ক্রোড়পত্র জন্মদিনে : কামাল চৌধুরীর সিরিজ-কবিতাগ্রন্থ ভ্রমণ কাহিনি : কাবেদুল ইসলাম

ক্রোড়পত্র জন্মদিনে

কামাল চৌধুরীর

সিরিজ-কবিতাগ্রন্থ ভ্রমণ কাহিনি

কাবেদুল ইসলাম

বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা কবিতার এক উজ্জ্বল নাম কবি কামাল চৌধুরী (১৯৫৭)। ইতোমধ্যে তাঁর ১০টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে (যার ৯টির একত্র সংকলন কবিতাসংগ্রহ, বিদ্যাপ্রকাশ, ঢাকা) এবং এর বাইরে অসংখ্য অগ্রন্থিত কবিতা ইতস্তত পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। বলাবাহুল্য, বেশ কিছু আস্বাদ্য ও সুপাচ্য কবিতা লিখে অনেক আগেই তিনি কবিতাপ্রেমিক সহৃদয় সামাজিকের নজর কেড়েছেন। তবে সে আলোচনায় আমরা এখন যাব না। বরং আমরা এখানে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণে চেষ্টা করব তাঁর অন্যতম সিরিজ-কবিতা ভ্রমণ কাহিনির স্বারূপ্য-সন্ধানের।

মোট ১৪টি ‘সনেট’প্রতিম চতুর্দশপদীর সমাহার কামাল চৌধুরীর ভ্রমণ কাহিনি। আগেই বলে নিই, এগুলো সনেট (Sonnet) নয় এই কারণে যে, বস্তুত সনেটের প্রথাগত যে কাঠামো-বিন্যাস বা রূপকল্প (Form)- তা সে পেত্রার্কান বা ইতালিয় হোক, কি শেক্সপিয়রিয় বা ইংরেজি- এগুলোর একটিরও রূপকল্প সে রকম নয়। এবং সনেটের অষ্টক (Octave) ও ষটক (Sestet) এবং তার অণুভাগ যথাক্রমে চতুষ্ক বা চৌপদিকা (Quatrain) ও ত্রিক, ত্রিতক বা ত্রিপদিকা (Tarcet)-য় ভাবের যে উপস্থাপনা বা অবতারণা, ক্রম-সমুন্নতি এবং শেষে চূড়ান্ত পরিণতি অনিবার্য, বিশেষ করে ইতালিয় সনেটে অনুসরণীয় ‘ভোল্টা’ (Volta), সেসব এগুলোতে অনুপস্থিত। তবে সুনিরূপিত ও সুনিয়ন্ত্রিত অক্ষরসম্পাতনের দৃষ্টিতে, অন্যকথায় বাংলায় আধুনিক সনেটিয়ার কবিরা মহাপয়ারে তথা ৮+১০ বা ১০+৮ মাত্রার চালে বা বিভাজনে যে ১৮-মাত্রার সনেট রচনা করেন [স্মর্তব্য, বাংলাভাষার সনেট-প্রবর্তক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-৭৩) ও তৎপরবর্তীদের ১৪-মাত্রাই আদর্শ ছিল], সেটি এর রয়েছে, অধিকন্তু প্রতিটি কবিতাই ১৪-পঙ্ক্তির হওয়ায় এগুলোকে ‘চতুর্দশপদী’ বলতে বা গণ্য করতে অসুবিধা নেই। বরং সেই নিরিখেই এগুলো বিচার্য। অন্যদিকে এর মুখ-কবিতাটির শেষ দু-পঙ্ক্তি সমিল (যদিও সমপদে গঠিত) হওয়ায় বলা যেতে পারে শেক্সপিয়রিয় সনেটের মতো তা মিলযুক্ত যুগ্মক (rhymed couplet) গঠন করেছে।

আবার ১৪টি চতুর্দশপদীর প্রতিটিকেই যেমন স্বতন্ত্র কবিতা হিশেবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে, তেমনি এর একটির সঙ্গে অন্যটির নিকট ও দূরান্বিত ভাব-সঙ্গতি থাকায় এগুলোকে ‘সনেট-পরম্পরা’ (Sonnet-sequence/ Sonnet Cycle)-র ন্যায় ‘চতুর্দশপদী- পরম্পরা’ও বলা যায়। যাই হোক, এখন আমরা এই চতুর্দশপদী কবিতাগুলো নিয়ে প্রাসঙ্গিক কিছু আলোচনার চেষ্টা করব।

ভ্রমণ কাহিনি শীর্ষক কবিতাটি কবি শুরুই করেছেন রাত্রিকে স্বাগত জানিয়ে এবং বাতাসরূপী নবীন বন্ধুর কাছে এমত প্রার্থনা করে যে, সে যেন কবিকে বা কথককে ডানা দেয়, যা হবে তার ‘উড়ন্ত আয়ুধ’, যেটি নিয়ে তিনি অন্ধকারে উড়ে যাবেন ‘দুচোখের দিগন্তসীমায়’।

স্বাগতম রাত্রি, বাতাস নবীন বন্ধু, দোলা দাও

চৈতন্য প্রসূনে ঢালো, বীজমন্ত্র ঢালো অবিরল

বলো তাকে, সে আমাকে ডানা দিক উড়ন্ত আয়ুধ

অন্ধকারে উড়ে যাব দুচোখের দিগন্তসীমায়

 

লক্ষণীয়, ‘কেবল ধূলির চিহ্ন রেখে দিয়ে পায়ের তালুতে’ আর ‘শতাব্দীর ক্ষতচিহ্ন ঢেকে দিয়ে শুকনো পাতায়’ এই ভ্রমণযাত্রার উন্মাদনা-ভরা বিস্ময়ের পথে বেরিয়ে পড়বেন তিনি। পথে কত কিছুই না দেখবেন- পাতাঝরা বনপথ, আকাশ নক্ষত্র তাঁবু, রাবার গাছের ছায়ার নিচে সকালের মেয়ে- যে কুয়াশায় ভেসে এসে হয়ে উঠবে তরুশীর্ষে ফুল, পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসা যূথবদ্ধ মেঘ, অতিথি পাখির ঝাঁক, মাধবকুণ্ডের জল, শালবনের হু হু শীত, উখিয়ার ঝাউবীথি, নারকেল, জেলেনৌকা, অনিঃশেষ খোলা মাঠ, সমুদ্র ভূতল নদী প্রস্রবণ ইত্যাদি। তবে তাঁর গন্তব্যপথের যে ভৌগোলিক পরিসীমা পরিদৃশ্যমান, কবি সেটিকে শুধু তাঁর প্রিয়মাতৃভূমির চৌহদ্দিতে সীমিত রাখতে চান না, বরং তাকে আরও দূরবিস্তৃত, কালচেতনায় প্রাচীনভারত বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে ‘বৌদ্ধ-ভারত’লগ্ন করার পক্ষপাতী। বস্তুত কবি যখন বলেন :

এবার বিশ্রাম নেব তথাগত এই জেতবনে

আনন্দ আমার সঙ্গী, অম্বপালি ভিক্ষুদের সাথী…

এবার সবাই মিলে সেরে নেব একান্ন ভোজন

যদিও বসন ছিন্ন, হৃতরাজ্য- তবু সুখী আজ

 

বোঝাই যাচ্ছে, ক্লান্তিহীন চলার পথে সাময়িক সুখের জন্যে হলেও সঙ্গীগণসহ জেতবনে বিশ্রাম নিতে চান। কেননা এখনও তার সামনে দীর্ঘ প্রতিকূল পথ :

চলেছি তিমির পিঠে সমুদ্র কী ভয়ানক নাচে

দিগন্তে অধরা ঢেউ লক্ষ লক্ষ শব্দমালা গাঁথে

সৈকতে আছড়ে পড়ে জলোচ্ছ্বাস

 

শুধু তাই নয়, কবির আকাক্সক্ষা আরও উত্তুঙ্গচারী, দূরগামী। তাই তাঁর ভাষ্য :

এই পথ আরো যাবে, হে বালক বহুদূর যাব

প্রতিটি মুহূর্ত থেকে সময়ের সুধাবিন্দু তুলে

প্রতিটি মুহূর্ত থেকে অপার্থিব লতাগুল্ম তুলে

রাতজাগা পাখিদের নিমন্ত্রণ ডানায় লুকিয়ে

আকাশে উড়ব আমি হিমবাহ পাহাড়চূড়ায়

দেশ থেকে দেশান্তরে ধূলিকণা শস্যবীজ ভ্রুণে

সমুদ্র ভূতল নদী প্রস্রবণ অশ্রুর কিনারে

 

তবে এ ভ্রমণে তিনি সঙ্গী হিশেবে পেতে চান নিজস্ব নারীকে, প্রেমিকাকে। তার উপস্থিতি কবিকে দেবে মৃত্যুপথরেখা পেরোবার অভয় শক্তি :

তোমার দু’হাত ধরে পার হবো মৃত্যুপথরেখা/

দেখব আকাশ আছে তার নিচে অবিশ্রাম হাওয়া

খোলামাঠ শুরু আছে আদিগন্তে শেষ তার নেই

যাই হোক, এখন কবিতাটির শিল্পপ্রকরণ-কৌশল দেখার চেষ্টা করব। প্রথমেই এর গঠন-কাঠামো বা রূপকল্প। নিচের ছকে তা দেখানো হলো :

 

চতুর্দশপদী             রূপকল্প বা মাত্রার চাল         স্তবক-সংখ্যা ও পঙ্ক্তি-সজ্জা

 

সংখ্যাহীন               ৮+১০ (নিখুঁত)     ২টি (১২ ও ৪ পঙ্ক্তির)

০১-সংখ্যক            ৮+১০ (নিখুঁত)     ৩টি (৪+৪+৬ পঙ্ক্তির)

০২-সংখ্যক            ৮+১০ (নিখুঁত)     ৪টি (৪+৪+৪+২ পঙ্ক্তির)

০৩-সংখ্যক           ৮+১০ (নিখুঁত)     ৩টি (৬+৪+৪ পঙ্ক্তির)

০৪-সংখ্যক            ৮+১০    ৩টি         (৬+৪+৪ পঙ্ক্তির)

০৫-সংখ্যক           ৮+১০ (নিখুঁত)     ৪টি (৪+৪+৪+২ পঙ্ক্তির)

০৬-সংখ্যক           ৮+১০ (নিখুঁত)     ৩টি (৪+৪+৬ পঙ্ক্তির)

০৭-সংখ্যক            ৮+১০ (নিখুঁত)     ৩টি (৪+৪+৬ পঙ্ক্তির)

০৮-সংখ্যক          ৮+১০ (নিখুঁত)     ৪টি (৪+৪+৪+২ পঙ্ক্তির)

০৯-সংখ্যক           ৮+১০ (নিখুঁত)     ৪টি (৪+৪+৪+২ পঙ্ক্তির)

১০-সংখ্যক            ৮+১০ (নিখুঁত)     ৪টি (৪+৪+৪+২ পঙ্ক্তির)

১১-সংখ্যক            ৮+১০                  ৪টি (৪+৪+৪+২ পঙ্ক্তির)

১২-সংখ্যক            ৮+১০                 ৩টি (৪+৪+৬ পঙ্ক্তির)

১৩-সংখ্যক           ৮+১০                  ২টি (৮ ও ৬ পঙ্ক্তির)

 

আগেই জানিয়েছি, সংখ্যাচিহ্নবিহীন প্রথম চতুর্দশপদীটির শেষ দু-পঙ্ক্তি সমিল অর্থাৎ হুবহু সমাক্ষরে (যথা ‘কাহিনি’) গঠিত যুগ্মক, এবং উপরের প্রদর্শিত ছক থেকেই জানা যায়, এগুলোর অধিকাংশই নিখুঁত অক্ষরবৃত্ত চালের বা ১৮-মাত্রার, যার প্রচল ও স্বভাবসিদ্ধ পর্ববিভাজন ৮+১০। এখানে উল্লেখ্য, ৮ ও ১০-এর এই পর্বভাগ বিকল্পে ১০+৮ চালে বা মাত্রায় করবার সুযোগ থাকলেও ক্বচিৎ তা করা উচিত। কেননা তাতে মূলত ১৮-মাত্রার অক্ষরবৃত্ত বা মহাপয়ারের যে মূল চাল বা পর্বভাগ, যথা ৪+৪+৪+৪+২- এটা করার প্রথম থেকেই সুযোগ থাকে না। যে কারণে তা এক ধরনের কবি-দুর্বলতাও বটে। তবে সত্যি কথা বলতে, কামাল চৌধুরীর আলোচ্য চতুর্দশপদীর একটিতেও এ রকম ঘটেনি, যা একার্থে তাঁর প্রবল ছন্দপ্রজ্ঞান ও পারঙ্গমতাই নির্দেশ করে।

চতুর্দশপদী সংখ্যক ০৪, ১১, ১২ ও ১৩- এ ৪টিও কার্যত ১৮-মাত্রার। তবে এর মধ্যে ০৪-এর ৫ম পঙ্ক্তিতে ‘হাওয়া’ শব্দকে ২-মাত্রায় (দৃশ্যত যদিও ত্রি-অক্ষর; একই শব্দ অর্থাৎ ‘হাওয়া’ লভ্য ১৩-সংখ্যক চতুর্দশপদীর ৯ম পঙ্ক্তিতে), ১১-এর ১০ম পঙ্ক্তির ‘বংশাই’ এবং ১২-এর ১১শ পঙ্ক্তিস্থ ‘ধ্বংস’-এর অনুস্বার বাদ দিয়ে যথাক্রমে তিন ও দুই অক্ষরবিশিষ্ট পদ বা শব্দ গণনা করে আঠারো পঙ্ক্তির মাত্রা ধর্তব্য। সনেটে ও পয়ারে সেটাই নিয়ম, ফলে একে মাত্রা-বিপর্যয় বলা যাবে না। তবে এটাও পরিহার করা গেলে ভালো, যদিও তা সবসময় সম্ভব হয় না।

এ কবিতায় কবির ভাব-কল্পনা ও আবেগচারিতা বিষয়ানুগ হয়েছে বলতে হবে। নামকরণের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অর্থাৎ ‘ভ্রমণ কাহিনি’ রচনায় দূরবিস্তৃত পথ থেকে যেসব মাল-মসলা সংগ্রহ করা জরুরি, তিনি চেষ্টা করেছেন তা করতে। অধিকন্তু তিনি ভুলে যাননি কবিতারচনার আনুষঙ্গিক প্রপঞ্চ। তাই দেখা যায়, চতুর্দশপদীর প্রতিটিতে রয়েছে অর্থ ও শব্দ অলঙ্কারের গুচ্ছ সমাহার। নিচে সে-সম্পর্কেও কিছু তথ্য তুলে ধরা গেল।

 

উপমা ও রূপক: ভ্রমণ কাহিনির কোনো কোনো চতুর্দশপদীতে উপমা ও রূপক যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। বস্তুত কবি যখন বলেন- ‘অক্ষর সবুজ ঘাস সেই আজ রেখেছে শিশির’ (০১-সংখ্যক চতুর্দশপদী; অতঃপর শুধু সংখ্যা উল্লেখের মাধ্যমে চতুর্দশপদীর অবস্থান নির্দেশিত), কিংবা ‘কামিনী সবুজ বন্ধু- চোখে জাগে অনন্যপৃথিবী’ (০৫) অথবা ‘যেখানে পথের ধুলো জননীর পবিত্র পাদুকা’ (০৭), তখন ‘অক্ষর’ উপমেয়কে যতটা না সবুজ ঘাসের উপমানে প্রতীয়মান হয় তার চেয়ে অধিক একে সবুজ ঘাসের রূপকে দেখতে ইচ্ছে জাগে। একইভাবে কামিনী সবুজ বন্ধুকে অনন্যপৃথিবী এবং পথের ধুলোকে জননীর পবিত্র পাদুকার রূপে ভাবতেই আমরা প্রণোদিত হই। ৪-সংখ্যক চতুর্দশপদীতে উক্ত- ‘শব্দকুহকের ঝাউ ভয় পেয়ে তীর থেকে দূরে/পাহাড়ের গ্রামগুলো সঙ্গে নিয়ে রাত জেগে থাকে’, তখন স্পষ্ট বোঝা যায়, এখানে ‘ঝাউ’ ‘শব্দকুহকের’ রূপকে উপস্থিত। এছাড়া ‘দিগন্তের পাখি’, ‘সহিংসার নদী’, ‘এস্কিমোর ঘুম’, ‘বালিকা-নদী’, ‘পাখি-জীবন’, ‘শান্তি-কবুতর’- এসব শব্দযৌগ রূপক আদলেই বিবেচ্য।

 

অনুপ্রাস : অনুপ্রাস বিভিন্ন রকমের হয়, যেমন ছেকানুপ্রাস, বৃত্তানুপ্রাস, অন্ত্যানুপ্রাস (সংস্কৃতে অবশ্য ‘অন্ত্যানুপ্রাস’ অলঙ্কার হিশেবে গণ্য হয় না, তার কারণ সংস্কৃত কাব্যে অন্ত্যমিল ক্বচিৎ লভ্য) প্রভৃতি। ‘ভ্রমণ কাহিনি’র কোনো কোনো পঙ্ক্তিতে আমরা বেশ কিছু অনুপ্রাস পাই। মোটা দাগে সেগুলো-

অ- অশরীরী অরণ্য সুন্দর (০৬);

প- ‘বিধাতা তোমার নামে এই পাপ, পবিত্র ব্যত্যয়’ (০২); ‘এইভাবে আসে ভোর, পুরোনো পথের রেখা ফোটে’ (০৫);  ‘যেখানে পথের ধুলো জননীর পবিত্র পাদুকা’ (০৭);

ব- ‘বড়োবাবু বেপরোয়া বন্দিনীর সুরায় রক্তিম।’ (১১)

ম- ‘মঙ্গল মধুর রাত্রি আজ কার শেকড়ে বরুণ?’ (১০);

র- ‘রাবার গাছের ছায়া তার নিচে সকালের মেয়ে’ (০২);

র/ন- ‘হাজার আলোর নিচে নিশাচর মাদল বাজিয়ে’ (সংখ্যাহীন);

স- ‘সেবার সামান্য স্রোত- আজ টান দিয়েছে অতল।’ (১০)

নরত্ব বা মানবত্ব আরোপ : অর্থালঙ্কারের এই বিশেষ প্রবণতাটির প্রতি কামাল চৌধুরী বরাবরই সদর্থকভাবে দুর্বল, যার প্রমাণ ভ্রমণ কাহিনি-তেও লভ্য। আমরা জানি, জন্ম বা সৃষ্টিগতভাবে অপ্রাণিবাচক তথা নির্বস্তুকতায় যখন কবিরা মানবত্বারোপ বা প্রাণসত্তা সংযোজন করেন, তখন সত্যিই তা এক অন্য ধরনের ব্যঞ্জনা নিয়ে আসে কাব্যদেহে, জন্ম দেয় অনির্বচনীয় ভাবের। দৃশ্যমান চিত্রের আড়ালে সংগুপ্ত, দূরচারী কবিকল্পনাই চিত্রকল্পের উদ্ভাস সৃষ্টি করে। দেখা যাক, তেমন কিছু কবি-কল্পনা।

‘পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসা যূথবদ্ধ মেঘ’ (০২); ‘চা-বাগান পার হয়ে হেঁটে আসে গুচ্ছ গুচ্ছ রোদ/ তাদের সোনালি আভা রুপোলি ধারায় মিলে মিশে/ একসঙ্গে হেসে ওঠে শান্ত এক গ্রামের ওপর।’ (০৩); ‘শব্দকুহকের ঝাউ ভয় পেয়ে তীর থেকে দূরে/ পাহাড়ের গ্রামগুলো সঙ্গে নিয়ে রাত জেগে থাকে’ (০৪); ‘বাতাস ক্যাঁচাল করে এই দৃশ্যে মানুষেরা নেই/ শুধু এক চা-বাগান অন্তরঙ্গ পূর্ণিমায় হাঁটে/আকাশ ছাদের নিচে অবিচ্ছিন্ন ব্যাকুল জীবিকা/ আঁকে এক বৃত্তরেখা’ (০৫); ‘আলিঙ্গনে পাতা ঝরে, আলিঙ্গনে জেগে ওঠে বীজ/ অন্ধকার মৃদু হাসে, সেও চায় চকিত আদর।’ (০৬); ‘বঞ্চিত হবে না জেনে চাঁদ আসে মাঝির পাড়ায়’ (০৯); ‘চলেছি তিমির পিঠে সমুদ্র কি ভয়ানক নাচে/ দিগন্তে অধরা ঢেউ লক্ষ লক্ষ শব্দ মালা গাঁথে’ (১০)।

এখানে যূথবদ্ধ মেঘ, গুচ্ছ গুচ্ছ রোদ, ঝাউ, চা-বাগান, আকাশ, অন্ধকার, চাঁদ, সমুদ্র, ঢেউ ইত্যাদি নিষ্প্রাণ বস্তুনিচয় কবি-কল্পনার অতিরেখে মানবীয় সত্তা লাভ (personification) করে সচল বাণীমূর্তি পেয়েছে, যা নিঃসন্দেহে পাঠকের ভাবনার দিগন্তকে উদ্দীপিত করে। অন্যদিকে ‘বাতাস ক্যাঁচাল করে’ পদবন্ধে শুধু নরত্ব-ই নয়, পরন্তু যানবাহনের বা যান্ত্রিক আওয়াজের দ্যোতনা পাই। কেননা গো-শকটের চলার সময় ‘ক্যাঁচ-ক্যাঁচ’ জাতীয় শব্দ শোনা যায়।

ভ্রমণ কাহিনির ১৪টি চতুর্দশপদীর কোনো কোনোটিতে বাংলার লোক-ঐতিহ্য বা লোকপুরাণ, হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র এবং প্রাচীন ভারতের বৌদ্ধধর্মীয় ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন কবি, যা মূলত ‘বনবিবি’ (০৩), ‘তথাগত’, ‘আনন্দ’ ও ‘অম্বপালি’ (০৮), ‘সোমরস’ (সংখ্যাহীন) এবং ‘বরুণ’ (১০) নামের অনুষঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে এককভাবে ধরলে ০৮-সংখ্যক চতুর্দশপদীটি যেন ইতিহাস-পুরাণের যৌগ তৈরি করেছে। স্বয়ং তথাগত অর্থাৎ গৌতমবুদ্ধের বেশে অন্যতম শিষ্য আনন্দ, থেরি অম্বপালিসহ কবি-ভ্রামণিক এতে জেতবনে বিশ্রাম নিতে চেয়েছেন, যেখানে তাদের পেছনে থাকবে ভক্তের দল, গৃহীদের দানে পূর্ণ হয়ে উঠবে কম-লু এবং শেষে সকলে মিলে একান্ন ভোজন করবেন। এর ফাঁকে প্রশ্ন উঠবে- এ জীবন কি শুধু মর্ত্যবাসেই শেষ হবে? তাই যদি হবে তবে কেন কেউ হিংসা-বিদ্বেষের রাজ্য ছেড়ে, সংসার ত্যেজে, রাজগৃহ ছেড়ে তপোবনে নির্বাণ খুঁজবে? কিন্তু এ-প্রশ্নের কোনো মীমাংসা হবে না। সত্যি বলতে, এর উত্তর কারওরই জানা নেই, তাই এ-সম্পর্কে প্রশ্নোত্থাপন বা বিতর্ক না করাই শ্রেয় :

তথাগত তুমি বলো এই যাত্রা মৃত্যুতেই শেষ?

আনন্দ তোমাকে বলি মৌন থাকো, জানতে চেয়ো না

জেতবন ইহকাল সর্বপ্রাণ অস্তিত্বে জীবিত

মৌন থাকো, মৌন থাকো, ভক্তকুল বিতর্ক করো না।

অলঙ্কারের তালিকায় আলোচ্য কবিতায় কাকু-বক্রোক্তিরও প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। যেমন- ‘শীত না শোক না জন্ম? এই নিশি কার জন্য লেখা’ (০১) এবং ‘নির্বাণেই মহামুক্তি- না কি আরো পথ আছে বাকি?’ (০৮)।

এ-পর্যায়ে ভ্রমণ কাহিনির ভাষা ও শব্দ ব্যবহার এবং আরও দু-একটি বিষয়ে উল্লেখ করে এ-আলোচনা শেষ করব। প্রসঙ্গান্তরে আগেই বলেছি, কামাল চৌধুরী তাঁর কাব্যে বিষয়বস্তু ও ভাব-কল্পনার সংরাগ সংস্থাপনে বিশিষ্ট কাব্যভাষা (Poetic diction) সঞ্চালনের পক্ষপাতী। আমরা জানি কবির হৃদয়ানুভূতি, আবেগ, অন্তর্গত তাড়না তথা এককথায় ভাষাপ্রকাশের প্রধান অবলম্বন শব্দ; সেই শব্দানুসন্ধানে কবি একান্ত চেষ্টা করেন কোনো বিশেষ শ্রেণির বা গোষ্ঠীর শব্দের প্রতি অনুরক্ত না থেকে বরং যথোপযুক্ত, সুষম শব্দটি (best word) বেছে নিতে। তবে সবসময় যে তা পারেন, এমনটা হয়তো নয়, তবে তিনি যে এব্যাপারে পুরোপুরিই ছুঁৎ-বর্জিত, তা তাঁর বর্তমান কবিতায় শব্দপ্রয়োগের একটি নির্বাচিত তালিকা (তৎসম-তদ্ভবের বাইরে) দেখলেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে- তাঁবু, যাদু, রোমাঞ্চ, রাবার, ফি-বছর, চা-বাগান, এপ্রিল, হেরিঙ বণ্ড, রাস্তা, বস্তি, সুরা, হল্লা, খানাখন্দ, খুনি, রসদ, এস্কিমো, ঠান্ডা, ইজারা, জমিদার, বেপরোয়া, খাজনা, কাছারি, নায়েব, হাজামজা, মহাল, এস্রাজ, হাওয়া, বাহার ইত্যাদি। অপ্রাণিবাচক বা বস্তুর বিশেষণেরও তিনি, ক্ষেত্রত, স্ত্রীলিঙ্গান্তর করেন, যেমন- ‘দীর্ঘতমা সৈকত’ (০৯)। বলাবাহুল্য গদ্যে তা অচল ও বিসৃদশ মনে হতো বটে, কিন্তু এখানে অর্থাৎ পদ্যে তা উৎরেই গিয়েছে বলতে হবে।

ভ্রমণ কাহিনিতে বেশ কিছু স্থাননাম, নদীনাম, কাল বা ঋতু এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপস্থিতি লক্ষ করি। তালিকা তৈরি করলে সেটি দাঁড়াবে নিম্নরূপ :

স্থাননাম ও নদী : মাধবকুণ্ড (০৩); উখিয়া (০৪); জেতবন, রাজগৃহ (০৮); ইনানী (০৯); পাহাড়তলি (১০) ও বংশাই নদী (১১)।

কাল/ঋতু : আষাঢ় (০৩); পূর্ণিমা (০৫) ও শীত (০১; ০৬)।

প্রাণী : প্রজাপতি, ভ্রমর (০২); বেড়াল (০৬); কবুতর (০৭); তিমি (১০); চড়ুই ও তক্ষক (১১)।

উদ্ভিদ: কামিনী (০৫); শাল (০৬); নারকেল, ঝাউ (০৯); শিমুল (১০) ও পরাগ (১২)।

পরিশেষে বলা যায়, ভ্রমণ কাহিনি আসলে কবি কামাল চৌধুরীর এক ধরনের মানসযাত্রা, স্বদেশের ভূগোল-মানচিত্র এবং ইতিহাস-পুরাণ তিনি এতে মন্থন করলেও আবিশ্বচারিতা ও মানবাত্মার পরিত্রাণ তাঁর মৌল অভীষ্ট। তাই দেখা যায়, কবি-ভ্রামণিক ‘অন্ধ মেয়েটিকে’ তথা অসহায় মানুষকে দীপ্র বরাভয় দিয়েই তাঁর পথচলার ইতি টানতে চান :

এইসব দৃশ্য থেকে নেব গান, রঙের বাহার

অন্ধ মেয়েটিকে দেব ভরাচাঁদ পূর্ণিমার সুখ

সে যেন জানতে পারে একা নয় তার বসুন্ধরা

মানুষ দাঁড়িয়ে আছে অনিঃশেষ পথের ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares