প্রথম সেরা উপন্যাস ২০১৮
শব্দঘর-অন্যপ্রকাশ-এর কথাশিল্পী-অন্বেষণ-২
অংশগ্রহণকারী তরুণ কথাশিল্পীদের পাঠানো পাণ্ডুলিপি থেকে নির্বাচিত প্রথম সেরা উপন্যাস ২০১৮

অগ্নিপ্রভাত

সাঈদ আজাদ

পর্ব-১

২৫শে মার্চ, ১৯৭১।

লাল শাড়ি, সবুজ ধানের ক্ষেত, সব তছনছ হয়ে গেল…

ছাত্রহলের গার্ডরুমে চৌকিতে শুয়ে হাবিল, বউ মরিয়মের কথা ভাবে। তার বউ খুব সুন্দর! বউয়ের শ্যামল মুখে যেন দুনিয়ার সৌন্দর্য! এই দেশটার সঙ্গে তার বউয়ের কোথায় যেন মিল আছে! লোকে শুনলে হয়তো হাসবে, হয়তো বলবে, মানুষের মুখ কখনও দেশের মতো হয়? গ্রামের মতো হয়? কিন্তু মরিয়মের শ্যামল কচি মুখের সঙ্গে আজন্ম বেড়ে উঠা গ্রামের কোথায় যেন মিল খুঁজে পায় হাবিল! মিলটা ঠিক কোথায়, কেউ জিজ্ঞেস করলে সেভাবে বুঝিয়ে বলতে পারবে না।

হাবিলের মনে হয়, মরিয়মের শ্যামল কচি মুখখানা যেন বর্ষা শেষে শীতের পলিপড়া জমি। পিঠভর্তি রাশি রাশি চুল, যেন মেঘজমা বর্ষার কালো আকাশ! স্বপ্নময় বড় বড় চোখ দুটো যেন কালো পানির গভীর দিঘি, ডুব দিলে শরীর মন শীতল হয়। শীতকালে পুঁটি মাছের গায়ে রোদ লাগলে যেমন ঝিলিক লাগে, মরিয়মের হাসি তেমন। তার আলতাপরা শ্যামল পা দুটো কচি দূর্বার মতো কোমল। লাল শাড়ি পরে মরিয়ম যখন সবুজ ধান ক্ষেতের আল ধরে হাঁটে, কী জানি কেন, বউকে তার তখন নিজের গ্রামের মতোই মনে হয়।

মরিয়মরা আসাতে আজ অফিসে আসা হয়নি হাবিলের, মামুনকে বলেছিল ওর হয়ে ডিউটি করতে।  আগামীকাল হাবিল মামুনের হয়ে ডিউটি করবে, এই শর্তে রাজি হয়েছে মামুন। অবশ্যি, দেশের অস্থির এই সময়ে ঠিক আগের মতো ডিউটি করে না কেউ। বিশেষ করে সরকারি অফিস আদালতে। তবে হাবিলরা, হলের কর্মচারী কী ক্যান্টিনের লোকজন যারাই আছেÑ তারা এখনও ডিউটিতে আসে নিয়মিত। যদিও হলের বেশিরভাগ ছাত্রই বাড়ি চলে গেছে, তবে যারা আছে তাদের জন্যই হাবিলদের আসা।

কাল বাসায় ফিরতে দেরি হবে। সন্ধ্যা হয়ে যাবে। ডিউটি শেষে তবে তো ফিরবে। মরিয়মের সঙ্গে মন ভরে দুটো কথা বলতে পারল না আজ সারাদিনেও। আলাদা করে কথা বলার সুযোগই ছিল না। সারাক্ষণ মা বসেছিল কাছে। অবশ্যি সবাই মিলে গল্পগুজব করে দিনটা ভালোই কেটেছে। আচ্ছা, মরিয়ম কি এখন ঘুমিয়ে পড়েছে? বোধহয়। রাত তো কম হয়নি। হাতে ঘড়ি না থাকলেও হাবিলের আন্দাজ বলে, দশটার বেশিই বাজবে।

মরিয়মের কথা ভাবতে ভাবতে হাবিলের মনে হয়, ভালোবাসার মানুষ যদি দূরে থাকে, তাহলে বোধহয় ভালোবাসাটা বেশি করে বুঝা যায়। না হলে দেশে থাকলে কই মরিয়মের কথা তো এতো মনে পড়ে না! না কি মানুষ চোখের সামনে থাকলে, চলাফেরা করলে, হাসলে, কাজ করলে, পাশে শুয়ে থাকলে তাকে আলাদা করে মনে পড়ে না। এই যে এখন মরিয়মকে সারাক্ষণই মনে পড়ে, সে কি অনেকদিন মরিয়মকে না দেখার কারণে? মরিয়মের লজ্জা মাখানো হাসিমুখ সারাক্ষণই এখন কেন হাবিলের চোখে ভাসে? সে কি অনেকদিন বউকে দেখে না বলে? আদর করে না বলে? …কদিন আগেও ভালোবাসা কী, ঠিক যেন বুঝত না হাবিল। এতোদিন মনে হত, দেহের আকর্ষণ বা চোখের মোহটাই বুঝি ভালোবাসা। কিন্তু এখন মনে হয়, দেহের আকর্ষণ চলে গিয়ে, চোখের মোহ সরে গিয়ে একটা মানুষের জন্য হৃদয়ের গহিনে গোপন যা থাকে, তাই-ই ভালোবাসা। এখন মরিয়মের জন্য এতো যে ব্যাকুলতা, একবার মরিয়মের মুখটা দেখার এতো যে আকুলতা, মরিয়মের কণ্ঠে একটু কথা শোনা, তাকে খুশি দেখা, পাশে বসে একটু কথা বলা, হাতটা একটু ধরাÑ হাবিল যেন বুঝতে পারে এই সবই মিলেমিশেই ভালোবাসা ।

দেশের এমন ক্রান্তিকালে সবাই যেখানে দেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন, এ সময় বউয়ের কথা ভাবছে বলে খারাপ লাগে হাবিলের। নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হয়। আবার না ভেবেও পারে না।…আসার সময় পথে পথে যা দেখেছে হাবিল, তাতে বোঝা গেছে দেশের অবস্থা থমথমে। দেশের অবস্থা যে ভালো না, একটা ছোট বাচ্চাও তা জানে এখন। সবাই জানে পাকিস্তানিরা ক্ষমতোা দিতে চায় না বঙ্গবন্ধুর কাছে।…ঢাকা শহরে যে-কোনো দিন আর্মি নামবে, ভেবে শঙ্কিত সবাই। আসার পথে দেখেছে হাবিল, পথে পথে লোকজন স্লোগান দিচ্ছিল। বিভিন্নভাবে ব্যারিকেড দিচ্ছিল।…পল্টনে, দৈনিক বাংলার মোড়ে অসংখ্য মানুষ। কেউ ইট টেনে আনছে। কেউ ধরাধরি করে বিরাট বিরাট গাছ আনছে কোত্থেকে। দুতিনজন পাশের মোটর মেরামতের কারখানার সামনে ফেলে রাখা পুরনো মোটরগাড়ি টেনে এনে ব্যারিকেড তৈরি করছে। বিশ^বিদ্যালয় এলাকায়ও ছাত্ররা বিভিন্নভাবে রাস্তায় ব্যরিকেড দিচ্ছিল। ওরা বোধহয় এখনও কাজ করছে। এইতো, কান পাতলে এখনও স্লোগান শোনা যায়।…জয় বাংলা, বাঙালি জেগেছে… বাঙালি জেগেছে।

কিন্তু ইদানীং একা থাকলেই হাবিল কীভাবে কীভাবে যেন বউয়ের কথা ভাবতে শুরু করে। মরিয়মের শ্যামল কচি মুখটা সব সময়ই তার চোখে ভাসে। আর আশ্চর্য, যখনই মরিয়মের কথা মনে হয়, কী জানি কেন, সঙ্গে সঙ্গে দেশের কথা, তার গ্রামের কথাও মনে হয়। হাবিল ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, কেন এমন হয়। আসলে মরিয়মের সঙ্গে সঙ্গে মাতৃভূমির জন্যও বোধহয় হাবিলের হৃদয়ে কোথাও একটা অব্যক্ত ভালোবাসা, গোপননির্ভরতা  আছে।

জগতে কত অবিশ্বাস্য ঘটনাই না ঘটে!

হাবিল কদিন ধরে খুব ভাবছিল মরিয়মের কথা। প্রায় মাসখানেক হয়ে গেল, মরিয়মকে দেখে না। তাই বলে বউয়ের মুখ যে ভুলে গেছে তা তো নয়। বিছানায় শুয়ে চোখ বুজলেই মরিয়ম চোখের সামনে চলে আসে। তখন তার সঙ্গে কত কত কথা যে বলে হাবিল! কোন কোন সময়তো রাতই পার হয়ে যায়।

গতকাল রাতেও মরিয়মের কথা ভাবছিল হাবিল। ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। ঠক ঠক শব্দে ঘুম ভাঙে তার। কে যেন দরজায় শব্দ করছে। ঘুম জড়ানো চোখে টেবিলে রাখা ঘড়ির দিকে তাকায় হাবিল। সাতটা পঁয়ত্রিশ বাজে। এতো সকালে আবার কে এল!

দরজা খুলে হাবিল নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না। মরিয়ম আর আমিনা। পেছনে ছোট ভাই নাবিলও আছে।

আম্মা তোমরা! এত সহালে!

আগে ভিত্রে ঢুকতে দে। আমিনা হাবিলকে ঠেলে মরিয়মকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে।…তর বউ রাইতে স্বপ্ন দেখছে কারা জানি তরে মারতাছে। সকালে উঠ্যাঅই শুরু করছে কান্নাকাটি। তরে দেখতে আইব। পারলে তো একলাঅই রওয়ানা হয়।…যতই বুঝাই আমি তর মা, তর কোনো বিপদ অইলে আমি ঠিকঅই টের পামু। কিন্তু বউ কথা শুনলেদঅ! বউরে এই অবস্থায় একলাই-বা ছাড়ি কেইমনে? এইদিকে দেশের যা অবস্থা! কী কী সব হুনি। আমরা দুইজনেঅই বেডি মানুষ, একজন পুরুষ মানুষ লগে না লইয়্যা আওন যায়! এর লাইগ্যা নাবিলরেঅ লগে লইয়্যা আইলাম।

ভালা করেছ। কত দিন তোঙ্গরে দেহি না। কইদিন ধইরা তোঙ্গরে দেখতে খুব ইচ্ছা করতাছিল।

অইছে। আর মনরাখা কথা কওন লাগদঅ না। কারে দেখতে যে তোমার মন ছটফট করতাছিল, হেইডা আমি বুঝি। আমিদঅ তোমার পেডে হই নাই, তুমিই আমার পেডে অইছো।…বাড়িত গেলে কত জানি আমার সামনে বইয়া থাহো, আর আমারে দেহো।

ছোট ঘরটাতে চারজন ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়ানো। মরিয়মকে দেখে হাবিলের মন আনন্দে নাচছে। কিন্তু মা ভাইয়ের সামনে তো আর তা প্রকাশ করা যায় না। তার উপর মায়ের অমন টিপ্পনি মারা কথা। মায়ের কথায় হাবিল লজ্জা পায়। ও বউকে শাসন করে।

শইলের এই অবস্থায় ঘুমত্তে  উঠ্যাই দৌড়াইয়্যা না আইলে অইত না?

মরিয়ম কোনো কথা বলে না।

আমিনা বোরখা খুলতে খুলতে বলে, সারাজীবন জানি, এই সময় মাইয়্যারা নিজেরে লইয়্যা দুঃস্বপ্ন দেহে। বউ দেখল কিনা তরে লইয়্যা।…কী বউ, কইছিলাম না? হাবিলের কিছু অইলে আমি ঠিকঅই টের পাইতাম!

নাবিল বলে, আহ আম্মা, তুমি ব্যাপারডা বুঝবা না। ভাবির আসলে হাবিল ভাইরে দেখতে ইচ্ছা করতাছিল। এর লাইগ্যাঅই… দেহ না, হাবিল ভাই কেমন খুশি অইছে!

এই বদ, সব সময় খালি ফাইজলামি। কতদিন পর তগরে দেখলাম, খুশি লাগব না!… আম্মা, তোমরা বও। আমি বাজারেত্তে আই। ঘরেদঅ কিছুই নাই।… নাস্তা করেছ? মনেদঅ অয় ফজরের নামাজ পইরাঅই রওয়ানা অইছো!

আমরা নাস্তা কইরাঅই রওয়ানা হয়েছি। শহুরা মানুষের মতোন আমরা কি আর দোফরে ঘুমত্তে উডি!

দোফর কই দেখলা! আটটাও বাজে না।

ওই অইল। তর আটটা, আর আঙ্গ দোফর একই কথা।…যা তুই, বাজার কইরা আয়। এই ফাঁকে তর নাস্তাডা বানাইয়্যা রাহি আমি।

যাই আমি। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে হাবিল একবার মরিয়মের দিকে তাকায়। মরিয়ম ঘোমটা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।

কীরে, যাই কইয়াঅ খাম্মার মতোন খাড়অইয়্যা রইলি যে।

এইদঅ, যাই আম্মা। বের হওয়ার আগে মুখটা দেখা হল না। তবে আগের চেয়ে নিশ্চয়ই আরো সুন্দর হয়েছে মরিয়ম। হাবিল জানে, বাচ্চা পেটে এলে  মেয়েদের সৌন্দর্য বাড়ে !

মায়ের হাতের রান্না পেয়ে অনেকদিন পর ভালো মতো পেট পুরে খায় হাবিল। হাবিল নিজের রান্না নিজেই করে। কিন্তু নিজের হাতের রান্না খেতে ওর কখনওই ভালো লাগে না। ওসব রান্না শুধু বেঁচে থাকার জন্যই খাওয়া। বেচারি মরিয়ম অত ভালো খাবারও ঠিকমতো খেতে পারল না। সব কিছুতেই নাকি কেমন গন্ধ পাচ্ছে। অত কিছু রেখে কাঁচামরিচ দিয়ে ভাত মেখে অল্প কটা ভাত মুখে তুলেছে মাত্র। আম্মা অবশ্যি বলছিল, এ সময় মেয়েদের মুখে রুচি থাকে না। তবে, আস্তে আস্তে সময় গেলে সমস্যাটা নাকি অনেকটাই কেটে যায়।

খেয়েদেয়ে বেশ রাত করেই হলে এসেছে হাবিল। ডেমরার দিকে ছোট একটা রুম নিয়ে থাকে ও। অত ছোট রুমে কি আর চারজনের জায়গা হয়! নাবিল শুয়েছে চৌকিতে। মা আর মরিয়ম মেঝেতে। মা আর নাবিল হয়তো দু একদিন থেকেই চলে যাবে। তখন না হয় থাকা যাবে মরিয়মের সঙ্গে। এসেছে যখন মরিয়ম কি আর কটা দিন থাকবে না!

ভাগ্য ভালো বলতে হয়। গার্ড আসাদ রাতে আসবে না। আসাদের বিছানায় শোয় হাবিল। ছোট চৌকিটাতে শুয়ে ঘুম আসে না হাবিলের। আজ আবহাওয়াটা কেমন যেন। চারপাশ থমথমে! বাতাস নেই। গরম লাগছে বেশ। সে কারণেই বোধহয় ঘুমটা আসছে না। থাকগে, একরাত না ঘুমালে আর কী হবে। তার চেয়ে মরিয়মের কথা ভাবা যাক।

হাবিলদের বাড়িতে মরিয়ম বিয়ে হয়ে এসেছে চব্বিশ মাসের কাছাকাছি। হাবিলের হিসাব আছে। এখনও পুরোপুরি দুবছর হয়নি। এর মধ্যেই মেয়েটি বাবা মাকে ভুলে তাকে আপন করে নিয়েছে। মরিয়মেরর যত স্বপ্ন, যত আকাক্সক্ষা হাবিলকে ঘিরেই। বেচারি হাবিলকে ছেড়ে গ্রামে থাকতে চায় না। তা না থেকেই বা করবে কী। হাবিল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের সামান্য একজন দারোয়ান। বেতন যা পায়, ঘর ভাড়া আর খাওয়ার খরচ শেষে বাড়িতে পাঠায়। বলতে গেলে তার টাকাতেই বাড়িতে তিনজনের সংসার চলে। এখন আবার বাড়িতে নতুন অতিথি আসছে। মরিয়মের পেটে বাচ্চা এসেছে দেখতে দেখতে দুমাস শেষ হয়ে এল। ভবিষ্যতে খরচ আরও বাড়বে। বাড়িতে তেমন জমিজমাও নেই যে ফসল হবে। চালটা পর্যন্ত কিনে খেতে হয়। ছোট ভাইটা অবশ্য অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কিছু চাষ করে। কিন্তু তাতে সংসারের আর কতটুকু সুসার হয়! ভাগে যা ধান পায়, তাতে মাস দুয়েকও যায় না। শেষমেষ হাবিলের বেতনই ভরসা।

নাহ, চিন্তাটা যে কোত্থেকে কোথায় চলে গেল! রাত হয়েছে অনেক। ঘুমানো দরকার। সকাল হলেই তো আবার শুরু হবে ডিউটি। কিন্তু এলোমেলো ভাবনাগুলো যে ঘুমাতে দিচ্ছে না।…এদিকে দেশ নিয়েও কেমন একটা চিন্তা হচ্ছে। আসার পথে রাস্তায় মানুষের মধ্যে কেমন একটা চাপা উত্তেজনা দেখে এসেছে। বিশ^বিদ্যালয় এলাকায়ও এখানে ওখানে মিছিল করছিল ছেলেরা। দেশের উপর কোন বিপদ আসে কে জানে! তার চাকুরির আবার কোন সমস্যা হয় কিনা। অনেক কষ্টে চাকরিটা পেয়েছে। চাকরি হারালে বড় কষ্ট হবে। এসব ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে হাবিল।

হঠাৎ প্রচ- শব্দে ঘুম ভেঙে যায় হাবিলের। মেঘ ডাকল নাকি? ওই তো আকাশে আলোর ঝলক। আবার শব্দ। কোথাও বোধহয় বাজ পড়ল। যাক, যদি বৃষ্টি আসে তো গরমটা কমে। কিন্তু না, পরক্ষণেই ভুল ভাঙে হাবিলের। বাজ তো এতো ঘন ঘন পড়ার কথা না। আর বাজ পড়ল এতো শব্দ! বিদ্যুৎ চমকে এতো আলো! পুরো আকাশ যেন আলোতে ঝলসে উঠছে। মানুষজনও কেমন চিৎকার করছে না? কারা যেন ছোটাছুটিও করছে!

চারপাশে জোরালো শব্দ, তীব্র আলো, মানুষের আর্তনাদ! কী যে হচ্ছে, ঘুমভাঙা হাবিল কিছুই বুঝতে পারে না। হলে বোধহয় বিদ্যুৎ নেই। ক্ষণে ক্ষণে আলো ঝলসে উঠছে আকাশের গায়ে। পরক্ষণেই চারপাশ ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে। আবার আলোর ঝলকানি। আবার শব্দ।…গুরুম গুরুম, টাস টাস। সেই সঙ্গে নারী-পুরুষের মরণ চিৎকার। সে চিৎকার শুনে বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠে হাবিলের। বোধহয় হলের পাশের বস্তির লোকেরাই চিৎকার করছে। অমন চিৎকার কেন করছে ওরা?

হাবিল চট্ করে চৌকি থেকে নেমে বের হতে গিয়ে দরজার সামনে থমকে দাঁড়ায়। অন্ধকার আকাশজুড়ে  আবারও আলো ঝলক। সে আলোতে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। টাস টাস গুরুম গুরুম শব্দ হচ্ছেই। শব্দে কানের পর্দা ফেটে যাবার উপক্রম? হঠাৎ ওর পায়ের কাছাকাছি আগুনের গোলা এসে পড়ে। চমকে সরে যায় ও। কী হচ্ছে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না হাবিল। কেয়ামত শুরু হয়ে গেল নাকি!

হায় আল্লা, এতো আর্মি!

বুট পরা আর্মিরা সব দৌড়ে দৌড়ে হলে ঢুকছে। আর বন্দুক উঁচিয়ে গুলি করছে। গার্ডরুমেও তীব্র আলো এসে পড়ে হঠাৎ। ভয়ে কেঁপে উঠে হাবিল। তাকে আবার না দেখে ফেলে। ও গড়িয়ে দেয়ালের দিকে চলে যায়। আলোটা নিভে যেতেই বন্ধ শ্বাসটা ফেলে। দরজার কাছ থেকে সরে এসে দ্রুত চৌকির নিচে ঢুকে পড়ে। কালো রঙে চোখের সামনে থেকে সব যেন সরে যায়। টাস টাস শব্দটা কিসের এতোক্ষণে বুঝে হাবিল। গুলি! এখন ওর কানে শুধু গুলির শব্দ। বৃষ্টির মতো গুলি করছে ওরা। মাঝে মাঝে বেশ জোরালো গুরুম গুরুম শব্দও কানে আসছে। এতেঠ জোরালো শব্দটা কিসে হয়? কামান নাকি? শেষ পর্যন্ত ওরা এই পথ বেছে নিল! সত্যিই আক্রমণ করল করে বসল নিরীহ ঘুমন্ত মানুষের উপর!

রাত কয়টা হবে এখন? বারোটার কম না বোধহয়। নিরীহ মানুষগুলোর চিৎকার শুনে বুকের ভেতর কেঁপে কেঁপে উঠছে। আর্মিরা দলে দলে ভেতরে ঢুকছেই। বুটের আওয়াজে বোঝে হাবিল। প্রাণটা ভয়ে কাঁপছে। যে কোনো সময় তাকে দেখে ফেলবে ওরা। কী করবে কোথায় লুকাবে, ভাবতে ভাবতে হাবিল চৌকির নিচ থেকে বেরিয়ে, পেছন দিকের দরজা দিয়ে বের হয়ে ঝোপের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু দাঁড়ানোর পরক্ষণেই বোঝে এখানে দাঁড়ানোটা নিরাপদ নয়। আশপাশে বৃষ্টির মতো গুলি পড়ছে, যে কোন সময় গায়ে এসে পড়তে পারে। ধীর পায়ে সার্ভেন্টস্ কোয়ার্টায়ের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু মাঝখানে বেশ ফাঁকা জায়গা। আকাশে যেভাবে আলো ঝলকাচ্ছে, পার হতে গেলে চোখে পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা প্রবল। ওর চারপাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে গুলি ছুটে যাচ্ছে। হাবিল আশপাশে আত্মগোপনের কোনো জায়গা না পেয়ে কাছের সেফটি ট্যাঙ্কের ঢাকনা কিছুটা খোলা পেয়ে ঠেলে দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়ে। দুর্গন্ধময় তরল ময়লায় হাবিলের শরীর প্রায় ডুবে যায়। শুধু গলার কাছ থেকে মাথার উপরটুকু জেগে থাকে। হাবিল মাথাটা আরেকটু নিচু করে সেফটি ট্যাঙ্কের প্রায় ভেতরে ঢুকে যায়। বলাতো যায় না, মাথা উঁচু থাকলে যদি গুলি এসে লাগে। মাঝে মাঝেই আকাশ ঝলসে যাচ্ছে তীব্র আলোতে। পরক্ষণেই চারপাশ আবার আঁধার। এখান থেকে হলের প্রায় সবটাই দেখা যায়। দেখার চেয়ে অবশ্যি শোনাই যাচ্ছে বেশি। গুলি হচ্ছে, বৃষ্টির মতো অনবরত। চারদিকে টাস টাস, গুরুম গুরুম শব্দ। নারী পুরুষের মরণ চিৎকার। মাঝে মাঝে তীব্র আলো!

দেখতে পায় হাবিল, সৈন্যরা ছাত্রদের রুমে রুমে ঢুকছে। ভেতরে থাকা ছাত্রদের বের করে বাইরে এনে গুলি করছে। কাউকে কাউকে ভেতরেই গুলি করছে। ভেতরে থাকা দামি দামি জিনিস বের করে নিয়ে আসছে। বিছানা বালিশে, আসবাবে, দরজা জানালায় আগুন দিচ্ছে। যে সব রুমের দরজায় তালা সে সব দরজা বুটের আঘাতে খুলে ফেলছে। দরজা জানালা, আসবাব ভাঙচুর করছে। রুমে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।…একতলা থেকে ওরা দোতলায় উঠে যায় দ্রুত। কেউ রুমে থাকলে তাকে চুল ধরে, লাথি মারতে মারতে রুম থেকে বের আনছে। বাইরে এনে কাউকে গুলি করছে। কাউকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে দোতলা থেকে। এক রুম থেকে তিনজনকে বের করে বাইরে দাঁড় করায়, তারপর একসাথে গুলি করে। ছেলেগুলো ধপাস করে পড়ে যায়। ওদের হাত থেকে বাঁচতে উপায় না পেয়ে কজন ছাত্র আর ক্যান্টিন বয় দৌড়ে একটা রুমে ঢুকে। ঢুকেই তারা দরজা বন্ধ করে দেয়। আর্মিরা সে রুমের দরজা বুটের আঘাতে ভেঙে ফেলে। তারপর রুমের ভেতরে একটা কী যেন ছুঁড়ে মারে। প্রচণ্ড শব্দের সঙ্গে সঙ্গে রুমটাতে আগুন ধরে যায়। রুমের ভেতর থেকে মরণ চিৎকার ভেসে আসে। হাবিল বুঝতে পারে, ভেতরে আশ্রয় নেওয়া সবাই আগুনে পুড়ছে।

হঠাৎ হঠাৎ মরণ চিৎকার শুনে ভয়ে হাবিলের শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হয় পাশের বস্তির নারী পুরুষ সবাই পাঁচিল ডিঙিয়ে হলের ভেতরে ঢুকছে। এমন তারা সব সময়ই করে। যে-কোনো বিপদে পড়লেই। কিন্তু হতভাগ্য মানুষগুলো আজ বাঁচতে পারছে না। পাঁচিলের উপর উঠলেই গুলি খেয়ে টুপ করে পড়ে যাচ্ছে। যে হল তাদের আশ্রয় দিয়েছে বিপদেআপদে, আজ সে হলে ঢুকেই তারা মরছে। ভালোভাবে দেখার জন্য মুখটা আরেকটু জাগিয়ে তোলে হাবিল।…দুতিনটা ছেলেকে দেখা যায় ছাদে দাঁড়ানো। হঠাৎ দুটো ছেলে ছাদ থেকে ছিটকে পড়ে। মনে হয় শক্তিশালী কোনো কিছু তাদের ধাক্কা দিয়েছে। হাবিলের মুখের কাছ থেকে হাত পনেরো দূরে এসে পড়ে ছেলে দুটো। একজনের মাথা ফেটে ঘিলু এসে হাবিলের কাছাকাছি পড়ে। হঠাৎ কেমন অবশ হয়ে আসে হাবিলের শরীর। দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না ও। মনে হয় পা দুটো যেন নিচের দিকে টানছে কেউ। মৃত্যু এতো সহজ! মানুষ এতো সহজে অন্যের জীবন নিতে পারে! চোখের সামনে সব দেখেও হাবিলের বিশ^াস হয় না। কোন অপরাধে নিষ্পাপ মানুষগুলোর উপর এমন অত্যাচার করছে পাকিস্তানি আর্মিগুলো।

আলোর ঝলকানিতেই বোধহয় হাবিলের হুস হয়। হাবিল বুঝতে পারে ও অজ্ঞানমতো হয়ে গিয়েছিল। চারপাশে আগুন জ¦লছে। আকাশে আগুন! হলের ভেতরে আগুন! প্রতিটা রুমে রুমে আগুন! আর্মিরা এখনও চলাফেরা করছে। ছাত্রদেরকে বোধহয় গেটের বাইরেও নিয়ে যাচ্ছে। টানা-হেঁচড়া আর কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে, ফাঁকে ফাঁকে গুলির শব্দও। বাইরে কেমন গুম গুম আওয়াজ! কোনো গাড়ির বোধহয়। ট্যাঙ্ক নাকি?

পাক আর্মিরা আক্রমণ করেছিল মাঝরাতের দিকে। এখনও চলছে হত্যার উৎসব! এর মাঝেই চারদিক থেকে হঠাৎ ফজরের আজানের শব্দ ভেসে আসে। আজানের শব্দ এমন করুণ হয়! মুয়াজ্জিন আজান দিচ্ছে না যেন, যেন করুণ কান্নার কষ্ট ছড়িয়ে দিচ্ছে আকাশে বাতাসে! হায়েনারা ক্ষণিকের জন্য থামে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার শুরু করে ওদের তা-বলীলা। ¯্রষ্টার আহ্বানে থামে না তাদের তা-ব।

অনেকক্ষণ শব্দ নেই আর। মনে হয় চলে গেছে ওরা। কিছুক্ষণ আগে থেকে সব নীরব। না নীরব না! থেকে থেকে আর্তনাদ কানে আসছে ঠিকই। তবে, এতোক্ষণ যে নারকীয় তা-ব ছিল, সে তুলনায় হলের ভেতরটা এখন যেন কবরের মতোই নীরব। প্রতিটা মুহূর্ত হাবিলের কাছে অনেক লম্বা মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন অনন্তকাল ধরে সেফটি ট্যাঙ্কের তরল ময়লার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে একটা অন্তহীন কালো কুয়ার মধ্যে। ওর চারপাশে যেন শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। একটা রাত কখনও এতো লম্বা হয়! কখন আলো দেখা যাবে। আচ্ছা, আদৌ কি রাতটা শেষ হয়েছে? হবে? দেখা মিলবে আলোর?

না, সব প্রতীক্ষারই বুঝি শেষ আছে। সব অন্ধকারই বোধহয় একসময় আলোর কাছে হার মানে। এই তো, একটু একটু আলো ফুটছে চারপাশে। আবছাভাবে চারপাশ নজরে আসছে। সকাল হচ্ছে। শেষপর্যন্ত ভোর হয় নিশ্চুপ মৃত্যুপুরীতেও। তখনও চারপাশে জ¦লছেই আগুন। আকাশে ধোয়ার কু-লী পাক খাচ্ছে। ভোর তো হচ্ছে, কিন্তু কই, আজ তো কোনো পাখি ডাকছে না! পাখিরা কি ওদের পৈশাচিকতা দেখে কণ্ঠের সুর হারিয়ে ফেলেছে! নাকি সব পাখিদেরও মেরে ফেলল ওরা?

সেফটি ট্যাঙ্কের ভেতর থেকে নিজের দেহটা টেনেহিঁচড়ে বের হয় হাবিল। বের হয়ে ও যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। নিজের চোখে দেখেও যেন বিশ্বাস হতে চায় না। ওর মনে হয় ভোর না হলে, অন্ধকার না সরলেই ভালো হতো। নিজের চোখে সব দেখতে হত না।

গেট থেকে হলে ঢোকার রাস্তায় রক্তের মাঝে এদিক ওদিক পড়ে আছে লাশ। লাশ, না মানুষগুলো শুয়ে আছে? হ্যাঁ লাশই তো। রক্তাক্ত। বিবস্ত্র। বীভৎস। কারও তলপেট চেরা। কারও মাথার খুলি ফেটে দুভাগ হয়ে আছে।…বারান্দা থেকে ঝুলছে লাশ। জানালার ভাঙা কাচের ফাঁকে আটকে আছে লাশ। ছাদের কার্নিশে লাশ। মালী, বাবুর্চি, দারোয়ান, ছাত্র, ক্যান্টিনবয়-পরিচিত অনেককেই চিনতে পারে হাবিল। হলে থাকা সবাইকেই কি মেরে ফেলল ওরা! কিন্তু কী অপরাধে?

শরীরের ময়লা ধোয়ার জন্য হলের পেছনের পুকুর পাড়ে গিয়ে শরীর যেন অবশ হয়ে যায় হাবিলের। সারি সারি মৃতদেহগুলো কি আর্মিরাই সাজিয়ে রেখে গেছে? না হলে কচি কচি ছাত্ররা তো এভাবে নিথর হয়ে পাশাপাশি শুয়ে থাকার কথা না। পর পর এগারোজন ছেলে মাটিতে পড়ে আছে, নিথর।

বাঁচাও! আমগরে বাঁচাও!

ভিজা কাপড়ে উঠে আসতেই ক্ষীণ আর্তনাদ শুনে চমকে উঠে হাবিল। পাঁচিলের ওপাশ থেকেই বোধহয় শব্দটা আসছে। ওই তো একজন মেয়ের মুখ উঁকি দিচ্ছে পাঁচিলের কাছে। মেয়েটা তাকে দেখেই বাঁচার আকুতি জানায়। হলের পেছনে রেললাইনের পাশের বস্তির কোনো মেয়েই হবে। মনে হয় সবাইকে মেরে ফেলতে পারেনি পিশাচরা। কতক্ষণ পর নিজেকে ছাড়া আর কোন জীবিত মানুষ দেখল হাবিল! হোক না আহত।

আমাদেরকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাও। হাসপাতালে নিয়ে যাও।

অন্যদিক থেকে শব্দ আসে। হাবিল মুখ তুলে তাকায়। তাকে দেখে কার্নিশে ঝুঁকে কেঁদে উঠে ছেলেটা। ছাদ থেকে যে সব লাশ ঝুলছে, তাদের গা থেকে এখনও টপ টপ করে রক্ত পড়ছে। এক দুফোঁটা ওর গায়েও পড়ে। আর সহ্য করতে পারে না হাবিল। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। রাস্তায় বসে শরীর কাঁপিয়ে বমি করে।

খানিক পর ধাতস্থ হাবিল উঠে দাঁড়ায়। কেমন জ্বর জ্বর লাগে ওর। পা দুটো কাঁপছে ঠক ঠক। কোনো দিকে তাকাতে সাহস পায় না। এদিক ওদিক না তাকিয়ে হলের বাইরে আসে। গেইটের কাছেই রাস্তায় নাইট গার্ড হারুনের নিথর দেহটা পড়ে আছে রক্তের উপর। হায় আল্লা! একি দেখছে হাবিল। রাস্তাজুড়ে শুধু লাশ আর লাশ। নারী পুরুষ শিশুÑ সবার লাশই আছে। এখানে ওখানে লাশ কুকুরে কামড়াচ্ছে, কাকেরা দল বেঁধে খুঁটে খুঁটে রক্ত খাচ্ছে।

হাবিল এদিক ওদিক তাকায়। রাস্তায় কোনো জীবিত মানুষ নেই। চারদিকে কবরের নিস্তব্ধতা। নিস্তব্ধ কবরের এখানে ওখানে শুয়ে আছে নিথর লাশ।

ধীর পায়ে হাঁটতে থাকে ও। হাঁটতে গিয়ে পা কেমন অবশ অবশ লাগে ওর। মনে হয় এতো এতো লাশের মাঝে নিজেও একটা লাশই যেন! হাবিল যে বেঁচে আছে, সেটা যেন নিজেরই বিশ^াস হতে চায় না।

 

২৬শে মার্চ, ১৯৭১।

লাশ লাশ লাশ, চারদিকে লাশ…

হাঁটতে হাঁটতে একটু পর হাবিল দাঁড়িয়ে পড়ে। ওর সামনে দুটো মৃতদেহ। বেশভূষা দেখে মনে হয় ভিখারিই হবে। মৃতদেহ দুটোর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে হাবিল। তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর চোখ পানিতে ভরে উঠে।

একটা দুধের শিশু মৃত মায়ের পায়ের কাছে পড়ে আছে। শিশুটাও মৃত। বোধহয় মাথায়ই গুলি লেগেছিল। ওখানে রক্ত শুকিয়ে আছে। একটা দাঁড়কাক শিশুটার একচোখ ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে। আরেক চোখ আগেই খাওয়া। সেখানে এখন গর্ত। কালো একটা কুকুর মায়ের পায়ের গোছা কামড়াচ্ছে। আশপাশে আরও মৃত দেহ যে নেই, তা নয়। কুকুর আর কাকটা কেন যে মা আর শিশুটার লাশই খাচ্ছে! হাবিল হাত দিয়ে ভয় দেখায়। কাকটা উড়ে গেলেও কুকুরটা নড়ে না। হাবিল আবার হাত উঁচিয়ে কুকুটাকে ভয় দেখায়। এবার কুকুরটা কামড়ে ধরা পাটা ছেড়ে সরে দাঁড়ায় বটে, তবে একবারে দূরে চলে যায় না।

হাবিল আশপাশে তাকিয়ে একটা আধলা ইট দেখতে পেয়ে তুলে নিয়ে কুকরটাকে ছুঁড়ে মারে। কুকুরটার গায়ে লাগে না। তবে ভয় পেয়ে কুকুরটা দূরে চলে যায়। হাবিল খানিক সামনে হেঁটে কী মনে করে পিছু ফিরে তাকায়। তাকিয়ে দেখতে পায়, কুকুরটা আবার ফিরে এসেছে মৃতদেহ দুটোর কাছে। কুকুরটার দিকে তাকিয়ে হাবিলের মনে হয়, কুকুরটা যেন পাকিস্তানি সৈন্যদের মতোই। ওরা যেমন ঘুমন্ত নিরীহ ছাত্রদের উপর আক্রমণ করেছে, কুকুরটাও তেমনি ভিখারি মা আর বাচ্চাটা বেঁচে থাকতে নিরীহ ছিল বলেই তাদের লাশ খাচ্ছে। না হলে আশপাশে তো আরও লাশ আছে, কই কুকুরটা তো সেদিকে যাচ্ছে না!

হাবিল দৌড়ে গিয়ে কুকুরটাকে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে লাথি মারে। কুকুরটা ছিটকে গিয়ে পড়ে হাত পাঁচেক দূরে। উঠেই কুঁইকুঁই করে লেজ গুটিয়ে পালায়। কুকুরটা চলে গেলে হাবিল এদিক ওদিক তাকায়। দৃষ্টিসীমায় কোনও মানুষ নেই। হাবিলের মনে পড়ে, হলে থেকে বের হয়ে খানিকটা পথ আসার পর দুজন লোককে দেখেছিল। তারা হাবিলকে রাস্তায় বের হতে নিষেধ করেছিল। অনির্দিষ্টকালের জন্য নাকি কারফিউ জারি করেছে টিক্কা খান। বাইরে কাউকে দেখামাত্র গুলি করা হবে। সে কারণেই বোধহয় রাস্তায় লোকজন নেই। রাস্তায় কোনো রিকশা বা অন্য কোনো যানও নেই। দূরে শাহবাগের দিকে হতে মিলিটারিদের বিরাট এক লরি আর দুটো জিপ আসছে দেখা যায়। লরি চলার শব্দে পায়ের তলে রাস্তা কেঁপে কেঁপে উঠছে। লরির পেছনে জীপ। গাড়িগুলোর উপর চারদিকে অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে আছে মিলিটারিরা।

লরিটা কাছাকাছি চলে আসার আগেই হাবিল ভয়ে ভয়ে একটা ঝোপের ভেতরে লুকায়। লরি চলে গেলে ঝোপ থেকে বের হয়ে  দ্রুত পায়ে হাঁটতে থাকে। আরেকটু গেলেই রেসকোর্স ময়দান। হাবিল ভেতরে ঢুকে থমকে দাঁড়ায়।… মাত্র আঠারোদিন আগের ঘটনা না! এক সিংহপুরুষের কণ্ঠ তার কানে বাজে। বিরাট জনসমুদ্রের মাঝে সে কণ্ঠ প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছিল। সে সিংহপুরুষকে একনজর দেখার জন্য হাবিল গাছে উঠে বসেছিল। এখনও সে দৃশ্য তার চোখের সামনে দেখে হাবিল। শাহাদাৎ আঙুল উঁচিয়ে সিংহপুরুষ বলছেন, এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম,স্বাধীনতার সংগ্রাম।…সেই সংগ্রাম কি শুরু হয়ে গেল? বঙ্গবন্ধুর সেই অমোঘ বাণী কি মাত্র আঠারো দিনের ব্যবধানেই সত্যি হয়ে গেল!

হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন হাবিল রেসকোর্স থেকে বের হয়ে এসেছে। একটা জিপ থেকে মিলিটারিরা গুলি করছিল। শব্দে সচকিত হাবিলকে হঠাৎ কেমন অচেনা একটা ভয় গ্রাস করে। ও বড় রাস্তা ছেড়ে গলিতে ঢুকে  দ্রুত হাঁটতে থাকে। এতোক্ষণে মা বউয়ের কথা মনে হয়। রাত থেকে একবারও ওদের কথা মনে পড়ল না ওর! যে মরিয়মের কথা না ভাবলেও মনে পড়ে, তার কথাও ভুলে গেল হাবিল! বোধহয় এতো রক্ত, এতো লাশ, আর আর্তনাদের মধ্যে সে নিজেকেও ভুলে গেছে। হাবিল যে বেঁচে আছে সেটাই বোধহয় এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। ওদিকেও কি মিলিটারিরা আক্রমণ করেছে? মা মরিয়ম ছোট ভাইটা, সুস্থ আছে তো? বেঁচে আছে তো?

হাবিল রাস্তা ধরে হাঁটতে সাহস পায় না। কখন আবার মিলিটারিদের চোখে পড়ে যায়! গলিতে গলিতেই হাঁটতে থাকে। মতিঝিলির কাছে পৌঁছে দেখতে পায় এক জায়গায় রক্তাক্ত হৃৎপি- আর নাড়িভুঁড়ি পড়ে আছে। কাছেই বুকে বিশাল শূন্যতা নিয়ে পড়ে আছে এক নিথর যুবক। হৃদপি- আর নাড়িভুঁড়ি বোধহয় ওই হতভাগ্য যুবকেরই। রাস্তায় কোনো লোক নেই। রাস্তা আর আশেপাশের বিল্ডিং যেন কাঁপছে। নিশ্চয়ই লরি আসছে। ও কোনো দিকে না তাকিয়ে দ্রুত হাঁটতে থাকে।

একটা ট্রাক হাবিলের পাশ দিয়ে চলে যায়। ট্রাকটা বেশ ধীর গতিতে চলছিল। সামনে তিনটা মৃতদেহ পড়ে আছে। ট্রাকটা সেখানে থামে। দুজন লোক নেমে লাশ তিনটা দ্রুত ট্রাকে উঠিয়ে নেয়। হাবিল এতোক্ষণে খেয়াল করে দেখে, ট্রাক থেকে চুঁইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে। তার মানে ট্রাক ভর্তি মানুষের লাশ। লাশ নিয়ে ওরা যাচ্ছে কোথায়? …পথে পথে এতো যে লাশ দেখে এল হাবিল, এতো লাশ কবর-ইবা দেবে কোথায়।

ট্রাকটা চলে যেতেই বুড়োমতো এক লোককে দেখতে পায় হাবিল। লোকটা উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটছিল। হাবিলকে দেখে যেন দৌড়ে আসে।

অ বাবা, আমার মেয়ে দুটোকে দেখেছো। এখান থেকেই তো ধরে নিয়ে গেল গতকাল রাতে বাড়ি যাওয়ার সময়। ওরা বলেছিল, মেয়ে দুটোকে ছেড়ে দিবে। কেয়ামতের রাতটা গেল। মেয়ে দুটো তো ফিরে এল না। ওরা কি বেঁচে নেই বাবা?

হাবিল ফ্যালফ্যাল করে বৃদ্ধের দিকে চেয়ে থাকে। বৃদ্ধকে কী বলবে! কোন ভাষা খুঁজে পায় না। একটা জিপ আসছিল সাইরেন বাজিয়ে। বোধহয় মিলিটারিই আসছে। আতঙ্কিত হাবিল দ্রুত একটা আধপোড়া দোকানে  ঢুকে পড়ে। বৃদ্ধ লোকটি রাস্তার উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে। হাত নেড়ে জিপটার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মিলিটারি জিপটা বৃদ্ধের কাছে এসে থামে। বৃদ্ধ কী যেন বলে। মিলিটারিরা বৃদ্ধের কথায় জোরে জোরে হেসে উঠে। হাবিল যে হাসির শব্দ শুনতে পায় তা না। তবে ওরা যেভাবে শরীর বাঁকিয়ে দাঁত বের করেছে, তাতে ওরা যে হাসছে সেটা দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে। হাবিলের চোখ দেখে, মিলিটারিদের একজন হাসতে হাসতে বৃদ্ধের মাথায় গায়ে গুলি করে। বৃদ্ধ মাটিতে পড়ে যায়। মিলিটারি জিপটা সাইরেন বাজিয়ে চলে যায়। হাবিল আর দেরি করে না। দোকানের আশ্রয় থেকে বের হয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে থাকে।

দুর্বল পায়ে দৌড়াতে দৌড়াতে হাবিল দেখে, রাস্তায় এখানে ওখানে ধোঁয়া উড়ছে, আগুন জ¦লছে। বস্তি পুড়ছে, দোকান জ¦লছে। ফুটপাতে, রাস্তায় পড়ে আছে লাশ। পোড়া আধপোড়া লাশ। বিকৃত রক্তাক্ত থ্যাঁতলানো লাশ। নারী-পুরুষ শিশুর লাশ। শ্রমিক ভিখারি রিকশাওয়ালার লাশ। মাঝে মাঝে পায়ের তলায় রাস্তা কাঁপছে, বোঝা যায় রাস্তায় ভারি গাড়ি চলছে, সে সঙ্গে গুলির আওয়াজ। মানুষের আর্তনাদ। হাবিলের মনে হয়, যে কোনো সময় ওর গায়েও গুলি এসে লাগতে পারে। তা হলেও থামে না ও। দৌড়াতে দৌড়াতে কখন যে যাত্রাবাড়ি চলে আসে! একটা খালি রিকশা দেখে একরকম জোর করেই তাতে উঠে বসে হাবিল। হাঁপাতে হাঁপাতে কাকুতি করে বলে, ভাই আমারে উট্টু ডেমরা নিয়া চলেন।

জোয়ান রিকশাওয়ালা ঝড়ের গতিতে রিকশা টানতে টানতে বলে, কোনদিক থাইক্যা আইতাছেন ভাইজান?

আমি বিশ্ববিদ্যায়ের হলের দারওয়ান। বিশ^বিদ্যালয়ের দিগেত্থে আইতাছি। এই দিগের কী অবস্থা ভাই?

হুনছিলাম, এই দিগে মিলিটারি আইছিল। কিন্তু নিজের চৌখ্যে দেহি নাই। ভাইজান, আপনি যে দিগেত্থে আইছেন, সে দিগের কী অবস্থা?

রিকশা খানিকটা এগিয়েছে। পথে দুএক জন লোক দেখা যাচ্ছে। একটা দুটো গাড়িও চলছে। দেখে ভয়টা একটু কমে হাবিলের। মনে হয়, কত কত দিন পরে জীবিত মানুষ দেখছে! রিকশাওয়ালার কথায় তো মনে হচ্ছে মরিয়মরা বেঁচেই আছে। হে আল্লাহ, বাসায় গিয়ে যেন মরিয়মের মুখটা দেখতে পাই, মায়ের মুখটা দেখতে পাই। মনে মনে খোদার কাছে আর্জি জানায় হাবিল।

নিজের চৌখ্যে যা দেইখ্যা আইলাম, বিশ্বাস হয় না। পাকিস্তানিগদঅ বঙ্গবন্ধুর কাছেই ক্ষমতা দেওয়ার কথা আছিল। হিসাব মতো তা-ই অয়। আমরা নির্বাচনে জিতলাম না! তার বদলে তারা কী করল! …নিজের  চৌখ্যে দেইখ্যাঅ বিশ্বাস করতে পারতাছি না।…ঢাকা শহরের সব মানুষরেঅই মনেঅয় আর্মিরা মাইরালাইছে! সবখানে শুধু লাশ আর লাশ!

আমরা যে পাড়ায় থাকি, হেন আর্মিরা যায় নাই। রিকশাওয়ালা ঘাড় ঘুরিয়ে হাবিলকে দেখে। তয় আমরা সারারাইত গোলাগুলির শব্দ হুনছি। ভয়ে দুই চোখ এক করতে পারি নাই। ওয়ারির দিগে আগুন দেখছি আকাশে। সকালে উঠ্যাঅই গেছিলাম ওইদিকে। দেহি বাড়িঘর সব পুড়তাছে তহনো। বিহারিরা হিন্দুগঅ সবকিছু লুট করে নিয়া যাইতাছে। রাস্তায় পোড়া, আধাপোড়া লাশ দেখেছি।

লাশ! লাশের কথা আমার কাছে কইঅ না ভাই। সারা রাস্তায়ইদঅ দেখছি লাশ। আমি যে বাঁইচ্যা আছি এখনো যানি বিশ^াস অইতাছে না। আমার চৌখ্যের সামনে এতোলা তরতাজা ছেলে মরল! হলে আমি একলাঅই আছিলাম বাঁইচ্যা।

হুনলাম, সব লাশ নাকি ট্রাকে কইরা ধলপুরের গর্তে নিয়া ফালাইতাছে।

কী জানি, অইতেও পারে। আমি আসার পথে একটা ট্রাকে দেখছি লাশ তুলতে। ভিতরে নিশ্চই আরও লাশ আছিল।… তুমি আট্টু জোরে চালাও না ভাই। বাসার লোকজনরে না দেখলেদঅ মনডায় শান্তি পাইতাছি না। তারা সব বাঁইচ্যা আছে কিনা কে জানে!

অত চিন্তা কইরেন না। এদিগের সব জায়গায়দঅ আর্মিরা আইয়্যে নাই। গিয়া দেখবেন, বাসার লোকজন ঠিকঅই আছে।

তোমার কথাঅই যানি সত্য হয়।

বলতে না বলতেই বিকট আওয়াজ শোনে ওরা দুজন। হাবিল ছিটকে পড়ে রাস্তায়। প্রচ- ব্যথায় চোখ বোজার আগ মুহূর্তে হাবিল দেখে রিকশওয়ালার দেহটা ছিন্নভিন্ন হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

 

২৮শে মার্চ, ১৯৭১।

তারা পিতা ও পুত্রকে পাশাপাশি উলঙ্গ করে বেঁধে রাখে সারারাত…

সকালবেলা ফেরিঘাট থেকে ধরে নিয়ে আসার পর থেকেই দু’চোখ বাঁধা নাবিলের। দুহাতও পিছমোড়া করে বাঁধা। চোখ বাঁধা থাকায় কিছু না দেখলেও বুঝতে পারছে নাবিল, পথে পথে ওরা অনেক লোক তুলেছে সারাদিনই। চোখে না দেখলেও, শব্দ শুনেছে গুলির। আর্তনাদ শুনেছে মৃত্যু পথযাত্রীর। বিকালের দিকে নাবিলের চোখের বাঁধন নিজে থেকেই অনেকটা ঢিলা হয়ে এসেছিল। এক সময় চোখের বাঁধন পুরোপুরিই খুলে যায়। অনেকক্ষণ চোখের উপর কাপড় চেপে থাকায় হঠাৎ কিছু নজরে আসছিল না। ধীরে ধীরে আলো সয়ে দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে এলে নাবিল দেখে, ট্রাকটা প্রায় ভর্তি মানুষে। সবাই পুরুষ এবং প্রায় তার সমবয়সি। সবারই দুহাত পিছমোড়া করে বাঁধা। কারও চোখ বাঁধা। কারও চোখ খোলা। কারও কারও নাক মুখ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। কেউ কেউ কাঁদছে। পথে পথে এখনও লোক তুলছে মিলিটারিরা। সবাইকে নিয়ে যাচ্ছে কোথায় ওরা?

এখন রাস্তা বলতে গেলে ফাঁকাই। তবে ট্রাকটা চলছিল ধীরগতিতে। চারজন মিলিটারি ওদের দিকে অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। আর কয়েকজন ট্রাকটার চারদিকে পজিশন নিয়ে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো। যেতে যেতে এদিক ওদিক তাকায় নাবিল। লোকজন চোখে পড়ে না, মাঝে মধ্যে দেখা যাচ্ছে লরি কী ট্রাক চলছে মাটি কাঁপিয়ে। তবে জীবিত মানুষ দেখা না গেলেও মৃত মানুষের অভাব নেই। পথের এখানে ওখানে পড়ে আছে লাশ। …ভিখারির লাশ, ওই তো থালাটা সামনেই পড়ে আছে। …পুলিশের পোশাক পরা বেশ কয়েকটা লাশ। পুরুষের লাশ। মহিলার লাশ। রিকশাওয়ালা মরে পড়ে আছে তার রিকশার উপরে। অনেক লাশেই পচন ধরেছে। ফুলে উঠে বীভৎস হয়ে আছে।…দুতিনজন লোক লোহার কাঁটা দিয়ে গেঁথে গেঁথে টেনে টেনে একটা ট্রাকে লাশ তুলছে। এখানে ওখানে, দোকানে, বাড়িতে আগুন জ¦লছে, ধোঁয়া উড়ছে।… আসলে ইব্রাহিম তাদেরকে ঠিক খবরই দিয়েছিল। হাবিল ভাইকেও ওরা মেরে ফেলেছে। যদিও প্রথম শুনে মনে হয়েছিল, হাবিলের মৃত্যুর খবর বোধহয় সত্যি নয়। একটা তরতাজা মানুষ রাতে খেয়েদেয়ে হলে গেল আর সকালের আগেই লাশ হয়ে গেল! ঠিক বিশ^াস হতে চায় না। তাছাড়া হলের সমস্ত মানুষকে এক রাতেই মেরে ফেলেছে আর্মিরা, ব্যাপারটাও কেমন অবিশ^াস্য মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল, হয়তো ইব্রাহিম বাড়িয়ে বলছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ইব্রাহিমের দেওয়া খবরটা সত্যিই শুধু নয়, খুবই স্বাভাবিক। মিলিটারিরা  যে অকারণে মানুষ মারছে সে তো সকাল থেকেই দেখছে নাবিল।…চোখের সামনে এতো লাশ দেখে হাবিলের মৃত্যুর খবর আর অবিশ্বাস্য মনে হয় না নাবিলের।…মাকে তো ওরা তার চোখের সামনেই মারল! ভাবির কী হল কে জানে!

একটা গেইটের কাছে এসে ট্রাকটা থামে। গেইটের কাছে দুজন মিলিটারি অস্ত্রহাতে দাঁড়িয়ে আছে।  সবাইকে ঠেলে ঠেলে নামানো হয়। ভেতরে একটা মাঠ। বেশ বড়। মাঠে সব বন্দিদের উপুড় করে শুতে বলা হয়। যারা শুতে দেরি করছিল মিলিটারিরা তাদের ধাক্কা দিয়ে, পিটিয়ে মাটিতে শুইয়ে দেয়। তারপর হঠাৎই শুরু হয় এলোপাথাড়ি মার।…বেত লাঠি বন্দুক, যার হাতে যা ছিল, তাই দিয়ে পিটাতে থাকে ওরা। প্রায় ঘন্টাখানেক বন্দিদের পিটায় ওরা। হয়তো ক্লান্ত হয়েই থামে। বন্দিদের অনেকেই ততক্ষণে অজ্ঞান হয়ে গেছে। নাকমুখ হাত পা পিঠ ফেটে রক্ত পড়ছে। নাবিলের মনে হয় ওর বাম হাতটা বোধহয় ভেঙ্গেই গেছে। তবে ও বেহুঁশ হয়নি।

একটু পরেই আবার সবাইকে গরুর মতো পিটাতে পিটাতে, ঠেলতে ঠেলতে একটা ছোটরুমে ঢুকানো হয়। রুমটা লোকের তুলনায় খুব ছোট। ঠাসাঠাসি করে দাঁড়ায় সবাই। রুমে জায়গা এতোই কম যে, সবাইকে দাঁড়িয়েই থাকতে হয়। কেউ একজন যে বসবে সে জায়গাটুকুও নেই। কিন্তু অনেকেই অসম্ভব অত্যাচারের দরুন দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। আরেকজনের গায়ে ঢলে পড়ছে। মিলিটারিরা বসামাত্রই হাতের লাঠি দিয়ে বন্দুকের বাট দিয়ে পিটিয়ে, পায়ের বুট দিয়ে লাথি মেরে জোর করে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিল।

মাঠে শুইয়ে অমানুষিক অত্যাচারের কারণে কারও গায়ের কাপড় চোপড়ই ঠিক নেই। অনেকের গায়ে কোন কাপড়ই নেই। নাবিলের পরনে জাঙ্গিয়াটা ছিল কোনমতে। মিলিটারিরা এসে বন্দিদের হাত রুমের ছোট জানালার সঙ্গে ঝুলিয়ে বাঁধে। বাধা যে দিবে এমন শক্তিও কারও অবশিষ্ট ছিল না। একটা কিশোর বাবা বাবা করে ডাকছিল। কিশোরটি সম্পর্ণ উলঙ্গ। দু’হাত পিছমোড়া করে বাঁধা বলে সে তার লজ্জা দু’হাতে ঢাকতে পারছিলো না। তার বাবা রুমটাতে আছে কিনা কে জানে। তবে তার কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। একজন মিলিটারি এসে ছেলেটার গালে থাপ্পড় মেরে জিজ্ঞেস করল, তুমাহারা বাপ কাহা গ্যায়া? ম্যায় ঢুনতাহু।

মিলিটারিটা সত্যি ছেলেটার বাপকে খুঁজে বের করে। সে বেচারার মাথা ফেটে রক্ত ঝরছিল। দুহাত পিছন থেকে বাধা। সেও সম্পূর্ণ উলঙ্গ। ছেলেকে দেখে সে ঘুরে যায়। কিন্তু মিলিটারিটা তাকে ছেলের কাছে এনে জানালার শিকের সঙ্গে হাত ঝুলিয়ে বাঁধে। সে এক অবমাননা দৃশ্য! উলঙ্গ বাপ আর ছেলেকে পাশাপাশি বেঁধে রেখেছে পিশাচরা। বাপ ছেলে দুজনেই মাথা নিচু করে রেখেছে। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না।

সারারাত এভাবেই জানালার শিকের সঙ্গে বন্দিদের সবাইকে বেঁধে রাখা হয়। কাউকে ঘুমাতে দেয় না ওরা। মাথার উপরে কড়া আলো জ¦লছে। বাইরে দুজন মেশিনগান নিয়ে পাহারা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে এক এক জন মিলিটারি ঢুকে বন্দিদের এলোপাথাড়ি মার দিয়ে যাচ্ছে। যার যেমন ইচ্ছে গালিগালাজ করছে। ইয়ে শালালোগ, সাব মুক্তি হ্যায়। শালা শোয়ার কা বাচ্চা, হিন্দুকা লাড়কা।…হামলোগ আদমি নেহি মাংতা। জমিন মাংতা। …আভি কাহা হ্যায় তুমহারা মুজিব বাপ?

প্রথমদিকে প্রচণ্ড ব্যথা ছিল শরীরে, এখন যেন সব অনুভূতি ভোতা হয়ে গেছে নাবিলের। ভাঙা হাতটা ফুলে উঠেছে। রশির গিট চেপে বসেছে হাতে। পাশাপাশি উলঙ্গ পিতাপুত্র মাথা নিচু করেই ছিল। প্রচণ্ড মারের পরও মাথা তুলে তাকায়নি কেউ। তাকালেই একজন দেখতে পেত ঝুলিয়ে হাত বাঁধা আত্মজ-র নগ্ন দেহ। আরেকজন দেখতে পেত আবরণহীন জনকের নগ্ন অবয়ব। তাই তারা চোখ খোলেনি। তাই তারা মাথা তুলেনি। মিলিটারিরা মজা দেখার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে। বলতে গেলে সারারাতই দুজনকে মেরেছে। কিন্তু বাপ ছেলে মাথা নিচু করেই ছিল। শেষে, মিলিটারিদের একজন হাসতে হাসতে পিটাতে পিটাতে ছেলেটার মাথা গুঁড়া করে ফেলে। রক্ত ছিটকে পড়ে পাশে বাঁধা জন্মদাতার গায়ে। তবুও জনক মাথা তুলেনি। মৃত ছেলেটাকে একজন বস্তায় ভরে নিয়ে যায়। জনকের মাথা তখনও নিচের দিকে।

নাবিলের চোখের সামনেই সব ঘটে। বন্দিদের চোখের সামনেই এসব নিষ্ঠুরতা চলে। কিন্তু কেন জানি নাবিলের মনে হয় ওরা যা করছে তা স্বাভাবিক। অথবা ওর মাথাটাই নষ্ট হয়ে গেছে। সকাল থেকে এই পর্যন্ত যা দেখেছে তাতে কোনো মানুষই সুস্থ থাকতে পারে না। মিলিটারিরা দুপুর থেকে পালাক্রমে তাদের পিটিয়েছে। পিটাচ্ছিল আর অট্রহাসিতে ফেটে পড়ছিল তারা। বন্দিদের অনেকেই পানি পানি করে কাতরাচ্ছিল। কিন্তু তাদেরকে কেউ পানি দেয়নি।

সকাল হলে উলঙ্গ অর্ধ উলঙ্গ সবাইকে গরুর মতো পিটাতে পিটাতে নিয়ে যাওয়া হয় বাইরে। একটা ছোট হাউজের সামনে সবাইকে দাঁড় করানো হয়। অগভীর হাউজে অল্প পানি। পানিটা ময়লা। ঘোলাটে। বোধহয় এখানেই পশুগুলো গোসল করে।

যাও শালা লোগ, পিয়ো যিতনা মন চায়।

অমন পানি কেউ পান করতে পারে! অবিশ্বাস্য চোখে নাবিলরা দেখে ওদের সামনেই মিলিটারিরা প্যান্টের বোতাম খুলে হাসতে হাসতে হাউজের পানিতে প্রস্রাব করছে। দু’একজন বন্দি এখনও পানি পানি বলে কাতরাচ্ছে। মিলিটারিরা তাদের মুখে প্রস্রাব করে আর বলে, পিয়ো। আর তারা ক্রমাগত হাসতে থাকে। হাসতে হাসতেই তারা এক একজন বন্দির মুখে প্রস্রাব করতে থাকে।

পিপাসা সইতে না পেরে কেউ কেউ হাউজের পানিতে মুখ ডুবিয়ে পানি পান করে। গতকাল দুপুর থেকে নাবিলেরও পিপাসায় বুক ফেটে যেতে চাইছে। কিন্তু পানি খাওয়ার সাহস হয় না।

গতকাল সকাল থেকে কিছু পড়েনি পেটে। না খাবার, না পানি। বন্দিদের সবারই এক অবস্থা। তবু সবাই কিভাবে দাঁড়িয়ে আছে, বেঁচে আছে, ভেবে নাবিল অবাক হয়। মানুষ কি এতেঠই শক্ত প্রাণী! এতো পিটুনিতে হাতিওতো মারা যাওয়ার কথা। নাবিল নিজের কথা ভেবেই অবাক হয়। জন্মইস্তক কেউ তার গায়ে হাত তুলেনি। কিন্তু গতকাল থেকে যে মার মারছে ওরা, তাতে নাবিল কিভাবে দাঁড়িয়ে আছে! বাম হাতটা ভেঙে একসাথে বাঁধা ডান হাতের সঙ্গে লেগে আছে। সে হাতেও যেন কোনো ব্যথা অনুভব করছে না নাবিল। কখন যে ওরা আবার পিটানোর শুরু করেছে বলতে পারবে না। ঠেলতে ঠেলতে সবাইকে যখন ছোট রুমটাতে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন সে ও সবার সঙ্গে এগিয়ে যায়।

দুপুরের দিকে বোধহয় ওদের দয়া হয়। এক গামলা ভাত নিয়ে আসে বন্দিদের সবার জন্য। এতো নির্র্যাতন এতো অবমাননা, তারপরও ভাত দেখে যেন সবার ক্ষুধা জেগে উঠে। মিলিটারিরা কিন্তু ওদের ভাত দেখিয়ে হাসে। হাসতে হাসতে গামলার ভাত মেঝেতে ছিটিয়ে দেয়। আর বলে, শালা লোগ, চাওল খায়েগা? চাওল!

ক্ষুধায় কাতর কেউ কেউ কুকুরের মতো চেটে চেটে সে ভাত খেতে থাকে। নাবিল অবিশ^াস্য চোখে দেখে, উলঙ্গ সে পিতাও সবার সঙ্গে ভাত খাওয়ার চেষ্টা করছে। এতো মার খেয়েও নাবিলের যা হয়নি, চোখ থেকে পানি আসেনি, এখন কেন জানি, দু’চোখ ভরে উঠে পানিতে।

 

২৯শে মার্চ, ১৯৭১।

লাশটা লাথি দিয়ে ফেলে দেয় মেঘনার জলে…

চোখ খুলে হাবিল দেখতে পায়, একটা ময়লা বিছানায় শুয়ে আছে। শরীরজুড়ে প্রচ- বেদনা। কাঁধের কাছে কাপড় বাঁধা। রিকশাওয়ালার দেহটা তো চোখের সামনে টুকরা টুকরা হয়ে গেল। অথচ ও মরেনি! চোখের সামনে সবাই মরছে, অথচ ও বেঁচে যাচ্ছে। মরিয়মরাও বোধহয় বেঁচে নেই।

এক বৃদ্ধ বসেছিলেন শিথানের কাছে। হাবিলকে চোখ খুলতে দেখে বলেন, ওরা কামান থেকে গোলা ছুঁড়েছিল, আপনার কাঁধে লেগেছে। রাস্তায় পড়ে ছিলেন। কাঁধের মাংস অনেকখানি উড়ে গেছে। রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না কিছুতেই। ব্যান্ডেজ যে বাঁধা হবে তার উপায়ও ছিল না। আশপাশে কোনো ডাক্তার পাইনি। শেষে আমার মেয়ে তার ওড়না কেটে ব্যান্ডেজের মতো করে বেঁধেছে। শেষ রাতের দিকে রক্তপড়া বন্ধ হয়েছে। আপনি পুরো রাতই অজ্ঞান ছিলেন। শরীর তো অনেক দুর্বল মনে হচ্ছে, উঠে বসতে পারবেন? কিছু না খেলে শরীরে বল পাবেন না। ঘরে দুধ আছে। একটু দুধ খান। গরম করে দিক?

খাওয়া! হাবিলের মনে পড়ে বাসা থেকে রাতে খেয়ে যে বের হয়েছিল এরপর আর খাওয়া হয়নি। কিন্তু কোনো ক্ষুধা অনুভব করছে না ও। সারাশরীর কেমন যেন হালকা হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে ও যেন একটা পাখি হয়ে গেছে। কিন্তু আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখিকেওতো ওরা মেরে ফেলেছে। না হলে ভোর হল, কই পাখিতো ডাকল না। বৃদ্ধ কেমন চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। খোলা জানালা দিয়ে ভোরের মোলায়েম আলো এসে পড়েছে হাবিলের মাথার কাছে।

হঠাৎ টর টর আওয়াজ শোনা যায়।

ওই আবার শুরু হয়েছে গোলাগুলি। মাত্রই সকাল হল, পশুগুলো মানুষ মারার উৎসব শুরু করে দিয়েছে। কোনো বাঙালিকেই আর জীবিত রাখবে না ওরা।…বিথি, জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে যা তো মা। বলাতো যায় না, কোন ফাঁকে আবার ঘরের ভেতর গুলি এসে ঢোকে। সেদিন সোবহান সাহেবের নাতিটা বারান্দায় বসে খেলছিল। হঠাৎ গুলি লেগে ছেলেটা মরল।…আর আমার রেডিওটা দিয়ে যাস। দেখি বিবিসিটা শুনে, নতুন কোন খবর পাওয়া যায় কিনা।

বিথি এসে বাপকে রেডিও দিয়ে যায়, পাল্লা টেনে জানালা বন্ধ করে দেয়। হাবিলের মনে হয় এই মেয়েটার সঙ্গে কোথায় যেন মরিয়মের মিল আছে। মিলটা ঠিক কোথায় সেটা ধরতেই হাবিল মেয়েটার দিকে তাকায় ভালোমতো। তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিথি এক সময় অদৃশ্য হয়ে যায় তার চোখের সামনে থেকে।

বৃদ্ধ লোকটি পরম মমতায় হাবিলের গায়ে হাত রাখেন। ছেলেটার গা পুড়ে যাচ্ছে জ¦রে! বোধহয় অজ্ঞানই হয়ে গেছে। অজ্ঞান ছিল সারারাতই। মরিয়ম মরিয়ম বলে কাকে যেন ডাকছিল। রিকশা করে কোথায় যে যাচ্ছিল কে জানে! জানালা দিয়ে দেখলেন, মিলিটারিদের গাড়ি থেকে কামানের গোলা ছুঁড়ে মারছে ওদের দিকে। ধারণাই করতে পারেননি, ছেলেটা বেঁচে থাকবে। তবে, কাঁধের জখমটা বেশ গভীর। পচে বিষিয়ে উঠলে বিপদ বাড়বে।

তিন দিনের পর হাবিল আর থাকতে চাইল না। কপাল ভালো, কাঁধের জখমটা পচেনি। একটু যেন টানও ধরেছে। তবে প্রচুর রক্ত গেছে। শরীর বোধহয় সে কারণেই দুর্বল। কিন্তু মা আর মরিয়দের কথা ভেবে ও ছটফট করছিল। না আশা করে না হাবিল, যে ওরা বেঁচে আছে। তা হলেও নিজে গিয়ে একবার খোঁজ করতে চায়।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো খালি রিকশা পাওয়া যায় না। অনেক বলেকয়ে শেষে এক ঠেলাগাড়িওয়ালাকে ডেমরা যেতে রাজি করান বৃদ্ধ ভদ্রলোক। হাবিল চেয়েছিল হেঁটেই যেতে। কিন্তু উনি কোনমতেই হাবিলকে হেঁটে রওয়ানা হতে দেননি। হাবিলকে বিদায় দিতে বৃদ্ধের মেয়ে আর ছেলের বউও এসে দাঁড়িয়েছে গলির মাথায়।

সাবধানে যাবেন। সতর্ক থাকবেন। বৃদ্ধ কেমন কোমল গলায় বলেন। শুনেছি, ওরা নাকি আহত কী জখম দেখলেও ধরে নিয়ে যায়। আমরাও হয়তো গ্রামের দিকে চলে যাব যে-কোনো দিন। আমার ছেলেটা মোহাম্মদপুরে একটা মসজিদে ইমামতি করে। বাসা থেকে যাওয়ার সময় বলেছিল ছাব্বিশ তারিখ  বাসায় আসবে। আজকে উনত্রিশ তারিখ। আমরা তার জন্য অপেক্ষা করছি। জানি না আর কদিন অপেক্ষা করতে পারব। জানি না আমার ছেলেটা বেঁচে আছে কিনা!

যাওয়ার সময় হাবিল কোনো কথা বলতে পারে না। খালি বৃদ্ধের দিকে একবার তাকায়। ওর দু’চোখ ভরে উঠে পানিতে।

যেতে যেতে হাবিলের মনে হয়, দয়াবান বৃদ্ধ ভদ্রলোক ওকে হেঁটে আসতে না দিয়ে ভালোই করেছেন। শরীর এতো দুর্বল লাগছে যে, ঠেলাগাড়িতে বসে থাকতেও কষ্ট হচ্ছে। হাবিল কাত হয়ে ঠেলার উপর শুয়ে পড়ে। আজ রাস্তায় লোক আছে। শুধু আছে তাই না, সংখ্যায় অনেক। রাস্তায় রিকশা বা অন্য কোনো যান তেমন নেই বললেই চলে। পায়দলই বেশি লোক চলছে। রাস্তায় দুপাশ ধরেই লোকজন হাঁটছে! বাচ্চা বুড়ো সব বয়সের লোকই আছে। কারও মাথায় বড় বড় গাঁটরি। কারও হাত বাচ্চার হাত শক্ত করে ধরা, পেছনে ঘোমটা মাথায় বোধহয় বউ-ই। কারও হাতে ট্রাঙ্ক। কারও কাঁধে বড় ব্যাগ। জোর পায়ে দ্রুত হাঁটছে সবাই। ঠিক হাঁটছে বলা যায় না, কেমন যেন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। যেন পেছন থেকে কেউ তাড়া করছে সবাইকে! হাবিল বুঝে, মৃত্যুভয়! মৃত্যুভয়েই লোকজন ঢাকা শহর ছাড়ছে। হয়তো নিজেদের গ্রামের দিকেই যাচ্ছে সবাই।

পথের পাশে বয়স্ক এক মহিলা ছোট একটা মেয়েকে নিয়ে বসে আছে। হাবিল ওদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মহিলা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। বাবা তোঙ্গ লগে আঙ্গরে লইয়্যা যাও। আমার নাতনিডার পাও মচকাইছে। হাঁটতে পারতাছে না। সেই সকাল থাইক্যাঅই আমরা হাঁটতাছি বাবা। খালি কোন রিকশা গাড়িও পাই নাই যে উঠমু।

হাবিল ঠেলাওয়ালাকে থামতে বলে। বৃদ্ধাকে দূর থেকে দেখে যতটা বয়স মনে হয়েছিল, কাছ থেকে দেখে আরো বয়স্ক মনে হয়। ফুটফুটে মেয়েটা বৃদ্ধার কোল ঘেষে নেতিয়ে আছে। ওরা ঠেলায় উঠলে ঠেলাওয়ালা চলতে থাকে।

বাবা, দুনিয়াত্ এই নাতনিডা ছাড়া আমার আর কেউ বঁাঁইচ্যা নেই। কিন্তু ছিল সবাইঅই। আমরা মালিবাগে ভাড়া থাকতাম গো বাবা।…খাওয়া দাওয়া শেষে অন্য রাইতের মতোনঅই সবাই ঘুমাইতাছিলাম। মাঝরাইতে হঠাৎ দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা। আওয়াজে বাসার সবারঅই ঘুম ভাঙ্গছে। বড় ছেলেডা গিয়া দরজা খুলল। তারা ঢুইক্যাঅই গুলি করল ছেলেডারে। মিলিটারিরা আমার আরও দুই ছেলে, ছেলের বউ আর নাতি দুজনরেও মারছে। আমার চৌখ্যের সামনেই সবাইরে মারল বাবা। আমি এই নাতনিডারে বুকে ধইরা ভয়ে কাঁপতাছিলাম থরথর। তারা কে জানে কিয়ারে, আঙ্গরে মারে নাই। যাওয়ার সময় বাসায় সোনাদানা টেহা পইয়সা যা আছিল, সব নিয়া গেছে।

বৃদ্ধা একনাগাড়ে কথা বলেই যাচ্ছেন। তাঁর দুচোখ বেয়ে পানি পড়ছে।

হাবিল কীভাবে বৃদ্ধাকে সান্ত¡না দিবে, ভাষা খুঁজে পায় না। ওর মনে শঙ্কা বাড়েই। বাসায় গিয়ে সবাইকে পাবে তো জীবিত?

ডেমরার কাছাকাছি পৌঁছে হাবিল ঠেলাওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে বৃদ্ধা আর তার নাতনিকে ঘাটে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে দেয়। বৃদ্ধা যাওয়ার সময় খুব কান্নাকাটি করেন। হাবিলের হাত ধরে বলেন, আমার মাইঝ্যা ছেলেডা বয়সে তোমার সমানঅই আছিল বাবা। তার বউডার পেডদঅ আছিল সন্তান। পশুরা গর্ভবতী বউডারে দেখ্যাঅ দয়া করে নাই। জীবিত বলতে এই নাতনিডাই অনে। বাড়ি ফিরা আমি কারে লইয়্যা থাকমু বাবা!

হাবিল বুঝিয়ে শুনিয়ে বৃদ্ধার কাছ থেকে বিদায় নেয়। বৃদ্ধার প্রতি কেন জানি তার মনে কোনো সহানুভূতি আসে না। ওর মনে এখন মা মরিয়মদের জন্য দুশ্চিন্তা। হাঁটতে গিয়ে বুঝে, শরীর কতটা দুর্বল হয়েছে। পা যেন চলতেই চাচ্ছে না। যতই বাসার কাছাকাছি হচ্ছিল, ততই ওর মনের আশঙ্কা বাড়ছিল। মরিয়মরা কি বেঁচে আছে!

বাসার কাছে বৃদ্ধ এক দোকানি মুদি দোকান চালায়। হাবিল তার কাছ থেকেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনে। বৃদ্ধ হাবিলকে দেখে অবাক গলায় বলে, হাবিল তুমি বাঁইচ্যা আছো? ইব্রাহিম যে  কইল, তুমি যেন কাজ কর হেন সবাইরে নাকি মাইরালাইছে?

ইব্রাহিম মনে অয় সত্য কথাঅই কইছে চাচা। হলের প্রায় সবাইরেঅই মিলিটারিরা মাইরালাইছে, আমার  চৌখ্যের সামনেঅই। আসার পথে দেখ্ছি রাস্তায় খালি লাশ আর লাশ! আমারঅই কি বাঁচার কথা আছিল! মৃত্যুর দুয়ারেত্থে ফিরা আইছি চাচা। …এদিগে মিলিটারিরা আইয়ে নাই?

না, এখনও এদিকে আইয়ে নাই। তোমার কাঁধ কী অইছে?

গোলার আঘাত লাগছিল।…আমি যাই চাচা। বাসায় যেতে ব্যগ্র হাবিল, বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছিল না। যেতে যেতে আশা জাগে হাবিলের মনে। এদিকে যখন মিলিটারি আসেনি তাহলে মরিয়মরা বেঁচে আছে নিশ্চয়ই।

বাসায় পৌঁছে হাবিল দেখে দরজায় বড় একটা তালা ঝুলছে। দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। মা, মরিয়ম ওরা গেল কোথায়! বাসায় যখন তালা দেওয়া তখন কেউ যে জোর করে ওদের বাসা থেকে বের করে দেয়নি তা বোঝা যায়। কিন্তু সকালবেলাতেই সবাই মিলে গেল কোথায়? ওরা কি গ্রামে চলে গেল? তাহলে কি ইব্রাহিম বাসায়ও এসেছিল? মরিয়মদের কাছে কি হাবিল মৃত?

হাবিল উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায় বের হয়ে আসে। কী যে করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। আশপাশটা দেখে তো মনে হচ্ছে, জীবনযাত্রা এখনও স্বাভাবিক এখানে। মরিয়মরা ওর জন্য অপেক্ষা না করেই কি বাড়ি চলে গেল? কিন্তু তা কী করে হয়! ওরা হাবিলের জন্য অপেক্ষা করবে না।

পাশের বাসায় গিয়ে হাবিল দরজায় নক করে। দরজা খুলেন এক মধ্যবয়স্ক মহিলা। মহিলা হাবিলকে চেনেন। হাবিল জানতে চায়, মরিয়মরা যাওয়ার সময় কিছু বলে গেছে কি না? মহিলা জিজ্ঞেস করেন, মরিয়ম কে?

আমার বউ। লগে মা আর ছোট ভাইঅ আছিল।

ও ওরা! ওরাতো বলল তোমাকে নাকি মেরে ফেলেছে, সে খবর কে যেন ওদের কাছে বলে গেছে। ওরা সবাই গ্রামের দিকে রওয়ানা হয়ে গেছে। এই তো গতকাল সকালেই গেল। শুনেছি নাকি দুদিন তোমার আসার অপেক্ষায় ছিল। আমরাও আজকে রওয়ানা হব গ্রামের দিকে।…তুমি এই কদিন কোথায় ছিলে? তোমার কাঁধে কী হয়েছে?

হাবিল মহিলার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে হাঁটতে থাকে। ওরা সবাই বেঁচে আছে! গ্রামের দিকে গেছে! হাবিল স্বস্তিবোধ করে। ও আর দেরি করে না। বাড়ির পথে রওয়ানা হয়। ভাগ্য ভালো হলে হয়তো পথেই ওদের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে।

বাসটা ফেরিঘাটে আসতেই আতঙ্কিত হাবিল দেখে সামনে মিলিটারি! ওরা হাবিলদের বাস থামায়। তিনজন মিলিটারি উঠে ওদের বাসে। অল্প বয়সি তিনজন মেয়েকে টানতে টানতে নামিয়ে নিয়ে ওদের গাড়িতে উঠায়। একজন মহিলাকে নামিয়ে তার স্বামী আর সবার সামনেই রাস্তায় ফেলে তার উপর চড়াও হয়ে অত্যাচার শুরু করে ওরা। স্বামী বেচারা বাঁধা দিতে গেলে তাকে গুলি করে। লাশটা লাথি দিয়ে ফেলে দেয় মেঘনার জলে। হাবিল নিজেকে যথা সম্ভব লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। একবার ওদের হাত থেকে বেঁচে গেছে, আবার চোখে পড়লে যদি ধরে নিয়ে যায়। এইতো চোখের সামনেই দুজন জোয়ান ছেলেকে বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। চোখ বেঁধে, হাত পিছমোড়ো করে বেঁধে, জিপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু না, ছেলে আর মেয়েগুলো নিয়েই ওরা বাসকে চলে যেতে ইশারা করে। পেছনে একটা মাইক্রোবাস আসছে। সেটার দিকে এগিয়ে যায় মিলিটারিরা।

বাস ছেড়ে দেয়। বাসের যাত্রীরা সব স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলে। মেয়ে তিনজন বোধহয় বোন। ওদের বাপ এতোক্ষণ চুপ ছিল। বাস ছেড়ে দিলে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। সবার উদ্দেশ্যে বলে, আপনারা এতোগুলো মানুষ থাকতে আমার মেয়েগুলোকে ধরে নিয়ে গেল, আর কিছু বললেন না আপনারা!

বাসের সবাই চুপ। কেউ কোন কথা বলে না।

বৃদ্ধ লোকটি বলেন, আপনাদের কারও মেয়ে বোনকেও তো ওরা নিয়ে যেতে পারত।… এই ড্রাইভার তুমি গাড়ি থামাও। আমি নেমে যাব।

চাচমিয়া, আপনি নাইম্যা কী করবেন। যা অইছে, তার কোনো প্রতিকার পাইবেন না। মিলিটারিরা যাগরে ধইরা লইয়্যা যায়, তাগরে আর ফেরত পাঅন যায় না। মাঝখানেত্থে আপনেঅ বিপদে পড়বেন।

আমার আর বিপদের কী বাকি আছে!… বললাম না বাস থামাও, আমি নেমে যাব।

বাস থামলে বৃদ্ধ সত্যি সত্যি নেমে যান। হাবিলের একবার মনে হয় নেমে যায় বৃদ্ধের পেছনে পেছনে। পরক্ষণেই মরিয়মের মুখ মনে পড়াতে সে নামতে পারে না। ততক্ষণে বাস ফেরিতে উঠছে।

 

পর্ব ২

৩রা মে, ১৯৭১।

আগুন লুণ্ঠন ধর্ষণ হত্যা…

নারাণপুর। পূর্ব পাকিস্তানের আর দশটা গ্রামের মতোই গ্রামটা। উপরে উদার আকাশ, গ্রামের সীমানার পরে অবারিত ফসলের মাঠ। আম জাম কাঁঠাল নারিকেল আর যত ফলের গাছ, বাঁশের ঝাড় ঘিরে রেখেছে গ্রামখানিকে। গ্রামের জনসংখ্যার আশি ভাগই হিন্দু। তাদের আবার বেশিরভাগই ধনাঢ্য। এক এক জনের বাড়িতে প্রতিদিন দশ পনেরো জন দিন মজুর কাজ করে। নারাণপুর গ্রামের প্রায় সকলেরই গোলায় ধান ভরা। গোয়ালে দুটো তিনটা দুধেল গরু। পুকুর খালের জলে পর্যাপ্ত মাছ। গ্রামটিতে অভাব তেমন নেই বললেই চলে। আছে গ্রামবাসীদের মধ্যে সদ্ভাবও। গৃহস্থরা বিত্তবান বটে, তা হলেও তারা নিজেরা যে মাঠে ক্ষেতে কাজ করে না, তা নয়। তারাও কামলাদের সঙ্গে কাজ করে, নয়তো কাজের তদারকি করে।

গ্রামের মুসলিমরা যাকে বলে ঠিক সম্পদশালী নয়। বলতে কী, বিত্তবান হিন্দুদের জমিতেই বেশিরভাগ কাজ করে। কেউ কেউ বর্গায় জমি চাষ করে। তাই বলে তাদের সঙ্গে হিন্দুদের সম্পর্ক ঠিক প্রভূ-ভৃত্যের নয়। প্রতিবেশীসুলভই। হিন্দু মুসলিম সকলেই গ্রামের কোনো বিপদ হলে একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রতিবেশীর, হোক সে মুসলিম কী হিন্দু, বিপদ দেখলে এগিয়ে যায় আরেকজন।

দুপুরবেলা। মাথার উপর মে মাসের সূর্য গনগন করছে। পুরো গ্রাম এখন কেমন যেন সুনসান। বেশিরভাগ পুরুষই ক্ষেতের কাজ করে ফিরেছে। ঘরের দাওয়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। দুএকজন লুঙ্গি গামছা কাঁধে খালের দিকে যাচ্ছে। গোসল করবে। কেউ কেউ মাঠ থেকে ফিরছে। বউ-ঝিরা রান্না শেষ করতে তৎপর। পুরুষরা তো এখনই খেতে চাইবে।

রাধা ঝরিয়ে নেওয়া ভাতের ফেনটুকু গোয়ালের কাছের চাড়িতে জাবনা ফেলার জন্য রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আসে। বড় বড় পা ফেলে গোয়ালের দিকে যেতে যেতে ছেলে শীতলকে দাওয়ায় বসে থাকতে দেখে বলে, কীরে শীতল, ¯œানে গেলি না অনেঅ! সূর্য ঠাকুর কোনসময় মাথার উপরে উঠ্ছে খেয়াল আছে! ¯œানে কোন সময় যাবি, কোন সময় খাবি?

এইদঅ যাই মা।… তোমার বউরে দেহি না, বাড়ি নাই নাহি?

বাড়িত্ থাকব না কা! এই দুপুরবেলায় যাইব কই! আছে রান্নাঘরঅ।

বাবা কই?

কই আর থাকব, বেরাইম্যা মানুষ! শুইয়া রইছে।…তা হঠাৎ সবার এতো খোঁজ খবর লওয়া শুরু করলি যে।

না, সকালে ঘুমেত্তে উঠ্যাঅইদ ক্ষেতে গেলাম। যাওনের সময় বাবারে প্রণাম কইরা যাইতে পারি নাই।

সে না অয় করিছ। খালপাড়ে যা, ¯œানটা আগে কইরা আয়। ক্ষেতেত্তে ঘাইম্যা নাইয়্যা আইলি।

এই যাই মা। বলেও বসেই থাকে শীতল।

রাধা গোয়ালের কাছ থেকে ফিরে দেখে ছেলে তেমনই বসে আছে।

কীরে, দোফর গড়াইলে ¯œানে যাবি? খাবি কহন? আমার রান্না সব নামানো শেষ। ¯œানটা সাইরা আয়। গরম গরম খাবি।

শীতল আসলে বউ আদুরিকে দেখার জন্য বসে আছে। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে আর দেখেনি আদুরিকে। এখনও কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বাড়ি নেই নাকি! মাকে তো একবার বউয়ের কথা জিজ্ঞেস করেছে, আবার জিজ্ঞেস করতে লজ্জা লাগছিল। কিন্তু রাধা ঠিকই ছেলের মনের মতোলব বুঝতে পারল। বলল, তুই কি আদুরির লাইগ্যা বইয়্যা রইছত্? বউদঅ রান্না সাইরা ঠাকুরের পায়ের কাছে বইছে। উঠতে দেরি অইবে।

এই অসময়ে ঠাকুর ঘর!

আছে কারণ। পেডঅ বাচ্চা আওনের পর নাকি কী মানত করছিল। আমি ঠিক জানি না। আদুরির ঠাকুর ঘর সময় লাগব। তুই যা তো, স্নানটা সাইরা আয়। এক কথা কতবার কমু!

শীতল পানিতে নেমে দুটো ডুব দিয়ে হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে ভেজা গামছায় গা ঘষে।

অদূরে অনাথ মাথায় বাংলা সাবান ঘষছে। শীতলকে দেখে বলে, হুনছো শীতলদা, মিলিটারিরা নাহি রায়পুর ব্রীজের কাছে ক্যাম্প করছে।

হুনছিরে অনাথ। হোনার পরেত্তে ভয়ে ভয়ে আছি। কোনোদিন না আবার আঙ্গ গেরামঅ আইয়্যা হাজির অয়।…আদমপুরের সবাই নাহি গেরাম ছাইড়া গেছে?

আমিওদঅ সেইরহমঅই জানি। তা আছিলইবা কারা? সব ঘরবাড়িইদঅ মিলিটারিরা পোড়াইয়্যা দিছে হুনলাম। ওই গেরামে নাহি মুক্তিরা আছিল। মিলিটারিরা বলে তাগ খোঁজেঅই ওই গেরামে গেছে। মুক্তিগঅ কাউরে পায় নাই। কিন্তু নিরীহ লোকজনের ঘরবাড়ি, ধানের গোলা সবকিছুতেই আগুন ধরাইর‌্যা দিছে।

তুই কি ইন্ডিয়া যাওনের কোনো চিন্তা ভাবনা করছস?

ভাবি নাই তা না। কিন্তু বাপ দাদার ভিটা ছাইড়া যাইতে মন চায় না দাদা।

তুই দেহি আমার বাপের মতোন কথা কস। এই দেশঅ থাইক্যা প্রাণডা খোয়াবি নাকি? চল্ শুভক্ষণ দেইখ্যা রওয়ানা অইয়্যা যাই।

কোন ক্ষণ কি আর শুভ আছে অনে! চাইরদিকে থাইক্যা যেই সব খবর কানে আসে। কোন সময় যে প্রাণডা হারাই।

এর লাইগ্যাঅই কই, বাইরামাসটা শুরু অওনের আগেই চল।

 

মিলিটারি আইয়্যে গো! মিলিটারি! গেরামের বড় সড়ক ধইরা মিলিটারি আইতাসছে। সামনে যারে পাইতাছে, গুলি করতাছে। তোমরা কে কই আছো, পালাও।

কিশোর হরিপদ প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছিল আর চিৎকার করছিল। হরিপদ শীতলের গ্রাম সম্পর্কের ভাতিজা হয়। শীতল আর অনাথকে দেখে হরিপদ থমকে দাঁড়ায়। জেঠা, শীতলকে উদ্দেশ্য করে বলে, শয়ে শয়ে মিলিটারি আইতাছে সড়ক দিয়া। এদিকেঅই আইতাছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও।

অনাথ আর শীতল ভিজা কাপড়েই পড়িমড়ি করে বাড়ির দিকে দৌড়ায়। শীতল গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছে দেখে ত্রিশ পঁয়ত্রিশ জন মিলিটারি সড়ক ছেড়ে গ্রামে ঢুকছে। আতঙ্কে শীতলের মনে হয় পা দুটো যেন জমে গেছে। ও স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

মিলিটারিরা এলোমেলো গুলি করতে করতে গ্রামে ঢুকে। গুলির শব্দে শীতলের হুস হয়। ও কাঁপতে কাঁপতে পাশের ধানক্ষেতে গিয়ে কাদা পানিতে শুয়ে পড়ে। অনাথ বোধহয় বাড়ির দিকে গেল।  কাদা পানিতে শুয়ে শুয়ে শীতল দেখে, মার্চ করে একের পর এক খাকি পোশাক পড়া মিলিটারি ঢুকছেই গ্রামে।

ষাট বছরের বৃদ্ধ শরৎচন্দ্র বাড়ির পাশে ধানক্ষেতে সার ছিটাচ্ছিল। গুলির শব্দ শুনে দৌড়ে বাড়ি ঢুকে দেখে, দাউ দাউ করে জ¦লছে তিনটা ঘর। বসতের দুটো ঘর আসবাবপত্র আর মূল্যবান জিনিসপত্রসহ পুড়তে থাকে। এক ঘরে বস্তা বস্তা ধান ছিল, সারা বছরের খোরাক। সে ধান তার চোখের সামনে জ¦লতে থাকে। …গোয়াল ঘরে তিনটা দুধেল গরু চাড়িতে মুখ ডুবিয়ে ভূষি খাচ্ছে। শাদা পাউডার ছিটিয়ে গরুগুলোর গায়ে, গোয়ালের চালের খড়ে আগুন দেয় খাকি পোশাক পরা মিলিটারিরা। গরুগুলো চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে ওঠে। শরৎ গোয়ালের দিকে এগুলে মিলিটারিরা তাকে ধরে ফেলে।

শরতের ছোট ভাই হেমন্ত দোকান রেখে এখনও খেতে আসেনি বাড়িতে। ভাইয়ের বউ আর শরতের   মেয়ে আরতি সবে পুকুর থেকে ¯œান সেরে উঠানে পা রেখেছে, মিলিটারিরা ওদের দেখে হায়েনার মতো উঠান কাঁপিয়ে হেসে উঠে। দু’জন কিছু বুঝার আগেই মিলিটারিদের পাঁচ সাতজন ওদের গায়ের কাপড় টেনেহিঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলে। শরতের সামনেই তার মেয়ে আর ছোট ভাইয়ের বউয়ের উপর অত্যাচার শুরু করে ওরা। শরৎ বাঁধা দেওয়ার সুযোগটুকুও পায় না। মিলিটারিরা ওকে দুহাত পিছমোড়া করে বেঁধে উঠানে ফেলে রাখে।

কার্তিক হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসে। আজকে ও অন্যদিনের চেয়ে একটু আগেই খেতে বসেছে। ছোট মেয়ে লক্ষ্মীকে আজকে দেখতে আসার কথা পাত্রপক্ষের। দেশের যা অবস্থা, ভালয় ভালয় মেয়েটার বিয়েটা দিতে পারলে মাথার উপর থেকে চিন্তা যায়। আশপাশের গ্রামে মিলিটারিদের অত্যাচারের খবর প্রায়ই কানে আসে। সে সব শুনলে বুক কেঁপে উঠে। কে জানে ছেলে পক্ষ লক্ষ্মীকে পছন্দ করে কিনা! তবে, লক্ষ্মীকে দেখলে পছন্দ না করার কথা না! দেখতে লক্ষ্মী প্রতিমার মতোই মেয়েটা। সংসারের কাজেকামেও পটু। পাত্রের জেঠাকে আকারে ইঙ্গিতে বলা হয়েছে, একমাত্র মেয়েকে যতটুকু পারে সাজিয়ে দেবে কার্তিক। সে জন্যই আজ খাওয়া শেষে ইলিয়টগঞ্জে যাবে। গয়নার বায়না করা আছে। ত্রিশ ভরি স্বর্ণ আজকেই দেওয়ার কথা। খেয়ে দেয়েই আনতে রওয়ানা হবে কার্তিক। আজকে পাত্রপক্ষের পছন্দ না হোক, তাই বলে মেয়ে তো আর ঘরে বসে থাকবে না। তাকে বিয়ে দিতে হবেই একদিন। গয়নাগুলো গড়িয়ে রাখাতে একদিকের চিন্তা তো কমল।

খাবার বাড়তে বাড়তে বাড়তে বাসন্তি স্বামীকে বলে, এতোলা টেহা লইয়্যা একলা যাইবেন? কাউরে সঙ্গে লইয়্যা গেলে অইত না?

দেহি, শীতলরে না অয় যাওনের সময় বাড়িত্তে ডাইক্যা লইয়্যা যামু। লক্ষ্মীরে দেহি না, গেছে কই?

আছে। গোয়াল লেপে।

ঝিডা গেলেগা বাড়িডা খালি অইয়্যা যাইবগা!

হেইডাদঅ অইবঅই। বাড়ি খালি অউক, তঅ ভালায় ভালায় ছেড়িডার বিয়াডা জানি অয়। মাইয়্যা অইয়্যা যহন জন্মাইছে তহন সারা জীবনদঅ আর বাপ মায়ের কোলে থাকত পারত না। হউরবাড়ি যাইতেঅই অইব। …আপনে তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ কইরা রওয়ানা হনত্। যাইতে আসতে না হোউক সন্ধ্যা অইবই। এতোলা স্বর্ণ লইয়্যা আইবেন! রাইত অইলে আবার কোন বিপদে পড়েন!

চিন্তা কইর না, স্বর্ণ আমি সাবধানেঅই আনমু। লগেদঅ শীতল থাকবঅই। আমার খাওয়া শেষ। তুমি টেহার খুতিডা আর শাটটা লইয়্যা আইয়্যো।

বাসন্তি ঘর থেকে শার্ট আর টাকা এনে দেখে, উঠানে দশ বারোজন লোক। তাদের পরনে মাটি রঙের পোশাক। হাতে অস্ত্র। কোনোদিন এমন মানুষ চোখে দেখেনি বাসন্তি, তাহলেও ওদের ঠিকই চিনতে পারল। কত শুনেছে ওদের অত্যাচারের কথা।

মিলিটারি!

ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাসন্তি ঘরের ভেতরে ঢুকতে গেলে মিলিটারিদের একজন বাঁধা দেয়। তাকে টেনে বাইরে নিয়ে আসে। বাসন্তির হাত থেকে টাকা নিয়ে নেয় একজন। কার্তিক কী যেন বলতে যাচ্ছিল, বলা হয় না। তার বুক বরাবর দুবার গুলি করে ওরা। কার্তিক ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়। বাসন্তি চিৎকার করে স্বামীর রক্তাক্ত দেহের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

লক্ষ্মী গুলির শব্দ শুনেই গোয়াল থেকে গোবরমাখা হাত নিয়ে বের হয়ে এসেছিল। চোখের সামনে বাবার মৃত্যু দেখে ও নড়তে পারে না। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। সামনে সাক্ষাৎ যম দেখেও ওর পালিয়ে যাওয়ার কথা মনে হয় না। লক্ষ্মী গোয়াল থেকে শুনেছে, বাবা মা মিলে ওর বিয়ের কথাবার্তা বলছিল। বাবা খেয়ে দেয়ে ওর জন্য গয়না আনতে বের হচ্ছিল। সে বাবা এখন রক্তের মধ্যে লাশ হয়ে পড়ে আছে!

মিলিটারিরা উঠানের এক কোণে লক্ষ্মীকে দেখে অট্টহাসিতে বাড়ি কাঁপিয়ে ধরতে গেলে লক্ষ্মীর হুস হয়। তবে ও পালিয়ে যেতে চাইলেও পারে না। মিলিটারিরা ওকে ধরে ফেলে। মেয়ের আর্তনাদে স্বামীর লাশ ছেড়ে বাসন্তি মেয়েকে ধরতে এলে মিলিটারিরা তাকে লাথি দিয়ে উঠানে ফেলে রেখে, লক্ষ্মীকে নিয়ে যায় টানতে টানতে।

অল্পবয়সি নুরু খালার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। নুরুদের বাড়ি পাশের গ্রামেই। খালার ছেলেমেয়ে নেই বলে নুরুকে খালা নিজের ছেলের মতোই দেখে। আগে প্রায়ই নুরু আসত খালার বাড়ি। কদিন আগে হঠাৎ করে বাপ মরে যাওয়ায় অনেকদিন আসেনি খালার বাড়ি। বহুদিন পরে আজ বোনের ছেলেকে পেয়ে রাহেলা ভালোমন্দ রান্না করেছে। পাশে বসিয়ে খাওয়াচ্ছিল ভাগিনাকে।

আরেকটা মুরগির রান দিতে গেলে নুরু বাধা দেয়।

আর কত খামু খালা। পেডঅ এক ফোঁটা জাগা নাই।

খা বাজান। কতদিন পর আইলি!…অই কিসের শব্দ নুরু? হিন্দু পাড়াত কারা যানি চিৎকার করতাছে না! আগুন লাগল নাহি?

আগুনইদঅ মনে অইতাছে খালা। নুরু বাইরে বের হয়ে বলে। আমি যামু নাহি?

খাইতে বইলি, অনে যাবি ক্যামনে! খাওয়াডা শেষ কইরা যা।

খাওয়াদঅ উইড়া যাইতাছে না। আমি যাই খালা, দেহি কোন কাজে লাগি কিনা।

গামছায় হাত মুছে নুরু সবে উঠানে দাঁড়িয়েছে, এমন সময় মিলিটারি ঢুকে রাহেলাদের বাড়িতে। মিলিটারির কথা রাহেলা আর নুরু দুজনেই এতো শুনেছে যে, যদিও ওরা কোনোদিন স্বচক্ষে মিলিটারি দেখেনি, তবে আজকে দেখামাত্রই চিনতে পারল।

রাহেলা মিলিটারি দেখেই আর্তচিৎকার করে, মা মুরগি যেমন চিল কী কাকের নখর থেকে ছানাকে বাঁচাতে ডানা দিয়ে আগলে রাখে, তেমনি আঁচল দিয়ে নুরুকে ঢেকে ফেলল। নুরু আর রাহেলা দুজনেই কাঁপছিল থরথর করে।

মিলিটারিরা কোনো কথা না বলে গান পাউডার ছিটিয়ে রাহেলাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। তারপর রাহেলার আঁচলে তলা থেকে নুরুকে একজন ছো মেরে বের করে নেয়। লাথি দিয়ে একজন নুরুকে উঠানের পাশের ছাইগাদার কাছে ফেলে দেয়। আর নুরুর চোখের সামনে খালা রাহেলাকে মাটিতে শুইয়ে অত্যাচার শুরু করে। একজন শেষ হতেই আরেকজন। তারপর আরেকজন।…রাহেলার আর্তনাদে নুরু এতোই ভয় পায় যে, ছাইয়ের গাদার কাছ থেকে শরীর নড়াতেও পারে না। ওর সারা শরীর কাঁপছে থরথর করে।

দশ বারো জন মিলিটারি একে একে রাহেলার উপর অত্যাচার করে। একজন নুরুকে টেনে তোলে উঠানের উপর দিয়ে টেনেহিঁচড়ে নিতে থাকে। রাহেলা প্রথমদিকে চিৎকার করেছিল। পরে মুখ দিয়ে আর শব্দ বের হতে শোনেনি নুরু। মিলিটারিরা ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরেই বোধহয়, ক্ষীণকণ্ঠে বলে, আমার নুরুকে তোমরা কই লইয়্যা যাও? আমার বুকের মানিকরে ছাইড়া দেও।

মিলিটারিগুলো হাসতে হাসতে নিজেদের মধ্যে কী যেন বলে। নুরু বুঝতে পারে না। রাহেলার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা একজন হাসতে হাসতে রাহেলার মাথায় গুলি করে। ভয়ে নুরু কেঁপে উঠে। হঠাৎ বমি করে ও। প্রাণপণে মিলিটারিদের হাত থেকে ছাড়া পেতে চায়। কিন্তু বজ্রআঁটুনি থেকে ছুটতে পারে না।

আদুরি উঠানে কাপড় নাড়ছিল। রাধা মুরগিকে খুদ খাওয়াচ্ছে। তখন মিলিটারা ঢুকে বাড়িতে। দুজন শাদা পাউডার ছিটিয়ে দেয় টিনের চালে, আর গোয়াল ঘরের উপর। রাধা বা আদুরি কিছু বুঝার আগেই ঘরের চালে আর গোয়ালে আগুন ধরে যায়। চিৎকার দিয়ে রাধা দৌড়ে গিয়ে গোয়ালে ঢোকে। গরু দুটো যে পুড়ে মরবে!

আদুরি শাশুড়িকে ধরতে গিয়েও যেতে পারে না। মিলিটারিদের দুজন ওকে ধরে ফেলেছে। একজন জোর করে মাটিতে ফেলে দিয়ে চড়াও হয় ওর উপরে। সে উঠে গেলে আরেকজন। তারপর আরেকজন। আগুনে ততক্ষণে সারা গোয়াল জ¦লছে। অত্যাচারিত হতে হতে আদুরি দেখে, শাশুড়ি গোয়ালের দুটো গরুর সঙ্গে পুড়ছে। আদুরির শশুর রাধাকে বাঁচাতে ঘর থেকে বের হয়ে এলে মিলিটারিরা তাকে ধরে ফেলে। শ^শুরের সামনেই পশুরা তার উপর চড়াও হতে থাকে, একের পর এক। অসহ্য যন্ত্রণা আর লজ্জায় আদুরির সারা শরীর কাঁপতে থাকে। ও আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে, ঠাকুর, দিনভর তোমার পাও পূজা করছি। তুমি আমার সন্তানটারে বাঁচাও। ঠাকুর শুনতে পায় কি না কে জানে। তবে, পশুরা কিভাবে যেন বুঝে যায় আদুরি অন্তঃসত্ত্বা। অথবা, হয়তো ওরা আগেই পাঁচ মাসের পেট দেখে বুঝেছিল। অত্যাচার শেষ হলে দুজন ওকে দাঁড় করার। আরেকজন বেয়নেট দিয়ে বুকের নিচ থেকে তলপেট পর্যন্ত চিরে ফেলে। আদুরির আর্তনাদ সারা গ্রাম কাঁপিয়ে আকাশে উঠে যায়।

মিলিটারিরা গ্রাম থেকে ধরে এনেছে সাত আটজন মেয়ে, সবাই-ই কম বয়সি। একজনের বয়স বোধহয় দশও হবে না। সে সালামের মেয়ে, চিনতে পারে শীতল। ওরা মোট সতেরজন পুরুষকে নারাণপুর ব্রিজের উপর সারি করে দাঁড় করায়। সকলেরই দুহাত পিছন দিকে টেনে বাঁধা। সে সারিতে আছে সত্তর বছরের বৃদ্ধ। আছে বাইশ বছরের জোয়ান। আছে দশ বছরের বালকও।

শীতল ধানক্ষেতে কাদা পানিতে শুয়ে সব দেখে। নজর করে দেখতেই ও দাঁড় করানো লোকদের মধ্যে তার বাবা কালিপদকেও দেখে। অইতো, সুবিনয়ও আছে।…আহারে, নুরুকেও ধরেছে। বেচারা বোধহয় খালার বাড়ি বেড়াতে এসেছিল।…ওর ইচ্ছে করে ধান ক্ষেত থেকে উঠে গিয়ে সারির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বাবাকে নিয়ে দৌড়ে পালায়। কিন্তু শীতল জানে তা সম্ভব না। শীতল এখন ধানক্ষেত থেকে উঠে দাঁড়ালেই তাকে মিলিটারিরা মেরে ফেলবে। ধান ক্ষেতের অল্প পানির মধ্যে শুয়ে জোঁকের কামড় খেতে খেতে শীতল অপেক্ষা করতে থাকে। চোখের সামনে বাবার মৃত্যু দেখার।

মিলিটারিরা অবশ্য বেশি সময় নষ্ট করে না। সারি সারি দাঁড়ানো সতের জন মানুষকে ব্রাশ ফায়ার করে। মানুষগুলো মৃত্যুর সময় চিৎকার করার সুযোগও পায় না। ব্রীজ থেকে ছিটকে টুপটুপ পানিতে পড়ে যায়।

শীতল শুয়ে শুয়ে সব দেখে। মিলিটারিরা মেয়েগুলোকে টেনেহিঁচড়ে নিতে নিতে নারাণপুর গ্রামের সীমানা পার হয়ে যায়। খানিক আগে চোখের সামনে দেখা বাবার মৃত্যুর কথা ভুলে যায় শীতল। ওর মনে হতে থাকে, মিলিটারিরা যে মেয়েগুলোকে নিয়ে যাচ্ছে সেখানে হয়তো তার পোয়াতি বউটাও আছে। এতোদূর থেকে তো সব মেয়ের মুখ দেখা সম্ভব হয়নি। বউয়ের কোমল মুখটা চোখে ভাসতে থাকে শীতলের। এই জনমে আর বোধহয় দেখা হবে না আদুরির মুখ। খানিকক্ষণ পর ওর হুস হয়, ও শুধু বউয়ের কথাই ভাবছে। মা আর ছোট ভাইটা  কেমন আছে এ বিষয়ে ওর কোনো ভাবনা আসছে না। প্রীতমের অবশ্যি এই সময় বাড়ি থাকার কথা না। ও দোকানে থাকে বিকাল পর্যন্ত। সে না এখনও নিরাপদ। কিন্তু মা! আর্মিরা চলে যেতেই শীতল উঠে বাড়ির দিকে দৌড় দেয়।

 

পর্ব ৩

২১শে মে, ১৯৭১।

ফিরা যাওনের লাইগ্যা কেউ যুদ্ধে আইয়ে নাই হাসান ভাই…

আমাদের এবারের অপারেশনটা আগেরগুলোর মতো নয়। এবারেরটায় বেশ ঝুঁকি আছে। রায়পুর পুলের কাছে হাইস্কুলে আর্মিদের যে ক্যাম্পটা আছে সেটাই আমাদের টার্গেট। আমরা খোঁজখবর নিয়ে জেনেছি, ওখানে কম বেশি পঞ্চাশজন পাক আর্মি আছে। জানা কথাই ভারি অস্ত্রশস্ত্র আছে ক্যাম্পে। এই ক্যাম্প থেকেই আশেপাশের এলাকায় নানান অত্যাচার চালায় পাকিস্তানি পিশাচগুলো। নারাণপুর, জিংলাতলী, আসমানিয়া, আমদপুর, ইউছুফপুর, মটুপিসহ আরও কয়েকটা গ্রাম এর মধ্যেই জ্বালিয়ে দিয়েছে ওরা। ধনসম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে। ধরে নিয়ে গেছে মেয়েদের। পুরুষদের বেশিরভাগকেই গুলি করে মেরেছে।

রায়পুর জায়গাটা অবস্থানগত কারণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা চট্রগ্রাম মহাসড়কের উপরে। সামনে ঘণ্টাখানেক গেলে কুমিল্লা শহর, পেছনে ঘণ্টাখানেক গেলে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট। আর ওদের ক্যাম্পটাও হাইওয়ের উপরেরই। ক্যাম্পটা উড়িয়ে দিতে পারলে একটা কাজের কাজই হবে। এই এলাকায় এটাই আমাদের আসল অপারেশন।

ভারতের ত্রিপুরার মতিনগর ক্যাম্প থেকে ট্রেনিং নিয়ে মাসখানেক আগে আমরা এই এলাকায় ঢুকেছি। ঢোকার পর ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে আমাদের। শীতল, হাসান ভাই, মনির, বাসেত, দুলাল ভাই, আর আমি মিলে একটা দল। ছয়জনের কমান্ডার হাসান ভাই। আমরা ছয়জন চালানশাপুর বাজার থেকে ইলিয়টগঞ্জ পর্যন্ত ছোটখাট কিছু অপারেশন করেছি। আমাদের সবারই গ্রেনেড চার্জের উপর বিশেষ প্রশিক্ষণ আছে। অবশ্য এসএমজি, থ্রিনটথ্রি এসব অস্ত্রও আমরা সবাই কম বেশি চালাতে জানি।

এখন একজন কম আমাদের গ্রুপে। প্রথম প্রথম একটু মুষড়ে পড়েছিল সবাই। কতদিন একসাথে ছিলাম আমরা। ভারতে, একসাথে একই ক্যাম্পে থেকে ট্রেনিং নিয়েছি, দেশেও ঢুকেছি একসাথে। তার মধ্যে একজন নেই। ভাবলে কেমন জানি লাগে। কে জানে, হয়তো এই অপারেশনেই আমি হারিয়ে যাব। বা অন্য কেউ। সবাই আমরা সেটা জানি। কিন্তু আমরা কেউ মরতে ভয় পাই না। দেশের জন্য আমরা আমাদের জীবন উৎসর্গ করার পণ করেই বাড়ি থেকে বের হয়েছি। আমরা জানি এই মৃত্যু গৌরবের। তা হলেও, চোখের সামনে দীর্ঘদিনের সঙ্গীকে মরতে দেখলে খারাপ লাগেই।

বাসেতকে আমরা হারিয়েছি মটুপি অপারেশনে। বাসেতই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী ছিল। আর বাসেত আমাদের মধ্যে বয়সেও সব চেয়ে ছোট ছিল। কত হবে বাসেতের বয়স! বড়জোর সতেরো। পেটে গুলি লেগেছিল। চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়নি। রক্তক্ষরণে মারা যায় বাসেত।

যে কেন সময় যে কাউকে হারাতে হবে জানে সবাই, তা হলেও সঙ্গী কেউ মারা গেলে কদিন কেমন কেমন  লাগে। আত্মীয়স্বজনদের কথা খুব মনে হয়। আমার মনে পড়ে মিনার কথা। যখন মিনার কথা মনে পড়ে একটু লজ্জাই লাগে। বাবা মা বেঁচে আছে, তাদের কথা না, মনে পড়ে মিনার কথা। কে জানে মিনা এখন কেমন আছে! শুনেছি বিয়ে হয়ে গেছে মিনার।

গত দশদিনে আমরা কিছু অপারেশন করেছি। ওই অপারেশনগুলো করে আমাদের সাহস এবং আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে। অবশ ছোটখাট অপারেশনই ছিল সব। প্রায় ঝুঁকিহীনই বলা যায়। টেলিফোনের তার কাটা, কাঠের পুল বা কালভার্ট ভেঙে ফেলা, রাজাকার ধরা, সড়ক পথে আর্মিদের গাড়ির পজিশন বুঝে এক্সপ্লোসিভ পুতে রাখাÑ এইরকম।

ঠিক করাই আছে আজ আমরা অপারেশনটা চালাব রাত নয়টার দিকে। এ সময় ওরা খাওয়াদাওয়ায় ব্যস্ত থাকে। আগেই এ তথ্য আমাদের নেওয়া হয়েছে। অপারেশনের কথা চিন্তা করে সবাই কম বেশি উত্তেজিত।

আমাদের কমান্ডার হাসান ভাই শিক্ষিত মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। মাথা খুব ঠান্ডা। এই পর্যন্ত কোনো অপারেশনেই উনার হিসাব ভুল হয়নি। যে কারণে সবাই উনার কমান্ড সহজে মেনে নেয়।

ক্যাম্পের কাছাকাছি একটা পরিত্যক্ত বাড়িতে এখন আমাদের আস্তানা। সেখান থেকে পালাক্রমে দুদিন ধরে চোখ রেখেছি ক্যাম্পটার উপরে। সকাল থেকেই অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিল। তবে সন্ধ্যার আগে আগে গতি একটু কমেছে। আর্মিদের ক্যাম্পটার সামনের দিকে একটু দূরে পাট ক্ষেত। ক্ষেতে হাঁটু ডুবে যায় এমন পানি। পানিতে সন্ধ্যা থেকেই শুয়ে আছি আমরা তিনজন। দুলাল ভাই, মনির আর আমি। ক্যাম্পের উপর চোখ রাখছি। যদি আক্রমণের সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে মনির ব্যাঙের ডাক ডেকে সঙ্কেত দিবে। মনির যে-কোনো প্রাণির ডাকই নকল করতে পারে। হুবহু পারে! ওর এই গুণটা আছে।

সময় যেন কাটতেই চাচ্ছে না আমাদের। এক একটা মিনিটকে মনে হচ্ছে এক এক ঘণ্টা। পচা পানিতে শরীর জ্বলছে। পানিভর্তি জোঁক! জোঁকে বোধহয় শরীরের সব রক্ত শুষে নিচ্ছে। প্রথম দিকে দুএকটা টেনে নামিয়ে ছিলাম। এখন আর কামড়টা টের পাচ্ছি না। শরীর কেমন জানি অসাড় হয়ে গেছে। খাক যত ইচ্ছা রক্ত! বড় জোঁকদের মোকাবিলা করতে গিয়ে না হয় ছোট জোঁকদের কামড় সহ্য করলামই।

পাট ক্ষেতের আলোর উপর কিছু কইমাছ উঠে এসেছিল বিকালের দিকে। মনির আর শীতল মিলে তা ধরেছে। পরিত্যক্ত বাড়িটার গোয়ালে আগুন জ্বেলে সিদ্ধ করে খেয়েছি আমরা। কতদিন পর মাছ খেলাম! আহারে, কদিন আগেও কী কষ্ট গেছে খাওয়ার! কসবার দিকে যখন ছিলাম। দুতিন দিন একাধারে কাঁচা কাঁঠাল খেয়েও থেকেছি। কাঁচা কাঁঠাল খেয়ে পেটের ব্যথায় তো দুলাল ভাই প্রায় মরো মরো। আর যখন কাঁঠাল শেষ হয়ে গেল, কেউ বিশ্বাস করবে, আমরা সাপও খেয়েছি। সাপ মেরে, লেজ আর মাথার খানিকটা ফেলে পুড়িয়ে খেতাম।…এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো। গ্রামের যে কোনো বাড়িতে ঢুকেই মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিলে জামাই আদর জোটে। বাড়ির লোকজন এমনভাবে আপ্যায়ন করে, মনে হয় কত আপনজন যেন আমরা। পোলাও কোর্মা মুরগি খাসি কিছু বাদ যায় না।

তবে এদিকের গ্রামগুলোতে এখন আর ঢোকার উপায় নেই। সব গ্রামেই মিলিটারিদের লোকজন আছে। তারা এদেশেরই সন্তান। হলে কী হবে, তারা দেশের সঙ্গে, দেশের মাটির সঙ্গে বেইমানি করে পাকিস্তানি হায়েনাদের সাহায্য করে। কোন্ বাড়িতে কোন্ মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় নিয়েছে, কোন্ বাড়ির ছেলে মুক্তি হয়েছে, এসব তথ্য তারা সরবরাহ করে আর্মিদের।

তাই এখন একেবারে বিপদে না পড়লে কারও বাড়ি উঠি না আমরা। বর্ষা বলে এখন খাওয়ার কষ্টটা বেশিই হচ্ছে আমাদের। রান্না করার জন্য শুকনো লাকড়ি পাওয়া যায় না কোথাও। বেশিরভাগ দিনই শুকনা চিড়া কী মুড়ি খেয়ে থাকতে হয়। সমস্যা থাকারও। বৃষ্টির কারণে চাইলেই যেখানে সেখানে, খোলা মাঠের উপরে শুয়ে পড়া যায় না। কাপড় চোপড় বলতে বেশিরভাগেরই একটা লুঙ্গি বা একটা হাফপ্যান্ট। একটা কী দুটো শার্ট। বৃষ্টিতে ভিজে রোদে ঘেমে, গা থেকে কাপড় থেকে, উৎকট গন্ধ বের হয় মাঝে মাঝে। তবে গোসলের সমস্যা নেই। চারদিকেই তো পানি। এক জায়গায় নেমে পড়লেই হল। তা গোসল করতে হলে লুঙ্গি বা প্যান্ট খুলেই করতে হয়, লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে।

রাত বাড়ছে। কটা হবে? আমাদের কাছে ঘড়ি নেই। আকাশ ঘোলাটে। বৃষ্টিটা পড়ছেই, টিপটিপ। তবু মনে হচ্ছে আটটা সাড়ে আটটা বাজে। সময় প্রায় হয়ে এল। বৃষ্টিটা সন্ধ্যার আগে একটু ধরেছিল। কিছুক্ষণ আগে থেকে আবার শুরু হয়েছে। এখন বেগ যেন আরও বাড়ছেই বৃষ্টির। অবশ্যি বৃষ্টি হলেই আমাদের সুবিধা। জানি পাকিস্তানিরা পানিকে বেশ ভয় পায়।

ক্যাম্পটা বড় বেখাপ্পা জায়গায়। চারপাশেই খোলা। সামনের দিকে আধহাত উঁচু পাটক্ষেত ছাড়া কাভার নেওয়ার মতো কিছু নেই। আক্রমণ করতে হলে করতে হবে ওই দিক থেকেই। তবে ওই দিক থেকে আক্রমণ করতে গেলে আমাদের ঝুঁকি বেশি। আবার পেছন দিক থেকে আক্রমণ করাটাও খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। পেছন দিকটায় উঁচু খোলা জমি। একটা বিড়াল হেঁটে গেলেও দেখা যাবে। আক্রমণটা কোনদিক দিয়ে করব তাই নিয়ে আমাদের মধ্যে কথা হয়েছে। দুলাল ভাই আর মনির চাচ্ছে পেছন দিক থেকে আক্রমণ করতে। হাসান ভাই চাচ্ছেন সামনের দিক থেকেই আক্রমণ করতে। তাঁর মতে, ওই দিকে আক্রমণ করলেই আমাদের সুবিধা বেশি।

দুলাল ভাই প্রশ্ন করেন, ক্যামনে, বুঝাইয়্যা কন হাসান ভাই? সামনের দিগদাদঅ আমি দেহি সাক্ষাৎ মরণ।

সামনের দিক বলেই ওরা ধারণাও করবে না ওদিক থেকে কেউ আক্রমণ করতে পারে। নজরদারিতে সে কারণেই সামনের দিকে থাকবে ঢিলেঢালা ভাব।

সারাক্ষণঅইদঅ কেউ না কেউ পাহারায় আছে। ওই দেহেন, এহনো একজন বন্দুক নিয়া বইসা রইছে। তার নজরদঅ সামনের দিকেঅই আছে।

আছে। কিন্তু তার মধ্যে দেখো কেমন ঢিলে ভাব । এতোদূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে। বন্দুকটা পায়ের কাছে রেখে অলসভাবে বসে আছে। আর ঝুঁকিতো থাকবেই। যেদিক থেকেই আক্রমণ করি না কেন। যতদূর জানি ক্যাম্পে ওরা পঞ্চাশজনের মতো আছে। সেখানে আমরা মাত্র পাঁচজন। তাদের তুলনায় আমাদের অস্ত্রও কম। তাছাড়া সামনের দিক যে একেবারে খোলা তাতো না। পাট ক্ষেতের কাভারটা আছে। যদিও পাটের চারাগুলো এখনও তেমন বড় হয়ে ওঠেনি।…দেখো, এতো কিছু ভাবলে আর যুদ্ধে আসা কেন!

মনির বলে, ফিরা যাওনের লাইগ্যা কেউ যুদ্ধে আইয়্যে নাই হাসান ভাই। মরতেও আমরা ভয় পাই না। কথা অইল, সবদিক ভাইব্যাঅই অপারেশনটা করা উচিত।… যাক, আপনে আঙ্গ কমান্ডার। আপনে যেমনে কইবেন হেমনেঅই সবকিছু অউক।

হঠাৎ বৃষ্টিটা শুরু হয়েছে যাকে বলে একেবারে মুষল ধারে। বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে পড়ছে আর আমি ঠান্ডায় কেঁপে কেঁপে উঠছি। অন্যদেরও মনে হয় একই অবস্থা। পাটের চারাগুলোর উচ্চতা কম হলেও আমরা কাভার নিতে পারছি ভালোমতোই। আর হাসান ভাই ঠিকই বলেছেন। যতটা ভেবেছিলাম, আর্মিরা ততটা সাবধান না। বৃষ্টিতে বাইরে আসেনি ওদের কেউ। দুজন বারান্দায় বসে বসে বোধহয় সিগারেট খাচ্ছে। ঝাপসা বৃষ্টির মধ্যেও আগুনের উঠানামা দেখতে পাচ্ছি। আমরা পাটক্ষেতের ভেতরে শুয়ে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে থাকি। অপেক্ষা করতে করতে আমি মিনার কথা ভাবি। ভাবি ইচ্ছে করে নয়, মিনার মুখটা আমার সামনে চলে আসে যেন। কী করছে এখন মিনা? এই বৃষ্টির রাতে!

মিনা চায়নি আমি যুদ্ধে যাই। ট্রেনিং এ যাওয়ার দুদিন আগে মিনার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল। সন্ধ্যার মুখে আমি মিনার কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়েছিলাম।

মিনা, আমি পরশুদিন যাচ্ছি। প্রথমে ভারতের ত্রিপুরাতে যাব আমরা। সেখানে ট্রেনিং নিয়ে দেশে ঢুকব, যুদ্ধ করতে।

তাজুল ভাই, তোমার না গেলে অয় না?

ট্রেনিংয়ে?

হ।

যুদ্ধ করতে হলে, অস্ত্র চালাতে হলে ট্রেনিংতো লাগেই?

তাজুল ভাই, আমি চাই না তুমি যুদ্ধে যাও।

এ কেমন কথা মিনা। যুদ্ধে কি আমি একা যাচ্ছি! আমার সাথেই তো সাগর আর নূর নবি যাচ্ছে। এখন গ্রামের কোন জোয়ান ছেলেটা না যাচ্ছে যুদ্ধে?

তারা যায় যাউক, তুমি না গেলা। তুমি না গেলে যুদ্ধ কি অইব না?

হবে। আমার একার জন্য কোনোকিছু থেমে থাকবে না। আমি না গেলেও সাগর যাবে, নূর নবি যাবে। সারা দেশ থেকে আরও অনেকে যাবে।

তই! তুমি না গেলে কী অয়?… যুদ্ধে গিয়া তুমি যদি আর ফিরা না আইয়্যো।

না-ই আসতে পারি। যুদ্ধ তো একটা অনিশ্চিত ব্যাপার।

আমার কথা একবার ভাবলা না!

ভাবব না কেন! তোমার কথা তো আমি সবসময়ই ভাবি। আমার কাছে তুমি আর দেশ কি আলাদা?… আর তুমি কি ভেবেছো, আমি যুদ্ধে না গিয়ে গ্রামে থাকলেই খুব নিরাপদ?… গ্রামের এতেঠ এতেঠ নিরীহ মানুষজন বুঝি খুব নিরাপদে আছে। নিজের চোখে সব দেখছ, তারপরেও কী করে ভাবো যে গ্রামে থাকলেই আমি নিরাপদে থাকব! এখন তো গ্রামের জোয়ান ছেলেদেরই বিপদ বেশি।

জুয়ান মাইয়্যারা বুঝি খুব নিরাপদ?

তাই বললাম নাকি? মেয়েদের বিপদ তো আরও বেশি। কিন্তু আমি যুদ্ধে না গিয়ে বাড়ি বসে থাকলেই কি তোমাকে রক্ষা করতে পারব?

আমি জানি সবঅই, তাজুল ভাই। তুমিদঅ আমার চেয়ে বেশি জানবাঅই। কলেজে পড়ছ।…তুমি, তোমার মতো আরও ছেলেরা যুদ্ধে গেলেইদঅ দেশের মানুষের ভরসা বাড়ব আরও। অনে তোঙ্গ মতো যাগঅই সামর্থ্য আছে দেশের স্বাধীনতার লাইগ্যা পাক আর্মিগঅ মোকাবিলা করা উচিত। তারপরও মনে অয়, স্বার্থপরের মতো আমার মনে অয় একদিন অইলঅই বা দেশ স্বাধীন, যদি তুমি ফিরা না আইয়্যো, তইলে সেই স্বাধীন দেশঅ তোমারে ছাড়া আমি একা কারে লই্যয়া পথ চলমু।… তোমারে ছাড়া আমার বাঁইচ্যা থাকতে কষ্ট অইব তাজুল ভাই। খুব কষ্ট!

কষ্ট! কষ্ট কি শুধু মিনার একার হয়! আমার হয় না, কষ্ট? আচ্ছা, বিয়ের পর মিনার কি কষ্ট আরও বেড়ে গেছে? নাকি ও স্বামী সংসারের সঙ্গে মিলে গিয়ে সব ভুলে গেছে?

দুলাল ভাই, মনির আর আমি ক্রলিং করতে করতে আর্মিদের ক্যাম্পের দিকে এগুতে থাকি। বৃষ্টিটা পড়ছেই। ক্যাম্পে এখন যেন সাড়াশব্দ কম। কিছুক্ষণ আগে বোধহয় ওদের খাওয়া শেষ হয়েছে। তবে পাহারাদার দুজন বসে আছেই অলসভাবে। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। আক্রমণ করতে হলে এই-ই সময়। বলা ছিল আক্রমণের আগে মনির ব্যাঙের ডাক ডেকে সংকেত দিবে।…ব্যাঙের ডাক শুনলেই হাসান ভাই অন্যদের নিয়ে কাভার দিবেন, দুলাল ভাই আর আমি গ্রেনেড ছুঁড়ব ক্যাম্প লক্ষ্য করে। আমাদের কাছে পলিথিনে মোড়া গ্রেনেড আছে। আমরা এখন ক্যাম্পের একেবারে কাছে। এখান থেকে গ্রেনেড ছোঁড়ার কাজটা মোটেই কঠিন মনে হচ্ছে না।

কিন্তু সহজ কাজটাই করা হল না আমাদের। সাপটা মনিরের পিঠের উপর দিয়ে পাটক্ষেতটা পার হচ্ছিল। মনির চমকে গিয়ে আমাদের চমকে দিয়ে, গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। প্রহরীরটার চোখ মনে হয় এদিকেই ছিল। শব্দ শুনেই  সতর্ক হয় সে। সঙ্গে সঙ্গে হাতের এলএমজিটা দিয়ে গুলি ছুঁড়ে। মনির ধপাস করে আমাদের উপরই পড়ে যায়। ভয়ে আমার কলিজা কাঁপতে থাকে। নিশ্চিত মরণকে কে না ভয় পায়! আমি আর দুলাল ভাই পাটখেতের ভিতরে পানির সঙ্গে মিশে যেতে থাকি। আরও কিছু এলোপাথারি গুলি ছোঁড়া হয়। ভাগ্য ভালো, সব গুলিই আমাদের গায়ের উপর দিয়ে যায়।… বোধহয় আমাদের নিস্তব্ধতাই ওদের নিশ্চল রাখে। কে জানে হয়তো মনিরকে ওরা কুকুর বা অন্যকিছুই ভেবেছে। যা হোক, এখন আর এতোকিছু ভাবার সময় নেই। যে কোনো সময় ওরা ব্যাপারটা বুঝে ফেলতে পারে। যে কোনো সময় শক্তিশালী টর্চ এসে গায়ে পড়তে পারে। মনিরকে নিয়ে দ্রুত সরে যাওয়া দরকার।… মনির বলেছিল, ফিরে যেতে কেউ যুদ্ধে আসিনি হাসান ভাই। মনিরের মুখের কথাই সত্যি হল। ও বোধহয় আর ফিরে যাচ্ছে না।

দুলাল ভাই আর আমি মনিরকে নিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে সরে যেতে থাকি। এর মধ্যেই দুলাল ভাই আবার ব্যাঙের ডাক ডাক। এটা হাসান ভাইদের জন্য ইশারা। ওনার ডাকটা মনিরের ব্যাঙের ডাকের মতো নিখুঁত হয় না। কিন্তু এই শব্দ শুনেই আমাদের কমান্ডার হাসান ভাই বুঝবে আমরা নিরাপদে সরে এসেছি। ঠিক করাই ছিল, আমরা বিফল হলে আক্রমণটা ওরাই করবে। কয়েক সেকেন্ড পরেই আমরা বিকট শব্দটা শুনতে পাই। …সঙ্গে সাথেই আরেকটা শব্দ। এরপর কিছুক্ষণ আমাদের কানে শুধু শব্দই আসে। গুলি, মেশিন গান, গ্রেনেড, কে যে কোনটা ছুঁড়ছে বোঝা দায়। তবে, এই বৃষ্টির মধ্যেও যখন আর্মিদের ক্যাম্পটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠে তখন আমরা বুঝি যে আমাদের সব অস্ত্র আমরা শেষ করেছি, এবার দ্রুত এলাকা ছাড়তে হবে।

মনির আমাদের হাতের উপরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আমরা দ্রুত মনিরের লাশ নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে আসি। কী আশ্চর্য! মনির এখন লাশ। একটু আগেও ও আমাদের সঙ্গে ছিল। আমরা কাছাকাছি পাটক্ষেতে শুয়েছিলাম দীর্ঘক্ষণ। আমাদের সহযোদ্ধা আরেকজন কমল। কে জানে আমরা কোনো অসম যুদ্ধ করে যাচ্ছি কি না। আমরা কি আদৌ পারব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সশস্ত্র পাকিস্তানি মিলিটারিদের সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়ী হতে?

মনির কথায় কথায় বলেছিল, ওর বাড়িতে শুধু ওর মা আছে। মনির কেরায়া নৌকার মাঝি ছিল। যা আয় হতো মা ছেলের চলে যেত। মনির মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেই বোধহয় বুঝতে পেরেছিল ও বাঁচবে না। আমাকে ফিসফিস করে বলেছিল, যেন মৃত্যু হলে লাশটা ওর মায়ের কাছে পৌঁছে দিই।

হাসান ভাই সিদ্ধান্ত দেন, মনিরের লাশ অতদূরে ওর বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। আমরা যে পরিত্যক্ত বাড়িটায় থাকি, তার কাছাকাছি একটা কবরস্থান আছে। সেখানেই মনিরকে কবর দেওয়া হবে। তবে, সম্ভব হলে মনিরের মাকে মৃত্যুর খবরটা দিতে হবে ।

আমরা যারা বনেবাদাড়ে ঘুরে ঘুরে যুদ্ধ করছি, বা যারা ট্রেনিং নিয়ে দেশে ঢুকছে, সবার মনে এখন একটাই স্বপ্ন। স্বাধীনতা! জানি না সে স্বাধীনতা কবে আসবে। আদৌ আসবে কিনা কে জানে। স্বাধীনতার জন্য আর কত মূল্য দিতে হবে তা-ই বা কে জানে।

বেশ রাত হয়েছে। এখনও খাওয়া হয়নি আমাদের। রান্নাই হয়নি, খাওয়া হবে কী! বৃষ্টিটা কমেছে অনেকক্ষণ হল। আকাশে বেশ বড় চাঁদ উঠেছে। দুলাল ভাই বসে বসে উদাস চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি কাছে যেতেও তাকালেন না।

কী দুলাল ভাই, মনটা খুব খারাপ মনে হচ্ছে ।

দুলাল ভাই ফিরে তাকান। হঠাৎ বাড়ির কথা মনে পড়ছে খুব।…সেদিন বাসেত মারা গেল, আজ মনির মারা গেল। আমিও হয়তো একদিন কোনো অপারেশনে মারা যাব।

দুলাল ভাই, এসবতো সবার মনেই আসে। যুদ্ধ মানেই তো মৃত্যুর সম্ভাবনা। সব জেনে শুনেই তো আসা।

জানি। তাজুল, আমি যে ভয় পাচ্ছি তা নয়। হঠাৎ মনটা কেমন বিষণœ হয়ে গেল। আসলে আপনজন মারা গেলে দুঃখটা বুকে গিয়ে লাগে। এখন যাদের সঙ্গে আছি তারা আমার আপনজনের চেয়েও বেশি। এই নিয়ে তুই ভাবিস না। কিছুক্ষণ পরেই মন খারাপ ভাবটা কেটে যাবে। তুই তো জানিস না, যেদিন আমি যুদ্ধ করার জন্য ট্রেনিং নিতে ইন্ডিয়া গেলাম সেদিনই আমাদের বাড়িতে মিলিটারি এসেছিল। আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। ছোট বোনটাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় মা বাঁধা দিলে তাকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। যতদূর জানি, বাড়িতে মানুষ বলতে বাবা একা।…চল, রান্নার জোগাড়টা করে ফেলি।

আমি হতবাক হয়ে দুলাল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। কত স্বাভাবিকভাবে আমাদের সঙ্গে হাসিমুখে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। অথচ, বুকভরা কত দুঃখ! উনাকে সবসময় হাসি তামসার মধ্যেই থাকতে দেখেছি। সে কি এতোবড় দুঃখ ভুলে থাকার অভিনয়!

 

পর্ব ৪

৭ই জুন, ১৯৭১।

আমাদেরকে বাঁচাও, এখান থেকে বের করে নিয়ে যাও…

দাওয়ায় বসে অলস চোখে তাকিয়ে আছে হাবিল। বিশেষ কিছু যে দেখছে তা নয়। উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে শুধু। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চলল, সকাল থেকে এই পর্যন্ত কিছুই খায়নি।

ধীরেন হাবিলদের প্রতিবেশি। স্নান করার আগে হাবিলকে যেমন বসে থাকতে দেখে গেছে, স্নান শেষে দেখে হাবিল তেমন ভাবেই বসে আছে। আহারে, ছেলেটা বোধহয় মা ভাই বউয়ের খোঁজ এখনও পায়নি।

কীরে হাবিল, সহালেত্তে এক জায়গাতঅই বইয়্যা রইছস! নাওয়া নাই খাওয়া নাই। এমন করলেদঅ  অসুখে পড়বি, যেই কোন সময়। তহন তরে কে দেখব?

কাকা, কেমইনে খাওয়া দাওয়া করি কন! গলা দিয়াদঅ খাওয়া নামে না। দুই মাস পার অইতে চলল, মা ভাইয়ের কোন খোঁজ নাই। আপনগেঅ বউয়ের অবস্থাতো জানতেনঅই।…তারা আমার একদিন আগেঅই রওয়ানা অইছিল বাড়ির দিকে। বাড়িতদঅ পৌঁছল না কেউ। অথচ, আমিদঅ ঠিকমতোই ফিরলাম বাড়ি। তিনজন মানুষ একবারে হাওয়া অইয়া গেল।

তরে আর কী সান্ত¡না দিমু। দেশের অবস্থাদঅ আমার চেয়ে কম জানস না। হয়তো কোন বিপদে আটকা পড়ছে তারা। বিপদ কাটলেঅই ফিরব বাড়ি।

ফিরব কাকা! তুমি নিজে বিশ্বাস কর হেই কথা? আমি নিজের চউখ্যে মিলিটারিগঅ যে তা-ব দেইখ্যা আইলাম, তাতে বিশ^াস হয় না তারা বাঁইচ্যা আছে। আর মিলিটারিরাদঅ পরশুদিন পাশের গেরামেঅ আইছিল। কী কইরা গেছে হুনছতো সবঅই। দেইখ্যো যে কোনোদিন এই গেরামেঅ আইল বইল্যা।

ভয়দঅ হেনঅই। না জানি কোনোদিন এই গেরামঅ আইয়্যে। আমরাদঅ ঠিক করছি ইন্ডিয়াত যামুগা। সব গোছগাছ হইতাছে।…হাবিল, তুইও চল আঙ্গ লগে। যাবি?

আমি গেলেগা তহন যুদি আম্মারা আইয়ে?

আইলে আইব। তুই যে আঙ্গ লগে ইন্ডিয়া গেছস, ভালা আছস, হেইডা তর মা জানলে খুশিঅই অইব।

কাকা, তুমি বিশ^াস কর আম্মারা বাঁইচ্চা নাই। এর লাইগ্যা আমারে  তোঙ্গ লগে লইয়্যা যাইতে চাও। না?

ঠিক তা না রে।… আসলে দিনদঅ অনে খুবঅই খারাপ। যেই কোন সময় যেই কারোইদঅ বিপদ অইতে পারে। ধর, যুদি তর মা ভাই বউয়ের খারাপ কিছু অইয়্যাঅই থাহে, তুই এই দেশ থাইক্যাঅই-বা করবি কী?

না কাকা, আমি থাকমু গেরামেঅই। তোমরা যাও। আমার নিজের গেরাম ছাইড়া, এই দেশ ছাইড়া যাইতে ইচ্ছা করে না।  আমি একলা মানুষ, বিপদ আপদ আইলে সামলাইতে পারমু।

আঙ্গঅই কী আর সাত পুরুষের ভিটা ছাইড়া যাইতে মন চায়? সাধ কইরাদঅ আর ভিটা মাটি ছাইড়া যাইতাছি না। না গেলে যে জীবন বাঁচে না, ইজ্জত বাঁচে না।… আমরাদঅ আউজ্জাঅই যাইতাছি না। গোছগাছ চলতাছে। তুই চিন্তা কর্ই দেখ আরেকবার।…তর কাঁধের কী অবস্থা?

শুকাইছে অনেকটা।

তুই না অয় ভাব আরেকবার ভালামতোন। যদি মতো বদলাস, কইস। যাইরে, খাওনের সময় অইয়্যা আইল। আমার আবার বেশিক্ষণ খালি পেডে থাকলে বেদনা অয় পেডঅ।

ধীরেন চলে গেলে হাবিল চুপচাপ বসে থাকে।

চুপচাপ থাকলেই যন্ত্রণ বেশি। চুপচাপ থাকলেই ওর মনে পড়ে যায় পঁচিশে মার্চের বিভীষিকার সেই রাত। আহারে, কী নৃশংস অত্যাচার-ই না করেছে নিষ্পাপ ছেলেগুলোর উপর। মানুষ এমন হিং¯্র হতে পারে! নাকি ওরা আসলে মানুষ না! তাই হবে। হলের পাশের বস্তির মেয়েদের আকুল ডাক এখনও তার কানে বাজে। বাঁচাও। আমাদের বাঁচাও! …আহা, বাঁচার জন্য কী আকুতি ছিল তাদের কণ্ঠে! হাবিল কি পারত না, পালিয়ে না এসে অসহায় মেয়েগুলোকে বের করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যেতে? হাবিল কি পারত না আহত সে ছেলেটাকে বাইরে নিয়ে আসতে? কিন্তু কী যে এক ভয় গ্রাস করেছিল ওকে। সমস্ত বিচার বিবেচেনা যেন হারিয়ে ফেলেছিল।

গ্রামে আসার পর থেকেই যেন রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা লাশেরা তাড়া করছে হাবিলকে। তাড়া করে পুকুর পাড়ের সারি সারি লাশ। তাড়া করে হলের ভেতরের রক্তাক্ত সব লাশ। চোখে শুধু লাশ আর লাশ ভাসে হাবিলের। মনে পড়লেই বুকের ভেতর কষ্ট মোচড়াতে থাকে,হলের নিষ্প্রাপ ছেলেদের অত্যাচার করে, বেওনেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে, গুলি করে ফেলে রেখেছিল হিং¯্র জানোয়ারগুলো। বস্তির লোকেরা প্রাণ বাঁচাতে হলে ঢুকেছিল। বেচারারা বাঁচতে পারেনি। সে রাতে দেখা সব দৃশ্য চোখের সামনে থেকে যেন সরে না হাবিলের। উঠতে বসতে খেতে শুতে লাশের সারি যেন তাকে তাড়া করে। খ-িত বিকৃত সব লাশ। লাশ আর লাশ!…রুমে বারান্দায় দেওয়ালের উপরে লাশ, ঝুলে আছে লাশ, গেঁথে আছে লাশ। রাস্তায় রাস্তায় লাশ। যুবতিদের উলঙ্গ লাশ। সামনে পেছনে ক্ষতবিক্ষত। আহ্! চাকু দিয়ে কুচি কুচি করা হয়েছে তাদের কোমল অঙ্গ।…ছোট শিশুর থেঁতলানো লাশ। কোনো লাশের মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ। বুক থেকে পেট পর্যন্ত চেরা লাশ। কোনো লাশের পাকস্থলী হৃৎপি- সব বের হয়ে আছে বাইরে। কোনো লাশের গলা কাটা, কোনো লাশের হাত পা বাঁধা। লাশ আর লাশ!…মাঠের ঘাসে লাশ, ফুটপাতে লাশ। নারী-পুরুষ, শিশু বৃদ্ধ-সবাই লাশ হয়ে পড়ে আছে। বিকৃত খণ্ডিত, আধপচা লাশ। পোড়া, আধ পোড়া লাশ।…এই জীবনে কি ওইসব লাশ সরবে হাবিলের চোখের সামনে থেকে?

নীতিশ উঠানের কোণে নিমগাছের তলে বসে তামাক খাচ্ছিল। মনটা খারাপই তার। সবাই প্রাণ ভয়ে দেশ ছাড়ছে। পূর্ব পুরুষদের ভিটা মাটি ছেড়ে কোন অজানায় পাড়ি জমাচ্ছে সবাই। সেখানে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে কে জানে। শোনা তো যায় ইন্ডিয়ায় শরণার্থী শিবিরে লোকজন সব অমানুষিক কষ্ট করছে। বাসস্থান, খাওয়া, সব ধরনেরই কষ্ট। তারও বুঝি আর এদেশে থাকার উপায় নেই। বাড়ির সবাই খুব তাড়া দিচ্ছে ইন্ডিয়া চলে যাওয়ার জন্য। চলে গেলে তবুও প্রাণে বাঁচার চেষ্টাটা করা যাবে।

হাবিল আসে বিষণœ মুখ নিয়ে। হাবিলকে দেখে চোখ তুলে তাকায় নীতিশ। আহা অমন তরতাজা ছেলেটার কী হাল হয়েছে দেখো! এই ক মাসে ছেলেটার বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেছে।

আয় হাবিল। জলচৌকিডা টাইন্যা কাছে আইয়্যা ব।

হাবিল বারান্দা থেকে জলচৌকি টেনে এনে নীতিশের কাছাকাছি বসে।

কোন খোঁজখবর পাইলিরে হাবিল?

না জেঠা। দেশের এই দুঃসময়ে কে কার খোঁজ রাহে। তই, আমি যেন থাকতাম, হেনের একজনের লগে আমার দুইদিন আগে গৌরিপুর বাজারে দেখা অইছিল। সে কইছে সে ঢাকাত্তে পালাইয়্যা আওনের সময়, আম্মাগরে নাহি দাউদকান্দি ফেরিঘাটে দেখছে ।

তাইলেদঅ খবর ভালাঅই।

ভালো খবর আর কই! সে তো প্রায় আড়াই মাস আগের কথা জেঠা। কে জানে এখন তারা বাঁইচ্যা আছে কিনা।

তুই আগেই অত অমঙ্গল চিন্তা করিস না ত। তুই যার কথা কইলি, সে যখন কইছে সবাইরে দেখছে, তহন নিশ্চই ভগবান তাগরে বাঁচাইয়্যা রাখছে।

বাঁইচ্যা থাকলে এতো দিন বাড়ি আইত না?

হয়তো কোনো অসুবিধায় আছে। আছে হয়তো কোন আত্মীয়স্বজনের বাসায়। দেশের অবস্থাদঅ আমার চেয়ে বেশিই জানিস তুই।

না জেঠা, আমার বিশ্বাস অয় না তারা বাঁইচ্চা আছে!

তুই অনে কী করবি? নীতিশ হাবিলের মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে প্রসঙ্গান্তরে চলে যায়।… আমরাদঅ ঠিক করছি ওইপার যামুগা। তর কাকিরা মনে অয় গোছগাছ শুরু করছে। আমি অবশ্য কইছি, শেষ পর্যন্ত না দেইখ্যা আমি ভিটা মাটি ছাইড়া যামু না। তুই যাবি হাবিল, আঙ্গ লগে?

কয়দিন আগে ধীরেন কাকুও কইতাছিল তাগ লগে যাইতে।…না জেঠা। আমি আরঅ কিছুদিন দেহি। যদি তারা ফিরে!…অবশ্য আশা করি না, তাও… পরশু আমার কাছে ওদুদ আইছিল। কইল, সে বর্ডার পার হইয়্যা ইন্ডিয়া যাইব। ট্রেনিং নিতে। কইতাছিল, আমারেও যাইতে। ভাবতাছি ওদুদের লগে যামু।

কাঁধের জখম লইয়্যা পারবি ট্রেনিং নিতে?

পারমু জেঠা। প্রায়দঅ শুকাইয়্যাঅই গেছে। আর, মনে এতো বড় জখম আছে যে, শইল্লের জখমের কথার মনেঅই থাহে না আমার।

আমার যুদি বয়স থাকত আমিঅ তগ লগে যাইতাম। এই সত্তুর বছরের ঘাটের মড়ারে দিয়া দেশের কোনো কাজঅই অইলঅ না।…আইচ্ছা, ঢাহার কথা কিছু কত, হুনি। মানুষজন যা কয় ঠিক বিশ্বাস অয় না। তুইদঅ নিজের চৌখ্যে কিছু দেখছস।

যা দেখছি আমার নিজেরইদঅ বিশ্বাস অয় না জেঠা। কইলে তোমারঅ বিশ্বাস অইব না। আমিদঅ সারারাইত আটকা আছিলাম সেফটি ট্যাঙ্কে। সেইখানথে দেখছি তাগ তা-ব! …সেফটি ট্যাঙ্ক কী, তুমি ঠিক চিনবা না। ধর, টাট্টিখানার নিচেরটা যেমন।…গন্ধে আর গ্যাসে দম বন্ধ বন্ধ অইয়্যা আইছিল। শ্বাস নিতে কী যে কষ্ট। তই যা দেখলাম, মনে অইতাছিল মইরা গেলেঅই ভালা আছিল। এমন দৃশ্য নিজের চৌখ্যে দেখতে অইত  না।

জেঠা, অন্যের কাছে শোনা আর নিজের চউখ্যে দেহা, আকাশপাতাল ব্যবধান।…কী কমু তোমারে। ছাত্রডির কলিজা কাঁপাইন্যা চিৎকার মনে অইলে এখন শইল শিউরাইয়্যা উঠে।…দেহো দেহো, আমার গায়ের লোম কেমন খাড়া অইয়্যা গেছে।… রাইতে ঘুমাইতে গেলে মানুষের কান্না হুনি। ঘুমাইতে পারি না। আহ্! কী যে অত্যাচার করেছে আর্মিরা।…পরেরদিন যহন রাস্তায় বাইর অইলাম, কী দৃশ্য দেখছি তোমারে কথায় বুঝাইতে পারমু না।… লাশের লাইগ্যা রাস্তায় হাঁটতেও পারছিলাম না। পুরুষ মহিলা বাচ্চা বুড়া- সব লাশ অইয়্যা পইড়া আছে রাস্তায়। কোন লাশ কুকুর খাইতাছে। কোনো লাশ কাক ঠোকরাইতাছে।… দেখলাম, ট্রাক ভর্তি কইরা লাশ লইয়্যা যাইতাছে, ভাবছিলাম বোধঅয় কবর দেওয়ার লাইগ্যা। পরে মনে অইলঅ, এতো লাশ কবর দেওয়ার জায়গা কই!

কবর দেওনের লাইগ্যা কি আর অতলা মানুষ মারছে ! দেখ্গা কোনখানে ফালাইয়্যা দিছে।

আপনে ঠিকঅই কইছেন জেঠা। যত্ন কইরা যুদি কবরঅই দিব তো এতো মানুষ মারবোইবা কিয়ারে! কইছিঅইদঅ আগে, কাঁধে বোমা লাইগ্যা এক দয়াল লোকের বাড়িত আছিলাম। সেইখান থাইক্যা ডেমরা যাওনের পথে দেখলাম, ধলপুরে বিরাট বিরাট গর্তে আধপচা, পচা, গলা লাশ ফেলতাছে ট্রাক ট্রাক।

তুই বেশি ভাবিস না বাবা। আমার মন কইতাছে তর মা ভাইরা ভালাঅই আছে। হয়তো কোনো কারণে আটকা আছে কোথাও। দেশের এই অবস্থায় চলাফেরাদঅ সহজ না। দেখবি, যেই কোন দিন আইয়্যা হাজির অইব।

তা-ই বা আশা করি কী কইরা! বাড়ি আসার দিনদঅ আর্মিগঅ অত্যাচার নিজের চউখ্যেঅই দেখছি। বাপের কাছ থাইক্যা মাইয়্যারে ধইরা নিয়া গেল। মায়ের কোল থাইক্যা দুধের শিশুরে কাইড়া নিয়া হাসতে হাসতে আঁছড়াইয়্যা মারল পশুরা।

থাক। আর কইস না হাবিল। এই সব হুনলে মানুষের উপ্রেত্তে বিশ্বাস উইঠ্যা যাইব।

আপনে তাগরে মানুষ কইতাছেন জেঠা!

মানুষ না! মানুষের মতোঅইদঅ হাত মুখ সব।

মানুষ অত হিংস্র অইতে পারে না।

কোন্ প্রাণীই বা অন্য প্রাণীর উপর এমন অত্যাচারডা করে। তাও বিনা দোষে।… আগেদঅ ভাবতাম তারা বোধঅয় আঙ্গ হিন্দুগঅ এই দেশ থাকতে দিব না। পরে বুঝছি, তাগ কাছে হিন্দু মুসলিম সমান।…কী অন্যায়ডা করেছিলাম আমরা। নিরীহ মানুষের উপর এমন অত্যাচার করতাছে তারা।

তই, আঙ্গ লোকজনরাও বইস্যা নাই জেঠা। তাগরে সমান মাইর দেওয়া শুরু করছে।

হ, তা তো জানিঅই। কিন্তু আমরা সব কৃষক মজুর, খাইট্যা খাওয়া মানুষ। আঙ্গ অস্ত্র নাই, যুদ্ধ করার বিদ্যা নাই, একটা শিক্ষিত মিলিটারির লগে, তাগ অস্ত্রের লগে পারমু আমরা?

পারমু কিনা জানি না জেঠা। তাই বইল্যা তাগরে এমনি এমনি ছাইড়া দিব এই দেশের মানুষ, তা ভাইব্যেন না। আঙ্গ দেয়ালেদঅ পিঠ ঠেইক্যা গেছে এমনিতেই। মরতে যহন অইবঅই, তাগর দুই চারটাকে মারমু তই মরমু।… আমি আসলে মন ঠিক কইরালাছি জেঠা, আমি ইন্ডিয়া যাম ট্রেনিং নিতে। হয়তো কাল পরশুই যামু। মা ভাই আর আপনেগঅ বউ যুদি বাঁইচ্যা থাহে, যুদি ফিরা আইয়ে, হয়তো আপনাগেঅ লগে দেখা অইত না। আর যুদি আপনেরা যাওনের আগেঅই গেরামে ফিরে তারা, কইয়্যেন, আমি যুদ্ধে গেছি। যদি তারা বাঁইচ্যা থাহে, আর আমিও বাঁইচ্যা ফিরি, তাইলে তাগ লগে দেখা অইব।

আমি কেমনে কমুরে হাবিল! আমি যে পালাইয়্যা যাইতাছি ইন্ডিয়ায়।

নাহ্, যদি তারা ফিরেও, আপনেগঅ লগে দেখা অওনের সম্ভাবনা কমই।… কিন্তু পালাইয়্যা কইতাছেন কিয়ারে জেঠা! আপনার মতোন আরও কতজনেঅইদঅ জীবন বাঁচাইতে যাইতাছে অইপারে।

গত পরশুদিন নারাণপুর গেরামে মিলিটারি আইয়্যা বাড়িঘর জ্বালাইয়্যা পুরুষগরে খালের পাড়ে খাড় করাইয়্যা গুলি কইরা মারছে হুনলাম। নাকি মানুষ পুড়াইয়্যাও মারছে। জোয়ান ছেড়িডিরে সব ধরে লইয়্যা গেছে। কমু আর কী! সবদঅ তরও জানা।… হুনছি রায়পুর কাঠের পুলের কাছে আর্মিরা ক্যাম্প করছে। হোনার পর থাইক্যা ডরের মধ্যে আছি। রায়পুরদঅ ঘরের কাছেঅই। কোনোদিন যে মিলিটারিরা আইয়্যে আঙ্গ গেরাম!

হেই ক্যাম্পদঅ মুক্তিরা উড়ইয়্যা দিছে জেঠা।

কস কী! জানতাম নাদঅ! কত দিন পরে একটা ভালা খবর হুনাইলি বাপ।… যাক, যাওনের আগে অন্তত জাইন্যা গেলাম যে আঙ্গ ছেলেরা সাহস লইয়্যা আগাইয়্যা যাইতাছে। …উপায় নাই রইল্যাঅই  দেশ  ছাইড়া যাইরে হাবিল। না অইলে জন্মইস্তক বাইড়া উঠা এই মাটি ছাইড়া যাই! প্রাণের মায়া বড় মায়ারে হাবিল।

যাইতাছেন উপায় না দেইখ্যা তাত  বুঝিঅই। যান। যদি বাঁইচ্যা থাহি আবার দেখা অইব জেঠা। যদি বাইচ্যা থাহি!

বলতে বলতে হাবিল আনমনে হেঁটে চলে যায়। নীতিশ হাবিলের গমনপথের দিকে চেয়ে থাকে অপলক।

 

২০শে আগস্ট, ১৯৭১।

প্রতিদিনই নতুন নতুন লোক ধরে আনে…

কদিন গেল নাবিল ঠিক বলতে পারে না। এখন দিন কী রাত, তাও বলতে পারবে না। দিন রাতের হিসাব কবেই গুলিয়ে গেছে তার। অমানুষিক অত্যাচারের কারণে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারে না এখন নাবিল। মাটিতে পা হেঁচড়ে হেঁচড়ে হাঁটে। ডান হাতটা অকোজোই হয়ে গেছে। ওই হাতে কোন অনুভূতি নেই। বেঁধে রাখার কারণে দু’হাতের কবজিতে পচন ধরেছে।

মিলিটারিরা নিয়মিতোই অত্যাচার করে যাচ্ছে। কতজন যে চোখের সামনেই মরল! মৃত দেহগুলোকে ওরা বস্তায় ভরে কোথায় যেন নিয়ে যায়। প্রতিদিনই নতুন নতুন লোক ধরে আনে। বেশিরভাগই অল্প বয়সি। এনে মৃতদের জায়গায় বেঁধে ঝুলিয়ে রাখে। তাদের উপরও বিভিন্ন রকম অত্যাচার করে। ওরা বোধহয় মেয়েদেরও ধরে নিয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে মেয়েদের মরণ চিৎকার শোনা যায়। সে কান্না শুনলে এমন অবস্থায়ও নাবিলের বুক কেঁপে উঠে।

এখানে কাউকেই পেট ভরে খাবার দেওয়া হয় না। মাথাপিছু একটা কী দুটো পাতলা রুটি, সঙ্গে পাতলা ডাল। মাঝে মাঝে ভাতও দেয়। তবে, সে ভাত থেকে কেমন একটা গন্ধ উঠে আসে। সঙ্গে থাকে মরা মরা পোকা। সে পোকাওয়ালা গন্ধ ভাতই সবাই গোগ্রাসে খায়। বন্দিদের সংখ্যার তুলনায় খাবারের পরিমাণ খুবই কম। সে খাবারও ওরা ঢেলে দেয় মাটিতে। খাবারের সময়ও সকলের হাত বাঁধা থাকে। কুকুরেরর মতো চেটে চেটে ওই খাবার খায় ওরা। বাইরে এক বালতি পানি থাকে। পিপাসা পেলে চুমুক দিয়ে খায়। কোনো বেলাই পেটে ভরে না খাবার খেয়ে। মাঝে মাঝে ভিখারি ছেলেরা জানালা দিয়ে ওদের খাবার দিয়ে যায়। ভিখারি ছেলেদের দেওয়া খাবার খেয়েই মনে হয় ওদের জীবনটা টিকে আছে।

ছোট রুমটাতে দুর্গন্ধে টেকা দায়। শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। বন্দিদের পায়খানা প্রস্রাবে রুমটা সয়লাব। নাবিলরা তার মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকে। বসে থাকে। এখন অবশ্য দু একজনকে ওরা বসতে দেয়, যারা ওদের অত্যাচারে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতোা হারিয়েছে। যেমন নাবিল।

দুপুরে খাকি পোশাক পরা একজন আসে। দেখলেই বোঝা যায় উচ্চপদস্থ কেউ হবে। তার চেহারা সুন্দর। হাতে সুন্দর একটা লাঠি। সে নাকে রুমাল চেপে লাঠি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বন্দিদের দেখে। তার সঙ্গে আরও দুজন খাকি পোষাক পড়া মিলিটারি। সাথের মিলিটারি দুজন বন্দিদের চড় থাপ্পড় মারে, হাতের লাঠি দিয়ে গুতো দেয়। আর বলতে থাকে, ইয়ে শালা লোগ সাব মুক্তি হ্যায়, স্যার।

অফিসারটি সাথের লোকদের কী যেন বলে, হাবিল ঠিক বুঝতে পারে না। তবে অফিসার বের হয়ে গেলে ওকে সহ আরেও কয়েকজনকে ওরা বাইরে এনে ছেড়ে দেয়, সন্ধ্যার দিকে।

নাবিল হাঁটার শক্তি হারিয়েছে। হাঁটবে কী, সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারে না। বাইরের আলোতে ও ঠিকমতো চোখও মেলতে পারে না। লেংড়া লোকের মতো মাটিতে পা টেনে টেনে চলতে থাকে। আকাশে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। কাছেই একটা দোকানে আগুন জ¦লছে।

চারদিক কেমন যেন নীরব নীরব। না ঠিক নীরব নয়, মাঝে মাঝে দূরে কোথায় যেন গুড়–ম গুড়–ম শব্দ হয়। শব্দটা কিসের ও বোঝার চেষ্টা করে। নাবিল কোথায় আছে সেটা বুঝার চেষ্টা করে। কিন্তু আশ্চর্য, নাবিল কোনো কিছু মনে করতে পারে না। অতীতের কোনো স্মৃতিই যেন নেই ওর। ও এখানে এল কী করে, কোথায় যাবে কিছুই ভাবতে পারে না। হতভম্ব নাবিল জ¦লন্ত দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকে।

 

পর্ব ৫

১২ই নভেম্বর, ১৯৭১।

শ্যামল মাটি উদার আকাশ নির্মল বাতাস, সব ছেড়ে যেতে হবে…

অবশেষে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত পাকা হয়। অনেকদিন তো পার হলো। মিলিটারিরা হয়তো এখনও আসেনি গ্রামে। তবে আসবেই, যে কোনোদিন। বর্ষাটা যেতেই আর দেরি করে না বাড়ির মেয়েরা। শীতের শুরুতে সব বাধাঁছাদা করতে শুরু করে।

কালিপদ উঠানে বসে আছে উদাস হয়ে। বাড়ির মেয়েরা গত দুদিন ধরেই গোছগাছ করছে। এখনও তাদের গোছানো শেষ হয়নি। পুরনো একটা কৌটা হাতে নিয়ে বউ যমুনা এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। কালিপদ জিজ্ঞেস করে, কী গো, তোঙ্গ গোছানো এহনো শেষ অয় নাই? কী এতো নেও? জীবন নিয়ে টানাটানি লাগছে মানুষের! আর তোমার সারাবাড়ি বাঁধাছাধা শুরু করছ! এতো গাঁটরি বোঁচকা কার ঘাড়ে চাপাইবা! যাইতেদঅ অইব পায়ে হাঁইট্যাঅই।

কালিপদর কথার জবাব না দিয়েই যমুনা ফের ঘরে ঢোকে। ভেতর থেকেও মেয়েরা বা ছেলের বউরা কেউ কোনো জবাব দেয় না। তাদের মতো তারা গোছগাছ করছেই।

তা সাড়া না দিলেও বোঝে কালিপদ। সারাজীবনের সঞ্চয় হুট বলতেই কি বাঁধাছাদা হয়। না এক বোঁচকাতেই ধরে। বলতে কী তার নিজেরই বা কোন জিনিসটা ফেলে যেতে মন চাইছে! এই ভিটায় তাদের চার পুরুষের বসবাস। কত মায়া, কত স্মৃতি! ওই যে উঠানের কোণে কাঁচামিঠা আম গাছটা, তার মায়ের লাগানো। গাছটা তার বড় প্রিয়। মাকে চিতায় দাহ করে আসার পর থেকে গাছটার ছায়ায় বসলে যেন মায়ের ছোঁয়া পাওয়া যায়। মনে হয় যেন গাছটার ছায়ায় মায়ের ¯েœহ মাখামাখি হয়ে আছে। এই গাছটা কি তুলে নেওয়া সম্ভব? …এই গ্রাম, গ্রামের মানুষজন, আকাশ, নির্মল বাতাস, প্রতিবছর উঠানের ডালিম গাছে বাসা বাঁধা বুলবুলি জোড়া, কাকেই বা সঙ্গে নেওয়া যাবে। এই যে পায়ের কাছে বসে আছে কতদিনের পোষা কুকুরটা, সেওতো পড়ে থাকবে এখানেই। আর এমন আকাশ কি আছে কোথাও! এমন মাটি, মাটির এমন গন্ধ, তা-ই বা পাওয়া যাবে কোথায়!… ধন সম্পদই যদি শেষ কথা হতো জীবনের, তাহলে আর কথা ছিল কী! মেয়েদের কে এসব বুঝাবে।

এই যে ওরা যাচ্ছে, হয়তো জনমের তরেই যাচ্ছে। হয়তো আর ফিরে আসা হবে না এই শ্যামল মাটির দেশে। হয়তো আর কখনও নিশ্বাস নেওয়া হবে না এই কোমল বাতাসের। এ-তো আর দু’দিনের জন্য বেড়াতে যাওয়া নয়। শেকড়সুদ্ধ উপড়ে নিয়ে অজানায় ভেসে যাওয়া।

আশপাশের গ্রামের লোক সব বর্ষা শুরুর আগেই গ্রাম ছাড়তে শুরুছিল। এইতো সেদিন নীতিশ গেল। যাওয়ার সময় সে কী কান্না নীতিশের! তা ভিটামাটি ছেড়ে, দেশ ছেড়ে যেতে তো বুক ফাটে সকলেরই। কালিপদদের কজনের ভিটা গ্রামের একবারে শেষ মাথায়, মুসলমান পাড়া ঘেঁষে। সবাই ভেবেছিল, হয়তো পাকিস্তানিরা মুসলমানদের মারতে এতোদূর আসবে না। তারাও তো মুসলমান। এখন তো দেখা যাচ্ছে কিসের কী। ওই সব পিশাচদের কাছে মুসলিম হিন্দু, ছোট বড় সমান। ওরা নাকি মসজিদে ঢুকে সিজদারত মুসল্লিকেও গুলি করে মারে।

এর মধ্যেই কদিন আগে পাশের রামপুর গ্রামে মিলিটারি এল। সেখানে যে তা-ব চালিয়েছে তাও শুনেছে সবাই। পাশের গ্রামে যখন এসেছে, এই গ্রামে আসতেই বা কতক্ষণ! সে ভয়েই বাকি হিন্দুরা সবাই গ্রাম ছেড়ে যেতে উদগ্রীব। অনেকেই চলে গেছে এর মধ্যে। কেউ কেউ মাতৃভূমির মায়ায় ছিল মাটি কামড়ে। তারাও এখন যাওয়া শুরু করেছে। জীবন বাঁচলে তবে তো মাতৃভূমি!

বাড়িঘরে মূল্যবান জিনিসপত্র রেখে গিয়ে লাভ নেই। কোনোদিন যদি দেশে ফিরে আসা হয়ও, ওসব কি আর পাওয়া যাবে! যে যেভাবে পারবে লুট করে নিয়ে যাবে। আর দেশে আদৌ ফিরা যাবে কিনা কে জানে! তাহলেও, কালিপদ সিন্দুক খুলে খুঁজে খুঁজে ভিটা আর জমিজমার দলিল বের করে, খাজনার রশিদ বের করে। যদি কোন দিন ফিরে আসা হয় ভিটায়! তাহলে এসব কাজে লাগবে। পূর্বপুরুষের ভিটাটা মাটিটা অনন্ত দাবি করা যাবে।

কালিপদ অলস চোখে দূরের পানে তাকিয়ে আছে। তার মনে কত যে কিছু খেলা করছে। যে কোনোদিন তারাও যাত্রা করবে। যে কোনোদিন তারাও শরণার্থী হয়ে যাবে। কে জানে ভাগ্য তাদের কোথায় নিয়ে যায়!

 

পর্ব ৬

১৪ই নভেম্বর, ১৯৭১।

শালা মালাউন, শোয়ার কা বাচ্চা…

শীতকাল। রমজান মাস। এ বছর শীতটা পড়েছে জবর। দুপুর থেকেই  শীতে হাড়ে কেমন কাঁপন ধরে যায়। আর কুয়াশাটাও পড়ে চারদিক শাদা করে। তবে আজকে কী জানি কেন, কুয়াশা তেমন নেই। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয় হয়। ইফতারের সময় হয়ে এল প্রায়। গ্রামের সব লোকজনই তাই বলে কাজকাম রেখে বাড়িতে গিয়ে বসে আছে তা নয়। পেটে ক্ষুধা নিয়ে কাজ করতে তারা অভ্যস্ত। দুচার জন এখনও ক্ষেতে কী সড়কে।

ডিসট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা ধরে মার্চ করে মিলিটারিদের দলটা কদমতলি গ্রামের কাছাকাছি আসতেই বাইরে থাকা সবার মধ্যে প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দু’একজন যারা ছিল রাস্তার উপর, তারা প্রাণপণ দৌড়ে ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে নেমে যায়। ফজিলত বুড়ি সারাদিন চরে খাওয়া খাসি ছাগলটাকে নিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। সেও মিলিটারি দেখে ছাগলের রশি ছেড়ে সড়কের পাশের ডোবায় ঝাঁপ দিয়ে পড়ে। যারা ক্ষেতে কাজ করছিল তারাও কাজ ফেলে ঊর্ধ্বশ^াসে ক্ষেতের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে থাকে। সবার একটাই লক্ষ্য। যত দ্রুত সম্ভব দৌড়ে মিলিটারিদের চোখের সামনে থেকে সরে যাওয়া। আজরাইলের হাত থেকে হয়তো ছাড়া পাওয়া যেতে পারে, মিলিটারিদের হাত থেকে না।

সালামও অন্যদের মতো দৌড়ে গিয়ে একটা খড়ের গাদার নিচে শুয়ে ছিল। মিলিটারিরা একটু এগিয়ে গেলে ও গাদার নিচ থেকে মাথা বের করে। কই মিলিটারিরা তো কাউকেই গুলি করল না! তবে এই যে মানুষজন বলে, মিলিটারিদের সামনে কোনো বাঙালি পড়লেই হল, দেখা মাত্র গুলি করে। কই এই গ্রামের পাশ দিয়ে কত সুন্দরভাবে হেঁটে যাচ্ছে ওরা। মেরেছে কাউকে? মানুষ বোধহয় বেশি বেশিই বলে ওদের সম্পর্কে।

ওদের হাঁটাটা দেখতে ভালো লাগছে। কেমন এক সঙ্গে পা ফেলছে সবাই, একসাথে পা উঠাচ্ছে। কিন্তু যায় কোথায় ওরা! বোরখা পরা এক মহিলাও মিলিটারিদের সঙ্গে যাচ্ছে। যেতে যেতে তো ওরা গ্রামের শেষ মাথায় চলে যাচ্ছে। তবে কি ওরা পির বাড়ি যাচ্ছে? ওইদিকেতো পির বাড়িই। মিলিটারিরাও কি দোয়া নিতে যাচ্ছে? আহা, ওরাতো মুসলমান। পির দরবেশের প্রতি তো তাদেরও ভক্তি থাকা স্বাভাবিক। আর শামসুদ্দিন হুজুর যে সে পির তো নয়। সারাদেশের কে না জানে শামসুদ্দিন পিরের নাম! সারাক্ষণই বাড়িতে শত শত ভক্ত মুরিদ। কত দূর দেশ থেকে ভক্তরা দোয়া নিতে আসে। পিররা তিন ভাইই ভালো। শামসুদ্দিন, আলাউদ্দিন, নুরুদ্দিন। যেমন তাদের চরিত্র, তেমনই শিক্ষা, তেমনই আমল। বাড়িতে সারাক্ষণই কোরান পাঠ না হয় দরুদ শরিফ পাঠ নয়তো ধর্মীয় আলোচনা লেগেই আছে। আর প্রতি ওয়াক্তে নামাজ। পির বাড়িতে সব সময়ই যেন বেহেশতের পরিবেশ বিরাজ করছে। যত পাপীই হোক না কেন, পির বাড়িতে পা পড়লে বদলে যাবেই। কী যেন আছে ওই বাড়িটাতে! বাড়িতে পা দিলেই কেমন একটা মানসিক শান্তি পাওয়া যায়।

কিন্তু পিরবাড়ির লোকজনতো মিলিটারিদের পছন্দ করে না। না, প্রকাশ্যে তারা কিছু অবশ্য বলেনি কখনও। তবে সালাম বহুবার বড় পির সাহেবকে কান্নাকাটি করতে দেখেছে আল্লাহর দরবারে, যেন দেশের উপর থেকে গজব দূর হয়ে যায়। যেন নিরপরাধ মানুষ, মা বোনদের উপর পাকিস্তানিদের অত্যাচার বন্ধ হয়। পির বাড়ির এক ছেলে ঢাকায় বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ে। সে ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসে এখন মুক্তি বাহিনীর কমান্ডার হয়েছে। খুব বেশি লোক সেটা জানে না। তবে সালাম জানে। তাকে একবার যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বলেছিল হাসান ভাই। সেও বাপ চাচাদের মতোই সুন্দর স্বভাবের। সুন্দর দেখতেও। নম্রস্বরে কথা বলে। এতেঠ বড় বাড়ির ছেলে, বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ে। সে কি না সালামের মতো মূর্খ গরিব এক বর্গা চাষিকে বলে আপনি করে!

নাকি ওরা সুধীর সাধুর বাড়ি যাচ্ছে। পির বাড়ির পাশেইতো সাধুর বাড়ি। এই একটা ব্যাপার আছে এই গ্রামে। পির বাড়ি আর সাধুর বাড়ি পাশাপাশি। এক বাড়িতে সারাক্ষণই নামাজ কালাম হচ্ছে, আরেক বাড়িতে সময় সময় পূজার ঘণ্টা, শাঁখের শব্দ। আশ্চর্যের বিষয় হল, পির বাড়ির লোকজন যেমন সাধুকে খুব পছন্দ করেন তেমনি সাধুও পির বাড়ির লোকজনকে বেশ পছন্দ করেন। দু’বাড়ির লোকরা একে অন্যের বাড়িতে হামেশাই যাতায়াত করছে। মাঝে মাঝেই সুধীর সাধু আর বড় পির সাহেব মিলে ধর্ম নিয়ে কথা বলেন ঘণ্টার পর ঘন্টা। ভক্তরা কিন্তু দুবাড়ির মেলামেশা ভালো চোখে দেখে না। এ নিয়ে অনেকে বড় পির সাহেবের কাছে অনেকবার অভিযোগও করেছে।… আপনারা পির বাড়ির সম্মানিত মানুষ। আপনারা কেন একজন হিন্দু সাধুর বাড়িতে যাওয়া আসা করেন। তাকে নিজের বাড়িতে বসিয়ে কথা বলেন! সালাম নিজে দেখেছে, জবাবে বড় পির সাহেব মৃদু হেসে বলছেন, উনি আমাদের প্রতিবেশী। আমাদের ধর্মে প্রতিবেশিদের হকের কথা বলা আছে। বাড়িতে প্রতিবেশী আসলে তাকে সম্মান করতে হয়। আর সাধুর সাথেতো আমার ধর্ম নিয়েই কথা হয়। আমরাতো অন্য বিষয়ে কথা বলি না। তিনি আমার ধর্ম সম্পর্কে জানলেন, আমি তার ধর্ম সম্পর্কে জানলাম। খারাপ কী!  একটা বিষয়ে জ্ঞান আরো বাড়ল।

সালামের জানা আছে, মিলিটারিরা হিন্দুদের উপরই বেশি অত্যাচার করে। ওদের উপরই তো মিলিটারিদের রাগটা বেশি। বোধহয় মিলিটারিরা সুধিরের বাড়ির দিকেই যাচ্ছে।

আবার, সালামের হঠাৎ কেমন সন্দেহও হয়। আচ্ছা, মিলিটারিরা কি কোনোভাবে জেনে গেল, পির বাড়ির এক ছেলে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার? সামনের মেয়ে মানুষটা-ই-বা কে? মিলিটারিদের সঙ্গে তাল রেখে কোনো মেয়ে এক স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে। হঠাৎ সালামের মনে হয়, সামনের বোরখা পরা মেয়েমানুষটা বোধহয় নারী না। পুরুষ। আর তাছাড়া মিলিটারিরা সঙ্গে মেয়ে মানুষ নিয়েই-বা হাঁটবে কেন। এই এলাকার সবাই জানে রাজাকার সদস্য ইমান আলি বোরখা পরে মিলিটারিদের বাড়ি বাড়ি নিয়ে যায়। মিলিটারিদের সঙ্গে এমন সমানতালে হাঁটছে, এ নিশ্চয়ই কুখ্যাত ইমান আলিই। তাকে কেউ  দেখেনি তবে জানে, ইমান বোরখা পরে মিলিটারিদের সাহায্য করে। হারামির বাচ্চা, নামে ইমান আলি। আসলে বেইমান। মিরজাফর। সালাম উৎকণ্ঠিত হয়। যদি সত্যিই ইমান আলি হয় তাহলে সর্বনাশ! ইমান হয়তো পির বাড়িতেই নিয়ে যাচ্ছে মিলিটারিদের।

মিলিটারিরা অনেকখানি এগিয়ে গেছে। প্রায় পির বাড়ির কাছাকাছি। এদিকে মাগরিবের আজানের সময় হয়ে এল। আজান হলেই তো রোজা ভাঙতে হবে। একটুক্ষণ ভেবেই দৌড় শুরু করে সালাম। আজ না হয় পরেই রোজা ভাঙ্গল। যে করেই হোক, মিলিটারিদের আগে পির বাড়ি পৌঁছতে হবে। পিরবাড়ির লোকদের, ভক্তদের খবরটা দেওয়া দরকার। বাড়িঘরের ভেতর দিয়ে সালাম ঊর্ধ্বশ^াসে দৌড়াতে থাকে। পির বাড়ির কাছাকাছি যেতেই দেখে মিলিটারিরাও সড়ক ছেড়ে বাড়িতে ঢুকছে।

এখন বাড়ি ঢুকলে মিলিটারিদের চোখে পড়ার সম্ভাবনা আছে। সালাম আড়াল থেকে একবার পির বাড়ির অবস্থাটা দেখে নেয়। খোলা বারান্দায় ভক্তদের সঙ্গে বড় পির সাহেব বসে আছেন। তাঁর সামনে ইফতার সাজানো। উনি গ্লাসে পানি ঢালছেন। ভক্তরা কেউ তাকে সাহায্য করছে না। তারা পীরের স্বভাব জানে। উনি নিজের কাজ নিজের হাতেই করেন। বলেন, এটাই আমাদের নবির সুন্নত। নবিজি নিজের সব কাজ নিজেই করতেন। পরিবারের সদস্যদের কাজেও সাহায্য করতেন।…আহা, মানুষটা জানে মেলা। ধর্ম, ইতিহাস, বিজ্ঞান, ভাষা-কত কিছু। আর মুখে যেন জাদু। যে কথাই বলেন, শুনতেই ইচ্ছা করে। মেঝজন একটু তফাতে। বসেছেন একাই। সামনে থালা। গ্লাসে পানি। পষ্ট না দেখলেও  সালাম জানে, থালায় দুধভাত আছে। ওই বাড়িতে তো কম যাতায়াত না। মেঝ পীরের অভ্যাস তিন বেলাই দুধ ভাত খাওয়া। এখন রোজার মাস চলছে। তা বলে  দুধ ভাত খাওয়া বন্ধ না। ইফতার সেহেরিতে খান। ছোটজন উঠানে ঘটিতে পানি নিয়ে ওজু করছেন।…সব ভাইয়ের অভ্যাস নিজের কাজ নিজ হাতেই করা। তাই এতো ভক্ত চারপাশে, কিন্তু কেউ উঠে তিন ভায়ের কাউকেই সাহায্য করছে না। সকলেই জানে, সাহায্য করতে গেলে পিরভাইরা নারাজ হন। বড় পিরের দুবছরের নাতি তালহা উঠানে একটা মোরগের পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছে। বড় সুন্দর ছেলে তালহা। এতো নিষ্পাপ চেহারা, দেখতে যেন একটা ফেরেশতা।

মিলিটারিরা বাড়ি ঢুকে উঠানে দাঁড়ায়, দেখে ভক্তদের গুঞ্জন থেমে যায়। উঠানজুড়ে কেমন একটা নীরবতা বিরাজ করে। তখনই মাগরিবের আজান হয়। বড়পির সাহেব মিলিটারিদের দেখে সম্মানর্থে দাঁড়িয়ে উর্দুতে বলেন, আইয়ে জনাব, হামারে সাথ ইফতার মে শরিক হো জায়ে।

জবাবে মিলিটারিদের একজন, শালা মালাউন, শোয়ার কা বাচ্চা, বলে ঠিক মাথা বরাবর গুলি করে। বড় পির সাহেব সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। গ্লাসের পানিতে মেঝে ভেসে যায়। পানির সঙ্গে মিশে যায় পির সাহেবের রক্ত। তখনও মাগরিবের আজান শেষ হয়নি। ভক্তরা সবাই অবিশ্বাস্য চোখে মিলিটারিদের দিখে তাকিয়ে থাকে।

মিলিটারিরা না মুসলমান! তারা কী করে পবিত্র রমজান মাসে ইফতারের সময় একজন নিরপরাধ পরহেজগার মানুষকে এভাবে গুলি করে মারতে পারল!

না ভক্তদের আরও দেখার বাকি ছিল। মিলিটারিরা এবার মেঝ পিরের মাথা লক্ষ্য করে গুলি করে। তিনিও মাটিতে পড়ে যান। পরক্ষণেই মিলটারিরা ছোটজনকেও গুলি করে। ওজুর ঘটি হাত থেকে পড়ে উঠানে গড়াতে থাকে। ছোটজন পড়ে থাকেন মাটিতে। ওজুর ঘটিটা তালহা তুলে দাদার জন্য নিয়ে আসছিল। মিলিটারিরা তাকেও গুলি করে। কচি শিশুটা একবার মাত্র হেঁচকি তুলে ধপাস করে পড়ে যায় মাটিতে। সালাম গাছের আড়ালে লুকিয়ে অবিশ^াস্য চোখে সব দেখ। এতো কম সময়ে মিলিটারিরা এতোগুলো লোক মেরে ফেলল! তাও পিরবাড়ির পিরদেরকে!

ভক্তরা যেন পাথর হয়ে গেছে। কেউ একটুুও নড়ছে না। একটুক্ষণ অপেক্ষা করে মিলিটারিদের দুজন ভক্তদের লক্ষ্য করে অবিরত গুলি করে। সালাম আন্দাজ করে অস্ত্রটা মেশিনগান বোধহয়। আজকাল সবাই  অস্ত্রের নাম জানে, অস্ত্র চেনে। কদিন আগেও মানুষ ভাবতে কি পেরেছিল, এতো অস্ত্র তারা চোখে দেখবে!… কতজন যে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তা ঠিক আন্দাজ করতে পারে না সালাম। ওর মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। সেটা কি ক্ষুধায় না অন্য কারণে বুঝতে পারে না। ও গাছের গোড়ায় বসে পড়ে।

হায় আল্লা, মানুষ মানুষকে এভাবে মারতে পারে! কোনো অপরাধ ছাড়াই! সালামের মনে হয়, একটু আগেই ও  ভেবেছিল মিলিটারিরা অকারণে মানুষ মারে না। কিন্তু আজ চোখের সামনে ও কী দেখল! সালামের মনে হয় ও যুদ্ধে না গিয়ে বড় ভুল করেছে। ওর মনে হয় আজ যদি ওর হাতেও একটা মেশিনগান থাকত। তাহলে ওদের একজনকেও বেঁচে ফিরতে দিত না। এর জন্য যদি নিজেও মারা যেত, তো সে মৃত্যুকে ও হাসি মুখেই মেনে নিত। সালাম অবিশ^াস্য চোখে দেখে, মিলিটারিরা যেমন তাল মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসেছিল, তেমনই হাঁটতে হাঁটতে সাধুর বাড়ির দিকে যায়। কী নির্বিকার ওরা! ওদের দেখে এখন কে বলবে, ওরা এই মাত্রই এতোগুলো নিরীহ মানুষকে বিনাদোষে হত্যা করেছে।

সালাম মিলিটারিদের চোখ বাঁচিয়ে তাদের পেছনে পেছনে যায়। রোজা ভেঙে ইফতার করার কথা তার মনেই থাকে না। তার মনে আফসোস, একটু আগে গেলে হয়তো সাধুর বাড়ির লোকজনকে সতর্ক করা যেত।

সুধীর আসলে সাধু নন। কিন্তু গ্রামের সবাই ভালোবেসে সুধীরকে সাধু বলেই ডাকে। স্বভাবে নরম গোছের আর বড্ড ভাল মানুষ সুধীর। প্রতিবেশীদের বিপদেআপদে সবার আগে থাকেন। তার কাছে হিন্দু মুসলামান বাছ বিচার নেই।

সাধুর বাড়ি গ্রামের একটেরে। চিৎকার আর হৈচৈ শুনেই সুধীর বুঝেছেন, গ্রামে মিলিটারি ঢুকেছে। মিলিটারিরা বাড়ি আসার আগেই সুধীর স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে, টাকা পয়সা গয়নাগাটি আর মূল্যবান কয়েকটা জিনিস পোটলা বেঁধে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন। মেয়ে আর স্ত্রীকে বাড়ির বাইরে রেখে কী মনে করে আবার বাড়িতে ঢুকতে গেলে, বউ অনুরাধা বাঁধা দেন।

তুমি আবার বাড়ির ভিত্রে ঢুকো কিয়ারে? কোনকিছু যুদি থাকেতো থাউক।

না, হাতে কইরা যা নেওয়ার নিছি। বাড়ি ছাইড়া যাইতাছি, যা নিতে পারলাম না, কোনোদিন ফিরা আইলে সেই সব কিছু আর ফিরা পামু কিনা কে জানে! তোমারা আগোও, আমি ঠাকুরের পায়ে পূজাটা দিয়া আইতাছি। মিলিটারিরা যদি আইয়্যেঅ, পূজা করছি দেইখ্যা নিশ্চই মারত না। ধর্মদঅ তাগঅ আছে।

সুধীর সাধু গিয়ে বসেন পূজার ঘরে। পূজার ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই মিলিটারিরা মার্চ করে তাঁর বাড়িতে  ঢোকে। ঢুকেই শুরু করে ভাঙচুর। বাঁশের বেড়া আর দরজা জানালায় হাতের লাঠি দিয়ে আঘাত করতে করতে পূজার ঘরে ঢুকে। যে সব প্রতীমা ছিল সব লাঠি দিয়ে, বুটের আঘাতে, বন্দুকের বাট দিয়ে টুকরা টুকরা করে। সুধীরকে টেনে হিঁচরে পূজার ঘর থেকে বের করে আনে। সাধুর স্ত্রী আর মেয়ে যায়নি। দাঁড়িয়েছিল তার জন্য। মিলিটারিদের দেখে দুজনে প্রাণ ভয়ে গিয়ে লুকিয়েছে বাড়ির নামায় মোর্তার বনে। পাতার ফাঁক-ফোঁকল দিয়ে তারা দেখে, মিলিটারিরা মারতে মারতে সুধীরকে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে।

মেয়ে কণিকা বাবার উপর অত্যাচার হচ্ছে দেখে চিৎকার করে উঠে। চিৎকারের শব্দ শুনে মিলিটারিরা ওদের অবস্থান জেনে ফেলে। বোরখা পরা ব্যক্তি ওদের টানতে টানতে মোর্তার জঙ্গল থেকে বের করে আনে।

সালাম দেখে, সাধুর স্ত্রী আর মেয়েকে দেখে মিলিটারিরা বাড়ি কাঁপিয়ে হেসে উঠে। তার পর যা হয়, দেখে সালাম শিউরে উঠে। মিলিটারিরা মা মেয়েকে নিয়ে শুরু করে কাড়াকাড়ি। টেনে ওদের গায়ের কাপড় ছিঁঁড়ে ফেলে উঠানে শুইয়ে একসাথে মা আর মেয়ের উপর শুরু করে অত্যাচার। সাধুর চোখের সামনেই এসব ঘটে। সাধু বাঁধা দিতে গেলে একজন তাকে গুলি করে। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সাধু এক সময় নিথর হয়ে পড়ে। সালাম আর দেখতে পারে না। ও সরে আসে।

 

২০শে নভেম্বর, ১৯৭১।

এতেঠ যে ত্যাগ, এতেঠ যে চোখের জল…

ফজিলত আজ অন্যদিনের চেয়ে ভোরে উঠে। ফজরের আজানেরও আগে। বাইরে প্রচ- শীত। চারপাশ কুয়াশায় শাদা। দু’হাত দূরের কিছুও দেখা যায় না। মসজিদে আযান হলে ফজিলত অজু করতে বসে। গতকাল সন্ধ্যায়ই ঘরের দাওয়ায় একঘটি পানি এনে রাখা আছে। তাই দিয়েই অজু করে ফজিলত। কী কনকনে ঠান্ডা পানি! হাড়ে পর্যন্ত কাঁপন ধরে যায় ফজিলতের। তাড়াতাড়ি অজু সেরে ঘরে এসে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়তে বসে। নামাজ শেষে দীর্ঘক্ষণ মোনাজাত করে। বুকের ব্যথা চোখের পানি হয়ে বের হয়ে আসে ফজিলতের। মনির মারা গেছে আজ কত মাস হয়ে গেল! সন্তান বলতে, অবলম্বন বলতে ছিল ওই একজনই। খুব ছোটবেলায় কলেরায় মনিরের বাপ মারা গেলে অনেক কষ্টে মানুষ হয়েছিল। কিন্তু কে জানত সেও মাকে ছেড়ে চলে যাবে। আরেক মাকে রক্ষা করতে গিয়েই জীবন দিল মনির। যুদ্ধে যাওয়ার আগে নিজেই বলেছিল ছেলেটা, মা, আমি জানি না তোমাকে কার কাছে রেখে গেলাম। তবে মা, আমি যাচ্ছি আরেক মাকে রক্ষা করতে। দেশ, মায়ের চেয়ে কম বড় নয়। তুমি আমাকে দোয়া কর মা, আমি যেন আমার জীবন দিয়ে হলেও দেশকে স্বাধীন করে যেতে পারি। কোন কুক্ষণে যে ফজিলতের মুখ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল, যা বাপ, তোকে দেশের জন্য কুরবানি করে দিলাম। কে জানত, আল্লাহ ফজিলতের এই দোয়াটা কবুল করে নিবে!

জায়নামাজ ছেড়ে ফজিলতের উঠতে ইচ্ছা করে না। তবু তো উঠতে হবে। আজ ঈদ। একমাস রোজা পালন শেষে আজ ঈদ। মনের দুঃখকে চেপে রেখে গ্রামের সবার সঙ্গে খুশিতে শামিল হতে হবে। অবশ্য গ্রামের মানুষ যে খুব একটা খুশিতে আছে তা বলা যাবে না। পুরো গ্রামেই কেমন একটা শোকের ছায়া। কারও বাড়িতেই বোধহয় তেমন আনন্দ নেই। কদিন আগে  মিলিটারি পশুরা পির বাড়িতে, সাধুর বাড়িতে কী তা-ব করে গেল!

আহা, পির বাড়ির লোকজন কী ভালোমানুষ গো। গ্রামের সবার খোঁজখবর নিতেন পিররা তিনভাই। এই ফজিলতকে কত সাহায্য করেছেন তারা। মনিরের বাপ মারা যাওয়ার পর থেকেই তো বলতে গেলে উনারা সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। তা শুধু ফজিলতের কেন, গ্রামের সবারই খোঁজখবর রাখতেন উনারা। সকলকেই কিছু না কিছু সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। অমন ভালো মানুষগুলোকে এভাবে মরতে হল! মিলিটারিরা নাকি মুসলমান! কোনো মুসলমান এভাবে বিনাদোষে মানুষ হত্যা করতে পারে! তাও রমজান মাসে!

ফজিলত জায়নামাজ ছেড়ে বাইরে আসে। চারপাশ এখন একটু ফর্শা হয়েছে। আরেকটু পরেই লোকজন ঈদগাহের দিকে যাবে। মনির বেঁচে থাকলে, ফজিলতের কাছে থাকলে সেও এখন সেজেগুজে মাকে সালাম করে, বের হতো ঈদের নামাজ পড়তে।  আজকের দিন কেমন কাটবে মুক্তিযোদ্ধাদের? আজকেও কি তারা যুদ্ধ করবে? মিলিটারিরা কি আজকেও মানুষ মারবে?

ঈদের দিন বলে কথা! বছরের একটা দিন। কিছু আয়োজন তো করা লাগেই। না, ফজিলত একা মানুষ, একমুঠ চাল জ¦াল দিলেই চলে যায় সারাদিন। নিজের জন্য বিশেষ কোন আয়োজন করার ইচ্ছে নেই। মনিরের খবর দিতে যে দুজন ছেলে এসেছিল, তারা বলেছিল ঈদের দিন এসে ফজিলতের হাতের সেমাই খেয়ে যাবে। ছেলে দুটোর কথা ভেবেই ফজিলত বহু কষ্টে কিছু আয়োজন করেছে। সেমাই কিনেছে একপদের। হাতে গড়েছে এক পদের। পায়েসের দুধ জোগাড় করেছে। কেজিখানেক পোলাওয়ের চালও কিনেছে। ঘরের রাতা মেরাগটা জবাই করে রান্না করে দিবে পোলাওয়ের সঙ্গে। আহা, ছেলেগুলো নিজে থেকে তার বাড়িতে ঈদে খেতে চেয়েছে, এইটুকু আয়োজন না করলে হয়। ওরাও তো কোনো না কোনো মায়ের বুক খালি করে বের হয়েছে।

ওরা বলেছিল সকালে এসে সারাদিন থাকবে। সকাল তো হয়েই এল! এবার রান্নার আয়োজন করা লাগে। একা হাতে ফজিলতকেই সব করতে হবে। সময় লাগবে। কত আশা ছিল মনিরকে বিয়ে করিয়ে একটা শান্ত বউ আনবে বাড়িতে। সে সারাবাড়িতে হাঁটবে, চলবে, হাসবে, কথা কইবে তার সঙ্গে! মাঝে মাঝে ফজিলতকে ঘরের কাজে সাহায্য করবে। মেয়ে দেখে পছন্দও করে রেখেছিল ফজিলত। তা মনির যুদ্ধে গেছে জানতে পেরে, মেয়ের বাপ আর মনিরের জন্য অপেক্ষা করতে চাইল না। তড়িঘড়ি করে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিল। না, তাকে দোষ দেওয়া যায় না। দেশের এই অবস্থায় কোন বাপই বা ডাগর মেয়েকে বাড়িতে রাখার সাহস রাখে। মিলিটারি বা রাজাকার বাহিনীর কারও চোখে পড়লে সে মেয়ের ভাগ্যে কী ঘটে তাতো সবাই জানে। তা বিয়ে হলেই যে পুরোপুরি রক্ষা পেয়ে যায় তাও না। স্বামীর বাড়িতে গেলেই যে বয়সি মেয়েরা সবাই নিরাপদ এমনও নয়। পশুগুলোর কাছে বিবাহিত আর অবিবাহিত বলে কোনো বাছবিচার নেই। তবে হয়তো মেয়ে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি চলে গেলে বাপের দায় কিছুটা হলেও কমে। মেয়ে নিয়ে যে দুশ্চিন্তা তা কিছুটা হলেও ভাগ হয় মেয়ের শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে।

হাতে বানানো সেঁওইটা রেঁধে, পায়েস বসায় ফজিলত। চাউলটা ভালোমতো ফুটতে শুরু করলে চিনি আর দুধ দিয়ে জ¦াল কমিয়ে দেয়। ছোট রান্না ঘরটায় ধোঁয়া আটকে আছে, তাতে চোখ একটু  জ্বালা করছে ফজিলতের। দুধটা উথলে উঠলে জ¦াল আরও কমিয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। ধোঁয়া থেকে বের হলেও চোখ পানিতে ভরে ওঠে ফজিলতের । আহারে ছেলেটা বাসি পায়েস কী যে পছন্দ করত। সে চোখের মণি আজ কোথায় হারিয়ে গেল। না জানি দেশজুড়ে এমন কত শত মায়ের বুক খালি হয়েছে! না জানি দেশ জুড়ে কত শত নিরীহ মানুষ মিলিটারিদের হাতে প্রাণ দিয়েছে। না জানি কত শত নারী তাদের ইজ্জত হারিয়েছে! না জানি কত শত লোক তাদের সম্পদ খুয়েছে, বাড়িছাড়া হয়েছে! এতেঠ যে ত্যাগ, এতো যে চোখের জল, এসবের বিনিময়ে আসবে তো স্বাধীনতা?

আকাশটা কেমন মেঘলা আজ। বৃষ্টি হবে নাকি কে জানে! পৌষ মাসে তো এমন মেঘ থাকার কথা না আকাশে। বৃষ্টি হলে আজকে বড় কষ্ট হবে সবার। ঈদের দিন, তায় এমন হাড় কাঁপানো শীত। এর মধ্যে আশ্রয়হীন পোশাকহীন মুক্তিযোদ্ধদের কষ্টটাই বেশি হবে। কী জানি কেন, মনির মারা যাওয়ার পর থেকে অদেখা অচেনা সব মুক্তি যোদ্ধাদের কথা ভেবে উৎকণ্ঠিত হয় ফজিলতের মন। মনে হয়, তারা সবাই এখন তার ছেলে।

কই দুপুরতো হয়ে এল। ছেলে দুটোতো এখনো আসল না! ওরা তো বলেছিল, সকালেই আসবে। এসে ফজিলতের হাতে সেমাই পায়েস খাবে। ওরা কি ভুলে গেল? ফজিলত বাড়ির সীমানায় গিয়ে দেখে কাউকে দেখা যায় কিনা। নাহ্, কেউতো আসছে না এদিকে। ওরাতো নিজে থেকেই এসে বলে গিয়েছিল, ঈদের দিন সকালের দিকেই চলে আসবে।… আবার কোন বিপদআপদ হল না তো ওদের? ভেবে ফজিলত উদ্বিগ্ন হয়। ওরাও কি মনিরের মতো… না, এমনটা ভাবতে পারে না ফজিলত। খোদা, ছেলেগুলো যেন বেঁচে থাকে।

হয়তো ওরা দেরি করে আসবে। হয়তো দুপুরেই এল। ভেবে, ফজিলত মাংস পোলাও রান্নার আয়োজন শুরু করে।

সব রান্না শেষ করে অপেক্ষা করতে থাকে ফজিলত। হয়তো ওরা এসে যাবে যে কোন সময়।

 

২২শে নভেম্বর, ১৯৭১ ।

মাথায় কারো বোঁচকা, কাঁধে কারো গাঁটরি, নারীদের কোলে সন্তান…

শেষরাতের দিকে ওরা রওয়ানা হয়। তখনও গ্রামখানি ঘুমন্ত। তখনো গ্রামের চারপাশ কুয়াশায় আচ্ছন্ন। তখনো পাখপাখালি উঠেনি জেগে। কিন্তু এ সময়টাই ওরা বেছে নেয়। রওয়ানা হওয়া যেত দিনের আলোতেও। কিন্তু শান্তি কমিটির লোকেরা কী রাজাকার বাহিনীর লোকেরা সব সময় নজরে রাখে কে কখন গ্রাম ছাড়ে। তারা গিয়ে মিলিটারি ক্যাম্পে খবর দেয়। মিলিটারিরা তাদেরই ডরে পালিয়ে যাওয়া ভয়ার্ত মানুষদের ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। নানান রকম নির্যাতন করে সে সব লোকদের মেরে ফেলে। মেয়েদের ক্যাম্পে আটকে রাখে। এসব ভেবেই ওরা রাত থাকতে থাকতে রওয়ানা হয়। তিন ভিটার একত্রিশজন মানুষ। ওদের সঙ্গে আছে রাবেয়া আর তার মেয়ে টুনি। সব মিলে তেত্রিশজন মানুষ ওরা।

রাবেয়া এ গ্রামের মেয়ে হলেও বিয়ে হয়ে চলে গেছে রামপুর গ্রামে। সেখানে মিলিটারিরা তার স্বামী আর শ^শুর শাশুড়িকে ঘরের ভেতরে আটকে পুড়িয়ে মেরেছে। রাবেয়া তখন মেয়েকে গোসল করাতে নিয়ে গিয়েছিল ঘাটে। ফিরে দেখে তার সংসার, ঘর বাড়ি, স্বামী, শ^শুর শাশুড়ি সব জ¦লছে দাউ দাউ করে। তখনও পশুরা যায়নি গ্রাম ছেড়ে। তখনো তাদের পৈশাচিক উল্লাস চলছে গ্রামে। রাবেয়া মেয়েকে নিয়ে জল্লাদদের চোখ বাঁচিয়ে চলে এসেছে বাপের বাড়িতে। তার বাবা মা বেঁচে নেই। দু ভাই থাকে কুমিল্লা শহরে, সেখানে তারা রিক্সা চালায়। কালিপদরা যখন রওয়ানা হবে তখন রাবেয়া এসে ধরল, তাকেও সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

পুরুষ মহিলা বাচ্চা বুড়ো সব কিসিমের লোকই চলছে। কারো মাথায় বোঁচকা, কাঁধে কারো গাঁটরি। নারীদের কোলে শিশু। ওদের সঙ্গে একটা গাভীন ছাগলও আছে। ছোট টুনি অসুস্থ, কোলে তার পোষা বিড়ালটা। টুনি বিড়ালটা বাড়ি থেকেই কোলে করে নিয়ে এসেছে। সে বিড়াল ছাড়া যাবেই না। এর জন্য সে মারও খেয়েছে তার মায়ের কাছ থেকে। তা হলেও বিড়াল কোল ছাড়া করেনি।

জাড়টা পড়েছে জবর। মাঝে মাঝে কুয়াশায় চারপাশ শাদা হয়ে যাচ্ছে। তখন দু’হাত দূরের কিছুও ঠাওর হয় না। সবাই তাই ধীরে ধীরে হাঁটে। যেতে যেতে সবাই পেছনে ফিরে ফিরে চায়। খানিক পথ গেলে কুয়াশার কারণে পিছনে কিছু দেখা যায় না। নিজেদের ঘরবাড়ি অনেক আগেই দৃষ্টিসীমার বাইরে ফেলে এসেছে, তাহলেও কেউ কেউ সজল চোখে হাঁটতে হাঁটতে পেছনে ফিরে ফিরে দেখছিল। মাতৃভূমির একটা পিছুটানতো থাকেই।

মিলিটারিদের চোখে পড়ার সম্ভাবনা আছে বলে ওরা ডিসট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা ছেড়ে গম ক্ষেতের আল ধরে হাঁটে। কখনও হাঁটে খালের পাড়ঘেঁষে। খালের পাড় ধরে হাঁটতে বেশ কষ্টই হয় ওদের। কচুরিপানার স্তূপ শুকিয়ে রাস্তা হয়েছে। সাবধানে পা ফেলতে হয়। এখানে ওখানে সাপের খোলস। ভাঙা শামুক আর কাঁকড়ার দাড়া। অনেকেরই পা কেটেছে এর মধ্যে। না চাইলেও, হাঁটা ছাড়া গতি নেই। এদিকের খালে পানি অল্প। নৌকা চলাচল করতে পারবে না। তার উপর খালের পানিতে কচুরিপানা ঠাসা। অমন অল্প পানিতে কচুরিপানা সরিয়ে গুন টানাও অসম্ভব। বাধ্য হয়েই হাঁটে সবাই। প্রাণের দায়েই হাঁটে।

যমুনার ছাগলটার অবস্থা সুবিধার না। অতটা পথ হেঁটে বোবা জীবটা এখন আর চলতে পারছে না।…কালিপদ বউকে ধমক লাগায়। কোন আক্কেলে তুমি ছাগলটা নিয়ে এলে। এতো করে বললাম, যা দাম পাওয়া যায় তাতেই ছেড়ে দাও ছাগলটা। তা না। সঙ্গে করে নিয়ে এলে। এই শীতের মধ্যে কচুরিপানার রাস্তায় মানুষই ঠিকমতো চলতে পারে না আবার ছাগল। দাও, ছাগলটার গলার রশি ছেড়ে দাও। ধারেকাছে গ্রাম থাকলে সেখানে গিয়ে উঠবে।

এই অচেনা জায়গায় কোথায় যাবে অবলা জীবটা। চারপাশে তো কোন গ্রাম চোখে পড়ে না। জন্মের পর থেকে সঙ্গে আছে, ছেড়ে আসা যায়? চিন্তা করবেন না তো, আরেকটু গেলেই তো উঁচু জায়গা। সেখানে একটু জিরালেই ঠিক হবে যাবে।

প্রায় দুপুর পর্যন্ত হাঁটে ওরা। দুপুর হলেও সূর্য নেই আকাশে। কুয়াশা আছে এখনও, তবে আগের চেয়ে হালকা হয়েছে। আকাশেও হালকা মেঘ জমেছে। পৌষ মাসে এমন আকাশ ওরা কমই দেখেছে জীবনে। না, জীবনে তো মানুষ নতুন কিছু দেখেই। এই যে তাদের জীবনটা, এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। নিজের দেশ, নিজের গ্রাম, বাপ দাদার ভিটাÑ সব ছেড়ে যেতে হচ্ছে কোনো অজানার উদ্দেশে। তাদের শান্ত সুখী জীবন আকাশ আচমকা এমন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যাবে, এমন অনিশ্চিত হয়ে যাবে, কেউ ভাবতে পেরেছিল!

সবাই উট্টুু পা চালাইয়্যা হাঁটো। কালিপদ সবাইকে তাড়া দেয়। এইভাবে হাঁটলেদঅ পথেঅই রাইত অইয়া যাইব!

কাকাগো, পা যে আর চলে না। কৃষ্ণা কাতর কণ্ঠে বলে। সূর্য উঠার আগেত্তেঅইদঅ হাঁটতাছি।

কষ্টদঅ সবারঅই অইতাছেরে মা। কিন্তু উপায় নেই, চলতে যে অইবঅই। কষ্ট অইলেও হাঁট্ আরেকটু। ওই সামনেঅই দেখা যায় রাস্তা। হেন উট্টু থাইম্যা আমরা জিরামু। সুযোগ হইলে রান্না কইরা খামু।

সবার শেষে ধীর পায়ে হাঁটছে মরিয়ম। ভারি পেট নিয়ে হাঁটতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে। একটু হাঁটলেই হাঁপ ধরে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে থেমে বড় বড় শ^াস নিতে হচ্ছে। এক এক পা ফেলছে আর মনে হচ্ছে যেন এখনই মুখ থুবড়ে পড়বে। মাঝরাত থেকে তো হাঁটছেই। পা যেন আর চলতে চায় না। তাও যদি পথটা সুগম হতো। এর মধ্যে পা শামুকে কেটেছে দুবার। তার উপর কনকনে শীত। খোলা জায়গা বলে শীতটা যেন বেশিই লাগছে। আগে যদি জানা থাকত এমন পথে হাঁটতে হবে, তাহলে মরিয়ম কিছুতেই বাড়ি থেকে বের হত না। এখন মনে হচ্ছে, বাড়িতে থেকে মিলিটারিদের হাতে মরত সেও ভালো ছিল। আসলে বাড়িতে থাকতই, যদি বাপ মা নিরুদ্দেশ না হতো। ওরা যে কোথায় গেছে, মরে গেছে না বেঁচে আছে তাও গ্রামের কেউ বলতে পারেনি।

প্রায় আড়াই মাস পরে বাড়ি ফিরে মরিয়ম দেখে পুরো বাড়ি খাঁ খাঁ করছে। শাশুড়িতো তার সামনেই মারা গেল। দেবরকে নিয়ে গেল ধরে। কী জানি সে বেঁচে আছে কি না! বেঁচে না থাকারই সম্ভাবনা বেশি। বেঁচে থাকলে এতেঠদিনে বাড়ি তো ফিরত নিশ্চয়ই।

মরিয়ম বাড়ি এসে যখন শুনল হাবিল বেঁচে আছে এবং যুদ্ধে গেছে, কী যে ভালো লেগেছে! বেঁচে আছে, তার চেয়েও বড় কথা হাবিল দেশের জন্য যুদ্ধে গেছে। ভেবে তার খুব ভাল লাগছিল। গর্ব হচ্ছিল। যদিও তার মনে ঠিকই ছিল, হাবিল হয়তো বেঁচে ফিরে নাও আসতে পারে। কিন্তু তা ভেবে তার কেন জানি কোন রকম দুঃখ জাগেনি মনে। দেশের জন্য মৃত্যু গৌরবের মৃত্যু। হাবিল তো তাদের কাছে মৃতই ছিল। যদিও সেদিনের খবরে মনে কিছুটা সংশয় ছিল ঠিকই। কিন্ত মরিয়ম আসার পথে নিজের চোখে যে নৃশংসতা দেখেছে তাতে হাবিলের মৃত্যুটা তার মন ঠিকই মেনে নিয়েছিল।

বাড়িতে কেউ ছিল না। খালি বাড়িতে কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছিল মরিয়মের। তার সঙ্গে যে রাতে থাকবে এমন কেউও নেই। প্রাণভয়ে গ্রামের সবাই পালাচ্ছে। মরিয়ম একা একা কী করে? বাবামা বা চাচারা গ্রামে থাকলে তাদের কাছে যেতে পারত। সে পথও খোলা নেই। সবাই গ্রাম ছাড়া। ভাইবোনও নেই যে, তার কাছে গিয়ে আশ্রয় নিবে। নিকট আত্মীয় বলতে এক খালা। বর্ষার শুরুতে মরিয়ম পাশের গ্রামে খালার বাড়িতে চলে গেল। গিয়ে দেখে খালারা কেউ বাড়িতে নেই। তারাও ইন্ডিয়ার দিকে চলে গেছে। খালার ননদের বিয়ে হয়েছে একই গ্রামে। তাকেও খালা বলেই ডাকে মরিয়ম। তাদের বাড়িতে রইল কিছুদিন। খালার ননদ শত হলেও পর মানুষ, তার বাড়িতে আর কতদিন থাকা যায়। একজন মানুষের খাওয়ার খরচওতো কম না! তার উপর মরিয়মের পেটে সন্তান, তার জন্য ভালোটা মন্দটা খেতে হয়। সে সবের জোগান কে দেয়? দিন পনেরো থেকে সেখান থেকে চলে এল।

ফিরে এল গ্রামে। বর্ষাটা কাটল কোনোমতে। মরিয়ম আশায় আশায় রইল কদিন। যদি হাবিল বা নাবিল আসে বাড়িতে। না, কেউই আসে না। নাবিল হয়তো বেঁচে নেই, হাবিল হয়তো কোথাও যুদ্ধ করছে। হাতে কোন টাকা পয়সা নেই। বাজার সদাই করে কীভাবে? কাকে দিয়েই বা করায়? গ্রাম প্রায় পুরুষ শূন্য। তা প্রতিবেশীরা মাঝেমধ্যে খাবার দিত একবেলা দুবেলা। কিন্তু তাতে কী আর দিন চলে! একা হলে না হয় মাটি কামড়ে পড়ে থাকত বাড়িতেই। পেটে সন্তানও যে বড় হচ্ছে। তার জন্য তো বাড়তি খাবার লাগে।

শীতের শুরুতে শোনা গেল মিলিটারিরা এদিকে তাদের ক্যাম্প করেছে। যে-কোনো দিন গ্রামে হামলা করতে পারে। আশপাশের গ্রামগুলোতে এর মধ্যেই তারা আক্রমণ করেছে। তাদের নানান অত্যাচারের কথা কানে আসে। তারা নাকি গর্ভবতী নারীদের পেট চিরে সন্তানকেও মেরে ফেলে। ভয়ে ভয়ে দিন যেন কাটতে চায় না মরিয়মের। তাই কালিপদ কাকা যখন বলল, তারা বর্ডার পার হয়ে ইন্ডিয়া যাচ্ছে মরিয়ম তাদের সঙ্গে যাবে কি না, তখন মরিয়ম মনস্থির করে, সেও যাবে। তার অনাগত সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবেই মূলত সে গ্রাম ছেড়ে যেতে রাজি হয়।

হাঁটতে হাঁটতে মরিয়ম একটু থেমে হা করে বড় বড় নিশ্বাস নেয়। দাঁড়িয়ে পড়াতে ও অন্যদের চেয়ে একটু পিছিয়ে পড়েছিল। কালিপদর বউ যমুনা এসে ওকে ধরে।

মা, হাঁটতে কষ্ট অইতাছে না?

কাকিগো, এক এক পা হাঁটি আর মনে অয় এই বুঝি মুখ থুবরাইয়্যা পরলাম মাটিত্। শইলডা পাথরের মতোন ভারি লাগতাছে। উট্টু জিরাইয়্যা লই আমি, আপনারা আউগান।

এনঅ জিরাইবা কী! পথের মাঝে। এমনেঅই তুমি পিছাইয়্যা পড়েছ। আমরা আরও আউগাইয়্যা গেলে আঙ্গরে আর ধরতে পারব! কষ্টদঅ সবারঅই হইতাছে মা। বুঝি, তোমার শইল্লের কারণে অন্যগর চেয়ে তোমার কষ্টডা বেশি অইতাছে। কিন্তু উপায়দঅ নাই মা। আরেকটু কষ্ট কর। সামনে মনেঅয় আমরা থামমু।  তোমার কাকা তাই কইল।

আপনে যান কাকি। আমি আর পারতাছি না। মরিয়ম বসে পড়ে।

তোমারে যহন লগে লইয়্যা আইছি, সঙ্গে না লইয়্যা যাই কী কইরা। তুমি না অয় আমার কাঁধে ভর দিয়া হাঁট মা।

আমি আর হাঁটতে পারমু না কাকি। আমার মনেঅইতাছে এনঅ উট্টু শুই। শইলডা কেমন যানি করতাছে। বলতে বলতে মরিয়ম শরীর কাঁপিয়ে করে বমি করে। বমিতে বের হয় না কিছু। শুধু একটু পানি। মরিয়মের সারা গা ঘেমে উঠে। মুখ হা করে বড় বড় শ^াস টানে।

যমুনা বসে পড়ে মরিয়মের মাথাটা কোলে নেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, বেশি কষ্ট হইতাছে মা?

মরিয়ম কোন শব্দ করে না। যমুনার কোলে নেতিয়ে পড়ে।

কী হল তোঙ্গ আবার! পিছনে পড়লা কা?

যমুনা স্বামীকে দেখে মাথায় ঘোমটা টেনে বলে, মরিয়মের শইলডা খারাপ লাগতাছে। আমরা উট্টু জিরাই, আপনেরা আউ¹ান।

মরিয়ম, তোমারে আর কী কমু মা, আমরা সুস্থ মানুষ, আঙ্গঅইদঅ কষ্ট হইতাছে। কষ্ট অইলেঅ আরেকটু পথ হাঁট মা। মনে হইতাছে সামনে উঁচা জাগা আছে। এনথে দেইখ্যাদঅ তাই মনে অয়। হেন পৌঁছলে আমরা কিছুক্ষণ থামমু।

এলিয়ে পড়া শরীরটা নিয়ে মরিয়ম যমুনার কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটে। কদিন আগেও কি মরিয়ম ভাবতে পেরেছিল, ওর জীবনে এমন দুঃসময় আসবে! কোন কুক্ষণে যে ঢাকায় গিয়েছিল। গ্রামে থাকলে হয়তো এমন দুর্যোগ নেমে আসত না তার জীবনে। ওরা যদি হঠাৎ করে খবর না দিয়ে হাবিলের মেসে উপস্থিত না হতো সেদিন, তাহলে হাবিলকেও সে রাতে থাকার জন্য হলে চলে যেতে হত না। জীবনটা এমন তছনছ হতো না।

মরিয়মের বাবা মা কার যেন খবর পেয়েছিল, আর্মিরা পঁচিশে মার্চের রাতে মরিয়মদের সবাইকে মেরে ফেলেছে। রামপুর গ্রামে আক্রমণের পর বাবা চাচারা সবাই ভিটা মাটি ফেলে বোধহয় ইন্ডিয়াই চলে গেছে। গিয়ে অবশ্য ভালোই করেছে। এ দেশে থাকলে জীবন দিতে হত। জানোয়ারগুলো কী অবলীলায় মানুষ মারে তা তো নিজের চোখেই দেখা।

সেই রাতে মরিয়মরা শুধু আকাশ কাঁপানো শব্দ শুনেছে। আর দেখেছে আকাশ ছোঁয়া আগুনের শিখা। সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি কেউ। কী এক অজানা ভয়ে কাঁপছিল সবাই। কী যে হচ্ছে, ঠিক বুঝতে পারছিল না।

নির্ঘুম উৎকন্ঠার রাত কেটে বাইরে আলো ফুটলে কে একজন এসে খবর দিয়ে গেল, রাতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আর্মিরা আক্রমণ চালিয়েছে। ওই এলাকার সমস্ত মানুষকে মেরে ফেলেছে। হলের ছাত্র ছাত্রী শিক্ষক কর্মচারী কেউ বেঁচে নেই। আপনাদের বাসার লোককেও মেরে ফেলেছে, লোকটা বলে। হাবিলকে আমি চিনে। সে বেঁচে নেই।… ঢাকা থাকা এখন আর নিরাপদ না। আপনারা যত দ্রুত পারেন গ্রামে চলে যান। শুনলাম, আজকে এই দিকেও আক্রমণ করতে পারে আর্মিরা।

লোকটার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল মরিয়মরা। হাবিল বেঁচে নেই! অথচ, রাতেও মানুষটা বেঁচে ছিল। একসাথে খাওয়া দাওয়া করল।…ওরা দু দিন অপেক্ষা করল। কিন্তু না, হাবিল ফিরল না। একের পর এক খবর আসতে লাগল ঢাকার শহরের এখানে ওখানে মানুষ মারছে মিলিটারিরা। যাকে দেখছে তাকেই গুলি করছে। জ¦ালিয়ে দিচ্ছে বাড়িঘর। লোকজন প্রাণভয়ে সব পালাচ্ছে ঢাকা ছেড়ে গ্রামের দিকে। যে-কোনো দিন এ এলাকায় আক্রমণ হবে। তিন দিনের দিন ওরাও নিজেদের জীবন বাঁচাতে গ্রামের দিকে রওয়ানা হল।

বাসে উঠেই এক বৃদ্ধের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ওদের। বুড়ো লোকটার সঙ্গে দু’জন যুবতি মেয়ে। আলাপে আলাপে মরিয়ম জানতে পারে একজন উনার মেয়ে, আরেকজন পুত্রবধু। উনারা থাকেন ঢাকার রাজারবাগে। গত রাতে মিলিটারিরা ওদের ছেলেকে গুলি করে মেরেছে। বৃদ্ধ দুই তরুণী কে নিয়ে কোন রকমে রাতটা পার করে সকালেই গ্রামের বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়েছেন। যাবেন সোনারগাঁয়ের দিকে। বৃদ্ধের সাথের মেয়ে দুটো বোধহয় খানিকক্ষণ আগেও কেঁদেছে। দু’জনের গালেই কান্নার দাগ শুকিয়ে আছে।

কাঁচপুরের কাছে আর্মিরা ওদের বাস আটকায়। মিলিটারিরা সবাইকে বাস থেকে নামিয়ে লাইন ধরে দাঁড় করায়। এক একে সবাইকে নামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। নাম কী, কে কী করে, কোত্থেকে আসছে, কোথায় যাবে- এই সব।

বৃদ্ধ মরিয়মদের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। মিলিটারিরা উনার সাথের মেয়ে দুজনকে নিয়ে গিয়ে নিজেদের গাড়িতে উঠায়। ফিরে এসে বলে, ইয়ে দো আওরাত নেহি জায়েগি।

বুড়ো লোকটা হুমড়ি খেয়ে আর্মিদের পায়ের কাছে পড়ে মিনতি করে, বাবারা ওদের ছেড়ে দাও। আমার ছেলেটা গতকাল রাতে মারা গেছে। আমাদের যেতে দাও। আমরা তো তোমাদের কোন ক্ষতি করিনি।

মিলিটারিরা বুড়োর কথায় কর্ণপাত করে না। পায়ের কাছ থেকে লাথি মেরে সরিয়ে দেয়। বুড়ো তখন ওদের সবার উদ্দেশ্যে বলে, আপনারা একটু বলেন না, আমার মেয়ে দুটোকে ছেড়ে দিতে।

কিন্তু তাঁর কাকুতিতে কেউ কোনো কথা বলে না। কে কী বলবে! সবার সামনেই তখন বিপদ। চোখের সামনে সাক্ষাৎ আজরাইল ঘুরছে।

এক দম্পত্তি ছিল মরিয়মদের আগে। বউটার মাথায় ঘোমটা, কোলে শিশু। হাতের লাঠি দিয়ে মিলিটারিদের একজন বউটার ঘোমটা সরালে কপালের সিঁদুর দেখে ওরা সবাই হেসে উঠে। হেসে হেসেই একজন কোল থেকে শিশুটাকে ছিনিয়ে নিয়ে শূন্যে ছুঁড়ে মারে, আরেকজন পাখি মারার মতো করে গুলি করে। বাচ্চাটা হাসতে হাসতে রক্তে ভেসে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে পড়ে। আরেকজন স্বামী আর স্ত্রীকে গুলি করে।…মরিয়মদের একহাত দূরে তখন মিলিটারিরা দাঁড়িয়ে। মরিয়ম লম্বা ঘোমটায় মুখ ঢেকে সমানে দোয়া ইউনুস পড়ছিল।

মিলিটারিরা ওদের সামনে এসে কিছুক্ষণ দেখে। মরিয়মের মুখের কাপড় সরালে ও মাটিতে বসে হড়হড় করে বমি করে।

ওদের একজন বলে, উসকো ছোড় দো। বিমারি হ্যায়।

ইয়ে লাড়কা তোমহারা হ্যায়? একজন মরিয়মের শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করে। আমিনা তখন সমানে কাঁপছিল। কোন জবাব দেয় না।

ইয়ে নেহি জায়েগা। হামকো সাথ চলেগা।

নাবিলকে গাড়ির দিকে নিতেই শাশুড়ি মিলিটারিদের পা জড়িয়ে ধরে। বাবারা, আমার ছেলেডাকে নিও না বাপরা। আমার এই একটাই ছেলে আছে। বড় ছেলেডা বাঁইচ্যা আছে কি না জানি না।

মিলিটারিরা শাশুড়ির কথায় ভ্রুক্ষেপ করে না।পা ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দেয় আমিনাকে। আমিনা ছিটকে পড়ে। উঠে আবার মিলিটারিদের পা ধরতে গেলে ওরা আমিনাকে গুলি করে। রক্তে ভিজে ছটফট করতে করতে প্রাণত্যাগ করে আমিনা। তারপর মিলিটারিরা আরো দুটো মেয়েকে ধরে নিয়ে যায়। একজন কিশোরকে গুলি করে মারে।

আহা, ধরে নিয়ে যাওয়া মেয়েগুলো, কী করুণ চোখে গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বের করে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে মেয়েগুলোর করুণ চাহনি এখনো চোখে ভাসে মরিয়মের।

 

পর্ব ৭

২৩শে নভেম্বর, ১৯৭১।

শকুনেরা লাশের উপর এমনভাবে বসে আছে যেন লাশ পাহারা দিচ্ছে…

দুপুরের দিকে মেঘলা আকাশ থেকে ঝিরঝির বৃষ্টি ঝরে। নভেম্বরের বৃষ্টি যেন গায়ে সুচ বিঁধায়! হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই সবাই হাঁটে। পেটে ক্ষুধা, শরীর অবসন্ন, তাহলেও হাঁটে সবাই। না হেঁটে তো উপায়ও নেই। বাঁচতে হলে হাঁটতে হবেই। পেছনে মিলিটারিদের অত্যাচার, ভিটামাটি সম্পদ, স্বদেশ ছেড়ে, সামনে অজানার উদেশ্যে হাঁটে সবাই।

বিকালের পর পর বৃষ্টিটা একটু ধরে। সূর্য উঠেনি, তবে তার আভায় চারপাশ কেমন মায়াবি হয়ে উঠেছে। সে আলোয় দূরে একটা মাঠ দেখা যায়। মাঠের মধ্যে একটা পরিত্যক্ত বাড়ি। তবে, বাড়িটাতে ঢুকার পর বোঝা যায় সেটা মানুষের বসবাসের জন্য নির্মিত নয়। চারপাশে কেমন গোবর চোনার গন্ধ। হয়তো কোন সম্পন্ন গৃহস্থের গোয়াল ছিল। তা হোক গোয়াল। এমন ক্রান্তিকালে এও বড় ঠাঁই। বড় কথা, বিশ্রাম নেওয়ার একটা জাগয়া অন্তত পাওয়া গেল। যার কাছে যা ছিল, তাই মাটিতে বিছিয়ে, সবাই হাতপা ছেড়ে এলিয়ে পড়ে। সবাই মরার মতো পড়ে থাকে, সাড়া শব্দও করে না কেউ। শুধু মহিমের ছোট মেয়েটা কাঁদে। দুধের শিশু, বোধহয় ক্ষুধাই লেগেছে।

 

বাইরে দুতিন জন মহিলা একপাশে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ভেজা কাঠ খড়ে আগুনটা ঠিকমতো ধরেছে না। ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে জায়গাটা।

সেখানে এসে কালিপদ মহিলাদেরকে বলে, তোঙ্গ কোন কাণ্ডজ্ঞান নাই দেখতাছি। বাইরে খোলা জাগায় আগুন ধরাইছ। ধোঁয়া বহুদূর থাইক্যা দেখা যায়। ঘরের ভিত্রে গিয়া আগুন জ্বালো।

কালিপদর ভাইয়ের বউ ভাসুরকে দেখে মাথায় ঘোমটা টানে। বলে, দাদা, ভিত্রে সবাই উট্টু শুইছে। আগুন যে জ্বালমু সে জায়গাটুকু নাই।

একবেলা না খাইলে কী অয়! চিড়া ভিজাইয়্যা গুড় মাইখ্যা খাইলেঅই অয়।

বলতে গেলে দুই দিন ধইরা কেউ ভাত খায় না। তাই ভাবলাম…

এতেঠই যহন খাওয়ার শখ, ভিত্রে গিয়া বারান্দামতো জায়গাটায় গিয়া রান্না কর। যাগ ভয়ে সড়ক ছাইড়া এতেঠ কষ্টের পথে অইলাম, শেষে তোঙ্গ নির্বুদ্ধিতায় জীবনটা না যায়। রাতইটা কোন রকমে পার কর। সহাল অইলেঅই আমরা নৌকায় উঠমু। ভগবানের ইচ্ছায় নৌকায় উঠতে পারলে বিপদটা কাটে।

মহিলারা বাড়ির ভেতরে গিয়ে রান্না বসায়। যার যা সম্বল ছিল, চাল ডাল আলু পেঁয়াজ ডিমÑ এক সঙ্গে করে আগুনটা ভালোমতো ধরলে বসিয়ে দেওয়া হয়। খিচুরিমতো জিনিসটা যখন হাঁড়িতে উথলাতে শুরু করে, তখন সবাই একে একে এসে জড়ো হয় আগুনের কাছে। সকলেইতো খুব ক্ষুধার্থ।

কখন সন্ধ্যা হয়েছে! চুলার আগুনের আলোতেই সবাই খেতে বসে যায়। যারা বাসন পায়নি তারা হাঁড়ি থেকে হাত দিয়েই নিয়ে নিয়ে খাচ্ছে।

বিস্বাদ খিচুরিটা সবাই কত আগ্রহ করে খাচ্ছে! মরিয়ম প্লেটে সামান্য খিচুরি নিয়েছিল। তাই খেতে পারছে না। মুখে দিতেই কেমন বমি বমি লাগছে। ও অলস হাতে খাবার নাড়াচাড়া করে। দেখে মহিমের বউ রাধা বলে, কাকি, খাইতে পারতাছো না, না? আমার কাছে তেঁতুল আছে। মাইখ্যা খাও। দিমু?

দেও, দেহি খাইতে পারি কি না।

তেঁতুল মাখানো খিচুরি খানিকটা খেতে পারে মরিয়ম। তবে, কয়েক লোকমা খেয়ে ও উঠে পড়ে। শরীরটা জুত লাগছে না। গিয়ে ঘরের এককোণে গায়ের চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়ে।

দিনের আলো ভালোভাবে না ফুটতেই সবাই উঠে পড়ে। রান্নার ঝামেলায় না গিয়ে গুড় দিয়ে শুকনো চিড়া মুড়ি খেয়ে সবাই হাঁটা ধরে। ফের একই রকম পথ ধরে হাঁটা। এদিকের আল অবশ্য অনেকটা উঁচু। রাতে বিশ্রাম আর ঘুমে, সবার অবসন্ন ভাবটা কমেছে। তাই শুকনো পথে হাঁটতে ওদের কষ্টটা আগের চেয়ে কমই হচ্ছে। তার উপর রওয়ানা হওয়ার শুরুতেই কালিপদ সবাইকে আশ^স্ত করেছে, মাইল পাঁচেক হাঁটলেই খাল। সেখান থেকে ওরা নৌকায় উঠবে। তাই সবাই পা চালিয়েই হাঁটছিল।

টুনির শরীরটা রওয়ানা হওয়ার আগে থাকতেই খারাপ ছিল। অসুখ এখন অনেক বেড়েছে। জ¦রে টুনির গা পুড়ছে। মুখ দিয়েও গেজলা বের হচ্ছে। ও হাঁটতেই পারছিল না। রাবেয়া মেয়েকে কোলে নিয়ে হাঁটছে অনেকক্ষণ ধরে। কিন্তু বেশ খানিকক্ষণ মেয়ের সাড়াশব্দ না পেয়ে ভয় পেয়ে যায়। কাঁধে কেমন নিস্তেজ হয়ে এলিয়ে আছে মেয়েটা। বেচারি অত প্রিয় বিড়ালটাও ছেড়ে এসেছে পরিত্যক্ত বাড়িটায়।

টুনিরে, খারাপ লাগে মা।

টুনির কোন সাড়া পায় যায় না। জ্বরে অজ্ঞান হয়ে গেল নাকি? রাবেয়া থেমে মেয়েকে কোল থেকে নামায়। টুনির চোখ দুটো বন্ধ। মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে! রাবেয়া মেয়ের মুখে হাত বুলায়। শীতে মুখটা কেমন ঠান্ডা হয়ে আছে! যেন বরফে হাত বুলাচ্ছে রাবেয়া। অন্যেরা অনেকটাই এগিয়ে গেছে। রাবেয়া মেয়েকে কোলে নিয়ে বসেছিল। হঠাৎ রাবেয়ার কেমন সন্দেহ হয়। টুনির নাকের নিচে হাত ধরে। কই, শ্বাসতো পড়ছে না! দ্রুত বুকে কান ঠেকায়। না বুকও উঠানামা করছে না মেয়ের। ও আল্লারে! আমার টুনি আর দুইন্নাত নাইগো।

রাবেয়ার বুকফাটা আর্তনাদে অন্যেরা ফিরে তাকায়।

টুনির জন্য ওদের অনেকটা সময় ব্যয় হয়। রাবেয়া মৃত মেয়েকে কিছুতেই কোল ছাড়া করছিল না। আম্বিয়া অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে টুনিকে রাবেয়ার কাছ থেকে ছাড়ায়। ওদের সঙ্গে বয়স্ক কোন মুসলিম পুরুষ নেই। তাই জানাজা ছাড়াই টুনিকে পথের একপাশে কবর দেওয়া হয়। মেয়ের কবরের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে রাবেয়া সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই হাঁটতে থাকে।

মরিয়মের দুপায়ে অসহ্য ব্যথা। কেমন ফোলা ফোলা লাগছে পা দুটো। মনে হচ্ছে যে কোনো সময় হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাবে। তাহলেও দাঁতে দাঁত কামড়ে হাঁটছিল সবার সঙ্গে। ওর পাশাপাশি রাবেয়া হাঁটছে। মরিয়ম রাবেয়াকে দেখে অবাক হয়। মাত্রই কোলের মেয়েকে কবর দিয়ে কী স্বাভাবিকভাবে হাঁটছে মেয়েটা। চোখে এক ফোঁটা পানি নেই, পা টলছে না একটুও। বরং মেয়ে কোলে থাকতেই যেন হাঁটার গতি শ্লথ ছিল। এখন সামনে তাকিয়ে সোজা হাঁটছে। বেচারি, মনে হয় শেষ স্বজনটাকেও হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছে।

বিকালের দিকে ওদের হাঁটা শেষ হয়। যদিও কালিপদ বলেছিল পাঁচ মাইল, ওরা কত মাইল হেঁটেছে কে জানে!

খালের পানিতে সারি সারি আটটা নৌকা ভাসছে। ছয়টা নৌকায় অন্যান্য যাত্রীরা অপেক্ষা করছিল। ওরা সবাই বাকী দুটো নৌকাতে উঠে। ওরা উঠতেই সব কটা নৌকা ছেড়ে দেয়। ধীরে ধীরে এগুতে থাকে নৌকা। ততক্ষণে সকালটা বেশ ঝকঝকে হয়েছে। আজ কুয়াশা নেই একটুও! সূর্যটাও যেন হাসছে আকাশজুড়ে।

মরিয়ম নৌকায় উঠেই পাটাতনে শুয়ে পড়ে। শুয়ে যেন একটু স্বস্তি বোধ করে। এতোক্ষণ হাঁটার ধকল, মানসিক দুশ্চিন্তায় সবাই কেমন চুপচাপ আর অন্যমনস্ক ছিল। এখন নৌকায় উঠে শুয়ে বসে সবাই যেন একটু হাঁপ ছাড়ে।

মহিলারাই প্রথম দেখতে পায় লাশগুলো। নৌকার গলুয়ের কাছে রান্নার ব্যবস্থা আছে। মহিলারা সেখানে রান্নার তোড়জোড় করছিল। চাউল ধুতে গিয়ে আরতি দেখে একটা শুকুন কিসের উপর যেন বসে ঝিমাচ্ছে। আরতি ভালোমতো তাকাতেই দেখতে পায়, শকুনটা একটা মহিলার লাশের উপর বসে আছে। মুখ দেখে নয়, পরনের কাপড় দেখে আরিতি বুঝে যে সেটা একটা মহিলার লাশ। ও চিৎকার করার আগেই দেখে আরো তিনটা লাশ। কচুরিপানার সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে।… পাশের নৌকা থেকে কে যেন আর্তচিৎকার করে উঠে, ও মাগো, এতো লাশ। ওই চিৎকারেই সবাই পানির দিকে তাকায়।

পানিতে ভাসছে অসংখ্য লাশ। শিশুর লাশ। বৃদ্ধের লাশ। মহিলার লাশ। পুরুষের লাশ। আধখাওয়া। ফুলে উঠা। পচা।… উলঙ্গ। চোখ বাঁধা। দু হাত বাঁধা। উপুড় হয়ে আছে কোন লাশ। চিৎ হয়ে ভাসছে কোন লাশ।

শকুনেরা অলসভাবে বসে আছে লাশের উপর। চোখের সামনে এতো মৃতদেহ, অথচ ওরা খাওয়ার আগ্রহ পাচ্ছে না। শকুনগুলো এমনভাবে বসে আছে লাশের উপরে, যেন ওরা লাশগুলো পাহারা দিচ্ছে।

মরিয়মও দেখছিল অন্যদের সঙ্গে। দেখতে দেখতে ও আর নিজেকে সামলাতে পারে না। ঝুঁকে পড়ে হড়হড় করে বমি করে। যমুনা ওকে ধরে। তুমি আবার উঠতে গেলে কেন মরিয়ম। শুয়ে ছিলে সেইতো ভালো ছিল। যাও, ছইয়ের ভেতরে গিয়ে শুয়ে থাকো।

কাকিগো, কী দেখলাম আমি! মানুষ মানুষরে এমনভাবে মারত পারে। আমার হড়িরেও তারা আমার চৌখ্যের সামনে গুলি কইরা মারছে। দেবররে ধইরা নিয়া গেছে। চৌখ্যৌর সামনে ঘটছে দেইখ্যাঅ আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারি নাই সব। আমি কত খারাপ জান, মনে মনে আল্লার কাছে কইছি, আমারে যানি না মারে তারা। আমি যানি আমার সন্তানরে জন্ম দিতে পারি।

অত কথা কয় না মা। তোমার এই অবস্থায় মনে চাপ পড়লে পেডঅ যে আছে তার ক্ষতি অইতে পারে।

কাকিগো, আপনেরা সত্যি কইতাছেনদঅ? আপনেগঅ ছেলে বাঁইচ্যা আছে? না কি আমারে সান্ত¦না দেওনের লাইগ্যা কন।

নাগো মরিয়ম, হাবিল সত্যঅই বাঁইচ্যা আছে। তুমি ফিরার কয়দিন আগে সে বাড়ি ছাড়ল। হুনছি ইন্ডিয়া গিয়া ট্রেনিং লইয়্যা বলে দেশ আইয়্যা যুদ্ধ করব। তুমি যুদি আর কয়ডা দিন আগে বাড়ি ফিরতা, হাবিলের লগে দেখা অইতো।

কাকিগো, আমি কি ইচ্ছা কইরা বাড়ি ফিরি নাই! হড়িরে চৌখ্যের সামনে গুলি কইরা মারল। দেবররে ধইরা নিয়া গেল। আমারে মিলিটারিরা যে কিয়ারে মারল না কে জানে!…আগেঅই একজন আইস্যা খবর দিয়া গেছিল, আপনেগ ছেলেরে পঁচিশ তারিখ রাতেঅই মাইরালাইছে। একলা একলা আমি তহন কী করমু বুইঝ্যা উঠতে পারছিলাম না। চৌখ্যের সামনে এতো মৃত্যু দেইখ্যা, আমার মাথাটা কেমন যান আউল্যা গেছিল। আৎকা এমন জ্বর আইল, বাস থাইক্যা নাইম্যা আমি আর হাঁইট্যা বাসেঅ উঠতে পারতাছিলাম না। কোনোসময় যে আমি জ্ঞান হারাইয়্যা ফালাইছিলাম।

বাসে একজন বুড়ামতো লোক আছিল। তার লগে তার ছেলের বউ আর মেয়ে আছিল। আর্মিরা তাগ দুজনরেঅই ধইরা নিয়া যায়। জ্ঞান ফিরতেঅই দেহি উনি আমার মাথাটা কোলে নিয়া বইসা আছেন। আমি নাহি তখন কিছুই মনে করতে পারতাছিলাম না। বাড়িঘরের ঠিকানাও মনে করতে পারি নাই।

উনি আমারে উনাদের বাড়িতে নিয়া যান। হেন আমি জ্বরে ভুগছিলাম দেড়মাসের মতো। আমার নাকি টাইফয়েড অইছিল।…আমিদঅ কোন দিন একলা বাড়িত্তে বাইর অয় নাই কাকি। আর দেশের এই অবস্থায় মাইয়্যা মানুষ অইয়্যা একলা একলা বাড়ি ফিরার সাহস পাই নাই। একটু সুস্থ হলে ওই বুড়া মানুষটাঅই আমারে দাউদকান্দি পার কইরা রায়পুরে রাইখ্যা গেছে।

থাক মা, এসব আর কইয়্যা কী অইব। সুস্থভাবে ফিরা আইছো সেই ভগবানের দয়া। অনে খাইবা কিছু? খাবার বোধঅয় অইয়্যা গেছে। সহাল থাইক্যাইদ খাও নাই কিছু।

নাগো কাকি। যা দেখলাম তাতে…খাওয়ার কথা ভাবতেঅই বমি আইতাছে।

তাইলে থাহুক। তুমি একটু শুইয়া থাহ। কিছুক্ষণ শুইয়া থাকলে শইলডা ভালো লাগব। পরে না অয় শইল ভাল্লাগলে খাইয়ো কিছু। নিজের লইগ্যা না অউক, পেটেরটার লইগ্যা খাওন লাগব।

খালের এদিকটায় কচুরিপানায় নেই তেমন। আছে দু’একটা ছাড়া ছাড়া। কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে লাশগুলো ভাসছে। খালের এদিকটায় ¯্রােত বাঁধাপ্রাপ্ত। তাই বোধহয় লাশগুলো ভেসে এসে এদিকে আটকে আছে। মাঝির সঙ্গে একজন অল্পবয়স্ক ছেলে। সে বাঁশ দিয়ে ঠেলে ঠেলে কচুরিপানা আর লাশগুলো সরিয়ে নৌকা চলার পথ করে দিচ্ছে।

নৌকার যাত্রীদের মুখে কোনো কথা নেই। সবাই আতঙ্কিত চোখে পানির দিকে তাকিয়ে আছে। নৌকাগুলো চলছিল নিঃশব্দে। পানিতে লগি আর বৈঠা ফেলার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই এখন।

হঠাৎ দূর থেকে কারা যেন হাঁক দেয়। নৌকায় কারা যায়?

হাঁক শুনে মাঝিদের বৈঠা থেমে যায়। সবচেয়ে সামনের নৌকার মাঝি চাপাস্বরে বলে, আপনেরা হগলতে ছইয়ের ভিত্রে যান। মনে অইতাছে বিপদ।

সবাই দ্রুত ভেতরে চলে যায়।

আবার চিৎকার শোনা যায়, কথা কয় না কা! নৌকায় কারা যায়?

মাঝিদের একজন চেঁচিয়ে জবাব দেয়, আমরা বরযাত্রী।

নৌকা ঘাটে ভিড়াও। আমরা দেখমু, নৌকায় কারা যায়।

নৌকার বহর থামে না। মাঝি আবার বলে, কইলাম না বরযাত্রী। বিয়া করতে যাই।

ওই মাঝি, ঘাটে ভিড়াও নৌকা। না অইলে গুলি করমু। আমরা শান্তি কমিটির লোক। বলতে বলতে ওরা ফাঁকা গুলি ছোড়ে।

গুলির শব্দে শিশুরা, মহিলারা কেঁদে উঠে। মাঝিরা তীরে ভিড়ানোর জন্য নৌকার মুখ ঘুরায়।

 

পর্ব ৮

২৪শে নভেম্বর, ১৯৭১।

ইমান আলি বোরখা পরে মিলিটারিদের সঙ্গে চলাফেরা করে…

আজকের অপারেশনটার পরেই আমরা এই এলাকা ছেড়ে চলে যাব। আমাদের উপর এমনই নির্দেশ। কমতো নয়, ছয় মাসের বেশিই আমরা এই এলাকায় অপারেশন চালালাম। সাধারণত এক এলাকায় আমাদের এতেঠদিন থাকার কথা না।

আজ আমরা যাব রাজাকার সদস্য ইমান আলির বাড়ি। তাকে শেষ করে দিতে হবে। ইমান আলির গ্রামের কাছাকাছি আমাদের  গ্রাম। আমার মনটা একটু চঞ্চল হয়। বড় লোভ হয় একবার বাড়িতে গিয়ে দেখে আসি মা আর সবাই কেমন আছে। কিন্তু আমি জানি, তা সম্ভব না। ওই এলাকার রাজাকার বাহিনীর সবাই জানে আমি যুদ্ধে। হয়তো আমাদের বাড়ির উপর ওদের নজর আছে। কে জানে এর মধ্যেই বাড়িঘর সব জ্বালিয়ে দিয়েছে কিনা। মা আর বাড়ির সবাই বেঁচে আছে কিনা তা-ই বা কে জানে! একমাস আগে একজনের কাছে ওদের খবর পেয়েছিলাম। এখন তারা কেমন আছে, জানতে খুব জানতে ইচ্ছে করছে আমার। মিনা-ইবা কেমন আছে?… আহা যুদ্ধ কত কিছু কেড়ে নিল। কত নিশ্চয়তায় ফেলে দিল সবাইকে!

তাজুল, ওই দিকের অপারেশনে তুমি না গেলেও হবে। আসলে সবার যাওয়ার দরকারও নেই। ইমান আলির বাড়িতে গ্রেনেড চার্জ করতে দুলাল আর শীতলই যথেষ্ট।

হাসান ভাই কি আমার মনে অবস্থা বুঝে ফেলেছেন? না হলে এমন কথা বলবেন কেন।

আমিও যেতে চাই হাসান ভাই। জানি না আপনি কী মনে করে আমাকে যেতে বারণ করলেন। তবে, আমি আপনার কাছে অনুমতি চাই। ওই এলাকায় আমার বাড়ি। আমি সব জায়গা ভালোভাবে চিনি। ভাববেন না, আমি কোনো দুর্বলতা প্রকাশ করব না। একজন যোদ্ধার মতোই আচরণ করব।

হাসান ভাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, না গেলেই ভাল হত। তবু যেতে চাইছো যখন, যাও। তবে, সাবধানে থেকো।

আমি সাবধানেই থাকব।

আপনি চিন্তা করবেন না হাসান ভাই। শীতল বলে। আমরাদঅ আছিঅই।

ইমান আলি একজন ধুরন্ধর রাজাকার। সে বোরখা পরে আর্মিদের সঙ্গে চলাচল করে। যাতে স্থানীয়রা তাকে না চিনে। তবে, সে এতেঠই কুখ্যাত যে, তার কন্ঠ শুনেই সবাই তাকে শনাক্ত করতে পারে। সে আর্মিদের, বিশেষ করে হিন্দুদের বাড়ি, মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি, আওয়ামী লীগ করা লোকদের বাড়ি চিনিয়ে দেয়। অনেক তরুণী মেয়েকে সে ধরে নিয়ে আর্মিদের ক্যাম্পে দিয়ে এসেছে। এমন কী শোনা যায়, সে আপন ভাইয়ের কিশোরী মেয়েকেও নাকি আর্মিদের ক্যাম্পে দিয়ে এসেছিল।

আমরা দুপুরের দিকে রওয়ানা হয়েছিলাম। কদমতোলির কাছে বড় খালে আমাদের নৌকা রেখে আমরা প্রায় মাইল দুয়েক পায়ে হেঁটে যখন ইমানের গ্রামে পৌঁছি তখন বিকাল শেষ হয়ে আসছে। শীতের বিকাল, দ্রুত দৌড়ায়। আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। সন্ধ্যার আগেই কাজ সেরে আমাদের এ এলাকা ছাড়তে হবে।

ইমান আলির বাড়ি খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয় না আমাদের। ইমান আলির নাম ধরে ডাকতে বয়স্ক এক মহিলা বের হয়ে আসেন।

তোমরা কারা? এই হাইঞ্জাবেলায় আমার নাতির খোঁজ করতাছো!

দুলাল ভাই, শীতল আর আমি খুব সাধারণ পোশাকে আছি। তিনজনের পরণেই লুঙ্গি। ঢোলা পাঞ্জাবি। মাথায় টুপি। এখনকার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পোশাক। পোষাকগুলো জোগাড় করতে আমারদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। পাঞ্জাবির ভেতরে আমাদের অস্ত্র লুকানো। কিন্তু বাইরে থেকে ঠিক বোঝার উপায় নেই পাঞ্জাবির ভেতরে কিছু আছে।

দুলাল ভাই জবাব দেন, দাদি আমরা ইমান আলির পরিচিত। তার লগে কিছু কথা কমু। তারে উট্টু ডাইক্যা দেন।

ইমান আলি বাড়ি নাই। ভেতর থেকে আরেক মহিলা বলেন।

বয়স্ক মহিলা ঘাড় ফিরিয়ে বলেন, ইমানের মা, তুমি আবার কথা কও কা! দেখতাছো আমি কথা কই। …এই ছেরারা, এই হাইঞ্জাবেলায় আঙ্গরে বিরক্ত করতাছো কা। হুনলাদঅ ইমান বাড়ি নাই।

সে আঙ্গরে চিনে। ডাকেন তারে, কয়ডা কথা কইয়্যা যামু গা। শীতল বলে।

ইমানের পরিচিত অইলে আমি তোঙ্গরে চিনতাম। আমার নাতির বন্ধুগ সবাইরে আমি চিনি।

বৃদ্ধার কথায় আমরা নিশ্চিত হই, ইমান আলি  বাড়ি আছে। আমি বলি, আপনি যা বললেন, ঠিক না দাদী। মুক্তিযোদ্ধাদের সবাই চেনে।

আমার কথা শুনে বৃদ্ধা হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠেন। ঘরের ভেতর থেকে শব্দ শোনা যায়, ও ইমান, শিগ্গির পালা বাপ। তরে ধরতে আইছে।

কথাটা শোনামাত্র আমরা দেরি করি না। তিনজনেই দ্রুত ঘরে ঢুকি। ইমান আমাদের ঘরে ঢুকার আগেই বের হয়ে গেছে। আমরা তিনটা ঘরেও তাকে খুঁজে পাই না। ঘরে না পেয়ে দুলাল ভাই আর আমি বাইরে এসে চারপাশে তাকাই। এ বাড়িটাই গ্রামের শেষ বাড়ি মনে হয়। চারপাশই খোলা। আমার মনে হয় ইমান এতেঠ দ্রুত বাড়ির সীমানার বাইরে যায়নি। সে কথা বলতেই দুলাল ভাইও সায় জানান। আমি চেঁচিয়ে শীতলকে বলি, বাড়ির সামনের দিকটায় নজর রাখতে। আমরা পেছনদিকটা দেখছি।

তারপর গোয়াল ঘর, রান্নাঘর, বাড়ির পাশের ঝোপঝাড় সব টর্চ জ্বেলে দেখি আমরা। কিন্তু কোথাও ইমানকে পাই না। এতো চিন্তার কথা! সব জায়গায়ইতো খুঁজলাম। এতো অল্প সময়ে গেল কোথায় বেইমানটা। দুলাল ভাই  বলেন।

তাজুল, এদিকে আসো তোমরা। শীতল চিৎকার করে। আমি পেয়েছি বেইমানটাকে। মুরগির খোঁয়ারের ভেতরে ঢুকেছে।

আমরা দ্রুত ইমানকে টেনে বের করি।

ভেবেছিলাম, ইমান আলি বয়স্ক মানুষ হবে। কিন্তু সে বয়সে প্রায় আমারই সমান। সাতাশ আটাশ বছর হবে বয়স। চেহারা ছবিও সুন্দর। কে বলবে এই লোক এমন কাজ করতে পারে!

ইমান কোন কথা না বলে ঠান্ডা চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর চোখে কোন রকম ভীতি নেই। বোধহয় ও জানে, আমরা তাকে নিয়ে কী করব। আমার ব্যক্তিগত মতো হচ্ছে, ইমানকে কদিন বাঁচিয়ে রাখা। তার কাছে থেকে আমরা আর্মিদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারব। কিন্তু সবাই ইমানকে এখনই মেরে ফেলার পক্ষে। তাদের যুক্তি হল, আমরা তো এই এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এদিকের আর কোনো ইনফরমেশন আমার দরকার নেই।

আমি ওদের কথাই মেনে নিই। এসএমজিটা আমার কাছেই। পাঞ্জাবির নিচ থেকে অস্ত্রটা বের করতেই উঠানে ঘোমটা দেওয়া এক মহিলা এসে দাঁড়ায়। মুখ দেখা না গেলেও অবয়বে বুঝা যায়, মহিলা অল্পবয়স্কই হবে।

মহিলা ঘোমটা ফেলে কথা বলে। তাজুল ভাই, হেয় আমার স্বামী। তোমরা তারে মাফ কইরা দেও। তার অইয়্যা আমি তোঙ্গ কাছে মাফ চাই।

যদিও আবছা আধাঁর ঘিরে ফেলছে চারপাশ, যদিও কুয়াশায় হিম হয়ে আসছে আশপাশ, তাহলেও ঘোমটা ফেলার সঙ্গে সাথেই আমি মিনাকে চিনতে পারি। কিন্তু মিনা এসব কী বলছে! ইমান ওর স্বামী!

আমি ঘটনার আকস্মিকতায় যেন বিমূঢ় হয়ে গেছি। কী বলব বুঝতে পারছি না। আসলে আমি নিজের চোখ, নিজের কানকে বিশ^াস করতে পারছি না। ইমান কেন মিনাকে বিয়ে করবে? ইমানের দিকে অস্ত্র উঁচিয়ে আমি চুপ করে থাকি। বুঝতে পারি মিনা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

দেখ তাজুল ভাই, জীবন কেমন। এই অবস্থায় তোমার লগে দেখা হল।…আর্মিরা যহন আঙ্গ গেরামে আইয়্যা বাড়িঘর জ্বালাইয়া দিয়া আমারে ক্যাম্পে ধইরা নিয়া আটকাইয়্যা রাখছিল তিনদিন, তহন আমি খালি তোমার কথাঅই ভাবতাম।…আউজ্জা আমি তোমার কাছে আমার স্বামীর জীবন ভিক্ষা চাই। আমি তোমারে কথা দিলাম, আমি তারে এইসব কাজ আর করতে দিমু না।

ইমান তোমার স্বামী! তুমি জান ও কি কাজ করছে?

জানমু না কা। আমি তোঙ্গ সম্পর্কেও জানি, তাগ সম্পর্কেও জানি।

সব জেনেও ওর জীবন ভিক্ষা চাইছো!

আমার কাছে সে খারাপ না। ক্যাম্পের আর্মিরা সবাই আমার উপর নির্যাতন করেছে। এই মানুষটা শেষ পর্যন্ত আমারে না বাঁচাইলে আমি আর্মিগ নির্যাতনেঅই মইরা যাইতাম।

সেটা তবুও ভালো ছিল। তুমি এমনভাবে বদলে গেছো মিনা!

সময় বদলাইয়্যা দিছে। তুমিদঅ দেশের লইগ্যা যুদ্ধে গেলা, কিন্তু আঙ্গরে কে বাঁচায়, তোমার বাবা মারে কে বাঁচায় সেই চিন্তা করলা না। ঘরবাড়ি পুড়াইয়্যা, তোমার বাবারে তারা গুলি কইরা মারছে। জানি না তুমি সে খবর জান কি না। তোঙ্গ বাড়িত অনে মানুষ বলতে তোমার মা।…তুমি দেশ বাঁচাইতে ব্যস্ত, আঙ্গরে বাঁচায় কে! অনে আমার মতো আমারে বাঁচতে দেও। বলে, মিনা সরে এসে রমজানকে আড়াল করে দাঁড়ায়।

তুমি সর মিনা। আমাকে আমার কর্তব্য করতে দাও।

পারবা আমারেসুদ্ধা গুলি করতা? পারলে কর।

আমি আর কথা বাড়াই না। খুব কাছ থেকে পরপর দুটো গুলি করি। দুজনেই ধপাস করে আমার পায়ের কাছাকাছি পড়ে যায়।

গুলির শব্দে ইমানের মাও উঠানে এসে দাঁড়ায়। শীতল ইমানদের ঘর লক্ষ্য করে একটা গ্রেনেড ছুঁড়ে মারে। লোকজন আসার আগেই আমরা বাড়ির নামার দিকে দ্রুত পায়ে হাঁটতে থাকি।

যেতে যেতে আমার মনে হয়, মিনা বোধহয় রমজানকে বাঁচাতে নয়, নিজেই মরতে চেয়েছিল আসলে।

আমরা খালের পার ঘেষে ধীরে ধীরে নৌকা বাইতে থাকি। খালে কচুরিপানা খুব। হঠাৎ হঠাৎ এখানে ওখানে ভাসছে লাশ। লাশগুলো পচে ফুলে বিকৃত হয়ে আছে। শকুনেরা অলসভাবে বসে আছে লাশের উপর। মুখের কাছে এতেঠ খাবার অথচ ওরা খাবারে কোন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কত খাবে! সারাদেশের পথে ঘাটেইতো লাশ।

বাবাকেও ওরা মেরেছে! আমার কেন জানি কান্না আসে না। চোখ জলে ভরে উঠে না। এর বদলে কী একটা ক্রোধ বুকের ভেতরে তোলপাড় করতে থাকে।…কতদিন মায়ের মুখটা দেখি না। কেমন আছে এখন মা? জানতে চাইলেও জানার উপায় কই। হাসান ভাই ঠিকই বলেছিল, আমার এই অপারেশনে না আসাই ভালো হত।

নৌকা অনেকটাই অগ্রসর হয়েছে। তবে কচুরিপানার জন্য এগুচ্ছে খুব ধীরে।…আমার হঠাৎ মনে পড়ে মনিরদের বাড়ি কদমতোলী গ্রামে। আমরাতো ওই গ্রামের পাশ দিয়েই যাব। যদিও এদিক থেকে যাইনি কখনো তবে যাওয়ার রাস্তা আমি চিনি। তবে কদমতলী যেতে হলে আমাদের অনেকটা পথ ঘুরতে হবে। আমার মনে হয় একবার ঘুরে আসলে হয়। ঈদে যাওয়ার কথা বলেওতো যেতে পারলাম না আমরা। মনিরের মা নিশ্চয়ই আশা করেছিলেন আমরা যাব। কিন্তু আমার প্রস্তাবে অন্যেরা রাজি হয় না। দুলাল ভাই বলেন, এখন আবেগ দেখানোর সময় না। হয়তো রাজাকার ঈমান আলির মৃত্যুর খবর মিলিটারিদের কানে পৌঁছে গেছে এতেঠক্ষণে। ইমান এ এলাকায় ওদের ডান হাত ছিল। আমাদের এদিক থেকে যথা সম্ভব দ্রুত চলে যেতে হবে। দুলাল ভাইয়ের এর কথায় যুক্তি আছে, আমি কিছু বলতে পারি না।

নৌকা বাইছিল শীতল। শীতল খুব ভালো নৌকা চালাচ্ছে। নৌকা একটুও দুলছে না। এদিক ওদিক কাত হচ্ছে না। আমি অলসভাবে পানির দিকে তাকিয়ে আছি, দুলাল ভাই ছোট একটা লাঠি দিয়ে কচুরিপানার দাম সরাচ্ছে। খালের পানিতে কচুরিপানার চেয়ে মানুষের লাশই যেন বেশি। এতো লাশ ভাসছে পানিতে, মাঝে মাঝে পানিও দেখা যায় না। কুয়াশাটা ঘন হয়ে আসছে। শীতের হাত থেকে বাঁচতে দুলাল ভাই ছইয়ের ভেতরে গিয়ে গুটিসুটি মেরে বসেছেন। কিন্তু আমার কেন জানি শীত লাগছে না।

মিনা আমাকে যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য বলেছিল। কী হত যদি আমি যুদ্ধ করতে না আসতাম? কী হত যদি আমি মিনাকে বিয়ে করে সংসারি হতাম? আমি একজন যুদ্ধে না এলে কী হতো? দেশ স্বাধীন না হয় অন্যরা করত। যে মিনাকে আমি এতো ভালোবাসতাম, তাকে আমি নিজের হাতে গুলি করে মারলাম!…মিলিটারিরা বাবাকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। মা এখন একা একা বাড়িতে। আমিতো সবই হারালাম, কী হবে আর যুদ্ধ করে? কাদের জন্য আর যুদ্ধ করব।… নৌকার গলুয়ের কাছে বসে এসব আবোলতাবোল ভাবতে ভাবতে পরক্ষণেই মনে হল, নাহ্, আমি এসব কী ভাবছি। দেশের এই সংকটে কে-ই-বা স্বজন হারায়নি! বোধহয় হাসান ভাই এর কথা শুনলেই ভালো ছিল। এই অপারেশনটাতে আমি না আসলেই ভালো ছিল। হয়তো মনোবল এতো কমে যেত না আমার। মন এতো নরম হয়ে পড়ত না।

হঠাৎ শিশু আর মহিলাদের আর্তচিৎকারে চমকে উঠলাম। সেই সঙ্গে গুলির আওয়াজ। চিৎকার আর শব্দ আসছে আমাদের সামনে থেকে। শীতল বৈঠা দ্রুত চালাতে থাকে। একটু এগুতেই আমরা দেখতে পাই নৌকাগুলোকে। সারি সারি আটটা নৌকা। সবগুলোতেই ছই আছে। বোধহয় শরণার্থীদের নৌকা। নৌকাগুলো ততক্ষণে ঘাটের দিকে ভিড়তে শুরু করছে। বোধহয় রাজাকার বাহিনী কী শান্তি কমিটির কেউ নৌকাগুলো তীরে ভেড়াতে বাধ্য করেছে। আর্মি না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ওরা সাধারণত এমন খোলা জায়গাতে চলাফেরা করে না।

এসএমজিটা আমার হাতেই ছিল। আমি উপর দিক লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে চিৎকার করে বলি, জানি না তোমরা কারা। নৌকাগুলোর কাছ থেকে দূরে সরে যাও। না হলে গ্রেনেড দিয়ে তোমাদের উড়িয়ে দেওয়া হবে। আমরা মুক্তিযোদ্ধা।

আমার হুমকিতে কাজ হয় না। লোকগুলো সরে তো যায়ই না, বরং আমাদের  লক্ষ্য করে গুলি করে। গুলি অবশ্য আমাদের মাথার উপর দিয়েই যায়। এতো সাহস দেখাচ্ছে ওরা। আবার মিলিটারি নয়তো!

আমাদের অস্ত্র আর গ্রেনেড নৌকার পাটাতনে রাখা ছিল। দুলাল ভাই একটা গ্রেনেড নিয়ে পিন খুলে ওদের লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারে। গ্রেনেডে কাজ হয়। ওরা সরে যায়। বোধহয় কেউ আহত হয়নি। হলে বুঝতাম।

নৌকাগুলো শরণার্থীদেরই। আটটা নৌকাতে নারী-পুরুষ বাচ্চা, সব ধরনের লোকই আছে। মহিলারা আমাদের দেখে ভয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠল। দুটো বাচ্চা আগেই কাঁদছিলো। একটা অল্পবয়সী মেয়েকে দেখলাম মলিন চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। অবয়বে বোঝা যায়, মেয়েটি গর্ভবতী। মেয়েটির উপর দিয়ে খুব ধকল গেছে তাও বোঝা যায়। মেয়েটি কি সুস্থভাবে তার বাচ্চাকে জন্ম দিতে পারবে? বাচ্চাটা কি পরাধীন দেশে জন্ম নেবে? পরাধীনতার মধ্যেই বড় হবে? নাকি, তার জন্য একটা স্বাধীন দেশ দিতে পারব আমরা?

কে জানে কত দূরে সে স্বাধীনতা! কে জানে আর কত মূল্য দিতে হবে সে স্বাধীনতার জন্য!

দুলাল ভাই বলেন, আপনাদের ভয় নেই। আপনারা এখন নিরাপদ। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আপনারা সীমান্তের কাছাকাছি এসে গেছেন প্রায়। আজকের দিনটা পার করতে পারলেই বিপদ কাটবে।

সবাই কেমন অবাক চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। সবার চোখে কেমন অবিশ্বাস। আমরা এমন দৃষ্টি আগেও দেখেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের মানুষ কেন জানি সাধারণ মানুষ মনে করতে পারে না।

 

পর্ব ৯

২৫শে নভেম্বর, ১৯৭১।

নতুন একটা জন্মের জন্য অনেক কষ্ট সইতে হয় গো মা…

চারপাশে শাদা হয়ে আছে কুয়াশায়। এক হাত দূরের কোনো কিছুও যেন নজরে আসে না। এখন কত রাত কে জানে! মাঝি সন্ধ্যার অনেক পরেও নৌকা বাইছিল। সবাই অবশ্য সন্ধ্যার পর পরই রাতের খাবার খেয়ে ফেলেছিল। মাঝি আগেই সতর্ক করেছিল, রাতে নৌকাতে আলো  জ্বালালে বিপদ হতে পারে। কারও চোখে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। হোক না চারপাশ কুয়াশায় আচ্ছন্ন, মিলিটারিদের দোসর এদেশিয় কেউই হয়তো আবার নৌকা আটকে দিল। ওরা নৌকা আটকে যাত্রীদের কাছ থেকে মূল্যবান জিনিস পত্র. টাকা পয়সা কেড়ে নেয়। মেয়েদেরকেও ধরে নিয়ে যায়। আগে ওরা সব কিছুই আর্মিদের ক্যাম্পেই নিয়ে যেত। এখন ওরা নিজেরাই ভাগজোখ করে ভোগ করে। সে কারণে আরও বেশি করে ওরা নদী পথগুলোতে নজর রাখে। নদী পথে যে সব শরণার্থী যায় তাদের আটকাতে বেশি সুবিধা। ভাগ্যের জোরে একবার বেঁচে গেছে বলে, সামনে যে আবার বিপদ আসবে না কে বলতে পারে।

সবাই অন্ধকারে থাকতে রাজি কিন্তু ঝুঁকি নিতে চায়নি কেউ। খেয়েদেয়ে সবাই অন্ধকারে বসে কথা বলছিল। সবার মধ্যেই কেমন একটা উৎকন্ঠা! দুশ্চিন্তা। এর মধ্যে কে যেন খুনখুন করে কাঁদছিলো। বোধহয় রাবেয়াই।…কখন যে নৌকা থেমে গেছে বুঝতে পারেনি মরিয়ম। রাবেয়ার কান্না শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে বলতেও পারবে না। মরিয়মের ঘুম ভাঙে ব্যথায়। নৌকার সবাই এখন ঘুমে। চারপাশের আঁধার জড়িয়ে আছে কুয়াশায়।

নৌকার পাটাতনে শুয়ে মরিয়ম চাপা স্বরে গোঙ্গাচ্ছে। এতেঠ কষ্ট! মনে হচ্ছে কেউ যেন পিটিয়ে পিটিয়ে মরিয়মের শরীরের সব হাড়গোড় ভাঙছে। এতো কষ্টের মধ্যেও মরিয়মের হাবিলের মুখ মনে পড়ছে। যদি আজ মরে যায় মরিয়ম, তাহলে হাবিলের সঙ্গে আর দেখা হবে না। আবারও মনে হয়, সেদিন যদি মরিয়ম এমন হুট করে হাবিলের মেসে গিয়ে হাজির না হতো, তাহলে বোধহয় মরিয়মের জীবনে এতো দুঃখ নেমে আসত না। শাশুড়ি মরল, দেবরটাকে ধরে নিয়ে গেল। নিজেরও কত কষ্ট হচ্ছে। সবাইতো বলছে, দেশ একদিন না একদিন স্বাধীন হবে। হলে, কতদিন পর হবে। এই কদিন মরিয়ম আর তার বাচ্চার কী হবে? কীভাবে চলবে তাদের দিন? আচ্ছা, আজকে বিকালে কজন মুক্তিযোদ্ধা যে তাদের বাঁচালো, তেমনই কি হাবিল কাউকে বাঁচানোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে? যুদ্ধে জীবনের ঝুঁকিতো থাকেই।… এসব ভেবে মরিয়ম একটু অন্যমনস্ক হয়েছিল ঠিকই, তবে ব্যথাটা প্রবলভাবে সারা শরীরে জানান দিতে ও কেঁপে উঠে।

মরিয়মের গোঙানিতে আম্বিয়া জেগে উঠে। মেয়েটা অমন করছে কেন! মুহূর্তেই বুঝে যায় আম্বিয়া। ব্যথা উঠেছে বোধহয়। আম্বিয়া তড়িঘড়ি করে শোয়া থেকে উঠে বসে। সবাই ঘুমে, তাদের ঘুমের ব্যাঘাত না হয় এমনভাবে কাছে গিয়ে মরিয়মের পেটে হাত বুলিয়ে মৃদুস্বরে বলে, কষ্ট অইতাছে মরিয়ম?

খুব কষ্ট চাচী! এতেঠ বেদনা, কেউ বুঝব না।

পাগল। আমি বুঝি ছয় বাচ্চার মা অই নাই! প্রসবের কী বেদনা আমি বুঝি। কিন্তু কী করবি ক, মাইয়্যা অইলে, মা অইলে এই যন্ত্রণা সইতেঅই অয়। একটা নতুন জন্মের জন্য অনেক কষ্ট সইতে অয় গো মা। মাগো, একটু সহ্য র্ক। একটা জীবন জন্ম দেওয়া কি কম কষ্টের। এই কষ্টের লগের অন্য সব কষ্টের তুলনা অয় না। তই দেহিস, সন্তানের মুখ যহন দেখবি তহন সব কষ্ট ভুইল্যা যাবি।

মরিয়মের মনে হয় ওর সারা শরীরের সমস্ত হাড় যেন ভেঙে ভেঙে আসছে। ও দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথাটা সহ্য করার চেষ্ট করে। মনে মনে ভাবার চেষ্টা করে ওর অনাগত সন্তান কেমন হবে। কত কষ্টের পর সে আসবে পৃথিবীতে? আম্বিয়া চাচী যেমন বলল, আসলেই কি সে সন্তান তার সমস্ত ব্যথা ভুলিয়ে দিবে? মরিয়ম আর ভাবতে পারে না। শরীর ব্যথায় কেঁপে কেঁপে উঠছে।

গোঙানির শব্দে নৌকার একজন দুজন জেগে উঠেছে। এই নৌকার সকলেই জানে, যে কোনো সময় মরিয়ম সন্তান প্রসব করবে। তবে প্রসবের সময় যে এতো কাছে, তা সবাই জানত না। যারা জেগেছে তারা চুপচাপ অপেক্ষা করে কখন নতুন শিশুর আগমন বার্তা শুনতে পাবে।

হাবিল এখন কোথায়? কোথাও কি যুদ্ধ করছে? নাকি ট্রেনিং নিয়ে দেশেই ফেরেনি এখনও?… পেটে সন্তান আসার খবরে হাবিল খুশি হয়েছিল খুব। হাবিল চেয়েছিল তাদের যেন মেয়ে হয়। আর মরিয়ম চেয়েছে তাদের ছেলে হোক। আচ্ছা, তার সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে? সন্তান হওয়ার সময়টাতে হাবিল কাছে রইল না।

ব্যথাটা ধীরে ধীরে বাড়ছিল। মরিয়মের আবোলতাবোল কত কিছু যে মনে পড়ছে। ব্যথা ভুলে থাকতে ও হাবিলের সঙ্গে প্রথমদিন দেখা হওয়ার কথা মনে করার চেষ্টা করে। অবশ্য চেষ্টা করার দরকার হয় না। মরিয়ম যে কোনো সময় চাইলেই সে সব স্মৃতি মনে করতে পারে।

প্রথম যে দিন হাবিল তাদের বাড়ি গেল মরিয়মকে দেখতে, একনজর দেখেই চোখ নামিয়ে নিয়েছিল সে। ওই এক বার দেখেই হাবিলকে পছন্দ করে ফেলেছিল। হাবিলরা কোন মতামত জানায়নি। বাড়ির সবারই মন খারাপ, বোধহয় ছেলে পক্ষ তাকে পছন্দ করেনি। অবশ্য হাবিলরাই যে তাকে প্রথম দেখেছে তা নয়। এর আগে আরও দু’বার তাকে দেখে গেছে পাত্রপক্ষ। একজন তাকে পছন্দ করলেও সে ছিল মৃতদার। তার সন্তান আছে, বয়সও বেশি। মরিয়ম সেখানে বিয়েতে রাজী হয়নি। আরেকজন মরিয়মকে পছন্দ করেনি। নাকি মরিয়ম বেশি লম্বা। ছেলের নিজের উচ্চতা মরিয়মের চেয়ে কম। তাই নিজের চেয়ে কত উচ্চতার বউ চায় সে। তারপরেই এসেছিল হাবিলরা। কিন্তু তারা দেখে যাওয়ার একমাস পরেও কোন রকম সাড়া দেয়নি। মরিয়মের বাড়ির সবাই ধরেই নিয়েছিল, হাবিলদের তাকে পছন্দ হয়নি।

কিন্তু না, হাবিলরা নাকি তাকে দেখেই পছন্দ করেছে। মাস দেড়েক পরে ঘটক ফের এসে বলল, হাবিলের চাচা মরিয়মের বাবার সঙ্গে কথা বলতে চায়। হাবিলের চাচা বলল, নাকি হাবিলদের আর্থিক অবস্থা মরিয়মদের চেয়ে অনেক খারাপ, তাই ঠিক তারা সাহস পায়নি তখনই তাদের পছন্দের কথা বলতে। নাকি ঘটক মরিয়মদের সম্পর্কে হাবিলদেরকে সঠিক তথ্য দেয়নি। বলেছিল, মরিয়মদের অবস্থা হাবিলদের চেয়ে খারাপ। হাবিলের চাচা প্রস্তাব দেয়, এখন যদি সব জেনে মরিয়মের বাবার ইচ্ছা হয় তো হাবিলদের গ্রামে গিয়ে হাবিল সম্পর্কে খোঁজ খজর নিতে পারে। অর্থ বিত্ত না থাকুক, ছেলে হিসেবে হাবিল ভালো সে কথা গ্রামের সবাই বলবে। আর বিস্তর জমিজমা না থাকুক, ছেলে একেবারে বউকে না খাইয়ে রাখবে তাও নয়। ছেলে যে ছোটখাটো একটা চাকুরি করে সে তো আপনারা জানেনই।

কথা হচ্ছিল পাশের ঘরে। একটু আগে মরিয়ম গিয়ে নাস্তা দিয়ে এসেছে সে ঘরে। দিয়ে এসে ঘরের বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে শুনছিল ওদের কথা। ওর বুক ধড়ফড় করছিল ভেবে, বাবা কী জবাব দেয়।

না, বাপ তার মনের কথাটাই বলেছিল। দেহেন ভাইসাব, আপনে কওনের আগেঅই আমরা ছেলের সম্পর্কে খোঁজখবর লইছি। ঘটকের কথায় কি আর বিশ^াস করা যায়! তাগঅ কাছে পাত্র কী পাত্রী কী, সবই ভালা। তারা কয়টা টেহার লইগ্যা দিনরে রাত করত পারে। ঘটক ঘটকের মতো কইছে, আমরা আঙ্গ মতোন খোঁজ-খবর লইছি। চিরদিনের লইগ্যা যেন মাইয়্যারে দিমু, খোঁজখবর কইরা দেখমু না সে বাড়ি কেমন, সে পোলা কেমন। তাই কি অয়? … আঙ্গ পক্ষত্থে কোনো আপত্তি নাই। বাকীডা আপনেগ বিবেচনা।

মরিয়মের যা শোনা দরকার তা শুনেছে। আর দাঁড়িয়ে থাকার দরকার নেই। ও বেড়ার কাছে থেকে সরে যায়।

তারপর যা হয়। বাপের সাধ্য অনুযায়ীই ধুমধাম করে মরিয়মের বিয়ে হল। শাশুড়ি আর দেবর তাকে ভালো মনেই গ্রহণ করল। না, যতটা বলেছিল হাবিলের চাচা, হাবিলরা ততটা গরীব নয়। তবে হ্যাঁ, তাদের তুলনায় অনেকটাই অসচ্ছল। তাই বলে ভাত কাপড়ের কষ্ট যে ছিল তাও না। সে বাড়িতে কষ্ট বলতে যা ছিল, তা হল হাবিলকে না দেখতে পাওয়া। হাবিল যে বাড়ি আসত না এমনও না। বলতে কী প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আসত বাড়ি। কিন্তু যখন চলে যেত তখন যেন খাঁখাঁ করত সারা বাড়ি। অথচ সব সময় শাশুড়ি তার কাছেই থাকত। দেবরও দিন শেষে বাড়ি ফিরত। কিন্তু মরিয়মের মনে হত, সে যেন সারা বাড়িতে একাই। সপ্তাহ যেন কাটত না তার।

পরপর চার সপ্তাহ বাড়ি না ফেরাতে অধৈর্য হয়ে গিয়েছিল মরিয়ম। সে জন্যইতো মরিয়ম সকাল না হতেই ছুটে গিয়েছিল হাবিলের মেসে।

অন্ধকার আকাশে লক্ষ লক্ষ তারা। তারার আলো কিছুটা যেন ফ্যাকাসেও হয়ে এসেছে। চারদিকের কুয়াশাও যেন কমে আসছে। হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যে অন্ধকার কাটবে। ভোর হবে।

ব্যথায় কেঁপে কেঁপে উঠছে মরিয়ম। দাঁতে দাঁত চেপে ও ব্যথাটা সহ্য করার চেষ্টা করে। বড় বড় শ^াস নেয়। আম্বিয়া পরম মমতায় ওর মাথায় পেটে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এতে যেন ও কিছুটা আরাম বোধ করে। মরিয়মের মনে হয়, মা পাশে থাকলে বোধহয় এভাবেই আদর করত। এই অল্প কদিনেই কত ঝড় বয়ে গেল জীবনের উপর দিয়ে। কে জানে মা বেঁচে আছে কিনা।

এইতো মাত্র দু’সপ্তাহ আগেও মরিয়মের শিয়রের পাশে এমন করেই আরেক অনাত্মীয় বৃদ্ধা বসে থাকতেন। সারারাত। যার ছেলেকে মিলিটারিরা মেরে ফেলেছিল। মেয়ে আর পুত্রবধূকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। আম্বিয়া চাচিও একইভাবে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। মায়েরা কী সবাই এক রকম হয়! মায়েদের সবার স্পর্শেই কি এক রকম অনুভূতি হয়?

ব্যথা ভুলে থাকতে মরিয়ম মন অন্যদিকে ফেরানোর চেষ্টা করে। সেই বৃদ্ধা মায়ের মতোই সেবা করেছেন তার। প্রথম প্রথম তো কেউ বুঝতে পারেনি যে টাইফয়েড হয়েছে। ভেবেছিল, ভয়ে চিন্তায় শরীর খারাপ হয়েছে। কিন্তু জ¦র কিছুতেই ছাড়ছিল না। এমনি এমনি করে দু’সপ্তাহ গেল।

কখন যে জোরে জোরে কথা বলতে শুরু করেছে মরিয়ম নিজেও জানে না।

কিন্তু জ¦রদঅ ছাড়ে নাগ চাচি। দিন পনেরো পার অইতেঅই উনারা কইথাইক্যা একজন ডাক্তার লইয়্যা অইল। সেই ডাক্তারঅই ধরতে পারল আমার টাইফয়েড অইছে। জ্বরে ভুইগ্যা ভুইগ্যা ততদিনে আমি শুকাইয়্যা গেছি। হেই সময় সেই মমতাময়ী নারী নিজের হাতে আমারে পাখির ছাওয়ের মতোন মুখে তুইল্যা খাবার খাওইছে। আমি খাইতে পারতাম না। মুখে রুচি বলতে কিছু আছিল না। আর কিছু মুখে দিলেঅই বমি অইয়্যা যাইত। আমারে জোর কইরা পেটের সন্তানের কথা কইয়্যা কইয়্যা খাওয়াইত সেই মায়। সন্তানের কথা ভাইব্যাঅই জোর কইরা গিলতাম। মাস দেড়েক ভুইগ্যা তই টাইফয়েডত্তে মুক্তি পাইছিলাম। তারপর আস্তে আস্তে গায়ে বল অইল, পায়ে জোর অইল।

আম্বিয়া চাপাস্বরে বলে, হুনছি মুক্তিযোদ্ধাগ পতিও এই দেশের মায়েগ এমনঅই মমতা। ঘর ছাড়া, স্বজন ছাড়া ছেলেগরে এই দেশের মায়েরা পরম আদরে নিজের বাড়িত আশ্রয় দিতাছে। তাগ খাওয়াইতাছে। দেশরে স্বাধীন করতে যারা মারে ছাড়েছে, ঘররে ছাড়েছে, তাগরে আরেক মা আপন কইরা নিতাছে।

চাচিগো, তোমার জামাইদঅ যুদ্ধে গেছে হুনলাম। তার লগে কি আমার আর দেখা অইব! আমারদঅ মনে অইতাছে, আমি আর বাঁচমু না।

অইসব অলুক্ষইণ্যা কথা কইস না মা। একটু চুপ কইরার থাক।

বড় ব্যথা চাচি। আর পারি না। কী করমু কও। কত কথা যে মনে পড়তাছে। মনে করতে চাই না। তঅ মনে পড়ে।

অপেক্ষা কর মা। এই সময় একটু অপেক্ষা করতে অয়।

চাচি এতো কষ্ট কিয়ারে জন্ম দিতে। কহন এই আজাবত্তে  মুক্তি পামু। আহ্, সহ্য হয় নাগো চাচি!

মারে, জন্ম দিতে বড় কষ্ট সইতে হয়। সব মাইয়্যাগঅই এই কষ্টের মইধ্য দিয়া যাইতে অয়।…এই যে, এতো এতো কচি কচি সব পোলারা বনে জঙ্গলে ঘুইরা, খাইয়্যা না খাইয়্যা, বৃষ্টিতে ভিজ্যা অঘুমা থাইক্যা যুদ্ধ করতাছে, মরতাছে দেশের লাইগ্যা, এই যে শত শত মায়েরা বইনেরা ইজ্জত হারাইতাছে, এতো এতেঠ লাশ এইখানে সেইখানে, মিলিটারিরা বাড়িঘর জ¦ালাইয়্যা দিতাছে, সম্পদ লুট কইরা নিয়া যাইতাছে, বাবার চৌখের সামনে সোমত্থ মাইয়্যার সম্মান নষ্ট করতাছে, মায়ের চৌখের  সামনে জোয়ান পুতেরে গুলি কইরা মারতাছে, স্বামীর সামনে স্ত্রীর ইজ্জত নিতাছে, স্ত্রীর চৌখের সামনে স্বামীরে হত্যা করতাছে- এইসব কী কম দুঃখের, কম কষ্টের! …এই যে আমরা সব, বাড়ি ছাইড়া ভিটামাটি ছাইড়া অজানা অচেনা কই যাইতাছি, এই কী কম দুঃখ। শেকড় উপড়ানর দুঃখরে মা। এতো রক্ত এতো দুুঃখ এতেঠ ত্যাগ কিয়ারে, না একটা স্বাধীন দেশ চাই। নিজের দেশ চাই। যেহানে মাথা উঁচা কইরা হাঁটতে পারমু। যেহানে পরাণ খুইল্যা নিশ^াস লইতে পারমু। একবার ভাব্, এর লাইগ্যা আঙ্গ কতডা মূল্য দিতে অইতাছে। কতডা কষ্ট স্বীকার করতে অইতাছে। সবার চৌখ্যে অনে একটাঅই স্বপ্ন, নিজের একটা দেশ। নতুন একটা দেশ। নতুন সেই দেশের জন্মের লাইগ্যাঅইদঅ সবার এতো কষ্টরে মা। তাই কই, জন্মমাত্রই কষ্টের।…দাঁতে দাঁত চাইপ্যা আরেকটু কষ্ট কর মা। পানি ভাঙ্গা শুরু অইছে, নতুন মুখ দেখার আর দেরি নাই। দেখবি, সন্তানের মুখ দেখলে সব ব্যথা, সব কষ্ট দূর অইয়্যা যাইব। নতুন কইরা বাঁচার ইচ্ছা অইব।

মরিয়মের চিৎকারে ওদের নৌকার সবাই একে একে জেগে উঠেছে। বাকি নৌকারও একজন দুজন করে জাগছে।

আজ যেন কুয়াশা অনেক কম। চারদিকে আবছা আলো ফুটছে। তবে সূর্য এখনও দেখা দেয়নি। মাঝি জানিয়েছে, নৌকা এখন নিরাপদ জায়গায় আছে। সকালে নাশতা খেয়ে আস্তে ধীরে রওয়ানা হবে আবার।

নদীর পাড় ধরে একদল লোক যাচ্ছে। আবছা আলোতেও চেনা যায় ওরা মুক্তিযোদ্ধা। সবার বড় বড় চুল, মুখভর্তি দাড়িগোঁফ, ছেড়া মলিন পোশাক, কাধে অস্ত্র। দৃঢ়পদে হাঁটছে সবাই। তাদের একজন নৌকার বহর দেখে হাঁক দেয়, কারা যায়? শরণার্থী নাকি? … যান যান, ভয় নেই। এই এলাকা মুক্ত হবে যেকোনো দিন।… বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, যদি একটিও গুলি চলে তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলবেন। যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।…আমরা সে দুর্গ গড়ে তুলতে পেরেছি। শীঘ্রই আমরা সারাদেশ মুক্ত করে ফেলব, ইনশাআল্লা!

আটটা নৌকার সকল যাত্রী ততক্ষণে উঠে পড়েছে। সবাই মুক্তিযোদ্ধাদের যাওয়া দেখছিল। বাংলার সোনার সন্তানেরা, দামাল ছেলেরা যাচ্ছে। তারা হয়তো নিজের বুকের রক্তের বিনিময়েই সবার জন্য একটা লাল সূর্য এনে দিবে। একটা নতুন দেশ দিয়ে যাবে।

মরিয়ম চাপাস্বরে চিৎকার করলেও সবাই শুনতে পাচ্ছে। সবাই অপেক্ষা করতে থাকে কখন মরিয়মের অনাগত সন্তান আসবে পৃথিবীতে। সবাই অপেক্ষা করতে থাকে একটা নতুন শিশুর চিৎকার শোনার জন্য। সবাই অপেক্ষা করতে থাকে একটা নতুন সূর্যের। সবাই অপেক্ষা করতে থাকে কখন সব কুয়াশা সরে গিয়ে আঁধার ভেদ করে সবুজ ধান ক্ষেতের ওপার থেকে উঠবে লাল একটা সূর্য!

লেখক : তরুণ কথাশিল্পী

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares