অনূদিত উপন্যাস- ধা রা বা হি ক : দ্বি তী য়  প র্ব পনেরো কিস্তি ভূতলবাসীর কড়চা : ফিওদর মিখাইলোভিচ দস্তইয়েফ্স্কি মূল রুশ থেকে অনুবাদ মশিউল আলম

অনূদিত উপন্যাস

ধা রা বা হি ক : দ্বি তী য়  প র্ব

পনেরো কিস্তি

ভূতলবাসীর কড়চা

ফিওদর মিখাইলোভিচ দস্তইয়েফ্স্কি

মূল রুশ থেকে অনুবাদ মশিউল আলম

এ মনিই, লিজা, আমি জানি না। দেখো, আমি এক বাবাকে জানতাম, খুব কঠোর বাবা ছিল সে, কঠিন মানুষ; কিন্তু মেয়ের সামনে সব সময় কাতর; হাঁটু গেড়ে চুমো খেত মেয়ের হাতে-পায়ে; মেয়ের তারিফ করে আশ মিটত না তার, সত্যি বলছি। মেয়ে বিকেলে নাচে, বাপ তার পাঁচ ঘণ্টা ধরে এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে তা দেখে, মেয়ের দিক থেকে এক পলকের জন্যও চোখ সরাতে পারে না। মেয়ের জন্য পাগল, এটা আমি বুঝতে পারি। মেয়ে রাতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ঘুমিয়ে যায়, আর বাপ জেগে উঠে মেয়ের হাতে চুমো খেতে শুরু করে, ঘুমন্ত মেয়েকে লক্ষ করে ক্রুশ চিহ্ন আঁকে। বাপ নিজে ময়লা তেল চিটচিটে জ্যাকেট পরে ঘুরে বেড়ায়, অন্য সবার কাছে সে একটা পিশাচ কঞ্জুস, কিন্তু শেষ কপর্দকটা খরচ করে সে মেয়ের জন্য কিনে আনে দামি দামি একেকটা উপহার। উপহার মেয়ের পছন্দ হলে তার আনন্দের সীমা থাকে না। বাপ মেয়েকে সব সময় সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, মায়ের চেয়েও বেশি। অন্য মেয়েরা বাবার বাড়িতেই সুখে থাকে! আমি, মনে তো হয়, আমার মেয়ের বিয়েই দিতাম না।’

‘এ আবার কেমন কথা?’ শুধাল মেয়েটা, একটুখানি হেসে।

‘হয়তো ঈর্ষায় ভুগতাম, ওহ ঈশ্বর! এটা কী করে হয় যে মেয়ে আমার অন্য একজনকে চুমো খাবে? নিজের বাবার চেয়ে বেশি ভালোবাসবে অন্য একজনকে? এটা তো ভাবতেও কষ্ট হয়। অবশ্যই এসবের কোনো মানে হয় না; নিশ্চয়ই সবারই শেষ পর্যন্ত হুঁশ হয়। কিন্তু আমি, মনে হয়, মেয়েকে বিদায় দেওয়ার আগে একটা কাজ মনেপ্রাণে করতাম: একটার পর একটা বরকে নাকচ করে দিতাম। এই কা- শেষ করতাম কেবল তখনই, মেয়েকে একমাত্র সেই ছেলের হাতেই তুলে দিতাম, মেয়ে নিজে যাকে পছন্দ করত, ভালোবাসত। মেয়ে যে ছেলের প্রেমে পড়ে, বাপের কাছে সেই ছেলে হয় সবচেয়ে খারাপ। এটাই সত্য। এই কারণেই অনেক পরিবারের ভীষণ ক্ষতি হয়ে যায়।

‘আর কিছু কিছু বাপ তো মেয়েকে বেচে দিতে পারলেই খুশি হয়; মর্যাদার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া নয়,’ হঠাৎ করে বলে উঠল মেয়েটা।

ও! তাহলে এই হলো ঘটনা!

‘লিজা, এরকম ঘটে সেই সব অভিশপ্ত পরিবারে, যেখানে না আছে ঈশ্বর, না আছে ভালোবাসা,’ মেয়েটার কথা চট্ করে ধরে নিয়ে গরম হয়ে বললাম আমি, ‘আর যেখানে ভালোবাসা থাকে না, সেখানে কোনো বিচার-বিবেচনাও কাজ থাকে না। এই ধরনের পরিবার আছে, এটা সত্য, কিন্তু আমি ওইসব পরিবারের কথা বলছি না। দেখাই যাচ্ছে, তুমি তোমার পরিবারে ভালো কিছুর দেখা পাওনি, সে জন্যই এভাবে কথা বলছ। তুমি আসলেই এক ধরনের হতভাগী। হুম…বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এরকম হয় অভাবের কারণে।’

‘কিন্তু মালিকদের কাছে এর চেয়ে ভালো নাকি? ভালো মানুষেরা তো অভাবের মধ্যে ভালো থাকতে পারে।’

‘হুম…আচ্ছা। হয়তো-বা। তাহলে বলি তোমাকে: মানুষ শুধু নিজের দুঃখটাই দেখে, সুখটা দেখে না। যেভাবে দেখা উচিত সেভাবে যদি দেখত, তাহলে সে দেখতে পেত সুখ ও দুঃখ দুটোই তার জন্য বরাদ্দ আছে। আর ঈশ্বরের আশীর্বাদে পরিবারটা যদি ঠিকঠাকমতো হয়, দেখা গেল স্বামীটা ভালো লোক, তোমাকে ভালোবাসে, মাথায় করে রাখে তোমাকে, তাহলে! এরকম পরিবারে তো জীবন সুন্দর। এমনকি, পারিবারিক জীবনের অর্ধেকটাও যদি দুঃখকষ্টে ভরা হয়, তবুও তা ভালো; দুঃখ নেই কোথায়? বিয়ে করলে নিজেই হয়তো তুমি বুঝতে পারবে। কিন্তু অন্তত একবার শুরুটার কথা ভেবে দেখো, যাকে ভালোবাস, ধরো তার সঙ্গে তোমার বিয়ে হলো, তাহলে দেখবে, সেই বিবাহিত জীবনে কত সুখ, কত সুখ! হ্যাঁ, দিনরাত সব সময়। প্রথম প্রথম স্বামীর সঙ্গে যদি ঝগড়াঝাটিও হয়, সেটা শেষ হয় মধুরভাবে। মেয়ে স্বামীকে যত বেশি ভালোবাসে, তত বেশি ঝগড়া করে। সত্যি, এ রকম একটা মেয়েকে আমি চিনতাম, যে বলত, ‘দেখো, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি, সে জন্যই কষ্ট দিই তোমাকে, এটা তোমার বোঝা দরকার।’ তুমি কি জান যে ভালোবাসার কারণে ভালোবাসার মানুষটাকে কষ্ট দেওয়া যায়? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েরাই এটা করে। কষ্ট দেয় আর মনে মনে ভাবে : ‘এজন্য পরে ওকে এত ভালোবাসব, এত আদর করব! এখন একটু কষ্ট দিলে কোনো পাপ হবে না আমার।’ বাড়িতে সবাই তোমাকে নিয়ে খুশি; পরিবারে সবকিছু ভালো, হাসিখুশিতে ভরা; শান্তি আছে, সততা আছে.., অবশ্য ঈর্ষাকাতর, সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মানুষও আছে। এরকম একটা মেয়েকে আমি চিনতামÑহয়তো স্বামী কোথাও গেল, মেয়েটা ছটফট করতে লাগল; রাতের বেলাতেই বের হয়ে গেল, ছুটতে ছুটতে চুপি চুপি দেখতে লাগল: ওইখানে গেল না? ওই বাড়িটাতে না? ওই মেয়েটার কাছে না? এইটা একদম খারাপ। খারাপ যে তা মেয়েটা নিজেই কিন্তু জানে, তার বুক ধড়ফর করে, সে নিজেকে দোষায়, তবুও সে স্বামীকে ভালোবাসে; এসবই হচ্ছে ভালোবাসার জন্য। আর ঝগড়ার পরে মিটমাট হয়ে যাওয়াটা যে কী সুখের! স্বামীর কাছে নিজের দোষ স্বীকার করা, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া, কী যে সুখের! তখন হঠাৎ দুজনেরই এত ভালো লাগে, যেন তাদের নতুন করে দেখা হলো, নতুন করে বিয়ে হলো, প্রেম শুরু হলো নতুন করে। স্বামী আর স্ত্রী যদি পরস্পরকে ভালোবাসে, তাহলে ওদের মধ্যে কী যে ঘটে তা অন্য কেউ, অন্য কারোরই জানার সাধ্য নেই। তাদের মধ্যে যতই ঝগড়াঝাটি হোক, তাদের উচিত নয় বিচার করার জন্য মাকে ডেকে আনা, তাঁর কাছে পরস্পরের বিরুদ্ধে নালিশ করা। তারা নিজেরাই নিজেদের বিচারক। ভালোবাসা ঈশ্বরের রহস্য, ওটা রেখে দিতে হয় অন্য সবার চোখের আড়ালে, যত যা-ই ঘটুক না কেন। এভাবেই ওটাকে পবিত্র রাখা যায়, ভালো রাখা যায়। তখন তারা পরস্পরকে আরও বেশি বেশি শ্রদ্ধা করে, আর পারস্পরিক শ্রদ্ধা অনেক কিছুর ভিত্তি। আর একবার যদি ভালোবাসা হয়, সেই ভালোবাসা যদি বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে ভালোবাসা কী করে হারিয়ে যেতে পারে? ভালোবাসা কি ধরে রাখা যায় না। ধরে রাখা যায় নাÑএরকম ঘটে খুবই কম। আচ্ছা, স্বামী যদি ভালোমানুষ হয়, সৎলোক হয়, তাহলে ভালোবাসা কীভাবে ফুরিয়ে যেতে পারে? অবশ্য এটা সত্য, প্রথম দাম্পত্য প্রেম ফুরাবে, কিন্তু তার পরে আসবে আরও গভীর প্রেম। তখন দুজনের হƒদয় কাছাকাছি হবে, যা-কিছুই করবে দুজনে মিলে করবে; কেউ কারো কাছে কিছু লুকাবে না, দুজনের মধ্যে গোপন কিছুই থাকবে না। আর যখন বাচ্চাকাচ্চা হবে, তখন সবকিছু, এমনকি সবচেয়ে কষ্ট ও ঝামেলার মুহূর্তগুলোও সুখকর মনে হবে; দরকার শুধু ভালোবাসতে পারা আর বুকে সাহস রাখা। এমন সংসারে কাজ মানেই আনন্দ, এমনকি যদি কখনো বাচ্চাদের জন্য নিজের ভাগে রুটিরও ঘাটতি পড়ে, উপোস করতে হয়, তবুও আনন্দ। বাচ্চারা এ জন্য তোমাকে পরে অনেক অনেক ভালোবাসবে, অর্থাৎ তোমার নিজের জন্য সঞ্চয় জমছে। বাচ্চারা বড় হচ্ছে, আর তোমার মনে হবে তুমি ওদের কাছে দৃষ্টান্ত, তুমি ওদের খুঁটি; আর যখন তুমি মারা যাবে, বাচ্চারা সারাজীবন তোমাকে অনুভব করবে, তোমার কথা ভাববে, কারণ ওরা তোমার কাছেই সবকিছু পেয়েছে; ওরা তোমার মতো হয়ে উঠবে। অর্থাৎ এ এক মহান দায়িত্ব। মা-বাবা পরস্পরের ঘনিষ্ঠ না হয়ে পারে কী করে। লোকে বলে বাচ্চাকাচ্চা থাকাটা কষ্টের। কে বলে এমন কথা? আরে এটা স্বর্গীয় সুখ! লিজা, তুমি ছোট ছোট বাচ্চাদের ভালোবাস না? আমি তো ভীষণ ভালোবাসি। জান, গোলাপি গোলাপি একটা খোকা, মায়ের স্তন চুষছে, কোন স্বামীর অন্তর তখন স্ত্রীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে, যখন সে দেখতে পায় তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসে আছে মা! বাচ্চাটা গোলাপি, গোলগাল নাদুস-নুদুস, আহ্লাদ করছে, হাত-পা ছুঁড়ছে; ওর ছোট ছোট হাত-পাগুলো গাট্টাগোট্টা, নখগুলো কী পরিষ্কার আর কী ছোট ছোট! এত ছোট ছোট যে দেখে হাসি পায়, চোখদুটো এমন যেন এরই মধ্যে সবকিছু বুঝে ফেলেছে! মায়ের স্তন চুষছে সে, ছোট ছোট হাতে খামচে ধরে আছে তোমার স্তন, খেলা করছে। ওর বাপ কাছে আসবে, ও মায়ের স্তন থেকে মুখ সরিয়ে, পেছন দিকে ঢলে পড়বে, তাকাবে বাপের দিকে, হাসবে, যেন ব্যাপারটা যে কী হাসির তা কেবল ঈশ্বরই জানে, তারপর আবার, আবার শুরু করবে স্তন চোষা। অথবা কামড়াতে শুরু করবে মায়ের স্তন, যদি ইতিমধ্যে ওর দাঁত গজিয়ে থাকে; আড়চোখে চাইবে মায়ের দিকে, যেন বলতে চায়, ‘দেখলি, তোকে কেমন কামড়ে দিলাম!’ যখন ওরা তিনজন, স্বামী, স্ত্রী আর বাচ্চাটা যখন এক সঙ্গে, তখন সেটাই কি সম্পূর্ণ সুখ নয়। ওরকম মুহূর্তের জন্য তো অনেক কিছুই ক্ষমা করে দেওয়া যায়। না, লিজা, সবকিছুর আগে জানা দরকার কীভাবে জীবন যাপন করতে হয়, তার পরেই শুধু অন্যদের দোষ খোঁজা যায়!’

‘এই ছবিগুলো, এই ছবিগুলো তোমাকে দেখানো দরকার,’ মনে মনে বললাম আমি, যদিও, ও ঈশ্বর, যদিও আমি কথাগুলো বলছিলাম সহƒদয়ভাবে, এবং লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিলাম। ‘মেয়েটা যদি হঠাৎ হো হো করে হেসে ওঠে, তখন আমি নিজেকে নিয়ে কী করব?’ এই ভাবনাটা আমার ভেতরে ক্রোধ জাগিয়ে তুলল। কথাগুলোর শেষ দিকে আমি সত্যিই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলাম, আমার আত্মপ্রেম কেমন জানি যন্ত্রণা পাচ্ছিল। নীরবতা প্রলম্বিত হয়ে চলল। এমনকি মেয়েটাকে একটা ধাক্কাও মারার ইচ্ছা হচ্ছিল।

‘আপনি যেন-বা…’ হঠাৎ বলতে শুরু করল মেয়েটা, কিন্তু থেমে গেল।

কিন্তু ইতিমধ্যে সবকিছু বুঝে ফেলেছি: ওর কণ্ঠস্বরে অন্য কিছু কাঁপছিল; তীব্র কিছু নয়, কর্কশ কিছু নয়; বরং নরম কিছু, সলজ্জ কিছু; এমনই সলজ্জ যে আমার নিজেরই লজ্জা লাগছিল, ওর সামনে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল।

‘কী?’ কোমল কৌতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

‘আপনি তো…”

‘কী?’

‘আপনি যেন-বা…যেন-বা আপনি কোনো বই থেকে হুবহু…’ বলল সে, এবং আবারও তার কণ্ঠস্বরে হঠাৎ যেন বিদ্রূপ ধ্বনিত হলো।

মেয়েটার এই মন্তব্যে আমার বুকটা যন্ত্রণায় টনটন করে উঠল। এটা আমি আশা করিনি।

আমি বুঝতেও পারিনি যে মেয়েটা ইচ্ছা করেই বিদ্রূপের মুখোশ পরেছিল; বুঝতে পারিনি যে এটা লজ্জাশীল ও সহƒদয় লোকেদের সাধারণ শেষ হাতিয়ার, যাদের মনের কথা বের করার জন্য রূঢ়ভাবে নাছোড়বান্দার মতো পীড়ন করা হয়, কিন্তু তারা শেষ মুহূর্ত পর্য আত্মসমর্পণ করে না, অন্যদের সামনে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে ভয় পায়। মেয়েটার নম্র ভীরুতা দেখেই তো আমার এটা বোঝা উচিত ছিল, বোঝা উচিত ছিল যখন সে থেমে থেমে বিদ্রূপের হাসি হাসছিল এবং অবশেষে বলে ফেলেছিল। কিন্তু আমি আন্দাজ করতে পারিনি, আমাকে গ্রাস করে ফেলেছিল বদমায়েশির অনভূতি।

মনে মনে বলেছিলাম, ‘দাঁড়াও, একটু অপেক্ষা করো।’

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares