বিশেষ ঈদ উপহার : সৈয়দ শামসুল হকের অপ্রকাশিত চিত্রনাট্য

 

বিশেষ ঈদ উপহার : সৈয়দ শামসুল হকের অপ্রকাশিত চিত্রনাট্য

ভুল ও ভালোবাসা

চিত্রনাট্য : সৈয়দ শামসুল হক

[ উনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজি ক্লাসিক শার্লট ব্রন্টির উপন্যাস ‘জেন আয়ার’-এর ছায়া অবলম্বনে কাহিনি বিন্যস্ত ]

সৈয়দ হকের চিত্রনাট্য সম্পর্কে কিছু কথা

সৈয়দ হক অল্প বয়সে বোম্বে থাকাকালীন বিখ্যাত চিত্রপরিচালক কামাল আমরোহীর মতো অভিজ্ঞ মানুষের সাথে কাজ করেছিলেন। তখন তিনি চিত্রনাট্য সম্পর্কে সম্যক অভিজ্ঞতা লাভ করেন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশে ফিরে (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান) তিনি স্বনামে এবং ভিন্ননামে প্রচুর চিত্রনাট্য তৈরি করেন। তবে এখানে বলতে হবে চিত্রনাট্য লেখাকে তিনি কখনও তাঁর সাহিত্য-সংসারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেননি। এটি ছিল তাঁর জাগতিক সংসার চালাবার একটি উপায়। পরবর্তীকালে চিত্রনাট্য লেখা তিনি একেবারে ছেড়ে দিয়েছিলেন, বরং তরুণ প্রজন্মের চিত্রনাট্যচর্চার প্রতি তাঁর প্রশংসনীয় দৃষ্টি ছিল। তিনি তরুণ প্রজন্মের অনেকেরই লেখা চিত্রনাট্য পছন্দ করতেন। সম্প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত পাঠাগার থেকে কিছু চিত্রনাট্য আমি খুঁজে পেয়েছি। এসব কবেকার লেখা আমি জানিনে বা জানার কোনো উপায় নেই। কারণ চিত্রনাট্যেগুলোতে বিস্তারিত তেমন কিছু লেখা নেই। এসবের কোনটি চিত্রায়িত হয়েছে বা কোনটি চিত্রায়িত এখন পর্যন্ত হয়নি- তার আদ্যোপান্ত খুব বেশি আমি বা আমার পরিবার জানে না। তাঁর কিছু কিছু চিত্রনাট্যের চলচ্চিত্ররূপ আমি দেখেছি। হয়তো আমার সব পাণ্ডুলিপি দেখার সুযোগ হয়নি কিংবা আদৌ চিত্রায়িত হয়েছে কিনা সে ব্যাপারেও আমি বা আমার পরিবার অজ্ঞাত।

উনবিংশ শতাব্দীর ক্লাসিক ইংরেজি উপন্যাস শার্লট ব্রন্টির ‘জেন আয়ার’ এর ছায়া অবলম্বনে শব্দঘর ২০১৮ ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত এই বিশেষ চিত্রনাট্যটির কাহিনি বিন্যস্ত করা হয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর ক্লাসিক ইংরেজি উপন্যাস ‘জেন আয়ার’-এর ছায়া অবলম্বনে কাহিনি বিন্যস্ত- এ কথাটি মূল চিত্রনাট্যে সৈয়দ হকের নিজের হাতে লেখা রয়েছে।

বর্তমানে যেহেতু তাঁর সব রচনা নিয়ে মানুষের কৌতূহল জাগছে তাই পত্রিকায় এগুলো পত্রস্থ করতে আমি উদ্যোগী হয়েছি।

পাঠকের কাছে অনুরোধ থাকবে সৈয়দ শামসুল হকের এ ধরনের লেখাগুলোকে তারা যেন তাঁর সৃজনকর্মের একটি বিশেষ ধারা হিসেবে বিবেচনা করেন।

 

বিনীত

আনোয়ারা সৈয়দ হক

 

 

 

দৃশ্য ১

মিড শট। জরিনা, এ ছবির নায়িকা। সোলো শট। তার চুল এলোমেলো, চোখের কোলে কালি, আতঙ্কিত তার অভিব্যক্তি। জরিনা ঘরের কোণে দেয়ালের সংগে প্রায় ঠেস দিয়ে আধো বসে। সময়টাÑ রাত। শটে আর কাউকে  না দেখা গেলেও জরিনার অভিব্যক্তিতে বোঝা যায় ঘরে আর একজন আছে। অচিরেই অফভয়েসে তার অট্টহাসি শোনা যায়, তারপর অফভয়েসেই সংলাপ।

পুরুষকণ্ঠ।    হাঃ হাঃ হাঃ। এ বিয়ে তোমাকে করতেই হবে। আমি যেখানে তোমার বিয়ে দেব, সেখানেই তোমার বিয়ে হবে, জরিনা।

জরিনা।          না, না, না।

ভয়ার্ত অস্ফুটস্বরে জরিনা উচ্চারণ করবে, পেছুবার চেষ্টা করবে, পেছনে দেয়াল, তখন সে পেছনের দেয়াল ঠেস দিয়েই আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াবে, আর ক্যামেরা তার ওপর ধীরে চার্জ করে ক্লোজ শটে ধরবে। একই সংগে অফ ভয়েসে পুরুষকণ্ঠ শোনা যেতে থাকবে।

পুরুষকণ্ঠ।    আলবত হ্যাঁ। আগামীকাল সন্ধ্যায় তারা আসবে, আগামীকাল সন্ধ্যায় তোমার বিয়ে, আগামীকাল সন্ধ্যায় সুন্দরী জরিনা লাল শাড়ি পরে বলবে, হ্যাঁ, কবুল।- নইলে, তোমার ঐ রূপ আমি এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেব।

আর্তনাদ করে ওঠে জরিনা।

পুরুষকণ্ঠ।    ভয় পেলে? হাঃ হাঃ হাঃ।- পালাবে ভাবছ? পারবে না। হাঃ হাঃ হাঃ। জরিনার ওপরেই হঠাৎ দরোজা বন্ধ হবার শব্দ ওভারল্যাপ হয়।

জরিনা ছুটে যায় দরোজার দিকে। দরোজায় আঘাতের পর আঘাত করে। বাইরে থেকে তালা লাগাবার শব্দ আর অট্টহাসি।

পুরুষকণ্ঠ।    বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত ও ঘরেই তুমি বন্দি হয়ে থাকবে। হাঃ হাঃ হাঃ। হাসিটা দূরে মিলিয়ে যায়।

আর একই সংগে কান্নায় ভেঙে পড়ে জরিনা। দরোজা ধরে বসে পড়ে সেখানেই, সংলাপ বলতে বলতে লুটিয়ে পড়ে মেঝেয়।

জরিনা।          আল্লা, রহমানুর রহিম, তুমি রক্ষা করো, তুমি আমাকে রক্ষা করো। এ সংসারে যে এতিম, তুমি ছাড়া তার কে আছে? আমাকে তুমিই তো একদিন আশ্রয় খুঁজে দিয়েছিলে, তুমি কি এমন আশ্রয় আমাকে দিয়েছিলে, খোদা, যেখানে আমার মরণ তুমি লিখেছ? না, তুমি তো দয়ার সাগর. তুমি তো করুণাময়, আমি তোমারই হাতে আবার আমার সব ছেড়ে দিলাম। আমাকে তুমি এই শয়তানের হাত থেকে রক্ষা করো, আল্লা।

মেঝেতে মাথা ঠুকতে ঠুকতে হতচেতন হয়ে যায় জরিনা। তার ওপরে করুণ সংগীত দূর থেকে ভেসে আসে। সেই সংগীতের ভেতর যেন আমরা স্বর্গীয় কোরাস শুনতে পাই।

কোরাস মিলেয়ে যায়।

অফস্ক্রিনে পেটা ঘড়িতে রাত দুটো বাজবার ঢং ঢং শোনা যায়। ঘড়ির শব্দ মিলিয়ে যায়।

দরোজার তালা খোলার মৃদু আওয়াজ পাওয়া যায়।

জরিনা ধীরে মাথা তোলে, তার চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। সে শয়তানের আগমন প্রতীক্ষা করে। ধীরে দরোজা খুলে যায়। কিন্তু কাউকে দেখা যায় না।

জরিনা জ্বলন্ত চোখে দরোজার দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু কেউ আসে না। তখন জরিনার ভ্রু ঈষৎ কুঞ্চিৎ হয়। সে ঠিক বুঝতে পারে না, কি ঘটছে। সে উঠে দাঁড়ায়।

দরোজার কাছে যায়। তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় করিডর জনশুন্য, ফাঁকা।

 

দৃশ্য ২

ঘরে থেকে ধীরে বেরিয়ে আসে জরিনা। চারদিকে তাকায়। কেউ কোথাও নেই। নিঃশব্দে সে করিডর পেরিয়ে যায়।

সিঁড়ি দিয়ে নামে।

সিঁড়ি দিয়ে নেমে সদর দরোজার দিকে বাঁক নিতেই কাকে দেখে যেন চমকে ওঠে জরিনা।

মিডক্লোজ শট। বুড়ি দাসী। দাসী নিজের ঠোঁটে হাত রেখে জরিনাকে চুপ থাকতে বলে।

ক্লোজ আপ। জরিনা। সে যেন বুড়িকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

বুড়ি নীরবে তাকে অভয় দেয়, তাকে ইশারা করে।

বুড়ি এসে জরিনার হাত ধরে দ্রুত একটা ছোট দরোজা দিয়ে বের করে নিয়ে যায়।

 

দৃশ্য ৩

বুড়ি জরিনার হাতে ধরে বাড়ির পেছনে নিয়ে আসে। এবার কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে তারা। এবার বুড়ি দাসী সজল চোখে বলে ওঠে,

বুড়ি।              তোমার কান্দন শুইনা পাষাণ গইলা যায়, বুবু। সেই ছোটকাল থিকা তোমারে দেখছি, কোলেপিঠে মানুষ করছি। তোমার মামাতো ভাই মানুষ না, একটা শয়তান। আইজ তোমারে যদি সাহাইয্য না করি, আল্লার কাছে হাশরের মাঠে আমি জবাব দিতে পারব না। আমার ছেলেরে খবর দিছি, বুবু। রিকশা নিয়ে সে দাঁড়াইয়া আছে। আসো।

বুড়ি জরিনার হাত ধরে বাইরে নিয়ে যায় পাঁচিলের দরোজ দিয়ে।

 

দৃশ্য ৪

অন্ধকার সড়ক। রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বুড়ির ছেলে, সে নিজেই রিকশাওয়ালা।

জরিনা হঠাৎ বুড়িকে জড়িয়ে ধরে বলে,

জরিনা।          কিন্তু আমার যে যাবার কোথাও জায়গা নেই, হানিফের মা।

বুড়ি।              আছে, তাও আমি চিন্তা কইরা রাখছি বুবু। সেই মাস্টার, তোমার সেই গানের মাস্টার, তোমারে সে মেয়ের মতো ভালোবাসে। হানিফ, ত্ইু তো কতদিন বুবুরে সেখানে নিয়া গেছস, পারবি না বাবা মেয়েটারে সহি সালামতে সেইখানে দিয়া আসতে?

হানিফ।          পারুম না ক্যান? ঢাকার পোলা না আমি?

জরিনা তখন বুড়ির হাত ধরে বলে,

জরিনা।          আর তুমি? তোমার যদি কিছু হয়?

বুড়ি।              আমার কথা ভাইব না, সে কিছু জানতে পারব না। হারামজাদা মদ খাইয়া বেহুঁশ হইয়া আছে। ঘরে গিয়া আমি এমুন ভাবে সব সাজায়া রাখুম, য্যান তুমি খিড়কি ভাইঙ্গা পালাইয়া গেছ।

ইতঃস্তত করে হাত ছেড়ে দেয় জরিনা। বুড়ি তাকে রিকশায় তুলে দেয়। বুড়ির ছেলে বলে,

বুড়ি।              এই শয়তানের পুরী থিকা মাইয়াটারে রক্ষা কর, বাবা।

হানিফ।          এইটা তো সওয়াবের কাম।

হনিফ প্যাডেল চালিয়ে রওয়ানা হয়ে যায়।

বুড়ি তাকিয়ে থকে। আপন মনেই বলে,

বুড়ি।              আল্লা, মাইয়াটারে তুমি দেইখো।

 

দৃশ্য ৫

গানের মাস্টারের বাড়ি। ইনি বয়সে প্রবীণ এবং চিরকুমার। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, মাথায় রূপালি  চুলের রাশ, পরনের ট্রাউজার সাসপেন্ডার দিয়ে কাঁধ থেকে ঝোলানো। ঘরে পিয়ানো আছে। আরো কিছু বাদ্যযন্ত্র দেখা যাবে, যেমন বেহলা, ডবল বাস। আমরা এঁকে স্যার বলে জানব, এবং পুরনো দিনের সাহেবিকেতার ব্যক্তিত্ত্ব ফুটিয়ে তুলব অভিনয়ে।

দৃশ্য শুরু হবে স্যারের ক্লোজ আপ থেকে, তারপর যখন আমরা জরিনার ওপর যাবো, দেখব, সে একটা মিউজিক্যাল টুলের ওপর বসে আছে।

স্যার।             আশ্চর্য, মানুষ কি করে এত নীচ হয়? আমার নিজের ভাই আমাদের জমিদারী ঠকিয়ে নিয়ে গেল, সে তিরিশ বছরের কথা, আজো বিস্ময় গেল নাÑ মানুষ কি করে এত স্বার্থপর হয়? যদি মিউজিক নিয়ে না থাকতাম, জরিনা, আমি পাগল হয়ে যেতাম। আমি তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারি। ভুলে যাও তুমি তোমার বাপের সম্পত্তির কথা, তোমার মায়ের গয়নার কথা

জরিনা।          আমি তো সম্পত্তি চাই না স্যার, আমি তো অলংকার টাকা পয়সা কিছুই ফেরত চাই না, আমি শুধু চাই আমার মতো বেঁচে থাকতে, সামান্য একটু সুখ ছাড়া জীবনের কাছে আমার আর কিছুই চাইবার নেই, স্যার।

স্যার।             আমি জানি। আমার কাছে বসে, আমার হাত ধরে, তুমি, মিউজিক শিখেছ, সংগীত যার রক্তের ভেতর আছে, গান যার কণ্ঠে আছে, টাকা পয়সা হীরে জহরত সব তার কাছে তুচ্ছ। আমি ভাবতেই পারি না, জরি, মানুষ গান গায়, কবিতা লেখে, ছবি আঁকে, প্রেম-প্রীতি ভালোবাসা নিয়ে মানুষ মনুষ্যত্বের গৌরব করে, আবার সেই মানুষের ভেতরেই এমন মানুষও আছে যারা সাপের চেয়েও খল, বাঘের চেয়েও হিংস্র, জল্লাদের চেয়েও নিষ্ঠুর।

স্যার এসে জরিনার কাঁধে হাত রাখে।

স্যার।             অনেক দেখেছি, এখন বুড়ো হয়ে গেছি, আই অ্যাম অ্যান ওলড ম্যান নাউ। আমার কতটুকু সাধ্য জানি না, তোমার কোনো ভয় নেই, আমি তোমাকে  প্রাণ দিয়ে রক্ষা করব।

জরিনা।          আপনি তাকে জানেন না, স্যার, আমাকে অসহায় পেয়ে নিঃস্ব করেও তার লোভ মেটেনি, অনেক টাকার বদলে সে আমাকে এক লম্পটের হাতে তুলে দিচ্ছিল, পালিয়ে এলেও সহজে সে ছেড়ে দেবে না। আমি আপনাকে বিপদে ফেলতে চাই না, স্যার। আমি শুধু চাই, আপনি আমাকে এই শহর থেকে দূরে, তার নাগালের বাইরে, অনেক দূরে, কোথাও আমাকে পাঠিয়ে দিন, কোথাও আমাকে একটা কাজ জুটিয়ে দিন। আমি আমার অতীত ভুলে যেতে চাই, মানুষের নীচতা থেকে দূরে থাকতে চাই, মানুষের ছলনা থেকে দূরে থাকতে চাই। স্যার, আমি যে মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি, আমি আবার মানুষকে বিশ্বাস করতে চাই।

কান্নায় ভেঙে পড়ে জরিনা।

স্যার উঠে এসে তার পিঠে চাপড় দিয়ে আদর করে। বলে,

স্যার।             ভেঙে পোড়ো না, মা। ভেঙে পড়তে নেই। অতীতকে যদি পেছনে ফেলে এসেছ, ভবিষ্যতের দিকে স্বপ্ন নিয়ে তুমি তাকাও, তুমি এগিয়ে যায়। এত বড় পৃথিবীর কোথাও না কোথাও তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে মায়া, মমতা, স্নেহ, ভালোবাসা- কিন্তু তোমাকে তো এগিয়ে যেতে হবে, হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তোমার মনে নেই?- যে গানটা তোমার সবচেয়ে প্রিয়, তার কথাগুলো মনে নেই? ভুলে গেছ?

স্যার জরিনাকে ছেড়ে এগিয়ে যায় পিয়ানোর দিকে।

জরিনা তবু মুখ লুকিয়ে থাকে নিজের হাতের ভেতর। হঠাৎ তার ওপর ওভারল্যাপ হয় পিয়ানোর একটি গানের সুর।

জরিনা ধীরে মুখ তোলে, চোখ তুলে তাকায়।

তার দিকে পেছনে ফিরে স্যার বাজিয়ে চলে। একটু পর স্যার বাজাতে বাজাতে পেছন ফিরে তাকায়, মুখে স্নেহের হাসি। তখন জরিনার মুখেও অতি ধীরে অস্পষ্ট হাসি ফুটে  উঠতে থাকে।

জরিনা উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে যায় স্যারের দিকে। স্যার অনুভব করে তার পেছনে জরিনা। একটুপর বাজাতে বাজাতেই স্যার বলে চলে,

স্যার।             তুমি বলছিলে না?- দূরে যেতে চাও, অনেক দূরে? একটা অদ্ভুত যোগাযোগ। আজ সকালেই তো? হ্যাঁ, আজ সকালেই একজন এসে তোমার মতো একজনকে খুঁজছিল।

জরিনা।          কে সে?

স্যার।             চমকে উঠলে যে? মানুষকে অবিশ্বাস করতে নেই, জরিনা।

বলেই স্যার পিয়ানোয় প্রবল আঘাত করেন এবং সংগীত এখন পূর্ণ রূপ নিয়ে আমাদের কানে আছড়ে পড়ে। সংগীতের এই অভিঘাত আমাদের কাট করে নিয়ে যায় টাইটেলে।

শাদার ওপরে একগুচ্ছ রজনীগন্ধার পাশে টাইটেলের লেখাগুলো ভেসে ওঠে। পরিচালকের নাম শেষে ক্যামেরা এগিয়ে গিয়ে শুধু ফুলে গুচ্ছ ধরে রাখে।

 

ফেড আউট

টীকা : যে গানের সুর পিয়ানোতে বাজানো হবে সেই গান ছবিতে কয়েক বার ব্যবহার করা হবে- নারী ও পুরুষকণ্ঠে। গানের কথাগুলো এমনভাবে রচনা করতে হবে যাতে অনুভব করা যায় যে- হারিয়ে গেলেও হারিয়ে যায় না, যে রাত আঁধার সেই রাতেই চাঁদ ওঠে, তারা ফোটে, চোখের আলো নিভে গেলেও মনের আলো উজ্জ্বল হয়ে থাকে।

 

ফেড ইন

দৃশ্য ৬

চলন্ত জীপ গাড়ির ভেতর ক্যামেরা। আমাদের চোখের ওপর দিয়ে ছুটে পেরিয়ে যাচ্ছে খেত, মাঠ, বন, টিলা। আর জীপ চালাচ্ছে চা বাগানের ম্যানেজার জামাল, তার পাশে বসে আছে জরিনা। আমরা দৃশ্য শুরু করছি চলন্ত শটের ওপর জামালের অফ ভয়েস দিয়ে, তারপর প্রকাশ করব চালক ও আরোহিনীকে।

জামাল।          এই সবই যা দেখছেন, যতদূর চোখ যায়, একসময় সব ছিল চৌধুরীদের জমিদারী। এখন জমিদারী নেই, আছে একটা সেকেলে বিরাট প্রাসাদ যেখানে আপনি যাচ্ছেন-

এবার আমরা দেখতে পাই শুধু জরিনাকে ক্লোজ শটে, জীপে বসে আছে- তার ওপর শোনা যায়,

জামাল।          গভর্নেস হয়ে, একটি ছোট্ট মেয়ের ভার নিতে। আর আছে, মাইল পাঁচেক দূরে একটা চা বাগান, চৌধুরীদের এখন একমাত্র সম্পত্তি, আমি যার ম্যানেজার-

এবার শুধু জামালকে দেখা যায়, সে গাড়ি চালাচ্ছে।

জামাল।          আমার নাম জামাল। আমিও খুব বেশিদিন এখানে আসিনি, বলতে গেলে আপনারই মতো নিউলি ইম্পোর্টেড।

বলেই হেসে ওঠে জামাল।

কাট করে টু শট ধরি, দেখি জরিনাও তার সংগে হাসছে।

জরিনা।          তাহলে তো আপনার কাছে থেকেও বিশেষ কিছু জানতে পারব না, চৌধুরী সাহেবের সংগেও দেখা হলো নাÑ

জামাল।          কেন, ঢাকায় তার সংগে আপনার দেখা হয়নি? আপনাকে সিলেকট করলেন কে?

জরিনা।          আমার গানের স্যার, তাঁর কাছে উনি গান জানেন এমন কাউকে খুঁজছিলেন।

জামাল।          আপনি গান জানেন বুঝি? বাহ, একদিন শোনাবেন তো?

জরিনা।          গান শোনাতে তো এখানে আসিনি, এসেছি গান শেখাতে, চৌধুরী সাহেবের মেয়েকে।

 

জামাল।          মেয়ে? চৌধুরী সাহেবের মেয়ে? তার তো বিয়েই হয়নি, মেয়ে কোথায় পেলেন? ও ওঁর বড় ভাইয়ের মেয়ে, ভাই মারা গেছেন।- এই যে, এসে গেছি আমরা। আপনাকে নামিয়ে দিয়েই আমাকে আবার গার্ডেনে ছুটতে হবে। শেষ কথাগুলোর ওপর চলন্ত শট- জরিনার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে। দেখা যায় বিশাল ও প্রাচীন একটি জমিদার বাড়ি ক্রমশ আমাদের দৃাষ্টর নিকটতর হচ্ছে।

জরিনা তাকিয়ে থকে।

চলন্ত শট থেমে যায়। বাড়ি স্থির হয়ে যায়।

 

দৃশ্য ৭

বাড়ির বাইরে, বারান্দার নিচে এসে জীপ দাঁড়ায়। লাফ দিয়ে নামে জামাল। জামাল হর্ন বাজায় বার দুয়েক। চিৎকার করে ডাকে,

জামাল।          শমসের, শমসের, লুৎফার মা, গেল কোথায় সব?

জরিনা ততক্ষণে নেমে এসেছে। জামাল তার সুটকেস নামিয়ে দিতে দিতে বলে,

জামাল।          আশ্চর্য, ঢাকায় চৌধুরী সাহেবের সংগে আপনার দেখা হয়নি?

জরিনা।          কেন, আপনার ভয় হচ্ছে উনি আমাকে দেখেশুনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেননি, এসে হয়ত পছন্দ হবে না, বরখাস্ত করে দেবেন?

জামাল।          আরে না, না, তা ভাবছি না। ভাবছি, আমার বোন বোধহয় ফাঁসিয়েছে।

জরিনা।          আপনার বোন?

জামাল।          হ্যাঁ, ও লিখেছিল দল বেঁধে কক্সবাজার যাচ্ছে, পারলে জাহাংগীর, মানে আপনার চৌধুরী সাহেবকে দলে টেনে নেবে।

জরিনা।          আমার চৌধুরী সাহেব?

জরিনা মৃদু রসিকতা করেই ভুলটা ধরিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে থাকে জামাল, তারপর হেসে ফেলে অপ্রস্তুত হয়ে। কি করবে বুঝতে না পেরে জোরে হর্ন বাজিয়ে দেয়, লম্বা একটানা হর্ন বাজে।

ভেতর থেকে এবার দৌড়ে আসে লুৎফার মা- এ বাড়ির পুরানো দাসী, আর শমসের- এ বাড়ির পুরানো চাকর।

জামাল।          কোথায় থাকো তোমরা, আ্যাঁহ? এ যে মিস খানম, এ হচ্ছে লুৎফার মা, আর এ শমসের- এদের হাতেই বাড়িঘর, চৌধুরী সাহেব তো আর দুদিনের বেশি থাকেন না কখনো, এরাই বাড়ির হর্তাকর্তা।

কথাটা শুনে লুৎফার মা বিরক্তির সংগে পানের পিক ফেলল।

জামাল।          এরাই আপনাকে সব দেখিয়ে শুনিয়ে দেবে। আর, লুৎফার মা, ইনি সেই নতুন মাস্টার, ঢাকা অফিস থেকে যার কথা লিখে টেলিগ্রাম করেছিল।

লুৎফার মা।   সাহেব করে আসবেন, জানেন নাকি ম্যানেজার সাব?’

জামাল।          নাহ। কক্সবাজার গেছে।

বলে সে জরিনার দিকে প্রশস্ত নিঃশব্দ হাসে- অর্থাৎ তার বোনের সংগে যে কক্সবাজার গেছে, তার স্মরণে হাসিটা। তারপর জরিনাকে বলে,

জামাল।          আসি তাহলে, বাই বাই।

লুৎফার মা শমসেরকে বলে, যে এর মধ্যে জরিনার সুটকেস হাতে তুলে নিয়েছে।

লুৎফার মা।   শমসের, পুবের ঘরে নিয়ে যাও।- আসুন, আপনার ঘরটা সব ঠিক করে রেখেছি, আসুন।

ভেতরে উঠে যায় ওরা।

 

দৃশ্য ৮

প্রশস্ত ড্রয়িং রুম। সেকেলে আসবাব দিয়ে সাজানো। পুরানো দিনের অনুকরণে এমনকি একটা ফায়ার প্লেসও আছে। তবে, দেয়ালে কোনো ফটো বা তৈলচিত্র নেই। একটা পিয়ানো আছে এক কোণে। বাঘছাল এবং বল্লম ইত্যাদি দিয়ে দেয়াল সাজানো। ঘরের ভেতর আসে জরিনা ও লুৎফার মা। শমসেরকে দেখা যায় সুটকেস নিয়ে ভেতরে চলে যেতে। লুৎফার মা জরিনাকে নিয়ে ভেতরের দিকে যাবার উদ্যোগ করে, এমন সময় জরিনা দাঁড়িয়ে পড়ে জিগ্যেস করে,

জরিনা।          সে কই?

সংগে সংগে লুৎফার মার ক্লোজআপ। হঠাৎ যেন চমকে উঠেছে বুড়ি। কম্পিত গলায় সে উচ্চারণ করে,

লৎফার মা।   কে?

জরিনা।          মেয়েটি

জরিনা নির্দোষভাবেই তার দেখাশোনার কথা যাকে সেই মেয়েটির কথা জানতে চায়, কিন্তু ভুল বোঝে লুৎফার মা। (কাহিনী আরো অগ্রসর হলে আমরা বুঝতে পারব, কেন লুৎফার মা চমকে উঠেছিল।)  লুৎফার মার নিঃশ্বাস পড়ে ঘনঘন, ঠোঁট শুকিয়ে যায়।

জরিনা।          তার নামটিও তো আমার শোনা হয়নি। কি নাম ছোট্ট সোনামনির?

এবার স্বস্তি বোধ করে লুৎফার মা। হাঁপ ছেড়ে বলে,

লুৎফার মা। ও, তার কথা বলছেন। তুলির কথা। তার নাম তো তুলি

জরিনা।          বাহ, মিষ্ট নাম। তুলি। কোথায় সে?

লুৎফার মা।   বিকালে একটু ঘুমোয়, ঘুমিয়ে আছে। আপনি ঘরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিন, চা দিই, তুলি মনি উঠলেই আপনার কাছে নিয়ে আসব। আসুন,

সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠে যায় দু’জন।

 

দৃশ্য ৯

দোতলায় লম্বা বারান্দা। দরোজার পর দরোজা পেরিয়ে যায় লুৎফার মা, তার সংগে জরিনা।

জরিনা।          এত বড় বাড়ি?

লুৎফার মা।   হলে হবে কি, মানুষ আমরা এই ক’জন সাহেব তো থাকেই না।

জরিনা।          তুলির বাবা নেই শুনেছি। মা?

ক্লোজ আপÑ লুৎফার মা, চোখ নামিয়ে নেয় দাঁড়িয়ে পড়ে।

জরিনা।          তুলিও তবে আমারই মতো?

লুৎফার মা এগিয়ে যায়, একটা ঘরের সমুখে এস থামে।

লুৎফার মা।   এই আপনার ঘর। নতুন নতুন অসুবিধা হবে একটু দিশ পেতে, বড় বাড়ি তো। আপনার ঘর থকে সোজা বাঁ দিকে গিয়ে, তারপর ডান কি, আবার বাঁ দিকে, তারপর আবার বাঁ দিকে ফিরলেই নিচের সিঁড়ি পাবেন।

জরিনা।          তুলি কোথায় শোয়?

লুৎফার মা।   নিচে, সিঁড়ির পাশে বড় ঘরে,। আমার কাছে। জন্ম থেকে তো আমিই ওর দেখাশোনা করছি। যাই কামরাঙার হাতে চা পাঠিয়ে দিই।

জরিনা।          কামরাঙা  কে?

লুৎফার মা।   কাজের মানুষ। কামরাঙা আছে, ডালিম-এর মা আছে, আম্বিয়া আছে, আরো অনেকজন আছে। কতকালের বাড়ি কতকালের সংসার, বোঝেন না।

জরিনা ঘরের ভেতর ঢুকে যায়।

 

দৃশ্য ১০

ঘরের ভেতর আসে জরিনা। প্রশস্ত ঘর। পরিপাটি বিছানা পাতা। বিরাট ড্রেসিং টেবিল। চওড়া জানালা জরিনা জানালার কাছে যায়। নিচে বিরাট চত্বর চোখ পড়ে। কাজের মানুষদের দু’একজনকে দেখা যায়। কোথায় একটা পাখি ডেকে ওঠে। মনটা প্রফুল্ল হয়ে যায় তার। জানালার বাইরে চোখ ফেলে খোঁজে। পাখিটা দেখতে পায় না। ফিরে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে, আর তক্ষুনি তার চোখে পড়ে টেবিলের ওপর শাদা পাতায় কাঁচা হতে কি লেখা।

ক্লোজ আপÑ লেখাÑ “তুমি কি আমার মা?”

অফস্ক্রীনে পাখিটা আবার ডেকে ওঠে।

জরিনার চোখ জলে টলমল করে ওঠে।

 

দৃশ্য ১১

আগের দৃশ্য থেকে কাট করে আমরা দেখতে পাই তুলিকে। সাত বছরের মেয়ে। ড্রয়িং রুমে বসে তুলি আর তার সমুখে জরিনা।

তুলির সোলো শট থেকে দৃশ্য শুরু।

তুলি।              তুমি আমার মা? নিশ্চয়ই তুমি আমার মা। চাচা বলেছে, আমার মা আছে। আমার মা আসবে। তুমি তো এসেছ। তুমি আমার মা। বলো তুমি আমার মা।

ঠিক এই সময়ে লুৎফার মা ঘরে ঢুকেছিল তার হাতে ঝকঝকে করে মাজা একটা বড় টেবিল ল্যাম্পÑ দিনের বেলা বলে ধারানো নয়।

লুৎফার মা।   ছি তুলিমনি, দুষ্টুমি করছ।

জরিনা।          না, না, দুষ্টুমি তো কিছু করছে না। আমার সংগে গল্প করছে, তাই না তুলি?

লুৎফার মা টেবিলে ল্যাম্পটা রাখে। কাছে আসে। তুলিকে বলে,

লুৎফার মা।   তোমাকে বলেছি না, তোমার মাস্টার আসবে। উনি তোমার মাস্টার।

তুলি।              কক্ষনো না।

লুৎফার মা।   আবার। উনি তোমার মাস্টার।

তুলি কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়। জরিনাও খুব অস্বস্তি বোধ করতে থাকে।

তুলি।              উনি তো গান জানেন।

লুৎফার মা।   তাতে কি?

তুলি।              চাচা বলেছে, আমর মা গান জানে। তাহলে এই তো মা।

বলেই তুলি জরিনাকে এক হাতে আঁকড়ে ধরে।

জরিনার চোখ বেয়ে টপ করে অশ্রু ঝরে পড়ে। কোনোরকম জরিনা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,

জরিনা।          তুলি… তোমার… ইচ্ছে  হলে… তুমি… আমাকে… মাস্টার মা বোলো।

লুৎফার মা বিরক্ত মুখ করে চলে যায়।

তুলি হাত তালি দিয়ে ওঠে।

তুলি।              মাস্টার মা? কি মজা, মাস্টার মা, আগে একটা ‘মা’ শেষে একটা ‘মা’ মাঝখানে ‘স্টার’- স্টার মানে আমি জানি, তারা- তুমি তারা নিয়ে গান জানো মাস্টার মা? গাও না, আমাকে শিখিয়ে দাও না।

জরিনা।          তারা নিয়ে গান?

তুলি।              হ্যাঁ।

জরিনা।          আকাশে যে তারা?

তুলি।              হ্যাঁ, আকাশে যে তারা, গান করো না মাস্টার মা।

জরিনা তখন গাইতে শুরু করে-

গানের কথাগুলো এ রকম হতে পরে,

“রাত্রি তো নয় শুধু নিবিড় আঁধার, ওঠে চাঁদ, ফোটে তারা।

তার একটি তারার নাম ধ্রুবতারা।

কত পাখি উড়ে যায় নিঃসীম নিলীমায়

তার একটি পাখি আজ পথহারা।

থরথর ডানা তার কাঁপছে, ফিরতে পারবে কিনা ভাবছে,

জানে না সে নীলাকাশে একটি তারার নাম ধ্রুবতারা।”

এই গানের ভেতরে আমরা দেখব, তুলিকে দিয়ে পিয়ানোর রিড বাজিয়ে নিচ্ছে জরিনা- আঙুল ধরে ধরে। দেখব, তুলির রাতের খাওয়া সারা হলো পোশাক বদলানো হলো, তুলি লুৎফার মার সংগে তার ঘরে গেল শুতে, জরিনা তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল।

 

দৃশ্য ১২

লুৎফার মা বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে। তুলি ঘুমিযে পড়ল। জরিনার গান শেষ হলো।

লুৎফার মা।   চলুন, আপনি ঘরে যাবেন।

জরিনা।          আমি নিজেই যেতে পারব।

লুৎফার মা।   নতুন মানুষ, এত বড় বাড়ি, হারিয়ে যদি যান।

জরিনা।          কি বলো তুমি? হারাব কেন?

লুৎফার মা।   না, না, আমি সংগে আসি।

লুৎফার মা এ হেন চাপাচাপি করায় একটু অবাকই হয় জরিনা।

ঘর থেকে বেরিয়ে এসে লুৎফার মা যখন আঁচল থেকে চাবি নিয়ে দরোজায় তালা দেয়, জরিনা বিস্মিত হয়ে যায় ।

জরিনা।          তালা দিচ্ছ যে?

লুৎফার মা।   রাত্রিকাল তো।

তার গলার স্বর শুনে চমকে যায় জরিনা, দুর্বোধ্য ঠেকে ব্যাপারটা। তারা বেরিয়ে যায়।

 

দৃশ্য ১৩

ড্রয়িং রুমে আসে তারা, সিঁড়ির কাছে যাবে, এমন সময় সব বাতি নিভে যায়। ভীত গলায় জরিনা বলে,

জরিনা।          কি হলো, লুৎফার মা?

লুৎফার মা।   আপনাকে বলতে ভুলে গেছি। গর্ডেনে পাওয়ার হাউস আছে, লাইট সেখানে থেকে আসে, রাত দশটায় বন্ধ হয়ে যায়। তখন এই বাতি ভরসা।

বলতে বলতে লুৎফার মা ড্রয়িং রুমের টেবিলে থেকে একটা ল্যাম্প তুলে নেয়, সেই আলোতে সিঁড়ি দিয়ে ওরা উঠে যায়।

 

দৃশ্য ১৪

বিভিন্ন বারান্দা পেরিয়ে জরিনাকে নিয়ে লুৎফার মা জরিনার ঘরের কাছে আসে। দরোজার কাছ থেকে সে বিদায় নেয়Ñ কি একটা বলতে গিয়েও যে ইতঃস্তত করে আর বলে না, কেবল বলে,

লুৎফার মা।   আচ্ছা, সকালে দেখা হবে।

লুৎফার মা চলে যায়। জরিনার মুখের ওপর থেকে আলো সরে যায়। লুৎফার মা অন্ধকারে বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।

জরিনা ঘরে ঢোকে।

 

দৃশ্য ১৫

ঘরে ঢুকে জরিনা দ্যাখে তার বিছানার পাশে ছোট টেবিলের ওপর একটা ল্যাম্প ছোট করে রাখা। সে আলোটা বাড়িয়ে দেয়। ড্রেসিং টেবিলের কাছে আলোটা নিয়ে গিয়ে চুল খুলতে শুরু করে। কোথায় একটা প্যাঁচা ডেকে ওঠে। চমকে ওঠে সে। কেমন গা ছমছম করে তার। আয়নার নিজের মুখের দিকে বিস্ফারিত তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।

 

দৃশ্য ১৫-ক

বাইরে থেকে লং শট- রাতের অন্ধকারে বিশাল বাড়িটা ঘুমিয়ে আছে। চারদিকে স্তব্ধ।

 

দৃশ্য ১৫

ঘুমিয়ে আছে জরিনা। পাশে ল্যাম্পটা ছোট করে রাখা। হঠাৎ প্যাঁচার ডাক আবার শোনা যায়। ঘুম থেকে চমকে ওঠে  জরিনা। দপদপ করে ল্যাম্পটা নিভে যায়। সে বিছানায় ওপর উঠে বসে দ্রুত। চুপ করে থাকে। উৎকর্ণ, আতংকিত।

হঠাৎ তার ওপর দূর থেকে ওভারল্যাপ হয় নারী কণ্ঠের হাসি। উন্মত্ত সে হাসি। হঠাৎই আবার হাসিটা বন্ধ হয়ে যায়।

ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে জরিনা। অপেক্ষা করে, আবার হয়ত হাসিটা শোনা যাবে।

যায় না।

রাতের বাতাসে জানালার ফিনফিনে পর্দা ওড়ে। কেমন ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয় মৃদু তালের সংগীতে।

১৫-ক

বাইরে লংশট- রাতের অন্ধকারে নিঃঝুম বাড়ি।

 

১৫

জরিনা বিছানার ওপর স্থির বসে আছে, সতর্ক, উৎকর্ণ।

 

১৫ ক

বাইরে লংশট- ভোরের আলোয় বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে এখন।

বাঁশিতে ভোরের সুর বাজে।

 

 

দৃশ্য ১৬

ভোরবেলা। ড্রয়িং রুমের পাশে তুলির পড়ার ঘর। দেখা যায় তুলিকে বইখাতাসহ নিয়ে এলো লুৎফার মা, দারোজার পাশেই ছিল জরিনা- তুলিকে তার হাতে তুলে দিল।

লুৎফার মা।   এই যে আপনার ছাত্রী, একেবারে ফিটফাট।

জরিনা।          তুলি পড়তে বোসো।

তুলি ঘরের ভেতরে যেতেই জরিনা লুৎফার মাকে- যে চলে যাচ্ছিল- ডাকে,

জরিনা।          লুৎফার মা?- একটা কথা জিগ্যেস করব। কাল রাতে… কিছু…শুনেছিলে? শেষ কথাটা লুৎফার মার ওপর ওভারল্যাপ হয়। তার উক্তিতে কিছু একটা গোপন করবার আভাস লক্ষ্য করা যায়।

লুৎফার মা।   কই, না, কেন? কিছু শুনিনি তো।

জরিনা।          দাঁড়াও। কাল রাতে কে যেন হাসছিল।

লুৎফার মা।   কই, না। না তো।

জরিনা।          হ্যাঁ, একটা মেয়ে, পাগলের মতো, অনেক রাত। তুমি শোনোনি? লুৎফার মা নিঃশব্দে মাথা নাড়ে, যাবার জন্য চঞ্চল হয়, তার হাত ধরে জরিনা।

জরিনা।          সত্যি, তুমি শোনোনি?

লুৎফার মা।   না । কে হাসবে? কেউ না।

লুৎফার মা চলে যায়। ক্যামেরা জরিনার মুখের ওপর এগিয়ে এসে স্থির হয়। জরিনার ভ্রু কুঞ্চিত হয়। হঠাৎ তার ওপর ওভারল্যাপ হয় লুৎফার মা-র গলা।

লুৎফার মা।   আপা।

জরিনা ফিরে তাকায়। লুৎফার মা কাছে আসে, এবার একগাল হাসি তার মুখে।

লুৎফার মা।   এবার বুঝছি। এ নিশ্চয় আম্বিয়া, আমাদের শমসেরের বউ, মাথা খারাপ, মাঝে মাঝে হাসে, আবার কাঁদে। বোধ হয় আম্বিয়ার হাসি আপনি শুনেছেন। ও কিছু না। পুরান মানুষ, ফেলতেও পারি না, অনেকদিনই মাথা খারাপ।

লুৎফার মা চলে যায়।

ভেতর থেকে তুলির ডাক শোনা যায়,

তুলি।              মাস্টার মা।

জরিনা।          এই যে বাবু।

জরিনা ঘরের ভিতরে গিয়ে তুলির পাশে তার বইপত্র নিয়ে বসে পড়াতে।

জরিনা।          তাহলে এখন আমরা কি পড়ব তুলিমনি? কবিতা? গল্প? না, অংক করব?

তুলি তেতো ওষুধ গেলার মতো করে বলে,

তুলি।              অংক?

জরিনা।          হ্যাঁ, অংক?

তুলি।              আচ্ছা, মাস্টার মা, অংকের কোনো গান হয় না?

জরিনা হেসে ফেলে তুলির মাথায় চুলনাড়া দিয়ে বলে,

জরিনা ।     তোমার মাথায় শুধু গান, না? দাঁড়াও, দেখাচ্ছি মজা। এই অংকটা আগে করো।

 

দৃশ্য ১৭

এটি একটি মন্তাজ দৃশ্য। জীবন্ত উৎফুল্ল সংগীতের তালে তালে আমরা দেখতে পাবো তুলিকে নিয়ে এখানে জরিনার দিন কেমন কাটছে। বিভিন্ন শটে দেখা যাবে-

ক্লোজ আাপ- কঠিন একটা যোগ অংক।

ক্লোজ আপ- তুলির নাক কুঁচকে আসে।

ক্লোজ আপ- জরিনা পেনসিল নাচিয়ে শাসন করে হাসিমুখে।

লং শট- বাগানে তুলি স্কিপিং করছে, জরিনা দেখছে পাশে দাঁড়িয়ে।

মিড শট- টেবিলে ল্যাম্প জ্বালানো, তুলি খাচ্ছে, জরিনা দেখছে।

ক্লোজ লট- পিয়ানোর ওপর জরিনার আঙুল বাজিয়ে চলেছে।

মিড ক্লোজ শট- তুলি তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে।

মিড ক্লোজ শট- জরিনা একটা বই খুলে পড়ছে, তুলি শুনছে, শুনতে শুনতে ঘুমে ঢলে পড়ছে তুলি। জরিনা হঠাৎ তা লক্ষ্য করে,  স্নেহের হাসি ফুটে ওঠে যখন দ্যাখে যে তুলি ঘুমিয়েই পড়েছে।

মিড শটÑ একা জরিনাকে দেখা যায় তার নিজের ঘরে বসে চিঠি লিখতে।

সংগীতের জের ধরে আমরা পরের দৃশ্যে চলে যাই।

 

দৃশ্য ১৮

ঢাকায় জরিনার গানের স্যারের ঘর। স্যারকে দেখা যায় একটা চিঠি পড়ছে- জরিনার চিঠি। ঘরের ভেতর পায়চারী করতে করতে স্মিতমুখে চিঠি পড়ছে স্যার। ওভারল্যাপ, জরিনার স্বর।

জরিনা।          স্যার, এখানে এসে আমার দিন চমৎকার কাটছে। তুলির সংগে আমার ভারি ভাব হয়ে গেছে। তুলি এখন সেই গানটা আমার কাছে থেকে শিখছে। বলছে, তার চাচা এলে তাকে শুনিয়ে অবাক করে দেবে। তিনি এখনো বাইরেই আছেন। কবে আসবেন, জানি না।Ñ স্যার, এখানে সব সবুজ, পাহাড়গুলোও সবুজ, আর কি নির্জন। সবুজের ভেতর দিয়ে, নির্জন সড়ক দিয়ে বিকেলে যখন হাঁটি, আমার ভারি ভালো লাগে, মনে হয়Ñ আমি একটা নতুন জীবন পেয়ে গেছি, আমার নিজেকে আমি আবার ফিরে পেয়েছি। এখানেই যদি সারাটা জীবন আমি থাকতে পাই, আমি আর কিছুই চাই না।

 

টীকা : চিঠির শেষাংশ ওভারল্যাপ হয়ে পরের দৃশ্যে- “সবুজের ভেতর দিয়ে ….চাই না” পর্যন্ত।

 

দৃশ্য ১৯

লং শট। দেখা যায় নির্জন পাহাড়ি সড়কে জরিনা, একা একা আপন মনে বেড়াচ্ছে। তার ওপরে শোনা যাবে চিঠির বাকি অংশটুকু আগের দৃশ্য থেকে। চিঠির শেষে গুনগুন করতে করতে একটা কালভার্টের ওপর বসে। পাশেই বুনো ফুলের গাছ। কয়েকটা ফুল তোলে সে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দ্যাখে। পথের ওপর মাঝে মাঝে দু’একটা গরু ছাগল পারাপার করে।

জরিনা গুনগুন করছে।

এমন সময় দূরে থেকে মোটর সাইকেলের আওয়াজ শোনা যায়। গুনগুন থামিয়ে চোখ তুলে পেছনে ফিরে তাকায়। তাকিয়ে থাকে।

এবার একটি মোটর সাইকেল দেখা যায়। দ্রুতগতিতে পাহাড়ি সড়ক বেয়ে আসছে। আরোহী একজন পুরুষ, আসলে এ ছবির নায়ক, নাম জাহাংগীর, কিন্তু এখনো তাকে আমরা শনাক্ত করব না, যদিও চিত্রনাট্যে এখন জাহাংগীর বলেই লিখব। জরিনার সমুখ দিয়ে মোটর সাইকেল বেরিয়ে যায়।

যেতে যেতে জাহাংগীর জরিনার দিকে ফিরে তাকায় এবং তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ সমুখে গরু পড়ে যায়। তাল সামলাতে গিয়ে জাহাংগীর সাইকেলসহ নিজেই উলটে পড়ে। জরিনাকে পেরিয়ে কিছু দূরে এই ঘটনা ঘটে।

সংগে সংগে জরিনা উঠে দাঁড়ায়। এক মুহূর্ত পর ছুটে যায় কাছে।

জরিনা।          আপনার লেগেছে?

জাহাংগীর উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে।

জরিনা।          কাউকে ডেকে আনব?

জাহাংগীর উঠে দাঁড়ায়। পায়ে কষ্ট হচ্ছে। দু’একবার পা ছোঁড়ে। বেশ কষ্ট হচ্ছে দাঁড়াতে।

জাহাংগীর।    দরকার নেই।

তার অবস্থা দেখে জরিনা নিশ্চিন্ত হতে পারে না। জাহাংগীর মোটর সাইকেল তুলতে গিয়ে ব্যথায় পারে না।

জরিনা।          দরকার নেই, কি বলছেন? কাছেই জাহাংগীর সাহেবের বাড়ি, খবর দিলেই…

জাহাংগীর।    কাকে? জাহাংগীর সাহেবকে?

জরিনা।          না, তিনি তো নেই, তিনি ঢাকায়, কি কক্সবাজার।

জাহাংগীর।    কক্সবাজার? তাই নাকি? আপনি তো অনেক খবর রাখেন।- কে বলেছে আপনাকে? আর কি বলেছে? জাহাংগীর সাহেবের আর কি জানেন আপনি?

প্রশ্নটা রুষ্ট স্বরে উচ্চারিত হয় বলে জরিনা কঠিন হয়ে যায়।

জরিনা।          দেখুন, আপনার বিপদ দেখে এগিয়ে এসেছি, আপনার জোর উত্তর দেবার জন্য নয়। সাহায্যের যখন দরকার নেই, তখন নেই।

জরিনা শট থেকে বেরিয়ে যায়।

জাহাংগীর।    শুনুন।

জরিনা দূরে দাঁড়িয়ে পড়ে।

জাহাংগীর।    কোথা থাকেন?

জরিনা।          তা শুনে দরকার আছে?

জাহাংগীর এবার মোটর সাইকেল তুলতে তুলতে বলে,

জাহাংগীর।    আছে। আপনি আমাকে সাহায্য করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন, এখন মনে হচ্ছে আমিই আপনাকে সাহায্য করতে পারি।

জরিনা।          কি রকম?

জাহাংগীর।    এ-ই , একা মেয়ে, নির্জন রাস্তা, সন্ধ্যে হয়ে আসছে, কোথায় থাকেন বললে পৌছে দিতে পারি। পেছনে বসতে পারেন।

জরিনা। ধন্যবাদ। সন্ধ্যে হলেও আমার ভয় নেই।

জাহাংগীর এ কথা শুনে ভ্রু তুলে রাখে কিছুক্ষণ।

জাহাংগীর।    তাই?

জরিনা।          হ্যাঁ, তাই। গাছপালাকে আমি ভয় পাই না।

জাহাংগীর মোটর সাইকেল ঠেলে জরিনার কাছে এসে বলে,

জাহাংগীর।    গাছপালাকে ভয় করেন না- মানুষকে?

জরিনা।          যদি জানাতে চান, মানুষকেই আমি বিশ্বাস করি না।

হো হো করে হেসে ওঠে জাহাংগীর। মোটর সাইকেলে বসতে বসতে বলে,

জাহাংগীর।    তাই, তাই, তাই আপনি আমার লিফট নিচ্ছেন না। আমাকে বিশ্বাস করছেন না। অল রাইট। আপনার অবিশ্বাস নিয়ে থাকুন।

জাহাংগীর দ্রুতবেগে মোটর সাইকেল চালিয়ে বেরিয়ে যায়।

সোলে শট- জরিনা, মুখ ফিরিয়ে নেয়, একটু এগিয়ে যায়, ব্যাক টু ক্যামেরা, থামে, তারপর আবার তার পেছন ফিরে অর্থাৎ আমাদের দিকে, অফস্ক্রীনের দিকে তাকায়। কঠিন তার দৃষ্টি। কাট করে- টপ শট- ভিস্টা শট- নির্জন পাহাড়ি সড়ক জরিনা একটা বিন্দুর মতো দাঁড়ায়ে- চারদিকে প্রায় অন্ধকার হয়ে আসেছ।

 

দৃশ্য ২০

লংশট। চৌধুরী বাড়ি। সন্ধ্যে পার হয়ে গেছে। এখন বাড়ির কোনো কোনো জানালায় আলো দেখা যাচ্ছে।

আমার জরিনাকে দেখতে পাই ধীরে হেঁটে হেঁটে, ব্যাক টু ক্যামেরা, অথবা পাশ থেকে, বাড়ির দিকে যাচ্ছে।

 

দৃশ্য ২১

ড্রয়িংরুম। লুৎফার মা এক কোণে পর্দা টেনে দিচ্ছে, এমন সময় সমশের তার কাছে আসে।

সমশের ।        খালা, আরেকটা বোতল দাও।

লুৎফার মা।   সে কি রে, এর মধ্যে এক বোতল শেষ?

সমশের।         এক বোতল? বোতলের তলায় এতটুকু। এক চুমুকে উড়ে গেল যে।

লুৎফার মা।   বলছিস?

সমশের।         শুঁকে দ্যাখো, আমার মুখে গন্ধ নেই। আরেকটা বোতল দাও। লুৎফার মার সন্দেহ তবু যায় না। ড্রিংক ক্যাবিনেটে চাবি দিয়ে বোতল বার করতে করতে বলে,

লুৎফার মা।   দিচ্ছি। তবে তোর পেটে যদি একটি ফোঁটাও যায়-

বোতলটা সমশের লুফে নিয়ে বলে,

সমশের।         পেলেও, আমার পেট তো কাচের তৈরি না খালা, যে লেবেল তুললেই দেখতে পাবে কি নেই।

বলে সে জমা  তুলে পেট দেখায়।

লুৎফার মা।   তবু, টের যদি পাই, বুঝবি মজা।

সমশের।         মজাটা যে কি , বুঝলে আর বলতে না। কতদিন বললাম, খালা-

লুৎফার মা।   মর হারামজাদা।

হাত তুলতেই সমশের বোতল বাঁচিয়ে সিঁড়ির দিকে ছুট দেয়।

আর ঠিক তখন বাইরে থেকে ঘরে আসে জরিনা।

তার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে ক্লোজ আপ গ্যাপ- সমশেরের হাতে বোতলের ওপর।

আবাক হয়ে থমকে যায় জরিনা।

সমশের সিঁড়ি দিয়ে উধাও হয়ে যায়।

লুৎফার মা জরিনার কাছে এগিয়ে আসে।

জরিনা তাকে চরম বিস্ময় নিয়ে উধাও সমশেরের দিকে আঙুল তুলে জিগ্যেস করে,

জরিনা।          এ…এ সব কি?

লুৎফার মা।   লাল পানি।

বলে লুৎফার মা আরেক জানালার পর্দা টানতে যায়। তার কাছে যায় জরিনা।

জরিনা।          বাড়িতে তোমরা রাখো এ সব?

লুৎফার মা।   যার বাড়ি সে রাখে, আমরা রাখতে যাব কেন?

লৎফার মা পর্দা টেনে এবার পিয়ানোটা ঝাড়ামোছা করে।

জরিনা।          কোথায় নিয়ে গেল?

লুৎফার মা।   সাহেবের ঘরে। সাহেব এসেছেন।

জরিনা।          উনি এ সব খান?

লুৎফার মা।   উনি আর কি খান? বড় সাহেব যা খেতেন, বোতল জমালেই- ঐ যে বাইরে পাহাড়- ও রকম একটা বোতলের পাহাড় হয়ে যেত।

সমশের আবার সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসেছে একটু আগেই, দূর থেকে সে এবার যোগ করে,

সমশের ।        বোতল যা জমেছিল, তাও একখানা টিলা। সেই টিলা বেচেই তো আমার বিয়েটা পার করলাম, মাস্টার আপা।

সমশের ড্রিংক ক্যাবিনেটের ওপরে খোলা তাক থেকে একটা গেলাশ হাতে নেয়। লুৎফার মা গিয়ে খপ করে তার হাত ধরে।

লুৎফার মা।   আবার গেলাশ নিচ্ছিস যে? একটা নিয়ে গেলি না তখন?

সমশের।         ও-ও, মনে ছিল না, খালা, মনে ছিল না, তাহলে যাই।

সমশের আবার সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায়। পেছন থেকে লুৎফার মা বলে,

লুৎফার মা।   মনে করিস, তোর শয়তানি আমি বুঝি না?

জরিনার দিকে ফিরে বলে,

লুৎফার মা।   অর্ধেক তো ওইই শেষ করে। চাবি দিয়ে রাখি। সাহেব এলে আর পারি না। এ সব দেশেশুনে জরিনা ভীত হয়ে পড়ে। মনে রাখতে হবে, তার মামাতো ভাই যে মদ খেতো সে ঈংগিত আমরা আগেই পেয়েছি। তাই মদ খাওয়াটা জরিনাকে একটু বেশি বিচলিত করে ফ্যালে। সে এখন তুলির জন্যে চিন্তিত হয়ে পড়ে।

জরিনা।          লুৎফার মা. তুলি কোথায়?

লুৎফার মা।   ঘরে। শুয়ে পড়েছে।

জরিনা।          এত সকালে?

লুৎফার মা।   শাস্তি দিয়েছে সাহেব।

জরিনা।          সাহেব শাস্তি দিয়েছে, তুলিকে? কেন?

লুৎফার মা।   আমি কি  বলব- আমি কি বলব?

অপ্রতিভ গলায় বলতে বলতে লুৎফার মা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

কিছুক্ষণ বোকা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে জরিনা। আপন মনে সে বলে,

জরিনা।          তুলি কি এমন করল?

সে তুলির ঘরের দিকে পা বাড়ায়।

 

দৃশ্য ২২

তুলির ঘরের দরোজার বাইরে এসে দাঁড়ায় জরিনা। দরোজা বন্ধ।

জরিনা।          তুলি মনি, তুলি।

বলতে বলতে দরোজার হাতল ঘোরাতে গিয়েই সে দ্যাখে তালা লাগানো। খুলছে না। তখন সে দরোজায় ব্যাকুল হয়ে আঘাত করে ডাক দেয়,

জরিনা।          তুলি, তুলি।

ভেতর থেকে দরোজার ওপর আছেড়ে পড়ে তুলি। জরিনার ওপর তার ডাক ওভারল্যাপ হয়,

তুলি।  মাস্টার মা, মাস্টার মা।

জরিনা। তুলি।

এরপর থেকে দরোজার এপার-ওপার আলাদা আলাদ শট নিতে হবে দু’জনের, আবার মাঝে মাঝেই একের সংলাপ আরেকজনের ওপর ওভারল্যাপ করবে।

তুলি।              আমি কিছু করিনি মাস্টার মা, আমি কিছু করিনি, কোনো দুষ্টুমি করিনি, আমাকে তবু আটকে রেখেছে।

জরিনা।          তুলিমনি, একটু দাঁড়াও, সোনা আমার, একটু দেরি করো।

বলেই জরিনা চিৎকার করে ডাকে,

জরিনা।          লুৎফার মা, লুৎফার মা। – তুলি, এক্ষুনি আমি তালা খোলাচ্ছি, সোনা।

তুলি।              আমি বাইরে যাবো, আমি তোমার কাছে যাবো, আমি তোমার কাছে থাকব।

জরিনা।          লুৎফার মা।

লুৎফার মা আসে। পরবর্তী সংলাপের ফাঁকে ফাঁকেই ভেতর থেকে তুলির ‘মাস্টার মা’ ডাক ও করাঘাত হবে।

জরিনা।          লুৎফার মা, চাবিটা দাও।

লুৎফার মা।   চাবি দিতে পারব না।

জরিনা।          পারবে না? ও। তাহলে তালাটা তুমিই খুলে দাও।

লুৎফার মা।   তাও পারব না।

জরিনা।          কেন পারবে না?

লুৎফার মা।   সাহেবের হুকুম।

জরিনা।          সাহেবের হুকুম? নিষ্পাপ কচি একটা বাচ্চাকে ঘরে তালাবন্ধ করে রাখতে হুকুম দিয়েছে তোমদের সাহেব? তার মনে এতটুকু মায়াদয়া নেই? তার না হয় নেই, তোমারও কি নেই, লুৎফার মা?

লুৎফার মা।   সাহেবের হুকুম।

জরিনা।          কোথায় তোমার সাহেব? কোথায় তিনি?

জরিনার ওপরেই ওভারল্যাপ হয় জাহাংগীরের কণ্ঠস্বরÑ

জাহাংগীর।    এখানে।

সংগে সংগে ঘুরে তাকায় জরিনা এবং জাহাংগীরকে দেখতে পায়। মুহূর্তে সে বুঝতে পরে এই লোকটির সংগেই তার দেখা হয়েছিল সড়কের ওপর।

জরিনা।          আপনি?

জাহাংগীর।    হ্যাঁ, আমি। আপনি যাকে চিৎকার করে খুঁজছিলেন।

বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে শেষ কটা ধাপ নেমে আসে জাহাংগীর- একটু নেশাগ্রস্ত। জরিনার কাছে দাঁড়ায়। লুৎফার মা সরে যায় চট করে।

জাহাংগীর। আমি আপনার সেই সাহেব, জাহাংগীর চৌধুরী। আপনি তো মিস জরিনা খানম। অ্যাকসিডেন্ট করে আমার পা ভাঙেনি, দেখতে পারছেন, ভালো আছে, আর অপনিও দেখছি বনেজঙ্গলে ভালোই ছিলেন, ভালোয় ভালোয় ফিরে এসেছেন। দু’জনের কারোরই কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি।- শমসের, শমসের, বোতল নিচে লাগাও।

চিৎকার করে নির্দেশটা দিয়ে জাহাংগীর ড্রয়িং রুমের দিকে এগোয়। আমরা তাকে অনুসরণ করে ড্রয়িং রুমে যাই।

শমসেরকে চিৎকার করে যখন ডাক দেবে জাহাংগীর আমরা ইনসার্ট দেখাব- জাহাংগীরের ঘরে শসমের তখন নিজেই এক ঢোঁক সুরাপন করছিল। ডাকটা ওভারল্যাপ হতেই সে দ্রুত সচল হয়ে বোতল গেলাশ গুছিয়ে নেয়।

 

দৃশ্য ২৩

ড্রয়িং রুমে প্রায় টলতে টলতে এসে জাহাংগীর ধপ করে একটা সোফায় বসে।

একটু পরেই জরিনা এসে দাঁড়ায়।

জরিনা।          আপনার মনে দয়া নেই.

প্রশ্নটা বেশ মজা দেয় জাহাংগীরকে।

জাহাংগীর।    কেন, কেন?

জরিনা।          তাও বলে দিতে হবে?

জাহাংগীর।    আপনার ইচ্ছা।

জরিনা।          তুলিকে আপনি আটকে রেখেছেন কেন?

জাহাংগীর।    তুলিকে আপনি এত আদর দিয়েছেন কেন?

জরিনা।          আপনি জানেন, তুলি একটা ছোট্ট মেয়ে।

জাহাংগীর।    আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আপনি ঠিক তত ছোট্ট মেয়ে নন।

জরিনা।          তার মানে?

জাহাংগীর।    তাও বলে দিতে হবে?

জরিনা।          নিশ্চয়ই। আপনাকে বলতে হবে, কেন আমাকে আপনি আপমান করছেন?

জাহাংগীর।    আপনিই বা কেন তার কাছে মা সেজেছেন, জানতে পারি কি মিস জরিনা খানম?

ইতিমধ্যে শমসের বোতল গেলাশ এনে জাহাংগীরের পাশের টেবিলে সাজিয়ে নিজে টেবিলের আড়ালে বসে পড়ছে।

জাহাংগীর।    আপনাকে আনা হয়েছে তুলির লেখাপড়ার জন্য, তার মা সাজবার জন্য নয়। আপনি তার মাস্টার মা নন, শুধু মাস্টার।

শেষ কথাটা জরিনার ক্লোজ আপের ওপর ওভারল্যাপ হয়। তার চোখ ছলছল করে ওঠে। কান্না ঠেলে উঠতে থাকে। সে ছুটে বেরিয়ে যায়।

মিড ক্লোজ- জাহাংগীর- জরিনার যাবার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং সেদিকে তাকিয়ে থেকেই বলে,

জাহাংগীর।    কেঁদে ফেলল নাকি রে, শমসের।

সংগে সংগে কেটে আমরা দেখি সমশের আরেক ঢোঁক লুকিয়ে খাচ্ছিল, তাড়াতাড়ি মুখ মুছে সে বলল,

সমশের।         হুজুর।

জাহাংগীর।    একটু বোধহয় কড়াই হয়ে গেল।

গেলাশে তুলে নেয় জাহাংগীর, চুমুক দেয়।

জাহাংগীর।   আমি ছন্নছাড়া লোক, সেন্টিমেন্ট একেবারেই পছন্দ করি না। আর বেশি আদর দিলে বাচ্চারা নষ্ট হয়ে যায়, যেমন আমরা নষ্ট হয়েছি। আমার বাবা আদর দিয়ে দিয়ে- ভাইয়ার পরিণাম তো জানিস, তার মেয়েকে আমি নষ্ট হতে দিতে পারি না। এখন থেকেই শক্ত হতে হবে। কড়া ডিসিপ্লিনে মানুষ করতে হবে। যা, যা , ঐ মাস্টারকে ডেকে নিয়ে আয় তো, না, আমিই যাচ্ছি, লেট মি গো।

জাহাংগীর উঠে যায়। শমসের সুরাপানের সুবিধে পেয়ে যায়। মনিব চলে যেতেই সে গলায় ঢালতে শুরু করে দেয়।

 

দৃশ্য ২৪

দোতালার বারান্দা দিয়ে জাহাংগীর আসে, এ ঘর সে ঘর দেখে অবশেষে একটা ঘরের দরোজা খোলা দেখে এগোয় এবং দ্যাখে- জরিনা দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে আছে বিছানার এক কোণে।

জাহাংগীর।    শুনুন।

জরিনা হাত নামিয়ে মুখ তুলে তাকায়।

জাহাংগীর।    কি একটা কথা মনে হলো, আপনাকে বলা দরকার, ভুলে গেলাম।

জরিনা।          আর কি কথা, আপনি তো শেষ কথা বলেই দিয়েছেন।

জাহাংগীর।    আপনি রাগ করছেন? প্লিজ, মাইন্ড করবেন না। তুলির মুখে ঐ ‘মা’ ডাকটা শুনে মাথার ভিতরে তখন চড়াক করে উঠেছিল। সে আপনি বুঝবেন না, জেনেও দরকার নেই।

জরিনা একটু অবাক হয়ে কথাটা শুনে। আস্তে উঠে দাঁড়ায়।

জাহাংগীর।    ইয়েস, মনে পড়েছে। বাড়ি আসতেই তুলি আমাকে কি একটা গান শোনাতে চেয়েছিল আপনি নাকি শিখিয়েছেন, মেজাজ গরম হয়ে গেল, শোনাই হলো না। তালাটা খুলে দিতে বলি, তুলি তাহলে গানটা আমাকে শুনিয়ে দিক।

জরিনা।          আপনি কি মনে করেন, তুলি একটা যন্ত্র, দরোজা খুলে দিলেই সে গান করতে পারবে? এরপরও তার সেই মন আছে?

জাহাংগীর।    আমি তো যে কোনো অবস্থায় গান করতে পারি, আপনার বিশ্বাস হয় না? আপনি জানেন না, গান আমি কতখানি ভালোবাসি। তাই তুলিকে গান শেখাচ্ছি। ওর ঐ ‘মা’ ডাকটা যদি না দিত, আমি তক্ষুনি ওর গান শুনতাম, ইউ বিলিভ মি। ওর মুখে ‘মাস্টার মা’ শুনে- আপনি যদি জানতেন। সত্যি, তুলিকে ডাকলে এখন গাইবে না?

জরিনা।          আপনি জানেন না, আপনি আবোলতাবোল বকছেন।

জাহাংগীর।    মানে, মাতলামো করছি?

জরিনা।          তাই যদি বোঝেন, কেন মদ খান?

জরিনা দরোজা লাগিয়ে দেয়।

দৃশ্য ২৫

ড্রয়িং রুম। সমশের একাকী, মেঝেয় বসে লুকিয়ে টানছে। জাহাংগীর আসতেই সামলে নেয়। জাহাংগীর সোফায় বসে গেলাশ হাতে চুমুক দেয়, তারপর গেলাশের দিকে তাকিয়ে বলে,

জাহাংগীর।    মদ কেন খাই? বল তো সমশের, কেন মদ খাই?

সমশের ।        হুজুর।

জাহাংগীর।    বলতে পারলি না তো। ইডিয়েট। খুব সোজা। এটা প্রতিশোধ। মদ খাই। কারণ মদ আমাদের বংশটাকে খেয়েছে। খায়নি?

সমশের অতঃপর উত্তরগুলো হেঁচকিসহ প্রতিবারে শেষ হবে।

সমশের।         খেয়েছি।

জাহাংগীর।    স্বীকার করছিস?

সমশের।         করছি।

জাহাংগীর।    তবু বল, কেন খাই।

সমশের।         খাচ্ছি।

জাহাংগীর।    খাচ্ছিস?

সমশের।         না, না তো।

জাহাংগীর।    হেঁচকি তুলছিস?

সমশের।         না তো।

জাহাংগীর।    টেনেছিস।

সমশের।         না।

জাহংগীর।      আলবৎ টেনেছিস। সত্যই আমার সামনে টেনেছিস? সত্যি কথা বল।

সমশের।         হুজুর, সত্যি কথা এই যে, আপনি আমার সামনে টেনেছেন।

জাহাংগীর।    তুই আর আমি এক?

সমশের।         না, দুই। তবে, আপনি এক, আমি এক, মোট দুই, দুইজন।

বলতে বলতে সমশের জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে যায়।

সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে জাহাংগীর। হঠাৎ জরিনার কথা মনে পড়ে তার, হাসে একটু, প্রতিধ্বনি করে

জাহাংগীর।    তাই যদি বোঝেন, কেন মদ খান?

 

দৃশ্য ২৬

জরিনার ঘর। রাত। লাইট নিভে গেছে। টেবিলে ল্যাম্প জ্বালিয়ে চিঠি লিখছে জরিনা। তার নিজেরই কণ্ঠস্বর ওভারল্যাপ করে এবং আমরা বুঝতে পারি সে কি লিখছে।

জরিনা।          স্যার, আজ উনি ঝড়ের মতো এসে উপস্থিত। জাহাংগীর সাহেবকে এই প্রথম দেখলাম। লোকটাকে বোঝা যায় না। কখন কি করবেন, কখন কি বলবেন, কখন কোন মুডে থাকবেন। আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না স্যার, তুলিকে এসেই তুচ্ছ একটা কারণে কি কঠিন শাস্তি দিয়েছেন। জানি না, মদ খান বলেই জাহাংগীর সাহের এ রকম কিনা। আপনি তো জানেন, আমি যার কাছে মানুষ, আমার সেই মামাতো ভাই একটা মাতাল। মাতালকে আমি ঘৃণা করি। স্যার, আমি এখানে আর এক মুহূর্ত থাকতে চাই না, থাকতে পারব না, কোথায় যাবো তাও জানি না।

কথা শেষ হবার সংগে সংগেই অফস্ক্রীনে পিয়ানোর টুং টাং শোনা যায়, তারপরই সুরের একটা জোর অভিঘাত।

জরিনা উৎকর্ণ হয়ে ওঠে। আবার পিয়ানোর সুর শোনা যায়।

আপন মনেই জরিনা বলে ওঠে,

জরিনা।          কে বাজায়?

চেয়ার থেকে সে উঠে দাঁড়ায়।

 

দৃশ্য ২৭ ইন্টারকাট দৃশ্য ২৭ক

অন্ধকার ড্রয়িং রুম। সেখানে তন্ময় হয়ে, পিয়ানোর ওপর ঝুঁকে পড়ে বাজিয়ে চলেছে জাহাংগীর।

২৭ক- জরিনা তার ঘরের দরোজা খোলে,  বেরিয়ে আসে ল্যাম্প হাতে।

২৭-  জাহাংগীর এখন পিয়ানোয় বসেই গান গেয়ে ওঠ- তার জীবনের আর্তি দিয়ে রচিত সে গান,

যার কথাগুলো এ রকম হতে পারেÑ

‘নিভে যাওয়া দীপ জ্বালাতে পারি না, কে আছে এমন বন্ধু

জ্বেলে দেবে দীপ, শুধাবে কুশল, আছে কি এমন বন্ধু?

নিরাশায় বয়ে যায় রাতের আঁধার, জানি, তুমি তো কাছেই আছো বন্ধু।

২৭ক- সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে জরিনা সন্তর্পণে, কৌতূহল নিয়ে।

২৭- জাহাংগীর প্রথম অন্তরা ধরে।

জরিনা এসে ড্রয়িং রুমের এক কোণে দাঁড়ায়। তার চোখ কোমল হয়ে আসে। যেন সে এই প্রথম লোকটির দুঃখ অনুভব করতে পারে।

জাহাংগীর দ্বিতীয় অন্তরা ধরে।

জরিনা ইতঃস্তত করে আর এগোবে কিনা।

গাইতে গাইতে জাহাংগীর একবার পেছনে ফেরে আধেক। তখন  নিজেকে লুকিয়ে নেয় জরিনা। জাহাংগীর গেয়ে চেলে।

২৭ক-   জরিনা এবার সিঁড়ি দিয়ে উঠে যায়।

২৭- জাহাংগীর গানের শেষ পর্যায়ে।

২৭ক-  জরিনা তার নিজের ঘরে আসে। টেবিলে ল্যাম্পটা রাখে। পাশেই চিঠিখানা। সেটা হাতে তুলে নেয় সে।

২৭-  জাহাংগীরের গান শেষ হয়।

২৭ক-  জরিনার ওপর পিয়ানোর শেষ অভিঘাত। জরিনা চিঠিখানা দুমড়ে ফেলে নিজের অজান্তে।

২৭-  পিয়ানোর ওপর মাথা রেখে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে থাকে জাহাংগীর।

 

দৃশ্য ২৮

ভোরের সোনালি রোদে চৌধুরী বাড়ির লং শট। শব্দ তুলে জীপ গাড়ি আসে, গাড়ি বারান্দার নিচে দাঁড়ায়। গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে জামাল নামে, আর একই সংগে দরোজা দিয়ে বেরিয়ে আসে জাহাংগীর। সহাস্য সজীবতা নিয়ে হাত বাড়িয়ে বলে,

জাহাংগীর।    হ্যালো, জামাল, হাউইজ লাইফ।

জামাল।          হ্যালো, স্যার, হোয়ট এ সারপ্রাইজ। আমাকে একটা খবর দিলে তো স্যার, আমি আপনাকে স্টেশন থেকে জীপে করে নিয়ে আসতে পারতাম।

জাহাংগীর।    আপনি তো  নতুন এসেছেন, জানেন না। আমি এই রকমই ধুমকেতুর মতো হঠাৎ উদয় হই, আবার মিলিয়ে যাই। যখন যাই স্টেশনে মোটর সাইকেলটা মাস্টারের কাছে রেখে যাই, ফেরার পথে নিয়েনি। নো প্রবলেম।

জামাল।          কতদিন, এবার থাকবেন তাহলে, স্যার?

জাহাংগীর।    আরে, সেইজন্যেই আপনার কাছে যাচ্ছিলাম, ভালোই হলো নিজেই এসে পড়েছেন।

দু’জনে নিচে নেমে আসে।

জামাল।          গার্ডেন যাচ্ছিলাম। চলুন।

জামাল ড্রাইভিং সিটে বসতে যাচ্ছিল, জাহাংগীর বাধা দিল।

জাহাংগীর।    নো, লেট মি টেক দ্য হুইল।

জাহাংগীর হুইল নেয়, জামাল পাশে উঠে বসে, এই অবসরে কথা চলতে থাকে, এনজিনও স্টার্ট দেয়া হয় এবং ওদের কথা চলতে চলতেই জীপ রওয়ানা হয়ে যাবে।

জাহাংগীর।    নূপুর, আপনার বোন, আর ওর বান্ধবী সিমকি- ইফ আই অ্যাম নট মিসটেকেন যার সংগে আপনার কি বলে ইয়ে-

জাহাংগীর হাতের একটা  অস্পষ্ট ভঙ্গি করে, জামাল লজ্জিত হাসে।

জাহাংগীর।    ওরা আগামীকাল ভোরের ট্রেনে আসছে।

জামাল।          এখানে? কি আশ্চর্য? হঠাৎ?

জাহাংগীর।    ঐ আমি কথায় কথায় বলছিলাম, পাহাড়িদের রাসপূর্ণিমার কথা, বলল- তাদের নাকি সেটা দেখাতেই হবে। আমি বললাম-

গাড়ি ঘোঁত শব্দ করে হঠাৎ এগিয়ে যায়।

 

দৃশ্য ২৯

দোতালায় জরিনার ঘর। তার জানালা থেকে টপ শট- দেখা যায় নিচে জীপটা উধাও হয়ে গেল। দেখছিল, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে জরিনা আর তুলি। তুলি জানালার তাকে ছোট্ট মুঠি পাকিয়ে তিনটে কিল দিয়ে বলে,

তুলি।              আর যেন না আসে।

জরিনা।          ছী। বলতে নেই। তোমার চাচা হয়ত। জানি তোমার খুব রাগ হয়েছে। দাঁড়াও, তোমার চাচাকে আমি এমন শাসন করব না?

তুলি।              ভয় পাবে না, মাস্টার মা?

জরিনা।          ভয়? তোমার চাচাকে? দেখো না, তোমার চাচাই আমাকে কি রকম ভয় করবে।

তুলি।              তাহলে খুব মজা হবে। চাচাকে তখন তালা দিয়ে আমি আটকে রাখব।

জরিনা।          তোমার চাচাকে আটকাতে আশা করি তালা লাগবে না, তুলিমনি।

জরিনা তাকে চুল বেঁধে সারা করে এখন দরোজার দিকে এগোয়। তুলি চোখ বড় বড় করে বলে,

তুলি।              তুমি জানো না, মাস্টার মা, তালা লাগাতে হয়, আমাদের বাড়ির ঐ পেছন দিকে না, একটা ঘরে তালা আছে। কে যেন আছে।

জরিনা।          কার কাছে যে কি তুমি শোনো।

তুলি।              না, সত্যি, মাস্টার মা। কেউ জানে না যে আমি জানি।

জরিনা।          আমিও জানি। ও একটা পাগলী। শমসেরের বৌ আম্বিয়া, লুৎফার মা আমাকে বলেছে।

তুলি তবু চোখ বড় বড় করে মাথা নাড়তে নাড়তে বলে,

তুলি।              না, না, না।

হসিনা।           থাক, আর পাকামো করতে হবে না। পড়তে চলো।

 

টীকা: এই দৃশ্যের শেষ অংশটুকু চলতে চলতে বারান্দায় করা যেতে পারে- কারণ ওরা নিচে যাচ্ছে তুলির পড়ার ঘরে।

 

দৃশ্য ৩০

ড্রয়িং রুম। সমশের আল লুৎফার মা পুরো ঘর সাফসুতরো করছে, ঝাড়ামোছা চলছে পুরো দমে, আরো দু’একজন দাস দাসী থাকলেও ক্ষতি নেই।

লুৎফার মা।   সব আয়নার মতো ঝকঝক করা চাই। কোথাও একটুও ধুলা থাকবে না। এমন সময় জরিনা তুলিকে নিয়ে আসে, গন্তব্য তুলির পড়ার ঘরের দিকে।

লুৎফার মা।   তুলিমনিকে আজ আমি তো আর চুল বেঁধে দিতে পারলাম না। ঘরদোর সাফ করার যে আর্জেন্ট হুকুম দিল সাহেব।

জরিনা মৃদু হেসে তুলিকে নিয়ে পাড়ার ঘরে চলে যায়। আমরা আর তাদের দেখি না।

সমশের।         বলা নাই, কওয়া নাই, হঠাৎ আর্জেন্ট হুকুম কেন, খালা? কে আসবে?

লুৎফার মা গলা নামিয়ে চাপা হাসি নিয়ে বলে,

লুৎফার মা।   সাহেবের বৌ।

সমশের।         যাঃ সাহেব বিয়েই করেনি।

লুৎফার মা।   করবে না-ও তো বলে নাই, সমশের মিয়া।

তারপরই লুৎফার মা হাসি ছেড়ে গম্ভীর গলায় হুকুম দেয়,

লুৎফার মা।   খানসামা খানসামার মতো থেকো, অত খোঁজ নিও না, তাড়াতাড়ি করো, এরপর আবার তাদের শোবার ঘর ঠিক করতে হবে, বিছানার চাদর টাদর বের করি।

সে চলে গেলে সমশের ঝাড়নের একটা ঝাড়া দিয়ে বলে ওঠে,

সমশের।         এহ, খালা বলেই ছেড়ে দেব নাকি? আমি খানসামা? আর সে ভারী নবাবের নানী?

দূরে একটা দাসী আঁচল চাপা দিয়ে হেসে ওঠে। সমশের বলে,

সমশের।         চোপ।

 

দৃশ্য ৩১

ড্রয়িং রুম। সন্ধ্যে হযে গেছে। পিয়ানোয় তুলি। শটে শুধু তাকেই দেখা যাচ্ছে, অফস্ক্রীনে কার দিকে ফিরে সে যেন বলছে আর বাজিয়ে গেয়ে শোনাচ্ছেঁ দু’টো লাইন মাঝখান থেকে।

তুলি।              না, না, এই রকম, এই রকম করে গাইতে হয়। ‘তার একটি তারার নাম ধ্রুবতারা/ কত পাখি উড়ে যায়- নিঃসীম নিলীমায়, তার একটি পাখি আজ পথহারা’/-

তার ওপরেই পুরুষ কণ্ঠে ওভারল্যাপ হয় সুরে সুরে গাওয়া প্রথম লাইন- আসলে এ কণ্ঠে জাহাংগীরের।

জাহাংগীর।    ‘রাত্রি তো নয় শুধু নিবিড় আঁধার, ওঠে চাঁদ, ফোটে তারা।’

হেসে ওঠে জাহাংগীর নিজেই হো হো করে। তুলির মাথায় নাড়া দিয়ে দেয়। বোঝা যায় অনেকক্ষণ থেকেই সে ভাইঝির কাছ থেকে গানটা শিখে নিচ্ছিল।

তুলি।              তুমি মোটেও মন দিচ্ছ না, আবার গাও।

জাহাংগীর।    এহ, মাস্টার হয়েছে।

তুলি।              মাস্টার তো। আমি শেখাচ্ছি যে। ও- মা।

বলেই সে দরোজার দিকে তাকায়।

কাট করে দেখতে পাই, বাইরের দরোজায় এসে জরিনা দাঁড়িয়েছে। সে বেরিয়ে ফিরছে।

তার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে জাহাংগীর ও তুলি।

জাহাংগীর সংগে সংগে গম্ভীর হয়ে যায়। উঠে দাঁড়ায়। জরিনার দিকে চোখ রেখে তুলিকে সে বলে,

জাহাংগীর।    তুলি, তোমার মাস্টার।

চাচার গম্ভীর স্বর শুনে তুলিও কাঁচুমাচু হয়ে উঠে দাঁড়ায়। জাহাংগীর তুলিকে বলে,

জাহাংগীর।    অনেকক্ষণ সন্ধ্যে হয়ে গেছে, এখনো পড়তে বসোনি? বেড়াতে গিয়ে মাস্টারের ফিরতে দেরী হলে নিজেই পড়তে বসবে। যা-ও।

তুলি সংগে সংগে রওয়ানা হয়ে যায় পড়ার ঘরের দিকে।

জাহাংগীর।    আদর পেয়ে মাথায় চড়ে গেছ?

তুলি অদৃশ্য হয়ে যায়।

জাহাংগীরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে জরিনা বারেক থেমে বলে,

জরিনা।          আদরটা কিন্তু আপনিই দিচ্ছেলেন।

জাহাংগীরের ক্লোজ শট- যেন ধরা পড়ে মর্যাদাবোধে আঘাত লেগেছে।

জাহাংগীর।    আমার ভাইঝিকে আমি, আদর করলে আপনার আপত্তি  আছে?

জরিনা।          আছে। মাস্টার মা নয়, মাস্টার হিসেবে তুলির ভালো মন্দের ভাবনা আমার, জাহাংগীর সাহেব। বিশেষ করে তার অভিভাবক যখন স্বাভাবিক নয়।

জাহাংগীর।    কি, কি বললেন?

জরিনা।          আপনি নিশ্চয়ই জানেন, কি বলেছি না বোঝার মতো ছোট্টটি আপনি নন।

জরিনা বেরিয়ে যায়- তুলির পড়ার ঘরে গিয়ে দুম করে দরোজা লাগিয়ে দেয়।

কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকে জাহাংগীর। তারপর চিৎকার করে ডাকে,

জাহাংগীর।    সমশের, বোতল লাগাও।

তুলির পড়ার ঘরের দরোজা দড়াম করে খুলে যায়। জরিনা মুখ বাড়িয়ে বলে,

জরিনা।          তুলি এখন পড়ছে। চ্যাঁচাবেন না।

জাহাংগীর দ্রুত কাছে গিয়ে নিজেরই বাঁ হাতের তালুতে ডান হাত মুঠি করে ঘুষি দিয়ে বলে,

জাহাংগীর।    আই ডোন্ট টেক অর্ডারস।

জরিনা পেছনে দরোজা ভেজিয়ে সমুখে মুখ রেখেই চাপা নিচুস্বরে বলে, ক্রুদ্ধ উচ্চারণে,

জরিনা।          তুলি পড়ছে। তুলির জন্যে আপনার একজাম্পল ভালো নয়। মদ খেতে হলে ওপরে নিজের ঘরে গিয়ে খান।

জরিনা দ্রুত ভেতরে চলে যায়, দরোজা বন্ধ করে দেয়।

জাহাংগীর চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও সামলে নেয় নিজেকে। ফোঁসে।

 

দৃশ্য ৩২

দোতলায় জাহাংগীরের শোবার ঘর। বিশাল খাটের পাশে গোল টেবিল, সিংগল সোফা।

ক্লোজ আপ- টেবিলের ওপর রুপার ট্রেতে বোতল, গেলাশ, পানির জগ, বরফের থার্মোস- রাখা হলো।

জাহাংগীরের হাত বোতল খুলে গলগল করে অনেক খানি ঢালল গেলাশে

এবার মিড লং শটে আমরা দেখব, জাহাংগীর গেলাশে ঢালছে, পাশে সমশের দাঁড়িয়ে। দ্রুত একটা চুমুক দিয়ে জাহাংগীর সমশেরের দিকে তাকায়।

সমশের ভীত অথচ অনুগৃহীত হাসি হাসে।

জাহাংগীর ভ্রু কোঁচকায়।

সমশেরের মুখ থেকে হাসি উধাও হয়ে যায়।

জাহাংগীর অতি ধীরে নিঃশব্দে বিস্তৃত হাসে।

সমশেরের মুখ নিঃশব্দ হাসি ফুটে ওঠে।

তারপর টু শট। জাহাংগীর ট্রের ওপর বোতল ছুঁয়ে বলে,

জাহাংগীর। সমশের।

সমশের।         হুজুর।

জাহাংগীর।    এটা কি?

সামশের।       এটা বোতল।

জাহাংগীর।    কিসের বোতল।

সমশের।         কাচের বোতল।

চিৎকার করে ওঠে জাহাংগীর। তার হাসি হাসি মুখ হঠাৎ এ রকম ক্রুদ্ধ হয়ে যাবে আশা কার যায়নি।

জাহাংগীর।    ইডিয়ট। বোতল কাচের হবে না তো কিসের হবে?Ñ বল, কিসের বোতল?

সমশের।         হুইস্কির বোতল।

হাসে জাহাংগীর হঠাৎ।

জাহাংগীর।    গুড। আবার বল।

সমশের।         হুইস্কির বোতল।

জাহাংগীর।    তোর পা দ্যাখা।

বুঝতে পারে না সমশের।

সমশের।         হুজুর।

জাহাংগীর।    তোর পা, তোর পা, স্টুপিড, তোর পা।

ভয়ে ভয়ে নিজের হাঁটুর নিচে হাত রাখে সমশের।

সমশের।         এই যে, হুজুর।

জাহাংগীর।    এবার ডান দিকে দশ পা হেঁটে যা।

সমশের গুনে গুনে হেঁটে যায়।

সমশের।         ১২৩৪৫৬৫৭৮৯১০।

জাহাংগীর।    বাঁ দিকে।

সমশের।         ১২৩৪৫৬৭৮৯১০।

জাহাংগীর।    দশ পা?

সমশের।         দশ পা।

জাহাংগীর।    বোতল চেনো, নিজের পা চেনো, দশ পা চেনো প্রতিবার মাথা নেড়ে স্বীকার করে সমশের।

জাহাংগীর।    তাহলে শোন, বোতলের দশ পা’র মধ্যে যদি তোমাকে দেখি তাহলে তোমার পাছায় লাথি মেরে দরোজার বাইরে-

সমশের।         চলে গেছি, হুজুর, চলে গেছি।

হুড়মুড় করে দৌড়ে পালিয়ে যায় সমশের। জাহাংগীর লম্বা চুমুক দেয় গেলাশে। সোফায় নড়ে চড়ে জুৎ করে বসে। সিগারেট ধরায়। বোঝা যায় সারারাতের মতো যেন বসল সে। আপন মনেই বলল,

জাহাংগীর।    হুঁহ, নিজের ঘরে গিয়ে খান। যেন ও ঘরটা ওর।

আবার ঢালল। আবার চুমুক দিল।

৩২ক-             রাতের অন্ধকারে নিঝুম চৌধুরী বাড়ির লং শট।

৩২-                বোতল শেষ। সোফায় কাত হয়ে পড়ে আছে জাহাংগীর। কোথায় যেন দেয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং তরে ঘন্টা বাজল।

 

দৃশ্য ৩৩

(এই দৃশ্যে তিনি স্থান- জরিনার ঘর, বারন্দা, জাহাংগীরের ঘরÑ ইন্টারকাট করে আসবে নাটকীয় প্রয়োজনে- সম্পাদনার টেবিলে- তাই আলাদা আলাদা নম্বর দেয়া সম্ভর হলো না।

মিড ক্লোজ-  জরিনা তার বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। ঘড়ির শেষ ঘণ্টা রেশ তার ওপর মিলিয়ে যায়। ক্যামেরা একটু এগিয়ে ক্লোজ ধরে। জরিনা আঘোর ঘুমিয়ে আছে। তার ওপরে খুব মৃদুভাবে হঠাৎ নূপুরের শব্দ শোনা যায় একবার ঝনক দিয়ে থেমে যায়, একটু পর ঝুন ঝুন ঝুন শোনা যায়।

ক্লোজ শট-  বারান্দায় নূপুর পরা রমণীর পা মৃদু শব্দ তুলে হেঁটে যায়। একটু পরে পা থামে। শব্দ থামে।

মিড ক্লোজ শট- জরিনা ঘুমিয়ে আছে। ওভারল্যাপ ঝুন ঝুন ঝুন- একই সংগে ক্যামেরা তার ওপর এগিয়ে এখন বিগ ক্লোজ আপে ধরে। নূপুরের শব্দ থমে যায়। জরিনা যেন একটু পাশ ফেরে।

ক্লোজ শট-  জরিনার বারান্দামুখী জানালায় এক রমণীর মুখ যেন সরে যায়। চার থেকে ছ’টি ফ্রেম মাত্র ব্যবহার করতে হবে।

ক্লোজ আপ-  নূপুর পরা পা দ্রুত এগিয়ে যায়। ঝুন ঝুন ঝুন শব্দ হতে থাকে।

মিড ক্লোজ-  ঘুমন্ত জরিনা পাশ ফিরে শোয়।

ক্লোজ আপ- নূপুর পারা পা আস্তে আস্তে আরেক জায়গায় এসে থামে।

মিড ক্লোজ- জাহাংগীর সোফায় এলিয়ে শুয়ে আছে, মদে অচেতন্য অবস্থায়। টেবিলে বোতল, গেলাশ, সিগারেটের প্যাকেট, দেশলাই। জাহাংগীরের গায়ে আলতোভাবে জড়ানো একটা চাদর।

ক্লোজ শট-  থেমে আছে নূপুর পরা পা। এখন এক পা এক পা করে এগায়, জাহাংগীরের ঘরে ঢোকে, জাহংগীরের পায়ের কাছে এসে থামে। জাহাংগীরের পা এখন ফ্রেমে দেখা যায়।

ক্লোজ শট-  ঘুমন্ত জাহাংগীর। ক্যামেরা ধরে এগিয়ে তাকে টাইট ক্লোজ আপে ধরে।

ক্লোজ শট-  রমণীর হাত টেবিলে থেকে দেশলাই তুলে নেয়।

টাইট ক্লোজ- ঘুমন্ত জাহাংগীর।

ইন্টারকাট কয়েক বার- রমণীর হাতে দেশলাই/ জাহাংগীরের ঘুমন্ত মুখ।

ক্লোজ শট-  রমণীর হাত ফস করে দেশলাই জ্বালায়। প্যান এবং ফলো। জ্বলন্ত কাঠি এগিয়ে নিয়ে যায় রমণীর হাত এবং জাহাংগীরের গায়ের চাদরের কোণে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন ধরে ওঠে।

বিগ ক্লোজ-  রমণীর মুখ- উন্মুক্ত হেসে ওঠে- তিন ফ্রেমের বেশি নয়। কিন্তু তার হাসি ওপারল্যাপ করবে পরের শটে।

মিড ক্লোজ।    জরিনা ঘুমন্ত। তার ওপরে হাসিটা শোনা যায় এবং দ্রুতবেগে পালিয়ে যাবার মতো নূপুরের ঝুনঝুনঝুন শব্দ। জরিনা ঈষৎ নড়ে ওঠে।

লং শট-  ব্যাক টু ক্যামেরা, বারান্দা দিয়ে ছায়ার মতো এক রমণী দৌড়ে মিলেয়ে যায়। হাসতে হাসতে।

মিড শট-  জরিনা নড়ে চড়ে উঠে, পাশ ফেরে। তার ঘুম ভাঙেনি। একটু পরে তার ওপর পুরুষকেণ্ঠর গোঙানি শোনা যায়-‘আহ, আহ’- জরিনা একটু পাশ ফেরে- গোঙানি বাড়ে- হঠাৎ পুরুষকণ্ঠে স্পষ্ট আর্তনাদ শোনা যায়, ‘আগুন আগুন।’ লাফ দিয়ে উঠে বসে জরিনা। প্রথমে ঠাহর করতে পারে না কি হয়েছে। আবার শোনা যায়, ‘আগুন’ যেন পুরুষটি আগুনের কাছে পরাজিত হয়ে এলিয়ে গেল।

মিড শট-  জাহাংগীর- তার চাদরে আগুন- সে টলতে টলতে ওঠে দাঁড়িয়েছে, গা থেকে চাদর খুলতে চেষ্টা করছে, বুঝতে পারছে না, পা টলছে, ধোঁয়া, আর সে আর্তনাদ করছে আর চক্রাকারে ঘুরছে।

মিড ক্লোজ শট- জরিনা। তার ওপরে আর্তনাদ ওভারল্যাপ হচ্ছে। সে লাফ দিয়ে ওঠে বসে। দৌড়ে বাইরে বেরোয়।

লং শট- জাহাংগীর এখনো আগুন ধরা চাদর গা থেকে খুলতে পারছে না। আগুন এখন সোফায়, বিছানায় লেগে গেছে। জরিনা দৌড়ে আসে।

ক্লোজ শট- বিস্ফারিত চোখে জরিনা তাকিয়ে দ্যাখে।

জরিনা।          এ-কি। জাহাংগীর সাহেব।

মিড লং শট- জরিনা দৌড়ে গিয়ে চাদর টেনে নেয় জাহাংগীরের গা থেকে, দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, জগ থেকে পানি নিয়ে সোফায় বিছানায় আগুনের ওপর ঢেলে দেয়। জাহাংগীরকে দু’হাতে নিরাপদ জায়গায় টেনে নেয়। জাহাংগীর তাকে জড়িয়ে ধরে অচেতন ঘোরের ভেতর। গোঙাতে থাকে।

জরিনা।          ভয় নেই, জাহাংগীর সাহেব, ভয় নেই। আগুন নিভে গেছে, বসুন, স্থির হয়ে বসুন আপনি।

জাহাংগীর।    অ্যাঁ? আগুন কেন? কি ভাবে? আপনি কোত্থেকে? আমি কোথায়?

ব্যাকুল হয়ে জাহাংগীর জরিনার হাত ধরে।

জরিনা তাকে বিছানার ওপর বসিয়ে দেয়।

জরিনা।          আপনি আপনার ঘরে। কি কা- বলুন তো, আগুনে পুড়ে মরতেন।

জাহাংগীর।    আগুন?

এতক্ষণে সে জ্ঞান ফিরে পায়। ঘরে তখনো ধোঁয়া।

জাহাংগীর।    আপনি আমাকে আগুনে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিলেন? আপনি? আপনি জরিনা খানম। আপনি আমাকে খুন করতে চেয়েছিলেন?

জরিনা।       কি বলছেন আপনি? যে আপনাকে বাঁচালো তাকে একটা ধন্যবাদ দেয়া দূরে থাক, তকেই আপনি খুনি বলছেন?

জাহাংগীর।    তাহলে, আপনি এখানে কেন? আগুন কিভাবে?

জরিনা।          নিশ্চয়ই মদ খেয়ে আপনার কোনো জ্ঞান ছিল না, সিগারেটের আগুন নেভাতে মনে ছিল না- তাছাড়া আর কি? আপনারা চিৎকার শুনেই এসেছি। কেন এ ভাবে মদ খান? কেন খান? যাক, প্রাণে বেঁচেছেন, আমার আর থাকবার দরকার নেই। চললাম।

জরিনার এই সংলাপের সময় জাহাংগীর যেন একটু একটু করে বুঝতে পারছিল পরিস্থিতিটা, সে বিব্রত হয়ে এ-পাশ ও-পাশ মাথা নাড়ছিল, জরিনা এখন চলে যাবার জন্যে ফিরতেই জাহাংগীর মাথা তুলে তাকিয়ে খপ করে তার হাত ধরে ফেলল।

জাহাংগীর।   যাবেন না।

কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল জরিনা তার হাত ধরায়, কিন্তু কণ্ঠের ব্যাকুল উচ্চারণ শুনে সে থমকে গেল। কোমল হয়ে গেল মুহূর্তে। হাতধরা অবস্থায় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তখন জাহাংগীর তার হাত ধরেই উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। আবার বলল,

জাহাংগীর।    আপনি যাবেন না। প্লিজ।

বলতে বলতে জাহাংগীর বিছানায় ঢলে পড়ে যায়। তখনও জরিনার হাত সে ধরে রেখেছে।

জরিনা অন্য হাত দিয়ে জাহাংগীরের হাতটা ছাড়িয়ে নেয় ধীরে।

জরিনা।          আমি থাকতে পারি না, জাহাংগীর সাহেব।

জাহাংগীর।    প্রথমে বুঝতে পারিনি, তাই আপনাকে ও রকম বলেছিলাম।

জরিনা।          যাক, এখন তো বুঝতে পেরেছেন?

জাহাংগীর।    বিশ্বাস করুন, আমি আর মদ খাবো না, আপনাকে কথা দিচ্ছি আর খবো না।

বলতে বলতে আবার হসিনার হাত ধরে জাহাংগীর।

জরিনা।          আমার জন্যে তো বলিনি, আপনার ভালোর জন্যেই বলেছি।

কথাটা উচ্চারণ করেই জরিনা এর মর্মার্থ নিজেই অনুভব করে একটু লজ্জিত হয়ে যায়। হাত ছাড়িয়ে নেয়।

জরিনা।          আপনি শুয়ে পড়ুন।

জাহাংগীর।    আপনি না এলে আমি মরে যেতাম। আপনাকে- ধন্যবাদ।

জরিনা।          থাক। আপনার ঘরে আর চাদর নেই?

জাহাংগীর টান টান হয়ে শুয়ে পড়েছে, তাকে ঢেকে দেবার জন্যে চাদর খোঁজে জরিনা ঘরে চোখ দিয়ে।

জাহাংগীর।    কে জানে, আছে হয়ত কোথাও, আমার যে ছন্নছাড়া সংসার।

তখন ইতঃস্তত করে জরিনা নিজের গায়ের চাদর দিয়ে জাহাংগীরকে ঢেকে দেয়।

জরিনা। আমি যাই।

জরিনা বাইরে এসে দরোজা ভেজিয়ে দেয়।

এদিক ওদিক দ্রুত একবার দেখে নিজের ঘরে দৌড়ে চলে যায় সে।

শূন্য বারান্দা পড়ে থাকে। দেয়াল ঘড়িতে ঢং করে একটা ঘণ্টা শোনা যায়।

 

দৃশ্য ৩৪

সকাল বেলা। ড্রয়িং রুমের ডাইনিং কর্নার। তুলি বসে নাশতা করছে। সিঁড়ি দিয়ে জরিনা নেমে এলো। তুলিকে একা নাশতা করতে দেখে তার কাছে চেয়ার টেনে বসে বলল,

জরিনা।          তুলি মনি, তোমাকে কাল বলেছিলাম, চাচা যখন বাড়ি থাকবে সবসময় সংগে খেতে বসবে।

তুলি।              বারে মাস্টার মা, চাচা যে নেই।

জরিনা ঈষৎ ভ্রুকুঞ্চিত করে।

জরিনা।          নেই?

তুলি।              চলে গেছে।

ক্লোজ আপ জরিনার। বিস্ময়।

জরিনা।          চলে গেছে?

লুৎফার মা টোস্ট নিয়ে আসে।

লুৎফার মা।   উনি তো সেই কোন ভোর বেলায় চলে গেছেন।

জরিনার ক্লোজ আপ আবার। লুৎফার মার কথা ওভারল্যাপ হয়।

লুৎফার মা।   ম্যানেজার সাহেব জপ নিয়ে এসে নিয়ে গেলেন। ঢাকা থেকে দু’জন লেডি আসছেন, তাদের আনতে গেলেন ইস্টিশনে।

জরিনা।          লেডি?

জরিনার এই বিস্মিত উচ্চারণের পর টু শটে ফিরে যাই আমরা।

লুৎফার মা।   সাহেব তো বললেন। দেখেননি, কাল থেকে ঘরদোর সাফ করছি।

এবার বোধহয় তুলিমনির একটা চাচী হবে।

ক্লোজ আপÑ   জরিনা। সে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।

তুলি হাত তালি দিয়ে ওঠে।

তুলি।              কি মজা, কি মজা, তাই না মাস্টার মা?

 

দৃশ্য ৩৫

চা বাগানের বাংলোর সমুখে এসে জীপ থামল। জীপ চালাচ্ছিল জাহাংগীর, তার পাশে জামাল। পেছনের সিটে জামালের বোন নূপুর আর জামালের প্রেমিকা সিমকি।

মেয়েরা লাফ দিয়ে নামল। দু’জনেই অত্যাধুনিক তরুণী, সান গ্লাস চোখে, হারেম সুট পরা।

সিমকি নেমেই হাত তালি দিয়ে বলে উঠল,

সিমকি।          ও, হোয়াট এ বিউটিফুল প্লেস।

নূপুর প্রশ্ন করল জাহাংগীরকে।

নূপুর।             এই নাকি আপনার প্যালেস?

জামাল উত্তর দিল।

জামাল।          ডোন্ট বি সিলি, নূপুর, এটা আমার বাংলো। ওঁর প্যালেস এখানে থেকে পাঁচ মাইল দূরে। তোমাদের ব্রেকফার্স্টের ব্যবস্থা করিগে।

নূপুর।             তাহলে এখানে এলাম কেন ভাইয়া?

এতক্ষণে জবাব দিল জাহাংগীর- সে গোড়া থেকেই কেমন একটু অন্যমনস্ক।

জাহাংগীর।    দ্যাট ওয়াজ মাই আইডিয়া, ফর সিমকি, ফর দি রোমান্টিক পেয়ার।

বলে সে হাতের একটা অস্পষ্ট ইশারা করে সিমকি আর জামালকে দেখাল।

সংগে সংগে সিমকি নূপুর আর জাহাংগীরকে দেখিয়ে বলল,

সিমকি।          অ্যান্ড হাউ অ্যাবাউট দিস রোমান্টিক পেয়ার? বুঝতে পারছেন না মি. চৌধুরী, নূপুরের এখানে ভালো লাগবে কেন?

নূপুর।             শাট আপ, সিমকি।

সিমকি।          সে যেতে চায় আপনার প্যালেসে। এত শুনেছি, এত শুনেছি আপনার প্যালেসের কথা, সেখানে নিয়ে যাবেন না, মিঃ চৌধুরী? আপনি রিয়ালি হার্টলেস।

কথা বলতে বলতে ওরা বাংলোর চওড়া বারান্দায় উঠে যায়।

বেতের সোফায় ওদের বসতে ইশারা করে জাহাংগীর।

জাহাংগীর।    আই মিন, নিয়ে যাবো না তো বলিনি, এখান থেকে পাহাড়িদের রাসপূর্ণিমার নাচটা কাছে হবে, তোমার নাচ দেখবার জন্যে এতদূর এলে- টেক ইয়োর সিট।

বলে সে কিছুটা অভদ্রের মতোই ভেতরে চলে যায়।

তখন সিমকি তার যাবার দিকে তাকিয়ে নূপুরের পাঁজরে কুনইয়ের খোঁচা দিয়ে বলে,

সিমকি।          নাচ দেখতে, না, তোমাকে নাচতে? নূপুর?

নূপুর।             কি জানি ভাই, আমি এখনো সিওর না।

সিমকি।          মিনমিন কোরো না, ওতে কিচ্ছু হবে না? আমাকে ফলো করো, আমি যেভাবে তোর ভাইয়াকে পটকান দিয়েছি, ঠিক সেই রকমÑ দেখবি, জোড়া লেগে গেছে।

বলে সিমকি দু’হাতের কড়ে আঙুল বাঁকা করে আটকে চোখ মারে নূপুরকে।

দৃশ্য ৩৬

পাহাড়িদের নাচ- খোলা জায়গায়, চাঁদ উঠেছে। পাহাড়ি মেয়েরা নেচে নেচে গাইছেÑ যার কথাগুলো এ রকম হতে পারেÑ

“তোরা সব জোড়া জোড়া, আমাদের জোড়া নেই

জোড়া খুঁজে দে’না তোরা, একা আছি দোকা হই।”

নাচ দেখছে নূপুর, জাহাংগীর, সিমকি আর জামাল। সিমকি আর জামাল ক্রমশ ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হয় নাচ ও গান চলাকলে। সিমকির গুঁতোয় নূপুর চেষ্টা করে জাহাংগীরের ঘনিষ্ঠ হতে, একবার হাত টেনেও নেয়, কিন্তু কোথায় যেন বাধা, নূপুর জাহাংগীরের ঠিক ঘনিষ্ঠ হতে পারে না।

নাচ ও গান শেষ হয়। পাহাড়িরা জাহাংগীরকে নিচু হয়ে সালাম করে বিদায় নেয় একে একে। এটা দেখে সিমকি জাহাংগীরকে বলে,

সিমকি।          আপনি দেখছি সাহেব, এখানে কিং।

জাহাংগীর।    ছিলাম কোনোকালে, এখন ফেট লাইন ডাউন।

বলে জাহংগীর নিজের করতলে বাঁ-হাতের আঙুল নিচের দিকে টেনে লাইনটা দেখায়।

এই কথায় জামালের যেন মনে পড়ে যায়, সে উৎসাহিত হয়ে দূরে একটা পাহাড়ি লোককে দেখিয়ে বলে,

জামাল।          সিমকি, ঐ যে লোকটা দেখছ, আমাদের কেরানিবাবু সেদিন বলছিল, চমৎকার হাত দেখতে পারে, ফিউচার টপটপ বলে দেয়।

সিমকি।          নূপুরের ফিউচারটা তাহলে দেখাই যাক। ডাকো না ওকে। প্লিজ।

জাহাংগীর।    না।

সিমকি।          কেন, নূপুরের ফিউচারে আপনি ইন্টারেস্টেড নন?

জাহাংগীর।    দ্যাটস নট দি পয়েন্ট। খবর দিলে বাড়িতে চলে আসবে।

নূপুর।             আপনার কি হয়েছে বলুন তো? সারাদিন শুধু কাটা কাটা কথা বলছেন।

জাহাংগীর।    বেশ তো-

জাহাংগীরের একটা ক্লোজ আপ- যেন সে কি একটা মতলব করে ফেলল-

জাহাংগীর।    হাত দেখাতে চাও, ইট উইল বি অ্যারেনজড। এখন চলো।

সিমকি।          যেতে হলে, বাংলোতে নয়, আপনার প্যালেসে।

জাহাংগীর।    অল রাইট, ইউ উইল বি মাই প্যালেস।

ওরা জীপের দিকে এগোয় ওঠবার জন্য।

জামাল।          স্যার, আমি কিন্তু বাংলোয় নেমে যাচ্ছি

জাহাংগীর।    ইয়েস, অ্যান্ড মাইনাস সিমকি।

হো হো করে হেসে ওঠে সকলে । জিপ ছেড়ে দেয়।

 

দৃশ্য ৩৭

রাত। চৌধুরীবাড়ির বাগান। চাদর গায়ে জরিনা একটা বেঞ্চে বসে আছে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। সে দেখছে।

তার ওপর জীপের শব্দ ওভারল্যাপ হয়। সে কৌতূহলে নিয়ে পাশ ফিরে তাকায়।

তার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে দেখা যায়, দূরে, গাড়ি বারান্দায় জিপ থামল, সদর দরোজা খুলে  বেরিয়ে এলো সমশের, লুৎফার মা, জাহাংগীর, সিমকি, নূপুর নামল। ভেতরে ঢুকে গেল।

জরিনার মিড ক্লোজ শট- দেখছিল- এবার আবার চোখ নামিয়ে, ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিল।

 

দৃশ্য ৩৮

ড্রয়িং রুম। জাহাংগীর, নূপুর, সিমকি ভেতরে এসে গেছে। সমশের সুটকেশ দুটো নিয়ে ভেতরে চলে গেল। লুৎফার মা পাশে দাঁড়ায়ে একটু দূরে, হাসি হাসি মুখে।

সিমকি আর নূপুর ঘরে এসেই চারদিক অবাক চোখে দেখছে আর বলছেÑ

সিমকি।          হোয়াট এ বিউটিফুল পিয়ানো।

নূপুর।             কতগুলো সোর্ড।

সিমকি।          ইজ দিস টেবল অ্যান্টিক?

নূপুর।             শ্যান্ডেলিয়ারটা দেখেছিস?

ওরা বিস্ময় নিয়ে একেকটা দ্যাখে আর বলে চলে। আর জাহাংগীর যেন চোখ দিয়ে কাকে খোঁজে।

লুৎফার মা জাহাংগীরকে বলে,

লুৎফার মা।   আমরা সেই সকাল থেকে বসে আছি-

জাহাংগীর।    ঠিক আছে, ঠিক আছে।

বলেই সে মেয়েদের কাছে গিয়ে বলে,

জাহাংগীর।    লেডিজ, রাত অনেক হয়েছে, আই সাজেস্ট রেস্ট নাও তোমরা। লুৎফার মা, ওদের ঘর দেখিয়ে দাও। এসো, এসো নূপুর , এসো সিমকি, ইউ আর ভেরি টায়ার্ড, আই নো, কাল দেখো সব।

জাহাংগীর ওদের প্রায় ঠেলে ভেতরে পাঠিয়ে দেয়Ñ ওদের শোবার ব্যবস্থা নিচের তলায়, কাজেই সিঁড়ির দিকে যাবে না। জাহাংগীর এবার দ্রুত চারদিক দেখে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যায়।

 

দৃশ্য ৩৯

৩৭ নং দৃশ্যের জের। জরিনা বাগানে বেঞ্চের ওপর গায়ে চাদর জড়িয়ে বসে আছে। গোল চাঁদের ওপর মেঘ ঢাকা পড়ছে, আবার সরে যাচ্ছে। জরিনা দেখছে।

নিঃশব্দে তার পাশে এসে দাঁড়ায় জাহাংগীর। চুপ করে জরিনাকে দ্যাখে সে।

জরিনা টের পায় না প্রথমে। হঠাৎ খেয়াল হতেই আধো চমকে সে উঠে দাঁড়ায়।

জরিনা।          ও, আপনি?

জাহাংগীর স্মিতমুখে একটু ইতঃস্তত করে বলে,

জাহাংগীর।    এখানে বসে আছেন?

জরিনা।          এই এমনি।

জাহাংগীর।    গেস্টরা এসে গেছে।

জরিনা চুপ করে রইল।

জাহাংগীর।    বাইরে ঠান্ডা, যদি লেগে যায়, ঘরে যান, শুয়ে পড়–ন। অবশ্য, আমি আপনার মতো নরোম করে বলতেন পারি না, আমার সব কথাই কেন যে হুকুমের মতো শোনায়।

জরিনার মুখে বহুদূরের অস্পষ্ট একটা হাসি ফুটে ওঠে।

জাহাংগীর তখন একটু প্রশ্রয় বলে,

জাহাংগীর।    শোনাচ্ছে তো? কিছু মনে করবেন না। আপনাকে ঘরে না দেখে-

জরিনা।          খুঁজছিলেন? কেন?

জাহাংগীর।    না-হ্যাঁ-না,ও, একটা কথা ছিল। গার্ডেন থেকে জীপ নিয়ে এসেছি, কাল ভোরে ফেরত দিতে যাব, আর, আর আমাকে একটু আউট গার্ডেনে যেতে হবে, একটা প্রবলেম আছে সেখানে, কাল আর ফিরব না।

জরিনা।          তা আমাকে বলছেন কেন?

জাহাংগীর।    এই জন্যে যে, গেস্টরা থাকবে, আপনি একটু ম্যানেজ করে নেবেন। জানি, হাউস কিপিং আপনার কাজ নয়, আপনি যেন আমায় ভুল বুঝবেন না।

এই শেষ কথাটা জাহাংগীর যেন একটু বিশেষ জোর দিয়ে, বিশেষ অর্থ নিয়ে, বলে, তারপর আচমকা আকাশে চাঁদটা আবার মেঘে ঢাকা পড়ে যায়।

 

দৃশ্য ৪০

সকাল বেলা। ড্রয়িং রুম। সিমকি আর নূপুর। দুজনেই বিস্মিত এবং উত্তেজিত।

নূপুর।             বাঃ, বেশ লোক তো জাহাংগীর সহেব।

সিমকি।          অভদ্র,আনশিভালরাস। দু’দুটো মেয়েকে ফেলে উধাও। জীপটাও নিয়ে গেছে। কথা বলার কেউ নেই, কোথাও যেতে পারব না। এ তো জেলখানা।

নূপুর।             সে জন্য বোধ হয় বাংলোতে থাকতে ইনসিস্ট করছিল।

সিমকি।          জি জানি, আমা তো স্ট্রেনজ মনে হচ্ছে।

নূপুর।             উনি অবশ্য, আমি যতদূর জানি, খুব খামখেয়ালি ধরনের মানুষ।

সিমকি।          তাই বলে আমাদের সারভেন্টসদের ভেতর ফেলে ভ্যানিশ হয়ে যাবে?

এ সময় সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে জরিনা।

সিমকি শিস দিয়ে নূপুরকে বলে,

সিমকি।          শি ডাজন্ট লুক লাইক এ সারভেন্ট। হু ইজ শি?

ইতিমধ্যে জরিনা কাছ দিয়ে যেতে যেতে একটু থেমে, সামান্য হেসে, সালামের ভঙ্গিতে হাত একটু তুলে বলে,

জরিনা।          আপনারা বোধ হয় ঢাকা থেকে এসেছেন। আমি তুলিকে পড়াই।

নূপুর।             তুলিকে পড়ান, ভোরবেলায় ওপরে কোত্থেকে এলেন?

জরিনা।          আমি এখানেই থাকি, আমি এখন পড়াতে যাচ্ছি।

চলে যায় জরিনা।

সিমকি।          এখানোই থাকে? দিস ইজ অ্যানাদার স্ট্রেনজ। আগে শুনিনি তো।

নূপুর।             লেটস গো অ্যান্ড ফাইন্ড আউট।

ওরা তুলির পড়ার ঘরের দিকে যায়।

 

দৃশ্য ৪১

তুলির পড়ার ঘর। জরিনা তুলিকে বই খুলে কেবল বসেছে, এমন সময় ঢোকে নূপুর আর সিমকি।

জরিনা।          আর আমরা কি পড়ব, তুলিমনি-

ওদের দিকে চোখ পড়তেই তুলিকে সে বলে,

জরিনা।          আদাব করো, তোমার চাচার গেস্ট।

তুলি আদাব করে, একই সংগে সিমকি বলে,

সিমকি।          গেস্ট কি করে বুঝলেন? নাও তো হতে পারি।

জরিনা।          তাহলে আমার ভুল হয়েছে।

নূপুর।             কবে থেকে আছেন?

জরিনা।          মানে?

সিমকি।          কদ্দিন থেকে তুলিকে পড়াচ্ছেন।

জরিনা।          দেড় মাস, দু’মাস।

নূপুর।             এর আগে কোথায় ছিলেন?

এ প্রশ্নে জরিনা একটু বিচলিত হয়ে পড়ে।

সিমকি।          আপনাকে সিলেক্ট করেছে কে? মিঃ চৌধুরী?

তুলি এবার কথা বলে ওঠে,

তুলি।              চাচা তো আগে দেখেইনি।

নূপুর।             তাই নাকি?

জরিনা।          এবার নিজেকে সামলে নেয়।

জরিনা।          কিছু যদি মনে না করেন, তুলির এখন পড়া আছে।

সিমকি।          পড়া তো রোজই আছে।

নূপুর।             তুলি এসো, তোমার সংগে গল্প করি।

জরিনা।          না। ওর চাচা সেটা পছন্দ করবে না।

সিমকি শিস দেয় বিস্ময়সূচক।

জরিনা।          হ্যাঁ, তিনি ডিসিপ্লিন চান। রুটিন ভাঙলে আমাকেই কৈফিয়ত দিতে হবে।

সিমকি।          সেটা অবশ্য ঠিক। চাকরি তো? বেচারার চাকরি চলে যেতে পারে। চল নূপুর, লেট আস একসপ্লোর দ্য প্যালেস।

 

দৃশ্য ৪২

ড্রয়িং রুম। নূপুর আর সিমকি আসে। তবে দৃশ্য শুরু হয় লুৎফার মার ক্লোজ আপ থেকে।

লুৎফার মা।   বাড়ি আর কি দেখবেন? এই তো যা দেখছেন। পেছনে সব ঘরই বন্ধ, সাহেবেও বড় একটা থাকেন না তো, তাই আর খোলার দরকার হয় না তার চেয়ে সমশের আপনাদের সংগে যাক, পাহাড়ে না হয় ঘুরে আসুন । সমশের, ও সমশের।

 

দৃশ্য ৪৩

পাহাড়ি এলাকা। প্যান করে এসে আমরা নূপুর আর সিমকিকে দেখতে পাই, হাঁটছে- দূরে সমশের তাদের অনুসরণ করছে।

ক্যামেরা কেটে কাছে আসে।

নূপুর।             জাহাংগীর এলে, কালই আমি ঢাকা চলে যাবো।

সিমকি।          একা যাবি কি, তাকেও সংগে নিয়ে যাবি। বিয়ের শপিং করতে হবে না তাকে? কিরে, ফাইনাল কথা দেয়নি?

নূপুর।             দিয়েছে, আবার দেয়নি।

সিমকি।          বুঝতে তো পারছিস, লোকটা ঐ রকমই। হুইমজিকাল। তাই লাগাম ধরতে হবে তোকে, যে দিকে ঘোরাবি, ঘুরবে।

 

দৃশ্য ৪৪

চৌধুরী বাড়ির বাইরে। কথা বলছে লুৎফার মা একটা অচেনা মধ্যবয়সি লোকের সংগে। এই লোকটির নাম মহসিন, তবে সেটা এবং তার পরিচয় আমরা পাবো পরে। দু’জনে নিচুগলায় চাপাস্বরে কথা বলে।

লুৎফার মা।   দেখা করতে চান?

মহসিন।         দেখা হবে না?

লুৎফার মা।   কি লাভ?

মহসিন নীরবে একটু চিন্তা করে বলে,

মহসিন।         তোমার সাহেব তাহলে এখন নেই?

লৎফার মা।   না। রাতে আসবে।

মহসিন।         ও।

লুৎফার মা।   বাড়িতে গেস্ট আছে। আপনার তো রাত ছাড়া সুবিধে হবে না।

মহসিন।         হ্যাঁ। তাছাড়া গেস্টেদেরও ডিস্টার্ব করতে চাই না। বোঝোই তো?

লুৎফার মা।   হ্যাঁ।

মহসিন।         তুমি তাহলে বরং আমাকে একটা ঘর খুলে দাও। রাতে তোমার সাহেব যখনই আসে, আমাকে খবর দিও।

 

৪৪ক

ভেতরের একটা জানালা থেকে জরিনা হঠাৎ তাদের দ্যাখে- দূরে তারা কথা বলছে। জরিনার ভ্রু একটু কুঞ্চিত হয় যেন। আবার সে দ্যাখে। তার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে- তাদের আর দেখা যায় না। জরিনা জানালা থেকে সরে যায়।

 

দৃশ্য ৪৫

সন্ধ্যে। ড্রয়িং রুম। ডাইনিং কর্নারে তুলি খাচ্ছে, জরিনা তার তদারক করছে। লুৎফার মা পরিবেশন করছে।

আর ড্রয়িং রুমে এদিক ওদিক হাঁটছে সিমকি আর নূপুর, এটা সেটা দেখছে।

সিমকি।          ওহ, বোরিং, বোরিং, বোরিং, হোল ডে মার্ডার। নো ফান, নো একসাইটমেন্ট, নাথিং।

বলতে বলতে পিয়ানোয় সে সবগুলো আঙুল দিয়ে চাপ দেয়।

দূরে তুলি হেসে উঠতে যাবে, জরিনা নিঃশব্দে তাকে শাসন করে।

সিমকি দূর থেকে প্রশ্ন করে।

সিমকি।          পিয়ানো কে বাজায়?

উত্তরটা দেয় লুৎফার মা, তার কাছে আসতে আসেতে।

লুৎফার মা।   সাহেব। তুলিমনিও গান শেখে।

নূপুর।             সে শেখায়? সাহেব?

লুৎফার মা।   না, উনি শেখান।

লুৎফার মা জরিনার দিকে হাত তুলে দেখায়।

সিমকি শিস দেয় বিস্ময়সূচক।

নূপুর।             আপনি গানও জানেন?

তুলি।              খুব ভালো গান করে, হ্যাঁ।

সিমকি।          ভালো গান করলে কি আর কেউ মাস্টারি করে?

নূপুর।             শোনান না, তুলিমনির কথায় কেমন ভালো করে আপনি দেখি।

জরিনা।          সবাইকে শোনাবার জন্য আমি করি না।

সিমকি।          বিশেষ কাউকে শোনাবার জন্যে তাহলে গান শিখেছেন?

জরিনা।          তেমন বিশেষ কেউও আমার নেই।

সিমকি আবার শিস দেয়

এমন সময় নাচতে নাচতে ঘরে এস ঢোকে সমশের।

সমশের।         এসেছে, এসেছে, এসে গেছে।

নূপুর।             কে, চৌধুরী সাহেব?

সমশের।         না, গনকাহাত দেখে ভাগ্য বলে দেয়।

সিমকি।          ও, সেই ফরচুন টেলার?

সমশের।         সাহবের কাছে খবর পেয়ে এসেছে। ঐ পেছনের ঘরে বসে আছে।

নূপুর।             তাকে নিয়ে এসো এখানে।

সমশের।         এখানে আসতে চায় না। আপনারা বরং যে হাত দেখাবেন, চলুন, আসুন।

সিমকি।          তাহলে যা, নূপুর।

নূপুর।             তুই। প্লিজ। আমার বাবা ফিউচার টিউচার শুনতে ভয় করে।

সিমকি।          সিলি।

নূপুর।             তুই দেখিয়ে আয়, তারপরে আমি।

সিমকি।          অলরাইট। বাই, বাই, উইশ মি লাক।

সিমকি চলে যায় সমশেরের সংগে। ভেতরে।

নূপুর জিজ্ঞাস করে জরিনাকে,

নূপুর।             আপনি হাত দেখা বিশ্বাস করেন।

জরিনা।          বিশ্বাস কবরার মতো ভবিষ্যৎ সমুখে থাকলে বিশ্বাস হয়ত করা যায়।

নূপুর।             বাহ, আপনি চমৎকার ধাঁধা বলেন তো।

ঢং করে দেয়াল ঘড়িতে ঘণ্টা পড়ে। ক্লোজ আপ।

সিমকি ফিরে আসে লাফাতে লাফাতে।

সিমকি।          নূপুর, তুই তো ভয়েই মরে যাচ্ছিলি। আমার হাত দেখে গড়গড়  করে সব বলে দিল। তিন মাসের মধ্যে বিয়ে, হ্যাপি লাইফ, বিস্তর টাকা, বছরের শেষে ফরেন ট্রাভেল।

নূপুর।             সত্যি।

সিমকি।          বলব সব। তুই যা, দেখিয়ে আয়।

নূপুর চলে যায় সমশেরের সংগে । সিমকি খুশিতে পিয়ানোয় গিয়ে টুং টাং করতে থাকে।

জরিনা তুলিকে বলে,

জরিনা।          এবার বিছানা, কেমন?

তুলি।              আমি যাবো না গণকের কাছে?

জরিনা।          ও সব মিথ্যে, বিশ্বাস করতে নেই।

তুলি।              কেন?

জরিনা।          রোজ তুমি ঘুমোতে গিয়ে চোখ বুঁজে আল্লার কাছে যে মোনাজাত করো, তুলিমনি তাঁর ওপর বিশ্বাস রেখো। এসো।

ওদিকে তখন গাল ফুলিয়ে নূপুর ঢুকলো। সিমকি কাছে এলো। নূপুর ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল। দূরে জরিনা তা দেখছে।

সিমকি।          কিরে?

নূপুর।             ছাই গণক। কিচ্ছু জানে না। লায়ার। মিথ্যুক।

সিমকি।          মানে?

নূপুর।             বলে, যা ভাবছেন, তা হবে না। বিয়ে আমার হাতে নেই।

কাট করে আমরা দেখি, আরেক কোণে, জরিনার কাছ থেকে তুলিকে নিচ্ছে লুৎফার মা, আর তখন সমশের এসে জরিনার কাছে দাঁড়াল। তুলিকে নিয়ে বিদায় হলো লুৎফার মা। সমশের জরিনাকে বলল,

সমশের।         আপা,  আপনাকে ডাকে।

জরিনা।          কে?

সমশের।         সেই গণক।

জরিনা।          আমাকে? না, না আমি ও সব হাতটাত দেখাব না।

সমশের।         আপা, আপনি হাত না দেখালে সে এখানে থেকে যাবেই না। বলে, বাড়ির তিনজন আছে, তিনজনেরই হাত দেখার কথা সাহেব বলে দিয়েছে, না হলে তার কথা শুনতে হবে।

জরিনা।          আচ্ছা, চল।

সমশের আগে আগে, রওয়ানা হয়ে যায়। জরিনা একটু পেছন পেছন বেরোয়।

 

দৃশ্য ৪৬

ভেতরের অন্ধকার দিয়ে হেঁটে যায় জরিনা। বারান্দার নিচেই উঠোন। হঠাৎ জরিনার চোখে পড়ে, উঠোনের এককোণে একটা মোটর সাইকেল ঠেস দিয়ে রাখা। জাহাংগীরের মোটর সাইকেল। জরিনা একটু বিস্মিত হয় ক্লোজ আপ। তারপর সে এগিয়ে যায়।

 

দৃশ্য ৪৭

ভেতরের একটি ছোট ঘর। ছোট একটা ল্যাম্প জ্বলছে। ঘর প্রায় অন্ধকার। সেখানে মাটির ওপর বসে আছে চাদর ঢাকা পাহাড়ি গণক- আসলে ছদ্মবেশী জাহাংগীর। সমুখে একটা টুল। সমশের ঢুকল। জাহাংগীর একটা চোখ ছোট করে টিপল। সমশের ইশারায় জানাল সে আসছে- বেরিয়ে গেল। জরিনা এলো। সমশের দরোজা ভেজিয়ে হাওয়া হয়ে গেল। জাহাংগীর ভালো করে চাদর ঢেকে বসল।

জাহাংগীর।    বৈঠিয়ে মেমসাব, হাত দিখলান।

জরিনা।          দ্যাখো, আমি কিন্তু এ সব বিশ্বাস করি না।

কিন্তু হাতটা টেনে নিয়েছে জাহাংগীর, ল্যাম্পটা হাতের কাছে টেনে এনেছে, হাত দেখতে দেখতে বলে,

জাহাংগীর।    তো ফির আসলেন যে।

জরিনা।          শুনলাম, না এলে সাহেব তোমাকে বকতে পারে।

জাহাংগীর।    আপনাকে ভি বকতে পারে, মেমসাব।

জরিনা।          তা পারেন। ওঁর মেজাজের ঠিক নেই, কখন কাকে কি বলেন তারও ঠিক নেই। আমরা যদিও বুঝতে  পেরেছি গণক আর কেউ নয় স্বয়ং জাহাংগীর, জরিনা কিন্তু বুঝতে পারেনি।

হাত দেখতে দেখতে জাহাংগীর বলে,

জাহাংগীর।    হাঁ, বড় দুখি মানুষ, পাগলপান, বড় দুখ, পেয়ার দিয়ে মহব্বত দিয়ে সে দুখ কাটতে পারে। তবে, সে পেয়ার তা উনি ঐ মেমসাহেবের কাছে পাবেন না, মেমসাহেব দিতে পারবে না, আর যে দিতে পরবে পেয়ার সে দেখছি বড় জিদ্দি আছে। পেয়ার না পাইলে সাহেব মরে যাবে।

জরিনা।          হাত দেখছ আমার, বলছ সাহেবের কথা, আমার হাতে তোমার সাহেরের কথা লেখা আছে নাকি?

জাহাংগীর।    হাঁ, হাঁ, ঠিক বাত। তবে কি জানেন মেমসাহেব, পেয়ার মহব্বত মানেই তো একজনের ভাগ্য আরেকজনের হাতে। আহাহা, হাত টেনে নিবেন না, হাত টেনে নিবেন না, জিদ্দি করবেন না, আপনার জীবনে সুখ হবে, শান্তি হবে, আপনার স্বামী আপনাকে বহুত পেয়ার করবে, এত পেয়ার করবে, এত পেয়ার করবে, লেকিন আপনাকে ভি পেয়ার করতে হবে।

হাত টেনে নেয় জরিনা। উঠে দাঁড়ায়।

জরিনা।          এ সব পেয়ারের কথা শুনতে আমি আসিনি।

চাদরমুড়ি জাহাংগীরও উঠে দাঁড়ায়।

জাহাংগীর।    আপনার সামনে পেয়ালা আছে, আপনি পিয়াস নিয়ে কষ্ট করছেন।- না যেও না, দাঁড়াও।

জরিনা চলে যাচ্ছিল, শেষ কথায় চমকে ফিরে তাকায়।

জরিনা।          কে তুমি? আপনি।

জাহাংগীর মাথা থেকে চাদর ফেলে দেয়।

জাহাংগীর।    হ্যাঁ, আমি।

জরিনা।          ছী, ছি, ছি, আপনি এমন করে মানুষকে নিয়ে খেলতে পারেন জানতাম না।

জাহাংগীর।    তোমাকে নিয়ে তো খেলিনি, আমার মনের সত্যি কথাটাই বলেছি।

জরিনা।          আর ঢাকা থেকে যাকে ডেকে এনেছেন, সেই নূপুরকে আপনি ভুলে যাচ্ছেন? গণক সেজে, তাকে বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে, তার আশা তার স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়ে তাকে আপনি কাঁদিয়েছেন।

জাহাংগীর।    তাকেও সত্যি কথাটিই বলেছি, জরি। এ ভাবে নাহলে তাকে বলতে পারতাম না। ভাগ্য সে বিশ্বাস করে বলেই গণক সেজেই তাকে আমার বলতে হয়েছে, সে যা ভাবছে তা কোনোদিন হবে না।

জরিনা।          আর আপনি মনে করেন, আপনি যা ভাবছেন তা কোনোদিন  হবে?

জাহাংগীর।    মানুষকে তুমি অবিশ্বাস করো জানি, প্রথম দিন তোমার নিজের মুখেই শুনেছি, কিন্তু একদিন না একদিন, কাউকে না কাউকে বিশ্বাস না করলে মানুষ বাঁচবে কি নিয়ে?

জরিনা।          জানি না, বুঝি না, আমার সে মন নেই, আমি যে জীবনের কাছে কেবল আঘাতই পেয়েছি।

বলতে বলতে জরিনা কান্না চেপে ঘর থকে ছুটে বেরিয়ে যায়।

তাকে পিছু ডাকতে গিয়েও জাহাংগীর নীরব হয়ে যায়, দাঁড়িয়ে থাকে।

 

দৃশ্য ৪৮

ড্রয়িংরুম। পিয়ানোয় হাত- বাজিয়ে দিল সুর। জাহাংগীর গাইতে শুরু করবার আগে পেছনে ফিরে তাকিয়ে হাসল, আমরা দেখলাম শ্রোতা নূপুর আর সিমকি। তারপর জাহাংগীর প্রথম লাইন গাইল, যে গান আমরা এর আগে জরিনার কণ্ঠে শুনেছি “রাত্রি তো নয় শুধু নিবিড় আঁধার, ওঠে চাঁদ, ফোটে তারা।”

চমকে উঠল জরিনা। কাট করে দেখলাম, দূরে সেও বসে আছে। সে বিস্মিত।

গানের মাঝখানে জরিনা উঠে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল।

সেটা লক্ষ্য করল সিমকি। নূপুরকে নিঃশব্দে তা দেখাল সে। তারা দুজনেই কি যেন একটা আঁচ করতে পারল।

জাহাংগীর গান শেষ করল।

 

৪৮ কÑশেষ শট জরিনার ঘরে- তারা ওপরে গানের শেষ রেশ মিলিয়ে গেল। তার মুখে ফুটে উঠেছে আশ-নিরাশার দোলা, প্রেম যেন শক্ত বাহুতে তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে।

 

দৃশ্য ৪৯

গভীর রাত। চৌধুরী বাড়ির লংশট। কাট করে আমরা জরিনার ঘরে আসি।

জরিনা বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। পাশে বাতিটা ছোট করে রাখা। দূরে দেয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং করে দুটো ঘণ্টা পড়ল।

জরিনা স্থির অপলক চোখে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ভাবছে।

হঠাৎ তার ওপর দরোজায় টোকা দেবার শব্দ ওভারল্যাপ হলো। সে ফিরে তাকাল। তখন আবার ওভারল্যাপ হলো কোনো পুুরুষের হাঁপানোর শব্দ- যেন খুব কষ্ট হচ্ছে।

আবার দরোজায় টোকা।

জরিনা দরোজার কছে গেল।

জরিনা।          কে?

ওভারল্যাপ হলো জাহাংগীরের চাপাস্বর।

জাহাংগীর।    আমি। আমি জরিনা।

জরিনা।          কি চান এত রাতে?

ওভারল্যাপ হলো জাহাংগীরের কণ্ঠ

জাহাংগীর।    দরোজাটা খোলো।

জরিনা।          না জেনে আমি খুলব না।

জাহাংগীর।    না খুললে তুমি বুঝতে পারবে না।

আবার হাঁপাবার শব্দ।

জরিনা ইতঃস্তত করে।

জাহাংগীর।    একটা বিপদ হয়েছে, জরিনা।

জরিনা।          বিপদ?

দরোজা খুলোই জরিনা দ্যাখে উদভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে আছে জাহংগীর। তার পায়ের কাছে অচেতন একটা পুরুষ- মহসিন। তার দুটো হাত জাহাংগীর ধরে আছে, যেন লোকটিকে সে টেনে এনেছে এ পর্যন্ত- এজন্যই হাঁপাচ্ছিল।

জরিনা।          ইনি কে?

জাহাংগীর। বলছি, তুমি আমাকে একটু সাহায্য করো। আমার ঘরে নিয়ে যাবো ভাবছিলাম, অনেকদূর, পারা গেল না।

বলতে বলতে লোকটিকে টেনে জরিনার ঘরে নিয়ে এলো জাহংগীর নিজেই সে দরোজা বন্ধ করে দিল।

জরিনা।          কপালের কাছে কেটে গেছে যে।

মহসিনের কপাল বেয়ে রক্ত পড়ছে। তাকে ওরা সোফায় শুইয়ে দেয়।

জাহাংগীর।    হ্যাঁ, একটু পানি, ব্যান্ডেজ  লাগবে, দেখি আমার ঘরে ওষুধ আছে কিনা। তুমি, চোখেমুখে পানি দাও ওর, আমি এক্ষুনি আসছি।

জাহাংগীর ছুটে বেরিয়ে যায়।

অচেতন মহসিনেরর শুশ্রুষা করে জরিনা দ্রুত এবং নিপুণ হাতে। লোকটির জ্ঞান যেন একটু একটু করে ফিরে আসতে থাকে। ডেটলের শিশি নিয়ে ফিরে আসে জাহাংগীর। আর ঠিক তখন মহসিন চোখ খোলে। জরিনাকে দেখেই সে যেন আতংকিত হয়ে পালাতে চায়। জাহাংগীর ছুটে এসে তাকে বলে,

জাহাংগীর।    এ তুলির মাস্টার, তুলিকে পড়ায়।

মহসিন তখন জরিনাকে ভালো করে দেখে শান্ত হয়।

তার মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা হয়ে যায়। জরিনা এখনো যেন বিস্ময়ের ঘোর কাটাতে পারছে না।

জাহাংগীর।    আপনি এখন হাঁটতে পারবেন তো?

মহসিন।         বোধহয় পারব।

জাহাংগীর।    তাহলে চেষ্টা করুন, আসুন।

মহসিনকে নিয়ে জাহাংগীর ঘর থেকে চলে যায়। যাবার আগে এ সবের কোনো ব্যাখ্যাই সে দিয়ে যায় না বলে জরিনা বিচলিত বোধ করে। কি একটা যেন জিগ্যেস করতে যায় হাত তুলে, জাহাংগীর তাকে নিঃশব্দে হাত তুলে ছোট্ট ইশারা করে যে- আসছি।

ঘরের ভেতর পায়চারি করতে থাকে জরিনা। বেশ কয়েকবার পায়চারি করে সে। জাহাংগীর ফিরে আসে।

জাহাংগীর।    লোকটা আমাদের এক আত্মীয়। দেখা করতে এসেছিল, কালই চলে যাবে। ওঁর আবার ঘুমের ভেতর হাঁটার রোগ আছে। সিঁড়ির সাথে টঙ্কার লেগে এই অবস্থা। ভগ্যিস আমি শুনতে পেয়েছিলাম।

ঝড়ের মতো কৈফিয়ত দেয় জাহংগীর।

জাহাংগীর।    সবাইকে ডাকাডাকি করলে হৈচৈ হয়ে যেত। বাড়িতে গেস্ট আছে। তাই তোমাকেই কষ্ট দিলাম।

জরিনা।          হয়ত আমার দরজাটা কাছেই ছিল।

জাহাংগীর।    তোমাকেই সবচেয়ে আপন মনে করেছি বলে তোমার দরোজায় ডেকেছি। এমনও তো হতে পারে।

জরিনা।          সেটা সত্যি হলে আপনি ‘এমনও তো হতে পারে’ বলতেন না।

কথাটা শুনে বিস্মিত হয়ে যায় জাহাংগীর। তার কথার এ রকম ব্যাখ্যা হতে পারে সে ভাবতেই পারেনি। সে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে, যেমন তার বরাবরের স্বভাব। নিষ্ঠুরের মতো হেসে ওঠে সে।

জাহাংগীর।    ঠিক ধরেছ, আমি তোমাকে নিয়ে খেলছি, খেলতে আমার ভালো, লাগে তাই।

জাহাংগীর ঝড়ের মতো বেরিয়ে যায়।

লম্বা বারান্দা দিয়ে সে ব্যাক টু ক্যামেরা হেঁটে যায়, মিলিয়ে যায়।

 

দৃশ্য ৫০

চৌধুরী বাড়ির বাইরের শট- লং শট। দিন। জীপ আসে। লাফ দিয়ে নামে জামাল। দেখতে পায় জরিনা বাগানে হাঁটছে। তার দিকে এগিয়ে যায়।

জামাল।          এই যে, আপনার কাছেই আসা, সবাইকে স্টেশনে তুলে দিয়ে এলাম। সেকি, আপনার মনটা যেন খারাপ দেখছি।

জরিনা।          না, কৈ? না তো।

জরিনা জোর করে হাসে।

জামাল।          চিয়ার আপ, মিস খানম, এখন তো আপনার ওপরেই সব।

জরিনা।          মানে?

জামাল।          সমস্ত কিছু আপনাকেই অ্যারেনজ করতে হবে। মিঃ চৌধুরী হঠাৎ মাইন্ড চেঞ্জ করে নূপুরের সিমকির সংগে ঢকা চলে গেলেন। বললেন, বিয়ের শপিং শেষ করে ফিরবেন। আপনাকে খবর দিয়ে যেতে বললেন, বাড়িঘরদোর যে ভাবে গোছাতে হয়, সাজাতে হয়, বিয়ের সব অ্যারেনজ করতে হয়, আপনি কাইন্ডলি যেন করে রাখেন। উনি বিয়ের শপিং করতে যাচ্ছেন শুনে নূপুর তো ভীষণ খুশি।

জরিনা।          নূপুরকে আমার কংগ্রাচুলেশন জানিয়ে দেবেন।

জরিনা তার সমুখ থেকে সরে যায় মাথা নিচু করে।

 

বিশ্রাম।

 

দৃশ্য ৫১

সকাল। পড়ার ঘর। জরিনা একটা ইংরেজি বই থেকে তুলিকে কবিতা পড়াচ্ছে।

জরিনা।          হার্ক, হার্ক, দ্য ডগস ডু বার্ক- মানে, শোনো, শোনো…

তুলি।              কুকুরগুলো ডাকছে।

জরিনা।          হ্যাঁ। কেন ডাকছে? বেগারস আর কামিং টু টাউন। ভিকিরিরা শহরে আসছে। অনেক ভিকিরি।

তুলি খুব মজা পায়। উজ্জ্বল চোখে সে শোনে।

জরিনা।          সেই ভিকিরিদের- সাম ইন র‌্যাগস- কারো পরণে ছেঁড়া জামা- সাম ইন ব্যাগস- করো পরণে

তুলি।              ব্যাগস মানে তো থলে। থলে কেউ পরতে পারে, মাস্টার মা?

জরিনা।          এখানে থলে মানে, চটের ছালা- তাই বলছে, সাম ইন র‌্যাগস, সাম ইন ব্যাগস- সাম ইন ভেলভেট গাউন।

তুলি হাত তালি দিয়ে হেসে ওঠে।

তুলি।              কি মজা,  আবার কেউ ভেলভেট গাউন পরেছে। ভিকিরিরা ভেলভেটের গাউন পেল কোত্থেকে?

জরিনা।          কেউ তাদের দান করেছে। বড়লোকের খেয়াল, দামি কাপড় চোপড় দান করে দিতে পারে তো? তাই দিয়েছে।

তুলি।              জানো মাস্টার মা, কালকে না, চাচা কত দামী কাপড় এনেছে, কত দামী শাড়ি এসেছে, লাল শাড়ি এনেছে, কত কিছু ঢাকা থেকে এনেছে, স…ব চাচীর জন্য চাচার বিয়ে হবে যে, তুমি জানো না?

তুলির সংলাপের শেষ অংশে আমরা দেখব জাহাংগীর দরোজার পাশ দিয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে শুনল- কিছুটা স্মিতমুখে।

জরিনা।          আমি জানি।

সংগে সংগে মুখ গম্ভীর করে জাহাংগীর পেছন থেকে বলে ওঠে,

জাহাংগীর।    জানেন তো, হাত গুটিয়ে বসেছিলেন কেন?

জরিনা চমকে ফিরে তাকিয়ে তাকে দেখতে পায়। বিদ্রুপটা তাকে কশাঘাত করে।

জাহাংগীর।    এসে দেখি কোনো আয়োজনই হয়নি।

জরিনার ক্লোজ শটের ওপর এবার জাহাংগীরের কথা ওভারল্যাপ করে-

জাহাংগীর।    কিছুই সাফসুৎরো হয়নি, দেয়ালে রঙ ফোরানো হয়নি, জানালার পর্দা নতুন লাগানো হয়নি, কিছুই হয়নি।

এবার টু শট- জরিনা ও জাহাংগীর। জরিনা তখনো চেয়ারেই বসে, জাহাংগীর দাঁড়িয়ে।

জাহাংগীর।    তোমাকেই তো এ সব করতে বলে গিয়েছিলাম। হয়নি কেন? কেন হয়নি? – জানি, উত্তর নেই।

বলে জাহাংগীর শট থেকে বেরিয়ে যায়। জরিনা তুলি দিকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে,

জরিনা। তুলি, কবিতাটা মুখস্থ করো, আমি আসছি।

 

দৃশ্য ৫২

ড্রয়িং রুম। জরিনা তুলির পড়ার ঘরের দরোজা ভেজিয়ে বেরিয়ে এসে ডাক দেয়,

জরিনা।          শুনুন।

জাহাংগীর সদর দরোজার দিকে চলে যাচ্ছিল, থমকে দাঁড়াল, ফিরে তাকাল, জরিনা এলো।

জরিনা।          উত্তর আছে। তুলির সামনে উত্তরটা দিলে ভালো শোনাতো কি?

জাহাংগীর।    এখনই কি  ভালো শোনাবে?

জরিনা।          না, এখানো ভালো শোনাবে না। তবে, আপনি ভুলে গেলেও আমি ভুলে যেতে পারি না যে, বাড়িতে একটা বাচ্চা মেয়ে আছে, বড়দের অনেক কিছুই সে বোঝে না, বোঝা তার উচিত নয়। আর যাই করুন-

ক্লোজ আপ- জাহাংগীর- তার ওপর জরিনার কথা ওভারল্যাপ-

জরিনা।          দয়া করে বাচ্চাটাকে এ সব থেকে দূরে রাখবেন।

আবার টু শট।

জরিনা।          তার মনে যেন খারাপ প্রভাব না পড়ে। আপনারই সে ভাইঝি।

জাহাংগীর।    উপদেশ রেখে, বলো, বিয়ের আয়োজন কেন হয়নি?

জরিনা।          কারণ, জাহাংগীর সাহেব, আপনি নিজেই জানেন ওটা আমার কাজ নয়, আপনি নিজেই জানেন, আপনার বিয়ের আয়োজন আমাকে করতে বলে আপনি শুধু মজা দেখতে চেয়েছিলেন, নিষ্ঠুর একটা খেলা করতে চেয়েছিলেন, দেখতে চেয়েছিলেন আমাকে খুঁচিয়ে আপনি রক্ত ঝরাতে পারেন কিনা?

জাহাংগীর।    তাই কি, জরিনা?

জরিনা।          এতদিনে আমি আপনাকে তো কিছুটা জেনেছি।

জাহাংগীরের ক্লোজ আপ। নীরব প্রতিক্রিয়া- যেন সে এই মুহূর্তে পারলে, নিজের অভিনয় ছেড়ে আত্মপ্রকাশ করে সত্যি কথাটা নিয়ে। ঠিক এই সময়ে জরিনা বলে ওঠে,

জরিনা।          আপনাকে আরো একটা কথা বলা দরকার। তুলির চাচী এসে গেলে, তুলির ভার তিনিই নিতে পারবেন, তাঁরই এটা কর্তব্য, তাই নয়কি?

জাহাংগীর।    তুমি কি চলে যাবার নোটিশ দিচ্ছ।

জরিনা।          চাকরি যখন, হ্যাঁ, নোটিশই দিলাম।

জাহাংগীর।    যদি অ্যাকসেপ্ট না করি তোমার নোটিশ?

জরিনা।          জাহাংগীর সাহেব, আপনাদের জমিদারী আমলে কি ছিল জানি না, এ যুগে কর্মচারীর নিশ্চয় ততটুকু স্বাধীনতা আছে যে নোটিশ দিয়ে সে তার চাকরি ছাড়তে পারে।

বলেই জরিনা বেরিয়ে যায়। তুলির পড়ার ঘরে চলে যায়।

ক্যামেরা এগিয়ে এসে স্থির হয় জরিনার ওপর।

 

৫৩ দৃশ্য

চৌধুরী বাড়ির বাগান। জরিনা সেই বেঞ্চের ওপর চুপ করে বসে আছে। এখন বিকেল।

জাহাংগীর আসে সেখানে।

জাহাংগীর।    এখানে বসে আছো যে?

জরিনা উঠে দাঁড়ায়।

জরিনা।          এখানে বসবার স্বাধীনতাও কি আমার নেই?

জাহাংগীর।    থাকা উচিত নয়। কারণ, মনিবের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য এ বাগান। জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জরিনা সেখান থেকে বেরিয়ে যায়।

ক্লোজ আপ- জাহাংগীর- এই প্রথম তার মুখে আমরা নিঃশব্দ হাসি দেখি। এবং আমরা অনুভব করি যে সে জরিনাকে নিয়ে মজা করছে।

 

দৃশ্য ৫৪

পাহাড়ের মাথা থেকে প্যান করে নিচে পাহাড়ী সড়ক ধরা হয়। সংগীত সহ। এই সংগীত শুরু হয়েছে আগের দৃশ্যের শেষ শট থেকে। আমরা দেখি জরিনা সড়ক দিয়ে হাঁটছে, হঠাৎ সে মুখোমুখি পড়ে যায় জাহাংগীরের। জাহাংগীরও সড়ক দিয়ে এগিয়ে এসেছে। সে প্রায় পথরোধ করে দাঁড়ায়।

জরিনা।          পথ ছাড়ুন।

জাহাংগীর নীরব হাসে।

জরিনা।          এই রাস্তার কি আপনার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য?

জাহাংগীর।    ভেবে দেখতে হবে। এককালে তো আমাদেরই ছিল। নাহ, এখন এ রাস্তার ওপর আমাদের আর স্বত্ব নেই।

হানিসা।          শুনে খুশি হলাম।

জরিনা হনহন করে এগিয়ে যায়

একটু পর জাহাংগীরও সে দিকে এগোয়

 

 

দৃশ্য ৫৫

সারি সারি গাছের মাথা থেকে ক্যামেরা প্যান করে  আমরা জরিনাকে ধরি পাহাড়ি সড়কে।

জাহাংগীরকেও আসতে দেখি তার পেছনে, কিছুটা দূরে।

জরিনা থামে।

জাহাংগীরও থামে।

হসিনা চলে।

জাহাংগীরও চলে।

হঠাৎ জরিনা তার দিকে তেড়ে আসে।

জরিনা।          আপনি কেন আমার পেছন পেছন আসছেন?

জাহাংগীর।    বাহ, তুমিই তো আমার আগে আগে যাচ্ছ।

জরিনা।          তাহলে,  আপনার যেখানে যাবার আপনি যান।

বলে সে পথ ছেড়ে পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

জাহংগীর নড়ে না।

জরিনা।          যান।

জাহাংগীর।    বেশ।

জাহাংগীর ধীরে সুস্থে এগিয়ে যায়।

কিছুক্ষণ পর জরিনা আবার হাঁটতে শুরু করে।

জাহাংগীর সেটা লক্ষ্য করে। হাঁটে।

আরেক শটে আবার হাঁটতে শুরু করে।

জাহাংগীর সেটা লক্ষ্য করে। হাঁটে।

আরেক শটে জরিনাও হাঁটে।

জাহাংগীর হঠাৎ জরিনার কাছে ফিরে আসে,

জাহাংগীর।    জানতে পারি কি, তুমি কেন আমার পেছন পেছন আসছ?

ক্লোজ আপ- জরিনা। জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। মুখ ফেরায়।

লং শট উলটো দিকে জরিনা ফিরতেই জাহাংগীর খপ করে তার হাত ধরে।

ক্লোজ শট- জাহাংগীর জরিনার হাত ধরে আছে। জরিনা হাত ছাড়াতে চেষ্টা করে।

জরিনা।          হাত ছাড়–ন, হাত ছাড়–ন, প্লি-ই-জ।

জাহাংগীর।    এ হাত ছেড়ে দেবার জন্যে তো ধরিনি।

জরিনা।          আপনি জানেন না, আপনি কি বলছেন।

জাহাংগীর।    আমি জানি, জরিনা, আমি কি বলছি।

হাতে ছেড়ে জাহাংগীর খপ করে জরিনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

জরিনা।          আহ, না, ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন আমাকে।

জাহাংগীর।    দেব, যদি কথা দাও, চলে যাবে না।

জরিনা।          আমার কষ্ট হচ্ছে।

তার চাপা কান্না টের পেয়ে জাহাংগীর আলিংগন শিথিল করে, কিন্তু ছেড়ে দেয় না সম্পূর্ণ, জরিনাকে সে দু’হাতে কাঁধে ধরে একটু দূরে রেখে বলে,

জাহাংগীর।    আমিও কষ্ট পাচ্ছি, জরিনা।

জরিনা।          না। না। আপনি কাউকে নিয়ে এ ভাবে খেলবেন না। আপনি একজনকে ভালোবাসেন।

জাহাংগীর।    হ্যাঁ, আমি একজনকে ভালোবাসি।

জরিনা মুখ পাশে ফিরিয়ে নিয়ে উচ্চারণ করে,

জরিনা।          তার সংগে আপনার বিয়ে হতে যচ্ছে।

জাহাংগীর।    হ্যাঁ, তার সংগে আমার বিয়ে হতে যাচ্ছে।

জরিনা তখন নিজেকে জাহাংগীরের হাত থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলে,

জরিনা।          আপনার শোভা পায় না। আপনার উচিত হয় না। আপনার বৌ আছে।

নিজেকে সে ছাড়িয়ে নিয়ে দেহ পেছনে ফিরে দাঁড়িয়ে থাকে। বোঝা যায় ভেতরের কান্না ঠেলে আসতে চাইছে।

জাহাংগীর।    আমার বৌ। আমার তো এখনো বৌ হয়নি।

বলতে বলতে সে জরিনার কাছে এসে, কাঁধে আলতো করে হাত রাখে। সে হাতের ওপর জরিনা নিজের হাত রাখে- এই কাজটুকুর দুটো অর্থ হতে পারে- জাহাংগীরের হাত সরিয়ে দেয়া অথবা জাহাংগীরের হাত স্পর্শ করে নিজের ব্যাকুলতার আশ্রয় খোঁজা- আমরা কেবল দেখি জরিনার আঙুল থরথর করছে।

জরিনা।          বৌ হয়নি, হবে তো।

জাহাংগীর তখন জরিনাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে এনে বলে,

জাহাংগীর।    হ্যাঁ, হবে, আর সে বৌ হবেÑ তুমি।

ক্লোজ আপ-    জরিনা। বিস্ময়, অবিশ্বাস।

জরিনা।          আমি?

জাহাংগীর।    হ্যাঁ, তুমি, তুমি, তুমি।

বলতে বলতে আবার সে জড়িয়ে ধরে জরিনাকে।

 

দৃশ্য ৫৬

রাত। ড্রয়িং রুম। দেয়ালে ক্রস করা তলোয়ার থেকে প্যান করে নিচে নামে ক্যামেরা। সোফায় মুখোমুখি বসে আছে জরিনা আর  জাহাংগীর।

জরিনা।          আপনি আমাকে নিয়ে খেলা করছেন।

জাহাংগীর।    না, জরিনা, না।

জরিনা।          আপনি নূপুরকে ভালোবেসেছেন।

জাহাংগীর।    না।

জরিনা।          নূপুরকে বিয়ে করবেন, কথা দিয়েছেন।

জাহাংগীর।    না।

চিৎকার করে জাহাংগীর সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। পায়চারি করতে করতে বলে,

জাহাংগীর।    নূপুরকে আমি কখনোই বলিনি, ভালোবাসি। নূপুরকে কখনো বলিনি, তার সংগে আমার বিয়ে। আমার ছন্নছাড়া জীবনে এমন কত মেয়ের সংগে পরিচয়, কত মেয়ের সংগে হেসে কথা বলেছি, কতজন আমার এখানে বেড়াতে এসেছে- তাহলে তো কবেই আমার বিয়ে হয়ে যেত তাদের কোনো একজনের সংগে। তা তো হয়নি।

জাহাংগীর এসে আবার জরিনার সমুখে সোফায় বসে।

জাহাংগীর।    জরিনা, তুমি জানো না, গার্ডেনের ম্যানেজার জামালের ফিয়ান্সে ঐ মেয়েটা সিমকি, নূপুরকে সে নাচিয়েছে, আমি নই।

জরিনা।          আপনি জামাল সাহেবের মুখে বলে পাঠিয়েছেন, বিয়ের শপিং করতে যাচ্ছেন।

জাহাংগীর।    হ্যাঁ, কিন্তু নূপুরের সংগে আমার বিয়ের শপিং তো তাকে বলিনি, সে ধরে নিলে আমার কি অপরাধ। আমার তো মনের ভেতরে ছিল- আমাদের বিয়ের শপিং, মনে মনেই তা রেখেছিলাম, ভেবেছিলাম, তোমাকে অবাক করে দেবে, তোমার মনে নেই, এখানে এই ঘরে, ঐ পিয়ানোর, নূপুরের অনুরোধে যে গান আমি গেয়েছিলাম, সে তোমারই গান, জরিনা, তোমার কি মনে নেই, নূপুরের হাত দেখে আমি বলেছিলাম- সে যা ভাবছে তা হবে না, তোমার কি মনে নেই, একদিন রাতে কি কঠিন বিপদে পড়ে আমি তোমারই দরোজায় এসে দাঁড়িয়েছিলাম?

জরিনা অশ্রভরা চোখ তুলে তাকায়।

 

দৃশ্য ৫৭

রাত। জরিনার ঘর।

ক্লোজ আপ- টেবিল ল্যাম্প- শিখাটা কেঁপে কেঁপে উঠছে।

ল্যাম্পের কোণ থেকে দেখা যায় ভেজানো দরোজা- দরোজা খুলে যায়- জরিনা এসে চৌকাঠে দাঁড়ায়। তার পেছনে আসে জাহাংগীর।

জরিনা একটু থমকে ঘরের ভেতরে এসে দরোজা ভেজাতে চেষ্টা করে। দরোজা ঠেলে আসে জাহাংগীর। জরিনাকে দু’হাতে ধরে নিজের দিকে ফেরায় সে।

জাহাংগীর।    না, বিশ্বাস তোমাকে করতেই হবে। কতকাল মানুষকে তুমি অবিশ্বাস করে থাকবে, জরিনা?

জরিনা।          মানুষের কাছে যে কেবল আঘাতই পেয়েছি?

জাহাংগীর।    আমি সব শুনেছি। হ্যাঁ, আমি সব শুনেছি। ঢাকায় আমি তোমার স্যারের সংগে দেখা করেছি। তাঁকে আমি কথা দিয়েছি, আমি তোমাকে সুখী করব।

জরিনা।          তিনি শুনেছেন? তাঁকে তুমি বলেছ?

জাহাংগীর।    হ্যাঁ, তিনি আমাকে বিশ্বাস করেছেন, তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে না? আমার হাতে হাত রাখবে না?- আমাকে ভালোবাসতে দাও, জরিনা, আমাকে তোমার ভালোবাসা দাও।

জরিনাই এবার ধীরে পাশ ফেরে, তারপর হঠাৎ জাহাংগীরের বুকে মুখ লুকোয়।

 

দৃশ্য ৫৮

বাড়ির কোনো একটা জায়গায় সমশের আর লুৎফার মার কথা।

সমশের।         খালা, এটা কি হলো? সাহেবও মাল খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন, আমিও ছেড়ে দিয়েছি- আমিও আর খাই না-

লুৎফার মা।   পাচ্ছো না তাই খাচ্ছো না, তোমাকে চিনি না?

সমশের।         কিন্তু আমি যে কিছুতেই বুঝতে পারছি না- এই শুনলাম ঢাকার সেই লেডির সাথে সাহেবের বিয়ে, তুমি গাল ভরে হাসতে হাসতে আমায় খবর দিল, আবার এই বলছ, মাস্টার আপার সাথে বিয়ে। তাহলে তুমিই খালা বোতলগুলো সাফ করছ নির্ঘাত, নেশার মাথায় উলটোপালটা বকছ।

লুৎফার মা।   হারামজাদা, তবে রে, বোতল আমি খাচ্ছি? বলেই সে ঝাড়ন পেটা করতে থাকে সমশেরকে।

 

দৃশ্য ৫৯

তুলির পড়ার ঘরে- জরিনা আর তুলি।

তুলি।              আমি কিন্তু তোমাকে চাচী বলব না, না, কক্ষনো না।

জরিনা হাসতে থাকে।

জরিনা।          তাহলে কি বলবে?

তুলি।              কেন, মাস্টার মা।

জরিনা তুলিকে জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে আদর করে আর বলে,

জরিনা।          তাই বোলো, তুমি তাই বোলো।

 

দৃশ্য ৬০

চৌধুরী বাড়ির গাড়ি বারান্দা। জাহাংগীর মোটর সাইকেল নিয়ে বাইরে থেকে আসতেই জরিনা ভেতরে থেকে একটা চিঠি হাতে ছুটে আসে।

জরিনা।          এই দ্যাখো, দ্যাখে, ঢাকা থেকে স্যার চিঠি দিয়েছেন। বিয়েতে তিনি আসবেন। দ্যাখো, কি মজা করে লিখেছেন, “মা জরি, আমার এই বুড়ো কোমরটা যতই আমাকে বিছানায় কাত করে রাখুক, তোমার বিয়েতে ঠিক এসে হাজির হবো।” তারপরে- না কিছু না।

জরিনার হঠাৎ লজ্জা পাওয়া দেখে জাহাংগীর ওর হাত থেকে চিঠিখানা খপ করে কেড়ে নেয়।

জাহাংগীর।    কিছু না, মানে।

জরিনা।          না, আমার চিঠি, দাও। দাও শিগগির।

জরিনার হাত এড়িয়ে চিঠি মাথার ওপর তুলে ধরে জাহাংগীর পড়ে,

জাহাংগীর।    “বিয়ের শাড়ি মিঃ চৌধুরীর সংগে আমিই পছন্দ করেছিলাম। শাড়ি দেখেছি, সেই শাড়িতে তোমাকে কেমন দেখায়, আমার আর তর সইছে না।”

হাঃ হাঃ করে হেসে ওঠে জাহাংগীর।

জাহাংগীর।    তর আমারও সইছে না।

চিঠিখানা কেড়ে নিয়ে জরিনা পালিয়ে যায়।

জাহাংগীর হাসতে থাকে।

 

দৃশ্য ৬১

জরিনা নিজের ঘরে আসে ছুটে। তারপর এদিক ওদিক দেখে দরোজাটা আস্তে লাগিয়ে দেয়। তার ড্রেসিং টেবিলের ওপর অনেক শাড়ির প্যাকেট, নতুন জিনিশপত্র। সে এখন বিয়ের শাড়িটা বের করে। আস্তে আস্তে একটু ভাঁজ খোলে। তারপর একটা দিক নিজের বুকের ওপর মেলে ধরে, ধীরে ঘোমটা দেয়, আয়নায় দেখে, নতুন বৌয়ের মতো লজ্জা পায়।

তার ওপরে ওভ্যার ল্যাপ হয় দরোজায় টোকা দেবার শব্দ।

সংগে সংগে সে শাড়ি লুকিয়ে ফেলে।

জাহাংগীরের গলা ওভারল্যাপ হয়,

জাহাংগীর।    এই, শোনো, শোনো না-

জরিনা।          না।

জাহাংগীর।    খোলো, প্লিজ।

জরিনা।          দুষ্টু।

তারপর জরিনা দরোজার কাছে গিয়ে, পাল্লার ওপর গাল পেতে বলে, ওধরে অফস্ক্রীন জাহাংগীরকে উদ্দেশ্য করে,

জরিনা।          দিনের বেলায় দরোজায় ধাক্কাতে হয় নাকি? কে কি বলবে?

তার ওপর ক্যামেরা চার্জ করে যায়। জরিনার চোখে মুখে যেন বিয়ের রাতের এবং বাসরের স্বপ্ন ও লজ্জা খেলা করে।

 

দৃশ্য ৬২

গভীর রাত। চৌধুরী বাড়ির লং শট। নিঝুম। কোনো শব্দ বা সংগীত কিছুই থাকবে না।

কোনো জানালাতেও কোনো আলো দেখা যাবে না।

 

দৃশ্য ৬৩

জরিনার ঘর। ছোট্ট করে টেবিল ল্যাম্পটা পাশে জ্বলছে। জরিনা ঘুমিয়ে আছে। জানালার পর্দা মৃদৃ বাতাসে উড়ছে।

জরিনার ওপর ওভারল্যাপ হয় দরোজায় মৃদু টোকা দেবার শব্দ। আবার, আবার।

জরিনা জেগে ওঠে। ওঠে বসে। আবার টোকা। জরিনার মুখে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। সে বন্ধ দরোজার কাছে এগিয়ে যায়। ফিসফিস করে জিজ্ঞাস করে,

জরিনা।          কি?

আবার দরোজায় টোকা।

জরিনা।          দুষ্টমি হচ্ছে?

আবার টোকা।

জরিনা।          দাঁড়াও।

বলে সে দরোজা খুলতেই- দেখা যায় উন্মদ এক যুবতী, চুল খোলা, চোখের কোলে কালি, মুখে ক্রুঢ় স্থির হাসি,  চোখ জ্বলজ্বল করছে।

আঁতকে এক পা পিছিয়ে আসে জরিনা।

জরিনা।          কে আপনি?

যুবতী স্থির চোখে তাকিয়ে ভেতরে আসে।

জরিনা।          কে আপনি ? কে?

যুবতীর ক্লোজ আপ- নিঃশব্দে হাসে।

যুবতী।           চিনতে পারছ না?

জরিনা।          না। না।

খিলখিল করে হেসে ওঠে যুবতী।

যুবতী।           কি করে চিনবে গো?

জরিনা।          আপনাকে তো কখনো দেখিনি।

যুবতী।           আমার কথা শোনোও নি? সে বলেনি? লুকিয়ে গেছে?

খিলখিল করে হেসে ওঠে যুবতী

যুবতী।           আমি যে এ বাড়ির বৌ।

জরিনা।          বৌ?

যুবতী ততক্ষণে ড্রেসিং টেবিলে ওপর বিয়ের লাল শাড়িটা দেখতে পেয়েছে। খপ করে তুলে নেয়।

যুবতী।           লাল শাড়ি, বিয়ের শাড়ি।

খিলখিল করে হেসে উঠে যুবতী একটানে শাড়ি দু’ভাগে ছিঁড়ে ফ্যালে। মুহূর্তের ভেতর ছুটে এসে জরিনার গলা টিপে ধরে বলে,

যুবতী।           তুই আমার স্বামীকে ছিনিয়ে নিতে চাস?

আর্তনাদ করে ওঠে  জরিনা।

জরিনা।          আহ, আহ, আপনার স্বামী, কে আপনার স্বামী।

খিলখিল করে হেসে ওঠে যুবতী, জরিনার গলা আরো জোরে টিপে ধরে।

যুবতী।           আমার স্বামী, যার সাথে তুই ঢলাঢলি করিস, যার জন্যে লাল শাড়ি নিয়ে বসে আছিস, যাকে তুই বিয়ে করতে যাচ্ছিস।

প্রাণপণে নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করে জরিনা। চিৎকার করে,

জরিনা।          না- না- না- না।

দু’জনের হটোপুটি, আর্তনাদ আর চিৎকার চলতে থাকে।

যুবতী।           তোকে আমি আজ শেষ করব। আজ অনেক কষ্টে ছাড়া পেয়েছি। তুই ভেবেছিস, আমার বাড়িতে, আমার খাটে আমার স্বামীকে নিয়ে রাজত্ব করবি। আমি সব চোখে রেখেছি, সব দেখিছে, সব জেনিছি, সতীনের কাঁটা আজ আমি রাখব না।

ঠিক এই সময় পাগলের মতো দৌড়ে আসে ঘুমভাঙা জাহাংগীর। ঘরে ঢোকেই বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যায়।

জাহাংগীর।    জরিনা, জরিনা, একি, ভাবী, জরিনা, ভাবী তুমি এখানে?

খিলখিল করে হসে ওঠে যুবতী। এই সময় জরিনার গলায় তার হাত ঢিলে হয়ে যায়।

যুবতী।           নিজের বৌকে ভাবী বলতে লজ্জা করে না?

জরিনা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারে। যুবতী তখন টেবিল থেকে লম্বা কাঁচি তুলে নেয় হাতে। জরিনাকে আড়াল করে ঝাঁপিয়ে পড়ে জাহাংগীর। যুবতীর হাত শক্ত মুঠোয় ধরে ফেলে।

জাহাংগীর।    ভাবী।

যুবতী।           ভালো বুদ্ধি করেছ। আমাকে ঘরে তালা দিয়ে, পাগল সাজিয়ে, ভাবী বানিয়ে, নতুন একটা বিয়ে করতে চলেছ।

এই কথাগুলো জরিনার ক্লোজ আপের ওপর ওভারল্যাপ হবে। তার ভেতরটা যেন খানখান হয়ে যায়। চোখ বিস্ফারিত হয়ে আসে। সেটা লক্ষ্য করে জাহাংগীর যুবতীর হাত শক্ত করে ধরা অবস্থাতেই জরিনার দিকে ফিরে বলে,

জাহাংগীর।    না, না, তুমি এ সব বিশ্বাস করো না, বিশ্বাস করো না জরি, সব মিথ্যে কথা।- সমশের লুৎফার মা সমশের- তুমি এখান থেকে পালাও।

জাহাংগীর যুবতীর হাত থেকে কাঁচি কেড়ে নেবার চেষ্টা করে আর লোকজনকে ডাকে, আবার জরিনাকে নিরাপাত্তার জন্য সরে যেতে বলে এভাবে। আর যুবতী খিলখিল করে হেসেই চলে।

জরিনা।          হ্যাঁ, পালাবো, পালাতে আমাকে হবে।

জাহাংগীর।    কি বলছ, জরিনা?

জরিনা।          ছী ছি ছি, আপনি এই, আপনি, এতটা নীচ?

জাহাংগীর।    তুমি বিশ্বাস করো জরিনা।

জরিনা।          বিশ্বাস? নিজের বৌকে বন্দি করে, নিজের মেয়েকে ভাইঝি পরিচয়ে দিয়ে, নিজেকে একা পরিচয় দিয়ে চমৎকার অভিনয় আপনি করেছেন।

সমশের, লুৎফার মা ও আরো দু’একজন ঝি দৌড়ে আসে ঘরে। তারাও দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়।

জরিনা।          ছী, ছি, আপনাকে যে আমি বিশ্বাস করেছিলাম, আপনাকে যে আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম।

বলতে বলতে ছুটে দরোজা দিয়ে বেরিয়ে যায় জরিনা পাগলের মতো।

জাহাংগীর যুবতীর হাত ছেড়ে দেয়, জরিনার দিকে দৌড়োয়। তার আগেই যুবতী একটা ফুলদানি তুলে জাহাংগীরকে ছুঁড়ে মারে।

পড়ে যেতে যেতে জাহাংগীর চিৎকার করে বলে,

জাহাংগীর।    সমশের, ওকে ধর, ওকে যেতে দিস না। জ-রি-না।

সমশের ছুটে বেরোয়।

 

দৃশ্য ৬৪

রাতের পাহাড়ী সড়ক দিয়ে পাগলের মতো জরিনা দৌড়াচ্ছে। তার ওপরে দূর থেকে ডাক শোনা যায় সমশেরের।

সমশের।         মাস্টার আপা, মাস্টার আপা।

তখন চলার গতি আরো বাড়িয়ে দেয় জরিনা।

সমশের দূরে থেকে জরিনাকে দেখতে পায়।

জরিনা ছুটছে।

সমশের।         মাস্টার আপা।

চিৎকার শুনে জরিনা এবার পাহাড় বেয়ে উঠতে থাকে।

সমশেরও তাকে অনুসরণ করে।

ও ভাবে কিছুক্ষণ চলবার পর জরিনা পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছায়।

সমশের কাছে আসতে আসতে বলে চিৎকার করে,

সমশের।         মাস্টার আপা।

জরিনা তাকিয়ে দ্যাখে নিচে ঘূর্ণি দিয়ে নদী বয়ে চলেছে তীব্র বেগে।

সমশের।         সাহেব ডাকছে, সাহেব আপনাকে ফিরে আসতে বলেছে, মাস্টার আপা

জরিনা নদীতে ঝাঁপ দেয়।

সমশের সেই মুহূর্তে চূড়ায় পৌঁছোয়- দ্যাখে নিচে শুধু পানির তোড়- জরিনার চিহ্ন নেই।

 

দৃশ্য ৬৫

চৌধুরী বাড়ির কোনো একটা জায়গায়- সমশের আর লুৎফর মা। সমশেরের কাপড় চোপড় ভেজা।

সমশের।         তারপর, আশে পাশে লোকজন ডেকে, জাল ফেলে কত খুঁজলাম, কত খোঁজাখুঁজি করলাম, কোথাও তাকে পেলাম  না, খালা।

লুৎফার মা।   পেলি না?

সমশের।         পহাড়ী নদী, যে স্রোতে, কোথায় তলিয়ে গেছে।

লুৎফার মা।   তাহলে? এ দিকে তো এই অবস্থা। এ বাড়ির ওপর গজব পড়েছে। সাহেব শুধু বলেছে, তুলিকে এ সবের মধ্যে না রাখতে, তুলিকে পাঠিয়ে দিতে। তোকে যে তার মামার কাছে ওকে নিয়ে যেতে হয়। এক্ষুনি। কি যে হবে। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। মাস্টার আপা চলে গেলে কেন?

তাকে পাওয়া গেলেও-

সমশের।         পাওয়া গেলেও তার লাশই পাওয়া যেত। গাঁয়ের লোকেরা বলল, সে বেঁচে নেই, খালা।

 

দৃশ্য ৬৬

ঢাকায় গানের স্যারের বাড়িতে এখন আমরা। বিছানায় শুয়ে আছে জরিনা। তার মাথার কাছে চেয়ার টেনে বসে আছে স্যার। দৃশ্য শুরু হবে স্যারের সোলো শট থেকে, টাইট, তার ওপরে জরিনার কথা ওভারল্যাপ করবে এবং ধীরে ধীরে ক্যামেরা পিছিয়ে এসে দু’জনকে কম্পোজ করবে।

দেখবে যে, জরিনা অত্যন্ত দুর্বল। কণ্ঠ কান্না ভাঙা।

জরিনা।          আমি তো মরতেই চেয়েছিলাম। মরে গেলেই ভালো ছিল।

স্যার তার মাথায় হাত রেখে মৃদু চাপড় দিতে থাকে।

জরিনা।          আপনি একদিন বলেছিলেন, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও আমার জন্য অপেক্ষা করছে মায়া মমতা স্নেহ ভালোবাসা। মিথ্যে, সব মিথ্যে, সব মিথ্যে।

অপরাধীর মতো বসে থাকে স্যার।

জরিনা।          আপনি কি আজো তেমনি করে আমাকে বলতে পারবেন, একদিন যেমন বলেছিলেন, ভবিষ্যতের দিকে স্বপ্ন নিয়ে আমাকে তাকাতে হবে? পারবেন স্যার, বলতে পারবেন?

কান্নায় ভেংঙে পড়ে জরিনা।

স্যার আবার তার মাথায় হাত দিয়ে আদর করে। জরিনা বালিশে মুখ লুকোয়।

স্যার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। হেঁটে শেষপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়ায়। পেছনে ফিরে চিন্তিত মুখে অফস্ক্রীনে জরিনার দিকে তাকায়- ক্লোজ শট।

কাট করে- রাতের শটে আমরা যাই। (এ ভাবেই পরপর সংলাপের গুচ্ছে আমরা টাইম ল্যাপস করব।)

রাতের শট- ক্লোজ- জরিনা ঘুমিয়ে আছে। স্যার এসে তার গায়ে চাদর টেনে দেয়। বেরিয়ে যায়।

কাট। স্যার পিয়ানোর কাছে আসে। বসে। অন্যমনস্ক টুং টাং করে। কাট।

দিনের শট। জরিনা আধো উঠে বসেছে। ওষুধ খাচ্ছে। গেলাশটা নেবার জন্যে ফ্রেমে স্যারের হাত এলো। গেলাশটা দিতে দিতে জরিনা বলতে লাগল, আর আমরা টুশট ধরলাম।

জরিনা।          আপনিও তো কোনো সান্ত¡না দিতে পারছেন না, স্যার। মরতে গিয়েও যখন মরতে আমি পরলাম না, তখন পৃথিবীতে একমাত্র আপনার কথা মনে হলো, আমি আপনারই কাছে আবার ফিরে এলাম। আপনার কাছেও কি আজ মনে হচ্ছে- এ পৃথিবী নিষ্ঠুর, এ পৃথিবী পাষাণ, এ পৃথিবীতে শুধু স্বার্থ,আর ছলনা, আর  বঞ্চনা?

স্যার পাশ থেকে উঠে যায়।

মিড ক্লোজ- স্যার- ব্যাক টু ক্যামেরা- দু’হাতে নিজের মুখ ঢাকে। মনে হয়, নিজের উদ্গত কান্না চাপবার চেষ্টা করছে। কাট।

রাতের শট। জরিনা এখন দাঁড়িয়ে। সোলো শট। অফস্ক্রীনে স্যারের  উদ্দেশ্য সে বলে,

জরিনা।          দিনের পর দিন পাথরের মতো আপনি আমার শিয়রে বসেছিলেন, আমার সব কথা আপনি শুনেছেন, আপনার কো ন কথা কি আমার জন্যে নেই? আপনি কি আমাকে বলে দেবেন না, এরপরও কেন আমি বেঁচে থাকব?

বলতে বলতে স্যারের  সোফার পাশে সে বসে পড়ে। স্যার এতক্ষণ বসেছিল।

স্যার।             মা, জরিনা।

জরিনা।          স্যার।

ব্যাকুল হয়ে সে তাকায় কথা শোনবার জন্যে।

 

দৃশ্য ৬৭

স্যার।             মা, জীবন তো তুমি রচনা করোনি, তাই, জীবনের শেষ রচনা করবার ভারও তোমার নয়।- তাঁর।

স্যার ওপরে আল্লাকে নির্দেশ করে।

জরিনা।          তাহলে কি নিয়ে বেঁচে থাকব ,স্যার? আমি যে কোনো মানুষের কাছে আর কিছুই আশা করি না, করতে পরি না। আপনি বলে দিন, আমার আর কি আছে জীবনে?

স্যার।             তোমার সংগীত, তোমার সাধনা।

জরিনা।          না।

স্যার।             কেন নয়? তোমার সাধনা তো ব্যর্থ হবে না। সংগীত তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, মা।

জরিনা।          স্যার?

স্যার।             তোমাকে আবার উঠে দাঁড়াতে হবে। আবার যন্ত্র হাতে তুলে নিতে হবে। আবার তোমাকে গাইতে হবে। আবার তুমি গাইবে।

জরিনা।          আমি পারব না, স্যার। হৃদয়ে যার আঘাত, সে কেমন করে গান গাইবে?

স্যার।             আঘাত না পেলে তো সুর ঝরে না, মা। তুমি গাও। তোমার মনের ভেতর থেকে সুর ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়, সেই সুর তুমি ছড়িয়ে দাও, নাও, তোমার যন্ত্র হাতে নাও, গাও।

জরিনা।          পারব না, স্যার। পারব না।

স্যার।             পারবে, তুমি পারবে, তোমাকে পারতেই হবে। আমি তোমার সংগে আজ বাজাবো।

বলে তিনি পিয়ানোয় হাত দেন।

জরিনার ক্লোজ আপ- তার ওপরে টুং টাং।

স্যার।             গাও, গাও  জরিনা, গাও।

কয়েকটি ইন্টারকাট- স্যার, জরিনা, পিয়ানোর রীড, পিয়ানোর ভেতর তারের ওপর হাতুড়ির আঘাত।

জরিনা বিষাদ নিয়ে গেয়ে ওঠে, যে গান একদিন জাহাংগীরের কণ্ঠে সে শুনেছিল।

“নিভে যাওয়া দীপ জ্বালাতে পরি না, কে আছে এমন বন্ধু

জ্বেলে দেবে দীপ, শুধাবে কুশল, আছে কি এমন বন্ধু?

নিরাশায় বয়ে যায়, রাতের আঁধার, জানি, তুমি তো কাছেই আছো বন্ধু।”

এই কথায় এসে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে জরিনা। গান থামিয়ে দেয়।

জরিনা।          আমি পারব না, স্যার। আমি গাইতে পারব না।

স্যার।             পারবে, তুমি পারবে, এ গান যে তোমার হৃদয় থেকে উঠে আসছে।

তখন আবার জরিনা গান ধরে।

এবং এই গানের ভেতরে জরিনাকে আমরা দেখব, বিভিন্ন লোকেশনে, একা একা ঘুরে বেড়াতে, যেন প্রকৃতির ভেতর সে তার সুর ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ ভাবে আমাদের কিছুটা টাইম ল্যাপসও অর্জিত হবে।

 

দৃশ্য ৬৮

স্যারের ঘর। স্যার এসে জরিনাকে বলে,

স্যার।             জরিনা, চট করে তৈরী হয়ে নাও তো, মা। এক জায়গায় তোমাকে নিয়ে যাবো।

জরিনা।          কোথায় , স্যার।

স্যার।             তোমাকে একটা কাজে লাগাবো। এ ভাবে বসে থাকা আর চলবে না।

জরিনা।          আমি কি আপনার ভার হয়ে দাঁড়িয়েছি, স্যার।

স্যার।             আরে না, না, পাগলী। সে কথা নয়। চুপচাপ থাকাটা তো জীবন নয়। সবার সংগে মিশতে হবে, হাসতে হবে, কথা বলতে হবে, কাজ করতে হবে, এটাই তো চাই । নইলে মনটা যে ভালো হবে না। চল, চল।

জরিনা।          কোথায় তাতো বললেন না? আবার কোনো মাস্টারি নয় তো?

স্যার।             না, এবার তুমি বিচারক। ওয়ান অব দি জাজ। বিশ্ব শিশু দিবসের জন্যে শিশু একাডেমীতে সারা দেশের ছেলেমেয়েদের গানের একটা প্রতিযোগিতা হচ্ছে। তার সিলেকশন বোর্ড আমাকে চীফ করে, আমি তোমার নাম ওয়ান অব দি জাজ হিসেবে সাজেস্ট  করছি। নাও, রেডি হও তো। কুইক।

জরিনা হেসে তৈরি হবার জন্যে ঘর থেকে বেরোয়।

 

দৃশ্য ৬৯

একাডেমীর একটা ঘর, দু’তিনজন বিচারক অপেক্ষা করছে, স্যার এবং জরিনা আসে। সবাই উঠে দাঁড়ায়। নীরবে সালাম বিনিময় হয়। একজন কর্মচারী স্যারকে বলে,

কর্মচারী।       আমাদের কিন্তু সব রেডি।

স্যার।             তাহলে আর বসে কি হবে? চলুন। যে ভাবে বলেছিলাম, অ্যারেনজ করেছেন তো?

কর্মচারী।       হাঁ, তাই-ই করা হয়েছে।

স্যার এগোতে এগোতে জরিনা  এবং অন্যান্য বিচারকদের বলে – বারান্দা পর্যন্ত টেনে নিতে হবে এই সংলাপ।

স্যার।             আমি আবার বাচ্চাদের মুখের বড় ভয় করি। মুখে দেখে মায়া পড়ে যায়, গান শুনে ভালো মন্দ বলতে পারি না তখন। তাই, আমার সিসটেম হচ্ছে, বাচ্চারা শাদা পর্দার আড়ালে একে একে গেয়ে যাবে, নাম বলবে না, চেহারা দেখব না, আমরা সবাই নোট করে যাব নম্বর। ব্যাস।

 

দৃশ্য ৭০

একটা হল ঘর। একদিকে শাদা পর্দা দিয়ে আড়াল করা। এদিকে কিছু সোফা আছে, সমুখে টেবিল কাগজ পেনসিল। সকলে এসে বসল। কাগজ কলম হাতে নিল।

কর্মচারী।       তাহলে শুরু করি স্যার।

স্যার।             হ্যাঁ, হ্যাঁ।

কর্মচারী ভেতরে, অর্থাৎ শাদা পর্দার আড়ালে চলে গেল। পর্দার ও পাশ থেকে শিশুদের গুঞ্জন। তারপর নীরব হয়ে গেল। কর্মচারীর কণ্ঠ পর্দার আড়াল থেকে শোনা গেল।

কর্মচারী।       এক নম্বর প্রতিযোগী।

পর্দার আড়াল থেকে গলা খাঁকারি দিয়ে বালক কণ্ঠ রবীন্দ্রনাথের ‘অনেক কথা যাও যে বলি কোনো কথা না বলি’- প্রথম তিন লাইন।

বিচারকেরা কাগজে নম্বর দিল।

কর্মচারী।       দু’নম্বর প্রতিযোগী।

পর্দার আড়াল থেকে বালিকা কণ্ঠ গেয়ে উঠল, “এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা সুরমা নদী তীরে”র প্রথম কয়েকটি লাইন।

বিচারকেরা নম্বর নোট করল।

কর্মচারী।       তিন নম্বর প্রতিযোগী।

একজন বিচারক স্যারের কানে কানে বলল,

বিচারক।       আপনার সিসটেমটা তো বেশ ভালো। পক্ষপাতিত্ব হবার কোনো চানসই নেই।

স্যার মৃদু হাসল।

পর্দার আড়াল থেকে বালক কণ্ঠে গান শোনা গেল, নজরুলের হাসির গান “হুলো রে তুই যখন তখন ঢুকিসনে হেঁসেল”-এর কয়েকটি লাইন।

সবাই এরও নম্বর নোট করে উৎসুক চোখে পর্দার দিকে তাকাল।

কর্মচারী। চার নম্বর প্রতিযোগী। …গাও না, ভয় কি, গেয়ে দাও, গেয়ে ফ্যালো।

পর্দার আড়াল থেকে এ কথা শুনে বিচারকেরা সস্নেহে হাসল।

হঠাৎ আড়াল থেকে গান ভেসে এলো, “রাত্রি তো নয় শুধু নিবিড় আঁধার, ওঠে চাঁদ, ফোটে তারা।’ প্রথম কয়েকটি শব্দের সংগে সংগে চমকে সোজা হয়ে বসল জরিনা। স্যার অবাক হয়ে এবার পর্দা একবার জরিনার দিকে তাকালো। “তার একটি তারার নাম ধ্রুবতারা”-র সময় উঠে দাঁড়াল জরিনা। স্যারও উঠে দাঁড়াল। বিচারকেরা মুখ চাওয়াচায়ি করতে লাগল। তখন শোনা যেতে লাগল, ‘কত পাখি উড়ে যায়, নিঃসীম নিলীমায়’- জরিনা পর্দার দিকে তাকিয়ে বিস্ফারিত চোখে উচ্চারণ করলে,

জরিনা।          ‘তুলি।’

কিন্তু তার কণ্ঠ আমাদের শোনার দরকার নেই। তার ঠোঁট নাড়া দেখেই আমরা টের পাই ‘তুলি’। জরিনা পর্দা তুলে ভেতরে ছুটে গেল- তখন গাওয়া হচ্ছিল “তার একটি পাখি আজ পাথহারা।”

ভেতরে গিয়ে ছুটে জড়িয়ে ধরল তুলিকে জরিনা, আদর করতে লাগল,

হসিনা।           তুলি, তুলি, আমার তুলি।

তুলি।              মাস্টার মা, মাস্টার মা, তুমি বেঁচে আছো?

জরিনা।          হ্যাঁ, তুলি, আমি বেঁচে আছি। তুমি কার সংগে এসেছ।

কাট। পাশে দাঁড়িয়ে আছে মহসিন। ক্লোজ আপ।

মহসিন।         আমার সংগে।

জরিনা চোখ তুলে তাকায়। কাট করে পরের দৃশ্যে যাই।

 

দৃশ্য ৭১

কাট করে আমরা মহসিনের ক্লোজ আপ ধরি। এবার সে স্যারের বাড়িতে ভেতরের ঘরে জরিনার মুখোমুখি বসে। এটা টু শট পরে প্রকাশ পাবে।

মহসিন।         আমি তুলির মামা, তুলির হতভাগী মায়ের আমি বড়ভাই, আমার নাম মহসিন।

এবার টু শট।

মহসিন।         তুলিকে নিয়ে ঢাকায় এসে এ ভাবে যে তোমার দেখা পাবো, আবার যে দেখতে পাবো তুমি বেঁচে আছ, আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। তোমার জন্যে তো জাহাংগীর এখন বেঁচে থেকেও মরে আছে, বোন।

জরিনা উঠে দাঁড়ায়।

জরিনা।          তার কথা আমাকে আপনি বলবেন না। সে কি ভাবে আছে, কেমন আছে, জানবার কোনো কৌতূহল আমার নেই।

জরিনা কিছু দূরে সরে যায়, পেছনে ফিরে দাঁড়িয়ে থাকে।

মহসিন এখনো বসেই আছে। বলছে,

মহসিন।         কিন্তু কিছু কথা তো তোমার জানা দরকার, বোন। একটা ভুলের জন্যে দুটো জীবন নষ্ট হয়ে যাবে?

মহসিনের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে জরিনার মিড শট- প্রায় ব্যাক টু ক্যামেরা। শেষ কথাটায় সে ঈষৎ মুখ আমাদের দিকে ফেরায়। তার ওপর ওভারল্যাপ হয়,

মহসিন।         আমি তোমাকে কয়েকটা কথা বলতে চাই, তাই তুলিকে ও ঘরে রেখে তোমাকে আলাদা আমি ডাকলাম।

ইনসার্ট- পাশের ঘরে, পিয়ানোয় তুলি স্যারের সংগে পিয়ানোয় রীড টিপে খেলা করছে। দু’জনের বেশ ভাব হয়ে গেছে।

আবার এ ঘরে ক্যামেরা। মহসিন উঠে দাঁড়িয়ে জরিনার দিকে এগোতে বলে- জরিনা সমুখে, মহসিনকে পেছনে থেকে তার পিঠের কাছ পর্যন্ত আসতে দেখা যায়।

মহসিন।         তুলির জীবন, তোমার জীবন, জাহাংগীরের জীবন, সব এক সুতোয় বাঁধা বলেই, চৌধুরী বাড়ির যে কথা এতদিন আমরা লুকিয়ে রেখেছি লজ্জায় ঘৃণায়, আজ তোমকে বলতে চাই।

জরিনা।          আমি তো শুনতে চাই না।

হাসিনা ঘুরে মহসিনের মুখোমুখি হয়।

জরিনা।          চৌধুরী বাড়ির সংগে আমার কোনো যোগ নেই।

জরিনা মহসিনকে অতিক্রম করে সোফার দিকে যায়। মহসিন তার দিকে ঘুরে দাড়িয়ে বলে,

মহসিন।         নেই? নিজের মনকে তুমি জিগ্যেস করে দ্যাখে, কোনো যোগ নেই?

মহসিন এবার জরিনার কাছে যায় দ্রুত।

মহসিন।         তাহলে আজ কেন তুমি তুলির গলা শুনে পাগলের মতো ছুটে গিয়েছিলে? বলো। উত্তর দাও।

জরিনা সোফায় বসে পড়ে। বলে,

জরিনা।          তুলি তো আমার কোনো ক্ষতি করেনি, তাই।

মহসিন এবার আবার তার সমুখে বসে পড়ে। বলে,

মহসিন।         আমার সব কথা তুমি শুনলে, তুমি বুঝবে, জাহাংগীরও তোমার কোনো ক্ষতি করতে চায়নি।

জরিনা।          কোনো লাভের আশাও আমি এখন আর করি না।

মহসিন।         যদি বলি, সে রাতে তুমি যাকে দেখেছিলে, সত্যি সত্যি সে জাহাংগীরের ভাবী?

জরিনার ওপর এবার ওভারল্যাপ হয়- জরিনা চকিত চোখ তুলে তাকায়।

মহসিন।         জাহাংগীর বড় ভাই তৈমুরের স্ত্রী সে, নুরজাহান।

মহসিনের ক্লোজ আপ।

মহসিন।         আমার বোন। তাহলে?

মহসিন উৎসুক হয়ে উত্তরের অপেক্ষা করে থাকে।

জরিনা।          আপনি মিথ্যে বলছেন, আপনি বানিয়ে বলছেন, আমি তার নিজের মুখে শুনেছি- সে জাহাংগীরের স্ত্রী।

মহসিন।         আর তুমি নিজেই তো দেখেছ, সে বদ্ধ উন্মাদ, তার কোনো জ্ঞান নেই, সে সুস্থ নয়। তবু তার কথাটাই বিশ্বাস করে তুমি বসে আছো?- বেশ, তাহলে তোমাকে, দেখাই একটা পুরানো ফটো, সবসময় আমার সংগেই থাকে, ওদের আমি ভালোবাসতাম, বিশ্বাস না হয়, এই দ্যাখো

বলতে বলতে মহসিন পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে একটা যুগল ফটো দেখায়।

ক্লোজ শট- ফটো। তার ওপর মহসিনের আঙুল আর কণ্ঠস্বর।

মহসিন।         এই আমার বোন নুরজাহান, যাকে সে রাতে তুমি দেখেছ, আর এই তৈমুর, যার কথা তুমি শুনেছ-

জরিনার ওপর মহসিন কথা ওভারল্যাপ।

মহসিন।         যে, সে মারা গেছে। আমি এখন তোমার কাছে প্রকাশ করছি, এবার টু শট।

মহসিন।         এ কথা পৃথিবীর কেউ জানে না, তৈমুর আসলে খুন হয়েছে, নুরজাহান তাকে খুন করেছে।

জরিনা যেন এখন বিশ্বাস হয় ফটো দেখার পর। কাহিনীতে এবার তার আগ্রহ দেখা যায়।

জরিনা।          তার নিজের স্ত্রী তাকে খুন করেছে?

মহসিন।         হ্যাঁ, আর তার জন্যে তৈমুরই দায়ী। সে বড় দুঃখের কাহিনী, সে বড় কষ্টের ইতিহাস। নুরজাহানের সংগে বিয়ের পরেও তৈমুরের বাইরে টান কমেনি। লজ্জা কথা কি বলব, বিয়ের কিছুদিন পরেইই বাড়িতে প্রকাশ্যেই সে ব্যাভিচার করতে থাকে। তুলি যখন পেটে, তৈমুর এক বাঈজিকে ঘরে এনে তোলে। তুলি হয়ে যাবার পর অবস্থা চরমে ওঠে আরো।

কাট করে আমারা ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যাই।

 

দৃশ্য ৭২

চৌধুরী বাড়ির একটি শোবার ঘর। দোলনায় শিশু। ঘরে টেবিল, ড্রয়ার, আলমারি, পুরনো ধরনের। তৈমুর মাতাল। সমুখে নুরজাহান। দেখে বোঝা যায় দু’জনে অনেকক্ষণ কথা কাটাকাটি হয়েছে।

তৈমুর।           আমি ওকে বিয়ে করব, এ বাড়ির বৌ করব। ইউ গেট আউট। নিকাল যাও।

নুরজাহান।     একটা বাঈজির জন্যে ঘরের বৌকে তুমি বেরিয়ে যেতে বলতে পারলে?

তৈমুর।           হ্যাঁ। চাইলে তালাকও নিয়ে যেতে পারো।

নুরজাহান।     কি, কি বললে তুমি? আমি তোমার মেয়ের মা।

তৈমুর।           তাতে কি, বাধা দিলে, ঐ মেয়েও তোমার আর থাকবে না।

নুরজাহান।     কি, কি করবে তুমি?

তৈমুর।           দেখবে, কি করব?

তৈমুর উন্মত্ত অবস্থায় দু’হাত সাঁড়াশির মতো করে দোলনার দিকে অগ্রসর হয়।

নুরজাহান।     না, না, না, না।

হা হা করে হাসে তৈমুর।

হঠাৎ ড্রয়ার খুলে পিস্তল টেনে নেয় নুরজাহান।

থেমে যায় তৈমুর।

নুরজাহান।     তার আগে তুমি শেষ হবে।

তৈমুর হা হা করে হেসে ওঠে, দোলনার দিকে এগোয়।

নুরজাহান পরপর গুলি করে।

জাহাংগীর ছুটে আসে ঘরে।

জাহাংগীর।    ভাবী?

হঠাৎ হাত থেকে পিস্তল পড়ে যায় নুরজাহানের। সে পাগলের মতো খিলখিল করে হেসে ওঠে। ক্যামেরা তার ওপর চার্জ করে।

ফ্ল্যাশব্যাক শেষ।

 

দৃশ্য ৭৩ (বস্তুত ৭১-এর অনুক্রম)

জরিনাকে মহসিন বলে যাচ্ছে কাহিনী। সোলো শট- মহসিন, ক্যামেরা ধীরে ধীরে পেছিয়ে দু’জনকে কম্পোজ করবে।

মহসিন।         বহু কষ্টে এ ঘটনা আমি আর জাহাংগীর ধামাচাপা দিই। সবাই জানল, তৈমুর হার্টফেল করে মারা গেছে, তার শোকে পাগল হয়ে গেছে নুরজাহান। জাহাংগীর তার ভাবীর কষ্ট জানত, বুঝত, তাকে সে এত ভালোবাসত, যে পাগলা গারদে পাছে তার কষ্ট হয়, তাই চৌধুরী বাড়িতে নিজের কাছেই রেখে দেয়, পেছনে একটা ঘরে, দুজন দাসী তার দেখাশোনা করত। দাসীদের ঘুমের সুযোগে কোনো কোনোদিন সে বেরিয়ে আসত। কেন জানো? জাহাংগীরকে খুন করতে।

জরিনা।          জাহাংগীরকে খুন করতে?

মহসিন।         হ্যাঁ, কারণ পাগল হয়ে যাবার পর জাহাংগীরকে সে তৈমুর বলে ভুল করত। নিজের হাতে তৈমুরকে গুলি করেও সে বুঝি বিশ্বাস করত না যে তৈমুর মরে গেছে। তার ধারণা ছিল, তৈমুর এখনো বেঁচে আছে, এখনো সে বাঈজি নিয়ে আছে, এখনো সে বাঈজিকে বিয়ে করতে চাইছে। এই রোগ এত বেশি হয়ে যায় যে, শেষদিকে আমি নিজেও দেখা করতে সাহস পেতাম না। তবু, লুকিয়ে লুকিয়ে বোনের টানে যেতাম। এক রাতে তো তার হাতে আহত হয়ে তোমার ঘরে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম, তোমার মনে নেই? এই জন্যেই তুলিকেও সাবধানে রাখতে হতো। তুলিকে জানতে দেয়া হয়নি যে তার মা খুনি, তার মা পাগল, তার মা চৌধুরী বাড়িতেই আছে। এমনকি, তুলি এখনো জানে না যে, তার মা আর নেই।

জরিনা।          নেই? মারা গেছে? সে মারা গেছে?

মহসিন।         হ্যাঁ, সে রাতেই সে মারা গেছে। হতভাগীর সব জ্বালা এতদিনে জুড়িয়েছে।

বলতে বলতে মহসিন নিজের চোখ মোছে।

কাট করে।  আমরা ফ্ল্যাশব্যাক দৃশ্যে যাই।

 

দৃশ্য ৭৪/ফ্ল্যাশব্যাক

 

আসলে দৃশ্য ৬৩-এর অনুক্রম এই ফ্যাশব্যাক অংশ।

আমরা এখানে শুরু করি ৬৩-এর শেষ শট রিপিট করে, যেখানে নুরজাহান ফুলদানি ছুঁড়ে মারল, জাহাংগীর পড়ে গেল বলতে বলতে ‘সমশের, ওকে যেতে দিস না, জ-রি-না।’

এখন থেকে নতুন শট শুরু হলো।

খিলখিল করে হেসে উঠল নুরজাহান।

নুরজাহান।     জরিনা, তোমার বাঈজির নাম জরিনা।

খিলখিল হাসি।

জাহাংগীর উঠে দাঁড়ায়।

জাহাংগীর।    ভাবী, ভাবী, তোমার ঘরে চলো, তোমার ঘরে চলো।

নুরজাহান।     কেন? এটা আমার ঘর নয়? এটা আমার বাড়ি নয়? আমাকে তাড়িয়ে দিতে চাও? পারবে না, পারবে না, তুমি পারবে না। আর আমাকে আটকে রাখতে পারবে না। আজ আমি ছাড়া পেয়েছি, আজ আমি ওকে তাড়িয়ে দিয়েছি, আজ আমার আনন্দ, আজ আমার আনন্দ।

বলতে বলতে নুরজাহান ঘর থেকে পাগলের মতো ছুটে বেরোয়।

জাহাংগীর।    ভাবী, ভাবী।

জাহাংগীর তার পেছনে ছোটে।

 

দৃশ্য ৭৫/ ফ্ল্যাশব্যাক

লম্বা বারান্দা দিয়ে দৌড়ে যায় নুরজাহান হাসতে হাসতে। জাহাংগীর তাকে ধরবার  জন্য  ছোটে।

জাহাংগীর। ভাবী, কোথায় যাচ্ছ ভাবী?

ঘুরে দাঁড়ায় নুরজাহান।

নুরজাহান।     ভাবী? লজ্জা করে না?

বলে সে নূপুর খুলে ছুঁড়ে মারে। জাহাংগীরের চোখে গিয়ে লাগে। আর্তনাদ করে ওঠে সে। তার চোখ ধরে সে আধো বসে পড়ে।

খিলখিল করে হাসতে হাসতে নুরজাহান তেতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায়।

জাহাংগীর চোখ থেকে হাত সরায়। রক্ত পড়ছে। চোখে সে ভালো করে দেখতে পাচ্ছে না। তবু টলতে টলতে সে চারদিক অনুসন্ধান করে। আর চিৎকার করে ডাকে,

জাহাংগীর।    ভাবী, ভাবী।

বাড়ির আরো কয়েকটি বারান্দায় জাহাংগীর খুঁজে ফেরে। তারপর এ সময় সিঁড়ির কাছে যায়।

 

দৃশ্য ৭৬/ ফ্ল্যাশব্যাক

তেতলার ছাদে, পূর্ণিমার চাঁদের নিচে উন্মাদিনী নুরজাহান, এক পায়ে তার নূপুর, সে দু’হাত মেলে নাচে আর হাসে, আর কখনো তাতাথেই থেই বলে।

একসময় জাহাংগীর সিঁড়ির মুখে উদিত হয়। সে পাগলের নাচ দেখতে পায়।

জাহাংগীর।    ভাবী, সরে এসো ভাবী, পড়ে যাবে, ওদিকে ভাঙা, যেও না, ভাবী।

নুরজাহান হঠাৎ আরেক পায়ের নূপুর খুলে জাহাংগীরকে ছুড়ে মারে। ভীষণ আর্তনাদ করে দু’চোখ চেপে ধরে সে বসে পড়ে।

নুরজাহান খিলখিল করে হেসে উঠে আবার দু’হাত মেলে পাক দেয়। তারপর হঠাৎ সে নিচে পড়ে যায়। জাহাংগীর দু’চোখ ধরে অন্ধের মতো ডাকে,

জাহাংগীর।    ভাবী, তুমি কোথায়।

কাট করে নিচে, ঘাসের ওপর আমরা ক্লোজ আপ দেখাই- মরে পড়ে  আছে নুরজাহান।

 

দৃশ্য ৭৭(বস্তুত দৃশ্য ৭১-এর অনুক্রম)

জরিনাকে কাহিনী বলছে মহসিন। মহসিনের ওপর থেকে ক্যামেরা পিছিয়ে এসে দু’জনকে ধরবে পরে।

মহসিন।         আর জাহাংগীর- সে…

জরিনা।          কি হয়েছে তার? তার কি হয়েছে, মহসিন ভাই?

মহসিন।         সে তার দৃষ্টি হারিয়েছে।

জরিনা।          অন্ধ হয়ে গেছে?

মহসিন।         হ্যাঁ, তার চোখে ভীষণ আঘাত লেগেছিল, চিকিৎসা করলে হয়ত ভালো হতো, ডাক্তারও বলেছিল, কিন্তু সে চিকিৎসা করতে চায় না। একটা ওষুধ পর্যন্ত লাগাতে দেয় না। সারাদিন সে তেতলার কাঁচঘরে সমস্ত পর্দা টেনে দিয়ে বসে থাকে । কারো সংগে দেখা পর্যন্ত করে না।

জরিনা উঠে দাঁড়ায়।

জরিনা। আমি যাবো, আমি তার কাছে যাবো।

 

দৃশ্য ৭৮

চৌধুরীর বাড়ির সদর দরোজার মুখে। যেন দরোজা খুলেই লুৎফার মা দেখতে পেয়েছে জরিনাকে।

লুৎফার মা।   আপনি? মাস্টার আপা, আপনি?

সে বিশ্বাসই করতে পারে না যে সত্যি তাকে সে দেখছে।

জরিনা তার কাছে আসে।

জরিনা।          হ্যাঁ, আমি। আমি মরিনি লুৎফার মা। আমি ফিরে এসেছি। কোথায় সে? আমাকে তার কাছে নিয়ে চলো।

বলতে বলতে জরিনা ভেতরে যায়।

দৃশ্য ৭৯

ড্রয়িং রুম। জরিনার পেছন পেছন লুৎফার মা এসে ঢোকে। জরিনা চারদিক তাকায়।

জরিনা।          আমি তার কাছে যেতে চাই।

লুৎফার মা।   আপনাকেই তাঁর এখন সবচেয়ে দরকার, মাস্টার আপা। আল্লার কাছে কত কেঁদেছি, কত মোনাজাত করেছি, তাই তিনি আপনাকে আজ ফিরিয়ে এনেছেন।

বলতে বলতে লুৎফার মা জরিনাকে পথ দেখিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায়।

 

দৃশ্য ৮০

দোতলার বারান্দায় হেঁটে যায় লুৎফার মা আর জরিনা।

লুৎফার মা।   আমরা তো সবাই মনে করছি, আপনি বেঁচে নেই। সাহেব তাঁর চোখের চিকিৎসা পর্যন্ত করাতে চান না। বলেন, কি হবে আমার চোখ ফিরে পেয়ে? ভালো করে আজ একটা মাস তিনি কিছু খানওনি।

বলতে বলতে তেতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায় ওরা।

 

দৃশ্য ৮১

তেতলার ছাদ। শেষ মাথায় কাচঘর, ভেতর থেকে পর্দায় ঢাকা। একজন দাসী ট্রেতে করে একগ্লাশ দুধ আর এক  গেলাশ পানি কাচঘরে থেকে নিয়ে আসছিল। লুৎফার মা  আর জরিনা সিঁড়ির দরোজা দিয়ে উঠে আসতেই তাকে দেখতে পেল। লুৎফার মা দাসীকে জিগ্যেস করল,

লুৎফার মা।   খেলেন না?

দাসী জরিনাকে দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল, জবাব দিতে পারল না।

লুৎফার মা।   ফিরিয়ে দিলেন?

জরিনা।          আমাকে দাও।

জরিনা ট্রে হাতে করে এগিয়ে গেল।

লুৎফার মাকে দাসী এক্ষণে বিস্ফারিত চোখে চাপাস্বরে প্রশ্ন করল,

দাসী।              মাস্টার আপা মরে নাই?

 

দৃশ্য ৮২

কাচঘর। চার দেয়ালই কাচের তৈরী। তবে এখন পর্দা টেনে ছায়া ছায়া অন্ধকার। সেখানে একটা বিছানা আছে, টুকিটাকি কিছু আসবাব, আর একটা সেকেলে গাদি আঁটা আরাম চেয়ার। সেই চেয়ারে পা লম্বা করে, বুক পর্যন্ত কম্বলে ঢেকে শুয়ে আছে জাহাংগীর। তার চোখে কালো চশমা। সে ঘুমিয়ে না জেগে, বোঝা যায় না।

নিঃশব্দে ট্রে হাতে জরিনা এসে ঢোকে।

জরিনার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে জাহাংগীর, প্রায় ব্যাক টু ক্যামেরা। ধরে সার্কুলার প্যান করে জাহাংগীরকে প্রোফাইলে ধরা হয়। নিঃশব্দে জরিনা ফ্রেমে ঢুকে ট্রে রাখে পাশে টেবিলের ওপর। টুক করে শব্দ হতেই জাহাংগীর ঈষৎ নড়ে ওঠে। জরিনা দুধের গেলাশ হাতে নেয়।

জাহাংগীর।    বললাম খাবো না,  আবার কেন এনেছ?

জরিনার ক্লোজ আপ। চোখ জলে টলটল করছে তার ওপর ওভারল্যাপ হয়।

জাহাংগীর।    যাও, ফিরিয়ে নিয়ে যাও।

টু শট।             জাহাংগীর জরিনার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে, পিঠ একটু উঁচু করে।

জাহাংগীর।    কতবার বলছি, আমাকে কেউ বিরক্ত করবে না, আমার কাছে কেউ আসবে না, কেন আসো তোমরা?

আবার পিঠ চেয়ারে পেতে দিয়ে জাহাংগীর লম্বা হয়। একটু পর বলে,

জাহাংগীর।    গিয়েছ?

উত্তর না পেয়ে সে ধরে নেয় দাসী চলে গেছে। সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

নীরব ক্লোজ আপ- জরিনা। তার চোখ বেয়ে জল পড়ছে। হঠাৎ একটা ফোঁপানি বেরিয়ে আসে।

চমকে ওঠে জাহাংগীর।

জাহাংগীর।    কে?

জরিনা তাড়াতাড়ি চোখ মুছে নেয়।

জাহাংগীর।    জবাব দাও। ঘরে কে?

উঠে দাঁড়ায় জাহাংগীর। হাত বাড়ায় অনুভব করবার জন্যে।

জাহাংগীর।    কে তুমি?

হঠাৎ জাহাংগীরের হাত জরিনার হাতে ধরা দুধের গেলাশে ঠেকে যায়।

জাহাংগীর আচমকা গেলাশটা আঁকড়ে ধরেই, বুঝতে পেরে, ছেড়ে দেয়।

জরিনা এই প্রথম কথা বলে, কান্না জড়িত গলায়,

জরিনা।          খেয়ে নাও।

বিগ ক্লোজ আপ-  জাহাংগীর। সে একবার দু’হাত দিয়ে চোখের চশমা ধরে, যেন খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে।

জাহাংগীর।    তুমি? তোমার স্বর?

মিড লং শট- সোলো জাহাংগীর। পিছিয়ে যেতে যেতে বলে,

জাহাংগীর।    না, না, এ হতে পারে না, এ কি করে হয়? আমি স্বপ্ন দেখছি, আমি ভুল শুনছি।

আবার জাহাংগীর এগিয়ে আসে সমুখে দু’হাত ব্যাকুলভাবে প্রসারিত করে, আকুলি-বিকুলি সন্ধান করতে করতে,

জাহাংগীর।    সে তো আমাকে অবিশ্বাস করেছে, সে তো আমাকে ভুল বুঝেছে, সে তো আমাকে ফেলে চলে গেছে। সে তো মরে গেছে।

জাহাংগীর হঠাৎ জরিনার হাত নিজের হাতের ভেতর পায়। খপ করে তা ধরে সে।

জাহাংগীর।    একি? না। না। হ্যাঁ। এই তো তার হাত। তার আঙুল। তার মুখ। তার চুল। এই তো সে।

বলে জড়িয়ে ধরে তাকে জাহাংগীর।

জাহাংগীর।    তুমি বলো, তুমি কিছু বলো, আমি যে বিশ্বাস করতে পারছি না, তুমি।

জরিনা।          হ্যাঁ, আমি, জরিনা।

জাহাংগীর।    আমার জরিনা?

জরিনা।          হ্যাঁ, তোমার জরিনা।

জাহাংগীর।    তুমি মায়া নও? ছলনা নও? আমার দুঃখী হৃদয়ের অসুস্থ মনের কল্পনা নও?

প্রত্যেকবার জরিনা মৃদুস্বরে বলবে কান্নাভেজা গলায় ‘না, না, না।’

জাহাংগীর। তুমি সত্যি? তুমি বাস্তব? তুমি বেঁচে আছো?

প্রত্যেকবার জরিনা কান্নাভেজা গলায় বলবে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ।’

জরিনা।          আমি সব শুনেছি, আমি সব শুনেছি, আমি ফিরে এসেছি।

জাহাংগীর।    কিন্তু আমি যে তোমাকে আর দেখতে পাবো না।

জরিনা।          কেন পাবে না? তোমার প্রেম যদি সত্যি হয়, আমার ভালোবাসা যদি মিথ্যে না হয়, আবার তুমি তোমার দৃষ্টি ফিরে পাবে। আবার তুমি এই অন্ধকার থেকে অলোয় বেরুবে।

 

দৃশ্য ৮৩

চৌধুরী বাড়ির বাগান।

প্রথম শট- সোজা সূর্যের ওপর। চারদিকে চোখ ধাঁধানো রশ্মি ছড়িয়ে পড়ে। ক্লোজ আপ-জাহাংগীর। পরের শটে দেখা যায় জরিনা জাহাংগীরকে ধরে বাগানে আসছে। জাহাংগীর মাঝে মাঝেই আকাশের দিকে ঈষৎ চোখে তুলে তাকাচ্ছে।

জরিনা।          তোমার চিকিৎসার সব ব্যবস্থা আমি করেছি। ঢাকা থেকে ডাক্তার আসছেন।

জাহাংগীর।    আমি কি ভালো হতে পরব?

জরিনা।          আমি জানি, তুমি ভালো হবে।

জাহাংগীর।    আমি কি আবার তোমাকে দেখতে পাবো?

জরিনা।          আমি জানি আমার ভালোবাসা মিথ্যে নয়।

জাহাংগীর।    এখন কি সকাল।

জরিনা।          হ্যাঁ।

জাহাংগীর চশমায় হাত দেয়।

জাহাংগীর।    খুব রোদ?

জরিনা।          হ্যাঁ।

জাহাংগীর চশমা খোলে, চোখ কুঞ্চিত করে আকাশের দিকে তাকায়।

জাহাংগীর।    জরিনা, জরিনা, আমার যেন মনে হয়, আমি একটা আলো দেখতে পাচ্ছি। খুব অস্পষ্ট, খুব ক্ষীণ। আলো, আলো, আলো।

চিৎকার করে ওঠে জাহাংগীর।

তারপরই সে দু’হাতে  চোখ চেপে ধরে আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ে, জরিনা তাকে ধরে ফেলে।

জাহাংগীর।    আন্ধকার, সব অন্ধকার।

জাহাংগীর ডুকরে কেঁদে ওঠে।

 

দৃশ্য ৮৪

জাহাংগীর অচেতন শুয়ে আছে। একজন ডাক্তার ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছে তার চোখে। তারপর সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। দেখলাম, পাশেই আছে জরিনা। তাকে সে বলল,

ডাক্তার।         দু’সপ্তাহ পরে ব্যান্ডেজ খুলবেন। মনে হয়, আশা আছে। ব্যান্ডেজ খোলার পর যদি কিছু না হয়, তাহলে… তাহলে…

জরিনা।          তাহলে কি? কি তাহলে, ডাক্তার সাহেব? তাহলে কি চিরদিনের মতো সে অন্ধ থেকে যাবে?

ডাক্তার চোখ নামিয়ে নেয়

জরিনার চোখ দিয়ে অঝোরধারায় নিঃশব্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

 

দৃশ্য ৮৫

তেতলার কাচঘর। শুয়ে আছে জাহাংগীর। পাশে সেবারত জরিনা। জাহাংগীরের চোখ ব্যান্ডেজ বাঁধা ।

জাহাংগীর।    অন্ধকার, সব অন্ধকার।

জরিনা।          না। আমার প্রেম, যদি সত্যি হয়, সব অন্ধকার নয়।

জাহাংগীর।    তুমি সত্যি আমাকে ভালোবাসো? সত্যি কি তোমার ভালোবাসা আমি পেয়েছি? আমার যে কেবলি মনে হয়, তুমি মায়া, এ স্বপ্ন, তুমি আবার চলে যাবে, আর আমি এক অনন্ত অসীম শূন্যতা নীরবতা আর আঁধারের ভেতর পড়ে থাকবে। আমার জীবনে আঁধারই কেবল সত্যি হয়ে থাকবে।

জরিনা।          না। না।

জাহাংগীরের হাত জরিনা আঁকড়ে ধরে।

ক্লোজ আপ- হাত।

তার ওপরেই সেই প্রথম গান জরিনার কণ্ঠে শুরু হয়-

“রাত্রি তো নয় শুধু, নিবিড় আঁধার, ওঠে চাঁদ, ফোটে তারা

তার একটি তারার নাম ধ্রুব তারা…”

এই গানের ভেতর আমরা মন্তাজ করে সময়ের অতিবাহান দেখাব, এবং গানটি বাড়ির বিভিন্ন স্থানে চিত্রয়িত হবে- বাগান, ড্রয়িং রুম, প্রকৃতি।

 

দৃশ্য ৮৬

তেতলার কাচঘর।

গানের শেষ পর্যায়ে আমরা দেখব, ডাক্তার চোখের ব্যান্ডেজ খুলছে। এই অংশে কেবল সুরটা শোনা যাবে পিয়নোয়। ডাক্তার যখন খুলছে।, তখন জাহাংগীর বলে,

জাহাংগীর।    জরিনা, তুমি আমার সমুখে দাঁড়াও, চোখ ফিরে পেয়ে আমি তোমাকে ফিরে পেতে চাই। তুমি কোথায়? তুমি কোথায়?

জরিনা।          তোমার কাছে। তোমার সমুখে।

ব্যান্ডেজ খোলা হয়। জাহাংগীর চোখ মিটমিট করে। ক্লোজ আপ- জরিনা। ক্লোজ আপ- ডাক্তার।

জাহাংগীর।    অন্ধকার, সব অন্ধকার।

ডাক্তার হতাশ হয়।

জরিনার চোখে অশ্রু এসে যায়।

জরিনা।          না। না।

ডাক্তার।         আপনি চেষ্টা করুন, চেষ্টা করুন।

জাহাংগীর।    তবু অন্ধকার।

জরিনা।          না।

ডাক্তার।         পর্দাগুলো খুলে দিন। আলো আসুক।

জরিনা একটা একটা করে পর্দার সরিয়ে দেয়, ধাপে ধাপে আলো এসে ঘরে ভরে দেয়।

আর প্রতিবার একটি করে পর্দা টানার সংগে সংগে জাহাংগীরের ওপর আরো বেশি আলো পড়তে থাকে। আর সে প্রথম মাথা নাড়ে, বলতে থকে,

জাহাংগীর।    না, আমি যে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না, অন্ধকার, জরিনা।

তারপর অর্ধেকের বেশি পর্দা সরানো হয়ে যেতেই জাহাংগীর থমকে যায়।

ডাক্তার।         কি? দেখতে পাচ্ছেন?

জাহাংগীর।    একটা…অস্পষ্ট…আলো।

তখন পাগলের মতো বাকি পর্দাগুলো সরাতে থাকে জরিনা।

আর জাহাংগীর আশান্বিত হয়ে উঠে বসে, উঠে দাঁড়ায়, হাত বাড়িয়ে দেয়।

তার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকেÑ অস্পষ্ট জরিনা, ক্রমশ স্পষ্ট হয়। সে দেখতে পায় জরিনাকে।

জাাহাংগীর।        জরিনা। আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি, আমি তোমাকে আবার দেখতে পাচ্ছি।

জাহাংগীর ছুটে যায় জরিনার কাছে।

ডাক্তার হেসে বেরিয়ে যায়।

জাহাংগীর।    তুমি মায়া নও, স্বপ্ন নও, তুমি সত্যি,- তুমি কি সুন্দর।

জাহাংগীর জড়িয়ে ধরে জরিনাকে। জরিনার অশ্রু আর আনন্দ মেশামেশি হয়ে যায়।

কেটে আমরা দেখি দরোজার কাছে স্যার, তার সংগে তুলি আর মহসিন।

স্যার।             বিয়েতে আসব বলেছিলাম সেবার, তা দেখছি রাইট টাইমেই এসে গেছি। লজ্জা পেয়ে জরিনা ছেড়ে দেয় জাহাংগীরকে। তুলি ছুটে যায় তাদের দিকে।

এদিকে স্যারকে মহসিন বলে,

মহসিন।         এ সুখবরটাও দিয়ে দিন, যে, প্রতিযোগীতায় তুলি ফার্স্ট হয়েছে।

ওদিকে, তুলিকে কোলে নিতেই জরিনাকে সব বলে,

তুলি।              তুমি আবার মরে যাবে না তো, মাস্টার মা?

জরিনা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। পাশে জাহাংগীর।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares