গল্প : অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার যাত্রীগণ : হরিপদ দত্ত

গল্প

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার যাত্রীগণ

হরিপদ দত্ত

 

তুষার-শীতল-কুয়াসার মহাপ্লাবনে ডুবে যাওয়া পৌষের ভোরবেলা শব-যাত্রীগণ মৃতব্যক্তির লাশ ফসলশূন্য নাতিদীঘল মাঠ শেষে উঁচু টিলার মাঝে গাছ-গাছড়াশূন্য পারিবারিক গোরস্থানের উদ্দ্যেশে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। টিলার মাঝখানে একটি খেজুর গাছ। মরুদেশের পবিত্র স্মৃতি। কবরের সাক্ষী। শববাহক চারজন। তিনজন মৃতব্যক্তির আত্মজ। জন্মদাতা এবং বিগত শৈশবকালের প্রতিপালক। চতুর্থ ব্যক্তি  স্নেহাস্পদ, পড়শি। পেছনের দলটি খোদার করুণা প্রত্যাশী গ্রামবাসী। কফিনটি তো বটেই, গোর-যাত্রীরাও কুয়াসার বিন্দু বিন্দু জলকণায় ভিজে যাচ্ছিল। যাত্রীদের বিশ্বাস জন্ম-মৃত্যুর এই দুনিয়ার ভেতর আসমান থেকে জমিনে নেমে আসার কুয়াসা খোদারই অজনা কোনো রহস্য। বান্দার বোধের অগম্য।

যাত্রীগণ নীরব। শব্দ নিরাকার। অগোছালো ঘেসো কুয়াসা লুটিয়ে-পড়া পথ বলেই যাত্রীদের নগ্নপদতলও শব্দশূন্য। মৃত ব্যক্তির পড়শি অনাত্মীয় এবং বাকি তিনজন আত্মজ শব-বাহকের কাছে লাশটি অনুমানের চেয়েও ঢের ভারি মনে হচ্ছিল। যদিও মধ্যরাতে মৃত্যুবরণ করা জন্মদাতার লাশের ভার ওরা পিতার স্নেহাস্পদের সঙ্গে, পরকালের কথা স্মরণ করে সমান ভাগ করে নিয়েছিল, তবু ওরা বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আজই ওরা জানতে পারল মৃত পিতার শরীরের ভার ঠিক কতটা। ওদের প্রত্যেকের আঙ্গুল যা আঁকড়ে ছিল দাফনের খাটিয়ার হাতল, ঠান্ডায় যেন তা অনুভূতিশূন্য হয়ে আসছে। মৃত্যু কতটা শীতল তা ওরা ভাবতেও পারছে না।

মৃতের কনিষ্ঠ পুত্র কৈশোর পেরোনো যুবক। দৃষ্টি তার ধারাল, কিন্তু ঠান্ডায় চোখের মণি শীতল। আচমকা সে কুয়াসার ফাটল দিয়ে আকাশে প্রভাতী শুকতারাকে দেখতে পায়। বুকটা ধুক্ধুক্ করে। মনে পড়ে নামাজ শেষে পিতা প্রায়শই পশ্চিমাকাশে হীরকের মতো জ¦লতে থাকা সন্ধ্যায় শুকতারার দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকতেন। তার বিশ্বাস নিশ্চয়ই তখন পিতার মনে পড়ত দুনিয়ার শেষ, পরমেশ্বরের কথা। চোখ ভিজে আসত। করুণায় বিচলিত হতো মন। পাপ-পুণ্যের এই দুনিয়া কেঁপে উঠত, ‘ইয়া রাসুল’।

ওই তো অস্পষ্ট দেখা যায় পারিবারিক গোরস্থানের খেজুর গাছটির মাথা। কুয়াসার সাদা বোরখা পরে যেন সে দাঁড়িয়ে আছে। আসলে সে একটি স্থির, অনড় বৃক্ষ। তার কি দৃষ্টি আছে, শ্রুতি আছে, কণ্ঠস্বর আছে? এই গোরস্থানে যারা চিরনিদ্রায় শায়িত, কবরের অন্ধকার গুহার গায়ে যে আলো জ¦লে, সে কি তা দেখতে পায়? শুনতে পায়, কবরের ভেতর খোদার ফেরেশতারা মুর্দার সঙ্গে কোন কথা বলছে? এ যে অন্য দুনিয়ার মহারহস্য! দুর্বোধ্য তার ভাষা।

হঠাৎ শবযাত্রীদের সমবেত কণ্ঠে উচ্চারিত হয় পবিত্র কিতাবের আয়াত। কিন্তু মৃতের পুত্রগণ ভাবছিল কার দায়িত্ব পড়বে পিতার গোর খননের ভার? কেননা কবর খনন যতটা শ্রমসাধ্য তার চেয়েও জটিল মনের বিষয়। মৃত্যু, ইহকাল, পরকাল, শেষবিচার, জিন, ফেরেশতা কোদালের হাতল জাপটে ধরবে। এ যে খোদার পরীক্ষা। নেক্ বান্দা আর গোনাহগার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। মনের চোখে ফনা তুলবে দোজখের সাপ ‘আজদাহা’। তখন এই শীত প্রভাবে ঠান্ডায় নিস্তেজ হয়ে আসা হাতের মুঠোয় কোদালের হাতল সেই আজদাহার হিমেল শরীর হয়ে যাবে। এ যে পাপ-পুণ্যের বড় জটিল পরীক্ষণ।

হলোও তাই। পুত্রগণ পালাক্রমে কবর গুহা খুঁড়ছে। এই খননক্রিয়া অন্য এক দুনিয়াকে ওদের সামনে এনে দাঁড় করায়। পুরাতন দুনিয়াটা দুলতে থাকে। আদি পিতার ভ্রাতৃঘাতক এক পুত্রের নিহত ভ্রাতার জন্য কবর খনন! প্রথম হত্যা! প্রথম কবর! মানুষের আদি পাপ। অলঙ্ঘনীয় অভিশাপ। দুঃখ। কষ্ট। বিষাদ। শেষ বিচার।

জ্যেষ্ঠ পুত্রের চোখে জল নামে। শোকাহত হয়। সেই শোক প্রলম্বিত হয় কনিষ্ঠপুত্র পর্যন্ত। ওরা যখন বুঝতে পারে গোরস্থানে কান্না নিষিদ্ধ, চিরন্তন সত্য হচ্ছে মৃত্যু এবং মানুষের প্রত্যাবর্তন তার আগমনের স্থান থেকেই, তখন তারা খোদার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অপরাপর যাত্রীগণ সবাই দেখে। একজনের মুখেই উচ্চারিত হয়, খুবই মৃদু-লয়ে- ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না… ঠিক তখনই মুর্দার কনিষ্ঠ পুত্রের শরীর আচমকা কেঁপে ওঠে। সে ভয়ার্ত। তার চোখের মণি ঠান্ডা কালো পাথরের মতো জমাট বাঁধে। কেন? দুনিয়ার কেউ এর উত্তর না-জানলেও আতঙ্কিতজনই জানে কোন সত্য থরথর কাঁপছে তার বুকের ভেতর গোপনে। কি নির্মম!

অপর পুত্রগণ ভাবতে থাকে এ কথা যে, তাদের পিতা সবচেয়ে ভালোবাসতো কনিষ্ঠকেই। তাই সে পিতার অনুপস্থিতির দুনিয়ায় নিজেকে অরক্ষিত মনে করছে। এর অধিক ভাববার সময় এই কবরস্থান নয়। তাই দ্রুতই বিধিবিধান সম্পন্ন হয়। মুর্দা যখন কবরে নামানো হয় তখন পবিত্র সুরার সমবেত উচ্চারণ মৃদু অথচ প্রলম্বিত লয় সৃষ্টি করে। হঠাৎ স্তব্ধতা নেমে আসে। এবং কতগুলো নিরাকার দীর্ঘনিশ্বাস শীতল কুয়াসায় একাকার হয়ে যায়। সেই নিশ্বাসের উষ্ণতা এবং গোরস্থানের কুয়াসার শীতলতা মিলে যে শিশির বিন্দুর রূপান্তর ঘটে তা মৃত্যুর মতোই ঠান্ডা গোরযাত্রীগণ যখন বুঝতে পারে এই নির্জন লোকালয়ে শূন্য শস্যহীন প্রান্তরে কুয়াসার রূপ ধরে মৃত্যু তাদের ঘিরে আছে, তখন তারা খোদার করুণা প্রার্থী হয়ে আরও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার আশায় গ্রামের দিকে হাঁটতে থাকে। মাত্র একজন কাফেলার সঙ্গী হয় নাই। কবরে শায়িত মানুষটির কনিষ্ঠ পুত্র। সে এখন অপর দুনিয়ায়।

কবর যাত্রীগণ লোকালয়ের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেলে কুয়াসার স্তর সাগরে ভাসমান হিমবাহের মতো ফাঁটল ধরে। ফাঁটলের ভেতর নীল জলজ জমিন। শীতের শিশির ভেজা সবুজ ঘাস। প্রাণের স্পন্দন। এখানে মৃত্যু কিংবা মউতের অস্তিত্ব নেই। দূর থেকেও অস্পষ্ট দেখা যায় মৃত ব্যক্তির কবরের পাশে মোনাজাতের ভঙ্গিতে হাত তুলে মাথা নত একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। যুবকটি মৃতের প্রিয় কনিষ্ঠ পুত্র। মুখে তার মোনাজাতের পবিত্র শব্দ নয়, বরং মরহুম পিতার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, ‘আব্বা, আপনি আমাকে মাফ করুন, যা ঘটেছে তা আপনার ইচ্ছায়ই। স্বেচ্ছামৃত্যু ঘটেছে আপনার, আমি আপনার হত্যাকারী নই।’

যুবক পুত্র দু’হাতে মুখ ঢেকে, চোখ ঢেকে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে কবরের পাশে। তার আক্ষেপ, বিলাপ আর কান্না থামে আরও পড়ে। চোখ মুছে সে হাঁটতে থাকে। বাড়ি ফিরে যাবে কি? সেই বাড়ির উত্তর ভিটের নির্জন একটি ঘরে শূন্য একটি চকি পড়ে আছে। সেই কাঠের বিছানায়ই সারা অঙ্গ অকেজো অর্থাৎ অসাড় একটি মানুষ পড়েছিল দীর্ঘ সাত বছর। দিবা-রাত্রির অন্ধকারের এক দুনিয়া। ক্রমে ঘরটির দরজা-জানালাও চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে যায়। দুনিয়ার সব আলো বৃত্তাকারে ঘিরে থাকে ঘরটিকে, আলোর দেয়ালে বাতাসে কম্পমান গাছের পাতার ছায়া। চাঁদের আলোর সঙ্গে প্রাচীন নবীদের যুগের গন্ধ ছড়ায়।

যারা ওষুধপত্র, খাদ্য-পানীয় কিংবা নোংরা বিছানা-কাপড় বদলাতে অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করতমাত্র, কিছুদিন তারা মুখ ঢাকা ছদ্মবেশী প্রিয়জন। পঙ্গু-অসাড় মানুষটি তাদের চিনতে পারেনি। ছদ্মবেশীদের নিশ^াস কিংবা কণ্ঠস্বর ও ওই অন্ধকার দোজখে ছিল নিষিদ্ধ। ওদের পদধ্বনিই কেবল শুনতে পেত পঙ্গু ওই বৃদ্ধ, গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের অবসর নেয়া শিক্ষক। ক্রমে, তারা তো কেউ প্রতিবেশি, আত্মজন, পুরাতন ছাত্ররাও দূরে হারিয়ে যায়। আত্মজন চিরদিনের জন্য পর হয়ে গেছে। এই দুনিয়া যাকে পরিত্যাগ করেছে, তার প্রতি এত ঘৃণা, বৈরিতা, অবজ্ঞা কেন মানুষের, কংকাল মানুষটির বোধেও তা আসে না। যতক্ষণ বিনিদ্র থাকে, চোখ খোলা থাকে, সে প্রত্যাশা করে কেউ পাশে বসে তার সঙ্গে আদম-হাওয়ার জামানার দুনিয়ার কিস্সা বলুক। না কেউ আসে না। স্ত্রী বেঁচে থাকলে এমনটা করত কি? হতো কি এত নির্দয়? মানুষের এই অনুপস্থিতির কালে অন্ধকারে পঙ্গু মানুষটি ইবলিশের চোখের হিং¯্র-ক্রূর আলোকে ঝিলিক দিতে দেখে। পঙ্গু মানুষটি ভয় পায়। আর্তনাদ করতে চায়। পারে না। তার কণ্ঠের ভাষা শুকিয়ে জমাট বাঁধে। কিন্তু নাক তার সতেজ। সে স্পষ্ট ঘ্রাণ পায় মউতের। মৃত্যুর। এই মৃত্যুগন্ধে ছড়িয়ে থাকা আঁঠাল অন্ধকার ঘরে শয়তানও তার সঙ্গে কথা বলুক, মানুষটির এমনি প্রত্যাশা বুকের ভেতর সাঁতরায়।

যেদিন তার শরীরে, অসাড় মাংসপেশিতে সাপের ছোবলের মতো ব্যথা উথলে ওঠে বিরামহীন, সে কেবল গোঙায়। তার গলা দিয়ে কসাইখানার জবেহ করা গরুর কাটা কণ্ঠনালির বহমান রক্তের সঙ্গে ফুসফুসের বাতাসের ধাক্কার মতো পৈশাচিক শব্দ ঘর ছেড়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। তখন বাড়ির জীবন্ত প্রাণীগুলো বিরক্তি, প্রতিহিংসা গজরায় মুখে মুখে। তাদের মন্তব্যগুলোর অর্থ কি তা স্মরণে রাখার একজনও সাক্ষী থাকে না বাড়িতে। পঙ্গু মানুষটি  বাইরের কথাগুলো শুনতে পেলেও অর্থ বুঝতে পারে না। সে কেবল অনুমান করতে পারে সেই ভাষার কেন আক্ষেপ, করুণা, ভালোবাসা নেই, আছে অন্তহীন প্রান্তরের আসমান-জমিন সমান ঘৃণার কাঁটা। সে জানে সন্তানেরা, তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যারা মুক্তি চায়। আসান চায়। মানুষটির মউত ঘটলেই মুক্তি পাবে তারা। তা হলে আসুক মুক্তি!

কিন্তু পঙ্গু মানুষটি মরতে চায় না। এই মৃত্যু শয্যায় তার কংকাল দেহটা খোদার কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকুক এমন প্রত্যাশায় তার চোখে পানি নামে। ভালোবাসার, মমতার, আনন্দের, অনন্ত সুখের। আর তখন বিগত শৈশব, কৈশোর যৌবন পাখি হয়ে এই অন্ধকার ঘরে উড়তে থাকে। পাখিকে দেখতে না পেলেও অসাড়-পঙ্গু দুনিয়ার সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষটি অতীত স্মৃতির পাখিদের অগ্নিময় পালকের ছায়া দেখতে পায়। সেই পাখিদের চোখে চোখে প্রশান্তির অগ্নিজলের বিন্দু ঝিলিক দেয়। যেন অপার্থিব অগ্নিজল! অন্য দুনিয়ার।

কোনো কোনো দিন মানুষটি মৃত্যুর প্রার্থনা করে। মৃত্যুকে সে ডাকে সন্ধ্যা বেলা মাঠে খেলতে থাকা শিশু সন্তানকে ঘরে ফিরতে মা যেমনি লম্বা সুরে ডেকে যায়। কিন্তু বিকলাঙ্গ মানুষটির সে ডাক খুবই ক্ষণস্থায়ী। মৃত্যুকে সে ভয় পায়। নিরাকারও নয় আবার সাকারও নয়, এমনি অবস্থায় সে মৃত্যুকে মাত্র একপলকই দেখেছে। নিদ্রা না-কি জাগরণ তার স্মরণে নেই। কিন্তু মানুষটি আতঙ্কিত। আর সেদিনই শেষবারের জন্য পুত্র এবং পুত্রবধূদের অনুরোধ করেছিল যেন তাকে তুলে নিয়ে বারান্দায় শুইয়ে দেয়। আলোর ভেতর খোদার এই রহস্যময় দুনিয়া, আসমান-জমিন গাছ-পালা, ফসলের ক্ষেত আর তার স্মৃতির স্কুল ঘরটি মাত্র একবার যদি দেখতে পেত? কেউ তার কথায় কর্ণপাত করেনি। দুনিয়ার জীবিতরা বড় নির্দয়!

স্ত্রীর মৃত্যুর পর যাদের এই মানুষটি শেষ ভরসার মানুষ ভাবা তো সেই পুত্র আর পুত্রবধূর ওপর তার ভরসা আর স্থিতি লাভ করেনি। তার আশ্রয় প্রত্যাশার দুনিয়া থেকে একে একে সবাই বিকেলের রোদের মতো ছায়ার ভেতর হারিয়ে যায়। তাই কনিষ্ঠপুত্র, গ্রামীণ সমবায় ব্যাংকের হিসাব রক্ষকই হয় তার শেষ ভরসা। তার আসা-যাওয়ার আওয়াজ পেত মানুষটা মোটর বাইকের আলামতে। পোড়া পেটেøালের গন্ধে। তার কাছেই মানুষটির আবদার ছিল, ‘বাবারে, ঘুমের খুব দরকার আমার। ঘুমালেই আমি পঙ্গু শরীর আর যন্ত্রণা-কষ্টের কথাটা ভুইলা যাইরে বাপ।’

‘আর কত কাল একলা বিছানায় ঘুমাইবা আব্বা? তোমার ঘুমের কি শেষ নাই?’ ছেলে জানতে চেয়েছিল। কি নির্মম জিজ্ঞাসা!

মানুষটির কাছে এ ছিল নির্মম প্রশ্ন। এতটা নির্মম যে, বছরের পর বছর একই বিছানায় পড়ে থাকতে থাকতে পিঠের ঘায়ের পোকাদের কামড়ের চেয়েও। পোকাদের জীবনবৃত্তান্ত রোজই কান পেতে শোনে মানুষটি গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বদমেজাজের আয়ার মুখে। পেনসনের টাকা তো তার হাতেই চলে যায় সেবার নামে। ভাগ পায় সন্তানেরাও।

পিঠের সেই ঘা, নরমাংসের পোকা আর তাদের ক্ষুধার কথা কেবল আয়াই নয়, বলে ছেলের বৌরাও। বরং ওরা বলে পচনধরা চামড়ার দুর্গন্ধের কথা। সঙ্গে বলে দোজখের আজাবের কথা। এ যেনা তাদের মুখের বচন নয়, ওয়াজ মাহ্ফিলে দাঁড়ানো আলেম-মাওলানার দোজখের বয়ান। তখন নিঃশব্দ ধর্মসভায় সৃষ্টি হয় বান্দার আচমকা কান্নার রোল, সমবেত রোল।

হ্যাঁ। পিতা চায় অন্তিম নিদ্রা। অনন্ত প্রসারী ঘুম। শীতের স্রোতহীন নিস্তব্ধ নদীর দীর্ঘ আঁকাবাঁকা শরীরের মতো কুয়াশাঢাকা ঘুম। নির্জন, নিঃশব্দ, স্তব্ধ, নিরাকার, অজাগতিক ঘুম। তাই পিতা টেবিলে সাজিয়ে রাখা ঘুমের ঔষধের কৌটার বড়িগুলোর কথা পুত্রকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে করুণা বিগলিত স্বরে বলে, ‘বাপধন, তুই তোর জন্মঋণ শোধ কর, ঘুমের বড়িগুলো খাইয়ে দে বাবা, খোদার দরবারে বাপ তোর সাক্ষী দেবে, গোনাহগার হবি না তুই, না দিলেই বাপ তোকে অভিশাপ দেবো, তুই দোজখের আগুনে পুড়বি। যেমন পুড়ছি আমি বিছানায় পড়ে। মুক্তি দিবি না আমাকে বাবা?’

একি কথা জন্মদাতা পিতার মুখে? একি অনুরোধ? না কি নির্দেশ? ভয়ংকর নির্দয় ঘাতকের নির্দেশ? ঘাতক তার বুকেই ধারালো ছোরাটা বিদ্ধ করতে ভীতু দুর্বল একজনকে আদেশ করছে! কনিষ্ঠ পুত্র ছুটে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। অন্ধকারে মাঠের দিকে দৌড়াতে থাকে সে। আকাশে তখন একটি নক্ষত্রকেও জ¦লতে দেখে না। আসমান জমিন অন্ধকার একাকার।

কিন্তু গভীর রাতের অন্ধকারে ফিরে আসে সে পিতার ঘরে। একলা বিছানায় যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে মানুষটি। অসহ্য যন্ত্রণা। মোবাইলের আলো ফেলে জন্মদাতার মুখে। হ্যাঁ, এই তো জন্ম ঋণ শোধের সময় সমাগত, ‘আব্বা, আমি আসছি।’ গলা ফিসফিস্। চোখ হিংস্র না কি করুণা-ভেজা?

নিরুত্তর পিতা। কিন্তু চোখ তার খোলা। এক পলক নয়, পলকহীন দেখছে ছেলেকে মোবাইলের নীলাভ আলোয়। কিন্তু চিনতে পারে না। অচেনা হয়ে গেছে আত্মজ। সেই অচেনা যুবকের হাতে পানির গ্লাস আর মুঠোয় অসংখ্য ঘুমের বড়ি। অন্য হাতে মোবাইল। পিতা দেখতে পায় অচেনা যুবক তার মুখে ফেলে দিচ্ছে এক মুঠো বড়ি। গ্লাসের পানি নীলবর্ণ হয়ে ঢুকে যাচ্ছে মুখ থেকে উদরে। খুদে বড়িগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে ঢুকে যাচ্ছে গলার অন্ধকার সুরঙ্গ ছেড়ে উদরে। ঢুকছে, একটার পর একটা।

মোবাইলের নীলাভ আলো নিভে যায় আচমকা। অন্ধকার গুহা যেন। কনিষ্ঠ পুত্র সেই অন্ধকারে পিতার অস্ফুট আর্তনাদের মতো শব্দ শুনতে পায়, ‘কে তুই? ইনসান না কি ঈবলিশ, এত নিষ্ঠুর! কে তোর দুশমন?’

তারপর ক্ষণকাল নিস্তব্ধ। সেই কাল বিগত হয়ে গেলে অন্ধকার ফালা ফালা করে কেটে কেউ যেন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। কে, কে যায়? এমনি প্রশ্ন করার মতো খোদার এই অন্ধকার দুনিয়ায় কেউ ছিল না ওখানে। যেন নক্ষত্রশূন্য, প্রাণশূন্য মহাকাশ।

ঘুম। ঘুম। অন্তহীন অতলান্তিক নিদ্রা। শেষ রাতে সেই ঘরে থেমে যায় যন্ত্রণাকাতর গোঙানি। একাকী, নিঃসঙ্গ ঘর। রাতের বেলায়ও আলো নিরাকার কোন এই ঘর? অন্তহীন নিদ্রাযাত্রীর ইচ্ছা? দু’বছর পূর্বে রাতের প্রথম প্রহরেই পঙ্গু মানুষটির ইচ্ছায় গ্রামীণ বিদ্যুতের আলো নিভে যেত। মানুষটি বুঝতে পেরেছিল আলোর দুনিয়া তাকে বিদায় দিয়েছে, অন্ধকার ঘরে রোগযন্ত্রণা, নিঃসঙ্গতা এবং প্রাচীন পৃথিবীর স্মৃতির ভেতর অজাগতিক অদৃশ্য আলো আর অগ্নিবিন্দুতেই তার মুক্তি। তাই দিনের বেলায়ও দরজা-জানালা বন্ধ করে অন্ধকারের গর্জন শুনতে মানুষটি কান খাড়া করে রাখল।

দিনের দ্বিতীয় প্রহর পেরিয়ে তৃতীয় প্রহরে গ্রামীণ স্বাস্থকেন্দ্রের সেবিকা এলেই আবিষ্কার হয় পঙ্গু মানুষটি আখেরি ঘুমের দুনিয়ায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। পুত্র ও পুত্রবধূগণ সমস্বরে আর্তনাদ করে একটি কথাই পড়শিদের জানায়, ‘দুনিয়ার আজাব থেকে মউত এসে আব্বাকে মুক্তি দিয়েছে।’

কিন্তু ওই মুক্তিটা কার? কংকালের সঙ্গে সেঁটে থাকা পচন ধরা একস্তূপ মাংসের জীবিত যন্ত্রণাকাতর মানুষটির, নাকি তার প্রিয় আত্মজনের? এর উত্তর কারও জানার কথা নয়। তাই তারা আখেরি গোসল, জানাজা, কবর, গোরস্থান এবং শেষ বিচারের বিষয়ে বলাবলি করছিল। কেবল কনিষ্ঠ পুত্রই অস্থির। তার চোখ ছিল শুকনো। রীতিমতো সে ভয়ার্ত। এত ভয় কেন তার? নিজেও কি সে জানে? অথচ তারই ইচ্ছায় মুর্দাকে কবরে নেয়ার সময় নির্ধারিত হয় শেষ রাতে।

সেই কখন গোরস্থান ছেড়ে সবাই গ্রামে ফিরে গেছে। ফেরেনি কেবল মরহুমের কনিষ্ঠ পুত্র। সে যে বাড়ি ফেরেনি তা বুঝতেই পারেনি কেউ। সবাই বুঝতে পারে আজ আর সূর্যের মুখের দেখা মিলবে না। সন্ধ্যা নামবে, তবু ছায়াচ্ছন্ন কুয়াসা কাটবে না। অথচ শীতের কুয়াসায় হারিয়ে যাওয়া যুবক মৃত পিতার কবরের পাশে সটান দাঁড়িয়ে আছে। সে কি পিতৃঘাতক? পিতার খুনি? মহাগোনাহগার? কার কাছে সে ক্ষমা প্রার্থী হবে? পিতা না কি খোদার কাছে? সে তো মহাশূন্যে ভাসমান। দৃষ্টির ভেতরে অনন্ত শূন্যতা।

অচিরেই ভয়ংকর আতঙ্ক, আত্মগ্লানি, পাপ-পুণ্যের প্রপঞ্চ তাকে ঘিরে ধরে। মগজের কোষে নামতে থাকে অন্ধকার। বিজ্ঞানের সেই হরমোন অভিক্রিয়া। সে স্পষ্ট দেখছে একটি জোনাক-পড়া রাত। কবরের মাটি খ–বিখ- হয়ে যাচ্ছে। সেই কবর গুহার ঘেরা অন্ধকারের কিয়ামতের দুনিয়া ছেড়ে তার মৃত পিতার পুনরুত্থান ঘটছে। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত, হাতে স্কুলের ছাত্র-হাজিরা খাতা, সামনে দাঁড়িয়ে আছে যুবা-বয়সী পিতা। বার্ধক্যশূন্য। যুবক।

তিনি বললেন, ‘পুত্র, তুমি ভয় পেও না, একটি কথা জানাতেই কবর থেকে আমার এই উত্থান, পুনরায় ওখানেই ফিরে যাব আমি, মনে রাখবে মউত আর কবরের জীবনের চেয়েও ভয়ংকর এই দুনিয়ার জীবন; বলেই চোখের পলকে পুনরুত্থিত মানুষটি কবরের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যায়। অদৃশ্যের এই খেলা অন্য দুনিয়ার।

‘আব্বা, তুমি বলে যাও আমি কি তোমার হত্যাকারী?’ পুত্র তখন আর্তনাদ করে ওঠে। নিরুত্তর পিতার শরীর নিরাকার, অদৃশ্য।

ঠিক তখনই নিখোঁজ যুবকের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া অবশিষ্ট অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া-যাত্রীগণ কবরটি ঘিরে ধরে। আতঙ্কিত, পিতা হত্যাকারী মতিভ্রম, হ্যালুসিনেশনে আক্রান্ত যুবক মৃত-পিতার কবরের ওপর লুটিয়ে পড়ে। জ্ঞানহারা। কেউ জানে না, কোনোদিন জানবেও না অন্ধকার কবরে শায়িত মৃত মানুষটির হত্যাকারী কে? তার কনিষ্ঠ পুত্র? না কি নিজেই আত্মঘাতী! কিংবা অন্ত্যষ্টিক্রিয়ার যাত্রীগণ?

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares