বইকথা

মৌমিতা  আত্মপরিচয় নয়, জন্মপরিচয়ের দায়

মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম

 

মৌমিতা

মোহীত উল আলম

প্রকাশক : কথাপ্রকাশ, ঢাকা

প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৬

মূল্য : ১২০ টাকা, পৃষ্ঠা : ৭০

 

দেশের এবং বিদেশের খেতাব নিয়ে এসে তড়িঘড়ি করে আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করি, মোহীত উল আলমের এ উপন্যাস তাদের জন্যে ভালো খবর নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যারা প্রবেশ করি, তাদের থাকে বেশ বড় বড় ডিগ্রি। ফোর ফার্স্ট ক্লাস, এমফিল, পিএইচডি, ডিলিট আরও কত কী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পদধূলি দেবার পরে আসে বড় বড় সম্মাননা, দেশ থেকে, বিদেশ থেকে! নানা জায়গায় আজকাল নানা জিনিস কুড়িয়ে পাওয়া যায়। যিনি সে সব পেতে আগ্রহী, তাঁর হাতে সেগুলি ধরা দেয়। আজকের দিনে এগুলি হয়েছে মুড়ি মুড়কির মতো। পুরস্কার সেই দরের একটি মোয়া। এইসব ব্যাপারে কেবল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকতে হয় যে, সে সব তাঁকে পেতে হবে। ব্যস!

সবাই যে আমরা এরকমভাবে ওঁত পেতে থাকি, তা অবশ্যি নয়। শিক্ষকতার উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশক মাত্রই যে এসব খেতাবের অধিকারী, তাও নয়। ব্যতিক্রম তো সবখানে, সর্বত্র আছে। ব্যতিক্রম দিয়ে সমাজ-সংসারের হিসাব হয় না। রাষ্ট্র ও সমাজ এই ব্যতিক্রম দিয়ে চলে না। সভা সমিতিতেও ব্যতিক্রমের হিসাব অচল। বলা হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা। সংখ্যাগরিষ্ঠ কী মনে করছে, কী ভাবছে, কী করছে, তাই দিয়ে সবকিছু চলে। চণ্ডীপাঠ থেকে জুতো সেলাই এই সংখ্যাগরিষ্ঠের ইঙ্গিতের বশীভূত। সত্যের মৃত্যু ও নীতিধর্ষণ আজ এই সম্মিলিত ক্ষমতা-লোলুপতায় ঘটে চলেছে।

মৌমিতা উপন্যাসে আমরা দেখি, মৌমিতা স্ট্রিট-বেশ্যার মেয়ে। ঘটনাচক্রে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষকের আশ্রয়ে পালিত হয় এবং দেশের সেরা চিত্রশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রতিভাবান শিল্পী হিসেবে মৌমিতাকে দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জয়নুল আবেদিনের পরে তাঁর স্থান। মৌমিতা আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে, একুশে পদক পেয়েছে। গুগল খুলে ওয়েব পেজগুলোয় দেখা গেল উইকিপিডিয়া ইত্যাদি মাধ্যমগুলোতে মৌমিতার কীর্তির পরিচয় সমগ্র দুনিয়া ছড়িয়ে গেছে। এই পরিচয় মৌমিতার শিল্পী পরিচয়। কিন্তু তার জন্মবৃত্তান্ত? এই শিল্পীর জন্মবৃত্তান্তের প্রশ্ন যখন এল, তখন দেখা গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক ম্যাগাজিনে তাঁর সে পরিচয় প্রকাশ নিয়ে জটিলতা তৈরি হলো।

 

ঘটনার জট এবার খুলে বলা যাক। বলে নিই মোহীত উল আলমের এই মৌমিতা, উপন্যাস কিনা, সার্থক উপন্যাস কিনা, শ্রেষ্ঠ উপন্যাস কিনা- এইসব জটিল ও কুটিল প্রশ্নে প্রবেশ করা এ আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। লেখক এটাকে উপন্যাস বলে মুদ্রিত করেছেন এবং উপন্যাসের উপকরণও এর মধ্যে অপ্রতুল নয়। কাজেই সাধারণ অর্থে এটাকে উপন্যাস ধরে নিতে বাধা নেই। প্রচলিত অর্থে উপন্যাসে থাকে কাহিনি, থাকে বিষয়বস্তু, চরিত্র, সামাজিক অবস্থান, কত কী! উপন্যাসের কথা বলতে গেলে তার নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কথা বলতে হয়। ভাষা, প্লট, চিত্রায়ণ, প্রকরণ বা শিল্প ইত্যাদি হচ্ছে পয়লা কাতারের সব গুরুত্বপূর্ণ উপকররণ। কোনোটিই কম মূল্যবান নয়। কোনোটির ওজন কম নয়। কোনো অঙ্গের কথা ছাড়া যায় না। কোনো অঙ্গের গুরুত্বকে ছোটো করে দেখা যায় না। মেয়েটিকে ভালো করে সাজানো হলো, পোশাকপাতির ঘাটতি নেই কোথাও, চুল আঁচড়ানো থেকে নিয়ে আমু-পদনখ সব ঠিক আছে। কিন্তু কাঁচা হলুদ জমিনের লালপেড়ে শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে পরার কথা ছিল যে লাল টক্টকে টিপ, অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেল, মেয়ের কপালে সেই টিপটি নেই। বরবাদ হয়ে যায় তেমন সাজগোজ। উপন্যাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই রকম উপকরণের ঘাটতি হলে।

তবু এমন শিল্পের দুটো দিক খুবই মূল্যবান। উপন্যাসের সামাজিক অবস্থান- স্থান ও কালের সংকট, মনে রাখতে হয় প্রথম। অন্যদিকে আছে, বিষয়বস্তু। কী নিয়ে কথা বলা হচ্ছে উপন্যাসে, ভুলে গেলে এ শিল্প দাঁড়াতে পারে না। কেননা এ দুই হচ্ছে এই শিল্পের হৃদয় ও মস্তিষ্ক। এ শিল্পের শরীরের অন্যান্য অংশ অনেকেই গড়তে পারে, কিন্তু হৃদয় ও মস্তিষ্ক গড়ার জন্যে প্রতিভার সঙ্গে প্রয়োজন হয় প্রতিভার কেন্দ্রে সততা। এরই অভাবে গত চল্লিশ বছরে বাংলাদেশে উন্নতমানের উপন্যাস সৃষ্টি হয়নি। উপন্যাসের সমালোচনাও নেই বাংলাদেশে। যা আছে তাকে বলা যায়, অতিনিন্দা এবং অতিপ্রশংসা। এই অত্যুক্তির ‘অতি’ কেবল কুরুচি ও কুচিন্তার পরিচয় নয়, এটা অসত্যও বটে। এখানকার গল্প এবং উপন্যাস যাঁরা আলোচনা করেন, তাঁরা হয় এর ভাষা, নয় এর প্রকরণের ওপর বেশি জোর দেন। সম্ভবত এই মনোভাবের মধ্যে থাকে একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত-‘আমার মাল তুমি যাচাই করে পয়লা নম্বরের বলে দাও, তোমার মাল আমি যাচাই করে পয়লা নম্বরের বলে দেব।’ প্রকৃত পাঠক হয়তো এর দু-লাইন পড়ে বুঝে ফেলেন যে, এ হচ্ছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাল। এরই ফলে এখানে যে অসংখ্য পত্রিকায় অগণিত লেখা ছাপা হয় প্রতিদিন, প্রতিমাসে-তাতে মানুষের মন গড়ে না, কারো মনেরও পরিবর্তন হয় না। মনের অপরিবর্তনে যে আদিমতা জমে ওঠে, হিংস্র দানবের মতো সমাজে সেটাই একদিন রূপ নেয় নৃশংসতায়, অকল্পনীয় জঙ্গি তৎপরতায়। কেবল অর্থনীতি ও রাজনীতি দিয়ে এ দানবকে ঠেকানো অসম্ভব। অর্থনীতি ও রাজনীতির পরিশীলিত রূপ সংস্কৃতিতে দেখা দিলে তবেই দানবের হাত থেকে মনুষ্যত্বের মুক্তি ঘটে।

 

মৌমিতা পড়তে গিয়ে যে এইসব কথা মনে এল, উপন্যাসের এও একটা ভালো লক্ষণ বলে ধরে নিতে ক্ষতি নেই। উপন্যাসটির বিষয়বস্তুর কথা যদি ধরা যায়, তবে বলতে হয়, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বর্তমান হাল-হকিকতের কিছু খোঁজ-খবর দেওয়া এর মৌল প্রতিপাদ্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অভাবিতপূর্ব দুর্দশা ও অন্তঃসারশূন্যতা দেখানো হয়েছে বিশেষত, শিক্ষকদের নানা কর্মকাণ্ডের নজির তুলে।

উপন্যাসের শুরুতে একটি চরিত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। সজল চৌধুরীর আসল নাম মফিজুর রহমান চৌধুরী। জীবনে লেখক হবেন বলে তিনি নিজেই নিজের নাম রাখেন সজল চৌধুরী। বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করতেন। এঁর পরিচয় লেখক দিয়েছেন, ‘নিজের পেশা শিক্ষকতা হলেও সজল চৌধুরী চূড়ান্তভাবে আত্মপ্রচারকামী।’ এই আত্মপ্রচারকামি তার নজির হিসেবে লেখক আমাদের জানিয়েছেন, তিনি প্রবীণ অধ্যাপকদের সঙ্গে বেশি বেশি ওঠাবসা করতে তৎপরপতা দেখাতেন। মোটকথা, ‘যেটি তাঁর মন চায় সেটি তিনি করতেন না, কিন্তু যেটি করলে তাঁর সামাজিক ও বৈষয়িক উন্নতি হবে সেটিই তিনি করতেন।’ অন্য একটি চরিত্রের মুখ দিয়ে তাই বলানো হয়েছে, সজল চৌধুরী ‘আপোশকামী’। আসলে সজল চৌধুরীর আদর্শ ছিল বাস্তবের জ্ঞান। এ জ্ঞান মানুষকে শেখায় সমাজের দশজনের মধ্যে তুমি একজন হবে, এগারোজন হবে না। বলাবাহুল্য, অজাতশত্রুর দৃষ্টান্ত হচ্ছে এই মানুষ।

অপর একজন শিক্ষক সাঈদুররহমান। সরকারি কলেজ থেকে সহকারী অধ্যাপকের পদ ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ‘বাংলা বিভাগে তাঁর চেয়ে সাহিত্যের ব্যাপারে উৎসাহী অন্য কোনো শিক্ষক ছিলেন না।’ পরিশ্রম করতে পারতেন। এঁর ‘নাটকের ইতিহাস’ লেখার কথা ছিল। ‘কী একটা রহস্যের কারণে’ সেটি আর হয়ে ওঠেনি। এঁরও মধ্যে ছিল অন্য রকম চালাকি। বশির আলির দূতিয়ালীতে বিশ্ববিদ্যালয়- সংলগ্ন একটি টিলা কিনেছিল সাঈদুর। এরই মধ্যে বশির আলির মৃত্যু হলে ‘তাঁর লাশ ধোয়ার সময় সাঈদুর ছুটে এসেছিলেন যতটা না মৃতের প্রতি সমববেদনা জানাতে, তার চেয়ে বেশি টিলার কাগজটিতে বিক্রেতার সই আছে কী না সেটি জানতেন।’ রসায়নের অধ্যাপক ছিলেন ইশতিয়াক। তাঁর ‘সুবিধাভোগী চরিত্রের প্রকাশ’ সম্পর্কে অন্যেরা নানারকম কথা বলাবলি করতেন।

অধ্যাপক কদম আলি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক। পরীক্ষায় তাঁর সাফল্য অসামান্য। স্কুল জীবন থেকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কোথাও তিনি দ্বিতীয় হননি। হার্ভার্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। সেখানে দশ বছর অধ্যাপনাও করেছেন। দেশের কথা মনে হওয়ায়, দেশসেবা করবার জন্যে পূর্বকর্মস্থলে এসে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু দেশে ফিরে এসে লক্ষ করেন যে, এখানে দেশসেবার পরিবেশ নেই। তাঁর আমেরিকান স্ত্রী এ পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে না পেরে আমেরিকায় চলে যান। কদম আলি আর গবেষণায় মন দিতে পারেন না। ‘সবকিছুর বিরুদ্ধে যেন তাঁর বিদ্রোহ।’ তিনি কঠোর নীতিপরায়ণ, ভালো চরিত্রের মানুষ। নতুন বেতন পে-স্কেলের সর্বোচ্চ গ্রেড নিয়ে অধ্যাপকদের পক্ষে সাহসী ও প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করছিলেন। কিন্তু সেটা এক ভিন্নখাতে প্রবাহিত হয়। কেউ সুযোগ পাবে, কেউ পাবে না- এরকম এক বাস্তব প্রশ্নে শিক্ষকদের মধ্যে ঘটে বিভক্তি। অনৈক্যের দ্বন্দ্বে সেই আন্দোলন আসলে হারিয়ে যায়।

উপন্যাসের গতিও এইখানে এসে একটা নতুন মোড় নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়ে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়কে জড়িয়ে। মৌমিতার আবির্ভাব ঘটে কদম আলি চরিত্রের মাধ্যমে। লেখক একটি চমৎকার নিখুঁত বর্ণনার মাধ্যমে জনৈক বেশ্যা-কন্যাকে অধ্যাপক কদম আলির হাতে সোপর্দ করেন। কদম আলি রাস্তার ধারের এক বাস্ট্যান্ড থেকে কন্যাটিকে বাাড়িতে নিয়ে আসতে নিতান্ত বাধ্য হন। বেশ্যা রমণী এক সুবর্ণ সময় লক্ষ করে অধ্যাপক কদম আলির জিম্মায় তার কন্যাটি রেখে স্বল্প সময়ের মধ্যে ফিরে আসার কথা বলে ভিন্ন একটি অজুহাতে চম্পট দেয়। বিপুল সময় পার হয়ে গেলেও সে আর ফিরে আসে না। নিরুপায় হয়ে কদম আলি শিশু কন্যাটি গৃহে নিয়ে আসেন। নাম রাখেন মৌমিতা আলি।

কদম আলি বাধ্য হয়ে বেশ্যা-কন্যাকে গৃহে নিয়ে আসেন বটে, কিন্তু শিশুটির প্রতি তাঁর একটা দায়িত্ব ও ভালোবাসার জন্ম হয়। তিনি এটাকে দেশসেবার অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেন। ইতিমধ্যে এই হার্ভার্ড ফেরত অধ্যাপকের লেখাপড়া, গবেষণা সব চুকে যায়। এ ব্যাপারে তাঁর মনে হয়েছে, ‘যে জ্ঞানের চর্চার সঙ্গে বাংলাদেশের সমাজ-রাষ্ট্রের কিছুতেই মেলে না সে জ্ঞান চর্চা করে লাভ কি?’ কাজেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্দীপ্ত হয়ে কতিপয় বিদ্রোহী শিক্ষকের নেতৃত্বের দায়িত্বে নিজেকে নিয়োজিত করেন। এই দুই কাজের ভিতর দিয়ে কদম আলির দিন গুজরান হচ্ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে সহকর্মী সাঈদুর রহমান, কদম আলিকে আবার বিয়ে করায় উদ্বুদ্ধ করেন। ফলে কদম আলির অনেকখানি নিভে যাওয়া প্রলুব্ধ বাসনা জাগ্রত হয়। সাঈদুর রহমান এই বিয়ের পুরো দায়িত্ব নিয়ে কদম আলির এক সময়ের ছাত্রী ও পরে সহকর্মী সাবেরার সঙ্গে বিয়ে দেন। সাবেরা স্ত্রী হয়ে কদম আলির ঘরে এলেন কিন্তু মৌমিতাকে গ্রহণ করলেন না। কারণ, সে স্ট্রিট-বেশ্যার মেয়ে।

এরই মধ্যে ঘটে গেল এক বিস্ময়কর ঘটনা। লেখকের মুখে সে ঘটনা শুনে নেওয়া যাক। তিনি লিখেছেন :

মৌমিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট ইনস্টিটিউট থেকে মাস্টার্স পাস করে বের হলো। ‘নিসর্গ’ নাম দিয়ে মৌমিতা আলির একক প্রদর্শনী ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলে প্রদর্শিত হলে গণমাধ্যম তার প্রশংসায় আলাদা আলাদা সচিত্র প্রতিবেদন ছাপালো। মৌমিতার মা হিসেবে সাবেরারও টুকরো-টাকরা সাক্ষাৎকার ছাপা হলো। মা-মেয়ের একসাথে একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবি বহুল প্রচারিত একটি দৈনিকে ছাপা হলো এ রকম ক্যাপশন দিয়ে যে মৌমিতার প্রতিভা প্রকাশে তাঁর মায়ের স্বপ্ন ও পরিশ্রম কী না ভূমিকা পালন করেছিল।

পত্রিকাটি হাতে নিয়ে সেটা দিয়ে নিজেকে আড়াল করে সাবেরা চোখের জল ফেললেন। তাঁর দুই ছেলেমেয়ে বিদেশে আছে, একভাবে সুখে আছে যার যার সংসার নিয়ে। তাদেরকে কেউ চেনে না। মৌমিতার জন্য সারা দেশ আজকে পাগল হয়ে উঠেছে। জীবনের কোথায় কী তার হদিস না পেয়ে সাবেরা অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন।

-এ বর্ণনা লেখকের নিজের। তিনি এঁকেছেন মধ্যবিত্তের ছবি। নির্ভুল ইমেজ। উপন্যাসটি আসলে মধ্যবিত্তকে নিয়ে। শহুরে জটিলতার সঙ্গে গ্রাম্যতা মিশে গেছে। এঁরা শহরে বাস করে। এঁরা গাছেরটাও খায়, তলারটাও কুড়ায়। এঁরা গ্রামে থাকতে চায় না, কিন্তু মন থেকে এঁদের গ্রাম্যতা যায় না। এঁরা সত্য স্বীকার করতে পারে না। এঁরা আকাশে উড়তে চায় কিন্তু দৃষ্টি আকাশের মতো হয় না, শকুনের মতো এঁদের দৃষ্টি নিচে, মৃত-ময়লার দিকে। প্রমাণ উপন্যাস থেকে সংগ্রহ করায় ক্ষতি নেই।

 

মৌমিতা আত্মপরিচয়ে সমগ্র দেশ গর্বিত। কিন্তু দেশের মানুষ তাঁর জন্মপরিচয় জানে না। জানতে চায় না। যেটা জানে, সেটা ভুল। ভুল এদেশের মানুষকে গর্বিত করে। নইলে সাবেরার এত কদর হবে কেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাগাজিনে যখন মৌমিতার জীবনী লেখার প্রয়োজন দেখা দিল, তখন তাঁর জন্মবৃত্তান্ত গোপন রাখার পক্ষেই জনমত প্রবল থেকে প্রবলতর হলো! আত্মপরিচয় মানুষের কীর্তির পরিচয়, সৃষ্টির পরিচয়। জন্মপরিচয় মানুষের নৃ-তত্ত্বের পরিচয়। একটি অর্জিত, প্রতিভা-সৃষ্ট; অন্যটি অনর্জিত, তাতে কারও হাত নেই। কেননা তা রক্তের ধারায় প্রবাহিত। এটা অস্বীকার করবার অর্থ নিজের জন্মটাই অস্বীকার করা। বিশেষ শিক্ষার গুণে এ দুই সত্যই আমাদের অর্জন করতে হয়।

মজার ব্যাপর হলো, যেখানে আমরা শিখব বলে মনে করি, সেই শিক্ষাগৃহ অন্ধকার। কেন? মোহীত উল আলম, সজল চৌধুরীর মুখ দিয়ে বলিয়ে নিয়েছেন, ‘শিক্ষকেরা কোথায় শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, সেখানে তারাই শিক্ষাকে পিছিয়ে নেবার আয়োজনে নামে।’ কিভাবে? সজল চৌধুরী এক বক্তৃতায় বলছেন, ‘শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাঁরা গোপনে গোপনে প্রত্যাশা করেন যে কোনো একটা দাঙ্গা-হাঙ্গামা হোক বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাক এবং তাঁরা নিশ্চিন্ত মনে পড়াশোনা আর গবেষণা ছেড়ে ক্ষেত-খামার করুক, ক্লাবে এসে তাস খেলুক, ক্যারাম খেলুক এবং রাজা-উজির মারুক।’ জিজ্ঞাস্য-শিক্ষকদের মধ্যে এই কুচিন্তা এল কিভাবে? অধ্যাপক দ্বিজেন দাশ, যিনি ছিলেন অকৃতদার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর কুখ্যাতি ছিল ‘ঠোঁটকাটা’ বলে। তিনি নতুন পে-স্কেলের প্রথম গ্রেড বিতর্কের একপর্যায়ে বলেন, ‘আপনি রাজনৈতিক কারণে নিয়োগ দিচ্ছেন, তখন আপনি মেধাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন না, ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতি শক্তিশালী হচ্ছে কিন্তু সাধারণভাবে সাধারণভাবে মেধার অবমূল্যায়ন হচ্ছে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই রকম মূল্যবোধ বর্জিত শিক্ষক নিয়োগের কারণে, কদম আলির জবানিতে শোনা যায়, ‘বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আমরা বহু চেষ্টা করেও তখনকার শিক্ষক সমিতি দিয়ে একটা প্রতিবাদ সভা পর্যন্ত করতে পারিনি।’ এখানে একটা মৌল প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়ে গেল। যাঁরা প্রতিবাদহীন, তাঁরা কি সকলেই অ-মেধাবী? আর মেধাবী মাত্রই কি অন্যায়ের প্রতিবাদকারী? কাকে আমরা মেধাবী বলব- যিনি সকল পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন, তাঁকে? যিনি সকল পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন, তাঁকে তো মেধাবী বলতে বাধা নেই। কিন্তু পড়ালেখা, গবেষণা- বিশ্ববিদ্যালয়ের যেটা প্রাণ, তার সঙ্গে এই মেধার সম্পর্ক কি নেই? হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত কদম আলির মেধার কি তুলনা আছে? কই, দেশে ফিরে তো একটি প্রবন্ধও লেখেননি। বরঞ্চ বাস্তবজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন শিক্ষক- রাজনীতিতে যোগ দিয়ে!

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের এই আত্মিক সংকট নজিরবিহীন সন্দেহ নেই। কিন্তু নৈতিক সংকটের জন্যে কেবল শিক্ষকদের দায়ী করা কি ন্যায্য বিচার? আজ যে-ছাত্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, কাল সে শিক্ষক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করবে। এই ছাত্রটি ঘরে-বাইরে যা শিখছে, সে সমাজে তা-কি দান করবে না? ঘরে- মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে তাকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে ‘শিক্ষক রাজনীতি’র সঙ্গে। বাইরে- মানে দেশের বৃহত্তর ক্ষেত্রে সে দেখছে দলীয় রাজনীতির প্রভাব! সে দাঁড়াবে কোথায়? লেখক সজল চৌধুরীকে দিয়ে বলিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ আর যা বলেন সুস্থ বলা যায় না। দলীয় রাজনীতির প্রভাবে ছাত্র-রাজনীতির পরিবেশ এতটাই সন্ত্রাস নির্ভর হয়েছে যে বাবা-মা চিন্তা করেন ছেলেকে বিশ্ববিদ্যায়ে পাঠালাম পড়ালেখা শিখে মানুষ হওয়ার জন্য, সেখানে ছেলে ফেরত আসছে লাশ হয়ে।’ দলীয় রাজনীতি হচ্ছে ছাত্র রাজনীতির কারখানা। এই ছাত্রেরা যখন দলীয় রাজনীতির প্রভাবে শিক্ষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে, তখন শিক্ষক-রাজনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। লেখাপড়া, গবেষণা, সংস্কৃতি মনস্কতা, মানবিক মূল্যচেতনা, অন্যায়ের প্রতিবাদ, ন্যায়ের পক্ষে কাজ করা- বিশ্ববিদ্যালয়ের যেগুলো মৌল চাহিদা, সেগুলো মাটিচাপা পড়ে।

মৌমিতা উপন্যাসটি পড়তে পড়তে আমার মনে এমন অনেক প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে, যার সব উত্তর পাওয়া সহজ নয়। একটা সীমানার কথা উল্লেখ করা মন্দ হবে না। মৌমিতার এত বড় হয়ে ওঠার পটভূমি তেমন করে পাঠকের নজরে পড়বে না। কিভাবে তাঁর কীর্তির ইমারত গড়ে উঠল, পাঠক তা জানতে পারবেন না। পাঠকের এ অতৃপ্তি লেখককে আঘাত করতে পারে নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্নে। আরও একটি নজির দিই এ প্রসঙ্গে। অধ্যাপক কদম আলি যেভাবে বিশেষ জাঁকজমকের সঙ্গে সাবেরাকে বিয়ে করতে গেলেন, যে উৎসব সাবেরার বাড়িতে হলো, সে উৎসব যেন হারিয়ে গেল বরপক্ষে বাড়িতে ফিরে। বাড়ির বাইরে নিস্তব্ধ, অন্ধকার; বর-কনের বাসর ঘরটি কেবল আবেগের আলোয় উজ্জ্বল।

 

উপন্যাসটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর সমকালীনতা। বড় শিল্পীর কাজই হচ্ছে তাঁর সমকালকে দেখা, তাঁর চারপাশ সম্পর্কে জানা। পাঠককে তাঁর বিচরণ ক্ষেত্রের সুলুক সন্ধান দেওয়া। বিপুল বিস্তারে জীবনের আকাক্সক্ষা তৈরি করা। উন্নত সাহিত্যে অনেক উপন্যাস সৃষ্টি হয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবার জন্যে। তবে একজন পাঠক হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে, এরকম বিষয় যে বৃহৎ বিস্তার ও পটভূমিকার দাবি করে, বর্তমান উপন্যাসটি যেন তার খসড়া বা ভূমিকা মাত্র। এমন অনেক পৃষ্ঠা আছে যেখানে লেখক বৃহতের আভাস দিয়ে যাচ্ছেন। খুঁটিয়ে দেখছেন অনেক কিছু। সূক্ষ্ম এবং গভীরভাবে মনোযোগ দিতে হচ্ছে পাঠককে। কিন্তু টেক্সটের সব পৃষ্ঠায় তা উৎরায়নি, যেন লেখক তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাচ্ছেন, যেন সময়ের অভাব, ভয় যেন লেখকের, কী জানি পাঠক মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন। বিষয়ের ঐকান্তিকতায় উদ্বুদ্ধ এমন উপন্যাসের ভাষায় কোনো কোনো শব্দ অর্থের পরিচ্ছন্নতায় বাধা সৃষ্টি করে। যেমন-‘ছন্ন ছন্ন’, ‘প্যাঁচাল’, ‘ম্যাড়ম্যাড়া’, ‘ভ্যানরভ্যানর’, ‘গ্যাঁড়াকল’, ‘পেতনা’, ‘ফুটুশ’ প্রভৃতি। উপন্যসটির নামকরণেও একটা অসুবিধা এই হতে পারে যে, পাঠক হয়তো পূর্বকৃত অনুমানে এটাকে একটা সস্তা প্রেমের উপন্যাস হিসেবে পড়তে শুরু করবেন। কিন্তু ধীরে ধীরে টেক্সটে প্রবেশ করলে তিনি দেখবেন, তাঁর অনুমান ভেঙে যাচ্ছে। নতুন চিন্তা তৈরি হচ্ছে। মন স্থির করে নিতে হচ্ছে। কেননা জীবনের ও শিল্পের ভোজে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে টেক্সট। এই আমন্ত্রণ রক্ষা করলে, পাঠক খুশি হবেন বলেই আমার ধারণা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares