গল্প : অসুখের সুখ : মাহবুব ময়ূখ রিশাদ

গল্প

অসুখের সুখ

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ

বাতাসের ডাকে, বজ্রপাতের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় আমার। বাইরে ঝড় হচ্ছে। থরথর করে কাঁপছে থাই গ্লাস। প্রকৃতি যেন মাতাল হয়ে আছে। বছরের এই সময় ঝড় হওয়াটাই বরং স্বাভাবিক, কিন্তু এই বদ্ধ ঘর- যেখানে একবার ঢুকলে মনে হয়, কোনও এক অতল গহবরে এসে গেছি, বের হবার রাস্তা নেই, অক্সিজেন নেই, কারেন্ট ছাড়া আলো নেই- সেখানে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় পৃথিবীর শব্দ শোনা যাচ্ছে ঘরে বসেই- সে শব্দ এতটাই প্রখর ও তীব্র যে আমি জেগে উঠে তাকিয়ে থাকি অন্ধকারে। ঘটনাটি বিস্ময়কর বটে। আমাদের বিস্মিত হবার সুযোগ কিংবা ক্ষমতা এতটাই কমে গেছে যে, ঘরে থাকা অবস্থায় ঝড় টের পেলেও অবাক হতে হয়। অজান্তেই হাসি চলে আসে।

এই যে জান্নাত, মাসখানেক আগে আমাকে ছেড়ে চলে গেল, সেটা কি কম বিস্ময়ের ছিল?- তাও তো অবাক হইনি। সমস্যার সূত্রপাত মাসছয়েক আগে। বাসার অমতেই বিয়ে করতে হয়েছিল। আমি যে টুকটাক লেখালেখি করি এতে ওর পরিবারের আপত্তি ছিল। যদিও জান্নাতের বাবা আকারে-ইঙ্গিতে বলতে চেয়েছিলেন যে ছেলের চালচুলো নেই, ফ্যামিলিও তো টেকে না আমাদের সামনে। মূলত বাংলা সিনেমায় যা দেখে থাকি আমরা, তার থেকে ব্যতিক্রম কিছু তিনি বলেননি। আমি যে একেবারে বিয়ের জন্য পাগল ছিলাম তাও নয়। কিন্তু কেন জানি জিদ চেপে গিয়েছিল। সুতরাং সিনেমাটিক স্টাইলে বিয়ে করলাম আমরা।

দুজনের অফিস গেন্ডারিয়ায়- ধূপখোলা মাঠের পাশে, একটি তেলের ফ্যাক্টরিতে। বহু খুঁজে সস্তা একটা বাসা পেলাম সূত্রাপুর এলাকায়, মিলব্যারাক পুলিশ ফাঁড়ি থেকে কিছুদূর সামনে। প্রায় দশ থেকে বারোটা বিরানি-তেহারির দোকান পার হয়ে যেতে হয়। ছোট একটা গোলচত্বর। তার ঠিক সামনে বড় একটা গর্ত। প্রায়ই রিকশার চাকা, এমনকি মানুষও ধুমধাম সেই গর্তে বেখেয়ালে পা রাখছে। বৃষ্টি না থাকলে সমস্যা নেই কিন্তু বৃষ্টি হলে পানি জমে থাকে, তাই গর্তের পানিতে কেউ আলোড়ন তুললে আশপাশে দাঁড়ানো মানুষের জন্য তা বিপদের কারণ হয়ে যায়। একদিক দিয়ে ভালো হয়তো ডেংগু জ্বরের মাতা এডিস মশার জমাট পানিতে বংশবৃদ্ধি স্বস্তিকর হয় না।

নিশ্চয় এখানে ডেংগু জ্বর কম হয়? কার কাছে যেন জানতে চেয়েছিলাম। এমন অবাক চোখে তাকিয়েছিল, আর তেমন কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস পাইনি। তবে, জান্নাতকে বলেছিলাম- এখানে থাকলে অসুখবিসুখ কম হবে, বুঝলে?  ইশারা দিয়ে আমাকে তেহারির দোকানগুলো দেখিয়েছিল সে। বলেছিল, জ্বর নাহয় হলো না, হার্ট বাঁচাবে কী করে?

হাসতে হাসতে বলেছিলাম, হার্ট কি আদৌ বেঁচে আছে?

জায়গাটা খোলামেলা ছিল। রিকশার জ্যাম বাদে বিরক্তি লাগার মতো কোনোকিছু দেখিনি। দুদিন পর মনোহর একটা ব্যাপার খেয়াল করি। এখানে মফস্বলের আমেজ আছে। টের পাওয়া যায়। সন্ধ্যার পর দেখা যায় এলাকার মুরুব্বীরা চা খেতে খেতে হৈ হৈ করে আড্ডা দিচ্ছে। তাদের থেকে দূরে অন্ধকার কোনো এক টং দোকানের সামনে মহল্লার তরুণেরা বিড়ি ফুঁকছে। ভালো লেগেছিল বিষয়টি- প্রাণের ছোঁয়া পাওয়া যায়।

ধূপখোলা মাঠটিও বিশাল। আমাদের অফিসের পাশেই। মাঠে যাওয়া হয়েছে দুএকবার। এত বড় মাঠ, অথচ একরত্তি ঘাস নেই। দিনের বেলা  পালাক্রমে মাঠের একপাশে ফুটবল, অন্যপাশে ক্রিকেট চলতেই থাকে। ভোরে দেখা মেলে মধ্য-বয়স্ক চাচা-মামাদের- বিশাল বপু বাগিয়ে হাঁটায় ব্যস্ত। গভীর রাতে, মাঠের দখল চলে যায় নেশাতাড়িত মানুষের হাতে। মাঠের চারপাশ জুড়ে স্ট্রিট ফুডের পসরা। মানুষের কোনো বিরাম নেই। আমি আর জান্নাত ফুচকাও খেয়েছিলাম সেখানে।

জান্নাতকে বলেছিলাম, ‘ফুচকার ভেতরেও কেমন কাচ্চির গন্ধ?’

জান্নাত হেসেছিল। আমাদের জীবনের ভেতরকার সব গন্ধ যে কোথায় হারালো!

সদরঘাট লঞ্চ যখন ভেঁপু বাজিয়ে সন্ধ্যার পর ঢাকা ছেড়ে যায় আমরা দুজনেই তখন বাসায় ফিরতাম। মন্দ চলছিল না। কিন্তু এডভান্সের টাকা গচ্চা দিয়েই বাসা ছাড়তে হয়েছিল। অফিস ট্রান্সফার হয়ে গেল কলাবাগানে। ঢাকার কি আর ঐ দিন আছে, যে প্রতিদিন কলাবাগান থেকে গেন্ডারিয়া- সময়মতো অফিস করা যাবে?

আমরা চলে এলাম এখানে- এই বদ্ধ ঘরে, যেখান থেকে আকাশ দেখা যায় না।  জান্নাত-ই একদিন দুই বিল্ডিং-এর মাঝে আকাশ আবিষ্কার করেছিল।

এক সকালে আমাকে চিঠি লিখে চলে গেল সে; নাম জান্নাত হলেও আমাদের সংসারে কিংবা তার ব্যক্তিগত জীবনেও তেমন কোনো বেহেশতের হাওয়া ছিল না। সুতরাং তার চিঠি হাতে নিয়ে আমার তেমন ভাবান্তর হলো না। শুধু শুধু স¤পর্কটা ঝুলিয়ে রাখার পক্ষপাতি ছিলাম না আমিও। তাছাড়া একজন লেখককে যেমন বিয়ে করতে নেই, তেমনই লেখকেরও উচিত না বিয়ে করাÑ এই ভাবনা আমি লালন করি ভেতরে, বাস্তবে রূপ দেয়ার মতো যে শিল্পী হয়ে উঠতে পারিনি সে নিজেকে দেখেই বুঝতে পারি। এটাকে এক ধরনের কাপুরুষতা বলা যায় হয়তো, কিন্তু তাতে আমার কিছু যায় আসে না।

চিঠি পড়া শেষ হবার পর সেদিনই আকাশটা আবিষ্কার করি আমি।  বিস্ময় চিহ্নের আকৃতি নিয়ে এক টুকরো সুতোর মতো একটি মেঘখ- ঝুলছে; কিন্তু ঐ পর্যন্তই, সে মেঘ থেকে বৃষ্টি হয় কিনা, ভোরের আলো সানসেটে এসে পড়ে কিনা- তা আর জানা হয়নি।

আজ বজ্রপাত ও বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাঙলে বহুদিন পর বড় ভালো লাগে আমার। হয়তো ঐ মেঘখন্ড থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে, বিজলি চমকাচ্ছে আর আলোকণা বুকের ঠিক মাঝ বরাবর একটা রাস্তা বের করে পাতালে চলে যাচ্ছে; বেঁচে থাকার ব্যাপারটি একেবারে মন্দ নয় তাহলে। যদি সত্যি সত্যি এভাবে দ্বিখণ্ডিত করে যেত আমার শরীরকে খারাপ কি হতো? ধুঁকে ধুঁকে একা বেঁচে থাকার অবসান হতো; আসলেই কি তাই? মৃত্যুর পর যে লোনলিনেস থাকবে না, তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। নরকেই তো যাব, চিরকাল নরকেই যেতে চেয়েছি, পুড়তে চেয়েছি- কিন্তু যদি সেখানেও ভালো না লাগে?

এইসব দ্বিধার ভেতরেই বেড়ে ওঠা আমার। জান্নাত যে চিঠি লিখে চলে গেল, জানিয়ে দিল ডিভোর্স লেটার পাঠাবে দ্রুতই, অথচ তার চলে যাওয়ার দুই কি তিন ঘণ্টা আগেও আমি ভাবছিলাম, মুক্তি দিই তাকে। অথচ সে কি আমাকে প্রতারক ভাববে?- এই ভাবনাটা আমাকে আর এগোতে দেয়নি।

গড়িয়ে গড়িয়ে সকাল পার হয়। উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। পাশের বাসার বারান্দা একেবারে ঘর-লাগোয়া। চাই কি হাত বাড়িয়ে শুকাতে দেয়া কাপড়ও নিয়ে আসা যাবে। প্রতিদিন এই সময়ে  বাড়ির বারান্দায় আমাদের মতো এক কাপ্ল্কে দেখতে পাই- দাঁতব্রাশ করে, হাতে থাকে চায়ের কাপ, ছেলেটির মুখে সিগারেট ধরাতেই মেয়েটি ভেতরে চলে যায়- এক মাস ধরেই দেখছি, ব্যতিক্রম নেই- আজ তো বৃষ্টি হলো, অথচ তারপরেও দেখতে পেলাম তাদেরকে। জানালাটা খুলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে এলাম। বেশ ভালো ঝড় হয়েছে, অথচ তারপরেও ভেজা মাটির গন্ধ নেই। এই বাসা কিংবা বাসার আশপাশে কোথাও কি এক টুকরো মাটি নেই?

বাসা থেকে বের হই না একদম। জান্নাতের বিদায়ের সাতদিন পর আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। ভালো লাগছিল না- এর চাইতে বড় কারণ আর থাকতে পারে না। লেখক হতে এসেছিলাম এই শহরে। কয়েকটা বই বের হয়েছে। কিন্তু আসলে কি লিখছি আমি? জান্নাতের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে হতো খুব, কিন্তু ওর এসবে আগ্রহ ছিল না। বিয়ের আগে ভেবেছিলাম, আগ্রহ না থাকলেই ভালো- নিজের মতো থাকা যাবে। অথচ ক্লেদাক্ত নাগরিক জীবনের বাইরে যে আমিই কিছুই লিখতে পারছি না , এ-অক্ষমতা কার সঙ্গে শুধোই?

ভেতরে ভেতরে মারা যাচ্ছি আমি। জান্নাতের থাকা না-থাকায় অবস্থা বদলায়নি। শুধু কি আমি? ঐ যে কাপ্ল্টা প্রতিদিন ঠিক একভাবে বারান্দায় আসে, একভাবে সিগারেট ধরায়, নিশ্চয় একভাবেই অফিসে যায়- ওরা কি বেঁচে আছে? কিংবা পাশের বাসার একমাত্র চেনা প্রতিবেশি দাদু- উনিও কি বেঁচে আছেন? বাসায় ফিরলেই তাকে দেখতে পাই, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে যে সরু, করিডর আছে- সেখানে হুইল চেয়ারে বসে আছেন। চেয়ার নিজে টানতে পারেন না তিনি। হাত দুটো ঝুলে থাকে চাকার ঠিক পাশে। বোঝা যায় শক্তি হারিয়েছেন এতটাই, যে নিজের হাতের ভার আর বহন করতে পারছেন না। সেজন্য তারচেয়েও গোমড়ামুখের এক কিশোরি, কখনও-সখনও তাঁর সন্তানদের কেউ পেছনে দাঁড়িয়ে নিরাসক্ত ভঙ্গিমায় হুইল-চেয়ার টেনে তাকে করিডর ভ্রমণ করায়। গত এক বছরে সর্বোচ্চ দুই কি তিনদিন আমি এর ব্যতিক্রম হতে দেখেছি।  দাদু বলেই ওনাকে ডাকা হয়। অবশ্য খুব একটা কথোপকথন হয় না। সালাম দেয়া, কেমন আছেন- এইসব সাধারণ কথাবার্তার উত্তর তিনি মাথা কাত করেই দেন এবং সবসময় মাথাটি বাম দিকেই কাত করেন, হাতের যে অল্পকিছু নাড়াচাড়া দেখা যায়, সেটাও সেই বামদিকেই। তার মানে স্ট্রোক করেছিলেন এবং তারপর থেকেই এমন হয়ে পড়েছেন। এর চাইতে বেশি মাথা ঘামানোর প্রয়োজন পড়েনি। বরং এতটুকু যে দেখেছি, খেয়াল করেছি তাই তো বেশি।

একদিন জান্নাতকে বলেছিলাম, ‘মানুষটার জীবন কি দেখেছ? হয়তো সারাদিনের ভেতর এই যে তিনি করিডরে আসেন, এটাই তার রিলাক্সেশনের একমাত্র উপায়।’

জান্নাত বলেছিল, ‘তোমার রিলাক্সেশনের উপায় নেই কোনও? এমন কেউ নেই, যাকে দেখলে শান্তি পাবে? ’

আক্রমণটা এভাবে আচমকা আসবে ভাবতে পারিনি আমি। তাই চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। সচরাচর আমরা ঝগড়া করি না। দুজনেই খুব ঠান্ডা মেজাজের মানুষ। আমার অবহেলায় যখন সে গুমরে কেঁদেছে তখনও অভিযোগের বিন্দুমাত্র তির সে ছোড়েনি। কে জানত, তির না ছুড়ে একেবারে সে চলেই যাবে!

পাখির ডাক শোনা যায়। এতটাই চমকে উঠি, হাত থেকে গ্লাস পড়ে যায়। হচ্ছেটা কী আজ? বৃষ্টির শব্দ, বিজলি, আর এখন পাখির ডাক। কিছুক্ষণ থেমে আবারও শোনা যায়। এবার বুঝতে পারি কলিংবেল বাজছে। জান্নাত ফিরে এসেছে? নাহয় কে আসবে? যদি কেউ আসার থাকত, তবে কলিংবেলকে পাখি ভেবে চমকে উঠতাম?

দরজা খুলে দেখি দাদু হুইল চেয়ারে- অনেকদিন বাঁচবেন তিনি- ওনার কথাই যে ভাবছিলাম খানিক আগেই। পেছনে সুঠাম দেহের এক কিশোর ছেলে। তার মুখে হাসি।

‘দাদু, আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন।’

আমি তাদের ভেতরে আসতে বলি। ড্রয়িং রুম এলোমেলো থাকার কোনো সুযোগ নেই, আছেই কেবল একটি সোফা। এলোমেলো হবে কিভাবে?

উনি ভেতরে না ঢুকে উল্টো আমাকে বাইরে যেতে ইশারা করলেন। ছেলেটিকে সরিয়ে আমিই তাকে নিয়ে বের হয়ে সিঁড়ির কাছের অল্প খোলা জায়গাটায় যাই।

‘বাবা, বাসা থেকে বের হচ্ছ না কেন?’ কথা জড়িয়ে গেলেও বুঝতে অসুবিধে হয় না আমার।

কিশোর ছেলেটিকে দেখতে পাই না, হয়তো বাসায় চলে গিয়েছে।

দাদুকে কি উত্তর দিব ভেবে পাই না।

তিনি আবার বললেন,‘ তোমার বাড়ি কই? ’

সত্যি, প্রথমে বুঝতে পারি না তিনি কি জানতে চাইছেন। আমার বাড়ি আবার কোথায় হবে? এই যে বদ্ধ ঘর থেকে আমাকে ডেকে আনলেন, এখানেই তো থাকি।

আমি ইশারা করে দেখাতেই তিনি ধমকের সুরে বললেন, ‘ধুর ব্যাটা। গ্রামের বাড়ি, নিজের বাড়ি।’

ব্যাপারটা বড্ড মেলোড্রামাটিক হয়ে গেলেও বৃদ্ধের পায়ের কাছে বসে পড়ি। এমন আন্তরিকভাবে কে শেষ জানতে চেয়েছে বাড়ির কথা? বাড়ি কাকে বলে? যেখানে দিনশেষে ফিরতে হয় সবাইকে? আমরা তাহলে কোথায় ফিরি? কোথায় যাই? দাদুকে আর বলতে ইচ্ছা হয় না, আমার যে বাড়ি নেইÑ শূন্যতার ভেতরে বসত আমার, যেখানে আমি ডুবন্ত খড়কুটোর মতো একা ও অসহায়।

তিনি আমাকে আর কিছু বলেন না। আমিও চুপচাপ বসে থাকি। বসে থাকতে থাকতে একসময় সন্ধ্যা হয়। নাকি রাত? ভোরও হতে পারে। আমি বসে থাকি, হয়তো উঠে চলে যাই। তারপরেও মনে হতে থাকে, কেবল বসেই আছি অকাজে, নির্জনে।

 

দুই

বিয়ের রাতেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম, এমন হুট করে বিয়ে করাটা উচিত হয় নি আমার। জান্নাত যখন জড়িয়ে ধরেছিল আমাকে, শরীরের ভেতর অদ্ভুত এক শীতলতা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল- এমন নয় যে আমার কামনা নেই, সন্ন্যাসধর্ম পালন করছি। মনে হয়েছিল কি এক বন্ধনে নিজেকে জড়িয়ে ফেললাম! আর বুঝি মুক্তি নেই আমার। তারপর থেকেই পুরো ব্যাপারটি রুটিন হয়ে গেল- ঐ দাঁতমাজার মতোই- বিরক্তিকর ও একঘেয়ে।

এরপর এভাবেই পার হচ্ছিল দিন। নিজেকে জান্নাতের জায়গায় রেখে ভাবতামÑ কিভাবে সে সহ্য করছে, আমার নিষ্ক্রিয়তাÑ একটুও কি খারাপ লাগে না ওর, একটুও কি অভিযোগ নেই? কফিনের শেষ পেরেক লেগে যায় সে চলে যাওয়ার কিছুদিন আগে।

অফিস থেকে চলে এসেছিলাম একটু আগেই। সবেমাত্র বিছানায় শুয়ে জিপার খুলেছি প্যান্টের, আর ঠিক তখন জান্নাত এসে ঢুকেছিল।

হাত থেমে গিয়েছিল আমার। বিস্ময়ে চোখ ঠিকরে বের হয়ে আসতে নিয়েছিল তার। বলেছিল, ‘বাসায় আমি থাকতে তুমি এই অশ্লীল কাজটি করছ, অথচ আমি ভেবেছিলাম…’

বাক্য শেষ করে চিঠির মাধ্যমে। সে ভেবেছিল, আমি হয়তো শারীরিকভাবে কিছুটা উত্তাপহীন, সেজন্য তার সঙ্গে অমন রোবোটিকভাবে থাকি। এখন সে বুঝতে পেরেছে, আমি মূলত স¤পর্কটাতেই আগ্রহী নই। সে  তাই ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেবে।

ব্যাপারটা বিস্ময়কর বটে- পালিয়ে বিয়ে করা দুজন কাপলের জীবনে শুরুতেই কেন এমন দুর্দশা নেমে আসবে?

বৃদ্ধ দাদুকে আমার এসব কিছুই বলা হয় না। যার বাড়ি ফেরার ঠিকানা নেই, তার সঙ্গে তো এমনই হবে।  ঘরে ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দিই। তারপর বিছানায় নিজেকে পুনরায় উন্মুক্ত করি আবার। চোখে তখন ভেসে ওঠে পাশের বারান্দার তরুণীর চেহারাÑ আমি তো সাধু নই, মেয়েটাকেও অসাধু ভাবতে ইচ্ছে হয়।

বেশকিছু সময় পার হলে, শান্ত হই আর টের পাই ভেতরের যাবতীয় ক্ষোভ, লোনলিনেস, একঘেয়ে চালচিত্র একসঙ্গে বের হয়ে যায় পতন অভিমুখে এবং অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হয়ে উঠি সুখী মানুষ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares