ক্রোড়পত্র : জন্মদিনে জ্যোৎস্না হবে রৌদ্র লেখা বোন : স্বপন নাথ

ক্রোড়পত্র জন্মদিনে

জ্যোৎস্না হবে রৌদ্র লেখা বোন

স্বপন নাথ

কবি কামাল চৌধুরীর কবিতাচর্চার শুরু সত্তর দশকে। সহজেই বোঝা যায় এদেশের মুক্তিসংগ্রামের উত্থানপর্বে তাঁর কাব্যচর্চা ও বিকাশপর্ব। তিনি একজন সংবেদনশীল কবি ও মানুষ হিসেবে আত্মস্থ করেছিলেন এ ভূখ-ের মানুষের আবেগ ও অনুভূতির স্বর। ফলে, তাঁর কবিতায় অনিবার্যভাবে এসেছে এদেশের মাটি, মানুষ, প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিচিত্র রং ও রেখা। বহু দ্বন্দ্বপঙ্কিল সমকাল, ঐতিহাসিক ধাপ ও ইতিহাসের পর্বগুলোকে তিনি ধারণ করেছেন সহাস্যে। এ বিষয়গুলো ধারণ করেই কবিতা সৃজন করেছেন প্রচল ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা ও বিনির্মাণের স্বপ্নে। সুতরাং, তাঁর লেখায় ওই প্রচল অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া বা আপোসকামিতার গন্ধ নেই। ব্যক্তিগত অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও তিনি স্বপ্ন দেখেন, বুনন করেন বিপ্লবী শিল্পীর সুর ও স্বরে। তিনি সহজেই লিখে ফেলেন, ‘মিছিলের সমান বয়সী’। এখানেই কবি কামাল চৌধুরীর কবিতার লাবণ্য। কবিতা বিপ্লব তৈরি করে কিনা, নিশ্চিত নয়। আবার সাহিত্য, শিল্প, চলচ্চিত্র কিংবা কবিতা, যেকোনো শিল্পমাধ্যমই বলি না কেন মানুষকে আনন্দ-বেদনায় উদ্বেলিত করতে সক্ষম। তা না হলে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল, সুকান্ত, পাবলো নেরুদা, নাজিম হিকমত, প্রমুখের কবিতা মানুষ পাঠ করত না, শুনত না। সুতরাং, কাল থেকে কালান্তরে মানুষের সহবাস একইসঙ্গে সুর এবং অসুরের সাথে। শিল্পকলা, নান্দনিকতা ও যুদ্ধের সাথে। কবিতা এক্ষেত্রে মানুষের ওই আবেগ ও অনুভূতির তন্ত্রীতে দোলা দেয়। কবিতা বিষয়টি না বুঝেও কবিতার মতোই মানুষ আচরণ করে সেই আদি সময় থেকে। কবিতা মানুষের সাথেই ¯্রােতের মতো বহমান। সাহিত্য শিল্প কবিতায় এমনকি বিজ্ঞানের মাধ্যমে ওই প্রকৃতি ও পরিবেশের পুনরাবিষ্কার, বিনির্মাণ হচ্ছে। কবিতা সংগ্রহের ভূমিকারূপ Ñ ‘কবিতা কি আমার কথা শোনে’Ñ যেখানে কামাল চৌধুরী লিখেছেন, ‘মানবজীবন কিছু মৌলিক বিষয়কে ঘিরে আবর্তিত। প্রেম, প্রকৃতি, মানুষ, দেশকাল, ক্ষুধা, যৌনতা, যুদ্ধ, জন্ম-মত্যু এসবের বাইরে মৌলিক বিষয় খুব বেশি নেই। কবিতাও আবর্তিত এসব অনুষঙ্গের বিচিত্র ব্যবহারে। কবিকে তাই দাঁড়াতে হয় বহু ব্যবহৃত, বহুচর্চিত অথচ বিস্তৃত অসীম বলয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির উন্মাদনায়। শুধু আবেগ ও স্বতঃস্ফূর্ততায় কবিতা হয় না- কবিতায় স্বাভাবিক ব্যাকরণ, কাব্য বিবর্তনের ইতিহাস, প্রকরণ ছন্দ ও অলংকার সম্পর্কেও সম্যক অবহিত থাকতে হয়। এসবই স্বাভাবিক কবি হয়ে ওঠার পূর্বশর্ত।’ তাহলে কবি কামাল চৌধুরী মানবজীবনের সেই অতি স্বাভাবিক অথচ অলঙ্ঘনীয় বিষয়গুলোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন?- এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, করেছিলেন বলেই তিনি মহৎ কবি হিসেবে তাঁর স্বীয় ভুবন তিনি নির্মাণ করেছেন। কাব্যচর্চায় তিনি নিরলস নিষ্ঠায় নিয়োজিত, কখনও ছেদ পড়েনি। এক্ষেত্রে যদি প্রশ্ন করা যায়- তিনি কি তৃপ্তিবোধ করেছেন? নিশ্চয়ই তিনি অন্য সৃজনশীল ব্যক্তির মতোই বলবেন- না। কবি কখনওই তৃপ্ত হতে পারেন না। এ তৃপ্তিবোধ শুধু শিল্পসৃজনের নয়। মূলত, এ বিষয়টিই কবিতার গৌরব ও কবিতাকে প্রতিষ্ঠা দেয়। কবি কামাল চৌধুরীর কবিতা পাঠকের চিন্তায় ভিন্ন পাঠ তৈরির প্রতিক্রিয়াকে প্রণোদিত করে, উসকে দেয়। এখানেই তাঁর কবিতার মহত্ত্ব। ফলে, পাঠক হিসেবে আমরা বলতেই পারি কবিতা তাঁর কথা শোনে। তিনি কবিতাকে মহাকালের শূন্যতায় ছেড়ে দিয়েও নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

সৃজনশীল মানুষের আত্মগত ভাবনা থাকবেই। এখানেই কাব্যলক্ষ্মী অবস্থান করেন। হয়তো তাঁর সূচনাপর্বে একটু বেশি ছিল। ক্রমান্বয়ে কেটে গেছে আত্মগত বেদনা ও ভাবনার প্রলেপ। যেখানে নতুন ভূমি ও স্বতন্ত্র সত্তার উত্তরণ লক্ষণীয় :

ক. আজ বাতাসের মন খুব ভালো

আজ তার বেড়াবার শখ

মাঝরাতে নক্ষত্র জে¦লেছে আলো

জোছনা ঠিকরে পড়ে রাত্রির উদ্যানে।

(আজ বাতাসের মন, কবিতা সংগ্রহ, পৃ ৮৭)

 

খ. ওভার কোটের ভেতর ঢুকে থাকা শীত

ঘাপটি মেরে বসে থাকল

মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল ওজোন স্তরের সবগুলো ফুটো

কচ্ছপের উঁচু পিঠে সমুদ্র ধাবিত হচ্ছিল পৃথিবীর দিকে

সেও অকস্মাৎ লজ্জা পেয়ে পিঠ ডুবিয়ে দিল জলে।

(জলবায়ু পরিবর্তন : কিয়েটো সম্মেলনের ডায়েরি থেকে,  ক স, পৃ ১৮৮)

 

গ. এই গল্প শুরু হলো রোদেলা দুপুরে

দুপুর গড়িয়ে যায় গালগল্প হয় না নিঃশেষ

জগতের ক্লান্তি এসে চিৎকারে মিশেছে রাস্তায়

কোথায় দাঁড়ালে আজ ছায়া পাবে পথের মানুষ?

(মধ্যদুপুরের গল্প, ক স, পৃ ৯১)

 

শিল্পীরা বলেন শিল্পের ভাষায়। যা আন্দোলিত করে সাধারণ মানুষকেও। সব মানুষ তো রাজপথে বা জনতার কাতারে মাঠে গিয়ে বলে না বা বলতে হয় না যে Ñ বিপ্লব চাই, পরিবর্তন চাই। সংবেদনশীল ব্যক্তি হিসেবে কে না চায় সমাজপরিবর্তন, রূপান্তর। শুভ সমাজের আকাক্সক্ষায় নিয়োজিত করে নিজেকে। সচেতন ব্যক্তি মাত্রই লড়াই করে শিল্পে, মাঠে ও রাজপথে। সংগ্রমের পথপর্যবেক্ষণ করে কবি কামাল চৌধুরী কবিতায় বলেছেন অকপটে তাঁর স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষার কথা। সেখানেই তাঁর গতি থেমে থাকে না। এ গতিময়তা ও সমাজের অসংগতি অবলোকনের অনুপ্রেরণায় লিখে চলেছেন প্রতিনিয়ত। এজন্যই অতৃপ্তির বেদনা তাঁকে ঘিরে রাখে অবিচল। কিন্তু তাঁর ভ্রমণ তিনি আটকে রাখেন না প্রচল কাঠামোতে। চিন্তা ও আবেগের ধ্বনি ছড়িয়ে দেন কবিতার শব্দ ও পঙ্ক্তিতে। তিনি চিরায়ত অতৃপ্তিতে লিখেন :

‘চাষাবাদ হলো ঢের এ জীবনে

ফলমূল শস্যদানার

একত্রিশ বছর গেল জাগতিক ভূমি কর্ষণে

ক্ষয়ে গেল উর্বরতা মাটি ও বোধের

আকাক্সক্ষার চাষাবাদ হলো না তবুও।

(আকাক্সক্ষার চাষাবাদ, ক স, পৃ )

 

এ অতৃপ্তিবোধই তাঁকে প্রেরণায় উদ্দীপ্ত করেছে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে। ব্যক্তিগত বেদনার দেয়ালে আটকে থাকে সাধারণ মানুষ। কবি তা থেকে নিজেকে মুক্ত করেন নিজেকে। এ অতিক্রমণের শক্তি কবিকে নিয়ে যায় সামষ্টিক ভূগোলে। যেখানে ব্যক্তিসত্তা নিষ্প্রভ, আলোকময় উজ্জ্বল থাকে কবিসত্তা। কবি কামাল চৌধুরী সে সত্তাকেই পরিচিত করে তুলেছেন প্রারম্ভিকপর্বে। তিনি কী বার্তা পৌঁছে দিতে আগ্রহী, তা সবই বলেছেন কবিতায়। মানবিক ও জনমানুষের অধিকারের প্রশ্নে দায়বদ্ধতায় তিনি দৃঢ়তার সাথেই ঘোষণা করেন :

‘পাথরে আঘাত করো, খুলে ফ্যালো বেণীর জড়তা

ভেঙে ফেলি রাষ্ট্রসংঘ তন্ত্রমন্ত্র সামাজিক শ্রেণী

নতুন বিন্যাসে এসো তুমি আমি পৃথিবী বানাব।’

(রক্তাক্ত পঙ্ক্তিমালা ০৫, ক স, পৃ ৩৪)

 

তিনি ধারণ করেছেন দেশ-জাতির উত্থান, জাতিসত্তায় প্রত্যাবর্তনের আন্দোলন-সংগ্রাম। ক্রমেই এক্ষেত্রে সংযোজিত হয়েছে দেশাত্ববোধ, দেশপ্রেম ও সমাজরূপান্তরের স্বপ্ন। সামষ্টিক প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসেবে, পরিসংখ্যানগত ব্যবধানে আহত হয়েছেন। এসবের কাছে কবি আত্মসমর্পণ করেননি। কারণ, তিনি জানেন শিল্পের কাজ হলো মানুষকে চলমানতায় সচেতন করা; দ্বিতীয়ত চলমান কাঠামোকে ভেঙে ফেলে নতুনভাবে নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা করা। সমূহ সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকৃতি জানিয়ে কবিতার ভাষায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যা, পরে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুতি, রাষ্ট্র ও সমাজে অপশক্তির ক্ষমতা দখল ইত্যাদিতে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

স্বপ্নভঙ্গের চালচিত্রে মাঝে মাঝে হত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, এটা সত্য। কিন্তু হতাশা ও কষ্টে দগ্ধীভূত হলেও বন্ধ করেননি তাঁর স্বপ্নের বয়ান প্রকাশে ও প্রচারে। সেখানে যোজিত হয়েছে বিদ্রোহ ও সংক্ষুব্ধতা। ফলে, কবিতার বিষয়বৈচিত্র্যে বিভিন্ন স্বরের উপস্থিতি তাঁর কবিতাকে ঋদ্ধ করেছে, তা বলাই বাহুল্য। তবে সেখানে আবার প্রত্যয়ে চেতনায় ফিরে আশার স্বপ্নকে ত্যাগ করেননি। বলেছেন, ‘এখন আরাধ্য কাজ শুধু জেগে ওঠা’। পুনরায় যখন লক্ষ করেছেন পশুত্ব, ভেদাভেদ ইত্যাদি অপসৃত হচ্ছে।  রাষ্ট্র ও সমাজে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য, মূল্যবোধে জনগণ স্থিত হচ্ছে, তখন তিনি আত্মবিশ^াসে লিখেছেন কবিতা। আত্মশুদ্ধিতে তাঁর শব্দচয়ন ও বাক্য নির্মাণ অনেক বেশি দৃঢ় ও প্রত্যয়ী। ’৭১-এ প্রজ্বলিত আলোতেই তিনি অবগাহন করতে প্রয়াসী। উদাহরণ লক্ষণীয় :

ঘাতকের হাতে দ- দিয়েছি তুলে

শূলে চড়িয়েছি স্বপ্নের মহাকাল

ভুল হয়ে গেছেÑ এখন শুধরে নেব

ছাড়ব না তবু কিছুতেই ছাড়ব না।

এক জীবনে যদিবা ব্যর্থ হই

এই তলোয়ার পুত্রকে দিয়ে যাব।

(প্রতিশোধ, কবিতা সংগ্রহ, পৃ ৯১)

 

যতই বিরহ-দুঃখ-বিষাদের ছায়া গ্রাস করে তাঁকে। অবশেষে তিনি এ দেশ ও প্রকৃতির নিবিড়তায় নিজেকে আবিষ্কার করেন। তাঁর ব্যক্তি ও কবিসত্তাকে খুঁজে পান। বিভ্রান্তির নিশ্চয়তার বিপরীত পথে অভিযাত্রা। আগেও উল্লেখ করেছি বিষয়বৈচিত্র্যে তাঁর কবিতা বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। কবি কামাল চৌধুরী প্রেম, প্রকৃতি, বিদ্রোহ-বিপ্লব, মুক্তিযুদ্ধ দেশপ্রেম, সততা ন্যায়নিষ্ঠতাকে কবিতার অনুষঙ্গী করেছেন। প্রকৃতির অনুষঙ্গে প্রকাশ করেছেন স্তরবহুল জীবনের বিচিত্র ভঙ্গিমা ও মাত্রা। যেখানে জীবকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়। এ গ্রাম-বাংলার নিসর্গে তিনি জীবনের ধাপগুলোকে বিকশিত করেছেন এবং এর আলোতেই শিল্পের ভুবন নির্মাণে প্রয়াস পেয়েছেন। ফলে, প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান অনুষঙ্গী হয়েছে অনিবার্যতায়। বস্তুত, কবিতা ও প্রকৃতি হয়ে উঠেছে পরস্পর নির্ভরশীল। খুঁজেছেন নিজের অস্তিত্ব, এ যেন নিজেকে শেকড়ের কাছে যাবার জন্য অলোকসামান্য আত্মপরিক্রমণ। এখানে একটি দ্রোহ লক্ষণীয়, কবিতার নির্জনতার মতোই। প্রসঙ্গত, যে দীর্ঘ উপনিবেশের ছায়ায় বাংলা সাহিত্যসহ পৃথিবীর অন্য সাহিত্যের বিকাশ ও পুষ্টি সেখান থেকে কবিতার ভাষা নির্মাণে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টায় কবি কামাল চৌধুরী, তাঁর স্বতন্ত্র ভাষা সৃষ্টিতে এ উপনিবেশের মনোজাগতিক প্রভাব অস্বীকার করেছেন। ‘কলাপাতায় শিরনি দে ভাই/ এইখানে আজ ঘর বানাবো/ সব শালাদের ঘাড় কাটবো যেই শালারা/ বাধা দেবে/ খিস্তি গাবে/ চৌদ্দপুরুষ এক করবে/ সব শালাদের ঠোঁট কাটবো, চ্যাং দেখাব আমার নিজের।’ অথবা, যখন বলেন,Ñ

‘চুম্বনে শুষে নিয়েছি আমি তার অশ্রু/ একটু আগেও সে কাঁদছিল থেমে থেমে/ এখন সে টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের মেয়েদের মতো হাসছে। / চুম্বনে শুষে নিয়েছি আমি তার বেদনা সকল।’

এ ভাষাই বলে দেয় তিনি কোন ভাষায় কবিতা নির্মাণে প্রয়াসী এবং কী বার্তা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চান। এক্ষেত্রে তাঁর কবিতায় উপনিবেশ-উত্তর, স্বাধীন ভূমি তৈরির প্রয়াস লক্ষণীয়। স্থান-কাল বিবেচনা, মানুষের সচলতায় বিভ্রান্তির ধারাবাহিকতা লক্ষণীয়। এ বিষয়কে অস্বীকার করার উপায় নেই। তারপর এ জটিলতার মধ্যে আত্মপরিচয়ের সংকট অতিক্রমণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সেখানে নির্মিতির স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য আপন আদল তৈরি করে নিতে পারে। এ শেকড় সংস্কৃতি আগলে রাখতে পারে নিজেকে এ ডামাডোলের সময়ে। একালের চিন্তক হোমি ভাবা এ সংকট ব্যাখ্যায় স্থানবিচ্যুতি, সচলতা, সংকরায়ণ ইত্যাদি বিষয়কে সামনে এনেছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘ঈঁষঃঁৎব ধং ধ ংঃৎধঃবমু ড়ভ ংঁৎারাধষ রং নড়ঃয ঃৎধহংহধঃরড়হধষ ধহফ ঃৎধহংধঃরড়হধষ. ওঃ রং ঃৎধহংধঃরড়হধষ নবপধঁংব পড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু ঢ়ড়ংঃপড়ষড়হরধষ ফরংপড়ঁৎংবং ধৎব ৎড়ড়ঃবফ রহ ংঢ়বপরভরপ যরংঃড়ৎরবং ড়ভ পঁষঃঁৎধষ ফরংঢ়ষধপবসবহঃ, যিবঃযবৎ ঃযবু ধৎব ঃযব দসরফফষব ঢ়ধংংধমব’ ড়ভ ংষধাবৎু ধহফ রহফবহঃঁৎব, ঃযব দাড়ুধমব ড়ঁঃ’ ড়ভ ঃযব পরারষরুরহম সরংংরড়হ, ঃযব ভৎধঁমযঃ ধপপড়সড়ফধঃরড়রহ ড়ভ ঞযরৎফ ড়িৎষফ সরমৎধঃরড়হ ঃড় ঃযব বিংঃ ধভঃবৎ ঃযব ঝবপড়হফ ডড়ৎষফ ধিৎ, ড়ভ ঃযব ঃৎধভভরপ ড়ভ বপড়হড়সরপ ধহফ ঢ়ড়ষরঃরপধষ ৎবভঁমববং রিঃযরহ ধহফ ড়ঁঃংরফব ঃযব ঞযরৎফ ডড়ৎষফ. ঈঁষঃঁৎব রং ঃৎধহংধঃরড়হধষ নবপধঁংব ংঁপয ংঢ়ধঃরধষ যরংঃড়ৎরবং ড়ভ ফরংঢ়ষধপবসবহঃ- হড়ি ধপপড়সঢ়ধহরবফ নু ঃযব ঃবৎৎরঃড়ৎরধষ ধসনরঃরড়হং ড়ভ দমষড়নধষ’ সবফরধ ঃবপযহড়ষড়মরবং- সধশব ঃযব য়ঁবংঃরড়হ ড়ভ যড়ি পঁষঃঁৎব ংরমহরভরবং, ড়ৎ যিধঃ রং ংরমহরভরবফ নু পঁষঃঁৎব, ধ ৎধঃযবৎ পড়সঢ়ষবী রংংঁব.’’ (ঞযব খড়পধঃরড়হ ড়ভ ঈঁষঃঁৎব. চ ২৪৭)

ফলে, সংকটের উৎস বুঝে নিলে উত্তরণের উপায়ও বের করা সম্ভব হয়। কামাল চৌধুরী স্বীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। এ সংকটের মাত্রা বুঝেন বলেই কবি স্বীয় প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ভাষা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উপাদানগুলোকে প্রয়োগ করেছেন কবিতায়।  এক্ষেত্রে দুটি অর্জন এসেছে তাঁর, প্রথমত  তিনি কবি হিসেবে পরিচয়কে চিহ্নিত করেছেন, দ্বিতীয়ত  সামষ্টিক দায়িত্ব পালনে সকলের মধ্যে একজন হয়ে উঠেছেন। অনেকক্ষেত্রে রহস্যময়তা সৃষ্টি করেছেন বিভিন্নভাবে, নানা অনুষঙ্গে। ওই বিশেষত্বে কবিতার নির্মিতিতে তাঁর অনন্যতা অবশ্যই স্বীকার্য। এর মধ্যে চিন্তা ও ভাবনার বাহন হিসেবে নির্মুখ প্রকৃতির উপাদানগুলো অন্যতম। তাঁর জীবনের জীবনের অলিগলিতে প্রদক্ষিণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে। যেহেতু কবিতা সেহেতু এখানে প্রতীকী ব্যঞ্জনা থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রতীকী প্রকাশের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় অনেকান্ত চালচিত্রের বাস্তবতা। ‘পাখিদের স্বভাব’ কবিতা পাঠে আপাত মনে হতে পারে সেখানে একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে। কবিতাটি বারবার পাঠে আরও গভীরে গেলে এ কুয়াশা সরে যায়। যেখানে আবিষ্কৃত হয় জীবনের স্বভাববৈচিত্র্য। লক্ষণীয় :

ক. ‘আমি তাকে পাখি বলি যদিও সে পাখি নয়

নারীদের চেয়ে বড় কোন পাখি নেই

তাদের কাঁধের পাশে জমা থাকে অনাকৃতি পাখা ও পালক

স্বভাবে মননে তারা পাখি হয়।

 

উড়ে উড়ে ধ্বংস করে সংসারের সকল প্রণয়।

(পাখিদের স্বভাব, ক স, পৃ ২৫)

 

খ. তার ঘর ভিনদেশে, কোন গাঁয়ে? তার নাম নিসর্গকুমারী

আমার পদ্যরা আজ সারি সারি পানসি ভাসাবে

বাক্যরা হরেক বৈঠা ভাটিয়ালি পাল

জলে ভিজে পলি পাবে, সোনারোদ বাসর সাজাবে।

 

সমুদ্র কাতর হোক, আমার পদ্য পড়ুক

উদার চরণ শুনে নৃত্য হোক জলের কিনারে

এ নিসর্গ আমি চাইÑ আমিই প্রাপক

সারি সারি পদ্য আমি তার নামে ছুঁড়ে দেব জলে।

(নিসর্গকুমারী, ক স, পৃ ৩০)

 

গ.  কোথাও থামি না আমিÑ চলো, নৌকো পা চালাই

আর বাঁশপাতাদের শব্দে হারিয়ে যাবার আগে

ধূলি আমি তোমাকে উড়াই

 

এসব খুরের গল্প। মেঘ যাচ্ছে, বাতাসের

আগে পিছে প্রাকৃত সারসের ঠোঁটে শিলাবৃষ্টি

পথে যে দীর্ঘ রেখাÑ হালট ও উজান-ভাটি

তার নাম ব্যবধান

নিঃস্ব এক দিগন্তের জল ও নির্জন তীরে

যেখানে দাঁড়াব

 

হায় গ্রাম, সেখানেও মাটি খুঁড়ছি।

(খনন, ক স, পৃ ২৯৩)

 

জীবনের বিচিত্র টানাপড়েনের চালচিত্র, সংগ্রাম, বিবিক্তি, নৈঃসঙ্গ্য সবই জীবনাশ্রিত। এ যেন জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। এ থেকে কেউই বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষের অন্তরের দ্বৈতাদ্বৈত এক চিরায়ত বিষয়। শূন্যতা বিচ্ছিন্নতাও একইসাথে নিয়তির মতো মানবজীবনকে আবিষ্ট করে রেখেছে। এর মৌল কারণ বুঝিÑ দ্বন্দ্বই হলো পৃথিবীর যাবতীয় বস্তু, চিন্তা ও সৃজনশীলতার উৎসবীজ। মহাকাল তা-ই বলে। ফ্রান্সিস ফুকুওমা তাঁর দ্যা ইন্ড অব হিস্টরি এন্ড দ্যা লাস্ট ম্যান-এ দেখিয়েছেন কীভাবে সভ্যতা ও যুদ্ধ-রিরংসা হাত ধরাধরি করে চলে। সভ্যতার শেষ, এর মানে যুদ্ধ ও বর্বরতার সমাপ্তি। তাহলে শুভ অশুভের একটা পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে, মৌল কারণেই মানবজীবনের নিঃসঙ্গতা, দহন মানুষের চিরায়ত সঙ্গী। এ অশুভ, অমঙ্গলের বিপরীতে মানুষের অবস্থানও দৃঢ়। এ দ্বন্দ্বেই বিকশিত হয়েছে মানুষের সামূহিক নান্দনিক বোধ। কবি কামাল চৌধুরীও এ থেকে মুক্ত নন। তবে কোলাহলমুখর যন্ত্রণা থেকে শান্তি স্বস্তি কবির একান্ত কাম্য।

কবি কামাল চৌধুরী লক্ষ করেছেন সভ্যতার অনিবার্য দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি। এ দ্বন্দ্ব শুধু জাগতিক অন্য উপাদানের মধ্যেই সীমিত থাকে না। মানুষের মনোজগতে খেলে প্রতিনিয়ত। মানুষের চাওয়া হলো স্বাধীন সত্তার বিকাশ ও মুক্তির অনিঃশেষ আকাক্সক্ষা। আবার সে নিজেই নিজস্ব তৈরি বেড়াজালে বন্দি হয়ে একধরনের যন্ত্রণায় দহন অনুভব করে। এখনেই জন্ম টানাপড়েন ও দ্বন্দ্বের। কবি যে দ্বৈতাদ্বৈতের কথা বলেন, তা ব্যক্তির সীমাকে ছাড়িয়ে যায়। কখনও কখনও বাউল-সাধক, শেখ সাদি, ওমর খৈয়াম, শায়েরদের মতোই সত্তা ও পরমসত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বস্তুত, তিনি সত্তা, শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতাকে দেখেছেন ঐতিহাসিক বিবর্তনসূত্রে। মানুষের চলমানতা সেই প্রাগৈতিহাসিক প্রেক্ষিত থেকে শুরু হয়েছে ওই বিচ্ছিন্নতাকে ধারণ করেই। এ শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতার সূত্রই আবার সৃজনশীলতার মৌল অনুপ্রেরক হিসেবে ক্রিয়াশীল। কয়েকটি পঙক্তি উল্লেখযোগ্য :

(ক) পৃথিবীতে কে কাহার? তুই কার? কার?

কেউ তোর জন্যে কাঁদে? তুই কারো জন্যে কাঁদিস?

তাহলে প্রত্যাশা কেন? পরমুখাপেক্ষিতা কেন?

নিজের গ্লাস নিজে ভর, খা, সম্পূর্ণ মাতাল হয়ে যা।

(আওর এক গ্লাস, কবিতা সংগ্রহ পৃ ৪৫)

 

(খ) আধো ঘুমে আধো জাগরণে আধো আধো স্বপ্নের ভেতর

যাকে দেখি সে তো স্বপ্নÑ স্বপ্ন নয়, সত্য এক ছায়ার শরীর

এ রকম আধো ঘুম, আধো স্বপ্ন, আধো জাগরণে আছি

বুকে নড়ে পে-ুলাম

দোদুল্য হৃদয় কাঁপে স্বপ্ন ঘুম আধো জাগরণে।

(আধো ঘুমে আধো জাগরণে, ক স পৃ ৫৪)

 

(গ)  এ জীবনে সুতো টেনে রয়েছি দু’জন

দেখা হলো, হয়তবা এই শেষ দেখা

এ জীবনে আমরা কি শুধু আমাদের

আজো কি বুঝেছি বলো কে কার কতটা

বলো হে রহস্যময়ী অচেনা রমণী

কতজন্ম এইভাবে থাকব অচেনা।

(সহবাস, ক স, পৃ ৬০)

 

অস্তিত্বজিজ্ঞাসায় ¯œাত কবি অবশেষে তাঁর মৌল কবিসত্তায় স্থিত হলেন। আমরা লক্ষ্য করেছি পর্বান্তরে কবি কামাল চৌধুরী নিজেকে বদলে নিচ্ছেন। এখানেই একজন শিল্পীর সার্থকতা। আমাদের প্রচল ধারণার বিপরীতে তাঁর কবিতার জয়গান। জীবনের বহুকৌণিক প্রান্ত দেখা ও কবিতার সৃজন তাঁর সত্তা থেকে উৎসারিত। তাঁর ব্যাখ্যা গভীর দহনে নিষিক্ত- নিজস্ব অভিজ্ঞানে সৃজিত। আমরা আগেই বলেছি ও লক্ষ করেছি তাঁর কবি হিসেবে বিকশিত হওয়ার সময়পর্ব। তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছেন ইতিহাসের উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়ে। নীরবে বা বিচ্ছিন্ন সত্তায় উন্নাসিক ছিলেন না। স্ব-সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, মানুষের আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন সবই তিনি স্বীয় দৃষ্টিতে লক্ষ্য করেছেন। স্বকালবিদ্ধ একজন সচেতন ব্যক্তি হিসেবে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কবিতায়। যেখানে তিনি সময় পর্যবেক্ষক নন শুধু। সময়ের পরিবর্তনে মানুষের মানবিক বোধ প্রতিষ্ঠায় তিনি উচ্চকণ্ঠ।

‘পূজার প্রদীপ নিয়ে দাঁড়াবার দিন শেষ হলো কবি

আজ শুধু পদতলে মাটি খুঁজে বেড়াবার দিন।

দুুর্দিনের এই দুর্গশিরে বিজয় কেতন ওড়াবার দিন।’

(রবীন্দ্রনাথ, ক স, পৃ ৭৩)

 

আসলেই তিনি নিয়ত ভ্রমণ করেছেন স্বীয় মাটির গুণাগুণ জানা বোঝায়। তাঁর আস্থা বাংলার উর্বর জলকাদা-পলি,  প্রকৃতি ও এ ভূখ-ের মাটি, মানুষের অধিকারের লড়াই, দ্রোহ, সংস্কৃতি, মিথ-পুরাণ আর মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধে। তাঁর নিজস্ব বিবৃতিÑ ‘মুক্তিযুদ্ধ, প্রেম, শ্রমজীবী মানুষ এসব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে হয়ে উঠলাম কবিতা-পথিক।’ মূলত, কবি কামাল চৌধুরী মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এদেশের সমাজবিন্যাস ও রাষ্ট্রকাঠামো কল্পনা করেছেন, প্রতিষ্ঠা চেয়েছেন। বিশেষত, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্যুতির অবলোকনে তিনি ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন। তিনি মনে করেন, অস্তিত্বের প্রয়োজনে ওই ঠিকানাই আমাদের আশ্রয়। স্বভাবতই ক্ষত-বিক্ষত অন্তরের দুঃখ-কষ্ট ও বিক্ষোভ তাঁর কবিতায় শিল্পিত হয়েছে। আমরা দেখেছি কোনো সংকটকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিচ্যুতি ঘটেনি। নিছক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে তা হয়েছে। সেখানে নীরবতা পালনের অর্থই হলোÑ বিসর্জন। ফলত, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার বিপরীতে তাঁকে প্রতিস্পর্ধায় অস্তিত্বের পক্ষে দ্রোহী হতেই হয়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেনÑ

‘একজন স্বপ্নবান মানুষের আশাভঙ্গ হতে পারে কিন্তু স্বপ্নের প্রতি যে পক্ষপাত তা থেকে কিন্তু তিনি সরে আসতে পারেন না। আমি মনে করি কবি কোনো বিচ্ছিন্ন মানুষ নন। দেশের প্রয়োজনেÑ দেশের প্রয়োজন বলতে আমি বোঝাচ্ছি দেশটাকে তো অবশ্যই ধারণ করতে হবে, সেটাকে তো কবিতায় আনতে হবে। আপনারা লক্ষ করবেন আমি কিন্তু নিয়াজির আত্মসমর্পণ নিয়ে কবিতা লিখেছি পাশাপাশি আমার শিল্পচিন্তাও ছিল। মোট কথা সমস্ত দেশটাকে ধারণ করার চেষ্টা আমার মধ্যে আছে। এছাড়া বিশ্বকবিতার সঙ্গেও নিজের সম্পৃক্ত করার প্রয়াসও আছে।’ একইসাথে তিনি মানুষের যৌথ প্রচেষ্টা ও মানবিকতায় প্রকট আস্থাশীল। তাঁর কবিতায় লক্ষণীয় :

(ক) আমাদের সেই প্রিয় স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রেম রক্তাক্ত সময়

কুমারী কেশের মতো ঢেউ খেলা উড়ন্ত সবুজ

এখন নিঃশব্দ জলে আর্দ্রতা ছড়ায় নিরবধি

শত্রুদের সম্মুখে সে এতদিন বিজয়ী উষ্ণতা ছিল

এখন সে শত্রুর হাতে- বন্দি তার স্বাধীন স্বদেশ।

(একটি উজ্জ্বল লাল, ক স, পৃ ৪৬)

 

(খ) বাহান্নতে একবার তারা এই অস্ত্র চেয়েছিল

একাত্তরে অন্ধকারে তস্করের মতো ঝাঁপ দিয়েছিল ঘাড়ে

আমি যুদ্ধ ও মৃত্যুর কোলাহলে তাকে

অমলিন প্রদীপ্ত রেখেছি।

এই অস্ত্র শাসকের জন্যে নয়, শোষকের জন্য নয়

একমাত্র ভালোবাসা এর বিনিময় হতে পারে।

(হৃদয়াস্ত্র, কস, পৃ ৫০)

 

(গ) জনক মরতে পারে, কিন্তু তার চেতনা মরে না

গুলি বোমা নির্বাসন এ-সবের তাৎপর্য ক্ষণিক

ঘাতকেরা কাপুরুষ, অপশক্তি সহিংস কার্তুজে

নারী-হন্তা, শিশু-হন্তা- তারা ঘৃণ্য থাকে চিরকাল।

দশকোটি, বারো কোটি, শত কোটি অগ্নিপুত্র বাড়ে

জননী বাংলায় তারা স্তপতিকে অর্ঘ্য দিয়ে যায়।

(বীরের এ রক্ত¯্রােত, ক স, পৃ ১৯৩)

 

বাঙালির সমূহবিচ্যুতিতে তিনি বিদ্ধ হন। বিশ্বাসে- দ্রোহে জাত্তিসত্তায় তাঁর আবেগ স্থিত রেখে ঐতিহ্যের দীর্ঘ পথে হেঁটে তিনি তাঁর বন্দনাকে বাক্সময় করেন কবিতায়। এ যেন অন্য এক বাঙালির জাগরণের কবি ও কবিতা। রাষ্ট্র, সমাজ ও কবিতার বিনির্মাণের অসমাপ্ত কাজ সম্পাদনে তৎপর থাকেন অবিচল। ফিরে যান এ ভূগোলের মিথ- পুরাণে, লোকবাংলার মানুষের কাছে। প্রসংগত, রবার্ট ফ্রস্ট আর সুকান্ত ভট্টাচার্য মঙ্গলময় পৃথিবীর আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন যেভাবে। কবি কামাল চৌধুরী তাঁর প্রাতিস্বিকতায় উচ্চারণ করেন মানুষ ও কবি হিসেবে তাঁর দায়বদ্ধতার পঙ্ক্তিমালা। ‘কোটর জননী গর্ভ, জন্ম নেবে ছন্দ লেখা শিশু/ নবপত্র খাতা হবে, জ্যোৎ¯œা হবে রৌদ্র লেখা বোন/ কুয়াশা চুম্বন জল, ঘাসে ঘাসে রোমাঞ্চ ধ্বনিতে বহুদূর হেঁটে যাবে দূরাগত এক তেপান্তরে/ শূন্য থেকে উঠে যাবে হৃদপি-, মহিমার বীজ/ নিজের প্রশ্রয়ে তারা পুনর্বার জন্ম নেবে শীতে।’ (ভ্রমণ কাহিনি ০১. ক স, পৃ ১৬১) এ জন্মভূমি, স্বর্গাদপি, গর্বের মাটিতে তিনি বারবার রাহুগ্রাস লক্ষ্য করেছেন। পরাজয়-পরাভব তাঁকে জয় করেনি। জয় করেছে মানুষের যূথবদ্ধ শক্তি ও অমিত সাহস। মানবতার চিরায়ত সুরে ও স্বরে শুভ-অশুভের দ্বন্দ্বে তিনি আলোকের, জোছনালোকিত সময়ের কথাই বলেন। কবি কামাল চৌধুরী গেয়ে চলেছেন প্রতিনিয়ত মানুষেরই জয়গান। ‘প্রতিটি মুহূর্ত আমি পাখিদের জন্য লিখে দেব/ পত্র পুষ্পবীথি, অন্ধকার খোলা বাতায়ন/ ডাকো হে আকাশ ডাকো, চিৎকারে, ক্রন্দনে, ঘৃণায়/ শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাতেÑ এ শ্রাবণে আমি ঘুমাব না।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares