প্রবন্ধ- জসীম উদ্দীনের কবিতায় একাত্তরের বাংলাদেশ : বিভূতিভূষণ মণ্ডল

প্রবন্ধ

জসীম উদ্দীনের কবিতায়

একাত্তরের বাংলাদেশ

বিভূতিভূষণ মণ্ডল

 

বাঙালির হাজার বছরের গৌরব তার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জন। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভাজনের পর, ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলে পাকিস্তানের পূর্বাংশ, পূর্বতন পূর্ববাংলা, পূর্বপাকিস্তান নামে আখ্যায়িত হয়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে যে-ভূখ-টি বাংলাদেশ নামে স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নেয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসনভার অবাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে ন্যস্ত থাকায় পূর্ব পাকিস্তান নানারকম বৈষম্য, বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার হয়। এই নির্যাতন-নিপীড়নের মাত্রা যখন প্রকট আকার ধারণ করে তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ স্বায়ত্তশাসন তথা স্বাধীনতার দাবিতে স্বোচ্চার হয়ে বিভিন্নরকম আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করে। ১৯৭১ সালের ৭মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হলে, পাকিস্তানি শাসকচক্রের দমন-পীড়ন-আগ্রাসনে বাংলাদেশ কার্যত একটি অবরুদ্ধ ভূখ-ে পরিণত হয়। অবরুদ্ধ জনপদের স্বাধীনতাকামী জনসাধারণের ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তথা তাদের সেনাবাহিনী যে অমানবিক ধ্বংসলীলা চালায় তাতে বিশ্ববিবেক নড়ে ওঠে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম এবং অবরুদ্ধ বাংলাদেশে অবস্থানরত বিভিন্ন রাষ্ট্রের গণমাধ্যম-কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার খবরসহ অসহায়, ভীরু, আক্রান্ত, ক্ষুধার্ত, লাঞ্ছিত, আশ্রয়হীন মানুষের চরম দুর্দশার সংবাদ প্রচার ও প্রকাশ করেন। সাথে সাথে সংবেদনশীল মানবতাবাদী কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকরাও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন জানিয়ে মত প্রকাশ করেন। পার্শ্ববর্তী ভারতরাষ্ট্রের কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের পাশাপাশি মার্কিন কবি অ্যালেন গিনসবার্গ তাঁর বিখ্যাত ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতা লিখে এবং জর্জ হ্যারিসন প-িত রবিশঙ্করের সহযোগিতায় ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ করে বিশ্বের জনপ্রতিনিধিদের কাছে আক্রান্ত পূর্বপাকিস্তানের আশু স্বাধীনতাপ্রাপ্তির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। বাংলাদেশের ভেতর অবস্থান করে, বাংলাদেশের কোনো কবির পক্ষে পাকিস্তানিদের এই সব বর্বরতার বিরুদ্ধে কথা বলা বা লেখনি ধারণ করাটা ছিল রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ। একাত্তরের এই ক্রান্তিকালে বাংলাসাহিত্যের স্বতন্ত্রধারার এক বিশিষ্ট কবি জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) অবরুদ্ধ বাংলাদেশের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিকে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে কাব্যগ্রন্থে। এই কাব্যের অধিকাংশ কবিতাই ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে জুলাই মাসের মধ্যে রচিত। পাকিস্তানের কোনো গণমাধ্যমে এসব কবিতা প্রকাশ বা প্রচার করা সম্ভব ছিল না। তাই কবিকে একটি কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছিল। ‘লেখকের কথা’য় কবি নিজেই লিখেছেন :

তুজম্বর আলী ছদ্মনামে এই কবিতাগুলি রাশিয়া, আমেরিকা ও ভারতে পাঠান হইয়াছিল। আমার মেয়ে হাসনা এর কতগুলি ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়া অপর নামে নিউইয়র্কে বিদ্বান সমাজে বেনামিতে পাঠ করাইয়াছে। রাশিয়াতেও কবিতাগুলি সমাদৃত হইয়াছিল। সেখানেও কিছু কিছু লেখা রুশ ভাষায় অনূদিত হইয়াছে। ভারতে এই লেখাগুলি প্রকাশিত হইলে মুলকরাজ আনন্দ প্রমুখ বহু সাহিত্যিক ও কাব্যরসিকের সশ্রদ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

 

‘প্রকাশিকার কথা’য় কবিকন্যা হাসনা জসীম উদ্দীন মওদুদ লিখেছেন :

এই কবিতাগুলো লেখার প্রায় সাথে সাথে কবি সযতনে আমার কাছে আমেরিকায় পাঠাতেন। কিছু কিছু কবিতা অনুবাদ করে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও সমাবেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের খবররূপে বিশ্বসহানুভূতির আশায় তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। রাত জেগে জেগে স্বাধীনতার শত্রুদের বিরুদ্ধে কবিতা লিখছেনÑ যে-কবি সারাজীবন তাঁর লেখনীতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মায়ামমতা ও ভালোবাসার কথা লিখে স্বপ্নের জাল বুনে গেছেনÑ যার কবিতায় পল্লীর জীবন এক অসাধারণ রূপ ধারণ করেছিল সে কবির জন্য যুদ্ধে বিধ্বস্ত রক্তস্নাত দেশের কবিতা লিখতে না জানি কত কষ্ট হয়েছে। …মানুষের প্রতি অসীম মমতা ভালোবাসা বিশ্বাসের সাক্ষী এই বিরল কবিতাগুলো।

 

১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক মাসের ইতিহাসের ধারাবাহিক ঘটনাবলিও বিবৃত হয়েছে ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে। বাঙালি জাতিকে মুক্তির দিশা দেখাতে, বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের অগ্নিবর্ষী ভাষণ কীভাবে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্দীপ্ত করেছিল, কীভাবে তথাকথিত ভীরু বাঙালি বীর বাঙালি হয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল মরণপণ সংগ্রামের জন্য- এই প্রেক্ষাপট থেকেই শুরু হয়েছে ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে। দীর্ঘদিনের অধিকারবঞ্চিত বাংলাদেশের মানুষ ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত হচ্ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামে জন্য, তারা অপেক্ষায় ছিল একটি নির্দেশের, যে হুকুম পেলেই তারা আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ছিল সেই নির্দেশ। বঙ্গবন্ধুকে কবি ‘বিসুভিয়াসের অগ্নিউগারী বান’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বাঙালির বুকে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বারুদ যেন লেলিহান শিখা হয়ে জ্বলে উঠল বঙ্গবন্ধুর ভাষণের তেজোদীপ্ততায়। কবির ভাষায় :

জীবনদানের প্রতিজ্ঞা লয়ে লক্ষ সেনানী পাছে,

তোমার হুকুম তামিলের লাগি সাথে তব চলিয়াছে।

তোমার একটি আঙ্গুল হেলনে অচল যে সরকার

অফিসে অফিসে তালা লেগে গেছে স্তব্ধ হুকুমদার।

এই বাঙলায় শুনেছি আমরা সকল করিয়া ত্যাগ,

সন্ন্যাসীবেশে দেশবন্ধুর শান্ত-মধুর ডাক।

শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী-জীবন করিয়া দান,

মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান।

তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর

জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।

[বঙ্গবন্ধু]

বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে আন্দোলনে সামিল হয়েছিল আপামর বাঙালি। অচল হয়ে পড়েছিল সমগ্রদেশ। তাঁর পূর্বতন মহান দেশনায়কদের মহতী প্রচেষ্টাকে অন্তরে ধারণ করে বঙ্গবন্ধু তাঁদেরও অগ্রণী হয়ে উঠেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞায়। তাঁর আহ্বানে বাঙালি ভুলে গিয়েছিল সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ। তাঁর আহ্বান সমগ্র জাতিকে সমুদ্রের উত্তুঙ্গ ঢেউয়ের মতো আন্দোলিত করে, ঘরের মায়ার বাঁধন কাটিয়ে দেশের জন্য জীবনদানে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

পথে পথে তারা লিখিল লিখন বুকের রক্ত দিয়ে,

লক্ষ লক্ষ ছুটিল বাঙালি সেই বাণী ফুকারিয়ে।

মরিবার সে কী উন্মাদনা যে, ভয় পালাইল ভয়ে,

পাগলের মত ছোটে নর-নারী মৃত্যুরে হাতে লয়ে।

[বঙ্গবন্ধু]

 

পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে বাংলার ছাত্রসমাজ যে আন্দোলন-সংগ্রাম-মিছিল বিক্ষোভ করেছিল এবং শেষপর্যন্ত তারা তাদের প্রাণের নেতাকে পাকিস্তানি জল্লাদদের কারাগার থেকে মুক্ত করে এনেছিল সেকথাও কবি বলেছেন তাঁর কবিতায় :

মহাহুংকারে কংস-কারার ভাঙিয়া পাষাণ দ্বার,

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবেরে করিয়া আনিল বার।

[বঙ্গবন্ধু]

 

ইতিহাসের এই পর্বে দেখা যায়, পুর্বপাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন তথা স্বাধিকারের জন্য পাকশাসকগোষ্ঠীর সাথে বঙ্গবন্ধুর আলাপ-আলোচনার নামে শুরু হয় নানা টালবাহনা। কালক্ষেপণ করে জঙ্গি পাক সরকার যে-কোনোভাবে বাঙালিকে চিরতরে ধ্বংস করার জন্য গোপনে নতুন সামরিক কৌশল গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রস্তাবিত আলোচনা হঠাৎ স্থগিত ঘোষণা করে ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চের রাতে বিমানযোগে ঢাকা থেকে পালিয়ে যান পশ্চিম পাকিস্তানে। আর পরিকল্পিতভাবে বাঙালি নিধনের জন্য বর্বর সেনাবাহিনীকে কুকুরের মতো লেলিয়ে দিয়ে যান ঘুমন্ত ঢাকাবাসীর ওপর। ঢাকা শহরে সাঁজোয়া বহর নিয়ে দানবের মতো ট্যাংক নামে। সেই রাতেই ঢাকা শহরে সংঘটিত হয় ইতিহাসের বর্বরতম নরহত্যাযজ্ঞ। ২৫ মার্চের মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু এক বেতারবার্তায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নতুন নতুন পরিকল্পনা ও উদ্যমে বাঙালি নিধনের নিষ্ঠুর খেলায় মেতে ওঠে। মার্চ থেকে ডিসেম্বরের বিজয়লাভের পূর্ব পর্যন্ত চলে বর্বর এই গণহত্যা। খানসেনারা একের পর এক শহর-নগর-গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। গোটাদেশ হয়ে ওঠে রক্তাক্ত বধ্যভূমি, ভূতুড়ে গোরস্থান আর অগ্নিময় শ্মশানের চিতা। সবুজ শ্যামল সুখসমৃদ্ধ বাংলা হয়ে ওঠে আতংকিত এক জনপদের নাম। কবির ভাষায় :

সে বাঙলা আজি বক্ষে ধরিয়া দগ্ধ গ্রামের মালা,

রহিয়া রহিয়া শিহরিয়া উঠে উগারি আগুন জ্বালা।

দস্যু সেনারা মারণ অস্ত্রে বধি ছেলেদের তার,

সোনার বাঙলা বিস্তৃত এক শ্মশান কবরাগার।

বনে জঙ্গলে লুণ্ঠিত গৃহে কাঁদে শত নারী-নর,

কোথায় যাইয়া মিলিবে তাদের পুনঃআশ্রয়-ঘর।

প্লাবনের চেয়ে-মারিভয় চেয়ে শতগুণ ভয়াবহ,

নরঘাতীদের লেলিয়ে দিয়েছে ইয়াহিয়া অহরহ।

প্রতিদিন এরা নরহত্যার যে কাহিনী এঁকে যায়,

তৈমুর লং নাদির যা দেখে শিহরিত লজ্জায়।

[কবির নিবেদন]

 

দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সাতচল্লিশে যখন দেশবিভাগ ঘটে তখন ভারতের দুই পাশে অবস্থিত পাকিস্তানের দু’টি অংশকে কেবল ধর্মের ঐক্যে গেঁথে রাখার মুখরোচক আশ্বাসবাণী উচ্চারিত হয়েছিল। পাকিস্তানের মুসলমান, যে প্রান্তেই অবস্থান করুক না কেন, একে অপরের ভাই। ধর্মীয় সম্পর্কটাই বড়ো কথাÑ ভাষা, সংস্কৃতি এবং স্থানিক দূরত্ব কোনো প্রতিবন্ধকতাই নয়। কিন্তু অচিরেই বাঙালি মুসলমানের স্বপ্নভঙ্গ হতে শুরু করে। সেই ভাইদের একজন আরেকজনের ওপর খড়গহস্ত হয়ে ওঠে। সূচনা হয় বাংলা ভাষার ওপর আক্রমণের ভেতর দিয়ে। সে যাই হোক, পশ্চিম পাকিস্তানের ভাইয়েরা কীভাবে ধর্মের নামে, আল্লাহ-রসুলের নামে, পবিত্র কোরানের অপব্যাখ্যা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের ভাইদের নির্যাতন করেছে, নিধন করেছে, নারীদের শ্লীলতাহানি করেছে তার বেদনাময় চিত্র এঁকেছেন কবি জসীম উদ্দীন।

ভ্রাতৃপ্রেম যে সংহার রূপে হইয়াছে রূপায়ণ,

সংহতি আর ইমান লভেছে কামানের গরজন।

জন-নিধনের রুধিরে রাঙায়ে আপন অঙ্গ-বাস,

ভ্রাতৃপ্রেমের খোলস পরেছে আজিকে সর্বনাশ।

 

নর-হন্তারা আজিকে হয়েছে শ্রেষ্ঠ ইমানদার,

লুণ্ঠনকারী জালিম নিয়েছে দেশের শাসনভার।

[ইসলামি ভাই]

কিংবা

বনের বাঘে যে খায় না মানুষ, মানুষে মানুষ খায়,

মানুষের ভয়ে বনে সে লুকাবে সেথাও মানুষ ধায়।

[তোমার কবিতা]

 

২৫ মার্চের রাতে ঢাকা শহরে যে বাঙালি সংহারযজ্ঞ শুরু হয়েছিল তা ক্রমে ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশের বিভিন্ন শহর-বন্দর-গ্রামে। পাকিস্তানিদের এদেশিয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশাম্সদের সহযোগিতায় খানসেনারা দলে দলে বিভক্ত হয়ে পৌঁছে যায় দেশের প্রত্যন্ত জনপদেও। ঢাকা শহর থেকে আরিচাঘাট, পাবনা, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, গোয়ালন্দ, ফরিদপুর, রাজবাড়ি, টেকেরহাট, গোপালগঞ্জ প্রভৃতি জেলায় প্রবেশ করে। যাত্রাপথের দু’ধারের গ্রামগুলোকে তারা অগ্নিদগ্ধ করে, মানুষ মেরে লাশের পাহাড় তৈরি করে। সমগ্রদেশ যেন গোরস্থান এবং শ্মশানভূমি হয়ে ওঠে।

গোরস্থান যে প্রসারিত হয়ে ঘিরেছে সকল দেশ,

শ্মশানচুল্লী বহ্নিউগারী নাচে উলঙ্গ বেশ।

যারা বাকি আছে বনে জঙ্গলে ঘন পাটক্ষেত মাঝে,

পরিবার-পরিজন লয়ে শুধু কোনরূপে বেঁচে আছে।

 

কোথাও তাদের নাহি নিষ্কৃতি, বন হতে খুঁজে আনি,

পিঁপড়ের মত মারিছে মানুষ বুলেটে আঘাত হানি।

[কি কহিব আর]

 

চারিদিকে ধ্বংসের তা-বনৃত্য, অবিরত গোলাবর্ষণের তীব্র আওয়াজ, আর্তমানুষের গগনবিদারী করুণ চিৎকারÑ শহর থেকে শহরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ভীতসন্ত্রস্ত মানুষের কারাভ্যান। পেছনে পড়ে থাকে ঘরসংসার বিষয়-আশয়। কেবল পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রাণটুকু বাঁচাতে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করে বনপোড়া হরিণীর মতো। এক শহর আক্রান্ত হলে পালাতে চেষ্টা করে আরেক শহরে, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। পথে ওঁৎ পেতে থাকে পাকিস্তানি নরখাদক হায়নার দল ও তাদের দোসর। সম্ভাবনা থাকে তাদের কবলে পড়ার। তবু দলে দলে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ পালাতে থাকে। চলতে থাকে গন্তব্যহীন কোনো গন্তব্যের পানে :

দেখেছি শতেক লোকের মিছিল, অসহায় নরনারী,

মরণ হইতে ত্রাণ লভিবারে ছুটিয়াছে সারি সারি।

আহত শিশুরে বক্ষে লইয়া সম্মুখে চলেছে মাতা,

চিৎকারে ছিঁড়ে খান খান হলো আকাশের নীল ছাতা।

 

চলিয়াছে পিতা চলিয়াছে মাতা, পিছনে শিহরি চায়,

আসেনি দস্যু নর-ঘাতকেরা বুলেট হানিতে গায়।

কোথায় যাইবে, কোন দেশে গেলে আশ্রয় ক্ষণতরে

পাইবে তাহারও, এই আশা লয়ে চলিয়াছে পথ ধরে।

[খবর]

 

সামান্য একটুখানি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটা কোনো পরিবার অতর্কিতে শত্রুসেনার নজরে পড়ে। একটি পরিবারই যেন একাত্তরের লক্ষ লক্ষ পরিবারের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। পথিমধ্যে পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করে পাক জওয়ানরা। বড়ো করুণ কবির সেই বর্ণনা :

ছেলের শবেরে জড়ায়ে ধরিয়া রয়েছে পিতার শব,

কারো মুখখানি হতে উঠিবে না কভু মমতার রব।

নতুন বধূর পার্শ্বে শুইয়া যুবক স্বামী যে তার,

কেউ কারও তরে সোহাগের কথা কহিবে না কভু আর।

মৃত-মার কোলে পুত্রের শব, হায় আর কোনদিন,

একে অপরের আঁকড়িয়া কভু বাজিবেনা স্নেহবীণ।

[খবর]

 

মায়া-মমতা-স্নেহ-ভালোবাসামাখা স্বপ্নের মতো একেকটি পরিবার, রূপকথার মতো সাজানো গোছানো সুন্দর একেকটি গ্রাম-জনপদ একাত্তরের নয় মাসে উজাড় হয়েছে, বিরান হয়েছে। কার জন্য কে শোক করবে? সর্বস্ব হারিয়ে সবাই তো শোকার্ত। কোথাওবা কারও জন্য শোক করবার মতো অবশিষ্ট কেউ নেই। শত্রুসেনার আক্রমণে কেউবা ছেড়ে গেছে পৃথিবী, কেউবা চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে গেছে নিরুদ্দেশে। পেছনে ফেলে গেছে অনেক দিনের মধুর স্মৃতি, বুকভরা দীর্ঘশ্বাস, প্রিয়জন হারানোর হাহাকার। নরঘাতকেরা এসে শান্তস্নিগ্ধ গ্রামে আগুন জ্বেলেছে। ধ্বংসের উন্মাদনায় অসুরের মতো অট্টহাসি এসেছে। মায়ের কোল থেকে সন্তানকে কেড়ে নিয়েছে। সন্তানের সামনে জননীর শ্লীলতাহানি করেছে, ভাইয়ের সামনে বোনের, স্বামীর সামনে স্ত্রীর। পিতার চোখের সামনে কেটে খান খান করেছে তার প্রিয়তম পুত্রকে। চিরতরে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে একেকটি গ্রাম। হাসিখুশিভরা শিশুগুলি চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে। স্বামী-স্ত্রীর সোহাগ-মান-অভিমান, মা-বাবার কাছে সন্তানের আব্দার, সন্ধ্যেবেলা পাঁচালিপাঠ কিংবা গাজীগানের আসর, খেলার মাঠে শিশুদের জটলা, পুকুরে দুরন্ত বালকের ডুবসাঁতারÑ কোনো দৃশ্যই আর অবশিষ্ট রইল না সেইসব দগ্ধ গ্রামে। দুপুরের খা খা রৌদ্রে একাকী চিল চিৎকার করে কাঁদে, রাত্রের প্রহরে প্রহরে ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠে কোনো গৃহস্থ কুকুর। নরপিশাচের অগ্নিদহনে ঘরবাড়িগুলো ছাঁইয়ের স্তূপ হয়ে পড়ে রইল। কবির বর্ণনা :

ওইখানে ছিল কুলের গাছটি, স্খলিত দগ্ধ-শাখ,

পাড়ার যত না ছেলেমেয়েদের নীরবে পাড়িছে ডাক।

আর ত তাহারা ফিরে আসিবে না, নাড়িয়া তাহার ডাল,

পাড়িবে না ফল দস্যু ছেলেরা অবহেলি মার গাল।

সিঁদুরে আমের গাছ ছিল হোথা, বছরের শেষ সনে,

শাখাভরা আম সিঁদুর পরিয়া সাজিত বিয়ের কনে।

সে গাছে ত আর ধরিবে না আম, বোশেখ মাসের ঝড়ে,

সে ছেলেমেয়েরা আসিবেনা পুনঃ আম কুড়াবার তরে।

সারা গাঁওখানি দগ্ধ শ্মশান, দমকা হাওয়ার ঘায়,

দীর্ঘ নিশ্বাস আকাশে পাতালে ভস্মে উড়িয়া যায়।

[দগ্ধ গ্রাম]

 

পৃথিবীর সবচেয়ে অসভ্য, বর্বর পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী একাত্তরে বাংলাদেশে মানুষহত্যা বা সম্পদ ধ্বংস করেই ক্ষান্ত হয়নি, ধ্বংস করেছে বাংলাদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, নন্দনতাত্ত্বিক নিদর্শন, জ্ঞানগৃহ, উপাসনালয়, এতিমখানা- অনেক কিছুই। সেই সাথে ধ্বংস করেছে শিল্প সভ্যতা-সংস্কৃতির অনেক ঐতিহাসিক এবং ঐতিহ্যবহী উপকরণও। ঢাকার ধামরাইয়ের রথযাত্রার উৎসবটি জাতিধর্মনির্বিশেষে আপামর বাঙালির মিলনক্ষেত্র যেমন ছিল, তেমনি এই উৎসবের ঐতিহ্যটিও ছিল বহুকালের পুরনো। দারু ও কারু শিল্পের এক অসামান্য নিদর্শন সেই রথটিতেও অগ্নিসংযোগ করে ভস্মীভূত করে দিয়েছিল পাকদানবেরা। তারা শেষ করে দিতে চেয়েছিল বাঙালির লোকোৎসবের একটি গৌরবদীপ্ত অধ্যায়কে। দুঃখ-কষ্ট-ক্ষোভে কবি লিখেছেন :

পাকিস্তানের রক্ষাকারীরা পড়িয়া নীতির বেশ,

এই রথখানি আগুনে পোড়ায়ে করিল ভস্মশেষ।

শিল্পী হাতের মহাসান্ত¡না যুগের যুগের তরে,

একটি নিমেষে শেষ করে গেল এসে কোন বর্বরে।

[ধামরাই রথ]

 

একাত্তরের সেই ভয়াবহ দিনগুলিতে আপামর বাঙালি যখন নিজভূমে পরবাসী, নিরাপত্তাহীনতায় ভীত-সন্ত্রস্ত, একটু আশ্রয়ের জন্য উদ্বেগাকুল তখন দলে দলে মানুষ শরণার্থী হয়ে পাড়ি জমাতে শুরু করেছিল পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। কোন গ্রামের কোন পরিবার, কার কোন আত্মীয়-পরিজন কখন কীভাবে গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছে সেসব খবর জানারও অবকাশ ছিল না। জসীম উদ্দীনের কবিতার একটি চরিত্র ‘গীতা’। গীতারা চলে যাবে, গীতারা কোথায় যাবেÑ এমনি সব ভাবনা কবিকে ব্যাকুল করে। একাত্তরে হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ গীতা এমনই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। তারপর গীতারা কোথায় চলে গেছে সে-খবর আর জানা যায়নি। গীতাদের পরিত্যক্ত শূন্য আঙিনা যেন আর্ত হাহাকারে কেঁদে ওঠে। কবির সকরুণ বর্ণনা :

কাঁদিতে কাঁদিতে খেজুর পাকিবে, কুড়াতে কেউ না রবে,

আমের আঁটির বাঁশী সুরে আর পাড়া না মুখর হবে।

ঘরে ঘরে আর ফুলের বাগান হবে না রচিত পূজার ফুলের তরে,

উলু-ধ্বনিতে বধূদের আর লইবেনা কেউ বরণ করিয়া ঘরে।

[গীতারা চলিয়া যাবে]

 

পাকিস্তানি হানাদানর বাহিনীর অন্যায়-অত্যাচার তা-বে অতিষ্ঠ বাঙালিরা এক পর্যায়ে সংগঠিত হতে শুরু করে। নিপীড়নের দাঁতভাঙা পাল্টা জবাব দেবার জন্য তারা নিজেদের প্রস্তুত করে। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণামতে গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনী। যুবকেরা দলে দলে যোগদান করে মুক্তিযুদ্ধে। দেশমাতৃকার পরাধীনতার শৃংখল মোচনে তারা মরণপণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। পাকসেনার সাথে মুক্তিবাহিনীর সামনাসামনি আক্রমণে চলে শক্তিপরীক্ষা। ভীরু বাঙালিরা সময়ের প্রয়োজনে কতটা সাহসী ভূমিকা পালন করতে পারে সে-সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা ছিল না খানসেনাদের। এক পর্যায়ে মুক্তিবাহিনীর নামে আঁতকে উঠতে থাকে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা। হানাদাররা যাতে নির্বিঘেœ এবং বিনাপ্রতিরোধে লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য মুক্তিবাহিনীর জওয়ানরা কালভার্ট উড়িয়ে, সেতু ভেঙে, রাস্তায় বেরিকেড তৈরি করে। তারা যেন ছায়ার মতো, শিকারি বাঘের মতো, ভয়ংকর মৃত্যুর মতো অনুসরণ করতে থাকে খানসেনাদের। একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকা বর্ণনা করতে গিয়ে কবি লিখেছেন :

আমি চলিয়াছি চির-নির্ভীক অবহেলি সবকিছু

নরমু-ের ঢেলা ছড়াইয়া পশ্চাত-পথ পিছু।

ভাঙ্গিতেছি স্কুল ভাঙ্গতেছি সেতু স্টিমার জাহাজ লরি,

খান সৈন্যরা যেই পথে যায় আমি সে পথের অরি,

ওরা ভাড়া-করা ঘৃণ্য গোলাম স্বার্থ-অন্ধ সব,

মিথ্যার কাছে বিকাতে এসেছে স্বদেশের বৈভব।

[মুক্তি-যোদ্ধা]

 

একটি পর্যায়ে সমগ্রদেশে খানসেনারা তাদের দোসরসহ কোণঠাসা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজিত হতে শুরু করে। কোনোভাবেই যেন তারা পালারাব পথ খুঁজে পায় না। যেদিকে যায় সেদিকেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ। খান সেনাদের পেছনে তাড়া করে ফিরছে মুক্তিসেনার দল। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে যেমনটি বলেছিলেনÑ ‘আমরা তাদের ভাতে মারবো, আমরা তাদের পানিতে মারবো’ সেইরকম মুক্তি-যোদ্ধারা যেন সবদিক দিয়ে পাকবাহিনীকে আক্রমণ করার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে। খান সেনাদের প্রতি মুক্তিসেনাদের কঠোর হুঁশিয়ারি :

আকাশেতে পালাস যদি ধরব বজ্র হয়ে,

পাতালে গেলে মারাব তোদের সহস্র সাপ লয়ে;

সুন্দরবনে খাড়া আছি আমরা হাজার বাঘ,

পূর্ব আকাশে জ্বলছে আগুন (তোদের) কপালে দিতে আগ!

[গান]

কিংবা

এ সোনার দেশে যতদিন রবে একটিও খানসেনা,

ততদিন তক মোদের যাত্রা মুহূর্তেও থামিবে না।

[মুক্তিযোদ্ধা]

 

একাত্তরের সেই দুঃসময়ে, অবরুদ্ধ বাংলাদেশের যন্ত্রণা আর গোঙানির করুণ আর্তি দেশের বাইরে প্রকাশ করার কঠোর বিধিনিষেধ ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার। ফলে বহির্বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশার খবর সহজে পেতেন না। পাকিস্তানের গণমাধ্যম তো সকল পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে প্রচার করত। দেশের অভ্যন্তরে আটকে পড়া মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ক্ষরণের ব্যথা মুখ বুজে সহ্য করতে হতো। অপ্রকাশের ভার নিয়ে, আত্মদহনে জর্জরিত কবি নির্যাতিত সকল বাঙালির প্রতিনিধি হয়ে বিশ্ববিবেকের দরবারে তাঁর বেদনার কথা বলেছেন এইভাবে :

এসব কাহিনী কহিবারে মানা-লিখিবারে মানা হায়,

কবির কলম বড় অবাধ্য না লিখে বাঁচা যে দায়।

কঠিন কঠোর বেড়া দিয়ে ঘেরা এদেশের চারিধার,

সে বেড়া ডিঙিয়ে মোদের কাঁদন বাহিরে যায় না আর ,

দরদীজনেরা এসে যে মোদের খবর লইয়া যাবে,

তাহাদের পথ কণ্টকে ঘেরা মানা ভরা নানাভাবে।

কি কহিব আরÑ কাহারে কহিবÑ কি করিব আজি হায়,

মাটিতে কপাল ঠুকে ঠুকে শুধু বিনিদ্র রাতি যায়।

[কি কহিব আর]

সকল রকম অবরোধ আর নিষেধের বেষ্টনী ভেদ করে যখন বিশ্ববিবেকের কাছে বাংলাদেশের আর্তনাদ-হাহাকারের বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয় তখন কবি কবিতা-পত্র লিখে যেন বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছেন, যদি এই চিঠি কোনো দেশের কোনো বিবেকবান মানুষের নজরে পড়ে, যদি কেউ বাংলাদেশের মানুষের জন্য সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়ান-এই আশা নিয়ে। বিশ্ববাসীর কাছে করুণ আবেদন জানিয়ে কবি তার কবিতা-পত্রে লিখেছেন :

দেশ-দেশান্তেÍ দয়া-ধর্মের শপথ মানবতার,

তোমরা আসিয়া ভাঙ এ নিঠুর এজিদের কারাগার।

প্রতি মুহূর্তে শিশু মার কোলে মরিছে বুলেট ঘায়,

প্রতি মুহূর্তে শত অসহায় দলিত দস্যু-পায়।

তাদের দীর্ঘনিশ্বাসে ভরি উড়ানু পত্রখানি,

এই আশা লয়ে তোমাদের থেকে পাবো আশ্বাসবাণী।

[কবির নিবেদন]

কিংবা

মায়া মরিয়াছে, দয়া মরিয়াছে, মরিয়াছে মানবতা,

আওলা বাতাসে আছাড়ি পিছাড়ি কাঁদে বসুমতী মাতা।

এই ক্রন্দন আর কোনখানে আর কোন দেশে হায়,

পশিয়া কি কভু জাগায়ে তুলিবে মৃত এ মানবতায়।

[খবর]

 

১৯৭১ সালে কবি জসীম উদ্দীন আটষট্টি বছরের প্রৌঢ়। তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া। তাইতো মসীকে অসি বানিয়ে তিনি যুদ্ধ করেছেন পাকিস্তানি বর্বরতার বিরুদ্ধে। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে যন্ত্রণাকাতর মানুষের বিষাদগাথা রচনা করে, বহির্বিশ্বের মানুষের কাছে সেই হাহাকার পৌঁছে দিয়ে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করার যে মহান ব্রত তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তারই ফলশ্রুতিতে রচিত ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রামাণ্য এক কাব্যিক দলিল। ভয়াবহ সেই দিনগুলির বাস্তবচিত্র বিশেষ করে আর কোনো কবির কবিতায় এত বিস্তৃত এবং বিশ্বস্তভাবে পাওয়া যায় না। একাত্তরের ক্রান্তিকাল নিয়ে একক ভাবে এত সংখ্যক কবিতাও বোধ করি আর কোনো কবি রচনা করেননি। সবকিছু মিলিয়ে জসীম উদ্দীনের ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে কাব্যের কবিতাগুলি একাত্তরে বাংলাদেশের ভীরু-অসহায়-ক্ষত-বিক্ষত-রক্তাক্ত-দগ্ধ-চূর্ণ-বিচূর্ণ-বিকৃত মুখচ্ছবিই ধারণ করে আছে।

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares