ক্রোড়পত্র জন্মদিনে : তাঁর কবিতার স্বর ও শব্দমায়া : বেগম আকতার কামাল

ক্রোড়পত্র জন্মদিনে

তাঁর কবিতার স্বর ও শব্দমায়া

বেগম আকতার কামাল

প্রত্যেক সৎ কবিকে তাঁর প্রতিভার কাছে নতজানু হতে হয় একটি শুদ্ধ কবিতার জন্মের জন্য। যদিও এই প্রতিভা গড়ে তোলে দেশকাল-সমাজ-পেশা-ভাষা-প্রকৃতি ও নান্দনিকতার আদর্শ, তবুও কবির কল্পনা-প্রতিভা খানিকটা দিব্যতার স্পর্শজাত অন্তঃপ্রেরণায় বিনত। পেশাগত পরিচয় বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৈপরীত্য কখনও কবির প্রেরণাকে নিরস্ত করতে পারে না। কারণ কবির আত্ম-আমি কবিতার জন্ম দেয়, প্রতিক্ষণে শুশ্রƒষা ও শুদ্ধ করে চলে কবিতার পার্সোনাকে। যে কোনো শুভবাদী কবির অন্বিষ্টই হলো এই পার্সোনার মুখ ও মুখশ্রী খুঁজে ফেরাÑ শব্দে-ছন্দে-অলঙ্করণে। সত্তর দশকের কবি কামাল চৌধুরীর কবিতা পাঠে এ রকম প্রয়াসই চোখে পড়ে। অগ্নিগর্ভ সময়ে তাঁর লেখালেখির শুরু, এখনও তা অব্যাহত। গত চার দশকজুড়ে সময়ের হাত ধরে তিনি দাঁড়াতে চেয়েছেন স্বদেশের ইতিহাস-ভূগোল-নৃতত্ত্বের পটভূমিতে। আর প্রকৃতিলগ্ন জনমানুষের কৃতিতে এবং নিজের পার্সোনার সৎ অভিব্যক্তিতে। আত্মসচেতন কবি তিনি, আবেগবাহুল্যে আত্মহারা হন না, আর আত্মসচেতনতাকে চারিয়ে দেন মৃত্তিকার গভীরে, হয়ে ওঠেন বহুমাত্রিক। তাঁর ইতিহাসদৃষ্টি সর্বদাই তাঁকে আলো দেয়, তাপিত করে কালের ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামের আগুন। আর তৃষ্ণার্ত করে তোলে জীবনপ্রেমের জন্য।

কামাল চৌধুরীর জীবনপ্রেম বায়বীয় কিছু নয় বা নয় নিছক আপ্তবাক্য। তাতে জড়িয়ে থাকে প্রাকৃতায়নের অভীপ্সা, থাকে নিবিড় আর্তি আর তাতে শিল্পনিপুণ হয়ে ওঠে কবিতার উচ্চারণÑ ‘আমার কান্না বিষাদের কালো দিনে/সেই মুখখানি একা মহীরুহ ছিল/মারী ও মড়কে মানুষের তা-বে/সেই মুখখানি পৃথিবীর প্রেম ছিল। (‘সেই মুখখানি কবিতার বড় ছিল’) এই মুখচ্ছবি কোনো বত্তিচেলির চিত্রাঙ্কিত সমুদ্রে ভেসে-ওঠা ঝিনুকে দাঁড়িয়ে থাকা ভেনাস নয় কিংবা নয় রাবীন্দ্রিক কবিতাসুন্দরী কল্পনালতা-রহস্যময়ী। এই মুখ ‘যুদ্ধে মিছিলে রক্ত বারুদ মাখা’, তাতে ‘স্বদেশের ছায়া’ ছিল, তার হাতে ছিল ‘উদ্যত রাইফেল’। এই যে কবিতায় মুক্তিযোদ্ধার মুখকে ছন্দিত করেন তিনি, তা সত্যিই অভিনতুন। তবে কি তাঁর কবিতায় রহস্যময়তা নেই? নেই আত্ম মন্ময়ানুভূতি? না, তাও আছে, নইলে তো কামাল চৌধুরী কবিই হতেন না, তাঁর ‘কালোসুন্দরী’র এক হাতে থাকে ‘জীবনের প্রিয়পুষ্প প্রেম’, আরেক হাত থাকে মুষ্টিবদ্ধ মিছিলের প্রতীকতা, তাঁকে দেখায় ‘জাতীয়তাময় জন্ম-মৃত্যু’, জীবন যে নিরন্তর লড়াইÑ এই উপলব্ধিও কবির নিত্য ভাববোধি। আর এই বোধির প্রেক্ষণবিন্দুতেই তিনি দেখেনÑ ‘সাঁওতাল রমণীর ঘোরলাগা চোখের মতন/প্রতিদিন ঝুড়ি ভরে জমা হয় রোদ।’ অনন্য এই চিত্রকল্প, এর অনুষঙ্গে শুধু প্রকৃতি সৌন্দর্যই নেই, আছে চা শ্রমিকের-ফুল্লকামিনীদের ঝুড়িভরা দুঃখ। সম্পন্নদের ঘরে চায়ের সুবাস আর ফুল্লকামিনীদের জীবননিয়তিকে এভাবে আন্তঃবৈপরীত্যময় করে-তোলা কামাল চৌধুরীর আত্মসচেতন দৃষ্টিভঙ্গিরই কাব্যায়ন। তাঁর বলার কথা ও ভাষাÑ দুটোই মিথস্ক্রিয়া ঘটায় ওই প্রেক্ষণবিন্দুর চমৎকারিত্বে। তিনি শুধু দেখেন না, অনুভব করেন পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে আর সেই অনুভবকে ছবিতে-ছন্দে সাজিয়ে তোলেন, অক্ষরবৃত্ত-মাত্রাবৃত্তের লয়ে তাকে দেন সান্দ্রঘন কাব্যদ্যুতি। তাঁর নির্বাচিত কবিতা গ্রন্থের ‘যমজ’ কবিতাটি আমার কাছে খুব বেশি রহস্যময় আর নান্দনিক মনে হয়েছে। কবিতাটির ভাবনাও অভিনব, সমাজের দৃষ্টিতে একজন মৃত আর কবি জীবিতÑ কেবল বাঁচার জন্য তাকে বিচ্ছিন্ন করা হলো যমজের দেহ থেকে। কে এই যমজ? কবি নিজে কি এখানে জৈবিক মানুষ? নাকি যমজের মৃত-জন তাকে ভবিতব্যের দিকে নিয়ে গিয়েছিল? কবিতাটিতে জন্ম-মৃত্যুর নিয়তিকে যেমন মায়াবলে ধরা হয়েছে, তেমনি নিজের চেতনময় জীবন ও অবচেতনকেও কাব্যিক সত্তার অখ-তায় জুড়ে দেওয়া হয়েছে যমজ-প্রতীকে। শেষ স্তবকে কবির উচ্চারণÑ ‘পরজীবী চাঁদ তোর গায়ে হারিকেন বেঁধে দেবে বলে/ একাকী নিঃসঙ্গ এক অতৃপ্ত মানুষ/ যমজ প্রতিজ্ঞা নিয়ে নগ্ন হয়ে ছুটে যায়/ পদে পদে ছায়া পড়ে তার/পদছাপ মিশে যায় অবচেতনের রেখায় রেখায়, (‘যমজ’) ।

এখানে ধাঁধা লাগে এই যমজ কবির চেতন ও অবচেতন কিনা! এমনি বহুমাত্রিক রহস্যকুঞ্চিকায় ঠাসা কবিতাটি। ছোট আকারের কবিতাগুলো মনে হয়েছে যেন এক একটি ঝটিকা, আবর্তময় কথন। আর বড় কবিতাগুলো ভাবপ্রসারী ও রহস্যঘন। কবির বলার কথাগুলো প্রসারিত আঙ্গিকে নানা ভাবদ্যোতনায় আলোড়ন-বিলোড়ন তুলে ঘনীভূত হতে থাকে, কোথাও ভাবশৈথিল্য দেখা যায় না।

এ রকম একটি দীর্ঘ কবিতা হচ্ছে ‘হাড়ের গল্প’। এখানে কবির ইতিহাসযাপন বধ্যভূমি, রক্তাক্তযুদ্ধ-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় এক চক্রব্যুহের মধ্যে ও হাড়ের কথকতা হয়ে ওঠে। তবুও কবির আশাবাদ জেগে রয়, তাহলে কি লুপ্ত গর্ভে পুনর্বার শুরু হবে জন্ম জাগরণ/ঢাকা পড়ে যাবে দেহ অন্য কোনো বস্তুহীন বায়বীয় পথে/কোথায় জাগব তবেÑ সুন্দরের কোন কবিলোকে?/ এই তো হাড়ের গল্প, প্রাণ শুধু প্রশ্ন ভরা পাখি/ছিন্ন অস্থি উড়ে যায় অন্তহীন সৌর মহাঝড়ে… প্রাণের অমৃত রূপটিই টিকে থাকে, আর যদি রূপকার্থে কবিতাটি পাঠ করা যায় তবে পাওয়া যাবে কবিতার জন্ম-মৃত্যু কথার বয়ান। জীবনের যা কিছু সৌন্দর্য-নক্ষত্র-চাঁদ- আকাশ-দ্রাক্ষার নিকুঞ্জÑ যেসব প্রতি মুহূর্তে নিষ্পিষ্ট হয় অসুন্দরের হাতে, সেসব নিয়েই কবির কলম হাতে তুলে নেওয়ার প্রত্যয়টি ঘোষিতÑ যদিও তার বিরুদ্ধে সর্বদাই উদ্যত থাকে তরবারি। ‘সূর্যাস্ত’ নামের কবিতাটিতে অন্যরকম প্রেমাস্বাদের ভঙ্গি তৈরি হয়েছেÑ ‘সূর্যাস্তের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমি তোমার খুব/কাছে পৌঁছে গেছি…/… দিগন্তের কাঁধে ভর করে/সূর্যাস্তের দিকে হাঁটতে হাঁটতে/ এক নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায় আমরা সমুদ্রে ডুবে গেলাম।’ এই যে প্রেমেরÑ আমি-তুমির পারস্পরিকতার সমুদ্রে ডুবে যাওয়া এ কোনো দিগন্ত হারানোর বিদিশা নয় বরং দুইয়ের অন্তর্লীন হয়ে ওঠার অগাধ সমুদ্র-ডোবার ইশারা। কিন্তু প্রেম শুধু পরস্পরের মধ্যে লীন হওয়ার মধ্যেই বাঁচে না, প্রগাঢ় হয়ে ওঠে জীবনভূমির সঙ্গে লিপ্ত থেকেÑ যেখানে লোকালয়, বর্ষাভেজা গোমতি, আড়িয়ালখাঁ, নৌকা-ভাসা এবং এসবের মধ্যেই নিজেদের ভস্ম করা আর সেই ভস্ম থেকে আকাক্সক্ষার ফিনিক্স পাখির জন্মদানÑ যা করে সংগীত, যা করে কবিতা। কবি নিজেদের ‘পতঙ্গপ্রাণ’ বলছেন যথার্থ অর্থেই ক্রূর-বক্র-প্রথাগত ধূর্ত নিয়তি হা-মুখ-করা যে আগুন জ্বালিয়ে দেয় প্রতি মুহূর্তে তা তাদের শ্রম-ঘাম-অভিজ্ঞতার দীর্ঘ সেতুপথ পেরিয়ে সূর্যাভিমুখে উড়তে থাকে, ‘সূর্য’ শব্দটি ব্যবহারে প্রাণপতঙ্গের আলোকাভিসারী দিগন্ত-ছোঁয়ার গল্পটি যেন রচিত হলো। এই আলোই প্রেমকে নিষ্কাম করে তোলে, সুন্দরের আকাশই জৈবিক বাসনাকে বিলীন করে জীবনের বসন্তশয্যায় দুজনকে অপার্থিব করে তোলে। বাংলা কবিতার দেহজ প্রেম-কামবাসনাÑ যা শামসুর রাহমানে খুবই প্রত্যক্ষ করা যায়, কামাল চৌধুরীর কবিতায় সেই কামবাসনা পুড়ে যায় সুন্দরের আগুনে, তাই তিনি এক নিষ্কাম মিলন-ঋতুর বাসনা ব্যক্ত করেন এবং একমাত্র কবিতাই পারে সেই নিষ্কাম বাসনার ‘অপার্থিব পাতার বাসর’ রচনা করতে। (দ্রষ্টব্য, ‘একটি নিষ্কাম কবিতা)

কবির প্রেক্ষণবিন্দু সমুদ্র-দিগন্তচারী যতটা তারও বেশি ছোট ছোট অঙ্গনে-প্রাঙ্গণে জীবনকণার দিকে বেশি নিবদ্ধ। বাতাস-ছায়া, ধূলি-পাখি, দেবদারু-তরু-ইত্যাকার দৃশ্যকল্পে ভরে ওঠে কবিতার অঙ্গন। মনে হয় কবি কোনো বিশেষ অঞ্চলেরÑ হতে পারে তা আমাদের চা বাগান আর ছায়া-বাতাস-টিলাঘেরা সিলেট অঞ্চল, অনুপুঙ্খ চলচ্ছবি তৈরি করেন। যেমনÑ ‘শেকড় উপড়ে ফেলে পথ খোঁজে বিহঙ্গ বনানী/দাঁড়িয়ে ইস্কুল দেখে অপার্থিব অক্ষরের টানে/ অচেনা গাছের সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছে দেবদারু মেয়ে।’ (‘অপার্থিব’)

কামাল চৌধুরীর নিজস্বতা হচ্ছে নিটোল চিত্রকল্প, অন্যাসক্ত অলঙ্কার রচনায় আর যেটা আজকাল খুব বেশি দেখা যায় না সেই রূপক অলঙ্কার বিনির্মাণে। ‘বিকালের কোলাহলে ঝিনুকের স্থির অস্থিরতা’, ‘অঘ্রানের আকাশমুখিতা’, ‘বিহঙ্গ বনানী’, ‘দেবদারু মেয়ে’, ‘ধূসর নিয়তি’, ‘বাতাসমুখী বৃষ্টি ফোঁটা শ্যামা পাখির বর্ষাতিতে’ ‘শরীরে আজ বিহঙ্গকাল’, ‘তীর্থ-ভাষা,’ ‘অতল ডানা’, ‘অসীম নীরবতা’, ‘রামধনুকের মুকুট পরে’Ñ ইত্যাদি অনেক অনেক শব্দজোড় আর বাক্যাংশে কামাল চৌধুরীর স্বরগ্রাম লিপিবদ্ধ হয় এবং এই শব্দায়ন, ছন্দায়ন আর অলঙ্করণের স্বতঃস্ফূর্ত কিন্তু সচেতন অন্তর্বয়নে খুব নিবিড়, মন্মায়ানুভূতির সঙ্গে সঙ্গে কবিতা-আস্বাদে চারিয়ে দেয় তন্ময়তার রূপ-রূপান্তর।

অনুরুদ্ধ হয়ে কামাল চৌধুরীর কবিতা সম্পর্কে নিছক আর্শীবচন লেখার কথা ছিল, ইচ্ছাও ছিল। কিন্তু নির্বাচিত কবিতা কাব্যগ্রন্থটি পড়তে পড়তে আমারও লেখাটি বড় হয়ে যেতে থাকে, আরও অনেক কথার আকুতি তৈরি হতে থাকে, এই আকুতি জাগানোই একজন সৎ ও ভালো কবির লক্ষণ। কামাল চৌধুরীর কবিতা তার সাক্ষ্য বহন করে। আমি তাই কোনো নেতিবাচক চিহ্ন আবিষ্কারে যাইনি, যেতে ইচ্ছাও করেনি। আমলাতন্ত্রের মোহ-জটিলতা-কুটিলতার মধ্যেও এই যে কবিতাপ্রাণিত তার সত্তা এটির খোঁজ পেয়ে তাঁর মুখ ও মুখশ্রীÑ উভয়কেই পেয়ে গেলাম, তিনি অব্যাহতভাবে সৃষ্টিশীল থাকুনÑ এই কামনা করছি। তিনি তাঁর পাখিদের গ্রামে মাটির অক্ষর রচনা করে যাচ্ছেন। আর কোলাহল খুঁজছেন জীবন ও প্রকৃতির যুগলবন্দিতায়। এই প্রয়াস আরও নান্দনিক হয়ে ওঠুক।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares