ভ্রমণ : প্যারিসের প্রান্তিকে হাল ফ্যাশনের বজরায় : মঈনুস সুলতান

ভ্রমণ

প্যারিসের প্রান্তিকে

হাল ফ্যাশনের বজরায়

মঈনুস সুলতান

নদীজলের চিত্রময় আবহে

প্যারিস থেকে বেরিয়ে পড়েছি আজ। পুরানো একটি বার্জকে কনভার্ট করে বানানো হয়েছে নৌবিহারের শৌখিন বোট। যে জেটি থেকে আমরা এ হাল ফ্যাশনের বজরায় চেপেছিÑ ওখান থেকে সামান্য দূরে সেইন নদীর ঠিক মাঝামাঝি চোখ থেকে টুপ করে ঝরে-পড়া অশ্রু-আকৃতির একটি ছোট্টমোট্ট দ্বীপ। ওখানকার তীব্র সবুজ গাছপালায় বসে আছে একঝাঁক ধবধবে সাদা সিন্ধু-সারস। আমরা বোটে সওয়ার হয়ে যাচ্ছি খানিক দূরের গ্রাম, মাঠ ও মফস্বলি শহরের দিকে। প্রায় ঘণ্টাখানেক হলো ভাসছি সেইন নদীর ভরা জলে। নদীটি প্রস্থে তেমন বড় কিছু না, তবে সুনাব্য, এবং জলের প্রবহমানতায় গতি আছে প্রচুর।

ওপরতলার ডেকের রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়েছিলাম পাড়ে সমান্তরালভাবে চলে যাওয়া পিচঢালা সড়কের দিকে। এদিককার জীবনযাপনে মেগা-মেট্রোপলিটানের বিপুল ব্যস্ততা নেই। মানুষ চলছে ঢিমেতালে। দেখিÑ সড়ক ধরে কথা বলতে বলতে ধীরেসুস্থে বাইসাইকেল হাঁকাচ্ছে দুই তরুণ। তীরে বাঁধা অনেক দিনের ব্যবহারে মলিন দুটি বোট।

আজকের নৌবিহারে আমি একা না। হোটেল ডে আর্টস নামে প্যারিসের যে সরাইখানায় হালফিল আমি দিনযাপন করছি, তাতে বসবাস করা বেশ কয়েকজন পর্যটকের সাথে বোটে আমার চেনা মানুষ গারনেল সাহেব আছেন। হোটেল ডে আর্টসের প্রগ্রাম অরগেনাইজার ফরাসি তরুণী আডেলিনাও আমাদের সাথে চলছেন। নৌভ্রমণের জোগাড়যন্ত্রে তার হাত আছে। যাত্রার থিম নির্বাচনও করেছে সে। প্যারিস থেকে সামান্য দূরে শ দেড়েক বছর আগে বাস করতেন ইমপ্রেশনিস্ট ঘরানার জনাকয়েক নামজাদা চিত্রকর। তাঁরা এঁকে গেছেন বর্ণাঢ্য কিছু জলস্কেপ, নির্জন প্রান্তরের পাস্তর‌্যাল দৃশ্যপট, এবং বাগিচায় প্রস্ফুটিত কুসুমে আলোর রেখা বিন্যাস। আমরা ওদিকে নৌকা ভাসিয়ে যাচ্ছিÑ যে দৃশ্যপটের অভিজ্ঞতায় যাদুময় হয়ে উঠেছিলো তাঁদের ক্যানভাসÑ তা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করতে।

আজ সকালে কী কারণে জানি আমার মধ্যে ফিরে এসেছে ফোয়ারায় উৎসারিত জলধারার মতো উদ্দীপনা। আডেলিনার সঙ্গ পাওয়ার সম্ভাবনাও আমাকে উদ্দীপ্ত করেছে বিপুলভাবে। খুব উৎসাহের সাথে জাভাদ্বীপের দারুণ রঙচঙে একটি বাটিকের সার্ট পরে আজ বোটে সওয়ার হয়েছি।

আমি ঘাড় বাঁকিয়ে ডেকে বসে থাকা সহযাত্রী অচেনা পর্যটকদের নিরিখ করে দেখি। লালচে রঙের সানগ্লাস পরে ক্রুকাট চুলের এক পুরুষ আইপ্যাডে টাইপ করে চলেছেন নিবিড়ভাবে। তার পাশে বসে মোটর সাইকেল জ্যাকেট ও লেদারের স্কিন-টাইট প্যান্ট পরা আফ্রো-ফ্রেঞ্চ নারী চোখে মাসকারা পরতে পরতে চাপছেন হাই। রেলিংয়ে কোমর ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ব্লন্ড চুলের একটি মেয়ে। তার সোনালি কেশে গাঁথা র‌্যাবন সানগ্লাস। আস্তিন গোটানো ব্লেজার পরা এক পুরুষ তার দিকে নজর দিতে গিয়ে তাকে কষে চুমো খান। সে হেসে ভদ্রসন্তানের দুদিনের না কামানো দড়িতে তার করতল ঘষে। তাতে উৎসাহিত হয়ে তিনি তার ভি শেইপের নেকলাইলে ঝুলানো লকেটটি দু’আঙুলে তুলে ধরে পাথরটি পরখ করে তা ঘুরিয়ে ফেলে দেন মেয়েটির পিঠে। তাতে প্রতিবাদ করে সে কাঁধ ঝাঁকায়। ভদ্রসন্তান এবার তার হাত ধরে টেনে নিয়ে চলেন বারের দিকে। ধূসর শেডে ফিকে ফিরোজা রঙের ছোপ দেয়া একটি মিডি ড্রেস পরেছে সে। পুরুষটির শরীরসংলগ্ন হয়ে হাঁটতে গেলে পেছন থেকে তার কোমরকে দেখায় ভিনটেজ ওয়াইন রাখার ডিক্যান্টারের মতো।

একটি ট্রলি ঠেলে নিয়ে আসেন গারনেল সাহেব। তাতে বারবিকিউ-এর সরঞ্জামাদি। তিনি আজ সাজগোজ করেছেন রীতিমতো ফরাসি ফ্যাশনিস্তাদের কায়দায়। সুরকি রঙের ওয়াচকোটের সাথে মাথায় ম্যাচ করে পরা একই বর্ণের হ্যাট। আমার দিকে তাকিয়ে তিনি এমন এক ধরনের ভঙ্গি করেন যে, মনে হয় তার হাতে ধরা আছে ছোট্ট একটি অদৃশ্য ছড়ি। তা দিয়ে মিউজিক ডিরেক্টারের কায়দায় কনসার্ট শুরু হওয়ার ইশারা দিচ্ছেন। আমি তার ওয়াচকোটের পকেটে গোঁজা রুমাল ও চোখে পরা বৃত্তাকার ফ্রেমের চশমার দিকে তাকাই। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশ্যাল ফোর্সের অবসরপ্রাপ্ত সাঙ্গাতকে বুদাপেস্ট থেকে প্যারিসে শরণার্থী হয়ে আসা মিউজিক কন্ডাকটারের মতো দেখায়।

আমার কাছেই পাখির পালক গোঁজা হ্যাট পরে বারস্টুলের উঁচু রিভলবিং চেয়ারে বসেছেন বয়স্কা এক মেমসাহেব। তিনি গ্লাসে আইসকিউবের সাথে হুইস্কি মিশিয়ে বরফে চিড় ধরার শব্দ শুনছেন মনযোগ দিয়ে। তার সাইড-টেবিলে রাখা সিরামিকে তৈরি একটি ফুল। প্রসূনটি দেখতে নারীদেহের জনন ইন্দ্রিয়ের মতো। সম্ভবত তিনি তা কিনেছেন প্যারিসের কোন স্ট্রিট থেকে। ফুলটি এভাবে তৈরির পেছনে নির্ঘাৎ শিল্পশোভন কোনো ব্যাখ্যা আছে। প্যারিসের হাটে-বাজারে আকসার বিক্রি হচ্ছে হরেক রকমের শিল্পদ্রব্য। এখানে কিনতে পাওয়া যায় পল গ্যঁগার তাহিতি দ্বীপের তসবির আঁকা হান্ডি-পাতিল পর্যন্ত। চাইলে সংগ্রহ করা যায় বড়সড় একটি ছাতা,তাতে রোদে ঝলমল করবে খোদ পাবলো পিকাসোর হাতে তৈরি ব্রোঞ্জের লড়াকু ষাড়। বুড়ি মেমের সিরামিকে গড়া ফুলের দিকে আমি নজর দিচ্ছিলাম। তিনি গ্লাস টোস্টের কায়দায় আমার দিকে তুলে ধরে ফোকলা দাঁতে হেসে বলেন, ‘ইজ নট দ্যা ভিউ ম্যাজিক্যাল?’ আমি তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখিÑ ভেসে যাওয়া আরেকটি বোটের জল কেটে তৈরি সফেন তরঙ্গরেখায় রীতিমতো ড্যান্স করছে সূর্যরশ্মি।

আমি আডেলিনার তালাশে খোলা ডেকের এদিক ওদিকে তাকাই। তার সাথে আমার তৈরি হয়েছিল বেশ বড় ধরনের ব্যবধান। গতকাল সে নিজে থেকে আবার কাছে এসেছে। আমরা একসাথে প্যারিসের স্ট্রিটে পোস্টার কিনতে গিয়েছি। তাতে আমাদের মাঝে তৈরি হয়েছে সোনালি একটি সেতু। সে ফিরে আসাতে আমার মনে হয়েছে যেন ফিরে পেয়েছি পিকপকেটে খোয়া যাওয়া ওয়ালেটটি। আমি সিয়েরা লেওনের ফ্রিটাউনে আমার জানাশোনা বন্ধুবান্ধবদের জন্য গিফ্ট হিসবে কিনেছি ইমপ্রেশনিস্ট ঘরানার চিত্রাদির কিছু পোস্টার। পোস্টারগুলো নির্বাচনে সে আমাকে সহায়তা করেছে। আমি নিজের জন্যও কিনেছি ক্লদ মোনে, কমিল পিসারো ও ভ্যানগঘের কয়েকটি পেইনটিংয়ের রিপ্রিন্ট। এগুলো আমি তাকে ধার দিয়েছি বোট সাজানোর জন্য। রিপ্রিন্টের তাড়া নিয়ে নারীটি গায়েব হলো কোথায়?

ডেকের নিরিবিলি কোণে একাকী দাঁড়িয়ে চৌকশ চেহারার এক পুরুষ সোনালি সেক্সোফোনে সুর তুলছেন আফ্রো-ক্যারিভিয়ান জ্যাজের। আডেলিনার চেনা লোক তিনি। বোটে চড়ার সময় জেটিতে হেলান দিয়ে তিনি বাজাচ্ছিলেন ব্লুগ্রাস ঘরানার মিউজিক। সে তাকে আমার সাথে ইনট্রোডিউস্ করিয়ে দেয়। এ জ্যাজ বাজিয়ের নাম আনডিয়ান ফিলাত গিমপু। উনি সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র মলডোবা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আগত অভিবাসী। তার জননী ইউক্রেনের কিয়েভের মহিলা। সংগীতের প্রশিক্ষণ পান তিনি ছেলেবেলা মস্কোতে। কিছুদিন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারফোর্স ব্যান্ডে বাজিয়েছেন ব্লুজ ও কান্ট্রি ওয়েস্টার্ন মিউজিক। ড্রাগসের ঘোরে গাড়ি ড্রাইভ করার অভিযোগে তাকে এয়ারফোর্স থেকে ডিসচার্জ করা হয়েছে। তার বাদনে ছড়াচ্ছে এমন এক ধরনের বিদগ্ধ সুরলহরী যে, চকিতে তুষারময় চাতালে আইসস্কেট করা যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ফিগার স্কেটার ক্রিস্টি আমাগুচির ইমেজ মনে আসে। ক্রিস্টি যে রকম বরফের রিংয়ে চাকওয়ালা জুতা পায়ে সাবলীল ভঙ্গিতে ড্যান্স করে, ঠিক সে রকম মালডোবান এ জ্যাজ বাদকের সুরধ্বনি যেন উদ্বেগে জমে তুষার হয়ে ওঠা আমার মনলোকে আইসস্কেট করে যাচ্ছে।

আমি আডেলিনাকে দেখতে পাই। সে বার্জের দেয়ালে সেলোটেপ দিয়ে লাগাচ্ছে ওলন্দাজ চিত্রকর ভ্যানগঘের ‘বোট’ শিরোনামের একটি চিত্র। এ রিপ্রিন্টটি খরিদ করতে গতকাল সে আমাকে সহায়তা দিয়েছে। তাকে দেখা মাত্র আমার গভীর গহনে ভেসে ওঠে কবিতাপাঠের স্মৃতি। চরণগুলো বোধ করি কবি মহাদেব সাহার রচনা। একটি পঙক্তি আমার চেতনায় নষ্ট পিনের কারণে বারবার বেজে যাওয়া কলের গানের রেকর্ডে একই গানের কলির মতো ঘুরপাক খায়। ভাবি, আজ সে যদি আবার  কাছাকাছি হয়, তাহলে, “অনায়াসে ডিঙ্গাবো এ কারার প্রাচীর/ ছুটে যাবো নাগরাজ্যে পাতালপুরিতে।” আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ঘুরে সে দেয়ালে লাগানো রিপ্রিন্টটি স্মুদ করে। ফ্লোরাল সিল্কের খুব সুন্দর একটি হাফ স্লিভ র‌্যাপ ড্রেস পরেছে সে। মৃদু বাতাসে এপ্রিকট বর্ণের পট্টবস্ত্র বৃষ্টির মিহি ছাটের মতো জড়িয়ে যাচ্ছে নারীটির শেইপলি ফিগারে। আমি তার কাছাকাছি গিয়ে কাঁধে আলতো করে হাত ছোঁয়াই।  চোখ দুটি সামান্য বড় হয়, কী যেন ভাবে,তারপর সে বলে,‘প্যারিসের শহরতলি থেকে সামান্য দূরে যে সব গ্রাম, গমের নিরিবিলি খেতÑ ওসব জায়গায় ভ্যানগঘ খুঁজতেন আঁকাজোকার জন্য পাস্তোর‌্যাল সেটিং।’ আমি জানতে চাই,‘ কয়েকটি নৌকার প্রতিফলন-ঋদ্ধ এ চিত্রটি কী সেইন নদীর পাড় নিয়ে আঁকা?’ সে জবাব দেয়, ‘সেইন থেকে বেরিয়েছে অইসি নামে একটি শাখা নদী, কাছেই,আরও আধ ঘন্টা খানেক, তারপর আমরা ভাসব অইসিতে। নৌকাগুলো আঁকার সেটিং ছিল অইসির নির্জন বালুচর।’ সে গ্রীবা বাঁকিয়ে মন্তব্য করে,‘প্রকরণের নিরিখে এ চিত্রটি পোস্ট ইমপ্রেশনিস্ট ধারার। এর বোল্ড কালার কম্পোাজিশন আমাকে আকর্ষণ করে তীব্রভাবে। বাট আই স্ট্রাগল টু গেট মিনিং আউট অব দিস পেইনটিং। আমার কিন্তু পোস্ট ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকরদের মধ্যে পল সেজনকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ। তাঁর চিত্রকলায়  বর্ণের সাথে তন্ময়তা মিশে গিয়ে সৃষ্টি করে ভাবনাঋদ্ধ আবহ। দিস ইজ হোয়াট আই লাইক এবাউট সেজান সো মাচ। কিন্তু যে রকম নিষিদ্ধ ড্রাগস্ বিভ্রান্ত টিনএজারকে আর্কষণ করেÑ ঠিক সে রকম ভ্যানগঘের বিমূর্ত রেখাবিন্যাস আমাকে বিমুগ্ধ করে বটে, বাট আই ডোন্ট থিংক আই আন্ডারস্ট্যন্ড হিম অল দ্যাট ওয়েল।’

আমি এ আলোচনাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য বলি, ‘আডেলিনা, আমি জানি ইমপ্রেশনিস্ট ধারার চিত্রকলা তোমার খুব প্রিয়। ডু ইউ মাইন্ড এক্সপ্লেইন ইয়োর পার্সপেক্টিভ অন ইমপ্রেশনইজম? আমি এ বিষয় সম্পর্কে তোমার ধারণা প্রথমে শুনতে চাই। তারপর আমি চেষ্টা করব পোস্ট ইপ্রেশনিস্টিক ধারায় সৃজিত ভ্যানগঘের বোট চিত্রটির মর্মার্থ ব্যাখ্যা করতে।’ ‘অলরাইট দ্যান, ইটস্ আ ডিল। প্লিজ আসো আমার সাথে একটু,’ বলে আডেলিনা হেঁটে যায় বার্জের অন্যদিকে বারের কাছাকাছি। ওখানকার দেয়ালে সে একটু আগে লাগিয়েছে ক্লদ মোঁনের আঁকা ‘ইমপ্রেশন সানরাইজ’ চিত্রটির রিপ্রিন্ট। তাতে সূর্যাস্তের স্বর্ণালি রেখা যেন একঝাঁক উজ্জ্বল গোল্ডফিসের মতো নদীজলে ঘাঁই মেরে আলোড়ন তুলছে। আমি অবগত যে, ১৮৬০ সালের দিকে ফরাসি দেশে যখন পয়লা ইমপ্রেশনিস্ট ধারায় আঁকাজোকার সূত্রপাত হয়Ñতখন এ চিত্রের শিরোনাম থেকে চালু হয় ইমপ্রেশনিজম টার্মটি। আডেলিনা চিত্রটির দিকে ইশারা করে যেন চোখে-মুখে মেখে নেয় পট থেকে বিচ্ছুরিত আলোর অলীক কণা। তারপর পবিত্র স্তোস্ত্র উচ্চারণের মতো গাঢ়স্বরে বলে,‘চলমান মুহূর্তের ভিজ্যুয়েল ইমপ্রেশনকে ধারণ করাই এ ফর্মে আঁকা চিত্রকলার প্রধান বৈশিষ্ট্য। চিত্রকর জোর দেনÑকীভাবে আলোর প্রতিফলনে বিবর্তিত হয় দ্রষ্টব্যের আদি বর্ণ, তার ওপর। যেভাবে একটি দৃশ্য দর্শকের চোখে প্রতিভাত হয়,তা কিন্ত চিত্রকর অবিকলভাবে আঁকেন না। বরং তিনি প্রকাশ করেন এ দৃশ্যসঞ্জাত অনুভূতিকে। বর্ণের আবছা স্পর্শে দৃশ্যরূপকে এমনভাবে প্রকাশ করেন যে, তা আদতে দর্শকের চোখে সৃষ্টি করে আলোর মতিভ্রম। দিস ইজ হোয়াট আই থিংক ইমপ্রেশনিজম ইজ অল এবাউট। নাউ ইট ইজ ইয়োর টার্ন ম্যান। আমি শুনতে চাই ভ্যানগঘের চিত্রটির ব্যাখ্যা।’

চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করে আমি ঋজু পদক্ষেপে ফিরে আসি ‘বোট’ শিরোনামের চিত্রকলার কাছে। আডেলিনা উৎসুক চোখে তাকালে আমি চিন্তাভাবনা করে তির ছুড়ি, নৌকাগুলোর রেখাময় কাঠামোর দিকে ইশারা করে বলি, ‘পোস্ট ইমপ্রেশনিস্ট ধারায় জোর দেয়া হয় দৃশ্যের রৈখিক কাঠামোর ওপর। এ-প্রকরণে বর্ণ ব্যবহৃত হয় অত্যন্ত জোরালো স্ট্রোকে, বর্ণ কিন্তু এখানে দৃশ্যকে রিপ্রেজেন্ট করছে না, বরং স্বয়ম্ভুভাবে তৈরি করছে রূপকল্পÑ যা আদতে প্রকাশ করছে চিত্রকরের নিজস্ব ইমোশনকে।’ কথা বলতে বলতে আমি একটু পজ্ নিলে সে অধৈর্য হয়ে জানতে চায়, ‘আই ক্যান ফলো হোয়াট ইউ সেড সো ফার, কিন্ত আমি ব্যাখ্যা চাই, বুঝতে চাই কেন ভ্যানগঘ নদীর চর না এঁকে আঁকলেন হরেক বর্ণের নৌকাগুলো।’ আমি কনফিডেন্টলি জবাব দিই,‘আনসার ইজ ভেরি ইজি। এ ধারার চিত্রকরেরা তাবৎকিছু প্রকাশ করেন প্রতীকী পদ্ধতিতে। এখন দেখা যাক নৌকাগুলোর প্রতীকী তাৎপর্য কী? আমার ধারণাÑ পাড়ে আটকে থাকা নৌকার প্রতীকে ভ্যানগঘ গন্তব্যে পৌঁছতে না পারার বিষয়টির দিকে ইংগিত করছেন। একটি নৌকায় এক নারী ছিপ ফেলেছে জলে, পাশের নৌকায় দাঁড়িয়ে দশাসই পুরুষের আকৃতি, স্পষ্টত সেও অপেক্ষা করছে কোন কিছুর, আর অন্য নৌকায় বসা বিমর্ষ ভাবনায় নিমগ্ন নারীÑ কেবল প্রতীক্ষাই নয়, বরং চিত্রের বিমূর্ত ফিগারটি প্রতীক হয়ে উঠেছে তার অসুখী আত্মার। এবং অন্য নৌকাগুলোর যাত্রীহীনতা তাঁর সময়ের অন্তসারশূন্যতাকে প্রকট করে তুলছে।’

‘ওয়েল সেড ম্যান’, বলে তারিফের দৃষ্টিতে আডেলিনা আমার দিকে তাকায়। সে হাত বাড়িয়ে আমার রঙচঙে বাটিকের সার্টের কুঁচকনো ভাঁজ স্মুদ করে পার্স থেকে বের আনে একটি মেয়েলি হেয়ার ব্রাশ। তা বাতাসে এলোমেলো হয়ে আসা আমার চুলে চালিয়ে মৃদুস্বরে বলে,‘ইউ লুক লাইক আ কালারফুল কাকাতুয়া টু-ডে।’ আমি তার রঙিন ঠোঁটের দিকে ইশারা করে ফিসফিসিয়ে বলি,‘দে লুক স্ট্রোবেরি সুইট।’ ভ্রƒকুটি করে নিমেষে তাতে পাউটি ভাব ফুটিয়ে তুলে সে বলে,‘উই আর পাসিং থ্রু আ ভেরি সিনিক হিসটোরিক্যাল প্লেস। চল, এক সাথে দাঁড়িয়ে ভারননের ভুয়েক্স মোলিন নামে ভিলাটির দিকে তাকাই।’

আমরা পরস্পরের হাত ধরে কয়েক কদম হেঁটে ডেকের রেলিংয়ের পাশে এসে দাঁড়াই। ¯্রােতজলে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যযুগে তৈরি একটি ব্রিজের ভাঙারোঙা কয়েকটি খাম্বা। তাতে গজিয়েছে সবুজ গাছপালা ও ঝোপঝাড়। ব্রিজের খানিকটা অংশ এখনও টিকে আছে। তার শেষ প্রান্তে নদীজলে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে মূলত কাঠ ও খানিকটা চুনসুরকিতে তৈরি একটি সুদর্শন ইমারত। হুইস্কির গ্লাস হাতে রেলিং এর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন বয়স্কা মেমসাহেব। আডেলিনা কয়েকটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকা ফটোজেনিক অট্টালিকাটির দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, ‘লুক অ্যাট দিস ম্যাগনিফিসিয়েন্ট আর্কিটেকচার।’ মেমসাহেব অপসৃয়মান দালানের দিকে গ্লাস তুলে ধরে বলেন, ‘আই অ্যাম সিম্পলি ক্যাপটিভেইটেড্ বাই ইটস্ চার্মস।’

তন্ময় হয়ে তাকিয়েছিলাম সেইন নদীর বাঁকে ক্রমশ আড়ালে চলে যাওয়া ভারননের ভুয়েক্স মোলিন নামের দৃষ্টিনন্দন ভিলাটির দিকে। হাত ছাড়িয়ে নেয় আডেলিনা। আমি ফিরে তাকালে সে দৃষ্টিতে কেমন যেন ব্যাকুলতা ছড়িয়ে বলে, ‘আই রিয়েলি হ্যাভ টু গো। তোমাকে তো বলেছি আমার বিশেষ বন্ধু রেমন্ড মিলারের কথা। বেচারা একা একা বসে আছে নিচের কেবিনে।’ আমি জানতে চাই,‘তার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেবে না আডেলিনা?’ সে কেবিনের সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে বলে, ‘আমি তাকে তোমার কথা বলেছি, নো নিড ফর আ ইনট্রোডাকশন। সে আমার টেলিফোনে তোমার ছবি দেখেছে। তুমি পরে নেমে এসে তার সাথে কথা বলো, হি ইজ আ সুপার কুল গাই। সে পছন্দ করে মেডিটেশন। তুমি এ প্রসঙ্গ নিয়ে তার সাথে আলাপ করতে পারো। ও-কে, দেন।’

বার্জ ভারনন এলাকা ছেড়ে ভেসে যাচ্ছে শাখানদী অইসির দিকে। আজকের এ নৌযাত্রার প্রস্তুতি হিসাবে আমি গতকাল ইমপ্রেশনিজম নিয়ে রচিত কয়েকটি চটি বই-পুস্তক ঘেঁটেছি। একটি তথ্য মাছের ঘাঁই এর মতো ঝিলিক পারে স্মৃতিতে। চিত্রকর ক্লদ মোনে ঠিক এ জায়াগায় দাঁড়িয়ে ১৮৮৩ সালে এঁকেছিলেন ‘হাউস অন দি ওল্ড ব্রিজ অ্যট ভারনান’ নামে অসাধারণ একটি চিত্র। এর একটি রিপ্রিন্ট কেনা হয়নি বলে মনে একটু খেদ হয়। তখনই মনে হয়, এখান থেকে অনায়াসে চলে যাওয়া যায় জিবারনি বলে যে জায়গায় ক্লদ মোঁনে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর ওয়াটার গার্ডেন। যেখানে জাপানি কেতায় তৈরি বাঁকানো পুলের নিচে ফুটতো গোলাপি শাপলা-শালুক। যা নিয়ে আঁকা চিত্রগুলোর কয়েকটি এখন শোভা পাচ্ছে নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টসে। প্যারিসে আমার বসবাসের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। দুএক দিনের মধ্যে আমি রওয়ানা হবো ইতালির ভিনতেমিলিয়া শহরের দিকে। জিবারনির ওয়াটার গার্ডেনে যাওয়ার সুযোগ আর হবে না ভেবে খিন্ন লাগে।

আমি হেঁটে ফিরে আসি বারের কাছে। ক্লদ মোঁনের ‘ইমপ্রেশন সানরাইজ’ চিত্রটির সামনে দাঁড়িয়ে আমি তাঁর কথা ভাবি। ফরাসি চিত্রকলার এ পুরোধা পুরুষ ভালোবাসতেন আউটডোরে কাজ করতে। নিসর্গে আলোর ক্রমাগত বিবর্তনের প্রতিচ্ছায়া তাঁর রেখায় ছড়াতো মায়াবী বর্ণের ইন্দ্রজাল। তিনি ভুগতেন মারাত্মক ডিপ্রেশনে। ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে তিনি ধ্বংশ করেন তাঁর অনেকগুলো চিত্র। আমি এ মুহূর্তে আমার গভীর গহনে বয়ে চলা জলজগুল্মে স্লথগতি ঝোরার মতো ফ্রাস্ট্রেশন নিয়ে প্রতিফলন করি। আমার ব্যর্থতা ও অপ্রাপ্তি কী তাঁর চেয়েও প্রকট?

 

বয়স্ক হিপি রেমন্ড ও চিত্রকর ভেরোনিকা

আনডিয়ান ফিলাত গিমপু সেক্সোফোনে এবার বাজাচ্ছেন বলেরো মিউজিক। তাতে বার্জ-যাত্রীদের দেহমনে খেলছে নৃত্যপ্রবণ উচ্ছ্বাস। খানিকক্ষণ আগে আমার ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ থেকে কিনে আনা সমুসা ও  পাকোড়া বিতরণ করা হয়েছে। তা খেয়ে কেউ কেউ আমার দিকে তারিফের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ঝালমশলায় জেরবার হয়ে পান করছেন ওয়াইন বা বিয়ার। আডেলিনা বার সামলাচ্ছে, সে পরিবেশন করছে ফেনা উপচানো বিয়ার। সাথে সাথে আবার বলেরো মিউজিকের সাথে শরীরের ছন্দ মিলিয়ে ড্যান্স করছে হাল্কাচালে। বেলা পড়ে আসছে। সূর্যের তেরছা রশ্মি পড়ে আডেলিনার ত্বকে খেলছে জাফরানি আভা।

বার্জ নীরবে এসে ঢুকে অইসি নদীতে। একেবারে ছোট নয় শাখানদীটি। তবে ¯্রােতে তেজ নেই তেমন। আমি চোখে আউল সার্কল শেইপের রোদ-চশমাটি লাগিয়ে বহমান জলধারার দিকে তাকাই। ধবধবে সাদা কয়েকটি বড়সড় ভাসমান হাঁসের শুভ্র পালক মুহূর্তে বিবর্তিত হয় বেগুনি জোৎ¯œায়। আমি নদীটির শান্ত সমাহিত পাড়ের দিকে তাকাই। ছোট্ট এক ভাসমান জেটি, তাতে বাঁধা কেবল মাত্র একটি নৌকা। আমি হেঁটে বার্জের পিছন দিকে চলে আসি।  আমাদের বিশাল বজরাকে সাবধানে পাশ কাটিয়ে সামনে বাড়ে ছ্ট্টো একটি পানতুন বোট। তার ছাদে বসে বিকিনি পরা দুটি মেয়ে কী কারণে জানি হেসে লুটোপুটি হচ্ছে। আমি চোখে বাইনোকুলার দিয়ে তাদের খুঁটিয়ে দেখতে গেলে তারা বিষয়টি নজর করেÑ একটি মেয়ে খুব বন্ধুভাবে জোরে জোরে হাত নাড়ে। অন্য মেয়েটির ছুড়ে দেয় উড়ন্ত চুমো। তাদের চেহারা-সুরত দেখে কেন জানি মনে হয় মেয়ে দুটি যমজ বোন। তাদের হাল্কা বোটটি দ্রুত চলে যায় বেশ দূরে।

আমি সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসি নিচের লেয়ারের কেবিনে। আডেলিনার বিশেষ বন্ধু রেমন্ড মিলার জানালার পাশে আরামদায়ক সিটে কুশন হেলান দিয়ে বসেছেন। তার পনিটেইলের দুপাশে বটগাছের জুরি-নামা শিকড়ের মতো ব্রেইড করা দীর্ঘ চুলের একাধিক গুচ্ছ। চোখে হাইপাওয়ারের চশমাটি গড়িয়ে পড়তে পড়তে আটকে আছে নাকের ব্রিজে। রেমন্ডয়ের এক পাশে বসেছেন ক্রুকাট চুলের শক্তপোক্ত পুরুষটি। তার কপালে আটকে আছে লালচে শেডের সানগ্লাস। অন্যপাশে বসেছেন মোটর সাইকেল জ্যাকেট ও লেদারের স্কিন-টাইট প্যান্ট পরা আফ্রো-ফ্রেঞ্চ নারীটি। রেমন্ডের হাতে ধরা পুরানো ঝুরঝুরে একখানা ভারি পিকচার অ্যলবাম। তিনি তার দুপাশে বসা পুরুষ ও নারীকে ছবিগুলো কীসের তা বুঝিয়ে বলছেন।

রেমন্ডের পায়ের কাছে ফ্লোরে বসে একটি যুবতী মেয়ে মনোযোগ দিয়ে আঁকছে তাঁর প্রতিকৃতি। আমার দিকে তাকিয়ে সে মৃদু হাসে। স্পেন থেকে প্যারিসে আগত এ অভিবাসী চিত্রশিল্পীর নাম ভেরোনিকা। নৌভ্রমণের ঘোষণা দিয়ে কয়েকদিন আগে আডেলিনা সম্ভাব্য যাত্রীদের কাছে পাঠায় একটি তথ্যবহুল ইমেইল। তাতে ভেরোনিকার বিস্তারিত পরিচয় দেয়া আছে। ভেরোনিকা একশ ইউরোর বিনিময়ে নৌযাত্রীদের পোর্ট্রটে করে দেয়। তবে কী আডেলিনা তাকে রেমন্ডের পোর্ট্রটে আঁকার অনুরোধ করেছে? রেমন্ডের চেহারা অবশ্য পোর্ট্রেেট খুলবে দারুণ। আবহাওয়াবিধৌত রেখাবহুল মুখ, কুঁচকানো কপাল ও রুদ্রাক্ষের মালায় তাঁকে দেখাচ্ছে বাউলের মতো বিদগ্ধ। ভেরোনিকা আঁকতে আঁকতে উসখুস করে আমার দিকে তাকিয়ে আই কন্টাক্ট করে মৃদু স্বরে বলে, ‘তুমি চাইলে আমি একটু পরে তোমার পোর্ট্রটে এঁকে দেবো।’ আমি এ প্রস্তাবে তেমন একটা উৎসাহ দেখাই না, তবে ধন্যবাদ দিয়ে তাকে অবলোকন করি। হিস্পানিক এ নারী তার উর্ধাঙ্গে যা পরেছ তা পোশাকের জগতে বাস্টিয়ার বলে পরিচিত। অত্যন্ত ক্লোজ ফিটিং স্ট্র্যাপলেস টপ পরার ফলে তার ভরাট স্তন যুগল যেন শরীরী লাস্যে বিস্ফোরিত হচ্ছে থেকে থেকে। আমার দৃষ্টিকে বোধ করি উৎসাহিত করার জন্য সে অত্যন্ত মোহাষ্টিভাবে হেসে ফিরে যায় পোর্ট্রটে স্কেচে।

আডেলিনার ই-মেইলে এটাচড্ করে দেয়া ছিলো ভেরোনিকার ছোট্ট বায়ো। তা থেকে জেনেছি যে, মেয়েটির জন্ম হয় স্পেনের এক মফস্বল শহরের ব্রথেল সংলগ্ন নেইবারহুডে। তার বাবা কোন না কোন ক্রাইমে লিপ্ত হয়ে প্রায়শ বাস করতেন কারাগারে। ভেরোনিকার মায়ের মৃত্যু হয় ড্রাগসের অভারডোজে। গৃহহীন হয়ে বালিকা ভেরোনিকা রাত কাটাতো অর্ধেক তৈরি হওয়া একটি পড়ো দালানে। শহরের একটি ফোয়ারাতে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসাবে পর্যটকদের ছুড়ে দেয়া ভাংতি পয়সা সে তুলে নিতো গার্ডদের অগোচরে। মাঝে মাঝে সেক্সওয়ার্কাররা তাকে খুচরা টাকা দিয়ে পাঠাতো কনডম বা ড্রাগস্ কিনতে, তাতেও ভেরোনিকার কিছু রোজগার হতো। তার বায়োতে মেয়েটি কীভাবে ছবি আঁকা শিখলো, বা কেন প্যারিসে আসলোÑ এ বাবদে কোন তথ্য নেই।

আমি ভেরোনিকাকে পাশ কাটিয়ে আরও দুস্টেপ সামনে বাড়তেই অ্যালবামের ছবি দেখানো বন্ধ করে রেমেন্ড চোখ তুলে আমার দিকে তাকান। তখন খুব কাছ থেকে তাঁর মুখের রানডাউন হালত দেখে বুঝতে পারিÑ মানুষটি ভুগছেন ক্রনিক স্বাস্থ্যগত সমস্যায়। তবে তিনি খুব সুন্দরভাবে হেসে বলেন,‘সুলতান, কাম এন্ড জয়েন আস।’ তিনি উইন্ডোসিল কাউচের পাশে পড়ে থাকা মোড়ার মতো ফোমের গদি লাগানো স্টুল দেখিয়ে দেন। আমি তা টেনে বসে পড়লে তিনি অ্যলবামের দিকে ইশারা করে বলেন,‘এরা আমাদের জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে চাইছে। হিপি হিসাবে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কোথায় কীভাবে খুব স্বল্প ব্যয়ে বসবাস করতাম তার ছবিগুলো এদের দেখাচ্ছি। আই হোপ ইউ উইল ফাইন্ড দিজ পিকচারস্ ইন্টারেস্টিং অ্যজওয়েল।’ আমি ‘অবকোর্স’, বলে আগ্রহ দেখাই, আর খেয়াল করি দুটি বিষয়; কথা বলতে বলতে রেমন্ডের মুখের মাংশপেশি কাঁপছ অল্প অল্প। তবে কি তার শরীরে ফুটছে পার্কিনসন ডিজিজের আলামত? অন্য যে বিষয়টি নজরে পড়ে তা হচ্ছে, রেমন্ডের চোখে আসাধারণ দীপ্তি। ক্রমাগত মেডিটেশন করার ফলে মানুষের চোখে আসে শান্ত সমাহিত ভাব। কিন্তু রেমন্ডের চোখ দুটি যেন পলকে দেখে নেয় দ্রষ্টব্যের তাবৎ ডিটেল। রূপালি টোপাজ পাথরে ঠিকরানো আলোর মতো তার বিচ্ছুরিত দীপ্তির দিকে সরাসরি তাকালে আচ্ছন্ন লাগে? তবে কী রেমন্ড প্র্যাকটিস করেন সম্মোহনের?

তিনি সাদাকালো ছবিগুলো দেখাতে দেখাতে গল্প বলার ভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেনÑ তাঁর ও তাঁর স্ত্রী জুডিথ মিলারের দিনযাপনের বৃত্তান্ত। আমরা দেখি বনানীর প্রান্তিকে পড়ে থাকা ভাঙ্গারোঙ্গা স্কুলবাসের ভেতর পাতা তাঁদের সংসার। পরের ছবিতে তিনি দেখানÑ দীর্ঘ এক ম্যাপল গাছের তিনটি ডালকে ভিত্তি করে তৈরি তাঁদের ট্রিহাউস। তখন গাছের খোঁড়লে বাস করা শাবকসহ এক জোড়া পাখির সাথে তাঁদের সখ্য হয়। আমরা ছবিতে পাখি-দম্পতিকে তাঁর কাঁধে বসে থাকতে দেখি। তাঁর স্ত্রী জুডিথ শাবক দুটিকে ড্রপার দিয়ে বোধ করি বেবীফুড খাওয়াচ্ছেন। পরের ফটোগ্রাফস্গুলো আরও ইন্টারেস্টিং। একটিতে তাঁদের জলপ্রপাতের নিচে ¯œানের দৃশ্য। অন্যটিতে তাঁরা বাস করছেনÑ জলাভূমির কিনারে পড়ে থাকা জংধরা অকেজো একটি বোটে।

লালচে শেডের সানগ্লাস পরা পুরুষ ও লেদারের স্কিন টাইট প্যান্ট পরা আফ্রো-ফ্রেঞ্চ নারী রেমন্ডকে বিদায় জানিয়ে উঠে পড়লে তিনি আমার দিকে মনোযোগ দেন। হাত বাড়িয়ে আমার কব্জি চেপে ধরে বলেন, ‘মঁশিয়ো সুলতান, হাউ ওয়ান্ডারফুল দ্যাট ইউ কেইম ডাউন টু সে হ্যালো টু মি। আডেলিনা তোমার কথা আমাকে বলেছে, তুমি সিয়েরা লেওনে জানের রিস্ক নিয়ে ইবোলা রুগিদের মাঝে কাজ করছো। আই রিয়েলি অ্যাডমায়ার ইয়োর ওয়ার্ক।’ কথা বলতে বলতে আবেগে তাঁর গলার স্বর কাঁপে। আমি স্পষ্ট অনুভব করি,তাঁর বক্তব্যে কোন কপটতা নেই। তিনি আবার বলেন,‘আমার বুকে কফ জমে আছে, ডেকের খোলা হাওয়ায় বসতে পারি না। তো, তুমি যখন নিচে নেমে এসেছো, প্লিজ স্টে উইথ মি আ লিটল বিট।’ মানুষটির উষ্ণ আন্তরিকতায় আমি সাথে সাথে তাঁকে পছন্দ করি। একটু বিস্মিত হইÑ আডেলিনার সাথে তাঁর প্রগাঢ় বন্ধুত্বের কারণে আমার মাঝে কোনো জেলাসি তৈরি হচ্ছে না দেখে।

আমি অবগত যেÑতাঁর স্ত্রী জুডিথ যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপালেচিয়ান ট্রেইলে হাইক করতে গিয়ে পথ হারিয়েÑবাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে তেরো দিন পর মৃত্যুবরণ করেন। আমি এ প্রসঙ্গের উল্লেখ করে বলি, ‘মঁশিয়ো রেমন্ড, আই অ্যাম সো সরি, অনেস্টলি সরি দ্যাট… কী বলব, এ ধরনের একটি দুঃখজনক ঘটনা আপনার জীবনে ঘটেছে।’ তিনি মনোযোগ দিয়ে আমার সহানুভূতিসুচক মন্তব্য শোনেন। তারপর মৃদুস্বরে বলেন,‘ভালোই হলো জুডিথের বিষয়টি তোলাতে। খুবই ভালো হাইকার ছিল সে। কিন্তু তার সেন্স অব ডিরেকশন ছিলো মারাত্মকভাবে দুর্বল। শপিং মলে একা বাজার করতে গেলে সে বেরিয়ে আসার গেট খুঁজে পেতো না। পার্কিংলটে নিজের গাড়ি খুঁজে পাওয়া তার জন্য চ্যালেঞ্জ ছিলো। তো অ্যাপালেচিয়ান ট্রেইলে সে পথ হারিয়ে চলে যায় মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে। হার ডেথ ওয়াজ স্যাড এন্ড ট্রাজিক, কিন্তু কীভাবে বিষয়টি ঘটেছিলো যুক্তি দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা যায়।’ শুনতে শুনতে আমি বলি, ‘জুডিথ কি মাঝে মাঝে এরকম একা হাইক করতে যেতেন?’ রেমন্ড জবাব দেন, ‘রেয়ারলি, তোমাকে আসল বিষয়টা খুলে বলা যায়। হাইকিং ট্রেইলে দেখা হওয়া সুদর্শন পুরুষের প্রেমে পড়ার স্বভাব ছিলো জুডিথের। তো কারও আকর্ষণে মজলে সে আমার সাথে জোরালো ঝগড়া বাঁধিয়ে একা চলে যেতো বনানীতে। এবং কিছুদিন পর সাময়িক মায়াজাল কাটলে সে আবার ফিরে আসতো আমার কাছে। এভাবেই তো কেটেছে আমাদের একত্রিশ বছরের বহেমিয়ান ধারার দাম্পত্য জীবন।’ আমি এবার সরাসরি জানতে চাই, ‘জুডিথের অ্যাপালেচিয়ান ট্রেইলে একা হাইক করতে যাওয়ার পেছনে অন্য কোন পুরুষ জড়িত ছিলো কি?’ তিনি মুখে উদ্বেগ ফুটিয়ে তুলে বলেন, ‘ইটস্ অ্যা ফ্যাক্ট দ্যাট…আমার সাথে ঝগড়া করে সে অ্যাপালেচিয়ান ট্রেইলে একা হাইক করতে যায়। সে ফিরে না আসাতে সপ্তাহখানেক আমি তার কোন খোঁজখবর করিনি। ভেবেছিলাম, সে হয়তো ভিন্ন কোনো পুরুষের সন্ধান পেয়েছে…তারপর তো সে হারিয়ে গেল চিরতরে। বছর দেড়েক পর ট্রেইলের রেঞ্জাররা তার কংকাল খুঁজে পায়। সাথে পাওয়া যায় তার সেলফোন ও হাইকিং লগ্। সেল থেকে হারিয়ে যাওয়ার সংবাদ জানিয়ে সে আমাকে, পুলিশ ও ফরেস্ট রেঞ্জারদের অনেকবার ফোন করে ও টেক্সট্ ম্যাসেজ পাঠায়। কিন্তু নেটওয়ার্ক এরিয়ার বাইরে চলে যাওয়ার কারণে সে কিছুতেই যোগাযোগ করতে পারছিলো না। হাইকিং লগে ক্রমাগত মৃত্যুর দিকে চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা সে লিখে গেছে। আমার কাছেও লিখে গেছে দীর্ঘ তিনটি চিঠি। লগের উপরে স্পষ্টভাবে লিখে গেছে যেÑ যদি কখনও তার দেহাবশেষ পাওয়া যায়, তাহলে তা যেন আমার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়।’

পুরো কাহিনি শুনে আমি কি বলবো ঠিক বুঝতে পারি না। রেমন্ড ক্রিনান্স ট্যবাকোর কৌটা খুলে আমার দিকে তাকান। তাঁর টোপাজ পাথরের মতো দ্যুতিময় চোখে চোখ রাখা কঠিন হয়। মনে হয়, তিনি  শুধুমাত্র তাঁর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দিয়ে আমার অন্তস্থল থেকে গোয়েন্দার নিপুণ দক্ষতায় বের করে নিতে পারেন সিক্রেট তথ্যাদি। রেমন্ড রোলিং পেপার বের করে মারিয়ুয়ানার সাথে ট্যবাকো মিশিয়ে জয়েন্ট তৈরি করতে করতে বলেন,‘ জুডিথের দেহাবশেষ সৎকার করার পর কেবলই মনে হতোÑ আমার একত্রিশ বছরের হাইকিং সাথীর মৃত্যু হলো আমার সাথে ঝগড়া উপলক্ষ করে। আমি তার সাথে মনোমালিন্য মেটানোর আর কোন সুযোগই পেলাম না। তুমি বোধ হয় শুনেছোÑ আমি শৌখিন অর্কিড কালেক্টারদের সোসাইটির সদস্য। ওখানেই আডেলিনার সাথে আমার যোগাযোগ। আমি যখন জুডিথের কথা ভেবে খুব ডিপ্রেসড্ বোধ করছিলাম, তখন আডেলিনা আমাকে মানসিকভাবে হেল্প করে।’ রেমন্ড রোলিং পেপারে জিব ছুঁয়ে জয়েন্টটি ক্লোজ করে বলেন, ‘দেন ওয়ান ফুল মুন নাইট, আমি আ্যপালেচিয়ান ট্রেইলে যে পথ ধরে জুডিথ হাইক করতে গিয়েছিল ওখানে হাইক করতে যাই। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে বসে ছিলাম একটি প্রকা- রকের উপর। চারদিকের পাইনবন ভেসে যাচ্ছে চাঁদের আলোয়। তখন আমি প্ল্যানচেটে নক করতেই তাকে পেয়ে যাই। এন্ড বিলিভ মি, উই টকড্ ব্যাক এন্ড ফোর্থ সিন্স দেন। আমাদের ঝগড়াঝাটি মিটে গেছে। নাউ উই আর ফ্রেন্ড এগেইন। মাঝে মধ্যে জুডিথের সাথে আমার কথাবার্তা হয় প্ল্যানচেটে। আডেলিনা বয়সে অনেক ছোট হলেও সে জুডিথের পরিচিত মেয়ে। তার সাথে আমার বন্ধুত্বে জুডিথের কোন আপত্তি নেই।’

আডেলিনার সাথে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠাতে আমি রেমন্ডকে আন্তরিকভাবে কংগ্রাচুলেট করি। তখনই অনুভব করি, দূর থেকে তিনি যেন আমার ইচ্ছাশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। ঠিক বুঝতে পারি নাÑকীভাবে তাঁর অদৃশ্য প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে আসব। তখনই তিনি আমার দিকে জলন্ত জয়েন্টটি বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘আডেলিনা ইজ অ্যা ওয়ান্ডারফুল ওয়োম্যান, আই রিয়েলি এনজয় হার কম্পেনি।’ ‘শি ইজ ইনডিড লাভলি,’ বলে আমি জয়েন্টে পাফ দিই। তিনি আমাকে পর্যবেক্ষণ করছেন, এটা বুঝতে পেরে আমি সতর্কভাবে চোখ সরিয়ে ফ্লোরে বসে আঁকতে থাকা হিস্পানিক পেইন্টার ভেরোনিকার দিকে তাকাই। সে আমার ওপর থেকে দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়, তবে তার ঠোঁটে ঝুলে থাকে ইনভাইটিং হাসি। ভেরোনিকা নীরবে রেমন্ডের পোর্ট্রেেটর উপর তুলিতে বুলাচ্ছে রঙের পরত। আমার দৃষ্টি তার শরীর, আধেক উন্মোচিত বক্ষদেশ ও ব্রাশ ধরা হাত ছাড়িয়ে চলে যায় রঙের টেক্সচারের ওপর। তাতে রেমন্ডের চোখমুখে ক্রমশ ফুটছে সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব।

জয়েন্টটি শেষ হতেই ‘আবোঁয়া’ বলে রেমন্ডের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি চলে আসি বার্জের নিচের তলার নিরিবিলি ডাইনিং হলে। তার কাউন্টারের উপর পা ঝুলিয়ে বসে লেদারের স্কিন টাইট প্যান্ট পরা আফ্রো-ফ্রেঞ্চ নারীটি। পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে ক্রুকাট চুলে লালচে শেডের সানগ্লাস গাঁথা তার পুরুষ। তিনি নারীটির পা থেকে ধীরে ধীরে টেনে খুলছেন মোজা। তাদের অতিক্রম করে আমি চলে আসি গ্লাস উইন্ডোর কাছে। তাকিয়ে দেখি পাশ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে পাল খাটানো একটি সেইল বোট। তার ছাদে ডেকচেয়ারে আধশোয়া হয়ে হোল্ডারে সিগ্রেট ফুঁকছেন এক শে^তাঙ্গিনী। স্ট্রাইপ সেইলার জার্সি পরা এ নারীর হাবভাব মনে করিয়ে দেয়- অনেক বছর আগে সিনে ম্যাগাজিনে দেখা ব্রিজিত বার্দোর বিখ্যাত ‘রিভ্যেরা মুড লুক’ এর কথা।

অচেনা পারফিউমের সুরভি ছড়িয়ে কাছে এসে দাঁড়ায় ভেরোনিকা। উচ্চতায় খানিক খাটো সে। তাই ঝুঁকে তার দিকে তাকাতেই সে আরও কাছে ঘন হয় আসে। তার উষ্ণ নিঃশ^াস আমার পাঁজর ছুঁয়ে গেলে আমি জানতে চাই,‘হাই কিটেন, হোয়াটস্ আপ?’ সে ফিক করে হেসে আহ্লাদী ভঙ্গিতে বলে,‘সুগার, আই নো ইউ ওয়ানা প্লে উইথ মাই বুবস্ ।’ সে চোখে চোখ রাখলে আমি আস্তে করে তার কোমরে হাত রাখি। এতে কোন আপত্তি না করে সে ফিসফিসিয়ে বলে,‘ হেই সুগার, আই মাস্ট টেল ইউ সামথিং স্ট্রেট্…।’ আমি,‘গো এহেড কিটেন,’ বললে সে জানায়,‘আই অ্যাম সো সরি, ইউ নো..আই অ্যাম নট রিয়েলি ইয়োর টাইপ।’ নখরামিতে একটু বিরক্ত লাগে, বলি,‘হোয়াটস্ রং উইথ ইউ?’ আবিষ্ট হাসিটি ফিরে আসে ভেরোনিকার ঠোঁটে। সে তা বজায় রেখে বলে,‘ লিসেন, আই এনজয় প্লেয়িং উইথ গার্লস।’ খুব একটা অবাক হই না, তবে জানতে চাই,‘সো, হোয়াই ইউ কেইম হিয়ার?’ কোনো সময় নষ্ট না করে সে জবাব দেয়,‘জাস্ট টু টেল ইউ সুগার…ইউ হ্যাভ আ ভেরি এট্রাকটিভ ফেইস স্ট্রাকচার। পোর্ট্রেট তোমার মুখে ফুটবে দারুণ এক্সপ্রেশন। আই হ্যাভ আ ডিল ফর ইউ। হানড্রেড ইউরো তোমাকে দিতে হবে না। তুমি পোর্ট্রটে আঁকাতে চাইলে আমি ফিফটি ইউরোতে তা এঁকে দেবো।’ আমি তেমন একটা আগ্রহ না দেখিয়ে বলি,‘ ও-কে কিটেন, আই উইল থিংক এবাউট দিস। আমি বিষয়টা ভেবে দেখছি।’ ডিসয়েপোয়েন্টেড হয়ে ফিরে যেতে যেতে ভেরোনিকা কোমরে দোল তুলে গ্রিবা বাঁকিয়ে বলে,‘ কিপ স্ক্রুইং ইয়োর থিংকিং সুগার।’

তার মন্তব্যে আমি বিষণ্নবোধ করি। মনে হয় বজরায় চড়ে নৌভ্রমণে এসে দেখা হলো অনেকের সাথে,কিন্তু মনে মনে আমি যেন কী একটা প্রত্যাশা করে এসেছিলাম, তা পাইনি বলে দারুণ খিন্ন লাগে। খানিক শূন্যতা নিয়ে নীরবে হেঁটে আমি সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসি উপরের ডেকে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares