গল্প : কেরামত আলির সাধনভজন : হোসেনউদ্দীন হোসেন

গল্প

কেরামত আলির সাধনভজন

হোসেনউদ্দীন হোসেন

কেরামত আলি ইদানীং পিরের মুরিদ হয়েছে। লম্বা দাড়িও রেখেছে। মাথায় একটা গোলটুপি দিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করছে। কপালের মাঝখানে কালো একটা কপালঘষা দাগও দেখা দিয়েছে। আগে পরত প্যান্টশার্ট। কয়েক মাস আগে থেকে সে-সব কাপড়চোপড় বাদ দিয়ে দিব্বি লম্বা ঝুলওয়ালা পিরহান এবং একটা শাদা লুঙ্গি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার এই অবস্থা দেখে অনেকেই হাসি মশকরা করে।

লোকটা এত তাড়াতাড়ি যে নিজের স্বভাব বদলে ফেলবে, এলাকার পাড়াপড়শিরা এটা নিয়ে নানারকম কটু কথা বলে।

কয়েক মাস আগেও পির-ফকিরদের নাম শুনলেই বিরূপ মন্তব্য করত কেরামত আলি। ভ-, ফন্দিবাজ, ফিকিরবাজ বলে পিরের মুরিদদের উল্টাপাল্টা কথা শুনিয়ে দিত সে।

রহমত আলি ছিল ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে শব্দেলপুর গ্রামের দেওয়ান শরিফ শাহ-র কাছে গিয়ে মুরিদ হয়েছিল। এ দিগন্তের দেওয়ান শরিফ শাহ যে একজন বুজর্গ কামেল ব্যক্তি একথা অনেকে বিশ্বাস করলেও কেরামত আলি কখনও বিশ্বাস করত না। রহমত আলি পিরের মুরিদ হওয়ায় কেরামত আলি ওকে ‘একটা আস্ত ছাগল’ বলে উপহাস করেছিল।

পাল্টা প্রশ্ন করেছিল রহমত আলি, ক্যানি, একটা আস্ত ছাগল হলাম কি করে?

: হ্যাঁ, তুই একটা আস্ত ছাগল। পাগল আর ছাগল ছাড়া মুরিদ হয় কে?

: কেরামত, আমার পির বাবা সম্পর্কে, এরকম কথা বলবিনে-

: বললি কি হবে?

: তুই আমার পির বাবা সম্পর্কে কিছু জানিসনে-

: বুঝলি, আমার জানারও দরকার নেই।

: ঠিক আছে। কিন্তু উল্টাপাল্টা কথা বলবিনে। এসব ভণ্ডামি আমি একটুও পছন্দ করিনে।

রহমত আলি গ্রামের হাটখোলায় আড়তদারি করে। সচ্ছল সংসার। সংসারে কোনোরকম অনটন নেই। বেশকিছু জমিও আছে। লাঙ্গল গরু আছে। ক্ষেত খামারে কাজ করার জনমাইন্দারও আছে। সেখানে ধান পাট লাগায়। ছোলা মসুরি মটর কালাই হয়। শাক-সব্জি আলু পটল কুমড়ো হয়। একদিকে ভুসিমালের কারবার, অন্যদিকে ক্ষেতখামার থেকে ফসল বেচে প্রচুর টাকা আয় করে রহমত আলি। আগে ছিল কাঁচা বাড়ি। ইদানীং পাকা বাড়ি হয়েছে। দিনদিন অর্থনৈতিক অবস্থা আরও মজবুত হয়েছে।

নিজের সচ্ছল অবস্থা সম্পর্কে সে নিজেই বলে, পির বাবার দোয়া, তার নেক-নজরের ফলে, আমার অবস্থা এমন হয়েছে।

কেরামত আলি ওর কথা শুনে হো হো হি হি করে হাসত। দুচ্ছাই বলে টিটকিরি করত।

বলত, তাহলি একটা কাজ কর , পির বাবার দোয়ার বরকতে যদি এত কিছু উন্নতি হয়ে থাকে- তবে ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাঙ তুলে দিয়ে, ব্যবসা ট্যাবসা আর চাষবাস বাদ দিয়ে শুয়ে থাকগে যাÑ দেখি আয় উন্নতি হয় কী করে। ধান্দাবাজ ফন্দিবাজরা এরকম কথা বলে।

রহমত আলি ঘেন্নায় থুতু ফেলতে ফেলতে ওর সামনে থেকে উঠে গিয়েছে। পথেঘাটে দেখা হলেও কেরামত আলির সঙ্গে কথা বলেনি। ঘাড় বাঁকা করে অন্যদিকে তাকিয়ে নিজের কাজে চলে গিয়েছে।

কেরামত আলি ছিল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক। পাশের গ্রাম হৈবতপুরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রায় দশ বছর হলো শিক্ষকতা করছে। আধুনিক যুগজামানার সমাজ, অর্থনীতি, দর্শন ও বিজ্ঞান ছাড়া আর কিছুর প্রতি তার কোনো আস্থা ছিল না। ধর্মভাবনাকে সেকেলে বলে প্রায়শ সে যুক্তি খাড়া করত। বিদ্যালয়ের ধর্ম-শিক্ষক ও তার সঙ্গে কখনও বাহাস করতে অগ্রসর হতো না। তিনিও ছিলেন সেকেলে ধ্যানধারণা ও ধর্মকর্মের প্রতি আস্থাশীল।

হেড মাস্টার আনিসুল হক একদিন বললেন, কেরামত, সমাজ একটা বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই বিশ্বাসের মধ্যে রয়েছে প্রচলিত অন্ধ ধ্যান-ধারণা। এই ধারণা মানো আর না মানো- এটা নিয়ে ধর্ম মানা মুসল্লিরা তোমার বিরুদ্ধে নানারকম অভিযোগ জানাচ্ছে। কারওর সঙ্গে অহেতুক ধর্মসংক্রান্ত কথা বলতে যেও না। মসজিদের কয়েকজন মুসল্লি এসে আমাকে জানিয়ে গিয়েছে।

কেরামত আলি বললো, আমি তো ধর্ম নিয়ে কোনো কথা বলিনি স্যার, কথা বলেছি পিরতন্ত্র নিয়ে।

হেড মাস্টার জবাব দিলেন, পিরের বিরুদ্ধে কথা বললেও বিপদ। পির মানে আল্লাহওয়ালা লোক। তুমি যখন পির মুর্শেদ মানো না- তখন কেন এসব নিয়ে কথা বলো?

কেরামত আলি ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে রইল।

হেড মাস্টার বললেন, খামখা এসব নিয়ে আজুড়ে ঝামেলা না পাকানো ভালো। এরপর ছাত্ররাও তোমার বিরুদ্ধে লেগে যাবে।

কেরামত আলি আর কথা বলেনি। ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে নিজের কাজে চলে গিয়েছিল।

জষ্ঠি মাস। প্রখর সূর্যের কিরণে আবহাওয়া উতপ্ত হয়ে উঠেছে। রাস্তায় হাঁটাচলা কষ্টকর হয়ে উঠেছে। এই প্রখর রৌদ্রের মধ্য দিয়ে দেড়মাইল পথ হেঁটে কেরামত আলি হৈবতপুরের বিদ্যালয়ে যায়। এই পথটুকু হেঁটে যেতে গরমে সিদ্ধ হয়ে যায় কেরামত আলি। গতরটা ঘেমে জবজবে হয়ে যায়। বিদ্যালয়ে পা দিয়েই প্রচুর পানি পান করে সে। শরীরটা কেমন অসুস্থ মনে হয়। কয়েকদিন পর সে বুঝতে পারে তার ঠ্যাং দুটো ন্যাচফ্যাচ করছে। হাঁটতে গেলেই টলে পড়ে যাবে তার দেহটা। বুকের মধ্যে তোলপাড় করে উঠে আসে চিনচিন করে একটা ব্যথা। এর কারণ খুঁজে পায় না সে।

আকরাম আলি ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল কেরামত আলি। নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষাও করেছিল। একগাদা ঔষধ খেয়েও কোনো রকম প্রতিকার পায়নি। শরীরটা ক্রমান্নয়ে আরও ভেঙে যাচ্ছে। কেরামত আলির দেহটা ছিল বেশ মজবুত। চেহারায় ছিল একটা জৌলুস। সেই মজবুত-জৌলুস দেহের মধ্যে হঠাৎ করে যে একটা রোগের ক্ষত দেখা দিয়েছে, তা ঔষধ খেয়েও নিরাময় হচ্ছে না।

শহরের একজন নামকরা ডাক্তার আব্দুল ওদুদ। অভিজ্ঞ ডাক্তার হিসাবে এলাকায় তার একটা নামযশ আছে। কেরামত আলির শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরিবারের লোকজন সেখানেও তাকে নিয়ে গিয়ে ছিল।

দুমাস ওদুদ ডাক্তারের ঔষধ খাচ্ছে কেরামত আলি। বুকের ভেতরের ব্যথাটা একটু কমেছে বটে; কিন্তু পা দুটোর অবস্থা এখনও কাহিল। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি নেই।

ওদুদ ডাক্তার বললেন, আরও কিছুদিন সময় লাগবে।

কেরামত আলির বউ খোদেজা ডাক্তারের কথা শুনে আরও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠল। প্রায় তিন মাস হলো। রোগে ভুগছে কেরামত আলি। নানারকম দুর্ভাবনা মাথার খোড়লে এসে ঘুরপাক খাচ্ছে। টাকার পর টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ কেরামত আলি সুস্থ হচ্ছে না। এখনও ডাক্তার বলছে, সুস্থ হতে সময় লাগবে। একটা হতাশার কালো ধোঁয়া মনের কোটরে এসে জমা হচ্ছে। আদৌ কী ভালো হয়ে উঠে দাঁড়াবে কেরামত আলি? চারদিকে অন্ধকার দেখতে লাগল খোদেজা।

রহমত আলি কয়েকদিন এসে কেরামত আলিকে দেখে গিয়েছে। বিছানায় নিশ্চুপ শুয়ে আছে কেরামত আলি। বাল্যকাল থেকে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব। একই সঙ্গে খেলাধুলা। একই সঙ্গে লেখাপড়া। বিদ্যালয়ে একই সঙ্গে কাটিয়েছে। তারপর কলেজ জীবনে এসে রাস্তাটা দুদিকে চলে গেছে। রহমত আলি ছিল কলা বিভাগে। কেরামত আলির ছিল বিজ্ঞান। তবুও দুজনের মধ্যে ছিল সুসম্পর্ক। সংসার জীবনে রহমত আলি হয়েছে ব্যবসায়ী। কেরামত আলি হয়েছে বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মতের দিক থেকে ঘটেছে পার্থক্য।

কেরামত আলির রুগ্ণ চেহারা দেখে রহমত আলি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বাইরে বেরিয়ে এসে খোদেজাকে বলল, ডাক্তার কী বলেছে?

খোদেজা বলল, বলেছে, আরও কিছুদিন সময় লাগবে।

: সে কি ভালো হয়ে যাবে?

: সে-রকম কোনো আশ্বাস দেয়নি ডাক্তার।

: কী সুন্দর চেহারা ছিল- আর এখন কী হয়ে গেছে।

: তুমি পরামর্শ দাও, আমার এখন ওর জন্য কী করতে হবে।

: মসজিদের মুসল্লিদের কাছে দোয়াখয়রত চাও। আল্লাহ পারেন ওর রোগমুক্ত করতে।

: তাহলে আগামী শুক্রবারে মসজিদের ইমাম সাহেবকে বলো, যা কিছু লাগবে আমি- আমি দিয়ে দেব।

: ঠিক আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রহমত আলি।

পরের শুক্রবারে মসজিদে বসে কেরামত আলির জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলেন ইমাম সাহেব।

খোদেজা পাঁচ কেজি মিষ্টি পাঠিয়ে দিয়েছিল মসজিদে।

এই নিয়ে কয়েকদিন চলছে গ্রামের মুসল্লিদের মধ্যে গুড়-গ্যাজাগ্যাজি। কুরফান বিশ্বাস বলল, কেরামত আলি তো ধর্মটর্ম মানে না।

আওয়াল শেখ বলল, এই কারণেই তো- ও ব্যারামে হয়ে গেছে। বিছানা থেকে উঠতে পারছে না।

ইন্তাজ আলিও একই রকম কথা বলল। এটা মানিনে-সেটা মানিনে বললেই হলো ধর্মের বাইরে এরকমই হয়।

এসব কথা শুনে খোদেজার মন আরও বিষণœ হয়ে উঠল। দারুণ একটা উদ্যোগের মধ্যে সময় কাটতে লাগল। লোকেরা যা বলাবলি করছে, তা মিথ্যা নয়। সব কিছু সত্য। সে গলা ঝেড়ে আঙুল নাচিয়ে বলত, আমি পির-দরবেশ মানিনে। ভোগাজ। কেডা কী অভিশাপ দিয়েছে। সেই অভিশাপে রোগে ভুগছে কেরামত আলি। আল্লাহ, তুমি ওর গোনাহ মাফ করে দাও। আমার স্বামীরে তুমি সুস্থসবল করে দাও। যদি ও সুস্থ হয়- তবে আমি পিরের দরবারে বড় একটা গরু মানত দেব।

খোদেজা কেরামত আলির বিছানায় গিয়ে ওর বুকের উপর ডান হাত ছুঁয়ে ঘনঘন দোয়াদরুদ পাঠ করতে লাগল। ইয়া আল্লাহ, তুমি আমার স্বামীকে রোগবালাই থেকে মুক্ত করে দাও।

খোদেজার দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। কেরামত আলি অসহায় হয়ে খোদেজার মুখের দিকে ঝিমমের মতো তাকিয়ে রইল।

চার মাস পর। কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠে দাঁড়ালো কেরামত আলি। এখন নড়েচড়ে এদিকে-ওদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেরামত আলি। রহমত আলিও ওর বাড়িতে দুবেলা তিন বেলা এসে উঠবস করতে লাগল। পাঁচ বেলা নামাজ পড়ছে সে। থুতনিতে দাড়িও বেশ লম্বা হয়ে গেছে। খোদেজার ঠোঁটে হাঁসি ফুটে বেরিয়েছে। কয়েক মাস দারুণ দুশ্চিন্তার মধ্যে কেটেছে। যমের সঙ্গে কেরামতের চলেছে জীবন নিয়ে টানাটানি। শেষপযর্ন্ত কেরামত আলি মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে। আত্মীয়স্বজনরা এসে দেখা করে যাচ্ছে কেরামত আলির সঙ্গে। সংসারটা একেবারে লাটে উঠেছিল। বর্তমান সচল হয়ে উঠেছে। বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া সে করছে। মেপে মেপে কথাবার্তা বলছে এর ওর সঙ্গে। স্বভাবটা আগের মতো নেই। একেবারে অন্যরকম হয়ে উঠেছে সে।

অগ্রহায়ণ মাস। ভোরবেলা ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছিল কেরামত আলি। নামাজ শেষে দোয়াদরুদ পড়তে পড়তে মনে হলো, সে একজন গোনাহগার বান্দা। এযাবৎ অনেক কিছুই না বুঝে গোনাহ করে ফেলেছে। অনুশোচনায় মনটা ভারি হয়ে উঠল।

সে মসজিদ থেকে বেরিয়ে রহমতের বাড়ির দিকে রওনা হলো। রহমত ঘরের মধ্যে জায়নামাজে বসে কোরআন শরিফ পড়ছিল। কেরামত আলি সোজাসুজি ওর ঘরের মধ্যে ঢুকে পাশে গিয়ে বসল। ওকে দেখে অবাক হয়ে গেল রহমত আলি।

ঝিম মেরে মাথা নিচু করে বসে রইল কেরামত আলি।

: কি ব্যাপার, এত ভোরবেলা যে?

: আমি তোমার পির বাবাজির মুরিদ হতে চাই।

: আলহামদোলিল্লাহ।

: বলো, কবে নিয়ে যাবা?

: দেখি, একটু ভেবেচিন্তে দেখি, কবে যাওয়া যায়।

: আমার জন্যে খোদেজা একটা গরু মানত করেছিল, সেই মানতটাও পূরণ করতে চাই। বলো, আমারে তুমি কবে নিয়ে যাবা?

: গরুটা কী কেনা হয়ে গেছে?

: না, কোনো কেনা গরু নয়Ñ আমার বাড়িতে যে এঁড়ে গরু আছে, ওটাই দিতে চাই।

: আলহামদোলিল্লাহ।

: খোদেজার গরু, খোদেজাই মানত দিচ্ছে।

: আল্লাহ খোদেজার উপর রহমত বর্ষণ করুন। তাহলে আমরা দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলি। পিরের বাড়িতে কী খোদেজাও যেতে চায়।

: দেখি, তার কাছে গিয়ে আলোচনা করে দেখি।

খোদেজা কয়েকদিন থেকে মানত দেওয়ার ব্যাপারে তাগিদ দিচ্ছিল। আজ দেব, কাল দেব বলে অনেকদিন পার হয়ে গেছে। মনের ভেতর বিষয়টা এখন বারবার উঠাপড়া করছে। আবার যদি কোনো আপদ বিপদ হয়? একটা মস্তবড় ফাড়া ছিল কপালে। সেই ফাড়াটা থেকে আল্লাহ যখন মুক্তি দিয়েছেন, তখন তার নামে মানত দেওয়ার ব্যাপারে আর গাফেলতি করা ঠিক নয়।

খোদেজা বলল, পনোরো মাইল পথ হেঁটে আমি যেতে পারব না। তোমরা নিয়ে যাও গরুটা।

রহমত আলি বলল, ফাল্গুন মাসের শেষ বুধবারে পিরের বাড়িতে ওরস হয়। সেই সময় নিয়ে যাব গরুটা। আমাদের কাজ হলো, গরুটা পৌঁছে দেওয়। আর মাত্র দুমাস বাকি। একেবারে নাকের ডগায় এসে গেছে সময়টা। তোমাকেও গরুর গাড়িতে করে নিয়ে যাব ভাবী। পিরের কাছে গিয়ে, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই মুরিদ হবা। দেখবা, সংসারে আপদবিপদ থাকবে না। সেই কালে যদি কেরামত আলি আমার সঙ্গে গিয়ে পিরবাবার কাছে মুরিদ হতো, তাহলে তোমাদের সংসারে এত ঝুটঝামেলা হতো না।

খোদেজা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল কোনো জবাব দিল না।

রহমত আলি বলল, সবই কপালের ফের ভাবি। ভেবে কি করবা?

খোদেজা বলল, সেই সেই বেলা শেষ করে মুরিদ যখন হতি হচ্ছে, তখন সেই কালে মুরিদ হলে তো কোনো ক্ষেতি ছিল না। আসলে লোকটা হলো গিয়ে এক-বেঁকে। কারো কথা শুনতি চায় না। পিরফকিরদের ইন্নাত করতি নেই। উনি গার জোরে বলতেন, মানিনে। এখন দিব্যি পশ্চিমমুখো কপাল ঠুকছে পাঁচ বেলা।

: এটাও একটা আল্লাহর রহমত ভাবি।

: হ্যাঁ, এতকাল মতিগতি ছিল একরকম- এখন অন্যরকম হয়ে উঠেছে।

: পির বাবাজির কাছে মুরিদ হলি, দেখবা, আরো অন্যরকম হয়ে উঠবে।

: সেই দোয়া করো ভাই।

ফাল্গুন মাসে পিরের বাড়িতে গিয়ে মুরিদ হয়ে এল কেরামত আলি। খোদেজারও যাওয়ার কথা ছিল। সেই সময় চলছিল তার ঋতুকাল। অগত্যা রহমত আলির সঙ্গে কেরামত আলি মানতের গরুটা নিয়ে শব্দেলপুরে পির সাহেবের আস্তানায় গিয়ে হাজির হয়েছিল। পিরের বাড়িতে গিয়ে কেরামত আলি দেখল এলাহিকা- একটা। বাড়িটার পাশে বেশ বড় একট ময়দান। চারদিকে লোকে-লোকারণ্য। মস্তবড় একটা শামিয়ানা টাঙানো। ওয়াজ-নসিহত চলছে। দুদিন ধরে চলবে এই ওয়াজ-নসিহত ও জিকির। ময়দানের একপাশে চলছে রান্নাবান্না। একদিকে গরু। আর একদিকে ছাগল। পির সাহেবের মুরিদরা বস্তাবস্তা চালডাল এনে মজুদ করেছে। খাওয়াদাওয়ার কোনো কমতি নেই।

কেরামত আলি রহমত আলির সঙ্গে ঘুরতে লাগল। পির সাহেবের মুরিদরা এসে জড়িয়ে ধরতে লাগল রহমত আলিকে। বেশ মান্যিগুন্যি লোক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে সে এখানে। যেই দেখছে- সেই সালাম জানাচ্ছে ওকে। বুকে বুক লাগিয়ে চলে যাচ্ছে অন্যদিকে। রহমত আলি বলল, এরা হলো আমার মুরিদ ভাই। পিরসাহেবের ডাকে সব চলে এসেছে। কেমন লাগছে তোর বল?

: তোর সঙ্গে এখানে এসে ভালো লাগছে।

: বুঝলি, এখানে একবার আসলে, অন্য কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না।

: আমারও তাই মনে হতেছে।

: আমাদের উপরে যারা আছে- তারা হলো পির সাহেবের খলিফা।

: সে আবার কে?

: যাদের মাথায় আছে পাগড়ি- ওরাই হচ্ছে খলিফা। আমি এখনও খলিফা হতে পারিনি। দেখি, পিরবাবাজির আমার ওপর নেকনজর কবে পড়ে? প্রাণখোলা একটা হাসি দিয়ে বুক উচুঁ করে দাঁড়াল রহমত আলি। হাঁটতে হাঁটতে সদর মহল থেকে অন্দর মহলের দিকে চলে গেল ওরা। পিরবাবা একটা বড় কামরায় বালিশে ঠেস দিয়ে বসে আছেন। কামরাটা বেশ সাজানো গোছানো। ধূপের গন্ধে কামরাটা ভরে উঠেছে। তসবি টিপছেন পিরবাবা। মাঝে মাঝে হেক্কা মারছেন-‘ইয়া মাওলা’। কয়েকজন খলিফা শাদা লুঙ্গি এবং ঝুলওয়ালা পাঞ্জাবি পরে জিকির করছেন। মাথায় শোভা পাচ্ছে সবুজ পাগড়ি।

আস্তে আস্তে কামরার মধ্যে ঢুকে পিরবাবার সামনে গিয়ে মাথাটা উবুড় করে নিজের উপস্থিতির কথা জানাল রহমত আলি। কেরামত আলিও একই রকম করে মাথাটা উবুড় করে থাকল।

পিরবাবা ওদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, সোজা হয়ে বসো। ওরা দুজন সোজা হয়ে নামাজ পড়ার মতো হাঁটু মুড়ে বসল।

পিরবাবা ‘হক মওলা’ বলে চিৎকার করে উঠলেন। বাতাসে শব্দটা কেঁপে উঠল।

: বাবা আমার দোস্তকে নিয়ে এসেছি। মুরিদ হতে চায়।

: কি নাম?

: কেরামত আলি।

পিরবাবা কেরামত আলির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আবার জোরে ‘হক মওলা’ বললেন। চোখ দুটো ইশারা করে কেরামত আলিকে আরও সন্নিকটে আসতে বললেন।

: মুরিদ হতে গেলে নিজেকে কায়মনোবাক্যে কোরবানি করতে হয়। নিজেকে উজাড় করে দিতে হয়। তা না করতে পারলে মুরিদ হওয়ার দরকার নেই। সহায়-সম্পদের প্রতি যদি মায়া মহব্বত থাকে- তবে মুরিদ হওয়া যাবে না। কঠোর সংযম ছাড়া এ কাজে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়। এ-ব্যাপারে কতটুকু প্রস্তুতি নিয়ে এসেছো, এটা আমি জানতে চাই।

কেরামত আলি হাত জোড় করল। মিনতির স্বরে সে বলল, আপনার দরবারে এসেছি, আমাকে দয়া করেন বাবা। আপনি যে আদেশ-নির্দেশ করবেন, অক্ষরে অক্ষরে আমি পালন করব, বাবা।

: ‘হক মওলা’। ঘরের বাতাস কেঁপে উঠল।

পিরবাবা একটা শাদা কাপড় কেরামত আলির সামনে ছুঁড়ে দিলেন। কেরামত আলি কাপড়ের প্রান্ত ধরে পির সাহেবের মুখোমুখি বসল। পির সাহেব ওর মাথার তালুতে একটা শাদা রুমাল তুলে দিলেন।

: বলো, আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে তওবা করছি। অতীতে যে গোনাহ করেছি, ভবিষ্যতে আর করব না। পিরবাবার খিদমতের জন্যে নিজেকে সমর্পণ করলাম। আজ থেকে আমি পিরবাবার খাদেম হয়ে গেলাম। বলো ‘হক মওলা’-

কেরামত আলি ‘হক মওলা’ বলে মাথা নিচু করে রইল।

পিরবাবা কেরামত আলির মাথায় হাত রাখলেন, আমার চোখের দিকে তাকাও।

কেরামত আলি পিরবাবার চোখের দিকে তাকাল।

পিরিবাবা নিজের ডান হাত ওর মাথার ওপরে তুলে কয়েকবার শূন্যে ঘুরালেন। বিড়বিড় করে অস্ফুটস্বরে কি একটা আওড়ালেন তারপর ‘হক মাওলা’ বলে জোরে হাঁক মারলেন।

বললেন, উঠে দাঁড়াও।

কেরামত আলি উঠে দাঁড়াল।

: পশ্চিম দিকে মুখ রাখো।

কেরামত আলি পশ্চিম দিকে মুখ রাখল।

: কাবামুখো হয়ে সিজদা করো দুবার। বলো, ‘হক মাওলা’।

পিরবাবার নির্দেশমতো কেরামত আলি সিজদা করে ‘হক মাওলা’ বলল।

 

: এবার তোমার ডান হাত দিয়ে আমার ডান হাত ধরো।

কেরামত আলি পিরবাবার ডান হাত ধরল।

পিরবাবা ওর হাতের মুঠোর মধ্যে পুরে দিলেন একটা ধাতুর মাদুলি।

: উঠে দাঁড়াও। পুব, পশ্চিমে, উত্তর, দক্ষিণে আস্তে আস্তে ঘুরে চারবার সালাম জানাও।

কেরামত আলি চারদিকে ঘুরে ঘুরে চারবার সালাম জানাল।

: যাও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শেষে একশবার হক মাওলার নামে জিকির করবা। এই পরীক্ষায় যদি তুমি উত্তীর্ণ হও, তবে আরও দুটি সিঁড়ি তোমাকে পার হতে হবে। যাও। বাইরে ওয়াজ নসিহত চলছে, ওখানে গিয়ে শরিক হও। এক মাস পর আমার এই দরবারে আসবা, তখন আরও কিছু বয়াত তোমাকে দেওয়া হবে। আজ থেকে তুমি আমার মুরিদ হয়ে গেলে।

রহমত আলি ওকে নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। কেরামত আলির নাকে তখনও বাতাসে ভেসে আসছে সুগন্ধি ধূপের গন্ধ। মনে হলো, একটা ঘোরের মধ্যে মুগ্ধ হয়ে বহুক্ষণ বসেছিল সে।

শব্দেলপুর থেকে পিরের মুরিদ হয়ে বাড়িতে ফিরে এলে কেরামত আলি। পরনে সাদা লুঙ্গি আর সাদা পিরহান। মাথায় সাদা গোলটুপি। একেবারে পুরোপুরি নিজেকে বদলে ফেলল কেরামত আলি। পায়ে চটি স্যান্ডেল। ঘাড়ে একটা সাদা গামছা। যেখানে যাচ্ছেÑ সেখানেই গিয়ে বলছে পিরবাবার কেরামতির কথা। এমন কামেল পির এবং তার নুরানি চেহারা কেরামত আলি এর আগে কখনও দেখেনি। বিদ্যালয়ে গিয়েও তার ছাত্র এবং সহকর্মীদের সঙ্গে পিরের কেরামতির কথা বলতে লাগল। বুঝলেন, পির ছাড়া মুক্তি নেই। পিরবাবা যখন ‘হক মাওলা’ বলে হাঁক মারলেন, তখন দিব্যি দেখতে পেলাম, তার চোখ দিয়ে বেহেশতের দ্যুতি বেরিয়ে আসছে। বাতাসে সারা ঘরটা গোলাপি গন্ধে ভরে উঠল। মনে হতে লাগল, শূন্য আকাশের তলে আলো আর আলো। পিরবাবা আমার মাথার উপরে তার ডান হাতটা যখন রাখলেন, মনে হলো, আমি একটা ফুলের উদ্যানে বসে আছি। তোমরা যে যা বলো, এখন বুঝতে পারছিÑ পির ছাড়া মুক্তি নেই। নিজের অনুভূতির কথা বলতে বলতে হাওহাও করে জোরে কেঁদে উঠল কেরামত আলি, ইয়া মাওলা, অতীতে যে গোনাহ করেছি, তুমি মাফ করে দাও।

বিদ্যালয়ে আগে যেভাবে বিজ্ঞানের পাঠ দান করত, এখন সেভাবে পাঠ দান করে না কেরামত আলি। কেমন যেন একটা ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে চেয়ারে বসে থাকে সে। উদাস উদাস ভাব। মুখ থেকে ঘনঘন নির্গত হয় ‘হক মাওলা’ শব্দ। নিজের ভেতরে নিজেই ডুবে থাকে কেরামত আলি। ইদানীং ছাত্ররা কেরামত আলিকে ‘হক মাওলা’ স্যার নামে অভিহিত করছে। শিক্ষকরাও কেউ কেউ টীপ্পনী কেটে হাসাহাসি করে। বাড়িতে একটা ঘর তৈরি করে নিয়েছে সে। সেই ঘরে ঢুকে জিকির করে। যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, ততক্ষণ চলে জিকির। হক মাওলা শব্দে বাড়িটা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। দূর থেকে শোনা যায় জিকিরের শব্দ।

প্রতি মাসে শব্দেলপুরে গিয়ে পিরবাবার সঙ্গে দেখা করে আসে কেরামত আলি।

পিরবাবার সামনে থাকে একটা বড় কাঁসার থালা। সেখানে গেলেই পিরের মহব্বতের জন্য নজরানা দিতে হয়। নজরানার পরিমাণ হলো মোটা অঙ্কের টাকা। কেরামত আলি বিদ্যালয় থেকে প্রতিমাসে যে মাইনে পায়-তার চার ভাগের তিন ভাগ টাকা পিরবাবার খিদমতে উজাড় করে দেয়। শুধু কেরামত আলি নয়Ñদিগরে যত পিরবাবার মুরিদ আছে, সকলেই খুশিমনে দিয়ে যায়। যে যত বেশি দেয় সেই হয় পিরবাবার তত প্রিয় ভক্ত।

যতই দিন যাচ্ছে- ততই নিজের সংসারের প্রতি আরও উদাসীন হয়ে উঠছে কেরামত আলি। সংসারের হাল অবস্থা আগের মতো নেই। ক্রমান্নয়ে অবনতি ঘটছে। তিনটে অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান নিয়ে সংসারটা বেশ সুহালেই চলছিল খোদেজার। না ছিল কোনো অভাব অনটন- না ছিল কোনো অশান্তি। দিব্যি বেশ সংসারটা সুখ-সমৃদ্ধিতে আরও উন্নত হয়ে উঠছিল।

পিরের মুরিদ হওয়ার পর থেকে সংসারে নানারকম কষ্ট দেখা দিয়েছে। কর্মের প্রতি মন নেই- শুধু ঘরে বসে জিকিরের পর জিকির। সপ্তাহে একদিন মুরিদ ভাইয়েরা এস দল বেঁধে জড়ো হচ্ছে। তাদের সেবার কাজেও খরচ হচ্ছে একটা মোটা অঙ্কের টাকা।

কেরামত আলির আস্তানাটা মুরিদ ভাইদের পদার্পণে বেশ জাঁকজমক হয়ে উঠেছে। আশপাশের গ্রাম থেকে মুরিদ ভাবীরা এসে জিকির করছে। সারা রাত ধরে চলে জিকির। উঠোনের একপাশে চলে খিঁচুড়ি রান্না। শেষ রাতে জিকির শেষ হলে শুরু হয় লম্বা একটা মোনাজাত। মুরিদদের কণ্ঠ থেকে ভেসে আসে বুকফাটা কান্নার রোল। ভোরের বাতাস চিরে কান্নার রোল আসমানে উঠে তোলপাড় শুরু করে। তারপর মুরিদদের মধ্যে বিতরণ করা হয় তবারক। প্রতি সপ্তাহে চলে এই আয়োজন।

কেরামত আলির জিকির করা নেশার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময় পেলেই জিকির করে সে। সংসারের দিকে খেয়াল নেই। এখন এমন একটা অবস্থা হয়েছে যে একেবারে শূন্যের কোঠায় এসে পৌঁছেছে কেরামত আলি।

খোদেজা বলল, হাতে যা টাকা ছিল, সব তো উড়িয়ে দিলে, এখন করবাডা কি?

: কেন? টাকা নেই? আল্লায় চালাচ্ছেন, তিনিই চালাবেন।

: এরকম বেহিসেবির মতো খরচ করলে, টাকা থাকে নাকি? একদিকে দিচ্ছো পিরবাবার দরবারে, আরেকদিকে খরচ করছো মুরিদভাইদের আস্তানায়। ছেলেমেয়েদের হাল অবস্থা কেমন হয়েছে, তাকিয়ে কখনও দেখেছ নাকি?

: ভালোই তো আছে দেখছি।

: আমারও পরনে কাপড় নেই। ছেঁড়া কাপড় পরে বেড়াচ্ছি। ঘরেও কিছু নেই। সংসারটা কিভাবে চলছে, একবারও তাকিয়ে দেখনি।

: চুপ কর। পিরবাবা বলেছে, সাধনভজন করতে গেলে ত্যাগী হতে হয়। এটা আমার জন্য একটা পরীক্ষা। পিরবাবার নির্দেশ মতো চলছি। আল্লাহ আমারে পরীক্ষা করতেছে। সংসারে কষ্টভোগ মানে পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় যদি আমি টিকে থাকতে পারি, তবে সামনে আমাদের জন্যে সুখ আসতেছে। একটু কষ্ট কর। সামনে সুখ আসতেছে।

খোদেজা বোবার মতো তাকিয়ে রইল কেরামত আলির দিকে।

কেরামত আলি বলল, তুই একটা কাজ কর খোদেজা, ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়িতে চলে যাÑ

খোদেজার দুই চোখে পানি নেমে এল। শাড়ির আঁচলে মুখটা ঢেকে কেরামত আলির সামনে থেকে উঠে গেল সে। মনে হলো মাথাটা তার ফনফন করে ঘুরপাক খাচ্ছে। চারদিক থেকে অন্ধকার নেমে আসছে। দারুণ একটা হতাশার মধ্যে ডুবে যেতে লাগল খোদেজা। পরিবার-পরিজন নিয়ে একটুও চিন্তা নেই কেরামত আলির। তারা তিনবেলা খেলো কি খেলো নাÑবাঁচল কি বাঁচল না এটা নিয়েও কোনো চিন্তা নেই লোকটার। একমাত্র তার মুখ্য কাজ হয়ে উঠেছে জিকির করা। সকালে জিকির। বিকালে জিকির। সন্ধ্যার পর থেকে রাত দুপুর পযর্ন্ত জিকির। জিকিরের শব্দে বাড়িটা গমগম করে। পরিবেশটাও দূষিত হয়ে উঠেছে। ছেলেমেয়েদের রাতের বেলা ঘুম হয় না। নিজেও ঘুম পাড়তে পারে না খোদেজা। জিকিরের আকাশ কাঁপানো আওয়াজ কানের মধ্যে ঢুকে মাথার খোড়লে গিয়ে ঘা মারে।

খোদেজার বাবামা একদিন দেখে গেছে সংসারের এই অস্বস্তিকর অবস্থা। হাল আমলের এই করুণ অবস্থা দেখে তারা খোদেজাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। খোদেজা যেতে চায়নি। তার হাত দিয়েই গড়ে উঠেছে এই সংসার। যেদিকে সে তাকায়Ñ সেদিকেই দেখে সে তার হাতের স্পর্শ। প্রায় একযুগ লেগেছে এই সংসার গড়ে তুলতে। স্পষ্টই সে বলে দিয়েছিল, না, আমি কোথাও যাব না, শেষ দশা দেখেই তবে যাব।

বাবা আর মা তাকে সাধাসাধি করলেও খোদেজা তার নিজের গড়া সংসার থেকে চলে যায়নি।

ক্রমান্নয়ে সংসারে আরও অবনতি দেখা দিয়েছে। বাবা, মেয়ের এই দুর্দশা দেখে চালডাল কিনে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সংসারে মেয়ের সুখের আশায় নগদ অর্থ দিয়েও সাহায্য করেছেন। জামাই বাবাজির অচল সংসার সচল করার ব্যাপারে শ্বশুরের উদ্যোগের কমতি নেই।

খোদেজা এ নিয়ে বাপের সঙ্গে ঝগড়া ফ্যাসাদও করেছে।

: তুমি এভাবে দান-খয়রাত করো না বাবা।

: আমি তো দান খয়রাত করছিনে মা, আমাকে তুই কি মনে করিস?

: না বাবা সবাই বলছেÑ

: যে যা বলে বলুক, কান দিবিনে। তুই যদি না খেয়ে থাকিস, কেউ তোকে খেতে দেবে না। এই জগতে কেউ কারও নয়।

: তুমি এভাবে কতকাল দিবা? একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিল খোদেজা।

: আমিতো চেয়েছিলাম মা, আমার সন্তান যেন থাকে মহাসুখে। এখন তোর দুঃখের সময়, এই দুঃখ হরণও আমাকে করতে হবে। আমার কর্তব্য আমাকে করতে দে মা।

বিষয়টি মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেনি খোদেজা। পাড়া-পড়শিরাও নানারকম কটু মন্তব্য করে। মানসিক একটা যন্ত্রণায় ভুগছে বেশ কিছুকাল থেকে। যতই দিন পার হচ্ছে ততই বাড়ছে এই যন্ত্রণা।

মাঝে মাঝে ঘরের মধ্যে বসে কাঁদে খোদেজা। বুকের ভেতর থেকে ছটফট করে বেরিয়ে আসে চাপা দীর্ঘশ্বাস। মনটা তখন কাটা মুরগির মতো আরও গভীর যন্ত্রণায় লাফালাফি করে। কোথায়ও স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারে না। একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা বুকের মধ্যে চেপে রেখে দিন কাটাতে লাগল। আর কতদিন বাবা-মা এই সংসারের রসদ যোগান দিয়ে যাবে? বাবারও এখন বয়স হয়েছে। প্রায় সত্তরে গিয়ে পা দিয়েছেন। আর্থিক অবস্থাও আগের মতো নেই। ক্রমান্নয়ে শরীর ব্যারামে হয়ে যাচ্ছে। কোমরটা সামান্য নড়বড়ে হয়ে যাওয়ায় সোজা হয়ে হাঁটাহাঁটি করতে পারেন না। বুড়ো হলে যা হয়, তাই হয়েছে। আট ছেলে তিন মেয়ের জনক। মাও বাতের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন। এই বয়সে সংসারের খুঁটিনাটি নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন তবুও। ভাইদের মধ্যে কারও সুসম্পর্ক নেই। কেউ কারও পছন্দ করে না এক একটার এক এক রকম স্বভাব। কে কোন সম্পত্তির মালিক হবে, এটা নিয়ে বিরোধ বাঁধছে। সবাই এখন আলাদা হওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে বুড়োবুড়ির ওপর। বাবাও বিষয়টা নিয়ে শলাপরামর্শ করছেন। যত গোলমাল হচ্ছেÑ ততই বাবা দিশা হারাচ্ছেন। এর পরে যে কি হবে, ভবিতব্যই জানে। ভাবতে গিয়ে মাথাটা টলে উঠল খোদেজার। বাবার সাহায্য করার ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সাধ্যে কুলোবে না। তখন কি হবে খোদেজার?

মাথার মধ্যে বিষয়টা ঢুকতেই শরীরটা হঠাৎ মোচড় মেরে উঠল। মনে হলো টাল খেয়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে খোদেজা। আজ একটা অভাব তো কাল আর একটা অভাব। অভাবের সঙ্গে চাহিদাও দ্বিগুণ পরিমাণে বাড়ছে। খাই খাই ভাবটা কখনও মিটছে না।

নানারকম দুশ্চিন্তা মাথার খোড়লে ঢুকে বিষাক্ত সাপের মতো কামড় মারছে। সংসারের জ্বালাযন্ত্রণা সব চেপে বসেছে তার ওপরে।

খোদেজা কেরামত আলির উপর রাগ ঝাড়তে লাগল। সারাদিন জিকির করা ছাড়া তোমার আর কোনো দায়িত্ব নেই? পির সাহেব কি সংসার করতেও নিষেধ করেছে?

কেরামত আলি খোদেজার কথা গ্রাহ্য করেনি। এক কান দিয়ে শুনেছে। অন্য কান দিয়ে বার করে দিয়েছে। চোখ দুটো বড়বড় করে ওর দিকে তাকিয়ে শাসন করেছে।

: মেলা ফ্যাচফ্যাচ করিস ক্যান? সংসারে অভাব দিতেছে কেডা? কষ্টও দিতেছে কেডা? হক মাওলা এসব দিয়ে পরীক্ষা করতেছে।

খোদেজাও সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিয়েছে, যত অভাব আর অনটন কেবল তোমার সংসারে? আরও তো অনেকেই মুরিদ হয়েছে। তুমিও পিরবাবার মুরিদ, রহমত আলিও পিরবাবার মুরিদ। তার সংসারে অনটন নেই। সেও জিকির করছে, তুমিও জিকির করছ, কই, হক মাওলা তো তার সংসারে অভাব দিয়ে পরীক্ষা করেনি। যত পরীক্ষা সব তোমার ক্ষেত্রে? সে-তো দুনিয়াদারি বাদ দিয়ে সারাদিন জিকির করে না। আড়তদারি করে নিজের অবস্থা কেমন অর্থবিত্তে পূর্ণ করে তুলেছে। তোমার সংসার তো গিয়েছে আরও অধঃপতনে। আর কত পরীক্ষা দিবা কও?

কেরামত আলি খোদেজার কথা শুনে গরম হয়ে উঠল।

: এই, রহমতের সঙ্গে আমারে তুই তুলনা করলি ক্যান?

: রহমত আলিও মুরিদ যার- তুমিও মুরিদ তার। সে তার বউ বাচ্চাদের সুহালে রেখেছে,- আর তুমি? আমরা কি খেলাম, আর না খেলাম, আমরা কি পরলাম, আর না পরলাম, একবারও কি তাকিয়ে দেখেছো?

: দেখ, আমার কাজ আর রহমত আলির কাজ একরকম নয়, আমি যা চাই, রহমত আলি তা চায় না। ওর অবস্থা ভালো হচ্ছে কি মন্দ হচ্ছে, ওটা আমার দেখার ব্যাপার নয়- পিরবাবা আমাকে যা করতে বলেছে, আমি সেটাই করছি। তুই কথা বলার কেডা?

: তবে আমরাইবা এখন করব কী? থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও। শুটকো হয়ে মরতে পারব না।

আরও ক্ষিপ্ত হযে উঠল কেরামত আলি। আমি তোকে বলে দিয়েছি না আমার কাজের ব্যাপারে কখনও নাক ঢুকাবিনে? সংসার নিয়ে আমার কোনো ভাবনাচিন্তা নেই- সংসার চলতেছে কি চলতেছে না- সেটাও আমার দেখার দরকার নেই। তোরে আমি সাবধান করে দিচ্ছি- আর কখনও বিরক্ত করবিনে। যা-সামনে থেকে চলে যা- সংসার চলুক আর না চলুক, হক মাওলা বুঝবেন।

সেই থেকে কেরামত আলির মতো কেরামত আলি চলছে। খোদেজাও চলছে খোদেজার মতো। এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে একই বাড়িতে থাকলেও কেউ কারও ছায়া মাড়ায় না। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও আগের মতো নেই। ক্রমান্বয়ে আরও দূরত্ব বেড়েছে। কেউ কারও ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে না। বেগানা পুরুষের মতো চলাফেরা করছে কেরামত আলি। সে একটা আলাদা ঘরে জিকির করে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। ঘনঘন চিৎকার করে হক মাওলা বলে। হক মওলা আর পিরবাবার নাম করে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা পার করছে। রাতের বেলায়ও একই রকম। জিকিরের পর জিকির। মাঝে মাঝে সাইকেলে চড়ে রহমত আলিও আসে। কখনও কখনও দল বেঁধে ঘরে ঢোকে আশপাশের মুরিদভাইরা। সারা রাত ধরে চলে জিকির। জিকিরের শব্দে সারা গ্রামটা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

কেরামত আলির মাথার মধ্যে একটা চিন্তা। পিরবাবাকে সন্তুুষ্ট করা। অর্থ-বিত্ত। সহায়-সম্পত্তি। সব হক মাওলার। দুনিয়ায় যা কিছু আছে- সব হক মাওলার। পিরবাবাকে খিদমত করা মানে হক মাওলাকে খিদমত করা। পিরবাবার দরবার মানে হক মাওলার দরবার। এই দরবারে যে নিজেকে উজাড় করে দেবে সেই হবে খাঁটি বান্দা। দুনিয়াদারির মোহ ত্যাগ করতে পারলেই- সে হবে পিরবাবার খলিফা। পিরবাবার খলিফা হওয়া মানে হক মাওলার খলিফা।

ঘর-সংসার। পরিবার-পরিজন। দুনিয়াদারি। কেরামত আলির কাছে হয়ে উঠেছে তুচ্ছ। সে হক মাওলার খলিফা হতে চায়। পিরবাবার খলিফা হতে চায়। পিরবাবার দরবারে খাদেম হতে চায়। সহায়-সম্পত্তি অর্থ বিত্ত পিরবাবার দরবারে উজাড় করে দিয়েছে কেরামত আলি। এখনও মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়নি। কবে পূরণ হবে তাও সে জানে না।

প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের শেষ বুধবারে পিরবাবার দরবারে বিশাল একটা উরস হয়। দেশবিদেশ থেকে বহুলোক উরসে এসে হাল্কা জিকিরে অংশগ্রহণ করে। দুদিনব্যাপী চলে এই উরস উৎসব। ছাগল, গরু, চাল, ডাল, মাল-মসলা কে-বা কারা কোথা থেকে পাঠায়, তা কেউ বলতে পারে না। হাজার হাজার লোক খায়, জিকির করে। পিরবাবার দরবারে ঢুকে পিরবাবার কাছে দোয়া চায়। পিরবাবা দুএকজনকে খুশি হয়ে জরি মোড়ানো সবুজ একটা মনোরম পাগড়ি মাথায় পরিয়ে দিয়ে খলিফা হিসাবে ঘোষণা দেন। বলেন, এই হলো হক মাওলার খলিফা। আল্লাহু আকবর বলে সমবেত মুরিদ ও জনগণ ঘনঘন তকবির দিয়ে সবুজ পাগড়ি পাওয়া খলিফাকে সম্মান জানায়।

এই দৃশ্য বেশ কয়েকবার উরস উৎসবে অংশগ্রহণ করে কেরামত আলি দেখে এসেছে। এটা একটা মনোপ্রাণ মুগ্ধ করার অনুষ্ঠান। কেরামত আলিরও মনোবাঞ্ছা, সে খলিফা হতে চায়। একটা জরি মোড়ানো সবুজ পাগড়ি মাথায় পরে দরবারে পিরবাবার নৈকট্য পেতে চায়। জিকির করতে করতে কখনও বেহুশ হয়ে যায় কেরামত আলি। তখন তার কোনো চেতনা থাকে না। এতটা করেও এখনও পাগড়ি পায়নি কেরামত আলি। রাতের বেলা ঘুমের ঘোরে প্রতিনিয়ত সে দেখতে পায় একটা সবুজ পাগড়ি। পাগড়িটা মাথার উপরে ঘুরতে ঘুরতে উধাও হয়ে যায়। একটা বেহেশতি সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতে থাকে। ঘুমের ঘোরে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে ওঠে কেরামত আলি। ইয়া মাওলা, তুমি এই অধম বান্দার মনের বাঞ্ছা করে দাও। ইয়া মাওলা, আমার দিকে তুমি একটু নেকনজর দাও। ইয়া মাওলা, তুমি আমার প্রতি রহমতের বারি ঢেলে দাও। ইয়া মাওলা, তোমার খিদমত করার তওফিক আমাকে দাও। সে ঘুমের মধ্যে কাঁদতে কাঁদতে দেখতে পায় আসমান থেকে সবুজ পাগড়িটা নূরের ঝালরে ভাসতে ভাসতে তার দিকে আসছে। শিয়রের কাছে এসে ঘুরপাক খেতে থাকে পাগড়িটা। দুই হাত বাড়িয়ে ধরতে চায় সে।

হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যায় কেরামত আলির। সে বুঝতে পারে না বিষয়টি কি। অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকে কেরামত আলি। কোনো কথা বলে না। স্বপ্নের ঘোর কাটে না। পাগড়ির উড়ে আসার দৃশ্যটা তখনও সে আলগোছে দেখতে পায়। পাগড়িটা উড়ে বেড়াচ্ছে। বাতাসে ভাসছে। ধরতে গেলেই উধাও হয়ে যায়।

প্রতিটি রাতের বেলা উদ্বেগের মধ্যে কখনও জাগরণে, কখনও আঁধা জাগরণে মুহূর্ত পার করছে কেরামত আলি। ইদানীং দিনের বেলায়ও পাগড়ির উড়ন্ত দৃশ্য দেখতে পায় সে। বাড়ির দক্ষিণ দিকের বাঁশ বাগানের মাথার ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে বাড়ির ওপরে এসে ঘুরপাক খায়। কেরামত আলি চোখদুটো উদাস করে পাগড়ির উড়ন্ত দৃশ্য দেখে। যতই দেখে, ততই উদাস হয়ে যায় কেরামত আলি। পাগড়ির উড়ে বেড়ানোর রহস্যটা সে বুঝতে পারে না। আফসোসে বুক ফেটে যেতে লাগল কেরামত আলির।

বিষয়টি রহমত আলিও শুনল। এরকম কেন যে হচ্ছে, এর কোনো কারণ খুঁজে পায় না রহমত আলি।

: নাহ, আমিও কিছু বুঝতে পাচ্ছি না।

: কোনো বাঁধাবিঘ্ন আছে নাকি? কেরামত আলি বলল।

: তা হতে পারে বৈকি। রহমত আলি মাথা নাড়ল।

পরের দিন ভোরবেলা ফজরের নামাজ পড়ে দুজনে শব্দেলপুরে পিরবাবার উদেশ্যে রওনা হলো। ভাঙা চোরা রাস্তা। ওরা হাঁটতে লাগল। মনের মধ্যে দুশ্চিন্তা। পাগড়িটা একমাত্র দুর্ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রহমত আলি আগে আগে হাঁটছে। পেছনে হাঁটছে কেরামত আলি। দৃষ্টিটা পথের দিকে নয়। দৃষ্টিটা আকাশের দিকে। তার কাছে মনে হতে লাগল, পাগড়িটা যেন তাকে অদৃশ্য থেকে ডাকছে। দুপুর বেলা পিরবাবার আস্তানায় গিয়ে হাজির হলো দুজনে। মনটা উতলা হয়ে আছে। মাথার ভেতরে শুধু চিন্তা আর চিন্তা। চিন্তা পাগলা কুকুরের কামড়ের মতো যন্ত্রণা সৃষ্টি করছে।

পিরবাবা এই সময় দরবারে বসে রোগে ভোগা মানুষদের ঝাড়ফুঁক দেন। রোগীদের অবস্থা দেখে কারও কারও তেল পড়া এবং মাদুলিও দেন। দরবারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে শ, শ ব্যাধিগ্রস্ত মানুষেরা। কয়েকজন মুরিদ ভিড় করা রোগীদের সামাল দেয় এবং এক এক করে পিরবাবার সামনে হাজির করে। পিরবাবা এই সময় একমাত্র রোগী ছাড়া অন্যকারও সঙ্গে মোলাকাত করেন না। মুরিদদের সঙ্গে তিনি মোলাকাত করেন এশার নামাজের পরে। কেরামত আলি আর রহমত আলি অতিথিশালায় গিয়ে বিশ্রাম করতে লাগল।

রহমত আলি বলল, আজকের দিনটা আমার মাঠে মারা গেল। চার গাড়ি পাট আসবে বিকেলে। এখন করি কি বলো তো?

কেরামত আলি বলল, পিরবাবার সঙ্গে মোলাকাত করতে এসেছি, মোলাকাত না করে তো যাওয়া যাবে না।

: হ্যাঁ, এটাও তো একটা ব্যাপার। আড়তদারি আমার শিকেয় উঠে গেল।

: তবে কি বলতে চাচ্ছিস, বল?

: ত্ইু তো পাগড়ি নিয়ে ভাবছিস, আমি ভাবছি আড়তদারি নিয়ে।

: তবে তুই সঙ্গে করে নিয়ে এলি কেন?

: ভেবেছিলাম , এ বেলায় যাব- দুপুরের পরে ফিরে আসব। পিরবাবার সঙ্গেও মোলাকাত হবে, আড়তদারিও করা হবে।

: এখন তো দেখছি, আর একটা মুসিবত। এশার নামাজের আগে ওনার সঙ্গে মোলাকাত হবে না। আমি তো জানতে চাচ্ছি পাগড়ির রহস্য নিয়ে।

: এসেই যখন পড়েছি- তখন রাতটাও পার করতে হবে। এ-রকম ঘটনা যে ঘটবে, জানতে পারলে আসতাম না। বুঝলি, ফজরের নামাজের আগেই কেটে পড়তে হবে। তা‘না হলে, আগামীকালও ব্যবসার ক্ষতি হবে।

বসে বসে দুজনেই হেঁটে আসার ক্লান্তি ঝাড়তে লাগল। ঘনঘন হাই ছাড়তে লাগল রহমত আলি। কেরামত আলি তসবি টিপতে শুরু করল। বিশ লাখ পঞ্চাশ হাজার এখনও শেষ হয়নি। শেষ করতে পারলেই একটা ফজিলত। মনে মনে যা চাইবে, তাই সে পাবে। এর পরে রয়েছে দোয়াদরুদ।

রহমত আলি আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে একবার বাইরে যাচ্ছে, আবার কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরেফিরে অতিথিশালায় ঢুকছে। সময়টা কোনোক্রমেই শেষ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে দুপুরটা স্থির হয়ে আছে। এখনও বিকেলের দীর্ঘ ছায়া পড়েনি। পিরবাবার দরবারের সামনে প্রচুর মানুষের সারি। ক্রমান্বয়ে সারিটা লম্বা হচ্ছে।

রহমত আলির শরীরটা তন্দ্রায় ঢুলতে লাগল। এই সময় গৃহে থাকলে চোখ বুঝে আরামে নাক ডেকে ঘুমুতো সে। সেই ঘুমটা আজ মাঠে মারা গেল। একটা অস্বস্তি বোধে ছটফট করতে লাগল রহমত আলি। কেরামত আলি তসবি গুনছে। মাঝে মাঝে জিকির দিচ্ছে। চোখ দুটো বন্ধ। আসরের নামাজের আজান ভেসে আসছে। পাশেই মসজিদ। নামাজ পড়তে ছুটল রহমত আলি আর কেরামত আলি।

শীতের বেলা। কুয়াশা নামছে। সূর্যের আলো স্তিমিত হয়ে আসছে। হিমহিম বাতাস। রহমত আলির মনে হতে লাগল, তার মনের মধ্যে যে অস্থিরতা ছিল, সেই অস্থিরতা এখন নেই। মনটা এখন শান্ত হয়ে এসেছে। মসজিদের পরিবেশটা আরও শান্ত ও গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ। পিরবাবা বয়ান দিচ্ছেন। কেরামত আলি আর রহমত আলি বসে বসে বয়ান শুনতে লাগল। মাগরিবের নামাজ পর্যন্ত চলল এই বয়ান। পিরবাবা নামাজ শেষে মুরিদদের নিয়ে জিকির করতে লাগলেন। জিকিরের ধ্বনি বাতাসে হিল্লোল তুলে চারদিকে ছড়িয়ে      পড়তে লাগলো। আস্তে আস্তে একসময় জিকিরের ধ্বনি স্তব্ধ হয়ে গেল। এশার পর খোদ পিরবাবা বললেন, তোমাদের মধ্যে যদি কারও কোনো সমস্যা থাকে, জাগতিক অথবা আধ্যাত্মিক, তাহলে বলো।

কেরামত আলি বলল, বাবা, আমার একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে।

পিরবাবা কেরামত আলির দিকে তাকাল। শরীরটা নিরস বৃক্ষের মতো। চেহারায় একটা কাঠিন্য ফুটে বেরিয়েছে। চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গেছে।

: বলো, তোমার সমস্যার কথা বলো?

: বাবা, রাতের বেলা জিকিরের পর ঘুমের ঘোরে প্রতিদিন দেখি, একটা সবুজ পাগড়ি হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে আমার মাথার উপরে এসে ঘোরে। হাত দিয়ে ধরতে গেলেই মুহূর্তে উধাও হয়ে যায়। আমি এখন দারুণ কষ্টের মধ্যে আছি বাবাÑ

: কতদিন থেকে দেখছো এই পাগড়িটা? পিরবাবা জানতে চাইলেন।

: প্রায় দুমাস থেকে দেখছি বাবা। খোয়াবের মধ্যে দেখি। বেহেশতি খুশবুতে সারা ঘরটা ভরে থাকে। আমার মাথাটা আগুনের তাপে টগবগ করে জ্বলে।

: তুমি কি প্রতিনিয়ত জিকির করো?

: হ্যাঁ, বাবা নিয়মিত জিকির করি।

: ঠিক আছে। সাধনভজন করলে এ-রকম হয়। তবে একটা বাধা আছে। কেরামত আলি পিরবাবার দিকে চেয়ে রইল।

: পাগড়িটা যখন মাথার ওপরে উড়ছে, অথচ মাথায় গিয়ে বসছে না, হাত বাড়ালেই উধাও হয়ে যাচ্ছে, এরও একটা কারণ আছে।

: কারণটা কি বাবা? রহমত আলি জানতে চাইল।

পিরবাবা ঝিম মেরে কিছুক্ষণ ভাবলেন। বিড়বিড় করে ঠোঁট নাড়ালেন। এক সময় বললেন, কারণটা হচ্ছে সদকা। সদকা ছাড়া পাগড়িটা মস্তকে উঠবে না।

কেরামত আলির শরীরের মধ্যে শিহরন খেলে গেল।

: কি, কি, সদকা দিতে হবে বাবা?

: সেটাতো এই মুহূর্তে বলতে পারব না। মোরাকাবায় বসলে জানতে পারব। ফজরের নামাজের আগে জানিয়ে দেব তোমায়

: ঠিক আছে বাবা। যে-কোনোভাবে হোক সদকা দেওয়ার ব্যাপারটা পূরণ করতে চাই।

: এটা হচ্ছে গিয়ে ঈমানের পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় তোমার উত্তীর্ণ হওয়া চাই।

মনটা খুশি হয়ে উঠল কেরামত আলির। সারারাত ঘুমও পাড়েনি। আল্লা আল্লা আর ইয়া মাওলার নাম করে নফল নামাজ পড়ে মসজিদে কাটিয়ে দিয়েছে। ঘনঘন প্রার্থনা করেছে হাত জোড় করে। হক মাওলা, তুমি বান্দার আকাক্সক্ষা পূরণ করে দাও। তুমি যা চাও, তাই দেব তোমাকে। সারারাত মনের ভেতর ছিল অভূতপূর্ব এক শান্তি। অপার এক আনন্দ অনুভূতিতে তার দেহমন হিল্লোলিত হয়ে উঠল।

কখন যে কীভাবে ভোর হলো কেরামত আলি একটুও বুঝতে পারল না। ফজরের নামাজ পড়তে পড়তে তার মনে হলো আর একটা সুসমাচার তার জন্য অপেক্ষা করছে। প্রার্থনা শেষ করে পিরবাবার জায়নামাজের সামনে এসে দাঁড়াল কেরামত আলি।

পিরবাবা ওর দিকে শান্ত নয়নে তাকালেন। ঠোঁটে মৃদু হাসি।

: তোমার জন্য একটা সুসমাচার আছে।

বিনয়ে মাথাটা নত হয়ে এল কেরামত আলির সে বিড়বিড় করে বলল, আলহামদুলিল্লাহ। সকল প্রশংসা হক মাওলার।

পিরবাবা বললেন, তুমি যে সবুজ পাগড়ি দেখো, এই পাগড়ি তোমার। আমার হাতে হাত দাও।

কেরামত আলি পিরবাবার হাতে হাত রাখল। পিরবাবা বললেন, নামাজের ভঙ্গিতে বসো।

কেরামত আলি নামাজের ভঙ্গিতে বসল।

পিরবাবা মৃদুস্বরে বললেন, আরও একটা সুসমাচার এই- তোমার উপর সদকা জারি হয়েছে। দেড় মাসের মধ্যেই পরিশোধ করতে হবে। বলো, আলহামদুলিল্লাহ। তোমার উপর বয়াত ফরজ হয়ে আছে। কেরামত আলি আলহামদুুল্লিাহ বলে উঠে দাঁড়াল।

পিরবাবা বললেন, উত্তর- দক্ষিণে, পুব পশ্চিমে ঘুরে চারবার সালাম জানাও।

কেরামত আলি চারদিকে ঘুরে সালাম জানাল।

: বসো।

কেরামত আলি বসল।

পিরবাবা বরলেন, আগামী ফাল্গুন মাসের শেষ বুধবার, আমজাম করে উরস হবে। উরসের শেষ দিন আসর বাদ, হাজেরান মজলিসে তোমাকে খিলাফত দেওয়া হবে। বলো, আলহামদুলিল্লাহ।

বিনয়ে গদগদ হয়ে বসে রইল কেরামত আলি।

পিরবাবা বললেন, সুসংবাদ এই, তোমার উপর সদকা জারি হয়েছে যে- পাঁচটা স্বাস্থ্যবান এঁড়ে গরু,    দশটা খাসি ছাগল, বারোমণ চাল, তিনমণ ডাল, পঞ্চাশ গজ সাদা কাপড়। মাওলা তোমার উপর সদয় হয়েছেন।

কেরামত আলি ভাবে আপ্লুত হয়ে উঠল। দুই চোখে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল

পিরবাবা বললেন, যাও। চলার পথটা তোমার সহজ হয়ে গেল।

কেরামত আলি আর রহমত আলি পিরবাবার পা ছুঁয়ে কদমবুসি করল।

: বাবা, আমাদের চলে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাই।

: অনুমতি তো আমি দিয়েছি। যাও।

দুজনেই খুশি মনে পথে এসে দাঁড়াল। ভোরের আকাশ আলোয় ভরে উঠেছে। শিরশির করে শীতের বাতাস বয়ে যাচ্ছে। গাছে গাছে নেচে বেড়াচ্ছে ভোরের পাখি। দিনটা শুভদিন বলে মনে হলো কেরামত আলির। এ-রকম একটা সুসমাচার বয়ে নিয়ে যাবে, এটা কখনও ওরা কল্পনাও করেনি। সমস্ত পৃথিবী যেন কেরামত আলির কাছে আনন্দময় বলে মনে হতে লাগল।

রহমত আলি হাঁটতে হাঁটতে বলল, এর চেয়ে আনন্দ আর কি আছে, বলতে পারিস?

কেরামত আলি বলল, খোদার কসম করে বলছি, আমি নিজেও কখনও ভাবিনি পিরবাবা এই সুসমাচার শোনাবেন।

রহমত আলি বলল, পিরবাবার কাছে তোর যা চাওয়ার ছিল, তা তিনি প্রাণ উজাড় করে দিয়েছেন। এখন বা বাকি নির্ভর করছে তোর কর্মকাণ্ডের উপর।

: এ-ব্যাপারে, কোনো সন্দেহ নেই- উনি যা‘বলেছেন, সেটা আমি সত্বর পূরণ করবই।

বাড়িতে এসে কয়েকদিন হেসেখেলে দিনগুলি পার করতে লাগলো কেরামত আলি। মুরিদ ভাইদের সঙ্গেও জিকির করে বেড়ালো। চারদিকে- বাতাসে ছড়িয়ে গেছে কেরামত আলির সুসমাচার আসছে ফাল্গুন মাসের শেষ বুধবারে উরসউৎসবে কেরামত আলি খিলাফতে আসীন হবে। বিষয়টি যেমন গর্বের- তেমন সম্মানের। যে-ই শুনছে- সে-ই করছে প্রশংসা। মুরিদ ভাইদের মধ্যে দারুণ একটা আনন্দ উচ্ছ্বাস।

অগ্রহায়ণ মাস। দিনের পরিধিও সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে। দেখতে দেখতে বেলা কখন যে শেষ হয়ে যাচ্ছে, একটুও টের পাওয়া যাচ্ছে না।

রহমত আলি বলল, পিরবাবা জানতে চেয়েছেন, যা-কিছু করবি, তাড়াতাড়ি কর?

: এখনও ব্যবস্থা করতে পারিনি রহমত।

: আর মাত্র হাতে আছে বিশ দিন।

কেরামত আলি অসহায়ের মতো রহমত আলির দিকে তাকিয়ে রইল। ঘনঘন মাথা চুলকাতে লাগল সে। পাঁচটাকা নয়- দশটাকা নয়। প্রয়োজন একগাদা টাকা। টাকা জোগাড় করাও দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। যে দিকেই হাত বাড়াচ্ছে- সেদিকেই দেখছে শূন্য খালি হাতে ফিরে আসছে কেরামত আলি।

এখানে ওখানে চেষ্টা তদবিরও কম হয়নি। একটা হতাশায় ভুগতে লাগল সে।

প্রায় দুবেলা তাগিদ দিতে দিতে হয়রান হয়ে উঠল রহমত আলি।

: কি রে, শেষ পযর্ন্ত বেইজ্জতি হবো নাকি?

: সম্পত্তির মধ্যে আছে কেবল এই বসত বাড়িটি। এটাই হচ্ছে শেষ সম্বল। রহমত আলির হাত জড়িয়ে ধরল কেরামত আলি। নিজের কাছে নিজেই অসহায় বোধ করতে লাগল সে। মানসিক যন্ত্রণায় বুক তার ভেঙে যেতে লাগল।

: এই বাড়ি বেঁচে দিতে চাচ্ছি রহমত।

: খদ্দের পেয়েছিস?

মাথা নাড়াল কেরামত আলি। না। দেখ, কেউ কিনতে চায় কিনা?

: আমিতো খদ্দেরের খবর জানি না।

: খুঁজে দেখ, কেউ কিনতে চায় কিনা।

: এত তাড়াতাড়ি কেউ কিনতে চাইবে না।

রহমত আলি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। বিপদে পড়লে মানুষের চেহারা যেমন বিধ্বস্ত দেখা দেয়, তেমনি বিধ্বস্ত দেখা যাচ্ছে কেরামত আলিকে।

রহমত আলি বলল, বাজার মূল্যে কেউ এই বাড়িটি কিনবে বলে আমার মনে হয় না। কিনলেও নগদ টাকা দেবে না। সেই টাকা দিয়ে সদকার জন্য যে-সব গরু-ছাগল-চাল ডাল দরকার তা কিনতে টাকায় কুলোবে না।

একটা বিপজ্জনক অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কি যে করবে, তা ভাবতে ভাবতে জেরবার হয়ে উঠল কেরামত আলি। বাড়িটা যদি না বিক্রি করতে পারে, তবে সদকার টাকা জোগাড় করাও দুরূহ হয়ে উঠবে। মাথাটা লাটিমের মতো ঘুরতে লাগল ওর।

মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল কেরামত আলি। গতকালই দুজনে মিলে একটা হিসেব করেছিল। পাঁচটা এঁড়ে গরু কিনতে খরচ হবে তিরিশ হাজার টাকা। দশটা খাসি ছাগল কিনতে খরচ হবে বিশ হাজার টাকা। বারো মণ চালের দামÑ মাথাটা ফনফন আরও জোরে ঘুরতে লাগল কেরামত আলির।

একটার পর আর একটা ভাবনা মাথার মধ্যে ঢুকছে। যতই ভাবছে, ততই আরও সমস্যা বাড়ছে।

রহমত আলি বলল, মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকলে হবে না। একটা কিছু কর। দুএক দিনের মধ্যেই টাকা পাঠিয়ে দিতে হবে। প্রতিনিয়ত রহমত আলি আসছে। প্রতিনিয়ত তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে। শেষ পযর্ন্ত কেরামত আলির উপর তিক্ত-বিরক্ত হয়ে তাগিদ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে রহমত আলি। আগে ঘনঘন আসত বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করত। কয়েকদিন হলো, একেবারে আসা-যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে রহমত আলি।

পৌষ মাস। প্রচণ্ড শীত। যেমন শীত, তেমনি কুয়াশা। শীতে শরীরটা একেবারে ভেঙে গেছে কেরামত আলির। খক্খক্ করে কাশছে। বুকে সর্দি জমেছে। সারা রাত জেগে জিকির করতে করতে গলাটা বসে গিয়েছে। মেজাজটাও রুক্ষ। সদকার টাকাও এখনও জোগাড় করতে পারিনি। দারুণ একটা সঙ্কটের মধ্যে দিন যাচ্ছে। হঠাৎ করে মাথার মধ্যে একটা চিন্তা গজিয়ে উঠল। খোদেজা বাপের বাড়িতে গিয়েছিল। বাপ তার সমুদয় সম্পত্তি পুত্র-কন্যাদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দিয়েছে। খোদেজাও ভাগ পেয়েছে। নগদ টাকাও পেয়েছে।

খোদেজার টাকা পাওয়ার কথা মনে পড়তেই মাথায় আর একটা বুদ্ধি গজিয়ে উঠল। অনেকক্ষণ ধরে বিষয়টা নিয়ে নানারকম চিন্তা উদয় হতে লাগল।

এই টাকাটা কোনো রকমে হাতের মুঠোয় পেলে দুর্ভোগের ল্যাঠা চুকে যায়। সদকা দেওয়ার ব্যাপারে কোনো সমস্যা থাকে না। মাথায় আর একটা বুদ্ধি উঠে এল। টাকাগুলো তো তার টাকা নয়- টাকাগুলো খোদেজার টাকা। চাইলেই যে টাকা দিয়ে দেবে- এমন তো নয়। খোদেজার মতিগতি আগের মতো নেই। এখন এই মেয়ে মানুষটার চলনফেরন অন্যরকম হয়ে গেছে। অতএব,- মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল কেরামত আলির।

প্রায় ছমাস হলো। একই বাড়ির মধ্যে দুজনের বসবাস। অথচ পরস্পরের সঙ্গে কোনো বনিবনা নেই। দেখা-সাক্ষাৎ নেই। বউ বাচ্চারা কেমন আছে, এটা নিয়েও কোনো মাথা ব্যথা নেই। তারা কিভাবে দিন যাপন করছে, জানারও একটু আগ্রহ নেই। যতদিন গেছে তত দূরত্ব বেড়েছে। রাতের বেলা জিকির করতে গিয়ে বারবার ঠোকর খেতে লাগল। ইয়া মাওলা, তোমার ওপরেই ভরসা। মুশকিল আহসান করে দাও। পিরবাবার দোয়ায় একটা সরল রাস্তা দেখায়ে দাও। খোদেজার মনে আমার প্রতি মহব্বত সৃষ্টি করে দাও। আমার প্রতি তার আনুগত্য সৃষ্টি করে দাও। তোমার হুকুম ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। ইয়া মাওলা।

মনটা আস্তে আস্তে দুর্ভাবনা থেকে মুক্ত হতে লাগল। একটা ভরসার আলো দিব্য চোখে দেখতে পায় সে। এতক্ষণ মনের মধ্যে ছিল ছোপছোপ অন্ধকার। সেখানে জ্বলছে একটা নূরের বাতি। মন বলল, বিবির কাছে যাও। বিবি তোমার প্রতি আসক্ত। মনে রাখো, সে তোমার বাম পাঁজড়ের হাড়। তুমি তার কাছে যা চাও,- সবকিছু পাবে।

ভোরের আলো ফুটে বেরোলো। ফজরের নামাজ আদায় করল কেরামত আলি। হক মাওলার উদ্দেশ্যে দু-রাকাত নফল নামাজও আদায় করল। বুকে একটা ফুঁক দিয়ে ঘর থেকে বাইরে পা বাড়াল সে।

বহুকাল ইশক ছিল না স্ত্রীর প্রতি। সেই স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্যে উন্মাদ হয়ে উঠল কেরামত আলি।

প্রাচীরের শেষ কোণায় একটা ছোট্ট ঘরে বালবাচ্চা নিয়ে বহুদিন থেকে আলাদা বাস করছে খোদেজা। মেয়ে মানুষটাকে এতদিন মনে হয়েছে ওর কাছে হারাম, ঝগড়াটে ও বদমেজাজি। মনে হয়েছে, সাধন ভজনের পথের কাঁটা।

সেই মেয়ে মানুষটার জন্যে মন আকুল-ব্যাকুল হয়ে উঠছে। আস্তে আস্ত হেঁটে যেতে লাগল কেরামত আলি। ভোরের কুয়াশা চারদিকে ছড়িয়ে আছে। শীতে থরথর করে কাঁপতে লাগল কেরামত আলি। খোদেজার ঘরের দোর গোড়ায় এসে ঝিম মেরে দাঁড়াল সে। তারপর গলাকাঁপিয়ে মিহিস্বরে দরোজায় হাত রেখে অনবরত ডাকতে শুরু করলÑ

: হ্যাঁ গা, ঘুমিয়ে আছো নাকি?

: হ্যাঁ গা, ঘুমিয়ে আছো না কি?

: হ্যাঁ গা ঘুমিয়ে আছো না কি?

: হ্যাঁ গা ঘুমিয়ে আছো না কি?

বাতাসে তার গলার স্বর কাঁপতে লাগল।

ঘুমের ঘোরে খোদেজা বুঝতে পারে না বাইরে দাঁড়িয়ে কে তাকে বারবার হ্যাঁগা, হ্যাঁগা বলে ডাকাডাকি করছে।

ডাকতে ডাকতে কেরামত আলির গলার স্বর আরও উচ্চগ্রামে উঠতে লাগল। দরোজায় ঘনঘন ঘা পড়তে লাগল।

শীতে লেপের তলায় শুয়ে আরামের একটা ঘুম দিচ্ছিল খোদেজা। দরোজায় ঘা খাওয়ার শব্দ আরও তীব্র হয়ে উঠল।

ঘুম ভেঙে গেল খোদেজার।

আট বছরের কাসেমও জেগে উঠেছে।

: দেখতো বাবা, দরোজায় কে এসে ঘা মারতেছে। খোদেজা বিড়বিড় করে বলল।

কাসেম উঠে গিয়ে শীতে কাঁপতে কাঁপতে দরোজার খিল খুলে উঁকি মেরে অবাক হয়ে গেল। আপদ মস্তক কাপড়ে ঢাকা একটা বিদঘুটে মূর্তি। কেমন ভয়ভয় করতে লাগল কাসেমের।

দরোজা আউসে দিয়ে মায়ের কানের কাছে মুখ এন ফিসফিস করে সে বলল, ঠিকমতো চিনতে পারলাম নাÑ তবে মনে হতেছে বাপজানের মতো চেহারা-

: কেডা? কার মতো চেহারা?

: বাপজানের মতো চেহারা।

দরোজার পাল্লাটা জোরে ঠেলা মেরে ঘরের মধ্যে ঢুকল কেরামত আলি।

বিছানা থেকে হুড়মুড় করে উঠে বসলো খোদেজা। সেও বিদঘুটে মূর্তিটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। শাদা কাপড়ে আপাদ মস্তক ঢাকা। মনে হলো কাফনের কাপড় পরা একটা লাশ।

কোনো ভূমিকা না করেই কেরামত আলি বলল, কেমন আছো খোদেজা।

খোদেজা জবাব দিল না। ঝিম মেরে বসে রইল।

কেরামত আলি বলল, আমার সাধনভজন প্রায় শেষ। অনেকদিন তোমাদের কোনো খোঁজ নিইনি। কেমন আছো তোমরা।

খোদেজা তেমনি ভাবে মুখ গোমড়া করে নিশ্চুপ বসে রইল।

কেরামত আলি বলল, এখনও তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে। সম্পর্ক নষ্ট হয়নি। সেইহেতু এখনও তুমি আমার স্ত্রী।

খোদেজা ওর মুখের দিকে তাকাল।

: আমি তোমার কাছে কিছু দাবি নিয়ে এসেছি, খোদেজা।

: খোদেজা জানতে চাইল, বলো কি দাবি?

: স্বামীর দাবি নিয়ে এসেছি। স্বামী তার স্ত্রীর কাছ থেকে কিছু পেতে চায়।

: কি পেতে চাও?

তুমি তোমার পিতার কাছ থেকে যে অর্থ পেয়েছো, সেই অর্থ আমি চাই। খোদেজা বলল, তুমি যে দাবি নিয়ে এসেছো, এই দাবি আমি মানি না। স্বামী হিসেবে তোমার যে কর্তব্য ছিল- সেই কর্তব্য তুমি পালন করোনি। ছমাস আমার কোনো ভরণ-পোষণ দাওনি। তোমার বালবাচ্চাদেরও দেখোনি। আমরা মরে গেছি না বেঁচে আছি- এই খোঁজও কখনও করোনি। আমার কাছে যে অর্থ আছে, এই অর্থ তোমার দেওয়া নয়। পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছি। আমি কোনোক্রমেই এই অর্থ তোমাকে দেব না।

কেরামত আলির চোখ দুটো বড়বড় হয়ে উঠল। ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল সে। ঘাড় বাঁকা করে শক্ত হয়ে খোদেজার দিকে তাকিয়ে থাকল। চোখ দিয়ে যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে আগুন। দুটি হাতের আঙুলের মধ্যে আঙুল পুরে দিয়ে দাঁতের পর দাঁত রেখে আস্ফালন করে কয়েকবার লাফঝাফ মারলো কেরামত আলি। তারপর মেঝের উপর পদাঘাত করে ঘর থেকে দ্রুত বের হয়ে গেল সে। বিড়বিড় করে বলল, টের পাবি মা-গি-

খোদেজাও বকবক করতে লাগল, এতদিন খোঁজ নেই- এখন দাবি করছে আমি ওর স্ত্রী। টাকাগুলো হাতানোর জন্য এই ফিকির।

সেই যে বাড়ি থেকে ভোরবেলা কেরামত আলি চলে গেল- তারপর থেকেই কেরামত আলি লাপাত্তা। জিকিরের আওয়াজ শোনা গেল না। বাড়িটাতে অখ- স্তব্ধতা। কোনো হৈচৈ নেই। পিরবাবার মুরিদদেরও হাঁকডাক নেই। রহমত আলির আসা-যাওয়া নেই। বাড়িটা একেবারে জনহীন ও ফাঁকা।

পাড়াপড়শিরাও অবাক হয়ে গেল। সমস্ত বাড়িটা এখন নির্জন। মৃত্যুপুরীর মতো শীতল। কেমন যেন একটা বিদ্ঘুটে কালো ছায়া বাড়ির উঠোনের উপর হাঁটাহাঁটি করছে। খোদেজা যে দিকে তাকাচ্ছে- সেদিকেই দেখছে এই কালো ছায়া। সকালে দেখছে ছায়া। দুপুরেও দেখছে ছায়া। বিকেলেও দেখছে ছায়া। সন্ধ্যা হলেই ছায়াটা থপথপ শব্দ তুলে ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢুকছে।

ঘরটাও এখন আতঙ্কের পুরী হয়ে উঠেছে। বাচ্চারা ঘরের মধ্যে ঢুকলেই আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে বাইরে বেরিয়ে আসছে। কেমন একটা ঠকঠক শব্দ শুনে চিৎকার করে উঠছে বাচ্চারা।

: ওমা, কি যেন একটা ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।

: চলত, দেখি, কি দাঁড়িয়ে আছে।

খোদেজাও ঘরের মধ্যে ঢুকে টের পায়, তার শরীরের উপরে কার যেন একটা ছায়া। সারা বাড়িময় ছায়া আর ছায়া। কালো কালো ছায়া। কিলবিল করে বাড়ির উপরে হাঁটহাঁটি করছে। খোদেজার মনে হতে লাগল, সে-ও যেন ছায়ার ভেতর আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares