ক্রোড়পত্র : জন্মদিনে কামাল চৌধুরী প্রণীত কুহক : সরকার আমিন

ক্রোড়পত্র জন্মদিনে

কামাল চৌধুরী প্রণীত কুহক

সরকার আমিন

কামাল চৌধুরীর নির্বাচিত কবিতা পাঠ করলাম। কবিতাগুলো আমন্ত্রণময় পেখম মেলে আহ্বান করেছে প্রবেশ করতে ভেতরে। নিরীহ অভিযাত্রীর ছদ্মবেশে যেন আমরা প্রবেশ করেছি মনন ও আবেগজাত এক আবছা অন্ধকার বর্ণ-প্রাসাদে। যেখানে কবির চিত্ত সমাহিত। কবিতা তো, প্রকৃত অর্থে, এক বিমোক্ষণ। সমাধিক্ষেত্র। নিযুত আবেগ-রশ্মি কবিতার পঙ্ক্তির আড়ালে গ্রহণ করে মোহন আশ্রয়। মিশে যায়, মিশে যেতে থাকে। আর অপেক্ষা করে সহৃদয়-হৃদয় সংবেদের দেশলাইয়ের জন্য। এবং কবিতা  শেষতক একটা নৈঃশব্দ্যের ঘোর :

সাঁওতাল রমণীর ঘোরলাগা চোখের মতোন

প্রতিদিন ঝুড়ি ভরে জমা হয় রোদ। মনে হয়

ছায়াবৃক্ষ থেকে নেমে এসে অসংখ্য অতিথি পাখি

মিশে গেছে সাজানো সবুজে

[‘শ্রীমঙ্গলের দিন’- নির্বাচিত কবিতা, পৃ.২২]

সাঁওতাল রমণীর ঘোর লাগা চোখের সাথে ‘ঝুড়ি ভরা রোদ’-এর সম্পৃক্তায়নে কবি আসলে ‘কি বলিতে চান’? তিনি কি ক্রমবাস্তবতায় সৃষ্ট ‘নিয়তি’-কেই অবজার্ভ করছেন? ‘ওরা জানে এখানেই জন্ম-মৃত্যু-পুনর্জন্ম সেও এখানেই’।… ‘দুঃখকে সযতেœ ওরা সাজিয়েছে দুটো কুঁড়ি একটি পাতায়।’ চা শ্রমিকের ঘামে-শ্রমে উৎপন্ন হয় স্বাদজাগানো চা পাতা। ‘ভেসে ওঠে ঘ্রাণময় দিন/ তীব্র এক চায়ের  সুবাস/ সে সুবাস পান করে স্বাস্থ্যবান সম্পন্ন মানুষ।’ এখানেই একজন ‘সাঁওতাল রমণী’র চোখের ঘোর ও সমান্তরালে ঘূর্ণমান জীবন-সত্যের রসায়নে কবি কামাল চৌধুরী নির্মাণ করেন নবতর ‘ঘোর’।্ এই সূত্র ধরেই চা-দাসদের জীবনের মর্ম-সত্যটি কবির হাতে গ্রেফতার হতে দেখি। কবিতা শস্তা অর্থে প্রতিবাদ না। তবে চারিত্রে সে কমও না। বুঝতে পারি, কবিতার কুহকে জীবন-বাস্তবতা মর্মরিত হয়ে থাকে।

 

২.

সূর্যাস্ত

সূর্যাস্তের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমি তোমার খুব

কাছে পৌঁছে গেছি…

তুমি লাল চুলের আহ্লাদী মেয়ে

আমার সারা শরীরে মেখে দিচ্ছ আবীর

আবীরে আমার নেশা ধরেছে, আমার চুল উড়ছে

আর বোতম খোলা জামায় বাতাসের আনন্দ ঢেউ

আমার পায়ের নিচে বালি, পাশে সমুদ্র, দীর্ঘ দিগন্ত

আমি বালি মাখছি, বাতাস মাখছি, শুনতে পাচ্ছি

বাদামঅলার চিৎকার

ঝিনুক বিক্রেতার রিনিঝিনি, হানিমুন-রাঙা দম্পতির

ক্যামেরার ক্লিক

 

এইসব শুনতে শুনতে, নুন হাওয়া বালি

আর দিগন্তের কাঁধে ভর করে

সূর্যাস্তের দিকে হাঁটতে হাঁটতে

এই নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায় আমরা সমুদ্রে ডুবে গেলাম…

[‘সূর্যাস্ত’, নি.ক. পৃ. ৫৪]

 

জন্ম-মৃত্যু-দুঃখ প্রশাসিত জীবনে শেষ পর্যন্ত নিদান হচ্ছে প্রেম ও হারিয়ে যাওয়ার ‘ঘোর’। পুরো কবিতাটিতে বর্ণিত হয়েছে মগ্ন-অনুভূতির মর্মঘেষা বিকিরণ। সমুদ্র-সূর্যাস্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে হৃদয়ানুভূতির। সবশেষ ‘লস্ট’ হয়ে যাওয়ার অনুমিত পরিণতি। এখানেও সেই ‘ঘোর’ যা তৈরি করে কাব্যিক কুহকের। সাঁওতাল রমণীর চোখের মতোই কামাল-প্রণীত কুহক। আমাদের বিবেচনায় এটাই কবি কামাল চৌধুরীর কাব্যসত্তার অন্যতম প্রধান উড্ডয়নসূত্র।

 

৩.

বিচুর্ণ চিত্রকল্প

ক.

ব্যাঘ্র লালসার কাছে প্রতিদিন খুন হয়ে যায়

প্রতিদিন ভালোবাসা একা একা শুধুই পালায়।

[‘রক্তাক্ত পঙক্তিমালা’, নি.ক. পৃ. ১৫]

 

খ.

সানগ্লাসে মাঝে মাঝে ভুল হয়ে যায়, মরা জীবনের খুলি

রোদে পুড়ে চিক চিক করে, করোটিতে জেগে ওঠে ফুল

[‘ক্রাচের যুবক’, নি. ক. পৃ. ১২][

 

গ.

সে আসে ষাঁড়ের মতো যুদ্ধমত্তÑ লালসালু আমার শরীর

[‘বয়স পচিঁশের গল্প’ নি. ক. পৃ. ২৩]

 

ঘ.

মলমূত্রত্যাগী মানুষের ভিড়ে আমি একজন

কেবল বাঁচার জন্য

রমণীর সান্নিধ্যে গিয়েছি

[‘যমজ’, নি. ক. পৃ. ২৮]

উদ্ধৃত ৪টি নমুনা-স্তবকে খুবই স্পষ্টভাবে কবি বেশ কয়েকটি সংবাদ সরবরাহ করেছেন। লালসার সাথে তিনি বাঘের তীব্রতাকে যুক্ত করে সৃষ্টি করেছেন কাব্যানন্দ। সানগ্লাসের কালো রং  মরা জীবনের খুলির ধূসরতাকে নতুন মাত্রা দান করে। ‘পাশব লড়াই’-এর খবর সূত্রে আসে ষাঁড়Ñ আর ‘টার্গেট’ হিসেবে অঙ্গীকৃত হয় কবির ‘লালসালু’ শরীর। খ উদ্ধৃতিটিতে প্রেম উদ্ধার হিসেবে কল্পিত। প্রাত্যহিকতার ম্লান অভিজ্ঞতা থেকে কে আমাদের মুক্ত করে? কেন, প্রেম। কবি কামাল চৌধুরীর কাছে প্রেম একটি সংকেত; জীবন যাপনের অবলম্বন।

 

 

ক.

আলিঙ্গন তীব্র হলে ভালোবাসা শ্বাসকষ্টে ভোগে

বস্তুত এসব ভেবে এতকাল আলিঙ্গনে বিরত থেকেছি

ফলত অগ্নিতে আমি ঘড়াভর্তি জল ঢেলে ঢেলে

এক ভোরে তোমাকে পেয়েছি তপস্যায়

[‘একটি নিষ্কাম কবিতা’, নি.ক. পৃ.৬৭]

 

 

খ.

এত ঠান্ডা দাবদাহÑ কুয়াশায় এত বিকিরণ

ভয় পেয়ে আমি এসে বসন্তে লুকাই

তখন যে পাতা ঝরে তাতে গাছ কতটা কাতর?

নিজের হলুদ ছায়া ফেরি করে বিকেলের মেয়ে

কার শোক? আমরা তো কাহিনি বানাই।

[‘বৈপরীত্য’, নি. ক. পৃ. ৩৮]

 

 

গ.

আমার ঘুমের মধ্যে একটা সবুজ স্বপ্ন

সার্কাসের দড়ি বেয়ে হেঁটে গেল

[চূড়া নি. ক. পৃ. ৪০]

 

উপরের তিনটি উদ্ধৃতিতে পাওয়া গেছে সমাহিত-চিত্তের পরিচয়। তপস্যা তো আসলে আত্ম-আবিষ্কারের বাঁকা পথই। অগ্নিকে এড়িয়ে  কবি পেতে চান শীতলানুভূতির নির্যাস। তবু তিনি ‘ঠান্ডা’কে সন্দেহ করেন। যে ঠান্ডা আবার বৈপরীত্যময় দাহ। দাবদাহ।

আনন্দদায়ক চিত্রকল্প ‘আমার ঘুমের মধ্যে একটা সবুজ স্বপ্ন/সার্কাসের দড়ি বেয়ে হেঁটে গেল।’ এই সবুজ স্বপ্নটাই আসল। সার্কাসের দড়ি বেয়ে হেঁটে যাবার সামর্থ সে ভালোই রাখে। এখানেই দেখি জয়যুক্ত আশার উত্তাপ। আশঙ্কাকে অবহেলা  না করেও কবি কামাল চৌধুরী আশার প্রযত্নে বসবাস করাটাকেই ভালো মনে করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares