বইকথা

ছবি আর কবিতার

যুগলবন্দি

রাজীব শূর রায়

 

পা পা করে তোমার দিকেই যাচ্ছি

মিনার মনসুর

প্রচ্ছদ ও চিত্রকর্ম : বাহারউদ্দিন

প্রকাশক: আরম্ভ পাবলিশার্স, কলকাতা

প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৬

মূল্য : ২৫০ টাকা

 

অনেক সময়, অনেক কবির কবিতায় প্রকৃতি, প্রণয় যেভাবে ধরা দেয় সেভাবে উদাত্ত প্রতিবাদ, দ্রোহ বা শ্লেষ ধ্বনিত হয় না। গা-বাঁচানো মনোভাবের জন্য তাঁরা নান্দনিকতার আশ্রয় নেন, অথচ চারপাশের প্রাত্যহিক সমস্যা সম্পর্কে তাঁদের অদ্ভুত নীরবতা চোখে পড়ে। মিনার মনসুর এক্ষেত্রে কেবল ব্যতিক্রমী নন, এক প্রদীপ্ত প্রতিবাদের ও সাধু অঙ্গীকারের জাগ্রত প্রহরী। প্রতিবাদ ও প্রত্যাশা তাঁর কবিতাকে স্লোগান করে না- তাঁর উচ্চারণে অনুস্যূত হয়ে থাকে মরমি মানুষের সুদীপ্ত বোধ ও স্নিগ্ধ ভালোবাসার জলজ বাহার। মুক্তিযুদ্ধের আবহে ও উত্তাপে বেড়ে উঠেছেন তিনি, দেখেছেন জননায়কের হত্যাকাণ্ড, সামরিক শাসন, স্বেচ্ছাচারিতা, নৈমিত্তিক অরাজকতা ও মৌলবাদী সন্ত্রাস। কোনো সচেতন, সংবেদনশীল কবির পক্ষে এরকম পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে কেবল রূপ ও রসমঞ্জরির সাধনা করা হয়ে পড়ে অসম্ভব। আত্মমগ্নতা কবির স্বভাবজাত হলেও তিনি ছিঁড়ে ফেলতে চান ছন্দ, তন্তুজাল। নির্মোহ ও নিরাসক্তিকে তাঁর মনে হয় আত্মপ্রবঞ্চনা। অনুভব করেন তিনি দিনযাপনের দহন ও অসহায়তা। আর সেজন্যই ফুল্লকুসুমিত নয়, তাঁর কাব্য হয়ে ওঠে অশঙ্ক, স্পর্ধিত ও মানবিক দায়বদ্ধতায় ঋদ্ধ। তাঁর কবিতাকে সমৃদ্ধ করে ইতিহাসবোধ, ঐতিহ্যপ্রিয়তা ও প্রাণবন্ত জীবন সুষমা। ‘দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে’ কবিতার সূচনাটি এরকমÑ‘গ্রামপতনের শব্দ শুনি নিরন্তর/বন্য হাতির মতো দল বেঁধে তারা আসে।…’ আর সেই কবিতা বিবিধ ভ্রমণের শেষে পরিণতিতে আসে এভাবেÑ ‘মুমূর্ষু সন্তের মুখে যিনি তুলে দেন সঞ্জীবনী সুধা তার নাম বিমূর্ত নির্বাণ নয়, রক্তমাংসময় শুধুই সুজাতা।’

বিমূর্ত নয়, মূর্ততেই তিনি প্রাণবন্ত, অস্থির ও সঞ্চারমান। তাই তিনি অনায়াসে বলে দিতে পারেন- ‘কবিতাও ক্ষুব্ধ আজ, এমন দুর্দিনে যারা ঘরে বসে থাকে- শব্দরা সরব/আজ তাদের ধিক্কারে। দুর্বৃত্তের দম্ভের কফিনে/ তপ্ত সিসা ঢেলে দিতে এককাট্টা সুকান্ত-নজরুল।’

স্পর্ধা ও আত্মবিশ্বাস তাঁর স্বভাবধর্ম। তমসাক্লিষ্ট অবসাদের প্রতি সরব তাঁর ঘৃণা। অবরুদ্ধতার মাঝেও তিনি বলতে পারেন- ‘যতই পোড়াও তুমি-চাপা দাও মাটি/ছাইভস্মের ভেতর থেকে ফের জন্ম নেব আমি।’ প্রতিবাদ, প্রতিরোধের কণ্ঠস্বরের আড়ালে স্মিত থাকে দার্শনিকতাও। জীবনের সহজ থেকে কবি খুঁজে নেন বাঁচার অহৈতুকী বিনির্মাণ। আর সেজন্যই তিনি লিখতে পারেন- ‘ধূলির জীবন যার- শেষ ধূলিময়/ কে তার সাকিন খোঁজে- নাম পরিচয়।’

মিনার মনসুর প্রেমে উষ্ণ হন, স্নেহে সিক্ত হন ঠিকই, কিন্তু তাঁর কবিতার প্রাথমিক লক্ষণ প্রতিস্পর্ধা। তবু তাঁর কবিতা তš§য় হয়ে ওঠে আত্মস্থ শুভবোধ ও কল্যাণভাবনার জন্য। মিনার মনসুরের এ কাব্যগ্রন্থকে আনন্দময় করেছে বাহারউদ্দিনের চিত্রকর্ম। রং ও রেখায় সপ্রাণ উপস্থিতি কবিতাগুলিকে স্পর্শ দিয়েছে অন্য মাত্রার। ধ্বনিময়তা অভিষিক্ত হয়েছে আলোকের অঞ্জলিতে।

কাব্যগ্রন্থটির প্রায় প্রতিটি পাতায়, কখনও উলটোপিঠে বিভিন্ন ভঙ্গির ছবির সমাবেশ দেখে মনে হতে পারে, কবিতা পড়তে পড়তে বুঝি ছবি এঁকেছেন বাহার। কারণ চিত্রকর্মের জটিল অভিব্যক্তি, রূপক, অবয়বের তির্যক দৃষ্টি, দুঃসাহসী রেখা আর রং ব্যবহারে ক্রোধ, বিষণ্নতা আর পারিপার্শ্বিকের যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ গভীরভাবে নাড়া দেয় আমাদের, যা মিনার-এর কবিতারও নিহিত বিষয়। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে, দুই দেশের সমসাময়িক দুই নাগরিককে কীভাবে তাড়া করে একই ধরনের উদ্বেগ? এটা কি সমান্তরাল চিন্তার সংঘবদ্ধ লক্ষণ? হতে পারে। আবার না হওয়াটাও অসম্ভব নয়। এরকম হওয়া স্বাভাবিক। কারণ, সময় ও ইতিহাসসচেতন যেকোনো শিল্পীসত্তাকে কবিতা বা আঁকার মুহূর্তে চারপাশের ঘটনা নিরন্তর উদ্বিগ্ন করে। ঠিক তেমনই ঐতিহ্য আর ভবিষ্যতের স্বপ্নও ছুঁয়ে যায় তাঁদের। সৃষ্টির শরীর ও আত্মায়ও এসব ছায়া পড়ে। এই ধরনের ছায়াপাত নিছক তাৎক্ষণিকতা নয়, বরং একে বলা যায় আশঙ্কা-তাড়িত উদ্বেগ বা অশুভের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ প্রতিরোধ। একথা বলতে হচ্ছে এজন্যই যে, মিনার যখন দেখতে পান ধেয়ে আসছে কবন্ধ মানুষের ঢল, সর্বভুক দাঁতের তা-ব, রাষ্ট্রের অন্ধতা, মন্ত্রীর মুখগহ্বর থেকে নির্গত বিষ্ঠা ও কাদা, সাগরে রক্তের গর্জন, নদীর বস্ত্রহরণ, রক্তস্রোতে ভাসমান বিবস্ত্র দেহ- ঠিক একই সময়ে চিত্রকর্মের ব্যাকরণকে তছনছ করে দিয়ে, বাস্তব ও পরাবাস্তবকে স্পর্শ করে বাহার-এর তুলি কিংবা রেখায় বিমূর্ত হয়ে ওঠে বিষণ্ণন রক্তাক্ত রমণীর বস্ত্রহীন দেহ, ক্রুদ্ধ ঘোড়া, স্তম্ভিত মুখ-সবুজ, সাদা, হলুদ রঙের মিশ্রণে একাধিক মুখের বিমর্ষ দৃষ্টি।

মিনারের ‘বধ্যভূমি’ শীর্ষক কবিতার ঠিক উলটো পাতায় রমণীর বিস্মিত বিপন্ন ছবিতে লাল-কালো সাদা আর আকাশি নীল মিশিয়ে যে ভৌতিক অবয়ব তৈরি হয়েছে, তাতে একজন কবি ও আরেকজন শিল্পীর সমান্তরাল চিন্তার আত্মীয়তায় মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। মিনারের কাব্যভাষা স্বতন্ত্র, প্রতিবাদমুখর। এখানে বাহার-এর ছবির জগৎ কি আলাদা? ক্রোধ, বিষণ্ণতা আর বিস্ময়ের পাশাপাশি দুজনের বসবাসে দুজনকেই সমব্যথী মনে হয়। একই সময়কে ঘিরে লেখা আর আঁকার জন্যই হয়তো দুজনেই শুনতে পাচ্ছেন ভয়ঙ্করের পদধ্বনি। মিনার-এর কবিতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। কিন্তু বাহার-এর ছবি দেখার সুযোগ হয়নি। শিল্পীসত্তা সাংবাদিকতায় ঢাকা পড়ে আছে। তাঁর হƒদয় যে ছবি আর রং দিয়ে বর্ণিল, একথা খানিকটা সংশয় নিয়েও বলতে পেরে ভালো লাগছে। তাঁর ব্যকারণহীনতা, অয়ববে ভাঙচুর, বেপরোয়া রং ব্যবহার, অঙ্কনরীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, কিন্তু দুঃসাহস ভাবিয়ে তুলবে বহু বোদ্ধাকে। একইভাবে মিনার মনসুরের গম্ভীর উচ্চারণ প্রাণিত করবে কবিতাপ্রেমীদের। মিনার মনসুরের কবিতা ও বাহারউদ্দিনের ছবি তৈরি করেছে এক মুগ্ধ বিস্ময়, এক অনুপম যুগলবন্দি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares