ভ্রমণ : নয়নে আমার বিধি কেন পলক দিয়াছে : উদয় হাকিম

ভ্রমণ

নয়নে আমার বিধি কেন পলক দিয়াছে

উদয় হাকিম

 

ধিরাম বাবু। রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম। তিনি বিখ্যাত হয়েছেন টপ্পার জন্য। বাংলা টপ্পা গান আর নিধিরাম বাবু সমার্থক।

নিধিরাম বাবুর একটা গান আমার খুব প্রিয়। নয়নে আমার বিধি কেন পলক দিয়াছে। অর্থাৎ পলক না থাকলে প্রিয়ার রূপ সৌন্দর্য তিনি অপলক দৃষ্টিতে দেখতে পারতেন। কতটা সৌন্দর্য থাকলে, সৌন্দর্য দেখার চোখ কতটা তীক্ষè হলে, কতটা আবেগ থাকলে প্রিয়াকে একথা বলা যায়! ভিয়েতনাম দেখে, হা লং বে’র সৌন্দর্য উপভোগ করে সেরকমই অনুভূতি আমার।

মানুষ ভালোবাসে প্রকৃতিকে। জন্মগতভাবেই। প্রকৃতির নানান বিষয় তার মধ্যে খেলা করে প্রতিনিয়ত। আর তাই প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি নিরন্তর। কিন্তু সে প্রকৃতি যদি হয় নিখাঁদ সৌন্দর্যের আধার, তাহলে তার কাছে মানুষ আরও নিবেদিত।

প্রায় শান্ত একটি সাগর। তার মাঝে ছোট ছোট পাহাড়। একটা দুটো নয়, শত শত। চুনাপাথরের বৈচিত্র্যময় এসব পাহাড় আর নিচে সাগরের নীল জলই হা লং বে’র সৌন্দর্যের গোপন রহস্য। অনুপম এই সৌন্দর্যের টানেই প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ এখানে ছুটে আসে। শত শত জাহাজে করে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ এখানে আসেন পাহাড়-সাগরের মিতালি দেখতে।

আগের লেখাগুলোতে হা লং বে’র কথা বলেছি। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অংশ এটি। যদি একবাক্যে হা লং বে’র কথা বলি, এটি মানুষের স্বপ্নের মতো একটি জায়গা। যদি বলা হতো আপনাকে সাগর দিলাম, দিলাম ছোট ছোট পুতুলের মতো পাহাড়। এবার কল্পনায় সাজান এর সৌন্দর্য। তাহলে যেরকম হবে, ঠিক সেরকমই একটি ¯পট এটি। সমুদ্রের নীল জলের মধ্যে চুনাপাথরের পাহাড়। যেন স্বপ্নের সুনিপুণ বুনন।

এই জায়গাটির ছবি দেখলেই যে কারও মনে সাধ জাগবে, আহা একবার যদি যেতে পারতাম! হা লং বে’র মায়া যে কাউকে কাছে টানবে। মায়াবতী পাহাড়গুলো হাতছানি দেবেই। এখানে পর্যটক আকর্ষণের জন্য আর কিছুরই দরকার নেই। তারপরও ট্যুর অপারেটরগণ উপভোগ্য করেই সাজিয়েছেন তাদের পরিকল্পনা।

প্রথম দিন জাহাজে ওঠার আগেই চাহিদা অনুযায়ী রুম বরাদ্দ দেয়া হয়। হাতে দেয় রুমের চাবি। জাহাজে উঠেই ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ। লাঞ্চ পার্টিতে গাইড এসে প্রথমে হালকা চালে সবার সঙ্গে পরিচিত হয়। কে কি খেতে চান, সেটা জেনে নেয়। খাবার অর্ডার চলে যায় কিচেনে। গাইড জানায়, দিনের পরিকল্পনা। লাঞ্চের পর চা কফি খেতে খেতে ডেকে বসবেন। জাহাজ চলবে। সঙ্গে চলবে স্বপ্নের ডিঙ্গি। একেকটা পাহাড়-টিলা অতিক্রম করবেন আর অপেক্ষা করবেন আরও সুন্দর কিছুর। নিচে নীল জলের ঢেউ আপনার কল্পনাকে ভাসিয়ে নেবে মন পবনের নায়ে।

বিকেল বেলা বিশাল তিনটি পাহাড়ের কাছে গিয়ে জাহাজ থামে। একটি পাহাড়ে বড় গুহা। গুহার মুখে কয়েকটি ছোট নৌকো। ভেবেছিলাম এটা দর্শনীয় কোনো গুহা হবে। পরে দেখেছি না, এটা এখনও পর্যটকদের যাওয়ার উপযোগী করা হয় নি। অন্য তিনটি পাহাড় আড়াল করে রেখেছে জায়গাটিকে। অনেকটা পোতাশ্রয়ের মতো। খারাপ আবহাওয়া এবং অন্যান্য নিরাপত্তার জন্যই রাত্রি যাপনে এই স্থানটিকে বেছে নেয়া হয়েছে। প্রত্যেক রুমে সাউন্ড বক্স সেট করা। সেখানে ঘোষণা এল বোটিং, স্যুইমিং এবং হাইকিংয়ে যাব আমরা। সবাই নৌকায় চলে আসুন।

আবহাওয়া খারাপ। বৃষ্টি হচ্ছে গুঁড়িগুঁড়ি। জোরে বাতাস বইছে। ছোট বোটে যারাই উঠছে, সবাইকে লাইফ জ্যাকেট পরানো হচ্ছে। আমি পরতে রাজি না। কারণ ভালো সাঁতার জানি। সামান্য দূরত্বেই পাহাড়-টিলা। জ্যাকেট-ঝামেলার দরকার নেই। কিন্তু গাইড নাছোর বান্দা। তাদের নিয়ম, মানতেই হবে। কি আর করা, পরে নিই। বোট যখন ছাড়ে তখন বুঝেছি, জিনিসটার দরকার ছিল। প্রথমত প্রবল ঠান্ডা হাওয়া থেকে কিছুটা রক্ষা। দ্বিতীয়ত জাহাজ থেকে বোঝা না গেলেও বোটে চড়ে বোঝা যাচ্ছে ঢেউগুলো কত বড় বড়!

প্রথমেই যাই একটি বোটিং স্টেশনে। পানির মধ্যেই লোহার স্থাপনা। শেড আছে। টিকিট কেটে ব্যাম্বু বোট ভাড়া নিতে হয়। বোটগুলো প্লাস্টিকের। দেখতে বাঁশের খোলসের মতো। ভেসে থাকে, ডোবে না। এজন্য এরকম নাম হয়তো। একেকটা বোটে দুজন করে রোইং করা যায়। হাতে বৈঠা। এখানেও তিন দিকে পাহাড়। যাতে আনাড়ি নাবিকেরা মিসিং না হয়, জলে ডুবে না যায়।

আবহাওয়া খারাপ। কপাল মন্দ, সেদিনের জন্য বোটিং, স্যুইমিং স্টেশনের কাউন্টার বন্ধ। সাগর অনেকটা উত্তাল হয়ে উঠেছে। কমে আসছে সূর্যের আলো। সবাই যার যার মতো নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে যাচ্ছে। তার মধ্যেও অনেকে বোটিং করছে। প্রায় সবাই ইউরোপিয়ান। ওদের সাহস আছে বটে। এমন ঠান্ডার মধ্যে আমরা তো শীতে প্রায় জমে যাচ্ছি। আর ওরা শর্ট কাপড়-চোপড় নিয়ে কি না বোটিং করছে!

নেদারল্যান্ডস থেকে আসা এনা আর সুজানা কিছুটা প্রতিবাদ করল। প্যাকেজের পয়সাতো আগেই নিয়ে নিয়েছো। তাহলে বোটিং-এর কি হবে? গাইড নিরুত্তর। ঠান্ডা আর উত্তাল ঢেউ দেখে মালয়েশিয়ান দল একে অপরকে স্যুইমিংয়ে যাবার তাড়া দিয়ে মজা করছে। আমি, জাহিদ হাসান, ফিরোজ আলম আর মিল্টন শীতে কাবু। আমরা এখান থেকে যেতে পারলেই বাঁচি বাবা। ফেরার পথে দেখছি তিন/চার বছরের এক শিশুকে ব্যাম্বু বোটে বসিয়ে এক লোক বৈঠা বাইছে। সাদা চামড়ার পর্যটক। আমি হাত নাড়তেই ওরা দুজনেই হাত নেড়ে আমাদের শুভেচ্ছার জবাব দেয়।

বোট থামে খুব উঁচু একটা পাহাড়ের নিচে। শান বাঁধানো জেটি। যেখানে বেশ কিছু ছোট শিপ আছে। আর বোটের সংখ্যা অনেক। অনেক দূর থেকেই পাহাড়টা দেখা যায়। এর চূড়ায় একটা ওয়াচ টাওয়ার। এখানে এসেছি হাইকিংয়ের জন্য। যারা একদিনের প্যাকেজে এসেছে, তাদের জন্য জাহাজ; অন্যদের বোট।

টিকিট নিয়ে হাঁটছি। পাহাড়ের পূর্বপাশ দিয়ে উপরে ওঠার সিঁড়ি। গাইড জানায়, সিঁড়ির ৪০০ ধাপ ভাঙতে হবে। প্রথমেই ডাবের পানি খেয়ে নিই। এরপর উপরে ওঠা শুরু। হাইকিং ওয়ের মুখে একটা সাইনবোর্ড। তাতে লেখাÑ যাদের হৃদরোগের ঝুঁকি আছে, বয়স্ক, রোগাক্রান্ত তারা উঠবেন না। উঠলে দায়দায়িত্ব নিজেকেই বহন করতে হবে। আমি পাত্তা দিই না। এখনও শক্ত সামর্থ জোয়ান। কোনো সমস্যা নেই। প্রথম ধাপ ওঠার পরে একটা বিশ্রামাগার। সেখানে গিয়ে আমাদের নেতা জাহিদ হাসান বসে পড়েন। ‘আপনারা যান, আমি আর যাব না।’ উনাকে ফেলেই আমি উঠতে শুরু করি। কারণ মিল্টন আমাকে আর ফিরোজকে রেখে আগেই উঠে গেছে। সুতরাং না গেলে তার কাছে হেরে যাব!

উঠছি তো উঠছিই। এ পাহাড় যেন আকাশ-ছোঁয়া। শেষ হচ্ছে না। আরও উপরে উঠব কি উঠব না ভাবছি। অনেক খাঁড়া পাহাড়। সিঁড়িগুলো অপ্রশস্ত। খুব রিস্কি। পড়ে গেলেই জঙ্গলে হারিয়ে যেতে হবে। কে আর খুঁজতে যাবে? বিপজ্জনক পাহাড় বেয়ে উঠছি। উঠছি কেবল প্রেস্টিজের ভয়ে। কারণ অনেক বুড়ো মানুষও উঠে যাচ্ছে। কীভাবে যে এরা পারে! ওরা পারলে আমি কেন পারব না। বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে উঠছি। গাইড বেটা ভুল বলেছে। সিঁড়ি ধাপ মোটেও ৪০০ নয়। হাজার ছাড়িয়ে যাবে!

পণ করেছি। ভাগ্যে মরণ লেখা থাকলে থাক। উপরে উঠবই। পায়ে আর কুলাচ্ছে না। রেস্ট নিয়ে নিয়ে উঠছি। অনেকেই ক্লান্ত পায়ে নামছে। কেউ কেউ হাল ছেড়ে নিচে চলে যাচ্ছে। আমি হাঁপাচ্ছি আর উঠছি। একেবারে শেষ ধাপের আগে দুটো জায়গা আছে ছবি তোলার। সেখানে অনেক ভিড়। আর ওই ভিড়ের মাঝেই ছবি তোলায় ব্যস্ত ফিরোজ আর মিল্টন।

আমি উপরে গিয়ে আর নড়তে পারছি না। পা নিথর। মাথা ঘুরছে। বুকে হাপর চলছে। মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে যাবে। একটা বেঞ্চ খুঁজে বসলাম। অবাক ব্যাপার- আমিই বিশ্রাম নিচ্ছি। অন্যরা সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত। সময় নষ্ট করা যাবে না। অন্ধকার হওয়ার আগেই নামতে হবে। পাহাড়ে ওঠার চেয়ে নামা কষ্ট; ব্যাপারটা বুঝেছিলাম রামুর একটি উঁচু পাহাড়ে ওঠে।

আগে চারপাশটা তাকিয়ে দেখি। অদ্ভুত সুন্দর! যতদূর চোখ যায় লম্বা লম্বা টিলা। কোনোটার নিচে ক্ষয়ে গেছে লোনা পানির তোড়ে। চায়ের পেয়ালার মতো বসে আছে। টিলার যেন শেষ নেই। অফুরন্ত সৌন্দর্য! ছবি তুলছি। একপাশে অনেক জাহাজের ভিড়। বোঝা যাচ্ছে, রাতের বেলা জাহাজগুলো এই এলাকায় থাকতেই পছন্দ করে।

কিছুক্ষণ পর ফিরোজ আলমকে খুঁজে পেলাম। এনা আর সুজানার ছবি তুলছে। ওদিকে মিল্টন ব্যস্ত সেলফি নিয়ে। আমি গিয়ে বললাম. আমার ছবি তুলে দাও মিল্টন। প্রথমে সলো। পরে ফিরোজ আলম এসে যোগ দেন আমার সঙ্গে। কিন্তু মিল্টনের ক্যামেরা পজিশন দেখে মনে হয় আমাদের চেয়ে পাশের কিছু তাকে ফোকাস করেছে! পরে দেখেছি, পাশেই একটি সুন্দরী মেয়ে। তাকে সেন্টার করে আমাদের একপাশে রেখে ছবি তুলেছে! কি আর বলব। হাজার হোক জুনিয়র! কিছু বলা যায় না। মনে মনে বলছি, ‘পোলাপান নষ্ট হয়ে গেছে।’ তবে হ্যাঁ, তার দেখার চোখ ভালো! মেয়েটা অনেক সুন্দরী!

ছবি তোলা শেষ। সবাই একসঙ্গে নামছি। একেবারে নিচে এসে জাহিদ স্যারকে বললাম, না গিয়ে ভালো করেছেন। আপনি এক-দশমাংশও ওঠেননি। তারপর শরীর খুব একটা ভালো না। ওয়াইজ ডিসিশন। স্যার খুশি হন। এরপর লালচে বালুময় একটা জায়গায় গিয়ে ছবি তুলি। ওই ঠান্ডার মধ্যেও সেখানে ইউরোপিয়ানরা সাঁতার কাটছে। ওরা পারে বটে!

ওদিকে মিল্টন আর ফিরোজ আবার ছবি তুলছে ওই ডাচদের। ওরা লাফাচ্ছে! ক্যামেরা ক্লিক ক্লিক!

এনা আর সুজানা প্রস্তাব দেয় তোমরা লাফাও সবাই। আমরা ছবি তুলি। কি আর করা। সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে ওয়ান টু থ্রি…।

জাহাজে ফিরে আসতেই জ্বলে ওঠে সান্ধ্য আলো। ডিনারে গাইড এসে জানায় পরের দিনের শিডিউল। সকালে প্রাণায়াম জাতীয় ব্যায়াম। নামটা কি বলেছে মনে নেই। মালয়েশিয়া এবং বিশেষ করে সিঙ্গাপুরে এটার প্রচলন খুব বেশি। সেখানে মিউজিকের তালে তালে দল বেঁধে ব্যায়াম করা হয়।

ভোরে ঘুম ভাঙে। জানালা দিয়ে দেখি শান্ত-সৌম্য-স্নিগ্ধ পাহাড়। ওরা অভিবাদন জানাচ্ছে আমাকে। নমস্য। পাশের জাহাজের ছাদে ৬ জন মহিলা ব্যায়াম করছে। নেতৃত্বে একজন গাইড। শরীর বাঁক খাইয়ে খাইয়ে নাচের মুদ্রায় ব্যায়াম করছে। একটু পর ডাকবে আমাদেরও।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares