কাছের হাসান দূরের হাসান : সনৎকুমার সাহা

প্রধান রচনা : বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত চার কথাসাহিত্যিক

 

[কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক কথাসাহিত্যে অবদান রাখার জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭০), একুশে পদক (১৯৯৯), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৭), বাংলাদেশ লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), কাজী মাহবুবউল্লাহ ও বেগম জেবুন্নিসা পুরস্কার (১৯৯৪), খুলনা সাহিত্য মজলিশ সাহিত্য পদক (১৯৮৬), রাজশাহী লেখক পরিষদ পদক (১৯৯৩), সাতক্ষীরা সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার (১৯৯৭), দিবারাত্রির কাব্য সাহিত্য পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ) (১৯৯৭), শ্রুতি সাংস্কৃতিক একাডেমী পুরস্কার (১৯৯৯), রাজশাহী সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার (২০০২), আব্দুর রউফ স্মৃতি পরিষদ সাহিত্য পুরস্কার (হবিগঞ্জ) (২০০৩), ক্রান্তি পদক (২০০৪), অমিয়ভূষণ সম্মাননা (জলপাইগুড়ি) (২০০৪), গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন সম্মাননা (২০০৬), প্রথম আলো বর্ষসেরা বই (২০০৭), মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার (২০০৭), আনন্দ পুরস্কার (কলকাতা) (১৪১৪ বঙ্গাব্দ), হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার (২০১৬), শওকত ওসমান সাহিত্য পুরস্কার (২০১৮) এছাড়া ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি পান। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১২১টি : উপন্যাস ৫টি, ১২টি গল্পগ্রন্থ, ১৩টি প্রবন্ধ, ৬টি স্মৃতিকথা, ৮টি সম্পাদিত গ্রন্থ, ১টি নাটক, ২টি শিশুসাহিত্য ও অন্যান্য।]

 

কাছের হাসান দূরের হাসান

 

সনৎকুমার সাহা

 

হাসানের বাড়ি ‘উজান’। আমার যেখানে থাকা, সেখান থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্ব। ইচ্ছা করলে যখন খুশি, যেমন খুশি যেতে পারি। যাই। একা আমি নই। যে-সে, অথবা, যিনি-তিনি, যখন তখন। অবারিত দ্বার। কখনও তিনি বিরূপ হন না। কারও বেলাতেই না। মনে হয়, যেন তিনিই আছেন অপেক্ষা করে। যদিও অনাহুতই বেশি। তিনি অবশ্যি তা বুঝতে দেন না। যেন এদের জন্যেই অপেক্ষা। তাঁর কাছে এসে কেউ বিরস বদনে ফিরে যায়, এমন কখনও দেখিনি।

আগে মঞ্জুভাবি ক’জন আছে জেনে নিয়ে নিঃশব্দে চা-জলখাবার সময়মতো পাঠাতেন। কোনো হাঁক-ডাকের বালাই ছিল না। এমনটিই যেন হবার কথা। আজ তিনি নেই। মনে পড়লেই বুকটা টনটন করে। হাসানের জন্য এ ধাক্কা যে কত বড়, তা আন্দাজ করতে পারি। তিনি অবশ্য তাঁর কথা খুব কম তোলেন। শুধু দেখি,  অথবা জানতে পাই, কোনো-কোনোদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে একা-একা বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ ভাবির কবরের পাশে নিঃশব্দে বসে আছেন। ভোলেন না কিছুই। শূন্যতাকে যেন আত্মস্থ করেন। নিত্যদিনের শত কর্ম কিন্তু আগের মতোই চলে।

তিনি যে তুখোড় আড্ডাবাজ, এ কথা তাঁর পরিচিত মহলে সবার জানা। যখন খুলনায় ‘সন্দীপন’ গোষ্ঠী জমজমাট, তখন তার মধ্যমণি হাসান। তাঁর কথার জাদু বাকি সবার খাওয়া-দাওয়ার কথাও ভুলিয়ে দেয়। পাণ্ডিত্যের কোনো চমক দেখান না। আষাঢ়ে গল্পের আসরও জমান না। সহজ-কঠিন-তুচ্ছ-গুরুগম্ভীর যে কোনো বিষয়ে সরস বুদ্ধিদীপ্ত শালীন মন্তব্যেÑ ইংরেজিতে যাকে বলে ‘উইট’- তার ফোয়ারা ছুটিয়ে তিনি তর্ক-বিতর্ককেও রুচির ও মেধার উঁচুমানে তুলে নিয়ে যান। ‘সন্দীপন’ গোষ্ঠীর যে আকর্ষণ ছিল, তা এখন কিংবদন্তি। সবাই তরুণ। কিন্তু চিন্তা অনায়াসে আকাশমুখী হতো। যদিও শিকড় থাকত মাটিতে। হাসানেরও যথারীতি কোনো ভান ছিল না। এখনও নেই। ছল-চাতুরির কোনো ধার ধারেননি। কাউকে ভুগিয়ে মজা পাননি। অনায়াসে মাটির কাছাকাছি মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। কিন্তু জনারণ্যে হারিয়ে যাননি। এদিকে ভাবি ঘরে কচি বাচ্চা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, হাসানের তা খেয়ালই থাকে না। অনেকদিন ঘরে ফিরে অপ্রস্তুত হয়েছেন। ভাবি কিন্তু কোনো অনর্থ বাধাননি। তাঁর শান্ত গভীর চোখে কখনও অভিযোগের ইঙ্গিতটুকুও থাকেনি। হাসান যা হতে পেরেছেন, তার পেছনে তাঁর ঐকান্তিক বোধ ও নীরব উপস্থিতি এতটুকু খাটো করে দেখা যায় না।

 

যাঁরা ঘড়ি ধরে সময় মেপে কাজ সারেন, তাঁদের কাছে হাসান বেমানান। হয়তো তাঁর কাছে কাজ সারার অর্থটাও ভিন্ন। মনে হয়েছে, ওই সব আয়োজনে তিনি শুধু আনন্দ দেন না, নিজেও জীবনের মানে খুঁজে ফেরেন। যারা ভিড় করে আসে চারপাশে, চাক বাঁধে, চাক ভাঙে, তাদের চলা-ফেরায়, কাজে-কর্মে, মুখের রেখায় তিনি মানব-মানবীর চলমান জীবন- যাপনের শিরা-উপশিরাগুলোয় প্রবহমান প্রাণের ধারা হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পান। দেখতে পান তার হয়ে ওঠার আকাক্সক্ষায় ও উদ্যমে, সংঘাতে ও বিপন্নতায়, তুচ্ছতায়ও সার্থকতায়। তাঁর সৃষ্টিশীলতাকেও উজ্জীবিত করে এইসব। তিনি তাদের ভোলেন না। তাদেরই প্রেরণায়, অথবা তাদের রূপান্তরে ও মিশ্রণে তাঁর গল্প আকার পায়। বাস্তবস্য বাস্তব হয়। সবটাই হয়তো সচেতন যোগসাজশে নয়। কিন্তু তারা সক্রিয় থাকে অবিরাম। তিনি যে বলেন, তাঁর কল্পনা-প্রতিভা উল্লেখ করার মতো নয়, এই প্রক্রিয়া বোধহয় তা বুঝতে সহায় হয়। এখানেও স্মৃতি তাঁকে প্রেরণা জোগায়। তাঁর শৈশব-কৈশোরের রাঢ়বঙ্গ যে তাঁর মস্তিষ্কের কোষে-কোষে অনপনেয় ছাপ রেখে যায়, এবং তা চেতনায় মহীরুহের আকার নিয়ে স্থায়ী বসতি গাড়ে, হাসায়-কাঁদায়, পরে নিষ্কাশিত নিরাসক্তির জন্ম দিয়ে তাকে সক্রিয় করে- এর কারণও, মনে হয় সেখানে। ‘উজান’-এ বসার ঘরে সরাসরি চোখে পড়ে, এমন জায়গায় বেশ বড় বাঁধানো একটা ফটো। সে এক বিশাল বটগাছের। ওই গাছ বর্ধমানের মঙ্গলকোটে হাসানের ফেলে আসা বাড়ির সামনের। শৈশবেও তিনি তাকে অমন দেখেছেন। ওই গাছের বৈরাগ্যের প্রতীকী প্রতিফলন যেন ঘটে হাসানের কথাসাহিত্যে। বাস্তবতার নিষ্কাম-নির্মোহ উন্মোচন। বটগাছটির চোখ দিয়ে। তবে যিনি এখানে সৃষ্টিশীল, তিনি আমাদের চোখের সামনে নিত্যদিনের আসর জমানো হাসান আজিজুল হক নন, তিনি একান্তে সমুদ্রমন্থনের বিশ্বক্রিয়ায় উদ্্গীর্ণ বিষ ও অমৃতপানে নিশ্চল, রূপে-রূপে প্রাণপ্রতিষ্ঠায় নিবিষ্ট, সুদূরের হাসান আজিজুল হক। তাঁকে আমরা দেখি না। মঞ্জুভাবি শুধু কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। কখনও কখনও।

গত শতকে ষাটের দশকে হাসান যখন খুলনায়, তখনই তাঁর সাহিত্যিক-খ্যাতি পাকা। সাড়া জাগানো গল্পের বই সমুদ্রের স্বপ্ন, শীতের অরণ্য ও আত্মজা ও একটি করবী গাছ বের হয়ে গেছে। জীবন ঘষে আগুন গ্রন্থের কালাতিক্রান্ত বারবার পড়ার মতো ক’টি গল্পও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে আলোচনার ঝড় তুলেছেÑ দুই বাংলাতেই। এখানে তখন সবচেয়ে মর্যাদায় ‘আদমজি সাহিত্য পুরস্কার’ও তাঁর করায়ত্ত। সবই কিন্তু গল্পের অভিনবত্ব, শৈলীর নিজস্বতা ও মানবিক বোধের ঘনত্ব দিয়ে। কোনো ইচ্ছাপূরণের চেষ্টা কিন্তু নেই। রূপকথার আদলে সুখ-স্বর্গ তিনি রচনা করেন না। সহজ পাঠকপ্রিয়তার লোভে অলীক মাধুর্যের মায়াজাল তাঁকে টানে না। ওই অল্পবয়সেই তিনি স্থিতধী। দর্শন যে তিনি খুব ভালোভাবে রপ্ত করেছেন, তার চূর্ণ প্রকাশ খেয়াল করলেই ধরা যায়, যদিও কোনো বিশেষ মতবাদে আস্থা থাকলেও তা প্রকট হয়ে ওঠে না। মানবজীবনের করুণাহীন বাস্তবতার মর্মমূলে তাঁর চোখ। গল্প তার অনিবার্য বিস্তার। পরিণতির ইঙ্গিত উঠে আসে সেখান থেকে। তা সমাপ্তি নয়। কারণ, জীবনের শেষ নেই। এবং আধার-আধেয়র সংগতিতে, কাঠামোগত পরিসীমায়ও ধারণার তীরন্দাজিতে ওরা ছোটগল্পই। যদিও নতুন মাত্রার সংযোজন ঘটে, এবং তা হাসানের চৈতন্য-শাসিত। তাঁর মৌলিকতাও এখানে বহুস্তরীয়- বাস্তবের উপলব্ধিজাত স্বরূপ আপসহীন সততায় ও শিল্পিত নির্মাণে মেলে ধরা। তা সৃষ্টিই। কোনো গড্ডলিকা প্রবাহে, অথবা কারও সম্মোহনে আত্মবিস্মৃত পা ফেলা নয়।

সেই তখন থেকে তাঁর সত্যিকারের সৃষ্টিকলা এইভাবে ফসল ফলিয়ে চলেছে। এবং এ কাজ তাঁর একক মনীষার। একান্ত মানসিক-নির্জনে। স্থান-কাল সবই ওই মনোজগতে বাস্তব। মানব-মানবীÑ সঙ্গে-নিঃসঙ্গে, দ্বন্দ্বে-কোলাহলে, আশা নিয়ে ও আশাভঙ্গেÑ সব। তাদের মিশ্রণেও। এখানে লড়াই তাঁর নিজের সঙ্গেও। সরাসরি মুখোমুখি। আর কাউকে জড়িয়ে নয়। জানান দিয়ে নয়।

এমনই তিনি সদালাপী। বুদ্ধিদীপ্ত কথায় সবাইকে টানেন। হাসি-কৌতুকে ভরা। নিজেও পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গ-প্রত্যাশী। তাঁর উপস্থিতি চারপাশের আবহাওয়া প্রফুল্ল করে তোলে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে পেতে সবার কাড়াকাড়ি। পারলে কাউকেই তিনি নিরাশ করেন না। আজ এখানে, কাল সেখানে। আমরা অবাক হই। কী করে তিনি পারেন! এখন মনে হয়, এই তাগিদ কাজ করে তাঁর ভেতরেও। হয়তো অবচেতনে। যেমন বলেছি, সৃষ্টির রসদ পান তিনি এসব থেকে। তাদের সমস্তটার ভার তিনি বয়ে বেড়ান নিজের ভেতরে। সাধারণভাবে এটা জানা, তাঁর কথাসাহিত্যে যন্ত্রণার্ত মানব-মানবীর কথাই বেশি। এই যন্ত্রণা কিন্তু নিজেই প্রথমে আত্মস্থ করেন। শিল্পী হবার দায় এখানেই। সাবিত্রী উপাখ্যান উপন্যাসটি যখন লেখেন, তখন ওই অসহায় কন্যার দুঃসহ অবর্ণনীয় যন্ত্রণা সবটুকু তিনি নিজের ভেতরে একা নিঃশব্দে বহন করে চলেন। শিল্পে সত্যের ছাপ পড়ে। তখন হাসানের ওপর রাজশাহিতে ‘হেরিটেজ আর্কাইভস’-এর এক অনুষ্ঠানে মঞ্জুভাবি তাঁর বিরল আলাপে বলেছিলেন, হাসান একা যখন লেখায় মগ্ন থাকেন, তখন কোনো কোনো মুহূর্তে তাঁর মুখের রেখায় যে যন্ত্রণার ছাপ ফুটে ওঠে, তার অকরুণ আক্ষেপ বর্ণনার অতীত। কাওর সঙ্গে তিনি তা ভাগ করে নিতে পারেন না। সবটাই সহ্য করেন নীরবে। শিল্পসৃষ্টি শুধু আনন্দের নয়, যন্ত্রণার ভারও তাতে অপরিসীম। আমাদের মনে পড়ে, ওয়ার অ্যান্ড পিস লেখার সময় টলস্টয়ও এইরকম বারবার ভেঙে পড়ার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন। গুস্তাভ ফ্লব্যের নিজের উপন্যাস মাদাম বোভারি প্রসঙ্গে বলেছেন, জানা যায়, ‘মাদাম বোভারি, আমিই সে’। কী অর্থে দুজন এক? অনুভবের সমীকরণে, ফ্লব্যের মাদাম বোভারিতে প্রতিস্থাপন করেন নিজেকে। এবং তা সর্বাত্মক। বাস্তব তার অনুপুঙ্খে জীবন্ত হয়ে ওঠে- যদিও এই উপন্যাসের প্রাথমিক খ্যাতি তার শৈলীর জন্যে। হাসানের শৈলীও একান্ত তাঁরই। ‘অন্য লোকে লাঠি বাজে’- এটা অনেকে বোঝে না। এবং সব মিলিয়ে যে কথাসাহিত্য শিল্প হয়, শিল্প সত্য হয়, তার সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় হাসান উপায়হীন নিঃসঙ্গ। দূরের হাসান তাই দূরেই থেকে যান। কাছের হাসান সবার আপন।

লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares