প্রচ্ছদ রচনা : কোথাও কোনো প্রফেশনালিজমের ছাপ নাই : ওবায়েদ আকাশ

প্রচ্ছদ রচনা

কোথাও কোনো প্রফেশনালিজমের ছাপ নাই

ওবায়েদ আকাশ

যখনই কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা গণমাধ্যম বা প্রকাশনা নিজের সমালোচনা গ্রহণ করার জন্য মুখিয়ে থাকে; এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করায়ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ; তখন তার প্রতি সমালোচনার ভাষা অনেকটা সংযত হয়ে আসে। যেমন কেউ অপরাধ করে অনুশোচনা করলে আমরা অপরাধীর প্রতি বেশি দয়াপরবশ হয়ে ব্যবস্থা নিতে উদ্যত হই। তবে এটা কিন্তু আবার অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীর কৌশলও হতে পারে। আবার হতে পারে স্বাভাবিকভাবেই সে তার অপরাধ বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছে। এখন কথা হচ্ছে, বহুল প্রচারিত সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক কি কোনো অর্থে অপরাধী হতে পারেন যে তার জন্য তিনি অন্যের সমালোচনা গ্রহণে প্রস্তুত? অথবা তার যে কৃতকর্ম তার মাধ্যমে কি তিনি কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছেন বা দুষ্টবুদ্ধি ছড়াচ্ছেন, যে তা খুঁটে খুঁটে বের করে সমালোচককে সমালোচনা করতে হবে? কিংবা তিনি সমালোচকের সমালোচনা গ্রহণ করবেন কি? কিংবা এটি কি কোনো ধাঁধা যে ধাঁধার সঠিক উত্তর দিতে পারলে বিজয়ী হওয়ার আনন্দ পাওয়া যাবে?

একটি সাহিত্য পত্রিকার সমালোচনা কেন করব- এ প্রশ্নটি ভাবতে গিয়ে উপরের কথাগুলো হরহর করে মাথার ভেতর থেকে বের হয়ে এল। এক্ষণে আরও কিছু প্রশ্ন জাগছে যে, তিনি কেন পত্রিকাটি প্রকাশ করেন? বা তার উদ্দেশ্য কী? তিনি কি সাহিত্য সেবাই করতে চান, না অমরত্ব চান, না মনের আনন্দে পত্রিকা প্রকাশ করেন? নাকি সম্পাদক হিসেবে খ্যাতিমান বা জনপ্রিয় হবার জন্য কাজটি করেন? নাকি তার কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য আছে, নাকি তিনি পত্রিকাটির মাধ্যমে নিজের চিন্তাকে অন্যের মস্তিষ্কে ছড়িয়ে দিতে চান? অথবা তিনি কি চান সাহিত্যকে সুন্দর মোড়কে চমৎকার পণ্য তৈরি করে পত্রপত্রিকায় তার বিজ্ঞাপন প্রচার করে বিক্রি করে লাভবান হতে? অথবা তিনি কি চান তার পত্রিকাখানা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা মাহমুদুল হকের উপন্যাসের মতো স্বল্পবিক্রিত হোক, নাকি চান হুমায়ূন আহমেদ বা কাজী আনোয়ার হোসেনের রচনার মতো মার মার কাট কাট বিক্রি হোক? তিনি কি চান লেখকরা তার পত্রিকায় হুমড়ি খেয়ে লেখা দিক নাকি তিনি পছন্দের লেখকদের লেখা সংগ্রহ করে ছাপাতে চান? তিনি কি চান তার পত্রিকাটি সর্বমহলে আলোচিত হোক নাকি শুধু সুধীমহলে বা তরুণমহলে আলোচিত হোক? তিনি কি চান পত্রিকাটি নিয়ে অপর মিডিয়া ঝড় তুলুক নাকি চান তিনি নিজেই অন্য পত্রিকার ব্যাপারে সজাগ করে তুলবেন তার পত্রিকাটিকে? এই উত্তরগুলো জানা থাকলে অবশ্য সমালোচক হিসেবে কথা বলতে খুব সুবিধা হতো। যেহেতু কিছুই জানি না সম্পাদকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে, তাই এই সমালোচনায় কোনো ধার থাকবে বলে মনে হচ্ছে না।

এবার তিনি যদি বলেন, যা আছে তার ওপরেই দুটি কথা বলা গেলে মন্দ কী? তবে বলব একটি সাহিত্যপত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। তার কিছু গুণগ্রাহী পাঠক আছে। পত্রিকাটিতে লেখার জন্য একদল আগ্রহী লেখকও আছেন। বিভিন্ন দেশের লেখকদের মধ্যে একদল লেখক আছেন যাদের অন্যতম প্রধান কাজ হলো সম্পাদকের স্তুতি করা; তাকে তৈল মর্দন করে তার মন জয় করা এবং তার পত্রিকার মাধ্যমে ঘন ঘন নিজেকে প্রকাশ করা। যে কোনোভাবেই তারা এই স্তুতি সম্পাদকের কর্ণকুহরে পৌঁছে দেন। তাতে নিশ্চয় সম্পাদক যারপরনাই খুশি হন। মূল্য কম রাখা বা অন্য কোনো কারণে পত্রিকাটি বিক্রিও হয় ভালো। কিছু বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনও থাকে। তাতে পুরোপুরি লস না হয়ে কিছু টাকা ফিরেও আসে; সম্পাদকের মন প্রফুল্ল হয়। শুধু এটিই যদি হয় কমিটমেন্ট, তাহলে তো আর কিছু বলার নেই।

এছাড়া স্পেসিফিক অন্য কোনো কমিটমেন্ট যদি থাকে; তবে তার নিরিখে সমালোচনা করা যেতো।

এখন বলতে পারি, কিছু গল্প, কিছু কবিতা, কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ-অনুবাদ, স্মৃতিকথা, আত্মজীবনী, ধারাবাহিক উপন্যাস কিংবা লেখকের জন্মমৃত্যু নিয়ে বিশেষ সংখ্যা বা কোনো জাতীয় দিবসে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে দায়িত্বটি সমাধা করলেই কি একটি পত্রিকার দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল? একাজ তো সবাই করছে, তবে আলাদা করে আর একটি পত্রিকা শব্দঘর প্রকাশের তো কোনো দরকার আছে বলে মনে করি না। তার এমন একটি বিশেষ দিক থাকার অবশ্যই দরকার আছে, যে বিশেষ দিকটির কারণে পত্রিকাটি পাঠকের কাছে আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পত্রিকা হয়ে উঠতে পারে।

শব্দঘর-এ এমন কোনো বিশেষ দিক আছে বলে ধরতে পারিনি। আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্যও চোখে পড়েনি। বরং একটি অত্যন্ত অশোভন দৃষ্টান্ত দেখেছি একটি সংখ্যায় সেটি হলো সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা। সৈয়দ হক যখন মৃত্যুশয্যায় তখন থেকেই প্রস্তুতি চলছিল সংখ্যাটির, এবং মৃত্যুর পরপরই সে সংখ্যাটি সেই পূর্ব সংগৃহীত লেখা দিয়েই প্রকাশিত হয় (যদি আমি ভুল না করে থাকি)। একজন লেখক মারা যাবার আগেই তাকে নিয়ে সংখ্যা করার প্রস্তুতি চলছে, এটা আমার কাছে শিল্পসাহিত্যের কমিটমেন্টের অশুদ্ধতা-অশোভনতাকে প্রমাণ করে। যা একই সঙ্গে একটি অমানবিক সিদ্ধান্তও। কেউ মারা গেলে তাকে নিয়ে আগে সংখ্যা করতে হবে- এমন প্রতিযোগিতা সাহিত্য পত্রিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি?

অন্যান্য কিছু সংখ্যা দেখে মনে হয়েছে, সেই একই পরিকল্পনা, একই উদ্দেশ্য, একই ভাবনা থেকে সংখ্যাগুলো প্রকাশিত হয়েছে। যে কারণে মূল ধারার তরুণদের লেখা তেমন একটা চোখে পড়ে না। দেখি সেই পুরনো মুখ, পুরনো কবি-লেখকদের ছড়াছড়ি। ঘুরেফিরে আমাদের ঐ ক’জন সিনিয়র লেখকদের লেখা, তাদের ছবি প্রকাশ, তাদেরই সাহিত্যের অনুবাদে ভরপুর পত্রিকাটি। তবে এটা হতেই পারে যদি উদ্দেশ্য হয় বাণিজ্যিক। সেখানে প্রধান উদ্দেশ্যই থাকে পরিচিত এবং জনপ্রিয় লেখকদের লেখা প্রকাশ। এমন হয়ে থাকলে কতটা বাণিজ্য হচ্ছে সেটা তো আর আমাদের জানার কথা নয়।

 

২.

পত্রিকার মুদ্রণ ভালো হচ্ছে। তবে অযথাই ভেতরের পৃষ্ঠাগুলো মোটা দেয়া হচ্ছে। এতে সম্পাদনার প্রফেশনালিজমের ব্যাপারটি একদম চোখে পড়ছে না। বরং মোটা কাগজ কিনতে প্রকাশকের বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হলো, সর্বক্ষেত্রেই পত্রিকাটির জন্য প্রচুর ব্যয় করা হলেও, কোনো লেখক সম্মানী কি দেয়া  হয়? শুনেছি দেয়া হয়; তবে তা কি শুধু সিনিয়র লেখকদের জন্যই প্রযোজ্য? তাহলে তো সেই তেলে মাথায়ই তেল দেয়া হলো। সম্পাদক এবং প্রকাশককে বলব, সবার আগে সব লেখককে সম্মানী দেবার মানসিকতা তৈরি করুন। প্রয়োজনে প্রেসের বিল বাকি রেখে লেখকসম্মানী দিন। সাধ্য থাকলে অন্যেরা যে সম্মানী দেয় তারচেয়ে বেশি বেশি সম্মানী দিয়ে উদাহরণ তৈরি করুন। শব্দঘর-সম্পাদক নিজেও যেখানে একজন লেখক, সেখানে তাকে এ কথা বোঝাতে যাওয়া বোকামি ছাড়া আর কী? শেষ কথা, পত্রিকার কাগজ মুদ্রণ লেখা নির্বাচন পরিকল্পনা গেটআপ মেকআপ সর্বক্ষেত্রে প্রফেশনালিজমের যথেষ্ট ঘাটতি চোখে পড়ে। মনে হয় শুধু করার জন্য করা একটি পত্রিকা শব্দঘর।

লেখক : সম্পাদক, শালুক (লিটলম্যাগ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares