লিটলম্যাগ

ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক  : থিয়েটার

অপূর্ব কুমার কুণ্ডু

 

বাংলা নাট্যজগতে নিবেদিত নাট্যাভিনেতা আলী যাকের সম্প্রতি নাট্যবিষয়ক একটি সেমিনারে বলেছিলেন, আমরা যারা অভিনেতা কিংবা অভিনেত্রী তারা মঞ্চ-অভিনয় করি, দর্শকদের সামনে জীবন্ত সে অভিনয়। পুরস্কার-তিরস্কার সে-সবই পাই। কিন্তু অভিনয়টা তো শেষপর্যন্ত তাৎক্ষণিক। এই আছে এই নাই। জীবনের এই পরিণত বয়সে এসে মনে হয় জীবনের সমান্তরাল যাপিত অভিনয়-জীবনের কথা যদি লিখে রাখতাম, লিখে যেতে পারতাম, তবে তাৎক্ষণিকতার বিপরীতে মহাকালের বহমানতায় টিকে থাকতে পারতাম লেখার পাতায় কিংবা নন্দিত প্রকাশনায়। অভিনেতা আলী যাকেরের আজকের যে-ভাবনা সে ভাবনার কাছাকাছি ভাবনা সম্পাদক রামেন্দু মজুমদার যে ভেবেছেন স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে, তারই বাস্তবতা ৭২ সালে তাঁরই সম্পাদিত ত্রৈমাসিক থিয়েটার- বিষয়ক পত্রিকা থিয়েটার-এর প্রকাশনা। প্রকাশিত আত্মজীবনী দ্য উইংস অফ ফায়ার এবং মাই জার্নি গ্রন্থে ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট এপিজে আবদুল কালাম তার মিসাইল বিজ্ঞানী হয়ে উঠবার পথে যার প্রতি সব থেকে বেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি বিজ্ঞানী-শিক্ষাবিদ- প্রতিষ্ঠাতা এবং তাঁর মতো অনেকেরই পথপ্রদর্শক ড. ভিকরম সারাভাই। সারাভাইয়ের নেতৃত্বের মূল্যায়নে কালামের বিশ্লেষণ তিনি অপরের কথা শুনতেন, চিন্তার জগতে তিনি ছিলেন সৃজনশীল, সকলকে নিয়ে তিনি চলতেন আর অপরের ব্যর্থতাকে বড় করে না দেখে অপরের কর্মস্পৃহাটাকেই স্বাগত জানাতেন। বর্তমান নামসর্বস্বতা আর নিজের ঢোল নিজে পিটাবার দোদুল্যমান সময়ে অপরকে আর স্বাগত জানাবার প্রয়োজন পড়ে না। অপরের মুখ থেকে প্রশংসা শুনবার প্রয়োজন পড়ে না। সে নিজেই নিজেকে স্বাগত জানায়, সে নিজেই নিজের প্রশংসা করে, সে নিজেই অপরের পূর্বসূরি বিবেচনা করে নিজেকে পথ-প্রদর্শকের প্রবক্তা হিসাবে ঘোষণা করেন। এই মোহের ফাঁদে অনিচ্ছাকৃতভাবে পা রাখতে যাওয়া নাট্যাঙ্গনের কোনো অভিনেতা-অভিনেত্রী, নাট্যকার-নির্দেশক, আলোক পরিকল্পক কিংবা ডিজাইনার, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের নেতা-নেত্রী যদি ভাবতে বসেন যে সেই নাট্যাঙ্গনের হর্তা-কর্তা কিংবা নেতা তবে তার মোহভঙ্গের জন্যে সবিনয় নিবেদন, আপনি কি ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউটের সদস্য একশতের অধিক রাষ্ট্রের অধিক সংখ্যক ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারবেন? নির্বাচিত হলেও পরাপর দুবার নির্বাচিত হয়ে নন্দিততার মধ্যে দিয়ে অবসরে যেতে পারবেন? পারবেন থিয়েটার দলগুলোকে একত্রিত করে ফেডারেশনের আচ্ছাদনে আনবার মতো কোনো মৌলিক সাংগঠনিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হতে? থিয়েটারের মতো নাট্যদল গঠন করে ঝড়-ঝঞা আর বজ্রাঘাতের মতো আঘাতের দোলাচলে অবিচল থেকে নাট্যানুরাগী দর্শকদের সম্মুখে নব নব নাট্য রোশনাইয়ের আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে দিতে? কিংবা অসংখ্য নাট্যকার-প্রাবন্ধিক-সমালোচকদের লেখার ক্ষেত্র নির্মাণ করে তাদের বিকাশও প্রকাশের পাশাপাশি বাংলা নাটকের একটা নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের উপকরণ নির্মাণে ৪৫ বছর সময়কাল ধরে সম্পাদনার মতো থিয়েটার পত্রিকা সম্পাদনা করতে? হর্তা-কর্তা কিংবা সেই নেতা হয়তো এর যেকোনো একটি পারলেও পারতে পারেন অথবা কোনোটিই নাও পারতে পারেন তবে তাতে লজ্জ্বিত হবার কিংবা হীন ভাববার কোনো কারণ নেই। বরং তার গৌরবের কারণ আছে। কারণটা হলো এই কর্মযজ্ঞের কর্মবীর মানুষটি তারই সময়ের একজন, তারই পূর্বসূরিদের একজন, তিনি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। তারই সম্পাদিত থিয়েটার পত্রিকার ৪৫তম বর্ষের ১ম সংখ্যা পড়ে লিখতে বসার ক্ষণে উপরিউক্ত ভাবনার দোলাচল এ-কারণে যে, সমালোচক হয়ে থিয়েটারের বর্তমান সংখ্যার মূল্যায়নে কতটা পথ পাড়ি দিলেও দিতে পারি সে ভাবনা ভেবে।

ভাবাভাবির যেমন শেষ নেই তেমনি সমর মজুমদারের নয়নাভিরাম প্রচ্ছদে পাঠকহৃদয়ে প্রশান্তি আছে কিন্তু বৃষ্টি না খরা কি কারণে মা-মেয়ের মাথায় ছাতা ধারণ সে ব্যাখ্যা নেই। অবশ্যি শিল্প তো প্রয়োজন অপেক্ষা অপ্রয়োজনকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে এসেছে আবহমানকাল থেকে। শিল্পীর কাছে ইলিশ মাছ অপেক্ষা ইলিশের ঝিলিক কিংবা মেঘ অপেক্ষা মেঘের কৃষ্ণ বর্ণ যা ময়ূরকে পেখম মেলতে প্রেরণা দেয় তাই বেশি প্রয়োজনীয়। তবে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা রয়েছে তিনটি নাটক প্রকাশের ক্ষেত্রে। যেহেতু এবছর সারা বিশ্বব্যাপী শেক্সপিয়রের ৪০০তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হচ্ছে ফলে শেক্সপিয়রের রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট অবলম্বনে রচিত তিনটি নাটক থিয়েটার সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। পারিবারিক বিরোধের যাঁতাকলে পড়ে যুবক-যুবতী, রোমিও-জুলিয়েটের প্রেমের বলিদান গাথা রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট। কাব্যের শক্তি যে শব্দ-সুরে-ছন্দে তা নিয়েই নাট্যকার শুভাশিষ সিনহা রচনা করেছেন কাব্যনাটক নয়নতারা। রূপান্তরিত নয়ন আর তারার বিয়োগান্ত পরিণতি শেষে নাট্যকারের সিদ্ধান্ত ভালো লাগে :

বচনে বচনে সুধা        প্রেমের তিয়াস ক্ষুধা

নাই কূল নাই পারাপার

জীবনের সব আশা       প্রেমেরই পরম ভাষা

ধ্বনি, কথা, হাসি, হাহাকার…

 

হাহাকার না বরং হুংকার দিয়ে নাট্যাঙ্গনে বর্তমান অবস্থান ইউসুফ হাসান অর্ক’র। একদিকে নির্দেশনায় সফলতার তাড়নায় তিনি খানিকটা দিশেহারা। ফলে ডিরেক্টরিয়াল ভঙ্গিমায় নাট্যরচনা, দেশজ অঙ্গিকে পরিবেশনা অথচ গন্তব্য না জেনে অর্থাৎ ঠিক অনুবাদ-ঠিক রূপান্তর না করে চমকে দেবার মতো একটা গন্তব্যে পোঁছে যায় তার নিও রোমিও-জুলিয়েট। নাট্যকার রুমা মোদকের রচনা ‘স্বর্গ হতে আসে প্রেম’। রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েটের মূল দ্বন্দ্ব অক্ষুণœ রেখে আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে তার রূপান্তরিত নাটক মৌলিকত্বের সাধ পাইয়ে দেয়।

সাধ পাইয়ে দেবার ক্ষেত্রে শফি আহমেদের প্রবন্ধ শেক্সপিয়রের নাটকের বিভিন্ন পথে বিভ্রান্তভাবে পথ চলে কিন্তু শিরোনাম একটিই হয় আর তাহল ‘শেক্সপিয়রের নাটকে কর্তৃত্ববাদ এবং তার প্রতিবাদ’। শফি আহমেদের লেখাটি যতটা না পাঠকমুখি তার চেয়ে বেশি তার-মুখি। মো. সানোয়ার হোসেন অতসব জটিলতায় না গিয়ে বরং ওথেলো, ম্যাকবেথ এবং কিংলিয়ার নিয়ে নিজের মতো এবং খানিকটা বইয়ের মতে করে লিখেছেন তার প্রবন্ধে ‘শেক্সপিয়রের তিনটি নাটক : একটি পর্যালোচনা’। আল্ জাবির চেয়েছেন নিজেকে তুলে ধরতে প্রবন্ধ রচনার মধ্যে দিয়ে, সেটা তিনি পেরেছেন। ফলে তিনিই লক্ষ্য, শেক্সপিয়র উপলক্ষ। ফলাফলে সমুদ্রে জাল ফেলার মতো তার লেখার শিরোনাম ‘ঔপনিবেশিক কৃষ্ণকায়ায় শেক্সপিয়রের আলোকবর্তিকা এবং বাঙ্গালির নাট্যপ্রেরণা’। প্রেরণা-অনুপ্রেরণা কিংবা পথ-নির্দেশনায় যেভাবেই মুনীর চৌধুরীকে বিশ্লেষণ করা হোক না কেন সব লেখাই কেন জানি রিপিটেশান হয়ে ওঠে বারংবার। সেই কবর, সেই রক্তাক্ত প্রান্তর, সেই অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা প্রভৃতি। ফলে মো. হারুনুর রশীদের লেখার শিরোনাম সেই একই রকম ‘মুনীর চৌধুরীর নাটক : বিষয়বস্তু, জীবনবোধ ও নাট্যশৈলী’।

জীবনবোধ তৈরি হয় অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে আর নাট্যশৈলী প্রদর্শিত হয় সাধনার পরিচর্যায়। এই দুয়ের সংমিশ্রণে লেখা এনামুল হকের অভিজ্ঞতার সিঞ্চন ও আত্মজৈবনিক লেখা বাংলাদেশের মফস্বলে প্রথম রক্তকরবী। ১৯৫৭ সালে আরমানিটোলা ময়দানের পশ্চিমধারে শাবিস্তান সিনেমা হলে মঞ্চ তৈরি করে কলকাতা বহুরূপীর রক্তকরবী মঞ্চায়ন, ৫৭ সালে বর্তমান শেরাটন হোটেলের স্থানে ড্রাম্ সার্কেলের রক্তকরবী মঞ্চায়ন, চট্টগ্রামে সেন্ট প্লাসিডস হলে মঞ্চায়ন এবং বগুড়ায় স্থানীয় দলের প্রযোজনায় রক্তকরবী মঞ্চায়নের পথ-পরিক্রমা নিয়ে এনামুল হকের লেখা হৃদয়স্পর্শী। দল থাকলেই দলাদলি আর খ্যাতির প্রশ্নে পরশ্রীকাতরতার বলিদানে বগুড়ায় রক্তকরবী মঞ্চায়ন যখন বড় সর্দার চরিত্রাভিনেতার বেইমানি তথা শো শুরুর পাঁচ মিনিট আগে টর্চ লাইট সহযোগে অভিনেতার পলায়ন তখন ঐ সংকটকালে এনামুল হকের ভূমিকা ভুলবার নয়। ভুলবার নয় পরিশ্রমী গবেষক-লেখক- নাট্যকার- সমালোচকদের লেখার ডালি নিয়ে সম্পাদক রামেন্দু মজুমদার সম্পাদিত থিয়েটার পত্রিকা ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হয়ে ৪৫তম বর্ষের ১ম সংখ্যা হয়ে সদাই চলমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares