয়েছিল। রুচিরা। গতবছর। কলেরা স্যালাইন দিতেই ভাল হয়ে উঠল। তবে মহাখালির ডায়েরা হাসপাতালে নিবিনে। সেখানে মলের ভাণ্ড হিসাবে প্লাস্টিকের বালতি ব্যবহার করে। একেকজন ডায়েরিয়া রোগীর বিছানার পাশে বালতি রাখা আছে। লাল, হলুদ, সবুজ রঙের বালতি। পাশাপাশি সব বেড। আর সেই বালতি ভর্তি হয়ে আছে মানুষের পায়খানা দিয়ে। দেখে আমি ফিট হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ঠিকমতো পড়তেও পারিনি! কারণ কোথায় পড়ব? যেখানে পড়ব সেই মেঝের ওপরেই তো মানুষের তরল মল এদিক সেদিক পড়ে আছে! কত আর পরিষ্কার করবে তারা বল্? তৃতীয় বিশ্বের হাসপাতাল-এর চেয়ে আর পরিষ্কার রাখা যাবে না, বুঝলি।

নিমির কথায় হাসবে না ভাবতে ভাবতেও হেসে ফেলল রোকসানা। বলল, বুঝলাম। হয়ত তোর কথা ঠিক। হয়ত কলেরা স্যালাইন দিতে হবে। জোগাড় করে বাড়িতে এনেও দেয়া যাবে।

হ্যাঁ, তাই কর।

দেখি।

নসুর ব্যাপারে এতসব মিথ্যে বলতে ইচ্ছে করছিল না রোকসানার। কিন্তু এখন তো আর ফেরার উপায় নেই। বরং এত সুন্দর করে মিথ্যে বলতে পারার জন্যে গোপনে নিজের পিঠ চাপড়াল রোকসানা। আসলে মানুষ ইচ্ছে করলে কী না পারে!

নিমি কমার্স ক্যান্ডিডেট। সুতরাং তার অঙ্ক কোচিং আলাদা। একটু পরে নিমি চলে গেলে রোকসানা পায়ে পায়ে ক্লাসে গিয়ে ঢুকল। বসল একেবারে শেষের বেঞ্চিতে। মন অস্থির। তিনচার দিন আগে মিথুনের সঙ্গে রিকশা করে গোপনে মৌচাকে যাবার সময় তাদের ঝগড়া হয়েছে। এরপর থেকে মিথুন তাকে আর বাসায় ফোন করেনি। সে ও না। একবার ভেবেছিল এই কোচিং সেন্টারটা ছেড়েই দেবে সে। কিন্তু এখানে ভর্তি হবার সময় একগাদা পয়সা জমা দিয়ে ফেলেছে। বাবা তার চাকরিজীবী। মেয়ের খেয়ালের জন্যে এভাবে পয়সা নষ্ট করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তার ওপর হেলালকেও কোচিং-এ পাঠাতে হয়। বুলির জন্যে বাড়িতে টিচার আসে। বুলি ছেলেবেলা থেকে অংকে কাঁচা।

নসুর তিন বছর আগে এইচএসসি পরীক্ষা দেবার কথা ছিল। কিন্তু দিতে পারেনি। এবারও পারবে না। রোকসানার দৃঢ়বিশ্বাস নসু ভাইয়া আর কোনোদিন পরীক্ষা দিতে পারবে না। কিন্তু এই বিশ্বাসটা সে মনে মনে রেখেছে কারণ তার মা বশিরা খাতুন এখনও আশা করে যে নসু ভালো হয়ে যাবে। নসু আবার বই-খাতা বগলে ধরে নটরডেমে ক্লাস করতে যাবে। নসু আবার এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারবে।

মায়ের স্বপ্নে ব্যাঘাত করতে রোকসানার মন চায় না। নসু তার চেয়ে তিন  বছরের বড়। তবু তারা দুজনে বন্ধুর মতো ছিল। নসুর বুদ্ধি ছিল খুব। ছেলেবেলায় দুজনে একসাথে কত খেলা খেলেছে। এইচএসসি পরীক্ষা দেবার আগেই নসুর ভেতরে দেখা দিল এক পরিবর্তন। লেখাপড়ায় অমনোযোগ। যে নসু অংকে বরাবর ফার্স্ট হত, সে নসু সেবার ফার্স্টইয়ারের ক্লাস পরীক্ষায় করল ফেল। আর নসুর পরীক্ষার রেজাল্ট দেখে বশিরার সে কী বুক ফাটা কান্না। মায়ের কান্না দেখে রোকসানার তখন মনে হয়েছিল বাঙালি মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের ভেতরেই যেন বেঁচে থাকে। তাদের নিজস্ব আর কোনো অস্তিত্ব বুঝি নেই। মায়ের সেই কান্না রোকসানার বুকের ভেতরে একেবারে যেন গেঁথে  আছে। এখনও ভাবলে তার বুক টসটস করে।

রোকসানার বুকের ভেতরে অনেক দুঃখের পানি জমে আছে।

শেষ বেঞ্চিতে বসে আপন মনে তাকিয়ে দেখছিল রোকসানা মিথুনকে। সারা ব্ল্যাকবোর্ড জুড়ে অংক কষেছে মিথুন। এটাকে আর ব্ল্যাকবোর্ড বলা চলে না। কারণ এই বোর্ডের রঙ ধবধবে শাদা। এর গায়ে লেখার কালি হলো  কুচকুচে কালো। আগের যুগে ছিল কালো ব্ল্যাকবোর্ড আর শাদা চকখড়ি। এখন ঠিক তার উল্টো। তরল কালি বেরোয় এই ‘চকখড়ি’র ভেতর দিয়ে। আগে মানুষ কালোর ভেতরে শাদা দিয়ে নিজেদের জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতো। আর এখন যেন শুভ্রতার ভেতর দিয়ে মানুষের অমানিশার দিকে যাত্রা। কথাটা মনে ভেবে রোকসানা চমকিত হলো। কিন্তু অংকের দিকে মন ছিল না তার। সে তাকিয়ে দেখছিল মিথুনকে। এখন পর্যন্ত মিথুনের চেহারাটা যে কেমন সে স্থির করে উঠতে পারেনি। কখনও মনে হয় মিথুন দেখতে খুব সুন্দর। কখনও মনে হয় দেখতে খুব বাজে। আসলে চোখ বুজে কখনও মিথুনের চেহারা সে মনে করতে চাইলে করতে পারে না। কেমন যেন মুখটা এঁকেবেঁকে ভাঙচুর হয়ে যায়। অথচ এমন হওয়া উচিত ছিল না। কারণ মিথুনকে তো সে কমদিন ধরে দেখছে না। প্রায় ছ’মাস ধরে মিথুনের সাথে তার বিশেষ একটা সম্পর্ক তৈরি হবার সম্ভাবনা হয়েছে! আগে মিথুনের সাথে রিকশায় বসলে তার মনের ভেতরে কিছু হত না। কিন্তু এখন হয়!

একবার জোর বৃষ্টির ভেতরে সে আর মিথুন পড়ে গেল। সারা ঢাকা শহর পানিতে সয়লাব। আর সেই সাথে শীত। শীতে দাঁত ঠোকাঠুকি শুরু হয়ে গেল রোকসানার। রিকশা পাওয়া যায় না। সময়টা আবার সন্ধে। মৌচাকে একটা দুটো দোকানে ভিজে আলো জ্বলে উঠেছে। সেই সময় অনেক অনুরোধ করে একটা রিকশা জোগাড় করেছিল মিথুন। সেই রিকশায় দু’জনে জড়াজড়ি করে বসেছিল। না, সহোদরের মতো নয়। নতুন পৃথিবীর প্রেমিক প্রেমিকার মতো! মিথুনের ভেজা শরীর থেকে এমন একটা গন্ধ বেরোচ্ছিল যাকে পুরুষালি গন্ধ বলা যায়, যে গন্ধের সাথে রোকসানার আগে কোনোদিন পরিচয় ঘটেনি।

তো সেই থেকে রোকসানার দিনগুলো কেমন  যেন ওলটপালট হয়ে গেল। ওলট আর পালট। পালট আর ওলট। এ এক অদ্ভুত অবস্থা। খেয়ে বসে ঘুমিয়ে কিছুতে শান্তি নেই। বুকের ভেতরে অচেনা এক হাহাকার। রোকসানা তো এ পর্যন্ত জীবনে কিছু হারায়নি, তবু তার বুকে এত হাহাকার কোত্থেকে এল? এই অবস্থার নাম কি? একে মানুষ কী বলে? এখন আমার উপায় হবে কি। এইসব হাবিজাবি চিন্তায় রোকসানার মন আবোলতাবোল হয়ে গেল।  কিন্তু ওদিকে মিথুন একেবারে চুপ। সে এরপর থেকে রোকসানাকে দেখলে এমন একটা ভাব করতে লাগল যেন রোকসানা তার আর দশজন ছাত্রীর মতো। যেন সে সাকিনা, রাতুল, রেহানা, নাইমা বা দিলোয়ারা। কিন্তু রোকসানাতো ভুলতে পারেনি। বৃষ্টির অবিশ্রান্ত ধারার ভেতরে তার দিকে মিথুনের ফিরে ফিরে তাকানো তো রোকসানা ভুলতে পারেনি। কীভাবে ভুলবে? পুরুষের চোখ দেখলেই তো মেয়েরা বুঝতে পারে। সেই বিশেষ কথাটা মিথুন এখন পর্যন্ত না বললেও রোকসানা জানে যে, কোনোদিন মিথুন তাকে কথাটা বলবে, আমি তোমাকে ভালোবাসি রুক্সি!

কিন্তু এই ধারণাটা কি রোকসানার মন গড়া নয়, বা তার উইশফুল থিংকিং? রোকসানা মন থেকে চায় মিথুন তাকে ভালোবাসুক। কারণ সে মিথুনকে ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু মিথুনের ভাবভঙ্গি রোকসানার কাছে মনে হয় যেন রহস্যময়। যখন তার দিকে তাকায় তখন রোকসানা খেয়াল করে দেখেছে মিথুন তার চোখের দিকে সরাসরি তাকায় না। তাকায় তার চোখ ছাড়িয়ে একটু দূরে। এরকম তাকানোর মানে কি, রোকসানা বুঝে পায় না। রোকসানার কাছে সবকিছু সরাসরি, ডাইরেক্ট। কোনো রকম ভণিতা ছাড়া রোকসানা মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখতে ভালোবাসে। কিন্তু মিথুনের মনের ভেতরে যেন ভণিতার রঙিন কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে কে।

মিথুন তাকে সবসময়য় পুরোনাম ধরেই ডাকে, রোকসানা। যদিও রোকসানা তাকে অনেকবার করে বলেছে তাকে বাড়ির সকলে  রুক্সি বলে ডাকে। বন্ধুরাও তাই। কিন্তু মিথুন তবু তাকে রুক্সি বলে ডাকে না। আর কখনও তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেও কথা বলে না। অথচ অন্য সকলের সাথে তার বাঘের মতো ব্যবহার। যেসব মানুষ নিজের সম্পর্কে খুব আস্থাশীল হয় তাদের ভেতরে কি রোখ বেশি হয়, কে জানে? রোকসানা ভাবে। রোকসানা শুনেছে,  যে হিটলার মানুষ হত্যা করে দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছিল, সেও তার প্রেমিকাকে ভীষণ ভালোবাসত। তার বেড়ালটার কিছু হলে ঘাবড়ে যেত খুব। তাহলে এক মানুষের ভেতরে কি একই সাথে দ্বৈতসত্তার অবস্থান হতে পারে? কে জানে। রোকসানা আজকাল শুধু এইসব হাবিজাবি ভাবে। আবার ভাবে একদিন সেও নসুর মতো পাগল হয়ে যাবে না তো? কথাটা ভেবে বুক কেঁপে ওঠে রোকসানার। দম বন্ধ হয়ে আসে। দুনিয়াটা যেন চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসে।

হায়, রোকসানাও পাগল হয়ে গেলে তার মা বাবার কী হবে?

এই কোচিং সেন্টারে আসার পর থেকেই রোকসানা মিথুনকে চেনে। মিথুন নটরডেম কলেজ থেকেই আইএস সি পাশ করে বুয়েটে এখন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। থার্ড ইয়ার। তবু সে বেশ কিছুটা সময় এই কোচিং এ সেন্টারে ব্যয় করে। হয়ত এভাবেই সে তার পড়ার খরচ চালায়, কে জানে। এখানে অনেক তরুণ ছেলেরা কোচিং পড়ায়। ডাক্তারি পড়ে এমন একটি ছেলে, যার নাম সুধীর সে বায়োলজি পড়ায়। রোকসানাকে সুধীর খুব পছন্দ করে। কিন্তু সেই পছন্দের ভেতরে ভাতৃসুলভ নিষ্পাপতা অনুভব করে রোকসানা। রোকসানার ইচ্ছে সে ডাক্তারিতে ভর্তি হবে। আর সে জন্যে সে মন দিয়ে বায়োলজি পড়ছে। এবং সুধীরও তাকে যতœ করে পড়ায়। কোচিংয়ের বাইরেও সুধীর তাকে অনেক কিছু বুঝতে সাহায্য করে।

কিন্তু যদি সে কোনো কারণে ডাক্তারিতে ভর্তি হতে না পারে তাহলে যেন ইঞ্জিনিয়ারিংটা হাতছাড়া না হয়, এই ইচ্ছে আছে রোকসানার মনে। কিন্তু এ কথা সে সুধীর স্যারকে বলতে পারে না ভয়ে। সে জানে সুধীর স্যার চোখ বুজে বসে আছে একথা ভেবে যে সে বাংলাদেশের যে কোনো সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পারবে অ্যাডমিশন টেস্ট দিয়ে।  তবে এ সবই নির্ভর করছে পরিবেশ এবং পরিস্থিতির ওপরে।

এই কোচিং সেন্টারে ভর্তি হতে পেরে রোকসানা খুশি। এখানে তরুণ শিক্ষকরাই বেশি। যদিও বয়স্ক দু’চারজনকে দেখা যায় এখনও ছাত্র পড়াতে। এটাকে  রীতিমতো একটা নাইট কলেজ বলা যায়। রোকসানার সাথে সব টিচারের ভালো সম্পর্ক আছে।

তবে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক তার সুধীর স্যারের সাথে।

সুধীর মাঝে মাঝে তার পকেট থেকে চকোলেট বের করে রোকসানার হাতে দেয়। বলে, ক্যাডবেরি। আমার দিদি দিল্লি থেকে পাঠিয়েছে। খেয়ে দ্যাখ।

তো সুধীরের চোখের সামনেই রোকসানা ক্যাডবেরির রাংতা মোড়ানো কাগজ খুলে খায়। আর সুধীর বড় তৃপ্তির সাথে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। বলে, আমার ছোট বোনটা, বুঝলি, গতবছর ডেঙ্গু জ¦রে তিনদিনের ভেতরে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। ও খুব চকোলেট ভালোবাসত। দাঁতগুলো পোকায় খেয়ে গিয়েছিল বলে কত যে বকা খেত মায়ের কাছে।

রোকসানা বুঝতে পারে সুধীর স্যার কীভাবে যেন রোকসানার সাথে তার বোনের মিল খুঁজে পেয়েছে। আর তাই তার এত খাতির। নইলে অন্য কোনো মেয়ে হলে তাকে উঠতে বসতে সুধীর স্যারের বকা খেতে হত।

রোকসানার আজকাল মনে হয় আসলে দেশ থেকে স্কুল কলেজ সব তুলে দেয়া উচিত! থাকবে শুধু কোচিং সেন্টার। সেখানে পড়ানো হবে ছেলেমেয়েদের ছোট ছোট গ্রুপ করে। তরুণ হবে শিক্ষকগুলো। হ্যাঁ, মেয়ে শিক্ষকও থাকবে। তারা সকলে একজন বা  দুজন ছাড়া আর সবাই তরুণ হবে। তরুণ হবে কেন? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই রোকসানার মনে। রোকসানা তার জীবন মামার কাছে শুনেছে যে বিশাল বিশাল ক্লাসের চেয়ে ছোট ছোট গ্রুপে লেখাপড়া ভালো হয়। শিক্ষা দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলে। তরুণ টিচার এক কথা বারবার বলতে পরিশ্রান্ত হয় না। বুড়ো টিচারদের মতো হাতে লাঠি নিয়ে দৌড়োয় না!  স্কুল আর কলেজ বন্ধ করে দিয়ে এই পদ্ধতিতে দেশের শিক্ষা চললে অতি দ্রুত গতিতে দেশ শিক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে!

কিন্তু রোকসানার কথা কে শোনে। এমন কি নিমিও তার কথা শুনে ঠোঁট বাঁকায়। বলে, বোগাস।

ক্লাস শেষ হয়েছে। ছেলেমেয়েরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে হৈ চৈ করছে। রোকসানা ক্লাসে বসেই থাকল। ফাঁকা ক্লাস দিয়ে হেঁটে যাবার সময় মিথুন একবারও তার দিকে তাকাল না।

রোকসানা স্তব্ধ হয়ে বসে থাকল।

 

৩.

কোচিং সেন্টার থেকে বেরিয়ে এল রোকসানা। তার সাথে নিমি। এখন বিকেল। নিমির মুখে এখন চকোলেট। হিসেব করলে সারাদিনে একশোটা চকোলেট আর লজেন্স খায় নিমি। রোকসানার মনে হয় মিষ্টিতে নিমির অ্যাডিকশন হয়েছে। আচ্ছা মিষ্টিতে কি মানুষের অ্যাডিকশন হয়? রোকসানা ভাবল। ভেবে চিন্তিত মুখে নিমির দিকে তাকাল।

দুজনে একটা রিকশায় গা ঘেঁষে বসলে  নিমি হেসে উঠল। বলল, আমিই তো রিকশার তিনভাগ জুড়ে আছি, তোর এখানে কীভাবে জায়গা হবে? তার কথা শুনে হেসে উঠল রোকসানা। নিমি সবসময় সকলকে নিয়ে মজার কথা বলে। নিজেকে নিয়েও বলে। রোকসানা মুখ ফিরিয়ে নিমিকে দেখতে লাগল। ওরা এখন এখান থেকে বিজয়নগর যাবে। নিমি বইয়ের ব্যাগ কোলের ওপর রেখে রোকসানার দিকে ফিরে বলল, আমার দিকে তাকিয়ে দেখছিস কি?

উত্তরে রোকসানা বন্ধুর দিকে তাকিয়ে সমবেদনার স্বরে বলল, এত মিষ্টি খাস কেন রে নিমি, দাঁত সব নষ্ট হয়ে যাবে।

রোকসানার সাবধানবাণী কাঁধ ঝাঁকিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে নিমি বলল, দাঁত নষ্ট হবে, ডায়াবেটিস হবে, হার্ট অ্যাটাক হবে, এইসব রাতদিন শুনছি। অথচ তুই দাঁতের ডাক্তারখানায় গিয়ে দ্যাখ যাদের দাঁতের সমস্যা তারা কোনোদিন মিষ্টি খেতে ভালোবাসে না। ডায়াবেটিস রোগীরা অনেকেই মিষ্টি খায়নি কোনোদিন, তবু ডায়াবেটিস হয়েছে। আমার ধারণা কি জানিস, যার যা অসুখ হবার তা হবেই। মোটা হলেও হবে, রোগা হলেও হবে। আমার একটা মামা ছিল যাকে আমরা শুকনো মামা বলে ডাকতাম, তার ডায়াবেটিসও ছিল আবার ক্যান্সারও ছিল। মৃত্যুর আগে সে কি কম কষ্ট পেয়েছে, ভাই?

কথা বলে হিহি করে হেসে উঠল নিমি। এরকম একটা দুঃখের কথার ভেতরে হাসির কথা কি হলো  ভেবে অবাক হলো  রোকসানা। সত্যি নিমিটার মাথা খারাপ। ভাবল সে।

বিজয় নগরে যাবার আগে রিকশা একটা গলির মধ্যে মোড় নিল। রোকসানা সচকিত হয়ে বলে উঠল, এই রিকশা সোজা চল।

নিমি তৎক্ষণাৎ হাত উঠিয়ে বলল, না, না, ঠিক আছে। রিকশা ঠিক চলছে। ওকে আমি এই পথ দিয়ে যেতে বলেছি।

কেন? বিস্মিত হয়ে বলল রোকসানা।

ওর দিকে মুখ ফিরিয়ে নিমি বলল, আজ একজায়গায় তোকে নিয়ে যাবো।

কোথায়?

কাজলের বাড়ি।

সে কি, তোর সঙ্গে আমাকে দেখলে কি ভাববে সে?

কিছু না। আমার আগে থেকে বলা আছে।

নিমি, এটা কিন্তু ভালো হচ্ছে না। আমি তো আগে কোনোদিন কাজলের বাড়িতে যাইনি।

তাতে কি হয়েছে? আজ যাবি। নিশ্চিন্ত গলায় বলে উঠল নিমি।

নিমির কথা শুনে চুপ করে গেল রোকসানা। মুখে না, না, করলেও তার কৌতূহল হচ্ছে। কাজল নিমির ফিঁয়াসে। নিমি মাঝে মাঝে কাজলের বাড়িতে যায়। কাজলের মাবাবা দুজনেই আমেরিকায়। বড়ভাই আর ভাবির সাথে কাজল এখানে থাকে। তাদের নিজেদের বাড়ি। এখনও মাল্টিস্টোরি হয়নি। তবে ভবিষ্যতে হবে বলে কথাবার্তা হচ্ছে। রোকসানাদের নিজেদের বাড়ি নেই এই শহরে। তারা ভাড়া বাড়িতে থাকে। বাড়ির মালিক ক্যানাডায় থাকে। তার অতো গা নেই বাড়ি মাল্টিস্টোরি করার। তাই এখন পর্যন্ত রোকসানারা নিশ্চিন্তে ঐ বাড়িতে আছে। নিয়মিত ভাড়া তার বাবা বাড়িওলার অ্যাকাউন্টে জমা করে দেয়।

রোকসানার এখন মনে হলো  ইদানীং নিমি বলছে কাজলও নাকি আমেরিকায় চলে যাবে। কিন্তু এখনও দিন ঠিক হয়নি। নিমির শখ কাজলের সাথে বিয়ে হলে সেও চলে যাবে আমেরিকায়। ক্যানসাস সিটিতে কাজলের মা-বাবা আছেন। সেখানে যাবে তারা প্রথমে। তারপর নিজেদের জন্যে আলাদা ব্যবস্থা করে নেবে।

কাজলের সাথে নিমির প্রেম আজ অনেকদিন হলো, কিন্তু নিমির বাড়ির কেউ একথা জানে না। এগুলো নিমির টপ সিক্রেট। যখন বলবে, তখন আমেরিকা যাবার সব ব্যবস্থা করে বলবে। কাজলের বাসায় শুধু তার ভাবি জানে যে সে কাজলকে ভালোবাসে।

গলির শেষ মাথায় এসে রিকশা থামলে নিমি ব্যাগ থেকে টাকা বের করে রিকশাঅলার হাতে দিল। এই টাকা তুলে দেবার ভঙ্গিটা নতুন মনে হলো রোকসানার কাছে। কী আত্মবিশ্বাসের সাথে ব্যাগ খুলে পয়সা বের করল নিমি। রোকসানার হঠাৎ করে মনে হলো, এই বাড়িতে নিমি একবার বা দু’বার নয়, হাজারবার এসেছে। অবিশ্রান্ত  চকোলেট, টফি আর লজেন্স খাওয়া গাল দুটো নিমির এমনিতেই ফোলা ফোলা। বেবি ফ্যাট এখনও যেন তাদের দাবি নিমির শরীর থেকে ছাড়েনি। তবু তার ভেতরেও এই টাকা দেবার ভঙ্গিটি রোকসানার কাছে মনে হলো  বিশেষ অভিজ্ঞতার রসে যেন সিঞ্চিত। কিন্তু কীভাবে? প্রশ্নটা গোপনে নিজেকেই করল রোকসানা।

দরজায় বেল বাজতে খুলে গেল দরজা। মনে হয় জানালা দিয়ে এতক্ষণ খেয়াল করে দেখছিল কাজল। নিমির পেছনে রোকসানাকে দেখে হাসল কাজল। কিন্তু বিস্মিত হলো না। রোকসানা এর আগেও লক্ষ্য করেছে যে কাজল কোনো কিছুতে সহজে বিস্মিত হয় না। যেন সে জানে পৃথিবীতে সবকিছু সম্ভব। শুধু সময় এবং সুযোগের অপেক্ষা।  এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের দোষ না গুণ ঠিক বুঝে উঠতে পারে না রোকসানা।

দরজা বন্ধ করতে করতে কাজল নিমির দিকে তাকিয়ে বলল, ভেতরে আয়।

করিডর পেরিয়ে কাজলের পেছন পেছন তারা দু’জনে বসার ঘরে ঢুকল।

বসার ঘরটা পুরনো কতকগুলো বসার আসবাব দিয়ে সাজানো। তার ভেতরে কোনটা বেতের, কোনটা কাঠের, কোনটা প্লাস্টিকের। সমস্ত ঘরে যেন একটা হেলেফেলার ভাব। মেঝের কার্পেট তুলে ফেলা হয়েছে, কিন্তু কার্পেট তোলার দাগ মেঝেতে তখনও লেগে আছে। এইবাড়ির আসল মানুষজন যে দেশের বাইরে ঘরের চেহারা দেখলেই তা বোঝা যায়, অন্তত এরকমই মনে হলো রোকসানার। বাড়ির আসল লোকজন দীর্ঘদিন বাড়ির বাইরে থাকলে বাড়ি যে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, শোকে কাতর হয়, বাড়ি যে মলিন চেহারা করে বসে থাকে এটা রোকসানা বিশ্বাস করে। রোকসানার এক দূর-সম্পর্কের চাচা আছে। তিনি ডাক্তার। মাঝে মাঝেই সেই চাচা তার স্ত্রীকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় তার ছেলের কাছে বেড়াতে যান। চাচার বাড়িতে চারটে কুকুর আছে। দারোয়ান, বাবুর্চি আছে, কাজের মেয়ে আছে, অন্যান্য আত্মীয়স্বজন আছে। তবু রোকসানা যখন সে বাড়িতে বেড়াতে যায় তো দেখে বাড়ির চেহারা মলিন ও হতশ্রী। কুকুরগুলোর ভেতরে যেন প্রাণশক্তি নেই। তারা গোসল করে না ঠিকমতো। তারা রোদের ভেতরে মাথা মাটির দিকে ঝুঁকিয়ে চুপচাপ বসে আছে। বাড়ির কাজের লোকজনের জামাকাপড় সব ময়লা এবং পরিপাট্যের অভাব। গেটের দারোয়ান মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি নিয়ে লুঙি পরে বসে আছে গেটের সামনে আর কর্কশ স্বরে কথা বলছে মানুষের সাথে। অথচ বাড়ির সাহেব যখন বাড়িতে থাকে তখন এই দারোয়ানকেই রোকসানা দেখেছে প্যান্টশার্ট পরা, দাড়ি পরিষ্কার করে কামানো, মুখে বিনীত হাসি। আর চাচাচাচি বাড়ি না থাকলে বাড়ি ভালোমতো ঝাড়– দেয়া হয়নি বা গেটের কাছে জঞ্জাল ঢাঁই হয়ে পড়ে আছে। বাড়ির গাছপালাগুলোয় ধুলো জমেছে অথচ রোজ সন্ধেবেলা তাদের শরীর পানির পাইপ দিয়ে ধুয়ে রাখার কথা। যেন সকাল বেলা বাগানের গাছের গায়ে সোনালি রোদ পড়ে ঝিকমিক করে জ্বলে। কিন্তু চাচাচাচি বাড়ি ছাড়া, সুতরাং গাছদের সংসারও হয় ছন্নছাড়া, মলিন, ধুলি ধূসরিত।

তারপর চাচাচাচি যেদিন ফিরবেন তার ঠিক চার-পাঁচ দিন আগে থেকে শুরু হয়ে যায় বাড়িঘর ধোয়ামোছা। দারোয়ান আবার ফিটফাট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গেটে। কারণ কোনোদিন হুট করে সাহেব ম্যাডাম বাড়ি ফেরেন তার ঠিক নেই। অনেকসময় সময়ের আগেই বাড়ি ফিরে আসেন। সুতরাং সবক্ষণই তখন সতর্ক থাকতে হয়। বাগানের গাছগুলো রোজ বিকেলে পানি¯œান করে একেবারে ফিটফাট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের শরীর থেকে বাড়তি ডালপালা ছেঁটে ফেলা হয়। গোড়া খুঁড়ে নতুন সারমাটি দিয়ে দেয়া হয়। সবচেয়ে মজা হয় কুকুরগুলোকে নিয়ে। তারা চাচাচাচি বাড়ি ফেরার আগেই হৈ চৈ শুরু করে দেয়। বাগানের ঘাসে লাফালাফি করতে থাকে। আর মাঝে মাঝেই বাড়ির গেটের সামনে মাটিতে টানটান এবং উপুড় হয়ে বসে বন্ধ গেটের নিচ দিয়ে উদগ্রীব তাকিয়ে থাকে সাহেব, বেগম সাহেবের বাড়ি ফিরে আসবার আশায়। নিয়মিত গোসল এবং শরীরের লোম ব্রাশ করে দেবার জন্যে তখন তাদের চেহারা চকচক করে। চোখের পিঁচুটি পরিষ্কার হয়ে ফটফটে চোখে তারা তাকিয়ে দেখে চারপাশ। অবোধ জন্তু কীভাবে যেন জেনে যায় যে বাড়ির মালিকের ফিরে আসার সময় হয়েছে। আর তাই তাদের শরীরের যতœ শুরু হয়েছে।

চাচার বাড়িটাকে দিয়েই রোকসানা নিজের দেশটাকে বুঝতে চেষ্টা করে। মাথার ওপরে শাসন না থাকলে দেশের মানুষের অবস্থাও যে চাচার বাড়ির মতো এটা বুঝতে পারে রোকসানা। কারণ যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তারা কিছু না কিছু দেশের ভালো করার চেষ্টা করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়ে হলেও, কিন্তু একটু বেখেয়াল হলেই চাচার বাড়ির মতো অবস্থা!

কাজলের বাড়িতে ঢুকে এরকম কেন মনে হলো  রোকসানার সে জানে না। সত্যিকথা বলতে গেলে মনে হচ্ছে যেন চাচার বাড়ির চেয়েও এই বাড়ির মানসিক অবস্থা খারাপ! এ বাড়িতে আমেরিকা পাড়ি দেবার স্বপ্ন ঢুকে পড়েছে সকলের মনের ভেতরে! এর আর ছাড়াছাড়ি নেই। যারা চলে গেছে তারাতো গেছেই, যারা পড়ে আছে তাদেরও এদেশ থেকে মন উঠে গেছে। আউলা বাতাস ঢুকে পড়েছে এই বাড়ির মধ্যে। বাধভাঙা বন্যার নোনা জল ঢুকে পড়েছে সংসারে। হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে! এখন সকলের দেহটা শুধু এইদেশে, মন পুরোটাই আমেরিকার ক্যানসাসে।

কী সে দেশ, একবার চোখে দেখতে পারলে হত! মনে মনে যেন আফসোস করে কথাটা ভাবল রোকসানা।

ঘরের ভেতরে চোখ ঘোরাতে গিয়ে রোকসানা দেখল সোফার ওপরে একজন ছেলে বসে আছে। ছেলেটা কাজলের বয়সি। খুব সম্ভব কাজলের বন্ধু হবে। নিমি ছেলেটাকে দেখে বলে উঠল, হাই।

উত্তরে ছেলেটাও হাই বলল।

নিমি রোকসানার দিকে ফিরে বলল, এ হলো আমজাদ। কাজলের বন্ধু।

নিমি এইবার কাজলের চোখে চোখে তাকিয়ে বলল, কাজল, শোন, তোর সাথে আমার একটা কথা আছে।

কথাটা বলে কাজলকে সাথে করে নিমি পাশের ঘরে চলে গেল। মলিন একটা সোফায় বসে রোকসানা চোখ ঘুরিয়ে কাজলদের বসার ঘরটা এবার খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল। দেয়ালে কালো চেহারার কা’বা ঘরের চকচকে ম্যাট ঝোলানো। ঘরে টেলিভিশন এবং মিউজিক সেন্টার আছে। সেগুলো যে নিয়মিত ব্যবহার হয় তার প্রমাণ হচ্ছে তাদের গায়ে কোন ধুলোবালি নেই। আর সব আসবাবের গায়ে সূক্ষ্ম ধুলোর পরত পড়ে আছে। ঘরে কিছু পড়ার বই আছে। এলোমেলো করে রাখা। খুঁটিনাটি স্যুভেনির জাতীয় কিছু জিনিস আছে। একদিকের দেয়ালে কতকগুলো মুখোশ ঝোলানো আছে। মুখোশগুলো একেকটা একেক রকমের। দেখলে কেমন যেন গা শিরশির করে। রোমাঞ্চ হয়। মূলত এই  ঘরের এটাই হলো বৈশিষ্ট্য। ভাবল রোকসানা। তার নিজস্ব একটা পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আছে। ঘরে মুখোশ ঝোলানোতে এই ঘর আর দশটা সিটিং রুম থেকে পৃথক। সব বাড়ির সিটিং রুমে মুখোশ ঝোলানো থাকে না।

রোকসানা যতক্ষণ চোখ ঘুরিয়ে ঘর দেখছিল, ঘরের আসবাব দেখছিল, ততক্ষণ রোকসানাকে তাকিয়ে দেখছিল আমজাদ। মাথার ওপরে ফ্যান বনবন্ করে ঘুরছে। আজ এই সন্ধেয় গরম পড়েছে বেশ।

হঠাৎ চোখ ফিরিয়ে যেন আমজাদের চোখে নিজেকে দেখতে পেল সে। আর তাই অপ্রতিভ হয়ে বলল, মুখোশগুলো দেখতে অদ্ভুত, তাই না?

হ্যাঁ। উত্তরে বলল আমজাদ। তারপর বলল, তোমার ভয় করে?

আমজাদের কথা শুনে জোর গলায় হেসে উঠে রোকসানা বলল, কেন ভয় করবে? ওগুলো তো মুখোশ মাত্র!

আমজাদ ভেবে বলল, তাই। আসলের কাজলের বড়ভাই মুখোশ সংগ্রহ করতে ভালোবাসে। সে আমেরিকায় আছে এখন। সিটিজেনশিপ পেয়ে যাবে এবছর। ঐ যে ওপাশে যেটা দেখছ, চৌকোমতো, ওটা হলো  মেক্সিকোর। ঐ মুখোশটার একটা ইতিহাস আছে। শুনবে?

কী? বলল রোকসানা।

একবার কাজলের বড়দা আটলান্টায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে পাহাড়ের ধারঘেঁষে একদল আদিবাসী বাস করত। সেখানে তারা একটা বাজারের মতো করেছিল। ট্যুরিস্টরা প্রায় সেখানে গিয়ে তাদের হাতের তৈরি জিনিস কিনত। ত্রিপলের ছউনি ঢাকা ছোট্ট একটা দোকানে একজন বুড়ো মতো মেক্সিকান লোক মুখোশটা বিক্রি করেছিল বড়দার কাছে। বলেছিল মুখোশটা একজন মেক্সিকানের তৈরি। সেই লোক নিজেও নাকি মুখোশ পরে তাদের স্থানীয় উৎসবের সময় নাচ করত। একবার একটা দুর্ঘটনায় লোকটার মৃত্যু হয়, তখন তার হাতের তৈরি মুখোশগুলো লোকে যে যেভাবে পারে তুলে নিয়ে চলে যায়। বর্তমানের এই মুখোশটি নাকি সেই লোক নিজে ব্যবহার করত। বিক্রি করার সময় বলেছিল, যে লোকটির তৈরি এই মুখোশ সে মাঝে মাঝে কোনো কোনো ভরা পূর্ণিমায় এই মুখোশের ভেতরে নিজের মুখ রেখে চাঁদনি রাত দেখে। মুখোশের চোখের ভেতরে রাখে তার চোখ। মুখোশ তখন নিজেই নাকি নড়াচড়া করতে থাকে বাইরে থেকে কাউকে না দেখা গেলেও!

আমজাদের কথা বলার ভঙ্গি দেখে চোখ বড় বড় হয়ে গেল রোকসানার। সে বলল, আর এই কথা শোনার পরও মুখোশটা কিনলেন কাজলের বড়দা?

রোকসানার ভয় দেখে মনে মনে খুব মজা পেয়ে আমজাদ বলল, হ্যাঁ, কিনলেন তো। বড়দা তো তার কথা বিশ্বাসই করেননি। লোকটা গুল মেরে তার কাছ থেকে বেশি দাম আদায় করতে চায় একথা ভেবেছিলেন তিনি। তাই তার কথা পাত্তা না দিয়ে তিনি কিনে নিয়েছিলেন মুখোমাটা। শুনেছি বেশ দাম দিয়েই কিনেছিলেন।

বলেন কি? আর আপনি এতসব কথা জানলেন কীভাবে। রোকসানা গলায় সন্দেহের সুর তুলে বলল। তারপর দেয়ালে ঝোলানো মুখোশটার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাল। চারপাশের আরও মুখোশগুলো যেন এই ফাঁকে আরও জীবন্ত হয়ে উঠল রোকসানার কাছে। কত দেশের কত রকমের মুখোশ। কত রকম তাদের তৈরি হবার ইতিহাস। তাদের বিকট চেহারাগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই যেন গা শির শির করে উঠল তার।

রোকসানার হাবভাব দেখে হেসে উঠল আমজাদ। বলল, শোন, তোমাকে তুমিই বলি, শোন, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, প্রি হিস্পানিক আমেরিকা, বা শ্রীলঙ্কা যে কোনো দেশ বলো না কেন, সেসব দেশের মুখোশ বা মাস্ক কালচারের পেছনে প্রতিটি মুখোশের নির্মাতার একটা অবদান আছে। যে বা যারা এইসব মুখোশ তৈরি করে এবং সেই মুখোশ পরে নানারকমের ধর্মীয় বা স্থানীয় কৃষ্টির উৎসবে সামিল হয় তাদের প্রত্যেকের ভেতরে এক ধরনের অন্তর্গত পরিবর্তন দেখা দেয়। তাদের নিজের স্বকীয়তার ভেতরে ঢুকে পড়ে অন্য একটি সত্তা, তাকে তুমি শয়তান বলতে পার বা বলতে পার দেবতা। মোটকথা মুখোশ যারা পরে এবং এইসব মুখোশ যারা ঘরে রাখে তাদের ভেতরে অচেনা কিছু একটার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় মাঝে মাঝে। ভুলে যেও না, এই মুখোশ কালচার কিন্তু আফ্রিকার ভুডুর মতোই পুরোনো একটি কালচার।

আমজাদের কথা শুনে কৌতূহলী হয়ে রোকসানা তার দিকে তাকাল। মনে মনে ভাবল ছেলেটা তো বেশ! এ নিশ্চয় কোথাও কোচিং-এ পড়ায়।

তার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরে খুশি মুখে আমজাদ বলল, মুখোশ তৈরি হয় কী দিয়ে জান? সাধারণত কাঠ, কাগজ, জন্তুর শিং, গাছের ছাল বা কোনো জীবজন্তুর চামড়া দিয়ে। মুখোশ পরে নাচকরা বা দুনিয়ার বাইরের মানুষের সাথে অর্থাৎ মৃত মানুষের সাথে যোগাযোগ করা, এটা হলো পৃথিবীর পুরোনো একটা কালচার বা ঐতিহ্য বলতে পার।

কথা বলে আমজাদ পা নাচাতে শুরু করল। তবে অভদ্রভাবে নয়। এটা যে ওর হবি তা বুঝতে পারল রোকসানা। রোকসানা তার মুখের দিকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকল। যেন আরও কথা সে শুনতে চায়।

আমজাদ সেটা লক্ষ্য করে উৎসাহী হয়ে বলতে লাগল, এমনকি তুমি হয়ত শুনলে অবাক হবে যে খ্রিস্টপূর্ব সাত হাজার বছর আগের পুরোনো একটি মুখোশ মানুষ খুঁজে পেয়েছে। সেই মুখোশটা তৈরি হয়েছিল কী দিয়ে জান? পাথর দিয়ে। পাথর খোদাই করে মুখোশটা তৈরি হয়েছিল। কোনো কোনো মুখোশ আছে যা মুখে পরে নাচ করলে বা শরীরের অঙ্গভঙ্গি করে অদৃশ্য শক্তিকে পুজো করলে বধির মানুষেরা কানে শুনতে পারে। শ্রীলঙ্কায় এরকম এক ধরনের মুখোশ আছে যার নাম দেয় হয়েছে রাক্ষস মুখোশ। এইসব মুখোশ যারা পরে বা ব্যবহার করে তাদের একটা গোপন সংস্থা আছে। কোনো গ্রামে যখন মড়ক লাগে বা শয়তানের আছর হয়, তখন এই মুখোশ পরে  গোপন সংস্থার লোকেরা গ্রাম থেকে মড়ক ভাগিয়ে দেয়।

সত্যি? রোকসানার মুখ থেকে এবার বিস্ময়সূচক ধ্বনি বেরোল।

হ্যাঁ, সত্যি।

কিন্তু মানুষ আদতেই মুখোশ পরত কেন? কে তাকে এই মুখোশ পরার জ্ঞান দিয়েছে? এবার জিজ্ঞেস করল রোকসানা।

এটা একটা প্রশ্ন বটে। মাথা চুলকে হেসে উঠে বলল আমজাদ। এখানে তুমি একটা ভালো প্রশ্ন করেছ যে মানুষ আদতেই মুখোশ পরত কেন?  বা কে তাকে এই মুখোশ পরার বুদ্ধি দিয়েছে? তাহলে তোমাকে সত্যি কথা বলি, এর সঠিক উত্তর আমি জানিনে। কারণ এর বহু রকমের বিশ্লেষণ আছে। তার একটা হলো এই, মুখোশের যে ব্যক্তিত্ব বা মুখোশ যার প্রতিভূ সেই সত্তার কাছে মানুষ নিজের সত্তাকে বলি দিতে ভালোবাসে। তার কাছে সে আত্মসমর্পণ করে। মুখোশের ব্যক্তিত্বকে সে নিজের ভেতরে ধারণ করে। মুখোশের শক্তি তার ভেতরে শক্তির সঞ্চার করে। তার মানসিক জগতে বিরাট এক পরিবর্তন নিয়ে আসে। সে নিজেকে রূপান্তরিত একজন মানুষের মতো দেখতে পায়। তার ভেতরে আধিভৌতিক ক্ষমতার জন্ম হয়। কিন্তু  তবু কেন? এই কেনর উত্তর বড় জটিল। এমন কি হতে পারে যে প্রতিটি মানুষের ভেতরেই আছে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে এক ধরনের অনীহা, এক ধরনের বীতরাগ, এক ধরনের ক্ষোভ? সে নিজেকে ভিন্নরূপে দেখতে চায়। নিজেকে শক্তিশালী চেহারায় দেখতে চায়। ভিন্ন অস্তিত্বের ভেতরে খুঁজে নিতে চায় তার ঠিকানা? কে জানে!

কথা বলে আমজাদ থামল। তারপর রোকসানার বোকা বোকা চেহারার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কি নিজেকে নিয়ে একটু পরীক্ষা করতে চাও? তুমি কি ইনোভেটিভ? আমি কি দেয়াল থেকে মুখোশটা খুলে তোমার মুখে বসিয়ে দেব?

আরে না, না, তাড়াহুড়ো করে বলে উঠল রোকসানা। এখন সে আমজাদের কাছ থেকে এবং এই ঘর থেকে পালাতে পারলে বাঁচে। তার মনের ভাব যেন আন্দাজ করে নিয়ে আমজাদ বুদ্ধিমানের মতো বিষয়ান্তরে যাবার জন্যে বলল, তোমার কথা অনেক শুনেছি।

কোথায়? একটু অবাক হয়ে বলে উঠল রোকসানা।

নিমির কাছে। আমার সাথে যখনই দেখা হয় তোমার কথা বলে। তার কাছে তোমার কথা শুনে শুনে আমার সবকিছু মুখস্থ। তোমার আব্বা কি করেন, আম্মা কতদিন ধরে বাতের অসুখে ভুগছেন, তোমার ভাই নাসিরুদ্দিন বা নসু কেমন বুদ্ধিমান ছেলে, তোমাদের বাড়িতে কবে ডাকাতি হয়েছিল, সব  আমার জানা।

আমজাদের কথা শুনে চোখ বড় বড় করে ফেলল রোকসানা। সরল মুখে বলল, সত্যি?

হ্যাঁ তো।

অথচ দুষ্টু নিমিটা আমাকে কিচ্ছু বলেনি, দেখ তো কা-! আরক্ত মুখে বলে উঠল রোকসানা, বন্ধুর প্রতি একটু বিরক্তি প্রকাশ করে।

হ্যাঁ, কথাটা সত্যি। আবার দেখ আমার কথা হয়ত তোমাকে সে বলেনি কোনোদিন, বলেছে?

না। মাথা নেড়ে বলল রোকসানা। এই সময়টা তার খুব খারাপ লাগছে না। মনে মনে ভাবল সে। ভেবে মনের ভেতরে কেমন যেন একটা অপরাধবোধ হলো। অথচ এমন লাগার কোনো কথা নয়। সে তো কারও কাছে জিম্মি নয়। নাকি জিম্মি? মানুষ কি অনেক সময় না বুঝেই অন্য কারও কাছে জিম্মি হয়ে যায়? কেন?

আমজাদ তার আগের কথার জের ধরে বলল, আমি যে কত ভালো হাত দেখতে পারি, সে বলেছে?

ইয়া আল্লা! কি আশ্চর্য, সত্যি আপনি হাত দেখতে পারেন নাকি?

পারি তো, অবশ্যই পারি। ছেলেবেলা থেকে নিরোর পামিস্ট্রি আমার মুখস্থ। তবে আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করবে। ও-কে?

আচ্ছা। মাথা নেড়ে বলল রোকসানা। তারপর গলায় একটু আদুরে সুর তুলে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আমার হাতটা একটু দেখে দেবেন?

হ্যাঁ, দেখে দেব। কিন্তু তার আগে আমি তোমার বন্ধু হতে চাই।

কেন? একটু যেন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল রোকসানা।

কারণ নিমি আমার বন্ধু। কাজল আমার ছেলেবেলার বন্ধু।

ঠিক আছে। তবে আমি কিন্তু আমার বন্ধুদের তুই করে বলি।

আমিও। রোকসানার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখে বলল আমজাদ।

আমজাদের কথা শুনে রোকসানাও তার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি ফেলে বলল, আমজাদ, কেমন আছিস রে?

ভালো আছি, তুই কেমন আছিস, রোক্? রোকসানাকে আমজাদ মুহূর্তের ভেতরেই রোক্ করে ফেলল।

এরপর দুজনেই চোখে চোখে তাকিয়ে জোরে হেসে উঠল। সেই হাসি ঘূর্ণায়মান ফ্যানের শব্দ ছাপিয়ে এত সশব্দে বাতাসে ঢেউ তুলল যে ওঘর থেকে ছুটে চলে এল নিমি আর কাজল।

রোকসানা তাকিয়ে দেখল নিমির মাথার চুল সব এলোমেলো। ঠোঁটের রঙ মুছে গেছে। আর কাজলের জামায় সেই রঙ লেপ্টে বসেছে।

ওদের দুজনের হতভম্ব চেহারার দিকে তাকিয়ে আরও জোরে হেসে উঠল আমজাদ আর রোকসানা।

মিথুনের সাথে কথা না বলতে পারার ক্ষোভ বুকের ভেতরে গুমরে মরছিল রোকসানার দুপুর থেকে। দমকা হাওয়ায় সে ক্ষোভ উড়ে গেল কোথায়।

 

৪.

সকাল থেকে এই নিয়ে পাঁচবার ফোন এল বাড়িতে। ‘হ্যালো’ বলে রিসিভার তুলতেই রেখে দেয় ফোন। ভালো জ্বালা তো। মনে মনে কথা বলে মকবুল হোসেন দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে পায়চারি করতে লাগলেন। তার  দুশ্চিন্তার প্রথম কারণ হলো  আজ সকাল থেকে নসু বাড়ি পালিয়েছে। এখন প্রায় বিকেল হয়ে এল, এখনও সে বাড়ি ফিরে আসেনি। কাল রাতে তার ব্যবহার সহ্য করতে না পেরে মকবুল হোসেন গালে একটা চড় বসিয়েছিলেন। গতকাল সকাল থেকে সে খুব রাগারাগি করছিল। কাজের মেয়ের গায়ে হাত তুলেছিল। মাকে ধমক দিয়ে বলেছিল, বাড়িতে স্পাই রাখছেন আম্মা। আমার সব গোপন কথা এই বেটি বাইরে চালান করে। ও খবরদার আমার ঘরে যেন না ঢোকে।

তার ব্যবহার দেখে বশিরা ’থ হয়ে গিয়েছিলেন। একেতো কাজের মেয়ে ঢাকা শহরে আজকাল পাওয়া যায় না। যদিও পাওয়া যায় তো মাইনে এত বেশি চায় যে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে নিয়োগ দেবার মতো। তারপর কাজকর্মেও খুব পটু মানুষ পাওয়া যায় না। আর কাজ করতে এসে ফাঁকি দেওয়া তো আছেই। এতসব ঝামেলার ভেতরে এই মেয়েটিকে পেয়েছিলেন ভালো। সে বেশিদিন হয়নি গ্রাম থেকে এসেছে। শহুরে পরিবেশের বিষাক্ত বাতাস তার শরীরে এখনও ঠিকমতো প্রবেশ করতে পারেনি। মেয়েটি বিধবা। বাড়িতে একটা ছোট মেয়ে মায়ের কাছে রেখে শহরে কাজ করতে এসেছে। এখনও এর মনের ভেতরে হয়ত গ্রামের সবুজ শ্যামল কোলাহল করে। সে কাজও করে মন দিয়ে। বাড়ির জন্যে মন কেমন করে বলে আরও মন দিয়ে কাজ করে। তাহলে সে ভুলে থাকতে পারে অতীত।

কিন্তু নসুর ব্যবহারে তাকে ঘরে রাখা মুশকিল হয়ে পড়েছে। মেয়েটির নাম আসমা। সে যেদিকে কাজ করে নসু সেদিকে পাও মাড়ায় না। তারপর তার ঘরে তাকে সে ঢুকতে দেয় না। আবার নিজেও ঘর পরিষ্কার করে না। নসুর ঘরটাকে এখন একটা আঁস্তাকুড় বললে চলে। সে ঘরে দুনিয়ার ছোঁড়াখোড়া জিনিস। প্ল্যাস্টিকের শাদা কালো ব্যাগ, ছেঁড়া সিলোফোনে জড়ানো লাল নীল কাগজের সব প্যাকেট, পুরনো খবরের কাগজ, ময়লা ছেঁড়া জামা, চটের দুটো ব্যাগের ভেতরে বাড়ির আতিল বাতিল জিনিস যেমন ফিউজ হয়ে যাওয়া বালব, প্ল্যাস্টিকের অকেজো সুইচ, স্ক্রু ডাইভার, ভাঙা চিরুণি, সিগারেটের খালি প্যাকেট, সিগারেট জড়িয়ে রাখার চকমকি র‌্যাপার কাগজ, দেশলাইয়ের খোল, চুরি করে সে সিগারেট খায় তার নমুনাও আছে ব্যাগে। সেখানে একটা ময়লা কাপড়ের রুমালে জড়িয়ে রেখেছে খানকয় স্টার সিগারেট।

বাড়ির সকলে নসুর এ ধরনের ব্যবহারের কথা জানে। কিন্তু জানলে কী হবে। নসুকে এ থেকে বিরত রাখাটা বিষম একটা সমস্যা বলা যেতে পারে। তার ওপর নসুর ব্যবহার। কখন যে সে কী করে বসবে কেউ বলতে পারে না। গতকাল সকালে নসুর এরকম ব্যবহার দেখে মকবুল হোসেন থাকতে না পেরে তার গালে একটা চড় মেরেছিলেন। চড়ের ওজনটা বেশি হয়ে গিয়েছিল একটু। সাধারণত এরকমভাবে তিনি ছেলের গায়ে কোনোদিন হাত তোলেন না। অতি আদরের ধনকে যে হাত তুলে মারতে হচ্ছে এই অপরাধে তার মন বিক্ষিপ্ত ছিল গতকাল সারাদিন। নসুও চড় খেয়ে কোনো কথা না বলে নীরবে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকেছিল। তারপর আজ সকালে অফিসে গিয়ে বশিরার ক্রন্দিত গলার স্বরে বুঝলেন, নসু আবার বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। একথা শুনে তিনি কাজে মন বসাতে পারেননি। অফিসে বলে ফিরে এসেছেন বাড়িতে। অবশ্য মিথ্যে কথা বলেই ফিরেছেন। এর আগে আরও দুবার নসু বাড়ি পালিয়েছিল। সেই দুবার থানায় রিপোর্ট করেছিলেন তিনি। এবার আর করেননি। থানায় গিয়ে বারবার নিজের ঘরের পাগল ছেলের কথা বলতে তার আত্মসম্মানে লাগে। এমনিতেও পাড়ায় এখন মোটামুটি কানাঘুঁসো শুরু হয়েছে। সকলে বুঝতে পারে নসুর মাথা ঠিক নেই। নইলে যে ছেলের প্রশংসায় তার মা এই কিছুদিন আগেও পাড়ার মানুষের কান ঝালাপালা করে তুলত, তার মুখে আর কোনো কথা নেই কেন। এর ভেতরে তো কত রকমের পরীক্ষা হয়ে গেল কলেজে। ফাইনাল পরীক্ষাও হয়ে গেল। অথচ নসু পরীক্ষা দিল না।

ছেলের কথা ভেবে ভেবে স্বামী-স্ত্রী কারও কাল রাতে ঘুম হয়নি। আজ ছিল বৃহস্পতিবার। সকালে ভারাক্রান্ত মন নিয়েই তিনি কাজে গিয়েছিলেন। কিন্তু বেলা দশটার দিকে বশিরার ফোন পেয়ে কাজে মন বসানো কঠিন হয়ে গেল। বাড়ি ফিরে সেই থেকে  মকবুল হোসেন ঘরের ভেতরে পায়চারি করছেন। থানায় যাবেন কীনা ঠিক বুঝতে পারছেন না। এদিকে মাঝে মাঝে একটা ফোন আসছে। হ্যালো বলে ফোন হাতে নিতেই ও-প্রান্তে ছেড়ে দিচ্ছে ফোন। এটা কি নসুর ফোন? সে কি কোনো বিপদে পড়ে বাইরে থেকে বাড়িতে ফোন করার চেষ্টা করছে? কে জানে। কথাটা ভেবে মকবুল হোসেনের ভেতরে অসম্ভব অস্থিরতা হচ্ছে।

এমনিতে নসু বাড়ির বাইরে মাঝে মাঝে গেলেও কিছুক্ষণ বাদে আবার ফিরে আসে। সেই কিছুক্ষণ মানে বড় জোর বিশ পঁচিশ মিনিট। হয়ত সিগারেট কিনতে যতটুকু সময় লাগে। তাকে বাইরে একটু বেশিক্ষণ থাকার জন্যে অনুরোধ করলেও সে থাকে না বা থাকতে চায় না। কিন্তু আজ সকালে নাস্তা না করেই সে বেরিয়ে পড়েছে বাইরে। বাইরে যাবার সময় সে সাধারণত মাকে বলে যায়। আজ সে কিছু বলেনি। নীরবে ঘর ছেড়ে কখন যেন বেরিয়ে পড়েছে। হয়ত অনেক ভোরেই চলে গেছে বাড়ি ছেড়ে। কারণ বশিরা ভোরে নামাজ পড়ে উঠেই রান্নাঘরে গিয়ে বসেন। তার চোখের সামনেই হলো নসুর ঘরের দরজা। সে ঘরের দরজা খুললেই  নসু তার মাকে রান্নাঘরে বসা দেখতে পায়। কিন্তু ভোর থেকেই নসুকে ঘরের বাইরে বেরোতে দেখেননি তিনি। তারপর তাকে নাস্তা খাওয়াবার জন্যে দরজার কাছে দাঁড়াতেই দেখেন দরজা খোলা। অথচ নসু সর্বক্ষণ, অসুখ হবার পর থেকেই, তার ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখে।

বশিরা সকালে আপন মনে কিছুক্ষণ কেঁদে নিয়ে সংসারের কাজে লেগেছেন। ভাগ্য ভালো যে কাজের মেয়েটি কাজ ছেড়ে যায়নি। সেও বুঝতে পেরেছে এই বাড়ির ছেলের মাথা ঠিক নেই। এর ব্যবহার অত ধরলে চলবে না। তার ওপর সে নিজের চোখেই দেখেছে, সাহেব তার ছেলেকে চড় মেরেছে। এর ওপর আর কথা কি। তাই আসমা কিছু আর মনে রাখেনি।

মকবুল হোসেন এখন একটি ফোনের অপেক্ষা করছেন। নসুর গলায় যে তাবিজ ঝোলানো থাকে তার গায়েই লিখে রাখা আছে বাড়ির টেলিফোন নম্বর। নসু কখনও নম্বর বলতে না পারলে তাবিজের গায়ে লেখা নম্বর দেখে মানুষ তার বাড়িতে ফোন করে। তিনি অফিস থেকে বাড়ির ফিরে আসার পরে, সেই সকাল এগারোটা থেকে, একটা টেলিফোন মাঝে মাঝে আসছে। কিন্তু মকবুল হোসেন ফোন তুলে হ্যালো বলতেই টেলিফোন রেখে দেয়। মনে হয় তার গলা শুনেই ফোন রেখে দেয়। নসু ছাড়া আর কে হবে। বাবার গলা শুনে হয়ত ভয় পেয়ে রেখে দিচ্ছে। সে তো ভেবেছে বাবা এখন অফিসে থাকবে।

কিন্তু এটা ভেবে এখন আর মকবুল হোসেনের মন সায় দিচ্ছে না। নসু বকা খেয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেও যখন বাইরে থেকে ফোন করে তখন তার গলায় কোনো অভিমানের রেশ থাকে না। মান-অভিমান নসুর ভেতর থেকে যেন উঠে গেছে। অন্তত অভিমান করলেও মকবুল হোসেন বুঝতেন নসুর ভেতরে স্বাভাবিকতা আছে। কিন্তু না। অসুখটা হবার পর থেকে নসুর ভেতরে স্বাভাবিক মানুষের চালচলন উঠে গেছে। হয়ত এখন নসু নিজেই ফোন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ঠিকমতো ডায়াল ঘোরোতে পারছে না।

শুধু নসুর কথা ভাবতে ভাবতে তার মাথায় একটা টিং করে উঠল। ভাবলেন, ফোনটা কি তাহলে রোকসানার? হ্যাঁ, হতে পারে। কথাটা মাথায় আসতে আপন মনে মাথা নাড়তে লাগলেন তিনি। মেয়ে তার সেয়ানা হয়ে উঠেছে। লম্বা, ফর্সা, একহারা চেহারা। উজ্জ্বল দুটো চোখ। রাস্তাঘাটে চলাফেরা করার সময় কি আর দুদশটা বখাটে ছেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি? কথাটা ভাবতে গিয়ে বুক ভারী হয়ে উঠল তার। দুনিয়া যত এগিয়ে যাচ্ছে, এদেশটা যাচ্ছে সেই পরিমাণে পিছিয়ে। নইলে মুক্তিযুদ্ধের পর কি ভাবতে পেরেছিলেন দেশের এরকম দূরাবস্থা হবে। দেশের দু দুটো প্রেসিডেন্ট দেশের মিলিটারির হাতে প্রাণ হারাবে? ধর্মের খোলস আঁটোসাঁটো হয়ে চেপে বসবে দেশটার শরীরে? সংবিধানে বসবে বিসমিল্লাহ, সংবিধানে বসবে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, শুধু নিজের ক্ষমতার গদিটাকে, নিজের ভণ্ড এবং লুচ্চা স্বভাবকে বইয়ে নিয়ে যাবার জন্যে এদেশের রাষ্ট্রনায়কদের? দেশের সার্বিক উন্নতির কথা কে ভাবে, কে ভেবেছে?

মকবুল হোসেন সরকারি কর্মচারী। যখন যে সরকার আসে, তার হুকুম বহনকারী। কিন্তু তার মনের ভেতরে কোনো সরকারের শাসন নেই। সেখানে তিনি যা ইচ্ছে ভাবতে পারেন। কারও কিছু বলার নেই। মনের এই স্বাধীনতাটুকু যখন কোনো রাষ্ট্রনায়ক কেড়ে নেবে, ভবিষ্যতে সেরকম অবস্থা আসতেও পারে, ততদিনে মকবুল হোসেন রিটায়ার করে যাবেন।

মকবুল হোসেন পায়চারি করতে করতে টেলিফোনের দিকে তাকাতে লাগলেন। এবার ফোন আসার সাথে সাথে তুলবেন। একটা রিং বাজার মাঝপথেই তুলে ধরবেন। নসুর চিন্তার সাথে সাথে তার ভেতরে এখন রোকসানার চিন্তাও এসে ঢুকেছে। এরকম একটা বখে যাওয়া সমাজে বাড়িতে কোনো মেয়ের বড় হওয়া মানে বাবা মায়ের চোখের ঘুম হারাম হয়ে যাওয়া।

আবার বেজে উঠল ফোন। লাফ মেরে এবার ফোন তুলে ধরলেন মকবুল হোসেন। এবার আর হ্যালো না বলে রিসিভার লাগিয়ে রাখলেন কানে। দেখি ও প্রান্ত থেকে কে কথা বলে, ভাবলেন। নসু বা যে কেউ হোক না কেন একবার হ্যালো বলে উঠবেই। কিন্তু ওপ্রান্তেও কোনো সাড়া নেই। যেন ফোন বাজেইনি। মকবুল হোসেন এবার জোরে রিসিভার ঠেসে ধরলেন কানে। কিছু না হোক, নিশ্বাসের আওয়াজ একটা হবেই। এপ্রান্ত থেকে এটাও এক ধরনের মানসিক চাপ। রিসিভার তুলে নিয়ে হ্যালো না-বলা।

মকবুল হোসেনের ধারণাই ঠিক। একটু পরে রিসিভারে একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল। বেশ মোটা একটা দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘশ্বাসের উত্তরে মকবুল হোসেন নিজেও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়বেন কীনা ভাবতে না ভাবতে ও প্রান্ত থেকে বিকট স্বরে একজন বলে উঠল, অ্যাই ব্যাটা, বুলিকে ডেকে দে!

গলার স্বর শুনে হাতপা জমে ঠান্ডা হয়ে গেল মকবুল হোসেনের। বুলি? মাত্র ক্লাস সেভেনে পড়া বুলিকে চায়? কী সর্বনাশ!

কথা না বলে ফোন রেখে দিলেন মকবুল হোসেন। কিছু বলার সাহস হলো না। তার বারো বছরের মেয়ে বুলিকে চায়! বুলির চেহারা থেকে এখনও ছেলেবেলার ঘোর কাটেনি। মেয়েটা পাড়ার আরেকটা মেয়ের সাথে রিকশা ভাগাভাগি করে স্কুলে যায়। তিনি একজন সরকারি কর্মচারী জেনেও তার ছোট্ট মেয়েকে কাছে টানার আয়োজন করার সাহস রাখে! সর্বনাশের সর্বনাশ। এখন যদি মেয়েটার স্কুল যাবার পথে তাকে অ্যাটাক করে, তখন কী হবে?

হাতপা ঘামতে লাগল মকবুল হোসেনের। বুলি আজ স্কুলে যায়নি। স্কুল বন্ধ। পূজার ছুটি চলছে। সকালে উঠেই সে ছোটখালার বাসায় বেড়াতে গেছে হেলালের সঙ্গে। বশিরাই ইচ্ছে করে পাঠিয়েছেন। বাড়িতে নসু নেই। কান্নাকাটি চলছে। এর ভেতরে ছোট ছেলেমেয়ে দুটোকে তিনি আর জড়াতে চান না। আবার এসব দেখে যদি তাদেরও মাথা খারাপ হয়ে যায় তখন কী হবে? বশিরা নিজে আজকাল কোথাও যান না। তার গড়ে ওঠা আত্মবিশ্বাসের ওপর মুগুরের ঘা মেরেছে নসু। শুধু কি তার আত্মবিশ্বাস, নসু নিজের আত্মবিশ্বাস নিয়েও ছিনিমিনি খেলেছে। আর মকবুল হোসেনের কথা বলতে গেলে তার নিজেরই এখন মানুষের মুখের দিকে তাকাতে লজ্জা করে। কেমন যেন ইতস্তত হয়। কেমন ভয় ভয় করে। মনে হয় এরা কি আমার ছেলেটার কথা জেনে গেছে। জেনে গেছে এ সমাজে নসুর আর কানাকড়িও দাম নেই? এখন আর সে কোনো কিছুরই হিসাব রাখতে পারে না।

মকবুল হোসেনের আজকাল মাঝে মাঝে নসুর ছেলেবেলার কথা মনে হয়। এককালে মায়ের খুব বাধ্য ছেলে ছিল নসু। মায়ের খুব ন্যাওটা ছিল। মায়ের সাথে রান্নাঘরে বসে মাকে কাজে সাহায্য করার চেষ্টা করত। ছেলেকে রান্নাঘরে মায়ের কাছে ঘুর ঘুর করতে দেখে তখন কতদিন তাড়াহুড়োর মাথায় তিনি নসুকে বলেছেন, নসু, তুই এখান থেকে যা। ঘরে বসে অংক কষগে। ভাত খাবার সময় তোর মা তোকে ডাক দেবে। কিন্তু নসু যেতে চাইত না। আর তিনি তখন রাগ করতেন। আর বশিরা ছেলেকে মায়া করে বলতেন, থাক না নসুর বাবা, ও আমার সাথে একটু থাক। একটু পরেই তো স্কুলে চলে যাবে।

সেসব কথা ভেবে মকবুল হোসেনের এখন নিজের ওপরেই ক্ষোভ হয়। মনের ভেতরে এক ধরনের শোক হয়। বিলাপ হয়। মনে হয়, হায়, কেন তিনি রাগ করতেন?

নসু স্কুলে পড়তে তার কোনো বন্ধুবান্ধব ছিল না। এতে করে মকবুল হোসেন একটু উদ্বিগ্ন হলেও বশিরা খুব খুশি থাকতেন। স্কুলের সব ছেলেকেই তার নসুর কাছে আজেবাজে মনে হত। তাই নসু তাদের কারও সাথে মিশুক তিনি চাইতেন না। নসুও মিশত না। কারও সাথে কোনোদিন মেশার জন্যে নসু বায়না ধরেনি। সত্যি বলতে গেলে তার নসুর চেয়ে ভালো ছেলে স্কুলে আর কে ছিল? অংকে সবসময় একশোর ভেতরে একশো। এদিকে স্বভাবচরিত্র সাধু সন্তের মতন। স্কুল থেকে সোজা সে বাড়ি চলে আসত। কথা বলতে কম। ভাইবোনদের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকত। রাতদিন শুধু ঘরের ভেতরে বসে বই পড়ত। শুধু কি পড়ার বই? কত রকমের বই। সায়েন্সের যাবতীয় বিষয়ের প্রতি তার কৌতূহল ছিল। ধর্ম সম্পর্কে কৌতূহল ছিল। ফিজিকস, মেটাফিজিক্স, ফিলোসফি, নভোমণ্ডল, অ্যারিসস্টোটল, সক্রেটিস, সুফিইজম, কার্ল সাগান, স্টিফেন হকিং কত কিছু নিয়ে যে নসু মেতে থাকত। কিন্তু সব আপন মনে। কেউ তার সঙ্গী ছিল না। কারও সাথে সে নিজের চিন্তাভাবনা ভাগাভাগি করত না। সব হত নীরবে। ঘরের অন্ধকার আবছায়ার ভেতরে। জানালার পর্দা টেনে দিয়ে। একদিন শুধু বিকেলবেলা ঘরের দরজা খুলে তার মায়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করেছিল, আম্মা ধর্ম কি? আর তার প্রশ্ন শুনে বশিরা থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন। আচমকা এটা একটা কী ধরনের প্রশ্ন।

তারপর একদিন বলেছিল, আমার কাছে যদি আকাশ থেকে ওহি আসে, তবে কি আপনি আমাকে নবী বলবেন? সেই প্রশ্ন শুনে বশিরার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল। তিনি তাকে তাড়াতাড়ি করে সাইদাবাদের পির সাহেবের কাছে নিয়ে গিয়ে তওবা করিয়েছিলেন।

মকবুল হোসেন মাঝে মাঝে তাকে খেলাধুলা করতে বলতেন। কিন্তু বাধা দিতেন বশিরা। বলতেন, স্কুলে রোজ হেঁটে গেলেই তো কত পরিশ্রম হয়, এর ওপরে আবার খেলাধুলা কি। এর চেয়ে বাসায় ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে পড়তে বসলেই ভালো। তাহলে তাড়াতাড়ি পড়াটা শেষ হয়ে যাবে। খামোখা আর রাত জাগতে হবে না।

মকবুল হোসেন আজকাল বুঝতে পারেন তার মতো একজন সাধারণ চাকরিজীবীর ঘরে একটি অসাধারণ মেধার অধিকারী ছেলের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু তার জন্মের মুহূর্তে বিধাতা নিজের হাতে তার কপালে একটা থাপ্পড় মেরেছিলেন। যে জন্যে তার এবং তার  বাবা-মায়ের সংসারের আজ এই অবস্থা!

তার এতসব ভাবনার ভেতরেই আবার বেজে উঠল ফোন। না, এবার আর মকবুল হোসেন ফোন ধরবেন না। কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে গেলেও ফোন বাজতে লাগল। শব্দটাকে এখন অশুভ একটা বার্তার মতো মনে হতে লাগল মকবুল হোসেনের। না, আর ফোন ধরবেন না মকবুল। একভাবে ফোন বাজছে শুনে বশিরা কোনো একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। মকবুল হোসেন তাকে হাত ইশারায় চুপ থাকতে বলে ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। এখানে দাঁড়ালে পাশের বাড়ির গাড়ি বারান্দা দেখা যায়। আবুধাবিতে এই বাড়ির মালিক চাকরি করে। আড়াই কাঠার জমির ওপর সুন্দর ডিজাইনের চারতলা বাড়ি তুলেছে। ছেলেমেয়ে দুটো ইংরেজি স্কুলে পড়ে। স্ত্রী পর্দানশীন। নিজের ভাইকে কাছে রেখে সংসার চালান।

এবার সেদিকে তাকিয়ে থাকতে গিয়ে বুক থেকে তার একটি বিলাপিত দীর্ঘশ্বাস বেরোলো। নসু ঠিকমতো লেখা পড়া করতে পারলে এখন সে ইঞ্জিরিয়ারিং পড়ত। পড়া শেষ হলে বিদেশে আরও বড় পড়া করতে যেত। তারপর দেশে ফিরে এসে বা না ফিরলেও সে ঠিক ঠিক নিজের আখের গুছিয়ে নিতে পারত। ভাইবোনগুলোকে বড় করে তুলত। মা বাবাকে সাহায্য করতে পারত। নসুর, তার ছেলে নাসির হোসেনের, অসাধ্য ছিল কি?

ভাবতে ভাবতে আবার দীর্ঘশ্বাস পড়ল তার। আসলে মকবুল হোসেন কি? সরকারি অফিসের একজন মাঝারি কিসিমের চাকুরে। তার জীবনযাত্রা জীবনের শুরু থেকেই ছিল মাঝারি। তার স্বপ্নও ছিল মাঝারি রকমের। কিন্তু ছেলেমেয়েরা সংসারে জন্ম নিয়ে মাঝে মাঝে বাবামায়ের মনোজগতে বড় একটা কিছুর, অনেক বড় একটা কিছুর ইশারা নিয়ে আসে। অনেক বড় একটা কিছুর হাতছানি দিতে থাকে। তারপর হঠাৎ করে কিছু একটা ঘটে যায়, তেলেসমাতির মতো অশুভ কিছু একটা ঘটে যায়, কল্পনার বাইরে ছিল এমন একটা কিছু ঘটে যায়, আর তাতেই বাবামায়ের স্বপ্নের জগতে নামে ধস।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ মকবুল হোসেনের দৃষ্টি রাস্তার দিকে গেল। তাকিয়ে দেখলেন রাস্তার ওপারে নসু দাঁড়িয়ে আছে। অদৃশ্য কারও সাথে নসুর বাকবিত-া শুরু হয়েছে। নসু মুখ খারাপ করে তার অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে হাত উঠিয়ে হুমকি দিচ্ছে!

সব ভুলে মকবুল হোসেন বাবা নসু বলে রাস্তার দিকে ছুটলেন।

৫.

বশিরা খাতুন তার খালাতো বোন সগিরাকে নিয়ে পুরনো ঢাকার গলিঘুঁজির ভেতরে অনেক খোঁজাখুজি করে মনা পাগলার সন্ধান পেলেন। চকচকে ঢেউ টিনের একটা চালার নিচে মনাপাগলা বসে আছে। লোকটার নামের শেষে পাগলা টাইটেল বসানো থাকলেও লোকটা দিব্যি ধোপদুরস্ত জামা কাপড় পরে বসে আছে। তার মুখে লম্বা কাঁচাপাকা দাড়ি আর চোখে গাঢ় করে লেপা সুরমা। তার সামনে অনেক মানুষ বসে আছে। অধিকাংশই সাধারণ চেহারার লোক। একজন বা দুজন মাত্র শাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরা। ঘরের এককোণে একটা ধুনুচির ভেতর কর্পূর পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে। বশিরা দেখলেন অনেকগুলো বোরকা পরা মহিলা বাচ্চা কোলে নিয়ে মনাপাগলার সামনে বসে আছে। বশিরা খাতুন নিজেও বোরকা পরেছেন। সাধারণত তিনি বোরকা পরেন না। গায়ে সাদা চাদর জড়িয়ে রাখেন, কিন্তু মনাপাগলার আখড়ায় আসার আগে ভেবেচিন্তে বোরকা পরেছেন। তার খালাতো বোন সগিরাও বোরকা পরেছে। সগিরা অন্য সময়েও বোরকা পরেই বাইরে ঘোরাঘুরি করে।

সগিরার স্বামী মারা গেছে গত বছর। তার মন থেকে এখনও শোক মরে যায়নি। শোকের আঁচড় এখনও রাতে তার চোখের ঘুম হারাম করে দেয়। বর্তমানে বিভিন্ন মাজার এবং খানকা শরীফে ঢুঁ মেরে তার সময় কাটে।

বোরকা পরলেও বশিরার চোখমুখ খোলা ছিল। তাই দেখে একজন জিজ্ঞেস করল, দাদা হুজুরের কাছে এসেছেন?

বশিরা মুহূর্তে বুঝে গেলেন মনাপাগলার ভালো নামই দাদাহুজুর। তিনি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন। লোকটা মুহূর্তে ভিড় সরিয়ে তাদের দুজনকে সামনের দিকে নিয়ে গেল। বশিরা আর সগিরা দুইবোন হাঁটু মুড়ে বিনয়ের ভঙ্গিতে মনাপাগলার সামনে বসলেন।

মনাপাগলা তখন দর্শকদের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিল, মঞ্জিল মকসুদে পৌঁছাইতে গেলে কতকগুলান তরিকা মাইন্যা চলতে হয়। এইসব তরিকা হইল গিয়া মারেফাতের জিনিস। পবিত্র কোরানের অনেক কথা আমরা বুঝি আবার অনেক কথা বুঝি না। যেগুলান বুঝি না সেই গুলান হইল গিয়া মারেফাত। আমার হুজুর শাহ সুলতানপুরী এইগুলান বোঝেন এবং আমারেও বোঝান। আমি বুইঝা আবার সেইগুলান আপনাদের বুঝাইবার চেষ্টা করি। বুঝলেন আমি কী বলবার চাই?

মনাপাগলার এই বক্তব্য শুনে ভিড়ের ভেতর থেকে একজন ভয়ে ভয়ে বলে উঠল, হুজুর, আপনের নিজের হুজুর শাহ বদিউজ্জামান সুলতানপুরী কোথায় থাকেন? তার খানকা শরিফ কোথায়?

উত্তরে মনা পাগলা মিষ্টি হেসে বলল, তিনি তো এই দুনিয়ার না ভাইয়া! তিনি রুহানি জগৎ থেইকা আমার কাছে আসেন। ফি চান্দের শুক্লাপক্ষের তৃতীয় রজনীতে। হেইদিন আমি কারও লগে দেখা করি না। শুধু তার লগে দেখা করি। তাঁর মতন বড় বড় রুহ্দের সঙ্গী হচ্ছেন জিনেরা। আমার নিজের দাদাহুজুর অর্থাৎ হুজুর শাহ বদিউজ্জামান সুলতানপুরীরও দুইজন জিনসঙ্গী আছেন। ওনাদের একজনের নাম বদর আরেকজনের নাম পটল। পটল হইতেছেন দৈত্য টাইপের। পটলের রাগ হইলে বিভিন্ন খারাপ কাম করতে পারেন। সে ক্ষমতা তার আছে। কিন্তু তিনি শুধু খারাপ মাইনসেরে ট্যাকেল করেন। ভালা মাইসের সাথে তার কোনো দুশমনি নাই। আমার নিজের আব্বাও ছিলেন পির। পির বাহাদুরপুরি। তার সাথেও জিনদের বড় দোস্তি আছিল। চরফ্যাসনে এখনও আমার আব্বার কবর জিয়ারত করে জিনেরা। মানুষ সে কবরের কাছে ঘেঁষতেই পারে না। বুকে ব্যথা উইঠা, বুক ধড়ফড় কইরা তারা মইরা যায় গিয়া। মওতের চেয়ে বড় শাস্তি আর কী আছে। মওত হইলেই তো গোর-আজাব। মওত হইলেই তো আল্লাহ্ তায়ালার কাছে জবাবদিহি। বোঝলেন?

বশিরা খাতুন মনা পাগলার কথা শুনতে শুনতে সগিরার দিকে তাকালেন। দুজনের চেহারায় ভক্তি উপচে পড়তে লাগল। সগিরা আর থাকতে না পেরে ডুকরে উঠে বলল, বাবা হুজুর।

মনা পাগলা ডাক শুনলেও সে ডাকের ত্বরিত উত্তর দিল না। সে নিজের দাড়ি মোচড়াতে লাগল ডানহাত দিয়ে। একজন এইসময় কানে কানে কিছু বলতে মনা পাগলা মাথা নেড়ে সায় দিল। বশিরা সগিরাসহ উপস্থিত সকলে ঘাড় ফিরিয়ে দেখল ইয়া মোটা একটা লোক পাকিস্তানি মিলিশিয়াদের মতো সালোয়ার কোর্তা পরে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে আসছে গলি দিয়ে। একটা লাল রঙের গাড়ি মোড়ের মাথায় রেখে সে মনা পাগলার চালার দিকে আসছে। লোকটার পেছনে বিরাট দুটো কাপড়ের গাট্টি টানতে টানতে আসছে গোটাচারেক লোক। মোটা লোকটা মনা পাগলার কাছে এসে একেবারে পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে বলল, দাদাহুজুর, আপনের অছিলায় আর আপনের কেরামতির জোরে আমার বংশে বাতি দেওনের সন্তান আইছে। পোলা সন্তান মাশাল্লাহ্, দাদাহুজুর। থোরা আপনের মিষ্টিমুখ করনের লাইগা সন্দেশ আনছি হুজুর।

লোকটা তার কথা শেষ করার সাথে সাথে পেছনের লোক চারজন কাপড়ের বিরাট গাট্টি দুটো টেনে সামনে নিয়ে এল। গাট্টির মুখ একটু আলগা হতেই দেখা গেল গাট্টি ভর্তি ঝুরো সন্দেশ। মনা পাগলার সাগরেদরা মুখ চাওয়াচায়ি করতে লাগল। কাপড়ের ঝোলায় পলিথিন ব্যাগে এতগুলো ঝুরো সন্দেশ মনে হয় তারা কল্পনায় আনতে পারেনি। কিন্তু কী যে তারা কল্পনায় এনেছিল, তারও কোনো হদিশ মিলল না। যাইহোক, তারা তাড়াতাড়ি গাট্টি দুটো বেড়ার পেছনে রাখার চেষ্টা করল। মনা পাগলা তাদের হাত উঠিয়ে ইশারায় মানা করল। তারপর মুখে বলল, লাগা!

সাগরেদগুলো এবার মুঠো মুঠো সন্দেশ তুলে বিলাতে লাগল সকলকে। বশিরাও একমুঠি সন্দেশ পেল। সগিরাও। বশিরা তার পাওয়া সন্দেশটুকু না মুখে দিয়ে সযতেœ রুমালে বেঁধে ফেলল। সগিরা মুঠিতে রাখল। এই মুহূর্তে সেটা মুখে দেয়া উচিত হবে কীনা ঠিক বুঝতে পারল না। মোটা লোকটার হাতে কিছু ঝুরো সন্দেশ ফুঁ দিয়ে একটা ছোট পলিথিন ব্যাগে ভরে দিল মনা পাগলা। ভরল তার সাগরেদরা। ফুঁ দিল সে-ই।

অনেকক্ষণ বাদে বশিরা খাতুন মনা পাগলার দিকে একবার চোখ তুলে তাকিয়ে পরমুহূর্তে চোখ নামিয়ে নিয়ে বললেন, আমার ছেলেটাকে বাবা ঠিক করে দিতে হবে। ওর ঘাড়ে জিনের আছর হয়েছে আজ কতদিন। লেখাপড়া নাই, ঘুম নাই, রাতদিন শুধু বিড়বিড়, ভয়, ভয়, শুধু ভয়। এই ভয়ের কোনো কারণ নাই। কথা যখন জোরে জোরে বলে সে কথারও কোনো মাথামু-ু নাই। কোনো স্টেশন নাই। কোথায় থামবে বুঝতে পারে না। আপনের এলেম এর খবর পেয়ে বহুদূর থেকে আসছি বাবা।

বশিরা থামতে সগিরা বলে উঠলেন, কার অছিলায় কী হয়, কে বলতে পারে? আপনি পুত্রহীনকে পুত্র দান করেছেন, তাইলে আমার বোনপোর মাথাটাও ঠিক করতে পারবেন, দাদাহুজুর। আমার বোন বড় কষ্ট পায়।

কথা শেষ করে সগিরা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন। আজকাল সগিরার মতো অনেক বয়স্ক মহিলা সালোয়ার কামিজ পরে, কিন্তু সগিরা এখন পর্যন্ত শাড়িই পরছেন। সালোয়ার কামিজে মেয়েদের উদোম পাছা দেখতে তার খুবই আপত্তি।

সগিরার কথা শেষ হতে মনা পাগলা এবার দুটো আঙুল তুলে দেখাল। আঙুলের অর্থ বুঝতে না পেরে বশিরা সগিরার দিতে তাকালেন। আর সগিরা তাকালেন সাগরেদদের দিকে। একজন সাগরেদ বা মুরিদ, যে বেশ একটু চটপটে, হাত উঠিয়ে ওদের ইশারা করল বেরিয়ে আসার জন্যে।

বশিরা সগিরা তার ইঙ্গিত বুঝে তড়িঘড়ি করে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এলেন বাইরে।

সাগরেদ বলল, হুজুর দুসপ্তাহ বাদে ছেলে সাথে নিয়ে আসতে বলেছেন। সে সময় পাঁচ কিলো চাউল, তিন কিলো গুড়, আর তিনশোটা টাকা নিয়ে আসবেন, শিন্নি হবে।

বড় খুশি এবং মুগ্ধমনে বশিরা মাথা নাড়লেন। তারপর ভিড় ছেড়ে একেবারে রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন। সগিরা এলেন বোনের পেছন পেছন।

বশিরা রিকশায় উঠে বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, কেমন মনে হলো  তোমার?

কামেল ফকির মনে হচ্ছে। বুঝদার মাথা নেড়ে বললেন সগিরা। তারপর বললেন, কত বড়লোক একজন কতগুলো সন্দেশ নজরানা নিয়ে এল দেখলে না? কাজ না হলে কি মানুষ এমনি এমনি গুণগান করে?

আমার নসুকে ভালো করতে পারবে বলে মনে হয় তোমার?

মনে তো হয়, বুবু। দাদাহুজুরের প্রতি আমার আস্থা আছে।

আগের পির বাবা তো পারলেন না। বশিরা একটু যেন ক্ষোভের সাথে বলে উঠলেন। তার গলার স্বরে হতাশা জমাট বেঁধে থাকল।

সগিরা তাড়াতাড়ি করে বললেন, পারলেন না বলো না। হয়ত ইচ্ছে করে করেননি! এঁরা আবার সময় না হলে কিছু করতে চান না। এ বিষয়টা আমার বহুবার দেখা। এখন কার কাছে গিয়ে ঠিক সময়টা হবে তা তো আমাদের মতো পাপীতাপীদের পক্ষে বলা খুব মুশকিল।

বোনের কথা শুনে চিন্তা করতে করতে বশিরা গভীর একটা শ্বাস ফেললেন। একথা ঠিক মনা পাগলাকে তার পছন্দ হয়েছে। অন্তত আগের পিরসাহেবটার চেয়ে ভালো মনে হচ্ছে। পিরবাবা মওলানা মুসলেহউদ্দিনের আচার আচরণে এক ধরনের নিষ্ঠুরতা ছিল। যেন দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিকতার বাইরে আর কিছু তিনি সহ্য করতে চাইতেন না। মানুষের অস্বাভাবিক আচরণ তাকে যেন ক্ষুব্ধ করে তুলত, যেন মনে করতেন মানুষটা ইচ্ছে করে এরকম অস্বাভাবিক আচরণ করছে। পির বাবার ব্যবহার তাই গোপনে বশিরা খাতুনকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। অন্তত মনা পাগলার চেহারা এবং ব্যবহারে এরকম কোনো কাঠিন্য নেই।

তবে পির আর পাগলার ভেতরে তফাত তো কিছু থাকবেই!

কথাটা ভেবে বশিরা খাতুন যেন আত্মমগ্ন হয়ে গেলেন। সারা পথ আর দুবোনে কোনো কথা হলো না।

 

৬.

মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে হেলাল চিন্তা করতে লাগল সে এখন কি করবে। স্কুল তার শেষ হয়েছে পাঁচটায়। তারপর একঘণ্টা টিউশনি। সে ক্লাস এইটে পড়ে। অংকে কাঁচা বলে স্কুল শেষে ক্লাস টিচারের কাছেই একঘণ্টা অংক শেখে। হেলাল জানে সে তার নসু ভাইয়ার মতো লেখাপড়ায় এত ভালো না, মানে নসু ভাইয়া যখন ভালো ছিল, যখন তার মাথা খারাপ হয়নি, তখন তার মতো ভালো ছাত্র নাকি ক্লাসে দুটো ছিল না। এমনকি ক্লাসের শিক্ষক নসুকে দিয়েই অন্য ছাত্রদের অংক বা ফিজিক্স শেখাত।

তার মা বশিরা খাতুনের মুখে এইসব কথা শুনতে শুনতে হেলালের কান ঝালাপালা হয় মাঝে মাঝে। যখন বশিরা কথাগুলো বলেন তখন হেলালের চোখের দিকে দৃষ্টি ফেলে বলেন। তাতেই হেলাল বুঝে যায় মা তাকে নিয়ে কতখানি দুশ্চিন্তা করেন। কারণ হেলাল অংকে ভালো না। তাছাড়াও বাড়িতে মাঝে মাঝে হেলালের নিজেকে অপাঙ্ক্তেয় মনে হয়। সকলে এমন কি রোকসানা আপাও নসু ভাইয়াকে নিয়ে রাতদিন চিন্তাভাবনা করে। হেলালের দিকে কারও কোনো খেয়াল নেই। হেলাল নিজেকে এজন্যে বাড়ির মধ্যে একজন বহিরাগত বলে অনুভব করে। তার রাগ হয়। অভিমান হয়। লেখাপড়ায় বেশি ভালো না বলে সে যেন সকলের করুণার পাত্র, একথা সে মনে মনে বুঝতে পারে। এইজন্যে আজকাল স্কুল শেষে বাড়ি ফিরতে হেলালের ইচ্ছে করে না। বাইরের জগৎটাকে বাড়ির চেয়ে যেন বেশি আপন মনে হয় তার।

তার ক্লাসের এক বন্ধুর নাম হলো রওশন আজাদ। তার বাবা ব্যবসায়ী। এখন থেকেই সে গোপনে ফাইভ ফিফটি ফাইভ খায়। একদিন হাতেনাতে তাকে বাথরুমে ধরে ফেলেছিল হেলাল। আর তাতে রওশন বিন্দুমাত্র ঘাবড়ে না গিয়ে বলেছিল, দোস্ত্, তুই খাবি?

হেলাল তাকে স্কুলে বসে এরকম খারাপ কাজ করতে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে বলেছিল, না, না।

আর রওশন হাসতে হাসতে বলেছিল, তাহলে কাউকে যেন বলিস নে। আমার বাবা তো ব্যবসায়ী। রাতদিন সিগারেট খায়। আবার মদও খায়, দোস্ত। একদিন বাবার আলমারি খুলে আমিও একটু খেয়েছিলাম। খেতে একদম ভালো না। কিন্তু এই সিগারেটটা খুব ভালো। একটু খেয়ে দেখবি?

এই বলে তার হাতের জ্বলন্ত সিগারেট বাড়িয়ে দিয়েছিল হেলালের দিকে।

আর হেলাল ছটফট করে উঠে বলেছিল, না, না, আমার মা বকবে, ভাই।

রওশন তার কথা শুনে আরও জোরে হেসে বলেছিল, আর কতদিন মায়ের আঁচলের নীচে থাকবি, দোস্ত? এবার বেরিয়ে আয়।

তো রওশনের কথাবার্তা তার সেদিন ভালো লাগেনি। আবার বাথরুমে দাঁড়িয়ে চুরি করে সিগারেট খাওয়াটাও হেলাল মানতে পারেনি। কিন্তু সে ক্লাসের কাউকে একথা বলেনি। কেন যেন মনে হয়েছিল একথা কেউ জানলে তাকেও ক্লাসের ছেলেরা খারাপ ভাবতে পারে।

কিন্তু মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে হেলাল চিন্তা করতে লাগল। এখন সে আর স্কুলে নয়? রাস্তায়। আর একটা রাস্তা পেরোলে তার বাড়ি। কিন্তু বাড়ি তার আর ভাল লাগে না। বাড়িতে বাবা আর মায়ের হাহুতাশ শুনতে শুনতে তার মন বিষিয়ে উঠেছে। যেন নসু ছাড়া তাদের আর কোনো ছেলে নেই। জ্বলজ্যান্ত হেলালকে তারা যেন দেখেও দেখে না। এইসময় তাকিয়ে দেখে মুদির দোকানের মেহেদি হাত ইশারা করে তাকে ডাকছে। ঠিক ইচ্ছে না থাকলেও হেলাল পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল মেহেদির দোকানের দিকে। মেহেদি তাকে কাছে পেয়ে নরম গলায় বলল, আপনেরে কদিন থেইকা এট্টু য্যান বেচয়েন দেখি। উত্তরে মাথা নেড়ে হেলাল অস্বীকার করল। তাকিয়ে দেখল মেহেদির ছোট্ট দোকানটা একেবারে সিগারেট, দেশলাই, মোমবাতি, চকমকি কাগজে মোড়া চিপস, কাজু বাদাম,  টফি আর পান পরাগে ভর্তি। দোকানের মাথার ওপর কিছু বানরুটি আর কলাও ঝুলছে।

একজন লোক এই সময় একটা সিগারেট চাইল। খোলা একটা প্যাকেটের ভেতর থেকে মেহেদি তাকে সিগারেট বের করে দিল। লোকটা চলে গেলে মেহেদি হেলালের দিকে তাকিয়ে নিরীহ চোখে বলল, একখান সিগ্রেট চলব নাকি? একথা বলে হাত বাড়িয়ে সে একটা সিগারেট হেলালের নাকের ডগায় তুলে ধরল। হেলাল সেদিনের মতো এটা বাতিল না করে একটু ইতস্তত করতে লাগল। মেহেদি নরম গলায় বলল, আপনের বড় ভাইয়া নসু তো আপনের বয়সেই এই কাম করছে। আমি তারে জিগাই নাই, তবু একদিন আইয়া আমারে কইল, কি মেহেদি ভাই, একখান সিগ্রেট হইবে নাকি? তার কথা শুইন্যা আমি তো তাজ্জব। আরে বলে কি, এত ভালা ছাওলা সিগ্রেট চায়, ব্যাপার কি? কিন্তুক আমার কাছে কেউ কিছু চাইলে আমি আবার না করবার পারি না। তা আমি তারে সিগ্রেট দিলাম। তহনও তো জানি না যে হেই পরথম তার মাথার ব্যারাম দেখা দিছে। মাথার ব্যারাম দেখা দেওনের লাইগা হে আমার কাছে আইয়া সিগ্রেট চায়। তবে যৌবন হইল গিয়া ভাইয়া অকাম কুকাম করণের সময়। নাইলে আর কখন অকাম কুকাম করবেন? বেশি বয়স হইয়া গেলে তো আর অকাম কুকাম করা যায় না। তহন তো দৌড়াইতে হয় মসজিদের দিকে। বোঝলেন, কি কথা কই?

হেলাল তার কথা বুঝুক বা না বুঝুক সে সিগারেটটা ধরাল। মেহেদিই যতœ করে তার সিগারেট ধরিয়ে দিল। তারপর তাকে পয়সা দিতে গেলে সে জিভ কেটে পয়সা নিতে অস্বীকার করল। বলল, এইখান কোন কথা নাকি। মাত্তর একখান সিগ্রেটের লাইগা আপনের কাছ থে পয়সা লমু। আমি কি বেজন্মা?

সিগারেটে দুই টান দিয়ে হেলাল খকখক করে কেশে সিগারেটটা রাস্তায় ফেলে দিল। মেহেদি লাফ মেরে দোকানের বাইরে বেরিয়ে সেটা আবার মাটি থেকে তুলে হেলালের হাতে দিয়ে বলল, ফেইলেন না, আপনের কাছে রাইখ্যা দেন। দামি সিগ্রেট। পরে লাগতে পারে। আমার কাছে আরও মজার জিনিস আছে। আপনি আগে সিগ্রেট খাওয়া শিখেন, তারপর হৈগুলাও আপনেরে আমি দিমু। আমার  কাছে গাঁজা আছে, ফেন্সি আছে, টেবলেট  আছে, আছে নাই কি? পোলাপানেরা এইগুলান খাইবার লগে আমারে এক্কেরে পাগল কইরা দেয়। আপনেরেও আমি হেই গুলান দিমু, কিন্তু এখন না। তার সময় আছে।

হেলাল বাড়ি ফিরে দেখে তার মা পাগলা পির বলে একজনের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। হাতে তার মুঠি ভরা সন্দেশ। সেই সন্দেশ তিনি নসুকে খেতে দেবেন বলে তার ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাকুতি মিনতি করছেন। বলছেন, ও নসু, দরজা খোল বাপ। এট্টুখানি সন্দেশ খা। এই সন্দেশ খেলে তোর বালামুসিবত সব সেরে যাবে, বাবা। একটু খানি দরজা খোল।

কিন্তু ঘরের ভেতর থেকে নসু রেগে রেগে উঠছে। হম্বি তম্বি করছে। গালি দিচ্ছে। হেলাল শুনতে পেল ভেতর থেকে নসু বলছে, আপনি এখান থেকে চলে যান। আপনি শয়তানের চ্যালা। আপনার কোনো কথা আমি বিশ্বাস করি না।

অবস্থা দেখে মনে মনে ভীষণ রাগ হলো হেলালের। রোজ তাদের বাড়ির ভেতরে এই ধরনের কা-বা- চলছে। এই নসু ভাইয়াকে নিয়ে বাড়ির সকলের বাড়াবাড়ি। বিশেষ করে তার মাবাবার যেন নসু ছাড়া আর কোনো ছেলেমেয়ে নেই।

হেলাল কারও সাথে কথা না বলে গটগট করে নিজের ঘরে ঘুমোতে চলে গেল। আগে সে নসুর সাথে এক ঘরে ঘুমোত। ভাইয়া বেশি কথা বলত না তার সাথে। তবু ভাইয়ার সাথে একঘরে ঘুমোত বলে কতনা খুশি থাকত তার মন। সেই ভাইয়া একদিন তার মাথার কাছে চোখ বড় বড় করে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, তুই আমার ঘর থেকে বেরো। নইলে তোকে লাথি মেরে বের করে দেব। আমার সাথে ফাজলামো?

তো সেই থেকে হেলাল আলাদা ঘরে। ভাইয়ার সাথে আজকাল তার কোনো কথা হয়ই না বলতে গেলে। কথা বলবে কি, হেলালকে যেন খেয়াল করেই দেখেনা আজকাল নসু। তার চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেও সে থাকে অন্যমনস্ক। নসুর এ ধরনের ব্যবহার আজকাল হেলালের ভেতরে জাগিয়ে তুলছে বিদ্রোহ। কেন, সে কি এ বাড়ির ফ্যালনা নাকি? সে কি বানের জলে ভেসে এসেছে?

এসব ভাবে হেলাল আজকাল। এখন এই মুহূর্তে কথাগুলো আবার তার মনে হলো। মনের ভেতরে বিতৃষ্ণা জমা হতে লাগল। শুধু নসুভাইয়ার প্রতি নয়, বাড়ির সকলের প্রতি। হেলাল এদিক ওদিক তাকিয়ে জামার পকেট থেকে আবার বের করে আনল আধ খাওয়া সিগারেটটা। সেটা আবার ধরাবে কিনা ভাবতে লাগল।

কিন্তু সিগারেটা ধরাতে না ধরাতে দরজায় একবার মাত্র টুকটুক আওয়াজ করে বুলি ঢুকে পড়ল।

বুলির এই এক খারাপ স্বভাব। না বলে হুট করে ঘরে ঢুকে পড়া। তার মা বশিরা জানেন, হেলাল ঘরের দরজা লাগিয়ে পড়তে বসতে ভালোবাসে। লেখাপড়া করার সময় সে কোনো গ-গোল পছন্দ করে না। তাহলে তার মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটে।

তাছাড়া এমনিতেও এই ছেলেটি লেখাপড়ায় একটু কাঁচা, সেটা বশিরা বোঝেন। হয়ত এজন্যে তাকে বেশি পড়তে হয়।

কিন্তু বুলির এতসব বিবেচনা নেই। সে আর হেলাল সাধারণত একঘরে বসে লেখাপড়া করে। কিন্তু সে বুঝতে পারে হেলাল ভাইয়া আজকাল এ ব্যাপারে একটু আপত্তি তুলছে। লেখাপড়া করার সময় সে অন্য কাউকে তার সাথে পড়তে দিতে রাজী নয়। এতে করে নাকি তার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে। অথচ এতদিন তারা এই এক ঘরেই নিজের নিজের টেবিলে বসে লেখাপড়া করে এসেছে।

ঘরে ঢুকে বুলি দু’ দুবার নাক টেনে দেখল। কীসের গন্ধ শুঁকে দেখল সে। তারপর বলল, তোমার ঘরে সিগারেটের গন্ধ পাই, ভাইয়া।

বুলির কথা শুনে প্রাণ উড়ে গেল যেন হেলালের। সে গম্ভীর মুখে বলল, বেশি বাজে বকিস নে তো। হুট করে না বলে ঘরে ঢুকবি আর একেকটা আজেবাজে কথা বলবি।

বুলি হেলালের কথায়  ঘাবড়ে না গিয়ে বলল, আমি তোমাকে পাড়ার মুদি দোকানে দাঁড়িয়ে ঐ দুষ্টু দোকানদারের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি আজ বাড়ি ফেরার পথে। তুমি জানো না, ঐ লোকটা খুব খারাপ। ছোট ছোট বাচ্চাদের কাছে পর্যন্ত সে কী যেন একটা গুঁড়ো পাউডার বিক্রি করে।

বুলির কথা শুনে যেন রুখে উঠল হেলাল। চেঁচিয়ে বলল, আর তুই যে এ পাড়ার হিরু গু-ার সাথে তার হো-ায় চেপে সেদিন নিউমার্কেটে গিয়েছিলি, সেটা যদি আমি মাকে বলি, তখন কি হবে? হ্যাঁ, তখন?

হেলোলের কথা শুনে ঠান্ডাচোখে বুলি তাকিয়ে থাকল তার মুখের দিকে।

সে দৃষ্টিতে কী যেন ছিল, হেলাল হঠাৎ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, আচ্ছা, শোধবোধ। আর কক্ষনো হিরু গু-ার হো-ায় বসবিনে। তাহলে কিন্তু তোর বিপদ হবে।

 

৭.

আজ আবার নিমির সাথে কাজলদের বাসায় এসেছে রোকসানা। অথচ প্রথমে সে মন থেকে চায়নি আসতে। কিন্তু নিমি যখন বলল যে আমজাদ তাকে যেতে বলেছে তখন কেন যেন সে আহ্বান ফেলে দিতে মন চাইল না তার। এদিকে মিথুনের সাথে এখনও তার রেষারেষি চলছে। ক’য়েকবার সে চেষ্টা করেছে মিথুনের সাথে কথা বলতে কিন্তু সফল হয়নি। একবার একটা চিরকুটও পাঠিয়েছে কোচিং সেন্টারের পিয়নের হাতে, শুধু এইটুকু বলে যে, মিথুন এত রাগ ভালো না!  আমি তোর কী করেছি?

ব্যস শুধু এই দুটো লাইন। রোকসানা ভেবেছিল মিথুন এই মেসেজ পেয়ে তাকে ফোন করবে। কিন্তু করেনি বা যোগাযোগের কোনো চেষ্টাও নেয়নি। এখন তাহলে রোকসানা কি করবে? তার তো এদিকে সময় কাটতে চায় না। শোকের মতো প্রবল একটা কিছু তার বুকের ভেতর থেকে ফুঁড়ে বাইরে বেরোতে চায়। তার দিনরাত কিছু ভালো লাগে না। রোকসানা কোনোদিন কারও প্রেমে পড়েনি। এটাকে প্রেম বলে কীনা রোকসানা তাও জানে না। যদি এটা প্রেম হয় তাহলে রোকসানা মরে যাবে। কারণ বিরহ সহ্য করার মতো ক্ষমতা তার নেই। রোকসানা তাহলে পা পিছলে ফেলবে। সে চলে যাবে অন্য কোথাও। অন্য কারও কাছে। বিরহ যে শোকের মতো হয়, কিছু না পাওয়ার শোক বা কিছু পেয়েও হারিয়ে ফেলার শোক এ ধরনের কষ্টের জন্যে রোকসানা এখনও প্রস্তুত নয়। তার বয়স মাত্রই উনিশ। উনিশ বছর বয়সে শোকের এরকম  উৎপাত  রোকসানা সহ্য করতে পারবে না।

নিমির সাথে রোকসানা আবার গিয়ে হাজির হলো কাজলদের বাড়ি। সেদিনের মতো কাজল আজও দরজা খুলে দিল। সেদিনের মতো আমজাদকেও বসে থাকতে দেখল তাদের সিটিং রুমের সোফায়। সপ্তাহের এই সময়টা তারা বেছে নেয় কারণ এইদিন কাজলের ভাবি তার বাপের বাড়ি যায় বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে এবং সারাদিন সেখানেই থাকে। কোনো কোনোদিন রাতেও থেকে যায়। সেজন্যে বলতে গেলে এই সময়টুকু কাজলের নিজস্ব। কাজলের বড়ভাই এখন আমেরিকায়। আমেরিকার সিটিজেনশিপ পাওয়ার জন্যে তাকে বছরের কিছু মাস আমেরিকায় থাকতে হয়। আবার সে ফিরে আসে কিছুদিনের জন্যে বাংলাদেশে। তবে এবছরেই তার সিটিজেনশিপ হয়ে যাবে শুনেছে। বাংলাদেশে তার কনসালটিং ফার্ম আছে। ফার্ম ভালোই চলে। ফার্মের পয়সাতে সে দেশ বিদেশ করে। কিন্তু আমেরিকার কাছে এসব ভালো কিছুই না। আমেরিকায় যেতে পারাটাই পৃথিবীর ভেতরে সবচেয়ে ভালো। বলা যায় হয়ত স্বর্গের কাছাকাছি।

এসব ধারণা অবশ্যি রোকসানার। নিমির কাছে শুনে শুনে এইসব ধারণা করেছে রোকসানা। নিমি বলেছে আমেরিকা মানে স্বাধীনতা। আমেরিকা মানে যা ইচ্ছে করে তাই। নিমি শুধু শাড়ি, সাওলোয়ার কামিজ নয়,  প্যান্টশার্ট পরে রাস্তায় চলতে চায়। এমনকি ইচ্ছে হলে হাফপ্যান্ট পরে সে রাস্তা দিয়ে হাঁটবে। একটা বিদেশি ম্যাগাজিনে নিমি নাকি হাফপ্যান্ট পরা অবস্থায় একজন মহিলা টিচারকে স্টুডেন্ট পড়াতে দেখেছে ক্লাসে। কী স্বাধীনতা! ভাবলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। নিমির নিজের চেষ্টায় আমেরিকা যেতে হয়ত বহুদিন লাগবে, কিন্তু কাজলের সিটিজেনশিপ হয়ে গেলে আর তাকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। তখন সে আমেরিকা গিয়ে প্রথমেই পোশাকের স্বাধীনতা উপভোগ করবে। কেউ তাকে টিটকারি বা গালি দেবে না বা ধর্ম চলে গেল বলে ধুঁয়ো তুলবে না, এইটা সে দেখতে চায়। বাংলাদেশের মতো দেশে তার দম বন্ধ হয়ে আসে। বাংলাদেশের জন্যে নিমির জন্ম হয়নি। সে আরও বড় দেশে বসবাসের উপযুক্ত।

রোকসানা অবশ্যি বলেছে সে রকমের স্বাধীনতাও নিমি বাংলাদেশে পাবে ভবিষ্যতে। কারণ পোশাকের ব্যাপারে মেয়েরা আজকাল সচেতন। আধুনিক প্রযুক্তি অতি দ্রুত বাংলাদেশে এসে যাচ্ছে। হয়ত শিগগির ইমেইল, ইন্টারনেট, মোবাইল এসে যাবে। তখন বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের যোগাযোগ ঘটবে খুব দ্রুত। বাংলার মেয়েরাও আর পোশাকের ব্যাপারে শুধু শাড়ি আর সালোয়ারে আটকে থাকবে না। কিন্তু উত্তরে নিমি বলেছে ততদিনে তার চুলে পাক ধরে যাবে। তার যৌবন শেষ হয়ে যাবে। তখন তার বোরকা পরার সময়!

তার কথা শুনে তখন রাগ করে রোকসানা বলেছে, নিমি, তুই শুধু পোশাকের স্বাধীনতার কথা বলছিস। কিন্তু সভ্যতার কথা বলছিস নে। স্বাধীনতার সাথে সাথে সভ্যতারও একটা কথা আছে। সৃষ্টির আদিকালে মানুষ ন্যাংটো থাকত। তার কোনো দরকার ছিল না পোশাকের। কিন্তু সে ক্রমে পোশাক আবিষ্কার করল।  কিন্তু কেন? কী তার দরকার ছিল? অথবা পোশাক হিসাবে গাছের ছালবাকল তো যথেষ্ট ছিল দুনিয়াতে, তাহলে আরও ভালো পোশাকের সন্ধান করল কেন মানুষ?  কোনোরকমে লজ্জাস্থান ঢেকে রাখলেই তো চলত।  কিন্তু মানুষ তা করল না কেন? সে আরও ভালো করে তার শরীর ঢাকতে চাইল কেন?

এখন আমেরিকা সভ্যতার শিখরে উঠে তার শরীর থেকে খুলে ফেলছে পোশাক, কারণ পোশাকটাকে তার বড়ই একটা বোঝা বলে মনে হচ্ছে। তাহলে ঐ সংক্ষিপ্ত পোশাকটাকে তার ধরে রাখার দরকার কি? সমস্ত আমেরিকা একটা ন্যুডকলোনিতে রূপান্তরিত করলেই তো চলে! তাহলে মানুষ যেমন চরম পোশাকের স্বাধীনতা ভোগ করল, তেমনি চরম যৌনতারও জয়গান করল। মানুষ দেহে মনে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করল। মাথাভর্তি জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন এবং ধর্ম নিয়ে মানুষ হেঁটে চলল ন্যাংটো! আমেরিকাকেই আমি এক্ষেত্রে সামনে রাখব কারণ আমেরিকা হচ্ছে তোর কাছে সভ্যতার চরম নিদর্শন একটি দেশ।

রোকসানার কথার ভেতরে এমন কিছু ছিল যার পর নিমি দুদিন তার মুখ দেখেনি।

এখন রোকসানা বুঝে গেছে নিমি কাজলের মাধ্যমে আমেরিকা যাবার স্বপ্ন দেখছে, নিমিকে এখন আর ঠেকানো যাবে না। এজন্যে তার মাথায় যত রকমের যুক্তি আছে সব সে প্রয়োগ করছে।

আজ কাজলের মুড খুব ভালো মনে হচ্ছে। দরজা খুলে একগাল হেসে কাজল বলে উঠল, ওয়েলকাম লেডিস। প্লিইজ, কাম ইন। হোয়াট সার্ভিস ক্যান আই অফার ইউ, ম্যাডাম?

উত্তরে নিমি মুচকি হেসে বলল, আমাদের সাথে দুষ্টুমি করো না কাজল। আমি তোমার মতো ইংরেজি বলতে পারিনে তুমি জান। তবু যদি ইংরেজিতে জিজ্ঞেস কর, তো ইংরেজিতেই উত্তর দিতে হবে আমাকে। কথাটা বলে মুহূর্তের ভেতরে গলার স্বর পরিবর্তন করে গম্ভীর হয়ে নিমি বলল, ডোন্ট ওয়ারি মাই বয়, উই ক্যান লুক আফটার আওয়ারসেলভস!

তার ইংরেজি শুনে তো কাজল অবাক। এতদূর? বলে উঠল সে। তলে তলে এভাবে ইংরেজি শেখা হচ্ছে, হ্যাঁ? বলে উঠল কাজল।

আমজাদ কাজলের কথা এবং নিমির ব্যবহার দেখে হাসতে হাসতে কাজলকে বলল, তুই মনে করিস বুঝি শুধু তোর বুদ্ধি আছে আর নিমির নেই? তুই আমেরিকায় চলে গেলে নিমি কি বসে থাকবে?

না, না, আমি তা কোনোদিন মনে করিনি। বলল কাজল। তারপর রোকসানা আর আমজাদের চোখের সামনেই নিমিকে জড়িয়ে ধরে বলল, ডারলিং, আই লাভ ইউ!

তার কথা শুনে হেসে উঠল নিমি। মনে মনে কাজলের ব্যবহার দেখে লজ্জা পেলেও হাসল রোকসানা। আমজাদ যেন খুব মজা পেয়েছে, এইভাবে হাসতে লাগল।

কাজল আমজাদের হাসি দেখে রাগ করে বলল, তুই শালা হাসিস কেন, তুই তো এই কথাটা বলার মানুষও এতেদিন ধরে খুঁজে পেলিনে।

মানুষ জুটে যাবে রে দোস্ত, তুই এত চিন্তা করিস নে। কথা শেষ করে আমজাদ গভীর চোখে রোকসানার দিকে তাকাল। সে দৃষ্টির অর্থ বুঝে চোখ নামিয়ে হাসল রোকসানা। সে মনে মনে আমজাদকে কোনো পাত্তা দেয় না। কিন্তু এরকম প্রেম প্রেম খেলতে দোষ কি! মিথুন যখন এভাবে তাকে বিরহের ভেতরে রেখে দিয়ে কষ্ট দিচ্ছে, তখন তো তাকে বাঁচতে হবে, নাকি?

নিজের মনের ভেতরে নিজের ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি খুঁজে বের করতে লাগল রোকসানা।

নিমি আর কাজল পাশের ঘরে অর্থাৎ কাজলের ঘরে চলে গেলে রোকসানা আমজাদের দিকে ফিরে বলল, তুমি কি রোজ কাজলের বাসায় আসো?

উত্তরে আমজাদ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, না তো, আমি তো রোজ এখানে আসিনে, আমার এত সময় কোথায়?  আজ তুমি এখানে আসবে জানতে পেরে এলাম। যতদূর জানি, এ বাসায় রোজ যদি কেউ আসে সে হলো  তোমার বন্ধু নিমি। নিমি অবশ্যি আমারও বন্ধু। কিন্তু কাজলের সাথে তার প্রেম আছে, তাই তার সাথে কাজলের সম্পর্কটা একটু আলাদা।

কথাটা বলে আমজাদ সোফার একপাশে সরে বসে বলল, আমার এখানে এসে বসো। তোমার হাতটা সেদিন ভালো করে দেখতে পারিনি।

কথাটা সত্যি ছিল। কারণ হাত দেখতে বসার পরপরই বাসায় ফিরে এসেছিল কাজলের ভাবি। এসে দেখে কাজলের বন্ধু আমজাদ অচেনা একটি মেয়ের সাথে বসে কথা বলছে। দেখে একটু অবাক হয়ে আমজাদের দিকে তাকিয়েছিল। আর উত্তরে আমজাদ বলেছিল, এ নিমির বন্ধু, ভাবি। নিমির সাথে এসেছে। নিমি কাজলের ঘরে বসে কথা বলছে। কাজলের ভাবি সেকথা শুনে ভদ্রতা করে বলেছিল, তাই নাকি? নাম কি?

নাম বলেছিল রোকসানা।

বসো তোমরা, গল্প করো, আমি আসছি।

এরপর ভাবি তার ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। আজ অনেকবছর বিয়ে হয়েছে কিন্তু ভাবির সংসারে এখন পর্যন্ত কোনো সন্তান আসেনি। হয়ত  আমেরিকায় গিয়ে বাচ্চা সংসারে আনার জন্যে চিকিৎসা করবে।  মহিলাকে দেখে তখন ভেবেছিল রোকসানা। কারণ সে নিমির মুখে কথাটা শুনেছে।

আজ রোকসানার ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোর ভেতরে অনেকক্ষণ ধরে থাকল আমজাদ। কী যেন ভাবতে লাগল। অবস্থা দেখে রোকসানা তার হাত টান দিয়ে বলল, কই, কিছু বলছ না যে?

ওঃ, হ্যাঁ, কিছু তো বলবই। একথা বলে আমজাদ তার হাতের রেখা পরীক্ষা করতে করতে বলল, তুমি অনেকদিন বাঁচবে। তোমার লাইফলাইন অনেক লম্বা। মাঝখানে কোনো বড় অসুখ হবে তোমার, তারপর আবার সেরে উঠবে। এজন্যে তোমার জীবন রেখায় একটা ব্রেক আছে।

কী অসুখ হবে আমার? আমজাদের কথা শুনে গম্ভীর হয়ে বলল রোকসানা। এখন সে একটু একটু আমজাদকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। কারণ তার বাড়িতে তার ভাই নসু গুরুতর একটা মানসিক অসুখে ভুগছে। কে বলতে পারে রোকসানাও হয়ত একদিন নসুর মতোই আপনমনে বিড়বিড় করতে শুরু করবে? দু’ভাইবোন একসাথে বিড়বিড়ানি অসুখে ভুগবে। তখন তার মা শুধু নসুর জন্যে নয় তার জন্যেও বাড়িতে ডেকে আনবে পির সাহেব। আর সে পির তাকে নিয়ে বন্ধ দরজার ভেতরে কীসব করবে আর রোকসানা চিৎকার করে উঠবে। বলবে, না, না, না!

তার ভাই নসু তো বন্ধ দরজার আড়ালে এভাবেই মাঝে মাঝে চিৎকার করে। আর ভেতর থেকে তার উত্তরে সে পির সাহেবের ধমকানি শুনতে পায়।

রোকসানার মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ যেন ঘাবড়ে গেল আমজাদ। বলল, ওকি, তোমার চেহারা ওরকম দেখাচ্ছে কেন? আরে, হাতের রেখা মানুষের মাঝে মাঝে পাল্টে যায় জানো না? তুমি কি ভাবছ তোমার সত্যি সত্যি কোনো কঠিন অসুখ হবে?

রোকসানা কোনো কথা বলল না। আর সেই ফাঁকে আমজাদ তাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ভয় করে না সোনা, ভয়ের কি আছে? কথাটা শেষ করে সে তাকে চুমো খেতে গেল। মুখে বলল, ওঃ, রোকসানা , তোমাকে প্রথম দিন দেখেই আমি ভালোবেসে ফেলেছি! প্লিইজ, আমাকে ভালোবাসতে দাও, জান।

প্রথমে না , না , বলে মুখ সরিয়ে নিতে গেল রোকসানা। তার শরীর শক্ত হয়ে এল। হাত পা কাঁপতে লাগল। তারপর ভাবল মুখ সরিয়ে কী হবে? কার জন্যে মুখ সরিয়ে নেবে সে? আর কেনইবা নেবে?

হঠাৎ তার ভেতরে একটা পরিবর্তন টের পেল রোকসানা। আমজাদের বুকের ভেতরে ক্রমাগত যেন গলে যেতে লাগল সে। যেন একটা রূপান্তর ঘটে যেতে লাগল তার ভেতরে।  সে তার বুকে মুখ ঘষতে ঘসতে বলল, আমাকে তুমি ভালোবাসো?

তাকে বুকের ভেতরে ধরে রেখে তার মুখে, বুকে চুমো খেতে খেতে আমজাদ বলল, হ্যাঁ, অনেক। অনেক। প্রথমদিন থেকেই। তুমি জানো না এ ক’সপ্তাহ আমার কেমন করে কেটেছে।

তাহলে আমাকে দেখে তুই মুখ ফিরিয়ে নিস কেন? কেন, আমার কাছে তুই কেন এগিয়ে আসিস নে? তুই জানিস এ কটা সপ্তাহ আমার কেমন করে গেছে? তুই কি বুঝতে পারিস? আমি ভেতরে ভেতরে ক্ষয় হয়ে গিয়েছি রে!

আমজাদ রোকসানার কথা শুনে হঠাৎ থমকে গিয়ে নিজের বুক থেকে রোকসানাকে তুলে তাকে চোখের সামনে রেখে বিস্মিত হয়ে বলে উঠল, আমি তো তোকে কখনো দূরে সরিয়ে রাখিনি। সেই প্রথম দেখা থেকেই। এ তুই কি বলছিস?

একথা শুনে তার বুকের ভেতর থেকে জোর করে বেরিয়ে এসে লজ্জিত মুখে রোকসানা বলল, আমি জানিনে!

কথাটা বলে তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। এই কথাগুলো সে তো আমজাদকে বলেনি। একথাই বলেছে এমন একজনকে যে তার মুখের দিকে আজ কতদিন ধরে তাকায় না!

 

৮.

মকবুল হোসেন আজ সকাল থেকে তার টেলিফোন বইয়ের পাতা হাতড়ে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন ভদ্রলোকের নাম। তার কাছে সেই মানুষটার ঠিকানা আছে যাকে তিনি খুঁজছেন। সেই লোকটির সাথে অনেক আগে তার সদরঘাটে দেখা হয়েছিল। সে বলেছিল বুলির চরে একজন দরবেশ বাস করেন। লোকালয় থেকে অনেকদূরে। তার কাছে নাকি অনেক অলৌকিক ধরনের ছায়া আসে। ছায়াগুলো দরবেশের বাড়ির উঠোনে নড়েচড়ে বেড়ায়। তাদের দিয়ে তিনি অনেককিছু অঘটন ঘটাতে পারেন। দরবেশ বাবা খুব রাগী। সহজে কারও সাথে তিনি কথা বলেন না। কিন্তু একবার যদি কষ্ট করে তার কাছে পৌঁছোনো যায় এবং তার সুনজরে পড়া যায়, তাহলে নসুর একটা হিল্লে হতে পারে।

গত কয়েকদিন ধরে মকবুল হোসেনের ঘুম হচ্ছে না ছেলের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে। তার বা তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর নসুর ভবিষ্যৎ কী? সে কি তাহলে তার ছেলেবেলায় দেখা গ্রামের মাঠেঘাটে রাত বিরেতে ঘুরে বেড়ানো মোকসেদ পাগলা হয়ে যাবে? মানুষের দূরছাই শুনে দিন পার করবে। তার অন্যান্য ছেলেমেয়েদের ওপর তিনি ভরসা করবেন কী করে। তারা বা তাদের কেউ কি নসুর জন্যে এতবড় দায়িত্ব নেবে? না। সেটা সম্ভব নয়। তাই তার জীবদ্দশায় নসুর একটা ব্যবস্থা করে যেতে হবে। তার মেয়ে রোকসানা অবশ্য বলে নসুকে ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু ডাক্তারের ওপর মকবুল হোসেনের কোনো আস্থা নেই। তার অফিসেরই একজন কলিগ কিছুবছর আগে বলেছিল কী জানি এক ইনজেকশন দিয়ে তার ছেলের হাতপা ঘাড় সব বেঁকে গিয়েছিল। তারপর থেকে সেই ডাক্তারের কাছে যাওয়া সে ছেড়ে দিয়েছে। সেই ছেলে পরে চৌমুহনির পিরের আখড়ায় গিয়ে তার তরিকা মেনে পানি পড়া খেয়ে এখন অনেকটা সুস্থ।

মকবুল হোসেন নসুর অসুখ শুরু হবার পর থেকে নিজেই একটু বেতাল অবস্থার ভেতরে আছেন। এখন তার নিজের কাছে নিজেকেই মনে হয় যেন অসুস্থ। নসু সর্বক্ষণ বাইরের শত্রুর ভয়ে তটস্থ থাকে। ঘরের দরজা জানালা সব বন্ধ করে রাখে। ঘর অন্ধকার করে রাখে। জানালার পর্দা একটু ফাঁক করে রাস্তার দিকে চোখ ফেলে রাখে। তার অবস্থা দেখে মনে হয় নসু এমন কিছু জানছে যা এ পৃথিবীর আর কারও জানার কথা নয়। তার এ রকম ব্যবহার দেখে মানুষ অবাক হতে পারে, কিন্তু নসুর সন্দেহের সবটুকুই কি মিথ্যে? এমন কি হতে পারে না নসুর ভেতরে একটা দৈবশক্তির উদয় হয়েছে , যে ঠিক পথ খুঁজে পাচ্ছে না যে কীভাবে এগুলে সে তার ধ্যানধারণাগুলো মানুষদের বিশ্বাস করাতে পারবে? সে যখন আপন মনে মিটিমিটি হাসে, তখন তো তাকে সত্যিই একজন অতীন্দ্রিয়বাদী বলে মনে হয়?

কথাটা ভেবে নিজের মনে মাথা নাড়তে লাগলেন মকবুল হোসেন। এসব ভাবতে ভাবতে একমনে টেলিফোনের ছোট্ট বইটি খুঁজতে লাগলেন তিনি। লক্ষ্য করে দেখলেন বইটির প্রায় অর্ধেক জুড়ে ইরেজি এস অক্ষরটি রাজত্ব করছে! বাংলাদেশে যে এত অসংখ্য মানুষ এস অক্ষর দিয়ে তাদের নামের বানান শুরু করে এটা যেন তার জানা ছিল না। তবে এটা হয়ত সত্যি নাও হতে পারে। হয়ত শুধু মকবুল হোসেনের টেলিফোন ডায়েরিতেই এস অক্ষরের অহেতুক আধিপত্য। কে জানে। ভাবতে ভাবতে আর খুঁজতে খুঁজতে তিনি পেয়ে গেলেন সেই নামটা। শমসের আলি। নামটা ছোট। কিন্তু এটা খুঁজতে তাকে বেগ পেতে হলো খুব। প্রথম তো ডায়েরিতে হাতের লেখার অক্ষরগলো খুব ছোট ছোট, তারপর কাগজের রঙ হলো হলদেটে ধরনের।

খুব শিগগির এদেশে মোবাইল ফোন এসে যাবে। মকবুল হোসেন ডায়েরির পাতা ঘাঁটতে ঘাঁটতে ভাবেন। তখন হয়ত এরকমভাবে ডায়েরির ভেতরে নাম এবং টেলিফোন নম্বর লিখে রাখার প্রয়োজন হবে না। সব কিছু মেশিনের ভেতরে থাকবে। তবে কতদিনে এই ব্যবস্থা চালু হবে কে জানে। শুনেছেন ইয়োরোপ আমেরিকায় নাকি এই মেশিন এসে গেছে। হাতের মুঠোর ভেতরে এ মেশিন নাকি লুকিয়ে রাখা যায়। কথাটা শুনে মকবুল হোসেনের মনে রোমাঞ্চ হয়েছে। এই কল্পনায় রোমাঞ্চিত হতে তার বাধেনি।

খুঁজতে খুঁজতে নামটা পেয়ে গেলে একটু ভাবলেন মকবুল হোসেন। চট করে ফোন করলেন না। ভাবতে লাগলেন। তারপর রিসিভার হাতে ওঠালেন। কিছুক্ষণ বাজার পর ও প্রান্ত থেকে একজন কিশোর ফোন তুলল। মকবুল হোসেন নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন যে, তিনি শমসের আলির সঙ্গে কথা বলতে চান। তার কথা শুনে অন্যপ্রান্তের কিশোরটি বলল, আপনি ফোন ধরেন, আমি আব্বাকে ডেকে দিচ্ছি। তার কথা শুনে ফোন ধরে থাকলেন মকবুল হোসেন। একটু পরে প্রৌঢ় মতো একজন ভদ্রলোকের গলা শোনা গেল। তিনিই শমসের আলি। এপ্রান্তে গলাখাঁকারি দিয়ে মকবুল হোসেন বললেন, আমার কথা কি আপনার মনে আছে?

আপনি কে? ও প্রান্ত থেকে বললেন শমসের আলি।

আমি মকবুল হোসেন। বছরখানেক আগে আপনি আমাকে জাহাজঘাটায় দাঁড়িয়ে বুলির চরের দরবেশ বাবার কথা বলেছিলেন। সেই দরবেশবাবা যার বাড়ির উঠোনে ছায়ারা ঘোরাঘুরি করে। যিনি তাদের সাহায্যে মানুষের অনেক বালামুসিবত দূর করতে পারেন। মনে আছে?

জি, মনে আছে। ওপ্রান্তে গলার স্বর এবার বেশ সহজ হয়ে এল। শমসের আলি বললেন, কিন্তু ভাই সাহেব, সে দরবেশের শরীর এখন খুব খারাপ। একেবারে বিছানায় শয্যাশায়ী বলা যেতে পারে। বয়সও হয়েছে হুজুরের। একশো বছর ছাড়িয়ে গেছে স্থানীয়রা বলে। এখন গিয়ে কি কিছু লাভ হবে?

ভাই, টেলিফোনের এ প্রান্তে একেবারে হাউমাউ করে উঠলেন মকবুল হোসেন। বললেন, ভাই, তার মৃত্যুর আগেই আমাকে তার আস্তানায় গিয়ে পৌঁছতে হবে। আমার ছেলেটার অবস্থা দিনকে দিন খারাপ হয়ে উঠছে। আপনি আমাকে যদি একটু সাহায্য করতেন তাহলে আমি বড়ই উপকৃত হতাম। যাতায়াতের সব খরচ আমিই বহন করব। দিনে দিনে যাব, আর দিনে দিনে ফিরব।

মকবুল হোসেনের গলার স্বরের ভেতরে সেই আবেদন ছিল যা  চট করে বাতিল করে দেয়া যায় না। একটুক্ষণ চুপ থেকে শমসের আলি বললেন, আমি তো চাকরি করি। একটা ছুটির দিন ছাড়াতো আর যাওয়া সম্ভব নয়।

তাই হবে ভাইসাহেব। ছুটির দিনেই যাব আমরা। কারণ আমিও সচিবালয়ে চাকরি করি। এমন কোনো বড়পোস্ট না, তবে আছি একরকম। আপনি যদি রাজি থাকেন তাহলে এই শুক্রবারেই আমরা রওনা দিতে পারি।

আমাদের মাওয়া দিয়ে যেতে হবে, ঠিক আছে? আপনার কি গাড়ি আছে?

জি আছে, তবে তা সরকারি গাড়ি। ছুটির দিনে গাড়ি চাইলে আগে থেকে বলে রাখতে হয়। কারণ ড্রাইভার পাওয়াটা একটু টাফ ছুটির দিনে।

তাহলে আপনি আগে থেকে বলে রাখেন। আল্লা চাহে তো আমরা হয়ত গিয়ে তাকে জিন্দা দেখব।

কথা শেষ করে ফোন রেখে দিলেন শমসের আলি।

মকবুল হোসেন এবার ভাবতে লাগলেন। তিনি একা যাবেন নাকি নসুকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। অনেক ভেবে তাকে সাথে করে নিয়ে যাওয়াই ঠিক করলেন। অন্তত তাকে চোখে দেখলেই দরবেশ বাবা বুঝতে পারবেন ঠিক কী ধরনের সাহায্য তার দরকার।

রাতের বেলা খাওয়াদাওয়া শেষ হলে মকবুল হোসেন বশিরা খাতুনের সাথে পরামর্শ করতে বসলেন। টাকাপয়সারও চিন্তা করতে হয়। যে লোকটি তার সঙ্গী হবে তার পথখরচও তাকেই তো দিতে হবে, কারণ এটাই হলো ভদ্রতা। তার ওপর স্টিমারে কিছু খাওয়াদাওয়াও আছে।

বশিরা সব শুনে এবং সম্মতি জানাবার পরও বললেন, কিন্তু নসু যদি যেতে না চায়? যদি সে বেঁকে বসে? তখন কী হবে?

কেন, নসু যেতে চাইবে না কেন? আমি তাকে বলব একটু নদীর ওপাড় থেকে ঘুরে আসি। এইকথা বলব। তাহলে সে যেতে রাজী হবে। তুমি তো জান নসু নদী দেখতে খুব ভালোবাসে? ছেলেবেলায় নানাবাড়ি গিয়ে কীভাবে পুকুরে ঝাঁপাত?

বশিরার সবই মনে আছে। কিন্তু এইসব অতীত স্মৃতি তাকে আর আলোড়িত করে না। বরং এই ধরনের স্মৃতি তাকে খুব বেশি হতাশ করে দেয়। তার মন খারাপ করে দেয়। তখন তার নসু ভালো ছিল। সে একজন ভালো ছাত্র ছিল। সে ক্লাসের ফার্স্টবয় ছিল। বশিরা ভেবেছিলেন ছেলেকে হয় ইঞ্জিনিয়ার অথবা ডাক্তার করবেন। অবশ্যই করবেন। দরকার হলে ছেলেকে বিদেশে পাঠাবেন বা ছেলে নিজেই স্কালারশিপ জোগাড় করে বিদেশ যাবে, কিন্তু বশিরার সে স্বপ্ন শকুনেরা খুবলে খেয়েছে। নসুকে নিয়ে বশিরার এখন একটাই স্বপ্ন সেটা হলো নসু কলেজে ফিরে গিয়ে খুব সাধারণভাবে তার কলেজ পরীক্ষাগুলো পাশ করে বেরোবে। খুব সাধারণ একটা চাকরি করে নিজের জীবিকা নির্বাহ করবে। সে জীবিত থাকতে কারও কাছে হাত পাতবে না, কেউ তাকে করুণা করার সুযোগ পাবে না। এটুকুই এখন বশিরার স্বপ্ন। বশিরা যেন এখন বুঝতে পেরেছেন স্বপ্ন যেমন মানুষকে গিলে খায়, তেমনি অবস্থা বিপাকে মানুষও তার স্বপ্নকে গিলে খেতে পারে!

 

৯.

মিথুনের আজ কিছু ভালো লাগছে না। তার মনের ভেতরে হাবিজাবি চিন্তারা শুধু একবার আসছে আর যাচ্ছে। আজ কতদিন ধরে কোচিং-এ রোকসানার দেখা নেই। হয়ত সে আর কোচিং করতে আগ্রহী নয়। মিথুন রোকসানার সঙ্গে ইদানীং সেভাবে না মিশলেও একটা চোখ সে সর্বদাই ফেলে রাখে রোকসানার গতিবিধির ওপরে। মিথুন জানে রোকসানার ভাই নসুকে নিয়ে ইদানীং সে খুব বিব্রত থাকে। মিথুন জানে না, নসুর রোগের ধরন। শুধু এইটুকু শুনেছে লেখাপড়ার চাপ আর সহ্য করতে পারবে না নসু। তার সে ক্ষমতা নেই। বা ক্ষমতা ঠিক আছে, বুদ্ধি তো আর নষ্ট হয়নি, কিন্তু সেই বুদ্ধিকে কাজে লাগাবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে নসু। শুধু এই ব্যাধিটা হবার জন্যে।

নসুর জন্যে মিথুনের মায়া হয়, কিন্তু সে জানে না কীভাবে তাকে সাহায্য করবে। নসু আর সে তো একসময় এক নটরডেম স্কুল ও কলেজেই পড়ত। যদিও নসু ছিল তার চেয়ে দুবছরের সিনিয়র। কিন্তু খুব দাপটের সঙ্গে এসএস সি পাশ করার পর কলেজের প্রথম বর্ষে সকলকে বিস্মিত করে নসু ফেল করেছিল। একবার তাদের কলেজে হরতাল ডাকা হলো। এরশাদ পতনের জন্যে হরতাল। সেবার সব দল মিলে হরতাল ডেকেছিল। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড, মিছিল, বক্তৃতা, বিবৃতি, খবরের কাগজে লেখালেখি। নসু কীভাবে যেন সেইসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ল। অথচ নসু এসব করার ছেলে নয়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে লাগল। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, মিছিলের সঙ্গে চলতে লাগল নসু। একদিন মিথুনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল নসুর রাস্তায়। আর মিথুন জিজ্ঞেস করেছিল, নাসির ভাই, আপনি মিছিলে?

তার কথা শুনে নাসিরউদ্দিন হোসেন ওরফে নসু বলেছিল, আরে ভাই, একজনের ঘরে আগুন লাগলে কি পাশের ঘরের বাশিন্দা ঠিক থাকতে পারে? এরপরে তো তার ঘরেই আগুন ছিটকে পড়বে। কত ছাত্র মারা পড়ছে, আর আমি ঘরে বসে লেখাপড়া করে কী করব? গুলি, ট্রাকের চাকা, রগকাটা, কী আর বাকি থাকল?

তো সেই নসু ভাই কয়েকমাস পরেই লেখাপড়া ছেড়ে দিল। রোকসানা একবার বলেছিল, তার ভাইয়ের নাকি ডিপ্রেশন হয়েছে। আবার একদিন বলল, তার ভাইয়ের ক্রনিক ডিসেন্ট্রি মতো হয়েছে। যা খায়, তাই হজম হয় না। আবার একদিন বলল, তার ঘাড়ে জিনের আসর বসেছে।

একেকসময় একেরকমের কথা। মিথুনের শেষে মনে হয়েছে আসলে কেউই বুঝতে পারছে না, নসুর রোগের ধরনটা।

এ ব্যাপারে বেশি জিজ্ঞেস করতেও সাহস হয়নি মিথুনের। কারণ মিথুন দেখেছে নসুর ব্যাপারে কোনো প্রকারের আগ্রহ দেখানোটা রোকসানা পছন্দ করে না।

তাই সে সাবধান।

মিথুনের মনের ভেতরে কিছু জটিলতা আছে। এটা বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও মিথুন বোঝে যে সে এখনও সরাসরি রোকসানাকে তার প্রস্তাবে সায় দিতে পারেনি। কেন পারেনি সেটা মিথুন জানে না। মনে হয় ছেলেবেলায় বাবাকে সে হারিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়। তখন তার বয়স ছিল মাত্র চারবছর। তারপর অবস্থার বিপাকে তার মাকে আবার বিয়েতে বসতে হয় যখন মায়ের জন্যে এবং মিথুনের জন্যেও এই বিয়েটা সুখের হয় নি। মিথুন তার সৎবাবার অত্যাচারে কিছুদিনের ভেতরেই মামাবাড়ি চলে আসে। তার কিছুদিন বাদে তার মাও। মা পরে একটা স্কুলে চাকরি নিয়ে মিথুনকে মানুষ করে তুলেছে।

মিথুন বরাবরই লেখাপড়ায় মেধাবী ছিল। যেজন্যে তার মাকে বেশি কষ্ট করতে হয়নি।

এখন তার মায়ের অবস্থাটা একটু ভিন্ন। মা স্কুল থেকে ইচ্ছাকৃত ভাবে রিটায়ার করে এখন একটা ভাড়া বাড়িতে মিথুনের সঙ্গে থাকেন। একদিন রোকসানাকে মিথুন তার মায়ের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। কেন যে নিয়ে গিয়েছিল সে ব্যাপারে মিথুন এখনও স্পষ্ট নয়। তার মা রোকসানার সঙ্গে খুব আগ্রহের সাথে আলাপ করেছিলেন। রোকসানাও তাকে খুব কাছ থেকে দেখে খুশি হয়েছিল। নিজের উচ্চাশার কথা বলেছিল। সে ডাক্তার হবে বা ইঞ্জিনিয়ার। বিদেশে যাবে আরও লেখাপড়া করার জন্যে। পোস্টগ্র্যাজুয়েট শেষ করবে। তারপর পিএইচডি করবে ভবিষ্যতে। তার ভাই নসু যেমন তার বাবা মাকে হতাশ করেছে, সে তা করবে না। সে ছেলে না হলেও মেয়ে হয়েই বাবা মাকে দেখিয়ে দেবে কতদূর সে যেতে পারে। এবং প্রয়োজন হলে সে তার ছোট ভাইবোনেদের পড়াবে। বাবামাকে নিজের কাছে এনে রাখবে। একটা সাধারণ বাঙালি পরিবারের মা-বাবা যেমন একজন ছেলের কাছ থেকে কিছু পাবার আকাক্সক্ষা করে, রোকসানা মেয়ে হয়েই সেই আকাক্সক্ষা পূরণ করবে বাবা-মায়ের।

বাবা-মা ভাইবোনের কথা বলতে বলতে আবেগে গলা ধরে গিয়েছিল রোকসানার। আর মিথুনের মা অবাক বিস্ময়ে তার মুখের দিকে চেয়ে বসেছিলেন।

রোকসানা একসময় হঠাৎ সচেতন হয়ে থেমে গেলে তিনি হেসে উঠে বলেছিলেন, তোমার মা-বাবা খুব ভাগ্যবান যে তোমার মতো মেয়ে তারা জীবনে পেয়েছেন।

একথা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠেছিল রোকসানা। খুশির হাসি। তারপর মিথুনের মায়ের হাতে হাত রেখে বলেছিল, মিথুন স্যারও খুব ভাগ্যবান আপনার মতো মাকে জীবনে পেয়ে।

সে ও মিথুন যখন একসঙ্গে থাকত তখন সে মিথুনকে নাম ধর্ইে ডাকত। কিন্তু বাইরে সে মিথুনকে স্যার বলে ডাকত। মিথুনের যেন কোনো অসম্মান না হয় সেদিকে দৃষ্টি ছিল তার প্রখর।

তারপর অনেকক্ষণ সে মিথুনের মার সঙ্গে বসে গল্প করেছিল। কেন জানি সে মিথুনের মাকে প্রথম থেকেই খুব আপন মনে করেছিল। মিথুনের মায়ের হাতের সেলাই দেখছিল বসে বসে। আর সেসব দেখতে দেখতে রোকসানা একসময় উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠেছিল, আপনি কী সুন্দর সেলাই করেন, অথচ আমি একেবারে সেলাই জানিনে।

উত্তরে মহিলা, মিথুনের মা, রাজিয়া খাতুন, বলেছিলেন, আর আমি যে তোমার মতো এত ভালো ছাত্রী ছিলাম না, মা। সাধারণ বিয়ে পাশ করা একজন মেয়ে। স্বামী যুদ্ধের সময় তার অফিসে বসেই বিহারিদের হাতে নিহত হন  যখন, তখন আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল। কোনোরকমে একটা চাকরি জোগাড় করে ভাইদের সাহায্যে মিথুনকে মানুষ করে তুলি। কোনোদিন কি ভেবেছিলাম যে আমাকে বাইরে বেরিয়ে রুজিরোজগার করতে হবে?

ভদ্রমহিলা রোকসানার কাছে তার জীবনের আরও অনেক দুঃখের কথা বলেননি। বলবার দরকারও অবশ্য ছিল না। তাছাড়া প্রথমদিনেই কি এসব কথা বলা যায়। মুক্তিযুদ্ধের তরুণী বিধবাদের সকলের অবস্থাই তো মোটামুটি একরকমেরই ছিল। কত যে ভাঙচুরের ভেতর দিয়ে, দুঃখ, অশ্রু এবং বঞ্চনার দিয়ে তাদের জীবন কেটেছে, সেসব ইতিহাস কেউ কি মনে রেখেছে? পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, দেশ কেউ কি মনে রেখেছে? এসব ইতিহাস যার যার তার তার। এইসব রিক্ত নিঃস্ব নারীদের জীবন মুক্তিযুদ্ধের পরতে পরতে অশ্রুপ্লাবিত চোখের করুণগাথা হয়ে থেকে যাবে কালের অতলে। কেউ কোনোদিন কোন না কোনো সময় খুঁড়ে বের করবে তাদের বঞ্চনার ইতিহাস। রিক্ত জীবনের দীর্ঘশ^াস। শোক, তাপ এবং হাহাকারের ইতিহাস।

দেশ, সমাজ, সরকার এবং মানুষের অবহেলায় করুণ এই সব মুক্তিযুদ্ধপ্রসূত তরুণ বিধবাদের জীবনালেখ্য।

রোকসানা সেদিন বাসা থেকে চলে গেলে রাজিয়া মিথুনের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, মেয়েটি বড় ভালো রে মিথুন। কিন্তু এরকম উচ্চাশা নিয়ে কোনো মেয়ে কি আমাদের সংসারে আসবে?

আর মিথুন মায়ের কথা শুনে বিরক্ত হয়ে বলেছিল, তাকে কি কেউ এই সংসারে আসার জন্যে মিনতি করেছে, আম্মা? সে আমার আর দশজন ছাত্রী- বন্ধুর মতোই একজন।

এরপর থেকে মেজাজটা যেন খিঁচড়ে গিয়েছিল মিথুনের।

এড়িয়ে চলছিল রোকসানার সংসর্গ।

 

১০.

শুক্রবারে ভোরবেলা নসুকে সাথে করে মকবুল হোসেন বেরিয়ে পড়লেন। শমসের আলির সাথে তার বাসস্ট্যান্ডে দেখা হলো। না, অফিসের গাড়ি তিনি জোগাড় করতে পারেননি। না, কথাটা ঠিক নয়, গাড়ি তিনি জোগাড় করতে পেরেছিলেন, কিন্তু ড্রাইভার জোগাড় করা গেল না। কারণ যে ড্রাইভারের যাবার কথা ছিল তার মা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেছে। জোর করে তাকে নিয়ে এতদূরের জার্নি করানো ঠিক হত না। তাই বাসেই যাওয়া ঠিক করেছেন মকবুল হোসেন। ভদ্রলোককেও বাসে যেতে রাজি করিয়েছেন। এছাড়া আর কোনো উপায় তো ছিল না। অথবা তারিখ পিছিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু সেটা করতে মকবুল হোসেনের মন একেবারে চায় নি। তার মনে শুধু এই আশঙ্কা যে এখন যদি নসুকে ভালো করে, সুস্থ করে না তোলা যায় তাহলে তার নসু আর কোনোদিন ভালো হবে না।

নসুকে নিয়ে তারা মাওয়া পৌঁছে গেলেন বেলা বারোটার ভেতরে। তারপর নদী পার হলেন। নদীর ওপারে গিয়ে পৌঁছলেন প্রায় এক ঘণ্টা বাদে। তারপর সেখান থেকে লোকাল বাস। সেই বাসে ওঠার আগে তিনি আর শমসের আলি ফলুইমাছের ঝোল দিয়ে পেটভরে ভাত খেয়ে নিলেন। নসুকে বারবার করে বলা সত্ত্বেও সে কিছু খেল না। মকবুল হোসেন তখন বুদ্ধি করে কলা আর এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে দিলেন নসুকে। নসু কলার খোসা ছিঁড়ে চারটে কলা খেল। বিস্কুটের প্যাকেট খুলে তার ভেতরটা অনেকক্ষণ ধরে মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করে তারপর দুটো বিস্কুট মুখে দিল। ডাব কিনে দিলে ডাব খেল সে একটা। তারপর বাবার সাথে সাথে চলতে লাগল।

লোকাল বাসে চেপে তারা আবার ঘণ্টাখানেক পথ পাড়ি দিলেন। তারপর এল রিকশাভ্যান। সেই রিকশাভ্যানের তিনদিকে চড়ে তারা সেই প্রখর রোদ মাথায় করে চললেন বুলির চরে। কোথায়, কতদূরে সে বুলির চর কিছু বুঝতে পারলেন না তিনি। একবার মনে হলো এভাবে পাগলামি করে নসুকে নিয়ে এতদূর আসাটা কি ঠিক হলো? নসু বিগত এক বছরে প্রায় দুবার বাড়ি পালিয়েছে। অনেক কষ্ট করে আত্মীয়স্বজনের চোখ এবং কান বাঁচিয়ে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সেয়ানা ছেলে বাড়ির কাউকে না বলে বাড়ি ছেড়েছে, এটা কখনও গ্রহণ করা যায় না। সবচেয়ে বড়কথা হলো এখন পর্যন্ত তিনি নসুকে তার মূল আত্মীয়-স্বজনের চোখের আড়ালে রাখতে পেরেছেন। তার ধারণা নসু যখন একেবারে ভালো হয়ে যাবে, তখন আবার আগের মতো আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখাশোনা করবে। আবার সেই আগের নসু। মাঝখানের কালো অধ্যায়টা থাকবে সকলের অজানা।

রিকশাভ্যানে বসে নসু একভাবে ঘামতে লাগল। তার বড়বড় শ্বাস পড়তে লাগল। যেন তার কোথাও কষ্ট হচ্ছে, এমনি মনে হলো মকবুল হোসেনের। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া লাগল মকবুলের। তিনি আন্দাজেই বলে উঠলেন, আর বেশিদূর নেই রে নসু। আর কিছুক্ষণের ভেতরেই আমরা বুলির চরে পৌঁছে যাবো।

কিন্তু বাবার আশ্বাসের উত্তরে নসু কোনো কথা বলল না। যেন সে কথাটা শোনেই নি।

ঘণ্টাখানেক এভাবে যাবার পর একটা খোলা মাঠের প্রান্তে এসে দাঁড়াল রিকশাভ্যান। সকলে নেমে এল। সূর্য তখন পশ্চিমের দিকে হেলতে শুরু করেছে। মকবুল হোসেন তাকিয়ে দেখলেন। সামনে তার ধু ধু বিরান মাঠ। কোথাও কোনো ঘর বাড়ির চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। কোনো গাছপালাও নেই। অনেকদূরে কিছু বড় বড় গাছের নিশানা দেখা যাচ্ছে। ছোট্ট একটা খাল বা বিলের মতোও দেখা যাচ্ছে।

একটু হতভম্ব হয়ে মকবুল হোসেন শমসের আলির দিকে তাকালেন। শমসের আলি নিজেও একটু চিন্তিত হয়ে পড়েছে। এতকষ্ট করে এতদূর এসে এখন খালি হাতে ফিরতে কে চায়? সে একটু ইতস্তত করে এদিক ওদিক দেখে নিয়ে বলল, আপনারা এখানে একটু দাঁড়ান। আমি একটু ওদিকে দেখে আসি। কথা বলা শেষ করে শমসের আলি উত্তর দিকে হাঁটা শুরু করল। সেদিকেই সেই খালের মতো পানির জায়গাটা আর তার পরে একটুখানি জঙ্গলের মতো। মাথার ওপর গনগনে সূর্য নিয়ে শমসের আলি চলতে লাগল। মকবুল হোসেন এই প্রথম খেয়াল করলেন লোকটা একটু খুঁড়িয়ে হাঁটে। লোকটার পরনে একটা সাধারণ ফুলপ্যান্ট। গায়ে একটা হালকা সবুজ শার্ট। পায়ে একজোড়া চপ্পল। একটা চপ্পলের স্ট্র্যাপ ছেঁড়া। মকবুল হোসেন তাকে পেছন থেকে দেখতে লাগলেন। দেখতে গিয়ে তার মনে মায়ার জন্ম হলো। এরকম মানুষ কোথায় পাওয়া যাবে যে নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে এভাবে মকবুল হোসেনের সঙ্গী হয়েছে। তার বিপদে এভাবে সাড়া দিয়েছে?

ভালো মানুষ তাহলে এখনও দুনিয়াতে আছে? ভাবতে লাগলেন মকবুল হোসেন।

এদিকে রোদে তার মাথা পুড়ে যাচ্ছে। এমন বোকার মতো কাজ করেছেন যে বাসা থেকে বেরোবার সময় কোনো ছাতা সাথে আনেননি। আজকাল ছাতা সাথে করে কে বাড়ি থেকে বেরোয়। তবে এসব অচেনা জায়গায় আসার আগে ছাতা সাথে আনাটা বিশেষ দরকার ছিল।

কিন্তু এখন আর এসব ভেবে কী হবে?

তিনি নসুর দিকে তাকালেন। সে হঠাৎ মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ডনবৈঠক দিতে শুরু করেছে! একবার ভাবলেন ধমক দিয়ে মানা করেন। কিন্তু এখন ধমক দিলে নসু বিগড়ে যেতে পারে। তারচেয়ে যা করছে করুক। শমসের আলি ফিরলেই তিনি নসুকে সাথে করে এই স্থান ত্যাগ করবেন।

তার ভাবনার ভেতরেই ফিরে এল শমসের আলি। বেশ দ্রুততার সাথে সে ফিরল। তার শরীর দিয়ে এখন দরদর করে ঘাম বেরোচ্ছে। শমসের বলল, আসেন, তিনি ঐ দিকে আছেন। একটা ছাপরা ঘরের ভেতরে আছেন। কারও সাথে আর দেখা করেন না। কিন্তু তার মুরিদকে অনেক অনুরোধ করার পরে সে রাজি হয়েছে। তাকে আপনার কিছু পয়সা দিতে হবে। বিনাপয়সায় এসব করতে সে রাজী না।

তাই দিব। আমি তো তার জন্যে প্রস্তুত হয়েই এসেছি। বললেন মকবুল হোসেন।

শমসের আলি তখন ডনবৈঠকরত নসুর দিকে ফিরে বলল, এই রোদের ভেতরে ডনবৈঠক দিলে তো বাবা তুমি আরও ঘেমে যাবে। কিন্তু তার একথা বলার কোনো অপেক্ষা না রেখেই নসু তখন স্রোতের মতো ঘামতে শুরু করেছে। তার কপাল বেয়ে, গলা বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ছে সর্বশরীরে।

আরে নসু, তোর তো হিটস্ট্রোক হয়ে যাবে। এই বলে মকবুল হোসেন ছেলের ঘামে ভেজা হাত মুঠি করে ধরে রওনা হলেন শমসের আলির পেছন পেছন।

হাঁটতে লাগলেন তারা। বিরান রৌদ্রজ্বলা বৃক্ষহীন প্রান্তরে হাঁটতে লাগলেন। হাঁটতে হাঁটতে খালের ধারে এসে পৌঁছোলেন তিনজনে। এসময় মকবুল হোসেনের চোখে পড়ল একটা কলাপাতার ছাপরা। চারদিকে মুলি বাঁশের বেড়া আছে। কিন্তু সামনে কোনো দরজা নেই। সবটাই খোলা। সেখানে গিয়ে মকবুল হোসেন দেখেন একজন অশীতিপর বৃদ্ধ শুয়ে আছে একটা খড়ের বিছানায়। তার পুরো শরীরে শুধু কোমরের কাছে একটুকরো গামছা। শরীরের কাঠামো শীর্ণ এবং অসুস্থ। চোখ দুটো কোটরে যতদূর সম্ভব ভেতরে। কিন্তু শরীরের এই অবস্থাতেও তার চোখের মণিদুটো যেন জ্বলছে। কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকলে মাথার ভেতরে কেমন ঝিমঝিম করে ওঠে। সবচেয়ে তাজ্জবের কথা বাইরে এত বায়ুহীন রোদ কিন্তু এখানে মুলিবাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে হু হু করে বয়ে চলেছে বাতাস। সেই বাতাসে ফকিরের চুল উড়ে যাচ্ছে। তার পরনের বসন মৃদু মৃদু নড়ছে। ফকিরের পাশে মাত্র একজন মুরিদ চুপ করে বসে আছে। মুরিদের চেহারা হতভাগার মতো। মনে হয় লোকালয়ের সাথে এদের আর কোনো সম্পর্ক নেই। মকবুল বুঝলেন এই  ফকির ভিড় পছন্দ করে না। ভিড় দেখলে তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।  আর সেজন্যে এই বিরান প্রান্তরে সে আস্তানা গেঁড়েছে।

মকবুল হোসেন হা করে তাকিয়ে রইলেন ফকিরের দিকে। শমসের আলি প্রথমে ফকিরের পা ছুঁয়ে সালাম করল মুখে কীসব বলতে বলতে। হয়ত কোনো দোয়াদরুদ হবে। তার দেখাদেখি মকবুল হোসেনও। তারপর পা মুড়ে বসে পড়লেন ফকিরের সামনে। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। যেন কি বলতে হবে সেসব ভুলে গিয়েছেন। পুরো পরিবেশ তার মনের ওপরে কেমন যেন একটা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। যেন, কোনো কিছু আর কোনোকিছু নয়। এ দুনিয়া তার মতো করেই চলবে। এ নিয়ে বেশি চিন্তাভাবনা না করাই ভালো।

তারপর হাত জোড় করে বললেন, হুজুর আমার ছেলেটা কোন বদনজরে পড়ে আজ কতবছর ধরে ভুগছে। আমার খুব মেধাবী ছেলে হুজুর। হুজুর, সব জায়গায় বিফল হয়ে শেষে আপনার কাছে আমার আসা। হয়ত এই আসাই আমার শেষ। আমার আর সাধ্যে কুলোবে না এতদূরে এভাবে আসা। আপনি হুজুর আমার এই বেকসুর ছেলেটাকে যদি…

কথা বলে মকবুল হোসেন পেছনের দিকে তাকালেন।  ফিরে দেখলেন নসু নেই! তার এইসব ব্যস্ততার ভেতরে নসু কোথায় চলে গেছে।

ঘুরে দাঁড়িয়ে শমসের আলির দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাই, আমার ছেলে, আমার নসু?

আমি তো তারে চোখে দেখিনি, ভাইজান। হুজুরের কাছে এসে আমি তো সব ভুলে গিয়েছি! আরে, তাইতো আপনার ছেলে? কথা বলে হতভম্ব হয়ে শমসের আলি মুরিদ লোকটার দিকে তাকাল। মুরিদের চেহারাও প্রায় হুজুরেরই মতো। সেইরকম শীর্ণ এবং খেতে না পাওয়া চেহারা। অথচ ঘরের ভেতরেই কত রকমের খাবার পড়ে আছে। পড়ে আছে বস্তাভর্তি মুড়ি, চিঁড়ে, কমলালেবু, আপেল, বেদানা, কিসমিস, আখরোট, আঙুর। কিন্তু তাদের মুখ যেন খোলা হয়নি। কমলাগুলো চিমসে ধরে গেছে। আঙুরগলো কালো হয়ে গেছে শুকিয়ে। মুড়ি চিঁড়ার কী অবস্থা তা বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না। এখানে অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যেন না খেয়ে কীভাবে বেঁচে থাকা যায় তার সাধনা চলছে।

মকবুল হোসেনের যেন মাথা ঘুরে গেল। একে তো বাইরে প্রচ- রোদ্দুর। তার ওপর এই অচেনা অজানা জায়গা। চারদিকে বৃক্ষহীন একটা রিক্ততার ক্রোধান্বিত হাহাকার। তার মধ্যে ভীতিকর চেহারার এই ফকির এবং তার চ্যালা। যাদের মন থেকে ভক্তি করতে ইচ্ছে করে না, অথচ তাদের আধ্যাত্মিক শক্তির কথা শুনে বিশ্বাস করতে বাধ্য হতে হয়, ভক্তি করতে বাধ্য হতে হয়, সেখানে এসে ছেলে হারিয়ে ফেলে মকবুল হোসেনের যেন মাথা গরম হয়ে গেল। তিনি ফকিরের চালার নিচে হাত পা ছড়িয়ে বসে থাকলেন।

 

১১.

এখন এই বিরান প্রান্তরে গভীর রাত। আকাশে ঝলমল করছে পূর্ণিমার চাঁদ। ঝির ঝির বাতাসে গাছের শাখা প্রশাখার ভেতর দিয়ে সেই চাঁদ মনে হয় নড়ছে। বাতাসের ঝাপটে সেও যেন স্থির থাকতে পারছে না আকাশে। তার দুধ শাদা আলোয় এখন যেন ভেসে যাচ্ছে দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তর। আশেপাশে কোনো মানুষ নেই। শুধু পাগল ফকির আর তার চ্যালা ছাড়া। তারা মানুষ হলেও মানুষের মতো কথাবার্তা বলা ত্যাগ করেছে বহুদিন। তাদের জগৎ এখন ইশারায় চলে।

ইশারায় যদি মানুষের জগৎ চলতে পারে তাহলে কথার কোনো প্রয়োজন আছে কি? যখন মানুষ কথা বলতে পারত না, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তো মানুষ কথা বলতে পারত না, তখন কি জগৎ চলেনি? সূর্যোদয় সূর্যাস্ত হয়নি? মানুষের প্রেম ভালোবাসা হয়নি? সন্তান-সন্তুতি হয়নি?

তাহলে?

মকবুল হোসেন ভাবেন আর নসুর জন্যে ব্যাকুল হয়ে চারদিকে তাকিয়ে দ্যাখেন।

এদিকে শমসের আলি সন্ধে পর্যন্ত নসুকে খোঁজাখুঁজি করে তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে রওনা হয়ে গেছে ঢাকার দিকে। অবশ্য খুব নিরাশ হয়েই গেছে।  চিকিৎসা করতে এসে এরকম অঘটন ঘটবে সে আশা করেনি। তবে সে মকবুল হোসেনের হাত ধরে অনেক টানাটানি করেছে তার সাথে ঢাকায় ফিরে যাবার জন্যে। তারপর পুলিশে খবর দিয়ে একটা ব্যবস্থা করার জন্যে। কিন্তু মকবুল হোসেন যাননি। নসুকে সাথে না নিয়ে তিনি যাবেন না। তাহলে বশিরার কাছে তিনি মুখ দেখাতে পারবেন না।

বশিরাকে সারাজীবন অনেক কষ্ট দিয়েছেন তিনি। আর কষ্ট দিতে পারবেন না।

ফলে মকবুল সেই দুপুর থেকে ফকিরের চালায় বসে আছেন। আর এখন রাত। গভীর রাত। সেই বিকেল থেকে তার পেটে দানাপানি পড়েনি কোনো। এবং সত্যি বলতে কি তার পেটে কোনো ক্ষিদেও নেই। এসব জায়গায় এলে ক্ষিদে যে এভাবে অন্তর্হিত হয়, একথা মকবুল হোসেনের আগে জানা ছিল না।

ক্রমে রাত গভীর হলে মকবুল বেরিয়ে এলেন চালা থেকে। এই এত ঘণ্টার ভেতরে ফকির আঙুল তুলে তাকে বাইরে যেতে বলেছে। দুটো আঙুল সোজা করে বাইরের দিকে নির্দেশ করেছে। ফকিরের সাগরেদ তখন তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠেছে, আপনে বাহিরে যান। যা খুঁজেন তা পাইবেন।

তখন বাইরে বেরিয়ে এসেছেন মকবুল। মনের ভেতরে কুয়াসা জমেছে তার। যা তিনি কত সময় ধরে খুঁজছেন, তন্ন তন্ন করে খুঁজছেন, এখন কীভাবে তা তার চোখের সামনে এসে দাঁড়াবে। তিনি তো সোজা তাকিয়ে দূরে এক বনভূমি ছাড়া আর কিছু দেখতে পারছেন না। দূরের বনভূমির দিকে বিষণœ চোখ তুলে ইতোমধ্যে বারবার দেখেছেন। চন্দ্রিমায় বনভূমি বড় অচেনা মনে হচ্ছে মকবুলের কাছে। সবকিছু মনে হচ্ছে যেন রহস্য, সুদূর। অথচ দুপুরবেলা তিনি আর শমসের আলি খাল পেরিয়ে সেই বনভূমির ভেতরে ঢুকেছিলেন। জঙ্গল বেশি ঘন নয়, কিন্তু প্রচুর আগাছা আছে। সেখানে কেউ চেষ্টা করলে লুকিয়ে থাকতে পারে। শমসের আর তিনি নসুর নাম ধরে জোরে জোরে চিৎকার করে ডাকতে ডাকতে খুঁজেছেন। কিন্তু নসু যেন তাদের সকলের চোখের ওপর দিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

বিশাল বিরান এই প্রান্তরজুড়ে এখন বাতাস। আর সেই বাতাসে চেনাঅচেনা অনেক কিছুর গন্ধ। সেই গন্ধের ভেতরে মকবুল হোসেনের যেন শৈশব এবং যৌবনেরও কিছু কথা লুকিয়ে আছে। কিছু আশাভঙ্গের কথা, বেদনাময় কিছু স্মৃতির কথা , দুরাশার ভেতরে কিছু আশার কথা আবার কিছু ক্ষোভের কথাও আছে। জীবন তাকে বহুদিক থেকে বঞ্চিত করেছে। তিনি যে নারীকে নিজের জীবনে আনতে চেয়েছিলেন আত্মীয়স্বজনের বৈরিতায় তাকে আনতে পারেননি। যে নারী তার জীবনে স্ত্রী হয়ে এসেছিল সেই কোন অতীত যুগে,তাকে মনের ভেতরে ঠাঁই দিতে তার বহুবছর লেগেছে। আরও কষ্ট হয়েছে এজন্যে যে, যে কথাটা তিনি তার স্ত্রীর কাছে কোনোদিন মুখ ফুটে বলেননি, মানুষের প্রাণে অযথা ব্যথা দিতে যে মকবুল হোসেন সারাজীবন কুণ্ঠিত হয়েছেন, অথচ তার মনে ব্যথা দিতে, তাকে আশাভঙ্গ করতে,  সে প্রকৃতি হোক বা ঈশ্বর, কারও  যেন  কোনো কার্পণ্য নেই!

বিরাট প্রান্তরে এখন মকবুল একা দাঁড়িয়ে আছেন। তার মাথার ওপরে বিশাল এক চাঁদ। সেই চঁদের ভেতরে আদিম যুগের রহস্য যেন দানা বেঁধে আছে। এই চাঁদ যেন অনাদিকাল ধরে মানুষের রাতের ব্যবহারের সাক্ষী। সে মানুষের শোকের, বঞ্চনার, হাহাকারের বেদনার সাথে সৃষ্টির আদি থেকেই যেন সম্পৃক্ত। এই দেখার যেন শেষ নেই। শেষ কোনোদিন হবে না। কারণ এই পৃথিবীর শুধু আদি আছে, অন্ত নেই! মকবুল এখন কী করেন?  ডাক ছেড়ে কাঁদবেন? তার হতাশাময় জীবনের কথা বিলাপ করে বলতে বলতে কাঁদবেন? এখন তিনি তার শরীর থেকে শার্ট খুলে ফেলে শুধু গেঞ্জি গায়ে  হাঁটছেন। পরনে তার পুরোনো ঘসে যাওয়া একটা ট্রাউজার। যার কোনো বেল্ট নেই। কোনোদিন ছিল না।

হাঁটতে হাঁটতে তার শরীর এখন ঘেমে যাচ্ছে। প্রান্তরের হু হু বাতাস তাকে যেন আর ঠান্ডা করতে পারছে না। এবরোথেবড়ো জমিতে হাঁটতে হাঁটতে একসময় তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর আকাশের দিকে মুখ তুলে চিৎকার করে প্রলম্বিত স্বরে ডেকে উঠলেন, বা–বা–ন–সু–রে, নাসির, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন হোসেন, ফিরে আয় বাবা। আমার কাছে ফিরে আয়। তোর মা বড় কাঁদবে রে বাপজান, বাপ আমার! ফিরে আয়!

তার বিলাপ শুনে যেন একটু ক্ষণের জন্যে প্রকৃতি স্তব্ধ হয়ে গেল। বাতাস থেমে গেল। কণ্ঠস্বরের আর্তি কেবল ঘূর্ণিপাক খেতে খেতে এক জায়গায় যেন স্থির হয়ে দাঁড়াল।

নসু, আমার নসুরে, বলতে বলতে ডাক দিতে দিতে পাগলের মতো মকবুল হোসেন খাল পার হয়ে সেই বনভূমির ঝোপঝাঁড় হাতড়ে চললেন। যেন তাঁর কোনো হুঁশ নেই আর। কাঁটাঝোপ, অ্যাঁসশেওড়া, কন্টিকারি, হিজলকাঁটা সব তার শরীরে একের পর এক আঁচড় কাটতে লাগল। গায়ের গেঞ্জি ছিঁড়ে নাশ হলো।

চোখের পানি, নাকের পানি, হাত দিয়ে মুছতে মুছতে মকবুল হোসেন খুঁজে চললেন নসুকে।

কিন্তু নসু ফিরল না। জাগতিক কোনো আহ্বান যেন নসুকে বিচলিত করার ক্ষমতা বহুদিন হলো গুরুত্ব হারিয়েছে।

ভোর রাতে প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে ফকিরের ডেঁরার সামনে মাটিতে পড়েছিলেন মকবুল হোসেন। রাতের আকাশের  সেই ঝলমলে সোনা রঙের চাঁদ এখন বিবর্ণ এক বারবনিতার মতো ঝাপসা হয়ে এককোণে ঝুলে আছে, ফুরফুর করে আবার বাতাস দিয়েছে। জগৎ আবার তার দিনের ঐশ^র্য খুলে ধরছে পৃথিবীর চোখে। অন্ধকার দূর হয়ে যাচ্ছে। মানুষের জীবনও যেন শুধু অন্ধকার আর আলোর সমাহার। একবার অন্ধকার, আরেকবার আলো। আলো আর অন্ধকারের দোলাচলে মানুষের জীবন ছারখার।

কথাটা ভেবে যেন দম আটকে এল তার।

সেই সময় কীসের শব্দ শুনে মকবুল হোসেন তার ক্লান্ত চোখ তুলে সমুখে তাকালেন। তার সামনে শুধু কাঁটাঝোঁপ আর লতাগুল্ম। সেখানেই যেন এক নড়ঘট বেঁধে গেছে বলে মনে হলো তার। ক্রমে স্থির হলো সেই আগাছার আন্দোলন। তার ভেতর ফুঁড়ে যেন ক্লান্ত, ধুলিধূসরিত, চোরাকাঁটায় আচ্ছন্ন,  ছেঁড়া ফর্দাফাই জামায় দুড়ম-দাড়াম, দুড়–ম-দাড়াম করে বেরিয়ে এল নাসিরউদ্দিন হোসেন নসু। তার মাথার রুক্ষ চুলে শুকনো খড় আর ঝরাপাতার আচ্ছদন। সে ধুঁকতে ধুঁকতে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত স্বরে মকবুল হোসেনের বিস্মিত দৃষ্টির সমুখে এসে বলল, অব্বা, বাড়ি চলেন! শয়তানগুলোকে কোথাও খুঁজে পেলাম না!

 

১২.

খুব ভোরেই বশিরা খাতুনের দিন শুরু হয়। সপ্তাহের পাঁচটি দিন এবং ছুটির দিনগুলোও তার জন্যে মাঝে মাঝে ব্যস্ততার দিন। তার তিন ছেলেমেয়ে স্কুল কলেজ বা কোচিংএ যায়। তাদের খাবার জামাকাপড় রিকশাভাড়া সবকিছু গুছিয়ে রাখতে হয় সপ্তাহের শুরুতে।  বুলি পাড়ার একটি মেয়ের সাথে সাধারণত রিকশা করে স্কুলে যায়। হেলালের স্কুল কাছে, সে হেঁটেই যেতে পারে। সপ্তাহে একদিন বা দু’দিন ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বশিরা সময় কাটান তাদের বিছানায় বসে। মাঝে মাঝে তাদের স্কুলের বইখাতাও তাকে গুছিয়ে রাখতে হয়। আজ যেমন তিনি বুলির পড়ার ঘরে ঢুকে তার টেবিলের ধুলো পরিষ্কার করলেন অনেকক্ষণ ধরে। এই মেয়েটা তার রোকসানার মতো গোছালো নয়। একটু অগোছালো টাইপের। অবশ্য এখনও অনেক ছোট আছে। পরে হয়ত সব ঠিক হয়ে যাবে।

বুলি তার শেষ বয়সের সন্তান। মকবুল হোসেনের অনিচ্ছায় এই সন্তানটির জন্ম। দুটির বেশি তিনটি সন্তান নিতে মকবুল হোসেন অনিচ্ছুক ছিলেন। পরে যখন হেলাল গর্ভে এল তখন মকবুল বলেছিলেন, সরকারি চাকরি করে  তিনটে সন্তান মানুষ করে তোলা বড় কঠিন একটা কাজ হবে বশিরা।  তুমি এরপর থেকে খুব সতর্ক হবে।

তা বশিরা হেলাল হবার পরে পরে বেশ সতর্কই ছিলেন। কিন্তু তারপরও বুলি পেটে এসে গেল। মাত্র দুদিন তিনি জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিল খেতে ভুলে গিয়েছিলেন। এইসময় মকবুল বলেছিলেন, এমআরআই করিয়ে নাও।

কিন্তু এমআরআই ক্লিনিকে একবার গিয়েও ফিরে এসেছিলেন বশিরা। তার ভেতরে কেমন যেন এক অপরাধ বোধ সঞ্চারিত হয়েছিল সেই সময়। হয়ত সকল নারীর ভেতরেই এরকম হয়। এই শিশুটির অপরাধ কি? সে তো আর ইচ্ছে করে এই পৃথিবীর মুখ দেখতে চায়নি। তাকে একরাতে বিছানার সুখের ভেতরে, বাসনার ভেতরে, আবেগের ভেতরে ইচ্ছে করে টেনে আনা হয়েছে!

এখন তাকে আবার ইচ্ছে করে মেরে ফেলা! বা।

বুলি জন্ম নেবার পর তার মুখ দেখে অবশ্য খুব খুশি হয়েছিলেন মকবুল হোসেন। বলেছিলেন, ভাগ্যিস তুমি আমার কথা শুনে এমআরটা সেদিন করোনি। নইলে এত সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চাটা আমরা কোথায় পেতাম বলোতো?

আর তার কথা শুনে বশিরা হাসপাতালের বেডে শুয়েই মুখে আঙুল চেপে বলেছিলেন, চু-উ-প! কেউ শুনে ফেলবে।

বুলির টেবিল গোছাতে গিয়ে একসময় তার ড্রয়ার টেনে ধরে দেখলেন ভেতরে ছোট্ট একটা শাদা প্যাকেট এর গায়ে স্টুডিওর নীল সিল মারা ঠিকানা। এক নম্বর গুলশানের।

কৌতূহলী হয়ে প্যাকেটটার ভেতর হাত ঢুকিয়ে বের করে আনলেন একটা ফটো।

ভেতরে একটা রঙিন ফটো। ফটোর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলেন বশিরা। চোখের সামনে দুনিয়াটা যেন মুহূর্তে দুলে উঠল তার।

পাড়ার হিরু মাস্তানের বুকের কাছাকছি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে বুলি। বুলির পরনে লম্বা কালো মোজা। ওপরে লাল একটা টপ। দাড়ি গোঁফে সমাচ্ছন্ন বড় বড় চোখের হিরু বড় ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ধরেছে বুলির কাঁধ। পরিণত বয়সের হিরুর কাছে বুলি কচি একটা পাঁঠার মতো হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে!

বশিরা নিজের বুক চেপে ধরে ফটো হাতে মাটিতে বসে পড়লেন।

 

১৩.

ক’দিন ধরে কাজলের কোনো ফোন নেই। সাধারণত এরকম হয় না। প্রতি শনিবার বিকেলে কাজলের একটা ফোন আসে, সময় যখন পাঁচটা। নিমি এই সময়টা টেলিফোনের চারপাশে ঘুর ঘুর করে। তখনই কাজল তাকে বলে দেয় যে কখন তার সাথে দেখা হবে। এরকম দেখা তার অনেকদিন ধরে হচ্ছে। এখন বলতে গেলে নিমি আর কাজলকে আলাদা করা যায় না। কোচিং-এর সময় তো বটেই, অন্যান্য দিনও নিমি কোনো না কোনো অজুহাতে কাজলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। ইদানীং যেন নিমির মনে হয়, কাজলকে তার সর্বক্ষণই দরকার। কাজলের শরীর যেন তার শরীরের সঙ্গে মিশে গেছে, আর তা এমনভাবে যে দু’জনকে আর বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখা সম্ভব নয়!

নিমি কি তাহলে কাজলের প্রেমে পড়েছে?

কথাটা ভেবে নিমি মনে মনে মুচকি হাসে। তাকে আদর করার সময় কাজলের পাগলামির কথা মনে হয়। নিমি মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে বলে, আমাকে এত ভালোবাসো কেন? আমি তো মুটকি দেখতে!

উত্তরে কাজল তাকে জড়িয়ে ধরে আরও দ্রুত আদর করতে করতে বলে, এই মুটকি আমার মাথার মুকুট!

আর তার কথা শুনে খিলখিল করে হাসে নিমি। যে হাসির শব্দ মাঝে মাঝে রোকসানা বা আফজালকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। আবেগে নয় বরং লজ্জায় রোকসানার গাল রক্তিম হয়ে ওঠে। নিমি জানে, তার সাহসিকতায় রোকসানা বিস্মিত। কারণ সে নিমির মতো সাহসী নয়। নিমি তাকে গোপনে বলেছে ভালোবাসা মানুষকে সাহসী করে তোলে। রোকসানা নিমির সাহসিকতার কথা ভেবে মাঝে মাঝে চমকিত হয়। এভাবে যে কোনো মেয়ে বিয়ের আগে এত স্বচ্ছন্দে কোনো ছেলের সাথে মিশতে পারে, ভেবে রোকসানা অবাক হয়। তার কেন যেন একটু ভয় ভয়ও করে। নিমি তার ভয়ের কথা শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়েছে।

অথচ নিমির ছোট বোনটি নিমির চেয়ে কত আলাদা। রিমি পড়াশোনায় নিমির চেয়ে ভালো। আবার খুব গম্ভীর। নিমি মাঝে মাঝে আক্ষেপ করে রোকাসানাকে বলেছে, জানিস আমার মা না রিমিকে বেশি ভালোবাসে। সেজন্যে তো আমি একবার আমেরিকায় চলে গেলে আর কোনোদিন এদেশে ফিরব না। মা থাকুক রিমিকে নিয়ে।

এ হচ্ছে তোর অভিমানের কথা। রোকসানা হেসে বলেছে। কোনো মা কি তার সন্তানদের কম ভালোবাসে।

না, তুই সেটা বুঝবি নে। অবশ্যই মায়েরা তাদের সব সন্তানদের একভাবে ভালোবাসতে পারে না। একটু কম একটু বেশি এ হতেই হবে। আমরা সকলে মানুষ না?

কিন্তু আজ ক’দিন ধরে কাজলের কোনো ফোন নেই। নিমির মনটা বড় অস্থির অস্থির করে। সে আজ দুপুরে কোনোরকমে খেয়ে বাসা থেকে বেরোল। মাকে বলে গেল, রোকসানার বাসায় যাচ্ছে, একটা বই আনতে।

মিথ্যে কথা বলে বাসা থেকে বেরোতে নিমির আজকাল বিশেষ কষ্ট হয় না। আগে আগে যখন কাজলের সাথে দেখা করতে যেত বা কোচিং শেষে কাজলের সঙ্গে দেখা করে বাসায় ফিরত, তখন তার মন একটু খারাপ লাগত, মাকে মিছে বলে ভাওতা দিতে।

আজকাল আর লাগে না।

এটা খারাপ না ভালো নিমি বোঝে না। দু’গালে চকোলেট ভরে নিয়ে নিমি রিকশায় চেপে রাস্তা দিয়ে চলে আর মনে মনে ভাবে।

রিকশা মৌচাক পার হয়ে এ-রাস্তা ও-রাস্তা ঘুরে গলির ভেতরে ঢুকে কাজলের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নামল নিমি। পয়সা মিটিয়ে সে কাজলের বাড়ির দরজার বেল টিঁপল। মুখে তার একটু বিরক্তি। কাজলকে বকবে বলে। অবশ্যই কাজলকে আজ বকা দেবে নিমি। তার এরকম ব্যবহারের মানে কি? এমন না যে সামনে কাজলের কোনো পরীক্ষা আছে। বিএসসি পাশ করার পর কাজল তার পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। এখন আমেরিকান সিটিজেনশিপের জন্যে চেষ্টা করছে। হয়েও যাবে শিগগির। কাজলের ভাই টেক্সাসে একটা প্রেট্রোল পাম্পের মালিক। আমেরিকায় গেলে কাজলের চাকরির কোনো অসুবিধে হবে না। সে ভাইয়ের পেট্রোল পাম্পে কাজ পেয়ে যাবে। বস্তুত সব আগে থেকেই ছককাটা। নিমি সেখানে গেলে নিমিরও একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কাজল বলেছে নিমি আমেরিকায় গেলে সে আর নিমি হাউজিং-এর ব্যবসা করবে অর্থাৎ বাড়ি বেচাকেনা। অনেক বাঙালি সেখানে এই বিজিনেস করে লাল হয়ে যাচ্ছে।

নিমি দরজার বেল টিঁপতে লাগল। অনেক্ষণ ধরে বেল টিপতে লাগল। কোনো সাড়া নেই। কৌতূহলী হয়ে সে কাচের জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখল ভেতর বারান্দার করিডর। সেখানে কাউকে দেখতে পেল না। আবার সে তাই দরজার বেল টিপতে শুরু করল। এবার মুখ থেকে শব্দ বেরোল তার, কাজল, কাজল।

অনেক্ষণ পরে দরজার ছিটকিনি খুলল ভেতর থেকে।

কাজল নিশ্চয় ঘুমোচ্ছিল ভেতরে। এই এক দোষ কাজলের। বাড়িতে থেকে বেশির ভাগ সময় সে বিছানায় কাটায়।

বাইরে তার যাতায়াত কম। আমজাদ মাঝে মাঝে আসে। তখন তার সাথে বসে সে গল্প করে। আমজাদও আমেরিকায় যাওয়ার তোড়জোড় করছে নিমি এটা জানে। তবে কতদূর সে তোড়জোড় সেটা অবশ্য জানে না। একটু পরে দরজা খুললে নিমি বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, এমন কুম্ভকর্ণের মতো তোর ঘুম কাজল যেÑ

কথা অসমাপ্ত রেখে সে তাকিয়ে থাকল। দরজা খুলল হিরণ। কাজের ছেলেটা।

নিমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। একটুখানি সময় নিল ধাতস্থ হতে। তারপর বলল, কাজল কোথায় হিরণ? এখনও ঘুমায়?

কাজল ভাইয়া বিদেশ। বলল হিরণ।

বিদেশ মানে? নিমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকল।

হিরণ বলল, ক্যান আপু, আপনে জানেন না? ভাবিজানে আর কাজল ভাইয়া একলগে বিদেশ গ্যাছে গা।

কোন বিদেশ? নিমি জিজ্ঞেস করল।

তাগো বিদেশ তো আম্রিকা। জানেন না? কথা বলে হাসল হিরণ। হাসিটা নির্দোষ দেখাল।

কই , আমি তো জানিনে। আমাকে তো কেউ বলেনি। হতাশ গলায় বলে উঠল নিমি।

হঠাৎ তার বুকের ভেতরে একটা অচেনা ভয় যেন কুণ্ডুলি পাকিয়ে উঠতে লাগল গলা বেয়ে। চকোলেট চিবানো বন্ধ হয়ে গেল। টেনিস বলের মতো গাল দুটো চুপসে গেল হঠাৎ।

কোনো রকমে সে বলল, ঠিকানা, ঠিকানা রেখে গেছে?

হ। ঠিকানা আর টেলিফোন সব আমজাদ ভাইয়ার কাছে। তারে ফোন করলেই সব জানবেন।

তার কথা শুনে যেন স্তব্ধ হয়ে গেল নিমি।

তারপর বড় দ্রুততার সঙ্গে রাস্তায় নেমে মেইন রোড দিয়ে হন হন করে হাঁটতে লাগল।

কোথায় সে যাবে , বা কাকে সে ধরবে এসব যেন কিচ্ছু বুঝতে পারল না সে।

হঠাৎ করে তার চোখের সামনে দুনিয়াটা যেন দুলে উঠল। বমি চলে এল নিমির মুখে। সে ওয়াক করে বমি করে দিল হিরণের চোখের সামনে দরোজার পৈঠার ওপর।

১৪.

সকাল নটা থেকে রোকসানা আর নিমি এই ক্লিনিকটাতে এসে বসে আছে। ক্লিনিকটা পুরনো ঢাকার ঘিঞ্জি একটা গলির ভেতরে। একজন মহিলা ডাক্তার আর দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্লিনিকে ঘুর ঘুর করছিল। আরেকজন ডাক্তারও ছিল সেখানে। শোনা গেল তিনি অ্যানেসথেটিস্ট।

নিমি আর রোকসানা মুখ শুকনো করে তাকিয়ে দেখছিল তাদের চলাফেরা। নিমি বারবার ওড়নার আঁচল দিয়ে তার মুখের ঘাম মুচছিল। বারবার করে সে ক্লিনিকের মানুষজনের চলাফেরা লক্ষ্য করে দেখছিল। প্রতি মুহূর্তে তার ভয় হচ্ছিল এই বুঝি কোনো চেনা মানুষের সাথে তার দেখা হয়ে যায় নাকি।

রোকসানা তার সাথে সাথে তাকে ভরসা দেবার জন্যে ক্লিনিকে এসেছিল। তার বুকও ভয়ে দুরু দুরু করে কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল সে ও যেন কোনো প্রকারের দোষী।

নিমি যে কত বড় ধরনের বিপদে পড়েছে এটা রোকসানা মাত্র গত সপ্তাহে টের পেয়েছে। যখন ঘোর দুপুর বেলায় নিমি তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়েছিল। সেই সময় রোকসানা বাড়িতে বসে মাকে রান্নায় সাহায্য করছিল। সেদিন ছিল বন্ধ। এমন সময় দরজায় বেল বেজে উঠল। দরজা খুলে দিল কাজের মেয়ে লতিফা। কে রে কে? এই বলে রান্নাঘর ছেড়ে উঠে এল রোকসানা। আর হঠাৎ করে নিমিকে দেখে ঘাবড়ে গেল সে।

নিমির চোখ মুখ কাঁদতে কাঁদতে ফুলে গিয়েছিল। সে রোকসানার ঘরে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে আবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল।

কী হয়েছে রে নিমি? বারবার করে প্রশ্ন করার পর নিমি হঠাৎ বলে উঠেছিল, আমার সর্বনাশ হয়েছে ভাই।

সর্বনাশ? তার কথা শুনে চমকে উঠেছিল রোকসানা।

আমি কনসিভ করেছি ভাই। কথাটা বলে ডুকরে উঠেছিল নিমি। রোকসানাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, আমার কেউ নেই এ দুনিয়ায় যে আমাকে এই বিপদে সাহায্য করে।

বলিস কি রে? কথাটা বলে ভয়ে সংকোচে জড়সড় হয়ে গিয়েছিল রোকসানা। আর যাই হোক, নিমি যে এতদূর পর্যন্ত গিয়েছে বা যাবার সাহস রাখে একথা সে যেন স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।

সব শুনে তার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল।

নিমি বলেছিল, কাজল একটা বিশ্বাসঘাতক, রুক্সি। তাকে আমি সরল মনে বিশ্বাস করেছিলাম। আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম, ভাই। এরকম ভাবে যে আমার সাথে সে প্রতারণা করবে, বুঝতেও পারিনি। তাহলে কি সে এতমাস ধরে আমার সঙ্গে চাতুরি করেছে? আর তার ভাবি সবকিছু জেনেশুনেও আমাকে কিছু বলেনি। এ কী ধরনের ব্যবহার, ভাই?

রোকসানা জানে না এ কী ধরনের ব্যবহার।

নিমি বলল, আমি তোকে না জানিয়ে আমজাদকে ফোন করেছিলাম তার বাসায়। আমার বিপদের কথা তখনও জানতাম না, তাই আমজাদকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কাজলের এধরনের ব্যবহারের মানে কি? তো সে উত্তরে কি বলল জানিস?

কী? রোকসানা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল।

নিমি বলল, সে বলল, দেখ দুজন অ্যাডাল্ট মানুষ, যা কিছু তারা নিজেদের মধ্যে করে তার ফল কী হবে তা ভেবে চিন্তেই করে। কাজল যদি তোমাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে এবং তারপরও যদি সে এ ধরনের ব্যবহার করে তাহলে বুঝতে হবে তার ভেতরে স্বচ্ছতা ছিল না। কিন্তু ভাই, এটা তো আমাদের দেখার বিষয় নয়। এটা সম্পূর্ণ তোমাদের নিজেদের ভেতরের ব্যাপার। আমাকে বলে গেছে যে সে স্টেট্স্-এ যাচ্ছে। এবার ফিরতে তার দেরি হবে। তো আমি ভাবলাম তোমাদের নিজেদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এ বুঝি সবকিছু হচ্ছে। তোমার তো এখনও লেখাপড়া শেষ হয়নি। সুতরাং কিছুদিন তো তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে।

আমি তখন তাকে বললাম, তাহলে তার ঠিকানাটা আমাকে দিতে পার? তো উত্তরে সে কী বলল জানিস? বলল, ঠিকানা তো ভাই আমিও জানিনে। সে বলেছে, আমেরিকায় গিয়ে আমাকে জানাবে। কারণ তারা সেখানে বাড়ি পাল্টাচ্ছে। টেক্সাস ছেড়ে তারা এখন অন্য স্টেট্স্-এ যাচ্ছে।

সব শুনে আমার মন এত খারাপ হয়েছিল ভাই যে ক’দিন আমি আর বাড়ি ছেড়ে বেরোইনি। তোর সঙ্গেও কোনো কথা বলিনি। পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে এতবড় একটা প্রতারণা বলে মনে হয়েছিল যে তোকেও মুখ ফুটে বলতে আমার লজ্জা লেগেছিল।

রোকসানা কান পেতে গম্ভীর মুখে নিমির কথা শুনতে লাগল।

নিমি এবার বলল, আজ তিন সপ্তাহ আমার মাসিক হওয়ার ডেট পেরিয়ে গিয়েছে। বাইরে থেকে পরীক্ষা করার জিনিস কিনে নিয়ে বাথরুমে বসে পরীক্ষা করে দেখি প্রেগনেন্সি টেস্ট পজিটিভ। তারপর আর কোনো কিছু চিন্তা না করে তোর কাছে ছুটে এসেছি। আমাকে বাঁচা ভাই। আমার বিধবা মা এখবর শুনলে আত্মহত্যা করবে।

তো এসব মাত্র ক’দিন আগের কথা। এখন দু’বান্ধবী মিলে পুরনো ঢাকার এই অ্যাবরশন ক্লিনিকে এসে হাজির হয়েছে। তার আগে ফোনে ডাক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে রোকসানার। এক ঝুড়ি মিথ্যে বলতে হয়েছে। বলতে হয়েছে নিমি সদ্যবিবাহিতা। স্বামী কুয়েতে কাজ করে একটা ওষুধ কোম্পানিতে। মাত্র কিছুদিন হলো স্বামী কর্মস্থলে ফিরে গেছে। নিমি এখন এই বাচ্চা চায় না, সে এখনও লেখাপড়া করছে। হ্যাঁ, তার স্বামীর সম্মতিতেই সে এই গর্ভপাত করাতে চায়।

সেই মোতাবেক তারা এখন পুরনো ঢাকার এই ক্লিনিকে।

একটু পরে বেশ মোটাসোটা জাঁদরেল টাইপের একজন নার্স এসে একটা ফরম এনে নিমির হাতে দিয়ে বলল, এই ফরম ফিল আপ করে সাইন করেন।

নিমি মনে মনে কাঁপতে কাঁপতে সেই ফরম পড়ে দেখল। মোট কথা সেখানে লেখা আছে এমআর করার প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকারের ক্ষয়ক্ষতির দায় ক্লিনিকের ঘাড়ে বর্তাবে না। নামের জায়গায় নিমি নাম সাইন করল রাবিয়া হোসেন বলে, যেটা আর আসল নাম নয়। রোকসানা তার পাশে বসে সব কিছু দেখল। তার বুক দুরুদুরু করতে লাগল। একবার অসত্যের জালে জড়িয়ে পড়লে সেই অসত্য মানুষকে কীভাবে মাকড়শার জলের মতো জড়িয়ে ধরে, একথা ভেবে তার মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু বন্ধুর এই বিপদে সে তাকে ছেড়ে চলে গেল না।

একটু পরে সেই নার্স নিমিকে বেশ রুক্ষস্বরে ডাক দিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল। নিমি যাবার আগে একবার করুণ চোখে রোকসানার দিকে তাকাল। তার সে দৃষ্টি দেখে রোকসানার প্রাণ উড়ে গেল। মনে হলো , হায় আল্লা, নিমি বাঁচবে তো? যদি কিছু অঘটন ঘটে তাহলে কীভাবে সেটা সামাল দেবে রোকসানা?

কথাটা ভাবতে গিয়ে যেন মাথা ঘুরে উঠল রোকসানার।

অনেক, অনেক্ষণ সময় বসে থাকল রোকসানা। কাঠের একটা হ্যান্ডেল ছাড়া চেয়ারে সে বসে থাকল। অনেকক্ষণ। বসে থাকতে থাকতে তার হাতপা অবশ হয়ে এল। তারপর সেই মোটা নার্স, যার পরনে ডাক্তারের গাউন , কিন্তু মলিন তার চেহারা, রোকসানার সামনে দাঁড়িয়ে বিরস গলায় বলল, আপনের বন্ধু আপনেরে ডাকে।

তার কথা শুনে ধড়ফড় করে চেয়ার ছেড়ে উঠে রোকসানা নার্সের পিছু পিছু গেল। এক ঘর থেকে, আরেক ঘর। তারপর ছোট একটা চৌকো ঘরে ঢুকে সে আধো অন্ধকারে কাতরস্বরে একজনকে মা, মা , ও মাগো, বলে কাঁদতে দেখল। সে ছিল নিমি। রোকসানা দৌড়ে গিয়ে নিমির বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে বসল। নিমি রোকসানাকে দেখে তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ডাক্তারকে অনেক অনুরোধ করেছিলাম, রুক্সি। কিন্তু কিছুতেই তিনি আমাকে অজ্ঞান করলেন না। আমাকে জ্যান্ত রেখেই তিনি খুঁচিয়ে সব কিছু বের করলেন। বললেন, এই পয়সায় রোগী অজ্ঞান করে এমআর করা নাকি পোষায় না। খরচ বেশি পড়ে যায়। তাছাড়া এমআর করাবার সময় তিনি এমন কিছু কথা বলছিলেন যাতে মনে হয়, আমি সত্যিকারের বিবাহিত কীনা, তিনি সন্দেহ করেছেন। রসিকতা করে একবার বললেন, বুঝলে মেয়ে, ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। মানুষ এত নিষ্ঠুর কীভাবে হয়, রুক্সি? বলতে বলতে রোকসানার গলা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল নিমি।

তার কথা শুনতে শুনতে রোকসানার গাল লাল হয়ে উঠল। মনে পড়ল, কিছুদিন আগেই আমজাদ তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করার জন্যে অনেক ঝুল ধরেছিল। রোকসানার মনের ভেতরেও দোলা দিয়ে উঠেছিল বৈকি! ভাগ্যিস সে সায় দেয়নি। তাহলে তো তার অবস্থাও এই নিমির মতোই হত। আর কাজলের বন্ধু হয়ে আমজাদ কি আর ভিন্ন কোনো মানুষ হত? সেও হয়ত কাজলের মতই হয় হাওয়া হয়ে যেত, অথবা হাত উল্টে বলত, তুমি যে শুধু আমার সঙ্গেই সম্পর্ক করেছ, তার কি প্রমাণ আছে রুক্সি?

তখন? তখন রোকসানা কি বলত?

নানা কথা ভাবতে ভাবতে রোকসানা নীরবে নিমির মাথায় হাত বুলোতে লাগল।

 

১৫.

মৌচাকের গলির ভেতরে দাঁড়িয়েছিল রোকসানা। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়েছিল সে। তার চোখের সামনে মৌচাকের বেদম এক যানজট। যার কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ কেউ জানে না। কোনোদিন কেউ জানেনি। জানবার প্রয়োজনও নেই। কারণ যানজট বাঁধে আবার নিজেই একসময় খুলে যায়। দিগন্তু বিস্তৃত হয়ে খুলে যায়। এই ম্যাজিকের যারা সাক্ষী, তারা সাক্ষী।

বেশ কিছুদিন ধরেই রোকসানার মন খারাপ চলছিল। বিশেষ করে নিমির ঐ ঘটনাটার পর থেকেই তার মনের ভেতরে কেমন যেন একটা ভয়, একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। আমজাদ এর ভেতরে বারকয়েক রোকসানার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেয়েও পারেনি। রোকসানার কেমন যে মনে হলো যার বন্ধু এরকম একটি অন্যায় কাজ নিমির সঙ্গে করতে পারে, সেখানে আমজাদকেই-বা বিশ^াস কি? সে তো তারই বন্ধু। এবং ব্যাপারটা যতবার মনের ভেতরে সে নাড়াচাড়া করতে লাগল ততবারই তার মনে হতে লাগল, আমজাদ তার বন্ধুকে আগে থেকেই চিনত। হয়ত কাজলের এসব ব্যাপারে তার সায় ছিল। না হলে শুধু আমজাদকে বলে সে দেশ ত্যাগ করল কেমন করে?

মিথুনের ডাকেই রোকসানা আজ মৌচাকের একটা দোকানের পাশে এসে হাজির হয়েছে। জায়গাটা একটু নির্জন। দোকানটা মিথুনের এক বন্ধুর বাবার। রোকসানার কোনো ইচ্ছে ছিল না যে মিথুনের সাথে কোনো কথা বলে। বিগত কয়েক মাস মিথুনের সঙ্গে তার বিশেষ কোনো যোগাযোগ নেই। কিন্তু গতকাল মিথুন তাকে ফোনে বলেছে  যে, সে রোকসানার সঙ্গে কথা বলতে চায়। ইতোমধ্যে রোকসানা মেডিকেলে ভর্তি হবার পরীক্ষা দিয়ে সেরেছে।  সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার নিমিও তার সাথে পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষা দুজনেরই ভালো হয়েছে। হয়ত নিমিও কোনো একটা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবার চান্স পেয়ে যাবে। দুজনে এক মেডিকেলে হলে তো আরও ভালো।

তার সামনে দাঁড়িয়েছিল মিথুন। একটা লম্বা থামের গায়ে হেলান দিয়ে মিথুন রোকসানার দিকে স্থির দৃষ্টি ফেলে রেখেছিল। যেন সে অনেকদিন পরে আবার নতুন করে রোকসানাকে দেখছে।

মিথুন বলল, কেমন আছিস রোকসানা?

রোকসানা তার প্রশ্ন শুনে মনে মনে ভাবল, মিথুন আজ পর্যন্ত আমাকে আমার ডাক নাম ধরে ডাকতে পারল না। আশ্চর্য মানুষটার মানসিক কাঠিন্য।

উত্তরে ঘাড় গোঁজ করে রোকসানা বলল, যেমন দেখছ।

তার মানে, তুই ভালো আছিস?

উত্তরে রোকসানা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তার মনের ভেতরে রাগ, ক্ষোভ, বঞ্চনা একে একে জমে উঠতে লাগল। লাগতে লাগতে পাহাড়ের মতো হলো। ভালো আছে? রোকসানা ভালো আছে? এই তাহলে মিথুনের রোকসানার দিকে মনোযোগ? বাঃ!

মিথুন তার কাছ থেকে উত্তর না পেয়ে আবার বলল, আজকাল আমার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকিস, এটা আমি লক্ষ্য করেছি। কারণটা জানতে পারি কি?

কারণ? যে কারণ রোকসানার জানার কথা সেই কারণ মিথুন উল্টে তারই কাছ থেকে জানার চেষ্টা করছে? বারে বা।

রোকসানার মন ক্রমশ তিক্ত হয়ে উঠতে লাগল।

মিথুন একটু চুপ করে থেকে নিচু গলায় বলে উঠল, আমার কাছ থেকে এভাবে দূরে সরে গেলি কেন? তোকে কি কেউ কাছে ডেকে নিয়েছে?

এবার জ্বলন্ত চোখে মিথুনের দিকে তাকিয়ে রোকসানা বলে উঠল, আমাকে ডেকে নেবে কেন, আমিই তাকে কাছে ডেকে নিয়েছি। তুই কি মনে করিস তোকে আমি চিরজীবন ভালোবেসে যাব, আর বদলে তুই আমাকে হেনস্থা করবি?

হেনস্থা? অবাক হয়ে মিথুন তাকাল এবার।

রোকসানা আবেগতাড়িত হয়ে বলে চলল, দিনের পর দিন, তুই আমাকে অবহেলা করেছিস। দিনের পর দিন তুই আমাকে অবজ্ঞা করেছিস। কেন? আমি কি এতই হেলাফেলার পাত্রী? আমি ইচ্ছে করে আমজাদকে কাছে টেনে নিয়েছি। ইচ্ছে করে তাকে ভালোবেসেছি। তুই কি মনে করিস তুই ছাড়া আমার আর ভালোবাসার কোনো পাত্র নেই? ছিল না?

না, ছিল না! মিথুন জোর গলায় বলে উঠল।

এত জোরে মিথুন কথাটা বলল যে, রোকসানার হঠাৎ মনে হলো যেন মৌচাকের চলন্ত ব্যস্ত ট্রাফিক মুহূর্তের ভেতরে  স্তব্ধ হয়ে গেল।

মিথুনের গলার স্বর শুনে যেন প্রাণ কেঁপে উঠল রোকসানার। হায় আল্লা, এই তাহলে তার মিথুন? হায় আল্লা-

হঠাৎ দু’হাতে মুখ সজোরে চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল রোকসানা।

তারপর সজোরে মাথা নাড়ড়ে নাড়তে নাড়তে বলল, না , না, না। আমি খারাপ হয়ে গিয়েছি। আমি আর তোমার কাছে ফিরতে পারব না।

মিথুন বলল, খারাপ ভালো তো আপেক্ষিক একটা বিষয়।

রোকসানা চোখ মুছে মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল, তবুও। আমি আর তোমার কাছে ফিরতে পারব না। না , না।

মিথুন বলল, এই তাহলে তোর শেষ কথা?

হ্যাঁ। মাথা নেড়ে বলল রোকসানা। কথাটা বলতে গিয়ে চোখ তার আবার পানিতে ভরে উঠছে।

তার মানে তুই আর আমাকে ভালোবাসিসনে? যেন শুকনো স্বরে বলে উঠল মিথুন।

না। এবারও মাথা নেড়ে বলে উঠল রোকসানা। এবার মাথা নাড়তে গিয়ে টপ করে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল তার চোখ থেকে। তারপর লম্বিত হয়ে সেটা গালের প্রান্তে এসে ঝুলে থাকল।

তার মানে, তুই বলতে চাচ্ছিস একজনের সাথে তোর দৈহিক সম্পর্ক ঘটেছে এবং সে বলেছে যে সে তোকে ভালোবাসে। তোকে নিয়ে ভবিষ্যতে সংসার গড়তে চায়, তাইতো?

এবার আর উত্তর না দিয়ে চুপ থাকল রোকসানা।

তার চুপ থাকা দেখে যেন মাথা গরম হয়ে উঠল মিথুনের। সে জোর গলায় বলল, চুপ করে আছিস কেন, আমার কথার জবাব দে। শরীরের লোভ তোর এত বেশি যে আমাকে ভালোবাসার পরও তুই সময় এবং সুযোগ বুঝে অন্য একজনের সাথে বিছানায় যেতে আপত্তি করিসনি, এই তো?

এবার উত্তর দিল রোকসানা। বলল, একতরফা ভালোবাসা যায় না মিথুন। আমার বুক চিরে যদি দেখাতে পারতাম তখন তো দেখতি সারাটা বুকের ভেতরে শুধু তোর নাম লেখা ছিল। শুধু তোর নাম, আর কারও নয়।

সেই ভালোবাসা কীভাবে উবে গেল? কার মন্ত্রণায় উবে গেল, জানতে পারি কি? গলার স্বরে এবার বিদ্রুপ খেলা করতে লাগল মিথুনের।

তোর ব্যবহারে মিথুন, তোর ব্যবহারে। সাহস করে এবার বলে উঠল রোকসানা।

আমার ব্যবহারে? রোকসানার কথা শুনে যেন অবাক হয়ে গেল মিথুন।

হ্যাঁ, ঠিক তাই, তোর ব্যবহারে। তোর বিরহে আমার দিনরাত হারাম হয়ে গিয়েছিল। আর ঠিক সেইসময় তুই আমাকে অবজ্ঞা করতে লাগলি চরম। রাতের পর রাত আমার কাটতে লাগল বিনিদ্র। আর সকাল বেলা যখন তোকে দেখে আশায় আশায় এগিয়ে আসতাম কাছে, তুই তখন সরে যেতিস আমার কাছ থেকে। কিন্তু কেন তুই এরকম করতিস, মিথুন। কেন? তোর মায়ের সঙ্গে কি আমি দেখা করিনি? তিনি কি আমাকে পছন্দ করেননি? যদি পছন্দ না-ই করে থাকেন, তবুও আমার ভালোবাসার কি কোনো মূল্যই ছিল না তোর কাছে? কোনো ফুটো পয়সার দামও কি ছিল না?

কে বলেছে তোকে, যে দাম ছিল না! তুই আমাকে ভালোবাসতিস দেখেই না আমি তোর কাছ থেকে দূরে সরে থাকতাম। কারণ তখন আমি নিজেই তো আমার ভেতরে প্রস্তুত ছিলাম না! ভালোবাসার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না। যে মানুষ ভালোবাসা কাকে বলে জানত না তখন, বিরহ কাকে বলে জানত না, তখন যদি তার হাতে ভালোবাসার সোনার তাল তুলে দিস সে কি তার মর্যাদা রাখতে পারে? আমাকে কি তুই প্রস্তুত হবারও সময় দিবিনে, রুক্সি?

কথা বলতে গিয়ে গলা ভেঙে এল মিথুনের। এই প্রথম সে রোকসানাকে রুক্সি বলে ডেকে উঠল।

মানে, তুই কি বলতে চাচ্ছিস মিথুন? রোকসানা জলভরা বড় বড় চোখ করে মিথুনের দিকে তাকাল। তার বুকের ভেতরে এখন যেন হাঁপর পড়ছে।

আমি তোকে ভালোবাসি রোকসানা। হঠাৎ বলে উঠল মিথুন। কথাটা বলতে গিয়ে তার ঠোঁট কেঁপে উঠল। চোখে পানি চলে এল। তারপর বলল, তোকে ছাড়া আমি বাঁচব না!

তার কথা শুনে এবার হাউমাউ করে উঠল রোকসানা। কাঁদতে লাগল। না, না, বলতে লাগল আর কাঁদতে লাগল। তার কান্না শুনে ভিড় জমে গেল গলির মধ্যে। কাঁদতে লাগল মিথুনও। ওরা দুজনেই কাঁদতে লাগল। ভিড় জমুক ওরা তা গ্রাহ্য করে না। কারণ যে ক্ষতি তাদের হয়েছে সে ক্ষতি তো এত সহজে পূরণ হবার নয়।

পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দু’জন তরুণ-তরুণী কাঁদতে লাগল। কেউ কাউকে স্পর্শ পর্যন্ত করল না। কারণ ওরা জানত না এইসময় পরস্পরকে স্পর্শ করা ঠিক কী না। আর এ কান্না কোথায় গিয়ে থামবে তাও তারা তখন জানত না।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares