প্রচ্ছদ রচনা : শব্দশিল্পের কারুপত্র : সোলায়মান কবীর

প্রচ্ছদ রচনা

শব্দশিল্পের কারুপত্র

সোলায়মান কবীর

সাহিত্য ও শিল্পের বৈচিত্র্যময় দিগন্তস্পর্শী আধার ও আধেয় সর্বাঙ্গে ধারণ করে বাংলাদেশের যে সাহিত্য পত্রিকাটি দুর্বার গতিতে সামনে এগিয়ে চলেছে সেটি শব্দঘর। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে পত্রিকাটি প্রতিমাসে বিরতিহীনভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। সূচনাসংখ্যা থেকেই পত্রিকাটি নতুন নতুন বিস্ময় নিয়ে পাঠকের মুগ্ধতাকে উস্কে দিয়েছে নিরন্তর। কবিতা, গল্প, ধারাবাহিক উপন্যাস, নাটক ও শিল্পকলার নানাদিক এই পত্রিকায় যেমন গুরুত্ব সহকারে স্থান পেয়েছে, তেমনি এখানে আকর্ষণীয় অলঙ্করণসহ স্থান লাভ করেছে বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ। তবে শব্দঘর এর সবচেয়ে মৌলিক সংযোজন বাংলা সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদ। বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের প্রতিনিধিত্বশীল লেখাগুলোর ইংরেজি অনুবাদ যতœ সহকারে এই পত্রিকায় তুলে ধরা হয়। এই উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যকে বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে হলে অবশ্যই সমৃদ্ধ অনুবাদের সহায়তা প্রয়োজন। এই প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য বিদেশি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মাহমুদুল হক, হাসান আজিজুল হক, আবদুল গাফফার চৌধুরী, সুফিয়া কামাল, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়সহ বাংলা সাহিত্যের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের রচনার অনুবাদ এরমধ্যে পত্রিকাটি প্রকাশ করেছে। এই প্রক্রিয়া এখনও চলমান, যা শব্দঘর-কে বিশিষ্ট করে তুলেছে নিঃসন্দেহে ।

২.

শব্দঘর বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল। ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক সাহিত্য এখানে যেমন পত্রস্থ হয়েছে তেমনি বাংলাদেশের শেকড়-সংলগ্ন লেখকদের উৎসাহিত করছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। ফলে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আত্ম-অন্বেষণমূলক সৃষ্টি কর্মের একটি সুষ্ঠুধারা তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শব্দঘর বিভিন্ন বিষয়কেন্দ্রিক কিছু উল্লেখযোগ্য সংখ্যাও পাঠকদের উপহার দিতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে ভাষা- আন্দোলনকেন্দ্রিক সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক সাহিত্য, নির্বাচিত বই, কালজয়ী সাহিত্য নিয়ে শব্দঘর-এর আয়োজন মনে রাখার মতো। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে পত্রিকাটি বাংলাসাহিত্যের মূলধারার প্রতিনিধিত্বশীল প্রবণতা পাঠকের সামনে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

লেখকদের জন্মদিনকে কেন্দ্র করে শব্দঘর বিশেষ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে লেখকদের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি তাঁদের প্রতিনিধিত্বশীল রচনাও এখানে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে একজন লেখককে অন্তরঙ্গভাবে অনুধাবন করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। কবি শামসুর রাহমান, বেলাল চৌধুরী, কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদসহ বেশ কিছু লেখকের জন্মদিন উপলক্ষে পত্রিকাটি সমৃদ্ধ সংখ্যার আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছে।

 

৩.

শব্দঘর তরুণ লেখকদের সাহিত্যকর্মকে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে চলেছে। তরুণ লেখকদের চিহ্নিত করা ও লালন-পালন করা যে-কোনো পত্রিকার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিষ্ঠিত লেখকগণ যথারীতি চিহ্নিতই থাকেন। কিন্তু তরুণ লেখকদের মধ্যে কারা গুরুত্বপূর্ণ সেটি সাহিত্য সম্পাদককেই আবিষ্কার করে নিতে হয়। যিনি এই কাজটি যতটা দক্ষতার সঙ্গে করতে পারেন, প্রকৃতপক্ষে তিনি তত বড় সাহিত্য সম্পাদক। শব্দঘর তরুণ লেখকদের চিহ্নিত করতেও উৎসাহী। তরুণদের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে পত্রিকাটি বিশেষ সংখ্যারও আয়োজন করেছে। ‘বিজয় দিবস সংখ্যা ২০১৬’ মুক্তিযুদ্ধের কবিতা ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প দিয়ে সাজানো হয়েছে। এই সংখ্যার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছেÑ ‘পূর্ববর্তী প্রবীণ গল্পকারদের পাশাপাশি দ্বিতীয় প্রজন্মের লেখকদের গল্পে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কীভাবে রূপায়িত হয়েছে, তারই তদন্ত-তত্ত্ব-তালাশ করতে গিয়ে আমরা পেয়েছি অনবদ্য সব প্রকরণ-কৌশল, বিষয় ও আঙ্গিক।’ অর্থাৎ তরুণ লেখকদের সাহিত্যের বিষয় ও প্রকরণগত দিকের নিবিড় বিশ্লেষণেও পত্রিকাটি উৎসাহী।

শব্দঘর স্বদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে বাংলা সাহিত্যকে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। শব্দঘর-এর সম্পাদক কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের সুদৃঢ় আন্তরিকতায় পত্রিকাটি বহুদূর এগিয়ে যাবে এবং বাংলা সাহিত্যের সীমাকে প্রসারিত করবে নিরন্তরÑ এই প্রত্যাশা আমাদের সবার। শব্দঘর-এর তৃতীয় বর্ষপূর্তিতে শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা।

লেখক : সম্পাদক, অক্ষৌহিণী (সাহিত্য বিষয়ক ছোটকাগজ)

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares