ক্রোড়পত্র : জন্মদিনে রূপ-অরূপের মন্ত্রণা : অনু হোসেন

ক্রোড়পত্র জন্মদিনে

রূপ-অরূপের মন্ত্রণা

অনু হোসেন

অনন্য একটি কবিতা লেখার আশায় সৃষ্টির যন্ত্রণা থেকে কবি সব সময় মুক্তি খোঁজেন। নিয়ত সাধনাটির ফল শেষ পর্যন্ত সৃষ্টিব্যঞ্জক না-হলে যন্ত্রণা থেকে কবির মুক্তি নেই, শূন্যতার ভেতরই তাঁকে পড়ে থাকতে হয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মুক্তি শূন্যতায় নয়, পূর্ণতায়; এই পূর্ণতাই সৃষ্টি।’ একেকটি সৃষ্টির জন্য রবীন্দ্রনাথ কথিত একেকটি ‘পূর্ণতা’ কবিকে নিশ্চিত করতে হয়, তবেই সৃষ্টির যন্ত্রণা থেকে কবির মুক্তি মেলে, অন্যথায় কবিকে যন্ত্রণা বুকে করেই শূন্যতার ভেতর থাকতে হয়। ‘পূর্ণতাই সৃষ্টি’Ñকিন্তু এই পূর্ণতার প্রকাশটি সহজ শর্তে অনেক সময় মেলে না।

সর্বোত্তম কবিতাটি লেখার বাসনায় কবির আকাক্সক্ষাব্যাকুল মন জেগে থাকে। ধ্যান চলে অবিরত, থামে না আরাধনা তাঁর। কবিতা নির্মাণের পক্ষে কবিতাময় অনুভূতি, শরীর-মনের যৌথ আশকারাÑসবই প্রস্তুত, তাতেই একটি অনন্য কবিতা লেখা হয়ে যাবে! মন ও শরীরের সর্বোত্তম শ্রম দেওয়ার উপযোগী সজীবতা থাকলেও অনেক সময় একটি ভালো কবিতার জন্ম হয় না। ধ্যান, আরাধনা যাই থাকুক কবির জন্য প্রয়োজন তাঁর ‘আত্মার প্রেরণা’। রবীন্দ্রনাথ জানান, ‘মানুষ নির্মাণ করে ব্যবসায়ের প্রয়োজনে, সৃষ্টি করে আত্মার প্রেরণায়।’ প্রেরণার কাজটি চলে রূপের সাধনায়। রূপের সাধনাও জটিল শর্তে কবিকে পেতে হয়। যে-‘রূপ’কে কবি দেখতে পান তাকেই তিনি কাব্যের উপাদান করলে কবিতা হয় না; তাকে নিতে হয় ‘অরূপে’, কখনও ‘রূপ’-‘অরূপে’র মধ্যিখানে। কাব্যের উপাদানের জন্য রূপ-অরূপের সাধনা,Ñএই এক জটিল খেলা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘রূপের দ্বারাই অরূপকে প্রকাশ করা; অরূপের দ্বারা রূপকে আচ্ছন্ন করে দেখা। রূপকে মানতেও হবে, না-ও মানতে হবে, তাকে ধরতেও হবে, তাকে ঢাকতেও হবে। রূপের প্রতি লোভ না থাকে যেন।’ ‘লোভ’ এখানে শিল্পের শর্তে আবেগের নিয়ন্ত্রণ, আর সৃষ্টিশীল বোধের আত্মপ্রকাশ।

রবীন্দ্রনাথ ইন্দ্রিয়জ অনুভবের সঙ্গে কবিতার তফাত, ফারাক ও দূরত্বের সতর্কতাসূচক হুইসিল-বিন্দুগুলি নির্ণয় করেছেন। তা না হলে কবিতার সঙ্গে সাধারণ বাস্তবতার চেনা রূপগুলির কোনো প্রভেদ থাকে না। কবিদের প্রতি তাঁর বিনীত উচ্চারণ এইজন্যই, যেন ‘রূপের প্রতি লোভ না থাকে’। রূপের লোভ সংবরণ করতে হয় বলেই একটি কবিতা লেখার জন্য কবিকে কয়েকটি ড্রাফট তৈরি করতে হয়। স্টিফেন স্পেনডার অবশ্যি বলেছেন, ‘ডিফ্রেন্ট পোয়েটস কনসেনট্রেট ইন ডিফরেন্ট ওয়েজ।’ স্পেনডারের নিজের প্রবণতা ছিল দুধরনের : অকস্মাৎ দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ কবিতা নামিয়ে ফেলা; আবার ধীরে ধীরে ড্রাফটের পর ড্রাফট করে কয়েকটি স্তরে কবিতাটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া। সচরাচর স্পেনডার-কথিত এ দুটো পদ্ধতিই চোখে পড়ে। স্পেনডার পরে অবশ্যি ব্যাখ্যা দিয়েছেন যাঁরা কোনো ড্রাফট ছাড়া এক বসাতেই একটি কবিতা নামিয়ে ফেলেন, তাঁরা কী করে পারেন? তাঁরাও মাথার ভিতর এক ধরনের অদৃশ্য ড্রাফট করে চলেন এবং তা অনেক সময়, কখনও, অনেকদিন ধরে। ‘ড্রাফটের স্টেজ’ শেষ হলে কলমের ডগায় একবারেই কবিতা হয়ে দেখা দেয়।

ড্রাফটের কথায় আরও একটি ঘটনা মনে আসে। কোনো খসড়াহীন নতুন একটি কবিতা লিখে ফেললে নীরা কাদরী বিস্মিত হয়ে শহীদ কাদরীর কাছে জানতে চান, ‘তোমার কবিতায় কোনো কাটাকাটি নেই যে!’ শহীদ কাদরী তখন জবাবে বলেন, ‘নীরা কবিতা তো কাটাকাটি করলাম মাথায়Ñসাতদিন ধরে!’ শহীদ কাদরী কবিতায় পুনরাবৃত্তি অপছন্দ করতেন। তাঁর চিত্রকল্পগুলো ড্রাফটের পর ড্রাফট হয়ে মাথায় ঘুরপাক খেত, একসময় কাগজের পাতায় আত্মপ্রকাশ করত।

 

ড্রাফট পর্যায়ের ঢিলেঢালা কোনো পঙ্ক্তি কামাল চৌধুরীর কবিতার জমিনে সচরাচর চোখে পড়ে না। রূপ-অরূপের খেলায় তাঁর কবিতা সযতœ-সতর্ক। প্রবল প্রস্তুতি ও পরিমিত বয়ান তাঁর সহজাত। অনুভূতির ‘লোভ’ থেকে সতর্ক আবার কাব্যময় ব্যঞ্জনা সঞ্চারণে সর্বদা সজাগ। তাঁর অনেক কবিতা প্রথম পাঠে মনে হবে বক্তব্যপ্রধান, আবার মনোজ্ঞপাঠে দেখা যাবে ওই কবিতায় সঞ্চারিত হয়ে আছে জীবনের গভীর কোনো বোধের বাণীগ্রাহী ব্যঞ্জনা :

ক.

একজন মাঝি যদি পাল ও বৈঠার প্রেমে

আমার কবিতা থেকে গান তুলে ছুড়ে দেয় মুগ্ধ হাওয়ায়

মুক্তিযোদ্ধারা যদি মৃত্যু ও বারুদের ঘ্রাণে

ভালোবাসে আমার কবিতা

আমি সেদিন বলব

সমস্ত প্রার্থনা আজ শেষ হয়েছে

জন্মের ঋণ আমি স্বীকার করেছি।

[নির্বাচিত কবিতা, বাংলা একাডেমি ২০১৬। জন্মের প্রার্থনা, পৃ. ১]

 

খ.

আমরা ব-দ্বীপের লোক

আমরা ভাত ও মাছের স্বপ্নে বেঁচে থাকি

আমরা মুজিবের লোক

আমাদের বারুদগন্ধ মিশে আছে পতাকার রঙে

ত্যাগ ও মহিমাভাষায়-

যে যুদ্ধ ভালোবাসার

সেখানে পরাজয় নেই

সেখানে বিজয়ী জাতির রক্তে প্রতিদিন ভোর আসে

প্রতিদিন সূর্যোদয়ে

আত্মসমর্পণ করে হানাদার।

[বিজয় দিবস, পৃ. ১০৮]

 

গ.

খাতাভর্তি পাতা লিখি, বৃষ্টি-গাছে পদ্য, পদাবলি

বটপাতা আমপাতা বুনোফুল, প্রথম কদম

পা-ুলিপি ভরে যায়, সাদা খাতা অভিজ্ঞান-লিপি

বীজের উত্থান শেষে গাছেরাই প্রকৃত প্রেমিক।

বাংলা ভাষা পাখিদের, বাংলা ভাষা বৃক্ষ-জাতিময়

সবুজ পুস্তিকা ছাড়া মহাকালে কেউ কবি নয়।

[বৃক্ষ, পৃ. ৭৫]

ক, খ ও গ উদাহরণে যথাক্রমে ‘জন্মের প্রার্থনা’, ‘বিজয় দিবস’, ও ‘বৃক্ষ’- এই তিনটি কবিতাংশ রয়েছে। সবগুলিই একই বিষয়কেন্দ্রী কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গে স্বদেশপ্রেমের নিবেদনে কবির হৃদয়স্ফুরণ সুস্পষ্ট। প্রতিটি কবিতাংশে বক্তব্য আছে, কিন্তু বক্তব্যের দাপটে তা স্থায়ী বাণী সঞ্চারণ থেকে দূরে সরে থাকেনি। সত্তরের কবিতার একটি বড় চেহারা সময়ের উচ্চ-তাকে কবিতার স্পন্দনের ভিতর উন্মোচিত করা। রক্ত রঞ্জিত অধ্যায়ের ভিতর দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ভূখ-ের অভ্যুদয় কবিদের হৃদয়ে-হৃদয়ে বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছে। অনেক রক্তের বিনিময়ে প্রাপ্তি,- স্বাভাবিকভাবেই সংবেদী হৃদয়ের ঘটেছে উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনাময় বাস্তবতার মুহুর্মুহু প্রকাশ। সাহিত্য-শিল্পেও সেই প্রভাবের বিস্তার ঘটেছে বিপুল মাত্রায়। বিস্ময়করভাবে কামাল চৌধুরীর কণ্ঠস্বরে সময়ের এই উচ্ছ্বাসকামী প্রকাশভঙ্গি অনেক ক্ষেত্রে সংযত, সংহত এবং নিয়ন্ত্রিত। তুমুল উচ্ছ্বাসকামিতার চেয়ে কবিতার ক্যানভাসে পঙ্ক্তিতে-পঙ্ক্তিতে নিয়ন্ত্রিত শিল্পবোধের বর্ণগভীর রঙ ছড়িয়ে দেওয়ার সর্বান্তরিক প্রস্তুতি ও প্রচেষ্টা মাঝে মাঝেই দেখা যায়। তাঁর সময়ের কবিতার একটি বড় অংশ কোনো কিছু বলতে চাওয়ার প্রবণতায় শতোচ্ছল। কামাল চৌধুরী সময়ের এই কিছু বলতে চাওয়ার শতোচ্ছলতা থেকে কবিতাকে মোড় ঘুরিয়ে নিয়ে বক্তব্যধর্মিতার স্থলে যতটা সম্ভব ব্যঞ্জনাময় প্রত্যয় মেলে ধরতে চান। বক্তব্যও অনেক সময় গভীর প্রেরণাদায়ী কবিতা হয়ে ওঠে; কিন্তু বক্তব্যশাসিত কবিতার অভিলক্ষ্য সচরাচর একটি সুনির্দিষ্ট অভীষ্টের কাছে যাওয়ার শরীরমন নিয়ে হাল ধরে বসে থাকে। কামাল চৌধুরীও তাঁর কবিতায় স্বদেশসংলগ্ন আত্মত্যাগীদের অবদানের ইতিহাসগুলি চিন্তার অভীষ্টে জায়গা দেন বারবার। গৌরবময় ইতিহাসের আত্মত্যাগী মানুষের কথা বলতে গিয়ে তিনি মাঝে মাঝে একটি সমান্তরাল জীবনসৌন্দর্যের প্রশস্তিমূলক বর্ণনা যুক্ত করেন। ক-অংশে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রসঙ্গে ‘মৃত্যু ও বারুদের ঘ্রাণ’-এর সমান্তরালে মাঝির ‘পাল ও বৈঠার প্রেম’, খ-অংশে জীবনের অন্যতম প্রয়োজনীয় চাহিদার দাবিতে ‘ভাত ও মাছের স্বপ্নে বেঁচে’ থাকার সঙ্গে মহান নেতা মুজিবের নেতৃত্বে পাওয়া পতাকার রঙে বারুদগন্ধ এবং গ-অংশে ‘বাংলা ভাষা’র মেটাফর হিসেবে ‘পাখি’ ও ‘বৃক্ষ’-এর সমরূপতায় যোগ করেছেন ‘সবুজ পুস্তিকা ছাড়া মহাকালে কেউ কবি নয়’। স্বদেশ, স্বভাষা, মহান নেতার নেতৃত্ব ও মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি অনুষঙ্গে এইসব সংকেতধর্মী প্যারালালিজম বা সমান্তরালতার বিস্তার থাকায় কামাল চৌধুরীর স্বদেশ চেতনায় একটি অনুপুঙ্খময় স্থায়ী আবেদন সঞ্চারিত হয়। বলা ভালো, একই বর্ণনা সমকালের অনেকের, বিশেষ করে ষাট-সত্তরের কোনো কোনো কবির মধ্যে পুনরাবৃত্তিমূলক বহুকথনরীতি, ধ্রুবপদ, ধ্রুববাক্য বা রিফ্রেইন যোজনার মধ্য দিয়ে তালিকাধর্মী বিবরণে মেলে ধরার আন্তরিক প্রবণতা দেখা যায়। কাব্যস্বভাবে অনেকটাই ভাবালুতামুক্ত সংযত-সংহত হওয়ায় কামাল চৌধুরী এই প্রবণতা থেকে খানিকটা দূরে থাকতে চেয়েছেন, কখনও কখনও যেন অনেকটা আয়োজন করেই।

নানা ধরনের নান্দনিক অলংকার প্রয়োগের দক্ষতা ও শক্তিই কামাল চৌধুরীর পরিমিত কবিতাকথনে সৃষ্টি করে পর্যাপ্ত আবেদন ও দ্যোতনা। রূপক, সংকেত, চিত্রগ্রাহিতা ও চিত্রকল্পময়তা, ন্যারেটিভে সংকেতধর্মী ব্যঞ্জনা ও দার্শনিক উচ্চারণ তাঁর কাব্যপরিচর্যাকে বৈশিষ্ট্যম-িত করেছে। কমবেশি অনেকেই কবিতায় এইসব অলংকার প্রয়োগের সহায়তা নিয়ে থাকেন। এই ক্ষেত্রে অলংকার প্রয়োগের ফ্রিকোয়েন্সিতে দেখা যায় কারও কবিতা বেশি মাত্রায় প্রতীকধর্মী, কারওটা রূপক-মেটাফর শাসিত, কারওটা গভীরভাবে সংকেতময় কিংবা উপমাবাহী, কারওটা দৃশ্যপ্রধান কিংবা চিত্রকল্পময়, আবার কেউ কেউ বক্তব্য-মন্তব্যঘেরা রূপ সৃষ্টিতে সুদক্ষ-সুচারু। কামাল চৌধুরীর কবিতা এগুলোর নির্দিষ্ট কোনো একটির দ্বারা বিশেষায়িত হতে দেখি না, বরং বিভিন্ন কবিতায় বিচিত্র নান্দনিক মোটিফ সৃষ্টি করা তাঁর সহজাত গুণ। অলংকার আশ্রয়ী মোটিফের পরিচর্যা থাকায় তাঁর আবেদনে বক্তব্যধর্মিতার চেয়ে ব্যঞ্জনাময়তা প্রকাশ পায়। ফলে অতিকথন, বিবৃতি, তালিকাবিস্তার থেকে কামাল চৌধুরীর কবিতা সব সময় মুক্ত থাকতে দেখি।

তাঁর বৈচিত্র্যময় অলংকার প্রয়োগের কয়েকটি পরিচয় আমরা দেখার চেষ্টা করব। কয়েকটি রূপক :

কেউ কেউ আছে যারা কখনো মরে না। তারা চলে যায়।

অন্ধকার তাড়াবার কাজে দূর কোনো নক্ষত্রের দেশে যেতে যেতে

তাদের অনন্ত ঘুমের বৃষ্টি পড়ে মায়ের কবরে

মা সেখানে মাটি ও স্বদেশ। মা সেখানে পতাকার রং

সেখানে কবির স্বপ্নে মৃত্যু হেরে যায়।

[শামসুর রাহমানের স্মরণে, পৃ. ৯৩]

 

উপরের কবিতায় অনবদ্য সুন্দর এক চিরস্থায়ী রূপক ‘মা’। শামসুর রাহমানের স্মরণে লেখা হলেও ব্যঞ্জনায় কবিতাটি মহত্তর মানবপ্রাণের সার্বজনীন প্রতীক হয়ে উঠেছে। মহৎ মানুষগুলো তাঁদের সৃষ্টির মধ্যে বেঁচে থাকেন। শরীরী মৃত্যুতে তাঁদের পার্থিব অবদানের অবসান ঘটে না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে। কবির কল্পনায় পৃথিবী থেকে প্রস্থানের পরেও তাঁরা ‘অন্ধকার তাড়াবার কাজে দূর কোনো নক্ষত্রের দেশে’ চলে যান। তাঁদের চলে যাওয়াকে কবি আখ্যায়িত করেন ‘অনন্ত ঘুম’ আর তাঁদের রেখে যাওয়া সৃষ্টিকর্মকে ‘অনন্ত ঘুমের বৃষ্টি’ রূপে। ‘বৃষ্টি’ রূপক-এ তাঁদের অর্জনগুলো বিকশিত হয় মায়ের কবরে পড়ে। আবার মা এখানে ব্যক্তি-মা নন, তিনি হয়ে ওঠেন মাটি, স্বদেশ ও পতাকার রূপক। এইভাবে গৌরবান্বিত মহত্তর মানবের অমরত্বকে কবি উন্মোচিত করেন কয়েকটি রূপকে। সংকেতধর্মী :

মানুষের যত দেশ আছে সব সাদা।

সাদাকে অনেকে রং বলে না। রংধনুর সাতরঙে সাদা নেই

তবু আমাদের বাচ্চাদের স্কুলের জামা, শান্তির কবুতর সাদা

কবিতা লেখার খাতাও সাদা

কালো মানুষের দেশে আমরা এখনো সাদা-কালো!

সাদার সুবিধা এই

একে ইচ্ছেমতো লাল করা যায়, কালোও করা যায়।

[সাদা কালো, পৃ. ৯৭]

 

ফরাসি কবিতার একটি প্রবল ধারা সংকেতধর্মী কবিতা। সংকেতের ভেতর থাকবে ছবি, টুকরো ঘটনা, গল্প, দৃশ্য, কখনও আবার চিত্রকল্প। সবগুলি অনুষঙ্গ মিলিয়ে একটি বহুস্তরস্পর্শী আবেদনে শেষ পর্যন্ত কবিতাটি হয়ে উঠবে সংকেতময়। ‘সাদা কালো’ কবিতায় কামাল চৌধুরী সেই কাজটি করেছেন। ‘সাদা’র সংকেতে অনেক কিছু বলেছেন। রংধনুর সাতরঙে সাদার উপস্থিতি না থাকলেও জীবনে সাদার অপরিহার্যতা বহুমুখী। নিত্যজীবনে সাদা অসংখ্য প্রয়োজনের সঙ্গী। আবার সাদার আরেকটি রূপ তাকে অন্য রঙেও রূপায়িত করা যায়। এই অর্থে সাদা শেষ পর্যন্ত সৃষ্টিশীলতার সংকেত বহন করে। সংকেতে পরিমিত বাক সংযোজনায় কনোটেশন সৃষ্টি হয় আর কনোটেশন থেকে বেরিয়ে আসে বহুমাত্রিক অনুভূতি। অল্পতেই অনেক কিছু প্রকাশের এ আরো এক পন্থা।

ক. চিত্রকল্প : দৃশ্যপটে আলোকচিত্রের কুহক

আমার পায়ের নিচে বালি, পাশে সমুদ্র, দীর্ঘ দিগন্ত

আমি বালি মাখছি, বাতাস মাখছি, শুনতে পাচ্ছি

বাদামঅলার চিৎকার

ঝিনুক বিক্রেতার রিনিঝিনি, হানিমুন-রাঙা দম্পতির

ক্যামেরার ক্লিক

এইসব শুনতে শুনতে, নুন হাওয়া বালি

আর দিগন্তের কাঁধে ভর করে

সূর্যাস্তের দিকে হাঁটতে হাঁটতে

এক নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায় আমরা সমুদ্রে ডুবে গেলাম…

[সূর্যাস্ত, পৃ. ৫৪]

খ. চিত্রকল্প : দৃশ্যপটে আঁকা দৃশ্যকাব্য

শেষরাতের ট্রেন থেকে নেমে গেছে

প্রাচীন উপকথার নায়িকারা

তাদের শাড়ির রঙে জেলেপাড়ার টেরাকোটা

সেখানে শিল্পীর হাতে ক্রমাগত ফুটে উঠছে

জাতিস্মর মাটিকন্যা- ভোরবেলাকার স্মৃতি, স্বপ্ন, কোলাহল

শেষরাতে আমিও ধূসর এক স্টেশন

আমিও শালবন বিহার থেকে উঠে আসা শ্রমণের প্রার্থনার ভাষা

আমিও চা-দোকানির পাশে রাতজাগা অপেক্ষার কুয়াশাবিন্দু

আমিও ঘটনাক্রম, দৃশ্যকাব্য, হুইসেলে জেগে ওঠা

কোলাহলপ্রবণ এক জনপদ।

[শেষরাতের ট্রেন, পৃ. ১০৫]

চোখের দেখার বাইরে মন ও মস্তিষ্কের চোখ দিয়ে কবিরা এই জগৎ সংসারের মনোজ্ঞ সুন্দর ছবির মালা গেঁথে যান। কাব্যসমালোচনার ভাষায় এই চিত্রাত্মক মোটিফগুলিই চিত্রকল্প হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। সহজ করে বললে হয় এমন- চোখের দেখায় ‘চিত্র’, আর মন ও মস্তিষ্কের দেখায় ‘কল্প’, উভয়ের সমবায়ে চিত্রকল্প। সিডে লিউস তাঁর দ্য পোয়েটিক ইমেজ বইয়ে কয়েকটি স্তরে বিভাজিত করে চিত্রকল্পের আধুনিক তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাগুলো উপস্থাপন করেছেন। অপূর্বত্ব, অভিনবত্ব, ব্যঞ্জনাত্মক ও চিত্তাকর্ষক- এই চার প্রধান বৈশিষ্ট্যকে চিত্রকল্পের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে লিউস দেখেছেন। কামাল চৌধুরীর কবিতায়ও আমরা মাঝে মাঝে দেখতে পাই তাঁর মন ও মস্তিষ্কজাত ছবির সম্মিলন। ছবিগুলো দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে সৃষ্টিশীল শক্তির নানা আবেদন নিয়ে। ক-অংশের চিত্রকল্পে সঞ্চারিত হয়েছে ফটোগ্রাফিক ইলুশন বা আলোকচিত্রের কুহক। ‘আমি’ ও ‘আমরা’ শব্দদ্বয়ে কবি ও কবির সহযাত্রীরা সান্ধ্যসমুদ্রের দৃশ্যময় কুহকে সম্মোহিত হয়েছেন। ‘পায়ের নিচে বালি’, ‘দীর্ঘ দিগন্ত’, ‘বাতাস’, ‘বাদামঅলার চিৎকার’, ‘ঝিনুক বিক্রেতার রিনিঝিনি’ ও হানিমুনে আসা ‘দম্পতির ক্যামেরার ক্লিক’- দৃশ্যের পর দৃশ্য মিলিয়ে ক্যামেরা প্যান করে ফেড আউট হয়ে যায় কবি ও কবিবন্ধুদের সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। আলোকচিত্রের পরিপূর্ণ কুহকে হারিয়ে যায় এইসব চিত্রাত্মক সম্মোহন! খ-অংশের চিত্রকল্পে আঁকা হয়েছে একটি অনন্য দৃশ্যকাব্য। ‘শেষ রাতের ট্রেন থেকে’ যে নারীর দল নেমে গেছে তাঁরা সবাই এসেছে ‘প্রাচীন উপকথা’ থেকে। কবি প্রাচীন উপকথার প্রসঙ্গ টেনে আমাদের নিয়ে যান দূর অতীতের বর্ণনাঘেরা অনুভূতির ভিতর। চিত্রকল্পের বড় লক্ষ্যই হচ্ছে একটি মোটিফ থেকে অসংখ্য মোটিফের অনুভবের কাছে টেনে নিয়ে যাওয়া। কামাল চৌধুরী এই কাজটি অত্যন্ত নৈপুণ্যের সঙ্গে করে গেছেন। কবিতাংশের পরের স্তবকে প্যারালালিজম সৃষ্টি করে কবি নিজেই যুক্ত হয়েছেন দৃশ্যপটে। চায়ের দোকানের পাশে নিজেকে দেখেছেন ‘রাতজাগা অপেক্ষার কুয়াশাবিন্দু’র আহূত একজন হয়ে। নিজে হয়েছেন ঘটনাক্রমের অংশীদার, কোলাহলপ্রবণ জনপদঘেরা দৃশ্যকাবের অন্যতম একজন। এমন করেই কামাল চৌধুরীর অনেক কবিতা চিত্রাত্মক ঘটনাপ্রবাহে দৃশ্যকাব্যের আবহ বুনে যায়। ন্যারেটিভে সংকেতধর্মিতা :

আলিঙ্গন তীব্র হলে ভালোবাসা শ্বাসকষ্টে ভোগে

বস্তুত এসব ভেবে এতকাল আলিঙ্গনে বিরত থেকেছি

ফলত অগ্নিতে আমি ঘড়াভর্তি জল ঢেলে ঢেলে

এক ভোরে তোমাকে পেয়েছি তপস্যায়

তুমিও আমার মতো শ্বাসকষ্টে কাশি শ্লেষ্মা পরিহার করে

শিশির পতন থেকে স্বর্গসুখ কুড়াতে এসেছ

জেনেছি অন্যত্র মুক্তি, নেশা ও মাংসের লোভ, ধর্ষকাম

আত্মার পীড়নে

যেটুকু অর্জন তার সব জাগতিক।…

এখন এখানে শুধু বাউলের ভূমধ্য-কবিতা

তোমার শোবার ঘরে অপার্থিব পাতার বাসর।

[একটি নিষ্কাম কবিতা, পৃ. ৬৭]

 

একমাত্রিক ন্যারেটিভ কবিতা হয়ে ওঠার পক্ষে অনেক সময় জঞ্জাল তৈরি করে, অপরদিকে বহুদ্যোতনাবাহী ন্যারেটিভ কবিতার প্রাণ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। ন্যারেটিভে কেবল গল্প বলে যাওয়া কিংবা অনুভবের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ামূলক আবেগ বা কথাগুলো ছেড়ে দেওয়া কবিতা নয়। ন্যারেটিভেও কবিকে শিল্পের আড়াল দিয়ে কাব্যময় ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে হয়। শিল্পের আড়ালটি কবিকে সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হয়। ন্যারেটিভ কবিতা চর্চায় সুচারু হাত না-হলে অনেক সময় সাদামাঠা বর্ণনায় কাব্যরস সঞ্চার না-করে একটি একমাত্রিক শুষ্ক আবহ বিরাজ করার ঝুঁকি থেকে যায়। কামাল চৌধুরীকে এই ধারায়ও দেখেছি একইসঙ্গে সহৃদয়-সযতœ। উপরের ন্যারেটিভে দারুণভাবে তাঁর ভালোবাসাময় মানবীর কথা বলেছেন। আগুনের ভিতর ‘ঘড়াভর্তি জল ঢেলে ঢেলে’ অনেক সাধনায় মানবীকে লাভ করেছেন। এই প্রাপ্তির সবকিছুই পার্থিব। পরের স্তবকে কবি সমান্তরালে প্রকাশ করেছেন বর্তমানের ছবি। বর্তমান প্রেক্ষাপট কবিকে নিয়ে গেছে অপার্থিব অনুভবের কাছে যেখানে ‘শোবার ঘরে’ থাকে কেবল ‘অপার্থিব পাতার বাসর’। অপার্থিব পাতার বাসর- এই শিল্পের আড়ালটি যুক্ত করে কবি আকস্মিকভাবে সমস্ত জাগতিকতা থেকে সরিয়ে নিয়ে একটি পরম আধ্যাত্মিক কুহকের দিকে পাঠককে সংকেতময় করে যান। কবিতায় সংকেত বিস্তার শক্তিমান কবির কাজ। অল্পবয়ানে দার্শনিক তীক্ষ্ণতা :

দাঁড়িয়ে থাকাও আমার কাজ

বসে থাকাও আমার কাজ

এ লেখা কোনো কাজ নয়- যারা বলে

তাদের আওয়াজ

শোনাও জরুরি

আমি যখন শুনি

দাঁড়িয়ে থেকেও শুনি

বসে থেকেও শুনি

আর তখন আমার লেখা হাঁটতে থাকে

কবিকে তুমি পথ থেকে সরাতে পারবে না হে

[কবির পথ, পৃ. ৮৮]

 

প্রতিক্রিয়ামূলক জিজ্ঞাসার মীমাংসা এই কবিতা। কাজ করে প্রতিটি মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। কবিতা লেখার বাইরেও কবির উপর ন্যস্ত গুরুদায়িত্বের ভার নিতে হয়। সমাজ-রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্বে নিয়োজিত হলেও কবির কবিসত্তা ওই দায়িত্বের কারণে অন্তর্হিত হয়ে যায় না। বরং দেখা গেছে সংবেদনাগ্রাহী শক্তিশালী কবি দায়িত্বের মধ্যে থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চার করে আরও পরিণত হয়ে উঠছেন। কাজেই কবিকে নিয়ে যতই প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পাক, তাতে কবির কিছুই আসে-যায় না। গুরুদায়িত্বে থাকলেও মাথার ভিতর জমে থাকা কবিতা একসময় অনিবার্যভাবেই নাজিল হয়ে যায় কবিতার খাতায়। এইভাবে সমাজ-অন্তর্গত প্রতিক্রিয়ার জবাবের মীমাংসা খোঁজেন কবি, দার্শনিক তির্যকতায় বলে যান ‘কবিকে তুমি পথ থেকে সরাতে পারবে না হে’। কারণ কবি সর্বাবস্থায় কবি। কবির শক্তি তাঁর সংবেদনায়, তাঁর দার্শনিক বাণীতে, তাঁকে কে পারে রুখতে?

 

৩.

এই লেখায় কামাল চৌধুরীর কবিতার কয়েকটি প্রবণতার দিকে আলো ফেলতে চেষ্টা করা হয়েছে। বহু বৈশিষ্ট্যের সংযোজনায় এই কবি। আবার বহুত্বের মধ্যে পরিমিতিবোধ বজায় রাখাও এই কবির রুচি অন্তর্গত মানস। কবিতায় স্থায়ী মুগ্ধতা জাগানোর জন্য, আবেগকে শিল্পময় করার জন্য, বর্ণনাকে বাণীতে রূপান্তরের জন্য তাঁর প্রচেষ্টার কোথাও কমতি দেখি না।

শুরুর কথায় আবার যাই। রবীন্দ্রনাথ রূপকে ধরতেও বলেছেন আবার ঢাকতেও বলেছেন। সহজ কথায়, অরূপকে রূপ দিয়ে সজ্জিত করা  যেমন প্রয়োজন, রূপকে ঢেকে অরূপে নিয়ে যাওয়াও দক্ষ শিল্পীর কাজ। কবির জন্য এ এক মন্ত্র। এ মন্ত্র যার যত নিয়ন্ত্রণে তিনি কাব্যবাক প্রকাশে তত শৈল্পিক, তত বৈশিষ্ট্যম-িত ব্যঞ্জনাময়। কামাল চৌধুরী তাঁর কবিচরিত্রে করায়ত্ত করেছেন এই মন্ত্র, তাঁকে অভিবাদন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares