উপন্যাস : কুহেলিকা : হরিশংকর জলদাস

উপন্যাস

কুহেলিকা

হরিশংকর জলদাস

 

মাতারবাড়ির নাম শুনেছেন স্যার? শুনেছেন বলছেন? কোথায় বলেন তো? চট্টগ্রাম শহরের সদরঘাট অঞ্চলে বলছেন? বলছেন- মাদারবাড়ি বেশ্যাপল্লির জন্য পরিচিত ছিল একসময়। ওই পাড়ায় একটা রক্ষাকালীর মন্দির ছিল। রক্ষাকালীকে পতিতারা মা বলত। মা মানে মাদার। ইংরেজদের মুখে ওই অঞ্চলের নাম হয়ে গেল মাদারবাড়ি। এখন মাদারবাড়ি দু’ভাগে বিভক্ত- পূর্ব মাদারবাড়ি আর পশ্চিম মাদারবাড়ি। এক নিশ্বাসে অনেক কথা বলে গেলেন স্যার। হা হা হা।

হাসছি কেন? হাসছি স্যার আপনার উত্তর শুনে। জিজ্ঞেস করলাম কী, আর উত্তর দিলেন কী! জিজ্ঞেস করলাম মাতারবাড়ির কথা, উত্তর দিলেন মাদারবাড়িকে নিয়ে। বললাম কী, শুনলেন কী? অবশ্য আপনাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ঢাকা শহরের অধিবাসীদের একটা কমন রোগ আছে- বধিরতা। শব্দ দূষণে দূষণে গোটা ঢাকা শহর জেরবার। অনেকেরই কানের পর্দা ফাটা। উচ্চ শব্দ ঢাকা শহরের জনগণের শ্রুতিশক্তি একেবারে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে।

আরেকটা জিনিস খেয়াল করেছেন স্যার? ঢাকা শহরের মানুষরা উচ্চস্বরে কথা বলে? কেন? চারদিকে হই হট্টগোল। আকাশ বাতাস উচ্চ শব্দে সয়লাব। মৃদুকণ্ঠ সেই শব্দসাগরে হাবুডুবু খায় স্যার। উচ্চশব্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের গলার স্বরও পঞ্চমে পৌঁছেছে স্যার। ঢাকা শহরের মানুষ এখন একে অপরের সঙ্গে স্বাভাবিক কণ্ঠে কথা বলে না। শুনলে মনে হয় যেন পরস্পরে ঝগড়া করছে। ওদেরও দোষ কী? শব্দ দিয়ে কমিনিকেশন তো করতে হবে!

যাক স্যার মাতারবাড়িকে আপনি মাদারবাড়ি শুনেছেন। আমি আসলে মাতারবাড়ি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। সরি বলছেন? কেন? মাতারবাড়ি সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে? শুধু আপনি কেন স্যার, অনেকে মাতারবাড়ির নাম শোনেনি।

আপনারা সেন্টমার্টিন চেনেন, ছেঁড়াদ্বীপ চেনেন, মহেশখালি চেনেন, কুতুবদিয়াও চেনেন। সন্দ্বীপ-হাতিয়াও আপনাদের জানা। কিন্তু মাতারবাড়ি সম্পর্কে কোনোই ধারণা নেই আপনাদের।

মাতারবাড়ি একটা দ্বীপ স্যার। মহেশখালির উত্তর-পশ্চিমে। মহেশখালি উপজেলারই একটা ইউনিয়ন। কিন্তু মহেশখালি থেকে বিচ্ছিন্ন। মাতারবাড়ি সম্পর্কে কিছু জানেন না বলছেন? জানবেন কী করে স্যার? খোদ ম্যাপওয়ালারাও দ্বীপটি বিষয়ে বিশেষ ওয়াকিবহাল নন। বাংলাদেশের ম্যাপটা খোলেন, সব পাবেন, মাতারবাড়ি পাবেন না। প্রকৃতি তার সকল রূপ-রস ঢেলে দিয়েছে এই দ্বীপটির ওপর। চারদিকে সফেন সমুদ্র। আশি হাজার মানুষ স্যার এই দ্বীপে। বাইশটি গ্রাম। বাইশগ্রামের একটি হলো হংসমিয়াজির পাড়া। এই দ্বীপের জমিদার ছিলেন হংসনারায়ণ চৌধুরী। সাতচল্লিশের দেশভাগের আগে ছেচল্লিশে দাঙ্গা হলো। ওই দাঙ্গার ঢেউ মাতারবাড়িতেও লাগল। হংসনারায়ণ দেশত্যাগ করলেন। যাওয়ার আগে উঠতি ধনী রুহুল মিয়াজির কাছে সব স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে বললেন, মিয়াজি সাহেব, একটা অনুরোধ আপনার কাছে, আর যা-ই করেন, দ্বীপটির নামটা বদলাবেন না। জগত্তারিণী মায়ের নামেই আমার পরদাদা দ্বীপটির নাম রেখেছিলেন। হংসনারায়ণের কোনো এক পূর্বপুরুষ পুকুর খুঁড়তে গিয়ে মাটির নিচে জগত্তারিণী কালী মায়ের কষ্টিপাথরের মূর্তিটি পেয়েছিলেন। সেই মায়ের স্মরণেই দ্বীপটির নাম রেখেছিলেন মাতাজির বাড়ি। রুহুল মিয়াজি হংসনারায়ণের অনুরোধটি রেখেছিলেন। নামটি বদলাননি স্যার। তবে মানুষের মুখে মুখে মাতাজির বাড়ি মাতারবাড়ি হয়ে গিয়েছিল। রুহুল আমিন বড় ভালো মানুষ ছিলেন স্যার। নিজের জন্ম-গ্রামের নাম পাল্টে রেখেছিলেন হংসমিয়াজির পাড়া। ওই হংসমিয়াজি পাড়াতেই স্যার আমার জন্ম। আজ থেকে পঁয়ষট্টি বছর আগে।

বেশিদিন বাঁচেননি রুহুল মিয়াজি। সম্পত্তিটি যখন কেনেন তখনই সত্তর। তখন উপযুক্ত নাতি-নাতনিরা ঘরে। উপযুক্ত মানে বিবাহযোগ্য স্যার। মিয়াজি সাহেবের দুই ছেলে- ইয়াকুব মিয়াজি আর শফিক মিয়াজি। ইয়াকুব মিয়াজির স্বভাবচরিত্র একেবারে রুহুল মিয়াজির মতন। সহজ, সরল, পরোপকারী। শফিক মিয়াজি ট্যারা টাইপের। বড় ভাইয়ের ঠিক বিপরীত। ইয়াকুব মিয়াজি বাপের সঙ্গে সঙ্গেই থাকতেন। দিনরাত বাপের মন জুগিয়ে চলতেন। শফিক বাপের ধারেকাছে ঘেঁষতেন না। বাপ যেদিকে হাঁটতেন, তার উল্টোদিকে হাঁটতেন শফিক মিয়াজি। দিনে বাপের সঙ্গে এক দুবার দেখা। বাপকে দেখে মুখ লুকিয়ে রাখেন। বাহারি জামা-কাপড় পরে চোখে সুরমা মেখে সারা মাতারবাড়ি টো টো। তাঁর বিরুদ্ধে দু’চারটা ছোটকা-ছাটকা অভিযোগ রুহুল মিয়াজির কানে আসে। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকান মিয়াজি। রুহুল মিয়াজি কী চোখেই যে দেখতেন ইয়াকুব মিয়াজিকে! কাজকারবার, মামলা-মোকদ্দমা, ধানকল দেখভালের সময় ইয়াকুব মিয়াজিকে সঙ্গে সঙ্গে রাখতেন রুহুল মিয়াজি।

সম্পত্তি ভাগ করে দেওয়ার সময় কিন্তু পক্ষপাতিত্ব করেননি রুহুল মিয়াজি। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দুই পুত্রের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দিয়েছিলেন। একটু ভুল বললাম স্যার, সমুদ্রপাড়ের দুই দ্রোণ জমি ইয়াকুব মিয়াজিকে বেশি দিতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, ইয়াকুব, গাছ রোপণের বড় শখ ছিল আমার। বয়স হয়ে গেল, শরীরটা কথা শুনছিল না। পারলাম না। ওই জমিটা তোমাকে বেশি দিলাম। পারলে ওই জমিতে বৃক্ষরোপণ কর। গ্রামের শোভাও বাড়বে, পাখ-পাখালির আবাসস্থলও হবে।

ইয়াকুব মিয়াজি বাপের কাছ থেকে সেই জমি নেননি। বলেছিলেন, বাবা, আমার ঘরে তিনটি কন্যা। বিয়ে দিয়ে দিলে তারা শ্বশুরবাড়িতে চলে যাবে। আমার আর আমার স্ত্রীর জীবন এমনিতেই চলে যাবে। শফিকের তিন ছেলে চার মেয়ে। বড় সংসার। সংসারের হালচাল তেমন করে শিখল না। আপনার অবর্তমানে বড় বিপদে পড়ে যাবে শফিক। বাড়তি জমিটা শফিকেরই থাক বাবা। এই-ই ছিলেন স্যার ইয়াকুব মিয়াজি। ত্যাগেই স্যার তাঁর আনন্দ।

বাবার মৃত্যুর পর ধর্মকর্ম, পরোপকার আর লাইব্রেরি নিয়ে মগ্ন হয়ে পড়লেন বড় মিয়াজি। হ্যাঁ স্যার, ইয়াকুব মিয়াজির কা-কারখানা দেখে মাতারবাড়ির মানুষরা তাঁকে বড় মিয়াজি ডাকা শুরু করল।

একটা কথা বলতে ভুলে গেছি স্যার। হংসনারায়ণ চৌধুরী দেশত্যাগের সময় রুহুল মিয়াজিকে আরেকটা অনুরোধ করেছিলেন। সে লাইব্রেরি নিয়ে। হংসনারায়ণের বাবা ধর্মনারায়ণ চৌধুরী মায়ের নামে একটা লাইব্রেরি দিয়েছিলেন স্যার- ত্রিভুবন সুন্দরী লাইব্রেরি। আপনি ঠিকই ভাবছেন স্যার- মেয়েদের এরকম নাম ছিল নাকি? লোক পরম্পরায় শুনেছি, হংসনারায়ণের ঠাকুরদি অসাধারণ রূপবতী মহিলা ছিলেন। তাই এরকম নাম রেখেছিলেন তাঁর পিতামাতা।

কী বই ছিল না স্যার সেই ত্রিভুবন সুন্দরী লাইব্রেরিতে! ভেবে দেখুন- সেই সময়ে এই লাইব্রেরিটিতে কুড়ি হাজার বই ছিল স্যার। ধর্ম-দর্শন-ইতিহাস-সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সঙ্গীত- সব বিষয়ের বই সেই লাইব্রেরিতে মজুদ ছিল। আমার যা কিছু জ্ঞান-গম্যি স্যার ওই লাইব্রেরির কল্যাণে।

তো স্যার, হংসনারায়ণ রুহুল মিয়াজিকে বলেছিলেন, আরেকটা অনুরোধ মিয়াজি সাহেব, আমার ঠাকুমার নামের লাইব্রেরিটার সঙ্গে আমাদের বংশের তিন পুরুষের সম্পর্ক। পারলে সঙ্গে করে নিয়ে যেতাম সব বই। তা তো আর সম্ভব নয়। অনুরোধ এইটুকু- লাইব্রেরিটা নষ্ট করবেন না। ঠাকুরমার নামটিও পাল্টাবেন না। রুহুল মিয়াজি হংসনারায়ণ চৌধুরীর অনুরোধ ফেলেননি। ইয়াকুব মিয়াজিও বাপের ধারাটি বজায় রেখেছিলেন।

বাইশ গ্রামের মানুষ মাতারবাড়িতে। খুব বেশি মানুষ লেখাপড়া করত না। তিনটা প্রাইমারি আর একটা হাইস্কুল। কলেজে পড়তে চাইলে সেই কক্সবাজার কলেজে যেতে হতো।

সুযোগ পেলেই ইয়াকুব মিয়াজি ত্রিভুবন সুন্দরী লাইব্রেরির কথা বলতেন। মুরুব্বিদের বলতেন- আপন সন্তানদের ওই লাইব্রেরিতে পাঠাতে। বয়স্কদেরও অনুরোধ করতেন সন্ধ্যাটা ওখানে কাটাবার জন্য। সবাই যে তাঁর কথা শুনত, এমন নয়। তবে কেউ কেউ শুনত। তার মধ্যে আমি একজন। একদিন দুপুরে ইয়াকুব মিয়াজি মাতারবাড়ি হাইস্কুলে এলেন। হেডমাস্টারকে অনুরোধ করে ছাত্রদের একত্রিত করলেন। ছাত্রদের উদ্দেশে অনেক কথা বলেছিলেন সেদিন। সব কথার সার কথা ছিলÑ লাইব্রেরি জ্ঞানের চোখ  খুলে দেয়। এমনিতে মানুষের দুটো চোখ, যারা বই পড়ে তাদের শত শত চোখ। আমি তখন এইটে স্যার। খুব মনে ধরেছিল স্যার ইয়াকুব মিয়াজির কথাগুলো। পরদিন থেকে ত্রিভুবন সুন্দরী লাইব্রেরিতে আমি যাওয়া-আসা শুরু করেছিলাম। বিকেল থেকে রাত নয়টা অবধি বড় মিয়াজি লাইব্রেরিতে সময় দিতেন। তো স্যার, সেই থেকে মাতারবাড়ি ছাড়ার দুদিন আগ পর্যন্ত ওই লাইব্রেরির সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল।

কেন ছাড়লাম মাতারবাড়ি? আপনি উপসংহারটা আগে জেনে নিতে চাইছেন স্যার? ভূমিকাটা শুনলেন, প্রবাহ আর ক্লাইম্যাক্সটা শুনবেন না? আপনাকেও দোষ দেব কী স্যার! অনেক মানুষ আপনার মতোই। উপন্যাসটা খুলেই শেষ অধ্যায়টা পড়ে ফেলেন। উপসংহারটা পড়ে ফেলার পর ক্লাইম্যাক্সের আর মজা থাকল স্যার? আপনিই বলেন স্যার। থাকল না তো! তাই বলছিলাম- আপনার কেন-র উত্তর এই মুহূর্তে আমি দেব না। ভূমিকা যে আরও অনেকটা বাকি রয়ে গেছে।

এবার স্যার শফিক মিয়াজির কথা। কী এক মন্ত্রবলে শফিক মিয়াজি পাল্টে গেলেন স্যার? কখন? বাপের মৃত্যুর পর, সহায়-সম্পত্তি হাতে আসতেই আগাপাছতলা একেবারে বদলে গেল স্যার। আগে তো বাপের হোটেলে খেতেন আর ভাদাইম্যার মতো এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াতেন। কিন্তু পরে সে চেহারা আর থাকল না। হঠাৎ করেই বিষয়মুখী হয়ে গেলেন শফিক মিয়াজি। বাপের কুলখানি শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে পৃথগন্ন হয়ে গিয়েছিলেন দুই ভাই। এককে দুই করার, শতকে হাজার করার নেশা পেয়ে বসল ছোট মিয়াজিকে। কুহেলিকা নদীর গা ঘেঁষে কাঠ চেড়াইয়ের কল বসালেন। ওই যে সমুদ্রপাড়ের জমিটা, যেটা বড় মিয়াজিকে দিতে চেয়েছিলেন রুহুল মিয়াজি, তাতে লবণের চাষ শুরু করলেন ছোট মিয়াজি। ছোট মিয়াজির দুই ছেলে লেখাপড়ায় লবডঙ্কা। বড়টা প্রতিবন্ধী। মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। বাঁ হাতটা একটু বাঁকানো। থপ্পড় থপ্পড় করে পা ফেলে ফেলে হাঁটে। ঘাটার বাইরে বের হলেই পথের নিশানা গুলিয়ে ফেলে। এত বয়স হলোÑ দুই আর দুইয়ে মিলে যে চার হয়, তাও জানে না শফিক মিয়াজির বড় ছেলেটা। ছোট ছেলেটা সাত কী আট। মাদ্রাসায় দেওয়া হয়েছে তাকে। ছোট মিয়াজি ভাবেনÑ একটা ছেলের ধর্মের দিকে যাওয়া ভালো। তাতে পরিবারের মঙ্গল, বংশের সুনাম। মেয়েদের মধ্যে তিনজনকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন শফিক মিয়াজি। মেয়ে তিনটি ছেলেটিরও বড়। ছোট মেয়েটি এখনো মাটির সঙ্গে কথা বলে।

মেজছেলে শহিদুল বড় সেয়ানা। এইটের বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করে পড়া ছেড়েছে। তাকে আর স্কুলে পাঠানো যায়নি। ছন্নছাড়া বাপের কোনো খেয়াল ছিল না শহিদুল মিয়াজির প্রতি। তাই তার বিদ্যে ওইটুকু পর্যন্ত। গায়েগতরে গাট্টাগোট্টা হয়ে উঠল এক সময়। বাপের ধারা গায়ে। প্রথমে কাঁঠাল চুরি আম চুরি দিয়ে শুরু হয়েছিল, পরে দু’চারজনের গায়ে হাত। এরপর গ্রাম্য মেয়েদের পথ আগলে দাঁড়াতে শুরু করল। গলায় বাহারি রুমাল, পরনে রোহিতপুরি লুঙ্গি। মুখে শিস- তাতে রঙিলা গানের সুর। বাপের হাতে দাদার সম্পত্তি আসার পর দুচার বছর সোজা হয়ে চলেছিল। বাপ তাকে লবণগোলা দেখাশোনার দায়িত্ব দিল। হাতে তখন শহিদুল মিয়াজির কাঁচা পয়সা। কাঁচা পয়সা মানুষকে বাজে পথ দেখায়, অমানুষ করে তোলে।

আমার কথা বলতাম? বাপের খুব পয়সা ছিল না স্যার। তবে মধ্যবিত্ত গৃহস্থ যাকে বলে, সেরকমই ছিল বাপ। জমি ছিল বিঘা কয়েক। ও দিয়েই বছর চলে যেত। ধানের সময় ধান, রবিশস্যের সময় রবিশস্য ফলাত বাপ। আমাকে জন্ম দিয়ে বাপ আর সামনে এগোয়নি। আর সন্তানের প্রয়োজন নেইÑ এই কথাটায় আমার আনপড়া মাকে কোন মন্ত্রবলে বশ করেছিল কে জানে! আগে আকারে ইঙ্গিতে বলেছি স্যারÑ আমাদের বাড়িটা একটেরে। মূল পাড়া থেকে একটু বিচ্ছিন্ন। কিন্তু কৈবর্তপাড়ার কাছাকাছি। কৈবর্তদের সঙ্গে বাবার উঠ-বস ছিল বেশি। বাবার ব্যাপারটি আমার মধ্যেও বর্তেছিল। কৈবর্তদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা দেখে বাবা মুচকি মুচকি হাসত।

আমার আরেকটি ব্যাপার বাবাকে খুব চিন্তিত করত। তা হলো কুহেলিকা নদীর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা। ওই নদী ছিল আমার বন্ধু। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না আমাকে, মা বলত কুহেলি নদীর পাড়ে খোঁজ নাও। মা কুহেলিকা বলতে পারত না, বলত কুহেলি।

নদীর এরকম নাম আগে শোনেননি বলছেন? এ নদীনামেরও একটা ইতিহাস আছে স্যার, শুনবেন?

নদীটা আসলে একটা খাল ছিল স্যার। বড়োসড়ো। মানুষরা নাকি বড়খালই বলত একে। পূর্ব থেকে পশ্চিমে মাতারবাড়িকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে খালটি। সমুদ্রজল এদিকে ঢুকে ওদিকে বের হয়। গলগলে স্রোত স্যার। সারাদিনমান কলকল ছলছল।

তো স্যার হংসনারায়ণের বাবা ধর্মনারায়ণ, তাঁর পিতা দর্পনারায়ণ। নামের মতোই দর্পনারায়ণের হাবভাব, প্রভাব প্রতিপত্তি। মূলত এই দর্পনারায়ণই এখানে চৌধুরীদের জমিদারি শক্তপোক্ত করেন। তাঁর হাতেই জমিদারির রমরমা।

একদিন তিনি বজরায় করে কক্সবাজার থেকে ফিরছিলেন। সঙ্গে সাঙ্গোপাঙ্গো। গোমস্তা, সেরেস্তা- এরা তো ছিলই। জমিদারি দেখভাল করার দায়িত্ব যাঁর ওপর, সেই রাধাগোবিন্দ সোমও ছিলেন। সেদিন মনে বড় আনন্দ ছিল দর্পনারায়ণ চৌধুরীর। জমিদারি নিয়ে কী একটা লটঘট লেগেছিল। ইংরেজ কালেক্টর সমন পাঠিয়েছিল- অতি শিগগির জমিদারবাবু যাতে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। বড় জটিল ব্যাপার, সমস্যার সমাধান করতে না পারলে জমিদারি লাটে উঠবে। জয় মা জগত্তারিণী বলে বজরায় উঠেছিলেন সেই সকালে। সঙ্গে বোঝাই করা দলিলপত্র। আর নজরানার পোঁটলা।

নিজের বিচক্ষণতা আর পোঁটলার মহিমায় সমস্যার মিটমাট হয়ে গিয়েছিল। ফুর্তিমনে বাড়ি ফিরছিলেন দর্পনারায়ণ। বজরায় চড়েই মেয়েটির কথা মনে পড়েছিল জমিদারবাবুর। মেয়েটির নাম কী? কুহেলিকা স্যার। দুই ছেলের পর মেয়েটির জন্ম। বড় ভালোবাসতেন মেয়েটিকে। ফুটফুটে পরির মতন। জমিদারগিন্নিও কুহেলিকাকে পরির মতো করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতেন।

কক্সবাজারে রওনা দেওয়ার আগমুহূর্তে মেয়েটি হাঁটি হাঁটি পা পা করে বাপের দিকে এগিয়ে এসেছিল, বাপের একটু আদর খাবে বলে। কিন্তু সেদিন দর্পনারায়ণ এত টেনশনে ছিলেন যে, বাঁ হাত দিয়ে কুহেলিকাকে অনেকটা সরিয়ে দিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন। এ কদিন মেয়ের কথা একবারের জন্যও মনে পড়েনি দর্পনারায়ণের। টেনশনমুক্ত হবার পর, সমুদ্রের খোলা হাওয়া গায়ে লাগার পর কুহেলিকার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল জমিদারবাবুর।

এসব কথা কার কাজ থেকে শুনেছি? আমার বাবার কাছ থেকে স্যার। জমিদারবংশের কাহিনি এই মাতারবাড়িতে লোক-পরম্পরায় প্রচলিত স্যার। এখনো যদি আপনি মাতারবাড়িতে যান, এই কাহিনি শুনতে পাবেন। তবে একটু রঞ্জিত, একটু বিকৃতভাবে হয়তো বা। আপনি তো জানেনই স্যার, কর্ণান্তরিত কথা রঞ্জিত বা বিকৃত হয়। তবে কথা এটা যে, কাহিনি সত্য স্যার।

সমুদ্র ছেড়ে বজরাটা বড়খালে পড়ার পর থেকে কুহেলিকার কথা আরও বেশি করে মনে পড়তে লাগল দর্পনারায়ণের। বজরার ছাদে বসেছিলেন তিনি। পাশে রাধাগোবিন্দ সোম। একটু দূরে অন্যান্য কর্মচারীরা। সূর্য তখন পশ্চিমে। আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ। বড় বড় গাছের ছায়া খালের জলে। পাখিরাও ঝাঁক বেঁধে ঘরে ফিরছিল।

হঠাৎ দর্পনারায়ণ চৌধুরী রাধাগোবিন্দ সোমকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা গোবিন্দবাবু, এই নদীটির নাম কী?

রাধাগোবিন্দবাবু বয়সী মানুষ। পুরু কাচের চশমা চোখে। জমিদার দর্পনারায়ণের কথা শুনে বেশ অবাক হলেন তিনি। এই অঞ্চলের জমিদার তিনি। এই জলধারাটির নাম জানেন না! কী আশ্চর্য! আবার মনে মনে ভাবলেন- জমিদার বলে কথা! নিজের তাবেদারি এলাকার সবকিছুর নাম জমিদারমশাইকে জানতে হবে, এমন তো কথা নয়। তাহলে তাঁরা আছেন কী জন্য?

কান থেকে চশমাটা খুললেন রাধাগোবিন্দ সোম। ধুতির কোনা দিয়ে মুছে আবার চোখে লাগলেন। তারপর বিনীতভাবে বললেন, ভুল হলে মাফ করবেন কর্তামশাই, এটা নদী নয়, খাল। এটার কোনো নাম নেই। মানুষরা এই খালকে বড়খাল বলে।

রাধাগোবিন্দের কথা শুনে কর্তামশাই কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন। আকাশের দিকে একবার, জলের দিকে একবার তাকালেন। তারপর বললেন, আজ থেকে এই খাল নদী হল। আপনি ঢ্যাঁড়া পিটে দেবেন- কেউ এটাকে আর খাল বলতে পারবে না, সবাই একে নদী বলবে। আর হ্যাঁ, আমি এই  নদীর নাম দিলাম কুহেলিকা। আমার মেয়ের নামে নাম। এতদিন মাতারবাড়ির কোনো নদী ছিল না। আজ থেকে তার একটি নদী হলো, কুহেলিকা।

পরদিন ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে গোটা মাতারবাড়িতে জানিয়ে দেওয়া হলো জমিদার দর্পনারায়ণ চৌধুরীর ঘোষণার কথা। সেই দিন থেকে মানুষরা বড়খালকে কুহেলিকা নদী বলতে শুরু করল।

তো স্যার, ওই কুহেলিকাই ছিল আমার আশ্রয়, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমি তার সঙ্গে কথা বলতাম স্যার। জমিদারবাবু তাঁর বাড়ির কাছাকাছি কুহেলিকার ওপর একটা ব্রিজ তৈরি করে দিয়েছিলেন। লোহার ব্রিজ স্যার। বহু বছর চলে যাওয়ার পরও ব্রিজের লোহায় এইটুকুন মরিচা ধরেনি স্যার। আমার জন্মের কত কত বছর আগে করা ব্রিজ, আমার যৌবনকাল পর্যন্ত দেখেছি এই ব্রিজটি অনড় ছিল। সবাই একে জমিদার ব্রিজ বলত। এখন সেই ব্রিজের কী অবস্থা জানি না। চল্লিশ বছরে কত কিছুর রূপান্তর হয় স্যার।

সেই জমিদার ব্রিজের রেলিং থেকে ঝুঁকে নদী দেখতাম আর আপনমনে হাসতাম। নদী খলবল করে এগিয়ে যেত, যেন মুক্তকেশী মা কালী। হ্যাঁ স্যার, জমিদারবাড়ির মন্দিরে আমি একদিন কালীর মূর্তি দেখেছিলাম। কালো, ভীষণ আকার। লম্বা জিহ্বা বের করানো। গোটা জিহ্বাজুড়ে রক্ত আর রক্ত। চোখের চাহনি হিংস্র। হাতে নরমু-। কী ভীষণ! কী ভয়জাগানিয়া মূর্তি স্যার! জীবনে আর কোনোদিন কালীমূর্তির সামনে যাইনি। তো কুহেলিকার খলবলে চেহারা দেখে আমার খালি কালীমূর্তির কথা মনে পড়ত। ভয়ে শিউরে উঠতাম আমি। তারপরও কী এক অজানা টানে বার বার ওই নদীর কাছে যেতাম স্যার।

নদীর কাছে যাওয়ার আরেকটা কারণ ছিল। মহেশকাকার মেয়ে পাপিয়াদি ওই ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিয়েছিল স্যার। কেউ জানতে পারেনি। খোঁজ খোঁজ। চারদিকে তোলপাড় করেও পাপিয়াদিকে পাওয়া গেল না স্যার। তিনদিন পর মোহনায় তার দেহ ভেসে উঠেছিল। চেনা যাচ্ছিল না পাপিয়াদিকে। মাছরা খাবলে খাবলে মুখের মাংসগুলো খেয়ে ফেলেছিল পাপিয়াদির। কেউ জানল না স্যার, পাপিয়াদি কেন কুহেলিকায় ঝাঁপ দিয়েছিল! কেউ না জানলেও আমি জানতাম স্যার। পাপিয়াদির আত্মহত্যার জন্য সজলদা দায়ী ছিল স্যার। পাপিয়াদি খুব বেশিদূর লেখাপড়া করেনি। সেই সময় মাতারবাড়িতে মেয়েদের পড়াশোনার তেমন সিস্টেম ছিল না। মহেশ কাকার কাছেই পাপিয়াদি যা কিছু শিখেছিল। তো এই পাপিয়াদির সঙ্গে বাঁশঝাড়ের তলায় খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে কথা বলত সজলদা। এক সাঁঝবেলাতে উভয়কে জড়াজড়ি করতেও দেখেছি স্যার। যেদিন সজলদা বিয়ে করল, সেদিনই ওই ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিল পাপিয়াদি।

বড় রাগ হতো এই ব্রিজটির ওপর। বড় বড় ঢ্যালা ছুড়ে মারতাম জমিদার ব্রিজটির গায়ে। মুখে বলতাম- মর, মর তুই। তুই মানুষখেকো। তুই পাপিয়াদিকে খেয়েছিস, আর কাকে খাবি জানি না। মর তুই, মর। অনেকদিন পর আমাকেও খেয়েছিল ওই নষ্টা ব্রিজটি। আমাকেও সর্বস্বান্ত করেছিল কুহেলিকা। সে পরের কথা।

পুলটির তলায় বালিয়াড়ি। যখন ভাটা হতো জল নেমে যেত অনেক দূর। আমি তখন বালিয়াড়িতে নেমে যেতাম। ডান হাতের তর্জনী দিয়ে পাপিয়াদির ছবি আঁকতাম। তবে হুবহু পাপিয়াদির ছবি নয় স্যার। মা কালীকে পাপিয়াদির সঙ্গে মিশিয়ে দিতাম। লম্বা জিহ্বা দিতাম। হাতের নখগুলো বাঁকা বাঁকা। উড়ো উড়ো চুল। আর চোখে জ্বালাতাম আগুন। যেন পাপিয়াদি কাকে গিলে খাবে। আঁকা শেষ হলে নিচে লিখতাম- পাপিয়া দিদি।

তারপর মনে মনে বলতাম- পাপিয়াদি, সজলদা যদি এ পথ দিয়ে কোনো সময় যায়, তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ো। তোমার ওই যে হিংস্র নখ, ওই যে করাল দাঁত- ওগুলো দিয়ে সজলদার গা থেকে মাংস খাবলে খাবলে তুলে নিও। বেইমানের এই-ই তো শাস্তি হওয়া উচিত। আর একটা কাজ করো পাপিয়াদি- তুমি তো এখন পেত্নী হয়ে গেছ, রাতের বেলা সজলদার পথ আগলে দাঁড়িও। বলো, এই সজইল্যা যাস কই? বউ নিয়ে ঘর করস? আমারে নষ্ট কইরে বউ নিয়ে ঘর করস তুই? তারপর এক লাফে গাছে উঠে যেও পাপিয়াদি। দুই গাছে দুই পা দিও। তারপর ছ্যাড় ছ্যাড় করে সজলদার গায়ে মুতে দিও। সজলদার মাথা খারাপ হয়ে যাবে তখন। পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে, আর বলবে- ওই তোরা দূরে থাক। আমার গায়ে পেত্নীর মুত। বলে নিজের গা নিজে আঁচড়াবে নখ দিয়ে।

এই করে করে আমার দিন কাটতে লাগল স্যার। পড়াটাও চালিয়ে যাচ্ছিলাম। বাবা বড় সামাজিক মানুষ ছিল। তার কাছে শুধু মানুষ আসত। বাবা যে খুব পড়াশোনা জানত, তা নয়। কিন্তু তার দৃষ্টি ছিল খুব খোলামেলা স্যার। সবকিছুকে যুক্তি দিয়ে বিচার করত।

বাবাই ছিল স্যার আমার গুরু। ঘরে থাকলে বাবার পাশ ছাড়তাম না। বাবার সঙ্গে থেকে থেকেই লোকচরিত্র চিনতে লাগলাম। কেউ পাঁচ চড়ে রা কাড়ে না, কেউ ফণা-তোলা সাপের মতো। কেউ সহজ-সিধে, কারও রোখা-চোখা ভাব।

মাঝে মধ্যে পথচারীরা স্যার আমাকে রেলিং-এ ঝুঁকে থাকতে দেখে বলত- এই ছোকড়া, ওভাবে ঝুঁকে আছ কেন? পড়ে যাবে যে! আমি পেছন ফিরে মিষ্টি করে হাসতাম। মনে মনে বলতাম, বললেই হল! আপনারা বললেন আর আমি পড়ে গেলাম! এটা হল আমার ব্রিজ। আমি যতই পড়তে চাই না কেন, পুলটা কি আমায় পড়তে দেবে? ও যে আমাকে সেঁটে ধরে রাখে। বলে আরও ঝুঁকে পড়তাম কুহেলিকার জলের দিকে।

কখন বাবা আমার পেছনে এসে দাঁড়াত, টের পেতাম না। টের পেতাম বাবা যখন আমার পিঠের ওপর আলতো করে তার ডান হাতটা রাখত। বাবা মৃদু গলায় বলত, চল বাবা, তোর মা না খেয়ে বসে আছে। আমি একটু লজ্জা পেতাম স্যার।

এই যে আমার অন্যরকম চলা বাবা কোনোদিন তার জন্য কিছু বলেনি স্যার। এই যে নদীর সঙ্গে কথা বলা, নদীর পাড়ে দিনমান কাটানো- এসব নিয়ে বাবা কোনোদিন কিচ্ছুটি বলেনি আমায়। বাবার প্রশ্রয় আমি টের পেতাম। বাবার জন্যই আমি মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছি স্যার।

শুনেছিÑ ভালোবাসলে নাকি ভালোবাসা পাওয়া যায়। এ ডাঁহা মিথ্যে স্যার। ভালোবাসার বিনিময়ে মানুষ ভালোবাসা দেয় না স্যার, শ্রদ্ধার বিনিময়ে সমীহ পাওয়া যায় না স্যার। যদি পাওয়া যেত তাহলে আমাকে চল্লিশটা বছর এই ভাবে জীবনযাপন করতে হতো না।

বাবার কথা আরেকটু বলি স্যার। এমনি এমনি ভালো চাষি হওয়া যায় না স্যার। আসল চাষি মাটির প্রকৃতি বোঝে, সে বলদের সঙ্গে কথা বলে, লাঙলের সঙ্গে কথা বলে। মেঘ-বাদল-রোদের সঙ্গে ভাব জন্মায়। তারপর বীজ ছিটায়। চারা একটু মাথা তুলল তো তার গায়ে মমতার হাত। তারপর সার জল। গাছের মাথা বাতাসে দোল খায়তো চাষির হৃদয়টাও দোলে। কেন দোলে জানেন স্যার? ওই গাছের সঙ্গে যে চাষির আশা-বাসনা বাঁধা। তার স্বপ্ন যে ওই গাছ! গাছ যত বড় হয় চাষির স্বপ্নও তত বড় হয়। গাছ বড় হতে থাকল, চাষি টুপ করে একদিন মরে গেল। চাষি মরল বটে, স্বপ্নটি বেঁচে থাকল। চাষির বাসনা বৃক্ষ হয়ে এই পৃথিবীর জল হাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকল। কত ঝড়জল গাছটির ওপর দিয়ে বয়ে যায়। তার ডালপালা ভাঙে, কিন্তু কাণ্ডটি শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকে। কালক্রমে সেই বৃক্ষের অবশিষ্ট শাখায় কচিপাতা জন্মে। সেই পাতায় বসে চাষির স্বপ্ন আবার দোল খেতে থাকে।

আমার বারবার মনে হয়েছে, আমার বাবা সেই চাষি, বড় বাসনা নিয়ে আমার ভেতরে তার স্বপ্নকে রোপণ করেছিল। চাষির মতো বাবাও একদিন মরে গিয়েছিল, কিন্তু বৃক্ষের মতো বাবার বাসনাকে এই পৃথিবীর  জলহাওয়ায় আমি দোল খাওয়াতে পারিনি।

একটু কাব্য করে ফেললাম। কিছু মনে করবেন না স্যার। ধরে নেন, এ উন্মাদের প্রলাপ।

আমি স্যার আমার চারদিকের জীবনকে দেখছি আর একটু একটু করে শিখছি। আমি এইট পাস করে নাইনে উঠলাম স্যার। আমার নাকের নিচে সরু গোঁফের রেখা গজাতে লাগল। আমি পরম বিস্ময়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেই গোঁফের রেখা দেখি। এদিক ওদিক তাকিয়ে আলতো করে সেই গোঁফে আঙুল বুলাই। আমি টের পাই আমার ভেতরে একটা রূপান্তর ঘটছে। কিন্তু কিসের রূপান্তর তা বুঝতে পারি না। বাবা একদিন বলে, বাবা আমার, মানুষের স্বপ্ন যখন বাস্তব রূপ নিতে থাকে স্বপ্নদ্রষ্টার কী যে আনন্দ লাগে তা বলে বোঝানো যায় না। তুই আমার স্বপ্ন। তুই বেশি, আরও বেশি লেখাপড়া কর এই আমার বাসনা।

আমি এসএসসি ফাইনাল দিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। এক বিকেলে সেলিম চাচাকে পাঠালেন আমার কাছে। কে পাঠালেন? ইয়াকুব মিয়াজি স্যার। সেলিম চাচা বলল, বড় মিয়াজি বলেছেন- তোমার যদি সময় থাকে তার সঙ্গে একবার দেখা করতে।

আমি তো হতবাক! বড় মিয়াজি লোক দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন! আমি তো গাঁয়ের একজন সাধারণ ছেলে। তিনি কত্ত বড়। তাছাড়া সন্ধের দিকে এমনিতেই আমি লাইব্রেরিতে যেতাম। তখন তো তাঁর সঙ্গে দেখা হতোই। ভাবলাম- নিশ্চয় কোনো দরকারে তিনি ডেকে পাঠিয়েছেন আমায়। আমি জামাটা গায়ে জড়িয়ে সেলিম চাচার সঙ্গে রওনা দিলাম। গলা উঁচু করে মাকে বললাম, মা, আমি একটু আসছি। বাবা তখনো খেত থেকে বাড়িতে ফেরেনি।

বড় মিয়াজি বললেন, চল, তোমাকে নিয়ে একটু বেরোব। আপত্তি নেই তো তোমার?

কী জবাব দেব আমি! গোটা ব্যাপারটা আমি ঠাহর করে উঠতে পারছি না তখনো। আমি ডানদিকে ঘাড়টা কাত করেছিলাম।

তিনি আমাকে নিয়ে মাঠে নামলেন। সেলিম চাচাকে বললেন, আমার সঙ্গে আসতে হবে না তোমাকে। ভেতরবাড়িতে বলে দিও আমার জন্য চিন্তা না করতে।

বড় মিয়াজি জমির মাঝখান দিয়ে আল ধরে হাঁটছেন, আর ডানে বাঁয়ে তাকাচ্ছেন। কী যেন গম্ভীর মুখে চিন্তা করলেন কিছুক্ষণ। আমি তার পিছু পিছু।

একটা জায়গায় গিয়ে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। আমার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে বললেন, এই যে চারদিকে খেতগুলো দেখছ, সব আমার। এই ধান, তরমুজ, ডাল আর নানা শাকসব্জি দেখছ তার অর্ধেক যাবে আমার কাছে। তারপরও ভালো লাগে না আমার।

আমি সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, কেন ভালো লাগে না বড় মিয়াজি?

তিনি বললেন, এসবের কোনোটাই আমার নিজের শ্রমে অর্জন করিনি আমি। এগুলোর মালিক হওয়ার জন্য এক ফোঁটা ঘামও ঝরাতে হয়নি আমাকে। কিন্তু তারপরও এই জায়গা-জমি-ফসল আমার হয়ে গেছে। অথচ এগুলোর ন্যায্য প্রাপক যারা চাষাবাদ করছে তারা। বড় অপরাধ লাগে আমার।

তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বড় মিয়াজি। তার পর বললেন, আমার তুলনায় তোমার বাবা বেশ আছে। জমি আছে কিছুটা, কিন্তু তোমার মতো বিরাট একটা ফসলি মাঠ আছে তার। আমার দিকে তাকিয়ে দেখ, কিছুই নেই। মেয়েগুলো শ্বশুরবাড়িতে। তাদের ঘরকন্না নিয়ে তারা ব্যস্ত। এখন আমি আর আমার স্ত্রী বড় নিঃসঙ্গ। বলে চুপ মেরে গেলেন বড় মিয়াজি। এরপর আর একটি কথাও বলেননি তিনি। সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে এলে ঘরে ফিরে এসেছিলাম আমরা।

আজও স্যার একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাইনি আমি। কেন তিনি আমাকে নিয়ে মাঠে গিয়েছিলেন? যদি একাকিত্বের কথা বোঝাবার জন্য নিয়ে যান, তাহলে সঙ্গী হিসেবে আমাকে বেছে নিয়েছিলেন কেন? মাতারবাড়ির কত মানুষ তাঁর সঙ্গ পেলে বর্তে যায়!

এর পর বেশিদিন বাঁচেননি তিনি। যেদিন আমার এসএসসির রেজাল্ট বের হল, সেদিনই মারা গেলেন বড় মিয়াজি। আমার ভালো ফলের কথা ভুলে গিয়েছিলাম আমি। সারাদিন বুক ভাসিয়ে কেঁদে গিয়েছিলাম।

কক্সবাজার কলেজে বিএ পড়তে পড়তে বাবাও মারা গেল একদিন। আমি অথই জলে পড়লাম স্যার। পড়া শেষ না করেই ফিরে আসতে হয়েছিল আমাকে। মাতারবাড়িতে মা একা। তখন আমার তেইশ। দিশেহারা। কী করব কিছুই বুঝে উঠতে পারি না। যাঁর কাছ থেকে বুঝ নিতাম, বড় মিয়াজি, তিনি নেই। বাবার জমিজিরাত কোথায় কী আছে ভালো করে জানি না। বাবাও কোনোদিন এসবে আমাকে যুক্ত করেনি। আমিও নির্ভার ছিলাম। পিতা আছে, আমার মাথার ওপর বটগাছের ছায়া আছে।

শেষ ক’বছর বাবা নিজ হাতে চাষ করা ছেড়ে দিয়েছিল। দূরের জমিগুলো বর্গা দিয়ে দিয়েছিল। শুধু বাড়ির পাশের একখ- জমিতে নিজ হাতে কোদাল চালাত বাবা। মরিচ, টমেটো, ঢেঁড়শ, বেগুন, ধনেপাতা- এসবের চাষ করত। দু’একজন বর্গাচাষি আমার সঙ্গে দেখা করল, জমি চিনলাম। আমি বাবার শর্তে তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকলাম। চাষারা আগে ধান দিত। আমি ধানের বদলে টাকার প্রচলন করলাম। এর বাইরে কোনো খেত আছে কি না আমার জানা নেই। বাবার অবর্তমানে বর্গাচাষিরা ওই জমি, হজম করার তালে থাকলেও আমার কিছু করার থাকল না। ওই জমির অবস্থান আমার জানা নেই, ওই বর্গাচাষিদেরও আমি চিনি না। বাবা আছে- এই ভরসায় মা-ও কোনোদিন খেত-জমি-খামারের খোঁজ রাখেনি।

শফিক মিয়াজির তখন রমরমা অবস্থা। পিতল ছুঁলে সোনা হচ্ছে। কুহেলিকার ঘাটে ধান চালের আড়ত, কাঠ চেড়াইয়ের কল, লবণের গোলা- প্রতিদিন সোনার ডিম দিচ্ছে। এক জামাই, শমসের, এসবের হিসাব রাখার দায়িত্ব পেয়েছে। ছোট মিয়াজি বলেন, বাইরে হলেও তো চাকরি করবে তুমি। চাকরির সময়টা আমাকে দাও। মাস মাহিনা পাবে, চাকরি করে যা পেতে, তার দ্বিগুণ পাবে।

শমসের দোনামনা করে। হাজার হলেও সৈয়দ বংশের ছেলে। শ্বশুরের গোলামি করবে! ছোট মিয়াজি জামাইয়ের মনোভাব টের পান। বলেন, যতদিন ভালো লাগে কর। যেদিন তোমার মন বলবে- সম্মানের ক্ষতি হচ্ছে, ছেড়ে দেবে। শ্বশুরকে সংকট থেকে উদ্ধার করার দায়িত্বও তো জামাইয়ের ওপর বর্তায় শমসের। কী বল, মিথ্যে বললাম?

শমসের সৈয়দ আর দ্বিরুক্তি করবার সাহস করেনি। শহিদুল মিয়াজি লবণের গোলাটা দেখে বটে, তবে ব্যবসায়ে তার মন নেই। তার হিসেবে প্রায় গ-গোল ধরা পড়ে। সব জেনেও ছোট মিয়াজি চুপ মেরে থাকেন।

বাড়িটাও আলাদা করে ফেলেছেন ছোট মিয়াজি। দাদা যতদিন ছিলেন, আলাদা বাড়ি করার সাহস করেননি। বড় মিয়াজি মরার পর মাইজপাড়ায় ঘর তুলেছেন। হংসমিয়াজির পাড়ার পাশের গ্রাম মাইজপাড়া।

ঘর তো নয়, যেন রাজবাড়ি। চারদিকে বারান্দা খাটানো। বিরাট উঠান। উঠানের উত্তর দিকে কাছারি। সেখানে সন্ধ্যার দিকে বসে গোটা দিনের আয়-ইনকামের হিসাব মিলান ছোট মিয়াজি। স্ত্রীকে নিয়ে হজ করে এসেছেন। মাথায় সর্বদা টুপি, মুখে নুরানি দাড়ি।

কাছারির অদূরে কর্মচারীদের ঘর। দূরের যারা, তারা ওই ঘরগুলোতে থাকে। কেউ সস্ত্রীক, কেউ ব্যাচেলর। বাড়ির চারদিকে গড়খাই। কেউ চুরি করতে এলে জলভর্তি ওই গড়খাই লাফ দিয়ে পেরোতে পারবে না। মূল প্রবেশ পথে লোহার গেট।

কক্সবাজার থেকে ফিরে আসার পর মানুষের মুখে এসব কথা শুনি স্যার। ছোট মিয়াজির প্রতি কোনো কালেই আমার টান ছিল না। ফলে এসব কথায় আমার কোনোরূপ ভাবান্তর হতো না। আমি স্যার জমিজমার দিকে একটু মন দিয়েছিলাম, কিন্তু কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না। পারব কী করে, জন্ম থেকেই তো বাবা আমাকে অন্যভাবে তৈরি করতে চেয়েছে। বিষয়মুখী হবার জন্য কোনোকালেই তাগাদা দেয়নি।

তাছাড়া জমিটমিগুলো বর্গাচাষিদের বুঝিয়ে দেওয়ার পর আমার হাতে আদৌ কোনো কাজও থাকল না। আমি ত্রিভুবন সুন্দরী লাইব্রেরিতে যাই। বড় জীর্ণদশা এখন লাইব্রেরিটির। বড় মিয়াজির মৃত্যুর পর লাইব্রেরিটি দেখার কেউ নেই। মেজমেয়েটি স্বামীসহ বাপের বাড়িতে এসে উঠেছে। মাকে দেখার তো কেউ নেই। মেজজামাই শ্বশুরের জমিজিরাতের হিসেব রাখে। ওদের রুচি ও সময় নেই লাইব্রেরিটিকে মরণদশা থেকে উদ্ধারের। বড় মিয়াজি নেই বলে লাইব্রেরিতে আমার বেশিক্ষণ মন টিকে না। তারপরও মাঝে মাঝে যাই। অন্য সময় গাঁয়ের পথে পথে হাঁটি। আমার তেমন বন্ধুবান্ধবও নেই মনের কথা বলার। ছোটবেলা থেকে প্রকৃতির সঙ্গেই আমার যা বন্ধুত্ব ছিল।

মাঝেমধ্যে জমিদার ব্রিজের ওপর গিয়ে দাঁড়াই। কুহেলিকার জলের দিকে তাকিয়ে আমার শৈশবকে খুঁজি। পাপিয়াদির কথা মনে পড়ে। জলের স্রোতে পাপিয়াদির চেহারা দেখার চেষ্টা করি। শুনেছি, সজলদা এখন অর্ধ উন্মাদ। মাঝেমধ্যে হুঁশে থাকে, বেশিরভাগ সময় পাগলা। পাপিয়াদিকে বলি- পাপিয়াদি, দেখ তোমার অভিশাপ কী সাংঘাতিকভাবে লেগেছে সজলদার ওপর। নিশ্চয় তুমি কোনো এক নিশুতি রাতে সজলদাকে ভয় খাইয়েছিলে। নইলে কেন গাট্টাগোট্টা সজলদা পাগল হয়ে গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে।

বাড়ি ফিরলে মা মুখের দিকে তাকায়। আমার শুকনা মুখ আর উদাসীন চেহারা দেখে মা গম্ভীর মুখে কী যেন ভাবে। মায়ের চেহারায় বার্ধক্যের ছায়া। হাত-পা-মুখের চামড়া কুঁচকাতে শুরু করেছে মায়ের।

একদিন দুপুরে খেতে বসেছি। মা মাথার ওপর পাখা করতে করতে বলে, তোকে একটা কথা বলি বাপ?

মায়ের দিকে তাকিয়ে বলি, কী মা?

এবার তুই একটা বিয়ে কর।

কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম। মা আমাকে কথা বলতে না দিয়ে বলল, তুই তো আর লেখাপড়া করবি না বাবা। বয়সও তোর কম হলো না। জমিজমাগুলোও বর্গাচাষিদের দিয়ে দিয়েছিস। মরা মন নিয়ে পথে পথে হাঁটিস। ঘরে বড় একা একা লাগে। তোর বাপ যতদিন ছিল, সময় কেটে যেত। এখন একাকী সময় কাটে না। বউ ঘরে এলে খুব আনন্দ লাগবে আমার।

আমি নীরব ছিলাম। মা দু’একজন আত্মীয়স্বজনকে কনে দেখার খবর পাঠাল। সরদারপাড়ার লাবণ্যের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেল দু’মাস পর।

মা মারা যাবার আগে নাতনির মুখ দেখে যেতে পেরেছিল। বিয়ের বছর দেড়েক পরে মা আমার মারা গিয়েছিল।

সে পরের ঘটনা। আমি আগের মতোই। এখানে ওখানে ঘুরি, পারলে মানুষের উপকার করি। দুপুরে এসে পাতে বসি। লাবণ্য বড় ভালো মেয়ে। এ নিয়ে কোনোদিন কিছু বলে না। এক হাতে কন্যা, অন্য হাতে সংসার সামলায় লাবণ্য। আম্বিয়া নামের সতেরো আঠারো বছরের এক কিশোরী লাবণ্যকে ঘরকন্নার কাজে সাহায্য করে। চলছিল এরকমই জীবনটা। হঠাৎ একদিনের একটি ঘটনা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল স্যার।

হংসমিয়াজির গাঁয়ের মাঝখানে একটা বাজার স্যার। ছোট। কয়েকটি মুদির দোকান, চা-দোকান ক’খানা, সেলুন একটা, দু’তিনটে আড়ত- এ নিয়ে মিয়াজিবাজার। সোমবারে আর বৃহস্পতিবারে বাজারটা জমজমাট। আশপাশের চাষিরা খেতখামারের নানা ফসল নিয়ে আসে। অন্যদিন অনেকটা খাঁ খাঁ। একেবারেই যে খাঁ খাঁ, এমন নয়। আশপাশের মানুষজন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনার জন্য তো হরহামেশা আসেই।

একদিন দেখলামÑ শহিদুল মিয়াজি একজনকে বাজারের মাঝখানে ফেলে বেধড়ক পিটাচ্ছে। একেবারে ফিল্মি কায়দায় স্যার।

শহিদুলের সঙ্গে কয়েকজন সাঙ্গাত। দোকানদার থেকে সবাই তটস্থ। পিটুনি আর থামে না। বেলা এগারো সাড়ে এগারো হবে তখন। সে সকালে আমার ইচ্ছে জেগেছিল বাজারটি দেখার।

আমি একজনকে জিজ্ঞেস করায় বলল, ছোট মিয়াজির ছেলে শহিদুল মিয়াজি একজনকে পিটাচ্ছে।

আমি বললাম, কাকে?

লোকটি বলল, উত্তরপাড়ার সজলকে।

কোন সজল? পাপিয়াদির সজলদা নয়তো? আমি বিচলিত পায়ে জটলার নিকটে গেলাম। উঁকি দিয়ে যাকে পিটাচ্ছে তাকে চিনতে পারলাম না। পাশের একজন বলল, পাগলা সজইল্যা ছোট মিয়াজির পোলারে টিটকারি মারছে।

আমি জটলার মাঝখানে ঢুকে জোর গলায় বললাম, আর না। বহুত হয়েছে।

মারতে মারতে হাত ব্যথা হয়ে গিয়েছিল বোধ হয় শহিদুল মিয়াজির। মারায় ক্ষান্ত দিল। আমার দিকে ধমকের চোখে তাকিয়ে পাশের চা-দোকানে গিয়ে বসল।

মারটা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল স্যার। নাক ফেটে রক্ত পড়ছে ঝরঝর। ডান চোখটা বুজে গেছে, কালশিটে পড়েছে। প্রায় অজ্ঞান সজলদা, মাঝেমধ্যে কোঁকাচ্ছে।

কী মনে করে শহিদুল মিয়াজি আবার এগিয়ে এল। আমি সজলদাকে আগলে রেখে বললাম, কী করেছ? মরে যাবে যে!

শহিদুল আমাকে খুব ভালো করে চেনে বলে মনে হল না। চিনবে কী করে? ও হাঁটত একদিকে, আমি হাঁটতাম অন্যদিকে। তাছাড়া মাঝের ক’বছর তো আমি গ্রামেই ছিলাম না। উৎসবে-পার্বণে গ্রামে আসা, তাও দু’একদিনের জন্য।

শহিদুলের রাগ তখনো পড়েনি, নাক দিয়ে ফোঁস ফোঁসানি। আমার কথার কোনো উত্তর দিল না শহিদুল। সজলদাকে উদ্দেশ করে বলল, আমার সঙ্গে ফাতরামি! বলে কিনা মিয়াজি মিয়াজি, মাতারবাড়ির পিঁয়াজি।

আমি ঠান্ডা গলায় বলালাম, নিজেদের ঘাড়ে নিচ্ছ কেন? তুমি ছাড়াও মিয়াজিবংশের লোক এই মাতারাড়িতে আরও তো আছে। ও যে পাগল।

চোখ গরম করে কিছু একটা আমাকে বলতে যাচ্ছিল শহিদুল। পাশে দাঁড়ানো সাঙ্গাতদের একজন কানে কানে কী যেন বলল। শহিদুল চুপ মেরে গেল।

আমি শহিদুলের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে সজলদার দিকে তাকালাম। বললাম, আরে, এ যে মরে যাবে! খুব খারাপ অবস্থা বলে মনে হচ্ছে!

শহিদুল আস্তে করে পেছনে সরে গেল। চা-দোকানে গিয়ে আবার বসল। চোখ রাখল আধমরা সজলদার ওপর।

গরিব মতন মাঝবয়সী একজন দৌড়ে গিয়ে এক মগ পানি নিয়ে এল। অনেকক্ষণ জলের ঝাপটা দেওয়ার পরও চোখ খুলল না সজলদা।

আমি বললাম, পাগলা মানুষ। খেয়ে না খেয়ে রোদবৃষ্টিতে ঘুরে বেড়ায়। একদার গাট্টাগোট্টা সজলদা আজকে হাড়গিলা। ওর শরীরে কি এত মার খাওয়ার জোর আছে?

শহিদুল ভয় খেয়ে গিয়েছিল তখন। যদি সজইল্যা মরেটরে যায়, তাহলে কী হবে? ভয় খাওয়া গলায় পাশে বসা সাঙ্গাতটিকে বলল, ওরকম বেয়াদবি করল বলেই না মারলাম। ওরকম করে না বললে কি মারতাম?

ঠোঁটকাটা জব্বার বলল, সজইল্যার গায়েগতরে গোস্ত নাই বলে মারতে পেরেছ। পাগলা মারতে তো আরও সুবিধা। জব্বারের কথার মানে ভালো করে বুঝতে পারল না শহিদুল। কথাটা প্রশংসার না টিটকারির, বোঝার মাথা শহিদুলের নেই।

সজলদার শরীরটা তখন খিঁচাচ্ছে। একবার সোজা হচ্ছে আবার কুঁকড়ে যাচ্ছে।

আমি বললাম, ডাক্তার! ডাক্তার হরেনকাকাকে ডেকে আনো কেউ।

জটলা থেকে কে একজন বলল, হরেনকাকা কক্সবাজার গেছেন। ছোট মেয়েটির দাস্ত হচ্ছিল। সকালে গিয়ে পাইনি।

তাহলে এখন উপায়! জটলা থেকে আরেকজন বলে উঠল।

আমি কিছু একটা ভাবলাম স্যার। তারপর বললাম, এভাবে বাজারের মাঝখানে ঝাঁ ঝাঁ রোদের মধ্যে ফেলে রাখা ঠিক হবে না। বিপজ্জনক কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। তোমরা আমার সঙ্গে হাত লাগাও। আড়তের দাওয়ায় শুইয়ে দিই। সবাই মিলে ধরাধরি করে সজলদাকে আড়তের দাওয়ায় শুইয়ে দিলাম।

এই সময় কোত্থেকে আলুথালু কাপড়ে এক নারী ছুটে এল। তার পিছু পিছু ছোট ছোট দুটো ছেলেমেয়ে। ওদের সঙ্গে আরও অনেককে ছুটে আসতে দেখা গেল। নারীটি এসেই সজলদার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল- ওরে মারে, এরকম অবস্থা কে করল গো!

একজন বলল, সজলের বউ।

এত সংকটের মধ্যেও আমি নারীটির দিকে চোখ তুলে তাকালাম স্যার। এই প্রথম আমি সজলদার বউটিকে দেখলাম। ও, তাহলে এই-ই সজলদার বউ! পাপিয়াদির কথাও বেশ করে মনে পড়ে গেল আমার।

আমি হুঁশে ফিরলাম। বললাম, আজ সকাল থেকে সজলদা বোধ হয় কিছু খায়নি। দুর্বল শরীর। কিছু একটা ঘটে গেলে শহিদুল বেশ বিপদে পড়ে যাবে। থানা-পুলিশ, জেল-ফাঁসি। শেষের কথাটা আমি জোরেই বলেছিলাম স্যার। আমার কথায় কাজ হল। দ্রুত শহিদুল দাওয়ার কাছে এল। মুখটা ভীষণ শুকনা।

ততক্ষণে কে একজন তালপাতার একটা পাখা জোগাড় করেছে। সজলদার বউটি বিলাপের সুরে কাঁদছে আর সজলদার মাথায় জোরে জোরে বাতাস করছে।

বুড়ো ধরনের একজন আক্ষেপ করে বলল, এরকম করে কেউ মারে!

আরেকজন বলল, দুর্বল বলেই তো মেরেছে। আমাদের মেরে দেখুক দেখি! শহিদুল আমতা আমতা গলায় বলল, বেশি মারিনি। বেকায়দায় লেগে গেছে বোধ হয়।

বেশি ঢং মাইরো না মিয়াজির পোলা।। মাইরা এখন সাফাই গাইছ। সজইল্যার কিছু একটা হোক না, তখন টের পাইবা মজা। বলে ভিড়ের মধ্যে মুখ লুকাল লোকটি!

শহিদুলের পা দুটো কাঁপতে থাকে। সত্যি মরে যাবে নাকি বেটা! অন্য একজন বলল, মরে গেল নাকি? পেট যে উঠানামা করছে না!

লোকটির কথা শুনে আমি চট করে চিৎ করে শোয়ানো সজলদার পেটের দিকে তাকালাম। নাহ্, উঠানামা বন্ধ হয়নি। উঠানামা চলছে, তবে খুব ক্ষীণভাবে।

কিছুক্ষণ পর পর পানির ছিঁটা চলছে। জোরে জোরে পাখা নাড়া হচ্ছে। অবস্থা যেই কে সেই।

কে একজন বলে উঠল, হারামখোর, মিয়াজি বংশের কলঙ্ক। নানারকম কুকাজ করে বেড়ায়। ছোট মিয়াজির পোলা বলে আমরা সবকিছু সহ্য করে যাই। আর সহ্য করুম না। এর একটা উপযুক্ত বিচার হওয়া দরকার।

অনেকে বলে উঠল, হ হ, বিচার হওয়া দরকার।

আমি বুঝলাম- অবস্থা বেগতিক। ঝট করে উঠে দাঁড়ালাম আমি।

শহিদুলের কাছে গিয়ে চাপা স্বরে বললাম, তুমি এখান থেকে চলে যাও। এক্ষুণি।

আমি আবার সজলদার পাশে এসে বসে পড়লাম। সবার দৃষ্টি সজলদার দিকে ঘুরে গেল। এই ফাঁকে শহিদুল সটকে পড়ল।

বাড়ির দিকে যেতে যেতে শহিদুল হয়তো ভাবল- রাতে একটা আসর বসার কথা ছিল। কীজন্য যে মাথাটা গরম হয়ে গেল। মিয়াজির সঙ্গে পিঁয়াজির সম্পর্ক! সে পালিয়ে এল বটে, মনটা কিন্তু পড়ে রইল ওই বাজারে। আসার সময় জব্বারকে রেখে এসেছে। দেখা যাক কী হয়।

ওই সময় হঠাৎ তেজের গলায় একজন বলল, হারামজাদাকে ধরে দে না কয়েকটা।

আরেকজন বলল, আরে, গেল কোথায়! মিয়াজির বাচ্চাতো পালিয়ে গেছে।

আরেকজন বলল, সামান্য কথার জন্য খুন করে ফেলল বেচারাকে!

কে যেন বলে উঠল, এখানে বসে বসে সময় না খেয়ে চল থানায় খবর দিই। পুলিশের ঠেলা সামলাক মিয়াজির পোলা।

এই সময় একজন চিৎকার করে উঠল, মেলেছে, চোখ মেলেছে। সজল চোখ মেলেছে।

সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল সজলদার ওপর। সজলদা সত্যি তখন চোখ মেলেছে। শুধু চোখ মেলেছে নয়, চোখের পাতা পিটপিটও করছে।

জব্বার দৌড়ে গিয়ে এক গ্লাস দুধ নিয়ে এল চা-দোকান থেকে। সজলদার মুখ উঁচিয়ে ধরে বলল, খা ভাই, খা।

এই সময় বউটি আরও জোরে কেঁদে উঠল। বাচ্চা দুটোও মায়ের সঙ্গে সুর মিলাল। আনন্দের কান্নাই কেঁদেছিল বোধ হয় বউটা। পাগল হলেও স্বামী তো।

আমি জোর গলায় বললাম, এবার ভিড় হালকা কর তোমরা। এ যাত্রায় বেঁচে গেছে সজলদা। আমার কথা শুনে মানুষরা সরে যেতে লাগল।

আরও কিছুক্ষণ পরে দুজনের কাঁধে হাত রেখে সজলদা সামনের দিকে এগিয়ে গেল। পিছু পিছু বউটি। তার সঙ্গে বাচ্চা দুটো।

 

আমি ভীষণ চমকে গিয়েছিলাম স্যার সেদিন জামাই শমসেরকে আমাদের উঠানে দেখে। আপনার তো মনে আছে শমসের মিয়া কে? ওই যে শফিক মিয়াজির জামাই। মেজজামাই স্যার।

এত সকালে শমসেরকে আমাদের উঠোনে দেখে একটু ভয়ও পেয়ে গিয়েছিলাম স্যার। গতকালকের বাজারের ঘটনাটি আদ্যপ্রান্ত চোখের ওপর ভেসে উঠতে লাগল। শহিদুল মিয়াজির ক্ষিপ্ত চেহারা, সজলদার ওপর অকথ্য অত্যাচার, মানুষদের ক্ষেপে যাওয়া, সজলদাকে চ্যাংদোলা করে দাওয়ায় শুইয়ে দেওয়া, সেবা করা- এসব দৃশ্য দ্রুতবেগে আমার সামনে দিয়ে চলে গেল। শহিদুলের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে দু’চারটি কথা যে বলেছি, তা-ও মনে পড়ল। নিশ্চয় শহিদুল তার বাপকে উল্টাপাল্টা বুঝিয়েছে, নইলে এই সাতসকালে শমসের হাজির হবে কেন আমাদের উঠানে?

মন বলল, এত ভয় পাচ্ছ কেন তুমি? ভালোটুকুই তো করেছ গতকালকে। যেভাবে মানুষরা ক্ষেপে উঠছিল, তুমি একটু উসকালে শহিদুলের কিছু একটা করে ফেলত ওরা।

অন্য মন বলল, বড়লোকের কাজ কারবার! ভালো কাজ করলে এ ধরনের মানুষরা জুতা মারে, আবার অন্যায় কাজ করলে কোলে তুলে নেয়। বড়লোকের মন বোঝা দায়।

এই সময় শমসের বলল, আপনার কাছে শ্বশুর পাঠিয়েছেন আমাকে। তিনি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। যদি সময় থাকে তাহলে তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করার অনুরোধ করেছেন।

অনুরোধ! নিজের অজান্তে আমার মুখ দিয়ে শব্দটি বেরিয়ে এল। আমার ধারণা ছেলের অপদস্থতার জবাব চাইবার জন্য মিয়াজি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। সাক্ষাতে এসপার কী ওসপার- কিছু একটা করবেন। তা-ই যদি হয়, তাহলে অনুরোধ কেন? বড় দ্বিধায় পড়ে গেলাম আমি।

মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, কী কারণে ছোট মিয়াজি দেখা করতে বলেছেন, জান কিছু?

জামাই চিন্তান্বিত মুখে বলল, আশ্রিত মানুষ আমি। ওদের মনোভাব তো বুঝতে পারি না। খবরটা আপনাকে পৌঁছাতে বললেন শ্বশুর, তা-ই পৌঁছানোর জন্য আপনার কাছে আসা।

বুঝলামÑ শমসের মিয়া আত্মসম্মান বিষয়ে খুব সজাগ। অনেকটা ফাঁদে পড়ে যে শফিক মিয়াজির বাড়িতে কাজ করছে, জামাইয়ের কথাতে তা আঁচ করতে খুব বেগ পেতে হল না। আমি এ-ও বুঝলামÑ জামাইকে খুঁচিয়ে প্রকৃত কারণের সন্ধান পাওয়া যাবে না।

জিজ্ঞেস করলাম, কখন দেখা করতে বলেছেন?

আজ বিকেলে হলে ভালো হয় বলেছেন ছোট মিয়াজি। আমার মনে হল, জামাই শমসের ইচ্ছে করে ‘ছোট’ শব্দটির ওপর বেশি করে শ্বাসাঘাত করেছে। ওই শ্বাসাঘাতের সঙ্গে তার ক্ষোভটা জড়িয়ে আছে বলে অনুমান করলাম।

আমি বললাম, বিকাল নয়, সন্ধ্যার আগে আগে যাব।

জামাই বলল, ঠিক আছে।

মা আড়াল থেকে সব শুনেছে। তার পাশে লাবণ্যও দাঁড়িয়ে ছিল। আমি ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মা বলে উঠল, কী ব্যাপার বাবা! কোনো ঝামেলায় জড়িয়েছিস নাকি? ছোট মিয়াজির জামাই আমার উঠানে!

মায়ের অনেকগুলো প্রশ্ন শুনেও আমি মৃদু মৃদু হাসতে লাগলাম। এই সময় লাবণ্য কথা বলে উঠল, হাসছ কেন? মায়ের ভয় পাওয়াটা টের পাচ্ছ না? শুনেছি, ছোট মিয়াজির মেজছেলে ভীষণ বদ। তার সঙ্গে কোনো ঝামেলায় জড়াও নি তো?

আমি হাসিটা থামিয়ে বললাম, তোমরা শুধু শুধু ভয় পাচ্ছ, কিছু হয়নি। তবে…। বলে আমি থেমে গেলাম।

লাবণ্য বলল, তবে কী?

গতদিন শহিদুল মিয়াজি সজলদাকে বাজারের মধ্যিখানে ফেলে বেধড়ক পিটিয়েছে। সেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম। জানি না ছোট মিয়াজির কাছে কী রিপোর্ট গেছে। আমি শ্বাস টেনে বলি, যা হোক, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আজ সন্ধ্যায় গিয়ে  দেখি। সব পরিষ্কার হয়ে যাবে তখন।

বিকেলে বেরোনোর আগে মা বলল, সাবধান বাপ। ছোট মিয়াজি উল্টাপাল্টা দু’চার কথা শুনালেও চুপ মেরে থাকিস। মুখে মুখে তর্ক করিস না। বাপ নেই তোর। বাপহারা ছেলের ওপর চোটপাট করা সহজ। ওরা বড়লোক। বড়লোকের মতিগতি বোঝা দায়।

তাকিয়ে দেখলামÑ লাবণ্য মরামুখে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের কথা যে ওরই কথা বুঝতে অসুবিধা হল না আমার।

আমি একটু মুচকি হেসে উঠানে নামলাম। পেছন থেকে মা আবার বলল, আমার কথা মনে রাখিস বাপ। মাথা গরম করিস না।

আমি একটু উঁচুগলায় মাকে আশ্বস্ত করে বললাম, তুমি কখনো আমাকে মাথা গরম করতে দেখেছ মা?

হংসমিয়াজিপাড়া থেকে মাইজপাড়া গ্রামের দূরত্ব নেহাত কম নয়। আল-খাল মিলে অনেকটা পথ। ছোট মিয়াজির বাড়িতে পৌঁছাতে ঘণ্টা দেড়েক লেগে গেল।

কাছারিটি পরিপাটি করে গুছানো। ছোট মিয়াজির রুচি-আচার সম্পর্কে আমার ধারণা ভালো নয়। ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি- শফিক মিয়াজি ভিন্ন ধাঁচের মানুষ। একটু বাউণ্ডুলে, একটু বেয়ারা। লেখাপড়াও তেমন নেই। মানুষের সঙ্গে সদ্ভাবও ছিল না। আবাল্য তাঁর রাগ আর অনাচারের কথা শুনেছি। তো এই ধরনের মানুষের কাছারি এত পরিপাটি হবার কথা নয়। তাকিয়ে তাকিয়ে রুচির খামতি পেলাম না কোথাও।

পৌঁছামাত্র জামাই শমসের এগিয়ে এল। একটা গদিওয়ালা চেয়ার দেখিয়ে বলল, বসেন। এই চেয়ারটিতে বসেন। শ্বশুর জায়নামাজে। একটু পরে আসছেন তিনি।

খুব বেশি সময় বসে থাকতে হয়নি স্যার আমাকে। ছোট মিয়াজি ঘরে ঢুকতেই উঠে দাঁড়ালাম। বড়দের সম্মান জানানোর অভ্যাসটি বাবার কাছ থেকে পাওয়া।

ছোট মিয়াজি বললেন, বস বস। বলে মাথার টুপিটা ঠিক করে আবার মাথায় বসালেন। নুরানি দাড়িতে ডান হাতটা একবার বুলিয়ে নিলেন। আমি খেয়াল করলাম, এসব করতে করতে তিনি আমাকে গভীর চোখে লক্ষ করছেন।

তিনি বললেন, তোমাকে আমি কোনোদিন চোখে দেখিনি। তবে অনেকদিন হল তোমার নাম শুনে আসছি। তোমার বাপের জানাজায় যেতে পারিনি, কক্সবাজার ছিলাম সেদিন। থাকলে তোমার সঙ্গে দেখা হতো।

খবর রাখি- বাপের মৃত্যুর পর তুমি ভেবাচেকা খেয়ে গিয়েছিলে। তুমি ভালোমতো সমস্যাগুলো কাটিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছ, তা-ও জানি।

শফিক মিয়াজির কথার সুরটি আমি ঠিকমতো ধরতে পারছি না। তিনি আমাকে কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছেন, তাও বুঝতে পারছি না। শুধুমাত্র এই কথাগুলো বলবার জন্য তিনি আমাকে ডেকে পাঠাননি। নিশ্চয় এর পেছনে গভীর কোনো কারণ আছে। কিন্তু সে কারণটাই আমি ধরতে পারছি না। অদূরের একটা চেয়ারে জামাই শমসের বসে আছে। তার দিকে তাকালাম। তার মুখম-লে এই রহস্যের কোনো উত্তর নেই।

এবার ছোট মিয়াজির কণ্ঠে একটু গরম হাওয়া টের পেলাম। তিনি বললেন, বাপ আমার পরহেজগার মানুষ ছিলেন। বড় ভাই তাঁর স্বভাব পেয়েছিল। আমি একটু ট্যারাভাবে মানুষ হয়েছি। ভদ্রলোক আর ভদ্রতাকে পাশ কাটিয়ে চলেছি। বাপের সম্পত্তি হাতে আসার পর টের পেলাম আমি কত বড় বেয়াড়া। মানুষরাও যে আমাকে পছন্দ করে না, তা বুঝতেও আমার দেরি হলো না। নিজে তো এক রাতের মধ্যে আর ভালোমানুষটি হয়ে যেতে পারব না। চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম। বেশি চেষ্টা চালালাম শহিদুলের ওপর। হঠাৎ ছোট মিয়াজি কথা বলা থামিয়ে দিলেন। বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তারপর করুণ মুখে বললেন, তুমি তো আমার দুর্ভাগ্যের কথা জান। তিন ছেলে আমার। বড়টা থেকেও নেই। ছোটটা আল্লাহর পথের পথিক। আমার সকল আশা-ভরসা ছিল শহিদুলকে ঘিরে। পড়াশোনা করল না। আবেজাবে ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করল। লবণের গোলাটা দেখাশোনার দায়িত্ব দিলাম তাকে। তাও চালাতে পারল না। চুরিদাড়ি করে। মাসের শেষে হিসেব মিলাতে গিয়ে গড়মিল ধরা পড়ে। তার সম্পর্কে দু’চারটা আপত্তিকর কথাবার্তাও কানে আসে। এভাবেই চলছিল শহিদুল। কালকের ঘটনাটা আমাকে একেবারে কাহিল করে ছেড়েছে। তুমি না থাকলে কী যে হতো! যদি সজল মারা যেত, থানা-পুলিশে জেরবার হয়ে যেতাম। যেভাবে মানুষ ক্ষেপে উঠেছিল, তুমি বুদ্ধির পরিচয় না দিলে মানুষরা হারামিটাকে চিড়েচেপ্টা করে ছাড়ত। এসব সংবাদ আমার কাছে এসেছে। অনেকক্ষণ কথা বলার পর ছোট মিয়াজির দম ফুরিয়ে এসেছিল। অনেকটা হাঁপিয়ে উঠেছিলেন তিনি।

আমিও অনেকটা হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলাম স্যার। আমি ভেবেছিলাম- ছোট মিয়াজি কালকের ঘটনার জন্য আমাকে হেনস্থা করে ছাড়বেন। কিন্তু আদতে তা করলেন না। বরং আমাকে এসব বলতে পেরে তিনি যেন অফুরান স্বস্তি খুঁজে পেলেন।

এসব শুনে আমি কী বলব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মাথা নিচু করে বসে থেকেছিলাম।

এই সময় শফিক মিয়াজি কোমল কণ্ঠে বলেছিলেন, আমি তোমাকে চাই। আমি চমকে তাঁর দিকে তাকালাম। তাঁর কথার মানে আমি ধরতে পারলাম না।

আমার লবণের গোলার ব্যবসাটা খুব বাজেভাবে যাচ্ছে। আমার জামাইটাও কূলিয়ে উঠতে পারছে না। ব্যবসা তো আর একটা না। অনেকগুলো ব্যবসা শমসেরকে দেখতে হয়। তুমি শিক্ষিত ছেলে। তোমার খোঁজখবর আমি নিয়েছি। তুমি যদি আমার লবণের ব্যবসার দায়িত্বটা নাও তাহলে আমি বর্তে যাই। না না তুমি কিচ্ছু ভেব না। তোমাকে আমি ভালোই বেতন দেব। তুমি তো এখন কোনো চাকরিবাকরি কর না। দায়িত্বটা নিয়ে আমাকে বাঁচাও বাবা।

জামাই শমসেরের চোখেও অনুরোধের আভা।

আমার স্যার ভিড়মি খাওয়ার মতো অবস্থা।

এসেছিলাম কী শুনতে, শুনতে পাচ্ছি কী! এই ধরনের প্রস্তাবের জন্য স্যার আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমি মাথা নিচু করে চুপ মেরে থাকলাম।

আমি এটা আঁচ করি- আমার সম্পর্কে তোমার ধারণা ভালো না। স্বাভাবিক ধারণা। কারণ আমার অতীত ভালো নয়। দাদার সঙ্গে তুলনা করে করে মানুষ আমাকে অবহেলা করতে শিখেছে। অবহেলারই যোগ্য ছিলাম আমি। আমার কীর্তিকা-গুলো মিয়াজিবংশের জন্য সুখকর হয়নি। তুমিও তো মাতারবাড়ির ছেলে। তুমিও আমার কুকীর্তির কথা শুনে শুনে বড় হয়েছ। বলেছিলেন শফিক মিয়াজি।

তারপর আমার মুখের দিকে গভীর চোখে তাকালেন শফিক মিয়াজি। যেন তিনি আমার ভেতরটা পড়বার চেষ্টা করছেন।

মৃদু কণ্ঠে বললেন, মানুষের তো পরিবর্তন হয়। নইলে আমরা বাল্মীকিকে পেতাম না। আমারও পরিবর্তন হয়েছে। দাদার মতো কেন হইনি, এ নিয়ে আমার আফসোসের শেষ নেই। আমি বড় মিয়াজির মতো হবার চেষ্টা করে যাচ্ছি অবিরাম। জানি না মৃত্যুর আগে আমি কলঙ্কমুক্ত হতে পারব কি-না।

তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন ছোট মিয়াজি। এই ফাঁকে আমার কিছু বলা দরকার। কিন্তু বলতে গিয়ে কথা খুঁজে পেলাম না। ওঁর আর আমার মধ্যে বয়সের পার্থক্য এত বেশি যে, আমার কথাগুলো উপদেশের মতো মনে হবে। আমি জানি- ছোটদের মুখে পরামর্শ বাতুলতা ছাড়া কিছুই নয়। আমি চুপ করে থাকলাম।

ছোট মিয়াজি আবার বললেন, ভালো কাজ যা-ই করি, সব ভ-ুল করে দেয় ওই শয়তান শহিদুল। তার অকাজ কুকাজের জন্য আমার মাথা কাটা যায়। কালকের ঘটনাটা তার কুকাজের একটি। কানে আসে- সে এর চেয়েও জঘন্য কাজ করে বেড়ায়।

একটা রচনা লেখার পর মানুষ যেমন উপসংহার লেখে, তেমনি করে ছোট মিয়াজি বললেন, তোমার মতো ভালো ছেলে আমার দরকার। তুমি কাল থেকে লবণের কারবারটা দেখাশোনা শুরু কর।

এবার আমি বললাম, আমার মা আছে ঘরে। মা আমার মুরুব্বি। মাকে একবার জিজ্ঞেস করি। আগামী পরশু জানাব আপনাকে।

ছোট মিয়াজি তৃপ্তির কণ্ঠে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ!

চাকরির কথা শুনে মা ভীষণ খুশি হয়েছিল। বলেছিল, ওপরওয়ালা এতদিনে আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন।

লাবণ্যও বেশ খুশি। হাবেভাবে তা প্রকাশ করতে দ্বিধা করছে না সে। বেকার স্বামীর চাকরিতে কোন স্ত্রীটি খুশি হয় না বলুন।

দিন তিনেক পরে আমি ছোট মিয়াজির লবণ ব্যবসায় যোগদান করেছিলাম স্যার।

ভালোই কাটল কিছুদিন। সকাল সকাল রওনা দিই। ছোট মিয়াজির সঙ্গে একবার দেখা করে লবণগোলার দিকে যাই। লবণচাষের জায়গাটি মাতারবাড়ির পশ্চিম পাশ ঘেঁষে। ওখানেই বঙ্গোপসাগর। লবণচাষের জন্য বঙ্গোপসাগরের নোনাজল অপরিহার্য উপাদান। ওখানে লবণকর্মীদের কাজকর্মের তদারক করি। অফিসে বসে বেচাবিক্রির হিসাব রাখি। ছোট্ট একটা খাল ঢুকেছে ছোট মিয়াজির চাষভূমিতে। ছোট বড় নৌকা ঢোকে ওই খালে। কাদামাখা লবণ নিয়ে চট্টগ্রাম শহরের উদ্দেশে পাল তোলে। প্রায় শ’দেড়েক কর্মী ছোট মিয়াজির লবণ-গোলায় কাজ করে।

আমি লবণ-গোলা দেখার দায়িত্ব পেলেও এই গোলাটি শহিদুল মিয়াজির তত্ত্বাবধানে চলে। শহিদুল সবসময় আসে না, মাঝেমধ্যে আসে। ও এলে কর্মচারীরা তটস্থ হয়ে থাকে। তার মুখে টাট্টিখানা বসানো। প্রথমেই মা-বোন তুলে গালাগাল শুরু করে। আমার সঙ্গে নরম সুরে কথা বলবার চেষ্টা করে, আপনি বলে সম্বোধন করে। কিন্তু আমি বুঝতে পারি, সেই নরম সুরে ভদ্রতাটুকু আছে, প্রাণটুকু নেই।

যাওয়ার সময় ক্যাশবাক্স হাতিয়ে নেয়। বলে, বাবা জিজ্ঞেস করলে বলবেন প্রয়োজনে নিয়ে গেছি। তারপর আপন মনে বলে, কত জায়গায় যে ঘুষ দিতে হয়!

চাকরিতে যোগদান করার অনেক পরে জানতে পেরেছি- রাতের বেলায় ইয়ারদোস্তদের নিয়ে শহিদুল অফিস ঘরে ফুর্তিফার্তা করে। রস ও রমণী দুটোই থাকে এই আসরে।

মাসের শেষে হিসেব দিতে গিয়ে লাভ-ক্ষতির গড়মিল ধরা পড়ে। আমি ছোট মিয়াজিকে শহিদুলের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা বলি! সন তারিখের হিসেব দেখিয়ে টাকার পরিমাণের কথাও বলি। শুধু বলি না রাতের রঙ্গরসের আসরটির কথা। চাকরির প্রথমেই গ-গোলটা বাধাতে চাইনি আমি।

সব শুনে দেখে ছোট মিয়াজি চুপ মেরে যান। পরে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলেন, আমি দেখছি শহিদুলকে। একটু নীরব থেকে আবার বলেন, তুমি একটু হাত গুটানোর চেষ্টা কর। হাজার চাইলে পাঁচশ’ দাও। পাঁচবার চাইলে একবার দাও।

এইভাবে বেশ কিছুদিন চলে গেল। মেয়েটি আমার হামাগুড়ি থেকে হাঁটতে শিখল। মায়ের পরিতৃপ্ত মুখ দেখে আমার আনন্দের সীমা থাকল না।

কিন্তু একদিন আমার সেই আনন্দ নিভে গেল। আমার মাকে সাপে কাটল।

আগেই বলেছি স্যার আমাদের বাড়িটি পাড়ার একটেরে। উঁচুমতন ভিটেটির চারদিকে ঝোপঝাড়। মূলবাড়ি থেকে ঢেঁকিঘরটি আলাদা। এক সময় বর্গাচাষিরা ধান নিয়ে আসত। মা জনা কয়েক গরিবগুর্বা দিয়ে সেই ধান ঝেড়ে-বেছে-শুকিয়ে গোলায় তুলত। তারপর আড়ি আড়ি ঢেঁকিতে ছেঁটে নিত। দীর্ঘদিন উঠানে ধান আসে না। ঢেঁকিঘরের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। কিন্তু মা বছর বছর ঢেঁকিঘরটি সংস্কার করিয়েছে। বলেছে, তোমার বাপের হাতের নিদর্শন। নষ্ট হতে দেব না। চাষিদের লক্ষ্মীঘর হল এই ঢেঁকিঘর। দেখলে মনটা ভরে ওঠে আমার।

ধান ভানা হতো না বলে খুব বেশি যেত না কেউ ঢেঁকিঘরে। সারা বছরের লাকড়ি জমিয়ে রাখা হতো ওই ঘরে। সেদিন দুপুরে মা লাকড়ির জন্য ঢুকেছিল ঢেঁকিঘরে। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে লাকড়িগুলো ভেজাভেজা হয়ে গিয়েছিল। সেই দুপুরে কটকটে রোদ উঠেছিল। মা ভেবেছিল- কিছু লাকড়ি রোদে দিলে ভালো হয়। বউটি কদিন ধরে চুলায় ফুঁ দিতে দিতে চোখ লাল করছে।

লাবণ্যকে না জানিয়ে ঢেঁকিঘরে ঢুকেছিল মা। বোঝাই লাকড়ির নিচে বিষধর সাপ বাসা বেঁধেছিল। সেই সময় সাপটি হয়তো গর্তের বাইরে ছিল।

খুব বেশি সময় পায়নি মা, মুখে ফেনা এসে গিয়েছিল। লাবণ্যের চিৎকারে দু’চার বাড়ি থেকে পড়শিরা ছুটে এসেছিল। কিন্তু ততক্ষণে মায়ের প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে স্যার।

খবর দিয়ে আমাকে আনানো হয়েছিল। উঠানজোড়া মানুষ। কারও চোখে অশ্রু, কারও মুখে আফসোসের ধ্বনি। মাকে দাওয়ায় শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার মা, আমার প্রাণের মা-টির শরীর জুড়ে সাদা কাপড়।

অনেকদিন চাকরিতে গেলাম না স্যার। ছোট মিয়াজি এসেছিলেন সেদিন। বিমর্ষ মুখে বলেছিলেন, যে কদিন পর আসতে ইচ্ছে করে আসবে। মায়ের কাজকর্ম সেরে নাও।

চাকরিতে যেতে ইচ্ছে করছিল না স্যার। শুধু মায়ের কথা মনে পড়ছিল। মাঝেমধ্যে লাবণ্য ডুঁকরে উঠছিল। আমার মেয়েটিও একেবারে চুপ মেরে গেছে। তার চলনে আমরা বুঝতে পারছি- সে বড়ধরনের কিছু একটা হারিয়েছে।

সাপুড়ে এনে ঢেঁকিঘরের ভিটেটি তোলপাড় করে ছেড়েছি। গর্তে কয়েকটা সাপের বাচ্চা পাওয়া গেছে। মা-বাপ টের পেয়ে আগেভাগে পালিয়েছে।

সেদিন চাকরি থেকে আসার পর লাবণ্য বলল, ভালো লাগছে না আমার। একা একা ভয় করছে।

আমি ব্যাপারটাকে হালকা করবার জন্য বললাম, একা একা বলছ কেন? শীলা আছে না?

ওর জন্যই তো আমার ভয় বেশি। আমি রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকি। ও একা একা এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। কখন তাকে সাপে কামড়ায়! শুনেছি, সাপরা বড় প্রতিশোধপ্রবণ। বাচ্চা হারিয়ে ওদের মাথার ঠিক নেই এখন। লাবণ্য বলে।

লাবণ্যের কথাগুলো একেবারে উড়িয়ে দিতে পারি না। আমার মনেও শঙ্কা জাগে স্যার। তবে সেই শঙ্কার ছায়া মুখে ফুটিয়ে তুলি না। তাহলে লাবণ্য আরও ভয় পেয়ে যাবে। আমি মুখে বলি, ভয় পেও না তুমি। ছোট মিয়াজিকে বলে প্রতিদিন তাড়াতাড়ি আসবার চেষ্টা করব।

পরদিন থেকে বিকেল বিকেল ঘরে ফিরি। স্ত্রী-কন্যাকে সঙ্গ দিই। তারপরও লাবণ্যের চোখেমুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে থাকে। বুঝি- লাবণ্যের মনে সাপেকাটার আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে। এই আতঙ্ক সহজে যাওয়ার নয়। আমি বিষণ্ন বিপন্ন জীবনযাপন করতে থাকি।

একদিন সেই বিপন্নতা থেকে ছোট মিয়াজি আমাকে মুক্তি দিলেন। এই মুক্তি মুক্তি কিনা জানি না স্যার। শেষটা শুনে আপনি ঠিক করবেন, এই মুক্তি মুক্তি ছিল কিনা, না সর্বনাশের পথে টেনে আনা ছিল।

এক বিকেলে হিসেব দিতে গেছি ছোট মিয়াজির কাছারিতে। হিসেব বুঝে নেওয়ার মাঝখানটিতে ছোট মিয়াজি বললেন, তোমার মায়ের মৃত্যুর পর তোমাকে বেশ বিষণ্ন দেখছি। একটু উদাসীন উদাসীনও। এটা স্বাভাবিক। আবার এটাও স্বাভাবিক যে, মানুষ শোক কাটিয়ে ওঠে। অনেকদিন চলে গেল। তুমি কিন্তু শোক কাটিয়ে উঠতে পারছ না।

আমি মৃদু গলায় বললাম, ঠিক বলেছেন ছোট মিয়াজি।

আমার মুখের কথা অনেকটা কেড়ে নিয়ে ছোট মিয়াজি বললেন, তাছাড়া তোমার চোখেমুখে গভীর একটা আতঙ্ক খেয়াল করছি আমি। তুমি কি কোনো সংকটে পড়েছ?

সুযোগ পেয়ে লাবণ্যের শঙ্কার কথা বললাম। তার ভীত-সন্ত্রস্ত একাকিত্বের কথা বললাম। কন্যাটিকে নিয়ে লাবণ্যের যে ভয়, তার কথাও বললাম। শেষে আফসোসের কণ্ঠে বললাম, আমি তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে যাচ্ছি ইদানীং। তাতে আপনার ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। আপনি যদি অনুমতি দেন চাকরিটা ছেড়ে দিই আমি।

চাকরি ছেড়ে দেবে!! চোখেমুখে বিস্ময় ছড়িয়ে বললেন ছোট মিয়াজি। তারপর বহুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে আপন চেয়ারে বসে থাকলেন। অনেকক্ষণ পর আমার দিকে সোজাসুজি তাকালেন তিনি। বললেন, তোমাকে একটি কথা বলি- শুনেই চট করে না বল না। ভেবে দেখবে। আগুপিছু ভেবে উত্তর দিও। তারপর মিষ্টি করে একটু হাসলেন ছোট মিয়াজি। বললেন, আমার বিরাট বাড়ি। কত বড় উঠান তুমি দেখতেই পাচ্ছ। উঠানের উত্তর পাশে কর্মচারীদের অনেকগুলো ঘর বানিয়েছিলাম। ওই যে উঠানের দক্ষিণ দিকে খেয়াল কর। ওখানে তিন কামরার একটা বাড়ি বানিয়েছিলাম। বাসনা ছিল- আমার অনেক বড় ব্যবসা হবে। সেই ব্যবসা চালানোর জন্য পড়ালেখা জানা একজন কর্মকর্তা রাখব। সেই কর্মকর্তা ওই বাড়িতে থাকবে। তুমিই আমার সেই কর্মকর্তা। আমি বলি কী, স্ত্রী কন্যা নিয়ে তুমি ওই বাড়িতে উঠ।

তা কী করে হয়! জন্মভিটা ছেড়ে আমি এখানে এসে থাকি কী করে!

ছোট মিয়াজি বলে উঠলেন, আমি প্রথমেই তোমাকে বলেছি চট করে আমার প্রস্তাব ফেলে না দিতে। কিছু একটা ভেবে আরও মৃদুগলায় ছোট মিয়াজি বললেন, মানুষ বাইরে কোথাও চাকরি করলে জন্মভিটে ছেড়ে যায় না? পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে যায় না? তুমি অন্য জেলায় চাকরি করলে বউবেটিকে কি ওই নির্জন ভিটায় ফেলে রাখতে? নিশ্চয়ই ফেলে রাখতে না। তাছাড়া তোমার বাপের ভিটেটা একেবারে ত্যাগ করে আসার দরকার কী? কোনো দূরসম্পর্কের গরিব আত্মীয়কে তোমার বাড়িতে থাকতে দাও। তারা থাকলও আবার বাড়িটিও পাহারা দিল। মাঝেমধ্যে তোমরা গিয়ে এক দু’রাত থেকে এলে।

প্রস্তাবটা স্যার আমার কাছে লোভনীয় মনে হল। তারপরও মনটার ভেতরে একটু খচ খচ করতে লাগল। আমার চোখমুখ দেখে ছোট মিয়াজি কী বুঝলেন কে জানে, মোক্ষম কথাটি বলে বসলেন। বললেন, যে নির্জনতার জন্য তোমার বউ হাহাকার করছে, এখানে এলে তা কেটে যাবে। আমার বাড়িভর্তি মানুষজন। তোমার মেয়েটি খেলার সঙ্গী পেয়ে যাবে। আমি বুয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তোমার স্ত্রীর হাতের কাজ টানবে।

লাবণ্যের সঙ্গে কথা বলে জানাব। বললাম আমি।

তিনি বললেন, ঠিক আছে। তারপর হিসাবপত্রে মন দিলেন ছোট মিয়াজি।

আমি লাবণ্যের সঙ্গে কথা বলে একদিন ছোট মিয়াজির বাড়িতে উঠে এলাম। হংসমিয়াজিপাড়ার আমার এক দূরসম্পর্কের খালাতো বোনকে বাপের বাড়িতে থাকতে দিলাম। তার স্বামীটি ভালো। বাড়িটি ভালোমতো দেখভাল করে রাখবে।

দেখলাম, বাড়িটি বেশ সুন্দর। উঠানের এক কোনায় হলে কী হবে, কন্যাটি আমার হেসেখেলে দিন কাটাতে লাগল। লাবণ্যের মুখের বিষণ্নতাও ধীরে ধীরে কেটে গেল। সে আমার সঙ্গে আগের মতো উচ্ছল কণ্ঠে কথাবার্তা বলা শুরু করল। আমার মন থেকে ঘন মেঘ কেটে গেল। ছোট মিয়াজিকে মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম। আমি লবণ-গোলায় গভীরভাবে মনোযোগ দিলাম।

আমার অন্যরকম জীবনের একটা অধ্যায় শুরু হল। ছোট মিয়াজির রুটিনবাঁধা জীবন। নয়টার মধ্যে খাওয়াদাওয়া শেষ করেন। তারপর ঘুমাতে যান। অর্ডার আছে, বাড়ির মূলগেট দশটার মধ্যে বন্ধ করে দেওয়ার। কিন্তু দারোয়ান ছোট মিয়াজির ওই আদেশ রক্ষা করতে পারে না। গভীর রাতে শহিদুল ফিরে। গেট বন্ধ পেলে হই চই করে। মা-বোন তুলে গালিগালাজ করে। গালি আর হাঙ্গামার ভয়ে দারোয়ানটি পকেট গেটটি খোলা রাখে। কখনো স্বাভাবিক আবার কখনো বেহেড হয়ে ফিরে শহিদুল। মাঝেমধ্যে ঘর থেকে হট্টগোলের আওয়াজ শুনি। বের হতে চাইলে লাবণ্য বাধা দেয়। বলে, বড়লোকদের বড়লোকিপনা। ওসবে তোমার জড়িয়ে কাজ নেই। এমনিতে আমরা সুখে আছি। ভূতে কিলানোর ব্যবস্থাটা না-ই বা করলে। স্ত্রীর কথা শুনে বের হওয়া থেকে বিরত থাকি।

না স্যার, ছোট মিয়াজি ভেতরবাড়ি থেকে শহিদুলের এই হট্টগোল-হাঙ্গামার কথা শুনতে পান না। বাড়িটা ওভাবেই তৈরি স্যার। রাস্তার হাঙ্গামা ভেতরবাড়িতে পৌঁছাবে না।

না স্যার, তাও না। কোনো কর্মচারী বা দারোয়ান শহিদুলের এই সব হাঙ্গামার কথা ছোট মিয়াজির কানে তুলবার সাহস করে না। পুত্রের বিরুদ্ধে বাপকে বলবে কী করে? সেই পুত্র যদি বদমাস হয়।

কিন্তু এক রাতে আমি প্রতিবাদ না করে পারলাম না। রাত তখন অনেকটা। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল সে রাতে। মাঝে মাঝে ঝপঝপিয়ে। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

আমার স্ত্রী আমার গায়ে হঠাৎ ঠেলা দিয়ে বলে, শুনতে পাচ্ছ?

আমি তড়িঘড়ি বিছানার ওপর উঠে বসে চোখ ডলতে ডলতে বলি, কী শুনতে পাব?

মেয়ের গলার আওয়াজ! কান্নার শব্দ!

আমি ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বললাম, ধুর। এত রাতে কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছ কোত্থেকে?

আমি শুনতে ভুল করিনি। ও মারে বাবারে বলে কে একজন চিৎকার দিয়ে উঠেছে। জোর গলায় বলল লাবণ্য।

আমি কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এই বৃষ্টির রাতে কে চিৎকার দিয়ে উঠবে? উঠানের ওপাশে যে দুচারজন কর্মচারী থাকে, তারা সবাই ব্যাচেলর। বেশ কটি ঘর খালিই পড়ে আছে এমনিতে। আর ভেতরবাড়ির আওয়াজ কখনো এত দূর পর্যন্ত পৌঁছাবে না।

এই সময় আর্তচিৎকারটি আমার কানে এসে ধাক্কা দিল স্যার। আমাকে বাঁচাও…। শেষের দিকে গোঙানির মতন। মনে হলো কেউ নারীটির মুখ চেপে ধরেছে।

আমি টর্চটা নিয়ে এক লাফে উঠানে নামলাম। বৃষ্টিমাথায় নিয়ে সামনের দিকে যাওয়ার আগে পেছন ফিরে বললাম, খবরদার, তুমি আসবে না আমার সঙ্গে। দরজায় খিল দিয়ে রাখ। উত্তেজনায় ছাতা নিতে ভুলে গেলাম আমি। এই বাড়িতে এরকম অসময়ে নারীর আর্তনাদ!!

দ্রুত কর্মচারীদের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম আমি। যেতে যেতে বুঝতে পারলাম- কর্মচারীরা জেগে আছে। কিন্তু কেউ দরজা খোলেনি। তাদের ফিসফিসানি আমার কানে আসছে। কর্মচারীদের দিকে খেয়াল দেওয়ার সময় নেই আমার হাতে। আমি যে ঘরটি থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছে, সেদিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলাম। কর্মচারীদের ঘরগুলোর শেষটি থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছিল। আমি যতই কাছে গেলাম, ততই আর্তনাদ স্পষ্ট হল।

আমি জোর কণ্ঠে বলে উঠলাম, কে, কে ওখানে? বলে টর্চের তীব্র আলো ফেললাম ঘরটিতে।

আমার জোরালো গলা শুনে অথবা টর্চের আলো দেখে অথবা ভয়ে ধুড়ধাড় করে কয়েকজন পুরুষ ঘর থেকে বের হয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম- পালিয়ে যাওয়াদের একজন শহিদুল মিয়াজি।

আমি তাড়াতাড়ি ঘরটির মধ্যে ঢুকে গেলাম স্যার। উঃ! সে কী বীভৎস দৃশ্য! মেয়েটি প্রায় উদলা। ব্লাউজ ছিঁড়ে তন্ন তন্ন। পেটিকোটটি শুধু পরনে। শাড়িটি ঘরের এক কোনায়। ঠোঁটে গালে বুকে আঁচড়ের দাগ। মেয়েটির গায়ে শাড়িটি জড়িয়ে দিলাম স্যার।

মেয়েটি রেপড্ হয়েছিল কি না? না স্যার রেপ করতে পারেনি ষণ্ডারা। প্রস্তুতি প্রায় নিয়েই ফেলেছিল। আমার উপস্থিতির কারণে প্রস্তুতিটা ভেস্তে গিয়েছিল শহিদুল মিয়াজির।

হ্যাঁ স্যার, সেই রাতে মেয়েটিকে আমাদের ঘরে নিয়ে এসেছিলাম। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, ষোল সতেরো বছরের তেলকাজলা একটা মেয়ে। ভয়ে কাঁপছে তখন সে।

একটা কথা বলতে ভুলে গেছি স্যার। মেয়েটিকে শাড়ি জড়িয়ে উঠানে নামিয়ে ছিলাম। ঠিকঠাক পা ফেলতে পারছিল না মেয়েটি। ভয়ে থর থর করে কাঁপছিল। আপনি কি কখনো কঠিন শৈত্যে আক্রান্ত মানুষ দেখেছেন? অথবা মাঘের পুকুরজলে স্নান সেরে ওঠা মানুষ? যদি না দেখে থাকেন, বলি। শৈত্যের প্রকোপে ঠকঠক করে কাঁপে তখন মানুষটি। দাঁতে দাঁতে বাড়ি খেয়ে ঠক ঠক করে টক্কা ঠকঠক- এরকম শব্দ হতে থাকে। কথা বলার শক্তি হারায় তখন মানুষটি। দু’হাত বুকে জড়িয়ে কুঁজো থেকে কুঁজো হতে থাকে। মেয়েটিরও এরকম অবস্থা স্যার। তার দাঁতকপাটি লাগার অবস্থা। আমি বাঁ হাত দিয়ে জাপটে না ধরলে কাঁদাতে পড়ে যেত স্যার। আমার তখন বেদিশা বেদিশা ভাব। রাগ আমাকে আগাগোড়া দখল করে ফেলল। আমি গর্জন করে উঠলাম- হারামজাদারে…।

আমার চিৎকার লাবণ্যের কানে গিয়েছিল। দরজা খুলে ল্যাম্পটা উঁচিয়ে ধরে দাওয়ায় দাঁড়িয়ে ছিল। আমি কাছে যাওয়ার পর ভয় পাওয়া কণ্ঠে লাবণ্য জিজ্ঞেস করেছিল, ওরকম করলে কেন? ওরকম করে চিৎকার দিয়ে উঠলে কেন?

উঠান পেরিয়ে আসতে আসতে আমি ঠিক করে ফেলেছিলাম ঘটনার আনুপূর্বিক বৃত্তান্ত লাবণ্যকে বলব না। ভিলেনের নামও বলব না তাকে। তাতে ওর ভয় আর যন্ত্রণা বাড়বে। হয়তো এই বাড়িতে মুহূর্তকাল থাকতেও চাইবে না আর। ছোট মিয়াজির সম্মানের কথাও ভেবেছিলাম আমি। জানাজানি হলে বড় একটা ক্ষতি হয়ে যাবে তাঁর। সেটা যে কত বড় ভুল করেছিলাম, আজ হাড়ে হাড়ে বুঝছি স্যার। সে-রাতে যদি লাবণ্যের কাছে শহিদুল মিয়াজিকে চিনতে পেরেছি বলতাম, তাহলে লাবণ্য কিছুতেই ছোট মিয়াজির লবণগোলায় আমাকে আর কাজ করতে দিত না। তাতে আমি বেঁচে যেতাম স্যার। আমার এত বড় সর্বনাশটা হতো না।

কেন বলিনি জিজ্ঞেস করছেন? বলিনি স্যার কৃতজ্ঞতার কারণে। ছোট মিয়াজির প্রতি যে স্যার আমার অশেষ ঋণ।

যদি সে-রাতে উঠানে দাঁড়িয়ে হই চই করতাম বা লাবণ্যকে শহিদুলের নাম বলতাম, ঘটনাটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত। ছোট মিয়াজি জানতে পারতেন তাঁর ছেলের কুকীর্তির কাহিনি। বড় কষ্ট পেতেন তিনি। এমনিতে তাঁর জীবনটা জেরবার, এই অবস্থায় তাঁকে আর কষ্ট দিতে চাইনি স্যার।

তাই লাবণ্যের জিজ্ঞাসায় বলেছিলাম, না, কাউকে চিনতে পারিনি। আমার আওয়াজ শুনেই মেয়েটিকে রেখে পালিয়েছে ষ-ারা।

যাক স্যার, আগের কথায় ফিরে যাই?

মেয়েটির দিকে ভালো করে খেয়াল করে লাবণ্য আঁতকে ওঠা কণ্ঠে বলল, আরে, এ তো হাশেম চাচার মেয়ে!

আমি বললাম, কোন হাশেম চাচা?

আরে ষাইটপাড়ার হাশেম চাচার কথা তোমার মনে নেই!

আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে মেয়েটিকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে লাবণ্য। আলনা থেকে একটা শাড়ি নিয়ে মেয়েটির সমস্ত শরীর ঢেকে দিয়েছে। দীর্ঘ চুল খোঁপা করে বেঁধে মেয়েটিকে বলেছে, ওই যে বাথরুম। ওখানে যাও। ভালো করে গোসল করে নাও।

মেয়েটি বাথরুমে ঢুকে পড়লে লাবণ্য আমার দিকে প্রশ্নবোধক চোখে তাকাল। আমি তার আগের প্রশ্নের খেই ধরে বললাম, কই না তো! কোন হাশেম চাচা, মনে পড়ছে না তো!

আমার দিকে কিছুক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল লাবণ্য। তারপর বলল, গত বছরের আগের বছরেই তো তুমি তোমাদের জমিগুলো নতুন করে বর্গা দিলে?

হ্যাঁ, দিলাম তো। কিছু নতুন, কিছু পুরাতন।

কাকে কাকে দিয়েছিলে?

সালাম মিঞা, রুহুল কুদ্দুছ, মোহাম্মদ নাজমুল, ছালামত হোসেনÑ এই তো!

আর কেউ নাই?

মনে তো পড়ছে না।

আরেকজন ছিল। সে হাশেম চাচা। ওই যে ছোট মিয়াজির লবণ-গোলার পাশের জমিটা যার কাছে বর্গা দিলে।

হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। কিছুদিন পর হাশেম চাচা কলার কাঁধি কাঁধে নিয়ে একটা মেয়েকে হাতে ধরে আমার বাড়িতে এসেছিল।

লাবণ্য বলল, এই মেয়েটি সেই মেয়ে। আর ওই হাশেম চাচা এই মেয়েটির বাবা।

মেয়েদের চোখ অতি তীক্ষ্ণ স্যার। যা দেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। আর ওদের স্মৃতিশক্তিও দুর্দান্ত। একবার দেখা জিনিস বা একবার শোনা ঘটনা সহজে ভোলে না তারা। লাবণ্যের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। মেয়েটির চেহারার আদলটি ভুলে যায়নি লাবণ্য। আর মেয়েটিকে চিনতে পারায় হাশেম চাচার কথা মনে পড়ে গেছে তার।

শহিদুলের বিরুদ্ধে আমার ভেতরে ক্রোধ আরও ধূমায়িত হতে থাকল স্যার। আজকের কুকীর্তির নাটের গুরু যে শহিদুল, সেটা বুঝতে আমাকে বেগ পেতে হচ্ছে না। অন্যান্যরা যে তার সাঙ্গাত, তা অনুমান করতেও আমার অসুবিধা হচ্ছে না। এত বড় অমানুষ! নিজের অজান্তে কথাটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল।

লাবণ্য বলল, কে অমানুষ? কার কথা বলছ তুমি?

আমি ঢোঁক গিলে বললাম, কেউ না। কারও কথা বলছি না আমি।

আমার কথা শুনে লাবণ্য একটু হতবাকই হলো। হয়তো ভাবল- লোকটির ওপর দিয়ে এত ঝড়ঝাপটা গেল! হয়তো এমনি এমনি বলল কথাটা।

এই সময় মেয়েটি বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল স্যার। স্নানের পর তাকে বেশ ফ্রেশ লাগছে। যদিও ভীতির ছায়া তার মুখমণ্ডলে তখনো লেপ্টে ছিল। লাবণ্য এক গ্লাস দুধ আর বিস্কুট উজিয়ে ধরেছিল মেয়েটির দিকে। শীলার জন্য প্রতিদিন দুধ নেয় লাবণ্য।

লাবণ্য মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী?

মেয়েটি মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, জোবাইদা।

আমি তখন কাপড় চেঞ্জ করার জন্য বেডরুমে গেছি। দেখি- শীলা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। বৃষ্টিতে আমার পরিধেয় ভিজেভুজে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

চেঞ্জ করে ড্রইংরুমে আসার পর দেখলাম, জোবাইদার ভয় অনেকটা কেটে গেছে। দুধ ও বিস্কুট খেয়েছে সে। লাবণ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘটনার পূর্বাপর জেনে নিচ্ছে।

ঘটনাটা ছিল এরকম স্যার।

লবণ-গোলার পাশেই হাশেম চাচার খেতজমি। আমাদের কাছ থেকে বর্গা নেওয়া জমির পাশেই হাশেম চাচার নিজের জমি। ধান-রবিশস্য দুটোই করে হাশেম চাচা। নির্ভেজাল মানুষ। চাষ আর সংসারÑ এই হাশেম চাচার জীবন। গোটা সময় খেতেই পড়ে থাকে। সকালে গিয়ে সন্ধ্যায় ফেরে। দুপুরের খাবারের মোচাটা জোবাইদা পৌঁছে দেয় মাঠে। হাশেম চাচার অন্যান্য সন্তানরা ছোট ছোট। জমি থেকে বাড়িটা বেশি দূরে নয়।

এ অঞ্চলে মিঠাপানির বড় সংকট। আগেকার জমিদার একটা বড় পুকুর কাটিয়ে দিয়েছিলেন এই পাড়ায়। ওই পুকুর থেকে মেয়েটি সকাল-সন্ধ্যা পানি নিয়ে যায় কলসি করে। লবণগোলার পাশ দিয়েই জোবাইদাকে বাড়িতে যেতে হয়।

আসা-যাওয়ার পথে দু’একবার হয়তো জোবাইদার সঙ্গে শহিদুলের দেখা হয়েছে। একদিন হয়তো তার কুনজরটা জোবাইদার ওপর পড়েছিল। হয়তো সে তক্কে তক্কে ছিল কিছু একটা করার জন্য।

সেদিন সন্ধ্যার আগে-আগে আমি ঘরে ফিরে এসেছিলাম। সকালে শীলার গায়ে জ্বর দেখে এসেছি। শহিদুল মিয়াজিকে বলে ছুটি নিয়েছিলাম। হ্যাঁ স্যার, সেই দিন শহিদুলের রুটিনে একটু ব্যতিক্রম তো ছিলই। এমনিতে সকাল বা দুপুরের দিকে লবণের গোলায় যায় শহিদুল। টাকা পয়সা হাতিয়ে, একে তাকে ধমকিয়ে চলে আসে। সেদিন বিকেলেই গিয়েছিল স্যার। টাকা পয়সার জন্যও তেমন চাপাচাপি করেনি সেই বিকেলে। ছুটি চাওয়ায় বলেছিল, ঠিক আছে, আপনি চলে যান। আমি একটু পরে আসছি। দারোয়ান খালেদ তো রইলই। আমি এদের নিয়ে একটু বসি। জনা চারেক ইয়ারদোস্ত তখন তাকে ঘিরে অফিস ঘরে বসেছিল।

সন্দেহ যে একেবারে হয়নি, এমন নয়। এরকম তো শহিদুল কখনো করে না! মনকে বোঝালামÑ  ওদের বাড়ি, ওদের অফিস। নিজের অফিসে কতক্ষণ বসবে, কোন বেলা অফিসে আসবে, তা নির্ধারণ করার কেউ তো নই আমি। তাছাড়া, ক্যাশবাক্সে সেদিন কিছু ছিল না স্যার। দিনটি ছিল মাসের শেষ তারিখ। ছোট মিয়াজিকে হিসেব বুঝিয়ে দেওয়ার তারিখ। সুতরাং ক্যাশবাক্সে সামান্য কিছু খুচরো টাকা রেখে সবটা আমি নিয়ে এসেছিলাম।

সন্ধ্যার মুখে মুখে মা নাকি বলেছিল, জোবাইদা, ঘরে তো এক ছটাকও খাবার পানি নেই। তোর বাপ গেছে বাজারে। ফিরতে ফিরতে কতক্ষণ কে জানে? এক কলসি খাবার পানি না আনলে তো রাতে খেতে পাবে না কেউ। মা, যা না, এক কলসি পানি নিয়ে আয় না।

মায়ের অনুরোধ ফেলতে পারেনি জোবাইদা। মেঘ মেঘ আকাশ মাথায় নিয়ে পানি আনতে বেরিয়ে পড়েছিল। পানি নিয়ে ফেরার সময় টুপটাপ বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। লবণ-গোলা অফিসের পাশ দিয়ে আসার সময় কারা যেন জাপটে ধরেছিল জোবাইদাকে। মুখে হাতে কাপড় বেঁধে অফিস ঘরের মেঝেতে শুইয়ে রাখা হয়েছিল তাকে। না, দারোয়ান ছিল না স্যার। অনেক আগেই দারোয়ান খালেদকে ছুটি দিয়ে দিয়েছিল শহিদুল। কিছুক্ষণ পর ‘জোবাইদা জোবাইদা’ বলে মায়ের গলাও শুনেছিল জোবাইদা। কিন্তু মুখ যে গামছা দিয়ে শক্ত করে বাঁধা তখন। তারপর গভীর রাতে এই কা-। অফিস ঘরের চেয়ে কর্মচারীদের নির্জন ঘরকেই নিরাপদ মনে করেছিল শহিদুল। তাছাড়া বৃষ্টি তো তার অনুকূলে ছিলই।

তারপরের ঘটনা তো আপনি শুনেছেন স্যার। আমরা স্বামীতে স্ত্রীতে ঠিক করলাম জোবাইদার ব্যাপারটার জানাজানি করা যাবে না। মেয়েটার ইজ্জত নিয়ে টানাটানি হবে। হাশেম চাচার মান ইজ্জত ধূলায় মিশে যাবে। শহিদুলের নাম উল্লেখ না করলেও কেলেঙ্কারিটা লুফে নেবে বাদশা মিয়া।

বাদশা মিয়া মাতারবাড়ির নব্য ধনী। দু’দুটো ছেলে বিদেশি জাহাজে চাকরি করে। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পাঠায়। ওই টাকা দিয়ে যথেচ্ছা জমি কিনে নিচ্ছে বাদশা মিয়া। মাতারবাড়ির নানা স্থানে দু’চারটা মসজিদও গড়ে দিয়েছে। বাড়িও করেছে আলিশান। একদল স্তাবকও জুটে গেছে। দলবল নিয়ে রাস্তায় হাঁটে। সুযোগ পেলে ছোট মিয়াজির বদনাম করে। বলে, ওদের দিন শেষ, আমার দিন শুরু। মাতারবাড়ি এখন বাদশা মিয়ার কথাতে চলবে।

ইদানীং লবণ-গোলা নিয়ে বাদশা মিয়ার সঙ্গে ছোট মিয়াজির গ-গোল চলছে। বাদশা মিয়া লবণগোলার অর্ধেক জমির মালিকানা দাবি করে বসেছে। বলছে, আমার বাবার বাবা ওই জমি জমিদারবংশের উত্তরাধিকারী সুধাংশু চৌধুরীর কাছ থেকে কিনে নিয়েছিল। মামলা কক্সবাজার কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। দুই পরিবারের মধ্যে এখন বাঘ-কুমিরের সম্পর্ক।

আমি ছোট মিয়াজির পক্ষের লোক। ছোট মিয়াজির এত বড় সর্বনাশ আমি করতে পারি না। শহিদুলের বদমাসির ঘটনাটি জনসমক্ষে আনলে সমূহ ক্ষতি হয়ে যাবে ছোট মিয়াজির। আমার সঙ্গে একমত হল লাবণ্য। শহিদুলের নাম এড়িয়ে, ছোট মিয়াজি প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে হাশেম চাচা আর জোবাইদার ইজ্জতের কথাই ভালো করে বোঝালাম লাবণ্যকে। তারই পরামর্শে ভোরের আজানের আগে জোবাইদাকে নিয়ে বের হলাম আমি। লোকচক্ষুর আড়ালে জোবাইদাকে তার মা-বাপের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছিলাম স্যার।

এরপর থেকে শহিদুল আমার সঙ্গে কীরকম আচরণ করেছিল? প্রথম প্রথম একদম স্বাভাবিক স্যার। সে বেশ ভয় পেয়েছে বলে আমার মনে হলো। বরং স্বাভাবিক না বলে আমাকে সমীহ করে চলতে লাগল শহিদুল। আমি তাকে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দিইনি যে, সে রাতে তাকে আমি চিনতে পেরেছিলাম। কিন্তু মানুষ তো আমি! রক্তমাংসের মানুষ কাঁহাতক ভেতরের ঘৃণাকে চেপে রাখতে পারে স্যার? একদিন না একদিন ক্রোধাগ্নি বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে। সেই ক্রোধ কারও কারও থেকে হঠাৎ করে বের হয়, আবার কারও কারও থেকে পর্যায়ক্রমে মৃদুলয়ে বের হয়। আমার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টি হয়েছিল স্যার।

শহিদুলের সামনে অকারণে রেগে যাচ্ছিলাম আমি। মালিকের পুত্র হিসাবে আগে দাম দিয়ে কথা বলতাম। ঘটনাটির পরে আমি নিজেই টের পাচ্ছিলাম শহিদুলের সঙ্গে আচরণে আমি ভব্যতা লঙ্ঘন করছি।

শহিদুল তো স্যার ঘাগু। সে আস্তে আস্তে কিছু একটা আন্দাজ করতে শুরু করল। আমার দিকে চোখ কুঁচকে তাকাতে শুরু করল। ধীরে ধীরে তার আচরণেও পরিবর্তন এল। আমার সামনে সে চেয়ারে পা তুলে বসা শুরু করল। আপনি-র মাঝখানে মাঝখানে তুমিও বলতে শুরু করল।

তার সাঙ্গাতরা হয়তো তাকে বুঝিয়েছিল- এত বড় মওকা হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণত আমিই দায়ী। এটা যে শহিদুল স্বয়ং বুঝত না, এমন নয়। হয়তো আমি ঘটনাটা চাউর করে দেব, এই শঙ্কায় সে এতদিন চুপচাপ ছিল। কিন্তু যখন দেখল যে, আমি আকারে ইঙ্গিতে তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি, তোমাকে আমি চিনতে পেরেছি বাছাধন। বেশি তেরিমেরি করলে হাটে হাঁড়ি ভাঙব। এই কারণে সে হয়তো প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠছিল। আমাকেও সে বুঝিয়ে দিচ্ছিল- বেশি হেলদোল কর না বাপধন। বিষ দাঁত তুলে নেব। আরে বেটা, আমার আন্ডারে চাকরি করিস, আমাকে পাত্তা দিস না! আমার বাড়াভাতে ছাই দিয়েছিস! তুই ভাবছিসÑ ছোট মিয়াজি তোরে খুব পেয়ার করে, সে ব্যবসাটা ভালো চালচ্ছিস বলে। এমন চাল চালব, চাকরিটাকরি সব খতম হয়ে যাবে।

শহিদুল যতই চোখ কুঁচকে কথা বলুক আর মনে মনে আমাকে ধমক দিক, আমি কিন্তু দমবার পাত্র নই। আমি হাবেভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছি, প্রয়োজনে সেই রাতের ঘটনাটা আমি ছোট মিয়াজির কানে তুলব। তিক্ততা গড়াতে গড়াতে এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছাল স্যার, শহিদুল আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিল।

এক দুপুরে সে ক্যাশ-পিয়নকে উদ্দেশ করে আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, কুদ্দুস, ওকে বল কিছুক্ষণের মধ্যে আমার চল্লিশ হাজার টাকা লাগবে। রেডি রাখতে বল।

চল্লিশ হাজার টাকা! সেদিনের অর্থমূল্যে চল্লিশ হাজার অনেক টাকা স্যার। এক মাসের লবণ ব্যবসার লাভের সমান। তাছাড়া এত পরিমাণ টাকা ক্যাশ-বাক্সে নেই।

সেদিন ছোট মিয়াজি আমাকে সতর্ক করে বলেছিলেন, শহিদুল যখন তখন টাকা চাইলে দেবে না। টাকা পেয়ে পেয়ে সে উচ্ছন্নে গেছে। লাভের ধন ইঁদুরে খাচ্ছে। বাদশা মিয়ার সঙ্গে ঝঞ্ঝাটে অনেক টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে আমার। উকিল-মোকদ্দমা-পুলিশ-থানাÑ এসবেও বহু টাকা গলে যাচ্ছে।

বলতে বলতে তাঁর চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। বলেছিলেন, ঘরে কুলাঙ্গার, বাইরে শত্রু। শহিদুল্যা যদি বড়টার মতো হতো তাহলে বেঁচে যেতাম।

ছোট মিয়াজির হঠাৎ একথার মানে কী? তাহলে কি তিনি শহিদুলের সেই রাতের কুকীর্তির কথা কিছু জানতে পেরেছেন? আমি উৎসুক চোখে ছোট মিয়াজিকে পর্যবেক্ষণ করি। কিন্তু কিছুই ধরতে পারি না। ক্রোধ আর ব্যথা ঘন লম্বা শুভ্র দাড়ির আড়ালে লুকিয়ে রাখেন ছোট মিয়াজি। তবে চোখ দুটো লুকাতে পারেন না তিনি। দুচোখে বিষণœতা আর বিরক্তির মেশামেশি।

হঠাৎ করে ছোট মিয়াজি বলে উঠলেন, শোন, এর পর থেকে শহিদুলকে এক টাকাও দেবে না। দাবি করলে বলবে, আমার কাছ থেকে চেয়ে নিতে। এ আমার নির্দেশ। কোনো অবস্থাতে মচকাবে না।

ছোট মিয়াজির নির্দেশ আমার মনে পড়ে গেল। আমার সাহস বেড়ে গেল। আমিও স্বগত কণ্ঠে বললাম, টাকা দেওয়া যাবে না। অত টাকা আমার কাছে নেই।

চল্লিশ না হলে বিশ দেবে। এবার সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বলল শহিদুল।

আমি বললাম, একটাকাও দেওয়া যাবে না।

সে ফুঃ দিয়ে উড়িয়ে দিল আমার কথা। বলল, কী বললে! এক টাকাও দেওয়া যাবে না।

হ্যাঁ। ছোট মিয়াজির নির্দেশ- এক টাকাও দেওয়া যাবে না। লাগলে ওঁর কাছ থেকে চেয়ে নিতে বলেছেন।

চেয়ে নিতে বলেছেন? আমি ভিক্ষুকের মতো হাত পাতব ছোট মিয়াজির সামনে!

সে রকমই নির্দেশ। বললাম।

বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠল শহিদুল। ক্যাশ-বাক্সের দিকে এগিয়ে গেল সে। আমি ক্যাশ-বাক্সে তালা লাগিয়ে চাবিটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেললাম।

এরপর লঙ্কাকা- বাধাল শহিদুল। ক্রোধ আর ছোট মিয়াজির কড়া নির্দেশ আমাকে শক্তি জোগাল। ভাঙা তো দূরের কথা আমি মচকালাম নাও। গজরাতে গজরাতে লবণ-গোলা ছাড়ল শহিদুল।

আমি ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরলাম। সন্ধ্যা নাগাদ যথারীতি লবণ-গোলার হিসেব বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম ছোট মিয়াজিকে। মনে একটা ভয় কাজ করছিল তখন। লবণ-গোলার ঝঞ্ঝাটের কাহিনি এতক্ষণে ছোট মিয়াজির কাছে নিশ্চয় পৌঁছে গেছে। শহিদুলের দুর্ব্যবহারের কাট কাট জবাব আমিও দিয়েছি। সেই জবাব মিষ্টি ছিল না। তিক্ততায় ভরা ছিল। আকারে ইঙ্গিতে এটা বলতেও দ্বিধা করিনি যে, সে একটা আস্ত চরিত্রহীন। তার হাঁড়ির খবর আমি জানি। প্রয়োজনে সেই খবর ছোট মিয়াজির কান পর্যন্ত পৌঁছাব।

শহিদুলও আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের চূড়ান্ত করেছে। শুধু গায়ে হাত দেওয়া বাকি রেখেছে। তার বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, সে রাতে আমি তাকে চিনতে পেরেছি। কিন্তু সে দমবার পাত্র নয়। জোর গলায় সে বলেছে, তুই আমার ইয়ে.. ছিঁড়বি। বলেই সে প্যান্টের চেইন খুলেছিল। অনেকের সামনেই এই কাজটা করেছিল শহিদুল। আমাদের ঝগড়া দেখে কর্মচারীরা হাতের কাজ ফেলে দূরে কাছে দাঁড়িয়ে পড়েছিল।

তবে একথাও সত্য যে শহিদুলকে আমিও ছাড়িনি। তার অজ্ঞতার জবাব দিতে গিয়ে তার বাপের পূর্বতম কুকীর্তির কথাও মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল আমার। এই জন্যই আমার ভয়টা ছিল প্রবল। ছেলের কথা বাদই দিলাম, নিজের কুকীর্তির তুলনা শুনে যদি ছোট মিয়াজি রেগে টং হয়ে থাকেন!

কিন্তু ছোট মিয়াজির তো রাগের চেহারা দেখছি না। কোনো বিরক্তি বা অস্বস্তিও তো তার চেহারায় নেই! তাহলে কি ঝগড়ার সংবাদটি তাঁর কানে পৌঁছেনি? দ্বিধান্বিত মন নিয়ে সেদিনের হিসাবপত্র ছোট মিয়াজিকে বুঝিয়ে দিলাম। চলে আসার অনুমতির জন্য তাঁর দিকে চোখ তুললাম আমি।

তুমি ঠিক কাজই করেছ। তোমাকে ধন্যবাদ। ঠান্ডা গলায় ছোট মিয়াজি বললেন। আমি চমকে উঠলাম।

তিনি আবার বললেন, হারামজাদাকে টাকা না দিয়ে তুমি ঠিক কাজই করেছ। সর্বস্বান্ত করে ছেড়েছে হারামজাদা। দিনের পর দিন টাকা নিয়ে নিয়ে লবণ ব্যবসায়ে লালবাতি জ্বালিয়েছে। তুমি শক্ত থাকবে। আমি আছি তোমার সঙ্গে।

ছোট মিয়াজির চরিত্র নিয়ে যে দু’চারটা কটুকথা বলেছি, সেদিকে গেলেন না তিনি। বরং প্রশংসার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

আমি দারোয়ানদের বলে দিচ্ছি আর কোনো হাঙ্গামা করলে লাঠিপেটা করতে হারামজাদাকে।

বারবার হারামজাদা বলে বলে ছোট মিয়াজি ভেতরের ক্রোধকে প্রশমিত করতে চাইছিলেন।

আমি বেশ কৃতজ্ঞতা বোধ করতে লাগলাম ছোট মিয়াজির প্রতি। উঠে আসবার সময় তিনি বললেন, দাঁড়াও। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে চাপা স্বরে বললেন, একটু সাবধানে থেকো। ভালোভাবে তো মানুষ করতে পারিনি হারামজাদাকে।

যে ভয়টা কেটে গিয়েছিল, তা আবার চেপে ধরল আমাকে। একী বলছেন ছোট মিয়াজি! তিনি যদি আমার সঙ্গে থাকেন, তাহলে আমার ভয় কিসের!

তিনি বোধ হয় আমার মনের কথা বুঝতে পারলেন। বললেন, দেখে মনে হচ্ছে তুমি ভয় পাচ্ছ। ভয় পাওয়ার জন্য তোমাকে একথা বলিনি। শুধু বলেছি আগের তুলনায় একটু সতর্ক থাকবে। তারপর অনেকটা স্বগতোক্তির মতো করে বললেন, মানুষ করতে পারিনি শহিদুল্যাকে। গুণ্ডাছান্ডার সঙ্গে উঠবস হারামজাদার।

আমি আমার ঘরে ফিরে এসেছিলাম। আমাকে দেখে লাবণ্য জিজ্ঞেস করেছিল, কী হয়েছে তোমার! এরকম চেহারা কেন তোমার?

আমি জোর করে হেসে বললাম, আরে ধুর! কী হবে? গোটা দিনের পরিশ্রমে চেহারাটা হয়তো মলিন হয়ে গেছে। তাতেই তোমার হাজারো প্রশ্ন।

আমি ঠিক করেছিলামÑ আজকের কোনো ঘটনা লাবণ্যের কাছে বলব না।

আমি আমার হাসিটাকে আরও একটু উঁচুতে তুলে বললাম, দাপিয়ে গোসল করে ফেললে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। খালেদাকে বল আমাকে কড়া করে এক কাপ চা দিতে।

ছোট মিয়াজির বাড়িতে আসার পর থেকে খালেদা আমার বাড়িতে কাজ করছে। খালেদার প্রথম স্বামী মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিল। বহু বছর পরও ছেলেমেয়ে না হবার অপরাধে দ্বিতীয় স্বামী তাকে খেদিয়ে দিয়েছে। বয়সও কম হয়নি খালেদার। চেহারাটাও তেমন নয়। আর বিয়ে করেনি খালেদা। ছোট মিয়াজি আমাদের বাড়িতে কাজ করার জন্য খালেদাকে জোগাড় করে দিয়েছিলেন। নিঃসন্তান হবার কারণেই বোধ হয় শীলাকে খুব ভালোবাসে খালেদা।

বেশ ক’টা মাস কেটে গেল স্যার। কী কারণে জানি না, এ ক’মাসে শহিদুলের ব্যবহারেও দেখার মতো পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো কর্মচারীদের গালাগাল দেয় না। এ ক’মাসে একবারের জন্যও টাকা চায়নি সে আমার কাছে। পারতপক্ষে সে আমার সঙ্গে কথা বলে না। কথা না বলার পেছনে কোনো ক্রোধ আছে কিনা, তা-ও টের পাই না আমি। লবণ-গোলার সর্বাত্মক উন্নতির জন্য যেন সে উঠেপড়ে লেগেছে।

এক দুপুরে প্রচ- মারামারি হয়ে গেল লবণ-গোলায়। না, আমার সঙ্গে নয়। বাদশা মিয়ার ভাড়াটে গুণ্ডাবাহিনীর সঙ্গে ছোট মিয়াজির কর্মচারীদের। দুপুরের দিকে হঠাৎ করে পঁচিশ-ত্রিশজন লোক এসে ছোট মিয়াজির লবণগোলার মাঝখান বরাবর খুঁটি পোঁতা শুরু করল। সঙ্গে ছিল বাদশা মিয়া। বাদশা মিয়া চিৎকার করে বলল, গাঁড় গাঁড়। ওই জমি আমার। কোনো শালারপুত কিছু করতে পারবে না।

শহিদুল অফিসে ছিল স্যার। ত্বরিত লবণমাঠে কর্মরত মানুষজনকে ডেকে একত্র করল। তারপর হাতের কাছে যা ছিল, তা নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ল বাদশা মিয়ার গুণ্ডাদের ওপর। মারের চোটে পিছু হঠতে বাধ্য হল বাদশা মিয়া। যাওয়ার সময় চিৎকার করে বলে গেল, ওই খানকির পোলা শহিদুইল্যা। তোরে আমি দেখে নেব।

দূরাঞ্চলে জায়গাজমি নিয়ে এরকম মারপিট হরহামেশা হয়ে থাকে। দু’চারজনের হাত পা ভাঙে, মাথাও ফাটে দু’চার দশজনের। গ্রাম্য সালিসের মাধ্যমে তা মিটমাট হয়। মিটমাট না হলে উভয়পক্ষ রাগে ফুলতে থাকে। ভবিষ্যৎ মওকার অপেক্ষায় থাকে। কোর্ট-কাছারি-থানা-পুলিশ করতে তারা আগ্রহবোধ করে না।

লবণ-গোলার ঘটনাটাও সেরকম। মাতারবাড়ি মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন। থানা-পুলিশ করতে গেলে সেই কক্সবাজার যেতে হবে। তাছাড়া ঘটনাটা দুই ধনীলোকের মধ্যে। বাদী হওয়া এ অঞ্চলে অপমানের। উভয়পক্ষের কেউ বাদী হয়ে থানায় গেল না। বরং উভয়পক্ষ ভবিষ্যৎ সুযোগের অপেক্ষায় থাকল।

 

বিয়ে হয়েছে অনেক বছর। ছোট মিয়াজির মেজমেয়েটির কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি স্যার। আট মাস আগে মেজমেয়ের একটা ছেলে হয়েছে। ছোট মিয়াজির আনন্দের অবধি নেই। তিনি ঠিক করেছেন-  নাতির জন্ম উপলক্ষে এবারের কোরবানিতে বিশাল একটা গরু পাঠাবেন বেয়াইবাড়িতে।

কোরবানির দিন এগিয়ে এলে তিনি একটা গরু কিনলেন। গরুটি এত বিশাল যে, সামাল দেওয়া মুশকিল। তিনি তিনজন কামলা ঠিক করলেন। ওরা গরুটি মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে দেবে। যাওয়ার দিন ছোট মিয়াজি ভরসা হারালেন। আমাকে ডেকে বললেন, দেখ বাবা, ওদের ওপর ভরসা রাখতে পারছি না। পথের মধ্যে গরুটি কী করতে কী করে ফেলে। তুমিও যদি ওদের সঙ্গে যাও তাহলে আমি ভরসা পাই। তবে মেজমেয়ের শ্বশুরবাড়ি মাতারবাড়ির ওপিঠে। আজ ফিরতে পারবে বলে মনে হয় না। কাল সকালে ফিরো।

এমনভাবে বললেন, আমি না করার সুযোগ পেলাম না। রাজি আমাকে হতেই হল।

যাত্রার আগে বললেন, তুমি লবণ-গোলা নিয়ে ভেব না। শহিদুল তো আছেই, প্রয়োজনে আমিও একবার গিয়ে ঘুরে আসব।

আমি লাবণ্যকে ব্যাপারটি বলে, শীলার দিকে নজর রাখার অনুরোধ করে সাতসকালে বেরিয়ে পড়লাম স্যার।

মাতারবাড়ি দ্বীপটি উত্তরে দক্ষিণে লম্বা। প্রস্থে কম। চারদিকে সমুদ্র। তবে দক্ষিণে মহেশখালি দ্বীপ। পশ্চিমে বিরান পাথার। উত্তরেও তা-ই। পূর্বে বুরুমচরা। বুরুমচরা মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। বুরুমচরা আর মাতারবাড়ির মধ্যে নৌকায় দু’ঘণ্টার জল।

মেজমেয়ের শ্বশুরবাড়ি সিকদারপাড়া গ্রামে। মাইজপাড়া গাঁ-টি মাতারবাড়ির দক্ষিণাংশে, সিকদারপাড়া উত্তরাংশে। দুই গ্রামের দূরত্ব একবেলারও অধিক। আমরা যখন মাইজপাড়া থেকে সিকদারপাড়ায় পৌঁছালাম, সূর্য ডুবতে তখন বেশি দেরি নেই। গরু নিয়ে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে সময় লেগেছে প্রায় দ্বিগুণ।

বিশাল গরুটি দেখে সবাই ভীষণ খুশি। আশপাশের মানুষজন ভারী একটা জটলা করল গরুটিকে ঘিরে। বেয়াইবাড়িতে আনন্দের বন্যা বইল। কামলাদের কাছারিতে আর আমাকে ভেতরবাড়িতে বসতে দেওয়া হল। খাওয়া দাওয়ার বিপুল আয়োজন করলেন বেয়াই।

খাওয়া শেষ করে আমি ফিরে আসার উদ্যোগ নিলাম। বেয়াই শুনে আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, বল কী তুমি? এরকম সময়ে রওনা দিয়ে কোথায় যাবে?

আমি বললাম, কেন? মাইজপাড়ায়? আপনার বেয়াইবাড়িতে!

বেয়াই বললেন, মাথা খারাপ তোমার? আসবার সময় পথঘাট দেখে আসনি তুমি? দিনের আলোতে এসেছ বলে তেমন সংকটে পড়নি। রাতের বেলায় গাঁ-গেরামের অপরিচিত পথে বেঘোরে ঘুরে মরবে। তাছাড়া এখন রওনা দিলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তো সকাল হয়ে যাবে।

তারপরও আমি আমতা আমতা করতে লাগলাম। কামলারাও আমাকে বোঝাল, ঘোর অন্ধকারে যাত্রা করলে রাস্তাঘাটে সমস্যায় পড়ব। এখন না গিয়ে ভোর ভোর রওনা দেওয়া ভালো হবে।

কী আর করা স্যার! শেষ পর্যন্ত বেয়াইবাড়িতে রাত গুজরান করার জন্য রাজি হলাম আমি। কিন্তু লাবণ্যদের জন্য মনটা কেমন কেমন করতে লাগল। অনেকটা নির্ঘুমেই কাটল রাতটা।

সকালে দেখলাম মাথাটা একটু চক্কর দিচ্ছে। এ রকম তো আগে কখনো হয়নি। হঠাৎ আজ এরকম লাগছে কেন? বেশ কিছুক্ষণ বিছানার ওপর বসে থাকলাম। ভাবলামÑ স্থানান্তর হবার কারণে ভালো ঘুম হয়নি। তাছাড়া গতকালকে শরীরের ওপর দিয়ে বেশ ধকল গেছে। গোটাটা পথ হেঁটে আসতে হয়েছে। এত দীর্ঘ পথ এর আগে কখনো একটানা হাঁটিনি। দীর্ঘপথের ক্লান্তি আর ঘুমহীনতার কারণেই হয়তো শরীরটা বেতাল হয়ে গেছে। চোখেমুখে ভালো করে পানির ঝাপটা দিলে ঠিক হয়ে যাবে। তাই করলাম। শরীরটা একটু ঝরঝরে মনে হলো।

আমি ছোট মিয়াজির কোনো আত্মীয় নই, কর্মচারী মাত্র। আর ওরা তো দিনমজুর। ধনী বেয়াইয়ের চোখে আমরা সাধারণ মানুষ ছাড়া কিছুই নই। আমাদের অত খাতির যতœ না করলে কিচ্ছু যায় আসে না।

কিন্তু ছোট মিয়াজির বেয়াই তা করলেন না। বরং আমার ভাবনার বিপরীত আয়োজন করলেন। পদ ও আত্মীয়তার নিরিখে বেয়াই আমাদের মাত্রাতিরিক্ত খাতির করলেন। নাস্তার বিশাল আয়োজন করেছেন। কামলারা হাত ডুবিয়ে খেল। আমি খুব খেতে পারলাম না। নিজের মধ্যে কী রকম একটা অস্থিরতা অনুভব করতে থাকলাম। শীলার কথাই বেশি করে মনে পড়তে লাগল আমার।

নাস্তাপানি সেরে রওনা দিতে দিতে একটু দেরিই হয়ে গেল আমাদের। মাইজপাড়ায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা পড়ে গেল।

ছোট মিয়াজির বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে আমার গা-টা হঠাৎ ছম ছম করে উঠল। কী রকম যেন অস্বাভাবিক পরিবেশ। দারোয়ানটা অন্যদিন সালাম দেয়, আজ দিল না। মাথা নিচু করে সরে দাঁড়াল। সুনসান চারদিকে। কী ব্যাপার? এরকম ভারী ভারী লাগছে কেন চারদিক?

দেখলাম, একটু দূরে ছোট মিয়াজি দাঁড়িয়ে আছেন। অনেকটা মাথা নিচু করে। আমি দ্রুতপায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম। সালাম দিতে ভুলে গেলাম। উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলাম, এত থমথমে ভাব কেন ছোট মিয়াজি? কিছু কি হয়েছে? কোনো দুর্ঘটনা?

ছোট মিয়াজি হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। মুখে বললেন, আস। বলে অনেকটা টানতে টানতে আমাকে কাছারিতে নিয়ে গেলেন।

আমি ছোট মিয়াজির মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, কী ব্যাপার ছোট মিয়াজি!

ছোট মিয়াজি নরম গলায় বললেন, আজ সকাল থেকে তোমার স্ত্রী আর মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না।

কীÑ!! বলে আমি ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেলাম। ছোট মিয়াজি আমাকে টেনে তুললেন। আমি হেঁচকা মেরে তাঁর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আমার ঘরের দিকে দৌড় দিলাম।

গিয়ে দেখি দরজা খোলা। বিছানা এলোমেলো। অন্য সবকিছু ঠিকঠাক আছে। শুধু লাবণ্য আর শীলা নেই।

আমি হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠলাম, খালেদা, খালেদা কই?

ছোট মিয়াজি আমার পিঠে আলতো হাত রেখে বললেন, খালেদাকেও সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। তারপর আশ্বাসের গলায় বললেন, তুমি অস্থির হয়ো না। আমি চারদিকে লোক পাঠিয়েছি। মাতারবাড়ির যেখানেই তোমার স্ত্রী-কন্যা থাকুক না কেন, তন্ন তন্ন করে খুঁজে বের করে আনব আমি।

অস্থির গলায় বললাম, আমার বাড়ি! আমার বাড়িতে যায়নি তো লাবণ্য?

না যায়নি। সকালে জানতে পেরেই প্রথমে আমি হংসমিয়াজিপাড়ায় তোমার বাড়িতে লোক পাঠিয়েছিলাম। এসে বলল, ওবাড়িতেও যায়নি তোমার স্ত্রী।

আমি ‘ও মারে’ বলে আবার পড়ে গেলাম। আমাকে ধরাধরি করে শুইয়ে দেওয়া হল। মাথায় পানি ঢালা হল। আমি হঠাৎ গেটের দিকে ছুটে গেলাম। পাগলের মতো যেদিকে পথ দেখলাম, সেদিকেই দৌড়াতে শুরু করলাম। এখন যে সহজ গলায় আপনাকে ঘটনার বিবরণ দিয়ে যাচ্ছি স্যার, সে সময় প্রকৃতিস্থ অবস্থায় ছিলাম না স্যার আমি। সামনে যাকে পাচ্ছি, তাকে জিজ্ঞেস করছিÑ লাবণ্যকে দেখেছেন? আমার মেয়েটি? বলছি আর দৌড়াচ্ছি। যারা চেনে তারা হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আর যারা চেনে না তারা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে।

অল্প সময়ের মধ্যে আমার স্ত্রী-কন্যা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি সমস্ত মাইজপাড়ায় ছড়িয়ে পড়ল। সবার সম্মিলিত চেষ্টাতেও লাবণ্য-শীলার সন্ধান মিলল না। এমনকি খালেদারও খোঁজ দিতে পারল না কেউ।

অনেকটা রাত পর্যন্ত ছোট মিয়াজি আমার পাশে বসে থাকলেন। জোর করে খাওয়ালেন। মাঝরাতে বললেন, বুড়ো মানুষ, শরীরটা আর সইছে না বাবা। তুমি একটু ঘুমানোর চেষ্টা কর। সকালে আবার সন্ধান শুরু করব।

তিনি চলে গেলেন। আমি ঠায় বসে রইলাম। সকালের আজান দিতে না দিতেই আমি শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। যদি ওখানে যায় লাবণ্য? মন বলল, না বলে কেন যাবে? জানি না, নিজের অজান্তে কোনো সময় লাবণ্যকে কষ্ট দিয়েছি কিনা। সেই কষ্ট হয়তো এতদিন মনের কোনে লুকিয়ে রেখেছিল, হয়তো কালকে সেই কষ্ট তাকে বিচূর্ণ করেছিল। তাই হয়তো অভিমানে আর দুঃখে বাপের বাড়িতে চলে গেছে লাবণ্য। তুমি কি আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে লাবণ্য? আসছি আমি, হাতে পায়ে ধরে তোমার অভিমান ভাঙাবই আমি। তুমি ফিরে না এসে পারবে না লাবণ্য। হাঁটছি আর ভাবছি।

কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে গিয়েও লাবণ্য-শীলাকে পেলাম না। শ্বশুরবাড়ির সবাই উন্মাতাল হয়ে উঠল। লাবণ্য নাই জেনেই আমি আবার রওনা দিলাম মাইজপাড়ার উদ্দেশে।

কীভাবে দিন কাটল, রাত কাটল জানি না। আমার শরীরের সমস্ত বল ফুরিয়ে এসেছে। আমার হাঁটার শক্তি কমে এসেছে। আমি শুধু বলতে লাগলাম, লাবণ্য কী অপরাধে আমাকে ছেড়ে চলে গেলে? কোথায় গেলে? যাবে যদি বলে গেলে না কেন?

ছোট মিয়াজি এবং তাঁর পরিবার আমাকে ঘিরেবেড়ে রাখল। আমার মাতারবাড়ির লোকজনও আমার আশেপাশে। শহিদুলকে সবচাইতে মর্মাহত দেখলাম। মাঝে মাঝে সে আমার মাথায় হাত বুলাতে লাগল। এক সময় বলল, রাতে ফিরতে আমার একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। উঁকি মেরে দেখেছি, আপনার ঘরে হারিকেন জ্বলছে। এক রাতের মধ্যে এমন কী হয়ে গেল যে, ভাবি ঘর ছেড়ে চলে গেল! শহিদুলের কণ্ঠ কষ্টে ভরা। একমাত্র আপনজনেই বিপদে এরকম কণ্ঠে কথা বলে।

এইভাবে স্যার একদিন কাটল, দুদিন কাটল, তৃতীয় দিনও কাটে কাটে। বিকেলের দিকে কী কারণে জানি না, আমার জমিদার ব্রিজে যেতে খুব ইচ্ছে করল। মনে হল ব্রিজে ঝুঁকে কুহেলিকার জলের দিকে তাকিয়ে থাকলে শোক কমবে? হয়তো সেদিন শৈশবের স্মৃতি আমাকে প্রণোদিত করেছিল কুহেলিকার কাছে যেতে।

হ্যাঁ স্যার, আমি সেই বিকেলে কুহেলিকার কাছে গিয়েছিলাম। ব্রিজের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত অনেকবার হেঁটেছিলাম স্যার। তারপর কী করেছিলাম? তারপর স্যার ঝুঁকে কুহেলিকার জলের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থেকেছিলাম। তখন স্যার কুহেলিকায় ভাটার টান। ব্রিজের নিচের অনেকাংশ চর জেগে উঠেছিল। আমি একটু মাত্রাতিরিক্তভাবে ঝুঁকেছিলাম। হঠাৎ আমার নজরে পড়লÑ ব্রিজের নিচে আড়াল মতন জায়গায় কে যেন নড়াচড়া করছে। ভাবলাম- লাবণ্য নয় তো? এরকম ভাবার কোনো কারণ ছিল না স্যার। তারপরও একজন অপ্রকৃতিস্থ মানুষ এরকম ভাবতেও তো পারে।

আমি দ্রুত ব্রিজের নিচে নেমে গেলাম। দেখি- খালেদা জবুথবু হয়ে বসে আছে। তার উ™£ান্ত চাহনি। মলিন মুখ। অনাহার আর অসহায়তার চিহ্ন তার সারা চোখেমুখে। আমাকে দেখে ‘আল্লারে’ বলে চিৎকার দিয়ে উঠল।

এর পর কান্না। প্রথমে ফুঁপিয়ে তার পর বিলাপে। গ্রাম্য সুরে সেই বিলাপে নানা কথা বলে গেল খালেদা। কিছু বুঝলাম, অধিকাংশই আমার বোঝার বাইরে থেকে গেল। দীর্ঘক্ষণ পরে সে থামল। এর মধ্যে তাকে থামানোর চেষ্টা করেছি কিনা? হ্যাঁ, করেছি স্যার। কিন্তু সে থামেনি। ভেবেছি- একসময়ে সে থামবে। এখন বিলাপের মধ্যদিয়ে সে তার আবেগ বের করে দিক। আবেগ থিতু হলে তার সঙ্গে কথা বলব।

এতক্ষণ আমি কী করে ধৈর্য ধরে থাকলাম? তার ব্যাখ্যা আমি দিতে পারব না স্যার। মানুষ কোনো কোনো সময় ব্যাখ্যাতীত কিছু কাজ করে বসে। অন্যের কাছে তা অবাস্তব বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা-ই করে কিছু মানুষ। আমিও হয়তো সেই কিছু মানুষদের একজন। নইলে স্ত্রী-সন্তান হারানো আমি খালেদার বিলাপ না থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম কী করে?

কান্না থামলে তীব্র আগ্রহে জিজ্ঞেস করলাম, খালেদা, তোমার খালা কোথায়? শীলা কোথায়? খালেদা লাবণ্যকে খালা আর আমাকে খালু ডাকত।

আমার প্রশ্ন শুনে মাছের নিষ্পলক চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল খালেদা। আমি তার দু’বাহু ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে একই প্রশ্ন করলাম।

খালু, আপনার সর্বনাশ হয়ে গেছে গো। বলে আমার দুই পায়ে নিজের মাথা ঘষতে লাগল খালেদা।

আমি তাকে জোর করে দাঁড় করালাম। বললাম, কী হয়েছে? হয়েছে কী?

সে বলল, যে রাতে আপনি ছোট মিয়াজির শ্বশুরবাড়িতে গেলেন, সেই রাতে শহিদুইল্যা আপনার ঘরে ঢুকছে রে খালু!

আমি অজানিত আশঙ্কায় কাঁপতে শুরু করলাম।

খালেদা বলল, রাত তখন গহিন। খালা শীলাকে ঘুম পাড়াচ্ছিল। আমি রান্নাঘরে বাসন ধুচ্ছিলাম। আপনি জানেন, মূল দরজা বাঁধার দায়িত্ব আমার। সে রাতে বাঁধিনি। ভেবেছিলাম কাজকর্ম শেষে বাঁধব। ভয়ের তো কিছু নেই। হঠাৎ খালা চিৎকার পাইরা উঠল। কে কে? আমি দৌড়ে আপনাদের শোয়ার ঘরে ঢুকলাম। পেছন থেকে কে যেন আমারে ঝাপটে ধরল। আরেকজন শীলাকে কোলে নিয়া বাথরুমে ঢুকল। আমাকেও ঠেলে দেওয়া হল সেই রুমে। পরে ষণ্ডাটা বাইর হইয়া বাথরুমের দরজায় বাইর থেকে খিল দিল। শীলা কাঁদবার চেষ্টা কইরছিল। প্রাণের ভয়ে আমি তার মুখ চেপে ধরেছিলাম। মনে করেছিলাম আমাদের বাড়িতে ডাকাত পড়ছে।

অনেকক্ষণ পর খালা খিল খুলে দিয়েছিল। দেয়াল ধরে ধরে বিছানায় গিয়ে উপুর হয়ে ধপাস করে পড়েছিল। গোঙাতে গোঙাতে বলেছিল- শহিদুইল্যা শুয়োরের বাচ্চা…।

কী বলছ তুমি? নিজের কণ্ঠস্বরকে নিজেই বুঝতে পারছিলাম না আমি।

তারপর?

আরেকদিনের কথা মনে পড়ছে খালু। বিকালের দিকে উঠানে শীলাকে নিয়ে খেলছিল খালা। হঠাৎ ‘কুত্তার বাচ্চা’ শব্দে আমি বাইরে বেরিয়ে আসলাম। দেখি বেড়ার বাহির থেকে শহিদুইল্যা কী যেন একটা বইলতে চাইছিল খালাকে, তাতে খালা ‘কুত্তার বাচ্চা’ বলে চেঁচাইয়া উঠছিল।

কতদিন আগে।

মাসখানেক অইব।

আমাকে বলনি যে এতদিন?

খালা খুব কইরে মানা করি দিছিল আমারে। বইলছিল, ছোটখাটো ব্যাপার। খালুরে কইও না। গোডা দিন পরিশ্রম কইরা আসে। এগুলো শুইনলে মন খারাপ করবে।

আমি হাহাকার করে উঠলাম, এখন কোথায়? লাবণ্য কোথায়? শীলা কোথায়?

খালেদা বাঁ হাতের তর্জনীটা তুলে ব্রিজটা দেখিয়ে দিল। বলল, ওইখান থেইকে লাফ দিছে কুহেলি নদীতে।

শীলা! শীলা কোথায়?

শীলাও সঙ্গে আছিল।

আমার চারদিক হঠাৎ আঁধার হয়ে গেল। চোখে আমি কিছুই দেখতে পারছিলাম না তখন। না খালেদাকে, না ব্রিজটিকে। অনেকক্ষণ পর আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে থাকলাম। আমার সমস্ত শরীর তখন নিথর। শিরায় কোনো রক্তপ্রবাহ চলছে বলে মনে হল না। চোখের পলক ফেলতে পারছিলাম কিনা বুঝতে পারছিলাম না।

হঠাৎ স্যার আমার মধ্যে ভাবান্তর হলো। আমার মনে হলো- আমার কোনো ক্রোধ নেই, কোনো শোক নেই, কোনো দুঃখ নেই, কোনো আনন্দ নেই। আমি কোনো নিশ্বাস ফেলছিলাম না, কোনো শ্বাস টানছিলাম না।

অনেকক্ষণ পর খালা বিছানায় উঠে বসেছিল। ঘুমন্ত শীলাকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিল। তারপর দরজা খুলে বাইর দিকে হাঁটা দিছিল। পকেট গেইট তখন খোলা আছিল। হয়তো কুত্তার বাইচ্চা শহিদুইল্যা কুকাম সাইরা সাঙ্গোপাঙ্গ লইয়া গেইটের বাইরে চইলে গেছিল। দারোয়ান পকেট গেইট না লাগাইয়া ঘুমাইতেছিল। গেইটের বাইরে গিয়া খালা হঠাৎ আন্ধারে মিলাইয়া গেল। আমিও তার পিছন পিছন দৌড়াইতে লাগলাম। খালাকে এই দেখি, এই দেখি না। বয়স হয়েছে আমার, খালাকে দৌড়ে ধরতে পারছিলাম না। দৌড়াইতে দৌড়াইতে একসময় এই ব্রিজের ওপর এসে দাঁড়াইলাম। দেইখলাম- খালা শীলাকে জড়িয়ে ধরে ওই ব্রিজ থেইকে সর্বনাশী কুহেলির পানিতে ঝাঁপ দিল। ঝু-প কইরে একটা শব্দ কানে এল। দীর্ঘক্ষণ কথা বলে থামল খালেদা। আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। দেখল, আমি কিছু বলছি না, শুধু তার দিকে তাকিয়ে আছি।

আমি খুব ভয় পাইয়া গেছি খালু। ভয়ের চোটে এই ব্রিজের নিচে আশ্রয় নিছি। খালেদা বলল।

বেদনা ভেতরটা কুরে কুরে খেলেও বাহিরটা একেবারে শান্ত থাকল আমার। আমি তখন তখন ঠিক করলামÑ এই ঘটনা কাউকে জানানো যাবে না। খালেদাকে বললাম, খালেদা তোমার বাড়ি রামুণ্ডুতে না?

খালেদা বলল, হ।

আমি বললাম, আজকেই তুমি রামুতে চলে যাবে। এই ঘটনার কণিকামাত্রও কাউকে বলবে না। বলতে বলতে আমি খালেদার দুই হাত জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, রাখবে তুমি আমার কথা খালেদা? যদি না রাখ, পুলিশের হাঙ্গামায় পড়ে যাবে। তখন তোমার জেল ফাঁসি হয়ে যাবে।

খালেদা স্তম্ভিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। পকেটে আমার টাকা ছিল। বেয়াইবাড়িতে যাওয়ার প্যান্টটাই, আমার পরনে। মুঠি ভরে যা এল, তা-ই খালেদার হাতে দিয়ে বললাম, চল।

খালেদাকে কোথায় নিয়ে গেলাম আমি?

মাতারবাড়ি থেকে বেরোনোর দুটো ঘাট আছে স্যার। একটা কক্সবাজারের দিকে আর একটা বুরুমচরার দিকে। তখন আঁধার ছেয়ে গেছে চারদিক। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলে গ্রাম্যপথ নির্জন হয়ে যায়। আমি ওই নির্জন পথ দিয়ে খালেদাকে নিয়ে বুরুমচরার দিকের ঘাটে এলাম। একটা সাম্পান ভাড়া করলাম। মাঝিকে বললাম, ওকে ওই পাড়ে পৌঁছে দিও ভাই। বেশি ভাড়া পেয়ে মাঝি তখন তখনই সাম্পান ছেড়ে দিল।

আমি বাড়িতে ফিরে এলাম স্যার। কোন বাড়িতে? কেন স্যার ছোট মিয়াজির বাড়িতে!

পরদিন সকালে আমি একদম স্বাভাবিক মানুষ। সকালে উঠে গোসল করলাম। ছোট মিয়াজির বাড়ি থেকে নাস্তা এসেছে, খেলাম। এরপর খাতাপত্র নিয়ে লবণ-গোলার দিকে রওনা দিলাম। লবণ-গোলার মানুষজন আমাকে দেখে তো অবাক। তারা আরও অবাক হলো, আমি তাদের সঙ্গে আগের মতো কথা বলছি দেখে। কোনো বেদনা বা শোক আমার মধ্যে দেখতে না পেয়ে তারা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি শুরু করল। সবকিছু দেখেও আমি না দেখার ভান করলাম, বুঝেও না বোঝার অভিনয় করে গেলাম।

দুপুর নাগাদ শহিদুল এল। আমার সঙ্গে দরদি গলায় কথা বলল। বারবার বলল, এই সময় আপনার বিশ্রামের দরকার। অত কাজের চাপ নেওয়ার দরকার নেই।

আমি মুচকি একটু হেসে তার দিকে তাকালাম।

বিকেলের দিকে একজন লোক হন্তদন্ত হয়ে লবণগোলায় ছুটে এল। আসতে আসতে চিৎকার করে বলতে লাগল, পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে। ডেডবডি পাওয়া গেছে।

কে যেন জিজ্ঞেস করল, কার ডেডবডি? কোথায় পাওয়া গেল?

লোকটি বলল, খালাম্মার আর মেয়েটির ডেডবডি। কুহেলিকা নদীর ভাটির দিকে।

কে একজন কুহেলিকাতে মাছ ধরতে গিয়ে ভাটির দিকে লাবণ্য আর শীলার মৃতদেহ জলে ভাসতে দেখেছে। লাবণ্য উপুর হয়ে আর শীলা চিৎ হয়ে কুহেলিকার জলে ভাসছিল।

আমার যে তখন হুঁশ ছিল এমন নয়। আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শি একত্রিত হয়েছিল। সবাই বলাবলি করছিল, কী কারণে যে আত্মহত্যা করল বুঝতে পারছি না।

দাফন কাজ শেষ করে সবাই যার যার ঘরে ফিরে গিয়েছিল। সবাই ধরে নিয়েছে- লাবণ্য কন্যাসহ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আমাকে তেমন করে দোষারোপ করল না কেউ। ছোটবেলা থেকে আমি খুব ভালোছেলে বলে সবাই জানে এবং মানে। তাছাড়া ঘটনার দিন তো আমি বাড়িতেই ছিলাম না। সুতরাং আমি নির্দোষ। বুড়াবুড়িদের মধ্যে কেউ কেউ বলল, সবই কপালের লিখন। কার মৃত্যু যে কোথায় কীভাবে লেখা আছে আল্লাই মালুম।

তারপর কী হল? আমি কী করলাম? ওই দেখেন স্যার, আপনি বারবার টেনেটুনে কারবালার ময়দানে নিয়ে আসতে চাইছেন আমাকে। যে ব্যাপারটাকে এতদিন বুকের তলায় মাটি চাপা দিয়ে রেখেছি, মাটির তলা খুঁড়ে কুরুক্ষেত্রের রক্তাক্ত সেই কাহিনীটা আপনি বাইরে আনতে চাইছেন স্যার। থাক না স্যার এর পরের কথাগুলো। কেন থাকবে? শুনবেনই আপনি? বলছেনÑ ওই রাতে বড় একটা ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছিলাম আমি। কোন রাতে স্যার? যে রাতে হাশেম চাচার মেয়ে জোবাইদাকে শহিদুল ধর্ষণ করতে নিয়ে এসেছিল?

জীবন মানে তো ঝুঁকি স্যার। পদে পদে বিপদের নামই ঝুঁকি। বিপদ মানে পদে পদে অনিশ্চয়তা। তো ওই অনিশ্চয়তায় ঝাপ দিয়েছিলাম আমি। আপনি ঠিকই বললেন স্যার, এত বড় ঝুঁকিটা না নিলেও পারতাম আমি।

হাশেম চাচার মেয়ে হোক বা সোহাগিবালার বোন, ধর্ষিতা হলে আমার কী? এরকম ঘটনা কত হচ্ছে! সবগুলো কি ঠেকানো যাচ্ছে? অনেকেরই তো চোখে পড়ে এসব ঘটনা। কই কেউ কি এগিয়ে যায়? ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কেউ কি রুখে দাঁড়ায়? ও কিছু না অথবা ধর্ষিতা তো আমার কেউ না- এরকম ভেবে এড়িয়ে যায় দর্শকরা। আর আমি এমন কে হরিদাস পাল যে, শহিদুইল্যার মুখের খাবার কেড়ে নিতে গেলাম?

আপনি ঠিকই বলেছেন স্যার। আপনি সুবিধাবাদীদের পক্ষের লোক। সুবিধাবাদীরা এরকমই করে স্যার। দেখেও দেখে না, শুনেও শোনে না। গ্রামের তুলনায় শহরে এই পলায়নবাদী মানুষের সংখ্যা বেশি। ফুটপাতে অসহায় অসুস্থ মানুষ শুয়ে আছে। দুদিন ধরে অনাহারী। কঁকিয়ে কঁকিয়ে দু’মুঠো খাবারের জন্য ভিক্ষা চাইছে। শহরবাসীরা তার পাশ দিয়ে উদাসীন চোখে হেঁটে চলে যায়। অসহায় মানুষটির কাকুতিমিনতি তাঁর কান পর্যন্ত পৌঁছে না। তাকায় না পর্যন্ত স্যার তার দিকে। তাকালে যদি তার বিবেক জেগে ওঠে। অথচ কোনো তরুণী সুরভি ছড়াতে ছড়াতে পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে আপনারা শহরবাসীরা তাকে গিলতে শুরু করেন। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যে কতবার দেখেন, সে আপনারাই জানেন স্যার। এ স্যার শহুরে সুবিধাভোগীদের চরিত্রের লক্ষণ।

আমরা গ্রামের মানুষরা অসহায় মানুষদের উপেক্ষা করতে শিখিনি স্যার। গ্রামের বাজারে একজন আরেকজনকে মারছে, উপেক্ষা করে গ্রামবাসীরা এড়িয়ে চলে যাচ্ছে, তা কখনও হয় না স্যার। মারামারির দিকে এগিয়ে যাবেই যাবে। একটা মিটমাট করে তবেই তারা ক্ষান্ত হবে। আমিও তো গ্রামের মানুষ স্যার। আপনাদের তুলনায় সহজ-সরল গ্রামবাসীদের বিবেক যন্ত্রণা বেশি। ওই বিবেকের কারণেই স্যার আমি জোবাইদাকে বাঁচাতে এগিয়ে গিয়েছিলাম। প্রতিক্রিয়ায় আমার কী হবে না হবে তা বিন্দুমাত্র ভাবিনি স্যার।

বিবেকই আমাকে সেই রাতে স্থির থাকতে দেয়নি স্যার। স্থির থাকি কী করে বলুন?

হাশেম চাচার মেয়ের জায়গায় যদি স্যার আমার বোন হতো বা আমার মেয়ে? তাহলে কী করতাম স্যার? আপনিই বলুন, আপনি কী করতেন? লা-জবাব হলেন তো! কেন কোনো উত্তর দিচ্ছেন না স্যার? নিশ্চয় আপনার বিবেক আপনাকে ওই শহুরে সুবিধাবাদী উত্তরটা দিতে দিচ্ছে না।

জোবাইদাকে তার মা-বাপের কাছে পৌঁছে দিতে পেরে মনে বড় সুখ পেয়েছিলাম স্যার। তৃপ্তির সুখ। আমার বউটাও খুব খুশি হয়েছিল। একটা মেয়েকে বেইজ্জতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারলে কোন নারীটি আনন্দ পায় না স্যার? তাই ঝুঁকিটা নিয়েছিলাম আমি।

আজ মানছি স্যার, ওই ঝুঁকি নেওয়ার জন্য ভয়ংকর খেসারত দিতে হয়েছিল আমাকে। ওই রাতের পর আমি সাবধানে থাকিনি যে এমন নয়। লাবণ্যকে আকারে ইঙ্গিতে সতর্ক থাকতে বলেছি।

পরে শহিদুল এমন স্বাভাবিক আচরণ করতে থাকল যে, আমার ভেতর থেকে ভয়টা কেটে গেল স্যার। সে তো ইচ্ছে করে আমাকে বিভ্রান্ত করার জন্য এরকম আচরণ করেছিল।

শহিদুল হয়তো একটা সুযোগের জন্য অপেক্ষা করছিল। বেয়াইবাড়িতে গরু নিয়ে যাওয়ার রাতটা সেই সুযোগটা এনে দিল তাকে। অজগররা অলসভাবে মাটিতে শুয়ে থাকে বটে, সুযোগ পেলে আস্ত হরিণটা গিলে খায়। শহিদুইল্যাও লাবণ্যকে গিলে খেয়েছিল স্যার।

তারপর? তার পর কী হলো?

বউ আর বাচ্চাকে কবর দিয়ে আমি একেবারে চুপ মেরে গেলাম। ছোট মিয়াজির সব কাজ করি, কিন্তু পারত পক্ষে কথা বলি না। ছোট মিয়াজি বলে দিয়েছেন- আমার সকাল-রাতের খাবার আর নাস্তা ভিতরবাড়ি থেকে পাঠানো হবে। তা-ই পাঠানো শুরু হল। আমার স্ত্রী-কন্যা গেল, রান্নাবান্নার পাট চুকল। আমি ভীষণ একা হয়ে গেলাম স্যার।

ছোট মিয়াজি, শহিদুল, পাড়াপড়শি, লবণ-গোলার কর্মচারীÑ সবাই ভাবল, আমি শোকে পাথর হয়ে গেছি।

প্রতিশোধ নিয়েছি কি না? আর শুনতে ইচ্ছে করছে না স্যার আপনার? সিনেমা সিনেমা মনে হচ্ছে? ঠিক বলেননি স্যার। সিনেমা হলে তো নায়ক হুংকার দিয়ে ভিলেনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। হারামজাদা, আমার বউকে রেপ করেছিস তুই, আমার মেয়েটাকেও বাঁচতে দিস নি। আমি তোর জান কবচ করে ছাড়ব শুয়োরের বাচ্চা।

এর কিছুই আমি করিনি স্যার। শুধু নীরবে কাজ করে গেছি।

কী কাজ? প্রতিশোধের কাজ?

বলছি স্যার।

লবণ-গোলার দখল নিয়ে ছোট মিয়াজি আর বাদশা মিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্বটা বেশ পাকিয়ে উঠল। শোনা গেল- বাদশা মিয়া কক্সবাজার থানায় টাকা ঢেলেছে। গুণ্ডাষণ্ডা জোগাড় করছে বাদশা মিয়া। এবার পুরো লবণ-গোলাটাই নাকি দখল করে ছাড়বে সে। এসপার কী ওসপার- কিছু একটা না করে এবার ক্ষান্ত হবে না বাদশা মিয়া।

এদিকে ছোট মিয়াজিও বসে থাকলেন না। পুরনো ঘাগু লোক তিনি। তাঁর হাতেও গুণ্ডা বদমাসের কমতি নেই। লেজে পাড়া পড়লে ধোঁয়া সাপও ফণা তোলে, ছোট মিয়াজির বেলায়ও তা-ই হলো। এমনিতে শেষ বয়সে নির্ঞ্ঝাট জীবনযাপন করতেন তিনি। কিন্তু স্বার্থে আঘাত লাগল যখন, তখন তিনি বসে থাকলেন না। বাদশা মিয়ার জবরদখলকে যে কোনো মূল্যে ঠেকাতে হবে। ছোট মিয়াজিও প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলেন। সমস্ত এলাকাবাসী জেনে গেল- এবার মাইজপাড়া কারবালার ময়দানে পরিণত হবে। ওদিকের নেতৃত্ব বাদশা মিয়া দিলেও এদিকের নেতৃত্ব দিচ্ছে শহিদুল। দা-কুড়াল-কিরিচ-রামদা-লাঠি-শরকি নিয়ে প্রস্তুত হল উভয়পক্ষ। বাদশা মিয়ার ওপর যেমন এপক্ষের রাগক্ষোভ, ঠিক বাদশা মিয়ারও টার্গেট হয়ে দাঁড়াল শহিদুল।

মাতারবাড়ি থেকে বংশের নাম মুছে দেব- এসব হুংকার দিয়ে যেতে লাগল উভয় দল। পারলে এখনই পরস্পরের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাঁক করে দেয়। গোটা মাইজপাড়ায় থমথমে ভাব। কখন খুনাখুনি শুরু হয়, এই অপেক্ষায় রইল এলাকাবাসী।

সুযোগ এসে গেল স্যার আমার হাতে।

কিসের সুযোগ? প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ স্যার।

এক রাতে কোথা থেকে ফিরছিল শহিদুল। হয়তো মদ খেয়ে অথবা জোবাইদার মতো কোনো মেয়ের সর্বনাশ করে। আবার এমনও হতে পারে গুণ্ডাষণ্ডাদের সঙ্গে বৈঠক সেরে ফিরছিল সে। সামনের হাঙ্গামায় কী কৌশল নেবে, অথবা প্রথম টার্গেট কে হবে, ষণ্ডাদের সঙ্গে বসে তা ঠিকঠাক করে হয়তো বাড়ি ফিরছিল শহিদুল। আমি আগে একবার আপনাকে বলেছি বোধ হয়, অজপাড়া গাঁয়ে সন্ধ্যাগড়ানো রাত মানে গহিন রাত। আলো থাকতে থাকতেই গ্রামের মানুষ প্রয়োজনের কাজগুলো সেরে ফেলে। তারপর ঘরে ফিরে যায় সবাই। বাহিরটা তখন নির্জন খাঁ খাঁ।

ছোট মিয়াজির বাড়ি থেকে সামান্য দূরে টিলা মতন। সমস্ত টিলাজুড়ে বাঁশঝাড় স্যার। ভাইজ্যাবাঁশের ঝাড়। একেবারে সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালির মতো। বাঁশঝাড়ের মাঝখান দিয়ে চলাচলের পথ। রাত নামলেই গা ছমছম আঁধার। লবণ-গোলা থেকে অথবা অন্য কোনোখান থেকে আসতে হলে ওই পথ মাড়িয়েই আসতে হয়।

সেই বিকালে আমাকে বিদায় করে শহিদুল অফিসে থেকে গিয়েছিল। বলেছিল, আমার কিছু কাজ আছে। ফিরতে দেরি হবে। আপনি চলে যান। আব্বা অপেক্ষা করবেন আপনার জন্য।

আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম। বাঁশঝাড়ের মাঝখান দিয়ে আসবার সময় চট করে পরিকল্পনাটা আমার মাথায় এসে গিয়েছিল স্যার।

কী পরিকল্পনা? অন্ধকারের পরিকল্পনা স্যার। আমি তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলাম। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়েছিলাম। নিজের ভেতরে তাকিয়ে দেখলাম- একেবারে ঠান্ডা। যেন শীতের সমুদ্র। ঢেউ তো দূরের কথা স্রোতের যে টান, তাও অনুভব করলাম না আমি। তবে মনের তলে, বহুতর স্তরের গভীরে একটা ঘূর্ণিকে মৃদুলয়ে আবর্তিত হতে দেখলাম। এ-ও অনুভব করলাম যে, এই ঘূর্ণিটি চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে আমার মগজের দিকে এগিয়ে আসছে।

মিয়াজিবাড়ি থেকে পাঠানো নাস্তা খেলাম। তার আগে কাছারিতে গিয়ে ছোট মিয়াজিকে সেদিনের আয়-ইনকামের হিসাব বুঝিয়ে দিলাম। তারপর কাগজ মুড়িয়ে একটা দা হাতে নিলাম। হাওয়া খেতে যাচ্ছি মতো করে গেট দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। দারোয়ান গেটে ছিল না তখন।

আমি গা ছমছম আঁধারের বাঁশঝাড়ে ঢুকে পড়লাম স্যার। দা দিয়ে কেটে একটা লাঠি তৈরি করলাম। বাঁশের লাঠির একদিকে সুঁচালো করলাম। আমি পথের পাশে ঘন অন্ধকার মতন জায়গায় লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকলাম স্যার।

অনেকক্ষণ পর শহিদুলকে আসতে বুঝলাম। ঘোর আঁধারে কী করে বুঝলাম ও যে শহিদুল? শহিদুল স্যার পথে একাকী হাঁটবার সময় শিস দিত। ওই শিসে সে একটা বিশেষ গানের কলি ভাঁজত- যদি একখান মুখ পাইতাম, মহেশখাইল্যা পানের খিলি তারে খাওয়াইতাম। ওই রাতে শিসে ওই কলিটিই ভাঁজছিল স্যার। তাই তাকে চিনতে আমার বেগ পেতে হয়নি।

আমাকে পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িটা দিয়েছিলাম স্যার। একেবারে মাথা বরাবর। তখন তখনই মাথাটা দু’ফাঁক হয়ে গিয়েছিল। মুখে টুঁ শব্দটি করার সময় পায়নি শহিদুইল্যা। কলাগাছের মতো ধপাস করে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল স্যার।

ওই ঘূর্ণিটা আমার মগজকে এলোমেলো করে দিচ্ছে তখন। মনে হলোÑ আমার মগজ বাতাসে বাতাসে কণা কণা হয়ে উড়ছে। কিছু ভাববার শক্তি আমি হারিয়ে ফেলেছি। ভেতরে একধরনের শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমিÑ প্রতিশোধ, প্রতিশোধ, প্রতিশোধ। মৃদ থেকে প্রবল হতে থাকে সেই শব্দটি। একটা সময়ে আমার মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। বজ্রপাতের শব্দে এবং আলোতে আমি কি উন্মাদ হয়ে গেলাম?

গেলামই তো স্যার। নইলে কেন শহিদুইল্যাকে চিৎ করে বাঁশের সুঁচালো মাথা দিয়ে ওর শিশ্নে আর অ-কোষে গুঁতাতে লাগলাম আমি। গুঁতাতে গুঁতাতে গুঁতাতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়লাম।

আমার ভেতরের ঘূর্ণিটা হঠাৎ থেমে গেল। আমার সমস্ত শরীর তখন ঘামে ভেসে যাচ্ছে। সেই গা ভাসানো ঘামের মধ্যেও আমি বেশ শীত অনুভব করতে লাগলাম। শার্টের হাতা দিয়ে কপাল আর মুখের ঘাম মুছে ফেললাম। দা-টা পেন্টের নিচে লুকিয়ে আমি বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। লাঠিটা স্যার দূরে ছুড়ে ফেলেছিলাম।

না, কেউ দেখতে পায়নি আমাকে। রাস্তায় মানুষজন তো ছিলই না, দারোয়ানটাও ছিল না গেটে। ঘরে ফিরে আমি বাথরুমে ঢুকে পড়েছিলাম। আমার গোসল করা যে ভীষণ দরকার।

আমাকে কেউ সন্দেহ করেছিল কি না? কী যে বলেন না স্যার আপনি? সন্দেহ করার মতো কোনো আচরণ করেছি আমি? কাউকে বুঝতে দিয়েছি আমার বেদনা, আমার ক্ষোভ? একজন মেদামারা বোকাসোকা মানুষের অভিনয় করে গেলাম কেন তাহলে এতদিন? সবকিছু জেনেও না বোঝার ও না জানার ভান করে গেলাম কেন তাহলে? এমন কৌশলী অভিনয়টা করলাম স্যার, কেউ তো দূরের কথা ছোট মিয়াজিও বিন্দুমাত্র সন্দেহ করলেন না আমাকে।

সবাই মনে করলÑ এ বাদশা মিয়ার কাজ। ও-ই খুন করিয়েছে শহিদুল মিয়াজিকে।

গোটা মাইজপাড়া, শুধু মাইজপাড়া কেন সমস্ত মাতারবাড়ি জুড়ে হই চই পড়ে গেল। ছোট মিয়াজির পক্ষের লোকেরা বাদশা মিয়ার বাড়ি আক্রমণ করল। আগুন লাগাল বাড়িতে। বাদশা মিয়ার লোকেরাও বসে থাকল না। তারাও লাঠি-শরকি-কিরিচ নিয়ে ছোট মিয়াজির বাড়ির দিকে ক্ষেপে এল।

আমি কী করলাম? আমি তখন টুপ।

টুপ মানে? মানুষ যেমন পুকুর জলে টুপ করে ডুব দেয়, আমিও তেমনি মাইজপাড়া থেকে টুপ করে ডুব দিলাম। পালিয়ে গেলাম মাইজপাড়া থেকে।

কেউ আমার খোঁজ করেছে কিনা? এত হই হাঙ্গামার মধ্যে আমার খোঁজ কে করবে স্যার? খোঁজ করার ফুরসতইবা কোথায়? ছোট মিয়াজি তখন পরিবার-পরিজনের জান বাঁচানো নিয়ে ব্যস্ত।

তারপর পালিয়ে এসেছি এই ঢাকা শহরে। সুদূর ওই মাতারবাড়ি থেকে এই ঢাকা পর্যন্ত কী করে এলাম, তা স্যার অন্য এক ইতিহাস। সেই ইতিহাসটা স্যার আমার হয়েই থাক।

ভিক্ষা না করে চাকরি করিনি কেন? অন্য কিছু করিনি কেন?

কী করে করব স্যার? যদি কেউ চিনে ফেলে আমাকে? বললেন- আজকের মতো চল্লিশ বছর আগে ঢাকা তো বর্তমানের মতো ছিল না। কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে কে খুন হলো, তার সংবাদ ঢাকা পৌঁছানো তো সেই সময় সম্ভব ছিল না।

তারপরও ভয়টা আমার মন থেকে কাটেনি। খুনের ভয় তো স্যার। শহিদুলকে খুন করার সময় জানের মায়া ছিল না আমার। খুনের পর বুঝলামÑ আপন জানের মায়া বড় মায়া স্যার। সেই মায়ার ফাঁদে পড়েই তো স্যার আমার ঢাকায় পালিয়ে আসা। ওই বেঁচে থাকার লোভেই তো অন্য কাজ না করে ভিক্ষুকের সাজ নেওয়া আমার।

ছদ্মবেশই ধারণ করলাম আমি। চুল-দাড়ি-গোঁফ। লম্বা লম্বা নখ। আউলাবাউলা চেহারা। ছেঁড়াফোঁড়া জামাকাপড়। এই রমনা পার্ক, এই শিরীষতলা।

গাছতলা, ঝড়-রোদ, মাটিতে শোয়া- সব কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিলাম স্যার।

ভিক্ষা করি মানুষের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য স্যার। বেঁচে থাকার লোভে। চিনতে পারলে তো পুলিশে ধরিয়ে দেবে।

আপনি তো বিখ্যাত মানুষ। একে তো অধ্যাপক, তার ওপর সাহিত্যিক। ক-ত হোল্ড স্যার আপনার। আপনার সঙ্গে কত মানুষ আর কত প্রতিষ্ঠানের পরিচয়। সেই সুবাদে এনজিওদের সঙ্গেও আপনার পরিচয় আছে নিশ্চয়ই। বিদেশি এনজিও-ওয়ালাদের মাথায় কখন যে কী পোকা ঢোকে, বোঝা দায়। কেউ ঢাকা শহরে ভিক্ষুকের সংখ্যা কত, কেউবা ভাসমান আর স্থায়ী বেশ্যা কতজন, টোকাইরা রাতের বেলায় কোথায় শোয়, কী খায় এসবের সংখ্যা-প্রকৃতি নির্ণয়ের প্রকল্প হাতে নেয়। তাতে ওইসব নিরন্ন মানুষদের কী লাভ হয় কে জানে, কিন্তু এনজিও-ওয়ালাদের কী লাভ হয়, সেটা তো আপনি ভালো করেই জানেন স্যার।

আপনাকে একটা অনুরোধ করব স্যার? অনেকটা দিন আপনি আমার কাছে এলেন। কথাও বলালেন অনেক। আপনার কী লাভ হলো জানি না। তবে অনুমান করতে পারি- আপনার আগাম উপন্যাসের মাল-মসলা হয়তো আপনি আমার কথন থেকে জোগাড় করে নিয়েছেন।

আমারও লাভ হয়েছে স্যার। বুকের ভার কমেছে স্যার আমার। বেদনার চাপে মাঝেমধ্যে আমার দম বন্ধ হয়ে আসত। এখন আমি ভালো করে শ্বাস টানতে পারছি। আপনার সঙ্গে আমার জীবনকাহিনি শেয়ার করতে পেরে শ্বাসটানা আর নিশ্বাস ফেলার স্বস্তিটা পেয়েছি স্যার।

এই ক’দিনে আপনি আমাকে কী ভেবেছেন জানি না, আমি কিন্তু বন্ধু ভাবতে শুরু করেছি আপনাকে। জানি, এ বড় বাতুলতা। একজন অধ্যাপকের সঙ্গে একজন ভিক্ষুকের বন্ধুত্ব হয় কী করে? নিদেন পক্ষে পরিচয় হতে পারে, কথা হতে পারে, বন্ধুত্ব তো হতে পারে না। তবুও স্যার নাদানের মতো ভাবতে ভালো লাগছে- আপনি আমার বন্ধু।

তো স্যার সেই বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে বলছি, আপনি আমার এই অনুরোধটি রাখবেন।

কোনো এনজিওকে বলবেন, গুণ্ডাষণ্ডাদের পরিসংখ্যান তৈরি করতে। এই ঢাকা শহরে, শহর ছাড়িয়ে গ্রামেগঞ্জে ছোট মিয়াজির মেজছেলে শহিদুলের মতো কত কত লুচ্চা আছে, তাদের একটা হিসেব বের করতে বলবেন স্যার। কত খুনি, কত ধান্দাবাজ, কত সুবিধাবাদী, কত হন্তারক-প্রতারক, কত ভূমিদস্যু-জলদস্যু- সারা দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে, তাদের একটা তালিকা হওয়া দরকার। তাহলে দেশ অরাজকতা মুক্ত হবে, সাধারণ মানুষের বউঝিরা ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচবে স্যার।

আমার অনুরোধের সূত্র ধরে আপনি যদি আমাকে ধরিয়ে দেন কী করব?

কিছুই করব না স্যার। বেঁচে থাকার জন্য আমার ভেতর যে দুর্নিবার লোভটি ছিল, তা এখন মরে গেছে স্যার। শোধ নেওয়ার যা, তাতো অনেক আগেই নিয়ে ফেলেছি। এখন মরণে ভয় নেই আমার। বাঁচা আর মরা এখন আমার কাছে সমান স্যার।

যাবেন? আচ্ছা যান স্যার।

ও হ্যাঁ স্যার, ওই গাছতলাতেই থাকি আমি। দিনের বেলা যেখানেই থাকি না কেন, আমার রাতের আশ্রয়স্থল ওই শিরীষতলাটি।

আমি অপেক্ষায় রইলাম স্যার।

কেন? ওই যে আপনি আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেবেন। চল্লিশ বছর ছদ্মবেশে থাকা একজন খুনিকে ধরিয়ে দিয়ে মানুষের কাছে ক-ত বাহবা পাবেন স্যার।

পুলিশ নিয়ে বিকেলের দিকেই আসবেন স্যার। আমাকে পেয়ে যাবেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares