প্রবন্ধ : প্রমিত বাংলা ও বাংলাদেশ : শ্রীদেবেশ রায়ের সুপারিশ : পবিত্র সরকার

প্রবন্ধ

প্রমিত বাংলা ও বাংলাদেশ :

শ্রীদেবেশ রায়ের সুপারিশ

পবিত্র সরকার

শ্রীদেবেশ রায় বাংলাভাষায় অগ্রগণ্য সাহিত্যিক, আমার অগ্রজ, ফলে তাঁর লেখার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমি তাঁর প্রতি কোনও অশ্রদ্ধা প্রকাশ যাতে না করি সে বিষয়ে আমি প্রাণপণ সতর্ক থাকব। তাঁর সৃষ্টিশীল এবং মনোগত কাজকর্মের জন্য আমি বাঙালি হিসাবে তাঁর কাছে আর সকলের মতোই প্রভূত পরিমাণে ঋণী। তবু কলকাতার মননশীল পাক্ষিক কাগজ আরেক রকম (মূলত শ্রদ্ধেয় অশোক মিত্রের উদ্যোগে প্রকাশিত, এখন সম্পাদক কুমার রানা)-এর উৎসব সংখ্যায় (২০১৬) প্রকাশিত ‘প্রমিত বাংলায় ভুল ভুলাইয়া’ নামক লেখাটিতে, যেটি তিনি ঢাকায় পান্থজনের সখা নামক একটি পত্রে হায়াৎ মামুদের ‘কথা লেখা’ প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন বলে জানাচ্ছেন, তাতে তাঁর আত্মজীবন-সংক্রান্ত অংশটি বাদ দিয়ে বাকি প্রাসঙ্গিক নানান কথার প্রতিবাদ তো নাচার হয়েই করতে হচ্ছে। কারণ এই কলমধারীর বিচারের মূল প্রতিপাদ্যটি তার নানা আনুষঙ্গিকসহ রীতিমতো প্রতিবাদযোগ্য। তাঁর সীমাবদ্ধ পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি একটা মস্তবড়ো তত্ত্ব খাড়া করতে চেয়েছেন, যার মূলে আছে ভাষাগত আধিপত্যবাদ সম্বন্ধে এক জনপ্রিয় কিন্তু কিছুটা আংশিক, এমনকি অমূলক ধারণা। হয়তো তাঁর কথাতে একটু অভিভাবকত্বের সুরও আছে। কিন্তু তাঁর বয়স এবং প্রজ্ঞার পশ্চাদ্ভূমিতে এখন তাঁর কথায় অভিভাবকত্বের সুর অপ্রত্যাশিত নয়। আমি একে একে তাঁর কথাগুলিকে বোঝাবার এবং সে বিষয়ে আমার জ্ঞানবিশ্বাসমতো প্রশ্ন করার চেষ্টা করি।

 

প্রবন্ধ ঠিক কী বিষয়ে?

বিষয়টি নানাকথার মধ্যে থেকে যেটুকু উদ্ধারিত হয় তা এই : বাংলাদেশের বাঙালিরা কেন ‘প্রমিত’ বাংলার সাহিত্য রচনা করবেন? এই প্রমিত বাংলা পশ্চিবঙ্গের চাপিয়ে দেওয়া ভাষা, সুতরাং বাংলাদেশি বন্ধুদের এটা বর্জন করাই উচিত হবে। শুধু পশ্চিমবঙ্গেরই চাপিয়ে দেওয়া নয়, এটা তাঁর মতে ইংরেজরা পশ্চিমবঙ্গের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের এই কলোনি-কালিমালিপ্ত বাংলাকেই বাংলাদেশ গ্রহণ করেছে। শ্রীরায় অবশ্য জানেন যে, বাংলাদেশের জন্মের বহু আগে থেকে বাংলার পশ্চিমভাগের এই প্রমিত বাংলাÑ সাধু রূপে হোক আর চলিত রূপেই হোক, বাংলার পূর্বভাগ, এবং সেখানকার হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকলেই গ্রহণ করে আসছেন। তবু এসব কথা যখন শ্রীরায় বলছেন তখন তিনি প্রায় settled fact unsettled করার সদিচ্ছা নিয়েই বলছেন। অর্থাৎ প্রায় দুই শতাব্দী থেকে, বাংলাদেশ নির্মিত হওয়ার অনেক আগে থেকে যে সাহিত্যের ভাষা নানা পরিবর্তনের (সাধু থেকে চলিত এবং অন্যান্য শৈলীগত সংশোধনের) মধ্য দিয়ে সমগ্র বাংলাভাষীর সাহিত্যচর্চার ভাষা হয়ে উঠেছে, শ্রীরায় বাংলাদেশের বাঙালিদের জন্য সেই অভ্যস্ততার গতিমুখ উলটে দিতে চান। এই নিয়েই শ্রদ্ধেয় হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে তাঁর মৌখিক এবং বন্ধুবর হায়াৎ মামুদের সঙ্গে তাঁর লৈখিক বির্তক।

কিন্তু সমস্যা হলো, এখানেই তিনি থেমে যান- সেটা তাঁর প্রবন্ধকে কিছুটা প্রশ্নসংকুল অসম্পূর্ণতা দেয়। তিনি বলেন না, এই ‘প্রমিত’  বাংলা ছেড়ে তাঁরা কোন্ বাংলা ধরবেন। ঢাকার বাংলা? সিলেটের বাংলা? দিনাজপুরের বাংলা? সে কথা বললে আবার সেই জেলের আধিপত্যের প্রশ্ন উঠবে কিনা সেই প্রশ্নের দায়ও তিনি তাই এড়িয়ে যান। আমরা পরে এই প্রসঙ্গে ফিরে আসব।

ভাষাবিজ্ঞানে যাকে ‘ভাষা-পরিকল্পনা’ বলা হয়, শ্রীরায়ের প্রবন্ধটি তারই একটি প্রয়াস। বাঙালির সর্ববৃহৎ গোষ্ঠীকে দীর্ঘ-অভ্যস্ত একটি বাচন আর লিখনরীতি ছেড়ে অন্য একটি বাচন আর লেখনরীতি গ্রহণ করার পরামর্শ একে এক ধরনের হস্তক্ষেপ বা ‘intervention’  বলা যায়। হস্তক্ষেপের লক্ষ্য কী? না, যাকে বলা হয়েছে একটি ভাষারূপের ভূমিকা নির্দেশ করা, ‘status planning’- বাংলাদেশের সাহিত্যের- মূলত গদ্যে লিখিত সাহিত্যের ভাষা কী হওয়া উচিত তা-ই নির্দেশ করা। কিন্তু এই হস্তক্ষেপের মধ্যে যেন একটি আন্তরিক সদিচ্ছার সুর আছে- যেন ‘ভাই, তোমাদের ব্যাপারস্যাপার বোধহয় তোমরা যথেষ্ট ভালো বোঝ না, কাজেই আমার সদুপদেশ শোনো’ ধরনের আত্মবিশ্বাসও আছে। শ্রীরায় যাঁরা এই ব্যাপারটা বোঝেন না বলে মনে করেন, তাই তিনি যাঁদের সঙ্গে মুখোমুখি আর লৈখিক তর্কে প্রবৃত্ত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে আছেন আজিজুল হকের মতো বরেণ্য কথাশিল্পী, আর হায়াত মামুদের মতো প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী। তিনি নিশ্চয়ই জানেন যে, গত দেড়শ বছর ধরে প্রাক্তন পূর্ববঙ্গের, পূর্ব পাকিস্তানের এবং বর্তমান বাংলাদেশের সহস্র লেখক আর বুদ্ধিজীবী তাঁদের রচনায় এই ‘প্রমিত’ ভাষা ব্যবহার করে আসছেন, তাঁদের সকলের এই নিশ্চিত অভ্যাসের প্রতিপক্ষ হিসেবে তিনি নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন। এতে তাঁর অনুমোদন নেই।

অনেক পাঠকেই জানেন, সব ভাষা-পরিকল্পনা এ রকম প্রত্যক্ষ ‘intervention’-এর ফল নয়, তা ঐতিহাসিক বির্বতন আর ভাষাব্যবহারকারীদের আগ্রহপূর্ণ যোগদানের ফলেও ঘটে। আমরা পরে দেখব, সমস্ত বাংলাভাষী অঞ্চলে ‘প্রমিত’ বাংলার ব্যবহার এই ভাবেই গৃহীত হয়েছে। তা স্বাভাবিক আর প্রাকৃতিক ঘটনারই মতো।

 

‘প্রমিত’ ভাষারূপ আর ‘প্রমিত’ বাংলা ভাষারূপ কী?

প্রমিত ভাষারূপ হলো যে-কোনো ভাষার মধ্যে গড়ে ওঠা একটা সর্বজনগৃহীত আর সর্বজনব্যবহৃত রূপÑ যাকে ইংরেজিতে standard dialect  বলা হয়। ‘প্রমিত’-র বদলে ‘আদর্শ’ ভাষারূপ কথাটিও কোথাও কোথাও প্রচলিত। ভাষার এই প্রমিতায়ন বা আদর্শায়ন (standardization) ঘটে কখন? সাধারণভাবে যে ভাষার একাধিক আঞ্চলিক উপভাষা আর সামাজিক শ্রেণিভাষা থাকে তারই একটা প্রমিত রূপের দরকার হয়। দরকার হয় একটি অভিন্ন ভাষারূপের মধ্য দিয়ে ভাষীদের সকলকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য, তাদের কাছে সরকারি বিজ্ঞপ্তি পৌঁছে দেওয়ার জন্য, সংবাদ প্রচারের জন্যÑ এই রকম নানা উদ্দেশ্য। তার একটি লিখিত রূপ তৈরি হয়  লেখার মধ্যে দিয়ে, আর একটি মৌখিক রূপও তৈরি হয়, নানা অঞ্চলের অধিবাসীদের মৌলিক যোগাযোগের কারণে আর মাধ্যমে। কখনও রাজধানী অঞ্চল এই ব্যাপারটাকে সাহায্য করে, কখনও কোনো গতিশীল মিলনক্ষেত্রে (তীর্থ, স্থলবদ্ধ বা বন্দরের বাণিজ্যকেন্দ্র) মৌখিক রূপটির সৃষ্টি হয়। রাজধানীরও বাণিজ্যকেন্দ্র হতে বাধা নেই। লেখা এবং মুদ্রণে প্রমিত ভাষারূপের প্রমিতত্ব আরও দৃঢবদ্ধ  হয়। এ বিষয়ে পুণ্যশ্লোক রায়ের প্রামাণিক গবেষণা সারা পৃথিবীতেই স্বীকৃতি লাভ করেছে। বাংলার মধ্যে এ রকম যে প্রমিত ভাষারূপ গড়ে উঠেছে তার ইতিহাস এক রেখা ধরে এগোয়নি। ইংরেজ আসার কয়েকশ বছর আগে থেকেই প্রথমে গড়ে উঠেছিল একটি কবিতার ভাষার প্রমিত রূপ,  মৌলিক এবং লিখিত বাংলা কাব্যের ইতিহাসে তার পরিচয় আছে। বাংলার সমস্ত অঞ্চলে লেখা কাব্যেই তার নির্ভুল পরিচয় আছে। তখন অবশ্যি সে-কাব্য লেখার জন্য নিজের স্থানীয় জন্মভাষা ত্যাগ করার দরকার হয়নি, অর্থাৎ স্কুল ইত্যাদিতে কোনো প্রমিত ভাষা শিক্ষা শুরু হয়নি।

কিন্তু আমাদের প্রশ্ন, মুখের কোনো প্রমিত কি প্রাচীন ও মধ্য বাংলায় গড়ে ওঠেনি? কে এমন কথা হলফ করে বলতে পারে? বাংলার নানা প্রান্তের তীর্থযাত্রীরা যখন নিজেদের জন্মস্থান আবাসস্থান থেকে বহু দূরে অন্য প্রান্তের তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে মিলিত হতেন, তখন তারা কী ভাষা ব্যবহার করতেন? নিশ্চয়ই কাজ-চালানো গোছের একটা প্রমিত মুখের বাংলা গড়ে উঠেছিল তখনও, যদিও তার নথিবদ্ধ প্রমাণ অসম্পূর্ণ। মধ্যযুগের চরিতসাহিত্যে চৈতন্য শ্রীহট্টের ভাষা নিয়ে পরিহাস করছেনÑ তাতে ভাষা-পার্থক্যের, এবং উপভাষা সম্বন্ধে প্রমিতভাষীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্যের খবর পাই। কিন্তু তারই মধ্যে যে সংলাপ সম্ভব হতো, তা কী উপায়ে? ফলে মৌখিক প্রমিতও একটা নিশ্চয়ই তৈরি হয়েছিল। পরে কলকাতা রাজধানী হওয়ায় এর একটি মৌখিক রূপ, মূলত নব্য-উদ্ভূত শিক্ষিত এলিটশ্রেণির মুখের ভাষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। প্রমিত মৌখিক ভাষারূপের নাম এ বাংলায় এক সময়ে শিষ্ট চলিত বাংলা (Standard Colloquiall Bengali/Bangla  ছিল, পরে আমরা শিষ্ট কথাটির বহিষ্করণধর্মী (অন্য ভাষা অশিষ্ট) ‘মূল্যবোধ’ বর্জন করে মান্য চলিত বাংলা নাম দিই। বাংলাদেশে সেটাই ‘প্রমিত’ বাংলা নামে প্রচলিত। পাঠকদের জন্য এটাও বলা দরকার যে, যে-কোনো ‘প্রমিত’ ভাষারূপের একটি মৌখিক এবং একটি লিখিত চেহারা আছে। মৌখিক প্রমিত বাংলা সাধারণভাবে শিক্ষাদানে, বিধানসভা, বাংলাদেশের সংসদ, শিক্ষালয় এবং অন্যত্র নানা আচারিক (formal) বক্তৃতায়, সংবাদ মাধ্যমের সংবাদ প্রচারে, ঘোষণা আর অন্যান্য কথোপকথনে, বাংলার এক প্রান্তের এক উপভাষার মানুষের সঙ্গে অন্য প্রান্তের অন্য উপভাষার মানুষের কথাবার্তায়Ñ নানা উপলক্ষে ব্যবহৃত হয়। আর লিখিত প্রমিত ভাষারূপের একটি ধারাÑগদ্য, তা ব্যবহৃত হয় চিঠি আর দলিলপত্রে, পাঠ্যবইয়ে, সাহিত্যের নানা অংশে, বিশেষ করে আলোচনাত্মক রচনায়। গল্প-উপন্যাসে এই ‘প্রমিত’ গদ্য ব্যবহৃত হয় বা তার শৈলীবদ্ধ রূপ লেখকের বর্ণনা অংশে ব্যবহৃত হয়। কল্পিত চরিত্রগুলির সংলাপ অংশে এই ‘প্রমিত’ গদ্য ব্যবহৃত নাও হতে পারে, সেখানে বাস্তবতার খাতির চরিত্রের আঞ্চলিক, গোষ্ঠীগত বা শ্রেণিগত উপভাষা প্রায় অবিকলভাবে তুলে আনেন লেখক। ‘প্রায়’ বললাম এই কারণে যে, ওই ভাষা হুবহু সেই অঞ্চলের/ শ্রেণির ভাষা কিনা তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপভাষাগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অনেক সময় তর্ক তোলেন, যেমন শ্রীরায়েরই তিস্তাপাড়ের বৃত্তান্ত এবং তার নাট্যরূপ উপভাষা নিয়ে হয়েছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না এ বিতর্ক যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। লেখক একেবারে নিখুঁত উপভাষা লিখবেনÑ এই দাবি সংগত নয়, ওই অঞ্চলের মানব-পরিবেশ তৈরির জন্য যতটুকু দরকার তা লিখলেই যথেষ্ট। কথাকারকে এক নিখুঁত ভাষাবিদ হতে হবেÑ এ দাবি বড় বেশি কঠোর। এই প্রমিত ভাষারূপের মূল চরিত্র হলো যে, তার ব্যবহার স্থানসীমায়/শ্রেণিসীমায় বদ্ধ নয়, যদিও স্থানবিশেষের/শ্রেণিবিশেষের মৌখিক ভাষার সঙ্গে তার মিল থাকতেও পারে। হতেই পারে যেখানে তা গড়ে উঠেছে তার ভিত্তি জুগিয়েছে ওই অঞ্চলের মুখের ভাষা। সকলের মুখের ভাষা নয়, ওই অঞ্চলের ‘এলিট’ শ্রেণির মুখের ভাষা।

আর এই : ভাষারূপ উপলক্ষ বিশেষ ভাষার সমস্ত বক্তার দ্বারা ব্যবহৃত হয়, তাঁদের নিজেদের উপভাষা/শ্রেণিভাষা যাই হোক না কেন। তা ব্যবহারের উপলক্ষও অন্য সমস্ত উপভাষা/শ্রেণিভাষা চেয়ে অনেক বেশি, উপরে যেমন বলেছি। এ বক্তাদের অনেকের জন্মভাষা আর গৃহভাষা ‘প্রমিত’ ভাষা নয়, তাও মিথ্যে নয়। সব ভাষাতেই অ-প্রমিত ভাষার মানুষদের অনেককেই প্রমিত ভাষা শিখতে হয়, বাংলাতেও তাই হয়। বার্নার্ড শ-র ‘পিগমেলিয়ন’ নাটকের ইলাইজা ডুলিট্লকে প্রমিত ইংরেজি শিখতে হয়েছিল বাধ্য হয়ে, তার কক্নি উচ্চারণ ছেড়ে, কিন্তু বহু ইংরেজ স্কুলের পড়াশোনা করতে গিয়েই এই ভাষা শেখে, সেটা তাদের কাছে পীড়ন বলে মনে হয় না- শিক্ষাকে যদি পীড়ন বলে মনে না হয় সব বড় ভাষাতেই প্রমিতে প্রবেশের একটা খোলা আর বাধ্যতামূলক রাস্তা হলো শিক্ষাব্যবস্থা- পাঠ্যবইয়ে তা লিখিত আকারে, আর ক্লাসঘরে শিক্ষার আদান-প্রদানে প্রায়ই মৌখিক আকারে তা অন্য উপভাষার ছাত্রছাত্রীদির শেখানো হয়।

 

শ্রীরায়ের দেওয়া সাধুভাষার

ইতিহাসের সমস্যা

শ্রীরায় সাহিত্যের ভাষার প্রসঙ্গ এনেছেন, ঊনবিংশ শতাব্দীতে সৃষ্টি সাধুভাষার কথাও এসেছে, যদিও এ নিবন্ধে ‘প্রমিত’ বাংলা অর্থে তিনি তা বোঝাচ্ছেন না। তিনি না বেঝালে কী হবে, তাও নিশ্চয়ই এক ধরনের ‘প্রমিত’ ভাষারূপে- শুধু সাহিত্যের জন্য তৈরি। তাঁর মতে এই সাধুভাষারূপে ‘উনিশ শতকের শেষ ৬০ বছরে, মানে ১৮৪০ থেকে, সংবাদ সাময়িকপত্রে যে বাংলা গদ্য তৈরি হচ্ছিল’ (৫৯ পৃ. প্রথম কলাম) সেই সাধুভাষা তো ১৮৪০-এর অনেক আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল। ১৫৫৫ সালে পাওয়া কোচবিহার রাজের কাছে অহমরাজের চিঠিটি কোন্ ভাষায় লেখা ছিল? তা তো ওই সাধুভাষাতেই! তখন  ইংরেজরা ভারতের দিগন্তে উঁকিও দেয়নি। ইংরেজ আসার আগে যত চিঠিপত্র, দলিল, মন্দির উৎসর্গ, মানুষ বিক্রির কবলা পাওয়া গেছেÑ সবই ওই ‘সাধু’ ভাষাতে। তার পরে তো ইংরেজ এসে ঊংনবিংশ শতাব্দীর বাইবেলের নতুন নিয়মের অনুুবাদ করল, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বহু পাঠ্য দেশে প-িতদের দিয়ে লেখানো ১৮১৮সালে সমাচার দর্পণ আর দিগ্দর্শন প্রকাশ করল (তারও আগে বেরিয়েছিল গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের পত্রিকা)। এ সাধুভাষা ইংরেজরা তৈরি করে চাপিয়ে দিয়েছিলেন, এ কথা সর্বতোভাবে ভ্রান্ত। গোড়ার দিককার নক্শা সাহিত্য, অনুবাদ নাটকগুলির সংলাপ আর নির্দেশনায় বাংলার এই সাধুভাষার স্পষ্ট উপস্থিতি দেখা গেল, পরে সংবাদ আর সাময়িকপত্রে তার রূপটি আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠল। রামমোহনের ব্রাহ্মণ সেবধি বেরোল ১৮২১-এ। ১৮২১-এই বেরোল তাঁর সম্বাদ কৌমুদী। অর্থাৎ ১৮৪০- এর আগে অনেক বাংলা সাময়িক পত্র প্রকাশিত হয়েছে, ভবানীচরণের সমাচার চন্দ্রিকা ঈশ^রচন্দ্র গুপ্তের সংবাদ প্রভাকর, মাণ্টেগোমারি মার্টিনের বঙ্গদূত। ফলে শ্রীরায়ের ১৮৪০ সালটা বেশ-একটু অসতর্ক আর  অন্যমনস্ক উল্লেখ বলে মনে হয়।

 

আমাদের মতে প্রমিত ভাষা কী?

আমাদের মতে, সব ভাষার যেমন তেমনই বাংলা প্রথাগত কাব্যভাষা আর সাধু গদ্য, দুই-ই literary standard  হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ ‘প্রমিত’ ভাষা। মুখের ভাষার সঙ্গে সে সবের তফাত খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কবিতার ভাষা তো তফাত হবেইÑ সারা পৃথিবীতেই তা হয়, সাহিত্যের গদ্যও মুখের ভাষা থেকে রীতিমতো আলাদা হতে পারে। তেলুগুতে সাহিত্যের ভাষার এই রকম ‘গ্রন্থিক’ বলে একটি রীতি গড়ে উঠেছিল। তামিল, মলয়ালমেও সাহিত্যের গদ্য কথ্য থেকে প্রচুর আলাদা হয়েছিলÑ আমেরিকানরা যাকে high আর ষড়ি low variety বলে তার বিরোধ ছিল। আমরা এই ইংরেজি শব্দগুলির ব্যবহার পছন্দ করি নাÑ কিন্তু মুখের ভাষাকে যে এক সময় কেমন নীচু নজরে দেখা হতো তার প্রমাণ তো সবুজপত্র যুগের বিতর্কে যথেষ্টই  আছে। তবু এই সব সাধু ভাষা ‘প্রমিত’ এই কারণে যে, তা ব্যাপক ভাষা-অঞ্চলের সকলে ব্যবহার করত। এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে, বাংলাদেশের জন্মের বহু আগে, হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের , আর দুই ভিন্ন অন্যান্য সম্প্রদায়ের, এমনকি অসমিয়া প্রভৃতি অন্যভাষী লেখকেরা, অর্থাৎ ভৌগোলিকভাবে সমস্ত বঙ্গভাষী আর বঙ্গ-প্রভাবিত অঞ্চলের লেখকেরাও (এর মধ্যে আসাম, বিহার সবই পড়বে) সেই ‘প্রমিত’ সাধুভাষাকে গ্রহণ করেছেন, কেউ কেউÑ মীর মশাররফ হোসেন এ রকম অনেকের মধ্যে একজনÑ অসামান্য কৃতিত্বও দেখিয়েছেন।

আমারা বলব বাংলা কাবতারও একটি ‘প্রমিত’ ভাষারূপ আছে। গদ্যের মতোই আরও বিবর্তন ঘটেছে। ‘চর্যাপদ’কে যদি সে ভাষা বলে নাও মেনে নিই, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে তো একটা ধারাবাহিকতা তৈরিই হয়েছিল বাংলা কাব্যভাষার। সেটা তো তখনকার প্রমিত সাহিত্যের ভাষা। তার পিছনে কোন্ সা¤্রাজ্যবাদী প্রেরণা ছিল? তা কেন সমগ্র বরং তা হলে শ্রীরায়কে সমস্ত পৃথিবীর ‘প্রমিত’ কাব্যভাষা গড়ে ওঠার পিছনেই সা¤্রজ্যবাদী হস্তক্ষেপ খুঁজতে হবে। তা খুঁজে পাওয়া খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না।

 

‘প্রমিত ভাষা’ ধারণা বা কথাটা কি সা¤্রাজ্যবাদের উপহার?

উপরেই বলেছি, শ্রীরায় অবশ্যি সেই রকমই মনে করেন। তাঁর নিঃসন্দিহান উচ্চারণ, ‘আমার তো মনে হয়, কোনও ভাষার একটা ‘প্রমিত’ রূপের ধারণাটাই ইউরোপিয় দেশগুলির কলোনি-বিস্তারের সঙ্গে ওতপ্রোত। ‘স্টান্ডার্ড ডায়ালেক্ট’ বা ‘প্রমিত কথ্যভাষা’ ধারণাটাই সমস্ত সা¤্রাজ্যবিস্তারী ভাষার পক্ষে খাটে কিনা তা আমি জানি না। ইংরেজিই এ-ধারণাটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে। আমি তো স্ট্যান্ডার্ড জার্মান, স্ট্যান্ডার্ড ফ্রেঞ্চ এমন ধারণা, ও ধারণা থেকে তৈরি চিহ্ন, কখনও ব্যবহৃত হতে দেখিনি। কিন্তু ‘স্ট্যান্ডার্ড ইংলিশ ধারণাটি খুবই চলে। একটু বেশিই চলে।’

(৫৯ পৃষ্ঠা, দ্বিতীয় কলামের প্রথম অনুচ্ছেদ)

উপরের বিষয়টি তাঁর আর-একটু দেখে নেওয়া দরকার ছিল

তাঁর উপরিউক্ত পর্যবেক্ষণের মারাত্মক সীমাবদ্ধতার সমস্যা দিয়ে শুরু করি। তিনি যে বিশ^াস থেকে তাঁর প্রতিপাদ্য গড়ে তুলেছেন, তার তথ্যভিত্তি যথেষ্ট পোক্ত নয়। তাঁর একটা কথা হলো, প্রমিত ধারণা নাকি ইংরেজরা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। স্পষ্ট না বললেও এটাকে ইংরেজের সা¤্রাজ্যবাদী চক্রান্তের একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেন তিনি। জার্মান বা ফ্রান্সে নাকি এই ধরনের প্রমিত ভাষার বিশেষ কোনো উদাহরণ নেই।

আচ্ছা, এ কথাটি খুব বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করিÑ তিনি কি একদম ধ্রুব আর সুনিশ্চিতভাবে জানেন? এর মানে কি যে, জার্মান বা ফরাসিভাষায় কোনো প্রমিত রূপ নেই? তা যদি হয় সে বড় আশ্চর্য কথা এবং অন্যায্য কথা! জার্মান বা ফরাসিরা দিব্যি, ইংরেজের মতো সূর্যাস্তবিবর্জিত না  হলেও, সা¤্রাজ্য বিস্তার করেছিল, আফ্রিকাতে বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। হিটলারের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। এই দুটি ভাষার ‘প্রমিত’Ñএর ধারণা আর ওই ‘ধারণা থেকে তৈরি চিহ্ন, কখনও ব্যবহৃত হতে’ তিনি দেখেনই-নিÑ এ তো  তাঁর সমস্যা, সে ভাষাগুলির সমস্যা নয়। এই ভাষাগুলি সম্বন্ধে যে কোনো প্রাথমিক বই পড়লেই তিনি জানবেন দুয়েরই প্রমিত রূপ আছে। মার্টিন লুথারের গদ্য এবং নির্দেশ থেকে কীভাবে ‘নিউ হাই জার্মান’ ভাষা জার্মানির এক বৃহৎ অঞ্চলের প্রমিত ভাষা হয়ে উঠল তা কে না জানে? হ্যাঁ, ব্যাভেরিয়া আর সুইস জার্মানির সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়েছিল পারির রাজদরবারের ফরাসি থেকে, উনিশ শতকের বিখ্যাত লেখকদের রচনার সূত্রে। তার কথ্য চরিত্রটি এসেছে মূলত ইল্ দ ফ্রঁস অঞ্চলের উচ্চারণ থেকে, পারি যার অন্তর্ভূত। ইতালির ভাষার প্রমিত রূপ গড়ে উঠেছে তুস্কানি বা টাস্কানি অঞ্চলের ফ্লোরেন্স’র ভাষার উপর ভিত্তি করে। ইতালিরও অবশ্যি সা¤্রাজ্য ছিল আফ্রিকাতে। সেই অপরাধ স্পেনেরওÑ তার ‘প্রমিত’ ভাষারূপ কাতালান অঞ্চলের স্প্যানিশ। কিন্তু প্রমিতরূপ তো আছে সা¤্রাজ্যস্থাপনের ইতিহাসহীন সাঁওতালি ভাষার (দুম্কার সাঁওতালি), মালয়েশিয়ার ভাষা মালে বা মালয়ের (কেদা মালে)। আরও কত কত ভাষার। আসলে সব ভাষারই প্রমিত রূপÑ মুখের হোক, সাহিত্যের হোক, গড়ে ওঠে সেই ভাষার ‘এলিট’-দের ভাষাব্যবহার থেকে, যারা ‘এলিট’ নয় তারা সেই অভ্যাস অনুসরণ করে। কখনও তা দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায়, আবার কখনও, যেমন ইন্দোনেশিয়ার বাহাসা ইন্দোনেশিয়ার  ক্ষেত্রে,  সরকার আর বুদ্ধিজীবীদের প্রত্যক্ষ পরিকল্পনা বা হস্তক্ষেপের দ্বারা।

শ্রীরায়ের বক্তব্যে দ্বিতীয় গ-গোল হলো সা¤্রাজ্যবাদী ইংল্যান্ড তো নিজেদের জন্যও একটি ‘প্রমিত’ ইংরেজি তৈরি করেছে তার ধারণাটিকে শুধু সুটকেসে ভরে বাংলায় রপ্তানি করেছে এমন তো নয়। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ -পূর্ব অঞ্চলের ‘এলিট’ শ্রেণির ইংরেজিই তো তার নিজের ‘প্রমিত’ ভাষা হয়ে উঠেছে। শ্রীরায় হয়তো বলবেন, তাতে ইংরেজদের আপত্তি করা উচিত ছিল, তা যে তারা করেনি সে তাদের দুর্মতিবশত। যাই হোক, ‘প্রমিত’ ইংরেজির একটি নাম ‘Received Pronunciation’  বা ‘Accepted Pronunciation’ তা নিশ্চয়ই শ্রীরায় জানেন, এবং এও জানেন যে তা ইংল্যান্ডের ২ শতাংশ লোকের বেশি মুখে বলে না। তা সত্ত্বেও সেই ‘প্রমিত’ ভাষা সম্বন্ধে তারা কেউ টু শব্দটি করে না। এ তাদের মহা অন্যায়।

 

শ্রীরায় আসলে কী চান

শ্রীরায় অবশ্যি প্রমিত বাংলা বোঝাতে এখন সাধু ভাষা বা কবিতার ভাষাকে বোঝাতে চান না, তিনি বোঝাতে চান সব বাঙালির ব্যবহৃত মান্য ‘চলিত’ ভাষাকে। যা পশ্চিমবঙ্গে মান্য চলিত এবং বাংলাদেশে প্রমিত বাংলা নামে প্রচলিত। আমাদের মতে, এই মান্য চলিত গদ্যভাষা বাংলাভাষার প্রমিতকরণের ইতিহাসের শেষ পরিণাম। সে ইতিহাস শুধু ‘চলিত’ ভাষাতেই সীমাবদ্ধ নয়। তার শুরু হয়েছিল সাধু গদ্য দিয়ে, তার শেষ হলো চলিতে।

তবে তাঁর মোদ্দা কথা হলো, তথাকথিত ‘মান্য’ বা ‘প্রমিত বাংলা’ পশ্চিমবাংলারÑ তা কেন বাংলাদেশের লেখকেরা ব্যবহার করবেন?

তিনি এই ধারণায় বিশ্বাস করেন না যে, সে-বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের লেখকদেরই এবং আরও ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের মানুষের, এবং সে সিদ্ধান্ত তাঁরা নিয়েছেনÑ অন্তত সেই সব সাক্ষর মানুষ যাঁরা সাহিত্যের পাঠক হয়ে উঠতে পেরেছেন। আবার সাক্ষর না হলেও অনেক মানুষ নানা বৈদ্যুতিক মাধ্যমে দর্শক আর শ্রোতা হিসেবে প্রমিত বাংলার সংবাদ শোনেন, হয়তো ফোন করে তাতে অংশও নেন। অর্থাৎ তাঁর প্রমিত বাংলার এই পাঠ্য আর শ্রোব্য প্রতিবেশকে মেনে নিয়েছেন।

আজকে মেনে নিয়েছেন তা নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তৈরি একটা সাহিত্যিক প্রমিত বাংলাÑযার নাম ‘সাধু ভাষা’Ñ তাও তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন সাহিত্য রচনার জন্য, বাঙালির কবিতা রচনার যে ভাষা সারা বাংলায় তৈরি হয়েছিল তাও হয়ে উঠেছিল তাঁদেরও আত্মপ্রকাশের ভাষা।

শ্রীরায় কি ঢাকার একাডেমি প্রকাশিত ‘বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, বইটি দেখেননি? মনে হয় দেখেছেন, এবং তীক্ষèভাবে খেয়াল করেছেন, কারণ তাঁর লেখার ‘প্রমিত’ নামটির উপর বিরাগের পিছনে ওই বইটির উল্লেখ সযতেœ বর্জন করেছেন। সে অধিকার তাঁর অবশ্যই আছে, কিন্তু প্রমিত ভাষা বাংলাদেশের বাঙালিদের সাহিত্যরচনায় প্রধান প্রধান ক্ষেত্রগুলিতে ব্যবহার করা উচিত কি না সেই তর্কের বাইরে গিয়েও এ বইটি সম্বন্ধে ভালোমন্দ একটা মন্তব্য পেলে আমরা খুশি হতাম। অবশ্যি আমাদের খুশি না করার ইচ্ছেও তাঁর গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু  বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি, ধরা যাক, পশ্চিমবঙ্গের ‘মান্য’ বা প্রমিত বাংলার জন্যও কি একটা ব্যাকরণ তৈরি করতে পারে না? তা তো বাংলাভাষারই অংশ, না কি? বাঙালি ভাষাজিজ্ঞাসু হিসেবে খ্যাতিমান  শ্রীরায়ের ‘প্রমিত’ কথাটি নিয়ে এই কচলাকচলির নেপথ্যে যে বইটি আছে বলে মনে করি (আমার অনুমান ভুল হলে খুশি হব), সে বিষয়ে তাঁর সম্পূর্ণ তূষœীম্ভাব একটু বিস্ময় জাগায়। যাই হোক, তাঁর ‘বিবর্তনমূলক অভিধান’Ñ এর  আলোচনায় ‘ইমারত’ কথাটিকে তিনি বাংলা কথা বলেননি, এতে আমরা একটু বিস্মিত হয়েছি। ভাষার সব শব্দ কি তার নিজের রান্নাঘরে তৈরি হয় নাকি? বাইরের ভাষা থেকে ধার করি আমরা প্রচুর শব্দ, সেগুলি আমাদের আর ফেরত দিতে হয় না বলে আমাদের ভাষার শব্দ হয়ে যায়।

শ্রীরায়ের পরামর্শের কিছু সমস্যা

সমস্যা বেশ কয়েকটি। প্রথমত, তিনি settled fact unsettled  করতে চেয়েছেন, সেটা কতটা সম্ভব হবে জানি না। তাঁর পরামর্শমতো বাংলাদেশের লেখকেরা সকলেই প্রমিত বাংলা ছেড়ে তাঁদের নিজেদের ভাষায় (কোন্ অঞ্চলের ভাষায়?) লিখতে শুরু করবেন, এমনটা কার্যত অবিশ^াস্য, অভাবনীয় এবং ইতিহাসবিধ্বংসী। বহু দিন আগে (১৯৬০) মুনীর চৌধুরী International Journal of American Linguistics পত্রিকায় একটি প্রবন্ধে লক্ষ্য করেছিলেন যে, তৎকালীন পূর্ব পকিস্তানের রাজধানী ঢাকাতে একটি পূর্ববঙ্গীয় প্রমিত ভাষা গড়ে উঠেছে, মুখের কথাবার্তায়। তিনি  সম্ভবত আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, এই মুখের প্রমিত ভাষা ক্রমশ শ্রীরায়-কথিত প্রমিত বাংলাকে স্থানচ্যুত করবে, মুখে এবং লেখায়। তা সম্ভব হয়নি। এমনকি, ১৯৫৩ নাগাদ অন্নদাশংকর রায় চেয়েছিলেন পূর্ব বাংলার প্রমিত বাংলার বর্ণনা আর আলোচনার ভাষায় ‘দওয়া যায়, করণ যায়’ ইত্যাদি পূর্ববঙ্গীয় প্রয়োগ আসুকÑ তাও  কোনও দিন ঘটেনি। শ্রী রায়ের এই কথাটি ঠিক নয় যে, একটা সহিত্যের বা মুখের প্রমিত ভাষা চাপানো হয় তা কিছু ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে, তা এক অর্থে ‘স্বাভাবিক’। তিনি অনেকের চেয়ে বেশি করে জানেন যে, বাহান্নর ভাষা শহিদরা কোনও আঞ্চলিক বাংলাভাষার জন্য রক্ত এবং প্রাণ দেননি, তাঁরা সে সব দিয়েছেলেন প্রমিত অর্থাৎ অখ- ব্যবহৃত ‘প্রমিত’ বাংলার জন্য। ফলে তাঁদের জাতীয় অস্তিত্বের ক্রমবিকাশের সঙ্গে এই প্রমিত ভাষার ওতপ্রোত।

এ কথার অর্থ আমরা এমন ইঙ্গিত করছি না যে, পূর্ব বাংলার মানুষের মুখের ভাষার সাহিত্য রচিত হয়নি বা তার সাহিত্যে স্থান হবে না। ভাষাবিজ্ঞান উপভাষাকে তুচ্ছ করে না, এক ভাষাকে অন্য ভাষার বা অন্য উপভাষার তুলনায় গৌণ মনে করে না। তাই দুই বাংলার গল্প-উপন্যাসের সংলাপ তা বলিষ্ঠ এবং নির্ভুলভাবেই এসেছেÑ তা অবশ্যই আসা উচিত। সেই সঙ্গে সদ্যপ্রয়াত সৈয়দ শামসুল হক কাব্যনাট্য লিখেছেন কখনও ঢাকাই উপভাষায় পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় এবং দিনাজপুরের উপভাষায় নূরলদীনের সারাজীবন কিন্তু তাঁর বৃহৎ রচনাংশেÑ গল্গ-উপন্যাসের বিবৃতি, প্রবন্ধ, কলাম, কবিতাÑ সবই প্রমিত বাংলায়। বাংলাদেশের অনেক লেখকের প্রমিত বাংলার গদ্যের ইন্দ্রজাল আমাদের মুগ্ধ করে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লহ থেকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল থেকে হরিশংকর জলদাসÑ আরও কত কত নাম করা যায়। কারও কি একবারও মনে হয় যে তাঁরা একটা ‘বিদেশি’ ভাষায় লিখেছেন, চাপানো ভাষায় লিখেছেন, এবং এই ধিক্কৃত প্রমিত বাংলা ছেড়ে অন্য কোনও বাংলা খুঁজে নিলে তাঁদের হাত আরও খুলত?

আমি এও জানি যে, সম্প্রতি বাংলাদেশের লোকের মুখের ভাষায় কথাসাহিত্য রচনার একটি মৃদু আন্দোলন আছে। কিন্তু এর সমস্যাও তো কম নয়। চট্টগ্রামের মানুষের কথা চট্টগ্রামের উপভাষায় যদি বর্ণনা করা হয় তবে অন্য উপভাষার মানুষেরা তা পড়বেন কী করে? সেলিম আলদীন তাঁর নাটকে যে কাব্যিক উপভাষা তৈরি করেছেন তা সম্পূর্ণরূপে নোয়াখালি বা কোনো আঞ্চলিক ভাষা নয়, তা একটি সরলীকৃত উপভাষা, তার আবেদন বা বোধগম্যতা কোনো অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। শম্ভু মিত্র তাঁর চাঁদ বণিকের পালা তে এই রকম একটি  দূরত্ব তৈরি করেছিলেন এক সরলীকৃত ভাষায়Ñ তাও কোনও অঞ্চলের নয়।

এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ অবশ্যই কবি আর লেখকেরা নেবেন, যে কোনও ভাষাতেই, পশ্চিমবাংলাতেও নেবেন এবং নিয়েছেন। এমনও হতে পারে যে, একটি দুর্বোধ উপভাষার বারবার ব্যবহারে তা অন্য উপভাষা অঞ্চলের মানুষদের কাছে ক্রমশ তুলনায় বোধ্য হয়ে উঠবে। কিন্তু তাই বলে দুই শতাব্দীর প্রমিত ভাষাকে বর্জন করে ভিন্ন একটি প্রমিত ভাষা নির্মাণ করে সাহিত্য রচনা? এমন অলীক এবং অবান্তর স্বপ্ন নিজে কেন দেখেন, অন্যদের কেন দেখান শ্রীরায়? উপভাষায় রচিত লিখিত-সাহিত্য (নাটকে মুখের সংলাপে তা যতটা বোধ্য, লেখায় ততটা বোধ্য নাও হতে পারে) এই ঝুঁকি বহন করে যে, অন্য উপভাষার বা প্রমিত উপভাষায় শিক্ষিত লোকদের কাছে তা পড়া ততটা সহজ হবে না। এটা সাহিত্যের অর্থনীতির কতটা সহায়তা পাবে তা নিশ্চয়ই বিবেচ্য।

আর-একটা সমস্যা  হলো, শ্রীরায় এই প্রমিত বাংলার কী বিকল্প হবে, তা কখনওই তুলে ধরেন না তাঁর বন্ধু হাসান আজিজুল হক বা হায়াৎ মামুদের কাছে। যদি তাত্ত্বিকভাবে ধরেও নিই যে, একটা বিকল্প হতেই পারে, সে বিকল্প কি রাতারাতি তৈরি করা যাবে? কলকাতার প্রমিত বর্জনই তো শেষ কথা নয়, হাতের কাছে একটা বিকল্প তো নিশ্চয়ই তৈরি থাকা দরকার যতদিন সে বিকল্প তৈরি না হচ্ছে, ততদিন কি বাংলাদেশের লেখকেরা কলম তুলে রাখবেন কলমদানিতে, কম্পিউটারের চাবি টিপা বন্ধ রাখবেন? কোটি কোটি পাঠ্যপুস্তক বুড়িগঙ্গার জলে বিসর্জন দিতে হবে?  কারণ সাহিত্যের ভাষা যদি বাংলাদেশের নিজের কোনও উপভাষা হয় তা হলে তো পাঠ্যপুস্তকও সেই ভাষায় লিখতে হবে , শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে হবে। শ্রীরায় কি এই বিপুল অর্থনৈতিক বোঝা বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দিয়ে সুখী থাকবেন? এ সম্বন্ধে শ্রীরায়ের কোনও বক্তব্য নেই। তিনি শুধু বলেন ‘বাংলা না শিখে আমাদের গত্যন্তর নেই, যেহেতু…সকল কিছু আমাদের লিখতে হয় এবং বলতে হয় প্রমিত বাংলায়’ (শ্রীরায়ের উদ্ধৃতি, ৫৯ পৃ. দ্বিতীয় কলাম)। শ্রীরায় এই কথার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর খুঁজেছে বাংলাদেশে। অর্থাৎ তিনি নিজেও তার প্রতিবাদী অবস্থান বেছে নিয়েছেন। এই অবস্থানের পুরো দায় যে কতটা সে সম্বন্ধে তাঁর ধারণার স্পষ্টতা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।

এখানে তাঁকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। আচ্ছা, এক কলকাতা বা ভাগীরথী-পাড়ের ভাষা তো শুধু পশ্চিমবঙ্গের নয়, ত্রিপুরা, আসাম, ঝাড়খ-,দিল্লি, আন্দামান, এমনকি লন্ডন, আমেরিকা, ক্যানাডাÑ সব জায়গাতেই সাহিত্য রচনায় ব্যবহৃত হচ্ছে। সে সম্বন্ধে তাঁর কোনও প্রতিবাদ নেই? আর এই পশ্চিমবঙ্গের বা সব জায়গায় ব্যবহৃত হবে কেন? মালদহ. পূর্ব মেদিনীপুর,পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভুম, উত্তর আর দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহার, জলপাইগুড়িÑ সে সব জায়গার সঙ্গে কলকাতার ভাষার কী সম্পর্ক?

তা ছাড়া, শ্রীরায় কি বাংলাদেশের  বাঙালিদের কবিতার ভাষাও বর্জন এবং বদলের পরামর্শ দেবেন? কারণ সে ভাষাও একটা ‘প্রমিত’ ভাষা আর তাতেও পরে পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী তীরের ভাষার প্রচুর প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশের কবিতার ক্রিয়াপদ আর সর্বনাম আর অনুসর্গ লক্ষ করলেই তা সকলের কাছে স্পষ্ট হবে।

আর-একটা প্রশ্নও জিজ্ঞেস করি। বাংলাদেশের যেসব লেখকেরা পদ্মার এ পারে জন্মেছেন, পশ্চিমবঙ্গের চলিত (প্রমিত) ভাষা শিখে  বড় হয়েছেন, যেমন হাসান আজিজুল হক বা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানÑ তাঁদেরও কি শ্রীরায়ের পরামর্শমতো এখন বাংলাদেশের কোনও উপভাষায় লিখতে হবেÑযেহেতু পশ্চিমবঙ্গের প্রমিত ভাষায় বাংলাদেশের লেখকদের লেখা তাঁর পছন্দসই? এর উত্তরটা তাঁর কাছে তৈরি আছে আশা করি।

আরও একটা প্রশ্ন : তিনি কি জানেন যে তাঁর এই প্রস্তাবের সঙ্গে বাংলাদেশের মুষ্টিমেয় ভাষাবিচ্ছেদপন্থীদের মতামতের বেশ ঘনিষ্ঠ মিল আছে? যদি জানেন, সে সম্বন্ধে তাঁর বক্তব্য কী? তিনি কি বলবেন যে, আমি একটা তাত্ত্বিক প্রস্তাব তৈরি করেছি মাত্র, তার সঙ্গে কাদের কথার মিল আছে বা মিল নেই সে আমার বিবেচ্য নয়? সে উত্তরের জন্যও আমারা অপেক্ষা করব।

আর শেষ সমস্যাটা, আগে যার ইঙ্গিত করেছি, সেটাও আর-একটা প্রশ্নের আকারে তুলে ধরি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষদের আমাদের কি উপদেশ, এমনকি বন্ধুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেওয়ার অধিকার আছে? তাঁরা বিচার-বিবেচনায় কি আমাদের চেয়ে খাটো? একবারেই তা তাঁরা নন, বরং আমাদের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে অনেক বেশি এগিয়ে আছেন, সংস্কৃতির বহু এলাকার নেতৃত্ব এখন তাঁদের হাতে। তাঁরা নিজেরা যা ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে স্থির করেছেন, সে ব্যাপারে বিচার করার অধিকার আমাদের না তাঁদের ? সিদ্ধান্তের দায়িত্বটা তাঁদের হাতে ছেড়ে দিলে ভালো হয় না? এ নিয়ে তাঁদের পরামর্শ দিতে যাওয়া আমাদের পক্ষে একটু বাড়াবাড়ি নয়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares