লিটলম্যাগ : শাহ ইয়াছিন বাহাদুর

 

লিটলম্যাগ

শঙ্খচিল : বিষয়-বৈচিত্র্যে ঋদ্ধতার ছায়াছাপ

শাহ ইয়াছিন বাহাদুর

 

এমনকি বাবর আলীকে দেখে আমাদের না-পারা জীবনীতে একটুখানি পারার সুখ নেব কিন্তু সামাজিক নৈতিকতায় নিজেকে শুদ্ধ প্রমাণের প্রয়োজনীয় হিপোক্রেসি বা বহিরাচরণে ভদ্রতা ছড়িয়ে বলবÑ বাবর আলী একজন লম্পট’ অথবা ‘বাবর আলী সব সময়ই বিরাজমান, বর্তমানেও বাবর আলী ঘুরছে-ফিরছে। তার উপরে, ক্রমশ জীবন যেভাবে উন্মুল-ছিন্নমূল-শেকড়ছাড়া হয়ে উঠছে সনাতনী ব্যবস্থা ভেঙে ফেলে বা ছেড়ে এসেÑ এরকম সময়ে বাবর আলীদের সংখ্যা বেড়েছে কিনা, মনে মনে অনুমান করা যেতে পারে।’ সৈয়দ শামসুল হকের আলোচিত-সমালোচিত উপন্যাস খেলারাম খেলে যা নিয়ে কবি-নির্মাতা টোকন ঠাকুর উপরোল্লিখিত এমন সব যুক্তি প্রদান করেন যা উক্ত উপন্যাসের সপক্ষে একটি শক্ত অবস্থান আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। ‘বাথরুমের দেয়ালে উৎকীর্ণ প্রতারিতের অভিজ্ঞান’ শিরোনামের দীর্ঘ গদ্যে কবি টোকন ঠাকুরের স্বব্যাখ্যায়িত বয়ান সত্যি অসাধারণ।

ক্যামেরার কবি নাসির আলী মামুনের ‘আলোর ফোকাসে ব্যাকুল অরণ্য’ নামে বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের যে স্মৃতিচারণ তাও মন দিয়ে পাঠ করা যায়।

নাট্যজন সেলিম আল দীনকে নিয়ে কথাশিল্পী স্বকৃত নোমানের অথবা শিষ্যের কলমে গুরুর সঙ্গে অন্তিম সময়ের অভিজ্ঞতার বিবরণ বেদনাক্রান্ত করে মন।

এস এম সুলতান ও সেলিম আল দীন দুজনই বাংলাদেশের চিত্র ও নাট্যকলায় সর্বজনশ্রদ্ধেয় গুণীজন। তাঁদের স্মৃতিচারণ নিয়েই মূলত শুরু হয়েছে শিল্পসাহিত্যের কাগজ শঙ্খচিল-এর চতুর্থ বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা।

শঙ্খচিলের এ-সংখ্যায় প্রতিটি গদ্যের আলাদা আলাদা বিষয় দিয়ে নামাঙ্কিতকরণের চিন্তাটি যথেষ্ট সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রাখে। গদ্য আরো আছে। ‘জলছায়া’ বিভাগে সেজুল হোসেনের মুক্তগদ্য, আঁখি সিদ্দিকার কবিতা-ভাবনা, রিফাত চৌধুরীর কবি হয়ে উঠার গল্প, শতাব্দী ভব’র গুলতির গল্প বাছাইলেখা মনে হলো। তবে কথাশিল্পী  আফসানা বেগমের ‘কী যে হারালো!’ শিরোনামের শৈশবচারণ মুগ্ধতা নিয়ে পাঠ করতে হয়। তাঁর দেখার চোখ নিখুঁত। ছোট্ট একটি লেখায় বেশ কিছু সুখপাঠ্য গল্প তিনি দরদের সঙ্গে তুলে এনেছেন। ত্রিশোর্ধ্ব যেকোনো পাঠকের শৈশবের সঙ্গে এ গল্পগুলো মিলে যেতে পারে।

শঙ্খচিলর এ-সংখ্যাটি বিষয়বৈচিত্র্যে ঠাসা। চিরাচরিত ছোটকাগজ থেকে শঙ্খচিলকে মনে হয় এ কারণে একটু আলাদা ভাবা যেতে পারে। এটি কি বৈচিত্র্য দিয়েই পাঠকের মনোযোগ কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করছে? সম্পাদক কী বলেন? কিন্তু সম্পাদকের খোঁজ করতে গিয়ে একবার গলদঘর্ম হতে হলো! প্রিন্টার্স লাইনে প্রচ্ছদ-অলংকরণ-শিল্পসজ্জার কারিগরদের নাম থাকলেও একবারে নিচে ছোট্ট করে ‘মাহফুজ পাঠক  ইকবাল মাহফুজ সম্পাদিত’ কথাটা খুঁজে পেতে কষ্টই হলো! এ দেশে যশপ্রার্থীদের অস্বস্তিদায়ক প্রকাশভঙ্গি দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়া চোখ আকস্মিক মাহফুজদ্বয়ের মিনি ফন্টে নিজের নাম উল্লেখ করার নির্লিপ্ততায় অবাক হতে হয়।

বিষয়বৈচিত্র্যের কথা বলছিলাম। আসুন তবে সংগীতের চ্যাপ্টারটা ঘুরে আসি। ওপার-এপার দুই বাংলার বিকল্পধারার দুই শিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তী ও সায়ানকে নিয়ে করা এ আয়োজনটুকুও দারুণ। অনুবাদ ক্যাটাগরিতে কবি মাসুদ খানের দুটি কবিতার ইংরেজি অনুবাদ করেছেন মো. মোজাম্মেল হক। আর সাহিত্যে নোবেল পাওয়া কথাশিল্পী এলিস মুনরোর গল্পের বাংলা অনুবাদ করেছেন অনুপমা মাহফুজ। ‘দৃশ্যপট’ নামের এ অনুবাদগল্পটি বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেবে। কথাশিল্পী শিমুল মাহমুদের ‘নেপালের কবিতা’ শীর্ষক ভূমিকায় শ্রদ্ধেয় হায়াত মামুদের করা অনুবাদে নেপালি কবি ‘বানিয়া গিরি’র’ কবিতা ‘পূর্ণ সূর্য’এর ক্ষেত্রেও এ কথা বলা যায়।

‘চিত্রকলা’ বিভাগে শামছুল আলম আজাদের ‘শিল্পের পথে পথে’, এবং দ্রাবিড় সৈকতের ‘চিত্রকলা: আমাদের শ্যামল কন্যা যাকে অন্ধ-চতুর-বধির পুরুষের হাতে তুলে দিয়েছি’ শিরোনামের দুটো গদ্য পরিশ্রমলব্ধ বলে মনে হয়েছে।

তারপর আসি ‘মূল্যায়ন’ বিভাগে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদকে নিয়ে খোলাখুলি বলেছেন কথাশিল্পী মনি হায়দার ও কবি ফজলুল হক তুহিন। মনি হায়দার ‘শামসুর রাহমানের গল্প, বিদীর্ণ আয়নায় মুখ’ ও ফজলুল হক তুহিনের ‘আল মাহমুদের পশ্চিমবঙ্গ জয়’ দুটোই ক্ষুদ্র পরিসরের লেখা যা বাংলাদেশের অগ্রগণ্য দুই কবির লেখা বা যাপিতজীবনের মূল্যায়নের প্রশ্নে জবাব দিতে যথেষ্ট নয়। তবু দুই কবিকে পাশাপাশি উপস্থাপন করায় দুজনের ভক্তকূলেরই দৃষ্টি ও পাঠের তৃষ্ণা মিটবে বলা যায়। মূল্যায়ন বিভাগে তরুণ কবি পলিয়ার ওয়াহিদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথিবী পাপের পালকি’ নিয়ে লাওহে মাহফুজের ‘ক্রমাগত যেন নিজেকে অনুবাদ করা’ শিরোনামে আরেকটি গদ্যও রয়েছে। আছে লিটলম্যাগ বিভাগে আহ্মেদ লিপুর লিটলম্যাগ বিষয়ক ‘তত্ত্ব, তথ্য ও অভিজ্ঞতায় ছোটকাগজের আত্মকথন’ শিরোনামে একটি বিশ্লেøষণধর্মী গবেষণাপত্র। আর ছোটকাগজ ধমনি-এর ‘মহাজন সংখ্যা’ নিয়ে পলিয়ার ওয়াহিদের একটি গোছানো পাঠপ্রতিক্রিয়া ।

দুটো গল্প রয়েছে শঙ্খচিলে। মারজুক রবীন’র ‘যেই সব শেয়ালেরা’ আর রবিউল আলম নবী’র ‘প্রাকপৌরাণিক’। দুটো গল্পেই নেশাসক্তের ও যাদু-বাস্তবতার ঘ্রাণ বিদ্যমান। গল্পকথনে দুজন গল্পকারই যথেষ্ট যতেœর ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে হয়। তবে ‘যেই সব শেয়ালেরা’ গল্পটি আরেকটু গোছানো যেত আর ‘প্রাকপৌরাণিকে’ আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে গল্পকারের আরও সচেতন হওয়ার দাবি রাখে। তিনি ভৈরব অঞ্চলের ভাষা যথাযথ প্রয়োগ করতে পারেননি!  কথাসাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে সতর্কতা রক্ষা করা জরুরি, এটা মানতে হবে।

ছোটগল্পের বাইরে মুম রহমানের ‘ইলেকট্রিক করাতকল’, শিপা সুলতানার ‘ভিখারী ভাই’, মেহেদী উল্লাহর ‘ছিনতাই’ এবং মুহাম্মদ ফরিদ হাসানের ‘পাখিটি উড়ে যাবার আগে’ শিরোনামের চারটি অনুগল্প আছে। চারটি লেখাই সুখপাঠ্য তবে মেহেদী উল্লাহর ‘ছিনতাই’ অনুগল্পটি একশ্বাসে পড়ে তো শ্বাস বন্ধ হবারই যোগাড়! এত অল্প কথায় একটি অসাধারণ গল্প তুলে ধরেছেন তিনি। ‘ছিনতাই’ আনায়াসে একটি আদর্শ গল্প এমনকি উপন্যাসেরও  কলেবর পেতে পারে।

শঙ্খচিলে সব শেষে যোগ হয়েছে দুটো ভ্রমণকাহিনি। মৃত্তিকা গুণের ‘হারবিন, রাজহাঁসের গলার মুক্তাটি’ শিরোনামের কাহিনিতে লেখক আমাদের সামনে এক টুকরো চীনকে তুলে ধরেছেন। তাঁর বিবরণ সুন্দর।

মুহাম্মদ আবু রাজীন ‘নুহাশপল্লীর পথে পথে’ লেখাটিতে লেখক কথাশিল্পী  হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিধন্য নুহাশপল্লী ঘুরে দেখার আবেগঘন অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।

বাকি রইলো লিটলম্যাগের প্রধান অনুসঙ্গ কবিতা। সাতান্নজন কবির কবিতা নিয়ে করা কবিতার আয়োজনটুকু বেশ। তাঁদের বাইরে অন্যান্যদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গেরও পাঁচজন কবির কবিতা নিয়ে সেজেছে ১৬০ পৃষ্ঠার শঙ্খচিল।

চোখে লেগে থাকার মতো সব্যসাচী হাজরার সুন্দর প্রচ্ছদ ও নামলিপি, মোস্তাফিজ কারিগর, রাজীব দত্ত ও দেলোয়ার রিপনের অলংকরণ এবং কাজী যুবাইর মাহমুদের শিল্পসজ্জায় সাজানো শঙ্খচিলের এ সংখ্যাটি সংগ্রহে রাখা যাবে নিঃসন্দেহে। সকল শ্রেণির পাঠকদের শঙ্খচিল-পাঠে নিমন্ত্রণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares