ক্রোড়পত্র : জন্মদিনে কবিতার সত্য, পাঠকের আত্মজীবনী ও কামাল চৌধুরীর কবিতা : আলতাফ শাহনেওয়াজ

ক্রোড়পত্র জন্মদিনে

কবিতার সত্য, পাঠকের আত্মজীবনী ও কামাল চৌধুরীর কবিতা

আলতাফ শাহনেওয়াজ

একটি কবিতা লেখা হওয়ার পর থেকে পাঠকের মনে পৌঁছা অবধি যেসব তরঙ্গের মধ্য দিয়ে ওই কবিতাটি গমন করে তার প্রক্রিয়াটি বেশ ঘোরালো। এক বা দুইমাত্র বাক্যে তা পরিষ্কার করা দুরূহই বটে। কেননা কোনো কবিতা ঠিক কীভাবে পাঠকের মনে কাজ করে, সেটি তো আর আগ বাড়িয়ে বলা সম্ভব নয়। তবে এটি বলা বোধকরি অসংগত হবে না, পড়ার পর পাঠকের ভা-ারে রয়ে যায় যেসব পঙ্ক্তি, যে-কবিতা পাঠককে বিস্ময়াভিভূত করে অতঃপর গ্রাস করে তার মনকে, সেই কবিতার মধ্যে একটি শর্ত অবশ্যম্ভাবীভাবে অটুট থাকেÑ এবং একে চিহ্নিত করা যায় কবিতাটির শক্তি হিসেবেওÑ সেটি হলো কবিতার সত্য। ‘শব্দ আর সত্য’ প্রবন্ধে কবি শঙ্খ ঘোষ বিষয়টিকে খোলাসা করেছেন ‘বিচিত্র অভিজ্ঞতার সংঘর্ষে দেখাই কবিতার সত্য’ নামে।

তো, সেই ‘কবিতার সত্য’-এর কাছে পাঠক যেতে পারেন কীভাবে, কবি ও পাঠকের অভিজ্ঞতা কেমন করে মিলে যায় একবিন্দুতে? এ প্রশ্নটি এখন মনের ভেতরে পতাকা তুলেছে কবি কামাল চৌধুরীর কবিতা পড়তে পড়তে।

কবি হিসেবে তাঁর সক্রিয়তা চার দশকের বেশি সময় ধরে। কবিতায় এর মধ্যেই তৈরি করেছেন নিজস্ব একটি পরিম-ল।

কিন্তু যা সকল কবির আরাধ্য সেই ‘কবিতার সত্য’-এর কাছে পৌঁছানো প্রসঙ্গে তাঁর নামটি আসছে কেন?

বলে রাখা দরকার, বাংলাদেশের আরও অনেক কবির কবিতা পড়তে গিয়ে উপরোক্ত জিজ্ঞাসাটি মাথা তুলেছে। কিন্তু সুচিন্তিত এবং বিশেষভাবে এখানে যে কেবল কামালের কথা বলা হলো এর কারণ দশক বিচারে সত্তর দশকের এ কবির কাব্যজগৎটি বহুব্যাপ্ত, বিচিত্র ও অনেক বেশি প্রত্যক্ষÑ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিমুখে ধাবিত। নান্দনিক শর্তগুলো অক্ষুণœ রেখেই কবিতায় তিনি গমন করতে চান একটি প্রকাশ্য গন্তব্যে এবং পাঠককেও স্থিত করতে চান সেখানে। কবিতাটি পাঠের পর পাঠকের যেন ‘বিমোক্ষণ’ ঘটে, এমন অভিপ্রায় সকল কবির, কামালেরও। কিন্তু দুর্ভাবনা হাজির হয় তখনই, যখন এক-দুজন ব্যতিক্রম বাদে কামালের সমকালীন অনেক বিশিষ্ট কবির এন্তার কবিতা পড়ার পরও সেই ‘বিমোক্ষণ’, সেই সারস্বতের খোঁজ পাঠক হিসেবে আমাদের কাছে অধরা রয়ে যায়। ভাবনা আসে, একটি নির্দিষ্ট সময়পর্বের কবিতার মধ্যে এমন ঘটনা কেন ঘটেছে? কবিতার আবশ্যিক যে শর্তÑ শব্দের আভিধানিক অর্থ থেকে বেরিয়ে নতুন অর্থের জš§ দেওয়া, সত্তর দশকের অধিকাংশ কবির কবিতায় সেটি অনুপস্থিত কেন? প্রশ্নগুলোর কাব্যিক ব্যাখ্যা মিলবে, পাওয়া যাবে সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণও। এ লেখায় আমাদের গতিপথ সেদিকে নয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর এ দেশের প্রথম প্রজšে§র কবিকুলের হাতে যেসব কবিতা জš§ নিল, সেগুলোর অধিকাংশের বৈশিষ্ট্য এমন যে, বিবৃতি পুনরূপী বিবৃতিÑআড়ালের আশ্রয় না নিয়ে কবিতা মূলত সরাসরি কথা বলে। আড়ালহীনতা ও আভিধানিক অর্থ থেকে বেরিয়ে নতুন অর্থ তৈরি না হওয়াই আলোচ্য সময়ের কবিতায় ‘বিমোক্ষণ’ না ঘটার পেছনে হয়তো দায়ী। তবে প্রথম থেকেই তাঁর প্রজšে§র কবিদের চেয়ে কামাল উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। কবিতার সারস্বতের কাছে পৌঁছানো এবং ‘বিমোক্ষণ’ সংঘটনের আকাক্সক্ষা তাঁর কবিতায় প্রথম থেকেই বুক-টান করে আছে :

বড় লোভে আমি আবেগাশ্রিত

যেই দেখলাম গোপন মাংস

হয়ে যাই, যাই অবগাহনের হাঁস

সেই দেখি বাঁধা হয়ে গেল

চিরজীবনের সুতো।

 

আজো আমি সেই গোলকধাঁধায়

যত সাঁতরাই, ছেঁড়ে না, ছেঁড়ে না

সবাই ভাবল এই বন্ধন

এই তো মোক্ষÑপ্রাপ্তি, প্রাপ্তি।

 

অভিনন্দন জানাল সবাই

কেউ জানল না শেকল কাহিনি।

 

মাংস আর হাঁসের প্রতীক ব্যবহার করে ‘শেকল কাহিনি’ শীর্ষক কবিতাটি কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ টানাপোড়েনের দিন-এর। নিচুস্বরের এই কবিতার শেষে এসে কবি যে মুহূর্তে উšে§াচন করলেন নিজের শেকল কাহিনি, উপস্থিত হলো অন্য এক ব্যঞ্জনা। আর এর মাধ্যমে কবিতার সারস্বতে আরোহণ করে পাঠক হিসেবে ‘বিমোক্ষণ’ ঘটল আমাদেরও। জীবন দেখাশোনা, জীবন-অভিজ্ঞতাই কি এখানে ধরা দিল না ‘কবিতার সত্য’-এর মোড়কে? বস্তুত, এই কবিতার মতো অনেক কবিতাতেই ‘কবিতার সত্য’ ও সারস্বতের সন্ধান রাখেন কামাল। ফলে তাঁর কবিতা যখন পড়ছি, সেই কবিতার অভিঘাতÑকবিতায় বর্ণিত শব্দমালা বা ‘বিচিত্র অভিজ্ঞতার সংঘর্ষ’Ñ দেখা যাচ্ছে, আমাদের উদ্বেলিত করছে, আছড়ে ফেলছে নতুন এক ভাবনার জগতে। কবির সঙ্গে পাঠকের এই মিলনবিন্দু কি কবিকে স্মরণীয় করে রাখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়? প্রশ্ন-প্রসঙ্গের সাপেক্ষে আবারও উদহারণ জরুরি; এবং এক্ষেত্রে আমাদের অবলম্বন অবশ্যই কবিতা।

কামাল চৌধুরীর উড়ে যাওয়া বাতাসের ভাষা কাব্যগ্রন্থের কবিতা ‘নির্জন গ্রন্থাগার’। কবিতাটি পড়া যাক :

শরীরে শরীর রেখে ফিরে আসি নির্জন গ্রন্থাগারে

প্রচীন ধুলোয় হাত রেখে

পাঠ করি কাম ও অনুশোচনার স্মৃতি

 

প্রতিটি পাঠে আমাদের নদীতীরে

ভাঙা জাহাজের কথোপকথনের ঢেউ

ভেসে আসে

 

সে ঢেউয়ে মোমবাতি জ্বেলে দেখি

নদীগর্ভে বিলীন টেবিলে

আমারই হাতে লেখা পুরোনো পা-ুলিপি

একা একা পাতা ওল্টায়

 

অথচ যেটুকু পাঠের আজ

সেখানেই সাদাপাতা; অচেনা শরীর।

 

মাত্র বারো পঙ্ক্তির কবিতাটি নির্জনতা দিয়ে ঘেরা। আর নির্জনতার আবহ যে এ লেখায় মিলবে সে বিষয়ে ইঙ্গিত রয়েছে প্রথম চরণেইÑ ‘শরীরে শরীর রেখে ফিরে আসি নির্জন গ্রন্থাগারে’। এরপর সেই গ্রন্থাগারে পাওয়া যায় কাম ও অনুশোচনার স্মৃতি, কবির হাতে লেখা পুরোনো পা-ুলিপি, যা আবার একা একা পাতা ওল্টায়। তবে ওই গ্রন্থাগারের যেটুকু পাঠযোগ্য বলে কবির মনে হয়, শেষ পর্যায়ে দেখা গেল সেখানে পড়ে আছে সাদাপাতা এবং সেগুলো শরীরের সমান অচেনা!

এই পুরো ঘটনার মধ্যে একধরনের বৈপরীত্য আছে। কবি তা ব্যক্ত করেছেন পাঠযোগ্য ‘সাদাপাতা’-কে ‘অচেনা’ করে দিয়ে। কবিতাটিতে স্পষ্টভাবেই রয়েছে শরীর-বিষয়। তাহলে এই শরীর, বলা ভালো ‘অচেনা শরীর’Ñ এটি কি মানবজীবনের প্রতীক? মানুষ যে জীবন যাপন করে এবং সযতেœ যে জীবন সে যাপন করতে চায়, শেষ অবধি সেটি কি তার করতলে, চেনা চৌহদ্দিতে থাকে সব সময়? এক পর্যায়ে এসে পেরিয়ে আসা জীবনকে কখনও তো অচেনা বলেও মনে হয়। নৈমিত্তিক অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধিই তাকে বাতলে দেয় অচেনা হওয়ার পথ। আবার এমনও তো ঘটে, একসঙ্গে গোটা জীবন পার করার পরেও সঙ্গীটি অচেনাই থেকে যায়, চিনতে পারি না আমরা। এ-ও জীবনের স্বাভাবিক সত্য, অভিজ্ঞতার অন্তর্গত বটে। ফলে ‘নির্জন গ্রন্থাগার’ কবিতাটি কবির সঙ্গে পাঠকের যে মেলবন্ধন তৈরি করে সেটি অভিজ্ঞতার, উপলব্ধির।

আমরা তখনই কোনো কিছুর সঙ্গে একান্ত বোধ করি যখন সেটি আমার মনে হয়; যা বলা হলো সে কথা তো আমারই। ‘নির্জন গ্রন্থাগার’ অবলীলায় সেই ‘আমার’ কথাটি বলে। ঘা দেয় আমাদের চেতনায়,  শেষে দাঁড় করিয়ে দেয় এমন এক সত্যের সামনে যেখানে আমরা কেবল বিস্ময়াভিভূত, অসহায়ও।

২.

‘শব্দ আর সত্য’ প্রবন্ধে শঙ্খ ঘোষ আরও বলেছেন, ‘কবির আমি আর তার বাইরের সমাজ কেবলই মুখোমুখি হয়, কেবলই তার সংঘর্ষ, আর সেই সংঘর্ষ থেকে কেবলই আরেকটি তৃতীয় সত্তার উšে§ষ। তাই, চলমান এই জীবনের সামনে নিজের জীবনকে এনে রাখা, গড়ে তোলা এবং তৃতীয় এই সত্তার দিকে নিরন্তর আবর্তনের মধ্যে আমরা দেখতে চাই আজকের দিনের ক্ষুধার্ত-কবিকে, সমস্ত কবিকেই, যিনি ঠিক-ঠিক বলতে পারেন যে কবিতার কাজ হলো ‘যা সত্য তাকে সরাসরি বলা’, নিজের যে সত্যের সঙ্গে নিজের কোনো কারচুপি চলে না কখনও। কামাল চৌধুরীর কবিতার অন্দর-বাহির দেখে বলা যায়, উল্লিখিত ‘কারচুপি’র লেশমাত্র নেই সেখানে। জীবন-অভিজ্ঞতাকে কাব্যে রূপান্তর করেন তিনি। যা সত্যÑ আড়েঠাড়ে নয়, সেটি বলেন সরাসরি। তাঁর কবিতার যে কর্তাটি ‘তৃতীয় সত্তা’, বোধ করি তার নাম ‘বিমোক্ষণ’, সারস্বত কিংবা উপলব্ধি।

যেকোনো মহৎ কবির কবিতাতেই এই তিন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। চর্যাপদ-এর পদকার থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা জীবনানন্দ দাশÑ সকলের কবিতাই শেষ পর্যন্ত এক বিহ্বল উপলব্ধি ও কবিতা-সত্যের সামনে নতমুখে দাঁড় করিয়ে রাখে আমাদের। রবীন্দ্রনাথে যেমন, ‘রূপ-নারানের কুলে/ জেগে উঠিলাম;/ জানিলাম এ জগৎ/ স্বপ্ন নয়।/ রক্তের অক্ষরে দেখিলাম আপনার রূপÑ/ চিনিলাম আপনারে/ আঘাতে আঘাতে/ বেদনায় বেদনায়;/

সত্য যে কঠিন,/ কঠিনেরে ভালোবাসিলামÑ’। (রূপ-নারানের কুলে)

আবার জীবনানন্দের কাছে গেলে পাওয়া যাবে, ‘আলো-অন্ধকারে যাইÑ মাথার ভিতরে/ স্বপ্ন নয়,Ñ কোন্ এক বোধ কাজ করে!/ স্বপ্ন নয়Ñ শান্তি নয়Ñ ভালোবাসা নয়, হƒদয়ের মাঝে এক বোধ জš§ লয়!’ (বোধ)Ñ কোনো কবির কবিতার এই ‘বোধ’, এই ‘সত্য যে কঠিন’ই যে মুহূর্তে পাঠককে বিমূঢ় করে তার মনকে তছনছ করে দেয়, কবিকে তার বড় আপনার মনে হয়। আর এই কাজটি যাঁরা পারেন, পাঠকের দপ্তরে তাঁরাই স্মরণযোগ্য কবি।

কামাল চৌধুরীর কবিতায়ও ওই ‘বোধ’ ও ‘সত্য’ যুগপৎভাবে আছে, অজস্র পঙ্ক্তিতে। তাঁর আরেকটি কবিতার দিকে চোখ ফেরাই :

কোটরে ফাটল, জানালাটা খোলা রাখোনি

বাইরে অচেনা মরুঝড়ে ওড়ে রাত্রি

খড়ের গাদায় ঘুমিয়ে পড়ব ভাবিনি

বেঁকে যাওয়া পথ অনিকেত আজ বৈরী

 

তবুও জামাটা উড়িয়ে ডেকেছি তোমাকে

রুদ্ধ দিনের বাতায়নে তুমি পুষ্প

সকলেই জানে আমার মানুষ খেয়ালি

ছাই থেকে দ্রোহ নিয়েছে পথিক জš§

 

প্রতিদিন আমি জš§াতে পারি মৃত্যুÑ

তোমার প্রেমের মহুয়াপাতার দহনে

নিষিদ্ধ তবু প্রবাসে মশাল রেখেছি

আমার আলোক অভিসার অতি তীব্র

 

মাথার ওপর অচেনা দিনের ধূলিকে

অস্থি-গ্রন্থি-হাড়ে বানিয়েছি বাষ্প

আমার স্বপ্ন মাটি থেকে ওঠে উঁচুতে

অভিলাষ আমি জীবিত রাখি না গল্পে

 

আমার সময় অবয়বহীন প্রান্তে

প্রতিদিন এসে শোনাবে নতুন সত্য

সেখানে তোমাকে জানালাটা খুলে দাঁড়িয়ে

বীজ থেকে ফের জš§াতে হবে মাটিতে।

 

হে মাটি পৃথিবীপুত্র গ্রন্থের ‘সংশপ্তক’ শিরোনামের কবিতাটি জানান দিতে চায় ‘নতুন সত্য’। এক্ষণে কবিতা ব্যবচ্ছেদ করে দেখা যাক এই জানান-প্রক্রিয়ায় কবি এখানে কী কা- ঘটালেন, কোন বোধ এবং সত্যের ভেতর আমাদের প্লাবিত করল সংশপ্তক?

‘তুমি’ নামে একজনের উদ্দেশে নিবেদিত এ কবিতায় স্বাভাবিকভাবে ‘আমি’র অস্তিত্বও আছে। ধরে নেওয়া যেতে পারে, কবিতায় উক্ত ‘আমি’ স্বয়ং কবিই। ‘তুমি’ তবে কে? এখানে যেহেতু প্রেমের উদ্ভাস গোপন নেইÑ ‘তোমার প্রেমের মহুয়াপাতার দহনে/ নিষিদ্ধ তবু প্রবাসে মশাল রেখেছি’Ñ এবং আছে ‘অভিসার’-এর প্রসঙ্গওÑ তাই ভাবার অবকাশ থেকে যায়, ‘তুমি’ নিশ্চয় কবির প্রেম, প্রেমের উদ্দেশেই যা কিছু বলা। কিন্তু পর মুহূর্তে শেষ প্রান্তে এসে যখন বলা হলো, ‘আমার সময় অবয়বহীন প্রান্তে/ প্রতিদিন এসে শোনাবে নতুন সত্য/ সেখানে তোমাকে জানালাটা খুলে দাঁড়িয়ে/ বীজ থেকে ফের জš§াতে হবে মাটিতে।’; কবিতাটি এই সময় আর প্রেমের একরৈখিক বৃত্তে আবদ্ধ থাকল না, সেটি বরং বিস্তারিত হলো বহুরৈখিক বোধের সত্যেÑ শঙ্খ বাবুর বলা সেই ‘তৃতীয় সত্তায়’। ‘…সংঘর্ষ থেকে কেবলই আরেকটি তৃতীয় সত্তার উšে§ষ’Ñ সেই ‘সত্তা’ এ কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিধৃত।

উপরন্তু কবিতার শেষ চার পঙ্ক্তিতে আছে ভবিষ্যৎ-কাহনÑ নতুন সত্য শুনিয়ে বীজ থেকে মাটিতে জš§ানোর কথা। শব্দ-বাক্যে পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করে এই যে ভবিষ্যতের কথা বলা, কবিতার অন্তে উপনীত হয়ে শোনা গেল চূড়ান্ত উচ্চারণ, সেখানে ‘নিজ’ আর ‘অপর’-এর নিবিড় বাতাবরণে প্রকারান্তরে যেন নিজের সঙ্গে কথা বলার ফুরসতই মেলে বেশি। পাওয়া যায় সেই সত্যের স্পর্শ, যেখানে বারবার পৌঁছাতে চান কবিরা। রবীন্দ্রনাথ ‘কঠিনেরে ভালোবেসে’ সেখানে পৌঁছেছেন, জীবনানন্দ গিয়েছেন ‘হƒদয়ের মাঝে বোধ জš§ লয়’ বলে। পক্ষান্তরে ‘সংশপ্তক’-এ কামালও এক নবীন বোধের কথাই বললেনÑ কবির নতুন জšে§র কথা।

কবিতা থেকে কবিতায় প্রতিনিয়ত নতুন সত্য উদ্ঘাটন করতে চান কবিরা, সেই সত্যও গোপন নেই সংশপ্তক-এর চরণগুলোতে। মাত্রাবৃত্তে লেখা এ কবিতা বিন্যস্ত হয়েছে ৬+৬+৩ চালে। অতিপর্ব হিসেবে রয়েছে ৩-এর স্বচ্ছন্দ চলন। ফলে মাত্রাবৃত্তের স্বভাবিক স্বর অক্ষুণœ থাকার পরও প্রত্যেক পঙ্ক্তিশেষে অতিপর্ব ৩-এর বিন্যাস গোটা কবিতায় তৈরি করে ভিন্ন এক দ্যোতনা, যা বাংলাদেশের কবিতায় খুব একটা লভ্য নয়। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে কামালের হাতযশ বলার মতো। ‘বিপরীত বর্ষা’, ‘অপেক্ষা’, ‘লালকমল’, ‘করতাল’, ‘মহুয়া-মুক্তি’, ‘পুরাতন খেলা’সহ বহু কবিতায় ছড়িয়ে আছে সেই নিদর্শন।

 

৩.

 

দুরন্ত চাঁদ আলোভরা ছায়াপথ

চারদিকে ফোটে মৃত্যুর গাছে ফুল

মল্লিকা আজ বেড়াতে এসেছে বনে

সবুজ পাতায় শিশিরের এলোচুল।

 

পথ হারালেই বাউল বাতাস সুখী

বুনোচাঁদ ডাকে, ‘ঘুমিয়ে পড়ব আয়’

প্রশান্ত ধূলি অচেনা পাতায় শোব

আজ সঙ্গিনী উš§াদ দেহ চায়।

 

মৃত্যুর গাছে ডালে ডালে নাচে পাখি

তরুণ শেকড় আজ তরুদের স্বামী

চারিদিকে যদি এত অফুরান রাত

কবিতা লিখুক তবে অন্তর্যামী।

 

মাত্রাবৃত্তে ৬+৬+২-এর চলনে লেখা ‘প্রেরণা’ নামের কবিতার ছন্দ-প্রকৌশলটি লক্ষ্য করুন। এসেছি নিজের  ভোরে কবিতা বইয়ের অন্ত্যমিলসম্পন্ন কবিতাটির ছান্দিক গঠন খুবই প্রথাগত। কিন্তু এ স্থির কাঠামোর মধ্যে ভাবনা ও ভাবের যথাযথ মিথস্ক্রিয়তা এবং অনিবার্য শব্দের অনিবার্যÑ বলা ভালো সুচারু বিন্যাসের কারণেÑ কবিতাটি প্রথাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে নিমেষেই। ‘বুনোচাঁদ ডাকে, ‘ঘুমিয়ে পড়ব আয়”Ñ লাইনের পরেই বসছে একটি আকাক্সক্ষাÑ ‘প্রশান্ত ধূলি অচেনা পাতায় শোব’, তারপর সিদ্ধান্তÑ‘আজ সঙ্গিনী উš§াদ দেহ চায়।’Ñ তিন পঙ্ক্তির মধ্যকার অন্তর্নিহিত পারম্পর্য প্রথমে ভাব পরে হাজির করে ভাবনাকে। আর এই অভিন্ন কৌশলে বিন্যস্ত কবিতার প্রতিটি স্তর। অন্তিম পর্বে গিয়ে তা সারস্বতমূলক উপলব্ধিও মেলে ধরেছে ‘কবিতা লিখুক তবে অন্তর্যামী’র মাধ্যমেÑ অনেক সিদ্ধান্তের শেষে এ যেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, উচ্চারিত হলো মন্ত্রের মতো।

ছন্দ হতে পারে কামালের কবিতার শোভা, তবে ছন্দ ছাপিয়ে কবিতাগুলো দাঁড়িয়ে থাকে ‘সত্যে’র সৌরভে; ধাপে ধাপে তারা এগিয়ে চলে কবির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে।

 

৪.

 

কথা শুরু হয়েছিল কবিতার সত্য নিয়ে, অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধির অদ্বৈত বন্ধনে যে সত্য নির্মাণ করেন কবি। এই সত্য নির্মাণে কবিভেদে প্রত্যেকের রাস্তাও ভিন্ন। তবে আমাদের এই লেখার কর্তা যেহেতু কামাল চৌধুরী ও তাঁর কবিতা, তাই কবিতা নিয়ে কবির ভাবনাটি জানাও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এক সাক্ষাৎকারে তাঁর ভাষ্য, ‘কবি যা-ই লেখেন, তা তাঁর আত্মজীবনীর অংশ, সেটা তাঁর স্বপ্নের অংশ। কবি মেমোয়ার্স লেখেন, কিন্তু তা আরেকজনের মতো নয়। কবি মেমোয়ার্স লেখেন ছোট ছোট বিন্দু দিয়ে।’ ছোট ছোট বিন্দুর মাধ্যমে বিগত চল্লিশ বছর ধরে কামাল নিজের যে আত্মজীবনী রচনা করেছেন তাঁর কবিতায়, নিশ্চিতই সেগুলো তরঙ্গ তোলে আমাদের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিতে। চূড়ান্ত কথাÑ কবিতার উদ্দিষ্ট বাক্যটি বলার জন্য প্রথমে তিনি গড়ে তোলেন একটি আবহ। পরের ধাপে অনেকটা মন্ত্র উচ্চারণের ভঙ্গিতে বলে ফেলেন বলার কথাটি। (যেসব কবিতা ব্যবহƒত হয়েছে এ লেখায়, সেগুলোর দিকে আরেকবার দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে) এক ধরনের সাংঘর্ষিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পাঠকের সামনে অতঃপর যখন প্রকাশিত হয় কবি কামাল চৌধুরীর কবিতার সত্য; পাঠকের অবস্থাও তখন সাংঘর্ষিকÑ অপ্রত্যাশিত সত্যের সামনে তারা হতচকিত, বিহ্বল।

শেষে আমরা দেখি যে তাঁর কবিতাগুলো হয়ে উঠেছে আমাদেরও আত্মজীবনী, পাঠকের আত্মজীবনী!

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares