নির্জন রঙের বিন্যাস : শাহানা কায়েস

প্রধান রচনা : বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত চার কথাসাহিত্যিক

 

[ কথাশিল্পে অবদান রাখার জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার (২০১৭), বাঙলার পাঠশালা-আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পুরস্কার (২০১১), আজকের কাগজ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৪) ও বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস কথাসাহিত্য সম্মাননা (২০১৮) পেয়েছেন মামুন হুসাইন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা : ১৩টি গল্পগ্রন্থ, ৪টি উপন্যাস, ১টি উপন্যাসিকা, ২টি প্রবন্ধগ্রন্থ। ]

 

নির্জন রঙের বিন্যাস

শাহানা কায়েস

হঠাৎই আমি একা হয়ে পড়েছিলাম। মাস্টার্স পরীক্ষার পর যখন বন্ধুরা একে একে চাকরি, বিয়ের কারণে এদিক ওদিক ছড়িয়ে গেল। আমি তখন সবে কলেজে পড়ানো শুরু করেছি। পাশাপাশি এম. ফিলের কাজ শেষ করে পি এইচডি-তে ভর্তি হয়েছি।

মেয়েদের ক্ষেত্রে যা হয়, মাস্টার্স পাশ করলেই সমাজ জানিয়ে দেয় ‘বয়স বেড়ে যাচ্ছে, কাজেই বিয়ে করো, বিয়ে করো…।’ মেয়েদের চাকরি, প্রতিষ্ঠা এগুলো সমাজের চোখে কিছু না। আবার বিয়ে করব না এমন তো প্রতিজ্ঞা করিনি। কিন্তু নিজের পছন্দ, রুচি, মেধা, যোগ্যতা সবকিছুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একজন তো চাই। মনের মধ্যে অস্থিরতা হয়। অস্থিরতা হলেই পলাশ ভাইয়ের কাছে ছুটে যাই। দর্শনের মেধাবী ছাত্র পলাশ ভাই সরকারি কলেজে পড়ান। পাশাপাশি আগ্রহ অ্যাসট্রোলজিতে। আমার বাড়িয়ে দেয়া হাত দেখতে দেখতে অনেক ভালো ভালো কথা বলেন। বলেন, আমার খ্যাতিমান কারও সাথে বিয়ে হবে। তাঁর ঘরভর্তি বই থেকে দুই একটা বই পড়ার জন্য সব সময় বাসায় আনি। এবার তিনি নিজেই বেছে দিলেন মামুন হুসাইনের শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারি। লেখকের বই আগে পড়িনি। তবে নামে এবং চেহারায় চিনি। আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক চাচার বাসায় কখনও তাকে দেখেছি। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ডাক্তার। পলাশ ভাই হাসতে হাসতে বললেন, উনি ব্যাচেলর এবং খুব ভালো বেহালা বাজান।

নানা কারণে বইটি পড়তে দেরি হলো। শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারিতে ছয়টি গল্প। (১) মৃত খড় ও বাঙাল একজন, (২) এ এক পুনরুত্থান, (৩) সনকার কালা বুড়ি ও আমাদের দিনযাপন, (৪) এক প্রার্থনার ঘুম, (৫) আকুল পরান, (৬)  রাজযাত্রা কিংবা সহজ বেহুলা পাঠ। গ্রামীণ পটভূমিতে লেখা গল্পগুলোর ভাষা বুঝতে প্রথমে জটিল লাগলেও আস্তে আস্তে গভীরে যেতে শুরু করি। বাঙাল, মুংলা, আকালি, একাব্বর, কালা বুড়ি, আকুল- এই প্রান্তিক মানুষগুলোর যাপিতজীবন ও রক্তপাত যেন খানিকটা খানিকটা উন্মোচিত হচ্ছে।

এর মধ্যে অদ্ভুত ঘটনাটি ঘটলো। এক বিকালে আম্মা আমাকে, আমাদের পারিবারিক আত্মজন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সারোয়ার জাহান মামার বাসায় বেড়াতে নিয়ে গেলেন। মামি ‘এসিডি’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। মামা-মামি আমাকে স্নেহ করেন। সেখানেই আলাপ হলো গল্পকার মামুন হুসাইনের সাথে, যার বইটা ক’দিন ধরে আমি নাড়াচাড়া করছি। অন্তর্মুখী আমি অবশ্যি তক্ষুনি বলতে পারলাম না ওকে সেকথা। হঠাৎ মনে হলো, এই আলাপ করিয়ে দেবার মধ্যে কোনো পূর্বপরিকল্পনা নাই তো?

 

যা ভেবেছিলাম তাই। পরদিন মামি ফোন করে জানতে চাইলেন, কেমন লেগেছে মামুনকে। তারপর বললেন, কাল আমার বাসায় বিকালে আসো, দু’জনে কথা বলো। জোর করে কিছু হবে না, তোমার ভালো লাগাটা সবার আগে।

মনের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করে মামির বাসায় গেলাম। কারণ এসব দেখাদেখির মধ্যে সূক্ষ্ম সব অসম্মান জড়িয়ে থাকে। একজন মানুষের হ্যাঁ-না বলার উপর আমার জীবননির্ভর করবে- এটা আমি মানতেই পারি না। অবশ্যি আমার প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মামি কখনওই মেয়েদের অসম্মান হবে, এমন কিছু করবেন না- তা আমি নিশ্চিত ভাবেই জানি।

মামির বাসায় সেই প্রথম দু’জনের আনুষ্ঠানিক কথা হলো। কথা হলো দু’জনের অফিস, চাকরি, আমার সাঁওতাল বিষয়ক অভিসন্দর্ভ, ওর নতুন লেখাÑ এসব বিষয়ে। ছয় বছর বয়সে বাবার অকাল মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে ও ভারি বিষণœ হয়ে পড়ে। ওর মা তখন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াতেন। ’৭১-এ স্কুল নিশ্চিহ্ন হলে উনি চাকরিহীন হন। পরবর্তীসময় ফ্যামিলি প্ল্যানিং-এ চাকরি নিয়ে তিন ছেলেকে বড় করেন।

এই ঘটনার তিন চার দিন পর কলেজে গেছি। ক্লাস নিয়ে টিচার্স রুমে বসেছি। তখন পিয়ন এসে কুরিয়ারে পাঠানো চিঠিটা হাতে দিল। অচেনা হাতের লেখা! খুলে দেখি মামুনের চিঠি। কি সুন্দর করে লিখেছে! আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ওর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে আমার মনে আর কোনো দ্বিধা থাকল না।

শাহানা কায়েস, মাননীয়েষু, আপনার অনুমতি ছাড়া পত্র লেখার জন্য দুঃখিত। ঠিক এভাবে লেখা জরুরি কিনা তা নিয়ে সেই সন্ধ্যা থেকেই ভাবছি, এলোমেলো হচ্ছি এবং ছিঁড়েও ফেলছি। আপনি জানবেন এ সব-ই উদ্বেগ, ভয় এবং স্ট্রেসের লক্ষণ! আবার এর ভেতর প্রতিদিন-ই পারিবারিক যোগাযোগ বাড়ছেই! যে শহরে বসবাস করছি, সে শহরে চা খেতে খেতে (আপনি অবশ্য চা বিরোধী), এইসব বিবিধ ভাবনাগুলো যে আদান-প্রদান করবো সেই ভরসা-ইবা কোথায়? সর্বোপরি, আমার ধারণায়, চিঠি লিখতে যে সামান্য আড়ালের প্রয়োজন হয় তাতে করে দু’একটি কথা বলা অপেক্ষাকৃত সহজ হয়। আমার আয়োজন অনেকটা তাই- আসলে আমি বলতে চাইছিলাম, আপনার বান্ধববর্গ থেকে আমার সম্পর্কে যে ধারণা জন্মেছে, সেই তথ্যগুলি-ই যথেষ্ট মনে করেন কিনা, নাকি আরও বিশেষ  কোনো query আছে? আমার মূল উদ্বেগ ঠিক এখানটাতেই। কারণ, এটি তো সত্য যে, আমাদের দু’জনেরই বেড়ে উঠার ইতিহাস দু’রকম। কাজেই দেখার চোখ, সৌন্দর্যবোধ, ভাবনা এবং অভ্যাসগত হেরফের বিচিত্র নয়। অথচ Marriage নামক সামাজিক প্রতিষ্ঠানটি এই বিরোধের মধ্যেই সম্পর্ক গড়তে চায়। আপনি সমাজ বিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্রী, আপনাকে Love, Friendship, Guilt, Culture এসব বক্তিমা করে বোঝানো পাপ। বরঞ্চ আমি নিজে যেভাবে বুঝেছি, সেই কথাটি দু’একটি লাইনে আলাপের জন্য বলি- Marriage-কে আমি Friendship  হিসেবেই বিবেচনা করি। আবার Friendship-এর bondage ততবেশি গভীর হয়, Cultural gap যতবেশি কমে; এই কালচার অর্থ গপ্পো লেখা আর রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া যে নয়, সেই কথাটিই জোরের সাথে বলতে চাই। আমি বলি, এগুলো হলো সংস্কৃতিচর্চার নানান উপায়। একটি মানুষ সারাজীবন গপ্পো না লেখে, শান্তিনিকেতনের ব্যাগ-চটি ব্যবহার না করেও যে যথেষ্ট সংস্কৃতিবান হতে পারে সেই কথা কি আপনি মানবেন? আসলে মানুষ বাড়ে, তার একটি index হলো তার সার্বিক  aesthetics’-এ একটি গুণগত পরিবর্তন আসে। Culture-এর এইটি উল্লেখযোগ্য একটি অংশ বলে আমার বিশ্বাস হয়। আপনার Hair style, টিপ, চটি, খাদ্য অভ্যাস থেকে আরম্ভ করে গপ্পো-পদ্য-গান শোনা পর্যন্ত সবই আপনার সৌন্দর্যবোধকেই reflect  করে।

এই পটভূমি থেকেই আমার সমস্ত আচরণ, বিশ্বাস, ত্রুটি এবং স্খলনকে আপনি অনুগ্রহ করে বুঝতে চাইবেন, এ আমার প্রার্থনা। আমার অকাল প্রয়াত বাবা, আমার অতিসাধারণ চাকুরে মা, আমার দারিদ্র্র্য, আমার নীচতা, আমার শঠতা এবং আমার ভীরুতা-ও এই জটিল জীবনের-ই স্মারক! আমার বিশেষ ইচ্ছা, আপনি এই সব ব্যক্তি Negative –Virtue-গুলো সর্বাগ্রে মাথায় রেখেই আমাকে বিবেচনা বা অবহেলা করবেন! কারণ আমার রুচিতে বাধে যে, আপনাকে সত্যই আমি যাতনা দিচ্ছি কিনা! সামাজিক সম্পর্কের কালে আমার আচরণের দারিদ্র্যে আপনি আহত হন, প্রশ্নকাতর হোন এবং মানসিক আনন্দ হারিয়ে ফেলেন চিরকালের মতো, সেই দুমর্তি যেন আমার না হয়; কারণ, মানুষ বাঁচে কতদিন? তারাশঙ্করের লেখায় দেখবেন, তিনি বলেছেন জীবন এত ছোটো ক্যানে! তখন মায়া হয়, শোক হয়, চোখ জলে ভরে আসে! এর পরেও মানুষ সংসার করে, Successfully-ই করে- লীলা রায়, গৌরি আইয়ুব, মার্কেজের স্ত্রী মার্সিডেজ, এ সবের কয়েকটি নাম মাত্র। অনুগ্রহ করে এগুলোকে তুলনা বলে ভাববেন না।

আমার আচরণের যে সব বৈপরিত্য আপনাকে পীড়িত করে, তার একটি তালিকা এবং চিকিৎসা প্রেরণ করলে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। আমার দীর্ঘ এলোমেলোÑ অপ্রয়োজনীয় বক্তৃতা শোনার জন্য আনন্দ প্রকাশ করছি।

দয়া করে লিখবেন, গালমন্দ করে হলেও! খাওয়া, ঘুম, এ সব চলছে তো, নাকি মৌনব্রত!! ইতি – ২৫.৮.৯৭

মামুন হুসাইন

Ph. 776001 – 9 / 224 (off.)

[দুপুর বারোর পরে]

Dept. of Psychiatry

Rajshahi Medical College hospital

 

পরের ঘটনাগুলো দ্রুত ঘটলো। আমাদের বিয়ে ঠিক হলো ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৭। হাতে তখন ৩ সপ্তাহ বাকি। আমরা দু’জন দু’জনকে চেনার চেষ্টা করি। চিঠি লিখি। ফোনে কথা বলি। মাঝে মাঝে রিকশায় বেড়াই। কথা বাড়তে বাড়তে মস্তিষ্কের কোথাও এক আনন্দ-বেদনার জগৎ ছড়াতে থাকে। আমি যেন হঠাৎই নির্ভর করার মতো কাউকে আবিষ্কার করলাম। এ রকম স্বজনের অপেক্ষা, কে জানে হয়ত করেছি ঢের দিন। আমার সব কথা ওকে বলি। বলি ১৮ বছর বয়সে কিভাবে চিঠিতে আলাপ হয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সাথে। অনেক বছর যোগাযোগ ছিল, চিঠিতেই। রাজশাহীতে এসে আমাদের বাসায় ছিলেন। আমার বন্ধুদের গল্প করলাম। আমার আনন্দ বিষাদ সব। ও বড় মনোযোগী শ্রোতা। কথা বলতে বলতে আমার চোখ টলমল করে উঠলে রুমাল এগিয়ে দেয়। মনে হলো আমার অন্তর্গত জগৎ ও যেন অনেকখানি আন্দাজ করতে পারলো। কারণ একটা চিঠিতে লিখলো-

‘…আমি অবশ্য তোমার কথা সামান্য যদি বুঝে থাকি, তাহলো তুমি ভালো মেয়ে, লক্ষ্মী মেয়ে, আবেগী এবং অভিমানি, অভিমানি, অভিমানি… নিশ্চয়ই যে কোনো সৎ পরিকল্পনার জন্য আবেগ এবং অভিমান জরুরি উপাদান, তবে এক চিমটি Reason and Reality মেশাতে পারলে তা হয়, যাকে বলে সোনায় সোহাগা। তোমাকে এমনি ভাবে দেখতে আমার ঘোরতর লোভ হয়।’

 

বিয়ের পর ও আমাকে বললো : আমাদের দু’জনেরই লেট ম্যারেজ। কাজেই আমরা আমাদের বাকি জীবনটা আনন্দে-শান্তিতে কাটাতে চাই। ঝগড়া, ভুল বোঝাবুঝি, রাগারাগি করে সময় নষ্ট করতে চাই না। ও ওর কথা রেখেছে। আমাদের প্রায় ২১ বছরের সংসার জীবনে ওর সাথে কোনো বিষয়ে আজ পর্যন্ত আমার মনোমালিন্য হয়নি। আমি চাইলেও ওর নির্লিপ্ততায় আর এগোতে পারিনি। তারপর আরও বললো হাসতে হাসতে: আমি স্ত্রৈন হয়ে জীবনযাপন করতে চাই। আমার সব দায়িত্ব তোমাকে দিতে চাই।

বাসায় কেউ বেড়াতে এলে ও বলে, এটা মালার বাড়ি। আমাকে ও দয়া করে তিন বেলা খেতে দেয়, থাকতে দেয় Ñআমি তাতেই খুশি।

আমি সমুদ্র ভালোবাসি, অথচ কখনও দেখিনি শুনে প্রথমেই আমাকে নিয়ে যায় কক্সবাজারে। ওর ছোট্ট একটা ন্যাশনাল প্যানাসনিক ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল। সেটা কাঁধে ঝুলিয়ে গান শুনতে শুনতে সারাদিন সমুদ্রের তীর ধরে হাঁটতাম আমরা। ওর কোনো কিছুতেই না নাই। যদি বলি, আকাশের চাঁদ চাই, মনে হয় সেটাও এনে দেয়ার চেষ্টা করবে। ছোটখাট কোনো কিছু ওর নজর এড়ায় না। হয়তো শাড়ি পরার সময় সেফটি পিন খুঁজে না পেয়ে বিরক্ত হচ্ছি Ñ দেখা যাবে, সেদিনই ডজন খানেক সেফটি পিন বাসায় হাজির।

বিয়ের পর ওর সম্পর্কে দ্রুত যে বিষয়গুলো জানলাম, তা হলো :

১. চাকরির বয়স ৮ বছর। এই ৮ বছরে ওর সঞ্চয় বলতে রয়েছে বস্তা বস্তা বই। বইগুলো রাখার কোনো ব্যবস্থা নাই। ঘরের কোণে স্তূপ করে রাখা। সরকারি চাকরি ট্রান্সফ্যারেবল বিধায় বইগুলো বহন করার জন্য রয়েছে বিশাল সাইজের সব নীল চটের বস্তা।

২. প্রচুর সনি, হিটাচি, টিডিকে ক্যাসেট। ইউরোপ-ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল থেকে শুরু করে পুরোনো গানের বিপুল সমারোহ।

৩. ডাক্তার, পিজিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের ভয়ার্ত লেখাপড়া; তারপরও লেখালেখি, বেহালা শেখা ইত্যাদিতে আগ্রহ কিছুমাত্র কম হয় না। প্রখ্যাত বেহালা বাদক শ্রী রঘুনাথ দাসের কাছে বেহালা শিখেছে। বিয়ের পর কাকাবাবু আমাদের বাসায় এসে শেখাতে পছন্দ করতেন।

৪. কখনও কোনো অনুষ্ঠানে ডাক্তার, লেখক এসব পরিচয় দিতে পছন্দ করে না। ও সাধারণ হয়ে থাকতে চায় সবসময়। কেউ বাধ্য করলে  ‘এই সরকারি জবে আছি’ বলে কথা শেষ করে।

৫. বই ছাড়া থাকতে পারে না। ট্রেনে, বাসে চলাচলের সময় বই এ একটা এক্সট্রা কাভার লাগায় যাতে কেউ ও কি পড়ছে জানতে না পারে।

বিয়ের আগে আমার জীবনে বৈচিত্র্যময়তা খুব একটা ছিল না। আমার স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, চাকরিÑ সবই রাজশাহীতে। বিয়ের পর আমি বেড়ানোর চমৎকার একটা জায়গা পেলাম। আমরা প্রতি সপ্তাহে, বৃহস্পতিবার অফিস শেষে দুপুরের ট্রেন ‘কপোতাক্ষে’ কুষ্টিয়ায় গিয়ে শাশুড়ি মায়ের সাথে কাটিয়ে শুক্রবার বিকেলের ট্রেন মধুমতিতে ফিরতাম। যাবার সময় পোড়াদহ স্টেশনে নেমে ভ্যানে করে কুষ্টিয়া শহরে আসতাম। ভ্যানে ওঠার অভিজ্ঞতা আমার প্রথম। গ্রামের এবড়োথেবড়ো পথে সরিষা-ধান ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে ভ্যান চলত, বাতাসে আমাদের চুল এলোমেলা হয়ে যেত। শাশুড়িমা যেন টের না পায় কুষ্টিয়ায় ভ্যানে যাচ্ছি- তাই অনেক আগে নেমে রিকশায় উঠতাম সুবোধ বালক-বালিকার মতো। ক্রসিং-এর জন্য কতদিন ঈশ্বরদী বা পোড়াদহ স্টেশনে গভীর রাত পর্যন্ত থাকতে হয়েছে। আমরা ট্রেন থেকে নেমে অচেনা পথ ধরে হাঁটতাম। ও চা খেত। আমি চা খেতে পছন্দ করতাম না। চা নিয়ে একবার একটা মজার গল্প করেছিল, আমার আজও মনে আছেÑ

‘…এক সময় আমাকে রেল ধরে চাকরি করতে হতো। এ রকম এক জংশনে ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া একটি বিলবোর্ড পড়েছিলাম- হিন্দি, বাংলা এবং ইংরেজিতে একই কথা লেখা। সেই ব্রিটিশ রাজের তৈরি করা নোটিশ- ঝাপসা মনে পড়ছে : গরম চা পান করো, সমৃদ্ধ স্বাস্থ্য সুখ লাভ হইবে, শীত ও বর্ষার ব্যাধি দূর হইবে।… গরম চা প্রতি পেয়ালার দাম এক আনা… ইহা খাইতে বেশ সুস্বাদু, ইহাতে কোনও অপকার হয় না… ইহাতে মাদকতা শক্তি নাই …।’

খুব গুছিয়ে সংসার শুরু করি আমি। সবাই যখন বিয়ের পর ড্রেসিং টেবিল, খাট, ডাইনিং টেবিল বানায়, আমি শুরু করি বই রাখার আলমারি দিয়ে। প্রথমেই ওর রিডিং রুম সাজিয়ে দিই। বই রাখার ছয়টি আলমারি বানাই। ওর ড্রয়ার ভর্তি পার্কার, লুমি, পেলিক্যান, ওয়াটারম্যান ব্র্যান্ডের নানান কলম দেখে বুঝতে পারি, কলমের নেশাও নেহায়েত কম নয়। সেগুলো রাখার জায়গা করি। ক্যাসেট রাখার র‌্যাক বানাই। ও মুগ্ধ হয়। ওর এই মুগ্ধতা আমার দেখতে ভালো লাগে।

বরাবর দেখেছি লেখালেখি, প্রকাশনা ইত্যাদি বিষয়ে ও ছিল একেবারে নির্লিপ্ত। সাহিত্যবলয় তথা সাহিত্যের চেনা পথঘাট থেকে ও থাকে যোজন যোজন দূরে। পুরস্কার, খ্যাতি ওকে খুব সামান্যই স্পর্শ করে। অথচ লেখালেখির বাইরে ওর আছে সম-অসম বয়সের এক বিপুল বন্ধুবলয়- নাটকের, উপন্যাসের, ফিল্মের, পেইন্টিং-এর বাইরের এই মানুষগুলো অনেকে ওর লেখক পরিচয়ও খুব ভালো জানত না। বাসাইল, পাদ্রিশিবপুর, রাজবাড়ি, চাটমোহর, সাপাহারের সেইসব অগুনিত মানুষের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ অটুট থেকে গেছে। ওর সাথে অনেক সাধারণ মানুষের বিয়েতে গেছি আমি। ক্ষৌরকার কিংবা রাঁধুনির ছেলের বিয়েতে আমাকে ওর প্রথম দিকের কর্মক্ষেত্রে দূর-দূরান্তে নিয়ে গেছে। পাদ্রিশিবপুরের একজন প্রয়াত বয়োবৃদ্ধ মি. হিরণ গোমেজ মৃত্যুকাল পর্যন্ত ব্লক লেটারে চিঠি লিখতেন। আর চিঠির শেষে লিখতেন ‘আদিউ’। দুই অসম বয়সের বন্ধুত্ব বটে! তিনি এমনকি মৃত্যুর শেষকাল পর্যন্ত তার দাঁতের-চোখের-বুকের প্রেসক্রিপশনও কপি করে পাঠিয়েছেন ওর চুড়ান্ত অনুমোদনের জন্য।

ওর যখন ব্যস্ততা কম ছিল তখন আমরা প্রচুর সিনেমা দেখেছি একসাথেÑ সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল, বুদ্ধদেব, মনিকাউল, আদুর গোপাল হয়ে ইউরোপের নানান ছবি। প্রথম আমি তারকোভস্কির ডাইরি ও আদুর গোপালের সাক্ষাৎকার এবং গোদার-ফেলিনি-বুনুয়েল ইত্যাদি ফিল্ম মেকারদের লেখা বইপত্র দেখি ওর কাছে।

ও যখন পিজিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের জন্য গেল, অরণ্য তখন ৩ মাসের শিশু। এক কিশোরী গৃৃহকর্মীকে নিয়ে আমি থাকি। অফিসে যাওয়ার সময় অরণ্যকে গৃহকর্মীসহ আম্মার কাছে রেখে যাই। আবার ফেরার সময় নিয়ে আসি। আমার মন খারাপ হতো একা একা বাচ্চা, অফিস, সংসার সামলাতে। কখনও কখনও কাঁদতাম। ওর সাথে যোগাযোগের মাধ্যম তখন চিঠি, মাঝে মাঝে ল্যান্ড লাইন। ও অনেক চিঠি লিখতো আমাকে। আমার কান্নায় অস্থির হয়ে কান্না নিয়ে চিঠি লেখে …

‘কান্নার উপকারিতা বলে শেষ নাই। এ ব্যাপারে আমিও এক সময় অতিশয় চ্যাম্পিয়ান ছিলাম। বুড়ো লোকেরা পিতার অকাল মৃত্যুতে আমার মাথায় হাত রাখলে আমার গলা ব্যথা হয়ে চোখ ভিজে আসত। মা হয়ত স্কুল থেকে, অফিস থেকে ফিরতে দেরি করছে। আমি লুকিয়ে জল ঝরিয়ে চলেছি। এরপর আমি যখন বৃদ্ধ হয়ে উঠলাম, তখন কান্না আসতে শুরু করে অন্য সব বিবিধ কারণে। দু’একটা উদাহরণ দিই। যেমন : খুব চমৎকার কিছু দেখেছি। চোখ টলমল করে ওঠে। হয়ত পড়ছি, পড়তে পড়তে কোনো Image ভেতরটা নরম করে দেয়। মাঝে মাঝে Confession করি, তখন চোখে বর্ষা নামে। এরকম হয়েছিল একবার, সমুদ্র দেখতে গিয়ে। একটু একটু জ্বর (আর আমি এত Shy ছিলাম যে বন্ধু নিয়ে হুল্লোড় করতে পারতাম না)। আমাদের Rest house ফাঁকা, সবাই গেছে সূর্যাস্ত দেখতে। আমার তখন একটা জ্যাকেট ছিল চামড়ার। কালো। সেই জ্যাকেট চাপিয়ে ঢেউ ধরে হাঁটছি হাঁটছি। শেষ সূর্যের আলো মিলিয়ে Light house-এর ঘূর্ণায়মান আলো পড়ছে মুখে, তাতে আমি একবার আলোকিত হই, আর একবার আঁধারে ডুবে যাই; এই সময় সমুদ্রের শব্দ, ঝাউয়ের শব্দ, পায়ের নীচে মৃত কাঁকড়া-ঝিনুক, সব জমাট হয়ে আমাকে অথর্ব করে দেয়। মনে হয়, কি এক অপ্রয়োজনীয় জীবন কাটানো হলো? কত পাপ করলাম? কত রকমের স্খলন? এত গ্রহণ করলাম চারপাশের মানুষ থেকে, অথচ ঋণ স্বীকারের সুযোগই হয়ে উঠল না। এইসব বোধ এসে চোখ ভিজিয়ে দেয়। আমার কান্নার ইতিহাস অনেকটা এই রকম। কান্নার শক্তি অনেক। Catharsis রং হয় চমৎকার। আমার ধারণা মূলত জীবন দুঃখময়! বরঞ্চ একত্রে কান্না অনেক আনন্দের এবং সুখের।’

নিছক গল্প উপন্যাসের বাইরে, ওর পড়ার ক্ষমতা ঈর্ষণীয়। ও হচ্ছে ভোরাসিয়াস রিডার। জটিল অংক, জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিদ্যার বাইরে যে-কোনো বিষয়ে ওর আগ্রহের শেষ নাই। সমাজবিজ্ঞান আমার পঠিত বিষয়। কিস্তু সমাজবিজ্ঞানের নতুন নতুন বই ওর সংগ্রহে অনেক বেশি। ওর বহুদিনের ইচ্ছা খাদ্য নিয়ে, মাছ নিয়ে একটি গদ্য লিখবে। মেনুর সোসিওলজি, মাংসের নৃতত্ত্ব এবং মাছের রকমফের নিয়ে মাঝে মাঝেই কথা হয় ওর সাথে। বাজার থেকে সঠিক মাছ চেনা, মাছ খোঁজার কাজও সে গল্প উপন্যাস লেখার মতো যতœ নিয়ে করে বরাবর।

আমি একবার ভাবলাম সাঁওতাল মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে একটি গ্রন্থ রচনা করব, অনেকটা সাক্ষাৎকার বা ওরাল হিস্ট্রির মতো। আমার এম. ফিল থিসিসের বিষয় ছিল সাঁওতাল নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। রাজশাহি জেলার গোদাগাড়ি থানার কয়েকটি গ্রাম নির্বাচন করি আমার গবেষণায়, ঐ সময় তথ্য সংগ্রহের কাজে আমাকে সাহায্য করে সরেস সরেন। বহুদিন যোগাযোগ ছিল না, শুধু ওর গ্রাম আর বাড়িটা মনে ছিল- এই সূত্র ধরেই মামুনকে নিয়ে সরেস সরেনের বাড়ি পৌঁছাই। সরেসকে সেদিন পাই না, ধান তোলার কাজে মাঠে ছিল। তবে ওর পরিবারের অন্যান্যদের পেয়ে যাই। মামুনের সাথে কিছুক্ষণের মধ্যে ওদের এত ভাব হয়ে যায় যে ওরা মামুনকে কিছুতেই ছাড়তে চাচ্ছিল না। ওর মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা অনেক।

কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও তুতুল ভাবির গল্প প্রায়ই করত। ঢাকায় প্রাইভেট ক্লিনিক দিয়ে ওর কর্মজীবন শুরু হয়। ঢাকায় থাকাকালীন সময়ে ওর আনন্দের শ্রেষ্ঠতম জায়গা ছিল ইলিয়াস ভাইয়ের বাড়ি এবং তাঁদের খাবার ঘর। ইলিয়াস ভাই ওর কর্মস্থল বরিশালের পাদ্রিশিবপুরেও গিয়েছিলেন। বিয়ের পর আমাকে তুতুল ভাবির সাথে দেখা করাতে নিয়ে যায়। আমি সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী শুনে ভাবি অনেকবারই বলেন, তোমার ইলিয়াস ভাইয়ের প্রিয় বিষয় ছিল সমাজবিজ্ঞান। ওঁ বেঁচে থাকলে তোমাকে দেখে খুব খুশি হতো। পরবর্তী সময়ে ইলিয়াস ভাইয়ের কবরস্থান দেখতে আমরা একবার বগুড়া যাই।

এক সময় ওর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের যাবতীয় ডিগ্রি নেয়া শেষ হয়। মনোরোগবিদ্যার অন্তর্গত সৃজনশীলতায় ওর ব্যস্ততা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। রুগি দেখার পাশাপাশি লেখালেখির জগৎ তো আছেই। সকাল আটটা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ওর দেখা আমরা পাই না। অরণ্য-নক্ষত্রের সাথে ওদের বাবার দেখা হয় সকালে শুধুমাত্র অল্প সময়ের জন্য। আমার নিজের ব্যস্ততাও বাড়তে থাকে। ছাত্রদের ক্লাশ-পরীক্ষা খাতা দেখা- মাঝে ডিন-এর দায়িত্ব -পাশাপাশি বাচ্চাদের দেখাশোনা, সংসার, বাজার।

আমাদের ব্যক্তিগত সময়, ব্যক্তিগত জগৎ বদলে যেতে থাকে। আমাদের একসাথে খাওয়া হয় না, বেড়ানো হয় না, সিনেমা দেখা হয় না। কথা বলার সময়ও যেন হারিয়ে যেতে থাকে। আমরা চারজন একত্রিত হতে পারি শুধুমাত্র দূরে কোথাও গেলে। সেটাও হয়তো বছরে দুই-একবার।

মানুষ এই বেলা কি পিছন ফিরে দেখে? ‘পঞ্চাশ উত্তীর্ণ’ জীবনে সংসার ধর্ম ‘আর না’- মামুন মজা করে রবীন্দ্রনাথ আওড়ায়। আমার মধ্যে যে অভিমানী ‘আমি’ আছে, সে ছেলেমানুষের মতো ভাবে, বর যদি হয় ব্যস্ত ডাক্তার, লেখক, সর্বোপরি পড়ুয়া কেউ, তাহলে তাদের স্ত্রীরা যতই কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকুক, আনন্দ নিয়ে সংসার করুক, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে হুল্লোড় করে বেড়াক, বছরে দুইবার দেশে ও দেশের বাইরে বেড়াতে যাক, ফেসবুকে বুঁদ হয়ে থাকুক তাদের মন থেকে একাকিত্ব যায় না।

তবে আমার মধ্যে যে বাস্তবের বুঝদার ‘আমি’ আছে- সে চশমা পরা চোখ দিয়ে জীবনের লেনদেন পরখ করে। সে জানে, পৃথিবী নামক গ্রহে ২১টি বছর যে মানুষটির সঙ্গে জীবন কেটে গেল তা অনেক আনন্দের এবং তা আক্ষরিক অর্থেই ঈশ্বরের পরম আশীর্বাদ ও উপহার।

লেখক : অধ্যাপক, মামুন হুসাইনের সহধর্মিনী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares