শাহাদুজ্জামানের গদ্য : বিহ্বলতার ভাষা : স্বপন নাথ

 

প্রধান রচনা : বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত চার কথাসাহিত্যিক

 

[কথাশিল্পী শাহাদুজ্জামান কথাসাহিত্যে অবদান রাখার জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার (২০১৬), মাওলা ব্রাদার্স কথাসাহিত্য (১৯৯৬) পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩২ : ৫টি উপন্যাস, ৬টি গল্পগ্রন্থ, ৫টি প্রবন্ধ, ২টি সাক্ষাৎকার, ১টি ভ্রমণ, ৩টি চলচ্চিত্র, ২টি অনুবাদ, ২টি সম্পাদনা, ২টি গবেষণা এবং ৪টি সমগ্র রয়েছে]

 

শাহাদুজ্জামানের গদ্য : বিহ্বলতার ভাষা

স্বপন নাথ

 

এ সময়ের বাংলা গদ্যসাহিত্যে লেখক শাহাদুজ্জামান স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত। কথাশিল্পী হিসেবেই অতি পরিচিত। ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমিসহ কয়েকটি পুরস্কার তিনি অর্জন করেছেন। কৃতী বিবেচনায় এসব পুরস্কারই শেষ মানদ- নয়, তা মনে রেখে বলা যে, শাহাদুজ্জামান ব্যতিক্রম। পেশায় চিকিৎসক ও চিকিৎসা-নৃবিজ্ঞানী। একইসঙ্গে তিনি কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক, গবেষক, চলচ্চিত্র-লেখক হিসেবে পরিচিত। তাঁর লেখার ভূগোল বৈচিত্র্যময়। এগুলো হলো : ছোটগল্প : কয়েকটি বিহ্বল গল্প; পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ; গল্প, অগল্প, না গল্প সংগ্রহ; কেশের আড়ে পাহাড়; Ibrahim Buksh’s Circus and other Stories; উপন্যাস : দুঃখ; ক্রাচের কর্নেল; খাকি চত্বরের খোয়ারি; আধোঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে; একজন কমলালেবু; গবেষণা : একটি হাসপাতাল, একজন নৃবিজ্ঞানী, কয়েকটি ভাঙা হাড়; Broken Limbs, Broken lives : Ethnogrphy of a Hospital Word in Bangladesh;  ভ্রমণ : আমস্টার্ডাম ডায়েরি এবং অন্যান্য; সাক্ষাৎকার : কথা পরম্পরা; দূরগামী কথার ভেতর; চলচ্চিত্রবিষয়ক : চ্যাপলিন, আজো চমৎকার; চলচ্চিত্র বায়োস্কোপ; ইব্রাহিম বক্সের সার্কাস; অনুবাদ : ক্যাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিন এবং অন্যান্য গল্প; ভাবনা ভাষান্তর; প্রবন্ধ : লেখালেখি; চিরকুট;  শাহবাগ ২০১৩; ইলিয়াসের সুন্দরবন এবং অন্যান্য; সম্পাদনা : দেখা না দেখার চোখ; আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ডায়েরি, প্রভৃতি।

প্রথমত, আমরা লক্ষ করি হাসপাতাল পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর গদ্য। চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে এমন সাবলীল গদ্যসাহিত্য বিরল। যেখানে জীবন-মৃত্যুর উপলব্ধি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। জানা যায়, এ সমাজ ও প্রকৃতিতে কতটা অসহায় মানুষ। হাসপাতালে দেখা যায় মানুষ কীভাবে বেঁচে আছে, আবার হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত জীবনের জন্য একান্ত আকুতি ও বেঁচে থাকার লড়াই। মূলত, অসুস্থ না হলে, রোগীর সহায়ক ব্যক্তি ও দর্শনার্থী ব্যতীত কেউ হাসপাতালে যায় না। রোগী, ডাক্তার, শিক্ষানবিশ-ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা, কর্মচারী, দর্শনার্থী, সহায়ক, অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার, অনাহুত লোকজনসহ বিপরীতের সমন্বিতএ-হাসপাতাল সমাজ।

উল্লেখ্য যে, শাহাদুজ্জামান চিকিৎসা-নৃতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি পেশায় চিকিৎসক, তবে গবেষণার সুবাদে নতুনভাবে জেনেছেন হাসপাতালের সমাজতত্ত্ব। নৃবিজ্ঞানে অনেক মহৎ গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। তবে আমাদের দেশের প্রথম কোনো ব্যক্তি এ নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা করেছেন বলেই মনে হয়। আর কেউ করেছেন কিনা আমার জানা নেই। বিষয়টি অবশ্যই আগ্রহের।

 

লক্ষণীয়, হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার আয়োজন যেটুকু আছে, তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। লোকমুখে শোনাÑ সেখানে চিকিৎসা বলে কিছু নেই। আংশিক সত্যতা আছে বৈকি। শাহাদুজ্জামানের নিবিড় অবলোকন থেকে আমরা জেনে নিই যে, কয়েকটি সেবামূলক স্থানে সাধারণ গরিব মানুষ একেবারে অসহায়। এর মধ্যে হাসপাতাল একটি। পরিস্থিতি সাপেক্ষে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য জীবনের যাবতীয় সহায়-সম্পদ কেউ কেউ হারিয়ে ফেলে। জীবনের সৌন্দর্যে ও তাড়নায় মানুষ যায় হাসপাতালে, সেক্ষেত্রে উলটো অস্তিত্বসংকটের কূপ খনন করে ফিরে আসে। এ হলো অনিবার্য নিয়তি। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি, ঋণগ্রস্ত হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে মানুষ। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে, ব্যক্তিত্ব হারানো থেকে শুরু করে বাড়ি-ঘর ছেড়ে একধরনের ভাসমান মানুষে পতিত হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। চিকিৎসাকর্মে নিয়োজিত কেউই রোগীদের আর্থ-সামাজিক স্তরের কথা বিবেচনা করে না। এত অসহায়ত্ব, মানুষের কান্না দেখেও কারও টনক নড়ে না। এ হলো আমাদের তথাকথিত পবিত্র সমাজের অপবিত্র চালচিত্র। এ বিষয়গুলোকে শাহাদুজ্জামান গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও তাঁর লেখায় নথিভুক্ত করেছেন।

চিকিৎসা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা সীমাহীন। তবে, এ চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে চলছে বাণিজ্য। সব মিলিয়েই এটা চিকিৎসাব্যবস্থাÑ ভিন্ন এক রাজ্য। ফলে, তাঁর গবেষণাটি চমৎকার হওয়াই স্বাভাবিক। গবেষণাকর্মের রূপান্তরিত বাংলা ভাষ্য হলোÑ ‘একটি হাসপাতাল একজন নৃবিজ্ঞানী কয়েকটি ভাঙা হাড়’। গবেষণাকর্মের জন্য গৃহীত তথ্য-উপাত্তের আলোকে কথাসাহিত্যের আবহে এ-গ্রন্থ লিখিত। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষকরা হয়তো বলবেন, এখানে গবেষণার ভাষা বজায় থাকেনি। ওখানেই লেখকের কৃতিত্ব- তিনি প্রচলিত রীতি ভেঙে ফেলেছেন। বস্তুত, তা প্রতিষ্ঠানবিরোধী গদ্য। ফলে, সাধারণ পাঠক গল্পের মতোই এ গ্রন্থ পাঠে আনন্দ পেতে পারেন। জীবনের বাস্তব গল্পগুলোই এতে স্থান পেয়েছে। কেসস্টাডিগুলোই তাঁর গবেষণার মূল সূত্র। তুলে ধরেছেন হাসপাতালকেন্দ্রিক বিচিত্র মানুষের বিচিত্র পেশা ও কর্ম। কেসস্টাডিগুলোতে তিনি তুলে ধরেছেন (ক) রোগী (খ) রোগীর সাথে থাকা সহায়ক (গ) ওয়ার্ডবয়, ঝাড়ুদার, দারোয়ান, (ঘ) নার্স ও (ঙ) ডাক্তারসহ বিভিন্ন জনের মানসিকতা, আর্থ-সামাজিক মর্যাদা এবং শ্রেণিচরিত্র সাপেক্ষে তাদের ভূমিকা। এখানে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ পরস্পর সম্পর্কিত। শাহাদুজ্জামান তাঁর বর্ণনায় কোনো ব্যক্তির মূল নাম উল্লেখ করেননি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, ব্যক্তিচরিত্র, ভূমিকা ও এর পরিণাম-বাস্তবতা বিবেচনা। তাঁর বিবরণে উঠে এসেছে হাসপাতালের সমাজ অর্থনীতি ও নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের চালচিত্র। আমরা এখানে লেখকের বর্ণনাংশ পর্যবেক্ষণ করতে পারি।

(ক) ‘‘অনিশ্চয়তার আরেক অভিঘাত লাগে রোগীর অর্থনৈতিক জীবনে।… কখনও কখনও রোগীকে আবার একই ঔষধ দুবার করেও কিনতে হয়।… আলী আহমদেরভাই লিস্ট অনুযায়ী দোকান থেকে সব কটি ঔষধ কিনে আনেন এবং অপারেশন থিয়েটারের ওয়ার্ডবয়ের হাতে দেন।… কিছুক্ষণ পর ডিউটি ডাক্তার ওটির বাইরে এসে আলী আহমদের ভাইকে ধমকাতে থাকেন ‘দোকান থেকে ঔষধ দেখে আনেন নাই। এখন অপারেশন হবে কি করে?… আলী আহমেদর ভাই প্রায় ৫০০ টাকা খরচ করে আবার ইঞ্জেকশন দু’টা কিনে আনেন। পরে তিনি আমাকে বলেন. ‘আমি নিজ হাতে গুণে ওয়ার্ডবয়কে ঔষধগুলি দিছি। আমি জানি ঐ বেটা ইঞ্জেকশন দুইটা চুরি করছে।’… পরে সেই ডাক্তারও আমাকে বলেছেন, ‘ওয়ার্ডবয়রা যে হাসপাতালের ঔষধ চুরি করে সামনের দোকানে বিক্রি করে দেয়, এটা তো ওপেন সিক্রেট।’’ [একটি হাসপাতাল, একজন নৃবিজ্ঞানী, কয়েকটি ভাঙা হাড়; পৃ. ৫০]

সাধারণত রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থায় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বাইরে যাবার নিয়ম নেই। কেউ যায়ও না। কিন্তু রোগীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এমনই যে তাদের বাইরে যেতে হয় জীবিকা ও পরিবারের প্রয়োজনে। এমন দু-টি ঘটনা লেখক উল্লেখ করেছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এক ভিক্ষুক। তার শরীরে হিপ-স্পাইকা লাগানো হয় যাতে শরীর নড়াচড়া না করে। ওয়ার্ডে যখন ডাক্তার থাকেন না, দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে, ওই ভিড়ের ফাঁকে এ ভিক্ষুক ওই অবস্থাতেই ওয়ার্ডের বাইরে যেতেন এবং হাসপাতালের সামনে কিছুক্ষণ ভিক্ষা করে আবার ওয়ার্ডে ফিরে আসতেন। আরেকজন হাতে প্লাস্টার লাগানো রোগী হাত শার্টের মধ্যে লুকিয়ে দারোয়ানকে ফাঁকি দিয়ে প্রায়ই দুপুরে সিনেমা হলে চলে যেতেন এবং ম্যাটিনি শো দেখে আবার ওয়ার্ডে ফিরে আসতেন।

রোগীর সাথে থাকা পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনের মন-মানসিকতা চিত্রিত করেছেন লেখক। তিনি গবেষণা করেছেন নেদারল্যান্ডস-এ। ফলে সেখানের সামাজিক মূল্যবোধেও তাঁর নজর ছিল। হাসপাতালকেন্দ্রিক কিছু বৈশিষ্ট্য ও মানুষের ধারণা তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। নেদারল্যান্ডস-এর একজন গবেষক ভারত ও নেদারল্যান্ডস-এর মূল্যবোধের তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। শাহাদুজ্জামান বিষয়টি যুক্ত করেছেন তাঁর লেখায়, ‘নেদারল্যান্ডস-এ যেখানে বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোই ছেলেমেয়েরা তাদের দায়িত্ব বলে মনে করেন সেখানে ভারতে একজন তার বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠালে তা সেই ছেলের, বাবার প্রতি অবহেলা এবং অবজ্ঞার প্রমাণ হিসেবেই বিবেচিত হয়।…কিন্তু বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে এভাবে ভালোবাসা এবং দায়িত্বকে পৃথক করে ফেলা অত্যন্ত দুরূহ।… যে-দেশে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়ক শক্তিগুলো অনুপস্থিত সেখানে ব্যক্তির বিপদের সময় পরিবারই হচ্ছে প্রধান আশ্রয়।’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ৯৪]

 

ওয়ার্ড-বয়, ঝাড়–দার, দারোয়ানরা দায়িত্বে ছোট হলেও হাসপাতালে এরা খুবই শক্তিশালী। ওয়ার্ডবয় দারোয়ানরা প্রচ্ছন্নভাবে হাসপাতাল-ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণ মানুষের পক্ষে ডাক্তার, নার্স ও অন্য স্টাফদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না। তারা বাধ্য হয়ে বয় দারোয়ানের সাথেই সকল যোগাযোগ সম্পন্ন করে। ওয়ার্ডের শৃঙ্খলা তারাই রক্ষা করে, তবে তা অমানবিকভাবে। তারা কোনো সময় রোগীর আত্মীয়-স্বজন অ্যাটেনডেন্টদের ওপর চড়াও হয়। ধাক্কা, চড়-থাপ্পড় বা আঘাতের মাধ্যমে ওয়ার্ড থেকে বের করে দেয়। ডাক্তার ও নার্সরা তা নীরবে সমর্থন করেন। কারখানার অসুস্থ একজন শ্রমিকের ভাষ্য হলো : ‘ঐ দারোয়ান ব্যাটা নিজেই একটা লেবার, কিন্তু ভাব দেখায় সে জানি একটা বস। ব্যাটা তুইও গরিব আমিও গরিব।’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ১০০]

নার্সরা নিজেদের কষ্ট বুকে নিয়েও মানুষের সেবা করে যান। এ এক ভিন্ন জীবন। অনেকসময় ওয়ার্ডবয়দের কাজ নিজেদের করতে হয়। একদিকে রোগীদের চাপ, অসম্মান, অন্যদিকে ডাক্তারদের গালি, ধমক শুনতে হয়। এরপরও তারা দায়িত্ব পালন করে চলেন নিষ্ঠার সাথে। লেখক সমমর্মী হয়ে বলেছেন,-‘ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল নার্স বলতে প্রদীপ হাতে আত্মত্যাগী মর্যাদাশীল নারীর যে চিত্র এঁকেছিলেন, বাংলাদেশি নার্সদের বেলায় সে চিত্র মেলে না। বাংলাদেশের নার্সরা বরং প্রদীপবিহীন, হতাশ একদল নারী যারা ওয়ার্ডে কেবলই ফাইল আর রেজিস্টার নিয়ে ছুটাছুটি করছেন।’ [প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩২]

শাহাদুজ্জামান পেশায় চিকিৎসক। ফলে, তিনি খুব কাছে থেকে দেখেছেন হাসপাতালের পরিস্থিতি। তবে  সে-ই দেখা আর গবেষণাউত্তর দেখার মধ্যে বিস্তর ফারাক। তাঁর এ সুলিখিত বিবরণ থেকেই জানা যায়। আগে দেখেছেন একজন চিকিৎসক হিসেবে, কিন্তু একজন নৃবিজ্ঞানীর দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণে বিষয়ের গভীরতল তিনি আবিষ্কার করেন। তাঁর নিজের কথায়, ‘ডাক্তার হিসেবে মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে আমি কাটিয়েছি অনেকদিন কিন্তু এই গবেষণা করতে গিয়ে মনে হয়েছে এ হাসপাতালকে আমি যেন ঠিক চিনতাম না আগে, চিনলাম নতুন করে।’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ১৮৫]

যা কিছু লিখেন না কেন শাহাদুজ্জামান মূলত একজন কথাসাহিত্যিক। কথাসাহিত্য তাঁর প্রধান এলাকা হলেও সবকিছুতেই কথাকারের মুনশিয়ানা রয়েছে। তাঁর উপন্যাস একজন কমলালেবু বা ক্রাচের কর্নেল বিষয়ে অনেক কথাই বলা যায়। তিনি প্রমাণ রেখেছেন যে বাংলা কথাসাহিত্যে আরও অনেককিছু ও ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বলার আছে। এছাড়াও তিনি লিখেছেন চ্যাপলিন আজো চমৎকার, আধোঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে। এসবই তাঁর লেখা জীবনভিত্তিক উপন্যাস। এ-ধরনের উপন্যাস লিখতে যথার্থ জ্ঞান, মেধা ও পাণ্ডিত্য দরকার। তাছাড়া তথ্যের বিভ্রান্তি এড়িয়ে সত্যাসত্য অভিনিবেশসহকারে বিবেচনা করতে হয়। অনেকেই বলেছেন ইতিহাসের উপাদান, জীবনী অবলম্বনে উপন্যাস রচনায় লেখকের সৃজনশীলতা থাকে না। স্মরণীয়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত তিনটি উপন্যাস- সেই সময়, প্রথম আলো ও পূর্বপশ্চিম এ ধরনেরই লেখা। বস্তুত, কর্নেল তাহের ও কবি জীবনানন্দের ওপর লিখিত তথ্যসমূহ থেকে স্বীয় সৃজনপ্রতিভায় গ্রহণ করেছেন উপাদান। এগুলো তাঁকে জারন করতে হয়েছে। মূলত, লিখিত ও প্রতিপাদিত তথ্যের ভিত্তিতে সাজানো কথামালা হলোÑ ক্রাচের কর্নেল ও একজন কমলালেবু। উল্লেখযোগ্য যে, ক্রমনিরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় তাঁর স্বনির্মিত গদ্য ও সাহিত্যকর্ম।

শাহাদুজ্জামানের রয়েছে চলচ্চিত্র বিষয়ে প্রচুর পাঠ। তিনি চলচ্চিত্র চিন্তক হিসেবেও পরিচিত। চিত্রনাট্য সম্পর্কে রয়েছে তাঁর অভিজ্ঞতা। কয়েকটি স্থানে সেই সিনেমাটিক রীতি তিনি নিরীক্ষা করেছেন। কোনো কোনো লেখার শুরুই করেছেন এ রীতিতে। কখনও সিনেমাটিক কাট-অ্যাকশন-কাট পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন। তাঁর ভাষার সারল্য, স্বকীয়তা, স্বাতন্ত্র্যরীতি, কাব্য ও সংগীতময়তা এবং নাটকীয় বৈশিষ্ট্যভিন্ন মেজাজের কথাকার হিসেবে শাহাদুজ্জামানকে চিহ্নিত করেছে।

বিষয় নির্বাচনেও তাঁর মেধার স্বাক্ষর লক্ষণীয়। গদ্যের বিষয় হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন চিরতারুণ্য সমর্থিত কর্নেল তাহের, জীবনানন্দ, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, চ্যাপলিনের মতো ব্যক্তিকে। তারুণ্যের আবেগ তিনি বুঝে নিতে সমর্থ হয়েছেন। বাংলাদেশে উল্লিখিত খ্যাতজন সম্পর্কে প্রচুর আগ্রহ রয়েছে তরুণসমাজে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির কাছে তুলনারহিত আবেগের বিষয়। মাঝে মাঝে মনে হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহের রহস্যের মধ্যেই রয়ে গেছেন। শাহাদুজ্জামানের উপন্যাস থেকে আমরা জেনে নিই যে, তিনি স্বপ্ন দেখেছেন শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার। নিয়তি হলো- অস্থিরতার মধ্যে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হলেন। রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, উপন্যাসের আখ্যানে লেখক তৎকালীন রাজনীতিকে অস্বীকার করেননি। তিনি মূলত তাঁর সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা ও বিপ্লবী জীবনের প্রতি আলোকপাত করেছেন। কর্নেল তাহের যখন বিপ্লবের আহ্বান জানিয়েছেন সে সময় ঘটে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকা-। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের নির্মাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এ নির্মমতা সংঘটিত হওয়ার পর কর্নেল তাহের রাজনৈতিক বিভ্রান্তির চক্রে নিপতিত হন। এ থেকে আর উদ্ধার হয়নি তাঁর। শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তাহের। বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর হওয়া জাসদের কর্মীরা আর সংগঠিত হতে পারেনি, রাজনৈতিক কর্মসূচির বিভ্রান্তি ও ভুলের কারণে। যুক্তির কারণে বলা যায়, জাসদ ও কর্নেল তাহেরের রাজনৈতিক কর্মসূচি ভুল ছিল। কিন্তু তাহের আক্রান্ত হয়েছেন সে সময়ে তাঁর দ্বারা উপকৃত ব্যক্তিবর্গের বিশ্বাসঘাতকতায় ও ক্ষমতা দখলকারীদের অন্যায় সিদ্ধান্তে। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিলÑ রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ না রাখা ও ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করা। ইতিহাসের এমন ঘূর্ণাবর্ত পরিস্থিতির মধ্যে পতিত হওয়া কর্নেল তাহেরকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন শাহাদুজ্জামান। কেন লিখতে গেলেন সমস্ত দায় ও ঝুঁকি মনে রেখে? এ-প্রসঙ্গে লেখকের বক্তব্য জেনে নিতে পারি : ‘আমি মনে করি, স্বপ্নের যেমন মৃত্যু হয় না, কর্নেল তাহেরের মতো বিপ্লবীদেরও মৃত্যু নেই। তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক ব্যতিক্রমী চরিত্র।… আমি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময় নিয়ে নিজের মতো করে উপন্যাসটি লেখার চেষ্টা করেছি।… আমি মনে করি, ব্যক্তি হিসেবে কর্নেল তাহের ব্যর্থ। কারণ তিনি যা করতে চেয়েছেন তার কিছুই করতে পারেননি। তাহেরকে বুঝতে হলে তার সময় বুঝতে হবে। সেই সময়ের তারুণ্যের আকাক্সক্ষাগুলো কেমন সাহসের সাথে ধারণ করেছেন সেগুলো লক্ষ করতে হবে।’

সম্প্রতি প্রকাশিত একজন কমলালেবু উপন্যাসের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। কেন তিনি পছন্দ করেন জীবনানন্দকে? দু-টি চরিত্রই বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে সাড়াজাগানো। একজন মুক্তিযুদ্ধ, বিপ্লব ও রাজনীতি ও অন্যজন সাহিত্যে। আমার ব্যক্তিগত ধারণা যে, শাহাদুজ্জামান লেখক হিসেবে মেধাবী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। এ কারণে তিনি বুঝতে পেরেছেন সময়ের স্পন্দন। তরুণ পাঠক, ভাবুক ও চিন্তকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচিত রহস্যময় দু-টি নাম, এ দু-জন খ্যাতকীর্তি ব্যক্তি। একারণেও হয়তো তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এ দু-জনকে নিয়ে উপন্যাস লিখতে। এ দু-জনকে তিনি তাঁর সৃজনসামর্থ্যে যথাযথ বিনির্মাণ করেছেন, তা বলাবাহুল্য।

প্রসঙ্গত, ইতিহাসের বাস্তবতার সঙ্গে স্বীয় ভাবনার সম্পর্ক রেখেই শাহাদুজ্জামান তাঁর ক্রাচের কর্নেল উপন্যাস নির্মাণ করেছেন। ইতিহাসের তথ্যের ব্যত্যয় তিনি করেননি। ইতিহাস তাঁর কাছে উপন্যাসের উপাদান ও তথ্যের উৎসসূত্র মাত্র। তিনি তা যথার্থই ব্যবহার করেছেন। শিল্পী হিসেবে ইতিহাসের রীতি থেকে দূরে থেকেছেন নির্মোহভাবে। এ দূরত্ব বজায় রাখার ফলেই তাহেরকে শিল্পীসত্তায় নির্মাণ করতে সচেষ্ট ছিলেন। তবে ক্রাচের কর্নেল উপন্যাসের শৈলী নয় বরং এ বিষয় নিয়ে অনেক কথাই বাজারে প্রচলিত। ফলে, এ উপন্যাস প্রসঙ্গে আলোচনায় স্বয়ং লেখকের বক্তব্যকে সামনে রাখা জরুরি বলে মনে করি। তা হলো, সমূহ বিতর্কের বিষয়গুলো এড়ানো যেতে পারে। আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হয়Ñ কর্নেল তাহের রাজনৈতিক চরিত্র, এর চেয়ে বেশি শিল্পদৃষ্টিকোণ থেকে তিনি ইতিহাসের এক রহস্যময় ও সাহসী ব্যক্তি। লেখক মূলত এক স্বাপ্নিক ব্যক্তিকে তুলে ধরেছেন ইতিহাসের উপাদান ও পিলসুজে। শাহাদুজ্জামান কয়েকটি সাক্ষাৎকারে এ উপন্যাস রচনার পটভূমি ও তাঁর নিজস্ব ভাবনা অনেকবারই বলেছেন। সেগুলোর দু-একটি এখানে উল্লেখযোগ্য।

(ক) […] বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাহের একটি জটিল এবং ইন্টারেস্টিং ক্যারেকটার। ফলে তাহেরকে নিয়ে বই রচনা করা ছিল নানাদিক থেকে চ্যালেঞ্জিং।… খুব সাধারণ একটি পরিবারে বেড়ে উঠে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের একেবারে মোড় ঘুরিয়ে দেবার জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। অসাধারণ সব অ্যাডভেঞ্চারস, সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন।… সব মিলিয়ে তাহের সাহিত্যের জন্য একজন চমৎকার চরিত্র।’ [দূরগামী কথার ভেতর, পৃ. ২২-২৩]

(খ) ‘জাসদের ব্যাপারে আমার কিন্তু কোনো ইমোশনাল এটাচমেন্ট নাই, তাহের নিয়ে আমার অতীত কোনো মোহও নাই। ফলে আমি কিন্তু অনেকটাই অবজেক্টিভলি তাহের চরিত্রটা কিংবা জাসদকে দেখতে পেরেছি। বইটাতে আমি একেবারে নিরপেক্ষ তা তো বলতে পারি না, কারণ তাহেরকে যখন আমি প্রধান চরিত্র করছি তখন একটা পক্ষ তো নিয়েই ফেলছি। এসব ক্ষেত্রে চরিত্রকে নির্মোহ একটা জায়গা থেকে দেখা দরকার। কোনো হিস্টোরিক্যাল চরিত্র নিয়ে উপন্যাস লিখতে গিয়ে তার গভীর প্রেমে পড়ে গেলে সেটা তো মুশকিল। আমি যেহেতু পার্টি-পলিটিক্স করি না ফলে চরিত্রের সাথে সেই দূরত্বটা রাখা আমার পক্ষে সুবিধা হয়েছে।’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ৫৭]

বস্তুত, বিপ্লবী তাহেরের মানস ও স্বপ্নকে দেখা বিষয়টি রাজনৈতিক হলেও এখানে তা গৌণ। ব্যক্তি স্বপ্নবাজ তাহের এখানে মুখ্য। ’৭১-এ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা, লুটতরাজে পাকিস্তান থেকে তাহেরের পালিয়ে আসা, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান, অপারেশন, এরপর একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই সবমিলিয়ে শাহাদুজ্জামান তাঁকে জাতীয় বীর হিসেবে কল্পনা করেছেন ও বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। স্মরণীয় যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-, ক্যু, পালটা ক্যু, বিশ^াসহীনতা, বিশ^াসঘাতকতা ও হত্যাসহ ইতিহাসের বিকৃতি, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী গোষ্ঠীর উত্থান মিলে এক অস্থির সময়ে তাহেরের কর্মকা- পরিচালিত। এ অর্থে কখনওই তিনি তাঁর জীবনে অবসর সময় পার করেননি। এক অতি সাধারণ জীবন থেকে যাঁর উত্থান ও জীবনের নির্মিতি। তিনি বিপ্লবের স্বপ্নে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন ধাপে ধাপে। তাহেরের বিপ্লবী জীবনের ক্রমপরিণতির বিষয়কে গুরুত্বের সাথে রূপায়ণ করেছেন লেখক। ‘একটি ঘোর লাগা পতঙ্গের মতো তাহের যেন ছুটে চলেছেন আলোর শিখার দিকে, তার জন্য নির্দিষ্ট ভবিতব্যের দিকে।’ [ ক্রাচের কর্নেল; পৃ ১১৪]

এরপর তিনি ছুটে চলেছেন তাঁর লক্ষ্য পুরণে। রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর গন্তব্যের দিকে অভিযাত্রা। একটি পা হারান যুদ্ধে। ফলে, বিজয়োল্লাসের আনন্দে তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি। এরপর বঙ্গবন্ধুর দেশগড়ার প্রচেষ্টা ম্লান হতে থাকে নানামুখি ষড়যন্ত্রে। শাহাদুজ্জামান বঙ্গবন্ধুর আক্ষেপকে যেভাবে বলেছেন, ‘‘জিনিসপত্রের লাগামহীন দাম, চোরাকারবারী, কালোবাজারী, বেআইনি অস্ত্র, ব্যাংকলুট, ভেজাল, দুর্নীতির এক বিশাল পাহাড় তখন শেখ মুজিবের সামনে। বিহ্বল শেখ মুজিব ভেবে পান না কি করে এই পাহাড় ডিঙ্গোবেন তিনি। এক বক্তৃতায় তিনি আক্ষেপ করে বলেন : ‘সবাই পায় সোনার খনি, তেলের খনি, আর আমি পাইছি চোরের খনি।’’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ২০৯]

বঙ্গবন্ধুর সহযোগী তাজউদ্দীন আহমদের বিচ্ছিন্নতা এবং বিপরীতে খন্দকার মোশতাক চক্রের সক্রিয়তা শাহাদুজ্জামান চমৎকারভাবেই উপস্থাপন করেছেন। একপর্যায়ে তাহের বিপ্লবের দীক্ষায় তরুণ যুবসমাজকে নিয়ে গণবাহিনী গেড়ে তোলেন এবং তাঁর দল জাসদ মাঠে রাজনৈতিক কাজে সক্রিয় হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য যে, ১৫ আগস্ট ঘটে যাওয়া ইতিহাসের নির্মম হত্যাকা-ে, ‘দেশজুড়ে এক গাঢ় নিস্তব্ধতা নেমে আসে’। যে স্তব্ধতা কাটানোর চেষ্টা এখনও চলমান রয়েছে। উপন্যাসের বিবরণে রয়েছে যে, সে সময়ে সেনা কর্মকর্তারা এ বিষয়ে উদাসীন ছিলেন। কর্মকর্তা শাফায়াত জেনারেল জিয়াকে রাষ্ট্রপতি হত্যার খবর দিলেও তিনি ছিলেন নির্বিকার। ‘‘জিয়াকে মোটেও বিচলিত মনে হয় না। তিনি শান্তকণ্ঠে বলেন : প্রেসিডেন্ট ইজ ডেড সো হোয়াট? শেখ মুজিবুর রহমানের মুত্যু যেন একটি দাপ্তরিক ব্যাপার মাত্র।… ভোরবেলা ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনার কোনো অভিঘাত ঘটবার চিহ্ন জিয়াউর রহমানের মধ্যে নেই।’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ২৩৪] লেখকের বর্ণনা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, যারা বঙ্গবন্ধুর কাছে কাছে ছিল এতদিন, যারা নানাভাবে অভিষিক্ত হয়েছে, তারা একেবারেই উন্নাসিক। অতঃপর দেশ-জাতি এক উদ্ভট ভবিষ্যতের দিকে এগোতে থাকে। তা বোঝা যায় খন্দকার মোশতাক-এর একটি ইচ্ছের উদাহরণে। খন্দকার মোশতাক নিজের ব্যবহৃত টুপির নমুনা জাতীয় পোশাকের অংশ করতে তার ইচ্ছে ব্যক্ত করে। ‘দেশের একটা ঘোর ক্রান্তিকালে যখন একটি টুপি হয়ে ওঠে সবচেয়ে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তখন অবস্থাটি আর ঠিক বাস্তব থাকে না, কেমন যেন রহস্যময়, রূপকথার পরাবাস্তব এক জগতে পরিণত হয়।’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ২৪৬]

ঘটল ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকা-। জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হলো। পর্যবেক্ষণ করা গেল এত বিপর্যয়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর খুনিÑ ফারুক, ডালিম, রশিদ, হুদা, নুর, মোসলেমসহ সবাইকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। কর্নেল তাহের বঙ্গবন্ধু হত্যা মেনে নিতে পারেননি। তিনি বিস্মিত হন ক্ষমতার ভাগাভাগি দেখে। লেনিনের অনুসরণে ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার অভ্যুত্থানের তারিখ নির্ধারণ করেন তাহের। জিয়াকে মুক্ত করেন তিনি। জেনারেল জিয়া সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ডের নামে ভিন্ন গ্রুপ তৈরি করতে সমর্থ হন। ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার ঐক্যের নামে যে বিদ্রোহ হয়, তা সিপাহী-জনতার বিপ্লব হিসেবে তারা বিবেচনা করেন। এর ফলে উলটো জিয়ার হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়। তাহের অনুভব করেনÑ ‘জিয়া সানগ্লাস দিয়ে অদৃশ্য করে রাখেন তার চোখ’। জিয়া যাঁর বদৌলতে মুক্ত হলেন, তাঁকেই শত্রু হিসেবে বিবেচনায় কারাগারে নিক্ষেপ করেন। তাহের তাঁর অভিমতে জানাচ্ছেন, যে অপরাধে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে, ওই একই অভিযোগে জিয়াও অপরাধী। এ বিষয়কে অস্বীকার করা হলে ক্ষমতায় বসা যায় না। এরপর প্রহসনের বিচারে তাহের স্বীয় মূল্যায়নে জবানবন্দিতে বলেছেন : ‘জিয়া শুধু আমার সঙ্গেই নয়, বিপ্লবী সেনাদের সঙ্গে, সাত নভেম্বরের পবিত্র অঙ্গীকারের সঙ্গে, এক কথায় গোটা জাতির সঙ্গে বিশ^াসঘাতকতা করেছে।… আমাদের জাতির ইতিহাসে আর একটাই মাত্র বিশ^াসঘাতকতার নজির রয়েছে, তা হচ্ছে মীর জাফরের।’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ৩২৫] আরও বলেন তিনি :  ‘এ জাতির প্রাণে আমি মিশে আছি। কার সাহস আছে আমাদের আলাদা করবে? নিশঙ্ক চিত্তের চেয়ে জীবনে আর কোনো বড় সম্পদ নেই। আমি তার অধিকারী। আমি আমার জাতিকে তা অর্জন করতে ডাক দিয়ে যাই।’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ৩২৬] এত দৃঢ় সংকল্পের মানুষ আমরা ক-জনই পেয়েছি! ‘জেলের চার দেয়ালের ভেতর নিঃসঙ্গ পঙ্গু যে মানুষটি তেলাপিয়া মাছের জীবনবৃত্তান্ত লক্ষ করেছেন তাকে বরাবর একজন নিঃসঙ্গ অভিযাত্রী বলেই মনে হয়েছে। একটি খেয়াল পোকা যেন ভেতর থেকে তাকে ঠেলছে অবিরাম।’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ৩২২]

অনুষ্ঠিত হলো আরেকটি নির্মমতার উপাখ্যান। দ্রুততম সময়ে বিচার ও ফাঁসিতে তাহেরের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। এর আগে তিনি তাঁরই সহপাযোদ্ধা মেজর জিয়াউদ্দিনের লেখা কবিতা পাঠ করেন। জন্মমাটি কাজলায় তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। ‘ঘনবৃষ্টিতে আবছা দেখা যায় অস্ত্র হাতে রেইনকোট পরা সিপাইরা দাঁড়িয়ে আছে এদিক ওদিক। বৃষ্টিতে ঝুম ভিজছে কবরটি। পানি চুইয়ে চুইয়ে ঢুকছে কবরের অনেক ভেতরে। সেখানে শুয়ে আছেন একজন অমীমাংসিত মানুষ।’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ৩৪২) সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজসহ অনেক বলেছেন যে, তাহের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, এ স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটেছে।

কর্নেল তাহের ইতিহাসের একজন বীর। তাঁকে লেখক তাঁর স্বীয় প্রতিভায় নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। যে ঝুঁকির কথা আগেই বলেছিলাম, এর মীমাংসা লেখকই দেবেন। আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো, লেখক চেয়েছেন ইতিহাসের একটি ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় ও সংশ্লিষ্ট চরিত্রকে দেখানো। উপন্যাসের ভাষার প্রাঞ্জলতা পাঠককে ধরে রাখে। মনে হয় যেন কোনো রূপকথার নায়ককে পর্যবেক্ষণ করছি। ভাষার এ সহজ লাবণ্যই সকল ঝুঁকি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে লেখককে। শাহাদুজ্জামান অতি সতর্ক থেকেই পরিমিত বয়ানে অঙ্কন করেছেন এক অসামান্য গতিমান বীরপুরুষ কর্নেল তাহেরকে। ইতিহাসের বাস্তবতায় নিরপেক্ষ ও পরিশুদ্ধ থাকার জন্য তিনি দ্বারস্থ হয়েছেন বিভিন্ন তথ্যসূত্রের কাছে। এ ছাড়া ক্রাচবিহীন যেন তাহেরকে চেনা যায় না। এ ক্রাচ শুধু একজন পঙ্গু মানুষের সহায়ক বস্তু নয়। ইতিহাসের মহত্তম ঘটনা ও সময়ের ইঙ্গিতবাহী। সুতরাং, ক্রাচের কর্নেল প্রতীকায়িত এক বিপ্লবীসত্তা। এ উপন্যাসের ভাষা ও বর্ণনায় পাঠক সহজভাবেই তাহেরকে মূল্যায়ন করতে সক্ষম হবেন। ইতিহাসের এক জয়ে তিনি ক্রাচের কর্নেল এবং ইতিহাসের আরেকটি পরাজয়ে তিনি অমীমাংসিত কর্নেল।

সাহিত্যের ইতিহাসে রহস্যময় ও প্রভাবসঞ্চারী লেখক জীবনানন্দ দাশ। বিভিন্ন তথ্যে জানা যায় ব্যক্তিজীবনে নির্জনতাপ্রিয়, অন্তর্মুখী মানুষ ছিলেন তিনি। নিজের প্রয়োজনে কোথাও কিছু বলতেন না। নিজেকে আড়াল রাখতে পছন্দ করতেন। ফলে, তাঁকে আবিষ্কার করা বেশ জটিল কাজ। এ জটিল কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছেন শাহাদুজ্জামান তাঁর একজন কমলালেবু উপন্যাসে। জীবনানন্দের জীবনী, গবেষণামূলক গ্রন্থাদি পাঠে পাঠক জীবনানন্দকে যেটুকু জানতে পারবেন, এর চেয়ে খুব সহজে বুঝে নিতে সক্ষম হবেন এ উপন্যাসে। এখানেই শাহাদুজ্জামানের সার্থকতা। বইয়ের ফ্ল্যাপে এ উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে : ‘বাংলা সাহিত্যের প্রহেলিকাময় এই মানুষ জীবনানন্দ দাশের এক নিবিড় বোঝাপড়ায় লিপ্ত হয়েছেন এ সময়ের কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান তাঁর একজন কমলালেবু উপন্যাসে।’

জীবনানন্দের জীবন ও কর্মভিত্তিক এ উপন্যাসের আখ্যান রচনায় ঔপন্যাসিক জীবনানন্দের ব্যক্তিগত ডায়েরি, কবির ওপর লিখিত গবেষণাগ্রন্থ, কবিতা ও কথাসাহিত্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা ও নিজস্ব উপলব্ধি তৈরি করেছেন। তাঁর অন্য রচনার মতোই এ উপন্যাসের শুরু হয়েছে নাটকীয়ভঙ্গিতে, যা পাঠকের কাছে বিস্ময় ও আগ্রহ সৃষ্টি করে। জীবনের বিভিন্ন ঘটনাবলি, তাঁর জীবনের উপলব্ধি ও সাহিত্যবোধ অংশত বিশ্লেষণ করেছেন। জীবন ও রচনাবলির একটি পরম্পরা দেখানোর চেষ্টা করেছেন লেখক। জীবনানন্দের ব্যক্তিজীবনের কী কী ঘটনার অভিঘাতে ও চিন্তায় কী কী সাহিত্য রচিত হয়েছিল, এর একটি পটভূমি ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন শাহাদুজ্জামান। যে-ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা ও স্তরবহুল ব্যক্তিজীবনের সম্পর্ক সাপেক্ষ-নির্ণীত। বস্তুত, আমরা পাঠক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ জীবনানন্দকে জানা-বোঝার উপাদান পেয়ে যাই এ উপন্যাসে। অন্য বিবরণে হয়তো খ-িত জীবনানন্দকে পেতাম, এখানে পেয়ে যাই জীবনানন্দের মানসসত্তাকে। এ প্রচেষ্টাই লক্ষণীয় শাহাদুজ্জামানের আখ্যানে।

শুরুতেই মৃত্যু সম্পর্কিত ঘটনা উপস্থাপনে লেখক অসামান্য সার্থক। যে বিষয়টি নিয়ে পাঠকসমাজে একটি প্রশ্ন ঘূর্ণায়মান। এ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে লেখক পাঠকের মনে ঘাত তৈরি করতে চেয়েছেন। ‘ট্রামের ক্যাচার তৈরি হয়েছিল লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পশু তাড়াবার জন্য। কিন্তু জীবননানন্দ দাশই সম্ভবত ট্রামের ক্যাচারে আটকে যাওয়া প্রথম ও শেষ মানুষ। ফলে আদিম সাপের মতো ছড়িয়ে থাকা ট্রামের চাকার নিচে তাঁর এই মৃত্যু নিয়ে জট পাকিয়ে যায়। প্রশ্ন জাগে : এটা কি দুর্ঘটনা? নাকি ট্রামের চাকার নিচে আত্মহত্যা করেছেন? অথবা এটা কি আসলে একটা হত্যাকা-, যার পেছনে রয়েছে আরও অনেকের অদৃশ্য হাত?’ [একজন কমলালেবু; পৃ. ৯]

ঔপন্যাসিক একের পর এক ঘটনা বিন্যাসে ক্লাইমেক্স তৈরি করেছেন। এ উপন্যাসে ঘটনা বিশ্লেষণে এমন ঘোর তৈরি করেছেন লেখক, যা পাঠককে কোনো স্পেস নিতে সুযোগ দেয়নি। বস্তুত, বর্ণনায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি লেখার পটভূমি ও রচনার সারার্থ জীবনানন্দের চিন্তা-ভাবনার পরিধি সাপেক্ষে বিশ্লেষণ করেছন। যা থেকে জীবনানন্দের জীবনকে উপলব্ধি করা যায়। কখনও জীবনানন্দের ডায়েরির সাথে মিলিয়ে দেখা, কখনও লেখার সাথে ব্যক্তিজীবনের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ, কোনো লেখার সাথে পারিপাশির্^কতা ও সময় ব্যাখ্যা এবং সর্বোপরি সমকাল বিবেচনায় জীবনানন্দের জীবন বিশ্লেষণ। পর্যায়ক্রমে তাঁর কবিতা ও কথাসাহিত্য রচনার কিছু সংকেত ও পটভূমি তিনি স্পষ্ট করেছেন।

এ উপন্যাসে পাঠককে গোলকধাঁধায় ফেলেছেন শাহাদুজ্জামান। তা অনেকটাই জীবনানন্দীয় কায়দায়। এখান থেকেই পাঠক আগ্রহ নিয়ে বাকি আখ্যানের পথপরিক্রমা অতিক্রম করে থাকেন। আমরা উপন্যাস পাঠ করতে করতে জীবনানন্দের জীবনের গভীরে প্রবেশ করতে থাকি। লেখক তাঁর কথামালায় কী জীবনানন্দের ঘোরলাগা জীবন নিয়ে আগাম ইঙ্গিত দিয়ে রাখেন? আমরা জানি যে, এ জগৎ, জীবন, প্রকৃতি ও মানুষ সম্পর্কে জীবনানন্দের আলাদা এক সূক্ষ্মতর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তবে বিচ্ছিন্ন, স্বাধীন থেকে যেভাবে খাপ খাওয়ানো ও না-খাওয়ানোর খেলায় তিনি হেরে যান, এ কারণে তাঁর ওপর নেমে এসেছিল কষ্টসমূহ। মোদ্দাকথা নির্জনতা প্রিয় এ জীবনানন্দকে গভীরতায় আবিষ্কারের অধ্যবসায় রয়েছে। প্রকৃতি, নদী, গাছ ও পাখিপ্রেমী কবিকে ওই প্রকৃতির প্রেক্ষিতেই নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক তাঁর এ উপন্যাস। এককথায় একজন মগ্ন ব্যক্তি ও কবির জীবন উপস্থাপনে লেখক পাঠককে নিবিষ্ট ও মগ্নতায় আকৃষ্ট করেছেন। তা হলে কে এই জীবনানন্দ? Ñ‘কাব্য, প্রজ্ঞা, ঘাস, ফুল, পাখি মিলিয়ে মূর্ত-বিমূর্ত পৃথিবীর এক মায়াবী শৈশব, কৈশোর জীবনানন্দের। যেন পৃথিবী বড় এক আনন্দের জায়গা, যেন পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে আছে সত্য আর সুন্দর। জীবনানন্দের ছেলেবেলায় জন্ম নেওয়া ওই মায়ার ভেতরেই কি বোনা আছে তাঁর জীবনের বিপদের বীজ? পৃথিবী যখন একটু একটু করে দরজা খুলছে তার সামনে তখন বাস্তবতার কাঁটা মাছ কি চারদিক থেকে বিদ্ধ করেছে তার মায়ার বেলুনকে?’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ১৪]

জীবনানন্দ ছিলেন জ্ঞানপিপাসু একজন পাঠক। লেখক জানাচ্ছেন, ‘১৯২৫ সালের কথা। জীবনানন্দ দাশ একটা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিচ্ছেন, ব্রাহ্মসমাজের একজনের মৃত্যুতে স্মৃতিচারণ। সেখানে মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি আইনস্টাইনের থিয়োরি অব রিলেটিভিটি-এর কথা বলেছেন।… যখন জীবনানন্দের ডায়েরি পড়ছি,  সেখানে দেখি তিনি আইনস্টাইন ও নিলসবোরের যে তর্ক কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে, সেটা নিয়ে লিখেছেন।… জীবনের পুরোটা বুঝতে নানা মাধ্যম সম্পর্কে এ ধরনের কৌতূহল থাকা দরকার।’

জীবনকে এক অভিযাত্রা হিসেবেই ভেবেছেন জীবনানন্দ। ফলে, পুনর্জন্মে ফুল, পাখি বুনোহাঁস হয়ে জন্ম গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়েছেন। বাস্তবতার আঘাতে, বেদনায় নিজেকে লেখকসত্তায় সমর্পণ করেছেন। শাহাদুজ্জামান বলেছেন : ‘বলা যায় জীবনানন্দের গল্প-উপন্যাসগুলো প্রায় সর্বাংশেই আত্মজৈবনিক। তাঁর নিজের জীবনের সংকটগুলো নিয়েই তিনি নাড়াচাড়া করেছেন সেই গল্পে। গল্প-উপন্যাসগুলো যেন তাঁর ডায়েরিরই সম্প্রসারিত রূপ।’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ৭১] এ উপন্যাসেও আমরা লক্ষ করি, তাঁর দাম্পত্য জীবনের সংকট যত বেড়েছে তত তিনি কথাসাহিত্যের দিকে মনযোগী হয়েছেন। আমরা অনুমান করি, জীবনের নিকষ বাস্তবতা রূপায়ণের কারণেই বোধহয় তিনি তাঁর রচিত কথাসাহিত্য ট্রাঙ্কবন্দি রেখেছিলেন। শাহাদুজ্জামান নিশ্চিত হয়ে বলেছেন, ‘জীবননান্দ- লাবণ্যের দাম্পত্য সম্পর্ক ছিল অসুখী, অসফল’। বৈষয়িক ভাবনার বাইরে জীবনানন্দ কবিতাবিষয়ক কথা বলেছিলেন লাবণ্যকে। উলটো লাবণ্য বলেছেন,- ‘আমি ওসব কবিতার ধার ধারি না’।

জীবনানন্দ অতি সংবেদনশীলতায় যাপিত জীবনের দ্বন্দ্বাত্মক পরিস্থিতি বোঝাপড়া করেছেন। এর ভেতর-বাহির খুঁজেছেন বলেই বিপন্ন বিস্ময়ে খুঁজে পেয়েছেন দ্বন্দ্বসংকুল জীবনের সারার্থ। লেখক জীবনানন্দের এ উপলব্ধিকে বর্ণনা করেছেন যেভাবে : ‘জীবনের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা বীভৎসতা, নির্মমতার খোঁজ তিনি পেয়েছেন। পতঙ্গের জীবনের আনন্দকেও সন্দেহ করেছেন তিনি, তাঁর মনে হচ্ছে ওসব আসলে মুখোশ। কারণ, তিনি জানেন মৌমাছি যত আনন্দেই উড়–ক, তাকে ঠুকরে খাবার জন্য আছে দাঁড়কাক, প্রজাপতি যে ফুর্তিতেই তার রঙিন পাখা মেলুক, তার সেই পাখা ছিঁড়ে ফেলবার জন্য প্রস্তুত আছে দুষ্ট ছেলের দল। একজনের আনন্দ, প্রেম নস্যাৎ করবার জন্য বরাবর ওত পেতে আছে কেউ। জীবন, জগৎ সবকিছুর ভেতর একটা গভীর অসহায়ত্ব আছে যেন, আছে আশ্রয়হীনতা, এমনই মনে হচ্ছে তাঁর। [প্রাগুক্ত; পৃ. ৮৩) জীবনের এক-একটি ধাপ তিনি অতিক্রম করছেন, লিখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য কবিতা ও গদ্য। এছাড়াও বাকিসব কষ্ট যন্ত্রণার সঙ্গে দীর্ঘদিন বেকারত্বে তাঁর মনে হয়েছে জীবনে সনদ অর্জনই নিরর্থক। যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। সামাজিক বাস্তবতা, নিজের সমস্যা ইত্যাদি কারণে পেশাগত কাজে তাঁর স্থিতি ছিল না।

জীবনানন্দ জীবনের প্রয়োজনে বরিশালে অবস্থান ছাড়াও কলকাতা, দিল্লি, ডিব্রুগড়, মোম্বেসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। স্বরাজ, পূর্বাশা পত্রিকা এবং সিটি, রামযশ ও বিএম কলেজে চাকরি করেছেন। তবে বারবার পত্রিকা ও কলেজের চাকরি পরিবর্তন করেছেন। তাঁর চাকরিক্ষেত্রে স্থিতিকাল খুব কমই লক্ষণীয়। একাধিকবার এবং জীবনের উপান্তে কলকাতায় কাটালেও তিনি সেখানে বন্ধুহীন নিঃসঙ্গ জীবন অতিবাহিত করেছেন। সমকালে প্রতিষ্ঠিত দু-একজন ব্যতীত, অনেক লেখকই তাঁকে সমাদর বা গ্রহণ করেননি। বরং ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ ঘৃণা ও অবহেলার মধ্যেই প্রকাশিত হলো ঝরাপালক কাব্য।

এর বাইরে এক নিঃসঙ্গ সময়ে শোভনার সাথে তাঁর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি হয়। এ সময়ে ‘শোভনাকে ঘিরে একটা ঘোর তৈরি হয়েছে জীবনানন্দের’। শুধু ঘোরের মধ্যেই আটকে থাকেনি এ সম্পর্ক। ‘যে শোভনাকে জীবনানন্দ নিরন্তর বহন করেছেন মনের ভেতর’। ডায়েরি থেকে উদ্ধৃত করে জানাচ্ছেন যে, শারীরিক সম্পর্কে দু-জন সম্মত হয়েছিলেন, কিন্তু শোভনার অসুস্থতার কারণে তা থেকে বিরত থাকেন। অন্যদিকে লাবণ্যকে বিয়ে করতে সম্মতি দিয়ে দিল্লি চলে যান। পরিণামে লাবণ্য- শোভনাকেন্দ্রিক একটি দ্বন্দ্ব লক্ষণীয় তাঁর ভাবনায়। দিল্লিতে প্রবল মানসিক চাপে তিনি লিবিডোভারাতুর হয়ে ওঠেন। তাঁর ডায়েরি থেকে উদ্ধৃত তথ্যে জানা যায় : ‘সারারাত হস্তমৈথুন করেছেন তিনি। তাতে সকালে পিঠ ব্যথা করছে তাঁর। স্বমেহনের যৌন আনন্দের ভেতর দিয়ে তিনি বুঝি নিজেকে ভারমুক্ত করতে চাচ্ছিলেন তখন।’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ৬৩) এ সময় তিনি তাঁর এক সহকর্মীর সাথে অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন গণিকালয়ের। সেখানে তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন, যা তাঁর লেখায়ও প্রতিফলিত হয়েছে।

বলাবাহুল্য যে, সমকালীন ক্লেদাক্ত উপাদান, বিবমিষা তাঁকে আক্রান্ত করেছে। একইসঙ্গে ব্যক্তি ও দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপড়েন, প্রেমের উদ্বিগ্নতা, বেকারত্বের অনিশ্চিতি জীবনানন্দকে ঘোর হতাশায় ফেলে দেয়। পক্ষান্তরে তিনি নিজেকে আঁধারের কাছেই সমর্পণ করেন। কবিতায়ও বারবার এ অন্ধকার ফিরে এসেছে। অন্ধকার শিরোনামায় কবিতাও লিখেছেন। এ অন্ধকার ও আলোর বিপরীত সম্পর্কের দ্বন্দ্বেই সৃষ্ট জীবনানন্দ, যা বোঝাপড়া করেছেন শাহাদুজ্জামান। প্রসঙ্গত, এখনও বনলতা সেন কবিতা নিয়ে বিতর্ক চলমান। যে কবিতায় মুখোমুখি বসে থাকে অন্ধকার ও আলোর প্রতিনিধি বনলতা সেন। একালের গবেষক আকবর আলী খান পুরনো দলিলদস্তাবেজ পর্যবেক্ষণে এ কবিতার একটি ভিন্ন ডিসকোর্স তৈরি করেন। জীবনের অন্যসব বিবরণের সঙ্গে শাহাদুজ্জামান জীবনানন্দের কিছু কবিতা, যেগুলো তাঁর জীবনের কোনো বিপন্ন সময়ে রচিত সেগুলোর অনুবিশ্লেষণও দিয়েছেন। যেমন : আটবছর আগে একদিন, ক্যাম্পে, বোধ, বনলতা সেন, হায় চিল, ঘোড়া ইত্যাদি।

কবি সবসময়ই সত্য সুন্দর লালন করেছেন, এ সম্পর্কে লেখক শাহাদুজ্জামান মাঝে মাঝে ইংগিত দিয়ে গেছেন। এখানে লেখক শুধু ন্যারেটর ও কথক নয়। একটি জীবনের সূত্রধর-উপস্থাপক। লেখকের কাজ হলো অব্যক্ত কথাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা। শাহাদুজ্জামানের দৃষ্টিতে- সমকাল, ইতিহাস, মিথ-পুরাণ, ঐতিহ্য, রাষ্ট্র, দাম্পত্যসম্পর্ক, প্রেম ইত্যাদির সমীকরণে জীবনানন্দের জীবন। তা যেমন জীবনানন্দের উপলব্ধি : ‘জীবনের শুরুটা তাঁর হয়েছিল একটা নিষ্পাপ পৃথিবীতে। মনের ভেতর লালন করেছেন সত্য, সুন্দর, কল্যাণের আভা। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধোত্তর, দেশভাগোত্তর সেই পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হয়েছে শুধু তাঁর নিজের জীবনে না, কোথাও সত্য, সুন্দর, কল্যাণের সেই আভা আর অবশিষ্ট নেই। তাঁর এমনও আশঙ্কা হচ্ছে যে হাজার বছরের ইতিহাসে বুঝি সেই সত্য, সুন্দর, কল্যাণকামী স্বর্ণযুগ ছিল না কখনো, এ এক মায়াই শুধু;’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ২১৭)

এ মায়ার টানেই কী আবার আসতে চেয়েছেন, ‘একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে/কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষের বিছানার কিনারে’। জীবনানন্দের দুঃখজনক মৃত্যুতে যে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে এবং চাকার মতো ঘুরে ঘুরে এসেছে একালের পাঠকের কাছে। এ প্রশ্ন- ‘এই মৃত্যু তাহলে কী-দুর্ঘটনা? আত্মহত্যা? হত্যাকা-?’রেখেই উপন্যাস সমাপ্ত হয়েছে। এখানে উচ্চারিত হলো- ‘অমীমাংসিত সেই জিজ্ঞাসা’। ক্রাচের কর্নেল ও একজন কমলালেবুÑ উভয় উপন্যাসেই অমীমাংসিত শব্দটি ব্যবহার করেছেন লেখক। তাঁর এ দুই উপন্যাসে লেখক দেখিয়েছেন অমীমাংসিত সত্তা হিসেবে দু-মেরুর অথচ ভিন্নবৈশিষ্ট্যে সাদৃশ্যপ্রায় দু-জন ব্যক্তিকে। শাহাদুজ্জামানের গল্প পাঠ করতে করতে মনে হলো, কিছু লেখক জোরজবরদস্তিতে দখলে নিচ্ছে সাহিত্যের জমিন। তা হয়তো আপাত সত্য। ভাষার খেলা যে এমন হতে পারে, তা দেখিয়েছেন শাহাদুজ্জামান। কথাসাহিত্যে খুব সরল সহজ ভাষা ব্যবহার অথচ একেবারেই আলাদা ভঙ্গি। তাঁর গল্পে নিরীক্ষা রয়েছে অনেক, তারপরও পাঠক হিসেবে ঈর্ষণীয় অনেক ভালো লাগা।

নব্বইদশকে এক শূন্যতার মধ্যেই তাঁর প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠা। আমরা যেভাবে গল্প পাঠ করি বা একজন গল্পকার যেভাবে গল্প শুরু করেন, শাহাদুজ্জামান তা থেকে পৃথক। অনেকটা আমাদের ছোটোবেলায় বয়োজ্যেষ্ঠ কারও কাছে গল্পশোনার রীতিনিষ্ঠ। এক্ষেত্রে সিনেমাটিক কারুকাজও রয়েছে। গল্পের বিষয়বস্তু বলতে বলতে তিনি নিজে হঠাৎ করে হাজির হন গল্পে। বিষয়টি এমনই যে শাহাদুজ্জামান উপস্থিত না হলে গল্পই অসমাপ্ত থেকে যেত। মূলত, তিনি কিছু উন্মোচন করতে চান। অদৃশ্য কিছু খোঁজ করেন অবিরাম। মানবজীবন যেখানে বিহ্বল বা হতচকিত বিষয়।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন,Ñ ‘হ্যাঁ আমার গল্পে আমার চোরাগুপ্তা উপস্থিতি তো কিছুটা থাকবেই।… আমার গল্পে মীমাংসিত এবং অমীমাংসিত এ রকম একটা ব্যাপার আছে।… আমার লেখার ভেতর একটা অমীমংাসিত বা বিহ্বল ব্যাপার আছে।’ এ বিহ্বল বিষয়কে ভাষায় দৃশ্যমান করেছেন তাঁর কয়েকটি বিহ্বল গল্প গ্রন্থে। একক একটি ভাব বা বোধ নিয়ে প্রতিটি গল্পের নির্মাণ। গল্পগুলো এ অর্থে প্রতীকাশ্রয়ী। মানুষের যে-চিরায়ত বিহ্বলতা নিঃশেষ হয় না সারাজীবনেও। যেখানে বিহ্বল বলে কিছু নেই, সেখানে জীবনজিজ্ঞাসাও নেই। আমরা প্রতিনিয়ত নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে দিনযাপন করি। ‘এক কাঁঠাল পাতা আর মাটির ঢেলার গল্প’-এ বলেন : ‘শুধু অগণন ভ্রান্তিবিলাস মানুষকে ঘিরে থাকে অনুক্ষণ’। এগল্পটি কি গল্প হয়ে উঠেছে কি না? না কী শুধু ভাবেরই বিস্তার। প্রতিশ্রুতি প্রদান আর তা ভঙ্গই এ সভ্যতার অনিবার্য সত্য। আকাক্সক্ষা ও ব্যর্থতার কোলাজ মানবজীবনের নিয়তি। লেখক এ বক্তব্যের আলোকে মাটি ও কাঁঠাল পাতার সম্পর্ক স্পষ্ট করেছেন। ‘একদিন এক কাঁঠাল পাতা ও মাটির ঢেলার মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। কাঁঠাল পাতা মাটির ঢেলাকে বললো, যেদিন বৃষ্টি নামবে সেদিন আমি তোমায় ঢেকে রাখবো আর মাটির ঢেলা কাঁঠাল পাতাকে বললো, যেদিন ঝড় উঠবে সেদিন আমি তোমায় আটকে রাখবো।… একদিন কি যে হলো, একই সাথে শুরু হলো ঝড় আর বৃষ্টি। ঝড়ে কাঁঠাল পাতা উধাও হয়ে গেল আকাশে আর বৃষ্টিতে মাটির ঢেলা আবার হারিয়ে গেল মাটিতে।’ [কয়েকটি বিহ্বল গল্প; পৃ ৮]

গল্পে তিনি অসামান্য প্রজ্ঞাতাড়িত। গল্পগুলো পাঠে একজন পাঠক ইতিহাস, মিথ লোকশ্রুতি, পুরাণ, ঐতিহ্যের নানা স্তরে প্রবেশ করতে পারে। গল্পে টুকরো কিছু উপাদানের অবতারণা করেন; যা বেশিক্ষণ লেখক স্থির রাখেন না। মাত্র একটি ¯œ্যাপশট। একটি গল্প শুরু করে টুকরো কথামালাকে সংহত করে নেন গল্পে। আমরা যাকে বলছি অ্যানেকডটের প্রয়োগ। বস্তুত, তাঁর ব্যক্তিজীবনের বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাই শিল্পিত হয়েছে কথাসাহিত্যের এ পরিসরে। আমরা জানি যে, মানবজীবনের অসংখ্য স্তর। সাধারণ মানুষ হিসেবে এসব স্তরের কোনো বৈশিষ্ট্যই আমরা স্পর্শ করতে পারি না। শাহাদুজ্জামান বহুস্তরকেন্দ্রিক মানুষ ও সমাজের বিভিন্ন স্তরকে শনাক্ত ও মনোজাগতিক বৈশিষ্ট্য অবলোকনের প্রয়াস পেয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতা আবার ওই সাধারণ মানুষের কাছেই পাওয়া। এসব সংগ্রহে আরোপিত কোনো তত্ত্বের কাছে যেতে হয় না। আমাদের আশপাশে রয়েছে সূত্রাবদ্ধ তত্ত্বের প্রতœ-আখর। প্রসঙ্গত, তাঁর নিজের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে : ‘আমি যখন কর্মসূত্রে ঢাকার বাইরে চলে যাই, তখন ছুটিতে ঢাকায় আসতাম নাইট কোচে। নগরবাড়ি ঘাটে ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হতো। সেই ফেরিঘাট ওই রাতের বেলাতেও বেশ জমজমাট থাকত। সেখানে বিভিন্ন ধরনের ক্যানভাসাররা নানারকম ওষুধ, বিশেষ করে সেক্সুয়াল পটেন্সির ব্যাপারে ওষুধ বিক্রি করত। আমি দেখতাম তার সেই ওষুধ বিক্রির জন্য কীভাবে গল্পটা সে তৈরি করছে। একটা গল্পের ভেতর আরেকটা গল্প ঢুকিয়ে বেশ জটিল একটা ন্যারেটিভ তারা তৈরি করত। বিষয়টা আমার দারুণ লাগত। পরে দেখেছি আমার গল্পে সেই প্রবণতটা প্রভাব ফেলেছে। আমার গল্পগুলো নন-লিনিয়ারই বেশি। গল্প ভেঙে বলার মধ্যে একটা মজা আছে। এই মজা আমি ওই ক্যানভাসারদের গল্প বলার স্টাইলে দেখেছি। আমি কখনও কোনো চরিত্র, ঘটনা বা স্থান মাথায় রেখে গল্প শুরু করি না। আমার শুরুটা হয় একটা আইডিয়া থেকে। আমাকে লেখার উৎসাহ যোগায় একটি আইডিয়া।’ তিনি বড় হয়েছেন শ্রেণি বিভাজিত একটি পরিবেশে। সেক্ষেত্রে তিনি এ ফাঁপা মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ ও বই-পুস্তককেন্দ্রিক জীবনের দেয়াল অতিক্রম করতে চেয়েছেন। শুধু চাকরিজীবনে নয়, তিনি বাল্য-কৈশোরে গ্রামীণ হাটবাজারে ফেরিওয়ালাদের জীবন, তাদের প্রতিদিনের কর্মকা- মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ ও গ্রহণ করেছেন। তাদের গল্প বলার ঢং দেখে ও শুনে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। সে-সব রপ্ত করতেও সচেষ্ট ছিলেন।

আগেই বলেছি যে, তিনি একক কোনো আইডিয়া ধরে গল্প নির্মাণ করেন। এগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ও সংবেদনশীলতা। তিনি নিজে একবার বলেছেন,- ‘সাহিত্য আমার কাছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সামাজিকীকরণ’। যেমন ক্যালাইডোস্কোপ গল্প। একটি পরিবার কিন্তু প্রতিটি চরিত্র আলাদা বৈশিষ্ট্যের। এরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত সারাক্ষণ, যা কর্পোরেট সময়ের পরিণাম। কারখানার মালিক নুরুল আলমের ছেলে রুমিকে কেন্দ্র গড়ে ওঠা সমস্যা নিরসনে সবাই অস্থির। কিন্তু পারিবারিক বন্ধন যেখানে অনুপস্থিত, এর সমাধান কোথায়? কনিষ্ঠ সন্তান শুভ্র ভিসিআরে কার্টুন দেখবে বলে একটি ক্যাসেট চালু করে। কিন্তু পর্দায় প্রদর্শিত হতে থাকে নিগ্রমানুষের উত্থিত পুরুষাঙ্গ। পরিণামে ‘ঘরে নিমিষে আবার একটি হতবিহ্বল নীরবতা নেমে আসে’।

কালিক ভাবনায় বহুমাত্রিক রেখায় গড়ে তোলেন গল্পের বয়ান। গ্রিক বাচনের একটি রেখা তারপর মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত গল্প অগল্প। এখানে লেখক তুলে ধরেছেন মক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাস্তবতায় ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের কথামালা। এ স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংঘাতে গল্প বলতে বলতে লেখক বলেন, ‘অতএব আমি নির্দ্বিধায় একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাই অবশেষে। আমি সিদ্ধান্ত নিই, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গল্পটি আমি আপাতত লিখবো না; অপেক্ষা করবো।’

সামাজিক অসংগতি ও বিবেকহীনতার বিপরীতে ঝাঁকুনি দেওয়ার গল্প হলো : স্যুট টাই অথবা নক্ষত্রের দোষ গল্প। সাধারণ দরিদ্র মানুষের মধ্যে এখনো নিষ্ঠা ও সততা বিদ্যমান। কিন্তু এর বিপরীতে প্রচলিত শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের মধ্যে সে সততার অভাবই বেশি। একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছে রফিকুল ইসলাম, যেখানে স্যুট টাই পরতে হয় চাকরির প্রয়োজনে। বন্যার ত্রাণ কার্যক্রমে রফিকুল ইসলামকে যেতে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের আদেশ। রফিকুল অফিসের নিত্য কাজ এবং নির্দেশিত ত্রাণ কার্যক্রম দয়িত্ববোধের সঙ্গে পালন করে। সে মনে করে তার দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ চাকরি স্থায়ীকরণে সহায়ক হতে পারে। চেয়ারম্যান সাধারণ সভায় ত্রাণ কার্যক্রম-উত্তর প্রতিবেদন শুনতে চান। রফিকুল ইসলামের বর্ণনায় দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, দরদ প্রকাশ পায়। যা এ প্রতিষ্ঠানের কেউই কামনা করেনি। প্রতিবেদন শুনে তাড়াতাড়ি সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। লেখকের ভাষ্য থেকে জানতে পারি রফিকুলের চাকরি আর স্থায়ী হয় না। বন্যা ও ত্রাণপরিস্থিতি বর্ণনার সময় মেঝেতে পড়ে যায় রফিকুল ইসলামের টাই। সভা দ্রুত শেষ হলে ওই টাই হাতে তুলে নেয় রফিকুল ইসলাম। ‘নির্ভার বোধ করে রফিকুল ইসলাম, স্বস্তিবোধ করে’।

লোকজ অনুষঙ্গ এবং এ জাতীয় মোটিফ ব্যবহার করেছেন ইব্রাহিম বক্সের সার্কাস গল্পে। গ্রামীণ হাটে লেখক নিজে সার্কাস, যাত্রা শৈশব-কৈশোরে উপভোগ করেছেন। তিনি লক্ষ করেছেন মানুষের পরম্পরাগত সৃজনশীল শক্তি ওই গ্রামীণ লোকমানুষের কাছেই নিহিত। লোকগাথা ও উপাদানের অনুষঙ্গে ইব্রাহিম বক্সের বিচিত্র জীবন তিনি নির্মাণ করেছেন। বুড়ির উচ্চারিত ধাঁধা, ডিটান শ্লোক এ গল্পের মূল বক্তব্যকে করেছে স্পষ্ট ও সংহত। বারবার নিরীক্ষায় ভিন্ন ভিন্ন রীতিতে নির্মিত তাঁর গল্পগুলো। লক্ষণীয়, প্রতিটি গ্রন্থভুক্ত প্রতিটি গল্পের নির্মাণশৈলী আলাদা। রূপকথার ঋণে আরেকটি গল্প হলোÑ তারপর যেতে যেতে। গ্রামীণ জীবনে দর্শনের ধারা বহমান ছিল গল্পের মাধ্যমে। সাধারণ মানুষ গল্প বলে লোকায়ত দর্শনের মর্মার্থ তুলে ধরতো। এ লোকশিক্ষা থেকেই সমৃদ্ধ হত মানুষের মনোজগৎ। অনেকদিন অনুপস্থিতি ও অচেনা স্থান থেকে সোলেমান পানিসহ পাত্র নিয়ে আসে। এ পানি তিনবার ছিটা দিলে যা ইচ্ছে তা হওয়া যায়। তা প্রমাণের জন্য সোলেমান বাঘ হয়ে যায়। কিন্তু পাত্র পানিশূন্য হওয়াতে পুনরায় আর ছিটা দেওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে, সোলেমান বাঘই থেকে যায়। অবশেষে তার মেয়ের প্রয়োজনেই বাঘরূপী সোলেমানকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। গ্রামীণজীবনে ত্যাগের উদাহরণে এটি সমুন্নত এক গল্প।

মহাশূন্যে সাইকেল একটি অনন্যসাধারণ গল্প। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, বাণিজ্যপুঁজির বিকাশ, অসম চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদির ফলে আমাদের পরিবার ও সমাজে বিচ্ছিন্নতার জন্ম হয়েছে। প্রাযুক্তিক উন্নয়নে মানুষের মধ্যে ভার্চুয়াল যোগাযোগ বেড়েছে, কিন্তু নিজের সঙ্গে নিজের, ব্যক্তির সঙ্গে সমাজেরসহ সবকিছুতেই দূরত্ব ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। বিচ্ছিন্নতার ফলে সবকিছুই এখন অচেনা মনে হয়। এতে বিকশিত হওয়ার তো সীমানা আছে না কি তাও নেই, এরকম সংশয় বিদ্যমান। ‘যত খেলাধুলা করি না কেন, রাতুলের সঙ্গেও আমার দূরত্ব বাড়ছে। রাতুল আসলে কে? তার নাক এবং ঠোঁট সে বয়ে বেড়াচ্ছে সারা জীবন। তাতে তো তার সঙ্গে আমার দূরত্ব ঘোচে না।’ [কেশের আড়ে পাহাড়; পৃ. ১৫) এ দূরত্ব ও এলিয়েনেশনের ব্যাখ্যা এখানে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন রেখেই গল্পটি শেষ হয়। ‘মহাশূন্যে সাইকেল চালানো কি দূরত্বের আকাক্সক্ষা না কি বিচ্ছিন্নতার ফল সেটা মীমাংসা করবার জন্য আমি রেজাউল করিমের বাসার দিকে রওয়ানা দিই।’ [প্রাগুক্ত; পৃ. ১৭] এ যেন মানুষের মৌল সত্তাকে উন্মোচন প্রচেষ্টা। শুধু কথাসাহিত্যে তাঁর ভাষারীতির উদাহরণ নিহিত, তা নয়। শাহাদুজ্জামান পাঠকের আনন্দ উপযোগী স্তরে ভাষা নির্মাণ করে নিয়েছেন। অর্থাৎ, ভাষারও বিনির্মাণ করেছেন। স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব। কথাসাহিত্যের মতো এর দৃষ্টান্ত রয়েছে অনুবাদকর্মেও। অনুবাদের ভাষায় তিনি প্রয়োগ করেছেন স্থানিক বৈশিষ্ট্য। যেমন : ‘অতীতে একজন কারিগর বাঁধা কোনো খরিদ্দারের মর্জিমাফিক কাজ করতেন কিন্তু আজ পুঁজিবাদী পণ্য উৎপাদনের কারিগর কাজ করেন বাজারের অচেনা খরিদ্দারের উদ্দেশ্যে। তার উৎপাদিত পণ্যটি বাজারী প্রতিযোগিতার বন্যায় কোনো অনিশ্চিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় উৎপাদক তা জানেন না।’ [ভাবনা ভাষান্তর; পৃ. ৯৩)

গল্প বা গল্পহীনতার সবই শাহাদুজ্জামানের রয়েছে। গতানুগতিক ধারার গল্পের বিপরীতে শাহাদুজ্জামান ভিন্ন রীতির গল্প বলেছেন। ভেঙে দিয়েছেন ভাষাকাঠামো, আঙ্গিক। দুরূহ এবং মনোজাগতিক বিষয়ের বিভিন্ন স্তর সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন, যা অনন্য। তিনি হয়ে উঠেছেন কখনও ঘটনার কথক কখনও বাহক। সমাজ, রাষ্ট্র ও ব্যক্তি মানুষের বিচিত্র সমস্যা ও বহুধাবিস্তৃত এ মানবজীবন বহমান। এ জগৎ, সভ্যতা নিয়ত পরিবর্তনশীল; একইসঙ্গে জীবনের পর্যায়সমূহ। এসব শাহাদুজ্জামান প্রখর নিবিষ্টতায় অবলোকন করেছেন এবং তাঁর কথাসাহিত্যে রূপায়ণ করেছেন। চিরায়ত বিহ্বল মানুষেরই নিয়তি এবং বিহ্বলিতএ সমাজের কথাই বলেন শাহাদুজ্জামান। তিনি প্রমাণ করেছেন একটি লেখার মধ্য দিয়ে সৃজনশীল নির্মাণ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে না। ক্রমচর্চায় বিনির্মিত হয় কাক্সিক্ষত সাহিত্যকর্ম। তাঁর নিরীক্ষায় পাঠক আবিষ্ট, ঘোরগ্রস্ত থাকে। এ কারণেই তিনি স্বতন্ত্র ও ভিন্ন ভাষারীতির একজন গদ্যশিল্পী।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares